মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া?

আমরা যাকে লেখিকা তসলিমার সত্যবাদিতা বলে ভেবেছি, তা কি আসলে শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জারিত মুসলমান বিদ্বেষ?

এই উপমহাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কথা হবে, নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা হবে, আর তসলিমা নাসরিনের নাম আসবে না — এমনটা প্রায় হয় না। ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন এসে পড়লেও একবার না একবার তাঁর নাম ওঠেই। এ বারেও দিন দুয়েক আগে একটা বাংলা খবরের চ্যানেলে দেখলাম বিজেপির মুখপাত্র যুগপৎ তৃণমূল এবং সিপিএমকে আঘাত করতে তসলিমা অস্ত্র ব্যবহার করলেন। অনস্বীকার্য যে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ থেকে তসলিমার বিতাড়ন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বামপন্থীদের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। গোটা কতক গুন্ডার তাণ্ডবে সন্ত্রস্ত হয়ে বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে কলকাতা ছেড়ে যেতে বাধ্য করল — এ দৃশ্য কেবল বামপন্থী নয়, কোন উদারচেতা মানুষেরই পছন্দের দৃশ্য নয়। বিশেষত যখন একই সরকার অতীতে পাকিস্তানের ক্রিকেট দলকে শিবসেনা মুম্বাইতে খেলতে দেবে না শুনে সাদরে ডেকে এনেছে। দীপা মেহতাকে হিন্দুত্ববাদীরা বারাণসীতে ‘ওয়াটার’ ছবির শুটিং করতে দেবে না শুনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্বয়ং পশ্চিমবঙ্গে আহ্বান করেছেন। তৃণমূল রাজত্বে এক দিকে তসলিমাকে ফিরিয়ে না আনা, অন্য দিকে গজল শিল্পী গুলাম আলিকে অন্য জায়গায় গাইতে দেওয়া হচ্ছে না বলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে গাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির দ্বিচারিতা নির্দেশ করে। কিন্তু এসব জানা কথার পুনরালোচনা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আলোচ্য তসলিমার বিদ্রোহী, উদার ভাবমূর্তি।

সাহিত্যিক জীবনের শুরু থেকেই তসলিমা পশ্চিমবঙ্গের আদর পেয়েছেন। সম্ভবত নিজের দেশের চেয়েও বেশি সমাদৃত হয়েছেন সীমান্তের এ পারে। অবশ্য তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলো থেকে জানা যায় পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের অনেকেই তাঁর প্রতি ঈর্ষায় ভুগতেন, সকলেই তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন না। কিন্তু ঈর্ষা তো যে কোন গুণী মানুষের জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তসলিমার বই যে পশ্চিমবঙ্গের পাঠক একসময় গোগ্রাসে গিলেছেন তা তো আর মিথ্যে নয়। লোকাল ট্রেনে ‘লজ্জা’-র কপিরাইটকে কাঁচকলা দেখানো শস্তা সংস্করণ বিক্রি হতে দেখার অভিজ্ঞতা সে যুগে অনেকেরই হয়েছে। গ্রামীণ লাইব্রেরিতেও একসময় ‘নির্বাচিত কলাম’ ফেরত আসতে না আসতে অন্য কোন পাঠক নিয়ে নিতেন। তাছাড়া এ রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ যে তসলিমার দুঃসময়ে তাঁর পাশে থেকেছেন তা নেহাত অকৃতজ্ঞ না হয়ে উঠলে তিনি কোনদিন অস্বীকার করবেন না। নিজেই তো লিখেছেন, শিবনারায়ণ রায়ের মত মানুষ নাকি বলেছিলেন বাংলাদেশ তসলিমার বাড়ি হলে পশ্চিমবঙ্গ তার মাসির বাড়ি। মায়ের কাছে থাকতে না পারলে মাসিই তো আগলাবে। এই সমাদরের কারণ কী? কারণটা সহজ।

