ভো ভো ভদ্রসন্তান

কী হয় পঞ্চায়েত দিয়ে? যে ভদ্রসন্তান পেটে বোম মারলেও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের তিনটে স্তর কী কী বলতে পারবে না, সেও জানে পঞ্চায়েতের কোন কাজ নেই। বামফ্রন্ট সরকার এইটে বানিয়েছিল কেবল টাকা মারার জন্যে। কী দরকার এমন ভোটের? তুলে দিলেই হয়। এই যে ক্যানিং লোকালে ভদ্রসন্তানদের বাড়ি রান্না করতে আসা, বাসন মাজতে আসা ছোটলোকগুলো তিন চারদিন কামাই দেয় পঞ্চায়েতে ভোট দেবে বলে —- এর দরকারটা কী রে ভাই? এইসব ছোটলোক গণতন্ত্রের বোঝেটা কী? পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তো করার মধ্যে করেছে এই যে এদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে। ছোটলোকেরা অনেকে গ্রামের ভদ্রসন্তানদের টপকে প্রধান টধান হয়েছে। তা এ কি আর ভাল ব্যবস্থা রে বাপু?

শেষপর্যন্ত এক মাস্টারমশাইকে মরতে হল ভদ্রসন্তানদের “এসব আগেও হয়েছে” র এলায়িত ঔদাসীন্য থেকে জাগানোর জন্যে। হতভাগ্য প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায় মরিয়া প্রমাণ করিলেন ভদ্রসন্তানগণের চেতনা মরে নাই। তাঁহারা আজিও নির্বাচনী হিংসার জন্যে সরকারকে দায়ী করিয়া গালাগাল করিতে সক্ষম।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়কার হিংসাটা নেহাত বিসদৃশ লাগায় একটু “উঃ আঃ” করতেই হচ্ছিল। তবু “এরা আসলে সিপিএমের মত সংগঠিত না তো, তাই একটু বেশি উগ্র” এসব বলে চালানো হচ্ছিল। মনোনয়ন জমা দেওয়া মিটে যেতেই ভদ্রসন্তানদের ভারী নিশ্চিন্দিভাব এসেছিল। কাগজে বেরিয়েছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এত বেশি আসন শাসক দল কখনো জেতেনি তাই খানিকটা নিন্দেমন্দ না করে উপায় ছিল না। শিক্ষিত লোক হিসাবে সমাজে একটা পরিচিতি আছে তো। এরপর তো নির্বাচন আর নির্বাচনে তো মারামারি, বোমাবাজি, খুন হয়েছে অনেক। অতএব ওতে সরকারের দোষ হয় না। নিন্দে করার দায়িত্বও নেই ভদ্রজনের।
তার চেয়ে বড় কথা যে মরল সে তো হয় এ পার্টির লোক, নয় ও পার্টির লোক। তারা তো আর কারো মা, বাপ, ভাই, বোন, ছেলেপুলে নয়। পার্টি তো করে অশিক্ষিতরা, যাদের শিক্ষিতদের মত স্বার্থপর হয়ে বাঁচার সুযোগ নেই। অতএব তারা মরলে ভদ্রসন্তানের কী-ই বা এসে যায়? ও তাপসী মালিকই বলুন আর দেবু দাস, ঊষা দাসই বলুন, ভদ্রসন্তান হলে কি আর রাজনীতির মধ্যে যেত? চেতন ভগতের কথামত নিজের কেরিয়ার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে জমাটি একখান চাকরি জুটিয়ে সক্কলের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেত। অতএব পরিবর্তনের সরকার ভাল সরকার। যতই লোক মারুক আর গণতন্ত্রের মা-মাসি করুক, ভি আই পি রোডটা কংক্রিটে আর রেলিঙে মুড়ে দিয়েছে, এত আলো লাগিয়েছে যে ছেলেমেয়েরা চুমু খাওয়ার আড়াল পাচ্ছে না, স্কুলমাস্টারগুলো কোন কাজ করত না, তাদের ঘাড়ে কন্যাশ্রী থেকে দিদিশ্রী সব চাপিয়ে দিয়ে খুব টাইট দিয়েছে। আর কী চাই? একেই তো বলে উন্নয়ন। কেন হিংসার প্রতিবাদ করতে যাবে ভদ্রসন্তান? এত উন্নয়নের বদলে নাহয় এক ভাই এক কবিকে দিলই দুটো গাল। কবিকে কে বলেছিল পার্টির লোকের মত কবিতা লিখতে? তিনি যদি ভদ্রসন্তানোচিত কাজ কোনগুলো সেটা ভুলে মেরে দেন, সেটা বুড়ো বয়সের ভীমরতি। তার জন্যে সরকারকে কেন গাল দেবে? সর্বেসর্বা মুখ্যমন্ত্রীকেই বা কেন দোষ দেবে?
তবু নয় ভেবে দেখা যেত যদি ভোটটা লোকসভা কি বিধানসভার হত। কিসের ভোট? না পঞ্চায়েতের। কী হয় পঞ্চায়েত দিয়ে? যে ভদ্রসন্তান পেটে বোম মারলেও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের তিনটে স্তর কী কী বলতে পারবে না, সেও জানে পঞ্চায়েতের কোন কাজ নেই। বামফ্রন্ট সরকার এইটে বানিয়েছিল কেবল টাকা মারার জন্যে। কী দরকার এমন ভোটের? তুলে দিলেই হয়। এই যে ক্যানিং লোকালে ভদ্রসন্তানদের বাড়ি রান্না করতে আসা, বাসন মাজতে আসা ছোটলোকগুলো তিন চারদিন কামাই দেয় পঞ্চায়েতে ভোট দেবে বলে —- এর দরকারটা কী রে ভাই? এইসব ছোটলোক গণতন্ত্রের বোঝেটা কী? পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তো করার মধ্যে করেছে এই যে এদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে। ছোটলোকেরা অনেকে গ্রামের ভদ্রসন্তানদের টপকে প্রধান টধান হয়েছে। তা এ কি আর ভাল ব্যবস্থা রে বাপু? যেমন করেছিল পেছন পাকা কমিউনিস্টের দল, এখন ফল ভুগছে।
এ নিয়ে শহর, মফঃস্বল, গ্রাম সব জায়গার ভদ্রসন্তানেরাই একমত ছিলেন দুদিন আগে অব্দি। গোলমাল পাকালেন তাদেরই একজন। প্রিসাইডিং অফিসার হয়েছেন ভাল কথা, “আগেও হয়েছে” মন্ত্র জপে বুথে গিয়ে চোখকান বুঁজে থাকলেই চুকে যেত। কিন্তু এই চরম নীতিহীনতার যুগেও থাকে কিছু কিছু নীতিবাগীশ বোকার হদ্দ। এরা ভাবে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে ওঠাটা শিক্ষকের কাজের মধ্যে পড়ে। এই ভদ্রলোক সম্ভবত ঐ দলে। এই ধরণের লোকের সমস্যা হচ্ছে মেরুদণ্ড বলে জিনিসটা এখনো নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয়নি আমাদের মত। ফলে সাহসটা অসম্ভব বেশি। লাঠিসোটা, টাঙ্গি, বন্দুক — যা-ই দেখাও না কেন, এদের ভয় পাওয়ানো মুশকিল। তা শক্ত মেরুদণ্ড তো অধুনা একটি রোগবিশেষ। সে রোগে শেষ অব্দি যা হয় তাই হয়েছে আর কি। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি চমকপ্রদ। দৃশ্যত মার খেলেন এস ডি ও, তবে আসলে চড়চাপড়গুলো কার উদ্দেশে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এবং প্রত্যেকটি চড় তিনি অর্জন করেছেন।
মাস্টারমশাইয়ের মৃত্যু অনেক ছাত্রকে জাগিয়ে তুলেছে দেখে ভাল লাগছে। এই দারুণ দুঃসময়ে আমরা এতই দ্বিধাবিভক্ত যে ডাক্তার মার খেলে শুধু ডাক্তাররা প্রতিবাদ করেন, রাজনৈতিক কর্মী মার খেলে শুধু তার দলের লোকেরাই প্রতিবাদ করে, শিক্ষক মার খেলে শুধু শিক্ষক সমিতি প্রতিবাদ করে, ছাত্ররা মার খেলেও সেটা শুধু তাদের সমস্যা, সাংবাদিক মার খেলে… যাকগে। কথা হচ্ছে এই ব্যাপারটা শাসকও বুঝে ফেলেছে। ফলে প্রতিবাদীদের গায়ে একটা লেবেল সেঁটে দেয়। জানে ঐটে করে দিলেই তারা আর কারো থেকে কোন সহানুভূতি, সমর্থন পাবে না। এবারে যেমন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সরকার লেবেল দিয়েছে “ওরা তো ভোটকর্মী নয়, শিক্ষকও নয়। ওরা এবিটিএ।” কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যেমন বলে আর কি “ওরা তো ছাত্র নয়, ওরা বামপন্থী ছাত্র”, “ওরা তো কৃষক নয়, ওরা সিপিএমের কৃষক” বা এদের সব্বাইকে একেবারে থার্ড ব্র‍্যাকেটে পুরে “ওরা এন্টি ন্যাশনাল।” অস্যার্থ কেবল এটা নয় যে ঐ লেবেলের লোকেদের প্রতিবাদের অধিকার নেই। লেবেলটা আসলে চোখ মটকে বাকিদের বলা “এদের সাথে যোগ দিও না।” আমরা ভদ্রসন্তানেরাও এমন সুবোধ বালক যে সরকারী মতটা বুলির মত আউড়ে শুধু নিজে চেপে যাই তা নয়, অন্যকেও বোঝাই।
ভদ্রসন্তানদেরই আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি কিনা, তাই তেনারা যা মনে করেন সেই মতটাই প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে জঘন্যতম কান্ডগুলো করেও সরকারগুলো দিব্য “আগেও হয়েছে” বলে চালিয়ে যাচ্ছে।
— নির্বাচনের জন্যে খুন? আগেও হয়েছে।
— ধর্ষণ? আগেও হয়েছে।
— ঘোড়া কেনাবেচা? আগেও হয়েছে।
— বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশের অত্যাচার? আগেও হয়েছে।
মোদীর আছে “কংগ্রেস কে সত্তর সাল” আর দিদির “বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছর”। যদ্দিন উনি আরো সত্তর বছর আর ইনি আরো চৌত্রিশ বছর শাসন না করছেন তদ্দিন চুপটি করে থাকতে হবে। ভদ্রসন্তানরা অবিশ্যি চুপ করে থাকতে ভারী ভালবাসেন। জেগে উঠে একেকজন যা সব সমাধান দিচ্ছেন তাতে মনে হয় এর চেয়ে ঘুমোলেই বুঝি ভাল ছিল। সেদিন ভোট দেব বলে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি (সকাল সকাল গেছিলাম বলে দিতে পেরেছি, ভাইসব। আমায় মেডেল দিও), কর্তব্যরত পুলিশকর্মীর সাথে আমার পেছনের ভদ্রসন্তান দেশ, জাতি, পরিস্থিতি নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু করলেন এবং দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত করলেন “ভোট অনলাইন করে দেয়া উচিৎ।” আদ্ধেক লোক কী দিয়ে ভাত খাবে তার ঠিক নেই, উনি অনলাইনে ভোট করাচ্ছেন। এবং এতদ্দ্বারা শাসক দলের বদমাইশিকে বেমালুম অস্বীকার করছেন। আসলে সেই যে আগন্তুক ছবিতে ছিল — কূপমণ্ডূক। আজকাল ভদ্রসন্তানেরা স্মার্টফোনমণ্ডূক। নিজের প্রতি ছাড়া আর কারো প্রতি কোন দায়দায়িত্ব নেই। রাজকুমার রায়ের মৃত্যুটা বড় চমকে দিয়েছে, বড় কাছের লোক মনে হচ্ছে। তাই দুদিন একটু রাগারাগি করবেন আর কি। তারপর আবার মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগাবেন। তার উপরে লেখা থাকবে “আগেও হয়েছে”, এবং যেদিন সরকার দয়া করে ভোট দেয়ার সুযোগ দেবে সেদিন সুড়সুড় করে গিয়ে আবার ওদেরই ভোট দেবেন।
অবশ্য সব ভদ্রসন্তানই এমনধারা তা বললে অন্যায় হবে। অনেকে খুব প্রতিবাদী। তেনারা জেগে উঠেই ঠিক করে ফেলেছেন এদের আর ভোট নয়। কারণটি ভারী মজার। “এসব খুনোখুনি মারামারি করছে মুসলমানরা। বিজেপি এলেই এরা সিধে হয়ে যাবে। অতএব বাংলায় বিজেপিকেই চাই।” এদের জিজ্ঞেস করুন “হ্যাঁ দাদা, অনুব্রত মন্ডল কি মুসলমান? জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কি পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েন?” এনারা বুদ্ধিমানের মত জবাব দেবেন “আরে এরা তো আর মারামারিটা করছে না। যারা করছে তাদের নামগুলো দেখুন না। বেশিরভাগ মুসলমান। আরাবুলকে ভুলে যাচ্ছেন?” তখন যদি ধরিয়ে দেন যে যারা মার খেয়ে মরছে তাদের মধ্যেও অনেক মুসলমান, অমনি আপনি এন্টি ন্যাশনাল হয়ে যাবেন। আসল কথা সেই যে ব্রিগেডের মাঠে ২০১৪ সালে মোদীজি এসে বলেছিলেন “এখানে মমতা দিদি আছেন খুব ভাল কথা। দিল্লীতে আমায় বসান, আপনাদের দুই হাতে লাড্ডু হয়ে যাবে।” তা সেই লাড্ডু এখন গোগ্রাসে গিলছি আমরা। দু হাতের লাড্ডুতে মন ভরছে না, কোঁচড়েও চাই। তাই আবার নবান্নেও বিজেপিকে দরকার।
খান ভদ্রসন্তানগণ, পেট পুরে খান। পেটপুরে খান আর প্রাণভরে মলত্যাগ করুন। আপনারা তো আর ছোটলোক নন যে মাঠেঘাটে যেতে হবে। মোদীর স্বচ্ছ ভারত আর দিদির নির্মল বাংলার তো আপনারাই ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর।

