তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কখনো ঘটেনি এমন অন্তত দুটো ঘটনা কোভিড-১৯ ঘটিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। প্রথমত, অলিম্পিক এক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, লন্ডনের অল ইংল্যান্ড ক্লাবের বার্ষিক টেনিস প্রতিযোগিতা, যা সবাই উইম্বলডন নামে চেনে, সেটাও এ বছরের মত বাতিল হয়ে গেছে। প্রাণহানির হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে থাকলেও ব্যাপ্তিতে নতুন কোরোনাভাইরাস দুটো বিশ্বযুদ্ধকেই ছাড়িয়ে গেছে। ওসেনিয়াও বাদ পড়েনি। ঠিক কত মানুষের জীবিকা কোরোনার বলি হবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে গরীব মানুষের ক্ষতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যা এবং আজ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতির সাপেক্ষে হিসাব করলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ত এখনই আশি বছর আগেকার ক্ষতিকে অতিক্রম করেছে।

আমাদের দাদু-দিদিমাদের প্রজন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাপ অনুভব করেছিলেন। বোমাতঙ্কে এক সময় কলকাতা ছেড়ে দূর গ্রামে মফস্বলে পালিয়ে যাওয়ার হিড়িক পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভারত ভূখণ্ডে যুদ্ধ এসে না পৌঁছালেও পরাধীন দেশের শস্য উইনস্টন চার্চিলের বদান্যতায় ব্রিটিশ সৈন্যদের পেট ভরাতে চলে গিয়েছিল। কলকাতার রাস্তায় মানুষ ভাত নয়, ফ্যান চেয়ে বেড়িয়েছে, ভদ্র ঘরের মেয়ে বউদের ভাতের জন্য বেশ্যাবৃত্তি করতে হয়েছে (যৌনকর্মী শব্দটা তখনকার কোন লেখায় পাইনি, সম্ভবত যাদের কথা বলছি তারাও খুশি হত না এই শব্দ ব্যবহার করলে)। সেই সময় গ্রাম থেকে আসা অভুক্তদের মধ্যে সলিল চৌধুরীর চোখ রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলিকে দেখতে পেয়েছে। “দুটি শীর্ণ বাহু তুলে / ও সে ক্ষুধায় জ্বলে / অন্ন মেগে মেগে ফেরে প্রাসাদ পানে চেয়ে। / কে জানে হায় কোথায় বা ঘর / কী নাম কালো মেয়ে! হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।”

সেই যুদ্ধের পর অনেক কিছু বদলেছিল। উপনিবেশ বজায় রাখা ধনী দেশগুলোর আর পড়তায় পোষাচ্ছিল না। তাই বিংশ শতাব্দী হয়ে গিয়েছিল মুক্তির দশক — সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তির।

সাম্রাজ্য না হয় ছাড়া গেল, তা বলে কি রাশ ছেড়ে দেওয়া যায় পুরোপুরি? হরণ করতে না পারলে কি প্রাচুর্য বজায় রাখা যায়? তাছাড়া যাদের উপনিবেশ ছিল না তাদের বুঝি সাম্রাজ্যের সাধ হয় না, প্রাচুর্যের দরকার হয় না? সে প্রাচুর্য বজায় রাখতে মহাযুদ্ধের পরের প্রায় পঞ্চাশ বছর বেশ বেগ পেতে হয়েছিল পুরনো, নতুন দাদাদের। কারণ নতুন যে কায়দাটা, মানে কেনা আর বেচাই যে মনুষ্য জীবনের লক্ষ্য ও মোক্ষ, তা অর্ধেক পৃথিবীকে বোঝানোই যাচ্ছিল না। কেবল ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কথা বলছি না। সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অনেকেই তো তখন অর্থনীতিতে বাম দিক ঘেঁষে হাঁটছিল। ভারতের মত বিরাট দেশও। “যত খাই তত চাই বাপি চানাচুর” তত্ত্ব অর্ধেক বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি, মানুষকে ক্রেতাদাস বানিয়ে বিক্রেতারাজ কায়েম করা যায়নি। সেটা করা গেল গত শতকের শেষ দশকে এসে। ভোগবাদ শেষ অবধি বিশ্বায়িত হতে পারল আর বেলাগাম ভোগে আমরা পেলাম এই দুর্ভোগ — তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধে এক পক্ষে প্রকৃতি, অন্য পক্ষে নিরস্ত্র সরকার। আর সাধারণ মানুষ? উলুখাগড়া।

এতদ্বারা কোরোনা কী থেকে হয় তা আবিষ্কার করে ফেলেছি বলে দাবী করছি না, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বলছি মাত্র। যুদ্ধই যে চলছে তা নিয়ে তো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই বলেছে “global pandemic” অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী অতিমারী। রোগটা কিভাবে হচ্ছে, কী কী উপায়ে ছড়াচ্ছে তাও শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত নয় প্রাদুর্ভাবের এতদিন পরেও, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার কবে হবে তাও এখনো অনিশ্চিত। তাই বলছি এ যুদ্ধে এক পক্ষে প্রকৃতি।