তিনি এমন একজন সাহিত্যিক, যিনি নিজের লেখার জন্য সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়েছেন, খুন এবং ধর্ষণের হুমকি পেয়েছেন, নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। যে কোন রুচিশীল স্বাভাবিক মানুষেরই এমন মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন থাকে, অন্তত গত শতাব্দীতে থাকত। ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিপক্ষে যাঁরা দাঁড়ান, তাঁদের প্রতিও গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ (অন্তত সাংবিধানিকভাবে) দেশের মানুষের সহমর্মিতা থাকাই স্বাভাবিক। শুধু পশ্চিমবঙ্গ কেন? পাশ্চাত্যেও তসলিমা একই কারণে আশ্রয় পেয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হল, ভারতে হিন্দু মৌলবাদের উত্থান হওয়ার পর থেকেই তসলিমার উদারপন্থার সততা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। ২০১৪ থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তসলিমা ইসলামিয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার, হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার ছিটেফোঁটাও নন। উপরন্তু, প্রকৃত দক্ষিণপন্থীদের মতই তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য যতটা না ধর্মীয় মৌলবাদ, তার চেয়ে বেশি ধর্মাচরণকারী মানুষজন।

গত বছর কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ করল এবং দেশজুড়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে সাথে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান — সকলেই প্রতিবাদে পথে নেমে এলেন। কারণ এই আইন স্পষ্টতই সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের বিপরীত এবং মুসলমানদের অনাগরিক করে দেওয়ার প্রথম ধাপ। উদারচেতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বীর সৈনিক, নারীবাদী আইকন তসলিমা কিন্তু বিপুল সংখ্যক মহিলার অংশগ্রহণে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়াননি। বরং ১৭ জানুয়ারি ২০২০ কেরালা সাহিত্য উৎসবে তিনি আইনটার প্রশংসা করেন, শুধু যোগ করেন তাঁর মত নাস্তিক বা উদারচেতা মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের জন্য এই আইনে বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিৎ  [১]। বিজেপি রাজত্বে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী তারেক ফতের মতই তসলিমাও হিন্দুত্ববাদের কাজের মানুষ, কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন বোঝা যায়।

তবু তাঁর লেখালিখির ভক্ত কম নেই পশ্চিমবঙ্গে। তসলিমার বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে প্রায়শই দু দল বাঙালির মধ্যে তর্ক বেধে যায়। এক পক্ষে ইসলাম ধর্মের ধ্বজাধারীরা থাকেন, অন্য পক্ষে তাঁদের মৌলবাদী বলা মানুষজন থাকেন — ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। এক পক্ষে এমন হিন্দু এবং মুসলমান থাকেন, যাঁরা মনে করেন তসলিমা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অন্য পক্ষে থাকেন সেই হিন্দু এবং মুসলমানরা, যাঁরা মনে করেন তসলিমা অন্যায় কথাবার্তা লিখেছেন। স্বভাবতই দুই ধর্মের মৌলবাদীরাও এই কথোপকথনে ঢুকে পড়ে, কুকথার আদান প্রদান হয়, শেষ অব্দি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় না। কিন্তু গত পরশু তসলিমা যে টুইট করেছেন, সেটাকে কিছুতেই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে টুইট বলে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই।

তসলিমা লিখেছেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মঈন আলি ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে সিরিয়ায় গিয়ে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইসিসে যোগ দিতেন। স্পষ্টতই এখানে তসলিমা ইসলামিয় গোঁড়ামিকে আক্রমণ করছেন না। তাঁর লক্ষ্য মঈন আলি মানুষটাই, কারণ তিনি যে মুসলমান তা প্রচ্ছন্ন নয়। তাঁর লম্বা দাড়ি ধার্মিক মুসলমান হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। তসলিমার তাতেই আপত্তি এবং এই নিষ্ঠুর রসিকতায় তিনি ধার্মিক মুসলমান মাত্রেই সন্ত্রাসবাদী — এই বার্তাই দিতে চাইছেন। অতীতে ভারতীয় মুসলমানদের সম্বন্ধে এ জাতীয় মন্তব্য করে তিনি পার পেয়ে গেছেন, কারণ বর্তমান ভারতের বহু মানুষ তাঁর সমর্থনে উঠে দাঁড়ায়। বিপদে পড়লেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারকে নিয়ে টানাটানি করে। মুহূর্তের মধ্যে ইংল্যান্ড দলের জোফ্রা আর্চার, স্যাম বিলিংস, বেন ডাকেট প্রমুখ তসলিমার নিন্দা করে টুইট করেন।

