টুপির আমি টুপির তুমি?

খেলোয়াড়রা বা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া পাওয়া, ইতিহাস, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি খেলার মাঠে প্রকাশ করে শাস্তি না পেলে মাঠে ক্রমশ রাজনীতিই হতে থাকবে, খেলা নয়।

২৬শে নভেম্বর ২০০৮। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী হামলা। হতাহতের সংখ্যা, আক্রমণের ব্যাপকতা, দৈর্ঘ্য — যেদিক দিয়েই বিচার করুন। সেই ঘটনার ঠিক দু সপ্তাহ পরে, এগারোই ডিসেম্বর, চেন্নাইয়ের এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের একটি টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়। গোটা ম্যাচে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে থাকার পর, চতুর্থ দিন বিকেলে ৬৮ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে বীরেন্দ্র সেওয়াগ ম্যাচ জেতার পথ খুলে দিয়ে যান। পঞ্চম দিন সকালে ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন, তখন দেশের নয়নমণি শচীন তেন্ডুলকর অপরাজিত শতরান করে ভারতীয় দলকে জেতান। খেলার পরে তিনি বলেন

What happened in Mumbai was extremely unfortunate and I don’t think by India winning or me scoring a hundred, people who have lost their loved ones will feel any better. It’s a terrible loss for all of them and our hearts are with them, but whatever manner we can contribute to making them feel better we’ll make that effort.

(www.telegraph.co.uk)

শোক প্রকাশে যে পরিমিতি জরুরী, তাঁর কথায় শুধু যে তা ছিল তা-ই নয়, ঐ কথাগুলোর মধ্যে এই উপলব্ধিও রয়েছে যে ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত একটা খেলাই, তার বেশি কিছু নয়। কোন জয়, কোন শতরান মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।

মাঝে এগারো বছর কেটে গেছে। “আশাটাও পণ্য এখন বাজার দরে / বিকোতে পারলে টাকা আসবে ঘরে।“ শুধু আশা নয়, শোকও এখন বিক্রয়যোগ্য। দেশপ্রেম তো বটেই।

তাই দেশসুদ্ধ দেশপ্রেমিকরা হাততালি দিলেন, হর্ষিত হলেন এই দেখে যে বিরাট কোহলি তাঁর দলবল নিয়ে ক্রিকেট মাঠে নামলেন সেনাবাহিনীর টুপি পরে, যে টুপিতে আবার বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা নাইকির লোগো। অর্থাৎ ভারতীয় ক্রিকেটাররা পুলওয়ামার শহীদদের, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এত সম্মান করেন যে তাঁদের সম্মান জানানোর জন্যেও একটা দিন সেলসম্যান হওয়া বন্ধ রাখতে পারলেন না। স্পনসরের লোগো লাগানো টুপি যদ্দিন তৈরি হয়নি তদ্দিন ওঁরা শোকপালন স্থগিত রেখেছিলেন। পুলওয়ামায় হামলা হয়েছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। এমন নয় যে তারপর থেকে ভারতীয় দল আর মাঠে নামেনি। অথচ শহীদদের সম্মানে একটা ম্যাচের ফি দিয়ে দেব, জওয়ানদের মত ক্যামোফ্লাজ টুপি পরব — এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ধোনি, কোহলির মত বিরাট দেশপ্রেমিকদের লেগে গেল প্রায় এক মাস। আচ্ছা, সিদ্ধান্তটা এমন হল না কেন যে এই দিনটায় যেহেতু সেনাবাহিনীর টুপি পরছি, সেহেতু আমাদের জামা, জুতো, টুপি, ব্যাট, প্যাড কোত্থাও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকবে না? যাঁরা জীবন দিলেন তাঁদের জন্যে এটুকু ত্যাগ করতে পারি না, অথচ দেশপ্রেম আমার উপচে পড়ছে? দেশ ভর্তি দেশপ্রেমিক বলিউড তারকা, রাজনীতিবিদ, খোদ প্রধানমন্ত্রী, তাঁর আই টি সেল — সকলে কী করে মেনে নিলেন সেনাবাহিনীর টুপির এই বেসাতি? এরপর তো কোনদিন দেখব তেরঙার মাঝখানে অশোকচক্রের পাশে জিও লোগো। দেশপ্রেমিকরা মেনে নেবেন তো? অবশ্য এতে আপত্তির আছেটাই বা কী? লালকেল্লা তো ইতিমধ্যেই ডালমিয়া রেড ফোর্ট। দেশপ্রেম তো শুধু বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার সময়ে পবিত্র, ধরা ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে।

ক্রিকেটাররা নিজেদের এক দিনের বেতন দিয়ে দিলেন জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে। চমৎকার খবর। গত বছর কেরালায় ভয়াবহ বন্যা হল, সচরাচর এত বড় বন্যা হয় না। তখন ক্রিকেটাররা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কদিনের বেতন দিয়েছিলেন মনে করতে পারছি না। আমার মত দেশদ্রোহীরা অবশ্য দেশের ভাল কাজ দেখতে পান না। দেশপ্রেমিকরা কেউ মনে করিয়ে দিলে ভাল হয়। অবশ্য ত্রাণ তহবিলে দান ঠিক ফোটোজিনিক নয়। নিহত জওয়ানদের স্ত্রীরা যা-ই বলুন না কেন, সেনাবাহিনীর নাম করে কিছু করার মধ্যে যে মাচোপনা আছে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করার মধ্যে তা কোথায়?

তাছাড়া ক্রিকেটারদের মাথায় তুলতে তুলতে আমরা যে কৈলাসে তুলেছি, সেখানে বসে গঞ্জিকা সেবন না করেও তাঁদের মনে হতেই পারে ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, তাঁরাও নেহাত খেলোয়াড় নন। সকলেই সাক্ষাৎ যোদ্ধা একেকজন। বিরাট ভাবতেই পারেন তাঁর ব্যাটটা এক্কেবারে এ কে ৪৭, ধোনির হেলিকপ্টার শটে চাপিয়ে অভিনন্দন বর্তমানকে পাঠানো হলে তিনি পাক সেনার হাতে ধরা পড়তেন না। ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা যে নিজেদের দেবতা গন্ধর্ব বলে মনে করেন তা তো আমরা দেখেছিই কিছুদিন আগে, যখন দুই তরুণ ক্রিকেটার নিজেদের কার্তিক আর কেষ্ট জ্ঞানে টেলিভিশনের প্রাইম টাইম অনুষ্ঠানে বসে লীলা বর্ণনা করছিলেন। অতএব সেনাবাহিনীর জীবন নিংড়ে নেওয়া ট্রেনিং না নিয়েও, মাসের পর মাস সমস্ত শারীরিক, মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কাজ না করেও যদি ক্রিকেটাররা মনে করেন তাঁরা আর্মি ক্যাপ পরার যোগ্য, তাঁদের ঠেকাবে কে? “সিয়াচেনে আমাদের জওয়ানরা লড়ছে” বলে যাঁরা সমালোচনার মুখ বন্ধ করেন, নিরীহ লোককে ঠ্যাঙান বা ভোট ভিক্ষা করেন — বিরাটবাহিনীর এই ধ্যাষ্টামোতে তাঁদের আহ্লাদ প্রমাণ করে সত্যিকারের জওয়ানদের প্রতি এঁদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।

বিরাট কোহলি আজ নিজেকে সৈনিক ভেবে আমোদিত হচ্ছেন, তাঁর ব্যর্থতা এবং তাঁর দলের ব্যর্থতাকে যেদিন দেশের মানুষ সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মতই মরণবাঁচন সমস্যা মনে করবেন, সেদিন কিন্তু হেরে গেলে গালিগালাজ, মারধোর, বাড়িতে ইঁট পড়া — কোনটাকেই অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ খেলা যে শুধু খেলা নয়, ভারতীয় ক্রিকেট দল যে সেনাবাহিনীর মতই দেশরক্ষার কাজে নিযুক্ত সেটা বিরাটরা নিজেরাই তো প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছেন। ইতালিতে বিয়ে করতে যাওয়া যায়, সেই সঙ্কটে ওখানে ক্রিকেট খেলতে চলে গেলে লাভ হবে তো?

এসব কেনা বেচার বাইরেও অবশ্য কালকের দিনটা অন্য এক বিপদের জন্ম দিয়ে গেল। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল ভারতীয় ক্রিকেট সংস্থার কাছে কাঞ্চনমূল্যে আত্মবিক্রীত। তাদের ঠুঁটোপনার কারণেই সম্ভবত খেলার মাঠে সামরিক তথা রাজনৈতিক প্রতীকের প্রবেশ অনুমতি পেয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন খেলায় এ ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে বলে মনে হয় না। কারণ খেলার মাঠকে রাজনৈতিক, সামরিক বিষয়ে মত প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠতে দিলে খেলাধুলোর রক্তাক্ত শত্রুতা হয়ে উঠতে বিশেষ সময় লাগবে না।

ফুটবলপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে গত ফুটবল বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর আলবানিয়ার পতাকায় যে দুমুখো ঈগল থাকে সেটার সম্পর্কে ইঙ্গিত করায় ফিফা সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত ঝাকা আর ঝেরদান শাকিরিকে জরিমানা দিতে বাধ্য করেছিল। ঐ দুজনের উদ্বাস্তু জীবন, একজনের বাবার পূর্বতন যুগোস্লাভিয়ায় নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাসের কারণে বিশ্বজুড়ে এই সিদ্ধান্তের জন্যে ফিফা সমালোচিতও হয়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, খেলোয়াড়রা বা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া পাওয়া, ইতিহাস, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি খেলার মাঠে প্রকাশ করে শাস্তি না পেলে মাঠে ক্রমশ রাজনীতিই হতে থাকবে, খেলা নয়। ক্রিকেটে সেই সম্ভাবনা গতকাল তৈরি হয়ে গেল। এরপর ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার খেলায় যদি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা রাজীব গান্ধী প্রেরিত শান্তি বাহিনীর হাতে নিহতদের স্মৃতিতে লুঙ্গি ছাপ টুপি পরে খেলতে চায় আই সি সি না বলবে কোন যুক্তিতে? এই কষ্টকল্পনারও প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের খেলায় যদি বাংলাদেশ দল পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গণহত্যায় মৃতদের স্মরণে দেখতে রক্তের ছিটের মত এমন নকশার জার্সি পরতে চায়, আটকানো হবে কোন যুক্তিতে? রাজনীতি খেলার অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করতে শুরু করলে অচিরেই খেলা রাজনীতির অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করবে। সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের যুদ্ধ লেগেছিল সামান্য একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে। আমরা আধুনিক রাষ্ট্রের মানুষ নিশ্চয়ই এই ধ্বংসাত্মক ছেলেমানুষীর পুনরাবৃত্তি চাইব না।

শেষে একটা কথা বলার আছে। অনেকেই বলেন, খেলা কি তার পারিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন? খেলাধুলোর ইতিহাসে কখনো কি রাজনীতি ঢুকে পড়েনি? বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা কাকে সমর্থন করছি তার পেছনে কি রাজনীতি থাকে না কখনোই?

