হোক সংযুক্তি

আপনি বলবেন সবাই যদি নিজেকে একা ভাবে তাহলে সেদিনকার মেট্রোর মত গণপিটুনির মানসিকতা তৈরি হচ্ছে কী করে? মানুষ হিংসা প্রদর্শন করার বেলায় ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে কী করে?

মাত্র আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেল জোয়ান বনাম বুড়োতে। এরকমই একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। কেন? সে কথায় পরে আসছি। আগে মেট্রো, বাস, ট্রেনে আমার গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার কিছুটা বলি। তাতে এই “বুড়ো মানেই বদ” স্টিরিওটাইপটার অন্তঃসারশূন্যতা কিছুটা বোঝা যাবে।
আমার মেয়ের বয়স ছয়। যখন একেবারে কোলের শিশু ছিল, তখন বেশ কয়েকবার মেট্রোয় উঠে ভিড়ের মধ্যে আমার স্ত্রী লেডিস সিটের সামনে দাঁড়িয়েছে। সেখানে বসা জেন ওয়াইয়ের সদস্যারা নিজেদের মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত থেকেছে বা হেড ফোনে সুরের জগতে মগ্ন থেকেছে। উঠে দাঁড়িয়ে বা পাশের জনকে সরে বসতে বলে আমার বউকে বসার জায়গা করে দিয়েছেন পাকা বা কাঁচাপাকা চুলের মহিলারা, অনেক সময় পুরুষরা। কেউ বলতেই পারেন যে এ থেকে প্রমাণ হয় না বুড়োবুড়িরা রক্ষণশীল নয়, moral policing করে না। ঠিক। কিন্তু এ থেকে এটা প্রমাণ হয় যে বয়স্কদের মধ্যে রক্ষণশীলতা যদি থেকে থাকে, তরুণদের মধ্যে আছে নিদারুণ হৃদয়হীনতা। সেটাও ঘটনাবিশেষে নিগ্রহ হয়ে উঠতে পারে এবং ওঠেও।
এটাকেও স্টিরিওটাইপ বলবেন তো? একদম ঠিক। এবং স্টিরিওটাইপ মাত্রেই ভুল। বয়স্ক মানুষ মাত্রেই সেদিনের মেট্রোর লোকগুলোর মত নয়, অল্পবয়সী মাত্রেই হৃদয়হীন নয়। তবু আরো দুটো ঘটনা শুনে নিন।
বছর পাঁচেক আগে বাসে করে অফিস যাচ্ছি। আমি শুরুর দিকের স্টপেজ থেকে উঠি বলে বসার জায়গা পেয়েছি কিন্তু কিছু পরেই বাসটায় ঠাসাঠাসি ভিড় হয়ে গেল। লক্ষ্য করলাম প্রায় আমারই বয়সী একটি মেয়ে ঐ ভিড়ের মধ্যে বিশাল একটা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে লোকের অভিশাপ এবং গুঁতো হজম করছে। ব্যাগটা নিতে চাইলাম, দিতে রাজি না হওয়ায় আন্দাজ করলাম মূল্যবান কিছু আছে। তখন আমার আসনটাই ছেড়ে দিলাম, মেয়েটি বসল। এটা বলার মত ঘটনা নয়। বলতে হচ্ছে আমি উঠে দাঁড়াতেই আমার সমবয়স্ক পুরুষ সহযাত্রীর প্রতিক্রিয়াটার জন্যে। বাঁকা হেসে সে আমায় বলল “বা দাদা, মেয়েছেলে বলে বসতে দিলেন? একটুআধটু আমাদেরও তো দিলে পারেন।” প্রথমে ইঙ্গিতটা বুঝিনি। বুঝতে পেরে বললাম “হ্যাঁ মেয়ে বলেই বসতে দিলাম। আপনি মেয়ে হয়ে আসুন, আপনাকেও বসতে দেব।” ছেলেটি এরপর আর কথা বাড়ায়নি। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে দেখি ছেলেটি আর মেয়েটি অল্পস্বল্প কথা বলছে। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর বোঝা গেল ওরা সহকর্মী। এই হচ্ছে আমাদের প্রজন্ম, এই তার মহিলা সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা, এই আমাদের প্রগতিশীলতা।
দ্বিতীয় ঘটনা মাসখানেক আগের। বলতে লজ্জা হয়, আমার জন্মস্থান, আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা নবগ্রামে স্টেশন রোডের উপর ঘটেছে ঘটনাটা। বাড়ি ফেরার পথে সাইকেল নিতে গেছি ভর সন্ধ্যেবেলা। রাস্তা তখন জমজমাট। দেখি দোকানের সামনে আমার বয়সী একটি ছেলে তার সঙ্গের মহিলাকে কুৎসিত ভাষায় ধমকাচ্ছে। অনেকেই তাকিয়ে আছে, কেউ কিছু বলছে না। মেয়েটি, সম্ভবত ভয়ে, কাকুতিমিনতি করছে বাড়ি যাওয়ার জন্যে। একটু দেখে মনে হল ছেলেটি মত্ত। তাকে ধমকাব ভাবছি, এমন সময়ে ঠাস করে মেয়েটির গালে এক চড় কষিয়ে দিল। দ্বিতীয় চড় কষানোর আগেই তার হাতটা ধরে ফেলেছি এবং ধমকে বলেছি এটা ভদ্রলোকের জায়গা। এখানে এসব চলবে না। ছেলেটি অনেকক্ষণ ধরে টলতে টলতে আমায় ধমকে গেল এই মর্মে যে এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমি যেন নিজের চরকায় তেল দিই। আমি বলে গেলাম যা করার বাড়ি গিয়ে করতে হবে, এখানে এই ব্যবহার চলবে না। মিনিট পাঁচেক চলেছিল ব্যাপারটা। শেষ অব্দি মেয়েটি আমার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে টেনে হিঁচড়ে ইঞ্চি ছয়েক নড়াতে পারল ছেলেটিকে, আমায় চলে আসতে হল। কারণ আমাদের পাশ দিয়ে যেসব সুবেশী, শিক্ষিত তরুণ তরুণী হেঁটে যাচ্ছিলেন তাঁদের কেউ এগিয়ে এসে আমার সাথে গলা মেলালেন না। বরং ফুটপাথের মাঝবয়সী দোকানদার ভয়ে ভয়ে আমায় একটু সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পাশের মিষ্টির দোকান থেকে এক প্রবীণ তবু এসে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে আমায় বললেন “কী দরকার তোমার! এসব কি আর ভদ্র ঘরের ছেলেমেয়ে? কী করতে কী করে দেবে…”
দৃষ্টান্ত বাড়িয়ে কাজ নেই। আসল কথা হচ্ছে মানুষ বদলে গেছে । আমার মা যখন যুবতী আর আমি মায়ের আঙুল ধরে চলা শিশু, সেই সময় আমাকে নিয়ে ট্রেনে বাসে উঠলে বসার জায়গা পেতে অসুবিধা হত না মনে আছে। তরুণরাই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতেন। আর তাই নিয়ে অন্য তরুণদের অশ্লীল ইঙ্গিত করতেও দেখিনি কখনো। আর আমাদের নবগ্রাম অজ পাড়াগাঁ ছিল তখন। সেখানে প্রকাশ্য রাস্তায় বউকে চড় মারার সাহস কারো ছিল না। অর্থাৎ বুড়োবুড়ি ছুঁড়োছুঁড়ি নির্বিশেষে আমরা পশ্চাৎপদ হয়ে পড়েছি। কেন?
এর এক শব্দে উত্তর বিযুক্তি (alienation)। গত দুই আড়াই দশকে আমাদের শেখানো হয়েছে “শুধু নিজেরটুকু নিয়ে ভাবো।” এর পোশাকি নাম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যবাদ (individualism)। জীবনের সবকিছুর কেন্দ্রেই আমি। আমার সুখ, আমার স্বাচ্ছন্দ্য, আমার ক্লেশ, আমার কষ্ট। বাকি দুনিয়া গোল্লায় যাক। এই মতবাদ সম্বল করেই আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে, আমাদের বাবা-মায়েরা, মানে সেদিন মেট্রোয় ঐ যুগলকে যারা পিটিয়েছে তাদের পান্ডারা যে প্রজন্মের, বড় করেছেন। এই মতবাদই আমাদের সমাজকে, আমাদের রাজনীতিকে আজ নিয়ন্ত্রণ করছে। গোকুলে বেড়েছে সে, তারপর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে এখন রাজত্ব করছে।
খেয়াল করে দেখুন — গত আড়াই দশক আপনি কাগজে পত্রে, সিনেমায়, সিরিয়ালে সর্বত্র এটাই জেনেছেন যে নিজের সমস্যা নিজে মিটিয়ে নেওয়াই হচ্ছে সবচেয়ে ভাল। এবং সেটাই আধুনিক মানুষের ধর্ম। যে কোন রকমের জোটবদ্ধতাই হচ্ছে দুর্বলতার লক্ষণ, সেকেলে মানসিকতার লক্ষণ, অফিস কাছারিতে ফাঁকিবাজির লক্ষণ। এইভাবে আপনাকে ক্রমশ বিযুক্ত করা হয়েছে অন্য মানুষের থেকে। আপনি এখন জানেন আপনি অফিসে একা, ট্রেনে একা, বাসে একা, অনেক ক্ষেত্রে বাড়িতেও একা।
এবার আপনি বলবেন সবাই যদি নিজেকে একা ভাবে তাহলে সেদিনকার মেট্রোর মত গণপিটুনির মানসিকতা তৈরি হচ্ছে কী করে? মানুষ হিংসা প্রদর্শন করার বেলায় ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে কী করে?
ব্যাপারটা খুব সোজা। মানুষ জোট বেঁধেছিল, সমাজবদ্ধ হয়েছিল কারণ শারীরিক, মানসিকভাবে তার একার পক্ষে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেই ব্যাপারটা আজও বদলায়নি কারণ মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ জীব নয়। প্রযুক্তির এত উন্নতি সত্ত্বেও একা একজন মানুষ বাঁচতে পারে না, তাকে অন্য মানুষের উপর নির্ভর করতেই হয়, শারীরিক এবং মানসিক প্রয়োজনে। ফলে যতই কেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যবাদ শেখাও না, মানুষ বিপদে পড়লে, এমনকি বিপন্ন বোধ করলেই, একজোট হতে চায়।
ঠিক এই কারণেই মানুষ কী কারণে একজোট হচ্ছে সেটা বুঝতে গেলে রাজনীতিটা বোঝা দরকার। সব মানুষই নিজের নিজের রাজনীতি অনুযায়ী একজোট হয়। আর কে কার সাথে জোট বাঁধবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করে তার বিযুক্তি। কে কতটা বিযুক্ত সেটাই ঠিক করে সে তার চারপাশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে নিজেকে কোন পক্ষ ভাববে।
রাজনীতি মানে শুধু সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস নয়। এই পোস্টে যাঁরা লাইক দেবেন তাঁরা মনে করেন ছেলেমেয়েদুটোর প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন প্রকাশ্য জায়গায় প্রেমের অভিব্যক্তির অধিকার সকলের আছে, আবার কেউ মনে করেন ছেলেমেয়েদুটো বাড়াবাড়ি করেছিল কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। কেউ হয়ত আরো একটু ভিন্নমত তবে মোটের উপর এঁরা সকলেই মনে করেন ওদের মারা অন্যায় হয়েছে। এই ঘটনায় এই মতটাই তাঁদের রাজনীতি।
আবার যারা ছেলেমেয়েদুটোকে ধরে পেটাল আর যারা এখনো তাদের সমর্থন করে যাচ্ছে, তারা মনে করে একটা মেয়ে একটা ছেলেকে প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরা বা চুমু খাওয়া এদেশের সংস্কৃতিবিরোধী বা মোটের উপর অশ্লীল। মারা হয়েছে বেশ হয়েছে। এটাই তাদের রাজনীতি।
এখন মুশকিল হচ্ছে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যবাদের যুগে আমরা আবার শিখেছি যে সবকিছুর মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা উচিৎ নয়। কোন ঘটনার রাজনীতি বুঝতে না চাওয়ার এই যে দীর্ঘদিনের অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার ফলে আমরা পক্ষ চিনতে ভুল করি। যেমন যখন চাকরি পাই না, রোজগার হারাই, কষ্টের হকের রোজগারও ফুড়ুৎ করে পকেট থেকে উড়ে যায় তখন বুঝতে পারি না যে আমার শত্রু সেই অর্থনৈতিক নীতি যা উত্তুঙ্গ জিডিপি তৈরি করে অথচ কর্মসংস্থান কমায়। আমি ভাবতে শুরু করি আমার শত্রু তফসিলি জাতি উপজাতির লোকেরা, অথবা বিশেষ একটা ধর্মের লোকেরা। কখনো বা ভাবি মেয়েরা এত বেশি লেখাপড়া শিখছে বলেই যত গন্ডগোল, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যেও ভিড় বেড়ে যাচ্ছে। আমার বিযুক্তি আমাকে ভেতরে ভেতরে আক্রমণাত্মক করে তোলে আর আমি ঐ কাল্পনিক শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে হিসহিস করতে থাকি। আমার সামাজিক, অর্থনৈতিক, যৌন অবস্থান যা-ই হোক আমার চোখে আমিই হয়ে উঠি সবচেয়ে প্রতারিত, বঞ্চিত মানুষটা। অথচ যেহেতু আমি জানি যে আমি একা সেহেতু আমি সদা ভীত।
সুতরাং আমার সামনেই একটা মেয়ের কাপড় ধরে কেউ টানলে আমি না দেখার ভান করি কারণ ঐ মেয়েটা আমার কে? ওর চেয়ে আমি কি কম আক্রান্ত? ওর হয়ে বলতে গিয়ে কেন নিজেকে আরো বিপদে ফেলব? চোখের সামনে কেউ দুর্ঘটনায় মরে গেলেও আমি চোখ বন্ধ করে থাকি কারণ যে মরেছে সে আমার কেউ হয় না। আমার এমনিতেই হাজারটা সঙ্কট। আমার সঙ্কটের চেয়ে অন্য একটা মানুষের মৃত্যুও বড় সঙ্কট হতে পারে না।
তবে আমার চারপাশের সঙ্গে আমার যে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব — সেটা কিন্তু মিথ্যে নয়। আমার উপর যে নানাবিধ অন্যায় চাপ তৈরি হচ্ছে সেটা কিন্তু আমার কল্পনা নয়। যদি মিথ্যে হত তাহলে মেট্রোয় ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানোর জন্যে মার খেতে হত না। ফলত আমি যে কোন এক পক্ষে আর আমার যে বিপক্ষ আছে তাও সত্যি। আমি নিজের পক্ষের লোক খুঁজছি। একজোট হতে পারলেই আর আমার ভয়ের কারণ থাকে না। তখন গুছিয়ে ঠ্যাঙাতে পারি শত্রুপক্ষকে। কিন্তু আমি কোন পক্ষে আর কোন পক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই সেটা বুঝব কী করে? চোখের সামনে যাকে বা যাদের দেখছি তারা তো আমারই মত কয়েকজন ব্যক্তি মাত্র, তার বেশিকিছু নয় — এরকমটাই ভাবতে শিখেছি আমি। অতএব আমি সিদ্ধান্ত করলাম যে আমার বয়সী ছেলেমেয়েদের যে বুড়োরা ধরে মারল, তারা শুধুই বুড়ো। কোন বিশেষ মতামতের, মানে রাজনীতির, প্রতিভূ নয়। অর্থাৎ এই লড়াইটায় আমার পক্ষ হল আমার মত তরুণরা আর বিপক্ষ হল বয়স্ক লোকেরা। সেদিন দলে ভারী ছিলাম না তাই মার খেয়েছি। সোশাল মিডিয়ায় আমার পক্ষের অনেককে পেয়ে গেছি অতএব মার ফিরিয়ে দিই যত বয়স্ক লোক আছে সকলকে গালাগালি দিয়ে।
যারা সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে আক্রমণ করেছিল তারাও একইরকম বিযুক্তির শিকার ছিল, যতক্ষণ না সংস্কৃতির শত্রু নামক কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে তারা এক হতে পেরেছে। শুধু এদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এখন এরকম কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধেই মানুষ বিযুক্তি কাটিয়ে এক হতে পারছে, আসল শত্রুরা বহাল তবিয়তে আছে। কলকাতার মেট্রো কোন বিচ্ছিন্ন জায়গা নয়।
তাই বলছি, হোক আলিঙ্গন। বয়স্কদের বিরুদ্ধে তরুণদের আলিঙ্গন নয়, রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে প্রগতিশীলদের আলিঙ্গন। বিযুক্তি কাটুক, মোবাইলের বাইরে এসে সত্যিকারের দুনিয়ায় সংযুক্তি হোক।
পক্ষ নেওয়ার আগে পক্ষ চিনুন।