বিঃ দ্রঃ তৃণমূল কংগ্রেসের কে এক অর্বাচীন এম এল এ কাল দাবী করেছেন তিনি নাকি এমন সন্ত্রাস বাম আমলেও দ্যাখেননি। ওসব গুজবে কান দেবেন না। লাড্ডু খেয়ে যান।

এসব কী?

একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই ধরে নিচ্ছেন

পশ্চিমবাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে যা হচ্ছে তাতে দেখছি অনেক বামবিরোধীও এখন স্বীকার করছেন এমনটা তাঁরা কখনো দ্যাখেননি। অনেকে এও বলছেন যে এমন পরিবর্তন তাঁরা চাননি। ব্যক্তিগতভাবে এসব দেখে আমি যেমন ক্রুদ্ধ, কষ্ট পাচ্ছি তেমনি একটা মৃদু ভাল লাগার জায়গা এইটা যে দেখতে পাচ্ছি বাম দলগুলোর মধ্যে, সিপিএমের মধ্যে এখনো বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রাণের মায়া, মান সম্মানের মায়া ত্যাগ করে প্রতিরোধ করছেন। রঙ বদলে ফ্যালেননি বা আমার মত ফেসবুকিশ বামপন্থী হয়ে যাননি।
সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় যা দেখছি তাতে এটা দেখেও অবাক হচ্ছি বলা যায় যে মার বেশি খাচ্ছেন বামেরাই, বিজেপি নয়। পার্টি অফিস বা ঘরবাড়ি ভাঙচুরও বামেদেরই বেশি হচ্ছে, যারা নাকি প্রধান বিরোধী নয়। বাম রাজনীতির দিক থেকে দেখলে এই মার খাওয়া, লড়ে যাওয়া প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে। ভোট হলে তেমন কিছু বেশি আসন পাব না জেনেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্যে এরকম দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে পারে কটা পার্টি?
এসব ভাল লাগছে। কিন্তু একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই বলে ধরে নিচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে নেতৃত্বের দিক থেকে এমন সামান্যতম ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। কোন কোন এলাকায় দেখতে পাচ্ছি বা শুনতে পাচ্ছি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে “বাম-বিজেপি সমর্থিত”, এমনকি “বাম-তৃণমূল সমর্থিত” কাঁঠালের আমসত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছে। সেরকমটা একেবারে স্থানীয় স্তরে, একজন বা কয়েকজনের স্বার্থের খাতিরে অতীতেও হয়েছে শুনেছি। এখন যখন পার্টি দুর্বল, ২০১১ র পর থেকে কেষ্টেতর প্রাণীদের অত্যাচারে অনেক জায়গায় প্রায় উধাও তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারো কারো এরকম কান্ড ঘটিয়ে ফেলা অন্যায় হলেও অবাক করার মত নয়। আদর্শগত দেউলিয়াপনা যে আছে সে তো আর আমরা নতুন জানছি না, তা বলে সকলেই ওরকম তা ভাবারও কারণ নেই। সেইজন্যেই ওরকম জোট করাটাই সামগ্রিকভাবে পার্টির অঘোষিত নীতি বলে মনে করার কারণ আছে, এমনটা নিখাদ তৃণমূলী ছাড়া কেউ বলবেন মনে হয় না। ফলত আমার আপত্তির জায়গা অন্য।
এখন গ্রাম, শহর সর্বত্রই হোয়াটস্যাপ আর ফেসবুকের দাপট। রাগ হচ্ছে, শঙ্কিত হচ্ছি তখন যখন দেখছি বিজেপি আই টি সেলের তৈরি ভুয়ো খবর সম্বলিত বার্তা সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা দিব্যি ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছেন। ফেসবুকেও দেখছি অনেক সিপিএম সদস্য সরাসরি শেয়ার বাটন টিপে বিজেপি এবং তার বন্ধু যে দাঙ্গাবাজ সংগঠনগুলো, তাদের পোস্ট শেয়ার করছেন। সেসব পোস্টের মধ্যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষী, বানানো তথ্যসম্বলিত যে পোস্টগুলো আমরা অনেকেই চিনি, সেগুলোও রয়েছে। মমতা কত খারাপ তা প্রমাণ করার জন্যে এসবও যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই। মমতা কত খারাপ তা অনেকেই বুঝতে পারছে। আপনারা বিজেপির ভাষা ধার করে না বোঝালে লোকে বুঝবে না?
যেসব মানুষ বুক চিতিয়ে এখনো নিজেদের সিপিএম সমর্থক বলেন তাঁদের এহেন কার্যকলাপ দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। এমনও সন্দেহ হচ্ছে যে তাঁদের সমর্থন বস্তুত একটাই চিহ্নে বরাবর ভোট দিয়ে আসার অভ্যাস, দলটার নীতি বা আদর্শের প্রতি (আদর্শ শব্দটায় আপত্তি থাকলে কথিত আদর্শ বলা যাক) সমর্থন নয়।
তবু সেটা সমর্থকদের ব্যাপার। একজন সমর্থকের সব কিছু তো আর একটা দল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দল অন্তত তার সদস্যদের শাসন করুক। সি পি আই (এম) এর কোন সোশাল মিডিয়া সেল আছে কিনা আমার জানা নেই। যদি নাও থাকে, এসব যে পার্টি সদস্যরা করছেন তাঁরা বুঝে করছেন, না না বুঝে করছেন সে দিকে নেতৃত্বের নজর দেওয়া উচিৎ নয় কি? নইলে তো ধরে নিতে হবে “মৌনং সম্মতি লক্ষণম।” বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটাই যে বড় লড়াই সে কথা তো আপনাদের পার্টি কংগ্রেসও স্বীকার করল। তাহলে এসব কী?

খরচের খাতা

গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে

যারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার জন্যে গুন্ডামি হচ্ছে বলে চেঁচামেচি করছে তারা বুঝছে না এর মাধ্যমে কত পয়সা বাঁচছে। একটা এতবড় নির্বাচন করতে কত খরচা হয় বোঝেন? বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন হয়ে গেলে কত টাকা বেঁচে যাবে সে খেয়াল আছে? চৌত্রিশ বছরে বামফ্রন্ট তো কোষাগার খালি করে রেখে গেছিল। তা সত্ত্বেও বাংলায় যে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে এরা কি সেটা দেখতে পাচ্ছে না?
ক্লাবগুলো সব ঝিনচ্যাক নীল সাদা হয়েছে, রাস্তায় এত আলো যে পাখিরা রাতে দিন ভেবে কলকাকলিতে ভরিয়ে দিচ্ছে, ভি আই পি রোড, যশোর রোড সব কালীঘাট মন্দিরের চাতালের মত চওড়া হয়ে গেছে, গাছফাছ উড়িয়ে দিয়ে রেলিং বসিয়ে লন্ডন না হোক, কলকাতাকে হনলুলুর মত তো দেখাচ্ছেই। নইলে বিদেশ কিম্বা ব্যাঙ্গালোর থেকে অনেকবছর পর এসে বিশ্ব বাঙালিরা আনন্দে কেঁদে ফেলছে কি এমনি এমনি? গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে। তা সে রটাক। নিন্দুকের রাবণের মত দশটা মাথা হয়। কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে এত উন্নয়ন করতে টাকা লাগে। সে টাকা কি আকাশ থেকে পড়বে? বছর বছর ভোটও হবে আবার উন্নয়নও হবে? এ যে খেতে পেলে শুতে চাওয়া দেখছি।
আর ভোট দিতে গেলেই বা দিতেন কাকে? লালেদের তো আর দিতেন না এই বাজারে। আর আছেটা কে? জয় শ্রীরাম পার্টি? আরে জয় শ্রীরাম তো তরোয়াল হাতে নিয়ে যারা মনোনয়ন জমা দেয়া আটকাচ্ছে তারাও বলছে। তবে আর তফাত কী? তাহলে দাঁড়াল কী? দাঁড়াল এই যে ভোট হলেও যাকে দিতেন ভোট না হলেও সে-ই জিতবে। তাহলে আবার অসুবিধেটা কী? খামোকা এক কাঁড়ি টাকা খরচা করার থেকে এইটেই ভাল না? ভাত, ডাল আর ডিমের ঝোলের উপর দিয়ে মিটে যাবে।
কী বললেন? হিংসা? রক্তপাত? ধুর মশাই! ও তো বাম আমল থেকে চলে আসছে। এতটা দ্যাখেননি বলছেন? ওসব চক্রান্ত। চুপিচুপি করেছে, ক্যামেরায় উঠতে দেয়নি। এখনকার সরকার অনেক খোলামেলা, গণতান্ত্রিক। তাই সব দেখতে পাচ্ছেন আর ভয় পাচ্ছেন। এই যে ভয় পাওয়ার স্বাধীনতা — এইটাই তো আগে ছিল না। এটাই তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তাছাড়া হিংসা হচ্ছে হিংসা। পাঁচ কোটি চুরি কল্লেই চুরি আর পাঁচ টাকা চুরি কল্লে চুরি না? যত্তসব মাওবাদীর দল! সিপিএম এর ম, মাও এর ও আর বিজেপির পি র কা মিলে হল মওকা। এরা ভেবেছে এই মওকা ক্ষমতা দখল করে উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করে দেয়ার। সে গুড়ে বালি। উন্নয়ন চলছে, চলবে।

বিঃ দ্রঃ বিজেপিতে কা নেই সেটা আমরা জানি। বাম বুদ্ধিজীবীদের ভাষার উপর প্রভুত্ব করার স্বভাবটা আর গেল না। ভাষাটা এখন আর রবীন্দ্র সদনের আঁতেলদের নয়, ওটা এখন সবার। অতএব আমরা যখন বলেছি কা আছে তখন আছে। ও নিয়ে দাঁড়কাকের মত কা কা করবেন না বলে দিচ্ছি।

