টুপির আমি টুপির তুমি?

২৬শে নভেম্বর ২০০৮। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী হামলা। হতাহতের সংখ্যা, আক্রমণের ব্যাপকতা, দৈর্ঘ্য — যেদিক দিয়েই বিচার করুন। সেই ঘটনার ঠিক দু সপ্তাহ পরে, এগারোই ডিসেম্বর, চেন্নাইয়ের এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের একটি টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়। গোটা ম্যাচে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে থাকার পর, চতুর্থ দিন বিকেলে ৬৮ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে বীরেন্দ্র সেওয়াগ ম্যাচ জেতার পথ খুলে দিয়ে যান। পঞ্চম দিন সকালে ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন, তখন দেশের নয়নমণি শচীন তেন্ডুলকর অপরাজিত শতরান করে ভারতীয় দলকে জেতান। খেলার পরে তিনি বলেন

What happened in Mumbai was extremely unfortunate and I don’t think by India winning or me scoring a hundred, people who have lost their loved ones will feel any better. It’s a terrible loss for all of them and our hearts are with them, but whatever manner we can contribute to making them feel better we’ll make that effort.

(www.telegraph.co.uk)

শোক প্রকাশে যে পরিমিতি জরুরী, তাঁর কথায় শুধু যে তা ছিল তাই নয়, ঐ কথাগুলোর মধ্যে এই উপলব্ধিও রয়েছে যে ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত একটা খেলাই, তার বেশি কিছু নয়। কোন জয়, কোন শতরান মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।
মাঝে এগারো বছর কেটে গেছে। “আশাটাও পণ্য এখন বাজার দরে / বিকোতে পারলে টাকা আসবে ঘরে।“ শুধু আশা নয়, শোকও এখন বিক্রয়যোগ্য। দেশপ্রেম তো বটেই।
তাই দেশসুদ্ধ দেশপ্রেমিকরা হাততালি দিলেন, হর্ষিত হলেন এই দেখে যে বিরাট কোহলি তাঁর দলবল নিয়ে ক্রিকেট মাঠে নামলেন সেনাবাহিনীর টুপি পরে, যে টুপিতে আবার বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা নাইকির লোগো। অর্থাৎ ভারতীয় ক্রিকেটাররা পুলওয়ামার শহীদদের, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এত সম্মান করেন যে তাঁদের সম্মান জানানোর জন্যেও একটা দিন সেলসম্যান হওয়া বন্ধ রাখতে পারলেন না। স্পনসরের লোগো লাগানো টুপি যদ্দিন তৈরি হয়নি তদ্দিন ওঁরা শোকপালন স্থগিত রেখেছিলেন। পুলওয়ামায় হামলা হয়েছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। এমন নয় যে তারপর থেকে ভারতীয় দল আর মাঠে নামেনি। অথচ শহীদদের সম্মানে একটা ম্যাচের ফি দিয়ে দেব, জওয়ানদের মত ক্যামোফ্লাজ টুপি পরব — এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ধোনি, কোহলির মত বিরাট দেশপ্রেমিকদের লেগে গেল প্রায় এক মাস। আচ্ছা, সিদ্ধান্তটা এমন হল না কেন যে এই দিনটায় যেহেতু সেনাবাহিনীর টুপি পরছি, সেহেতু আমাদের জামা, জুতো, টুপি, ব্যাট, প্যাড কোত্থাও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকবে না? যাঁরা জীবন দিলেন তাঁদের জন্যে এটুকু ত্যাগ করতে পারি না, অথচ দেশপ্রেম আমার উপচে পড়ছে? দেশ ভর্তি দেশপ্রেমিক বলিউড তারকা, রাজনীতিবিদ, খোদ প্রধানমন্ত্রী, তাঁর আই টি সেল — সকলে কী করে মেনে নিলেন সেনাবাহিনীর টুপির এই বেসাতি? এরপর তো কোনদিন দেখব তেরঙার মাঝখানে অশোকচক্রের পাশে জিও লোগো। দেশপ্রেমিকরা মেনে নেবেন তো? অবশ্য এতে আপত্তির আছেটাই বা কী? লালকেল্লা তো ইতিমধ্যেই ডালমিয়া রেড ফোর্ট। দেশপ্রেম তো শুধু বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার সময়ে পবিত্র, ধরা ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে।
ক্রিকেটাররা নিজেদের এক দিনের বেতন দিয়ে দিলেন জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে। চমৎকার খবর। গত বছর কেরালায় ভয়াবহ বন্যা হল, সচরাচর এত বড় বন্যা হয় না। তখন ক্রিকেটাররা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কদিনের বেতন দিয়েছিলেন মনে করতে পারছি না। আমার মত দেশদ্রোহীরা অবশ্য দেশের ভাল কাজ দেখতে পান না। দেশপ্রেমিকরা কেউ মনে করিয়ে দিলে ভাল হয়। অবশ্য ত্রাণ তহবিলে দান ঠিক ফোটোজিনিক নয়। নিহত জওয়ানদের স্ত্রীরা যা-ই বলুন না কেন, সেনাবাহিনীর নাম করে কিছু করার মধ্যে যে মাচোপনা আছে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করার মধ্যে তা কোথায়?