এসব কী?

একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই ধরে নিচ্ছেন

পশ্চিমবাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে যা হচ্ছে তাতে দেখছি অনেক বামবিরোধীও এখন স্বীকার করছেন এমনটা তাঁরা কখনো দ্যাখেননি। অনেকে এও বলছেন যে এমন পরিবর্তন তাঁরা চাননি। ব্যক্তিগতভাবে এসব দেখে আমি যেমন ক্রুদ্ধ, কষ্ট পাচ্ছি তেমনি একটা মৃদু ভাল লাগার জায়গা এইটা যে দেখতে পাচ্ছি বাম দলগুলোর মধ্যে, সিপিএমের মধ্যে এখনো বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রাণের মায়া, মান সম্মানের মায়া ত্যাগ করে প্রতিরোধ করছেন। রঙ বদলে ফ্যালেননি বা আমার মত ফেসবুকিশ বামপন্থী হয়ে যাননি।
সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় যা দেখছি তাতে এটা দেখেও অবাক হচ্ছি বলা যায় যে মার বেশি খাচ্ছেন বামেরাই, বিজেপি নয়। পার্টি অফিস বা ঘরবাড়ি ভাঙচুরও বামেদেরই বেশি হচ্ছে, যারা নাকি প্রধান বিরোধী নয়। বাম রাজনীতির দিক থেকে দেখলে এই মার খাওয়া, লড়ে যাওয়া প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে। ভোট হলে তেমন কিছু বেশি আসন পাব না জেনেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্যে এরকম দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে পারে কটা পার্টি?
এসব ভাল লাগছে। কিন্তু একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই বলে ধরে নিচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে নেতৃত্বের দিক থেকে এমন সামান্যতম ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। কোন কোন এলাকায় দেখতে পাচ্ছি বা শুনতে পাচ্ছি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে “বাম-বিজেপি সমর্থিত”, এমনকি “বাম-তৃণমূল সমর্থিত” কাঁঠালের আমসত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছে। সেরকমটা একেবারে স্থানীয় স্তরে, একজন বা কয়েকজনের স্বার্থের খাতিরে অতীতেও হয়েছে শুনেছি। এখন যখন পার্টি দুর্বল, ২০১১ র পর থেকে কেষ্টেতর প্রাণীদের অত্যাচারে অনেক জায়গায় প্রায় উধাও তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারো কারো এরকম কান্ড ঘটিয়ে ফেলা অন্যায় হলেও অবাক করার মত নয়। আদর্শগত দেউলিয়াপনা যে আছে সে তো আর আমরা নতুন জানছি না, তা বলে সকলেই ওরকম তা ভাবারও কারণ নেই। সেইজন্যেই ওরকম জোট করাটাই সামগ্রিকভাবে পার্টির অঘোষিত নীতি বলে মনে করার কারণ আছে, এমনটা নিখাদ তৃণমূলী ছাড়া কেউ বলবেন মনে হয় না। ফলত আমার আপত্তির জায়গা অন্য।
এখন গ্রাম, শহর সর্বত্রই হোয়াটস্যাপ আর ফেসবুকের দাপট। রাগ হচ্ছে, শঙ্কিত হচ্ছি তখন যখন দেখছি বিজেপি আই টি সেলের তৈরি ভুয়ো খবর সম্বলিত বার্তা সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা দিব্যি ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছেন। ফেসবুকেও দেখছি অনেক সিপিএম সদস্য সরাসরি শেয়ার বাটন টিপে বিজেপি এবং তার বন্ধু যে দাঙ্গাবাজ সংগঠনগুলো, তাদের পোস্ট শেয়ার করছেন। সেসব পোস্টের মধ্যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষী, বানানো তথ্যসম্বলিত যে পোস্টগুলো আমরা অনেকেই চিনি, সেগুলোও রয়েছে। মমতা কত খারাপ তা প্রমাণ করার জন্যে এসবও যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই। মমতা কত খারাপ তা অনেকেই বুঝতে পারছে। আপনারা বিজেপির ভাষা ধার করে না বোঝালে লোকে বুঝবে না?
যেসব মানুষ বুক চিতিয়ে এখনো নিজেদের সিপিএম সমর্থক বলেন তাঁদের এহেন কার্যকলাপ দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। এমনও সন্দেহ হচ্ছে যে তাঁদের সমর্থন বস্তুত একটাই চিহ্নে বরাবর ভোট দিয়ে আসার অভ্যাস, দলটার নীতি বা আদর্শের প্রতি (আদর্শ শব্দটায় আপত্তি থাকলে কথিত আদর্শ বলা যাক) সমর্থন নয়।
তবু সেটা সমর্থকদের ব্যাপার। একজন সমর্থকের সব কিছু তো আর একটা দল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দল অন্তত তার সদস্যদের শাসন করুক। সি পি আই (এম) এর কোন সোশাল মিডিয়া সেল আছে কিনা আমার জানা নেই। যদি নাও থাকে, এসব যে পার্টি সদস্যরা করছেন তাঁরা বুঝে করছেন, না না বুঝে করছেন সে দিকে নেতৃত্বের নজর দেওয়া উচিৎ নয় কি? নইলে তো ধরে নিতে হবে “মৌনং সম্মতি লক্ষণম।” বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটাই যে বড় লড়াই সে কথা তো আপনাদের পার্টি কংগ্রেসও স্বীকার করল। তাহলে এসব কী?

সব ধর্ষণ সমান নয়

কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?

