প্রতিবাদ সংবাদে বাদ?

অনুপ্রেরণা ছাড়া এ রাজ্যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করাও মানা

গত ২৭শে নভেম্বর পাঞ্জাব, হরিয়ানার কৃষকরা তিনটে কৃষি বিল বাতিলের দাবীতে এবং প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে দিল্লী অভিযান শুরু করেন। ইতিমধ্যে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যগুলোর কৃষকরাও পথে নেমে পড়েছেন। মহারাষ্ট্রের কৃষকরা নামবেন বলে ঘোষণা করেছেন। কাউকে কেয়ার না করা মোদী সরকার বুঝেছে ঠ্যালার নাম বাবাজি। এ রীতিমত কৃষক বিদ্রোহ। তাই গায়ের জোর ভুলে অমিত শাহ ও সম্প্রদায় হঠাৎ আলোচনার জোরে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। চিড়ে কিন্তু ভিজছে না। একগুঁয়ে চাষাদের এক কথা — সংসদ ডাকো, আইন বাতিল করো। সারা দেশের বাম, মধ্য, দক্ষিণ — যে কোন পন্থার মানুষের কাছেই এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কোন ঘটনা নেই, কোন ইস্যু নেই, থাকার কথাও নয়।

অথচ বাংলা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে কিন্তু সেটা বোঝার উপায় নেই। গতকালই পি সাইনাথ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এই কৃষক বিদ্রোহ এক দিনে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের কিষাণ লং মার্চের ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলন এসেছে। সেই আন্দোলনগুলো যেমন বাংলার সর্বাধিক টি আর পি প্রাপ্ত দুটো খবরের চ্যানেলে প্রাধান্য পায়নি, এই আন্দোলনও পাচ্ছে না।

২৬শে নভেম্বর কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ছিল। সেই ধর্মঘটকেও সমর্থন জানিয়েছিল কৃষক সংগঠনগুলো। সেদিন বহু জায়গায় ট্রেন চলেনি, বাস চলেনি, দোকানপাট বন্ধ ছিল। অথচ সেদিন দুপুরেও কূপমন্ডুক বাংলা চ্যানেলের প্রধান খবর ছিল মাঝেরহাট ব্রিজ খোলার দাবিতে বিজেপির দাপাদাপি। যে ব্রিজ আজ বিকেলে উদ্বোধন হওয়ার কথা আগেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল।

বাংলা খবরের কাগজগুলোতেও গত কয়েক দিন ধরে কৃষক বিদ্রোহ নয়, বেশি জায়গা অধিকার করে থাকছে শুভেন্দু অধিকারীর ধাষ্টামো বা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ভোটমুখী প্রকল্প ঘোষণা। গত দু-তিন দিনে তবু কৃষক বিদ্রোহের খবর বা ছবি বাড়ির কাগজটার প্রথম পাতায় ভাল করে দেখতে পাচ্ছি, তার আগে এ কোণে এক কলম বা ও কোণে দু কলমেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল। সে অবশ্য চব্বিশ ঘন্টার আনন্দময় চ্যানেলগুলোর তুলনায় মন্দের ভাল। কারণ ওগুলোতে খবর বলতে সারাদিন যা পাওয়া যায়, তা হল — অমুক জায়গায় তৃণমূলের লেখা দেওয়াল মুছে দিল বিজেপি। তমুক জায়গায় বিজেপির পার্টি অফিসে তৃণমূলের ভাঙচুর। বিজেপি নেতার মাচার লাউ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতার অভিযোগ করলেন বিজেপি সদস্য — এইরকম আর কি।