তাছাড়া ক্রিকেটারদের মাথায় তুলতে তুলতে আমরা যে কৈলাসে তুলেছি, সেখানে বসে গঞ্জিকা সেবন না করেও তাঁদের মনে হতেই পারে ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, তাঁরাও নেহাত খেলোয়াড় নন। সকলেই সাক্ষাৎ যোদ্ধা একেকজন। বিরাট ভাবতেই পারেন তাঁর ব্যাটটা এক্কেবারে এ কে ৪৭, ধোনির হেলিকপ্টার শটে চাপিয়ে অভিনন্দন বর্তমানকে পাঠানো হলে তিনি পাক সেনার হাতে ধরা পড়তেন না। ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা যে নিজেদের দেবতা গন্ধর্ব বলে মনে করেন তা তো আমরা দেখেছিই কিছুদিন আগে, যখন দুই তরুণ ক্রিকেটার নিজেদের কার্তিক আর কেষ্ট জ্ঞানে টেলিভিশনের প্রাইম টাইম অনুষ্ঠানে বসে লীলা বর্ণনা করছিলেন। অতএব সেনাবাহিনীর জীবন নিংড়ে নেওয়া ট্রেনিং না নিয়েও, মাসের পর মাস সমস্ত শারীরিক, মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কাজ না করেও যদি ক্রিকেটাররা মনে করেন তাঁরা আর্মি ক্যাপ পরার যোগ্য, তাঁদের ঠেকাবে কে? “সিয়াচেনে আমাদের জওয়ানরা লড়ছে” বলে যাঁরা সমালোচনার মুখ বন্ধ করেন, নিরীহ লোককে ঠ্যাঙান বা ভোট ভিক্ষা করেন — বিরাটবাহিনীর এই ধ্যাষ্টামোতে তাঁদের আহ্লাদ প্রমাণ করে সত্যিকারের জওয়ানদের প্রতি এঁদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।
বিরাট কোহলি আজ নিজেকে সৈনিক ভেবে আমোদিত হচ্ছেন, তাঁর ব্যর্থতা এবং তাঁর দলের ব্যর্থতাকে যেদিন দেশের মানুষ সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মতই মরণবাঁচন সমস্যা মনে করবেন, সেদিন কিন্তু হেরে গেলে গালিগালাজ, মারধোর, বাড়িতে ইঁট পড়া — কোনটাকেই অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ খেলা যে শুধু খেলা নয়, ভারতীয় ক্রিকেট দল যে সেনাবাহিনীর মতই দেশরক্ষার কাজে নিযুক্ত সেটা বিরাটরা নিজেরাই তো প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছেন। ইতালিতে বিয়ে করতে যাওয়া যায়, সেই সঙ্কটে ওখানে ক্রিকেট খেলতে চলে গেলে লাভ হবে তো?