সত্যি কথা। খেলা বা খেলোয়াড় তার চারপাশ বাদ দিয়ে নয়। বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের সমর্থনও প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে হয়। খেলাধুলোর ইতিহাসেও বহু রাজনৈতিক ঘটনার পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে।

কিন্তু এই আলোচনায় আমাদের সমর্থনের প্রশ্নটা প্রথমেই বাদ দিতে হবে। কারণ মাঠ থেকে বহু দূরে থাকা সমর্থকের রাজনৈতিক বা সামাজিক পছন্দ অপছন্দ খেলায় প্রভাব ফ্যালে না। যাঁরা মাঠে থাকেন তাঁদের ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রভাব ফ্যালে। সেই কারণেই তাঁদের ব্যবহারেরও নিয়মকানুন আছে। সে নিয়ম ভাঙলে তাঁরা যে ক্লাবকে বা দেশকে সমর্থন করেন তাদের শাস্তি দেওয়ার নিয়মও আছে প্রায় সব খেলাতে। সেই কারণেই চেলসি সমর্থকরা বর্ণবিদ্বেষী গালাগালি দিলে চেলসি পার পায় না।

এবার খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে আসা যাক। রাজনৈতিক বিবৃতির কতকগুলো অবিস্মরণীয়, উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খেলার মাঠে আছে। কিন্তু সেই বিবৃতি এসেছে খেলার মধ্যে দিয়েই, আক্রমণাত্মক সামরিক পোশাকের মধ্যে দিয়ে নয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃষ্টান্তটা দিয়ে শেষ করি।

বার্লিন অলিম্পিক, ১৯৩৬। অ্যাডলফ হিটলার ভেবেছিল আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ তৈরি করবে অলিম্পিকটাকে। অথচ তার নাজি গর্ব গুঁড়িয়ে গিয়েছিল একজন কালো মানুষের পায়ের তলায়। তাঁর নাম জেসি আওয়েন্স। নাজিবাদকে খেলার মাঠে হারিয়ে দিয়েছিল চারটে সোনার মেডেল। মার্কিন সেনাবাহিনীর পোশাক নয়।

ঐ অলিম্পিকেই হকি ফাইনালে হিটলারের জার্মানিকে ভানুমতীর খেল কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এক ভারতীয়। তাঁর নাম ধ্যানচাঁদ। পরাধীন দেশের কালো চামড়ার লোকেদের দলের কাছে সেদিন আট গোল খেয়েছিল হিটলারের আর্য রক্তের বীরপুঙ্গবরা। শোনা যায় হিটলার নাকি ধ্যানচাঁদকে জার্মানিতে রেখে দিতে চেয়েছিল৷ হকির জাদুকর পাত্তা দেননি। তাঁর কিন্তু শস্তার জার্সি ছাড়া কিচ্ছু ছিল না।

Where is the hosh?

আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঐ মানুষগুলোকে এরকম জালনিবদ্ধ রোহিতের মত মরতে হয় কেন?

আমাদের এলাকায় পাড়ার লোকেরা মিলে অপেশাদার যাত্রা করেন বহুকাল থেকে। ছোটবেলায় চোখ বড় বড় করে দেখতাম মঞ্চের উপর যুদ্ধ হত, রাজা মন্ত্রী সৈনিক মরত, তারপর যেই আলো নিভে যেত অমনি তড়াক করে উঠে মঞ্চ থেকে চলে যেত। আমার বাবাও অভিনয় করতেন বলে যাত্রা শেষ হওয়ার পরে গ্রীনরুমে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। মৃত অভিনেতারা অন্ধকারের মধ্যে উঠে চলে যেতেন বলে শিশু বয়সে আমার কিন্তু সন্দেহ রয়েই যেত, লোকটা সত্যি বেঁচে আছে কিনা। গ্রীনরুমে গিয়ে পাড়াতুতো কাকু, জেঠু বা দাদুকে মেক আপ তুলতে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করা অব্দি আমার বুক দুরদুর করত। একটু বড় হওয়ার পর সেকথা মনে করে নিজের কাছেই বিস্তর লজ্জা পেয়েছি। তবে এখন বুঝতে পারি লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ ছিল না। ধেড়ে ধেড়ে লোকেরা যখন সত্যিকারের যুদ্ধ, সত্যিকারের সৈনিকদের জীবনকে যাত্রার মতই নেহাত খেলা মনে করে, তখন বছর পাঁচেকের ছেলের যাত্রাকে সত্যি ভাবা কী আর এমন দোষের?
কাল পুলওয়ামায় বিয়াল্লিশ জনের মৃত্যুর পর থেকে অনলাইন এবং অফলাইনে লোকের যা প্রতিক্রিয়া দেখছি তাতে মনে হচ্ছে যুদ্ধ নেহাত যাত্রা বৈ তো নয়। তাও ভাল, উরির পরে পাকিস্তানে পরমাণু বোমা ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছিল অনেকে, এবারে শুধু আরেকখানা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আবদার করেই ক্ষান্ত আছে। চারিদিকে বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। বিজেপি মুখপাত্র রাম মাধব দেখলাম টিভিতে বলছেন পাকিস্তানকে এমন জবাব দেব, ওরা ভুলতে পারবে না ইত্যাদি। ডি ডি ইন্ডিয়াতে আবার দেখলাম এক পলিতকেশ ভদ্রলোক বলছেন পাকিস্তান এটা করেছে নির্বাচনে বিরোধীদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। অর্থাৎ সম্ভবত, এখন থেকে ঘটনার তদন্ত এবং যাদের গাফিলতির ফলে এতগুলো মানুষের নিরুপায় মৃত্যু হল তাদের শাস্তিবিধানের চেয়ে সরকার যে ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেবে সেটা হল যারা সরকারকে প্রশ্ন করবে তাদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া (কে জানে হয়ত জেলে দেওয়া বা গণপিটুনি দেওয়াও)। মাধববাবু যেমন বুম ধরা সাংবাদিকটিকে ধমকে বলেই দিলেন “আপনার কমিউনিটির যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে তাদের বিচ্ছিন্ন করার সময় এসে গেছে।“
কিছু করার নেই, মেনে নিতে হবে। দেশে এখন দেশপ্রেমিক সরকার। আই এস আই চিহ্নিত। পাকিস্তানের নয়, প্রশান্ত মহলানবীশের।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস যখন বাকি তখন এক দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় এক মিত্রকে বলছিলাম কেন আমি মোদী ক্ষমতায় আসুন চাই না। সে প্রায় সবটাই মেনে নিয়েও বলল “মোদী ক্ষমতায় এলে আর কিছু না হোক, পাকিস্তানকে একটু ঠুকে দেওয়া যাবে।“ যে দেশটাকে মোদীজির ঠুকে দেওয়ার কথা ছিল, হঠাৎ সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে কোলাকুলি করেছেন। ওটা নাকি স্টেটসম্যানসুলভ কাজ। তারপর হল পাঠানকোটে হামলা। অতঃপর পাকিস্তানের আই এস আইকে আদর করে ডেকে এনে (বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছিল কিনা উজ্জ্বল নিকম জানতে পারেন) ভারতের সেনা ছাউনি পরিদর্শন করতে দেওয়া হল। ওটা বোধহয় নিউ ইয়র্ক টাইমসসুলভ ছিল। তারপর হল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এবং তা নিয়ে সিনেমা। এছাড়াও হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন পাননি বলে দিল্লীর যন্তর মন্তরে অনশন করছিলেন, তাঁদের কলার ধরে স্থানচ্যুত করা হয়েছে। বি এস এফ, সি আর পি এফ জওয়ানরা ঠিকমত খেতে পান না, অফিসাররা অন্যায় ব্যবহার করেন — এই অভিযোগ করে সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করেছিলেন। প্রতিকার পাননি, গলাধাক্কা পেয়েছেন। আর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ কিরকম কমে গেছে সে তো দেখাই যাচ্ছে পাঁচ বছর ধরে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ফলে নাকি সব তছনছ হয়ে গেছে শোনা যাচ্ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সে গুড়েও বালি। নোটবন্দির ফলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উঠে যাবে কথা ছিল, তাও হল না। এরপরেও এখনো দেখছি অনেকের অনেক আশা মোদীবাবুর উপরে। কোন কোন বাঙালির দেশপ্রেমের ভার বাংলা ভাষা বইতে পারছে না। তাই হিন্দিতে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন “মোদীজি সব কুছ রোক দো, বাস পাকিস্তান কো ঠোক দো।”
পাকিস্তান একটি সেনা আর মৌলবাদী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, যার ভারতে অশান্তি সৃষ্টি করা ছাড়া প্রায় কোন কাজ নেই। তাদের সাহায্যপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে এতজন সি আর পি এফ জওয়ানের প্রাণ গেল। ফলে রাগ, দুঃখ সবই বৈধ। কিন্তু এই যে প্রতিশোধ ইত্যাদি শব্দগুলো বুড়িমার চকলেট বোমের মত ব্যবহার করছি আমরা — এই প্রতিশোধ নিতে যাবেটা কে? আমি, আপনি তো নয়ই, রাম মাধব আর ভিকি কৌশল পর্যন্ত যাবেন না। যাবেন স্বাস্থ্যবান নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা, যাঁরা এই দেড়শো কোটির দেশের বিপুল কর্মসংস্থানের সমস্যার অন্যতম শিকার। তা এই প্রশ্ন কবে তুলবেন যে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঐ মানুষগুলোকে এরকম জালনিবদ্ধ রোহিতের মত মরতে হয় কেন? কাশ্মীরের মত বিপদসংকুল এলাকায় আটাত্তরটা গাড়ির বিরাট কনভয় আড়াই হাজার জওয়ানকে নিয়ে একত্রে চলাচল করে কোন দুঃখে? বিশেষত যেখানে গোয়েন্দা বিভাগ আগেই আক্রমণের সম্ভাবনা জানিয়েছিল? পাকিস্তানের সেনা, সরকার, সন্ত্রাসবাদী — কেউই তো আপনার হাতে নেই। যে সরকারটা আপনার হাতে তাকে এই প্রশ্নগুলো করবেন না?
অবশ্য এমনটা বললে অন্যায় হবে যে এই সরকারের আমলেই প্রথম এত কিছু ঘটল। কক্ষনো না। মহান লিবারাল নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের মাটি থেকে বিমান হাইজ্যাক করে আফগানিস্তানে চলে যায়নি? সে কি নরেন্দ্র মোদীর দোষ? কার্গিলে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়েনি? সে কি মোদীর দোষে? মৃত সৈনিকদের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়নি? তার জন্যেও কি মোদী দায়ী? খোদ সংসদ ভবনে আক্রমণ হয়েছে। সেটাও কি বেচারা মোদীর ঘাড়ে চাপাব এখন?
আসলে আগমার্কা দেশপ্রেমিকদের আছে টনটনে মান আর বিপুল জোশ। কিন্তু রামকৃষ্ণ আবার বলেছিলেন “যার মান আর হুঁশ আছে সে-ই মানুষ।” মান আর জোশ তো অর্ধমানবেরও থাকে। সেটা একবার স্বয়ং বিবেকানন্দ টের পেয়েছিলেন।

বিঃ দ্রঃ দয়া করে “ছিঃ! সৈনিকের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন?” জাতীয় মন্তব্য করবেন না। পৃথিবীর কোথাও সশস্ত্রবাহিনীর মানুষ অরাজনৈতিক কারণে নিহত হন না। মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়ানো একটি ঘোরতর রাজনৈতিক ক্রিয়া।

সাংবিধানিক সঙ্কট না পালে বাঘ?

আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?

১৯৯৩ সালের কোন একদিন কলকাতার তিলজলা এলাকায় ঢুকে পাঞ্জাব পুলিশ এক দম্পতিকে গুলি করে মারে এবং তাদের মৃতদেহ নিয়ে প্রস্থান করে। ঐ দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা নাকি খালিস্তানি জঙ্গি। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রচুর আলোড়ন হয়। অতঃপর আমৃত্যু মার্কসবাদী, প্রাক্তন সি পি আই (এম) নেতা এবং বামফ্রন্ট সরকারের একদা অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র সংবাদ প্রতিদিন কাগজে তাঁর কলামে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘সবার উপরে পঞ্জাব পুলিশ সত্য?’ সেই লেখা থেকে ঈষৎ দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক:

স্বাধীনতার পর প্রচুর ঢক্কানিনাদ সহকারে ১৯৪৯ সালে একটি সংবিধান রচনা করা হয়েছিলো, সেই সংবিধানের অনুশাসনে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা নাকি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশ যে-কোনো রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সার্বিক দায়িত্ব ঐ-রাজ্যের সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারেরও না, অন্য-কোনো রাজ্যের সরকারের তো না-ই। রাজ্য সরকারের অনুমতি না নিয়ে এমনকী কোন কেন্দ্রীয় বাহিনীরও কোনো উপলক্ষ্যেই রাজ্যে অনুপ্রবেশের অধিকার নেই। মাত্র একটি অবস্থায় এই রীতির ব্যত্যয় হতে পারে: কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসদমন ও অশান্ত অঞ্চল আইন যদি একটি রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’য়ে থাকে, তা’হলে। কিন্তু এই আইনের ধারাবলে এক রাজ্যের পুলিশ অন্য রাজ্যে ঢুকে যেতে পারে না, ঐ আইন কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’লে একমাত্র কেন্দ্রীয় পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীই রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়াই কোনো রাজ্যে ঢুকে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী আইনশৃঙ্খলার টহলদারীর ব্যবস্থা করতে পারে।