অন্য পক্ষে নিরস্ত্র সরকার কেন বলছি? কারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অস্ত্র হল শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি। সৈনিক হলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। কিন্তু মহাশক্তিধর দেশগুলোর অধিকাংশের আছে কেবল পরমাণু বোমা, মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ, বিশাল স্থলবাহিনী, বিমানবাহিনী আর নৌবাহিনী। মশা মারতে কামান দাগলে কোন লাভ হয়? ম্যালেরিয়ার সময় যদি কামান দাগেন তাহলে রোগী মরবে, মশা নয়। কি চমৎকার ব্যাপার হত বলুন তো, যদি কোভিড-১৯ পাকিস্তান হত? এক্ষুণি মেঘে মেঘে গোটা কতক স্টেলদ বম্বার হানা দিলেই এই দিনের পর দিন ঘরবন্দী থাকার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। সারা পৃথিবীতে এখন যত পারমাণবিক অস্ত্র মজুত আছে তা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলেও কোরোনার ক থাকবে না। কারণ মানুষ দূরের কথা, গ্রহটাই থাকবে না হয়ত। মাথা না থাকলে আর কিসের মাথা ব্যথা? আমাদের সরকারগুলোর অস্ত্র যা আছে তা আসলে এইরকম। তাই নিরস্ত্র।

কিন্তু কেন নিরস্ত্র? কারণ সরকারগুলো এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়নি। কেন নেয়নি? কারণ প্রয়োজন বোধ করেনি। কেন করেনি? কারণ ওটা সরকারের কাজ নয়। সরকারের কাজ তবে কোনটা? যুদ্ধ করা। তার প্রস্তুতি নিতেই সরকার ব্যস্ত ছিল। ভারতের সাথে তার প্রতিবেশীদের শেষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৭১ এ। বাংলাদেশ, বার্মা, নেপালের মত অতি ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর সাথে সুদূর ভবিষ্যতেও যুদ্ধের কোন সম্ভাবনা নেই। উঠতে বসতে যার সাথে অশান্তি, সেই পাকিস্তান খেতে পায় না তো যুদ্ধ করবে কী? পারবে না জানে বলেই প্রক্সি ওয়ার চালায়। সেই প্রক্সি ওয়ারে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ কোন কাজে লাগে না, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানেরও সচরাচর প্রয়োজন পড়ে না। বাকি রইল চীন। ভারত তার পণ্যের বিরাট বাজার। যুদ্ধ লাগলে তার নিজেরই ব্যবসার ক্ষতি। এরকম প্রতিবেশে দাঁড়িয়েও ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে, আর স্বাস্থ্য খাতে খরচ কমেছে। ২০২০-২১ এর বাজেটে প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ হয়েছে ৩.৩৭ লক্ষ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যের জন্য ৬৯,২৩৪ কোটি টাকা। তবু দেখবেন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা লিখে এবং বলে হা হুতাশ করেন “আহা, অমুক প্লেনটা কেনা হল না! তমুক কামান মান্ধাতার আমলের হয়ে রয়েছে। অমুকে এগিয়ে গেল, তমুকে টেক্কা দিয়ে দিল।” শুধু বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই বা কেন? আমরাও তো করি। কাউকে শুনেছেন বলতে “আহা, কতদিন একটা নতুন সরকারী হাসপাতাল হয়নি! অমুক ওষুধটার দাম যে কেন সরকার কমাতে পারে না! তমুক যন্ত্রটা কলকাতার সব হাসপাতালে কেন নেই?” কেউ এসব বলে না, কারণ সবাই জানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকারের নয়। যুদ্ধ করার দায়িত্ব সরকারের।

চিকিৎসা করার দায়িত্ব তবে কার? আমরা সবাই জানি। ঝাঁ চকচকে বেসরকারী হাসপাতালের। ওষুধ বানানো এবং বেচার দায়িত্ব বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির। ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থা। যেমনটা “উন্নত” দেশে হয় আর কি। ওটাই তো সর্বোত্তম ব্যবস্থা, তাই না? আমরা তো তেমনটাই শিখেছি সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। অন্য যে বিকল্প ছিল, মানে সরকার নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা — সেটা যে সেকেলে, সেটা যে ফালতু সে ব্যাপারে তো আমরা নিশ্চিত। সরকারী হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালেই তো বোঝা যায় ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থাই হল সঠিক ব্যবস্থা। হাসপাতাল হবে পাঁচ তারা হোটেলের মত। সেখানকার কর্মচারীরা হবে সুবেশী হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়া রিসেপশনিস্টদের মত। আর ডাক্তারবাবু অনেক টাকা পারিশ্রমিক নেবেন। তবে না চিকিৎসা? যদি বলেন কড়ির ব্যবস্থা করবে কে? কেন, ইনসিওরেন্স কোম্পানি? বছর বছর কয়েক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে গোটা পরিবারের মেডিক্লেম করিয়েছি তো। যার মেডিক্লেম করার ক্ষমতা আছে, সে ভাল চিকিৎসা পাবে। যার নেই তার জন্য তো পূতিগন্ধময় সরকারী হাসপাতাল রইল। উন্নত ব্যবস্থা মানেই তো এই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, তাই না?
এতদিন চলছিল বেশ। শুধু আমাদের দেশে নয়, যে দেশগুলো আমাদের বিকল্প ভুলিয়ে এসব ধরিয়েছে সেখানেও দিব্যি চলছিল ব্যবস্থাটা। যার পকেটে মেডিক্লেম আছে সে খুশি, ডাক্তার খুশি, হাসপাতাল মালিকরা খুশি, ওষুধ কোম্পানি খুশি। আমাদের দেশে তবু যত নষ্টের গোড়া, সমাজবাদের প্রতি দুর্বলতা থাকা জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে তৈরি সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ অনেক গরীব মানুষের যেমন তেমন দেখভাল চালাচ্ছিল। অনেক উন্নত দেশে, যেমন আমাদের স্বপ্নের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, রেস্ত না থাকলে অসুস্থ হওয়া মানা। মধ্যে বারাক ওবামা উল্টো গাইলেন, সে কথা বড় একটা পছন্দ হল না কারোর। কী করে হবে? সরকারী মানে ফালতু এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সরকারের কাজ নয় — এসব আমরা তো মোটে তিরিশ বছর হল শিখেছি, আমেরিকানরা সেই কবে থেকে শুনে আসছে। আর সকলকে শিখিয়েছেও। আজ হঠাৎ নতুন কথা শুনলে মনে হবে না ব্যাটা বুদ্ধির ঢেঁকি? ওবামার কথা শুনে যত লোক মুখ বেঁকিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি লোক বার্নি স্যান্ডার্সের কথা মন দিয়ে শুনছিল। তবু বার্নির গায়ে কেন কমুনিস্ট গন্ধ? এই প্রশ্নে দ্বিধায় ছিল। মানে সব দেশের পয়সাওয়ালা লোকই তো আমার আপনার মতই। যার পকেটে পয়সা নেই তাকে নিয়ে ভাবতে আমাদের বয়েই গেছে।