এসব কেনা বেচার বাইরেও অবশ্য কালকের দিনটা অন্য এক বিপদের জন্ম দিয়ে গেল। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল ভারতীয় ক্রিকেট সংস্থার কাছে কাঞ্চনমূল্যে আত্মবিক্রীত। তাদের ঠুঁটোপনার কারণেই সম্ভবত খেলার মাঠে সামরিক তথা রাজনৈতিক প্রতীকের প্রবেশ অনুমতি পেয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন খেলায় এ ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে বলে মনে হয় না। কারণ খেলার মাঠকে রাজনৈতিক, সামরিক বিষয়ে মত প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠতে দিলে খেলাধুলোর রক্তাক্ত শত্রুতা হয়ে উঠতে বিশেষ সময় লাগবে না।
ফুটবলপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে গত ফুটবল বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর আলবানিয়ার পতাকায় যে দুমুখো ঈগল থাকে সেটার সম্পর্কে ইঙ্গিত করায় ফিফা সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত ঝাকা আর ঝেরদান শাকিরিকে জরিমানা দিতে বাধ্য করেছিল। ঐ দুজনের উদ্বাস্তু জীবন, একজনের বাবার পূর্বতন যুগোস্লাভিয়ায় নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাসের কারণে বিশ্বজুড়ে এই সিদ্ধান্তের জন্যে ফিফা সমালোচিতও হয়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, খেলোয়াড়রা বা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া পাওয়া, ইতিহাস, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি খেলার মাঠে প্রকাশ করে শাস্তি না পেলে মাঠে ক্রমশ রাজনীতিই হতে থাকবে, খেলা নয়। ক্রিকেটে সেই সম্ভাবনা গতকাল তৈরি হয়ে গেল। এরপর ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার খেলায় যদি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা রাজীব গান্ধী প্রেরিত শান্তি বাহিনীর হাতে নিহতদের স্মৃতিতে লুঙ্গি ছাপ টুপি পরে খেলতে চায় আই সি সি না বলবে কোন যুক্তিতে? এই কষ্টকল্পনারও প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের খেলায় যদি বাংলাদেশ দল পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গণহত্যায় মৃতদের স্মরণে দেখতে রক্তের ছিটের মত এমন নকশার জার্সি পরতে চায়, আটকানো হবে কোন যুক্তিতে? রাজনীতি খেলার অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করতে শুরু করলে অচিরেই খেলা রাজনীতির অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করবে। সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের যুদ্ধ লেগেছিল সামান্য একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে। আমরা আধুনিক রাষ্ট্রের মানুষ নিশ্চয়ই এই ধ্বংসাত্মক ছেলেমানুষীর পুনরাবৃত্তি চাইব না।
শেষে একটা কথা বলার আছে। অনেকেই বলেন, খেলা কি তার পারিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন? খেলাধুলোর ইতিহাসে কখনো কি রাজনীতি ঢুকে পড়েনি? বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা কাকে সমর্থন করছি তার পেছনে কি রাজনীতি থাকে না কখনোই?
সত্যি কথা। খেলা বা খেলোয়াড় তার চারপাশ বাদ দিয়ে নয়। বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের সমর্থনও প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে হয়। খেলাধুলোর ইতিহাসেও বহু রাজনৈতিক ঘটনার পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে।
কিন্তু এই আলোচনায় আমাদের সমর্থনের প্রশ্নটা প্রথমেই বাদ দিতে হবে। কারণ মাঠ থেকে বহু দূরে থাকা সমর্থকের রাজনৈতিক বা সামাজিক পছন্দ অপছন্দ খেলায় প্রভাব ফ্যালে না। যাঁরা মাঠে থাকেন তাঁদের ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রভাব ফ্যালে। সেই কারণেই তাঁদের ব্যবহারেরও নিয়মকানুন আছে। সে নিয়ম ভাঙলে তাঁরা যে ক্লাবকে বা দেশকে সমর্থন করেন তাদের শাস্তি দেওয়ার নিয়মও আছে প্রায় সব খেলাতে। সেই কারণেই চেলসি সমর্থকরা বর্ণবিদ্বেষী গালাগালি দিলে চেলসি পার পায় না।
এবার খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে আসা যাক। রাজনৈতিক বিবৃতির কতকগুলো অবিস্মরণীয়, উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খেলার মাঠে আছে। কিন্তু সেই বিবৃতি এসেছে খেলার মধ্যে দিয়েই, আক্রমণাত্মক সামরিক পোশাকের মধ্যে দিয়ে নয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃষ্টান্তটা দিয়ে শেষ করি।
বার্লিন অলিম্পিক, ১৯৩৬। অ্যাডলফ হিটলার ভেবেছিল আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ তৈরি করবে অলিম্পিকটাকে। অথচ তার নাজি গর্ব গুঁড়িয়ে গিয়েছিল একজন কালো মানুষের পায়ের তলায়। তাঁর নাম জেসি আওয়েন্স। নাজিবাদকে খেলার মাঠে হারিয়ে দিয়েছিল চারটে সোনার মেডেল। মার্কিন সেনাবাহিনীর পোশাক নয়।

ঐ অলিম্পিকেই হকি ফাইনালে হিটলারের জার্মানিকে ভানুমতীর খেল কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এক ভারতীয়। তাঁর নাম ধ্যানচাঁদ। পরাধীন দেশের কালো চামড়ার লোকেদের দলের কাছে সেদিন আট গোল খেয়েছিল হিটলারের আর্য রক্তের বীরপুঙ্গবরা। শোনা যায় হিটলার নাকি ধ্যানচাঁদকে জার্মানিতে রেখে দিতে চেয়েছিল৷ হকির জাদুকর পাত্তা দেননি। তাঁর কিন্তু শস্তার জার্সি ছাড়া কিচ্ছু ছিল না।

Where is the hosh?