অর্থাৎ যে খবরগুলো আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও নেহাত দেখানোর বা ছাপার মত কিছু না থাকলে জায়গা ভরাতে ব্রিফ হিসাবে ব্যবহার করা হত — সেগুলোই বাঙালিকে দিনরাত পড়ানো এবং দেখানো হচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। আসলে দিল্লী ভিত্তিক হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম যেমন দেশের আসল সমস্যাগুলোকে আড়াল করতে পাকিস্তানকে কেমন দিলাম, লাভ জিহাদ, সিভিল সার্ভিস জিহাদ ইত্যাদি আবর্জনা পরিবেশন করে, বাংলার সংবাদমাধ্যমও কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিকদের আন্দোলনকে আড়াল করতে আবর্জনা পরিবেশন করছে। হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর থেকে মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া হয়, বাংলার আবর্জনা কেবল দুর্গন্ধ ছড়ায় — তফাত এটুকুই।

কিন্তু কেন এমন করা হচ্ছে? কৃষক আন্দোলনকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিলে কী ক্ষতি? পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা কি টিভি দ্যাখেন না, নাকি কৃষি আইন, শ্রম কোডের প্রভাব এ রাজ্যের শ্রমিক, কৃষকদের উপর পড়বে না?

আসলে প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, যারা জানার তারা জানে, হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ যেমন একচোখা, এ রাজ্যের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমও তাই। তাদের অনেকেই ফ্যাসিবিরোধী, কিন্তু কোনটাকে ফ্যাসিবাদ বলা হবে, তার কতটা বিরোধিতা করা হবে, আদৌ করা হবে কিনা — সেসব তারা ঠিক করে না। অনুপ্রেরণা ছাড়া এ রাজ্যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করাও মানা।

অতএব শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি খুঁজছে যারা, তাদের আন্দোলনের কথা জানতে হলে আপনাকে ফেসবুকই খুলতে হবে। টিভির স্থানীয় সংবাদ লাউমাচা পুঁইমাচা নিয়েই চলবে। কৃষক বিদ্রোহের খবর জানতে চাইলেও হাতে গোনা হিন্দ্রেজি সংবাদমাধ্যম অথবা খবরের সাইটের শরণাপন্ন হতে হবে। টিভি আর কাগজ জুড়ে দলবদলের হট্টগোলই চলবে।

ছবিটা অবশ্য কাল থেকে বদলে যাবে বলে আশা করছি। কারণ আজ দিদি ঘোষণা করেছেন তিনি কৃষকদের পাশে আছেন, ঐ আইনগুলো খুব খারাপ, অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ এবং এই দাবিতে তাঁর দল কোমর বেঁধে আন্দোলনে নামছে। আশা করি এবার আর বাংলা সংবাদমাধ্যমের অনুপ্রেরণার অভাব হবে না।

সকল অহঙ্কার হে আমার

“আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

সেদিন যথাসময়ে অফিসে ঢুকে দেখি, অনেক দেরি করে ফেলেছি। নিউজরুম আলো করে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তখন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ তে কাজ করি। কলকাতা সংস্করণের অধুনা প্রয়াত রেসিডেন্ট এডিটর সুমিত সেন সৌমিত্রবাবুর স্নেহভাজন ছিলেন বলে শুনেছি। সেই সুবাদেই টাইমসের অফিসে আসা। আসবেন জানতাম না। যখন পৌঁছেছি, তখন তাঁর প্রায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমার মত আরো অনেকেরই আশ মেটেনি সেদিন। তাই কিছুদিন পরেই আরেকবার তিনি আসবেন বলে কথা হল।

সে দিন আসতে আসতে আরো বছর খানেক কি দেড়েক। আগেরবার এসে শুনেছি গটগট করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছিলেন। এবার একতলাতেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঐ মানুষটিকে আগে কয়েকবার রবীন্দ্র সদন, বিমানবন্দর ইত্যাদি জায়গায় বহুদূর থেকে দেখেছি। দু হাত দূরত্ব থেকে সেদিন দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আড্ডার মেজাজে কথা হল, অনেকে অনেক প্রশ্ন করলেন, আমারও অনেক কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোল না। বেরোবে কী করে? কেবল আমার কান তো তাঁর কথা শুনছিল না, আমার প্রতিটি রোমকূপ শুনছিল।

