প্রজাতন্ত্রসাধনা

বেহুলা লখিন্দরের বাসরে একটা মাত্র ছিদ্র ছিল। সেখান দিয়েই প্রবেশ করেছিল কালনাগিনী। আমাদের প্রজাতন্ত্রের বাসরে শুরু থেকেই অজস্র ছিদ্র

কী শিখেছ স্কুলে আজ
বলো দেখি বাছা?

শিখেছি স্বাধীন সব মানুষ ধরায়
স্কুলেতে তো আমাদের তেমনই পড়ায়।

What did you learn in school today
Dear little boy of mine?

I learnt that everybody’s free
That’s what the teachers said to me.
—Tom Paxton

তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। স্কুলে বেশ নামডাক হয়েছে বক্তা হিসাবে। অতএব মাস্টারমশাইদের একজন বললেন প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে হবে ছাত্রদের পক্ষ থেকে। বক্তৃতা তৈরি করে সহকারী প্রধান শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র মণ্ডলকে শুনিয়ে আসতে হবে আগেই। পূর্ণবাবুকে শোনাতে যেতেই তিনি মৃদু হেসে পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন “আর যা-ই বল বাবা, ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় বলে দিস না। তুই তো আবার কমিউনিস্ট লোকের ছেলে…”

তখন অবশ্য আমার আজাদিকে মোটেই ঝুটো মনে হত না, আর বাবা আমাকে শিখিয়ে পড়িয়েও দিতেন না। সুতরাং ২৬শে জানুয়ারি হেড স্যারের ঘরের সামনে বসানো মাইকে যে ভাল ভাল কথাগুলো বললাম সেগুলো বিশ্বাস করেই বললাম। মাস্টারমশাইরা বিস্তর পিঠ চাপড়ে দিলেন, বন্ধুরা কেউ কেউ চোখ গোল গোল করে বলল “কী করে তুই এরকম বলতে পারিস!” আমি মহা খুশি। আহা! আমার স্বাধীনতা, আমার প্রজাতন্ত্র।

ক্রিকেট খেলায় ব্লাইন্ড স্পট বলে একটা ব্যাপার আছে, যেখানে বল পড়লে ব্যাটসম্যানের প্রতিক্রিয়ার বিকল্প অত্যন্ত সীমিত। বলটাকে আক্রমণ করা প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে সেটা লেগ স্টাম্পের বাইরের এলাকা। তাই আইন অনুযায়ী সেখানে পিচ পড়া বলে লেগ বিফোর উইকেট আউট দেওয়া যায় না। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পটগুলো সম্পর্কে তখনো কিছুই জানতাম না।

দেশমাতৃকা কী বিলক্ষণ জানতাম। কিন্তু মণিপুরের মায়েদের কথা জানতাম না। আমার সেই অপাপবিদ্ধ প্রজাতন্ত্র দিবসের বছর দশেক পরে তাঁরা উলঙ্গ হয়ে রাজপথে দাঁড়াবেন, হাতের ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে “INDIAN ARMY RAPE US”। ততদিনে ইরম শর্মিলার অনশনের চার বছর অতিক্রান্ত।

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে বিলাসিতা যেমন জানি না তখনো, তেমনি খিদে কাকে বলে তা-ও সম্যক জানি না। রোজ রাতে যারা জল খেয়ে ঘুমোয় তারাও যে প্রজাতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পট সে কথাও আমার বোঝা হয়নি।

আমার কাছে জম্মু-কাশ্মীর মানে তখন শর্মিলা ঠাকুর আর শাম্মি কাপুর। AFSPA যে কত বড় chutzpah সেকথা জানারও প্রশ্নই ছিল না সেই প্রজাতন্ত্র দিবসে।

যতদূর মনে পড়ে, আদিবাসীদের জীবন আর জল জঙ্গল থেকে উৎখাত হয়ে যাওয়া আটকাতে যুগ যুগ ধরে তাদের অনন্ত লড়াই যে ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারিতেও থামতে পারেনি সে কথাও তখন জানা ছিল না আমার।