আমাদের এলাকায় পাড়ার লোকেরা মিলে অপেশাদার যাত্রা করেন বহুকাল থেকে। ছোটবেলায় চোখ বড় বড় করে দেখতাম মঞ্চের উপর যুদ্ধ হত, রাজা মন্ত্রী সৈনিক মরত, তারপর যেই আলো নিভে যেত অমনি তড়াক করে উঠে মঞ্চ থেকে চলে যেত। আমার বাবাও অভিনয় করতেন বলে যাত্রা শেষ হওয়ার পরে গ্রীনরুমে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। মৃত অভিনেতারা অন্ধকারের মধ্যে উঠে চলে যেতেন বলে শিশু বয়সে আমার কিন্তু সন্দেহ রয়েই যেত, লোকটা সত্যি বেঁচে আছে কিনা। গ্রীনরুমে গিয়ে পাড়াতুতো কাকু, জেঠু বা দাদুকে মেক আপ তুলতে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করা অব্দি আমার বুক দুরদুর করত। একটু বড় হওয়ার পর সেকথা মনে করে নিজের কাছেই বিস্তর লজ্জা পেয়েছি। তবে এখন বুঝতে পারি লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ ছিল না। ধেড়ে ধেড়ে লোকেরা যখন সত্যিকারের যুদ্ধ, সত্যিকারের সৈনিকদের জীবনকে যাত্রার মতই নেহাত খেলা মনে করে, তখন বছর পাঁচেকের ছেলের যাত্রাকে সত্যি ভাবা কী আর এমন দোষের?
কাল পুলওয়ামায় বিয়াল্লিশ জনের মৃত্যুর পর থেকে অনলাইন এবং অফলাইনে লোকের যা প্রতিক্রিয়া দেখছি তাতে মনে হচ্ছে যুদ্ধ নেহাত যাত্রা বৈ তো নয়। তাও ভাল, উরির পরে পাকিস্তানে পরমাণু বোমা ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছিল অনেকে, এবারে শুধু আরেকখানা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আবদার করেই ক্ষান্ত আছে। চারিদিকে বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। বিজেপি মুখপাত্র রাম মাধব দেখলাম টিভিতে বলছেন পাকিস্তানকে এমন জবাব দেব, ওরা ভুলতে পারবে না ইত্যাদি। ডি ডি ইন্ডিয়াতে আবার দেখলাম এক পলিতকেশ ভদ্রলোক বলছেন পাকিস্তান এটা করেছে নির্বাচনে বিরোধীদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। অর্থাৎ সম্ভবত, এখন থেকে ঘটনার তদন্ত এবং যাদের গাফিলতির ফলে এতগুলো মানুষের নিরুপায় মৃত্যু হল তাদের শাস্তিবিধানের চেয়ে সরকার যে ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেবে সেটা হল যারা সরকারকে প্রশ্ন করবে তাদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া (কে জানে হয়ত জেলে দেওয়া বা গণপিটুনি দেওয়াও)। মাধববাবু যেমন বুম ধরা সাংবাদিকটিকে ধমকে বলেই দিলেন “আপনার কমিউনিটির যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে তাদের বিচ্ছিন্ন করার সময় এসে গেছে।“
কিছু করার নেই, মেনে নিতে হবে। দেশে এখন দেশপ্রেমিক সরকার। আই এস আই চিহ্নিত। পাকিস্তানের নয়, প্রশান্ত মহলানবীশের।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস যখন বাকি তখন এক দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় এক মিত্রকে বলছিলাম কেন আমি মোদী ক্ষমতায় আসুন চাই না। সে প্রায় সবটাই মেনে নিয়েও বলল “মোদী ক্ষমতায় এলে আর কিছু না হোক, পাকিস্তানকে একটু ঠুকে দেওয়া যাবে।“ যে দেশটাকে মোদীজির ঠুকে দেওয়ার কথা ছিল, হঠাৎ সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে কোলাকুলি করেছেন। ওটা নাকি স্টেটসম্যানসুলভ কাজ। তারপর হল পাঠানকোটে হামলা। অতঃপর পাকিস্তানের আই এস আইকে আদর করে ডেকে এনে (বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছিল কিনা উজ্জ্বল নিকম জানতে পারেন) ভারতের সেনা ছাউনি পরিদর্শন করতে দেওয়া হল। ওটা বোধহয় নিউ ইয়র্ক টাইমসসুলভ ছিল। তারপর হল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এবং তা