হেনকালে গগনেতে উঠিলেন কোরোনা।

ফল কী? ফেলো কড়ি মাখো তেলের দেশ যুক্তরাষ্ট্র এক কথায় ল্যাজে গোবরে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে পাত্তাই দেননি, বলেছিলেন ঐ দু চারটে হয়েছে আর কি, তাও চীনের চক্রান্তে। শিগগির শূন্যে নেমে আসবে। তারপর যখন রোগী বাড়তে থাকল তখনো বলছিলেন লকডাউন আবার কী? ওভাবে দেশ চলে? তারপর এখন, যখন চার লক্ষের বেশি আক্রান্ত নিয়ে তাঁর দেশ জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন দখল করে ফেলেছে, প্রায় তেরো হাজার মানুষ মৃত, তখন তিনি চীন আর হু কে দোষ দিচ্ছেন। ওদিকে ভেন্টিলেটর কোন রাজ্যে কতগুলো যাবে তা নিয়ে নিলাম চলছে। মানে বুঝলেন তো? আপনার স্বপ্নের দেশে, উন্নত ব্যবস্থায় মানুষের জীবন নিলামে কেনা বেচা হচ্ছে। এত অস্ত্র বানায় অত বড় দেশটা, সারা পৃথিবীতে বিক্রি করে, এত উন্নত মোবাইল কম্পিউটার ট্যাব নানাবিধ সফটওয়্যার আবিষ্কার করে, কে এফ সি, কোকা-কোলা, স্টারবাকস — উদ্ভাবনের স্বর্গরাজ্য একেবারে। অথচ যথেষ্ট ভেন্টিলেটর বানিয়ে উঠতে পারেনি। ভেন্টিলেটর তো অনেক বড় কথা, সামান্য অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ড্রাগের জন্য পর্যন্ত ভারতকে ধমকাতে হচ্ছে। এই আপনাদের উন্নত দেশ, উন্নত ব্যবস্থা। কড়ি ফেললেও তেল দিতে পারছে না।

হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নামে এই যে ওষুধ, যার জন্য ট্রাম্প মোদীকে দিলেন এক ধমক আর মোদী সুড়সুড় করে রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন, তেমন ওষুধ উৎপাদনের উপযুক্ত জায়গা হল ভারতের সরকারী ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলো। ভারতে ওষুধ তৈরির ৭০% কাঁচামাল আমদানি হয় চীন থেকে। ২০১৫ তে ভারত সরকার নিযুক্ত কাটোচ কমিটি বলেছিল সরকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে এই জায়গাটাতে ভারত অনায়াসেই স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভারত সরকার, মানে মোদীর সরকার, কী করলেন? না ঐ সংস্থাগুলোকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে কলকাতার বেঙ্গল কেমিক্যালও। যদিও কলকাতা হাইকোর্ট বেঙ্গল কেমিক্যাল বিক্রির সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছেন। তাহলে ভাবুন, যে সরকারী সংস্থা আমাদের জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি করতে পারে তাকে বেচে দিতে সরকার উৎসাহী কেন? কারণ ঐ যে, ওষুধ যোগানো সরকারের কাজ নয়।

বিরক্ত হচ্ছেন? এক কথা বারবার পড়ে রেগে যাচ্ছেন? জিজ্ঞেস করছেন কে ঠিক করল ওষুধ যোগানো সরকারের কাজ নয়, চিকিৎসা দেওয়া সরকারের কাজ নয়? আপনিই ঠিক করেছেন। যদি এতে খুব দাগা লাগে তাহলে বলা যায় আপনাকে দিয়ে ঠিক করানো হয়েছে। কে ঠিক করিয়েছে? সরকার নিজেই। একবার মনে করে দেখুন নব্বইয়ের দশক। মনমোহনী অর্থনীতি মনে আছে? তখন থেকেই তো কাগজে, টিভিতে, পত্রিকায় সর্বত্র জেনেছেন রাষ্ট্রের দিন শেষ। কেউ চীন বললে, কিউবা বললে, ভিয়েতনাম বললে বলেছেন “আরে ওসব রিজেক্টেড সিস্টেম। ওসব উঠে গেল দেখলেন না?” কারণ তার আগের কয়েক বছরে প্রণয় রায়ের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’ এ বার্লিনের দেওয়াল ভাঙতে দেখেছেন, দ্যুমায় আগুন জ্বলতে দেখেছেন। আপনি ঠিক দেখেছেন এবং ভুল বুঝেছেন। আপনি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতন দেখেছেন আর বাজার অর্থনীতির খুড়োর কল দেখেছেন। আপনি জানতে পারেননি যে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছিল না। আপনাকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর কথা বলা হয়নি, আপনাকে ব্রিটেনের এন এইচ এসের কথা বলা হয়নি, আপনাকে এখনো সিঙ্গাপুরের কথাও বড় একটা বলা হয়নি।

