হায়দারের দেশ, আমার দেশ

যত সজোরে দেশপ্রেম ঘোষণা করছি আমরা আর অন্যের দেশপ্রেম দাবী করছি তত কি দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের?

হিন্দুশাস্ত্র বলেছে পুং নামক নরক থেকে উদ্ধার করে যে, সে-ই হল পুত্র। কিন্তু ভূস্বর্গপ্রতিম নরক থেকে উদ্ধার করা কোন্ পুত্রের পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া হিন্দুশাস্ত্রের বিধান বিধর্মীদের বেলায় খাটে কিনা সেটাও গুরুতর প্রশ্ন। খাটলেও সবার উপরে AFSPA (Armed Forces’ Special Powers Act) সত্য তাহার উপরে নাই। অতএব যখনই হায়দারের বাবা নিরুদ্দেশ হয়েছেন তখনই তো বোঝা গেছে তাঁর আদরের পুত্রটি যতবড় তালেবরই হোক না কেন, সে এসে বাবাকে উদ্ধার করতে পারবে না, তাঁর পরিণতি যা হবার তা-ই হবে। প্রত্যাশা বাবারও ছিল না। তাই তো এলাকার সুপরিচিত শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবু সন্দেহভাজন নাগরিকের আলখাল্লায় পরিচয়পত্র হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে যান হায়দারের জন্য ঈশ্বর আছেন, তিনিই থাকবেন। অর্থাৎ বোঝা গেল ‘রোজা’ সুলভ নিরুদ্দেশ লোকটিকে খুঁজে বেড়ানোর রোমাঞ্চ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে নেই।
কি করে বুঝলাম নেই? কি যে বলেন! এটা ২০১৪। খোঁজখবর না নিয়ে, দু-একজন ফিল্মপন্ডিতের লেখাপত্র না পড়ে কি আর পয়সা খরচা করে দেখতে গেছি ছবিটা?
না। হলে যে জনাকুড়ি দর্শক ছিল তারা সবাই মোটেও অতসব জেনে যায়নি। তার প্রমাণ ডঃ মীর যখন মিলিটারির মুখঢাকা খোঁচড়টির সামনে দাঁড়িয়ে, তখন সোচ্চার প্রার্থনা “চিনিস না, চিনিস না”। তবুও সকলেই বুঝলেন যে ডঃ মীর আর ফিরবেন না। কারণ অবচেতনে আমরা সকলেই জানি, উগ্রপন্থীরা ধরে নিয়ে গেলে তবু ফিরে পাওয়ার আশা আছে, পুলিশ বা মিলিটারির বিষনজরে পড়লে কেউ ফেরে না। ডঃ মীর আমাদের অচেনা হতে পারেন, ভিখারী পাসোয়ান তো অচেনা নয়।
দেশপ্রেম ব্যাপারটা ভারী গোলমেলে। আমি পশ্চিমবঙ্গবাসী, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে বেশ একটু আত্মশ্লাঘা আছে, কাশ্মিরীদের মত ভারত আমার উপরে শোষণ চালাচ্ছে এরকমও মনে হয়না চট করে। অথচ যে লোকটাকে স্পষ্ট দেখলাম ভারতবিরোধী যোদ্ধার প্রাণ বাঁচাচ্ছে তার বাড়িটা উড়ে গেল দেখে আমার বেশ রাগ হল। এমনকি লোকটাকেও মানবতাবাদী বলেই মনে হচ্ছিল। কি আপদ বলুন দেখি!
লেনিন নাকি অনেক ঝানু কমরেডের মতামত অগ্রাহ্য করে আইজেনস্টাইনের ছবির জন্য টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। যুক্তিটা ছিল এই যে ফিল্ম যা পারে তা হাজারটা বক্তৃতাও পারে না। ‘হায়দার’ দেখার পরে এটা অকাট্য যুক্তি বলেই মনে হয়। অরুন্ধতী রায় কাশ্মিরীদের উপর অন্যায় নিয়ে যতবার লেখেন ততবার দেশদ্রোহী আখ্যা পান, মহিলা বলে ধর্ষণের হুমকিও শোনেন। অথচ ঐ যে দু ঘন্টা চল্লিশ মিনিট হিন্দুরাষ্ট্র হতে চাওয়া দেশের মূল ভূখন্ডের আমরা কয়েকজন প্রথমে হিলাল মীরের জীবনভিক্ষা করলাম নিজ নিজ ঈশ্বরের কাছে, তারপর চাইলাম হায়দার তার ভারতবন্ধু কাকাকে খুন করুক, প্রতিশোধ নিক বাবার হয়ে, এ কি ফিল্ম ছাড়া কোনকিছুর দ্বারা সম্ভব হত? আবার হল থেকে বেরিয়ে দিব্য বাড়ি চলে এলাম, একবারও নিজেকে দেশদ্রোহী মনে হলনা কিন্তু। অন্য কেউও তেমন অভিযোগ করে গ্রেপ্তার টেপ্তার করেনি এ পর্যন্ত।
যখন হায়দার আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে তার সবচেয়ে ঘেন্নার মানুষটাকে জীবনযন্ত্রণা ভোগ করার জন্য ছেড়ে দিল তখন তো একটা বিরাট চড় এসে পড়ল আমার গালেও কারণ আমিও তো বিড়বিড় করছিলাম “চালা, গুলিটা চালা”। অ্যারিস্টটল তো বলেছিলেন ট্র্যাজিক নায়কের কষ্টভোগের মধ্যে দিয়ে আমারও কষ্টভোগ এবং ফলতঃ পাপস্খালন। ‘Hamlet’ দেখে তাই-ই তো হয়। কিন্তু বিশাল ভরদ্বাজ কি ঠিক তা ঘটালেন? ট্র্যাজিক নায়ক যখন তার ট্র্যাজেডির ঊর্দ্ধে উঠে নতুন পথের সন্ধান দিয়ে যায়, কী বলে তাকে? Catharsis শব্দটা কি ধরতে পারে সেইসময়ে দর্শকের অপরাধবোধকে?
বয়ঃসন্ধিকালে দেখেছিলাম সেই ছবিটা — সেখানেও একটা খোঁজ ছিল; সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে অপহৃত স্বামীকে সেই কাশ্মীরেই। কি খারাপ সেখানে কাশ্মীরের লোকগুলো। গোটা রাজ্যটায় ভালো মানুষ বলতে শুধু এক মন্দিরের পুরুত আর একটা অবলা মেয়ে। বাকি সবাই এ কে ৪৭ চালায় আর জাতীয় পতাকা পোড়ায়, এবং নামাজ পড়ে। কি মজা! কত সোজা ছবি। কিচ্ছু ভাবতে টাবতে হয় না। বেশিরভাগ লোক যেমনভাবে কাশ্মীরকে ভাবে ঠিক তেমনই দেখানো। ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৫ তে। ‘হায়দার’ আমাদের ঐ সময়েরই গল্প বলছে। মানে কাশ্মীরকে কাশ্মীরের চোখ দিয়ে দেখতে আমাদের সময় লাগল দু দশক। এ বড় ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি; এর কাছে ‘Hamlet’ শিশু। অথচ আমাদের দাবী হল কাশ্মীরিরা যেন এদেশটাকে নিজের ভাবে, গলা ছেড়ে “জয় হিন্দ” বলে। Chutzpah বটে।
হায়দার আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের ছাত্র ছিল। কবিতাও লিখত। তার হাতে কি কোনভাবে এসে পড়েছিল নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’? সে জন্যই কি সে জন্মভূমিকে প্রচলিত নামে সম্বোধন না করে পছন্দের নামে ইসলামাবাদ বলে ডাকে? আমাদের সকলেরই তো বড় আদরের বড় ব্যক্তিগত বাবা-মায়ের বিছানাটা, বাবার চেয়ারটা, বাবার প্রিয় গানটা, বাড়িটা, পাড়াটা। সেইজন্যেই দেশটা। যার সেগুলো হারিয়ে যায় সে তো ঈশ্বর আর সীতার মত দেশ খুঁজে বেড়ায় আজীবন।
যত সজোরে দেশপ্রেম ঘোষণা করছি আমরা আর অন্যের দেশপ্রেম দাবী করছি তত কি দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের? হায়দার কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করতে চেষ্টা করেছে। মহাত্মা গান্ধী নামে এক দেশদ্রোহী ট্র্যাজেডি কাটিয়ে ওঠার ওরকমই একটা পথ বাতলেছিলেন বটে দাঙ্গায় সন্তান হারানো এক হিন্দু বাবাকে — “প্রতিশোধ ভুলে যাও, একটা অনাথ মুসলিম বাচ্চাকে দত্তক নাও।” সেই যে রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ছবিটায়।
ওহো! সে তো আবার একটা ইংরেজ। ওর দেশের বিরুদ্ধেই তো আবার আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। বোঝো কান্ড! এ তো দেখছি দেশ ব্যাপারটাই বেশ গোলমেলে!

*এটা ফিল্ম রিভিউ নয়। ওটা লেখার বিদ্যে আমার নেই, এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যও ছিল না।

শিক্ষণীয়

শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল

আজকাল লিখতে ইচ্ছে করে না খুব একটা। আর কতদিন যা লিখতে ইচ্ছে করে তা লেখা যাবে তাও অনিশ্চিত। তাই দুটো কথা লিখে দিই। না লিখে আর থাকা গেল না বলেই লিখছি, নইলে কাউকে “বোর” করার ইচ্ছা নেই।

১

একজন সাংবিধানিক প্রধান (বেচারা সংবিধান) আপত্তি করেছেন ওয়েস্ট বেঙ্গলের লোকেরা কেন ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করে তাই নিয়ে। তার জবাবে সকলে বলাবলি (এবং লেখালিখি) করছেন যে এটা ভুলভাল কথা বলে খবরে থাকার চেষ্টা, উনি ফুটবল তো জানেনই না, ইতিহাসও জানেন না ইত্যাদি।
এগুলো সবই ঠিক কথা। কিন্তু কথায় বলে প্রাজ্ঞ লোকের প্রজ্ঞার চেয়ে মূর্খের মূর্খামি দেখে অনেক বেশি শেখা যায়। এখানেও কিন্তু শেখার উপাদান আছে। কী সেটা?
হিন্দুত্ববাদীদের (“রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতির কোন দল হয় না” কথাটা এখন “সদা সত্য কথা বলিবে” রকমের বাতিল প্রবাদ) চিরকালই বাংলাদেশের হিন্দুদের দুঃখে বুক ফাটে। তাদের দীর্ঘদিনের ঘোষিত দাবী হল বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরা ভারতে চলে আসে তাদের শরণার্থী হিসাবে এ দেশে আশ্রয় দিতে হবে। আর যে মুসলমানরা আসে তাদের অনুপ্রবেশকারী গণ্য করে ফেরত পাঠাতে হবে। ২০১৪ সালে সরকারে আসার পর একে কাজে পরিণত করতে তারা বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছে। আসামে এন আর সি চলছে পুরো দমে (তাতে আসলে কী ঘটছে তা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না), অন্যদিকে নতুন নাগরিকত্ব আইন হচ্ছে। সেই আইনে বলা হচ্ছে যে কোন দেশ থেকে জাতিগত হিংসার শিকার হয়ে চলে আসা হিন্দুরা (বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকলকেই সাপটে হিন্দু ধরে নেওয়া হয়েছে অবশ্য) এ দেশে নাগরিকত্বের অধিকার পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বা পূর্বতন পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের প্রতি হিন্দুত্ববাদীরা সহানুভূতিশীল। অনেকটা সেই কারণেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন ক্রমবর্ধমান। যাঁরা নিজেরা বাঙাল তাঁরা জানেন যে আত্মীয়স্বজন অনেকেই ভাবছেন “হোক বাংলায় এন আর সি। ওরা আমাদের বাপ ঠাকুর্দাদের খেদিয়ে দিয়েছিল, বিজেপি এসে ওদেরও একটু দিক।”
তা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক তো মূলত বাঙালরাই। দেশভাগ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে তৈরি ক্লাব হলেও ইস্টবেঙ্গলের হার জিতের সঙ্গে যে উদ্বাস্তু হয়ে এ পারে চলে আসা বাঙালদের হাসি চোখের জল মিশে থাকে তা বাঙালি মাত্রেই জানে। সাংবিধানিক প্রধানবাবুও বিলক্ষণ জানেন। যদি উনি মোহনবাগান সমর্থক হন, তাহলে তো আরো বেশি করে জানেন। সেক্ষেত্রে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্যে তো ওঁর বিশেষ ভালবাসা থাকার কথা ছিল। উল্টোটা হল কেন?
ব্যাপারটা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের জন্যে শিক্ষণীয়। শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল।