বয়স আন্দাজে সে হয়ত আশ্চর্য নয়, যা আশ্চর্য তা হল আমি জানতাম সংবিধান প্রণেতা হলেন বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর। যেন ঐ একটি লোক একা একা দক্ষিণের জানলা খুলে বসে বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে লিখে ফেলেছিলেন কয়েকশো পাতার একখানা নিয়মাবলী, যা পুঙখানুপুঙখ অনুসরণ করে এত বড় দেশটা চলবে। সুতরাং সংবিধানটা ভাল হলে সব কৃতিত্ব আম্বেদকরের, মন্দ হলেও ঐ একজনকে গালাগাল দিলেই যথেষ্ট। সংবিধান সভা ব্যাপারটার কোন অস্তিত্ব আমার চেতনায় বহুকাল ছিল না। এমনকি ক্লাস নাইন টেন পর্যন্ত পাঠ্য ইতিহাস বইতেও সেটা নামমাত্র।

আম্বেদকর সম্পর্কেই বা কী জানতাম? একটা চশমা পরা টাক মাথা গোল মুখো লোক, যিনি সংবিধান প্রণেতা। ব্যাস! এটুকুই। ইতিহাস বইতে গান্ধীজির জন্যে অনেকগুলো পাতা বরাদ্দ। নেতাজীর জন্যেও কম নয়। নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতা সংগ্রামী — তাও পড়েছি। মৌলানা আবুল কালাম আজাদও স্বাধীনতা সংগ্রামী, সুপণ্ডিত, কংগ্রেস সভাপতি ইত্যাদি। হয়ত বাম শাসিত রাজ্য বলেই স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে মাস্টারদা সূর্য সেন বা ভগৎ সিংও তখন ব্রাত্য ছিলেন না। এমনকি মহারাষ্ট্রের চাপেকর ভ্রাতৃদ্বয়ের সশস্ত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে বিনায়ক দামোদর সাভারকরও ছিলেন (গভর্নর জেনারেলকে অজস্র মার্সি পিটিশন লেখা এবং মুক্তি পাওয়ার পর ভোল পাল্টে ফেলার ইতিহাস ছিল না অবশ্য)। আম্বেদকর সম্বন্ধে কিন্তু ঐ এক লাইন।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আজীবন সংগ্রামের কথা পড়তে পাইনি আমরা। গান্ধীর সাথে তাঁর পুনা চুক্তি স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি মাইল ফলক বলে লেখা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তিটা কী এবং কেন সেসব আমাদের জানা হয়নি। সাবালক হতে হতে আমরা জেনেছি নেহরুর লেখা বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘The Discovery of India’, গান্ধীর আত্মকথা ‘My experiments with truth’। কিন্তু আম্বেদকর যে সংবিধান ছাড়া জীবনে আর কিছু লিখেছেন তার কোন লক্ষণ দেখিনি আমরা। ‘Annihilation of caste’ নামক অদ্বিতীয় বইটা (আদপে বক্তৃতা) পড়তে আমার সাঁইত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেল।

অবশ্য আম্বেদকর সম্বন্ধে আরেকটা জিনিস স্কুল ছাড়ার পরে পরেই জেনে ফেলেছিলাম আমরা। “লোকটা কাস্টের ভিত্তিতে রিজার্ভেশন করে দেশের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।“ অর্থাৎ ঐ সিদ্ধান্তটার দায়ও একা ঐ লোকটার ঘাড়েই চাপে। আমার বাবা বলতেন “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর”। এও সেই ব্যাপার। কাস্ট কোথা থেকে এল, কেন এল, কত হাজার বছর ধরে তার অন্যায় সুবিধা কে ভোগ করল, কারা এখনো ভোগ করছে — সেসব কিছুই জানা হল না। সংবিধান সভা কী, তার সদস্য কারা ছিলেন, কিভাবে সেখানে প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংবিধান প্রণয়ন হয়েছে — তাও জানার দরকার পড়ল না। ফলে কাস্ট তৈরি করার দোষ মনুর ঘাড়ে চাপল না, চাপল আম্বেদকরের ঘাড়ে।

কত কী যে জানা হয়নি! পাঠ্য যে কত কিছু অপাঠ্য করে রেখেছিল! প্রজাতন্ত্রেও যে কত দেওয়াল তুলে রেখেছি আমরা! হিন্দুরা সর্বক্ষণ আলোচনা করে যে মুসলমানরা ঘেটো বানিয়ে বাস করে, ওদের আরো খোলামেলা হওয়া উচিৎ। অথচ হিন্দু বন্ধুরা মিলে একসাথে জমি কিনে কো-অপারেটিভ আবাসন তৈরি করার পরিকল্পনা করে মুসলমান বন্ধুর সামনেই, তাকে কখনো বলে না “তুইও আমাদের সাথে ফ্ল্যাট কেন।” মহানগরগুলোতেও নিরামিষাশীদের হাউজিঙে আমিষাশীর জায়গা হয় না।