তিনি যা যা বললেন তার মধ্যে অনেক কথা বহুবার বহু জায়গায় বলেছেন বা লিখেছেন। আজকের কাগজগুলোতেও সেসব বিলক্ষণ পাওয়া যাবে। যা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করেছিল, সেটা বলি। কারণ সেগুলো আর কোথাও পড়েছি বা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।

বলছিলেন অগ্রজ শিল্পীদের কথা। শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী থেকে ছবি বিশ্বাসে এসে দীর্ঘক্ষণ বললেন। সত্যি কথা বলতে, নিজের অভিনয় নিয়ে যা বললেন সেগুলো সবই নানাজনের প্রশ্নের উত্তরে। তার চেয়ে অনেক বেশি কথা বললেন ছবি বিশ্বাসের সম্বন্ধে। কেবল ছবি বিশ্বাসের অভিনয় প্রতিভা নয়, বললেন তাঁর অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতা নিয়েও। ছবি বিশ্বাসের জীবনের শেষ দিকে কোন এক ছবিতে দুজনের একটা দীর্ঘ দৃশ্য ছিল।

“লম্বা সিন, আর সংলাপগুলোও খুব লম্বা লম্বা। আমি বারবার ভুল করছি আর শট এন জি হয়ে যাচ্ছে। ছবিদার তখন শরীরটা এমনিই বেশ খারাপ। ঐ সিনটাতে আবার সুট বুট পরা, অথচ তখন অসম্ভব গরম। শট ওকে হচ্ছে না বলে ফ্যান চালানোও যাচ্ছে না। ফলে ওঁর আরো শরীর খারাপ লাগছে, ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন। শেষে পরিচালক বললেন ‘আমরা একটু ব্রেক নিই, আপনারা একটু রেস্ট নিয়ে নিন। তারপর আবার চেষ্টা করা যাবে।’ আমি ছবিদার সাথে বসে সারেন্ডার করলাম। বললাম ‘দেখছেন তো পারছি না। দিন না বাবা একটু দেখিয়ে?’ উনি সেই বিখ্যাত গম্ভীর গলায় বললেন ‘বুঝতে পেরেছ তাহলে’? তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ‘তুমি আমার ডায়লগ বলো, আমি তোমার ডায়লগ বলছি।’ তারপর অতবড় সিন গোটাটা রিহার্সাল করালেন, মুভমেন্টগুলোও শুধরে দিলেন। তারপর নিজের নিজের ডায়লগ বলিয়ে আবার করালেন। শেষে ডিরেক্টরকে ডেকে এনে শট নেওয়ালেন, শট ওকে হল।

আমি অবাক হয়ে গেলাম শরীরের ঐ অবস্থাতেও ওরকম উদ্যম দেখে। তাছাড়া আমার একটা অহঙ্কার ছিল, আমার সংলাপ সবসময় মুখস্থ থাকে। সেই অহঙ্কারটাও চুরমার হয়ে গেল। কারণ দেখলাম ছবিদার শুধু নিজের নয়, আমার ডায়লগও হুবহু মুখস্থ। বরং আমি দু এক জায়গায় ভুল করে ফেলেছিলাম, উনি ধমকালেন ‘কী যে করো তোমরা! ডায়লগ মুখস্থ রাখতে পারো না?”

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার মুখে এই গল্পটা শুনে আশ্চর্য লেগেছিল, কিভাবে আমাদের সামনে নিজের ত্রুটিগুলো অকপটে বললেন! অগ্রজ অভিনেতার কাছ থেকে কত শিখেছেন সেটাও কেমন সবিস্তারে বললেন! অথচ কত সহজ ছিল “আমি এই, আমি তাই, আমি সেই” বলা। সেরকম বলার মত যথেষ্ট কীর্তি তো তাঁর ছিলই। অবশ্য হয়ত আমরা এই প্রজন্মের লোক বলেই আমাদের এত অবাক লাগে। সৌমিত্রবাবু তো বললেনই “আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

“নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান” কথাটা আমরা ভুলে গেছি। তাই কলকাতার ফিল্মোৎসবে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাট আউট ঝোলে না। ঝোলে আয়োজক প্রধান মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা অবশ্য আকাশ থেকে পড়েন না, আমাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন। আমরা সবাই তো এখন আত্মরতিপ্রবণ। নইলে কোন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলে সাংবাদিকরা কেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখবেন, “অমুক সালে যখন আমি তমুক এক্সক্লুসিভটা করে অমুক প্রোমোশনটা পেয়েছি…”? কেনই বা আসবে মৃত মানুষটি কবে কী কারণে লেখকের প্রশংসা করেছিলেন?