২

একজন লোক জোম্যাটোর মাধ্যমে খাবার কিনতে চেয়েছিল। শেষ অব্দি অর্ডার বাতিল করে কারণ খাবার দিতে যার আসার কথা ছিল সে মুসলমান। আর আমাদের ইনি বিরাট হিন্দু, মোছলমানের ছোঁয়া খান না। তা জোম্যাটো বিরাট হিন্দুটিকে বলেছে খাবারের কোন ধর্ম নেই, খাবার নিজেই একটা ধর্ম। উপরন্তু জ্যোমাটোর বাবু আবার বলেছেন আমরা এসব অন্যায় আব্দার রাখব না, তাতে যা হয় হবে। বলতেই গেল গেল রব উঠেছে, হাজার হাজার বছরের ধর্ম একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মালিকের খোঁচায় নাকি রসাতলে যাচ্ছে। অতএব ধর্ম অন্তপ্রাণ হিন্দুরা সবাই মিলে অ্যাপটি আনইনস্টল করতে লেগেছে।
এ সম্বন্ধে কিছু শুকনো কথা বলার আছে। প্রথমত, জোম্যাটো বেশ করেছে। শুধু তাই নয়, যে লোকটি অর্ডার বাতিল করেছে তার কাজটা বস্তুত অস্পৃশ্যতা। দেশে অস্পৃশ্যতাবিরোধী আইন আছে। সেই আইন অনুযায়ী লোকটিকে অভিযুক্ত করা যায় কিনা সেটা আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন, তবে নীতিগতভাবে এটা অস্পৃশ্যতাই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের অফিসের পাশেই একটা নাম করা রেস্তোরাঁ থাকায় বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের হয়ে কর্মরত ছেলেদের সাথে আমাদের অল্প স্বল্প আলাপ আছে। যে কোন পেশার লোকের যে ন্যূনতম নিরাপত্তা প্রাপ্য তা তাদের নেই। ছেলেগুলো মোটামুটি লেখাপড়া জানা এবং বাইক চালায় দেখে ভুল করবেন না। এরা আক্ষরিক অর্থেই দিন আনে দিন খায়। ফলত ক্ষিদে পেলে পিঠের বাক্স খুলে অন্যের অর্ডার দেওয়া খাবারও খায়। ওদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও খেতাম। বেশ করতাম।
সারা পৃথিবীতে মানুষের শ্রমকে বড় লোকেরা শস্তায় কিনে নিয়ে আরো বড়লোক হচ্ছে। তাই একুশ শতকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হল দালালি। নানারকমের দালালি, যেখানে বিনিয়োগ তেমন কিছু নয় কারণ আসল পুঁজিটা হল শ্রম, যা খুব শস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ভারতের জোম্যাটোর ডেলিভারি বয়রা নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজনের কর্মীরাও একদম ভাল নেই। সেই কারণেই কদিন আগে প্রাইম সেলের দিনগুলোয় তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
এসবের প্রতিবাদ করতে চান? খুব ভাল কথা। এইভাবে শ্রমিকদের শোষণ করার জন্যে অ্যামাজনকে গালাগাল দিন, জোম্যাটোকেও গালাগাল দিন। তা বলে সংখ্যাগুরু বাঁদরামির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে পাবলিসিটি স্টান্ট বলে উড়িয়ে দেবেন না। যদি এটা স্টান্ট হয় তাহলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট যা দেখানোর ঝুঁকি আজকের ভারতে বিশেষ কেউ নেবে না। আমাদের কোটিপতি ক্রিকেটারদের দেখছেন না? বিমুদ্রাকরণকে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে দিতে পারেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে, অথচ নানা অজুহাতে যখন বেছে বেছে একটাই সম্প্রদায়ের মানুষকে খুন করা হয় তখন এঁরা অন্তত পাবলিসিটির জন্যেও একটা কথা বলেন কি? রূপোলি পর্দার তারকারাও তথৈবচ। সর্বকালের সবচেয়ে বড় তারকাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন গণপিটুনি নিয়ে। তো তিনি বলেছিলেন তিনি নাকি বিষয়টা ঠিক জানেন না। অর্থাৎ এই স্টান্টটা দেখাতে অমিতাভ বচ্চনও ভয় পান।
উনপঞ্চাশজন নানা পেশার বিশিষ্ট মানুষ অবশ্য দেখিয়েছিলেন স্টান্টটা। ফল কী? পাটনা হাইকোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। বোঝা গেল কতটা বিপজ্জনক এই স্টান্ট? সেই স্টান্ট যদি নিজেদের পুরো ব্যবসার ঝুঁকি নিয়ে জোম্যাটো কর্তৃপক্ষ দেখিয়ে থাকেন তাহলে আপনার অবশ্যই হাততালি দেওয়া উচিৎ। অবশ্য আপনি যদি প্রকাশ্যে লিবারাল আর মনে মনে হিন্দুত্ববাদী হন তাহলে আলাদা কথা।

কাটমানির স্বপ্নভঙ্গ?

যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ

বয়ঃসন্ধির প্রেম একতরফা হলেও বিশুদ্ধ। অন্তত আমাদের বয়ঃসন্ধির প্রেম তেমনই ছিল। কারণ আমাদের স্মার্টফোন ছিল না, তাতে সুলভ পর্নোগ্রাফি ছিল না, সম্ভবত সে জন্যেই অ্যাসিড দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করা ছাড়া আর কিছু করা যায় আমরা ভেবে উঠতে পারতাম না। তা সেই বয়ঃসন্ধির প্রেম নিয়ে সবচেয়ে জীবন্ত, হৃদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া গানটা লিখেছিলেন নচিকেতা। সে বয়সে তাঁর নীলাঞ্জনা আর আমাদের নীলাঞ্জনারা অভিন্ন ছিল।
শুধু প্রেম নয়, বয়ঃসন্ধির সবকিছুই মানুষের বহুকাল প্রিয় থাকে। হয়ত ওখানেই শৈশবের শেষ বলে। নচিকেতার জন্যেও তাই আমাদের প্রজন্মের অনেকের মনে একটা বিশেষ জায়গা আছে বা ছিল। শিল্পমূল্যে কবীর সুমন (সেযুগের সুমন চট্টোপাধ্যায়) অনেক এগিয়ে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে, মফঃস্বলে ছড়িয়ে থাকা মানুষের মনের কথা প্রায় তাঁদের ভাষায় গানের মাধ্যমে বলার ক্ষেত্রে নচিকেতার জুড়ি ছিল না। এবং সেটা বয়সের বাধা অতিক্রম করে। নচিকেতা আমাদের যেমন নীলাঞ্জনা দিয়েছিলেন, দাদু দিদাদের বৃদ্ধাশ্রম দিয়েছিলেন; শাপভ্রষ্ট বাবা, কাকাদের অনির্বাণ দিয়েছিলেন। অস্বীকার করবে কোন মূর্খ? আমরা সলিল চৌধুরীর যুগের লোক নই। আমাদের জন্যে কেউ ঘুমভাঙার গান লেখেনি। আলোর স্পর্শে দুঃখের কাল কেটে যাবে সেই স্বপ্ন আমরা দেখিনি, কারণ পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া ছাড়া আর কোন স্বপ্ন দেখতে শেখানোই হয়নি। প্রতিবাদের ভাষা বলতে আমরা তাই “শুনব না গান, গান শুনব না” বুঝেছি। সেই ভাষা নচিকেতাই যুগিয়েছিলেন।
সেই জায়গাটা নচিকেতা ধরে রাখতে পারতেন অনায়াসেই। কিন্তু ঐ যে অনেকে বলে, আপনি হয় যৌবনেই বিদ্রোহীর মৃত্যু বরণ করতে পারেন নয় দীর্ঘজীবী প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারেন। কথাটা নচিকেতার ক্ষেত্রে এমন নিদারুণ সত্যি হয়ে উঠবে ভাবতে পারিনি।
বেশ মনে আছে, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময়ে আমাদের কোন্নগর রবীন্দ্রভবনে একবার গাইতে এসেছেন, এক প্রবীণ সিপিএম নেতাকে অনুষ্ঠান শেষে তরুণ পার্টিকর্মী উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন “যা পপুলারিটি, ভোটে দাঁড় করায় দিলে ড্যাং ড্যাং কইর‍্যা জিত্যা যাইব।” সুভাষ চক্রবর্তীর সাথে নচিকেতার ঘনিষ্ঠতা ততদিনে সুবিদিত। জানি না ইঙ্গিতটা সেদিকেই ছিল কিনা, তবে সি পি আই (এম) শেষ পর্যন্ত নচিকেতার জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্যবহার করেনি। রাজ্যে যখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করল তখন আরো অনেক ছোট বড় বিখ্যাত লোকের মতই নচিকেতাও পরিবর্তনপন্থী হয়ে উঠলেন। বামফ্রন্ট সমর্থক হিসাবে দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু সঙ্গে এও মনে হয়েছিল যে হয়ত তিনি বামফ্রন্টের দলগুলির বিচ্যুতিতে ব্যথিত, বিরক্ত একজন বামপন্থী। ভুল জায়গায় নিস্তার খুঁজছেন। ভুল তো আমি, আপনি সকলেই করি। তাছাড়া ২০০৮-০৯ থেকে মমতার প্রতি বামফ্রন্টের বাইরের বামেদের প্রকাশ্য ও গোপন সমর্থন তো ছিলই। আর তাঁর বিভিন্ন গান শুনে নকশালপন্থীদের প্রতি নচিকেতার সমর্থন বুঝে নিতেও খুব অসুবিধা হত না। তাই সান্ত্বনা ছিল।
সে সান্ত্বনা অবশ্য দ্রুত অন্তর্হিত শুরু করল যখন দেখা গেল নচিকেতার মনকাড়া গান কমে আসছে, বেড়ে যাচ্ছে রেল দপ্তরের বিভিন্ন জলসায় তাঁর অনুষ্ঠান। রেলমন্ত্রী তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তনের সরকার আসার পরে মন ছুঁয়ে যাওয়া গান কমা আর অনুষ্ঠান বাড়া আরো ত্বরান্বিত হল। যে শিল্পী একসময় আমাদের বলতেন “চল যাব তোকে নিয়ে, এই নরকের অনেক দূরে। এই মিথ্যে কথার মেকি শহরের সীমানা ছাড়িয়ে”, তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে দাঁড়াল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ। একজন শিল্পী, তিনি বাম ডান যা-ই হোন, যখন নিজের শিল্পকে অপ্রধান করে ফেলেন, যখন তাঁর রাজনীতি তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে নয়, অন্য পথে প্রকাশ খোঁজে তখন তাঁকে সন্দেহ করতেই হয়। ভাঁড়ার খালি হয়ে গেছে বলে গানের ভান করে আখের গোছাচ্ছেন — এই সন্দেহ আর অমূলক থাকে না তখন। সেই সন্দেহই ক্রমশ প্রবল হয়েছে গত কয়েক বছরে। আর এখন, যখন পশ্চিমবঙ্গে আরেক পালাবদলের কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে, তখন কাটমানি নিয়ে তাঁর গান সেই সন্দেহকে আরো বাড়িয়েই তুলল।
মানুষ ভুল করে, আবার মানুষই সেই ভুল সংশোধন করে। সে দিক থেকে মত পরিবর্তন করার অধিকার সব মানুষেরই আছে, একজন শিল্পীর তো আছে বটেই। সুতরাং নচিকেতা একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন বলেই যে সারাজীবন করে যেতে হবে একথা বলার নিশ্চয়ই মানে হয় না। শিল্পীকে চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হতেই হবে এবং শেষ অব্দি নিজের বিবেকের বাণী শুনতেই হবে। কিন্তু মুশকিল হল যে সরকারঘনিষ্ঠ শিল্পীদের বিবেক একমাত্র উল্টোদিকে শক্তিশালী (সে যে উপায়েই শক্তিশালী হোক) বিরোধী দল থাকলে তবেই জাগ্রত হয়, তাদের বিবেককে যাত্রার বিবেকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায় না।
আজ সকালের কাগজে দেখলাম নচিকেতা সাফাই দিয়েছেন, গানটা সারা দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা নেত্রীদেরই বিরুদ্ধে। এবারেও একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁকে দেখা যাবে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেছেন দিদি ডাকলে তিনি নরকেও চলে যাবেন। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কই তাঁর কাছে আসল, পার্টি কোন ব্যাপার না। কথাটা কেমন সিগারেটের প্যাকেটের বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত শোনাল না? কাল সুভাষদার সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল বলে উনি সিপিএমের ছিলেন, আজ দিদির জন্যে উনি তৃণমূলের, কাল অন্য কোন দাদার জন্যে বিজেপির হয়ে যেতেই পারেন — এমনটাই কি বলতে চাইলেন জীবনমুখী শিল্পী?