বেহুলা লখিন্দরের বাসরে একটা মাত্র ছিদ্র ছিল। সেখান দিয়েই প্রবেশ করেছিল কালনাগিনী। আমাদের প্রজাতন্ত্রের বাসরে শুরু থেকেই অজস্র ছিদ্র। সেসব ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়েছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের শত সহস্র সাপ। ছিদ্রগুলো আম্বেদকর গোড়াতেই দেখতে পেয়েছিলেন। তাই সংবিধান সভায় তাঁর শেষ বক্তৃতায় ভারতে গণতন্ত্র টিকবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। টিকিয়ে রাখতে হলে তিনটি পদক্ষেপ জরুরী বলে উল্লেখ করেছিলেন। তৃতীয়টি নিয়ে গড়িমসি আমাদের আজকের দুর্দিন ঘনিয়ে তুলেছে বলে মনে হয়:

তৃতীয় যে কাজটা আমাদের করতেই হবে তা হল রাজনৈতিক গণতন্ত্র হয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে সামাজিক গণতন্ত্রে পরিণত করতে হবে। রাজনৈতিক গণতন্ত্র স্থায়ী হতে পারে না যদি তার ভিত সামাজিক গণতন্ত্র দিয়ে তৈরি না হয়। সামাজিক গণতন্ত্র মানে কী? মানে এমন এক জীবনচর্যা, যা স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীকে জীবনধারণের মূল নীতি বলে মনে করে। এই তিনটে নীতিকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। এদের একত্রে ভাবতে হবে কারণ কোন একটা অনুসরণ না করা হলেই গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়…। ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ আমরা এক স্ববিরোধী জীবন শুরু করতে চলেছি। রাজনৈতিক জীবনে সাম্য থাকবে, অর্থনৈতিক আর সামাজিক জীবনে থাকবে অসাম্য…। কতদিন আমরা এই স্ববিরোধ চালিয়ে যাব? কতদিন সমাজে, অর্থনীতিতে মানুষকে সাম্য থেকে বঞ্চিত করব? যদি বেশিদিন তা করি তাহলে তা আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্রের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠবে।

আম্বেদকরের ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যাওয়ার মুখে। ব্লাইন্ড স্পটগুলো চওড়া হতে হতে ব্ল্যাকহোলে পরিণত। সবচেয়ে বড়টার নাম কাশ্মীর, পিছু পিছু উত্তরপ্রদেশ।

আশার কথা এই যে সংবিধানের প্রস্তাবনায় যাদের “We, the people of India” বলা হয়েছে তারা এই প্রথম বিপুল সংখ্যায় সংবিধান কী এবং কেন, প্রজাতন্ত্র ব্যাপারটাই বা কী — এসব জিজ্ঞেস করছে। যারা এই সংবিধানের বিনাশ চায় তারাও এমন তেড়ে গাল দেয়নি আগে। তার ফলে সংবিধান সম্বন্ধে আগ্রহ বাড়ছে। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ একত্রে রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়ছেন, সংবিধান বাঁচাতে হবে বলে মিছিল করছেন — এমন প্রজাতন্ত্র আমরা আগে দেখিনি।

স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে জায়গা না পাওয়া আম্বেদকর এখন মিছিলে। জামা মসজিদের সিঁড়িতে দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ রাবণের হাতে, ধর্মতলার ধরনায় বর্ণহিন্দু ছাত্রীর হাতে। এমন প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের ইতিহাসে সম্ভবত আগে আসেনি। রাস্তায় অতন্দ্র মায়েরা বলছেন “বালাই ষাট”।

*ভাষান্তর আমার

হায়দারের দেশ, আমার দেশ

যত সজোরে দেশপ্রেম ঘোষণা করছি আমরা আর অন্যের দেশপ্রেম দাবী করছি তত কি দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের?