Are you okay ? I don’t think you’re okay https://t.co/rmiFHhDXiO

— Jofra Archer (@JofraArcher) April 6, 2021

Can’t believe this. Disgusting tweet. Disgusting individual https://t.co/g8O1MWyR81

— Saqib Mahmood (@SaqMahmood25) April 6, 2021

This is the problem with this app. People being able to say stuff like this. Disgusting. Things need to change, please report this account! https://t.co/uveSFqbna0

— Ben Duckett (@BenDuckett1) April 6, 2021


তাঁদের ভক্তরাও যোগ দেন। লেখিকা আর যা-ই হোন, বোকা নন। তিনি নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোন দেশের সংখ্যাগুরুকে চট করে চটান না। তাই পরবর্তী টুইটেই দাবি করেন মঈন সম্বন্ধে টুইটটা ছিল “sarcasm”। লোকে সব বুঝেও তাঁকে আক্রমণ করছে, কারণ তিনি মুসলমান সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেন এবং তিনি ইসলামিয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে:

Haters know very well that my Moeen Ali tweet was sarcastic. But they made that an issue to humiliate me because I try to secularize Muslim society & I oppose Islamic fanaticism. One of the greatest tragedies of humankind is pro-women leftists support anti-women Islamists.

— taslima nasreen (@taslimanasreen) April 6, 2021


খ্রিষ্টানরা তাঁকে আক্রমণ করছে তিনি ইসলামিয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন বলে — এই বাণীতে চিড়ে ভেজার কথা নয়, ভেজেওনি। অগত্যা তিনি টুইটটা মুছে দেন। অবশ্য দুঃখপ্রকাশ করেননি। উপরন্তু প্রথম টুইটের সমালোচনায় লিবারেশন নেত্রী কবিতা কৃষ্ণণ তাঁকে “garden variety bigot” বলায় দাবি করেছেন কবিতা তাঁর বিরুদ্ধে “ফতোয়া” দিচ্ছেন। এই শব্দের ব্যবহার থেকেই পরিষ্কার তসলিমার বিরুদ্ধে কথা বলা যে কোন মানুষই তাঁর কাছে ইসলামিয় মৌলবাদী। প্রথমে অন্যকে অকারণে আক্রমণ করা, তারপর প্রতিবাদের সম্মুখীন হলে নিজেকেই আক্রান্ত বলে দাবি করা এক চিরায়ত দক্ষিণপন্থী কায়দা। তসলিমা সেটা চমৎকার রপ্ত করেছেন দেখা যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হল, এই যে এতগুলো বছর ধরে আমরা, আমাদের শিল্পী সাহিত্যিকরা তাঁকে মাথায় করে রেখেছি তাঁর লেখনীর জন্য, সেটা কি স্রেফ বোকামি? আমরা যাকে লেখিকা তসলিমার সত্যবাদিতা বলে ভেবেছি, তা কি আসলে শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জারিত মুসলমান বিদ্বেষ? আমরা, ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা, নেহাত বাংলাদেশের হিন্দুদের নির্যাতনের কথা পড়তে ভাল লাগছিল, মুসলমান সমাজে মেয়েদের কোন স্বাধীনতা নেই –- এই স্টিরিওটাইপে তসলিমার লেখা চমৎকার খাপ খাচ্ছিল বলেই কি এতকাল তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি? কখনো সখনো অন্য ধর্মের গোঁড়ামি নিয়েও তিনি লিখেছেন সত্যি। কিন্তু যে ধারাবাহিকতায় এবং তীব্রতায় তিনি ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ করেন, একইভাবে হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করলেও আমাদের এই উদারতা বজায় থাকত তো?