নিয়ে সিনেমা। এছাড়াও হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন পাননি বলে দিল্লীর যন্তর মন্তরে অনশন করছিলেন, তাঁদের কলার ধরে স্থানচ্যুত করা হয়েছে। বি এস এফ, সি আর পি এফ জওয়ানরা ঠিকমত খেতে পান না, অফিসাররা অন্যায় ব্যবহার করেন — এই অভিযোগ করে সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করেছিলেন। প্রতিকার পাননি, গলাধাক্কা পেয়েছেন। আর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ কিরকম কমে গেছে সে তো দেখাই যাচ্ছে পাঁচ বছর ধরে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ফলে নাকি সব তছনছ হয়ে গেছে শোনা যাচ্ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সে গুড়েও বালি। নোটবন্দির ফলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উঠে যাবে কথা ছিল, তাও হল না। এরপরেও এখনো দেখছি অনেকের অনেক আশা মোদীবাবুর উপরে। কোন কোন বাঙালির দেশপ্রেমের ভার বাংলা ভাষা বইতে পারছে না। তাই হিন্দিতে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন “মোদীজি সব কুছ রোক দো, বাস পাকিস্তান কো ঠোক দো।”
পাকিস্তান একটি সেনা আর মৌলবাদী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, যার ভারতে অশান্তি সৃষ্টি করা ছাড়া প্রায় কোন কাজ নেই। তাদের সাহায্যপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে এতজন সি আর পি এফ জওয়ানের প্রাণ গেল। ফলে রাগ, দুঃখ সবই বৈধ। কিন্তু এই যে প্রতিশোধ ইত্যাদি শব্দগুলো বুড়িমার চকলেট বোমের মত ব্যবহার করছি আমরা — এই প্রতিশোধ নিতে যাবেটা কে? আমি, আপনি তো নয়ই, রাম মাধব আর ভিকি কৌশল পর্যন্ত যাবেন না। যাবেন স্বাস্থ্যবান নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা, যাঁরা এই দেড়শো কোটির দেশের বিপুল কর্মসংস্থানের সমস্যার অন্যতম শিকার। তা এই প্রশ্ন কবে তুলবেন যে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঐ মানুষগুলোকে এরকম জালনিবদ্ধ রোহিতের মত মরতে হয় কেন? কাশ্মীরের মত বিপদসংকুল এলাকায় আটাত্তরটা গাড়ির বিরাট কনভয় আড়াই হাজার জওয়ানকে নিয়ে একত্রে চলাচল করে কোন দুঃখে? বিশেষত যেখানে গোয়েন্দা বিভাগ আগেই আক্রমণের সম্ভাবনা জানিয়েছিল? পাকিস্তানের সেনা, সরকার, সন্ত্রাসবাদী — কেউই তো আপনার হাতে নেই। যে সরকারটা আপনার হাতে তাকে এই প্রশ্নগুলো করবেন না?
অবশ্য এমনটা বললে অন্যায় হবে যে এই সরকারের আমলেই প্রথম এত কিছু ঘটল। কক্ষনো না। মহান লিবারাল নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের মাটি থেকে বিমান হাইজ্যাক করে আফগানিস্তানে চলে যায়নি? সে কি নরেন্দ্র মোদীর দোষ? কার্গিলে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়েনি? সে কি মোদীর দোষে? মৃত সৈনিকদের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়নি? তার জন্যেও কি মোদী দায়ী? খোদ সংসদ ভবনে আক্রমণ হয়েছে। সেটাও কি বেচারা মোদীর ঘাড়ে চাপাব এখন?
আসলে আগমার্কা দেশপ্রেমিকদের আছে টনটনে মান আর বিপুল জোশ। কিন্তু রামকৃষ্ণ আবার বলেছিলেন “যার মান আর হুঁশ আছে সে-ই মানুষ।” মান আর জোশ তো অর্ধমানবেরও থাকে। সেটা একবার স্বয়ং বিবেকানন্দ টের পেয়েছিলেন।

বিঃ দ্রঃ দয়া করে “ছিঃ! সৈনিকের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন?” জাতীয় মন্তব্য করবেন না। পৃথিবীর কোথাও সশস্ত্রবাহিনীর মানুষ অরাজনৈতিক কারণে নিহত হন না। মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়ানো একটি ঘোরতর রাজনৈতিক ক্রিয়া।