গতকাল সন্ধ্যা থেকে কলকাতার নগরপালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে যে অভূতপূর্ব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা নিয়ে যে কোন আলোচনায় উপর্যুক্ত কথাগুলো মনে রাখা দরকার, যদিও ১৯৯৩ এর ঘটনার সাথে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে তার অনেক তফাত।
আইন অনুযায়ী কোন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যায় না বা এমন কোন আইন প্রণয়ন করাও যায় না যা সংবিধানের যা বিরুদ্ধে যায়। এখন কথা হচ্ছে সিবিআই কোন আইন অনুযায়ী সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে? মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাদের তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন তাই তারা তদন্ত করছে — এই উত্তরটা অসম্পূর্ণ। কারণ সুপ্রিম কোর্টও আইনের ঊর্ধ্বে নন। স্বয়ং প্রধান বিচারপতিকেও রায় দিতে হয় দেশের আইন মেনেই, তিনি নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্ট যে সিবিআই বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে আব্দুল মান্নানের দায়ের করা মামলার তদন্তভার দিয়েছেন সেটাও আইনমাফিক। কী সে আইন যার বলে সিবিআই একটা অঙ্গরাজ্যের ঘটনার তদন্ত করতে পারে?
আইনটা হল The Delhi Special Police Establishment Act, 1946. গত ২৫শে নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে এই আইনেরই একটি সংশোধনী বিল লোকসভায় পেশ হয়, যার ফলে সিবিআই অধিকর্তা বেছে নেওয়ার জন্যে তিন সদস্যের কমিশন গঠন হয়। সেই কমিশনের সদস্য প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা তাঁর মনোনীত কোন বিচারপতি। মূল আইনের ছ নম্বর ধারায় কিন্তু বলা আছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা রেল বিভাগের এলাকায় এই কেন্দ্রীয় পুলিশকে তদন্ত করতে পারে কিন্তু কোন অঙ্গরাজ্যে তদন্ত করতে হলে রাজ্য সরকারের সম্মতি প্রয়োজন।
তাহলে সিবিআই সারা দেশে এত অভিযোগের তদন্ত করে কী করে? করতে পারে কারণ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার সম্মতি দেয়। সেই সম্মতির পোশাকি নাম general consent. পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই general consent দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার, ১৯৮৯ সালে। কে জানে কী আঁচ করে গত নভেম্বরে প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, এবং তারপর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় general consent প্রত্যাহার করে নেন৷ অর্থাৎ এর পর থেকে এ রাজ্যের কোন কেসের তদন্ত করতে হলে সিবিআইকে প্রত্যেক কেসের জন্যে আলাদা করে তদন্তের অনুমতি চাইতে হবে।
কিন্তু এই সম্মতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময়ে সম্ভবত দিদির খেয়াল ছিল না যে ইতিমধ্যেই চালু হয়ে যাওয়া কেসে এর কোন প্রভাব পড়বে না।
এই আইনী জটিলতা নিয়ে আমরা আমাদের মাথার সব চুল ছেঁড়ার সময় অবশ্য পাব না। আজই সিবিআইয়ের আবেদনে সাড়া দিয়ে মহামান্য প্রধান বিচারপতি গোগোই বসেছিলেন। সলিসিটর জেনারেলকে (অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের কৌঁসুলিকে) মৃদু ধমক দিয়ে বলেছেন, আপনাদের কাছে এমন কোন প্রমাণই নেই যা থেকে বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা পুলিশ প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করছে। একটা প্রমাণ দেখান যে সেই চেষ্টা করছে বা করার কথা ভাবছে। এদের এমন শিক্ষা দেব যে আফশোসের শেষ থাকবে না।
মহামান্য আদালত আবার কালই বসছেন। ফলত খুব শিগগির আমরা জেনে যাব কোন পক্ষ আইনভঙ্গ করেছে? রাজ্য সরকারের পুলিশকে না জানিয়ে অসাংবিধানিকভাবে, কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই সিবিআই কলকাতার নগরপালকে ধমকাতে গিয়েছিল? নাকি নগরপালই তদন্তে অসহযোগিতা করে নিয়ম ভাঙছিলেন, এবং সিবিআই সব আইনকানুন মেনেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল?
আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?
যে ৩৫৬ র জুজু কেন্দ্রীয় সরকার দেখাচ্ছে বলে কাল মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করছিলেন বা স্টুডিওতে বিজেপি নেতারা হুমকি দিচ্ছিলেন, তা যদি সত্যি হয় তাহলে নিঃসন্দেহে মমতা ঠিকই করেছেন। তাঁর সরকারকে যদি কাজ করতে না দেওয়া হয়, নিশ্চয়ই তাঁর অধিকার আছে পথে নেমে আসার। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা হতে চলল, রাজ্যপাল চুপ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক চুপ। জুজুটা গেল কোথায়? তাহলে কি কাল সন্ধ্যের অতি তৎপরতা এবং ধর্না শেক্সপিয়রের ভাষায় “much ado about nothing”?
এতগুলো প্রশ্নের পরে আরো একটা প্রশ্ন আসে। সিবিআই তো বলছে তারা শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। তাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি কেন? এ কি সেই ঠাকুরঘরে কে জিজ্ঞেস করায় “আমি কলা খাইনি” উত্তর আসার মত ব্যাপার?
বিঃ দ্রঃ সংবিধানের ৩৫৬ ধারার কথা উঠতে মনে পড়ল, তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর একটা নির্বাচনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর দলের প্রাপ্ত ভোট ছিল শতাংশের হিসাবে ৩.৫৬। তিনি তৎকালীন রাজ্য সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন ভোটের শতাংশটা খেয়াল রাখবেন। বাড়াবাড়ি করলে পশ্চিমবঙ্গের ঐ অবস্থাই হবে।
ধন্য আশা কুহকিনী।

বেঁচে থাক ডিম ভাত

আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না

ডিম্ভাত নিয়ে চলা বিদ্রুপ এবং তার প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো কথা বলা দরকার যেগুলো মমতার ব্রিগেড সমাবেশ, বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ ছাড়িয়েও প্রাসঙ্গিক।
১) যাঁরা কোনোদিন কোনো রংয়ের রাজনৈতিক মিছিলে বা সমাবেশে যাননি এবং যাওয়াটা “down market” বলে মনে করেন তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, বহু মানুষের সাথে হাঁটলে অথবা দিগন্তবিস্তৃত মাঠে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে বসে থাকলে আর কিছু না হোক একটা জিনিস হয় সেটা হল ইগো নিয়ন্ত্রণে আসে। ছশো কোটি মানুষের দুনিয়ায় আপনি কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিৎকর সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। শুধু এই কারণেই নিয়মিত মিছিলে, মিটিঙে যাওয়া যেতে পারে। ল্যাজ মোটা হওয়া আটকানোর এর থেকে ভাল প্রতিষেধক নেই।
২) ব্রিগেডের সমাবেশে আসা লোকেদের উদ্দেশ্য বা কোন লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে তা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ নতুন কিছু নয়, বরাবর হয়ে আসছে। আমাদের বাল্যকালে, সিপিএম তথা বামফ্রন্ট যখন মধ্যগগনে, তখন একটি সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে দীর্ঘ লেখা বেরিয়েছিল, যাতে প্রশ্ন করা হয়েছিল “যে দেশে ব্রিগেড নেই সে দেশে কি গণতন্ত্র নেই?” পৃথিবীর সব দেশের গণতন্ত্র এক ছাঁচে ঢালা হোক, একই অর্থনীতি সব দেশে চলুক এই নিও লিবারেল বদমাইশি যাদের তত্ত্ব, বলা বাহুল্য তারাই এসব লিখেছিল। বিশ্বায়নের দুই দশকে আমরা, এ দেশের মধ্যবিত্তরা, এই বুলিগুলো মুখস্থ করে ফেলেছি। বহুজাতিক ব্র‍্যান্ডের জুতো আর জিনস পরতে পেরে আহ্লাদিত আমরাই এখন সগর্বে সকলকে বোঝাই গণতন্ত্র মানে হল পাঁচ বছর অন্তর ভোটটি দিয়ে বাকি সময়টা ঘুমিয়ে থাকা। বিরোধিতা মানেই “disruption” অতএব মিটিং, মিছিল, বনধ সবকিছুই কর্মনাশা। যাদের কর্ম নাশ হচ্ছে রোজ তারা ঘুমিয়ে থাকুক, আমাকে আমার কর্ম করতে দিক। এই চিন্তাভাবনা থেকেই ডিম্ভাত ব্যঙ্গ। এবং এই নিষ্ক্রিয়তার চাষবাসেরই ফল মমতা এবং মোদীর একনায়কত্ব, যেখানে প্রতিবাদ করলেন মানেই আপনি যথাক্রমে উন্নয়নবিরোধী এবং অ্যান্টি ন্যাশনাল। নিও লিবারেল অর্থনীতি, রাজনীতি এখন অস্তাচলে। জায়গা নিচ্ছে ট্রাম্প, ব্রেক্সিট, বলসোনারোর দল। অতএব ফ্রান্সে ব্রিগেড নেই, গণতন্ত্র আছে এবং সেখানে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন চলছে। স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানেও ব্রিগেড নেই। কিন্তু একনায়ক হতে চাওয়া রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রায় রোজ আপনারা যাকে “disruption” বলেন তা চলেছে। এমন অবস্থা যে মাঝেমধ্যেই সরকার ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। আপনি যদি এসব না জানেন বা জেনেও আন্দোলন, সমাবেশ দেখে নাক সিঁটকোন তার মানে একটাই — আপনি backdated বা আপনাদের ভাষায় uncool. অর্থাৎ down market.
৩) লড়াই, আন্দোলন, ইউনিয়ন — এসবকে অপ্রয়োজনীয়, “যাদের কোনো কাজ নেই তারা এসব করে” বলে গালাগাল দিতে হলে ভেবেচিন্তে দেবেন। জেট এয়ারওয়েজের কর্মীদের মত চাকরি থেকে রাতারাতি ছাঁটাই হয়ে গেলে আবার প্রকাশ কারাতের কাছে ছুটবেন না যেন। আরো একটা কথা ভেবে দেখবেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সত্যিই কোনো ব্রিগেড সমাবেশে আসা কয়েক লাখ লোকের কোন কাজ নেই, তাহলে সেটা জাতীয় সমস্যা। সেই সমস্যার সমাধানে আপনি কী করছেন? এই সমস্যার সমাধান দাবিও করেছেন কি কখনো? যদি না করে থাকেন তাহলে এই কর্মহীন লোকগুলোকে বিদ্রূপ করার বা নিন্দা করার অধিকার আপনার জন্মায় কী করে?
৪) “এদের তো কিনে নেওয়া খুব সোজা। এদের তো ডিম ভাত (মতান্তরে, স্থানান্তরে বা দিনান্তরে এক প্যাকেট বিরিয়ানি) খাইয়ে দিলেই চলে আসে”। এটা যদি মানুষের শস্তা হওয়ার প্রমাণ হয় তাহলে তো আপনি তো আরো শস্তা। এদের দূর দূরান্ত থেকে আনতে হলে অন্তত যে আনছে তাকে গাঁটের পয়সা খরচ করে বিরিয়ানি খাওয়াতে হয়। আপনি তো আলো ঝলমলে দোকান দেখলেই সপ্তাহান্তে সপরিবারে মলে চলে যান, যা দরকার নেই তা-ও নিজের পয়সা খরচ করে কেনেন, পাঁচ টাকার পপকর্ন দেড়শো টাকায় কেনেন। অর্থাৎ আপনাকে টুপি পরিয়ে আপনার চেয়ে অনেক বড়লোকেরা আরো বড়লোক হয়, এবং আপনার রুচি পছন্দকে কিনে ফ্যালে একটা সমাবেশ আয়োজনের চেয়ে অনেক কম খরচেই।
৫) উপর্যুক্ত কথাগুলো সবই “দেশটার কিস্যু হবে না” ধরণের, প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণপন্থী, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের প্রতি। এ ছাড়াও দুরকমের বামপন্থী আছেন। একদল তাঁদের অপছন্দের পার্টিকে গাল পাড়তে পারার আনন্দে ভুলেই গেছেন যে এই একই গালাগাল বরাবর তাঁদের পছন্দের পার্টিকে দেওয়া হয়েছে, কদিন পরেই আবার দেওয়া হবে। আরেক দল ঠান্ডা ঘরে বসে মার্কস, লেনিন, মাও মুখস্থ করা ছাড়া বিশেষ কিছুই করছেন না কিন্তু ব্রিগেড ফিগেডকে পাত্তা দেন না। কারণ তাঁরা তো কবেই বলেছেন যে কোনো মানুষই নিজের ইচ্ছায় ভোট দেন না এবং সকলকেই জোর করে ব্রিগেডে নিয়ে আসা হয়। এঁরা একদা ভাল করে বন্দুক চালাতে না শিখেই সশস্ত্র বিপ্লব করতে গিয়েছিলেন। সহযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করলেন, কেউ কেউ সারাজীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেলেন, এঁরা কে জানে কী করে আস্ত থেকে গেলেন। এখন হয় খবরের কাগজের স্তম্ভের আড়াল থেকে, নয় ফেসবুক ওয়ালের আড়াল থেকে শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এঁদের বোধ করি বেশি পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রথমোক্তরা কেউ বিমান বসুর মত আশি বছর বয়সে পুলিশের লাঠি খেতে যাবেন না। দ্বিতীয়োক্তরা কবিতা কৃষ্ণনের মত মাঠে ময়দানে রোজ ধর্ষণ, খুনের হুমকি অগ্রাহ্য করে রাজনীতি করবেন না। তবে মুখিয়ে আছি মোদীর মিটিংয়ের দিন এঁরা জোর করে আনা, ডিম ভাত খেতে আসা জনতা সম্বন্ধে কটা কথা বলেন তা দেখার জন্যে।
শেষে একটা কথা বলি। আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ (যে কোনো দলের) সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না।
আমার পকেটে হয়ত দুটো ডেবিট কার্ড, একটা ক্রেডিট কার্ড। সবকটা মিলিয়ে হয়ত আমার কাছে পাঁচশো ক্রেডিট পয়েন্ট আছে। ধরা যাক আমার স্ত্রীর পার্সেও দুটো ডেবিট কার্ড, আছে নশো ক্রেডিট পয়েন্ট। আমার বন্ধু প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, তার মোটে একটা স্যালারি অ্যাকাউন্টের কার্ড। তার সাথে তার বান্ধবী আছেন, যিনি হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে হাজার পাঁচেক টাকা আছে। আমাদের সাথে আমাদের পরিচারিকা আছেন, যাঁকে মাসে তিন হাজার টাকা মাইনে দিই। তাঁর কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। আমরা যদি কোনো সিনেমা হলে যাই বা মলে ঢুকি, পাঁচ জনের আত্মবিশ্বাস হবে পাঁচ রকমের। কারণ আমাদের ক্ষমতা ওই চত্বরে সমান নয়। কোনো কোনো জায়গায় পরিচারিকাকে হয়ত আমাদের সাথে বসতেই দেওয়া হবে না। কে জানে, হয়ত আমরাই চাইব উনি অন্য টেবিলে বসুন বা বাইরে অপেক্ষা করুন। কিন্তু আমরা যদি কোনো মিছিলে যাই বা ব্রিগেডে যাই, পাঁচজনেই সমান। আমাদের পরিচারিকার মত আমাদেরও ঘাসের উপর চটি পেতেই বসতে হবে। সুতরাং মিছিল বেঁচে থাক, মিটিং বেঁচে থাক, সেখানে যাওয়া মানুষের ক্ষিদে পেলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা বেঁচে থাক।
বরং “কেউ যদি বেশি খাও খাওয়ার হিসেব নাও, কেন না অনেক লোক ভাল করে খায় না।”

অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না

মৃণাল সেন প্রতিভাবান, মৃণাল সেন এ দেশে নতুন ধারার চলচ্চিত্রের দিকপালদের একজন, মৃণাল সেনের লেখার হাত চমৎকার — এসব গুণ সত্ত্বেও তাঁর একটা বড় দোষ তিনি রাজনৈতিক। ছবিতে বা ছবির বাইরে তিনি কখনো পাঁচিলের উপর বসে সিগারেট হাতে পা দোলাননি। নিরপেক্ষ হতে তাঁর বয়ে গেছে।
শুধু রাজনৈতিক নয়, তিনি প্রায়শই পার্টিজান। তাঁর ছবির রঞ্জিত মল্লিক যে চাকরি স্যুটেড বুটেড হওয়াটাকেই যোগ্য হওয়ার প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করে সেই চাকরি না পেয়ে স্যুট বুটের দোকানে আধলা ইঁট ছুঁড়ে মারে। তাঁর ছবিতে ফিল্ম ইউনিট নিজেদের শৌখিন মানবপ্রেমের অসারতা উপলব্ধি করে শুটিং বন্ধ করে ফিরে যায়। অতএব গত পরশু অব্দিও মৃণাল সেন আজকের ভদ্রলোকদের পাঞ্চিং ব্যাগও ছিলেন। প্রমাণ চাই? দিচ্ছি।
হয়ত আমার নিজের মুদ্রাদোষেই অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই রবিবাসরীয় কাগজে দেখলাম এক স্বনামধন্য প্রাক্তন আমলা নতুন বাঙালিদের নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন আজকের বাঙালি যে বাংলার সংস্কৃতি ভুলে গেছে, হিন্দি, ইংরিজি, বাংলা মিশিয়ে আজব ভাষায় কথা বলছে তার দায় যে নির্দিষ্ট কোন সরকারের ঘাড়ে চাপানো উচিৎ তা নয় তবে এর জন্যে আসলে দায়ী ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুঁজির পলায়ন, আর তারই দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নাকি বাঙালির ক্রমশ অবাঙালি হয়ে ওঠা। অবশ্য এমন নয় যে এই অভিযোগ ইনিই প্রথম করলেন। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর আউটলুক পত্রিকায় তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও একই কথা লিখেছিলেন। কিন্তু যে কারণে সেই আমলার লেখাটার কথা এখানে উল্লেখ করছি সেটা হল তিনি এক জায়গায় লিখেছেন
“এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের মতো কেবল পাড়ার মোড়ে বা রকে বসে আড্ডা না দিয়ে, কিংবা সরকারি চাকরি হল না — এই ক্ষোভে নিজেদের নষ্ট না করে রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। স্থানীয় কাউন্সিলরের আশীর্বাদে ধন্য হলে তারা ছোট ছোট হকার স্টল খোলে কিংবা জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজ়ন-এর মতো সংস্থার হয়ে মোটরবাইক চড়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। তারা কল সেন্টার বা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, আন্দোলনের চাহিদা ছাড়াই। তারা ঘাম ঝরায়, কিন্তু ১২ জুলাই কমিটির নাম শোনেনি কোনও দিন। এরা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়ায় ওতপ্রোত জড়িত, মোবাইল রিচার্জ বা ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত, কিন্তু এরা কেউ কোনও দিন সাহিত্যপত্রিকা বা জীবনানন্দের কবিতা পড়েনি।
এরা দিনরাত্রি কাজ করে, মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারাদের মতো মোটেই নয়।”
লেখাটা পড়া শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে রেখেছি সবে, এমন সময় হোয়াটস্যাপে এক সিনেমা অন্তপ্রাণ বন্ধু জানাল মৃণাল সেন প্রয়াত। লেখকের বক্তব্য সঙ্গত না অসঙ্গত তা বিচার করতে বসছি না এখন। শুধু বক্তব্য এই যে লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না, সম্ভবত আরেক ঘোষিত মার্কসবাদী ঋত্বিককুমার ঘটকের ক্ষেত্রেও নয়।
মৃণাল সেনের একাধিক ছবিতে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন এক অভিনেতা। প্রায় প্রতি সাক্ষাৎকারেই বলেন “মৃণালদার থেকে কত যে শিখেছি” ইত্যাদি। অধুনা নিজে ফিল্ম বানান। আমার মত অবসর যাপনের জন্যে ফিল্ম দেখা অশিক্ষিত লোকের সেসব ফিল্ম মুখে না রুচলেও ভদ্রসমাজে তাঁর ছবি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনিও কয়েকবছর আগে নবীন পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের ছবির সমালোচনায় এক জায়গায় লিখেছিলেন “আশির দশকের মৃণাল সেনের ছবির মত।“ কেন? না ছবিতে টানাটানির সংসার চালানো এক শ্রমিক দম্পতিকে দেখানো হয়েছিল যাদের জীবিকা অর্জনের লড়াই এত কঠোর যে ঠিক করে কথাও হয় না সারাদিন, দেখা হয় পলক পড়ার মত। আর ক্ষণিকের জন্যে ক্যামেরায় ধরা হয়েছিল একটি লাউডস্পিকারকে, যা দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আন্দোলনের সংবাদ বিসংবাদ। বারবার এসে পড়ছিল অর্থনৈতিক মন্দার নানা লক্ষণও।
অর্থাৎ মৃত্যুর পরে লোকের নিন্দা করতে নেই — এই সূত্র মেনে যত বিখ্যাত, অবিখ্যাত লোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি আমরা এখন দেখছি, পড়ছি তার অনেকগুলোর আড়ালেই আছে এই অনুভব, এই মতামত যে মৃণাল সেনের ছবি আসলে বাতিল সময়ের বাতিল দলিল। বাতিল মতাদর্শের বাতিল বুলি ছাড়া ও থেকে আর কিচ্ছু পাওয়ার নেই। কিছু কিছু লোকের কাজ নিজ গুণে এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায় যে সে কাজকে ভাল না বললে আবার রুচিশীল তকমা পাওয়া যায় না, উচ্চকোটির সদস্য হিসাবে পরিচয়টা নড়বড়ে হয়ে যায়। অগত্যা মৃণাল সেন সম্পর্কে গদগদ না হয়ে আজ অনেকেরই উপায় নেই। কিন্তু বাংলার ফিল্ম জগতের একজনেরও কাজ দেখলে কি মনে হয় যে কেউ “মৃণালদার” থেকে কিছু শিখেছেন?
সত্যি কথাটা স্বীকার করে ফেলা যাক। যাঁরা ছবি বানান আর আমরা যারা দেখি, কেউই বিশ্বাস করি না যে মৃণাল সেনের ছবিতে আর দেখার কিছু আছে। কেন করি না? কারণ স্রোতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা — এসবের অভ্যেস আমরা ‘মহাপৃথিবী’ ছবির ভিক্টর ব্যানার্জির মায়ের ডায়রির পাতার মতই পুড়িয়ে দিয়েছি। ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা বাধ্য হতে শিখেছি। বাধ্য হলেই যাবতীয় আরাম, যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য, যাবতীয় ভোগ্যপণ্য আমাদের হাতের মুঠোয় তা আমরা বুঝে গেছি। পোষ্যকে দুভাবে বাধ্য করা যায়। এক, কলার পরিয়ে। দুই, লোভ দেখিয়ে। বস্তুত লোভ দেখিয়ে বাধ্য করে নিয়ে কলার পরানোই সবচেয়ে উত্তম উপায়। আমরা বাঙালি ভদ্দরলোকেরা সেভাবেই বাধ্য হয়েছি। আমরাই তো বাংলা ছবির দর্শক, আমাদেরই কেউ কেউ বাংলা ছবির নির্মাতা।
আমরা এতটাই বাধ্য যে শুধু যে নিজেরা প্রতিবাদ করি না তা নয়, অন্যকে প্রতিবাদ করতে দেখলেও যারপরনাই রুষ্ট হই। তাই কলকাতায় মিটিং, মিছিল হলে বাসে আলোচনা করি গাঁয়ের লোকেদের কাজকম্ম নেই তাই এই সুযোগে কলকাতায় বেড়াতে চলে আসে, ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়। মাননীয় আমলা যাদের কথা লিখেছেন আর কি। “মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারা।”
এই যে সাদা কলারের আমরা, আমাদের কী করেই বা মৃণাল সেনের ছবি ভাল লাগবে? কলকাতায় মিছিল বেরোয়, ট্যাক্সিচালকরা ইউনিয়ন করে তা নিয়ে বাংলার বাইরের লোকেদের কাছে আমাদের যে লজ্জার শেষ নেই। অথচ কী আশ্চর্য দেখুন। বছরখানেক আগে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে কৃষকদের বিশাল মিছিল হল। সেখানকার ভদ্রলোকেরা অনেকেই সেই মিছিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কদিন আগে সারা দেশের কৃষকরা দিল্লীতে মিছিল করলেন। সেখানেও আমাদের মত ভদ্রলোকেরা খাবার নিয়ে, জল নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখানকার মত খবরও হল না কোন রাস্তায় কার গাড়ি আটকে পড়ে কার ফ্লাইট মিস হয়েছে। বাংলায় যখন কোন মিছিল, মিটিং হয় তখন আপনি তন্নতন্ন করে সংবাদের হাজারটা উৎস খুঁজেও একটা প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাবেন না। সেটা হল “কেন?” মানে মিছিলটা হল কেন? কোন দাবীতে? খবরটা আমাদের কেউ দেয় না কারণ আমরা জানতে চাই না। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে মিছিলটা এড়াতে পারব সেটুকু জানতে পারলেই আমরা খুশি। অতএব কী দরকার বাপু সিনেমার মধ্যে ওসব জিনিসের? রাজ্যটা অনেক দেরীতে উন্নয়নের রাস্তা ধরেছে, ওসব দেখলে বা দেখালে লোকে আবার যদি বিগড়ে যায়?