তসলিমা কি সত্যিই হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া, যাকে আমরা চিনতে পারিনি? নাকি এই মুহূর্তে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করে নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য তিনি তীব্র মুসলমান বিদ্বেষ প্রদর্শনের রাস্তা নিয়েছেন? আপনাকে, আমাকে, সবাইকেই তো শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাবার জন্য আপোষ করতেই হয়। তসলিমাই বা ব্যতিক্রম হবেন কী করে? তিনি বিখ্যাত হলেও শেষপর্যন্ত একজন নিরস্ত্র, ক্ষমতাহীন মানুষই তো।

এই যুক্তিতে ক্রিকেটে যাকে benefit of doubt বলে, তসলিমা সেটা পেতে পারেন। কিন্তু তাহলে মেনে নিতে হবে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক নন, নারীস্বাধীনতার লড়াকু আইকন নন। কারণ সেই স্তরের মানুষের পিঠ বাঁচানোর অধিকার থাকে না। মেয়েদের জন্য লড়ছি, সংখ্যালঘুদের জন্য লড়ছি, অথচ সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হতে পারব না, একথা বললে চলে না। দুই বাংলার যেসব মানুষ, বিশেষ করে মহিলা, তসলিমাকে উচ্চাসন দিয়েছিলেন; মঈনের কাছে না হলেও তাঁদের কাছে তসলিমাকে একদিন কৈফিয়ত দিতেই হবে।

সূত্র:
১. দ্য হিন্দু সংবাদপত্র

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি টুইটার থেকে।

শিক্ষণীয়

শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল

আজকাল লিখতে ইচ্ছে করে না খুব একটা। আর কতদিন যা লিখতে ইচ্ছে করে তা লেখা যাবে তাও অনিশ্চিত। তাই দুটো কথা লিখে দিই। না লিখে আর থাকা গেল না বলেই লিখছি, নইলে কাউকে “বোর” করার ইচ্ছা নেই।

একজন সাংবিধানিক প্রধান (বেচারা সংবিধান) আপত্তি করেছেন ওয়েস্ট বেঙ্গলের লোকেরা কেন ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করে তাই নিয়ে। তার জবাবে সকলে বলাবলি (এবং লেখালিখি) করছেন যে এটা ভুলভাল কথা বলে খবরে থাকার চেষ্টা, উনি ফুটবল তো জানেনই না, ইতিহাসও জানেন না ইত্যাদি।
এগুলো সবই ঠিক কথা। কিন্তু কথায় বলে প্রাজ্ঞ লোকের প্রজ্ঞার চেয়ে মূর্খের মূর্খামি দেখে অনেক বেশি শেখা যায়। এখানেও কিন্তু শেখার উপাদান আছে। কী সেটা?
হিন্দুত্ববাদীদের (“রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতির কোন দল হয় না” কথাটা এখন “সদা সত্য কথা বলিবে” রকমের বাতিল প্রবাদ) চিরকালই বাংলাদেশের হিন্দুদের দুঃখে বুক ফাটে। তাদের দীর্ঘদিনের ঘোষিত দাবী হল বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরা ভারতে চলে আসে তাদের শরণার্থী হিসাবে এ দেশে আশ্রয় দিতে হবে। আর যে মুসলমানরা আসে তাদের অনুপ্রবেশকারী গণ্য করে ফেরত পাঠাতে হবে। ২০১৪ সালে সরকারে আসার পর একে কাজে পরিণত করতে তারা বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছে। আসামে এন আর সি চলছে পুরো দমে (তাতে আসলে কী ঘটছে তা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না), অন্যদিকে নতুন নাগরিকত্ব আইন হচ্ছে। সেই আইনে বলা হচ্ছে যে কোন দেশ থেকে জাতিগত হিংসার শিকার হয়ে চলে আসা হিন্দুরা (বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকলকেই সাপটে হিন্দু ধরে নেওয়া হয়েছে অবশ্য) এ দেশে নাগরিকত্বের অধিকার পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বা পূর্বতন পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের প্রতি হিন্দুত্ববাদীরা সহানুভূতিশীল। অনেকটা সেই কারণেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন ক্রমবর্ধমান। যাঁরা নিজেরা বাঙাল তাঁরা জানেন যে আত্মীয়স্বজন অনেকেই ভাবছেন “হোক বাংলায় এন আর সি। ওরা আমাদের বাপ ঠাকুর্দাদের খেদিয়ে দিয়েছিল, বিজেপি এসে ওদেরও একটু দিক।”
তা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক তো মূলত বাঙালরাই। দেশভাগ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে তৈরি ক্লাব হলেও ইস্টবেঙ্গলের হার জিতের সঙ্গে যে উদ্বাস্তু হয়ে এ পারে চলে আসা বাঙালদের হাসি চোখের জল মিশে থাকে তা বাঙালি মাত্রেই জানে। সাংবিধানিক প্রধানবাবুও বিলক্ষণ জানেন। যদি উনি মোহনবাগান সমর্থক হন, তাহলে তো আরো বেশি করে জানেন। সেক্ষেত্রে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্যে তো ওঁর বিশেষ ভালবাসা থাকার কথা ছিল। উল্টোটা হল কেন?
ব্যাপারটা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের জন্যে শিক্ষণীয়। শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল।