কেবল এভাবেই যে আপনাকে বোঝানো হয়েছে যা কেনা যায় তা-ই ভাল আর সরকারী মানেই ফালতু তা-ও নয়। সরকার নিজে আপনাকে সরকারী ব্যবস্থা থেকে দূরে ঠেলেছে। আমার জন্ম আশির দশকের গোড়ায়, আমার বোনের জন্ম ১৯৯০ তে। তখনো ভারত বাজার অর্থনীতির দেশ হয়নি, মেডিক্লেম কারোর অভিধানে ছিল না। আমার বাবা স্কুল শিক্ষক। আমার জন্মের সময়ে না হলেও, বোনের জন্মকালে মন্দ মাইনে পেতেন না। আমরা দুজনেই জন্মেছি সরকারী হাসপাতালে। তখনো সেগুলোর চেহারা আজকের আমরি, অ্যাপোলো বা ফর্টিসের মত ছিল না। কিন্তু সামর্থ্য থাকলে ওখানে যাব না এমন মনে হত না, হলে বাবা আমার মাকে নিয়ে যেতেন না। অথচ ২০১১ সালে আমার মেয়ের জন্ম হল বেসরকারী নার্সিংহোমে। কারণ আমি আমার স্ত্রীর স্বাস্থ্যের ভার সরকারের উপর ছাড়তে ভরসা পেলাম না। ভরসার জায়গাটা সরকার নিজেই নষ্ট করে দিয়েছে তার আগের কুড়ি বছরে। সব দলের সরকারই। সরকার নিজেই ছিদ্র করেছে লৌহ বাসরে, আর সেই ছিদ্র দিয়ে ঢুকিয়েছে বেসরকারীকরণের কালনাগিনীকে। কারণ সরকার চায় না মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।

কেন চায় না? সরকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে না, শিক্ষার ব্যবস্থা করবে না, তাহলে করবে কী? দুটো কাজ করবে। এক, পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করবে। মানে রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর ইত্যাদি। দুই, যুদ্ধ করবে। নব্বইয়ের দশকে নতুন চিন্তা ছিল এটাই। কেন চিন্তাবিদরা সরকারকে এই কাজ দুটোয় বেঁধে দিলেন?

ভেবে দেখুন, সরকার নিজে রাস্তাঘাট বানাতে পারে না। কোন ব্যবসায়ীকে বরাত দিতে হবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বিমানবন্দর — সবেতেই তাই। তাহলে বেশ কিছু বড়লোকের আরো বড়লোক হওয়ার ব্যবস্থা হল। যত বড়, যত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, তত বেশি মুনাফা, তত বড়লোক হওয়ার ব্যবস্থা। তাছাড়া কেবল স্বাস্থ্য বেসরকারী হলে ভাল তা তো নয়, সবই বেসরকারী হলে ভাল বলা হয়েছে। তাই পরিবহন বেসরকারী, শিক্ষা বেসরকারী, যা যা মানুষের জীবনে দরকারী তার সবই বেসরকারী। অর্থাৎ আসল কথা হল ব্যবসা। মানুষের জন্য অর্থনীতি নয়, ব্যবসার জন্য অর্থনীতি। আর যেহেতু অর্থনীতিই অন্য সব নীতিকে চালায় তাই তখন থেকে রাজনীতিও ব্যবসার জন্য, স্বাস্থ্য নীতিও ব্যবসার জন্য। আর সবচেয়ে অর্থকরী ব্যবসা হল অস্ত্র ব্যবসা। তাই যুদ্ধ করার অধিকারটা সরকারকে দেওয়া হল। যুদ্ধ হোক আর না-ই হোক, সরকারকে অস্ত্র কিনতেই হবে। না কিনলে ধনকুবেররা আরো ধনী হবে কী করে?

সুতরাং আপনার পকেটে কড়ি থাকায় যে ব্যবস্থাকে আপনি ভেবেছিলেন ফেলো কড়ি মাখো তেল, সেটার আসল নাম হল এলোমেলো করে দে মা লুটে পুটে খাই। মনে রাখবেন যে ধনীরা এই ব্যবস্থা চালায় সাক্ষীগোপাল সরকারগুলোকে দিয়ে, তাদের খাঁই অপরিসীম। আপনি যে ধার করে গাড়ি কিনে বা বিদেশ ঘুরে এসে ভাবেন “দেশের উন্নতি হয়েছে। আমার বাবা-মা তো এমন পারত না,” তাও ওদেরই বদান্যতায়। আপনি খরচ না করলে ওদের মুনাফা হয় না বলে। মুনাফাই মোক্ষ। আপনি যে কোম্পানির চাকুরে সে কোম্পানির মুনাফা গত বছরের চেয়ে এ বছর না বাড়লে আপনার চাকরিটি নট হয়ে যাবে, আপনি ফাঁকিবাজ না পরিশ্রমী তা অপ্রাসঙ্গিক। হাড়ে হাড়ে টের পাবেন বেসরকারী সংস্থা মানে মোটেই মেধাতন্ত্র (meritocracy) নয়, মুনাফাতন্ত্র (profitocracy)।