এভাবেই সত্যি সত্যি ভাল থাকা গেলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাদা কলারের লোকেরা লক্ষ্মী হয়ে থেকেও মৃণাল সেনের সর্বহারাদের মত দুর্গতিগুলো এড়াতে পারছে না। কারখানার অস্থায়ী কর্মীদের মতই বহুজাতিকের এক্সিকিউটিভের হুটপাট চাকরি চলে যাচ্ছে, কর্মী হিসাবে যেসব অধিকার জন্মগত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সে অধিকারগুলো কোম্পানি বলে কয়েই কেড়ে নিচ্ছে অথচ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলা যাচ্ছে না। ছ ঘন্টার বদলে আট ঘন্টা, আট ঘন্টার বদলে দশ ঘন্টা কাজ করেই চলেছেন। বাড়িতে এসেও ল্যাপটপ খুলে মালিকের লাভের কড়ি বাড়িয়েই চলেছেন। বেসরকারী ক্ষেত্রের বসেদের কথা বাদ দিন, সরকারপোষিত স্কুল কলেজের সামান্য টিচার ইন চার্জরাও সাক্ষাৎ হিটলার হয়ে উঠেছেন। সেই যে সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা, যারা ১২ই জুলাই কমিটির নাম শোনেনি, আন্দোলনের নাম না করেই সোনা মুখ করে কাজ করে, তারা এত ভাল আছে যে বারো-পনেরো হাজার টাকার জন্যে বাইক নিয়ে দিন নেই রাত নেই ঝড় নেই জল নেই সুইগি, জোমাটোর হয়ে ডেলিভারি করছে। পিঠে খাবারের বোঝা তবু এ খাবার যাবে না ছোঁয়া। ছুঁয়ে ফেললেই ভিডিও ভাইরাল হবে, সামান্য মাইনের, বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ও অধিকারবিহীন চাকরিটিও যাবে।
একজন লিখেছিলেন “খাওয়া না খাওয়ার খেলা যদি চলে সারা বেলা হঠাৎ কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না।” একেবারে যে কিছু ঘটছে না তাও নয়। কয়েক বছর আগেই উবের, ওলার আগমনে যারা সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল ঐ দালালদ্বয় এখন তাদের টাকা পয়সা কমিয়ে শুধু নিজেদের পকেট ভর্তি করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বাইপাসের উপর গাড়ি পেটাচ্ছে। আমি, আপনি তখনো জানতে চাইছি না দাবীগুলো কী কী?
আর কটা দিন সবুর করুন। এ আই আসিছে চড়ে জুড়ি গাড়ি। তখন আমার আপনার অবস্থাও অ্যামাজনের ডেলিভারি বয় বা উবেরের ড্রাইভারের মত হতে পারে। সেদিন মৃণাল সেনের কোরাস হয়ত খুব অলীক মনে হবে না। যে নায়ক আধলা ইঁট ছোঁড়ে তাকে যে স্রেফ নকশালই মনে হবে তাও ঠিক করে বলা যায় না। আজকের অর্থহীন তর্পণ বাদ দিন। মৃণাল সেনকে আসলে সেদিন আপনার দরকার হবে।
আজ যতই ফেসবুকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বান ডাকুক না কেন, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে না দেখেই মৃণাল সেনের ছবিকে আঁতেল আখ্যা দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল এবং আছে। কারণ ছবিগুলো পপকর্ন খেতে খেতে দেখা যায় না। অপমানে যেদিন সবার সমান হতে হবে, সেদিন বোঝা যাবে আসলে কোন ছবিগুলো আঁতেল, অর্থাৎ আমার আপনার কথা কোনদিন বলেনি, আমাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা, আমাদের টেনে নিয়ে চলা জীবনের কথা বলেনি, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর গোয়েন্দা গল্পের গাড্ডায় ফেলে রেখেছিল।
মৃণাল সেন মার্কসবাদী ছিলেন আমৃত্যু। পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে লেগে যখন এই বাংলায় অনেক আগমার্কা বামপন্থী কবি, অভিনেতা, গাইয়ে রাতারাতি আবিষ্কার করলেন তাঁরা এত বছর ভুল পথে ছিলেন, তখনো মৃণাল সেন অবস্থান বদলাননি। তা মার্কসবাদ ব্যাপারটাকেই যখন বাতিল করে দিয়েছিল সকলে তখন একজন মার্কসবাদীর চলচ্চিত্র ভাবনাকে বাতিল করে দেওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা জানেন হাওয়া বদলাচ্ছে। এতটাই বদলেছে যে ‘দি ইকনমিস্ট’ এর মত চরম দক্ষিণপন্থী পত্রিকা মার্কসের দ্বিশতবার্ষিকীতে লিখেছে পুঁজিবাদকে বর্তমান সঙ্কট থেকে বাঁচাতে হলেও মার্কস পড়তে হবে। অতএব কেউ যদি সচেতন হন, তাহলে এই নাম কা ওয়াস্তে তর্পণ শেষ হওয়ার পরেই মৃণাল সেনকে শিকেয় তুলে রাখার ভুল তিনি করবেন না। তবু এরকম বলার মানে হয় না যে বাংলা ছবির নির্মাতারা তাঁর মত সোচ্চার বামপন্থী ভাবধারার ছবি না বানালেই সেগুলো ফালতু। বলার কথাটা হল ছবিতে আটপৌরে জীবন, তার লড়াই, তার সঙ্কট না থাকাই ফাঁকিবাজি। সেই ফাঁকিবাজি করে, তাকে প্রশ্রয় দিয়ে মৃণাল সেনের প্রয়াণে গদগদ হওয়ার মানে হয় না।
সেই ফাঁকিবাজি না করার জন্যে মার্কসবাদী বা বামপন্থী ছবি বানাতে হয় না। অনেকেই তো বলেন পশ্চিমবাংলায় বাম শাসন ছিল অপশাসন। সেই অপশাসনের স্বরূপ নিয়ে কটা বাংলা ছবি হয়েছে? অথচ সারা পৃথিবীতেই তো অপশাসনের মধ্যে থেকেই দারুণ দারুণ ছবি হয়। ইরানের পরিচালকরা যেমন করেন। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের রক্তাক্ত, অস্থির সময়গুলো নিয়েই তো অসামান্য সব ছবি হয়। সেগুলো সবই যে বামপন্থী ছবি তা তো নয়। আবার একটা কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি।
মৃণাল সেন মারা যাওয়ার আগের রাতে নেটফ্লিক্সে আলফোনসো কুয়ারনের ‘রোমা’ দেখছিলাম। মেক্সিকোর ছাত্র আন্দোলন, গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় বানানো সাদাকালো, আবহসঙ্গীতবিহীন ছবিটা দেখতে দেখতে আমার মত ভেতো বাঙালি, ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে ক্ষীণ সম্পর্কযুক্ত দর্শকের বারবারই ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের ছবিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। এই ২০১৮তে তৈরি ছবিতে ১৯৭০-৭১ এর গল্প বলা হচ্ছে। এমনকি ১০ই জুন ১৯৭১ এ সংঘটিত কুখ্যাত কর্পাস ক্রিস্টি গণহত্যাও দেখানো হচ্ছে। মৃণাল সেন তো রাজনৈতিক হত্যাগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন কেবল কাগজের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে। এই বাংলার কেউ ‘রোমা’ বানালে বোদ্ধারা নির্ঘাত বলতেন “এ ছবি দিয়ে কী হবে? এ তো মৃণাল সেনের মত।“
‘রোমা’ ছবির যে সময়কাল তা এই বাংলাতেও অস্থিরতা, ছাত্র আন্দোলন, গণহত্যার সময়। ঠিক ১৯৭১ সালেই ঘটেছিল কাশীপুর গণহত্যা। এখন তো রাজ্যে কংগ্রেস সরকার নেই, সিদ্ধার্থশঙ্কর মৃত, সেই কান্ডের খলনায়করা সকলেই প্রায় ক্ষমতাহীন, নির্বিষ। কই হোক তো দেখি একটা ভাল ছবি সেই নিয়ে। বামফ্রন্ট আমলেও তো দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসার অনেক ঘটনা। নাহয় তাই নিয়েই হোক। এ আমলে ওসব নিয়ে ছবি করলে তো পুলিশে ধরবে না, উলটে একটা ভূষণ টুষণ জুটে যেতে পারে।
হবে না। কারণ “মৃণালদার” থেকে যদি স্রেফ একটা জিনিস শেখার থাকে, সেটা হল বুকের পাটা। ওটা আবার কারো শেখা হয়নি। আর মেধা? থাক সে কথা। বরং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসা চলুক। পার্টিজানদের ব্যাপারে অস্বস্তি কাটানোর সেরা উপায় তাদের কাল্ট ফিগার বানিয়ে দেওয়া। চিরকালই।

ভুল জায়গায় সিরিয়াস

দুনিয়াশুদ্ধ লোক জেনে গেছে বাঙালির বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই

এ লেখার শিরোনামের জন্য আমি এক অগ্রজ সাংবাদিকের কাছে ঋণী। তাঁর সঙ্গে যে সময় কাজ করতাম তখন নানা কথায় তিনি বলতেন “বাঙালি ভুল জায়গায় সিরিয়াস, তার ভুল জায়গায় আবেগ।” সত্যি বলতে তখন কথাটা শুনে বেশ রাগই হত। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে যা চলছে তাতে তাঁকে সামনে পেলে করজোড়ে নিবেদন করতাম “গুরু, তুমিই ঠিক। তুমিই সত্য।” কথাটা হোয়াটস্যাপেও লেখা যায়, কিন্তু তাতে আবেগটা (ভুল জায়গায় হলেও) ঠিক ফুটিয়ে তোলা যায় না।
বিষয়টা হল এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির টিভি বিজ্ঞাপন। জনগণ দেখছি যারপরনাই রুষ্ট। ডান, বাম, যখন-যেমন-তখন-তেমন নির্বিশেষে সকলেই গেল গেল রব তুলেছেন। বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতির জন্যে কেঁদে কেটে একসা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান তথা কবিতার প্যারডি বানিয়ে ফ্ল্যাট বেচছে প্রোমোটার। তাতে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ক্যাওড়াতলা পৌঁছে গেছে বলে অভিযোগ। যতদিন লোকে ফেসবুকে বিষোদগার করছিল তদ্দিন ব্যাপারটা নিয়ে আদৌ ভাবনা চিন্তা করিনি। কিন্তু তারপর জানলাম শ্রীরামপুরে (যেখানে প্রাসাদোপম ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা) নাকি এ নিয়ে কারা সব মিটিং মিছিলও করে ফেলেছে। ভুল জায়গায় সিরিয়াস হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
কার সংস্কৃতি কে রাখে? ভদ্দরলোকেরা আজকাল পারতপক্ষে ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেন না, কেউ করলে দিন রাত কানের কাছে বলতে থাকেন “এসব স্কুলের মিডিওকাররাও কিন্তু ওদের স্কুলের ফার্স্ট বয়দের থেকে ভাল।” যেন ইংরিজি মাধ্যম স্কুল থেকে ফি বছর শয়ে শয়ে শেক্সপিয়ার আর ডিকেন্স বেরোচ্ছে, বাংলা মাধ্যম থেকে কেবল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি লিট।
ইংরিজির জন্যে আকুতি না হয় তাও মানা গেল, ইদানীং আবার বাংলা সরিয়ে হিন্দিকে দ্বিতীয় ভাষা করবার হিড়িক পড়েছে বাঙালি বাবা মায়েদের মধ্যে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মাঝে একবার, কে জানে কোন লগ্নে, বললেন বাংলার সব শিশুকে বাংলা পড়াতেই হবে। তাতে প্রগতিশীল বাঙালিরা একেবারে রে রে করে উঠলেন। তখন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য — এসব মনে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী লগ্ন দোষ কেটে যেতেই আবার ওসব ভুলে গিয়ে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে নেমে পড়েছেন। সেসবের বিরুদ্ধে কে কে কোথায় কোথায় মিছিল করেছেন জানতে ইচ্ছে করে। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো উঠে যাচ্ছে। কদিন আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটাই উঠে যেতে বসেছিল, কিছু ক্ষুদিরামপ্রতিম মানুষ আপাতত আটকেছেন। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী কদিন আগে বলেছেন সরকার ভাবছে স্কুলগুলোকে ইংরিজি মাধ্যম করে দেবে কিনা। এসবের কটা প্রতিবাদ হয়েছে? বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর মানোন্নয়নের দাবীতে সরকারের পেছনে কজন লেগেছে? ওসবে কারোর আগ্রহ নেই। কোথায় কোন বিজ্ঞাপনে দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারডি করা হয়েছে তাই নিয়ে আন্দোলন।
এসব নাটক যতই করুন, দুনিয়াশুদ্ধ লোক জেনে গেছে বাঙালির বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নাহলে বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানির সাহস হয় না কলকাতার দৈনিকগুলোর প্রথম পাতায় ছাপার বিজ্ঞাপনের বয়ানটা স্রেফ গুগল ট্রান্সলেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়ার। নিশ্চিত থাকতে পারেন ওরকম তামিলে চেন্নাইয়ের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোলে বা অমন মালয়ালমে তিরুবনন্তপুরমের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোলে কোম্পানিটির সর্বভারতীয় সি ই ও টিকে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হত।
আর জানবে না-ই বা কেন? পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী বাঙালিদের কথা শুনেছেন?
“আরে ইয়ার, তোদের একটা কথা কতবার বলতে হবে?”
“বস, কাজটাতে এত এফর্ট দিলাম, অব এক পার্টি তো বনতা হ্যায়।”
“যা-ই বল, মেয়েটা কিন্তু একটু হটকে।”
“উফ! কাকিমা আলুর দমটা যা হয়েছে না। অসাম।”
কারোর দিকে আঙুল তুলে লাভ নেই। এই ভাষায় কথা বলছে আমার আপনার ভাই, বোন, ছেলেমেয়েরা। বিদ্রোহ, বিপ্লব যা করতে ইচ্ছে করে নিজের ঘর থেকে শুরু করুন না। আর যদি আমার মত অক্ষম হন, তাহলে স্রেফ “চেপে যান”, লোক হাসাবেন না।
আমার মত মফঃস্বলের গাঁইয়ার কথা ছেড়ে দিন, শহুরে বাঙালিদের মুখে, ফি হপ্তায় মলে যাওয়া বাঙালিদের কাছে গত এক দশক ধরে শুনছি বাংলা সিনেমায় নাকি নবজাগরণ এসেছে। তা নবজাগরণের যুগে বাংলা ছবির নাম কী হচ্ছে? ম্যাডলি বাঙালি; মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর; আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস, ঘরে অ্যান্ড বাইরে, অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজো। যেসব ছবির নাম তবু আগাগোড়া বাংলা সেগুলোরও টাইটেল কার্ডে বাংলা হরফ খুঁজে পাওয়া ভার। এমনকি আমাদের এ যুগের মহানায়ক, যিনি নাকি সংসদে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, তাঁর ছবির পোস্টারেও বাংলা হরফ খুঁজে হতাশ হয়েছি। সে ছবিটার রেডিও বিজ্ঞাপনে শুনলাম তিনি বললেন “Let’s celebrate পয়লা বৈশাখ, let’s celebrate Kabir.” উত্তমকুমার মরে বেঁচেছেন। আমার শুধু ভয় করে এই রিমেকের যুগে আবার সপ্তপদী রিমেক না হয়। শেক্সপিয়ারের সংলাপ বলা তাঁর দ্বারা হবে না, উৎপল দত্তকে লাগবে — এটা বোঝার বিনয় বা কান্ডজ্ঞান তো এখনকার মহানায়ক বা নির্দেশকদের মধ্যে দেখা যায় না। উত্তম, অজয় করের মত ভেতো বাঙালি তো এঁরা নন, সারাসসোয়াতির সাক্ষাৎ বরপুত্র সক্কলে।
তা ভদ্রমণ্ডলী এসবের প্রতিবাদ কবে করবেন? এতে ঐতিহ্যে আঘাত লাগছে না? নাকি আপত্তিটা দ্বিজেন্দ্রলালে হাত দেওয়া হয়েছে বলে? তা যদি হয় তাহলে ব্যাপারটা আরো হাস্যকর। দ্বিজেন্দ্রলাল স্বয়ং প্যারডি লিখতেন। রবীন্দ্রনাথের গান “সে আসে ধীরে, যায় লাজে ফিরে / রিনিকি ঝিনিকি রিনিঝিনি মঞ্জু মঞ্জীরে।” দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারডি “সে আসে ধেয়ে, এন ডি ঘোষের মেয়ে / ধিনিক ধিনিক ধিনিক, চায়ের গন্ধ পেয়ে।” আপনি বলতেই পারেন কাজটা ভাল হয়নি, আমাদের কবিগুরুকে নিয়ে মশকরা অতি গর্হিত ব্যাপার ইত্যাদি। কিন্তু যিনি নিজেই প্যারডিশিল্পী, তাঁর লেখার প্যারডি হলে আন্দোলনে নামা চলে না। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের কোন গানের বাণীর দিকে আদৌ কান না দিয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে পাঁচশো বাজনা বাজিয়ে বা মাঝখান থেকে গাইতে শুরু করার চেয়ে একখানা ভাল প্যারডি করা অনেক বেশি উদ্ভাবনী শক্তির পরিচায়ক। আচ্ছা সত্যি বলুন তো, এত যে দ্বিজেন্দ্রপ্রেম দেখা যাচ্ছে, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি” ছাড়া ওঁর লেখা আর কটা গান কজনের মনে আছে? গোটা পাঁচেকের বেশি কি? তাহলে যে গীতিকারকে পরশু অব্দি ভুলে ছিলেন তাঁকে নিয়ে সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক করে না বাজালেই নয়?
কারো কারো অবশ্য আপত্তি অন্যত্র। “এরকম একটা গানকে সামান্য ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করল? এর সাথে জাতীয় আবেগ জড়িয়ে…।” আবার ভুল জায়গায় আবেগ। বিজ্ঞাপনের ইতিহাস না ঘেঁটেও বোঝা যায় চিরকাল বহু জনপ্রিয়, আবেগজড়িত আসল গান, আসল সুরকে ব্যবহার করে বহু বিজ্ঞাপন তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তেই যেমন একটা ধূপের বিজ্ঞাপনে ভীষণ বেসুরো গলায় “আমার এ ধূপ না পোড়ালে / গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে” গাওয়া হচ্ছে। বাজি রেখে বলতে পারি এই লেখায় যে মুহূর্তে টাইটান শব্দটা আপনি পড়বেন, অমনি মাথায় একটা সুর বেজে উঠবে। সেটা কী আসলে? মোজার্টের ২৫ নম্বর সিম্ফনির একটা অংশ। ওটা টাইটানের বিজ্ঞাপনে ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি। ওটা বাদ দিয়ে আজ আর টাইটান ঘড়ির কথা ভাবাই যায় না। তাতে কী এসে গেল মোজার্টের? কী-ই বা এসে যায় রবীন্দ্রনাথের? নাকি বক্তব্যটা এই যে আসল গান গাও আপত্তি নেই, প্যারডি গেয়ে জিনিস বেচা চলবে না? এ যুক্তি তো খন্ডনেরও অযোগ্য।
সত্যি সত্যি আন্দোলন করবেন? ইস্যু কম পড়িয়াছে? কেন? কোথাও কোন চাকরিতে কর্মীদের অধিকার বলে কিছু থাকছে না। তাই নিয়ে পথে নামুন না। এ তো আপনারই ইস্যু, চাষাভুষোদের ইস্যু নয়, যারা মিছিলে নামলে আমরা সাদা কলারের চাকুরেরা বলি “কোন কাজ নেই, কলকাতায় ঘুরতে আসে আর ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়।”
গত তিরিশ বছরে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ঠ্যালায় কলকাতার জলাভূমি প্রায় নিশ্চিহ্ন, মফঃস্বলে পুকুর চুরি আর বাগধারা হয়ে নেই। তার ফলে ক্রমবর্ধমান জঞ্জালের স্তূপ, সাবমার্সিবল পাম্পের বাড়বাড়ন্তে ভূগর্ভের জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। অথচ এগুলো কোন রাজনৈতিক দল ইস্যু বলে মনে করে না। এসব নিয়ে আন্দোলন করুন না। স্তূপীকৃত জঞ্জাল কোন সংস্কৃতির পরিচায়ক?
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সুবিধার্থে আইন কানুন বদলে ফেলে হেরিটেজ বিল্ডিং ভেঙে ফেলার সুবব্যবস্থা হয়েছে। তাতে ঐতিহ্য সঙ্কটে পড়েনি? তার প্রতিবাদ করবেন না?
উন্নয়নের নামে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে গেল। আপনারা সৌন্দর্যায়ন হচ্ছে বলে আহ্লাদে আটখানা হলেন। গাছের চেয়ে কংক্রিট ভাল — এই সৌন্দর্যবোধ কোন সংস্কৃতির অভিজ্ঞান? এখন বায়ু দূষণে দিল্লীর সাথে পাল্লা দিচ্ছে কলকাতা। তা নিয়ে আন্দোলন করবেন না? বাঙালির তো প্রাণ রক্ষার সঙ্কট সেটা। প্রাণ বাঁচলে তবে তো সংস্কৃতি বাঁচবে। ঐতিহ্য কার? মানুষেরই তো?
নাঃ! বাদ দিন। এত কে ভাবতে যাবে? আর এসব নিয়ে মিছিল করতে গেলে আবার চড়াম চড়াম ঢাক বাজার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়ে “শ্রীকান্তর গান এত ভালবাসতাম, আর ও কিনা এই বিজ্ঞাপনে গাইল!” বলে হা হুতাশ করতে করতে সিরিয়াস আলোচনা করা যাক।

সুবোধ কুমারের সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

– শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?

অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।

সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।

আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।

সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিংয়ের ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।

সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধ কুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।

আরও পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পারো না পারো, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”

বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।

এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”

সৃষ্টির মনের কথা

“ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”