নিজের দিকে আঙুল তুলুন

আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল

যেহেতু প্রাসঙ্গিক সেহেতু একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাক।
আমার বাড়ির খুব কাছে অধুনালুপ্ত হিন্দমোটর কারখানা, তৎসহ শ্রমিকদের কোয়ার্টার। ঐ এলাকার বাইরেও কিছুটা জায়গা জুড়ে যাঁদের কোয়ার্টারে জায়গা হয়নি বা নিজের সামর্থ্য আছে তাঁদের বাসস্থান। আমার যখন সদ্য অক্ষর পরিচয় হয়েছে তখন কারখানাটা রমরমিয়ে চলছে। আমার বাবা সেইসময় সক্রিয় রাজনীতিবিদ, তার উপরে প্রশাসক। ফলে রোজ সকালে ঐ কারখানার শ্রমিকরা, যাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন এবং মূলত হিন্দিভাষী, বাবার কাছে বিভিন্ন দরকারে আসতেন। বাবা বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে, ফলে খুব ভোর ভোর উঠতে পারত না। যতক্ষণ না উঠত, ওঁদের সাথে গল্পগুজব করতাম আমি। অন্য ভাষা আমার কাছে ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল আর ওঁদের দিক থেকে দেখলে, ছোটদের সাথে সময় কাটাতে কার না ভাল লাগে? তা এই রোজ সকালে হিন্দি বলার ফলে বাংলার সাথে সাথে হিন্দিটাও তখন আমি দিব্যি বলতে পারি।
যখন হাইস্কুলে পৌঁছেছি তখন ঐ কারখানারই এক শিখ শ্রমিক পরিবার আমাদের প্রায় আত্মীয় হয়ে গিয়েছিল। ওঁরা সপরিবারে আমাদের বাড়ি এসেছেন, ওঁদের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে আমরা নেমন্তন্ন খেয়েছি। সেই ঘনিষ্ঠতা বেশিদিন টেকেনি, নইলে গুরুমুখীটাও কিছুটা শিখে নেওয়ার চেষ্টা করতাম।
বরাবর, এমনকি হিন্দমোটর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও, এলাকার হিন্দিভাষী মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্ক একই রকম থেকেছে। খুব ছোটবেলা থেকেই তাই ছটপুজোর ঠেগুয়ার স্বাদ কিরকম সেটা জানি। আমার বাবার যখন ক্যান্সার হয়, তখন যাঁরা নিয়মিত খবর নিতেন, যে কোনরকমভাবে আমাদের সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিক। বাবা মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম স্বাভাবিক কারণেই ওঁদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। আমাকে অবাক করে, আমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছেন এমন একজন তাঁর মেয়ের গ্র‍্যাজুয়েশনের পরে কী পড়া উচিৎ তার পরামর্শ করতে আমার কাছে এসেছিলেন বছর দুয়েক আগে। “তুমহারে পিতাজি তো রহে নহি। অব কাঁহা যায়েঁ, কিসসে পুছেঁ? সোচা তুমসে হি পুছ লেতে হ্যাঁয়” বললেন এসে। এই যে জীবিকার তাগিদে, জীবনরক্ষার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আসা ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এখানে থাকতে থাকতে এই রাজ্যের মানুষকে ভরসাস্থল মনে করেন — এর চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই বলে আমার মনে হয়।
আমি নিজে একসময় হায়দরাবাদের একটা খবরের কাগজে কাজ করতাম। তখন সেই নিউজরুমে বাঙালিরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তেলুগুদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি তো বটেই। একদিন এক তেলুগু সহকর্মী হঠাৎ দাবী করে বসল আমাকে ফোনে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে কারণ কানের কাছে অজানা ভাষায় কেউ কথা বললে তার কাজের অসুবিধা হচ্ছে। এই অন্যায় দাবী মেনে নেওয়ার ছেলে আমি নই। ফলে তার সাথে জোর ঝগড়া হল। সে বলল “তাহলে তেলুগু শেখো। এখানে এসে থাকবে, কাজ করবে আর এখানকার ভাষা শিখবে না?” আমি সপাটে জবাব দিয়েছিলাম “শিখতেই পারি। কিন্তু তুমি কলকাতায় এসো, আমরা তোমায় বাংলা শিখতে জোর করব না। আমরা করি না।” সে আর রা কাড়েনি।
বাঙালি হিসাবে অত গর্বিত আমার কখনো লাগেনি। আর সশস্ত্র রামনবমী মিছিল, তজ্জনিত হিংসা, আবুল কালাম আজাদের মূর্তি ভাঙা দেখে বাঙালি হিসাবে এত লজ্জিতও কখনো হইনি। সেই লজ্জা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই বাঙালিরা যারা এখন আমাদের জাতিগত অধঃপতনের দোষ চাপাচ্ছে অবাঙালিদের ঘাড়ে। ভারত এখন বিবিধ আমরা ওরায় বিভক্ত। তার মধ্যে আবার একটা নতুন আমরা-ওরা যোগ করছে এই বাঙালিরা।
নিজের অযোগ্যতা, অপদার্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো ভীতু, ওপরচালাক এবং অলস লোকের লক্ষণ। এই বাঙালিরাও আমাদের সেরকম বলেই প্রমাণ করছে। হাস্যকর কিছু কথা বলা হচ্ছে। “এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”, “আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”, “রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এসে এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঢোকাল”, “ওরা যেখানে যেখানে থাকে সেখানেই কিন্তু হিন্দুত্ববাদের রমরমা” — এইসব কথা দেখছি বিজেপিবিরোধীরা তো বটেই, নিজেকে বামপন্থী বলে দাবী করা অনেকেও বেশ বুক ফুলিয়ে বলছেন, সোশাল মিডিয়ায় লিখছেনও। মোটের উপর ঐ তিনটেই বক্তব্য এঁদের। কথাগুলো কতটা অন্যায়, কেন অন্যায় সেটা এবার দেখা যাক।

“এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”
কিরকম হওয়া উচিৎ ছিল তাহলে? মুম্বাইয়ের শিবসেনার মত? বিহার বা উত্তরপ্রদেশের লোক দেখলেই ঠ্যাঙানো উচিৎ ছিল? নাকি সব্বাইকে বাংলা শিখতে হবে, নইলে এর লাইসেন্স দেব না, তার লাইসেন্স দেব না — এসব বলা উচিৎ ছিল? প্রথমত, মুম্বাইতে এটা করে কী ফল হয়েছে? মুম্বাই বলতেই বিশ্বসুদ্ধ লোক কী বোঝে? বলিউড। কোন ভাষায় ছবি হয় সেখানে? হিন্দি। চেনা পরিচিত বাঙালি যারা মহারাষ্ট্রে থাকেন তাঁদের কজন মারাঠি জানেন একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো। বুঝতে পারবেন ঠ্যাঙাড়ে পদ্ধতি ব্যর্থ। তাছাড়া এই কথা যদি বলেন তাহলে হিন্দুত্ববাদীরা যখন পাকিস্তানের উদাহরণ দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া সমর্থন করে তখন কিন্তু বলা চলবে না “দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চাও তাহলে?”

“আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”
এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর নেই। কিসের কালচার? কালচার বলতে আজকের বাঙালি কী বোঝে? কালচারের বাংলা প্রতিশব্দ কী? সঠিক বানানে সেটা লিখতে পারবে চল্লিশের নীচে বয়স এমন কজন আছে? তামিল, তেলুগু ছবি ঝেড়ে বলিউডে ছবি হয় আবার সেই ছবি ঝেড়ে বাংলা ছবি হয়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই চলছে। এর নাম কালচার? ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে তো বাঙালি দেড়শো বছর ধরে পড়ছে কিন্তু আগে তো বাপ-মা গর্ব করে বলত না “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না”? এই অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে বিহারী, মাড়োয়ারিরা? একই স্কুলে পড়া মাড়োয়ারি ছেলেমেয়ের বাবা-মাকে তো বলতে শুনি না গদগদ হয়ে “মেরে বেটে কো না হিন্দি ঠিক সে আতা নহি”? সন্ধ্যের পর তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি যে সিরিয়ালগুলো দ্যাখে সেগুলোর নাম কালচার? ওসবে তো হিন্দি ছবির গানও চলে। তার মানে যারা বানায় তারা নিজেরা লিখতে তো পারেই না, লাগসই বাংলা গান খুঁজে বের করার মুরোদও তাদের নেই। স্বাভাবিক। কারণ এদের সাক্ষাৎকার যা এদিকওদিক পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় এরা বাংলা বলে গ্রীকদের মত। তা এরকমটা এদের শেখাল কে? হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালা? গলায় পা দিয়ে? বাঙালি হিন্দু মেয়ের বিয়েতে মেহেন্দি চালু করল কে? কোন বিহারী এসে এ কে ৪৭ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল? যে ছেলে সব শাস্ত্রীয় আচার মেনে বিয়ে করে, প্রেমের বিয়েতেও পণ নিতে ছাড়ে না, সে বৌভাতের দিন প্রথাগত ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে শেরওয়ানি পরে কোন মাড়োয়ারির ভয়ে? ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে এমনকি দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও বাংলাকে সরিয়ে হিন্দি ঢোকান যে বাঙালি বাবা-মায়েরা তাদের কোন হিন্দিভাষী ব্ল্যাকমেল করেছে এটা করতে?
তাছাড়া কালচার মানে তো শুধু এসব নয়। ট্রেনে বাসে তরুণ বাঙালিদের ভাষা শুনে দেখেছেন? এমনিতে পাঁচ লাইন কথা বললে দু লাইন ইংরিজি আর আড়াই লাইন হিন্দি থাকে। খিস্তি দেওয়ার সময় কিন্তু এরা পরম বাঙালি। এবং জনসমক্ষে খিস্তিসহ কথা বলাটা বেশ গর্বের ব্যাপার এদের কাছে। বছর কুড়ি আগেও বড়দের সামনে শালা বলে ফেললে যে বাঙালি কানমলা খেয়েছে তারই ছেলেমেয়ে ট্রেনে বসে হেডফোনে বন্ধুকে মহানন্দে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যায়, সে কামরাভর্তি যতই বাপ-পিতেমোর বয়সী লোক থাক, মহিলারা থাকুন বা বাচ্চাকাচ্চা থাক।
এই জাতির কালচার শেষ করে দিয়েছে অন্য রাজ্য থেকে আসা দশ বারো শতাংশ লোক? শুনলেই হাসি পায়।