সাত শতাংশের অধিকারে

তার চেয়েও বড় কথা “বুনিয়াদি লড়াইটা হল ভাতের লড়াই। বামপন্থীদের সেই লড়াই জারী রাখতে হবে” — এই জাতীয় যুক্তিতে সমকালের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কি কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের উচিৎ?

যতই ক্ষমতাচ্যুত হোক, ক্ষমতাহীন হোক, বামপন্থীরা রাস্তায় নামলে ঢেউ উঠবে। আজও এর কোন ব্যতিক্রম পৃথিবীর কোথাও নেই। পার্টির নাম, সংগঠনের নাম যা-ই হোক। আর ন্যায্য দাবীতে রাস্তায় নামলে অকর্মণ্য শাসক মারবে, ধরবে, মাথা ফাটাবে — এরও কোন ব্যতিক্রম হয় না। ফলে গতকালের নবান্ন অভিযানে রাজপথে যেসব দৃশ্যের জন্ম হয়েছে সেগুলো অনভিপ্রেত হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। বুক চিতিয়ে পুলিশের সঙ্গে লড়ে গেলেন যে নূতন, সবুজ, কাঁচারা তাঁদেরও সাধুবাদ প্রাপ্য। ফেসবুক বিপ্লবের যুগে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা শিরোধার্য করে এইভাবে রক্তাক্ত হতে যাঁদের বাধে না তাঁদের কুর্নিশ না করে উপায় নেই। সমস্যা অন্যত্র।
কাল সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এস এফ আই আর যুব সংগঠন ডি ওয়াই এফ আই যে দাবীগুলোর ভিত্তিতে নবান্ন অভিযান করছিলেন — স্বল্প খরচে শিক্ষার দাবী এবং কাজের দাবী — সেগুলো যে ন্যায্য তা নিয়ে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মনে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়, যদি না তিনি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের অন্ধ সমর্থক হন বা মুখ্যমন্ত্রীকে দৈবী শক্তির অধিকারী, মানবিক ভুলচুকের অতীত বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনীতি, বিশেষত বিরোধী রাজনীতি, শুধু দাবী সনদ পেশের ধারাবাহিকতার নাম নয়। উপরন্তু ছাত্র সংগঠনের বা যুব সংগঠনের কেবল তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থের কথাই বলা উচিৎ, বৃহত্তর রাজনীতি তাদের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিৎ নয় — এমনটা আর যে-ই ভাবুক, বামপন্থীরা নিশ্চয়ই ভাবেন না। সেদিক থেকে দেখলে প্রায় একইরকমের দাবী নিয়ে গত কয়েক বছরে কখনো সিপিএম দলের নবান্ন অভিযান, কখনো কৃষক সভার নবান্ন অভিযান, কখনো ছাত্র, যুব সংগঠনের নবান্ন অভিযান দেশের যে বর্তমান রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক সঙ্কট তার সাপেক্ষে কী অবস্থান নিচ্ছে? অভিযানগুলো বারবার নবান্নেই বা যাচ্ছে কেন?
শিক্ষা, স্বাস্থ্যকে পণ্য করে তোলার যে প্রক্রিয়া ১৯৯১ তে শুরু হয়েছিল, ২০১৪ থেকে বিজেপি শাসনে তা আরো প্রকাশ্য, আরো নির্লজ্জ। আম্বানিদের যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো চালুই হয়নি তাকে সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের মত সরকারপোষিত প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের পুরো মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা নাকি সরকারের নেই, ইসরোর গবেষকদের মাইনে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এ রাজ্যে কলেজে তোলাবাজি, হবু শিক্ষক, প্যারা টিচারদের পুলিশ দিয়ে পেটানো ইত্যাদি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের কোথাও শিক্ষাজগতের লোকেরা ভাল নেই। না ছাত্রছাত্রীরা, না গবেষক শিক্ষক শিক্ষিকারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকার বিপন্ন। তাহলে এসব নিয়ে সিপিএম বা তার গণসংঠনগুলোর সংসদ অভিযান হচ্ছে না কেন?