পুনশ্চ: সেদিন দেখি আমার নীলাঞ্জনা বাজার করছে। মাছ, মাংস, সবজি বিক্রেতাদের সাথে তার কথা বলার ধরণ দেখে অবাক হয়ে ভাবলাম “একে নিয়ে কবিতা লিখতাম!”

অনধিকার চর্চা

অমর্ত্য সেন যেখানে অর্থনীতি জানেন না সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে জানে এ কি বিশ্বাসযোগ্য?

২০১৭ সালের নভেম্বরে আমার ডেঙ্গু হয়েছিল। সেবার চারিদিকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। বেশকিছু মানুষ মারা যান। আমি নার্সিংহোমের যে ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলাম সেই ওয়ার্ডেই আরো দু তিনজন মশাবাহিত রোগে ভুগছিলেন। একজনকে আমার চোখের সামনেই আই সি ইউ তে নিয়ে যাওয়া হল, পরে শুনলাম মারা গেছেন। কিন্তু পরিষ্কার মনে আছে, আমার রোগ নির্ণয় করে ডাক্তারবাবু ডেঙ্গু লেখেননি, লিখেছিলেন অজানা জ্বর। ডাক্তার আমার এক ডাক্তার আত্মীয়ের বন্ধু হওয়াতে তাঁকে একান্তে জিজ্ঞেস করা গিয়েছিল মুখে ডেঙ্গু বললেও লিখলেন না কেন। উত্তর দেওয়ার সময়ে ডাক্তারবাবুর কাঁচুমাচু মুখটা আজও মনে পড়ে। ডেঙ্গু লিখলেই সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা। অগত্যা।
অর্থাৎ কী রোগ হয়েছে সেটা এম বি বি এস, এম ডি ইত্যাদি করা ডাক্তার বোঝেন না, বোঝে সরকার। একে একনায়কতন্ত্র না বললে কাকে বলে জানি না। যে কোন একনায়কতন্ত্র শেষ পর্যন্ত কী করে? নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। সোজা বাংলায় “বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো।” এখন সেই গেরোতেই আমরা পড়েছি। পশ্চিমবঙ্গের সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সেই বাম আমল থেকেই রুগ্ন, মৃতপ্রায়। এই আমলে যোগ হয়েছে নতুন উপসর্গ — অবহেলার অভিযোগে ডাক্তার পেটানো।
আসলে এমন সুন্দর ব্যবস্থা তৈরি করেছি আমরা যে আমাদেরই ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কোন প্রশ্ন করা চলে না। করলেই কেউ বলেন “মাওবাদী”, কেউ বলেন “দেশদ্রোহী”। অথচ ডাক্তারদের যথেচ্ছ প্রশ্ন করা চলে, কিচ্ছু না জেনে বিজ্ঞের মত তাঁদের সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় বলে দেগে দেওয়া চলে। এ বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, ধনী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কেউ কম যায় না। যার হাতে স্মার্টফোন আছে, সে-ই ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কেনার আগে একবার গুগল করে নিচ্ছে, তারপর নিজের বিবেচনা অনুসারে অমুক ওষুধটা খাচ্ছে আর তমুকটা খাচ্ছে না। মানে ডাক্তার পরিশ্রম করে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাশ করলেন, তারপর পাঁচ সাত বছর পড়াশোনা করে এম বি বি এস হলেন, আরো দু তিন বছর পড়ে এম ডি বা এম এস কিছু একটা হলেন, কেউ কেউ এরপর আরো পড়াশোনা করে, ট্যাঁকের পয়সা খরচা করে আরো নানা ডিগ্রি পেয়ে যে চিকিৎসা করলেন সেটা যে ফালতু তা বুঝতে একটা গুগল সার্চই যথেষ্ট। যার স্মার্টফোন নেই তার আছে পাড়ার ওষুধের দোকান অথবা সর্বজ্ঞ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব। কোন অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক খেতেই হবে, কোন অন্তঃসত্ত্বার অস্ত্রোপচার করার কোন দরকার নেই এগুলো আজকাল হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তও জানে। এবং তারা এও জানে যে তাদের হিসাব অনুযায়ী “চিকিৎসায় গাফিলতি” হলেই হাসপাতালে দলবল নিয়ে চড়াও হয়ে ভাংচুর, মারপিট করাই যায়। কেউ কিচ্ছু বলবে না। বরং আলাপ পরিচয় থাকলে স্থানীয় কাউন্সিলর, এম এল এ বা এম পি স্বয়ং দক্ষযজ্ঞে নেতৃত্ব দেবেন।
তাছাড়া যেহেতু “অ্যালোপ্যাথিতে আসলে শরীরের ক্ষতি করে”, তাই সঙ্গে হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, ইউনানি, বাবা রামদেব, আর্ট অফ লিভিং, গোমূত্র — এসব তো আছেই। খোদ কেন্দ্রীয় সরকার একখানা আয়ুশ মন্ত্রক খুলে বসেছেন। অতএব একথা জানতে কারো বাকি নেই যে লেখাপড়া করে এম বি বি এস ইত্যাদি হওয়া ডাক্তারগুলো নেহাত ফালতু। জুনিয়রগুলো তো তস্য ফালতু। অতএব দলবল নিয়ে যাও আর যত ইচ্ছে ঠ্যাঙাও।
অবশ্য এতে আশ্চর্য হওয়ার তেমন কিছু নেই। অমর্ত্য সেন যেখানে অর্থনীতি জানেন না সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে জানে এ কি বিশ্বাসযোগ্য? বললেই মানতে হবে নাকি? এরপর তো বলবে মানুষ বাঁদর থেকে এসেছে, পৃথিবী বাসযোগ্য হতে কয়েক লক্ষ বছর সময় লেগেছে।
সরকারও বুঝেছে জনগণ কী চায়। জনগণ অধিকার চায়। নানারকম সব অধিকার, যার মধ্যে স্বাস্থ্যের অধিকারটাও আছে। তারা চায় নিজের সাধ্যের মধ্যেই উপযুক্ত চিকিৎসা। কিন্তু বাপু সবাইকে সব অধিকার দিয়ে দিলে বেচার জন্যে থাকবেটা কী? চিকিৎসার মত এমন একটা জিনিস যদি সরকারী হাসপাতালে গেলেই কম পয়সায় দিব্যি পাওয়া যায় তাহলে কত লোকের পোলাও মারা যাবে বলুন দেখি? যার পয়সা আছে সে যাক না ঝাঁ চকচকে বেসরকারী হাসপাতালে। যার সামর্থ্য নেই সে সরকারী হাসপাতালে আসুক, যেখানে সারাক্ষণ নেই রাজ্যের নৈরাজ্য চলে। বেড নেই, ওষুধ নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি নেই, প্রয়োজন অনুসারে ডাক্তারও নেই। একজন ডাক্তার টানা চব্বিশ ঘন্টা, ছত্রিশ ঘন্টা ডিউটি করেন। এখানেই লোকে আসুক। পরিষেবা পাবে না, হাতের কাছে ডাক্তার, নার্সগুলোকে তো পাবে। পেটাক, মেরে ফেলুক, যা ইচ্ছে করুক। আরে বাবা অন্তত মারপিট করার অধিকারটা তো দিতে হবে, নইলে সরকার চলবে কী করে? স্বাস্থ্যের অধিকারের চেয়ে এই অধিকার দিলে অনেক শস্তা হয় সরকারের। পুজো, কার্নিভাল, এ উৎসব সে উৎসবের বাজেটে টান পড়ে না।
কী মনে হচ্ছে? খামোকা বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গাল দেওয়া হচ্ছে? আচ্ছা মনে করে দেখুন তো, ২০১৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী কলকাতার টাউন হলে একটা মিটিং হয়েছিল না? সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী হাসপাতালের মালিকদের ডেকে খুব ধমকে দিয়েছিলেন। খামোকা পেশেন্টদের থেকে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে, স্বাস্থ্য নিয়ে বিজনেস করবেন না, মানুষকে ঠকাবেন না, সরকার কড়া ব্যবস্থা নেবে ইত্যাদি। আচ্ছা কার বিরুদ্ধে কটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আজ অব্দি? তার চেয়েও বড় কথা মুখ্যমন্ত্রী সারা রাজ্যের সরকারী হাসপাতালের সুপারদের নিয়ে টাউন হলে কবে বসেছেন? কবে জানতে চেয়েছেন কী কী সমস্যা আছে, কিভাবে মেটানো যায়? অর্থাৎ এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না। মাঝেমধ্যে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত যেখানে যায় সেখানকার ব্যাপারে একটু হম্বিতম্বি করলাম — এই যথেষ্ট।
সরকারী হাসপাতালেও কি আর কিছু করব না? করব। জবরদস্ত গেট লাগাব, আলো লাগাব, নীল সাদা রঙ করব, সেগুলো মাঝেরহাট ব্রিজের মত সুরক্ষিত হবে। এর বেশি করা যাবে না। বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খদ্দেররা সরকারী হাসপাতালের দিকে চলে না যায় সেটা তো নিশ্চিত করতে হবে। হ্যাঁ, উন্মত্ত জনতা কখনো কখনো ওখানেও গিয়ে পেটাবে বটে। সে মারও তো ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরাই খাবে। সরকার আর মালিকপক্ষ মান্না দের মত গান গাইতেই পারে “তাতে তোমার কী? আর আমার কী?”
অতএব প্রিয় ডাক্তারকুল, আপনারা মানিয়ে নিন। এ দেশে ডাক্তারি করতে গেলে হয় কাফিল খান নয় পরিবহ মুখোপাধ্যায় হতেই হবে।
যাঁরা ডাক্তার নন তাঁরা খুব রাগ করছেন, তাই না? ভাবছেন “ডাক্তাররা যে কত বদমাইশি করে সেকথা তো একবারও বলল না? নার্সিংহোম আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসা ফেঁদে লাল হয়ে যাচ্ছে কত ডাক্তার তা তো বলল না? এই যে সব চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে বসে আছে, এটা কি উচিৎ কাজ? কোন অধিকার নেই অসুস্থ মানুষের সাথে এরকম করার।”
ঠিক কথা। কোন কোন ডাক্তার অত্যন্ত অসৎ। নানারকম চক্র তৈরি করে দু নম্বরী পয়সা করেন, সরকারী টাকাও মেরে দেন। ইঞ্জিনিয়াররাও করেন। ব্যবসায়ীরা করেন, রাজনীতিবিদরা করেন, সাংবাদিকদের কথা আর নিজ মুখে কী বলব? আজকাল এমনকি মাস্টাররাও করেন এসব। কিন্তু বাংলা অভিধানে প্রসঙ্গ বলে একটা শব্দ আছে। ইংরিজিতে যাকে বলে context। এন আর এসের ঘটনার প্রসঙ্গে অসাধু ডাক্তারদের কথা আসে না। অবশ্য আজকাল আর প্রসঙ্গ টসঙ্গ কে মানে? ভারতের বেহাল অর্থনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তো উত্তর আসে “পাকিস্তান কো ঘর মে ঘুসকে মারা।”
রইল ডাক্তারদের অধিকারের কথা। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার তাঁদের অবশ্যই আছে। গোটা দেশে এই মুহূর্তে একটা অধিকারই স্বীকৃত — উন্মত্ত জনতার যা ইচ্ছে করার অধিকার। সকলকেই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ওটাই একমাত্র অধিকার নয়। বস্তুত ওটা আদৌ কোন অধিকার নয়, ওটা বরং অন্যের অধিকার হরণ।
আর আমাদের অসুবিধা? দুঃখজনক। কিন্তু হাসপাতালে লুম্পেনতন্ত্র চালু হতে দিয়ে ডাক্তার আর রোগীকে যুযুধান দুই পক্ষে স্থাপন করেছেন যিনি, এই বিবাদ মেটানোর দায়িত্ব তো তাঁর উপরেই বর্তায়। তিনি তো মূর্তি আর পাঁচতারা হোটেল উদ্বোধনে ব্যস্ত।