কথাটা অনেকদিন ধরেই লিখব লিখব করছি। কিন্তু এমনও কথা আছে যা লিখতে হাত সরে না। কেবলই মনে হয় “ভুল ভাবছি। এ সত্যি নয়।“ কিন্তু নিজেকে এ হেন প্রবোধ দিয়েই বা কতদিন চলে? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন লিখে গেছেন যুগান্তের কবিকেও মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়াতেই হবে, তখন আমার — দু পয়সার সাংবাদিক আর ফেসবুকে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা উগরে দেওয়া মূল্যহীন ব্লগার — সাধ্য কী যে একথা না লিখে থাকি? আর সত্যি বলতে যা লিখি তা তো কোথাও কোন মনের কোণে কোন প্রভাব ফেলে না। লিখি নিজের নিষ্ক্রিয়তার পাপস্খালন হচ্ছে — এই ভেবে। ঐ, এরিস্টটল যাকে catharsis বলতেন আর কি। তাই বুক ঠুকে কথাটা লিখেই ফেলি।
সব ধর্ষণ সমান নয়।
কথাটা খুব আপত্তিকর মনে হচ্ছে, না? হতে পারে। কিন্তু গত কয়েকবছরের ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে সব ধর্ষণ সমান নয়।
২০১২ র ডিসেম্বরের কথা মনে করুন। দিল্লীর সেই মেয়েটি, যার আমরা বাহারী নাম রেখেছি নির্ভয়া (যেন সে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে ধর্ষিত হতে গিয়েছিল, যেন তার ধর্ষণোত্তর মৃত্যু অত্যন্ত বীরোচিত ঘটনা, যেন একটা তাজা প্রাণের এই মর্মন্তুদ পরিণতি জাতির বিবেক জাগিয়ে তোলার জন্য এক মহান আত্মত্যাগ), সে যখন হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়েও বেশি বেদনা নিয়ে শুয়ে ছিল, তখন সারা ভারত জুড়ে কত মোমবাতি মিছিল! ফেসবুকে সরকার কত অপদার্থ সেই নিয়ে লক্ষ লক্ষ পোস্ট! দেশটাকে বদলে ফেলা দরকার — এই মর্মে আমাদের যুবসমাজের কি চিল চিৎকার! বহু মানুষ তো মিছিল করে খোদ দিল্লীতে প্রতিবাদ জানাতে গেলেন ক্ষমতার অলিন্দে। সহসা কি আপাদমস্তক আলোড়ন এই পোড়া দেশটার শরীরে!
সেই একই পরিমাণ আলোড়ন কি হয়েছিল এই বাংলায় যখন কামদুনির মেয়েটা ধর্ষিতা হল? যখন মধ্যমগ্রামে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের মেয়ে ধর্ষণ এবং তারপরেও চলতে থাকা দীর্ঘ লাঞ্ছনার শেষে মারা গেল এবং মৃত্যুটা আত্মহত্যা না হত্যা তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিল? সুজেট জর্ডানের ধর্ষক যেন এখন কোথায়?
যদি ঐ ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ঘেঁটে দেখেন তাহলে হয়ত বলবেন “কম কিছু তো হয়নি।” কিন্তু আমি সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর কথা বলছিই না। বলছি আমাদের মত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের কথা। আমরা কজন ধর্ষণ হলেই মুখ্যমন্ত্রীর সেটাকে “সাজানো ঘটনা” বা “সিপিএমের চক্রান্ত” বলা শুনে শিউরে উঠেছি, বমি বমি লাগায় বেসিনে থুতু ফেলেছি? কী বলছেন? অনেকেই? তাই নাকি? তার প্রতিফলন তো ভোটবাক্সে দেখলাম না। চৌত্রিশ বছর যারা অপশাসন করেছে তাদের তুলনায় পরিবর্তনের সরকার ভালই চলেছে যদি ধরেও নিই, তাহলে সরকারের পতন না হলেও এত সব ঘটনায় সমর্থন তো অন্তত কমে যাওয়া উচিৎ ছিল। হয়েছে তো উলটো। মুখ্যমন্ত্রীর পার্টির সমর্থন বেড়েই গেছে। ২০১৬ র ফলাফল নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি। সকলেই একমত যে ধর্ষণগুলো কোন ইস্যু নয় যতক্ষণ আমার বাড়ির সামনের কাঁচা নর্দমা পাকা হচ্ছে, আমার গাড়ির চাকা রাস্তার গাড্ডায় পড়ে সার্ভিসিঙের খরচ বাড়িয়ে না দিচ্ছে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে নির্ভয়ার ধর্ষণ আর কামদুনির মেয়েটার ধর্ষণ এক নয়।
এইসব অপ্রিয় কথা হয়ত লিখতাম না। কিন্তু মুশকিল হল এই যে দেখলাম ধর্ষণের অবমূল্যায়ন চলতেই থাকল (মুখ্যমন্ত্রী সেই যে কত লাখ যেন মূল্য ধার্য করেছিলেন সেই মূল্যের কথা বলছি না কিন্তু) এবং প্রায় দেড় শতক পরে গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই বিখ্যাত উক্তিকে আবার সত্য প্রমাণ করে এই রোগটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সংরক্ষণ চেয়ে জাঠরা দক্ষযজ্ঞ করল, সেই বাবদ নাকি ধর্ষণও করল। সেটা নিয়ে একটু হৈ চৈ হতেই সরকারগুলো ঘোষণা করল কিছুই নাকি হয়নি। সব ধর্ষণ কাল্পনিক। তারপর নয়ডায় জাতীয় সড়কের ধারে এক মহিলার ধর্ষণও এক দিনের মধ্যেই পারিবারিক কলহ, আদৌ ধর্ষণ হয়নি — এসবে পর্যবসিত হল। কোনটা যে সত্য, কোনটা উত্তরসত্য কে বা জানে!
কিন্তু তারপর একটা ঘটনা ঘটল যা তীব্রতার কারণে অস্বীকার করার কোন উপায় রাখেনি। অবশ্য কেউ অস্বীকার করতে চায়ওনি। সেটা হল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, যৌনবিকৃতিসম্পন্ন, বহু নারীর ধর্ষক এক গুরুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শত শত ভক্তের দাঙ্গা করা। হরিয়ানার রাজ্য সরকার স্পষ্টতই হাত গুটিয়ে বসে রইল। বুঝে নেওয়া শক্ত নয় যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং, মানুন আর না-ই মানুন, সাধারণ মানুষের এক বিরাট অংশের সমর্থন ঐ গুরমিত রাম রহিমের দিকে ছিল।
এর পরেও ধর্ষণ এবং সে সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতার গল্পটা যেন একতা কাপুরের কে সিরিয়ালের মত — শেষই হয় না। কিন্তু রাম রহিমের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছে আমরা আর শুধু উদাসীনতায় থেমে নেই। আমরা ক্রমশ যৌন অপরাধীদের সমর্থনে সোচ্চার।
কলকাতার নাম করা স্কুলে দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল ধর্ষণের। অবিলম্বে সরকারের মদতপুষ্ট লোকেরা গোপনে এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল এসব রাজ্যকে অশান্ত করার জন্যে বামপন্থী চক্রান্ত। একটা কাগজে তো প্রতিবাদী অভিভাবকদের ছবি ছেপে দাবী করা হল যে ওঁরা আসলে মাওবাদী। ফেসবুকে যে যা-ই লিখুক নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে, সেই সময় অন্তত পাঁচজন পরিচিত ব্যক্তিগত কথাবার্তায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটা মিথ্যে বলছে এবং গোটা ব্যাপারটা আসলে তৃণমূল বনাম বিজেপি ছাড়া কিছুই নয়। এমন তাদের যুক্তির বাহার যে একটা সময়ে আমিও ধন্দে পড়ে যাই। তখন আবার বুঝলাম যে সব ধর্ষণ সমান নয়। কোন দলের লোক যুক্ত, কোন দলের শাসনে ঘটেছে ব্যাপারটা সেসব দেখে আমরা, মানে শিক্ষিত, রুচিশীলরা ধর্ষণের দর ঠিক করি।
কিন্তু তখনো বুঝিনি দর ঠিক করার ওটাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। সেটা বোঝার জন্যে অপেক্ষা করতে হল একটা আট বছরের মেয়ের ধর্ষণ এবং খুন পর্যন্ত, একটা ধর্ষিত মেয়ের বাবা পুলিশের হাতে খুন হওয়া পর্যন্ত।
স্পষ্ট মনে আছে যখন নির্ভয়ার ঘটনা প্রকাশ হল, দোষীরা গ্রেপ্তার হল তখন নাবালক ছেলেটিকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে বিচার করা হোক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক — এই দাবীতে আমার কত বন্ধু, পরিজন সোচ্চার ছিলেন। আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম বলে তারা আমাকেই ধর্ষক বলে ফেলে প্রায়। এখন কোথায় তারা? কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?
নব্বইয়ের দশকের শেষদিক থেকে ক্রমশ “স্বতঃস্ফূর্ত” কথাটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। প্রতিবাদ নাকি স্বতঃস্ফূর্ত হলে তবেই গ্রাহ্য হবে, নইলে নয়। অর্থাৎ আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে আমার বক্তব্যের সমর্থনে আপনাকে রাস্তায় নামাতে পারি তাহলে সে প্রতিবাদ হল সাজানো ঘটনা। আপনার যদি একা একা স্কচ বা ইনস্ট্যান্ট কফিতে চুমুক দিতে দিতে মনে হয় “নাঃ! একটু মিছিলে হেঁটে আসি”, তবেই সেটা প্রতিবাদ হবে। যাদের স্কচ বা কফি খাওয়ার সাধ্য নেই তাদের প্রতিবাদ, অতএব, গ্রাহ্য নয়। তাদের হাতে থাকে পতাকা, অর্থাৎ তারা সংগঠিত। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ভাগ্যিস এইরকম স্বতঃস্ফূর্ততার ধারণা এমনকি অহিংসার পূজারী মহাত্মা গান্ধীরও ছিল না। থাকলে অসহযোগ, ভারত ছাড়ো ওসব করতেন না। সুভাষচন্দ্রও সাত মুলুক পাড়ি দিয়ে সেনাবাহিনী টাহিনী গড়ার ঝামেলায় যেতেন না। মার্টিন লুথার কিংও অপেক্ষা করতেন কবে সাদা চামড়ার লোকেরা এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে “ভাই রে” বলে কালো মানুষদের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেদের আমোদের জায়গাগুলোয় নিয়ে যাবে। তা সে যাই হোক, কথা হচ্ছে নির্ভয়ার জন্যে যে “স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ” দেখেছিলাম সে আবেগ কিন্তু উন্নাওয়ের মেয়েটির জন্যে দেখতে পাচ্ছি না। আসিফার জন্যে তো আরোই পাচ্ছি না। উলটে দেখছি এদের ধর্ষকদের জন্যে, হত্যাকারীদের জন্যে বেশ একটা সহানুভূতির আবহ।
আবার বলছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের যে সক্রিয় সমর্থন ঐ ইতরগুলোর প্রতি তার চেয়েও আমি বেশি আতঙ্কিত আমাদের মত মানুষদের আচরণ নিয়ে। কোন সন্দেহ নেই গত কয়েকবছরে এদেশে খুনী এবং ধর্ষকদের রাষ্ট্র নজিরবিহীন সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই যে এরকম একটা রাষ্ট্রশক্তি তো তৈরি করেছি আমরা। সেজন্যে আমাদের কেউ কি অনুতপ্ত? আমাদের গণতন্ত্রের হাজারটা ত্রুটি আছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে অন্যদের মনোনয়ন জমা দিতে না দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন? একজনও কি বলবে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে লোকের ভোট দেওয়া আটকে? কেউ বলবে ২০১৪ র লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিতেছিল কাউকে ভোট দিতে না দিয়ে?
তাহলে দাঁড়াল কী? ধর্ষকদের ক্ষমতায়ন করেছি আমরাই। দয়া করে বলবেন না “বুঝিনি এমন হবে।” ২০১১ থেকে ১৬ অব্দি অত ধর্ষণের ঘটনার পরেও আপনি বোঝেননি? যোগী আদিত্যনাথের অনেক দোষ আছে। কিন্তু সে কোনদিন নিজের চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য গোপন করেছে এমন অপবাদ তার চরম শত্রুও দেবে না। সে কোন ধরণের মানুষ সম্পর্কে কী ভাবে, কী করতে চায় সেসব সে প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছে। তার ভিডিও আছে, খবরেও প্রকাশিত হয়েছে। ওসব জেনেও উত্তরপ্রদেশে যে লোক তাকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে আর অন্য কোথাও বসে যারা সমর্থন জানিয়েছে তারা উন্নাওয়ের ঐ মানহারা মানবীর দ্বারে কোন মুখে দাঁড়াবে?
আসিফার ঘটনা আরো বেশি অবাক করার মত। এবং তার প্রতিক্রিয়াও চমকপ্রদ। কোন সভ্য দেশে একটা আট বছরের মেয়েকে একমাত্র কোন বিকৃতমনা অপরাধীই অপহরণ করে বন্দী করে রেখে বারবার ধর্ষণ করতে এবং তারপর খুন করতে পারে। ‘Silence of the lambs’ এর বাফেলো বিলের মত কেউ। এ কাজে কোন সঙ্গী পাওয়ার তার কথা নয় এবং যখন সে ধরা পড়বে তখন বিনা বিলম্বে কঠোরতম শাস্তি তার হওয়ার কথা। কিন্তু আসিফার দুর্ভাগ্য সে জন্মেছিল একটা অসভ্য দেশে। যে দেশের মানুষ ধর্মান্ধ, বর্বর। দুধের শিশুকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিগ্রহের সামনে দল বেঁধে ধর্ষণ করে বারবার এবং সেটা হয় তাদের পূজার অঙ্গ। আর কী দারুণ ব্যাপার! যে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসিফার ধর্মের, এমন এক ধর্ম যা নাকি, ধর্ষকদের ধর্মের লোকেদের কথানুযায়ী ভীষণ হিংস্র, সেই রাজ্যে পুলিশ অনেকদিন অব্দি অভিযোগই না নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে পারে! শেষ অব্দি যখন নেয়, তখন জানা যায় কর্তাদের আগেই অনেক টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছিল চেপে যাওয়ার জন্য। শুধু তাও নয়, ধর্ষণপুজোর পেরসাদ তাঁরাও পেয়েছেন। এতসব আয়োজন কেন? না আসিফার পরিবার পরিজন ভাই বেরাদরদের ঐ এলাকা থেকে সরানোর জন্যে। আচ্ছা এই অব্দিও না হয় বোঝা গেল। দোষীদের যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। এর বেশি আর কী করণীয়? ক্ষতি তো যা হওয়ার হয়েই গেছে। কিন্তু বিপদের শেষ তো সেখানে নয়। লোকে যে মিছিল করতে বেরিয়েছে ধর্ষকদের সমর্থনে! উকিলরা আন্দোলন শুরু করেছেন পুলিশকে চার্জশিটই দাখিল করতে দেবেন না বলে! আসিফার পরিবারের পক্ষের উকিলকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে “ভিটেমাটি চাটি করে দেব”!
তা এসবে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলি কী কী রকমের?

১) নীরবতা
২) নিশ্চয়ই পাকিস্তানের হাত আছে
৩) কাশ্মীরীদের বিশ্বাস করা যায় না। কে জানে আসলে কী ব্যাপার? মিডিয়া তো সবেতেই “ওদের” দিকে ঝোল টানে
৪) হয়েছে বেশ হয়েছে। বেঁচে থাকলে তো বড় হয়ে টেররিস্ট হত
৫) তুমি এত লাফাচ্ছ কেন? তোমার বোনকে তো কেউ রেপ করেনি

দু নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর হচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়া যারা ইদানীং হিন্দু বলে গর্বিত। এক থেকে পাঁচ তাদেরও প্রতিক্রিয়া যারা অত গর্বিত টর্বিত নয়, তবে মোগাদিশুতে মুসলমান সন্ত্রাসবাদীরা বোম মারলে মুর্শিদাবাদের মুসলমান সম্পর্কে বলে “কৈ, নিন্দা করল না তো? ওদের ধর্মটাই এইরকম। কোরানে পরিষ্কার লেখা আছে।”
এখন যদি জিজ্ঞেস করি এই যে আপনারা আসিফার ধর্ষণকে নির্ভয়ার ধর্ষণের পাশে রাখছেনই না, নিন্দাও করছেন না — এ থেকে কী বুঝব? হিন্দু ধর্মটাই এরকম? ঐ ধর্ষণপুজোর কথা বেদে পরিষ্কার লেখা আছে? কারা যেন ইংরিজিটা লিখতে পারে বলে মুসলমানদের উঠতে বসতে জ্ঞান দেয় “Educated Muslims should reclaim their religion from fundamentalists?” তেনারা হিন্দুধর্মটাকে মৌলবাদীদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করার কাজটা কবে শুরু করছেন জানতে ভারী ইচ্ছা করছে।
ইতিমধ্যে বুকে হাত রেখে একটা সত্যি কথা বলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। সেটা এই যে আমরা অনেকেই জেনেশুনে বিষ করেছি পান। কারণ বাইরে উন্নয়ন ইত্যাদি যা-ই বলে থাকি না কেন, মনে মনে জপছিলাম “মুসলমানগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার,” “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরোগুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে” ইত্যাদি। এসব যখন ভেবেছি তখন যোগী আদিত্যনাথের বক্তৃতায় ধর্ষণের হুমকি আমাদের ভালই লেগেছে। এ বিষ বড় মিষ্টি। খাওয়ার সময়ে ভেবেছি আমার কী? আমি তো সংখ্যালঘুও নই, দলিতও নই। এখনো মিষ্টি মিষ্টি লাগছে তাই ধর্ষণগুলোকে সেইভাবেই মাপছি।
এমন বিষ আছে খাওয়ার সাথে সাথে কেউ মরে না, মরে ধীরে ধীরে, অনেক মাস, বছর ধরে। যেমন আর্সেনিক। ঘৃণাও আর্সেনিকের মতই। মনে রাখবেন, যে ধর্ষক একটা আট বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করবে বলে মীরাট থেকে কাঠুয়া যেতে পারে, সে কিন্তু মুসলমান না পেলে ধর্ষণ করা বন্ধ রাখবে না। এ দেশের সব মুসলমান, দলিত, আদিবাসী হিটলারের জার্মানির ইহুদীদের মত হাওয়া হয়ে গেলেও তার চোখ লোভে চকচক করবেই। তা বিষ যখন গিলেছেন এবং আমাদের সক্কলকে গিলিয়েছেন তখন আর কী করা? দরজা, জানালা এঁটে শোবেন দয়া করে আর ছেলেমেয়েদের একা কোথাও ছাড়বেন না। মনে রাখবেন, ধর্ষণকে নানা লোক নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে কিন্তু ধর্ষণ করার ইচ্ছাটি একদম ধর্মনিরপেক্ষ। ওখানে কিন্তু জাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণও নেই।
সব ধর্ষণ সমান নয় কিন্তু সব ধর্ষক সমান।