“এ বাংলা রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এই সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ রাজনীতি ঢোকাল”
ঐ তিন চারটে নাম মুখস্থ বুলির মত আউড়ে যাওয়া বহুকাল হল বাঙালির বদভ্যেস। কাঁঠালি কলার চেয়েও বেশি ঘটে ব্যবহার করা হয় এই নামগুলো। অথচ এই লোকগুলো কেন বিশিষ্ট তা ছেলেমেয়েকে শেখানোর দায়িত্ব অনেকদিন বাবা-মায়েরা ছেড়ে দিয়েছেন। কি ভাগ্যিস দ্বিতীয় জন কিছু গান, কবিতা লিখে গেছেন। তাই স্ট্যাটাস বজায় রাখতে বাড়িতে রচনাবলী সাজিয়ে রাখা, ছেলেমেয়েকে আবৃত্তি স্কুলে পাঠিয়ে “ভগবান তুমি…” বলতে শেখানো, ঘুরেফিরে গুটিকয়েক গান আর নাচ শেখানো — এসব আছে। বাকিরা তো আক্ষরিক অর্থেই ছবি হয়ে গেছেন। প্রথমজনেরটা থাকে ঠাকুরঘরে। অতএব কী বলেছেন ওসব আর কে পড়তে যাবে? পড়লেও ভাবতে যাবে কেন? গুরুবচন। মুখস্থ করাই কর্তব্য, ভাবতে নেই।
রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন অথচ সঙ্গীতে এবং কাব্যে একেবারে স্বতন্ত্র নজরুলের প্রতি আমরা পশ্চিমবঙ্গীয়রা সযত্নলালিত অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছি। আজকাল আর নজরুলগীতি শেখা ঠিক কেতাদুরস্ত নয়। আমাদের ছোটবেলার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যাগুলোও প্রায় অবলুপ্ত। অন্নদাশঙ্করেরই বোধহয় ভুল হয়েছিল। নজরুলকে আমরা বিলকুল ভাগ করে দিয়েছি। আশঙ্কা হয় সেটাও হয়ত তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যেই।
চতুর্থজনের অবস্থা তো আরো করুণ। এই ভদ্রলোকের নাম আজকাল আর খুব বেশি বাঙালি জানে কিনা আমার সন্দেহ হয়। ছোটদের তো জানার উপায়ও নেই। তারা তো জলি প্রাইমার, এলিমেন্টারি ম্যাথসে ডুবে আছে। তার মধ্যে কি আর বর্ণপরিচয়ের জায়গা আছে? আর বড়রা তো বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বরাবরই জানত দুটো শব্দ —- বিধবাবিবাহ আর বাল্য বিবাহ। আরেকজনকে তো বাঙালি ভুলেই গেছে। তিনি রামমোহন রায়। সেটা অবশ্য একদিকে ভাল। পপকর্ন খেতে খেতে পদ্মাবতী দেখার সময়ে ঐ ভদ্রলোককে মনে পড়লে পুরো আমেজটাই নষ্ট হবে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে এই লোকগুলোকে শালগ্রাম শিলা বানিয়ে ফেলেছি আমরা অনেক আগেই। সুতরাং আমাদের বাংলাটা আর এদের বাংলা নেই। এর জন্যে বিহারী, মাড়োয়ারিদের গাল পাড়ার কোন যুক্তি নেই। তা বাদেও বাংলাকে এদের বাংলা বলা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে অর্ধসত্য বলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রামকৃষ্ণের কথা আলাদা। তিনি শত হলেও ধর্মগুরু। তাছাড়া তাঁর এক নম্বর শিষ্য একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গেছেন। তাই তিনি নিজের সময়ও পূজিত, এখনো পূজিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে গালাগাল দেওয়ার লোক তাঁর সময়েও নেহাত কম ছিল না। যেমন তাঁর যশে দ্বিজেন্দ্রলালের কম গা জ্বলেনি। আর নোবেল টোবেল পাওয়ার পরেও, বাণী বসুর ‘অষ্টম গর্ভ’ পড়লে বোঝা যায়, শিক্ষিত বাঙালিরা অনেকেই মনে করত উনি শুধু একজন বড়লোকের ছেলে যে শান্তিনিকেতনে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে। এসব যারা মনে করত এ বাংলা তাদেরও। নিজেদের রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি ভাবতে গেলে মনে রাখা উচিৎ আমরা ঐ লোকগুলোরও জাতভাই।
আর বিদ্যাসাগর? এ বাংলা কোনদিনই তাঁর ছিল না। তিনি যেমন আমাদের পূর্বপুরুষ তেমন যারা বিধবাদের বিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিল, তাঁকে খিস্তি করে গান লিখেছিল, জুতো ছুঁড়েছিল, টাকার লোভে তাঁকে ঠকিয়েছিল তারাও এই আমাদেরই পূর্বপুরুষ। এবং তারা নেহাত এলেবেলে লোকও নয়, অনেকেই তখনকার সমাজের মাথা। এই বাংলা এমনই বিদ্যাসাগরের যে তিনি শেষ বয়সে এই জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে দন্ডকারণ্যে সাঁওতালদের সঙ্গে গিয়ে বাস করতেন।
যে নবজাগরণ বা আলোকপ্রাপ্তি নিয়ে আমরা জাঁক করি সেই আলো যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক ইউরোপীয় অধ্যাপকও। মনে রাখা ভাল যে সেই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে আমাদেরই গণ্যমান্য পূর্বপুরুষরা বিদেশী এবং বিধর্মী বলে অপমানের একশেষ করেছিল। আমাদের সমাজের কুপ্রথাগুলোর দিকে আঙুল তোলার তাঁর অধিকার নেই বলেছিল। ঠিক যেমন আজকের দক্ষিণপন্থীরা বলছে লেনিন তো বিদেশী, এদেশে তার মূর্তি থাকবে কেন? আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরা ডিরোজিওকে ভাতেও মেরে এমন অবস্থা করে যে তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
আর সাম্প্রদায়িকতা হিন্দিভাষীরা এ রাজ্যে নিয়ে এসেছে, কেবল তাদের এলাকাগুলোতেই হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটছে এমনটা যদি আপনার মনে হয় তাহলে বলতে হয় আপনি বুদবুদের মধ্যে বাস করছেন বহুকাল ধরেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলে চারপাশে অজস্র আত্মীয়স্বজন পাবেন যারা গাদা ডিগ্রিধারী হয়েও চরম অশিক্ষিতের মত বলে “অমুকের মুসলমানদের সাথে এত কিসের দহরম বুঝি না। বাঙালি ছেলে বাঙালিদের সাথে বন্ধুত্ব কর না।” বাংলা ভাষার জন্যে আজ অব্দি যারা প্রাণ দিয়েছে সীমান্তের দুই পারে, তাদের বেশিরভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী অথচ আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশাধারী মূর্খরা বলে তারাই বাঙালি, মুসলমানরা মুসলমান। বিজেপির প্রোপাগান্ডা আর মমতার নিজেকে মুসলমানদের ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা শুরু হওয়ার পর থেকে আশপাশের লেখাপড়া জানা মানুষদের ভেতরের ঘৃণা কিভাবে বেরিয়ে আসছে, কি অনায়াসে তারা ভিত্তিহীন গুজবকে ধ্রুব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করছে এবং অন্যকে বিশ্বাস করাচ্ছে তা যদি আপনার চোখে না পড়ে থাকে, একমাত্র তাহলেই আপনি ভাববেন হিন্দুত্ববাদীরা শুধু হিন্দিভাষীদের এলাকায় শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে এই সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসও আমাদের সুপ্রাচীন। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অনন্য প্রতিভা যেমন তাঁর ইহুদীবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি, আমাদের গদ্যের আদিপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভাও তেমনি তাঁর মুসলমানবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি। মুসলমান শাসকরা এদেশে হানাদার এবং সমস্ত অধঃপতনের মূলে, তারা আসার আগে এদেশ স্বর্গরাজ্য ছিল — এই যে অতিসরলীকৃত ইতিহাস আর এস এস আমাদের গেলাচ্ছে, বঙ্কিম যে তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু ভাবতেন তা ভাবা শক্ত। রাজসিংহ উপন্যাসের শেষে তবু একটা কৈফিয়ত গোছের লেখা আছে, যেখানে বঙ্কিম লিখেছেন সব হিন্দুই ভাল আর সব মুসলমানই খারাপ এমনটা বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। আনন্দমঠ উপন্যাসের শেষে তাও নেই।
বিবেকানন্দ একবার বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সঙ্গে ঐস্লামিক দেহের সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর ইতিহাস পাঠেও “সবই ব্যাদে আছে” এবং সে যুগের পর থেকে ভারতে আর ভাল কিছু হয়নি — এই মনোভাবটা বড় জ্বলজ্বল করে। আর সত্যি বলতে কি, ঐ উক্তি থেকেও এটাই মনে হয় যে বিবেকানন্দ মুসলমানদের একটা বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষ হিসাবে না দেখে একটা বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর লোক হিসাবে দেখতেন। নইলে ঐস্লামিক দেহ কথাটার কোন মানে দাঁড়ায় কি? সব মুসলমানের দেহের গঠন কি একরকম? আমার মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মুসলমান মাস্টারমশাই সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার রোগাসোগা লোক। আবার আমাদের পেস বোলার মহম্মদ শামি। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ চেহারার উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা মুসলমান। এদের মধ্যে কার দেহের সঙ্গে বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সমন্বয় চাইছিলেন বিবেকানন্দ?
অত তত্ত্বকথারও দরকার নেই, বাস্তব উদাহরণ দেখি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গা করতে আমরা বাঙালিরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকিনি। ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্টের দাঙ্গাও বাইরে থেকে কেউ এসে করে দিয়ে যায়নি।
অতএব শুরু হয়ে যাওয়া ঝড় এবং আসন্ন প্রলয় আটকাতে হলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বাঙালি সংস্কৃতিমান, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, বাঙালি দাঙ্গাবাজি করে না — এই একমাত্রিক পরিচিতিটা আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আমাদেরই তৈরি করা। আসলে বাঙালিদের মধ্যে অন্য কোন জাতের লোকেদের চেয়ে পরধর্মবিদ্বেষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দাঙ্গাবাজ লোক কম নেই। কোনদিন ছিলও না। বাঙালির বাংলাকে এক রাখতে রাখীবন্ধন করা রবীন্দ্রনাথ আছেন আবার হিন্দু, মুসলমান এক দেশের নাগরিক হতে পারে না — এই মনোভাবের শ্যামাপ্রসাদও আছেন। আমাদের “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” লেখা, অসামান্য শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা নজরুল আছেন আবার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস লেলিয়ে দেওয়া সুরাবর্দিও আছেন। আপনি এদের মধ্যে কার উত্তরসূরি সেটা প্রমাণ হয় আপনার কথায় এবং কাজে।
অতএব আঙুলটা এবার নিজের দিকে তোলা যাক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের দৈত্যটার মুখোমুখি হওয়া যাক। এমনিতেও যে রাজ্যে আমরা বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে অন্য রাজ্যের অন্য ভাষাভাষী মানুষ এসে সবকিছু বদলে দিচ্ছেন — এটা যদি সত্যি বলে মানতে হয় তাহলে এটাও মানতে হয় যে আমরা সব নিরেট মাথার লোক। গোটা ভারতকে ভাগ করা হচ্ছে, বাঙালিকেও ভাগ করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সেটা ভুলে আরো নতুন ভাগাভাগি তৈরি করবেন না দয়া করে। আদি অনন্তকাল ধরে মানুষ জীবিকার সন্ধানে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাচ্ছে। এই ধারার বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন অনৈতিহাসিক তেমনই অমানবিক। পৃথিবীর কোন প্রগতিশীল মানবগোষ্ঠী এর জন্যে কারো সাথে শত্রুতা করে না। এবং করতে ইচ্ছে করলে মনে রাখবেন, সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকে এবং বহু বাঙালি পেশাগত কারণে সারা ভারতে ছড়িয়ে আছেন।
কী বললেন? হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ? সে তো সঙ্ঘ পরিবার, ভারত সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার করছে। তার জন্যে আপনার হিন্দিভাষী, রাম আর হনুমানের পূজারী প্রতিবেশী দায়ী হবেন কেন? আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে মালার মত গলায় পরে নিচ্ছি আমরা নিজে — বাংলার চর্চা ক্রমশ কমিয়ে দিয়ে এবং ভাষাটার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। কয়েক মাস আগে এক টেলিকম কোম্পানি তাদের ইংরিজি বিজ্ঞাপনের বাংলা তর্জমা খবরের কাগজে ছেপেছিল শুধু গুগল ট্রান্সলেটরের ভরসায়। ফলে সেটার হরফটাই যা বাংলা ছিল, ভাষাটা কী তা বোঝা ভগবানেরও অসাধ্য। এই সাহস ওরা তামিলনাড়ু, কর্ণাটক কি কেরালায় পায় না। এখানে যে পায় তার জন্যে দায়ী আমরাই, এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নন। অন্য ভাষা শিখতে গেলে যে বাংলা ভুলতে হয় না সেটা নিজে বুঝলে এবং ছেলেমেয়েকে বোঝালে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ এমনিই ট্যাঁ ফোঁ করার জায়গা পাবে না।

বেচারাথেরিয়াম ডাক্তার

এই তারতম্য সরকারকে এবং আমাদের মত রুগীদের, তাদের বাড়ির লোকেদের কী বার্তা দিচ্ছে? শুধু সরকারী হাসপাতালের যাঁরা ডাক্তারি করেন তাঁদের যোগ্যতা কম নাকি কম রোজগার করেন বলে গুরুত্ব কম? এই বার্তা গেলে কোন রুগী কোন ডাক্তারকেই শ্রদ্ধা করবে কি? নাকি সরকার কোন ডাক্তারকে গুরুত্ব দেবে?