বাধাই হো

ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে

পাশ্চিমবাঙ্গালের জানাগাণকে আনেক আনেক বাধাই। উয়ো তেইস তারিখ সে ভাবছি বাধাই দেবো, কিন্তু একটু দেরী হোয়ে গেলো। আমাকে শামা কারিয়ে দেবেন। এখোন তো আপনাদের সোনার সোমোয়, দোনো হাথ মে লাড্ডু। এখোন আপনারা এইটুকু গালতি মাফ কারিয়ে দিতে পারবেন।
আপনাদের ভালোবাষায় আমাদের ভোটবাক্সা একদম ভরে গেছে। আমরা আপনাদের এই ভালোবাষার বদলা বিলকুল সুদসামেত চুকতা কারিয়ে দেব। আপনাদের ছেলেমেয়েরা আনেক দিন ধরে এন্টি ডেভেলাপমেন্ট ভাষা সিখে বিলকুল বাকোয়াস তৈরি হোচ্ছে। আভি ওদের সব্বাইকে আমরা ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে।
হাঁ, ইয়ে সাচ বাত আছে কি দেশ মে বেকারি বহুত বেড়ে গেছে। পিছলে পঁয়তাল্লিশ সাল মে ইতনি বেকারি ছিলো না। লেকিন ওটা নিয়ে আপনারা একদম ভাববেন না। সব জায়গায় কিছু এন্টি নেসনাল আদমি থাকে, বেঙ্গালে থোড়া জিয়াদা আছে। ওরাই ইয়ে সব নিয়ে কথা বলছে। আপনারা ওদেরকে এই ভোটে যা থাপ্পাড় দিয়েছেন তার রিওয়ার্ড তো পাবেনই। জালদি আমরা বেঙ্গাল থেকে এন্টি নেসনালদের আউট কারিয়ে দেব। সাব উয়িদেশ থেকে ঘুসপেটি হয়ে ঢুকে আছে আর ওদেরই জন্যে আপনাদের নকরি হচ্ছে না।
বাই দা ওয়ে, আপনারা সাউথ ইন্ডিয়ার এন্টি নেসনালদের কোথায় একদম ভুলবেন না। ওরা ডেভেলাপমেন্ট চায় না। ইসি লিয়ে ওদের নেসনাল লেঙ্গুয়েজ নিয়ে বহুত প্রবলেম আছে। ওরা একদম বেকওয়ার্ড স্টেটস আছে। আপনাদের বেঙ্গালের যে একটা এন্টি নেসনাল ইকনমিস্ট আছে কি সেন? ওনার তৈরি কি সব আনাপ শানাপ ইনডেক্সে ওরা উপর দিকে আছে, লেকিন ভেদিক ইকনমিক্সে ওরা একদম ফেল আছে। রামায়ণ, মাহাভারাত কিচ্ছু ওরা মানে না। রাভাণ, মাহিষাসুরের মত ভিলেনদের ওরা পুজা করে। ওদেরকে ফালো করবেন তো কিচ্ছু ডেভেলাপমেন্ট হোবে না।
পার আমাদের বেঙ্গালিদের উপর ভিশোয়াস আছে। বেঙ্গালিরা সুইসাইড কোরবে না, তাদের মোদ্দে আনেক ইনটেলিজেন্ট মাইন্ডস আছে। আমাদের গালতি ভি সোশাল মিডিয়ায় ওরা এমোন ডিফেন্ড করে দেয় যে আমরা ভাবি “আরে ইয়ে তো গালতি থা হি নহি।“
উপার সে ইতনে সাল বাদ আমরা আপনাদের পার্টিশানের বদলা নেয়ার চান্স দিচ্ছি। আপনারা ছেড়ে দিবেন? রাভিন্দ্রনাথ টেগোর বোলেন, বাঙ্কিমচান্দ্র চাট্টোপাধ্যায় বোলেন, সোকোলেই বেঙ্গালিদের সাওধান করেছেন টার্মাইটদের বিরুদ্ধে। গদ্দার কমনিস্ট আর মমতাজ বেগম আপনাদের কাছে উয়ো সব লুকিয়ে রেখেছিল। এখোন আমরা ইতিহাস নয়া তারিকে সে লিখব তো দেখতে পাবেন।
বেঙ্গালি হিস্ট্রিতে লেকিন আনেক গদ্দার ভি আছে। ওদের এলমিনেট কোরতে হোবে। রামমোহান রয় আছে, ভিদিয়াসাগর আছে। হিন্দুধার্মের এরা যা শাতি কোরেছেন সব আমাদের রিভার্স কোরতে হোবে। তারপর মাইকেল মাদসুদান আছে। ক্রিশ্চান মিশনারিদের টাকায় রামজির বহুত বেইজতি কোরেছে। উসকা ভি উইচার আমরা কোরব। আর কোন কোন বেঙ্গালি এন্টি হিন্দুস্তান কাম করেছে উয়ো দেখার কাম আমরা কানভার্টেড বুদ্ধিজীউয়ীদের দিয়েছি। ওনাদের আর্ডিনারি বুদ্ধি নহি, এক্সট্রা আর্ডিনারি বুদ্ধি। সেগুলোর ইউজ কোরে নিতে হোবে। বাদ মে ওদের জন্যে ভি ডিটেনশন কেম্প হোবে। আমরা কোন বেঙ্গালির সাথে আন্যায় হোতে দিবো না, আপনারা দেখে নিবেন।
মনে রাখবেন, যারা দুর্গা মায়ের পূজা কোরে, রাষ্ট্রভাষা বোলে, তাদের কোন ভয় নাই। ভয় পাবে সির্ফ ভারত মাতার শত্রুরা।
ফির একবার সব বেঙ্গালিকে বহুত বহুত বাধাই।

ব্যর্থ নমস্কার

বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে

প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিষয়ে একটা লাইনও লিখব না। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। বাস্তবিক যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা দেখে বমি পাচ্ছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভেবে দেখলাম ইতরামির স্বর্ণযুগে প্রবৃত্তির দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকা অপরাধমূলক কাজ। যারা ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলেছিলেন, দুর্দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কবীন্দ্র স্বয়ং তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি কোন হরিদাস পাল? তাই সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বমি করার মত করেই উগরে দিই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি কেন ভাঙা হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অত বিশালকায় বাঙালি আর কে-ই বা আছেন? ওঁকে না ভাঙলে বাংলাকে কী করে ভাঙা যাবে? আমার নিজের অন্তত কারা ভেঙেছে তা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই, যতক্ষণ না তদন্ত অন্যরকম প্রমাণ করছে। কিন্তু বলার কথা এই যে বাঙালির ভণ্ডামি যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরই হাত শক্ত করছে।
যত লোক ফেসবুকে বিদ্যাসাগরকে ডিপি বানিয়েছে তার অর্ধেকও যদি ফেসবুকে বাংলায় পোস্ট করার অভ্যাস রাখত, হোয়াটস্যাপে বাংলায় চ্যাট করত তাহলে বাংলার রাজধানীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার সাহস কারো হত না। কলকাতা জুড়ে কয়েকশো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। সেই স্কুলে পাঠরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যদি অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেও বাংলা পড়ত, তাহলে আমাদের বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গদগদ হওয়ার একটা মানে থাকত। কিন্তু তারা পড়ে হিন্দি। বাবা-মায়েরা গর্ব করেন “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।“ এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে বলে লোকে কেঁদে ভাসাচ্ছে।
রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে ধুঁকছে, ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, স্বয়ং বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁদের কথা কম, কাজ বেশি তাঁরা আপাতত বাঁচিয়েছেন। আমরা কেউ সেসব নিয়ে ভাবি? বিদ্যাসাগর অবিভক্ত বাংলায় ঘুরে ঘুরে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কেন? যাতে শিক্ষার আলো সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, সবচেয়ে গরীব মানুষটার ঘরেও পৌঁছায়। এবং সেটা সম্ভব একমাত্র জোরালো সরকারপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকলে তবেই। অথচ আমাদের এখানে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে আমাদের কারোর মাথা ব্যথা আছে? বেসরকারী স্কুলগুলোর বেশি ফি এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রী একদিন মালিকদের ডেকে ধমকালেই তো আমরা খুশি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা গোল্লায় যাক, যতক্ষণ হাতে কলমে মূর্তি না ভাঙা হচ্ছে ততক্ষণ সব ঠিক আছে। মাস দুয়েক আগে কলকাতা শহরের বুকে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রোদ বৃষ্টি মাথায় করে না খেয়ে রাস্তায় বসেছিলেন। একদিন দুদিন নয়, আঠাশ দিন। কজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর কটা ফেসবুক পোস্ট দেখেছি পরিষ্কার মনে আছে। শিক্ষকের দুঃখে যার প্রাণ কাঁদে না সে কিরকম বিদ্যাসাগরপ্রেমী?
আরো মোটা দাগে বলব? বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করিনি, আমাদের অগ্রগামী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকরাও করেননি। গোটা শহর ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি সম্বলিত হোর্ডিংয়ে, যার মধ্যে বিদ্যাসাগরও আছেন। সঙ্গের ছবিটি কিন্তু সেই মনীষীদের নয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর। আরেক ধরণের হোর্ডিংয়ে বাংলার মনীষীদের সঙ্গে এক সারিতে বসানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই হোর্ডিংও আলো (বা অন্ধকার) করে রেখেছে শহরের আকাশ। কারো মনে হয়নি ব্যাপারটা অন্যায়, অশ্লীল? বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত? আমরা কি অপেক্ষা করছিলাম কবে বিদাসাগরের মুন্ডুটা আছড়ে মাটিতে ফেলা হবে তার জন্যে?
আর একটা কথা বলার আছে। বাংলার সংস্কৃতি আক্রান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু চট করে ব্যাপারটা যেরকম বাঙালি বনাম অবাঙালি করে ফেলা হয়েছে তা শুধু সঙ্কটটাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। লড়াইটা আসলে ভাল বনাম মন্দের, বাঙালি বনাম অবাঙালির নয়। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী হতে কেউ জোর করেনি।
অফিসে কাজ করতে করতে ক্ষিদে পেলে সুইগি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনাই। গত এক দেড় মাসে দুবার দুজন ডেলিভারি বয় খাবার নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে হিন্দিতে কথা বলেছে। একজনের পদবী হালদার, অন্যজনের সাহা। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম “ভাই, আপনি বাঙালি তো?” সদর্থক উত্তর পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও কেন হিন্দিতে কথা বললেন। দুজনেই জানালেন আজকাল বাঙালি খদ্দেররা নাকি বাংলায় কথা বললে বুঝতেই পারেন না। এ জিনিস বাঙালিকে বড়বাজারের গদির কোন মারোয়াড়ি শেখাননি, ভবানীপুরের পাঞ্জাবীরাও শেখাননি। ঠিক যেমন বাঙালি মেয়ের বিয়েতে সঙ্গীত করতে হবে এমনটা কোন অবাঙালি মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাবী করেননি, বাঙালি বর বৌভাতে শেরওয়ানি না পরলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম কেটে দেওয়া হবে, এমনটাও কোন অবাঙালি রাজনীতিবিদ হুমকি দেননি। হিন্দিকে বাংলার মাথায় চাপিয়েছে বাঙালি নিজেই। যে কারণে শহুরে, লেখাপড়া জানা বাঙালির বিদ্যাসাগরের জন্যে এই হঠাৎ আবেগকে মড়াকান্নার বেশি কিছু বলা শক্ত।
বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত করা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলার অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যেখানে সেখানে রাজনৈতিক হোর্ডিং লেখা শুরু হয়েছে উর্দুতে। প্রবল আঘাত করা হয়েছে তখন যখন হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিরাট আঘাত নেমে এসেছে তখন যখন কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, নিদেনপক্ষে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেনের বদলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন নেত্রীর ঢাউস প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে। পঞ্চধাতুর বা দুশো ফুটের বিদ্যাসাগর মূর্তি বানিয়ে এই ক্ষতি পূরণীয় নয়। এবং এ ক্ষতি অবাঙালিরা কেউ করেনি।
বিদ্যাসাগরকে রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্তর মত বাঙালিদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। তাই অনেকে যে বলছেন “বাঙালিকে সব বিভেদ ভুলে এক হতে হবে”, সেকথা একেবারে ভুল। বরং বাঙালিকে পক্ষ নিতে হবে। ঠিক করতে হবে সে বিদ্যাসাগরের পক্ষে না রাধাকান্তদের পক্ষে। কথায় এবং কাজে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আত্মীয় ছিলেন মহারাষ্ট্রের আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ, জ্যোতিরাও ফুলেরা। ঠিক তেমনি সেদিন যাঁরা বিদ্যাসাগরকে অকথা কুকথা বলেছেন, প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছেন তাঁদের উত্তরসূরী আজকের মোদী, অমিত শাহরা। অতএব হিন্দি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতিসরলীকরণ দিয়ে এ লড়াই লড়া যাবে না। ওভাবে লড়লে বড়জোর কারো নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা হতে পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে নিজেদের অপসংস্কৃতি লুকিয়ে ফেলার সুবিধা হতে পারে।
পুনশ্চ: অধুনা যে হাওয়া তাতে এই লেখাটাকে বামের রাম হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে চালানো হবে হয়ত। হলে আমি নিরুপায় কারণ আমি ছোট থেকে অঙ্কে কাঁচা। বাইনারি বুঝি না।