এখন কথা হচ্ছে এই মুনাফাতন্ত্রকে যদি ভাল বলেন, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থার মত হওয়াই ভাল। সরকার যদি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করে, তাহলে বেসরকারী হাসপাতালে যাবে কে? তাদের মুনাফা হবে কোথা থেকে? ভেন্টিলেটর নিলাম হওয়াও কিন্তু ভাল। ক্রয় বিক্রয়ের স্বাধীনতা। ফেলো কড়ি মাখো তেল। বুঝলেন কিনা?

মুনাফাতন্ত্র কিন্তু প্রকৃতির ধার ধারে না। বিশ্ব উষ্ণায়নকে বলে বামপন্থী কন্সপিরেসি থিওরি। কারণ উষ্ণায়ন হচ্ছে বলে মেনে নিলেই ফসিলজাত জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। তেল কোম্পানির লোকসান হবে না? পকেটে পয়সা থাকলেই আজকাল এ সি লাগিয়ে ফেলা যায়। সত্যি সত্যি ক্লোরোফ্লুওকার্বনের ব্যবহার কমাতে গেলে কী হবে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবসার? প্লাস্টিক দুনিয়ার ক্ষতি করছে মানলে বিশ্বজোড়া প্লাস্টিক ব্যবসার বারোটা বাজবে। বাহুল্যকে প্রয়োজনে পরিণত করা গেছে কত দিনের চেষ্টায়, এখন উল্টো পথে হাঁটলে কী হবে মুনাফার গতি? অতএব যেমন চলছে চলুক। চালাতে গিয়ে হিমবাহগুলো তো বটেই, চিরতুষার (permafrost), মানে পৃথিবীর যেসব জায়গার বরফ সেই তুষার যুগ থেকে আজ পর্যন্ত গলেনি, তাও গলে যাচ্ছে। কত মহামারী অতিমারীর জীবাণু যে সেই বরফে জমেছিল কে-ই বা বলতে পারে? কাকলাস মেরুভালুকের ছবি মুনাফাবাদীদের মন গলাতে পারেনি, এখন দুনিয়াসুদ্ধ লোক থাকো ঘরে বন্দী। সব ব্যবসার সাড়ে সর্বনাশ, মুনাফাতন্ত্র ছাপিয়ে মন্দাতন্ত্র এসে পড়ল।

তাহলে বিশ্বযুদ্ধটা দাঁড়াল মুনাফাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকৃতির। ওয়ার্ল্ডোমিটার বলে যে সাইটটা গত কয়েক দিনে জনপ্রিয় হয়েছে, সেখানে গিয়ে কোরোনা আক্রান্ত দেশের নামগুলো ভাল করে দেখুন। যেসব দেশের সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মনোযোগ আছে, মানে মুনাফাতন্ত্র জোরালো নয়, সেসব দেশে রোগটার দাপট কম। ভিয়েতনাম খুঁজে দেখুন, কিউবা খুঁজে দেখুন। “রিজেক্টেড সিস্টেম” গুলোর অবস্থা একবার দেখলেনই না হয়। জার্মানি আবার রিজেক্টেড সিস্টেমেও চলে না, তবু সে সামলে নিয়েছে। কারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভাল। সামলে নিচ্ছে ফ্রান্সও। স্পেনের সরকার আবার কী করেছে দেখেছেন তো? বেসরকারী হাসপাতালগুলো অধিগ্রহণ করেছে। ভাবুন তো, আপনি ই এম বাইপাসের ধারে একটা ঝাঁ চকচকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন, অথচ মেডিক্লেমে সবটা কভার হবে কিনা ভেবে রক্তচাপ বাড়ছে না!

এবার চীনা ফ্রন্টে একটা আক্রমণ হবে বুঝতে পারছি৷ প্রশ্ন উঠবে সবই যদি মুনাফাতন্ত্রের দোষ, তবে চীনে এমন কেলেঙ্কারির ব্যাখ্যা কী? উত্তরটা নেহাত সোজা। যতই চতুর্দিকে মাওয়ের ছবি থাক আর লাল পতাকায় ছেয়ে থাক পথ ঘাট, বর্তমান চীনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক নেহরুর সমাজবাদের সাথে নরসিমা রাওয়ের কংগ্রেসের চেয়েও ক্ষীণ। কাস্তে হাতুড়ি চীনের শালগ্রাম শিলা মাত্র। সারা পৃথিবীতে ব্যবসা করতে চীনের আগ্রহ ট্রাম্পের দেশের চেয়ে কিছু কম নয়। ট্রাম্প যদি বলেন “মেরে পাস গেটস হ্যায়, জোবস হ্যায়, ব্রনসন হ্যায়। তুমহারে পাস কেয়া হ্যায়, কেয়া হ্যায় তুমহারে পাস?” জিনপিং সগর্বে বলবেন “মেরে পাস মা হ্যায়। জ্যাক মা।” চীনের মুনাফাতন্ত্র হয়ত আরো নির্মম কারণ সেখানে সরকারকে প্রকাশ্যে গাল দেওয়ার উপায় নেই। তাই এমন মহামারী হতে পারল। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, চীন তবুও বেশ তাড়াতাড়ি সামলে নিল। তার পেছনেও সেই সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবদান।