একমাস হতে চলল বিছানায় পড়ে আছি — এক সপ্তাহ নার্সিংহোমে, তারপর থেকে বাড়িতে। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা, ধুম জ্বর — এসব নিয়ে নার্সিংহোমের দিনগুলো শোচনীয়ভাবে কেটেছে প্রথমদিকে। তারপর আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হলাম। হয়ে দেখলাম আমার চেয়েও খারাপ অবস্থা ডাক্তারদের। মুখে বলছেন ডেঙ্গু কিন্তু লিখতে হচ্ছে “এন এস ১ বাহিত ভাইরাল জ্বর” কারণ স্নেহময়ী দিদির রাজ্যে শুধু যে সাংবাদিক কী লিখবেন সেটা দিদি এবং তাঁর ভাইদের চোখরাঙানিতে ঠিক হয় তা নয়, ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে কী লিখবেন সেটাও নবান্নে ঠিক হয়। ডাক্তারের দুর্গতিটা ভাবুন — পুজোমন্ডপে অসুরও হতে হবে আবার প্রেসক্রিপশনও লিখতে হবে হুজুরের হুকুমমত, নইলেই টানাটানি। এক ডাক্তার তো বেচারাথেরিয়ামের মত মুখ করে বলেই দিলেন “মাঝেমাঝে মনে হয় প্র্যাকটিস করা ছেড়ে দিই।”
এসব দেখে মনে পড়ে গেল ডাক্তার গড়াইয়ের কথা। ডাক্তার এস পি গড়াই, যিনি বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজির কর্তা ছিলেন এবং মিডিয়াবাহিনী নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দেশোদ্ধারে আপত্তি জানিয়ে, অপারেশন ফেলে মহাকরণে জো হুজুরি করতে পারবেন না বলার জন্যে সেই ২০১১র মে মাসে সাসপেন্ড হয়েছিলেন। সেইসময় অনেকেরই খুব আহ্লাদ হয়েছিল কারণ “সি পি এম আমলের আবর্জনা সরানো হল।” কোন কোন ডাক্তারেরও যে এমন উল্লাস হয়নি তা বলা যাবে না। ডাক্তারবাবুরা সংগঠিতভাবে কোন প্রতিবাদ করেছিলেন কি? মনে করার খুব চেষ্টা করছি, মনে পড়ছে না।
আমার বাবার জন্যে কয়েকবার এবং একবার আমার নিজের জন্যেও মমতা ক্ষমতায় আসার আগে বাঙ্গুরের ঐ হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। তখন দেখেছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদির দিক থেকে সরকারী হাসপাতাল বললেই যে ভয়াবহ ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বাঙ্গুর ঠিক তেমনটা ছিল না। নিশ্চয়ই তার কৃতিত্ব ডাক্তার গড়াইয়ের মত লোকেদেরই। কিন্তু পরিবর্তন সেসবের ধার ধারেনি।
আরেকজন ডাক্তারের কথাও মনে পড়ল — ডাক্তার অরুণ সিং। শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালের এই ডাক্তারকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এনার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছিলাম। ওরকম ব্যস্ত হাসপাতালে নিও ন্যাটালজির মত একটা সুপার স্পেশালাইজড বিভাগ বানিয়ে ফেলেছিলেন ভদ্রলোক। সেই বিভাগে যেতে হয়েছিল আমাকে। গিয়ে দেখি কি আশ্চর্য মেশিনের মত কাজ হয় সেখানে, হাজারটা অপ্রাপ্তির মধ্যেও! একজন নার্স ডাক্তার সিংকে উদ্ধৃত করে যেরকম স্বরে কথা বললেন আমার আর আমার স্ত্রীর সাথে, অতখানি শ্রদ্ধা নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পর্কে অন্য কর্মীদের কথা বলতে শেষ শুনেছিলাম যখন আমার স্কুলের মাস্টারমশাইরা আমাদের হেডস্যার সম্পর্কে কথা বলতেন। ডাক্তার সিংকে যেদিন সামনাসামনি দেখলাম, দেখে মনে হল কোন ধ্যানমগ্ন ঋষিকে দেখছি। এমন একটা লোক যাকে এককথায় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছা করে। আমার সামান্য দেখায় ভুল থাকতে পারে কিন্তু তথ্য বলছে এস এস কে এমের পেডিয়াট্রিকস এবং নিও ন্যাটালজি বিভাগকে দেশের অন্যতম সেরা করে তোলায় ডাক্তার সিং অনস্বীকার্য অবদান। সেই লোকটিকেও কি এক অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই এমন এক হাসপাতালে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাঁর গবেষণার কোন দাম নেই। ডাক্তারবাবুরা কতটা প্রতিবাদ করেছিলেন? মনে করতে পারছি না।
হ্যাঁ, প্রতিবাদ একটা হয়েছিল, একেবারে রাস্তায় নেমে। যখন মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী হাসপাতালের জোরজুলুম, দু নম্বরীর একটা হিসাবকিতাব করলেন প্রকাশ্যে, তারপর যখন হাসপাতালগুলোয় পেশিশক্তির আস্ফালন চলল একের পর এক। তখন ডাক্তাররা রাস্তায় নেমেছিলেন বটে।
তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কী বুঝব? সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের পাশে বেসরকারীর ডাক্তারবাবুরা নেই নাকি বেসরকারীর ডাক্তারবাবুদের পাশে সরকারীর ডাক্তারবাবুরা নেই? আমাদের অভিজ্ঞতা তো বলে ঘুরেফিরে একই ডাক্তারদের সরকারী, বেসরকারী দুরকম জায়গাতেই দেখা যায়। তাহলে প্রতিবাদের এহেন তারতম্য হয় কেন? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই তারতম্য সরকারকে এবং আমাদের মত রুগীদের, তাদের বাড়ির লোকেদের কী বার্তা দিচ্ছে? শুধু সরকারী হাসপাতালের যাঁরা ডাক্তারি করেন তাঁদের যোগ্যতা কম নাকি কম রোজগার করেন বলে গুরুত্ব কম? এই বার্তা গেলে কোন রুগী কোন ডাক্তারকেই শ্রদ্ধা করবে কি? নাকি সরকার কোন ডাক্তারকে গুরুত্ব দেবে? দিচ্ছে না যে সে তো বোঝাই যাচ্ছে। নইলে ডাক্তার রোগনির্ণয় করে কী লিখবেন তা মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করেন কোন অধিকারে? তিনি পাশ করা উকিল, ডক্টরেট, কবি, চিত্রশিল্পী — এসব জানতাম। তিনি ডাক্তারও হয়ে উঠলেন নাকি? ইন্ডিয়ান মেডিকাল এসোসিয়েশন বলে কিছু এরাজ্যে আছে?

বড়লোকের খেলা

ছোটবেলা থেকে আমরা যে শুনে এসেছি ফুটবল হল গরীবলোকের খেলা সেটাকে এখন ছোটবেলার পরিত্যক্ত খেলনাগুলোর মত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। সারা পৃথিবীতেই ফুটবল এখন বড়লোকের খেলা — বড়লোকেরাই দ্যাখে, বড়লোকেরাই খেলে

saltlake

মাসখানেক আগে একদিন একটা ওয়েবসাইটের সাহায্যে হিসাব করে জানলাম আমি একবছরে যা রোজগার করি, প্যারিস সাঁ জা ফুটবল ক্লাবের ব্রাজিলীয় মহাতারকা নেমারের তা রোজগার করতে লাগে ছ ঘন্টার কিছু বেশি। মনে রাখতে হবে, মোদী সরকার যতই নানা ফন্দিফিকিরে আমার হকের টাকা থেকে আমায় বঞ্চিত করুক, আমি ভারতবর্ষের বেশিরভাগ লোকের চেয়ে সচ্ছল অবস্থাতেই আছি। অর্থাৎ আমার পরিবারের কাউকে আধপেটা খেয়ে থাকতে হয় না, আমার নিজের বাসস্থান আছে, প্রয়োজন পড়লে এবং না পড়লেও জামাকাপড় কেনার সংস্থান আছে, সন্তানকে স্কুলে পড়ানোর জন্যে সরকারী অনুদানের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না, বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে এ রাজ্যের সেরা বেসরকারী চিকিৎসা তাকে দেওয়ার মত আর্থিক সঙ্গতি আছে এবং এতকিছুর পরেও ইচ্ছে হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, দরকার না হলেও বইপত্র কেনা এবং বছরে একবার সপরিবারে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। তা এই আমার বাৎসরিক রোজগারই যদি নেমার মোটে ছ ঘন্টায় আয় করে ফেলেন, তাহলে ভেবে দেখুন ভারতের মত একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশের মহানগরগুলোর বস্তিতে যারা থাকে তাদের জীবনযাত্রার সাথে নেমারের জীবনযাত্রার ফারাক কতটা। একজন বস্তিবাসী যদি পৃথিবী হন, নেমার তাহলে মহাবিশ্ব।
কয়েকমাস আগেই নেমারের প্রাক্তন টিমমেট লায়োনেল মেসি বাল্যবন্ধু আনতোনেলাকে বিয়ে করলেন আর্জেন্টিনায় নিজের যে শহরে জন্ম সেই রোজারিও এক বিলাসবহুল হোটেলে। সংবাদসংস্থাগুলো আকাশ থেকে তোলা একটা ছবি পাঠিয়েছিল হোটেলটার, অনেক কাগজে ছাপাও হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যায় হোটেলটার ঠিক বাইরেই বিস্তৃত এলাকাজুড়ে বস্তি। দেখতেই মনে পড়েছিল বিজন ভট্টাচার্য নামে এক পাগলের লেখা ‘নবান্ন’ বলে একটা নাটকের কথা। তার একটা দৃশ্য আমাদের পাঠ্য ছিল কোন এক সুদূর অতীতে। সেই দৃশ্যে এক বড়লোকের বাড়ির বিয়ে হচ্ছে। সেখানকার আসবাবপত্রের গা দিয়ে “আলো চুঁইয়ে পড়ছে” আর বিয়েবাড়ির বাইরে ময়লার ভ্যাটে একদল মানুষ কুকুরের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে খাবারের জন্যে। আপনি বলবেন মেসি, নেমার তাঁদের জন্মগত প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের জোরে ঐ রোজগারে পৌঁছেছেন। কথাটা মিথ্যে নয়। একইসঙ্গে এটাও মিথ্যে নয় যে অনাহার ছাড়া অত্যাহার থাকতে পারে না।
যাই হোক, সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় ছোটবেলা থেকে আমরা যে শুনে এসেছি ফুটবল হল গরীবলোকের খেলা সেটাকে এখন ছোটবেলার পরিত্যক্ত খেলনাগুলোর মত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। সারা পৃথিবীতেই ফুটবল এখন বড়লোকের খেলা — বড়লোকেরাই দ্যাখে, বড়লোকেরাই খেলে। বিশ্বাস হচ্ছে না? ইন্টারনেটে খুঁজে দেখুন প্রিমিয়ার লিগের খেলাগুলোর টিকিটের দাম নিয়ে কত সমর্থক অসন্তুষ্ট। এন্ড্রু ফ্লিন্টফকে মনে পড়ে? তিনি তো নেহাত গরীব লোক নন, সিপিএম নন, বিজন ভট্টাচার্যের মত পাগলও নন। ইউটিউবে খুঁজে দেখুন, একটা রেডিও স্টেশনে বসে ফ্লিন্টফ প্রশ্ন তুলছেন আর্সেনালের খেলার টিকিটের দাম নিয়ে। বলছেন যে এওয়ে ম্যাচটা আর্সেনাল খেলতে যায় বিলাসবহুল প্লেনে করে, সে ম্যাচটা তো বাসে চড়েও খেলতে যাওয়া যায়। যে সমর্থক কষ্ট করে আয় করা পয়সা খরচ করে টিউবরেলে চড়ে খেলা দেখতে আসেন তিনি কুড়ি মিনিটের ফ্লাইটে যাতে সিনেমা দেখা যায়, ভিডিও গেম খেলা যায়, স্নানবিলাসী হওয়া যায় — তার জন্যে বেশি দামের টিকিট কিনতে বাধ্য হবেন কেন? গানাররা কেন বাসে করে খেলতে গিয়ে টিকিটের দাম কমানোর ব্যবস্থা করবে না?
তা এহেন ফুটবল খেলার ভবিষ্যতের তারকাদের আপনি দেখতে পাবেন আপনার দেশেই। আর কয়েকদিন পরেই আমাদের চিরচেনা (সাংবাদিক বন্ধুদের মুখে শুনছি আর চেনা যাচ্ছে না) সল্টলেক স্টেডিয়ামে তারা দাপিয়ে বেড়াবে। সেই স্টেডিয়ামের আশেপাশে কখনো বস্তি থাকতে দেওয়া যায়! ভাবলেন কী করে? পৃথিবীর সর্বত্রই তো দরিদ্র কুৎসিত, দারিদ্র্য নয়। অতএব বড়লোকেদের মোচ্ছবের জন্যে কিছু গরীবকে তো ঘরছাড়া হতেই হবে। আমাদের দেশটা কত সুজলাং সুফলাং সেটা দেখাতে হবে না দুনিয়াসুদ্ধু লোককে? হীরকরাজার মোচ্ছবের আগে লোকের ভিটেমাটি চাটি করার সেই দৃশ্য মনে নেই?
আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে এতবড় খেলাধুলোর আয়োজন মানেই তো এই। ব্রাজিলে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ হল তখনো এই একই ঘটনা ঘটেছিল তো। ব্রাজিল তো তবু ফুটবলের পীঠস্থান, আমাদের তো ফুটবলের বিশ্ব মানচিত্রের পিঠে স্থান খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তবু আমরা এই মহাযজ্ঞ করছি। করার সুযোগ যে পেয়েছি সেও ফুটবল আর গরীবের খেলা নেই বলেই। মাঠের ভেতরে আমরা যা-ই করি না কেন, বাইরে আমাদের মত বড় বাজার আর কোথায় আছে? ফিফা আর তার স্পনসররা সেই বাজারে ব্যবসা করার এমন সুযোগ ছাড়বে কেন? আমাদের আম্বানি ইত্যাদিরাও সেই সুযোগে যারপরনাই কামিয়ে নেবেন না কেন? আর আমাদের শাসকরাই বা দুনিয়াকে দেখানোর এমন সুযোগ ছাড়বেন কেন যে আমাদের দেশে সবার পেটে ভাত না থাক, দারুণ দারুণ সব স্টেডিয়াম আছে, মোচ্ছব করতে আমরা ভারী ওস্তাদ। তাই অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপই শেষ নয়, প্রধানমন্ত্রীর সস্নেহ প্রশ্রয়ে অনূর্ধ্ব-২০ আয়োজন করার আব্দারও করে ফেলেছি আমরা। হরির লুট ভাল জমেছে বুঝলে ফিফা সে আব্দার রক্ষা করতেও পারে। চাই কি, ভবিষ্যতে সিনিয়র বিশ্বকাপও আমরা আয়োজন করতে চাইতে পারি। এক ফুয়েরারের বার্লিন অলিম্পিক দরকার হয়েছিল শক্তি প্রদর্শন করতে, আরেকজনের একটা ফুটবল বিশ্বকাপ তো লাগতেই পারে।
যাও বস্তির ছেলে, যাও। যেখানে পার পালিয়ে যাও, ফুটবল তোমার খেলা নয়। বস্তিতে ন্যাকড়া দিয়ে বল বানিয়ে খেলতে খেলতে ফুটবলের রাজা হয়ে ওঠা দিয়েগো মারাদোনা যখন তোমার শহরের আদরের প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাথে বল লাথাবেন, তুমি তখন আসন্ন শীতে কোথায় মাথা গুঁজবে সেটা ভেবো। জগতের আনন্দযজ্ঞে তোমার নিমন্ত্রণ নেই, থাকতে পারে না।