একজন লোক জোম্যাটোর মাধ্যমে খাবার কিনতে চেয়েছিল। শেষ অব্দি অর্ডার বাতিল করে কারণ খাবার দিতে যার আসার কথা ছিল সে মুসলমান। আর আমাদের ইনি বিরাট হিন্দু, মোছলমানের ছোঁয়া খান না। তা জোম্যাটো বিরাট হিন্দুটিকে বলেছে খাবারের কোন ধর্ম নেই, খাবার নিজেই একটা ধর্ম। উপরন্তু জ্যোমাটোর বাবু আবার বলেছেন আমরা এসব অন্যায় আব্দার রাখব না, তাতে যা হয় হবে। বলতেই গেল গেল রব উঠেছে, হাজার হাজার বছরের ধর্ম একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মালিকের খোঁচায় নাকি রসাতলে যাচ্ছে। অতএব ধর্ম অন্তপ্রাণ হিন্দুরা সবাই মিলে অ্যাপটি আনইনস্টল করতে লেগেছে।
এ সম্বন্ধে কিছু শুকনো কথা বলার আছে। প্রথমত, জোম্যাটো বেশ করেছে। শুধু তাই নয়, যে লোকটি অর্ডার বাতিল করেছে তার কাজটা বস্তুত অস্পৃশ্যতা। দেশে অস্পৃশ্যতাবিরোধী আইন আছে। সেই আইন অনুযায়ী লোকটিকে অভিযুক্ত করা যায় কিনা সেটা আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন, তবে নীতিগতভাবে এটা অস্পৃশ্যতাই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের অফিসের পাশেই একটা নাম করা রেস্তোরাঁ থাকায় বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের হয়ে কর্মরত ছেলেদের সাথে আমাদের অল্প স্বল্প আলাপ আছে। যে কোন পেশার লোকের যে ন্যূনতম নিরাপত্তা প্রাপ্য তা তাদের নেই। ছেলেগুলো মোটামুটি লেখাপড়া জানা এবং বাইক চালায় দেখে ভুল করবেন না। এরা আক্ষরিক অর্থেই দিন আনে দিন খায়। ফলত ক্ষিদে পেলে পিঠের বাক্স খুলে অন্যের অর্ডার দেওয়া খাবারও খায়। ওদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও খেতাম। বেশ করতাম।
সারা পৃথিবীতে মানুষের শ্রমকে বড় লোকেরা শস্তায় কিনে নিয়ে আরো বড়লোক হচ্ছে। তাই একুশ শতকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হল দালালি। নানারকমের দালালি, যেখানে বিনিয়োগ তেমন কিছু নয় কারণ আসল পুঁজিটা হল শ্রম, যা খুব শস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ভারতের জোম্যাটোর ডেলিভারি বয়রা নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজনের কর্মীরাও একদম ভাল নেই। সেই কারণেই কদিন আগে প্রাইম সেলের দিনগুলোয় তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
এসবের প্রতিবাদ করতে চান? খুব ভাল কথা। এইভাবে শ্রমিকদের শোষণ করার জন্যে অ্যামাজনকে গালাগাল দিন, জোম্যাটোকেও গালাগাল দিন। তা বলে সংখ্যাগুরু বাঁদরামির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে পাবলিসিটি স্টান্ট বলে উড়িয়ে দেবেন না। যদি এটা স্টান্ট হয় তাহলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট যা দেখানোর ঝুঁকি আজকের ভারতে বিশেষ কেউ নেবে না। আমাদের কোটিপতি ক্রিকেটারদের দেখছেন না? বিমুদ্রাকরণকে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে দিতে পারেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে, অথচ নানা অজুহাতে যখন বেছে বেছে একটাই সম্প্রদায়ের মানুষকে খুন করা হয় তখন এঁরা অন্তত পাবলিসিটির জন্যেও একটা কথা বলেন কি? রূপোলি পর্দার তারকারাও তথৈবচ। সর্বকালের সবচেয়ে বড় তারকাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন গণপিটুনি নিয়ে। তো তিনি বলেছিলেন তিনি নাকি বিষয়টা ঠিক জানেন না। অর্থাৎ এই স্টান্টটা দেখাতে অমিতাভ বচ্চনও ভয় পান।
উনপঞ্চাশজন নানা পেশার বিশিষ্ট মানুষ অবশ্য দেখিয়েছিলেন স্টান্টটা। ফল কী? পাটনা হাইকোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। বোঝা গেল কতটা বিপজ্জনক এই স্টান্ট? সেই স্টান্ট যদি নিজেদের পুরো ব্যবসার ঝুঁকি নিয়ে জোম্যাটো কর্তৃপক্ষ দেখিয়ে থাকেন তাহলে আপনার অবশ্যই হাততালি দেওয়া উচিৎ। অবশ্য আপনি যদি প্রকাশ্যে লিবারাল আর মনে মনে হিন্দুত্ববাদী হন তাহলে আলাদা কথা।