খরচের খাতা

গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে

যারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার জন্যে গুন্ডামি হচ্ছে বলে চেঁচামেচি করছে তারা বুঝছে না এর মাধ্যমে কত পয়সা বাঁচছে। একটা এতবড় নির্বাচন করতে কত খরচা হয় বোঝেন? বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন হয়ে গেলে কত টাকা বেঁচে যাবে সে খেয়াল আছে? চৌত্রিশ বছরে বামফ্রন্ট তো কোষাগার খালি করে রেখে গেছিল। তা সত্ত্বেও বাংলায় যে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে এরা কি সেটা দেখতে পাচ্ছে না?
ক্লাবগুলো সব ঝিনচ্যাক নীল সাদা হয়েছে, রাস্তায় এত আলো যে পাখিরা রাতে দিন ভেবে কলকাকলিতে ভরিয়ে দিচ্ছে, ভি আই পি রোড, যশোর রোড সব কালীঘাট মন্দিরের চাতালের মত চওড়া হয়ে গেছে, গাছফাছ উড়িয়ে দিয়ে রেলিং বসিয়ে লন্ডন না হোক, কলকাতাকে হনলুলুর মত তো দেখাচ্ছেই। নইলে বিদেশ কিম্বা ব্যাঙ্গালোর থেকে অনেকবছর পর এসে বিশ্ব বাঙালিরা আনন্দে কেঁদে ফেলছে কি এমনি এমনি? গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে। তা সে রটাক। নিন্দুকের রাবণের মত দশটা মাথা হয়। কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে এত উন্নয়ন করতে টাকা লাগে। সে টাকা কি আকাশ থেকে পড়বে? বছর বছর ভোটও হবে আবার উন্নয়নও হবে? এ যে খেতে পেলে শুতে চাওয়া দেখছি।
আর ভোট দিতে গেলেই বা দিতেন কাকে? লালেদের তো আর দিতেন না এই বাজারে। আর আছেটা কে? জয় শ্রীরাম পার্টি? আরে জয় শ্রীরাম তো তরোয়াল হাতে নিয়ে যারা মনোনয়ন জমা দেয়া আটকাচ্ছে তারাও বলছে। তবে আর তফাত কী? তাহলে দাঁড়াল কী? দাঁড়াল এই যে ভোট হলেও যাকে দিতেন ভোট না হলেও সে-ই জিতবে। তাহলে আবার অসুবিধেটা কী? খামোকা এক কাঁড়ি টাকা খরচা করার থেকে এইটেই ভাল না? ভাত, ডাল আর ডিমের ঝোলের উপর দিয়ে মিটে যাবে।
কী বললেন? হিংসা? রক্তপাত? ধুর মশাই! ও তো বাম আমল থেকে চলে আসছে। এতটা দ্যাখেননি বলছেন? ওসব চক্রান্ত। চুপিচুপি করেছে, ক্যামেরায় উঠতে দেয়নি। এখনকার সরকার অনেক খোলামেলা, গণতান্ত্রিক। তাই সব দেখতে পাচ্ছেন আর ভয় পাচ্ছেন। এই যে ভয় পাওয়ার স্বাধীনতা — এইটাই তো আগে ছিল না। এটাই তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তাছাড়া হিংসা হচ্ছে হিংসা। পাঁচ কোটি চুরি কল্লেই চুরি আর পাঁচ টাকা চুরি কল্লে চুরি না? যত্তসব মাওবাদীর দল! সিপিএম এর ম, মাও এর ও আর বিজেপির পি র কা মিলে হল মওকা। এরা ভেবেছে এই মওকা ক্ষমতা দখল করে উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করে দেয়ার। সে গুড়ে বালি। উন্নয়ন চলছে, চলবে।

বিঃ দ্রঃ বিজেপিতে কা নেই সেটা আমরা জানি। বাম বুদ্ধিজীবীদের ভাষার উপর প্রভুত্ব করার স্বভাবটা আর গেল না। ভাষাটা এখন আর রবীন্দ্র সদনের আঁতেলদের নয়, ওটা এখন সবার। অতএব আমরা যখন বলেছি কা আছে তখন আছে। ও নিয়ে দাঁড়কাকের মত কা কা করবেন না বলে দিচ্ছি।

নিজের দিকে আঙুল তুলুন

আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল

যেহেতু প্রাসঙ্গিক সেহেতু একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাক।
আমার বাড়ির খুব কাছে অধুনালুপ্ত হিন্দমোটর কারখানা, তৎসহ শ্রমিকদের কোয়ার্টার। ঐ এলাকার বাইরেও কিছুটা জায়গা জুড়ে যাঁদের কোয়ার্টারে জায়গা হয়নি বা নিজের সামর্থ্য আছে তাঁদের বাসস্থান। আমার যখন সদ্য অক্ষর পরিচয় হয়েছে তখন কারখানাটা রমরমিয়ে চলছে। আমার বাবা সেইসময় সক্রিয় রাজনীতিবিদ, তার উপরে প্রশাসক। ফলে রোজ সকালে ঐ কারখানার শ্রমিকরা, যাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন এবং মূলত হিন্দিভাষী, বাবার কাছে বিভিন্ন দরকারে আসতেন। বাবা বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে, ফলে খুব ভোর ভোর উঠতে পারত না। যতক্ষণ না উঠত, ওঁদের সাথে গল্পগুজব করতাম আমি। অন্য ভাষা আমার কাছে ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল আর ওঁদের দিক থেকে দেখলে, ছোটদের সাথে সময় কাটাতে কার না ভাল লাগে? তা এই রোজ সকালে হিন্দি বলার ফলে বাংলার সাথে সাথে হিন্দিটাও তখন আমি দিব্যি বলতে পারি।
যখন হাইস্কুলে পৌঁছেছি তখন ঐ কারখানারই এক শিখ শ্রমিক পরিবার আমাদের প্রায় আত্মীয় হয়ে গিয়েছিল। ওঁরা সপরিবারে আমাদের বাড়ি এসেছেন, ওঁদের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে আমরা নেমন্তন্ন খেয়েছি। সেই ঘনিষ্ঠতা বেশিদিন টেকেনি, নইলে গুরুমুখীটাও কিছুটা শিখে নেওয়ার চেষ্টা করতাম।
বরাবর, এমনকি হিন্দমোটর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও, এলাকার হিন্দিভাষী মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্ক একই রকম থেকেছে। খুব ছোটবেলা থেকেই তাই ছটপুজোর ঠেগুয়ার স্বাদ কিরকম সেটা জানি। আমার বাবার যখন ক্যান্সার হয়, তখন যাঁরা নিয়মিত খবর নিতেন, যে কোনরকমভাবে আমাদের সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিক। বাবা মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম স্বাভাবিক কারণেই ওঁদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। আমাকে অবাক করে, আমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছেন এমন একজন তাঁর মেয়ের গ্র‍্যাজুয়েশনের পরে কী পড়া উচিৎ তার পরামর্শ করতে আমার কাছে এসেছিলেন বছর দুয়েক আগে। “তুমহারে পিতাজি তো রহে নহি। অব কাঁহা যায়েঁ, কিসসে পুছেঁ? সোচা তুমসে হি পুছ লেতে হ্যাঁয়” বললেন এসে। এই যে জীবিকার তাগিদে, জীবনরক্ষার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আসা ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এখানে থাকতে থাকতে এই রাজ্যের মানুষকে ভরসাস্থল মনে করেন — এর চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই বলে আমার মনে হয়।
আমি নিজে একসময় হায়দরাবাদের একটা খবরের কাগজে কাজ করতাম। তখন সেই নিউজরুমে বাঙালিরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তেলুগুদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি তো বটেই। একদিন এক তেলুগু সহকর্মী হঠাৎ দাবী করে বসল আমাকে ফোনে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে কারণ কানের কাছে অজানা ভাষায় কেউ কথা বললে তার কাজের অসুবিধা হচ্ছে। এই অন্যায় দাবী মেনে নেওয়ার ছেলে আমি নই। ফলে তার সাথে জোর ঝগড়া হল। সে বলল “তাহলে তেলুগু শেখো। এখানে এসে থাকবে, কাজ করবে আর এখানকার ভাষা শিখবে না?” আমি সপাটে জবাব দিয়েছিলাম “শিখতেই পারি। কিন্তু তুমি কলকাতায় এসো, আমরা তোমায় বাংলা শিখতে জোর করব না। আমরা করি না।” সে আর রা কাড়েনি।
বাঙালি হিসাবে অত গর্বিত আমার কখনো লাগেনি। আর সশস্ত্র রামনবমী মিছিল, তজ্জনিত হিংসা, আবুল কালাম আজাদের মূর্তি ভাঙা দেখে বাঙালি হিসাবে এত লজ্জিতও কখনো হইনি। সেই লজ্জা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই বাঙালিরা যারা এখন আমাদের জাতিগত অধঃপতনের দোষ চাপাচ্ছে অবাঙালিদের ঘাড়ে। ভারত এখন বিবিধ আমরা ওরায় বিভক্ত। তার মধ্যে আবার একটা নতুন আমরা-ওরা যোগ করছে এই বাঙালিরা।
নিজের অযোগ্যতা, অপদার্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো ভীতু, ওপরচালাক এবং অলস লোকের লক্ষণ। এই বাঙালিরাও আমাদের সেরকম বলেই প্রমাণ করছে। হাস্যকর কিছু কথা বলা হচ্ছে। “এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”, “আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”, “রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এসে এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঢোকাল”, “ওরা যেখানে যেখানে থাকে সেখানেই কিন্তু হিন্দুত্ববাদের রমরমা” — এইসব কথা দেখছি বিজেপিবিরোধীরা তো বটেই, নিজেকে বামপন্থী বলে দাবী করা অনেকেও বেশ বুক ফুলিয়ে বলছেন, সোশাল মিডিয়ায় লিখছেনও। মোটের উপর ঐ তিনটেই বক্তব্য এঁদের। কথাগুলো কতটা অন্যায়, কেন অন্যায় সেটা এবার দেখা যাক।

“এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”
কিরকম হওয়া উচিৎ ছিল তাহলে? মুম্বাইয়ের শিবসেনার মত? বিহার বা উত্তরপ্রদেশের লোক দেখলেই ঠ্যাঙানো উচিৎ ছিল? নাকি সব্বাইকে বাংলা শিখতে হবে, নইলে এর লাইসেন্স দেব না, তার লাইসেন্স দেব না — এসব বলা উচিৎ ছিল? প্রথমত, মুম্বাইতে এটা করে কী ফল হয়েছে? মুম্বাই বলতেই বিশ্বসুদ্ধ লোক কী বোঝে? বলিউড। কোন ভাষায় ছবি হয় সেখানে? হিন্দি। চেনা পরিচিত বাঙালি যারা মহারাষ্ট্রে থাকেন তাঁদের কজন মারাঠি জানেন একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো। বুঝতে পারবেন ঠ্যাঙাড়ে পদ্ধতি ব্যর্থ। তাছাড়া এই কথা যদি বলেন তাহলে হিন্দুত্ববাদীরা যখন পাকিস্তানের উদাহরণ দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া সমর্থন করে তখন কিন্তু বলা চলবে না “দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চাও তাহলে?”

“আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”
এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর নেই। কিসের কালচার? কালচার বলতে আজকের বাঙালি কী বোঝে? কালচারের বাংলা প্রতিশব্দ কী? সঠিক বানানে সেটা লিখতে পারবে চল্লিশের নীচে বয়স এমন কজন আছে? তামিল, তেলুগু ছবি ঝেড়ে বলিউডে ছবি হয় আবার সেই ছবি ঝেড়ে বাংলা ছবি হয়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই চলছে। এর নাম কালচার? ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে তো বাঙালি দেড়শো বছর ধরে পড়ছে কিন্তু আগে তো বাপ-মা গর্ব করে বলত না “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না”? এই অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে বিহারী, মাড়োয়ারিরা? একই স্কুলে পড়া মাড়োয়ারি ছেলেমেয়ের বাবা-মাকে তো বলতে শুনি না গদগদ হয়ে “মেরে বেটে কো না হিন্দি ঠিক সে আতা নহি”? সন্ধ্যের পর তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি যে সিরিয়ালগুলো দ্যাখে সেগুলোর নাম কালচার? ওসবে তো হিন্দি ছবির গানও চলে। তার মানে যারা বানায় তারা নিজেরা লিখতে তো পারেই না, লাগসই বাংলা গান খুঁজে বের করার মুরোদও তাদের নেই। স্বাভাবিক। কারণ এদের সাক্ষাৎকার যা এদিকওদিক পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় এরা বাংলা বলে গ্রীকদের মত। তা এরকমটা এদের শেখাল কে? হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালা? গলায় পা দিয়ে? বাঙালি হিন্দু মেয়ের বিয়েতে মেহেন্দি চালু করল কে? কোন বিহারী এসে এ কে ৪৭ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল? যে ছেলে সব শাস্ত্রীয় আচার মেনে বিয়ে করে, প্রেমের বিয়েতেও পণ নিতে ছাড়ে না, সে বৌভাতের দিন প্রথাগত ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে শেরওয়ানি পরে কোন মাড়োয়ারির ভয়ে? ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে এমনকি দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও বাংলাকে সরিয়ে হিন্দি ঢোকান যে বাঙালি বাবা-মায়েরা তাদের কোন হিন্দিভাষী ব্ল্যাকমেল করেছে এটা করতে?
তাছাড়া কালচার মানে তো শুধু এসব নয়। ট্রেনে বাসে তরুণ বাঙালিদের ভাষা শুনে দেখেছেন? এমনিতে পাঁচ লাইন কথা বললে দু লাইন ইংরিজি আর আড়াই লাইন হিন্দি থাকে। খিস্তি দেওয়ার সময় কিন্তু এরা পরম বাঙালি। এবং জনসমক্ষে খিস্তিসহ কথা বলাটা বেশ গর্বের ব্যাপার এদের কাছে। বছর কুড়ি আগেও বড়দের সামনে শালা বলে ফেললে যে বাঙালি কানমলা খেয়েছে তারই ছেলেমেয়ে ট্রেনে বসে হেডফোনে বন্ধুকে মহানন্দে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যায়, সে কামরাভর্তি যতই বাপ-পিতেমোর বয়সী লোক থাক, মহিলারা থাকুন বা বাচ্চাকাচ্চা থাক।
এই জাতির কালচার শেষ করে দিয়েছে অন্য রাজ্য থেকে আসা দশ বারো শতাংশ লোক? শুনলেই হাসি পায়।