পুনশ্চ: বন্ধুরা আমার ভন্ডামিতে ভুলবেন না যেন। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি এই খেলার বিপক্ষে নই। হতেই পারি না। আগামী একমাস সাজিয়ে গুছিয়ে ফলাও করে এই খেলারই খবর যারা আপনাদের সকালের কাগজে পরিবেশন করবে আমি তাদেরই একজন।

ভেসে যাব?

আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে গত এক দশকে দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন দেয় এরকম পুজোর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং একাদশীতে বিসর্জন দেওয়া হয় এমন ঠাকুরের সংখ্যাও ক্রমশ কমছে। সুতরাং আজকের দিনে একটা বিশেষ দিনে প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে ভাসান বন্ধ রাখতে বললে ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন উঠে যাওয়া বেশ বিস্ময়কর

দুটো কাগজের রিপোর্ট পড়লাম, আরো নানা জিনিস যা সবাই পড়ছে তাও পড়লাম। কিছু পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু যা নিয়ে সংশয় থাকছে না সেটা হল পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এর আগে কোন মুখ্যমন্ত্রী কবে দুর্গাপুজোর ভাসান হবে আর কবে হবে না তা ঘোষণা করেননি, কাজটা পুলিশকর্তা বা অন্য মন্ত্রীদের করতে দিয়েছিলেন। কেন? নিশ্চয়ই তাঁদের অন্য কাজ ছিল, ফলে উৎসবের খই ভাজা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর উৎসব নিয়ে উৎসাহ বরাবরই বেশি, এক্ষেত্রেও তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
ওঁত পেতে থাকা হায়েনার দল এমন সুযোগ ছাড়তে পারে না, ছাড়েওনি। “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” কথাটা বাঙালি হিন্দুর কানে ভাসিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী, পরিবারে কজন বিদেশবাসী আছে তা নিয়ে গর্ব করা বাঙালিও এই ঢপের চপ গপ গপ করে খেয়েছে, খাচ্ছে। একবারও ভেবে দেখছে না। ভাবলে বুঝতে পারত যে রাজ্যের বড় বড় পুজোগুলোর আয়োজক শাসকদলের নেতারা, যে রাজ্যের সরকার পারলে ইতুপুজোতেও ছুটি দিয়ে দেয়, শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় ভাসান নিয়ে মোচ্ছব করেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে — সে রাজ্যে হিন্দুর কোন খতরা নেই। সংখ্যালঘু তোষণ থাকলেও নেই, না থাকলেও নেই। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর অত্যুৎসাহে যেটা হল সেটা হচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা এমন একটা কারণে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে গেল যেটার সঙ্গে বাংলার মুসলমানদের কোন সম্পর্কই নেই। তাঁরা কেউ কখনো দাবী করেননি মহরমের তাজিয়ার জন্যে ভাসান বন্ধ রাখতে হবে। বলবেনই বা কেন? হিন্দু খতরায় থাকা বাংলায় এবছরও তো অসংখ্য পুজো কমিটির দায়িত্বে তাঁরাই আছেন। নিজেদের পুজোর ঠাকুরগুলো ভাসানোর ব্যবস্থাও তো তাজিয়া বার করার পাশাপাশি তাঁদেরই করতে হবে।
ক্ষতি যা হওয়ার ইতিমধ্যেই হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হাইকোর্টের আদেশ মেনে নিয়ে পুজো এবং মহরম যাতে শান্তিপূর্ণভাবে মেটে তার ব্যবস্থায় এইবেলা মন দিলে ভাল করতেন, কিন্তু উনি তো উনিই। আরো পাঁচটা গরম মন্তব্য করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ব্যাপারটাকে টেনে নিয়ে না গেলে, উত্তেজনা আরো না ছড়ালে ঠিক তৃপ্ত হতে পারছেন না বোধহয়।
যদি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য ঠিক হয় অর্থাৎ ১৯৮৩ আর ৮৭ সালে সত্যিই মহরমের জন্যে একাদশীর দিন ভাসান বন্ধ থেকে থাকে তাহলে প্রশ্ন ওঠে গত দুবছর ধরে যারা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদালতে যাচ্ছে, তারা কি ঐ দুবছর পুজো করেনি? তাহলে সেইসময়ে আদালতে যায়নি কেন? বা সেইসময়ে যারা পুজো করেছিল তাদের তখন কেন মনে হয়নি যে ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ হচ্ছে, হিন্দু খতরে মে হ্যায়? হঠাৎ ২০১৭ সালে এসে কেন মনে হল যে একদিন পরে ভাসান করতে বলা মানে ধর্মাচরণের অধিকারে হস্তক্ষেপ? আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে গত এক দশকে দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন দেয় এরকম পুজোর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং একাদশীতে বিসর্জন দেওয়া হয় এমন ঠাকুরের সংখ্যাও ক্রমশ কমছে। সুতরাং আজকের দিনে একটা বিশেষ দিনে প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে ভাসান বন্ধ রাখতে বললে ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন উঠে যাওয়া বেশ বিস্ময়কর।
এবার একটা জোরালো আপত্তি উঠবে জানি। “এই তাহলে সেকুলারিজম? আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমাদের সবসময় সংখ্যালঘুদের জন্যে স্যাক্রিফাইস করতে হবে কেন? ওদের ধর্মাচরণ মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে, আমাদের মৌলিক অধিকার নেই?” হক কথা। এবার তাহলে মৌলিক অধিকার নিয়ে আলোচনা হোক।
ভারতীয় সংবিধানের ২৫(১) ধারায় সব নাগরিককে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং স্বাস্থ্য বজায় রেখে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কাউকে দুর্গাপুজো করতে বাধা দেননি, বিসর্জনেও বাধা দেননি। দিলেও কিন্তু সেটা অসাংবিধানিক না-ও হতে পারত। যেমন দমকল বিভাগ যদি বলত কোন পুজোমন্ডপ বিপজ্জনক, দুর্ঘটনাপ্রবণ। তাহলে তাদের পুজো করার অনুমতি সরকার না-ই দিতে পারত। অর্থাৎ আপনি ধর্মাচরণ করবেন বলে অন্য লোককে বিপদে ফেলতে পারেন না। ওটা আপনার মৌলিক অধিকার নয়। যাদের অনুমতি দেওয়া হল না তারাও আদালতে যেতেই পারে। আদালত কি তাদের আর্জি শুনবে? কে জানে!
বিপদের কথা আসছে কেন? আসছে কারণ বিসর্জনের সময়ে পথে বা ঘাটে ঝগড়াঝাঁটি, এমনকি হাতাহাতি মোটেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যদি মহরমের তাজিয়া যোগ হয়, বিশেষ করে ২০১৭র ভারতে তথা বাংলায় সেটা সামলানো যে যথেষ্ট শক্ত তা কি বুঝতে খুব অসুবিধা হয়? এটা আইনশৃঙ্খলারক্ষার প্রশ্ন। সেটা যার দায়িত্ব, সেই রাজ্য সরকার যদি বলে “আমি পারব না”, তাহলে আমি তাকে অযোগ্য বলে তেড়ে গালাগাল দেবই। কিন্তু “কিচ্ছু হবে না” বলে উড়িয়ে দেব কি? জানি না। ক্ষমতাহীন নাগরিক হিসাবে শুধু আশা করি বিচারকরা যাতে খারাপ কিছু না ঘটে তার ব্যবস্থা করবেন, ব্যাপারটা রাজ্য সরকারের হাতে ছেড়ে রাখবেন না, বিশেষ করে যে সরকার তাঁদের প্রবল তিরস্কারের পাত্র।
তবে বিচারকদের রায় শোনার পর থেকে একটা প্রশ্ন বড্ড জ্বালাচ্ছে, সেইটা সবশেষে বলি। সংবিধানেরই ১৯(১)(ডি) চলাচলের স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে। মানে ভারতের যে কোন নাগরিক দেশের মধ্যে যে কোন জায়গা থেকে যে কোন জায়গায় চলাচল করতে পারে। তা কলকাতায় একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা আছে যার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। সেই রাস্তায় বেশ কিছুদিন হল দিনের বেলায় দেখেছি প্রাইভেট গাড়ি চলতে দেওয়া হয় না। এখন কয়েকজন গাড়ির মালিক মিলে যদি আদালতের কাছে গিয়ে বলেন যে সরকার এতদ্দ্বারা আমাদের চলাচলের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে, আদালত কি সেই আর্জি শুনবে? তারপর মামলায় যদি সাব্যস্ত হয় সত্যিই চালকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তাহলে কি আদালতের নির্দেশে মহাত্মা গান্ধী রোডে প্রাইভেট গাড়িও চলবে? এইভাবে যে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের কাজ তার সবই কি বিচারপতিরা নেবেন? সেভাবে দেশ চলবে তো?