আনিতে গৌরী

আকাশটার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? রঙ বদলে গেছে। যেখানে একটুআধটু ফাঁকা জমিতে সুযোগ আছে সেখানেই কাশফুল ফুটেছে। আমাদের বাংলায় এই সময়টা আগমনী গাওয়ার। “যাও যাও গিরী, আনিতে গৌরী/উমা বড় দুখে রয়েছে।” আজ সন্ধ্যায় বেঙ্গালুরুতে এক গৌরীর বিসর্জন সম্পন্ন হল। এখন আমরা ক্রুদ্ধ, আতঙ্কিত — আরো অনেককিছু হতে পারি কিন্তু বিস্মিত হওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
এটাই হওয়ার ছিল। গৌরী লঙ্কেশের বদলে অন্য কেউও খুন হতে পারতেন। এমন যে কেউ যিনি হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন ঘাড় শক্ত করে। শুধু হিন্দুত্বও নয়, ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন যাঁরা। কয়েকদিন আগেই নাকি একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মমতার ছবিতে হিটলারি গোঁফ লাগানোর জন্যে। রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতার যখন সীমা থাকে তখন সে আইনকে ব্যবহার করে বিরোধী স্বরকে নীরব করে দিতে, আর যখন ক্ষমতা সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আর ওসবের দরকার হয় না, সরাসরি গুন্ডা নামিয়ে নিকেশ করে দেওয়া যায়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের অনেকের মধ্যেই একনায়কসুলভ প্রবৃত্তির প্রকাশ প্রকট হলেও এই মুহূর্তে যেহেতু লাগামছাড়া ক্ষমতা হিন্দুত্ববাদীদের হাতে, তাই তারা নির্ভয়ে এরকম খুনোখুনি করবেই। এমনিতেই যারা ধর্মান্ধ তাদের সঙ্গে যুক্তি খাটে না, গণতান্ত্রিক অধিকারও তাদের দেওয়া উচিৎ না। হিন্দুত্ব যে বস্তুত আইসিস বা আল কায়দা বা বাংলাদেশের জমিয়তের মত একটি ভয়ঙ্কর কাল্ট সেটা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কবে বুঝবেন জানি না। যতদিনে বুঝবেন ততদিনে না দেরী হয়ে যায়। সাংবাদিকরা, প্রতিবাদীরা বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন কারণে খুন হয়ে চলেন কিন্তু এদেশে খুনগুলোর মধ্যে ব্যবধান বড্ড কমে এসেছে এবং কারা খুন হচ্ছেন সে ব্যাপারেও বেশ ধারাবাহিকতা দেখা দিয়েছে। এর কোন শান্তিপূর্ণ সমাধান তো দেখছি না। এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঘোষিত যোদ্ধা যারা তাদেরই এক দলের আবার সরকার কর্নাটকে। তাদের যুদ্ধ করার যা ছিরি, তাতে আমি ফ্যাসিবাদী হলে উচ্ছ্বসিত হতাম।
প্রকাশ কারাত, পিনারাই বিজয়ন! আপনারা কংগ্রেসের অযোগ্যতায় খুশি তো?
Gauri-Lankesh