এই বিশ্বযুদ্ধে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে লড়ছেন, নিরস্ত্র অনন্যোপায় সেনাপ্রধানরা সেভাবেই লড়েন। একশো তিরিশ কোটি লোকের দেশে যথেষ্ট ডাক্তার নেই, নার্স নেই, হাসপাতাল নেই। তাহলে আপনি কী করবেন? প্রার্থনা করবেন। উনি বারবার ঠিক সেটাই করতে বলছেন আমাদের। ঈশ্বর যদি কোরোনাটা সামলে দিতে পারেন, তাহলে পাকিস্তানকে উনি একাই দেখে নেবেন। অতএব আপনারা তেড়ে প্রার্থনা করুন। মসজিদ ছাড়া সব জায়গায় প্রার্থনা করতে পারেন।

ফুটন্ত সকালের পুরনো স্বপ্ন

নতুন নয়, আজ পুরনো কথার দিন।

ইতিমধ্যেই দিকে দিকে বার্তা রটে গেছে যে মানুষ বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। লেবানন আর চিলির ছবি উল্কার বেগে ছড়াচ্ছে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। চিলির আতঙ্কিত রাষ্ট্রপ্রধান সেবাস্তিয়ান পিনেরা পুরো ক্যাবিনেটকেই বরখাস্ত করেছেন। কিছুদিন আগে বিশাল আন্দোলন হয়েছে হংকঙে। সে আন্দোলন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মহাশক্তিধর চীনও। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন (আমিও পাচ্ছিলাম) চীন না আবার একটা তিয়েন আন মেন স্কোয়ার ঘটিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়লে এই একবিংশ শতাব্দীর পরমাণু শক্তিধর, নেট নজরদার রাষ্ট্রও কিন্তু আতান্তরে পড়ে। “শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও”।

কথাগুলো পুরনো, নাকি চিরনতুন? এদিকে আজ নয়া উদারবাদী (neo-liberal) অর্থনীতিতে ব্যতিব্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত আর্জেন্টিনার মানুষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাম-মধ্যপন্থী প্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্ডেজকে জিতিয়ে দিলেন। তাঁর পাশে উপরাষ্ট্রপতি হতে লড়ছিলেন ভূতপূর্ব বামপন্থী রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা কির্শনার। এইমাত্র দেখলাম বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেদক কেটি ওয়াটসন তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন আলবার্তোর জয়ে ক্রিস্টিনার রাজনীতির অবদান এতটাই যে অনেক ভোটার ভোট দিতে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন তাঁরা ক্রিস্টিনাকে ভোট দেবেন। যেন তিনিই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, আলবার্তো নন।

পৃথিবীর মানচিত্রে সবচেয়ে ওজনদার দেশ, আর্জেন্টিনা থেকে আরো উত্তরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ক্রমশ সুর চড়াচ্ছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তিনি অতি ধনীদের উপর আলাদা কর চালু করার কথা বলছেন। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সকলের অধিকার হওয়া উচিৎ বলছেন। কখনো বা টুইট করছেন পৃথিবীতে বিলিয়নেয়ার থাকাই উচিৎ নয়। আমাদের কানে এসব শুনতে লাগে নন্দ ঘোষ নেহরুর মত, বা যারা নাকি দেশটার (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের) সর্বনাশ করেছে, সেই কমিউনিস্টদের মত। মার্কিন দেশে কিন্তু এসব কথা ব্লাসফেমির সামিল ছিল এই সেদিন অব্দিও। অথচ এই মুহূর্তে বার্নির জনপ্রিয়তার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই আবার শ্রমজীবী মানুষ। বার্নি প্রকাশ্যে ধর্মঘটের অধিকারের পক্ষে বলছেন, ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমর্থন করছেন। কী কাণ্ড বলুন তো!

লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননই হোক আর লাতিন আমেরিকার চিলি বা আর্জেন্টিনা কিংবা উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা আমাদের প্রতিবেশী চীন। মানুষ রাস্তায় নামছেন কিন্তু আরো বেশি অধিকারের দাবীতে। হংকঙের আন্দোলন সেখানকার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, অর্থাৎ সেখানে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটাই প্রধান। অন্য সবকটা দেশের ক্ষেত্রেই ক্ষোভ আসলে সাধারণ চাকুরিজীবী এবং শ্রমজীবী গরীব এবং মধ্যবিত্ত মানুষের রোজগার কেড়ে নেয় যে অর্থনীতি, কর্পোরেটদেরই দন্ডমুন্ডের কর্তা করে তোলে যে অর্থনীতি, যার ভুরি ভুরি আছে তাকে আরো পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে আর শিক্ষা স্বাস্থ্যকে বেসরকারীকরণ করে সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যায় যে অর্থনীতি — তার বিরুদ্ধে।