আমাদের কেউ নেই

এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?

মমতা ব্যানার্জি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির — একথা ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় পার্থ চ্যাটার্জিও বলবেন না। তবু রাজ্যপালের বিরুদ্ধে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন সেটাকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না। তার কারণ দুটো। প্রথমত, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক। আর এস এস দ্বারা শিক্ষিত একজন লোক ভারতীয় সংবিধানকে খুব সম্মান করে এবং নিজের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে খুব সচেতন — এরকম দাবী করলে ভক্তরা যা-ই বলুন, প্রেতলোকে গোলওয়ালকর, হেড়গেওয়াররা খুব রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, বিজেপি ব্লক সভাপতির মত কথা এই ভদ্রলোক বলেই থাকেন। কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও বলেছেন।
কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল ওভাবে কথা বলার সুযোগ ত্রিপাঠীমশাইকে কে করে দিল? উত্তর একটাই। মমতা ব্যানার্জি নিজে।
দেড়শো কোটির দেশে আজকাল মানুষ অপ্রতুল, কিন্তু গরুর কোন অভাব নেই। এক গরুর নিজের ভগবানের মহত্ত্বে এত ঠুনকো বিশ্বাস যে অন্যের ধর্মস্থানে তাঁকে না বসালে শরীরটা বেশ হিন্দু হিন্দু লাগে না। আরেকপাল গরুর আবার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস এত ঠুনকো যে সামান্য ফটোশপের ধাক্কাতেই তার অপমান হয় এবং ভাঙচুর, বাড়ি পোড়ানো, মারধর (গণপিটুনিরও দাবী ছিল) না করলে নিজেদের যথেষ্ট মুসলমান মনে হয় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে মনে মনে তো অমন অনেকেই ভাবে। এই পরিমাণ হিংসা ছড়ানোর সাহস এদের হয় কখন? তখনই হয় যখন বিশ্বাস থাকে যে “আমার কিস্যু হবে না।” মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল কোন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না। ২০১১ র পর থেকে, ২০১৬ র পরে বিশেষত, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সৌভাগ্যক্রমে এর জেরে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানি হয়নি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। নইলে আরো বড় আকার নিত। এই ঘটনাগুলোর সবকটাতেই পুলিশ পৌঁছেছে হিন্দী সিনেমার পুলিশের মত দেরীতে। মালদা, চন্দননগর, ধূলাগড়, খড়গপুর, নদীয়া, অধুনা বাদুড়িয়া — এই সংঘর্ষগুলো কেন আগে থাকতে আটকানো গেল না সেটাও বড় প্রশ্ন। প্ররোচনা যে যাকেই দিয়ে থাক, সে প্ররোচনায় আগুন জ্বলার আগেই জল ঢালা গেল না কেন? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে আছে কী করতে?
আসল কথা মমতা এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছিলেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। বিজেপির হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করার বদলে মুসলমান মৌলবাদীদের তোল্লাই দিচ্ছিলেন। বস্তুত ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দিচ্ছিলেন। মুসলমানদের উন্নয়নের জন্যে হাতেকলমে কিছু করার বদলে নজর ছিল মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে ছবি তোলার দিকে। হাস্যকরভাবে সরকারী হোর্ডিং এ লেখা হচ্ছে “নমস্কার এবং সালাম।” যেন বাঙালি মুসলমান কখনো “নমস্কার” শব্দটা উচ্চারণ করে না। এতে কোন গরীব মুসলমানের কোন উপকার হয়নি। যা হয়েছে তা হল ইসলামিক মৌলবাদীদের বিশ্বাস তৈরি যে “দিদি আমাদের কিচ্ছু বলবে না” আর অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের কাজ সহজ করা। তারা দিব্যি হিন্দুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারছে “দিদি ওদের লোক। হিন্দুবিরোধী।” একইসঙ্গে মমতার আমলে গ্রামে, মফঃস্বলে গত কয়েকবছরে আর এস এস কিভাবে বেড়েছে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেটাও দিদির ইচ্ছা।
আদরের দিদি ভেবেছিলেন আর এস এস বাড়লে মুসলমানরা ভয় পাবে, তাঁকে রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে দেখবে আর ঢেলে ভোট দেবে। অন্যদিকে মুসলমান মৌলবাদীদের ভয়ে হিন্দুরা যদি বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে তো পড়ুক। এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?
এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী বললেন? না তিনি রাজ্যপালের কথায় এতটাই অপমানিত যে পদত্যাগ করবেন ভেবেছিলেন। চমৎকার। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, দাদু সুযোগ পেয়ে চেঁচামেচি করছেন আর মা ছেলেমেয়েদের কী করে বাঁচাব সেটা না ভেবে বললেন “আমি অত্যন্ত অপমানিত। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাব ভাবছিলাম। তারপর ভাবলাম আমি তো শ্বশুরমশাইয়ের মা নই, আমি ছেলেমেয়েদের মা। তাই গেলাম না। কিন্তু যেতে আমার দু মিনিট লাগবে।”
সঙ্কটমুহূর্তে পদত্যাগ যাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, তিনি হচ্ছেন আমাদের মুখ্য প্রশাসক! আমাদের যে কে বাঁচাবে!
বিঃ দ্রঃ তৃণমূল, বিজেপি, জামাত ইত্যাদি ছাড়াও এ রাজ্যে আরেকটা রাজনৈতিক শক্তি নাকি আছে বলে খবর। তাদের নাম বামফ্রন্ট। তারা গরু নয়, কচ্ছপ। গতকাল কলকাতায় তারা একটা গনগনে মিছিল করেছে। কিসের বিরুদ্ধে? কলেজ স্কোয়ারে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে। নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে। আর মাসখানেক পরে ওঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করবেন আশা করা যায়।