“এ বাংলা রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এই সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ রাজনীতি ঢোকাল”
ঐ তিন চারটে নাম মুখস্থ বুলির মত আউড়ে যাওয়া বহুকাল হল বাঙালির বদভ্যেস। কাঁঠালি কলার চেয়েও বেশি ঘটে ব্যবহার করা হয় এই নামগুলো। অথচ এই লোকগুলো কেন বিশিষ্ট তা ছেলেমেয়েকে শেখানোর দায়িত্ব অনেকদিন বাবা-মায়েরা ছেড়ে দিয়েছেন। কি ভাগ্যিস দ্বিতীয় জন কিছু গান, কবিতা লিখে গেছেন। তাই স্ট্যাটাস বজায় রাখতে বাড়িতে রচনাবলী সাজিয়ে রাখা, ছেলেমেয়েকে আবৃত্তি স্কুলে পাঠিয়ে “ভগবান তুমি…” বলতে শেখানো, ঘুরেফিরে গুটিকয়েক গান আর নাচ শেখানো — এসব আছে। বাকিরা তো আক্ষরিক অর্থেই ছবি হয়ে গেছেন। প্রথমজনেরটা থাকে ঠাকুরঘরে। অতএব কী বলেছেন ওসব আর কে পড়তে যাবে? পড়লেও ভাবতে যাবে কেন? গুরুবচন। মুখস্থ করাই কর্তব্য, ভাবতে নেই।
রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন অথচ সঙ্গীতে এবং কাব্যে একেবারে স্বতন্ত্র নজরুলের প্রতি আমরা পশ্চিমবঙ্গীয়রা সযত্নলালিত অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছি। আজকাল আর নজরুলগীতি শেখা ঠিক কেতাদুরস্ত নয়। আমাদের ছোটবেলার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যাগুলোও প্রায় অবলুপ্ত। অন্নদাশঙ্করেরই বোধহয় ভুল হয়েছিল। নজরুলকে আমরা বিলকুল ভাগ করে দিয়েছি। আশঙ্কা হয় সেটাও হয়ত তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যেই।
চতুর্থজনের অবস্থা তো আরো করুণ। এই ভদ্রলোকের নাম আজকাল আর খুব বেশি বাঙালি জানে কিনা আমার সন্দেহ হয়। ছোটদের তো জানার উপায়ও নেই। তারা তো জলি প্রাইমার, এলিমেন্টারি ম্যাথসে ডুবে আছে। তার মধ্যে কি আর বর্ণপরিচয়ের জায়গা আছে? আর বড়রা তো বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বরাবরই জানত দুটো শব্দ —- বিধবাবিবাহ আর বাল্য বিবাহ। আরেকজনকে তো বাঙালি ভুলেই গেছে। তিনি রামমোহন রায়। সেটা অবশ্য একদিকে ভাল। পপকর্ন খেতে খেতে পদ্মাবতী দেখার সময়ে ঐ ভদ্রলোককে মনে পড়লে পুরো আমেজটাই নষ্ট হবে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে এই লোকগুলোকে শালগ্রাম শিলা বানিয়ে ফেলেছি আমরা অনেক আগেই। সুতরাং আমাদের বাংলাটা আর এদের বাংলা নেই। এর জন্যে বিহারী, মাড়োয়ারিদের গাল পাড়ার কোন যুক্তি নেই। তা বাদেও বাংলাকে এদের বাংলা বলা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে অর্ধসত্য বলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রামকৃষ্ণের কথা আলাদা। তিনি শত হলেও ধর্মগুরু। তাছাড়া তাঁর এক নম্বর শিষ্য একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গেছেন। তাই তিনি নিজের সময়ও পূজিত, এখনো পূজিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে গালাগাল দেওয়ার লোক তাঁর সময়েও নেহাত কম ছিল না। যেমন তাঁর যশে দ্বিজেন্দ্রলালের কম গা জ্বলেনি। আর নোবেল টোবেল পাওয়ার পরেও, বাণী বসুর ‘অষ্টম গর্ভ’ পড়লে বোঝা যায়, শিক্ষিত বাঙালিরা অনেকেই মনে করত উনি শুধু একজন বড়লোকের ছেলে যে শান্তিনিকেতনে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে। এসব যারা মনে করত এ বাংলা তাদেরও। নিজেদের রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি ভাবতে গেলে মনে রাখা উচিৎ আমরা ঐ লোকগুলোরও জাতভাই।
আর বিদ্যাসাগর? এ বাংলা কোনদিনই তাঁর ছিল না। তিনি যেমন আমাদের পূর্বপুরুষ তেমন যারা বিধবাদের বিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিল, তাঁকে খিস্তি করে গান লিখেছিল, জুতো ছুঁড়েছিল, টাকার লোভে তাঁকে ঠকিয়েছিল তারাও এই আমাদেরই পূর্বপুরুষ। এবং তারা নেহাত এলেবেলে লোকও নয়, অনেকেই তখনকার সমাজের মাথা। এই বাংলা এমনই বিদ্যাসাগরের যে তিনি শেষ বয়সে এই জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে দন্ডকারণ্যে সাঁওতালদের সঙ্গে গিয়ে বাস করতেন।
যে নবজাগরণ বা আলোকপ্রাপ্তি নিয়ে আমরা জাঁক করি সেই আলো যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক ইউরোপীয় অধ্যাপকও। মনে রাখা ভাল যে সেই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে আমাদেরই গণ্যমান্য পূর্বপুরুষরা বিদেশী এবং বিধর্মী বলে অপমানের একশেষ করেছিল। আমাদের সমাজের কুপ্রথাগুলোর দিকে আঙুল তোলার তাঁর অধিকার নেই বলেছিল। ঠিক যেমন আজকের দক্ষিণপন্থীরা বলছে লেনিন তো বিদেশী, এদেশে তার মূর্তি থাকবে কেন? আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরা ডিরোজিওকে ভাতেও মেরে এমন অবস্থা করে যে তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
আর সাম্প্রদায়িকতা হিন্দিভাষীরা এ রাজ্যে নিয়ে এসেছে, কেবল তাদের এলাকাগুলোতেই হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটছে এমনটা যদি আপনার মনে হয় তাহলে বলতে হয় আপনি বুদবুদের মধ্যে বাস করছেন বহুকাল ধরেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলে চারপাশে অজস্র আত্মীয়স্বজন পাবেন যারা গাদা ডিগ্রিধারী হয়েও চরম অশিক্ষিতের মত বলে “অমুকের মুসলমানদের সাথে এত কিসের দহরম বুঝি না। বাঙালি ছেলে বাঙালিদের সাথে বন্ধুত্ব কর না।” বাংলা ভাষার জন্যে আজ অব্দি যারা প্রাণ দিয়েছে সীমান্তের দুই পারে, তাদের বেশিরভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী অথচ আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশাধারী মূর্খরা বলে তারাই বাঙালি, মুসলমানরা মুসলমান। বিজেপির প্রোপাগান্ডা আর মমতার নিজেকে মুসলমানদের ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা শুরু হওয়ার পর থেকে আশপাশের লেখাপড়া জানা মানুষদের ভেতরের ঘৃণা কিভাবে বেরিয়ে আসছে, কি অনায়াসে তারা ভিত্তিহীন গুজবকে ধ্রুব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করছে এবং অন্যকে বিশ্বাস করাচ্ছে তা যদি আপনার চোখে না পড়ে থাকে, একমাত্র তাহলেই আপনি ভাববেন হিন্দুত্ববাদীরা শুধু হিন্দিভাষীদের এলাকায় শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে এই সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসও আমাদের সুপ্রাচীন। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অনন্য প্রতিভা যেমন তাঁর ইহুদীবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি, আমাদের গদ্যের আদিপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভাও তেমনি তাঁর মুসলমানবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি। মুসলমান শাসকরা এদেশে হানাদার এবং সমস্ত অধঃপতনের মূলে, তারা আসার আগে এদেশ স্বর্গরাজ্য ছিল — এই যে অতিসরলীকৃত ইতিহাস আর এস এস আমাদের গেলাচ্ছে, বঙ্কিম যে তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু ভাবতেন তা ভাবা শক্ত। রাজসিংহ উপন্যাসের শেষে তবু একটা কৈফিয়ত গোছের লেখা আছে, যেখানে বঙ্কিম লিখেছেন সব হিন্দুই ভাল আর সব মুসলমানই খারাপ এমনটা বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। আনন্দমঠ উপন্যাসের শেষে তাও নেই।
বিবেকানন্দ একবার বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সঙ্গে ঐস্লামিক দেহের সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর ইতিহাস পাঠেও “সবই ব্যাদে আছে” এবং সে যুগের পর থেকে ভারতে আর ভাল কিছু হয়নি — এই মনোভাবটা বড় জ্বলজ্বল করে। আর সত্যি বলতে কি, ঐ উক্তি থেকেও এটাই মনে হয় যে বিবেকানন্দ মুসলমানদের একটা বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষ হিসাবে না দেখে একটা বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর লোক হিসাবে দেখতেন। নইলে ঐস্লামিক দেহ কথাটার কোন মানে দাঁড়ায় কি? সব মুসলমানের দেহের গঠন কি একরকম? আমার মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মুসলমান মাস্টারমশাই সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার রোগাসোগা লোক। আবার আমাদের পেস বোলার মহম্মদ শামি। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ চেহারার উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা মুসলমান। এদের মধ্যে কার দেহের সঙ্গে বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সমন্বয় চাইছিলেন বিবেকানন্দ?
অত তত্ত্বকথারও দরকার নেই, বাস্তব উদাহরণ দেখি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গা করতে আমরা বাঙালিরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকিনি। ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্টের দাঙ্গাও বাইরে থেকে কেউ এসে করে দিয়ে যায়নি।
অতএব শুরু হয়ে যাওয়া ঝড় এবং আসন্ন প্রলয় আটকাতে হলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বাঙালি সংস্কৃতিমান, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, বাঙালি দাঙ্গাবাজি করে না — এই একমাত্রিক পরিচিতিটা আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আমাদেরই তৈরি করা। আসলে বাঙালিদের মধ্যে অন্য কোন জাতের লোকেদের চেয়ে পরধর্মবিদ্বেষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দাঙ্গাবাজ লোক কম নেই। কোনদিন ছিলও না। বাঙালির বাংলাকে এক রাখতে রাখীবন্ধন করা রবীন্দ্রনাথ আছেন আবার হিন্দু, মুসলমান এক দেশের নাগরিক হতে পারে না — এই মনোভাবের শ্যামাপ্রসাদও আছেন। আমাদের “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” লেখা, অসামান্য শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা নজরুল আছেন আবার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস লেলিয়ে দেওয়া সুরাবর্দিও আছেন। আপনি এদের মধ্যে কার উত্তরসূরি সেটা প্রমাণ হয় আপনার কথায় এবং কাজে।
অতএব আঙুলটা এবার নিজের দিকে তোলা যাক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের দৈত্যটার মুখোমুখি হওয়া যাক। এমনিতেও যে রাজ্যে আমরা বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে অন্য রাজ্যের অন্য ভাষাভাষী মানুষ এসে সবকিছু বদলে দিচ্ছেন — এটা যদি সত্যি বলে মানতে হয় তাহলে এটাও মানতে হয় যে আমরা সব নিরেট মাথার লোক। গোটা ভারতকে ভাগ করা হচ্ছে, বাঙালিকেও ভাগ করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সেটা ভুলে আরো নতুন ভাগাভাগি তৈরি করবেন না দয়া করে। আদি অনন্তকাল ধরে মানুষ জীবিকার সন্ধানে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাচ্ছে। এই ধারার বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন অনৈতিহাসিক তেমনই অমানবিক। পৃথিবীর কোন প্রগতিশীল মানবগোষ্ঠী এর জন্যে কারো সাথে শত্রুতা করে না। এবং করতে ইচ্ছে করলে মনে রাখবেন, সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকে এবং বহু বাঙালি পেশাগত কারণে সারা ভারতে ছড়িয়ে আছেন।
কী বললেন? হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ? সে তো সঙ্ঘ পরিবার, ভারত সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার করছে। তার জন্যে আপনার হিন্দিভাষী, রাম আর হনুমানের পূজারী প্রতিবেশী দায়ী হবেন কেন? আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে মালার মত গলায় পরে নিচ্ছি আমরা নিজে — বাংলার চর্চা ক্রমশ কমিয়ে দিয়ে এবং ভাষাটার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। কয়েক মাস আগে এক টেলিকম কোম্পানি তাদের ইংরিজি বিজ্ঞাপনের বাংলা তর্জমা খবরের কাগজে ছেপেছিল শুধু গুগল ট্রান্সলেটরের ভরসায়। ফলে সেটার হরফটাই যা বাংলা ছিল, ভাষাটা কী তা বোঝা ভগবানেরও অসাধ্য। এই সাহস ওরা তামিলনাড়ু, কর্ণাটক কি কেরালায় পায় না। এখানে যে পায় তার জন্যে দায়ী আমরাই, এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নন। অন্য ভাষা শিখতে গেলে যে বাংলা ভুলতে হয় না সেটা নিজে বুঝলে এবং ছেলেমেয়েকে বোঝালে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ এমনিই ট্যাঁ ফোঁ করার জায়গা পাবে না।

এক যে ছিল সংসদ

বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”

ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরও একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”

এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।

আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরও পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।

তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদ এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?

কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন – কোনো বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।

এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোনো বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোনো দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদ সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।

আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিত”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।

ঘটনাটা ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।

ঢেউ উঠছে…

সাধারণ মানুষের কাছে লাল পতাকাটারই আলাদা পরিচিতি আছে, ভিন্নমত বাম দলগুলোর সেভাবে নেই। সেজন্যেই এত বছর পরেও বিদ্যাসাগরের মাথা কাটার দায় সিপিএমের ঘাড়ে চেপে যায়। একইভাবে সিপিএমের কুকর্মের দোষ এস ইউ সির ঘাড়ে কেউ চাপিয়ে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই

বামপন্থী, বা বৃত্তটা আরেকটু ছোট করে বললে মার্কসবাদী আন্দোলনে, মাঝেমাঝেই অনেক মতপার্থক্য ঘটে। এ সেই মার্কস, এঙ্গেলসের আমল থেকেই চলে আসছে। আন্দোলনের পথ নিয়ে তো বটেই, এমনকি লক্ষ্য নিয়েও মতান্তর হয়েছে। তার সুগ্রন্থিত ইতিহাস আছে। এদেশেও তো একসাথে যাত্রা শুরু করেও কমিউনিস্টরা পরে নানাভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন।
শুধু আন্দোলনেই নয়, আমার মত বামমনস্ক কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতি না করা লোক যারা আছে তাদের মধ্যেও মতপার্থক্য হয়। কয়েকদিন আগেই যেমন লেনিনের মূর্তি ভাঙার পালটা শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ভাঙা ঠিক হয়েছে কিনা তা নিয়ে হল।
এরকম মতান্তর এবং তা নিয়ে তর্ক আমরা বামপন্থী বন্ধুরা সামনাসামনি করি, দেখা না হলে ফোনে করি, ফেসবুকে করি, সর্বত্র করি। এবং ঝগড়া করে একে অপরের উপর রাগ করি, অভিমান করি। কোন ব্যাপারে মৃণাল হয়ত ভাবল “প্রতীকটা এরকম স্বল্পমেয়াদী চিন্তা করছে! চটজলদি সমাধান ভাবছে! ছিঃ!” আর প্রতীক ভাবল “সিদ্ধার্থকে এতদিন চিনি, আমার চেয়েও বেশি মার্কসবাদ পড়েছে। আর ও কিনা প্রত্যাঘাতের গুরুত্ব বুঝল না!” মণিশঙ্কর হয়ত এদের চেয়ে ঠান্ডা মাথার ছেলে। তাই সে ভাবছে “নাঃ! প্রতীককে সামনে পেলে বোঝাতে হবে। এটা হতে দেয়া যায় না।”
এই যে মতান্তর, আন্দোলনেই হোক বা সমর্থকদের মধ্যে, এটা কিন্তু নেহাত খারাপ নয়। এটা হওয়ার কারণ সমস্যাগুলো নিয়ে এই সব পক্ষই মনপ্রাণ দিয়ে ভাবছে এবং নিজের মত করে ভাবছে। কারোর কাছেই এটা নিছক আড্ডা দিয়ে বা বিতর্কসভা করে ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়। আর ইংরিজিতে কথা আছে না “fools seldom differ”? বিজেপি সমর্থকরা যেমন লক্ষ্য করি সব ব্যাপারেই একমত। দুজন সামনাসামনি বসলে এত একরকম কথা বলে যে যে তাড়াতাড়ি বলতে পারে সে-ই বলে যায়, অন্যজনের মাথা নাড়তে নাড়তে ঘাড় ব্যথা হওয়ার যোগাড়।
কিন্তু বামপন্থীদের মধ্যে যত মতপার্থক্যই থাক, দেশের আজকের অবস্থায় যে একত্র হওয়া দরকার সেটা নিয়ে বিরাট কোন মতান্তর নেই। মতান্তর যা আছে, তা বামেরা ছাড়াও আর কাউকে দলে টানা দরকার কিনা তাই নিয়ে। সেই বিতর্কের সমাধান করে দেওয়ার দায়িত্ব বোধহয় সাধারণ মানুষই নিয়ে নিয়েছেন। প্রথমে ত্রিপুরার নির্বাচনে তাঁরা সিপিএম সরকারকে হারিয়ে দিলেন, কংগ্রেসকে একটা আসনও দিলেন না। তারপর মহারাষ্ট্রে, যেখানে বামেরা বিধানসভায় উপস্থিতির বিচারে কোন শক্তিই নয়, সেখানকার হাজার হাজার কৃষক কিনা লাল পতাকা হাতে ছদিন মিছিল করে পৌঁছে গেলেন ভারতীয় পুঁজিবাদের সদর দপ্তর মুম্বাইয়ে! কে জানে, কলকাতার লেনিন সরণির স্ট্যাচুটা হয়ত স্মিত হেসে বলেছে “একটু পা চালিয়ে ভাই।” শুধু মহারাষ্ট্রের কৃষক নয়, আমাদের মিডিয়া পাত্তা দিক আর না-ই দিক, মাত্র কয়েকমাস আগে রাজস্থানের কৃষকরাও লাল ঝান্ডা হাতে বিজেপি সরকারের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন।
আইনসভায় উপস্থিতির দিক থেকে অদূর ভবিষ্যতে এদেশে বামেদের ক্ষমতায় আসার কোন সম্ভাবনা নেই, কিন্তু খুব কম সময়ের ব্যবধানে দুটো আন্দোলন ক্ষমতার মেদ জমে যাওয়া বামপন্থীদেরও দেখিয়ে দিল “রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।” এম পি, এম এল এ না-ই থাক, বামপন্থীরা মানুষের পাশে থাকলে, রাস্তায় থাকলে এখনো কী করতে পারে টের পেয়ে গেল সবাই।
আজকের মুম্বাইতে লাল ঝান্ডা যেটা করতে পারল সেটা সম্ভবত আজকের কলকাতায় পারত না। গ্রাম থেকে শহর হয়ে ওঠা মফঃস্বলের ছেলে হয়েও তো কৃষক সভার অস্তিত্ব টের পাই না বহুবছর হল। হয়ত পশ্চিমবঙ্গের কৃষকও ঝান্ডাটাকে নিজের মনে করতে পারেন না আর। তার পেছনে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের শেষের দিককার ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক। যতটুকু বুঝেছি, সাধারণ মানুষের কাছে লাল পতাকাটারই আলাদা পরিচিতি আছে, ভিন্নমত বাম দলগুলোর সেভাবে নেই। সেজন্যেই এত বছর পরেও বিদ্যাসাগরের মাথা কাটার দায় সিপিএমের ঘাড়ে চেপে যায়। একইভাবে সিপিএমের কুকর্মের দোষ এস ইউ সির ঘাড়ে কেউ চাপিয়ে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
শত্রুরাও কিন্তু লাল পতাকাধারী সব দলকেই এক ও অভিন্ন শত্রু বলে মনে করে। এবং বামপন্থীরা নিজেদের মধ্যে যতই তর্ক করুন কে প্রধান শত্রু তা নিয়ে, ফ্যাসিবাদীরা নিঃসংশয় যে বামপন্থীরাই প্রধান শত্রু। তা নাহলে ২০১৪ থেকেই মূর্তি ভাঙা শুরু হত নেহরু, গান্ধী বা ইন্দিরাকে দিয়ে। একটা বুড়ো আঙুলের সমান রাজ্যে লেনিনের মূর্তি ভেঙে এর সূচনা হত না।
সুতরাং হোক না, যেখানে কোনদিন ক্ষমতায় আসেনি কোন বামপন্থী দল, লড়াইটা সেখান থেকেই নতুন করে শুরু হোক না। আর এই আন্দোলন তো বেশকিছু নতুন জিনিস শেখাচ্ছে, বাকি দেশের বামপন্থীরা, বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজ্যের বামপন্থীরা সেগুলো শিখুন না। যেমন পরীক্ষার্থীদের যাতে অসুবিধা না হয়, তাই মিছিলটা আজাদ ময়দান পৌঁছল রাতেই, সকালে নয়। এটা নিশ্চয়ই শেখার মত। ভরসার কথা তো এটাই যে মহারাষ্ট্রের মত অতবড় রাজ্যের কৃষক লাল ঝান্ডাধারীদের এখনো বিশ্বাস করেন, তাই গলায় দেওয়ার দড়ি ছেড়ে রক্তপতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন।
অনাবশ্যক আশাবাদ মনে হচ্ছে? হতেই পারে, কারণ কিছুদিন আগেই একটি বামপন্থী দলের সর্বক্ষণের কর্মী এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। সে বলছিল হিন্দি বলয়ের অনেক রাজ্যেই শ্রমিক, কৃষক লাল পতাকাকে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বলেন “দাবী আদায় করতে লাল পার্টি, ভোট দেয়ার জন্যে অন্য পার্টি।” কেন হয় এমনটা? ভীষণ কঠিন পরিস্থিতিতে, মার খেয়ে, প্রাণের মায়া ত্যাগ করে, সবচেয়ে বড় কথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবহেলা উপেক্ষা করে, যে পার্টিকর্মীরা ঐসব রাজ্যে সংগঠন চালান তাঁরা কি পারছেন না আশু দাবী আদায় করার চেয়ে বেশি কিছু শ্রমিক, কৃষককে ভাবাতে? সোশাল ডেমোক্রেসির স্বপ্ন দেখাতে না পেরে কি ট্রেড ইউনিয়নবাদে পর্যবসিত হচ্ছে ঐসব রাজ্যের বামপন্থী রাজনীতি (যার বিরুদ্ধে লেনিন বারবার সতর্ক করেছেন)? সক্রিয় বামপন্থীরা ভেবে দেখতে পারেন।
আমরা যারা রাস্তায় নেই, ময়দানে নেই তারা শুধু স্বপ্নই দেখতে পারি। অবশ্য লেনিন রুশ সাহিত্যিক দিমিত্রি পিসারেভকে উদ্ধৃত করে বলেছেন “স্বপ্ন আর বাস্তবের পার্থক্যে কোনই ক্ষতি হয় না, যদি স্বপ্ন যে দেখে সে গভীরভাবে বিশ্বাস করে তার স্বপ্নে, নিবিড়ভাবে অনুধ্যান করে জীবনকে, জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে তার স্বপ্নসৌধকে আর সাধারণভাবে বলতে গেলে, তার আকাশকুসুমগুলিকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য যদি সে নিষ্ঠাসহকারে কাজ করে।”

ভূতের ভবিষ্যৎ

আমাদের দেশেও কিন্তু বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদ বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের সময়ে ঐ মতবাদ গাড্ডায় পড়েনি, জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে অন্তত কমেনি ২০০৮-০৯ পর্যন্ত।

ভারতীয় ফ্যাসিবাদ ভূত দেখেছে। কমিউনিজমের ভূত।

এই পোস্টটা প্রাথমিকভাবে বন্ধু অমিত এর প্রশ্নমালার উত্তর। তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর একবারে দিতে গেলে পোস্টটা অতিদীর্ঘ হয়ে যেত, আমার ওয়ালে কেউ প্রবন্ধ পড়তে আসে বলে মনে হয় না। আর আমার নিজেরও অতখানি লিখতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। তাই তিনটে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা তিনটে আলাদা আলাদা পোস্টে করার চেষ্টা করছি। অবশ্য উত্তরগুলো সব আমার কাছে আছে এমন দাবী করার মত মূর্খ আমি নই। সত্যি কথাটা হল অমিতের করা প্রশ্নগুলো আমি নিজেও নিজেকে করি অনেকসময়। সেগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। খুঁজতে খুঁজতে এখন অব্দি যা যা পেয়েছি সেগুলোই এখানে উত্তর হিসাবে লিখছি। আমার ধারণা আমাদের দুজনের মত আরো অনেকেই এই প্রশ্নগুলো নিজেকে বা অন্যদের করেন। তাঁদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই এর চেয়েও জোরালো উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। সেগুলো ভাগ করে নিলে সমৃদ্ধ হব।

১) সমাজতন্ত্রের ভবিষ‍্যৎ কি কেবল সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শ্রেণীকক্ষে অধ‍্যয়ন ও গবেষণার বিষয় হয়ে থাকা? বাস্তব পৃথিবীতে এর প্রয়োগের সম্ভাবনা আজকের দিনে কতটা?