ভারতের অবস্থা কি অন্যরকম? সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন সারা বিশ্ব শিখল সমাজতন্ত্র মৃত, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি উন্নয়নের পরিপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন শিল্পের ক্ষতি করে, বেসরকারীকরণই মুক্তির পথ — তখন থেকেই তো এ দেশের সরকারগুলো আই এম এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক ইত্যাদির বাধ্য ছাত্র হয়ে ঢালাও বেসরকারীকরণ করেছে। জওহরলাল নেহরুর নিজের পার্টিই কাণ্ডটি করায় এখনকার মত তাঁকে অকথ্য গালাগাল তখন করা হয়নি সত্য, কিন্তু নেহরুর “সমাজবাদী অর্থনীতির অচলায়তন” থেকে নরসিমা, মনমোহন ভারতকে মুক্ত করেছেন একথা তো তখন থেকেই কাগজে, টিভিতে বলাবলি শুরু হয়েছে। শ্রম আইনকে ক্রমশ দুর্বল করে বেসরকারী ক্ষেত্রের কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই, বর্তমান সরকারের আমলে মজা টের পাওয়ানো হচ্ছে সরকারী কর্মচারীদেরও। গ্রামীণ অর্থনীতি তখন থেকেই দুয়োরানী, তাই কৃষকদের মৃত্যু মিছিলও তো শুরু হয়েছে মনমোহিনী অর্থনীতির আমলেই। বিভিন্ন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আক্রমণের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন ব্যাপারটাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে, তুলে দেওয়া হয়েছে বহু শিল্পক্ষেত্রে। আমি আপনি, মানে ভদ্রলোকেরা, খুশি হয়েছি। কারণ আমাদের বলা হয়েছিল এতে শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নতি হবে। মনমোহন সিং নোটবন্দীর বিতর্কে জন মেনার্ড কেনসকে উদ্ধৃত করে বললেন বটে “In the long run we are all dead,” কিন্তু এই লং রানের কথা সেসময় তাঁরাও শুনিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, আসল কথা হল দেশের উন্নতি হয়েছে কিনা।

প্রশ্নটার উত্তর পেতে গেলে জানা দরকার দেশ মানে কে? বঙ্কিম লিখেছিলেন হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তর কথা। জানি না তাদের লাভ হয়েছে কিনা, তবে আমার আপনার তো লাভ হয়েছে বটেই। আমার বাবার সাদা-কালো টিভির বেশি কেনার সামর্থ্য হয়নি, আমি রঙিন টিভি দিয়ে শুরু করে এখন স্মার্ট টিভিতে পৌঁছে গেছি। বাবার জীবন কেটেছে ট্রেনে বাসে ঘামে ভিজে, আমি যখন তখন ওলা উবের। সত্যি বলতে কি গাড়ি কেনার জন্যে ধার দিতে চেয়ে ব্যাঙ্কের লোকেরা আমার পায়ে ধরতে বাকি রাখে। উন্নতি হয়নি?

আমার জন্যে চকলেট কিনতে ঢুকে দাম শুনে মুখ চুন করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি বাবাকে, আর আমার মেয়ে এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে বাছাই করে কোন কোন চকলেট সে কিনবে না। উন্নতি নয়, বলুন? বাবার জীবন কেটে গেছে পাড়ার দর্জির তৈরি জামাকাপড় পরে, আজ আমি ব্র‍্যান্ডেড শার্ট ছাড়া পরি না, বিদেশী ব্র‍্যান্ডের ঘড়ি থাকে হাতে। উন্নতি নয়?

বাড়িতে একখানা ল্যান্ড ফোন নেওয়া খুব দরকার হয়ে পড়েছিল বলে রেকারিং ডিপোজিট করতে হয়েছিল বাবা-মাকে, আজ আমি আর আমার বউ হাতের মোবাইলে সামান্য টাকায় সারা পৃথিবীর কথা বলা ছাড়াও বিশ্বায়িত বিনোদন ভোগ করছি। তবুও বলবেন উন্নতি হয়নি?

এদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার সময়ে আমার কিছু ক্রয় ক্ষমতা ছিল, তাই সেই অর্থনীতি আমাকে আরো আয় করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে আমি আরো ব্যয় করে যে আমার চেয়ে অনেক বেশি ধনী তাকে আরো ধনী করতে পারি। আমার যে সহপাঠীর বাবার ছোট মুদির দোকান, তার যে জয়েন্টে পেছন দিকে র‍্যাঙ্ক করে বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার টাকা না থাকায় লেখাপড়া শেষ হয়ে গেল সেকথা থাক। আমি তো কয়েক লক্ষ টাকা ফিজ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আজ এ দেশে কাল সে দেশে কাজ করে বেড়াচ্ছি। সেটা উন্নতি নয়?

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি। আমার সন্তান জন্মেছে ঝাঁ চকচকে নার্সিংহোমে। মনমোহন সিং না থাকলে কে দিত আমাকে এই সুযোগ? আমার চটকলের শ্রমিক বন্ধুর স্ত্রী যে সরকারী হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে সংক্রমণের ফলে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেল সে কথা থাক। একদিন তো সকলকেই মরতে হবে।

সুতরাং দেশ মানে আমার কাছে যেহেতু আগে আমি, আমার পরিবার, তাই উন্নতি যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যার লাভ হয়নি সে করুক চিলি, লেবানন বা ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের মত কিছু। বা আর্জেন্টিনার লোকেদের মত ভোট দিক বামপন্থীদের, ভিড় জমাক তাদের মিটিঙে যারা বার্নির মত বলে চিকিৎসার জন্যে গাদা গাদা ইনশিওরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হওয়া অন্যায়, যে পড়তে চায় তার পড়ার খরচ সরকারের দেওয়া উচিৎ। আমি কেন এসবের মধ্যে থাকব? আমার তো প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষমতা আছে, ছেলেমেয়েকে পয়সা খরচ করে যেখানে ইচ্ছে পড়ানোর ক্ষমতাও আছে আমার।