বুদ্ধিজীবীর নিরপেক্ষতা : নিরপেক্ষতার ভন্ডামি

ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।

রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন “যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি”। আজ সকালে শিখলাম বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এখন এত বুদ্ধি যে আইওয়া পৌঁছলে তবে ইসলামিক স্টেট সম্পর্কে জানতে পারেন। এই শিক্ষাটি আমার হল আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে নামকরা সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাটা পড়ে। ওঁর কবিতা কিছু কিছু পড়েছি। বেশ লাগে। বলতে কি, শ্রীজাতর চেয়ে বেশি ভাল লাগে। তার উপর আজকের লেখার শিরোনামটার সাথে একমত না হওয়ার কোন প্রশ্নই নেই: “সময় এসেছে ধর্ম না দেখে বিপন্নের পাশে দাঁড়ানোর”। অতএব লেখাটা গোগ্রাসে গিলতে গেলাম। আশা করেছিলাম লেখাটা ভাল হবে। এতটা শিক্ষামূলক হবে ধারণা করতে পারিনি।
কবি লিখছেন “গুজরাত দাঙ্গার পর দু’মাসের মাইনে দিয়েছিলাম। হেঁটেছিলাম বেশ অনেকগুলো মিছিলে। (তখনও জুকেরবার্গ ফুটেজ-বিপ্লবী হওয়ার সুযোগ করে দেননি)। তা সেই মিছিলের কয়েকটায় মহম্মদ সেলিম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কই সেলিম সাহেবকে কেউ মুসলিম সাম্প্রদায়িক বলেনি তো! আইনস্টাইন যখন রুজভেল্টকে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদিদের বাঁচাবার জন্য, কেউ কি তাঁকে ইহুদি-সাম্প্রদায়িক বলেছিলেন? মার্টিন লুথার কিং যে শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের মোকাবিলা করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের একে অপরের প্রতি “এক্সট্রিম ইন লাভ” হয়ে উঠতে বলতেন, তার জন্য কি কেউ বলেন যে উনি কৃষ্ণাঙ্গ সাম্প্রদায়িক?”
ইঙ্গিতটা বোঝা গেল? তিনটে উদাহরণ। একটাই মিল। মহম্মদ সেলিম জন্মসূত্রে মুসলমান, মিছিলটা ছিল ব্যাপক মুসলমান হত্যার বিরুদ্ধে। আইনস্টাইন জন্মসূত্রে ইহুদি, আবেদনটাও ছিল ইহুদিদের বাঁচানোর (যদিও এখানে কবি কোন চিঠির কথা বলছেন বুঝলাম না। কারোর জানা থাকলে জানাবেন। জানতে চাই। ম্যানহাটন প্রোজেক্ট নিয়ে চিঠিটা ঠিক ইহুদিদের বাঁচানোর জন্যে লেখা হয়েছিল বলে তো মনে হয় না)। মার্টিন লুথার কিং নিজে কৃষ্ণাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গদের এক হতে বলেছিলেন।
অর্থাৎ কবি ইঙ্গিত করছেন এঁদের কার্যকলাপ যে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো বলে প্রশংসনীয় তা নয়, এঁরা নিজ নিজ কৌমের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে প্রশংসনীয়। ভেবে অবাক লাগছে যে ২০০২ এ সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম একটা মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেখানে জন্মসূত্রে হিন্দু কোন সিপিএম নেতা যাননি। মানে বিনায়কবাবু তো তেমন কারো নাম করেননি দেখছি। কেউ গিয়ে থাকলে অবশ্য সেটা প্রশংসনীয় নয়। তাঁদের এখন বিবেকের দংশন হওয়া উচিৎ। যেমনটা বিনায়কবাবুর নিজের হচ্ছে। নিজের কৌমের পাশে না দাঁড়িয়ে অন্য কৌমের পাশে কেউ দাঁড়াতে যায়?
ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।
ভাল হত কবি যদি এই “নিজের কৌমের পাশে দাঁড়ান” কথাটাই সোচ্চারে গোটা লেখাটা জুড়ে বলতেন। তত্ত্বটা মানতে না পারলেও অন্তত বুঝতাম লোকটার সাহস আছে। কিন্তু না, সে সৎসাহস তিনি দেখাতে পারেননি। এরপরেই শুরু করেছেন, যাকে আজকাল ইংরিজিতে অনেকে বলেন whataboutery।
“কে বলবে এগুলোর বিরুদ্ধে? আমি নিজেই কি বলেছি? বলিনি বলেই মাথা নিচু হয়ে গেল যখন মল্লারপুরের একটি ছেলে বইমেলায় আমাকে বলল, ‘দাদরির পর আপনি খবরের কাগজে লিখেছিলেন, কিন্তু কই আমাদের ইন্দ্রজিৎকে যখন পিটিয়ে মেরে দিল, তখন কিছু লিখলেন না তো?’
কে ইন্দ্রজিৎ? আখলাখের মতো তাকেও পিটিয়ে মারা হয়েছে? জানি না তো! কোথায় ধূলাগড়? উস্তি-ক্যানিং-কালিয়াচক-সমুদ্রগড়-দেগঙ্গা কোথায়? এই পৃথিবীতে? সেখানে যাদের বাড়ি পোড়ানো হয়েছে তারা কারা? মানুষই তো?”
এই অংশটা পড়ে ইন্দ্রজিৎ কে সেটা আমারও মনে পড়েনি। তাই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল। করে যা বেরোল তা হচ্ছে বীরভূম জেলার একটি ঘটনা। ‘দ্য হিন্দু’ র প্রতিবেদনে পেলাম ইন্দ্রজিৎ দত্ত বলে এক দোকানদারকে মহরম উপলক্ষে অনেক টাকা চাঁদা দিতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। দিতে আপত্তি করায় তাকে মারধোর করা হয় এবং সেই আঘাতের ফলেই কদিন পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং প্রশাসনের অপদার্থতাজনিত মৃত্যু। কিন্তু আখলাক হত্যার সাথে তুলনাটা মেনে নেওয়া শক্ত। চাঁদার জুলুম আমাদের কারো অপরিচিত নয়, তার জেরে মৃত্যু বিরল হলেও। কিন্তু সেই মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করছেন একটি সংগঠিত হত্যার যার কারণ একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস! তার উপর তন্নতন্ন করে খুঁজেও এমন কোন খবর পেলাম না যে শাসকদলের কেউ ইন্দ্রজিতের হত্যাকারীর পক্ষে একটি কথা বলেছে। আখলাকের বেলায় কিন্তু এক অভিযুক্তের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হওয়ার পর তাকে জাতীয় পতাকায় মোড়া হয়েছিল এবং এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছিলেন। একজন কবি তুলনা করছেন এই দুটো ঘটনার? কবিরা আত্মভোলা হন শুনেছি, কাণ্ডজ্ঞানশূন্যও হন নাকি? আরো হাসির কথা এই যে বিনায়কবাবু এই হত্যাকে ভারতে আইসিসের জিহাদের এক নিদর্শন বলে ধরেছেন। চাঁদা দেয়নি বলে পিটিয়ে মারা যদি আন্তর্জাতিক জিহাদ হয়, তাহলে বলতে হবে পাড়ার তোলাবাজের সাথে এল বাগদাদির পার্থক্য কেবল পরিমাপগত।
গত দুবছরে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি লেগেছে। মানুষের ঘরবাড়ি পুড়েছে। প্রশাসনের গড়িমসি বারবার প্রকট হয়েছে। সেজন্যে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, বিরোধী দল সকলেই সরকারের অপদার্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন, সে বিনায়কবাবু যতই বলুন হিন্দুদের জন্য কেউ বলে না। তবু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে যদি এই কারণে তিনি বিষোদগার করতেন একটুও অন্যায় হত না। কিন্তু আশ্চর্যের কথা তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য মোটেও সরকার নয়। লেখার শেষ প্যারায় গিয়ে কবি বলছেন “বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো-সরস্বতীপুজো-বারের উপোস, নাতির পইতে, দাদুর শ্রাদ্ধ, সব কিছু করার পরে ফেসবুকে নিজেকে ‘নাস্তিক’ দাবি করার এলিটিস্ট ভণ্ডামি এক জন মুসলমান কল্পনাও করতে পারেন না। পারেন না বলেই, কোথাও কোনও মুসলমান অত্যাচারিত হলে তিনি বুক চিতিয়ে তার পাশে দাঁড়ান। দাঁড়ান এক জন মানুষের পাশে আর এক জন মানুষের যে-ভাবে দাঁড়ানো উচিত, সে-ভাবেই। প্রাজ্ঞ হিন্দুরা কবে এক জন অত্যাচারিত হিন্দুকেও মানুষ ভাবতে পারবেন? কবে বলতে পারবেন, সতেরো জন হিন্দু সন্ন্যাসীকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারা অন্যায় হয়েছিল? কবে আমি দেগঙ্গা কিংবা ক্যানিং-এর রাস্তায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার করে বলতে পারব, ‘প্লিজ পানিশ মি অলসো। আই হ্যাভ ডিসাইডেড টু কল মাইসেলফ, আ হিন্দু।'”
বুঝুন। হিন্দুদের প্রতি যত অত্যাচার, অনাচার, অবিচার হচ্ছে সবের জন্যে দায়ী হলেন সেইসব হিন্দুরা যাঁরা নিজেদের নাস্তিক বলে দাবী করেন। ধূলাগড়, দেগঙ্গা ইত্যাদির জন্যেও দায়ী হলেন নাস্তিকরা। কবিপ্রতিভা এখানে কি মারাত্মক বাইনারি নির্মাণ করল আসলে দেখুন, শিখুন।
বলা হল মুসলমানদের মধ্যে নাস্তিক-ফাস্তিক কেউ হয় না এবং মুসলমান সবসময় মুসলমানের পাশে দাঁড়ায়। অতএব আপনি যদি হিন্দু হন তাহলে ওসব নাস্তিক হওয়াটওয়া ত্যাগ করুন, হিন্দুর পাশে দাঁড়ান। লেখায় অনেক আগেই বলা হয়েছে যে ভারতে আইসিস ঠিক কত হাজার কোটি টাকা যে ঢোকাচ্ছে সেটা “সতর্ক করতে চাইলেও যাঁরা সতর্ক হন না, যাঁরা বিশ্বাস করেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকবে, সেই পণ্ডিতদের” জানা নেই (কবির যখন জানা আছে তখন তিনি কেন লিখলেন না সে-ও এক রহস্য)। অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ শিগগির শুরু হবে, আপনি যদি নাস্তিক হন বা সংখ্যালঘুর প্রতি সংবেদনশীল হন, তার মানে আপনি হিন্দু হয়ে হিন্দুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।
হিন্দু এদেশে কিরকম নিপীড়িত, কেমন কুকুর বেড়ালের মত তাদের রাখা হয়েছে সেকথা প্রমাণ করতে কবি বাংলাদেশী হিন্দু, কাশ্মীরি পন্ডিত সকলকেই টেনে এনেছেন। যখন আর কুলোয়নি তখন সেই আশির দশকের বিজন সেতু অব্দি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এত চোখের জলেও বাঁকা হাসিটা লুকনো গেল না। “কাশ্মীরের যে পণ্ডিতগুলো দিল্লির রাস্তায় কাতরাচ্ছে গত পঁচিশ বছর, তাদের যন্ত্রণাতেও কারও বুকটা টনটন করে উঠলে সে তৎক্ষণাৎ বিজেপি বলে চিহ্নিত হয় কেন?” কে যে ওঁকে বিজেপি বলে চিহ্নিত করল উনিই জানেন। গোটা লেখায় যা যা বিজেপির বক্তব্য ঠিক তাই তাই বললেন, তারপর জানিয়ে দিলেন ওঁকে কিন্তু বিজেপি বলা চলবে না।
শিক্ষিত বিজেপি সমর্থকদের এই অভ্যেসটা অননুকরণীয়। সিপিএমের এই দুর্দিনেও কোন সমর্থককে আপনি বলতে শুনবেন না সে কোন পার্টির সমর্থক নয়। কংগ্রেস সমর্থকও তাই। এ রাজ্যে প্রবল প্রতাপান্বিত তৃণমূল সমর্থকরা তো সোচ্চার দিদিভক্ত। কিন্তু বিজেপিভক্ত নরেন্দ্র মোদীর ছবি বুকে আটকেও বলে “আমি কোন পার্টির সাপোর্টার নই।” ওদেরই সবার সমঝে চলা উচিৎ। ওরা কোথায় রেলা নেবে, তা নয়। আসলে সারাক্ষণ যারা ভয় বিক্রি করে তারাও ভীত হয়ে থাকে। বিনায়কবাবুর মত আপনার যদি সিরিয়া, তুরস্কের মুসলমানের আজানের সুর ভাল লাগে অথচ এদেশের কোটি কোটি মুসলমানের এক শতাংশেরও কম যুবকের আইসিসে যাওয়া দেখে মনে হয় ঘরে ঘরে জিহাদের প্রস্তুতি চলছে, তাহলে আর আপনি রেলায় থাকবেন কী করে?
এই রাজ্যে এখনো এক বোকা কবি আছেন যিনি বলেন সত্য বলা ছাড়া কবিতার আর কোন কাজ নেই। চতুর কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য তথ্যের বা বাস্তবের ধার না ধেরে দিব্যি ভয় ছড়ানোর কাজটা করেছেন। সত্য নয়, এখন যে উত্তরসত্যের যুগ।

‘ওদের’ প্রতিবাদ

হিন্দু প্রতিরোধের যখন এত শক্তি যে অন্য ধর্মের ইমাম বদলে দিতে পারে তখন নিজের ধর্মে নিশ্চয়ই আরো বড় বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে? তাহলে খাপ পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক না

সারা পৃথিবীর উগ্র দক্ষিণপন্থীদের তো বটেই, সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষদের মধ্যে অনেকেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করেই থাকেন “ওরা নিজেদের ধর্মের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না।” যখন ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তর্কবিতর্কে আর সব যুক্তি ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন এই যুক্তিটাকে খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরে ভেসে ওঠার চেষ্টা করে অনেকে। সামগ্রিকভাবে এই অভিযোগটার সত্যতা বা অসত্যতা নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। আপাতত একটা ঘটনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছি।
কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের শাহি ইমাম বরকতিবাবু একের পর এক ফতোয়া জারি করে ইদানীং বেশ নাম করেছিল। ধর্মের চেয়ে রাজনীতিতেই যে বাবুর আগ্রহ বেশি তা বুঝতে কারো বাকি ছিল না। এবং লোকটি নিজেকে এতই মাতব্বর ভাবতে শুরু করেছিল যে সরকারী নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গাড়িতে লাল বাতি নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। লোকটার বিরুদ্ধে আমার হিন্দু বন্ধুবান্ধবদের মতই মুসলমান বন্ধুদের মধ্যেও বেশ কিছুদিন ধরে অসন্তোষ লক্ষ্য করছি — শুধু ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নয়, তার বাইরেও। আমাকে রোজই টিপু সুলতান মসজিদের সামনে দিয়েই অফিস যেতে হয়। ফলে প্রায় একবছর আগে থেকে আমার চোখে পড়েছে বিভিন্ন বিষয়ে ঐ এলাকার প্রধানত মুসলমান ব্যবসায়ীদের ঝোলানো পোস্টার, যেগুলো বরকতিবাবুর ঠিক উলটো কথা বলেছে। শেষমেশ গত সপ্তাহে দেখলাম একটা পোস্টারে বলা হয়েছে রাজনীতিকে মসজিদের বাইরে রাখা হোক। তারপরেই জানা গেল কয়েকদিন আগে মসজিদে ঢোকার মুখে বরকতিবাবুকে কিছু মুসলমান যুবক কয়েক ঘা দিয়েছেন। তারপর জানা গেল তার ইমাম পদটি গেছে।
মজার কথা আমাদের দক্ষিণপন্থীরা এখন বলতে শুরু করেছেন এটার কৃতিত্ব হিন্দুদের। মুসলমানরা এই রাজ্যটা দখল করে নিচ্ছিল। হিন্দুরা প্রবল প্রতিরোধ করেছে। তাতেই ঘাবড়ে গিয়ে নাকি মমতা এটা করালেন।
অর্থাৎ ডানদিকের বাবুরা মনে করেন মুসলমানদের মসজিদ, তাদের ইমাম — এসব তারা পরিচালনা করে না, তাদের নিজস্ব কোন মতামত নেই। বেশ কথা। তাহলে এরপর থেকে মুসলমানরা কেন প্রতিবাদ করে না এই কথাটা আর কখনো বলবেন না। মুসলমানরা যখন এতই ঠুঁটো জগন্নাথ তখন তারা আর প্রতিবাদ করবে কী করে? আপনারাই বলরাম হয়ে ওদের কাজগুলো করে দিন।
আরো অনুরোধ করি, হিন্দু প্রতিরোধের যখন এত শক্তি যে অন্য ধর্মের ইমাম বদলে দিতে পারে তখন নিজের ধর্মে নিশ্চয়ই আরো বড় বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে? তাহলে খাপ পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক না। সবর্ণ বিবাহের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক। হিন্দুদের বাধ্য করুন পাত্র/পাত্রী চাই এর বিজ্ঞাপনে “caste no bar” লিখতে। রাজ্যে নাহয় আপনাদের ভাষায় মমতাজের সরকার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান — এসব রাজ্যে গোরক্ষকবাহিনীর মত একটা বাহিনী হোক না যারা দলিতদের কুয়োয় যারা কেরোসিন তেল ঢেলে দেয় তাদের বেদম পেটাবে। হিন্দু প্রতিরোধের শক্তিতেই তো এন্টি-রোমিও স্কোয়াড হয়েছে? তা ঐ শক্তি দিয়ে একটা এন্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড করুন না। হিন্দু প্রতিরোধের এত শক্তি আর দেশের ৭৮% হিন্দুর একজনও যাতে খালি পেটে না ঘুমোয় তার ব্যবস্থা করতে পারবেন না? ২২% মুসলমানের কথা নাহয় না-ই ভাবলেন। তাদের তো এতবছর ধরে আমরা দেশদ্রোহীরা খাইয়েদাইয়ে মোটা করেছি। আপনাদের রাজত্বে নাহয় তারা না-ই খেল।