কাজের অধিকার সারা দেশে কিভাবে বিপন্ন তা তো আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত কয়েক মাসে কয়েক হাজার মানুষের চাকরি গেছে, আরো বহু মানুষ আশঙ্কিত। যাদের চাকরি আছে তাঁরাও অনেকে মাইনে পাচ্ছেন না বি এস এন এল কর্মীদের মত। তা নিয়ে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলো (সিটু তো বটেই) আন্দোলনও করছে। অথচ দল হিসাবে এসব নিয়ে সিপিএমের রাস্তায় নেমে আন্দোলন সংসদ বা সাউথ ব্লকের দিকে যাচ্ছে না কেন? এস এফ আই বা ডি ওয়াই এফ আই এর অভিযানই বা দিল্লীমুখো নয় কেন? অন্য রাজ্যে সাংগঠনিক শক্তির অভাব আছে বলে দিল্লী আক্রমণ করছি না, একথা যদি কেউ বলেন, সেটাকে অজুহাত বলেই ধরতে হবে কারণ মহারাষ্ট্র, রাজস্থান বা হরিয়ানার মত যেসব রাজ্যে সিপিএমের সাংগঠনিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক কম, সেখানকার কৃষকদের পর্যন্ত সংগঠিত করে দিল্লী, মুম্বইয়ের বুকে সিপিএমের কৃষক সভার উদ্যোগে কিষাণ লং মার্চ সারা দেশ অল্প দিন আগেই দেখেছে। তাহলে?
তার চেয়েও বড় কথা “বুনিয়াদি লড়াইটা হল ভাতের লড়াই। বামপন্থীদের সেই লড়াই জারী রাখতে হবে” — এই জাতীয় যুক্তিতে সমকালের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কি কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের উচিৎ? সারা দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ হল হিন্দুত্ববাদী একনায়কতন্ত্রের বিপদ। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র লুপ্ত হওয়ার বিপদ। সেই বিপদ কোন দিক থেকে এসেছে (এখনো আসছে ভাবার ভুল করবেন না) তা আমরা সবাই জানি। তার বিরুদ্ধে রাস্তার লড়াইকে কি সিপিএম কোন অদূর ভবিষ্যতের জন্যে স্থগিত রেখেছে? রাখতে পারে? রাজ্যের তৃণমূল সরকার তো ২০১১ থেকেই এখনকার মত চলছে। তা নিয়ে বারবার নবান্ন অভিযানে পার্টি সদস্য বা গণসংগঠনের সদস্যদের রক্ত ঝরছে অথচ মানুষের সমর্থন বাড়ার বদলে কমেই চলেছে। এর কারণ কী? আসলে কি মানুষের ইস্যু বুঝতেই ভুল হচ্ছে? নিজেদের পছন্দের ইস্যুকেই মানুষের ইস্যু বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? নেতৃত্ব এগুলো ভাববেন না?
পশ্চিমবঙ্গের গরীব, বড়লোক, মধ্যবিত্ত সকলেই এই মুহূর্তে কোন ইস্যুটা নিয়ে উদ্বিগ্ন? বা নিদেন পক্ষে আগ্রহী? নিঃসন্দেহে এন আর সি। বিজেপি রোজ বলছে, বড় মেজ সেজ ছোট সব নেতা নেত্রী বলছেন বাংলায় এন আর সি হবেই। শুধু বাংলাই বা কেন? আসামে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি হয়ে গেছে, অন্যত্রও হচ্ছে। তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্ব এখনো কিন্তু, যদি, তবে করছেন। কখনো শোনা যাচ্ছে আসামের বাইরে এন আর সি হলে ওঁরা বিরোধী, অর্থাৎ আসামে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। কখনো বলছেন দেখতে হবে যেন সত্যিকারের নাগরিকরা বাদ না পড়ে যান। এসবের মানে কী? যে পার্টি অসহায় মানুষ, গরীব মানুষ, ছিন্নমূল মানুষের পাশে নির্দ্বিধায় দাঁড়ায় না, মানুষকে ছিন্নমূল করার প্রক্রিয়ার বিপক্ষে পিঠ সোজা করে দাঁড়ায় না — সে আবার কিরকম কমিউনিস্ট পার্টি?
ওদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। শেষ অব্দি সারদা, নারদের চোখ রাঙানি পেরিয়ে কদ্দূর কী করবেন সেটা পরের কথা, কিন্তু ছিন্নমূল হতে চলা মানুষ কিন্তু দেখছেন তিনি বলেছেন “দু কোটি লোককে বার করে দেবে? দুটো লোকের গায়ে হাত দিয়ে দেখাক।” এরকম কথা সিপিএম তথা বাম নেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে না কেন? তাঁরা কি ভাবছেন বাঙালদের পক্ষ নিলে এদেশীয় ভোটাররা ক্ষেপে যাবেন? উদ্বাস্তুদের জন্যে আন্দোলন কিন্তু স্বাধীনোত্তর ভারতে তথা বাংলায় বামপন্থীদের শক্ত জমিতে দাঁড় করিয়েছিল।
আচ্ছা, রাজ্য সরকারকেও কি সঠিক ইস্যুতে আক্রমণ করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর সাধের মেট্রো রেল প্রকল্প এমনই কল্পরাজ্যের জিনিস যে তাকে বাস্তবের মাটিতে নামাতে গিয়ে বহু লোকের ভিটেমাটি চাটি হওয়ার যোগাড় হয়েছে। তা নিয়েই বা বামেদের আন্দোলন কই? যে শহরে এই সরকারের আমলেই নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয় বলে ঘোষিত হয়েছে, সেই শহরে আবার এরকম সর্বনাশা প্রকল্প এগোল কী করে তা নিয়ে বামেরা সরকারকে প্রশ্নবাণে, আন্দোলনে জর্জরিত করলেন কই? নেতৃত্ব কি মনে করেন এগুলোতে কারোর কিছু এসে যায় না? নাকি ওখানেও হিসাব? বাড়ি ভেঙে পড়া লোকেদের চেয়ে মেট্রো হলে যারা চড়বে তাদের ভোটসংখ্যা বেশি হওয়ার হিসাব?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এই যাঁরা লাল ঝান্ডার জন্যে এখনো প্রাণ বাজি রাখছেন তাঁরা কোন হিসাবে আছেন জানতে ইচ্ছা করে। তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের রক্ত অপচয় হচ্ছে না তো? সাম্প্রতিককালে অনেকের মুখে কাছের শত্রু তৃণমূল, তারপর বিজেপির মোকাবিলা করা হবে ইত্যাদি শোনা যাচ্ছে। মনে পড়ল, ছেলেবেলা থেকে দেখি গণশক্তির সম্পাদকীয় স্তম্ভের উপরে কোন মার্কসবাদী ক্লাসিক সন্দর্ভ থেকে কয়েক লাইন উদ্ধৃত থাকে। যখন স্কুলে পড়ি তখন একটা উদ্ধৃতি প্রায়ই দেখতাম। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি তাতে কথাটা ছিল খানিকটা এরকম: কমিউনিস্টদের লক্ষ্য, অন্য সব সর্বহারা পার্টির মতই, শ্রমিক শ্রেণীর আশু দাবীগুলি আদায় করা। কিন্তু তার মধ্যেও তারা বৃহত্তর লড়াইয়ের কথা ভোলে না এবং আসন্ন বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুতি নেয়।
আশা করি বাম নেতাদের স্মৃতিশক্তি আমার চেয়ে অনেক ভাল, তাঁরা আমার মত ক্লাসিকগুলো না পড়া লোক নন এবং ক্লাসিকগুলোর সময়োপযোগী ব্যাখ্যা করার শক্তিও তাঁদের অনেক বেশি।
কোন সিপিএম/বাম কর্মী বলতেই পারেন “তুমি কে হে, এত কথা বলছ? কোনদিন আমাদের কোন মিছিলে এক ঘা লাঠিও তো খাওনি। তোমার কী অধিকার এসব লেখার?” বললে তিনি ঠিকই বলবেন। তবে উত্তরে আমারও একটু বলার আছে।
আমি এই কথাগুলো লিখলাম সাত শতাংশের অধিকারে। অর্থাৎ আমি সেই সাত শতাংশের মধ্যে পড়ি যারা এখনো আপনাদের ভোট দেয়। অতএব আমার মতামতকে গুরুত্ব দিতে আপনারা বাধ্য। সংসদীয় গণতন্ত্রে কতিপয় লোকের এটুকু বাঁদরামি আপনাদের মেনে নিতেই হবে।