কিচ্ছু মিলছে না

নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে

স্কুলজীবনে পরীক্ষায় এক ধরণের প্রশ্ন আসত, “অমুকের সাথে তমুকের পাঁচটি সাদৃশ্য লেখো।” আমরা তখন পাশে রাখা ছয় ইঞ্চি স্কেলটা টেনে নিয়ে ঠিক খাতার মাঝ বরাবর উল্লম্ব ভাবে একটা দাগ টানতাম। তারপর তার ডাইনে বাঁয়ে দু পক্ষের বৈশিষ্ট্যগুলো লিখতাম। মজার কথা, যে দুটো প্রাণীর বা উদ্ভিদের বা বস্তুর সাদৃশ্য জানতে চাওয়া হত, তাদের বৈসাদৃশ্য জানতে চেয়েও প্রশ্ন আসত অনেক সময়। অর্থাৎ তাদের মিল থাকলেও তারা কিন্তু হুবহু এক নয়। কেন এমন হয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই সুবীরবাবু। বলেছিলেন “জানবে সাদৃশ্য থাকলে তবেই বৈসাদৃশ্যের প্রশ্ন আসে। মানুষের সঙ্গে মানুষের কী কী সাদৃশ্য, কী কী বৈসাদৃশ্য সেটা জিজ্ঞেস করা যায়। পাগল ছাড়া কেউ জিজ্ঞেস করে না মানুষ আর ছাগলের কী কী সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য।”
এইসব কথা আমার বেশ কয়েক বছর ধরে খুব মনে হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে। ওঁদের খুব লড়াই, আবার উনি সেদিন বললেন, নাকি মিষ্টি খাওয়াও চলে। শুনে ইনি কিন্তু বললেন না এসব মিথ্যে কথা। শুধু বললেন এরপর থেকে মাটির লাড্ডু না কিসব যেন পাঠাবেন, খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙে যাবে। স্কুলে পড়তে আমিও বন্ধুদের উপর রেগে গেলে এরকমই বলতাম। ফলে খুবই নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লাম। আমিও তো মানুষ, আমারও তো ইচ্ছে করে সেই সেকালের মত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাই ভাবলাম লিখেই ফেলি কিছু একটা। কী লিখি, কী লিখি? মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লিখি। নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে। চাকরি বাকরি চলে গেলে বাড়িতে বসে টিউশন করার সময় আমার এই লেখাটা নোট হিসাবে কাজে লেগে যাবে। তেমন জনপ্রিয় করতে পারলে ‘প্রতীকদার নোট’ হিসাবে অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা বই হয়েও বেরোতে পারে। রয়্যালটি থেকে বিলক্ষণ দু পয়সা কামাতে পারব।
আগে বৈসাদৃশ্যগুলোই দেখা যাক।
উনি পুরুষ, ইনি নারী। উনি গুজরাতি, ইনি বাঙালি। উনি বিজেপি নেতা, ইনি তৃণমূল নেত্রী। অনেকক্ষণ মাথা চুলকেও আর কিছু বার করতে পারলাম না। এই জন্যে সুবীরবাবুর হাতে আমি চিরকাল কম নম্বর পেতাম। আচ্ছা, নাহয় সাদৃশ্যগুলো লেখার চেষ্টা করে দেখি।
ওনার সরকার অমুকটা পারেনি বললেই উনি দায়ী করেন “কংগ্রেস কে সাট সাল” কে, ইনি বলেন “বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে যা সর্বনাশ করে দিয়েছে…”
তাতে থেমে গেলেন তো বেঁচে গেলেন, নাছোড়বান্দা হলে উনি বলেন “দেশদ্রোহী”, “পাকিস্তানি”, “আরবান নকশাল”। ইনি বলেন “সিপিএমের লোক”, “মাওবাদী” (নকশাল তকমার সঙ্গে আশ্চর্য মিল না?)। ইদানীং বিজেপিও বলছেন।
ওনার দলবল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর খড়গহস্ত। সেখানে চতুর্দিকে কন্ডোম ছড়িয়ে থাকে, ছেলেমেয়েরা সব মদ, গাঁজা, ড্রাগ ইত্যাদি খেয়ে পড়ে থাকে, আর ভারতকে খণ্ড খণ্ড করার চক্রান্ত চলে — এমনটাই ওঁরা বলেন।
এঁর দলের বিষনজরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও নাকি মাওবাদী গিজগিজ করছে। এবং যখন এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, তখন এঁর দলের এক পাণ্ডা প্রশ্ন তুললেন “মদ, গাঁজা বন্ধ। তাই কি এত প্রতিবাদী গন্ধ?” তিনি আবার এখন ওঁর দলের পাণ্ডা।
তা এর সমাধান হিসাবে ওঁর মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ক্যাম্পাসে ইয়া বড় জাতীয় পতাকা টাঙানোর ফতোয়া দিয়েছিলেন, উপাচার্য ক্যাম্পাসে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখার নিদান দিয়েছিলেন। আর এঁর শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলেছিলেন সরকারের পয়সায় খেতে পরতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের কথা শুনেই চলতে হবে। অতএব কিভাবে ভর্তি হবে আমি ঠিক করব, কী পড়ানো হবে আমি ঠিক করব, ইত্যাদি।
পরিতাপের বিষয় (কার পরিতাপ জানি না) দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ই পড়াশোনা, গবেষণায় পারদর্শিতা দেখিয়েই চলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অবশ্য দুজনেরই সম্পর্ক গভীর। উনি ‘সম্পূর্ণ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ, ডিগ্রি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে ওসব তথ্য দেখানো যাবে না, নিয়ম নেই। ইনি পাশ করা উকিল না কী যেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা ভুলে গেছি।
কর্মসংস্থানের সমস্যার কথা তুললে উনি বলেন “রোজগার নেই মানে? যে পকোড়া বেচে সে রোজগার করছে না?” আর ইনি বলেন তেলেভাজা শিল্পও তো শিল্প।
ওঁর উত্থানকে ওঁর ইংরিজি শিক্ষিত সুটেড বুটেড ধনীর দুলাল বুদ্ধিজীবীরা বলেন লুটিয়েন্স এলিটের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দলিত গরীবের ছেলের উত্থান। এঁর উত্থানকে এঁর বামপন্থী ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা বলেন ধুতি পরিহিত ভদ্রলোকদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ঘরের মেয়ের উত্থান। ওঁর উত্থানের পর যে দলিতদের প্রাণ ওষ্ঠাগত সেটা চেপে যাওয়াই ভাল। আর এঁর উত্থানের পর যে সাধারণ ঘরের মেয়েরা ধর্ষিত হলেই “সাজানো ঘটনা” হয়ে যাচ্ছে, সেকথা বললেও পুলিশে ধরতে পারে।
পুলিশে ধরা বলতে মনে পড়ল, ওঁর নিন্দা করে, ওঁর পার্টির অন্য নেতাদের নিন্দা করে ফেসবুকে পোস্ট করায় কলেজ পড়ুয়া থেকে সাংবাদিক অব্দি অনেকেই দেশদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এঁর বা এঁর সরকারের নিন্দা করে লোকে অম্বিকেশ, অরুণাচল ইত্যাদি হয়েছে। মিটিঙে প্রশ্ন তুলে শিলাদিত্যও হয়েছে।
প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে উনি করণ থাপারের অনুষ্ঠান থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে উঠে গেছিলেন, ইনি দর্শকের প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে তাকে সিপিএম, মাওবাদী ইত্যাদি বলে দেগে দিয়ে সাগরিকা ঘোষের অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।
দুজনেই কিন্তু লেখক। উনি এক্সাম ওয়ারিয়র লেখেন। এঁর লেখা বই এক্সাম ওয়ারিয়রদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
ওঁর বীরেরা বলেন অমর্ত্য সেন অর্থনীতি বোঝেন না, ইরফান হাবিব ইতিহাস জানেন না। এঁর বীর বলেছেন শঙ্খ ঘোষ কোনো কবি নন।
উনি বাবা গোরক্ষনাথ, গুরু নানক আর সন্ত কবীর — যাঁরা একে অপরের জীবৎকালে জীবিতই ছিলেন না — তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বৈঠক করান। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে অধুনা পাকিস্তান থেকে বিহারে এনে স্থাপন করেন। ইনি? ১৯৪১ এ প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে গান্ধীজির ১৯৪৬ এর অনশন ভঙ্গ করান, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সতীদাহ প্রথা রদ করার আইন পাশ করান।
বোর হয়ে যাচ্ছেন, না? আচ্ছা থামা যাক তবে। দুজনেই আবার বজরংবলীর ভক্ত। তিনি গদা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে দুদল ভক্ত নিয়ে গদাপেটা করতে চলে আসবেন হয়ত।