প্রথমেই বলি, এই প্রশ্নটা সেই আশির দশকের শেষে অর্ধেক পৃথিবীজুড়ে কমিউনিস্ট দেশগুলোর পতনের সময় থেকেই করা হয়ে আসছে। তার কারণ মনে করা হয়েছিল ক্ষমতা চলে গেল মানেই মার্কসবাদী/সমাজতন্ত্রবাদী পার্টিগুলো ধ্বংস হয়ে গেল এবং সমাজতন্ত্র নামক ব্যবস্থাটা যে চলে না সেটা প্রমাণ হয়ে গেল। অতএব মানুষের আর এই আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটার প্রতি কোন আকর্ষণই থাকবে না।
কিন্তু সেরকমটা ঘটেনি। মিখাইল গরবাচেভের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত রুশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণশত্রু বলে চিহ্নিত কমিউনিস্ট পার্টি এখন পুতিনের রাশিয়ায় প্রধান বিরোধী শক্তি। ২০১৬য় হওয়া দুমার নির্বাচনে পুতিনের নিজের পার্টি ইউনাইটেড রাশিয়া ছাড়া আর যে তিনটে মাত্র পার্টি দুমায় জায়গা করে নিতে পেরেছিল তার মধ্যে একটা কমিউনিস্ট পার্টি (KPRF)। তাও তো কিভাবে পুতিনের রাশিয়ায় ভোট হয় তা নিয়ে অনেক লেখাপত্র আছে ইন্টারনেটে। ঐ নির্বাচনে যেমন অর্ধেক রাশিয়ান ভোট দিতেই আসেননি। পুতিন ২০১৬ তেই লেনিনকে বেশ গালমন্দ করেছিলেন, তবু গতবছর তাঁর সরকারকে রুশ বিপ্লবে উপলক্ষে একটু নাচনকোঁদন করতেই হল। মোদীকে যেমন এখনো গান্ধী, আম্বেদকরের নাম করতেই হয়। এ থেকে ঐ প্রয়াত আইকনদের আজকের দিনের জনপ্রিয়তার আঁচ পাওয়া যায়।
শুধু রাশিয়ার ব্যাপার নয়, পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে আজ অব্দি কমিউনিস্ট পার্টি বা সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসীরা বিভিন্ন কোয়ালিশন সরকারে থেকেছে। অতএব মানুষ সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে একেবারে বাতিল করে দিয়েছে বলার মত কিছু ঘটেনি।
ইউরোপে যা ছিটেফোঁটা, লাতিন আমেরিকায় তাই-ই সুস্পষ্ট। এক দশক আগে কলকাতা ঘুরে যাওয়া উগো শাভেজের নেতৃত্বে বামপন্থী সরকারগুলো (তাঁর নেতৃত্বাধীন পার্টিগুলো কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি নয়) কিভাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ভর দিয়ে নিজেদের মধ্যে জোট গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেজ না ধরেই ঐ মহাদেশে বিকল্প অর্থনীতি চালাচ্ছিল সেগুলো সবাই জানে। শাভেজের অকালমৃত্যুর পর প্রবল প্রতিআক্রমণ হয়েছে। তার উপর নেতৃস্থানীয় ভেনেজুয়েলা, যার মূলধন খনিজ তেলের ভান্ডার, আন্তর্জাতিক বাজারে সেই তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছে। ব্রাজিলে দিলমা রুসেফের সরকারকে দুর্নীতির অভিযোগে পদচ্যুত করা হয়েছে অথচ এখনো কিছু প্রমাণ হল না। এইসব বিপর্যয় সত্ত্বেও বামদিকেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উরুগুয়ে এখনো যথেষ্ট সমৃদ্ধ এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। বোধহয় সেইজন্যেই সে দেশের কথা আমরা এদেশে বসে বড় একটা শুনতে পাই না। আমিও জানতাম না। সেদিন লাতিন আমেরিকার বর্তমান অবস্থা নিয়ে ইকুয়েডরের বামপন্থী নেতা রাফায়েল কোরেয়ার একটা লেখায় দেখলাম তিনি প্রশ্ন তুলেছেন — ভেনেজুয়েলা যদি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ব্যর্থতার প্রমাণ হয়, তাহলে উরুগুয়ে সাফল্যের প্রমাণ নয় কেন?
কিউবার কথা এখনো বলিনি। পঞ্চাশ বছরের উপর অর্থনৈতিক অবরোধে থাকা একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অবরোধকারী আমেরিকাও মুখ খোলে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল তার ভরসার জায়গা। সেটা ভেঙে পড়ার পরেও কিন্তু কিউবা ভেঙে পড়েনি। ফিদেল কাস্ত্রো সম্প্রতি মারা যাওয়ার পর কমিউনিস্টবিরোধী সংবাদমাধ্যমও স্বীকার করেছে যে কিউবানদের একটা ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান আছে। “একনায়ক” কাস্ত্রো মারা যাওয়ার পর যখন রাউল ওবামার সঙ্গে করমর্দন করলেন, তখন এদেশ, ওদেশ, সব দেশেই অনেকে বাঁকা হেসে বলেছিলেন “এইবার ওসব সোশালিজম টিজম ভুলে পুঁজিবাদের কোলেই এসে বসতে হবে।” এখন অব্দি কিউবা কোলে এসে বসেনি বোধহয়, কারণ বসলে তার প্রচারটা এমন জমিয়ে হত যে তার আওয়াজে লাল সন্ত্রাসমুক্ত কলকাতায় বসেও দিব্যি দাঁতকপাটি লেগে যেত।
এই প্রসঙ্গে একবার ব্রিটেনের লেবার পার্টির কথাও বলে নেওয়া যাক। এখন সে পার্টির নেতা জেরেমি করবিন, যিনি দীর্ঘদিন শীর্ষ নেতৃত্বের ধারেকাছে পৌঁছতে পারেননি কারণ তিনি “ভীষণ বামপন্থী”। দুজনেই লেবার পার্টির নেতা কিন্তু টোনি ব্লেয়ারের সাথে করবিনের তফাত ততটাই যতটা রাহুল গান্ধী আর মানিক সরকারের। করবিন যেভাবে সাইকেলে চেপে নিজের এলাকায় ঘুরে বেড়ান আর পকেটের নোটবুক বার করে লোকের অভাব অভিযোগ লিখে নেন, সেটা পড়লে আমাদের এখানকার পুরনো কমিউনিস্ট নেতাদের মনে পড়তে বাধ্য। এই করবিন লেবার পার্টির নেতা হলে পার্টিটা সিপিএমের মত নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেবে — এই ছিল বেশিরভাগ পন্ডিতের পূর্বানুমান। অথচ গত ভোটে লেবারদের শক্তি বেড়েছে, ব্রেক্সিটের পরে। বিদেশনীতি নিয়ে করবিনের কথাবার্তা নেটে পড়ে দেখা যেতে পারে। প্রকাশ কারাত লিখে দেন বোধহয়।
এদিকওদিক বেশকিছু বন্ধু আছে আমার যারা কোথাও বামপন্থীদের জন্য কিছু উৎসাহব্যঞ্জক দেখলেই লিঙ্কটা আমায় পাঠিয়ে দেয়। তাদের দৌলতে ইদানীং জানতে পারছি আমেরিকাতেও নাকি ছেলেপুলেরা কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট শব্দগুলো শুনলে অতটা নাক সিঁটকোচ্ছে না। কিন্তু ওসব আমি এখন কানে তুলছি না। ছোটবেলায় পাড়া প্রতিবেশীরা “তোমার ছেলে/মেয়ে অনেক বড় হবে” বললে মায়েরা যেমন বিড়বিড় করে “বালাই ষাট” বলে আর কি।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, এই যে আমাদের মনে হচ্ছে সমাজতন্ত্র বুঝি পাঠ্যবইয়েই সেঁধিয়ে গেছে, বাইরে কোথাও নেই, সেটা কিন্তু ঘটনা নয়। ব্যবহারিক রাজনীতিতেও সমাজতান্ত্রিক নীতিগুলো লেনিনের মূর্তি যখন প্রথম ভাঙা শুরু হয় তার আড়াই দশক পরেও বহাল তবিয়তে রয়েছে। লক্ষ্য করুন, আমি আগাগোড়া সমাজতান্ত্রিক শব্দটাই ব্যবহার করছি, সমাজতন্ত্র নয়। কারণ লেনিন ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইতে বারবার বলেছেন সর্বহারার একনায়কতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে পৌঁছনোর চেষ্টা করে একটা বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র। সমাজতন্ত্রে পৌঁছলে পর কেমনভাবে চলতে হবে সেটা আমরা জানি না, মার্কসও লিখে যাননি।

“যে রাজনৈতিক রূপের আওতায় সমাজের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্ভব হইতে পারে, কল্পনাবিলাসীরা সেই রূপ ‘আবিষ্কার’ করিবার জন্য ব্যস্ত ছিল….
সমাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সমগ্র ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়া মার্কস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, রাষ্ট্র অন্তর্হিত হইতে বাধ্য, এবং তাহার অন্তর্ধানের সংক্রমণ পর্বে (রাষ্ট্র হইতে অ-রাষ্ট্র সংক্রমণ) রাষ্ট্র গ্রহণ করিবে ‘শাসকশ্রেণী রূপে সংগঠিত মজুরশ্রেণী’র রূপ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ স্তরের রাজনৈতিক রূপ আবিষ্কার করিতে মার্কস আত্মনিয়োগ করেন নাই।” (পৃ ৫৫; রাষ্ট্র ও বিপ্লব; ভি আই লেনিন; ত্রয়োদশ মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর ২০০৮; ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড)

সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনব্যবস্থাও, ভেঙে পড়বার আগে অব্দি সমাজতন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছয়নি। সত্তর বছর তার জন্যে যথেষ্ট বলেও মনে হয় না। আমাদের কবির ভাষায় “সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ।”
এখন কেউ বলতেই পারেন “কমিউনিস্টগুলো হচ্ছে এইরকম ফালতু মাল। নিজের দেশে কী হচ্ছে তার ঠিক নেই, কেবল রাশিয়া, চীন, লাতিন আমেরিকা… যত্তসব।” সমালোচনাটা উড়িয়ে দিচ্ছি না। জবাব দিচ্ছি।
প্রথমত, আমি চীনের কথা বলিনি। কারণ চীনে লাল পতাকা টাঙিয়ে রেখে যেটা চলছে সেটা কোন সংজ্ঞা অনুযায়ী কমিউনিজম হতে পারে না। ওটা সমাজতান্ত্রিক পথই নয়। চীন ঘুরে আসা জাপানি কমিউনিস্ট পার্টির এক সদস্য ২০০৪ সালেই আমাকে বলেছিল “পশ্চিমবঙ্গের কৃষক চীনের কৃষকের চেয়ে অনেক ভাল আছে।” এখন চীন সম্পর্কে যা সংবাদ আমরা পাই তাতে সেই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে কিন্তু বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদ বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের সময়ে ঐ মতবাদ গাড্ডায় পড়েনি, জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে অন্তত কমেনি ২০০৮-০৯ পর্যন্ত। বরং সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর শক্তি বাড়তে বাড়তে ২০০৪ এর লোকসভা নির্বাচনের পরে তারা নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাওবাদীদের হিসাবে আনলামই না।
মজার কথা, এদেশে মার্কসবাদীদের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করল যখন তাদের সরকার সমাজতান্ত্রিক নীতিবিরোধী নানা কাজকর্ম করতে শুরু করল, যার সবচেয়ে হাতেগরম উদাহরণ সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম। ত্রিপুরায় কখনো যাইনি, নির্দিষ্ট করে তেমন কিছু জানি না। কিন্তু ত্রিপুরা তো ভারতের বাইরে নয়, আর ভারতও বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রাচীন ভূখণ্ড নয় কেবল। ফলে আজ ভারতে বামপন্থা যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন সেটা আমার কাছে খুব অবাক করার মত নয়, সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও সন্দিহান করে তুলছে না। এমনিতেও সংসদীয় গণতন্ত্রে কোন দলের সরকার চিরকাল চলতে পারে না। কেরালায় বামপন্থী সরকার আগামীদিনে না-ই থাকতে পারে। আগেও গেছে, ফিরে এসেছে। সরকারে নেই মানে হাপুস নয়নে কাঁদা ছাড়া কিছু করার নেই, আমার নীতি আদর্শ সব বৃথা হয়ে গেল — এরকম চিন্তাভাবনা যারা করে তারা ইতিমধ্যেই পাতলা হতে শুরু করেছে। মনে হয় সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যতের পক্ষে সেটা ভালই।
সামগ্রিকভাবে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবতে গেলে অনেকেই আজকাল বলেন মার্কস-এঙ্গেলস যে শ্রমিকশ্রেণীর কথা বলেছিলেন, সেই শ্রেণী কি আর আছে? আগামীদিনে তো আরো থাকবে না, কারণ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এসে যাচ্ছে। তাহলে বিপ্লবটা করবে কে? সমাজতন্ত্র ব্যাপারটারই বা প্রয়োজন কোথায়? সবকটাই ভাববার মত প্রশ্ন।
আমার ধারণা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যা করবে তা হল বিপুল পরিমাণে কর্মঠ অথচ কর্মহীন শ্রমিকশ্রেণী তৈরি করা (যেটা অটোমেশনের ধাক্কায় ইতিমধ্যেই কিছুটা হয়েছে এবং হচ্ছে)। এবং সে শ্রমিকদের একটা বড় অংশ হবে মার্কসের দেখা শ্রমিকদের থেকে একদম আলাদা। লেখাপড়া না জানা বা কম জানা নয়, বরং আমার মত সেন্ট্রালি এসি অফিসে কাজ করা, এসি ট্যাক্সি চড়া, ছুটির দিনে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় খেয়ে অভ্যস্ত শ্রমিকশ্রেণী। এদের সাথে যোগ হবে বাড়তে থাকা গরিব মানুষ। আজ তাদের যতই ঘেন্না করি, তাদের বিক্ষোভ, তাদের মিছিলকে যতই কর্মনাশা বলে দেগে দিই, সেদিন “অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।” সেই কম্বো বিস্ফোরক হতে পারে, কারণ যে যত বেশি হারায় সে তত বেশি ক্ষিপ্ত হয়। তার ফল কী হবে সেটা নির্ভর করছে সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব প্রয়োগের দায়িত্বে যাঁরা আছেন, মানে যে রাজনীতিবিদরা, তাঁদের উপরে।
আলোচনাটা শেষ করি এরিক হবসবমের কথা বলে। গতবছর এই মার্কসবাদী ঐতিহাসিকের জন্ম শতবর্ষ গেল। ওঁর সম্পর্কে একটা লেখায় পড়ছিলাম, উনি একটা মজার paradox (স্ববিরোধ) এর কথা লিখেছিলেন। সেটা এই যে বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব পুঁজি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে দু দুবার বেঁচে গেছে। দুবারই বাঁচিয়েছে কে? মার্কসবাদ। প্রথমবার জন মেনার্ড কেইন্স গ্রেট ডিপ্রেশনের মুখে এসে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কিছু কিছু অর্থনৈতিক নীতি পুঁজিবাদী দেশগুলোকে শিখিয়ে দিলেন, জনগণের অসন্তোষ ঠান্ডা হল। দ্বিতীয়বার যুদ্ধের ময়দানে ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাঁচিয়ে দিল বড় বড় পুঁজিবাদী দেশগুলোকে।
এখন কথা হচ্ছে কমিউনিস্ট দেশগুলো তো আর নেই, এদিকে বাজার বাড়তে বাড়তে তার চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। তাই এখন কিউবার পুঁজিবাদের দরকার হোক আর না-ই হোক, পুঁজিবাদের কিউবার বাজারটা দরকার। আর ভারত, চীনকে তো দরকারই। তা লাভের বখরা নিয়ে যদি লেগে যায় যুদ্ধ, ঠেকাবে কে?
ওদিকে মেরুর বরফ গলছে, ট্রাম্প বলছে “ওসব বাজে গল্প। তেল আমি পোড়াবই।” মোদী জঙ্গল কেটে হাইওয়ে বানিয়ে দিচ্ছে যাতে আরো ব্যবসা, আরো মুনাফা হয়। যারা লাভের কড়ি গোনে তারা বলছে “চুলোয় যাক গ্রহটা। আমার লাভের কড়ি বাড়া চাই।” তা গ্রহটা সত্যিই যখন চুলোয় যাবে (স্টিফেন হকিংকে যদি নির্বোধ বলেন, তাহলে আলাদা কথা। নইলে আর শ খানেক বছরের ব্যাপার) তখন ঐ ট্রাম্পসুলভ ধনীরা নাহয় Wall-E ছবিটার মত মহাশূন্যে অত্যাধুনিক মহাকাশযানে ভেসে বেড়াবে। আমাদের সন্তানেরা এবং তাদের সন্তানেরা যাবে কোথায়? তাহলে এখন উপায়?
ভাবতে গেলেই মনে হয় না, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, উদারনৈতিক অর্থনীতি — এসবে লাগাম দরকার? আরো ভাবলে হয়ত মনে হবে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভেবে ভাবা দরকার যে সমাজতন্ত্র প্রয়োগ না করা গেলে সভ্যতার ভবিষ্যৎ কী?