অবশ্য এত উন্নতির সঙ্গে কিছু উদ্বেগও আমি পেয়েছি, যা আমার বাবার ছিল না।

নিজের যৌবনে আমার চাকুরিজীবী বাবা মাইনে পেলে মায়ের সাথে মাস খরচের হিসাব করতে বসে দেখতেন এটা করলে সেটা হবে না, অমুক শখটা পরের মাসের জন্যে তুলে রাখতে হবে। কিন্তু জানতেন পরের মাসেও চাকরিটা থাকবে, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে দুটো খাওয়া পরার অভাব হবে না। আমার সে নিশ্চয়তা নেই। শুধু নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করেই নিশ্চিন্ত থাকার আমার উপায় নেই। কোম্পানি যদি তার লাভের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারে তার মানে হবে কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন হবে, বস বলবেন “সবাই তো ব্যবসা করতে এসেছে। কেউ তো মাদার টেরেসা নয়”। অতএব গত মাসের এমপ্লয়ি অফ দ্য মান্থ আমি বছর চল্লিশেক বয়সে হয়ে যাব বেকার, সামার ভ্যাকেশনে ফুকেটের বীচে যে বউকে দীপিকা পাড়ুকোন মনে হচ্ছিল অচিরে দেখব তার চোখের কোলে কালি পড়ে সে নিরুপা রায় হয়ে গেল। মেয়েকে ভেবেছিলাম বিদেশে পড়তে পাঠাব, এখন স্কুলের মাইনে দেওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অবশ্য বউ আমার যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তার সরকারী চাকরি আছে আমার বাবার মতই। তাই ভেবেছিলাম অবসর জীবনে অন্তত তার পেনশনে আমাদের দুজনের চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখছি সরকার তার পেনশন না-ও দিতে পারে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অথচ গিন্নীর মাইনে কাল কমিয়ে দিলেও কিছু বলার নেই। ওদিকে ব্যাঙ্কে যা টাকা জমিয়েছিলাম, ব্যাঙ্ক ফেল পড়লে শুনছি তার সবটা পাব না। অন্যত্র যা জমিয়েছি তার পাওনা গণ্ডাও নাকি শেয়ার বাজারের মর্জি মাফিক।

এসব মনে পড়লে বোধ হয় কি মিছিলে নামা উচিৎ? নাকি কেবলই মনে হয় ঐ ব্যাটা সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো — ওর জন্যেই আমি সরকারী চাকরি পাইনি, পেলে একবার…? ঐ যে সব মুসলমান বাংলাদেশ থেকে হুড়মুড়িয়ে আসছে, ওদেরকে বার করে দিতে পারলেই…? মনে হয় কি অমুকে কেন তমুকের মাংস খায় এটাই মূল সমস্যা? নাকি আমরা যারা আতঙ্কে ভুগছি আপনি তাদের দলে? ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক, গণপিটুনির আতঙ্ক। আমরা সকলেই যে ঘুমোচ্ছি, সকলেই যে বিশ্বাস করছি “সব চাঙ্গা সি”, তা তো নয়। তাহলে কেন আমরা রাস্তায় নেই?

নেই তার বড় কারণ যাঁরা মিছিল ডাকবেন, মিটিং করে রাস্তায় নামাবেন আমাদের তাঁরাই নিজেদের জায়গায় নেই। বার্নি স্যান্ডার্স সারাজীবন লড়ে গেলেন। যখন কেউ তাঁর কথা শুনত না তখনো লড়েছেন, আজও লড়ছেন। আজ অনেকে তাঁর কথা শুনছে। ক্রিস্টিনা কির্শনারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তিনি পদচ্যুত হয়েছিলেন। তবুও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাননি, মানুষ আজ তাঁর লড়াইকে জয়যুক্ত করলেন। বিবিসি লিখেছে “A comeback for the old politics”। এ দেশে পুরনো সমাজবাদী, কল্যাণকামী রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনার এই তো সময়। মানুষ, জল, জঙ্গল বাঁচাতে সেই রাজনীতিরই তো প্রয়োজন। কিন্তু দু একটি অঞ্চলে ছাড়া কোথায় সেই রাজনীতির লোকেরা? তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা কোথায়? তাঁদের কেউ কেউ যে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক, ধ্বংসোন্মুখ নয়া উদারবাদী মোদী সরকারের থেকে মনমোহিনী পথেই নিস্তার খুঁজছেন!

পৃথিবী জুড়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির (রাজনীতিরও, কারণ প্রয়াত অশোক মিত্র যথার্থই বলতেন “রাজনীতিই অর্থনীতি”) শিয়রে শমন। ট্রাম্প, মোদী জানেন যে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ তাঁরা জানেন না। তাই উনি বলেন ইমিগ্র‍্যান্টদের কথা, ইনি বলেন এন আর সি করব, নাগরিকত্ব আইন করব, মুসলমানরাই যত নষ্টের গোড়া ইত্যাদি।

এই দুঃসময়ে, এই সম্ভাবনার সুসময়ে, কোথায় তাঁরা যাঁরা রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার স্বপ্ন দেখাতে পারেন?