এই কথাটি মনে রেখো

মাত্র দুজনের কথা বলব, যাঁরা মুসলমানও নন আবার হিন্দুবিরোধী বলেও চিহ্নিত নন। কতটা ধর্মাচরণ করতেন জানি না, তবে জন্মসূত্রে হিন্দুই

সোশাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট খুব শেয়ার হচ্ছে। কিছু মৃত মানুষের ছবি। বলা হচ্ছে ভোট দেওয়ার সময় আমাদের মনে রাখবেন। সেই ছবিগুলোর মধ্যে যেমন আখলাক, পহলু, জুনেদ, আফরাজুলরা আছে তেমনি গৌরী লঙ্কেশ, নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুর্গিরাও আছেন। এঁরা হয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী, নয় হিন্দুবিরোধী হিসাবে চিহ্নিত।
আমি এত জনের কথা বলব না, মাত্র দুজনের কথা বলব, যাঁরা মুসলমানও নন আবার হিন্দুবিরোধী বলেও চিহ্নিত নন। কতটা ধর্মাচরণ করতেন জানি না, তবে জন্মসূত্রে হিন্দুই।
প্রথম জনের নাম সুবোধ কুমার সিং। উত্তরপ্রদেশের দাদরির আখলাক আহমেদের হত্যার তদন্ত করে চার্জশিট দাখিলকারী এই পুলিশ অফিসার গত তেসরা ডিসেম্বর বুলন্দশহরে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাত থেকে আরো কিছু মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিফল হন এবং গণপিটুনিতে প্রাণ হারান।
দ্বিতীয় জন হেমন্ত করকরে। মহারাষ্ট্র পুলিশের সন্ত্রাসবাদদমন শাখার প্রধান ছিলেন এক সময়। মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তকারী অফিসার হিসাবে হিন্দু সন্ন্যাসিনী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করেন। কান টানলে মাথা আসার মত তার ফলে আস্ত একটি সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। সেই নেটওয়ার্কে অনেকের সঙ্গে বাঙালি গেরুয়াধারী অসীমানন্দ আর সেনাবাহিনীর লোক লেফটেন্যান্ট কর্নেল পুরোহিতও ছিলেন (গত কয়েক দিনে আপনি হোয়াটস্যাপ বা ফেসবুকে যা-ই পড়ে থাকুন না কেন, ঘটনা হল সেই কেসে আজ অব্দি প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর নির্দোষ বলে ঘোষিত হয়নি। সে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আপাতত মুক্ত)। ইতিমধ্যে ২৬শে নভেম্বর ২০০৮ মুম্বাইতে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়। হেমন্ত সেই আক্রমণের মোকাবিলা করতে গিয়ে নিহত হন।
শহীদের সংজ্ঞা কী? যিনি দেশের প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান তিনি কি শহীদ? যদি তাই হয় তাহলে সুবোধ এবং হেমন্ত দুজনেই শহীদ। পুলওয়ামায় নিজেদের অজ্ঞাতে ৩৫০ কিলোগ্রাম আর ডি এক্স বিস্ফোরণে যে জওয়ানরা প্রাণ হারালেন তাঁরা যদি শহীদ হন, সজ্ঞানে নিজের জীবন বাজি রেখে কর্তব্য করতে গিয়ে নিহত এই দুই পুলিশকর্মীও শহীদ।
গত পাঁচ বছরে সরকারের সমালোচক, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মুখ খোলা নাগরিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্যে দেশের সর্বোচ্চ নেতা নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল নিউজ অ্যাঙ্কর পর্যন্ত সকলে চিৎকার করেছেন “সিয়াচেনে আমাদের জওয়ানরা লড়ছে, আর তোরা…”। অর্থাৎ জওয়ানদের, শহীদদের সম্মানার্থে মুখ বুজে সমস্ত সরকারী অপদার্থতা এবং অন্যায় মেনে নিতে হবে। তাই বলছি, এবার ভোট দিতে যাওয়ার সময় আর কিছু না হোক, অন্তত মনে রাখুন ক্ষমতাসীনরা সুবোধ আর হেমন্ত — এই দুই শহীদের প্রতি, জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরে, কিরকম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।
গত দোসরা মার্চ সুবোধের হত্যার ঘটনায় চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ, বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের পুলিশ। যে ৩৮ জনের নামে চার্জশিট দাখিল হয়েছে তাদের মধ্যে সঙ্ঘ পরিবার সগৌরবে বর্তমান। বজরং দল তো বটেই, বিজেপির যুব নেতারও নাম আছে। আর সবে গতকাল, জামিনে জেলের বাইরে থাকা মালেগাঁও বিস্ফোরণে অভিযুক্ত প্রজ্ঞা বলেছেন হেমন্ত তাঁর অভিশাপেই নিহত হয়েছেন।
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, এই সেদিন আমরা অ্যান্টি ন্যাশনাল তকমা পেলাম জাতীয়তাবাদীদের থেকে। কারণ আমরা প্রশ্ন তুলছিলাম শহীদদের শহীদ হতে হল কেন। আর আজ নিজের কাজ করতে গিয়ে শহীদ হওয়া পুলিশ অফিসারকে অবলীলায় “রাবণ” বলতে পারল সাংসদ পদপ্রার্থী, বলতে পারল “আমার অভিশাপেই লোকটা মরেছে।” শুধু বলল নয়, বলে সমর্থনও পেয়ে গেল। তাকে কোন অ্যাঙ্কর দেশদ্রোহী বললেন না, দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী দল বলল “ওটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত।” প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বললেন না যে এ একজন শহীদকে অপমান করেছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও মহিলা বিলক্ষণ সহানুভূতি কুড়িয়েছে টিভি ক্যামেরার সামনে কান্নাকাটি করে, হেমন্ত তার সাথে কত দুর্ব্যবহার করেছেন সেকথা বলে। কেউ কেউ বলছেন “পুলিশের লোকেদের কখনো বিশ্বাস করা যায় না। ওরা ভীষণ নৃশংস।” স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন একজন মহিলাকে, একজন সাধ্বীকে পুলিশ অত্যাচার করেছিল, তখন কেউ কিছু বলেনি কেন? মজার কথা সোনি সোরির যৌনাঙ্গে পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল শুনে এই মহা সংবেদনশীল ব্যক্তিরা কখনো “আহা” বলেন না। অথচ সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত মহিলাকে তদন্তকারী অফিসারের রসগোল্লা খাওয়ানো উচিৎ ছিল বলে মনে করছেন। একবার গুগল করলেই দেখতে পাবেন সারা ভারতবর্ষে তেমন সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে প্রতিনিয়ত কত মুসলমান যুবককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের দিয়ে অপরাধ স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্যে কি অকথ্য অত্যাচার করা হয়। মজার কথা, তৎসত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কোন অপরাধ না করেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারান্তরালে কাটিয়ে ভাঙাচোরা মানুষগুলো বেকসুর খালাস পায়। সেখানে এই মহিলার বাইকখানা যে সরাসরি বিস্ফোরণে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেকথা আজ অব্দি অপ্রমাণিত হয়নি। হেমন্তের প্রভাবমুক্ত এন আই এ দ্বারা নবলিখিত চার্জশিটেও বলা হয়েছে বাইকটা ওঁর হলেও উনি ব্যবহার করছিলেন না দু বছর যাবৎ।
অনেকে আবার দেখছি বোম ফাটিয়ে মানুষ মেরেছে বেশ করেছে, দেশ ভাগের সময়ে যে মুসলমানরা মানুষ মেরেছিল তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। এটা ওদের মতাদর্শ। ওরা নিজেদের জায়গায় ঠিক। এইসব কথাবার্তা বলছেন। চমৎকার যুক্তি সন্দেহ নেই। এই যুক্তি অনুযায়ী আই এস, আল কায়দা, জৈশ ই মহম্মদ, হাফিজ সঈদের জামাত উদ দাওয়া — সকলেই নিজেদের জায়গায় ঠিক। দুনিয়া জুড়ে ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়া উচিৎ, কাফেরদের হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি করা উচিৎ — এগুলো তাদের মতাদর্শ।
মানতে রাজি তো? ভেবে দেখুন। মনে রাখুন। মানুষ যখন বধির হয়ে যায়, জীবিতদের কণ্ঠ শুনতে পায় না, তখন মৃতদের কণ্ঠের উপরেই নির্ভর করতে হয়। কারণ মৃত মানুষ মিথ্যে বলে না।

বিঃ দ্রঃ খারাপ কথা বলে দিয়ে পরে দুঃখপ্রকাশ করার কৌশলটা বহু ব্যবহারে জীর্ণ। যাঁরা ঠিক ঐ কথাটাই শুনতে চেয়েছিলেন তাঁরাও বোঝেন বক্তা আসলে মোটেই দুঃখিত নন। অতএব যাঁরা মনে করেন বলা উচিৎ হয়নি, তাঁদেরই বা দুঃখপ্রকাশকে পাত্তা দেওয়ার কী আছে?

মেধামেধ যজ্ঞ

মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে

আজ কলকাতায় মহোৎসব ছিল। এ বছরের আই পি এল এর প্রথম খেলা। রাজভবনের উল্টোদিকে বাস থেকে নেমে যখন বাঁয়ে ঘুরে হাঁটছি, তখন উলটোদিক থেকে জনস্রোত ধেয়ে আসছে। নানারকম মুখ। রংচঙে, ঝকঝকে, হাত ধরাধরি করে প্রেমিক প্রেমিকা, বাবার হাত ধরে ছেলে, নাইট রাইডার্সের জার্সি পরিহিত বন্ধুদল। সকলেরই মুখ দেখে বোঝা যায় ফুরফুরে মেজাজ, ভর্তি পেট। কারো কারো হাতে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। এঁদের সকলের কাছে মহোৎসবের আহ্বান এসেছে। কিছু কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে। স্বর্গের বাগানের টিকিট কেটেছেন এঁরা কড়কড়ে নোট খরচ করে। কেনই বা মেজাজ ফুরফুরে থাকবে না?