দুঃসময়। বড় দুঃসময়ে বেঁচে আছি। সকালের কাগজ ১৯৯২ এর স্মৃতি উশকে দিয়ে লিখছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ হুমকি দিয়েছে রাত পোহালেই দু লক্ষ লোক ঢুকে পড়বে অযোধ্যায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮৯ মনে করানো রথযাত্রার প্রস্তুতি। রাজ্য সরকার শীর্ষস্থানীয় আমলাকে পাঠিয়েছে বিজেপির সাথে যাত্রাপথ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
ওদিকে আসামে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভিড় বাড়ছে, বহু পরিবার ছিন্নভিন্ন, আত্মহত্যার পর আত্মহত্যা। সংসদে পাশ হওয়ার অপেক্ষায় নতুন নাগরিকত্ব আইন। যে আইন পাশ হলে অহিন্দু মানুষের ভারতের নাগরিক হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে” শুধু কবিতার পংক্তি হয়ে যাবে।
এসব ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। আর বিরোধীদের রাজনীতিটা কিরকম?
দিন দুয়েক আগে কংগ্রেস নেতা সি পি যোশী বললেন একমাত্র একজন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীই পারেন রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। মনে করিয়ে দিলেন যে রাজীব গান্ধীই বাবরি মসজিদের তালা খুলিয়ে পুজো আচ্চার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। যোশী আরো বলেছেন হিন্দু ধর্মটা একমাত্র ব্রাক্ষ্মণরাই বোঝে। নরেন্দ্র মোদী, উমা ভারতী এরা আর কী জানবে? নীচু জাতের লোকেদের হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলার কোন অধিকারই নেই। যোশীজিকে যিনি ধমকে দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ, সেই রাহুল গান্ধী কেবল মন্দির থেকে মন্দিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তাই হিন্দুত্বের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর বিজেপি প্রশ্ন তুলেছিল তিনি কি হিন্দু? উত্তরে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেছিলেন রাহুল যে শুধু হিন্দু তাই নয়, তিনি রীতিমত পৈতেওয়ালা হিন্দু।
বাংলার অগ্নিকন্যা তথা কর্ণধার বিজেপিকে আটকাতে দীর্ঘদিন অব্দি সাধারণ মুসলমানকে ভুলে ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সমর্থনে ভর দিয়ে চলছিলেন। বছরখানেক হল সেসব চাপা দিতে আবার ব্রাক্ষ্মণ সম্মেলন, বজরংবলী পুজো, জনসভায় গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ, দুর্গা বিসর্জনের বিষণ্ণতাকে আমুদে কার্নিভালে পরিণত করায় মেতেছেন। তাতেও যথেষ্ট হচ্ছে না মনে করে শেষমেশ আয়করদাতাদের টাকা পুজো কমিটিগুলোকে বিলিয়েছেন। এন আর সি নিয়ে দিনকতক লোকলস্কর নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচি করার পর এখন স্পিকটি নট। অবশ্য ওটা নিয়ে বেশি পরিশ্রম কেনই বা করতে যাবেন? তিনিই তো প্রথম সাংসদ যিনি সীমান্তবর্তী এলাকায় সিপিএম বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকাচ্ছে, এদের বার করে দেওয়া হোক — এই দাবী করে লোকসভার স্পিকারের দিকে কাগজ ছুঁড়েছিলেন।
আর বামপন্থীরা? সর্ববৃহৎ পার্টির নেতাদের একাংশ তো মনে করছেন বিজেপিকে হারাতে উপর্যুক্ত কংগ্রেসেরই হাত ধরা দরকার এক্ষুণি। নিজেদের লড়ার ক্ষমতার উপর এমন আস্থা আর কাদের আছে? এন আর সি, নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বামেদের যে কী মতামত কে জানে! শীর্ষ নেতৃত্ব একবার বলেছিলেন দেখতে হবে নিরপরাধ লোকের যেন হয়রানি না হয়। মানে মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণে তার বংশপরিচয়কে মানদণ্ড ধরায় বোধহয় তাঁদের আপত্তি নেই। যাহা লিগ্যাসি তাহাই লিগাল।
অর্থাৎ দেশের সর্বত্র তাঁদের ভারতীয়তা, তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে মানুষের কাছে। এই প্রমাণ দীর্ঘকাল ঠারেঠোরে চাওয়া হত এদেশের মুসলমানদের কাছে। এখন ঘাড় ধরে চাওয়া হচ্ছে। আসামের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও সেই আওতায়। সংখ্যালঘুদের প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা অপ্রিয়, অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের খুন করলে শাস্তি হয় না চাকরি হয়, ধর্মস্থান ভেঙে দিলে অপরাধ হয় না মন্ত্রিত্ব হয়, গালাগালি দিলে বাহাদুরি হয়।
এমতাবস্থায় প্রায়শই “সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় — দ্বেষ।” মনটা এমন কোন সৃষ্টি খুঁজতে থাকে যার মনের কথা ভালবাসা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম অনুভব সিনহার ছবি ‘মুল্ক’ (দেশ)। হিন্দু, মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গমস্থল বেনারসের পুরনো বাসিন্দা বৃদ্ধ আইনজীবী মুরাদ আলি মহম্মদকে কাঠগড়ায় উঠতে হল এবং প্রমাণ করতে বলা হল তিনি তাঁর মুল্ক অর্থাৎ দেশকে ভালবাসেন। তিনি নিয়মিত আয়কর দেন, পুলিশের খাতায় কখনো তাঁর নাম ওঠেনি, এমনকি গাড়ি চালানোর সময়ও কখনো ট্র‍্যাফিক আইন ভাঙেননি। কিন্তু ওসব যথেষ্ট নয় একথা প্রমাণের জন্যে যে তিনি দেশপ্রেমিক। সন্ত্রাসবাদী নন।
ধর্মীয় মৌলবাদ আমাদের উঠোন পেরিয়ে চলে আসছে আমাদের সবার শোবার ঘর অব্দি। তফাৎ শুধু এই যে সংখ্যালঘুর মৌলবাদকে ঢুকতে হচ্ছে লুকিয়ে চুরিয়ে, সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ আসছে সামনের দরজা দিয়ে। আলি মহম্মদের ভোলেভালা ক্লাস টেন পাশ ভাই বিলালের ছেলে শাহিদ, যাকে ছোটবেলায় ধরে বেঁধে কোরান পড়িয়ে ওঠা যায়নি, সে কাশ্মীরের বন্যাত্রাণে অর্থসাহায্য করছে ভাবতে ভাবতে হয়ে গেল জেহাদি নেটওয়ার্কের সদস্য। আর বাড়ির উল্টোদিকের পান বিক্রেতা চৌবে, যে আলি সাহেবের প্রাণের বন্ধু, তার অকর্মণ্য ছেলে বুক ফুলিয়ে “দেশের কাজে” নেমে পড়ল বাইকের সামনে পতাকা লাগিয়ে। কী সেই কাজ? লোকলস্কর ডেকে এনে আলি সাহেবের গ্যারেজ ভেঙে দেওয়া, হিন্দু উৎসবের আগে লাউডস্পিকারের মুখটা মুসলমানদের বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে তারা টের পায় “গোটা দেশ তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ”, রাতে আলি সাহেবের বাড়িতে পাথর ছোঁড়ার আয়োজন, দেয়ালে এবং দরজায় লিখে দেওয়া “TERRORIST”, “GO TO PAK”।
এই ছবিতে অনুভব সিনহার সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত আমাদের অনেকের মনে তৈরি হওয়া চড়া একরঙা ছবিগুলো মুছে দেওয়া। এ ছবির হিন্দুরা নানারকম, মুসলমানরাও তাই।
ধর্মপ্রাণ অথচ গোঁড়ামিহীন আলি মহম্মদ আছেন, কোরান ঠিকমত না পড়েও জেহাদী হওয়া ভাইপো শাহিদ আছে, অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের ভুয়ো এনকাউন্টারবাদী অফিসার দানিশ জাভেদও আছেন। তিনি মনে করেন সন্ত্রাসবাদীদের গ্রেপ্তার না করে শেষ করে দেওয়া উচিৎ কারণ তারা মুসলমানদের বদনামের কারণ।
হিন্দুদের মধ্যে চৌবে আছেন, যিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে বন্ধু আলির বাড়িতে কোরমা, কালিয়া খেতেন অথচ শাহিদের অপরাধ প্রকাশ হতেই বিরাট হিন্দু হয়ে উঠলেন এবং নিঃসংশয়ে বুঝে নিলেন “আমার ছেলে ঠিকই বলে। ওরা ঐরকমই।“ কিন্তু আলি সাহেবের আরেক বন্ধু সোনকর আছেন, যিনি ১৯৯২ এর ৬ই ডিসেম্বরের অভিশপ্ত রাতে চৌবেকে সঙ্গে নিয়ে আলি সাহেবের পরিবারকে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলেন। যিনি গোটা মহল্লার বিরুদ্ধে গিয়ে আলি সাহেবের পুরো পরিবারকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার চেষ্টা চলার সময়ে পাশে থাকলেন। আলির প্রবাসী ছেলে এসে যখন বলল এ বাড়ি ছেড়ে তার সাথে ইংল্যান্ড চলে যাওয়াই ভাল, তখন সোনকরকে দেখিয়েই আলি সাহেব বললেন “আমরা চলে যাব? আমি নিজেকে কী জবাব দেব? যে আমি দেশদ্রোহী? পাড়ার লোককে সোনকর কী জবাব দেবে? ও বলবে ও দেশদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?”
সর্বোপরি আছেন আরতি মহম্মদ — আলি সাহেবের হিন্দু পুত্রবধূ। একজন বেপথু হয়েছে বলে পুরো পরিবারটাকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার প্রচেষ্টাকে বিফল করার দায়িত্ব শেষ অবধি যার ঘাড়ে পড়ে। মুসলমানদের ঝামেলা মুসলমানরাই সামলাক, কোর্ট তো বলে দিয়েছে ওরা টেররিস্ট — বাবা-মায়ের এইসব আবোলতাবোল কথাবার্তা উড়িয়ে দিয়ে ঘাড় সোজা করে লড়ে যায় মেয়েটি। অথচ বেনারসে আসার আগে স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়েছিল সে, কারণ আলি সাহেবের ছেলে আফতাব চাইছিল সন্তানের জন্মের আগেই যেন তার ধর্মটা ঠিক করে রাখা হয়। শুনানিতে যাওয়ার সময় কিন্তু সে মন্দিরের প্রসাদী ফুল মাথায় ছুঁইয়ে যায়।
আরো এক দল মানুষ আছেন আলি সাহেবের মুল্কে, যাদের কথা না বললেই নয়। কিছু লোক যারা মসজিদে নমাজ পড়তে এসে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় শাহিদ আর বিলালের শাহাদাত উদযাপন করতে আসার জন্যে এবং প্রবল ধমক খায়। আলি সাহেব তাদের জানিয়ে দেন শাহিদ যা করেছে তা শাহাদাত নয়, সন্ত্রাস। যারা তাঁর বাড়িতে পাথর ছুঁড়েছে তারাও যে সন্ত্রাসীই সেকথা তিনি বলে এসেছেন এফ আই আর নিতে অনিচ্ছুক দারোগাকে।
মসজিদে ফিসফিসিয়ে কথা বলা লোকগুলোর দলেই পড়েন সরকারপক্ষের উকিল সন্তোষ আনন্দ। সাক্ষ্যপ্রমাণ না-ই থাক, মুসলমানবিদ্বেষের কোন অভাব নেই তাঁর মধ্যে। তিনি জানেন এখন কেস জিততে হলে বিচারবিভাগকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে হয়; হোয়াটস্যাপ, ফেসবুককে হাতিয়ার করতে হয়।
ছায়াছবি হিসাবে অনায়াসেই আরো ভাল হতে পারত ‘মুল্ক’। তাপসী পান্নু আরো জোরালো আরতি হতে পারতেন, আদালতে তাঁর অতি মূল্যবান closing argument চিত্রনাট্যের সাহায্য পেলে আরো কম বক্তৃতা হতে পারত। বিচারকের শেষ কথাগুলোও, যদিও অত্যন্ত জরুরী, অতটা বক্তৃতার মত না শোনালে নিঃসন্দেহে আরো ভাল হত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কথা এই সময়ে এই ছবিটার প্রয়োজন ছিল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আলি সাহেবরূপী ঋষি কাপুর যখন সন্তোষ আনন্দরূপী আশুতোষ রানাকে প্রশ্ন করেন “আমার দেশে আমাকে স্বাগত জানানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?” তখন প্রশ্নটা তাঁর একার থাকে না, কোটি কোটি ভারতবাসীর হয়ে দাঁড়ায়। সেইসব ভারতবাসীর যাঁদের পান থেকে চুন খসলে পাকিস্তানি বলে সম্বোধন করা হয়, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়ে যাদের দিকে আড়চোখে, বাঁকা হেসে তাকানো হয়।
তবে সবচেয়ে মনে রাখার মত মুহূর্ত তৈরি হয় আদালতে নয়, বাড়ির ছাদে। ভাই বিলালের উকিল থেকে কেসে অন্যতম অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার পর শব্দহীন বিনিদ্র রাতে পুত্রবধূকে আলি সাহেব বলেন “তবসসুম যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এল, তখন আমার সাথে খুব ঝগড়া করত, বলত ‘তুমি আমায় ভালবাস না।’ আমি বলতাম ‘বাসি তো। খুব ভালবাসি।’ ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”
দেশকে ভালবাসার প্রশ্ন উঠতে তাঁর মনে পড়ল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা, মায়ের কথা নয়। “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগানের পরাভবে পূর্ণিমার তাজমহলের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুরাদ আলি মহম্মদের দেশপ্রেম।

ভালবাসার শক্তি

তারা খেলতে বেরিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে, পোষা জন্তুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষিত হয়ে গুমখুন হচ্ছে, অকারণে যখন তখন পিতৃহারা হচ্ছে, এমনকি শিশুদের শব ভেসে উঠছে আমাদের সমুদ্রতীরে

রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ‘গান্ধী’ ছবিটা অসংখ্যবার দেখেছি। ছোটবেলার দোসরা অক্টোবরগুলোয় দেখতাম আর কিছু দেখার ছিল না বলে। পরে স্বেচ্ছায় দেখেছি বেশ কয়েকবার। যে দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারি না সেটা হল বেলেঘাটায় গান্ধীজির অনশনের দৃশ্য।
অসুস্থ তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন, ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না থামলে অনশন ভাঙবেন না। কলকাতার দাঙ্গার হোতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দিকে পাশে নিয়ে জনগণের কাছে নেহরু দাঙ্গা বন্ধ করার আবেদন করলেন, বললেন “আমাদের পাগলামির জন্যে গান্ধীজির জীবন বিপন্ন।“ তার পরের দৃশ্যে দাঙ্গাবাজরা গান্ধীজির পায়ের কাছে অস্ত্র ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় তাদের মধ্যে থেকে এক ক্ষিপ্ত হিন্দু যুবক এসে কোন শিশুর পায়ের একপাটি জুতো ছুঁড়ে মারল তাঁর বুকের উপর।
“খাও এটা। খাও। আমি তো নরকে যাবই। কিন্তু তোমার মৃত্যুর পাপ নিয়ে যাব না।“
“সে তো শুধু ঈশ্বর জানেন কে নরকে যাবে,” গান্ধীজির উত্তর।
“খুন করেছি আমি। একটা ছোট বাচ্চাকে। মাথাটা দেয়ালে ঠুকে মেরে ফেলেছি।“
“কেন?”
“কেটে ফেলেছে… আমার এইটুকু বাচ্চাটাকে… মুসলমানরা মেরে ফেলেছে।“
“এই শোক কাটিয়ে ওঠার একটা রাস্তা আছে। এমন একটা বাচ্চাকে খুঁজে বার কর যার বাবা-মা খুন হয়ে গেছে। তাকে মানুষ কর। বাচ্চাটা যেন মুসলমান হয়। আর সেভাবেই তাকে মানুষ কোর।“
বিস্ফারিত নেত্রে একথা শোনার পর চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে গান্ধীর পায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে সেই সন্তানহারা, শিশুহন্তা পিতা। ক্ষমা প্রার্থনা করে।
যতবার দেখেছি ছবিটা, এই জায়গাটায় এসে মন বিদ্রোহ করেছে। মনে হয়েছে এমনটাই হওয়া উচিৎ বটে কিন্তু একমাত্র গান্ধীর উচ্চতার মানুষই ওভাবে ভাবতে পারেন। একজন সাধারণ মানুষ কি পারে? অসম্ভব, এ অসম্ভব।
একেবারে অসম্ভব যে নয় তার প্রমাণ পেতে অপেক্ষা করতে হল এই অবিশ্বাসী মধ্যবয়স অবধি। যখন রামনবমীর মিছিল নিয়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তিতে আততায়ীরা আসানসোলের এক মসজিদের ইমাম মৌলানা ইমদাদুল রশিদির কিশোর সন্তানকে খুন করল, আর তিনি বললেন যদি কেউ এর প্রতিক্রিয়ায় কোনরকম হিংসার আশ্রয় নেয় তাহলে তিনি মসজিদ ছেড়ে, আসানসোল ছেড়ে চলে যাবেন।
সেটা এবছর মার্চ মাসের ঘটনা। ঠিক তার আগের মাসে অঙ্কিত সাক্সেনা বলে এক হিন্দু যুবককে খুন করা হয় মুসলমান মেয়েকে ভালবাসার অপরাধে। তার বাবা যশপাল সাক্সেনাও একগলা পুত্রশোকের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেন “হ্যাঁ আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে তারা মুসলমান। কিন্তু তা বলে সব মুসলমানকে খুনী বলে দেগে দেওয়া যায় না। সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর কাজে আমাকে ব্যবহার করবেন না। ব্যাপারটাকে ধর্মের সঙ্গে জড়াবেন না, পরিবেশ বিষিয়ে দেবেন না।“
কিন্তু কে শুনছে তাঁর কথা, তাঁদের কথা? অপরবিদ্বেষ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। যার চামড়ার রং আমার মত নয় তার প্রতি বিদ্বেষ, যে আমার ভাষায় কথা বলে না তার প্রতি বিদ্বেষ, যে মূলত আমার রাজ্যের বা দেশের বাসিন্দা নয় তার প্রতি বিদ্বেষ, যার খাদ্যাভ্যাস আমার মত নয় তার প্রতি বিদ্বেষ, সর্বোপরি যে অন্য ধর্মের লোক তার প্রতি বিদ্বেষ।
এই সর্বব্যাপী বিদ্বেষ দিয়ে আমরা আমাদের শিশুদের জন্যে এক ভয়াবহ পৃথিবী তৈরি করেছি। তারা খেলতে বেরিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে, পোষা জন্তুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষিত হয়ে গুমখুন হচ্ছে, অকারণে যখন তখন পিতৃহারা হচ্ছে, এমনকি শিশুদের শব ভেসে উঠছে আমাদের সমুদ্রতীরে।
নব্বইয়ের দশক থেকে সৌদি আরবপুষ্ট যে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ পৃথিবীজুড়ে থাবা ছড়িয়েছিল তার কার্যক্রম ছিল জনবহুল জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ বা কয়েকজন সন্ত্রাসবাদীকে দিয়ে কোন জনবহুল জায়গায় মানুষকে বন্দী করে গণহত্যা। দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের মাঝখানে নিতান্ত সাধারণ হয়ে ঘোরাফেরা করত সেই সন্ত্রাসীরা। যাদের পারিভাষিক নাম স্লিপার সেল। একদিন অতর্কিতে হানা দিত তারা, প্রায়শই আত্মহনন যার অঙ্গ। আল কায়দা থেকে আইসিসের হাত ঘুরে অধুনা সেই সন্ত্রাসবাদ অনেকাংশে স্তিমিত। এখন পৃথিবীর সর্বত্র দেখছি স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাস আরো নির্দিষ্ট, আরো ব্যক্তিগত। কোথাও গোপন শিবির করার দরকার হচ্ছে না, মৌলবাদী ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ মস্তিষ্কে গুঁজে দেওয়ার জন্যে প্রয়োজন পড়ছে না কোন দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের। হাতের স্মার্টফোনেই চলে আসছে উশকানিমূলক প্রোপাগান্ডা, চতুর ভুয়ো খবর। এখানে আলাদা করে কোন স্লিপার সেল নেই কারণ আমি, আপনি, আমরা সবাই একেকজন স্লিপার সেল। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, টুইটার, অর্ণব গোস্বামী ও সম্প্রদায় প্রকাশ্যেই আমাদের মধ্যে অহোরাত্র বুনে যাচ্ছে ঘৃণার বীজ। আমাদের কোষে কোষে ঘুমিয়ে থাকা সেই ঘৃণা মুহূর্তে আমাদের করে তুলছে সন্ত্রাসবাদী। যে মুহূর্তে কেউ ছড়িয়ে দিল অমুকের ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা আছে, এই আমি, এই আপনি দৌড়লাম তাকে পেটাতে। কেউ চিৎকার করে বলল অমুক গরু চুরি করে পালাচ্ছে। সবাই মিলে পেটাতে গেলাম তাকে। মারতে পাশবিক সুখ হচ্ছে। মারতে মারতে মরে গেলে আরো সুখ।
আমি, আপনি মানুষ মারছি আর আমাদের দেখে ছোটরাও শিখছে মানুষ খুন করা নেহাত জলভাত। আফরাজুলকে খুন করে পুড়িয়ে দিয়েছিল যারা তাদের মধ্যে ছিল কয়েকজন চোদ্দ পনেরো বছরের ছেলে। আট বছরের আসিফার ক্রমাগত ধর্ষণ এবং খুনেও যুক্ত ছিল এক অপ্রাপ্তবয়স্ক। মাদ্রাসার ছাত্র আজিমকে খুন করে ফেলল অপ্রাপ্তবয়স্করাই। শুধু গ্রীনহাউস গ্যাস নয়, ঘৃণার বিষবাষ্পে পরিপূর্ণ এক বায়ুমন্ডলে বেড়ে উঠছে আমার, আপনার সন্তান। শুধু বড়দের কাছে নয়, সমবয়স্কদের সাথেও সে নিরাপদ নয়। আজকাল মনে হয় শিশুরা জন্মাচ্ছে হয় খুন হতে নয় খুনী হতে। নিরন্তর শক্তিক্ষয় হচ্ছে — ভালবাসার শক্তি। যে শক্তি একটুও অবশিষ্ট থাকলে শেষ পর্যন্ত খুন করা থামিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া যায়।
হিন্দুরা যাকে নরক বলেন, মুসলমানরা বলেন দোজখ, খ্রীষ্টানরা Hell, তা বোধহয় এমন পৃথিবীর চেয়ে ভয়ঙ্কর নয়।

থামো, ভাবো

আমাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে কেউ যদি বলে “ঐ একটা লম্পট ধর্ষক যাচ্ছে”, তাহলে আমার বলবার কিছু নেই

ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার হিড়িকের পাশাপাশি আমাদের ছাত্রজীবনের শেষ দিক থেকেই সাংবাদিক হওয়ার হিড়িক দেখেছি। বিখ্যাত হতে কে না চায়? টিভিতে মুখ দেখানোর অভিলাষ বা কাগজে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আশ বহু ছেলেমেয়েকে গত দুই দশকে সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট করেছে। পেশার সুবিধাগুলো এত দৃশ্যমান যে এই একটা অন্যরকম পেশায় যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করলে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বাবা-মায়েরাও আপত্তি করেননি, উলটে সাধ্যাতীত সাহায্য করেছেন। আত্মীয়স্বজনরাও সপ্রশংস চোখে তাকিয়েছে। কিছু সত্যিকারের ভাল প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা একগাদা জার্নালিজম স্কুল এই হিড়িকটাকে আরো উশকে দিয়েছে।
এই হিড়িক কলকাতাঘেঁষা মফঃস্বলে বসে আমার সাড়ে তেরো বছরের সাংবাদিক জীবনে খুব টের পেয়েছি। বহু অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে তাদের বাবা-মায়ের সাথে, যারা একটু বেশি সপ্রতিভ তারা একাই, আমার কাছে এসেছে কী করে সাংবাদিকতা পড়া যায়, কী করে সাংবাদিক হওয়া যায় সেই প্রশ্ন নিয়ে। আমার চাকরিজীবনের প্রথম তিন চার বছর বাদ দিলে বাকি সময়টা তথ্যগুলো দিয়েও তাদের নাগাড়ে নিরুৎসাহিত করে গেছি। আমি যে কলেজের ছাত্র সেই কলেজের মাস্টারমশাইরা বছরখানেক আগে এই একই ব্যাপারে আমাকে বলতে ডেকেছিলেন। সেখানে গিয়েও খুব উৎসাহব্যঞ্জক কিছু বলতে পারিনি। এই আচরণে অনেকেই বা সকলেই অসন্তুষ্ট হয়েছেন, হয়ত প্রকাশ করেননি। গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী তাঁদের মধ্যে যাঁরা লক্ষ্য করেছেন তাঁরা আশা করি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
কোন পেশায় সবাই ভাল লোক নয়, সব পেশারই ভালমন্দ আছে — এই জাতীয় ধ্রুব সত্য বলে যে সত্যকে আজ আর আড়াল করা যাবে না সেটা এই যে আমাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে কেউ যদি বলে “ঐ একটা লম্পট ধর্ষক যাচ্ছে”, তাহলে আমার বলবার কিছু নেই। কারণ এদিক থেকে আমার পেশার বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আমি নিজে যদি তেমন ইতর না-ও হই, তেমন ইতররা যে আমার পেশায় আছে তার প্রচুর তথ্যপ্রমাণ জনসমক্ষে এসে গেছে। আজ যদি কোন বাবা-মা বলেন “আমার মেয়েকে আর যা-ই হোক সাংবাদিকতা করতে দেব না” তাহলে তাঁদের রক্ষণশীল বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আমিও মেয়ের বাবা। আমিই কি শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গলে জেনেশুনে মেয়েকে ছেড়ে দেব? কোন বাবা-মাই কি তা পারে?
যেদিন গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে এই পেশাটার আমার আর দরকার হবে না সেদিন এ বিষয়ে আরো লিখব। আজ শুধু এটুকু বলি যে আমার মহিলা সহকর্মীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেছে গত কয়েকদিনে। কারণ পুরুষ হয়ে জন্মানোর সৌভাগ্যে আমরা জানতেই পারি না এমন অনেক নিপীড়ন সহ্য করেও তাঁরা আমাদের সমান তালে কাজ করেন।
যে তরুণ তরুণীরা এখনো সাংবাদিক হতে চায় তাদের বলি, থামো, ভাবো, তারপর সিদ্ধান্ত নাও। খ্যাতির শুরু আছে, শেষ আছে। কুখ্যাতির শেষ নেই।