হিন্দুশাস্ত্র বলেছে পুং নামক নরক থেকে উদ্ধার করে যে, সে-ই হল পুত্র। কিন্তু ভূস্বর্গপ্রতিম নরক থেকে উদ্ধার করা কোন্ পুত্রের পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া হিন্দুশাস্ত্রের বিধান বিধর্মীদের বেলায় খাটে কিনা সেটাও গুরুতর প্রশ্ন। খাটলেও সবার উপরে AFSPA (Armed Forces’ Special Powers Act) সত্য তাহার উপরে নাই। অতএব যখনই হায়দারের বাবা নিরুদ্দেশ হয়েছেন তখনই তো বোঝা গেছে তাঁর আদরের পুত্রটি যতবড় তালেবরই হোক না কেন, সে এসে বাবাকে উদ্ধার করতে পারবে না, তাঁর পরিণতি যা হবার তা-ই হবে। প্রত্যাশা বাবারও ছিল না। তাই তো এলাকার সুপরিচিত শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবু সন্দেহভাজন নাগরিকের আলখাল্লায় পরিচয়পত্র হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে যান হায়দারের জন্য ঈশ্বর আছেন, তিনিই থাকবেন। অর্থাৎ বোঝা গেল ‘রোজা’ সুলভ নিরুদ্দেশ লোকটিকে খুঁজে বেড়ানোর রোমাঞ্চ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে নেই।
কি করে বুঝলাম নেই? কি যে বলেন! এটা ২০১৪। খোঁজখবর না নিয়ে, দু-একজন ফিল্মপন্ডিতের লেখাপত্র না পড়ে কি আর পয়সা খরচা করে দেখতে গেছি ছবিটা?
না। হলে যে জনাকুড়ি দর্শক ছিল তারা সবাই মোটেও অতসব জেনে যায়নি। তার প্রমাণ ডঃ মীর যখন মিলিটারির মুখঢাকা খোঁচড়টির সামনে দাঁড়িয়ে, তখন সোচ্চার প্রার্থনা “চিনিস না, চিনিস না”। তবুও সকলেই বুঝলেন যে ডঃ মীর আর ফিরবেন না। কারণ অবচেতনে আমরা সকলেই জানি, উগ্রপন্থীরা ধরে নিয়ে গেলে তবু ফিরে পাওয়ার আশা আছে, পুলিশ বা মিলিটারির বিষনজরে পড়লে কেউ ফেরে না। ডঃ মীর আমাদের অচেনা হতে পারেন, ভিখারী পাসোয়ান তো অচেনা নয়।
দেশপ্রেম ব্যাপারটা ভারী গোলমেলে। আমি পশ্চিমবঙ্গবাসী, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে বেশ একটু আত্মশ্লাঘা আছে, কাশ্মিরীদের মত ভারত আমার উপরে শোষণ চালাচ্ছে এরকমও মনে হয়না চট করে। অথচ যে লোকটাকে স্পষ্ট দেখলাম ভারতবিরোধী যোদ্ধার প্রাণ বাঁচাচ্ছে তার বাড়িটা উড়ে গেল দেখে আমার বেশ রাগ হল। এমনকি লোকটাকেও মানবতাবাদী বলেই মনে হচ্ছিল। কি আপদ বলুন দেখি!
লেনিন নাকি অনেক ঝানু কমরেডের মতামত অগ্রাহ্য করে আইজেনস্টাইনের ছবির জন্য টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। যুক্তিটা ছিল এই যে ফিল্ম যা পারে তা হাজারটা বক্তৃতাও পারে না। ‘হায়দার’ দেখার পরে এটা অকাট্য যুক্তি বলেই মনে হয়। অরুন্ধতী রায় কাশ্মিরীদের উপর অন্যায় নিয়ে যতবার লেখেন ততবার দেশদ্রোহী আখ্যা পান, মহিলা বলে ধর্ষণের হুমকিও শোনেন। অথচ ঐ যে দু ঘন্টা চল্লিশ মিনিট হিন্দুরাষ্ট্র হতে চাওয়া দেশের মূল ভূখন্ডের আমরা কয়েকজন প্রথমে হিলাল মীরের জীবনভিক্ষা করলাম নিজ নিজ ঈশ্বরের কাছে, তারপর চাইলাম হায়দার তার ভারতবন্ধু কাকাকে খুন করুক, প্রতিশোধ নিক বাবার হয়ে, এ কি ফিল্ম ছাড়া কোনকিছুর দ্বারা সম্ভব হত? আবার হল থেকে বেরিয়ে দিব্য বাড়ি চলে এলাম, একবারও নিজেকে দেশদ্রোহী মনে হলনা কিন্তু। অন্য কেউও তেমন অভিযোগ করে গ্রেপ্তার টেপ্তার করেনি এ পর্যন্ত।