এঁদের পেরিয়ে ধর্মতলার বাস ডিপোর মধ্যে দিয়ে হাঁটছি, নাকে আসছে ফুটপাথে রাঁধা বিরিয়ানি, ডিমের কারি, মাছের ঝোল, শস্তার চাউমিন, মোগলাই পরোটা, এগ রোল, পেয়ারা, শসার গন্ধ। ধর্মতলার এই আনন্দযজ্ঞে দিনমজুর থেকে শুরু করে আমার মত এ সি ট্যাক্সি চাপতে সক্ষম মানুষ পর্যন্ত সবার নিমন্ত্রণ।

আর এইসব রূপ রস গন্ধের অনতিদূরেই বসে আছেন, বা মাথা ঘুরছে, গা বমি ভাব আসছে বলে শুয়ে আছেন — আমার মেয়ের হবু মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। একদিন দুদিন নয়, পঁচিশ দিন ধরে কিছু না খেয়ে। এমনও হতে পারে যে আগামী দিনে হয়ত এটাই নিয়ম হয়ে যাবে। এক বৃদ্ধকে দেখলাম একটি অসুস্থ মেয়ের পাশে বসে আছেন। সম্ভবত মেয়েটির বাবা। বলা যায় না, হয়ত আমার মেয়েকেও এরকম অনশনে বসতে হবে লেখাপড়া শিখে আর আমি তখন ঐ বৃদ্ধের জায়গায় গিয়ে বসব।

এই লড়াকু ছেলেমেয়েগুলোর প্রতি আমার অক্ষম, নীরব সমর্থন জানাতে কয়েক মিনিটের জন্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম পথপার্শ্বে, যেখানে এরা ত্রিপলের নীচে রাস্তায় বসে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাচ্ছে। বিশ্বাস করুন, জায়গাটায় কোন গ্ল্যামার নেই, কোন বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ নেই। কয়েকশো পরীক্ষায় পাশ তরুণ তরুণীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া বিশেষ কোন শব্দও নেই। সোশাল মিডিয়ায় অনেকেই ঠারেঠোরে যা বলতে চাইছেন বা সরকারপক্ষ হয়ত যে আশঙ্কায় এই আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করছেন, তেমন কোন রাজনৈতিক আগুনও জায়গাটায় জ্বলছে না। মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে।

আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, মামারা, জ্যাঠারাও এই পেশায় ছিলেন, স্ত্রীও শিক্ষিকা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি যাঁদের জন্যে, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক। শুনেছি একসময় শিক্ষকদের সংসার চালানো দুর্বিষহ ছিল, লোকে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইত না শিক্ষক পাত্রের সাথে। কিন্তু তখনো শিক্ষকদের এমন অসম্মান করেনি বোধহয় কোন সরকার। বিধানচন্দ্রের সরকার আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর গুলি চালিয়েছিল, সেকথা বাদ দিলে।

বেশ মনে আছে, বামফ্রন্ট আমলে একসময় স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠত প্রায়ই। ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রার্থীদের অসন্তোষ থাকত। যোগ্য প্রার্থী ভাল ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়েও চাকরি পেতেন না। আমারই এক পরিচিত বহুদূর থেকে এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে স্টেশন থেকে স্কুলে যাওয়ার রিকশায় উঠেই চালকের মুখ থেকে শুনেছিলেন “আপনার চাকরি হবে না। সেক্রেটারির লোক আছে। তাকেই নেবে।”
সম্ভবত কতকটা সেই কারণেই কলেজের জন্যে যেমন নেট বা স্লেট পরীক্ষা, সেই আদলে এস এস সি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল। তার সুফল আমাদের প্রজন্মের বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে পেয়েছেন। আমাদের বাবা-মায়েরা জানতেন, পশ্চিমবঙ্গে আর কোন চাকরি না হোক, এস এস সি টা পাশ করতে পারলে স্কুলের চাকরি হবেই। কিন্তু তা বললে তো চলবে না। আগের সরকারের কোন ভাল কাজকেও যে পরের সরকার রেয়াত করবে, এমন দাবী এ দেশে আর করা চলে না। পরিবর্তন আর উন্নয়নের জোয়ারে পুরাতন যাক ভেসে যাক। অতএব যে পরীক্ষা প্রতি বছর হওয়ার কথা, সে পরীক্ষা প্রায় প্রতি বিশ্বকাপে হচ্ছে। সে পরীক্ষার ফলাফলে আবার এত বেশি মেধাবী ছেলেমেয়ের নাম উঠে আসছে যে মেধা তালিকা প্রকাশ করাই যাচ্ছে না। তবু এই শ দুয়েক ছেলেমেয়ে চৈত্রের গরমে রাস্তায় বসে আছে সরকারের শুভবুদ্ধি উদয়ের আশায়। অহো, কি দুঃসহ স্পর্ধা!

কয়েকদিন আগেই ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ ছবিটা দেখছিলাম। নাজি অধিকৃত পোল্যান্ডের ক্রাকাউতে বন্দী শিবিরে দরকারী আর অদরকারী লোকেদের তালিকা বানানো হচ্ছে। একজন করে বন্দী এসে দাঁড়াচ্ছে আর নাজি কেরানি তার পেশা জিজ্ঞেস করছে। দরকারী বুঝলে পরিচয়পত্রে একরকম ছাপ, অদরকারী বুঝলে অন্যরকম। একজন বললেন “আমি ইতিহাস আর সাহিত্য পড়াই।” পত্রপাঠ অপ্রয়োজনীয় হওয়ার ছাপ পড়ে গেল। অসহায় শিক্ষক বিস্ফারিত নেত্রে বললেন “I teach history and literature. Since when it’s not essential?”

দেখে শিউরে উঠলাম। সাহিত্য, ইতিহাস — এসব পড়া যে দরকারী নয় তা তো আমরা ছোট থেকে শুনে আসছি। আর এই শেষ যৌবনে এসে দেখতে পাচ্ছি ওগুলো যাঁরা পড়ান তাঁরাও অদরকারী বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। এই তো সেদিন এক প্রথিতযশা সাংবাদিক (অধুনা বিচারাধীন বন্দী হিসাবে শ্রীঘরে থাকায় যশে কিঞ্চিৎ টান পড়েছে অবশ্য) সদর্পে ফেসবুকে লিখে দিলেন তুলনামূলক সাহিত্যের মত ফালতু বিষয় তুলে দেওয়া উচিৎ। এসব পড়ে কোন লাভ নেই। লিখলেন শুধু নয়, কয়েকশো লাইকও পেলেন। আর এস এস সি পাশ করা ছেলেমেয়েদের আন্দোলন শুরু হতেই সোশাল মিডিয়ায় অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব জন্মাচ্ছে — যারা বিজ্ঞান পড়ে তারা নাকি বেশিরভাগই ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রাজ্যের বাইরে চলে যায়। পড়ে থাকে মেধাহীন বাংলা, ইংরিজি, ইতিহাসের ছেলেমেয়েরা। তাদের এস এস সি ছাড়া গতি নেই, তাই তারাই নাকি যোগ্যতা না থাকলেও চাকরি দাবী করে রাস্তা জুড়ে বসে আছে।

যারা এসব বলছে তারা বোধহয় জানে না গোটা দেশে কত হাজার ইঞ্জিনিয়ার বেকার, কত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আসন পূরণ হচ্ছে না কারণ লোকে বুঝে গেছে ওখানেও চাকরি নেই। নির্ঘাত তারা এও জানে না যে ঐ “not essential” এর তালিকায় বিজ্ঞানের শিক্ষক, গবেষকরাও ঢুকে পড়েছেন।

গত মাসের ঘটনা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারপোষিত বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ গবেষকদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, শোন বাপু, এখন টাকাকড়ি নেই। অর্ধেক মাইনে দিচ্ছি, তাই নিয়ে চুপচাপ থাকো। পরে দেবখন বাকিটা। এদিকে খবরের কাগজ খুলে দেখুন। সরকারী বিজ্ঞাপনের কমতি নেই। যত অভাব মাস্টারমশাই, দিদিমণি, গবেষকদের মাইনে দেওয়ার বেলায়। এ রাজ্যেও যেমন শিক্ষকদের ডি এ, ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বেলায় শোনা যায় কোষাগার ফাঁকা। অথচ কার্নিভালের টাকা কম পড়ে না, থানা থেকে ডেকে ডেকে দুর্গাপুজোর টাকা দেওয়ার সময়েও টানাটানি হয় না।

আসলে ঐ যে “not essential”, ঐটেই হচ্ছে আসল কথা। যারা শেখায় তাদের যত অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া যাবে তত মানুষের শেখার আগ্রহ কমে যাবে, মগজ ধোলাই না করলেও সবাই বুঝে যাবে “বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান।” তবে না হীরকের রাজা ভগবান হবে?

আর ভগবান হতে সাহায্য করি আমরা, যারা ফেসবুক ভরে আছি। আমরা ভাবছি এসব ধরনা, অনশন তো করছে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা, যারা বাংলা মাধ্যমের স্কুলে চাকরি করতে চায়। এতে আমাদের কী? আমার ছেলেমেয়েকে তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াব, সে বড় হয়ে চাকরি করলে ওরকম স্কুলেই করবে। তো আমার ভারী বয়ে গেছে। কিন্তু এত নিশ্চিন্ত না থেকে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন দেখি, আপনি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে যে স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করেছেন সেই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা কত টাকা মাইনে পান? এ ছুতো সে ছুতোয় যে বিপুল পরিমাণ টাকা স্কুল কর্তৃপক্ষ আপনার থেকে নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত, তার কত শতাংশ শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মীদের বেতনে খরচ হচ্ছে? চিত্রটা কিন্তু ভাল নয়।

আসলে শিক্ষা এখন ব্যবসায় পরিণত। কিসের ব্যবসা? কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবসা। কাদের কাঁচামাল। কর্পোরেটের। আপনার ছেলেমেয়ে অঙ্ক করে মজা পাচ্ছে কিনা, তার মধ্যে ভবিষ্যতের গণিতবিদ তৈরি হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কেউ নিচ্ছে না। কারো সন্তান স্টিফেন হকিংয়ের মত মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে জীবন ব্যয় করুক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা চাইছে না। কারণ ওরকম ছাত্রছাত্রীকে মানবসম্পদ হিসাবে কোন কোম্পানি কিনবে না। আর যে শিক্ষা লাভের কড়ি উৎপাদনে কাজে লাগে না, তা “not essential.” একই কারণে সাহিত্য তথা তুলনামূলক সাহিত্যও ফালতু। কোন শিক্ষক বা শিক্ষিকার প্রণোদনায় (অনুপ্রেরণায় নয় কিছুতেই) যদি এক ঘর ছাত্রছাত্রী শিহরিত হয়ে আবিষ্কার করে জীবনানন্দের কোন পংক্তি আজকের প্যালেস্তাইনের কোন কবির প্রায় অনুবাদ বলে মনে হচ্ছে, তাতে আম্বানি বা জ্যাক মায়ের কী লাভ? উল্টে বিপদ। কারণ “এরা যত বেশি শেখে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।”

অতএব, এক দিকে ব্যাঙের ছাতার মত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে ওঠে, যেখানকার দেয় বেতন মহার্ঘ। অন্যদিকে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন সাধারণ পড়ুয়ার নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এ রাজ্যে কম বেশি যা-ই নম্বর পাও, কলেজে ভর্তি হতে হাজার হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকতে হয়, অথচ শিক্ষকের অভাবে স্কুল চলে না, ছাত্রসংখ্যা কমে যায়, স্কুল উঠে যায়।
দেখে শুনে আমি আপনি কী করব? বাবা-মা হিসাবে যেটুকু করতে পারি। অর্থাৎ সামর্থ্য আছে বলে বেসরকারী স্কুলে সরিয়ে নেব, বহুজাতিকের জন্যে মানবসম্পদ তৈরি করব। আর যে বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই, তাঁদের ছেলেমেয়ের আর লেখাপড়া শেখা হবে না, সে মানবসম্পদ হয়ে উঠতে পারবে না। আমরা “essential”, ওরা “not essential”। বিশ্বাস করুন, এখানে মেধার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কোন ভূমিকা নেই।

সেলেব ভূত আর ঝরঝরে ভবিষ্যৎ

ভূশণ্ডীর মাঠটা ঠিক কোথায়? রাজশেখর লিখেছিলেন ওটা চাঁপদানির চটকল ছাড়িয়ে আরো দু তিন ক্রোশ। কিন্তু সে তো গত শতাব্দীর কথা। জনবিস্ফোরণ যেভাবে হয়েছে তাতে ঐ এলাকায় আর সে নির্জনতা কোথায়? এখন টলিউডটাই ভূশণ্ডীর মাঠ বলে সন্দেহ হয়