অবিনয় নিবেদন

আপনি কে, আপনার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক না পেশাগত সম্পর্ক, আপনি লোকটা পাতে দেওয়ার যোগ্য না হলেও আপনার স্ত্রী/স্বামী নিপাট ভালমানুষ কিনা ওসব আর আমি দেখব না। “Forwarded as received” এর চালাকি আপনার রক্ষাকবচ হতে পারে কিনা সেটা তারপরে আপনি বুঝবেন আর পুলিস বুঝবে।

এবছর বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন, আবার মোদীজি ধুয়ো তুলেছেন সব নির্বাচন একসাথে করা ভাল। এরাজ্যে আবার সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। অতএব যেটা না করলে বিজেপি ভোটে জিততে পারে না সেটা তো করতেই হবে। শুরু হয়ে গেছে তার প্রচেষ্টা — দেশজুড়ে। সঙ্ঘ পরিবারের হিংসাত্মক আদর্শের কথা বাদ দিলেও, কর্মসংস্থানের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে যেখানে গুজরাটেই গদি টলে গেছিল, সেখানে বাকি ভারতে যে দাঙ্গা ছাড়া জেতা শক্ত সেটা নরেন্দ্র আর অমিত ভালই বোঝেন। সুতরাং পুরনো পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে।
কাসগঞ্জে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ঝামেলা পাকিয়ে, মুসলমানদের দেশদ্রোহী সাজাতে গিয়ে দুটো মানুষের প্রাণ গেল — কুছ পরোয়া নেই। যত দিন যাচ্ছে, ততই প্রকাশ পাচ্ছে কাসগঞ্জের ঘটনাটা যা বলে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছিল, ব্যাপার ঠিক তার উলটো। মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও যে সেগুলো রিপোর্ট করতে হচ্ছে তার অনেকটা কৃতিত্ব দাবী করতেই পারে সোশাল মিডিয়া। বিভিন্ন লোকের তোলা ঐ দিনের ভিডিও সেখানেই ভাইরাল হয়ে গেছে প্রথমে।
কিন্তু সামনে যেখানে এতগুলো নির্বাচন সেখানে সঙ্ঘ পরিবারের আই টি সেল বসে থাকবে কেন? উত্তরসত্যের সুবিধা হল একবার যা বলা হয়ে গেছে, সেটা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও বারবার ফরোয়ার্ড করে মিথ্যাটাকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বুকের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ঘৃণাই সেটাকে সত্য বলে মেনে নেয়। ফেসবুকে তাই গত কয়েকদিন ধরে কাসগঞ্জ নিয়ে সমানে মিথ্যাচার চলার পাশাপাশি দেখছি হোয়াটস্যাপে ছড়ানো হচ্ছে চরম অসত্য, মুসলমানবিদ্বেষী বেশকিছু বার্তা। তারমধ্যে কিছু একেবারে ভিত্তিহীন, গা ঘিনঘিন করা এবং অতিপরিচিত বোকা বোকা কথা সম্বলিত। যেমন কলকাতার বিশেষ বিশেষ এলাকায় এত অস্ত্র মজুত আছে যে যে কোনদিন ১৯৪৬ এর মত দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং শুরু হয়ে যাবে। আবার কিছু বার্তা সত্যের সঙ্গে মিথ্যে মিশিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। সেখানে বদমাইশিটা এত সূক্ষ্ম যে সাধারণ লোকের পক্ষে ধরতে পারাই শক্ত, বিশ্বাস করে ফেলা সহজ। একটা বার্তায় যেমন দেখলাম শ্রীচৈতন্যকে ইসলামের দালাল প্রমাণ করা হয়েছে।
এসব বার্তা অনেকেই পাচ্ছেন, যত দিন যাবে আরো পাবেন। সেসবের পুনরাবৃত্তি করা আমার এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য আমার যেসব বন্ধু, সহকর্মী, পরিচিত এসবে বিশ্বাস করেন এবং ফরোয়ার্ড করেন তাঁদের একাদিক্রমে জানিয়ে দেওয়া যে এরপরে আপনার থেকে ওরকম কিছু পেলে সোজা কলকাতা পুলিসে রিপোর্ট করব। আপনি কে, আপনার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক না পেশাগত সম্পর্ক, আপনি লোকটা পাতে দেওয়ার যোগ্য না হলেও আপনার স্ত্রী/স্বামী নিপাট ভালমানুষ কিনা ওসব আর আমি দেখব না। “Forwarded as received” এর চালাকি আপনার রক্ষাকবচ হতে পারে কিনা সেটা তারপরে আপনি বুঝবেন আর পুলিস বুঝবে।
এভাবে ফেসবুকে পোস্ট করলাম কারণ অনেকবার লক্ষ্য করে দেখেছি ব্যক্তিগতভাবে “আমাকে এসব পাঠাবেন না। পছন্দ করি না, একমত নই। আর পাঠালে সম্পর্ক রাখব না” বলে কোন লাভ হয় না। বোধহয় যাকে বলি সে ভাবে “এতদিনকার সম্পর্ক। ও বলছে ঠিকই, কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারে ওরকম করবে না।” কিন্তু ব্যাপারটা আমার কাছে সামান্য নয়। আর এইমুহূর্তে এই ঘৃণা ছড়ানোর ফলে এদেশে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। অতএব যা ফরোয়ার্ড করবেন তার ফল ভোগ করতে তৈরি থাকলে তবেই ফরোয়ার্ড করুন।

সঙ্গে রইল কাসগঞ্জ নিয়ে আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন

কংগ্রেস-সিপিএম জোট নিয়ে সীতারামায়ণ

“মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি

মার্কসবাদ মানে কী, সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি যা বলছেন সেটাই কিনা, প্রকাশ কারাত ঠিক না ভুল — এসব তত্ত্বকথা না হয় থাক। তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার বৈদগ্ধ্য আমার নেই, যতদূর জানি বেশিরভাগ লোকেরই আমার মতই অবস্থা। অতএব ওসব ভুলে গিয়ে একটা কান্ডজ্ঞান সংক্রান্ত প্রশ্ন করি। কান্ডজ্ঞান ব্যাপারটা সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায়শই গাণিতিক। অতএব প্রশ্নটাকে অঙ্কের প্রশ্নও বলা যায়। প্রশ্নটা এই — যে অঙ্কটা একবার ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে সেটাই আবার করতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ কিনা।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের জোট নিদারুণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আসন সংখ্যাটা যেসব সিপিএম কর্মীর মনে আছে তাঁরা নিশ্চয় মানেন একা লড়লে ৩৪ বছরের শাসন বা অপশাসন সত্ত্বেও এত খারাপ অবস্থা হত না। অর্থাৎ ইয়েচুরি, কারাত, বেঙ্গল লাইন, কেরালা লাইন যা-ই হোক না কেন হাতে কাস্তে হাতুড়ি উঠে আসা ভোটাররা মোটেই পছন্দ করেননি। সীতারামের একমাথা চুল বলেই তিনি আবার বেলতলায় যাবেন এটা কী ধরণের কান্ডজ্ঞান ভগবান কিম্বা মার্কস কেউই জানেন না বোধহয়।

আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ে বুঝলাম ভদ্রলোকের আবার পার্টির উপর অভিমান হয়েছে। “আমায় প্রো-কংগ্রেস বললে আমিও প্রো-বিজেপি বলতে পারি” জাতীয় ছেলেমানুষি কথাবার্তা বলেছেন ধেড়ে সাধারণ সম্পাদক। সে বলুন গে। উনি বুঝবেন আর ওঁর পার্টি বুঝবে। কিন্তু উনি মার্কসবাদের মানে যা বলেছেন সেটা মেনে নিলেও যে কংগ্রেসের সাথে জোট সমর্থনযোগ্য হচ্ছে না! উনি বলেছেন যে বদলাতে পারে না সে কমিউনিস্ট নয়। মেনে নেওয়া গেল। তাহলে উনি নিজে কংগ্রেসের সাথে জোটের চূড়ান্ত ব্যর্থতা দেখার পরেও বদলাচ্ছেন না কেন?

ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে তাড়ানো যে আশু কর্তব্য তা নিয়ে শুধু সিপিএম বা বামপন্থী কেন, বিরোধী রাজনৈতিক দল বা দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিকদের কারোরই দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। সীতারাম নিজেও বলেছেন মতপার্থক্য শুধু কিভাবে সেটা নিয়ে। তাহলে কেন মনে হচ্ছে যে বিরোধী ঐক্যটা নির্বাচনী জোট করেই হতে হবে? ভোটের পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তো সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায়। সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই তো নির্বাচন দিয়েই শেষ হবে না।

তেলে আর জলে মিশ খাওয়াতে গেলে যে যাকে হারাতে চাইছি তারই সুবিধা হয় সেই শিক্ষাটা ২০১৬ সালের ফল থেকে নেওয়া কি এতই শক্ত? আমরা কেউ কি ভুলে গেছি বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে মমতা কী বলে গেলেন সমানে? কংগ্রেস সমর্থকদের বললেন “দেখুন, বরাবর বলেছি কংগ্রেস সিপিএমের বি টিম। দেখলেন তো? ওরা সাঁইবাড়ির শহীদদের কেমন ভুলে গেল দেখুন।” আর সিপিএম সমর্থকদের ছুঁয়ে গেল তাঁর টিটকিরি “বাহাত্তরের সন্ত্রাস ভুলে গেলেন কমরেড?” এর ফলে যেটা হল সেটা হচ্ছে গোটা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে পাঁচ বছর কী কাজ করলেন তার কোন হিসাবই দিতে হল না। বিরোধীরা নিজেদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকলেন, সরকারকে প্রশ্নটা করবেন কখন?

আরও পড়ুন ঢেউ উঠছে…

এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়, রামধনু জোট হলে নরেন্দ্র মোদীর কাজটাও একইরকম সহজ হয়ে যাবে। অর্থনীতির বেহাল অবস্থার জন্যে জবাবদিহি করতে হবে না, সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পুঁজিবাদের জন্যে কৈফিয়ত দিতে হবে না, কর্নিসেনাদের তোল্লাই দেওয়া, মুসলমান, দলিতদের উপর অত্যাচারের প্রশ্ন উঠবেই না। তিনি শুধু কেঁদেকেটে মিটিঙে মিটিঙে সেই ফাটা রেকর্ড বাজাবেন “মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি। এর সাথে মোদীর ইশারায় সাঙ্গোপাঙ্গদের তৈরি কিছু বাইনারি তো থাকবেই, সেগুলো তো জোট হলেও হবে, না হলেও হবে। অর্থাৎ বিরোধীরা যথারীতি নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবেন। বরং মোদীর পক্ষে তুলনায় শক্ত হবে যে রাজ্যে যে শক্তিশালী সেখানে তার মোকাবিলা করা। কারণ ২০১৪ র হাওয়া আর নেই। সব প্রশ্নপত্রের একই উত্তর দিয়ে তখন ড্যাংড্যাং করে পাশ করা গেছিল, এবারে অত সোজা হবে না। অতএব আমি যদি মোদী হতাম, আমি চাইতাম শুধু কংগ্রেস-বাম নয়, যত বিরোধী দল আছে সব্বাই মিলে একটা জোট হোক। তাহলে বলতে পারব সারদা, নারদা, ভাদরা, কাস্তে হাতুড়ি সবাই এক। এরা এক হয়ে দেশের মানুষকে লুটতে চায়। এটা অ্যান্টি-ন্যাশনালদের জোট। অর্ণব গোস্বামীকে লেলিয়ে দেব, সে জিওর্জিও আরমানির স্যুট আর জিমি চুর জুতো পরে বলবে “এটা দেশের গরীব মানুষের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় ফিরতে হাত নিশপিশ করা লুটিয়েন্স এলিট আর জেএনইউ এর অ্যান্টি-ন্যাশনাল বামেদের জোট। এতদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ছিল, এবার ভোটে হয়েছে।” আহা! ভারী মজা হবে।

অনেক বাজে বকলাম। একটা মজার স্মৃতি দিয়ে শেষ করি।

জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে যখন সিপিএম পার্টিতে বিতর্ক হয় তখন সীতারাম ইয়েচুরি ছিলেন সরকারে না যাওয়ার পক্ষে। সেবারে তাঁরাই জয়যুক্ত হয়েছিলেন। তারপর আজকালে একটা ছবি বেরিয়েছিল। ছবি মানে এখন যাকে মিম (meme) বলা হয়। ছবিতে কার্ল মার্কসের মূর্তির সামনে বসে সীতারাম বোঝাচ্ছেন “মার্কসবাদ মানে হল…”। আর মার্কসের মূর্তিটা বলছে “এটা আবার কে?”