যখন হায়দার আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে তার সবচেয়ে ঘেন্নার মানুষটাকে জীবনযন্ত্রণা ভোগ করার জন্য ছেড়ে দিল তখন তো একটা বিরাট চড় এসে পড়ল আমার গালেও কারণ আমিও তো বিড়বিড় করছিলাম “চালা, গুলিটা চালা”। অ্যারিস্টটল তো বলেছিলেন ট্র্যাজিক নায়কের কষ্টভোগের মধ্যে দিয়ে আমারও কষ্টভোগ এবং ফলতঃ পাপস্খালন। ‘Hamlet’ দেখে তাই-ই তো হয়। কিন্তু বিশাল ভরদ্বাজ কি ঠিক তা ঘটালেন? ট্র্যাজিক নায়ক যখন তার ট্র্যাজেডির ঊর্দ্ধে উঠে নতুন পথের সন্ধান দিয়ে যায়, কী বলে তাকে? Catharsis শব্দটা কি ধরতে পারে সেইসময়ে দর্শকের অপরাধবোধকে?
বয়ঃসন্ধিকালে দেখেছিলাম সেই ছবিটা — সেখানেও একটা খোঁজ ছিল; সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে অপহৃত স্বামীকে সেই কাশ্মীরেই। কি খারাপ সেখানে কাশ্মীরের লোকগুলো। গোটা রাজ্যটায় ভালো মানুষ বলতে শুধু এক মন্দিরের পুরুত আর একটা অবলা মেয়ে। বাকি সবাই এ কে ৪৭ চালায় আর জাতীয় পতাকা পোড়ায়, এবং নামাজ পড়ে। কি মজা! কত সোজা ছবি। কিচ্ছু ভাবতে টাবতে হয় না। বেশিরভাগ লোক যেমনভাবে কাশ্মীরকে ভাবে ঠিক তেমনই দেখানো। ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৫ তে। ‘হায়দার’ আমাদের ঐ সময়েরই গল্প বলছে। মানে কাশ্মীরকে কাশ্মীরের চোখ দিয়ে দেখতে আমাদের সময় লাগল দু দশক। এ বড় ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি; এর কাছে ‘Hamlet’ শিশু। অথচ আমাদের দাবী হল কাশ্মীরিরা যেন এদেশটাকে নিজের ভাবে, গলা ছেড়ে “জয় হিন্দ” বলে। Chutzpah বটে।
হায়দার আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের ছাত্র ছিল। কবিতাও লিখত। তার হাতে কি কোনভাবে এসে পড়েছিল নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’? সে জন্যই কি সে জন্মভূমিকে প্রচলিত নামে সম্বোধন না করে পছন্দের নামে ইসলামাবাদ বলে ডাকে? আমাদের সকলেরই তো বড় আদরের বড় ব্যক্তিগত বাবা-মায়ের বিছানাটা, বাবার চেয়ারটা, বাবার প্রিয় গানটা, বাড়িটা, পাড়াটা। সেইজন্যেই দেশটা। যার সেগুলো হারিয়ে যায় সে তো ঈশ্বর আর সীতার মত দেশ খুঁজে বেড়ায় আজীবন।
যত সজোরে দেশপ্রেম ঘোষণা করছি আমরা আর অন্যের দেশপ্রেম দাবী করছি তত কি দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের? হায়দার কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করতে চেষ্টা করেছে। মহাত্মা গান্ধী নামে এক দেশদ্রোহী ট্র্যাজেডি কাটিয়ে ওঠার ওরকমই একটা পথ বাতলেছিলেন বটে দাঙ্গায় সন্তান হারানো এক হিন্দু বাবাকে — “প্রতিশোধ ভুলে যাও, একটা অনাথ মুসলিম বাচ্চাকে দত্তক নাও।” সেই যে রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ছবিটায়।
ওহো! সে তো আবার একটা ইংরেজ। ওর দেশের বিরুদ্ধেই তো আবার আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। বোঝো কান্ড! এ তো দেখছি দেশ ব্যাপারটাই বেশ গোলমেলে!

*এটা ফিল্ম রিভিউ নয়। ওটা লেখার বিদ্যে আমার নেই, এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যও ছিল না।