Bhobishyoter-Bhoot

“আমরা কিন্তু বাইজি নই”।

মাসখানেক আগের ঘটনা। চোখের জল সামলাতে সামলাতে কথাটা বলছেন বর্তমান সময়ের একজন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী। শুধু জনপ্রিয় নয়, সত্যিই বেশ ভাল গান করেন ভদ্রমহিলা, রবীন্দ্রনাথের গান এবং বাংলা ছায়াছবির গানে একইরকম সাবলীল, ইতিমধ্যে জাতীয় পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। এরকম একজন শিল্পী এ রাজ্যের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যশালী শহরের পৌরসভার অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন যে ফেরার পথে ফেসবুক লাইভ করে তিনি তাঁর বিপদের কথা ভক্তদের জানান। সেদিন পৌরসভারই কেষ্টবিষ্টু বলে যাদের মনে করা হয়েছিল, তাদের দাবী ছিল যেহেতু শিল্পীকে পয়সা দেওয়া হয়েছে গাইতে সেহেতু যতক্ষণ তাঁরা না বলছেন ততক্ষণ তিনি মঞ্চ ত্যাগ করতে পারবেন না। সেই ভিডিও দেখতে দেখতে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল এটা কি পশ্চিমবঙ্গ? নাকি যে রাজ্যগুলোকে সংস্কৃতিহীন বলে আমরা বরাবর হেয় করে এসেছি, যেখানে মঞ্চে নাচতে নাচতে কোন পয়সাওয়ালা দর্শকের উল্লসিত গুলিবর্ষণে মৃত্যু হয় মহিলাদের, তেমন কোন রাজ্য? আমাদের রাজ্যে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা শিল্পী এত অপদস্থ হবেন আর আমরা নিজেদের সংস্কৃতিমান বলে দাবী করব? এটা যে প্রথম ঘটনা তাও নয়। কিছুদিন আগে আরেক মহিলা শিল্পীও কতকটা একইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন।

কিন্তু বীভৎসতা এটুকুই নয়। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়, এবং যদিও সেই শিল্পী সেখানে বলেছিলেন তিনি এই ব্যাপারটা ছেড়ে দেবেন না, যতদূর যাওয়া যায় ততদূর যাবেন, একদিন পরেই কিন্তু তিনি সংবাদমাধ্যমে তাঁর অভিযোগের অনেকটাই প্রত্যাহার করেন এবং বলেন উত্তেজনার বশে অনেক কথা বলে ফেলেছিলেন, লোকগুলোকে চিনতে তাঁর ভুল হয়ে থাকতে পারে, ইত্যাদি। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আসলে তাঁকে চাপ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হল। কারা চাপ দিল? নিঃসন্দেহে সেই অদৃশ্য শক্তিই, যারা অনীক দত্তর ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটাকে রাজ্যের রাজধানীর কোথাও এক দিনের বেশি চলতে দেয়নি।

“বিজেপি এসে যাবে” বলেই ভয় দেখান আর “অমুক আমলেও হয়েছিল, তমুক সময়েও হয়েছিল” বলে গুরুকে লঘু করার চেষ্টাই করুন, আমরা সবাই মনে মনে জানি এ রাজ্যে আমরা এক নিঃশব্দ সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করছি কয়েক বছর যাবৎ। এই সন্ত্রাসের চেহারা সবসময় দৃশ্যমান নয়, যাকে একেবারে দাঁত নখ বের করে তাড়া করে শুধু সে-ই স্পষ্ট দেখতে পায়। যেমন অম্বিকেশ মহাপাত্র পেয়েছিলেন বা শিলাদিত্য পেয়েছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে এই যে আড়াল থেকে ভয় দেখানো — একেই বলে আধা ফ্যাসিবাদ। পুরো ফ্যাসিবাদের সাথে এর তফাতটা ভবিষ্যতের ভূতের প্রতি যা করা হচ্ছে তার সাথে পদ্মাবতের প্রতি যা করা হয়েছিল তার তফাত। ব্যাপারটা সুন্দর বুঝিয়েছেন নট নাট্যকার কৌশিক সেন। বক্তৃতাটা এই শুনুন। সংক্ষেপে ব্যাপারটা এই যে যারা পদ্মাবত চলতে দেব না বলছিল তারা বুক ফুলিয়ে মারদাঙ্গা করে বলছিল। কেন চলতে দেবে না তাও পরিষ্কার বলছিল। আর যারা ভবিষ্যতের ভূতের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে তারা সেটা করছে শুধু ক্ষমতার ব্যবহার করেই, কোন কারণ না দর্শিয়েই। পর্দার পেছন থেকে। এই সন্ত্রাসের বলি কিন্তু আসলে আমরা সবাই। এই যে আমি এই লেখায় এখন পর্যন্ত সমানে নামোল্লেখ না করার চেষ্টা করে চলেছি সে তো সন্ত্রস্ত হয়েই। আমি, আপনি সকলেই জানি — শাসক দলের বা সে দলের মুখ্য ব্যক্তিটির নাম করতে নেই। তাদের হাতে পুলিশ আছে, পুলিশের চেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্রও আছে।

এখন কথা হচ্ছে, হঠাৎ এতদিন পরে এসব কথা বলছি কেন? বলছি এইজন্যে যে রাজ্যের একটি দলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হয়েছে। এবং হতেই প্রশংসায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। যে নেত্রী ধর্ষণকে সাজানো ঘটনা বলেছিলেন, তিনি ৪১ শতাংশ মহিলা প্রার্থী ঘোষণা করে সহসা নারীবাদী তকমা পেয়ে গেছেন। সিমঁ দ্য বভোয়া বুঝি কবরে পাশ ফিরে শুলেন। বা হয়ত ভূশণ্ডীর মাঠে সুজেট জর্ডানের ভূতের সাথে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।

ভূশণ্ডীর মাঠটা ঠিক কোথায়? রাজশেখর লিখেছিলেন ওটা চাঁপদানির চটকল ছাড়িয়ে আরো দু তিন ক্রোশ। কিন্তু সে তো গত শতাব্দীর কথা। জনবিস্ফোরণ যেভাবে হয়েছে তাতে ঐ এলাকায় আর সে নির্জনতা কোথায়? এখন টলিউডটাই ভূশণ্ডীর মাঠ বলে সন্দেহ হয়। কারণ রাজ্যের অন্য অনেক শিল্পের মত বাংলা ছবিও তো এখন রুগ্ন শিল্প। টালিগঞ্জ পাড়ায় স্বাস্থ্যের এত অভাব যে কলাকুশলীরা দীর্ঘদিন টাকাপয়সা না পেয়ে কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন কিছুদিন আগে। তাঁদের হয়ে আসরে নামতে হয় অশীতিপর প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা এবং মহানায়কের আসনের দাবীদার নায়ককে। যে প্রযোজক একচেটিয়া ব্যবসা খুলে বসেছিলেন তিনি আবার অধুনা বিচারাধীন বন্দি হিসাবে শ্রীঘরে। ফলে এখন ও পাড়ায় বাতি ধরবে কে? বোধহয় সমাপতন নয় যে গত এক দশকের সবচেয়ে বাজারসফল বাংলা ছবিদুটোর নাম ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ আর ‘বেলাশেষে’। ফলত “বেলা যে পড়ে এল জলকে চল” বলতে বলতে কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকা বাংলা ছবির নায়ক দেব গতবার রাজনীতির সাগরে সাঁতরাতে নেমেছিলেন। এবারে দুই নায়িকাও নেমে পড়লেন।

এঁদের প্রার্থী করার পেছনে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় থাক আর না-ই থাক, প্রার্থী হওয়ার পেছনে এঁদের পেশাগত বুদ্ধির পরিচয় বিলক্ষণ আছে। খবরের কাগজের রংচঙে ক্রোড়পত্র আপনাকে যা-ই বলুক, আসলে বাংলা ছবি কোথাও চলে না। চললে পত্রিকার বিজ্ঞাপনে যে নায়ককে সত্যজিৎ রায়ের সাথে এক ফ্রেমে ধরে ফেলা হয়েছে ফোটোশপের বদান্যতায়, তিনি সব ছেড়ে এম পি হতে চাইতেন না। বছর তিনেক আগে এক টিভি বিতর্কে অভিনেতা চিরঞ্জিতকে বলতে শুনেছিলাম, ‘হারানো সুর’ ছবির জন্য সুচিত্রা সেন যে পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন, তা মুদ্রাস্ফীতির হার দিয়ে বিচার করলে আজ নাকি দু কোটি টাকা হয়। অথচ টালিগঞ্জের আজকের সবচেয়ে দামী অভিনেত্রীও (উনি তখন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের কথা বলেছিলেন) ঐ পারিশ্রমিকের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। অনেক ছবির বাজেটও অত হয় না। সুতরাং দেবই বলুন, মিমিই বলুন আর নুসরতই বলুন, তাঁদের রোজগারপাতি যা হয় তার অনেকটাই আসে আসলে গ্রামেগঞ্জে মঞ্চে হাত নেড়ে, হেসে, গেয়ে, নেচে। যাকে চলতি কথায় বলে মাচার অনুষ্ঠান। দুর্জনে বলে সেখানেও নাকি বাংলা ছবির অভিনেতা অভিনেত্রীদের টেক্কা দেন মেগা সিরিয়ালের লোকজনেরা। ফলত, একবার এম পি হতে পারলে পেনশনের যে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, তার হাতছানিকে উপেক্ষা করবে কোন আহাম্মক?

বাংলা ছায়াছবির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। না এখানে সফল বাণিজ্যিক ছবি হচ্ছে, না ধারাবাহিকভাবে সমান্তরাল ধারার সৃজনশীল ছবি হচ্ছে। আলোর রেখাও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বামফ্রন্ট আমলে শোনা যেত রাজ্যের অন্য অনেককিছুর মত বাংলা ছবির অধঃপতনের জন্যেও নাকি বামফ্রন্ট সরকারই দায়ী। তারা আঁতেল লোকেদের জড়ো করে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নিয়ে আদিখ্যেতা করে অথচ টালিগঞ্জ পাড়ার জন্যে কিছু করে না। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অমিতাভের ন্যাকা বাংলা আর শাহরুখের টোল ফেলা হাসি আমদানি করে, অতিরঞ্জিত কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে হর হর ব্যোম ব্যোম রব তুলেছিলেন। কলকাতার গণ্যমান্যরা ধন্য ধন্য করে উঠেছিলেন। এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই নাকি বাংলা ছবির ক্রমমুক্তি হবে। জ্যোতিবাবু, বুদ্ধবাবুরা টালিগঞ্জকে পাত্তা দিতেন না। নতুন সরকার নাকি এমন পাত্তা দিলেন যে পরিচালক কজন টেকনিশিয়ান ব্যবহার করবেন তা তাঁর নিজের হাতে রইল না, বিদেশে আউটডোর শুটিঙের লাগামও পরিচালকের হাত থেকে গেল বেরিয়ে। সুমন মুখোপাধ্যায়ের মত অনেক গুণী লোক তিতিবিরক্ত হয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেন।

অবশ্য হতেই পারে এসব নেহাত গুজব। কারণ টালিগঞ্জ পাড়ার তারকাদের তো এসব নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। তাঁরা সমস্ত সরকারী ও দরকারী অনুষ্ঠানে হাসিমুখে হাজির থাকেন। সে আই পি এল নিয়ে আদেখলেপনাই হোক আর বিবেকানন্দ জন্মোৎসবে মোচ্ছবই হোক। সি বি এফ সি র ছাড়পত্র পেয়ে যাওয়া একটা বাংলা ছবিকে বাংলার রাজধানীতে চলতে দেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়েও তো টালিগঞ্জের তারকাদের কোন উচ্চবাচ্য নেই। প্রার্থীদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, চিন্তা চেতনার অভাব নাহয় মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু তাঁদেরই ইন্ডাস্ট্রির প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা অভিনেত্রীদের সাড়ে সর্বনাশ করা হচ্ছে দেখেও চুপ যাঁরা, তাঁরা নাকি সংসদে দাঁড়িয়ে আপামর জনসাধারণের হয়ে কথা বলবেন, তাঁদের প্রার্থী করে নাকি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হল।

এই দিবাস্বপ্ন দেখছেন এবং কোন এক দুর্বোধ্য আশাবাদে দেখাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের আন্তরিক অভিনন্দন। দেখতে থাকুন। সিনেমায় তো আর দেখার কিছু থাকছে না। স্বপ্নেই যা পারেন দেখে নিন।