বাধাই হো

ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে

পাশ্চিমবাঙ্গালের জানাগাণকে আনেক আনেক বাধাই। উয়ো তেইস তারিখ সে ভাবছি বাধাই দেবো, কিন্তু একটু দেরী হোয়ে গেলো। আমাকে শামা কারিয়ে দেবেন। এখোন তো আপনাদের সোনার সোমোয়, দোনো হাথ মে লাড্ডু। এখোন আপনারা এইটুকু গালতি মাফ কারিয়ে দিতে পারবেন।
আপনাদের ভালোবাষায় আমাদের ভোটবাক্সা একদম ভরে গেছে। আমরা আপনাদের এই ভালোবাষার বদলা বিলকুল সুদসামেত চুকতা কারিয়ে দেব। আপনাদের ছেলেমেয়েরা আনেক দিন ধরে এন্টি ডেভেলাপমেন্ট ভাষা সিখে বিলকুল বাকোয়াস তৈরি হোচ্ছে। আভি ওদের সব্বাইকে আমরা ডেভেলাপমেন্টের ভাষা এমোন আচ্ছা সে সিখাবো যে নকরির গঙ্গা মাইয়া এসে যাবেন ওয়েস্ট বেঙ্গালে।
হাঁ, ইয়ে সাচ বাত আছে কি দেশ মে বেকারি বহুত বেড়ে গেছে। পিছলে পঁয়তাল্লিশ সাল মে ইতনি বেকারি ছিলো না। লেকিন ওটা নিয়ে আপনারা একদম ভাববেন না। সব জায়গায় কিছু এন্টি নেসনাল আদমি থাকে, বেঙ্গালে থোড়া জিয়াদা আছে। ওরাই ইয়ে সব নিয়ে কথা বলছে। আপনারা ওদেরকে এই ভোটে যা থাপ্পাড় দিয়েছেন তার রিওয়ার্ড তো পাবেনই। জালদি আমরা বেঙ্গাল থেকে এন্টি নেসনালদের আউট কারিয়ে দেব। সাব উয়িদেশ থেকে ঘুসপেটি হয়ে ঢুকে আছে আর ওদেরই জন্যে আপনাদের নকরি হচ্ছে না।
বাই দা ওয়ে, আপনারা সাউথ ইন্ডিয়ার এন্টি নেসনালদের কোথায় একদম ভুলবেন না। ওরা ডেভেলাপমেন্ট চায় না। ইসি লিয়ে ওদের নেসনাল লেঙ্গুয়েজ নিয়ে বহুত প্রবলেম আছে। ওরা একদম বেকওয়ার্ড স্টেটস আছে। আপনাদের বেঙ্গালের যে একটা এন্টি নেসনাল ইকনমিস্ট আছে কি সেন? ওনার তৈরি কি সব আনাপ শানাপ ইনডেক্সে ওরা উপর দিকে আছে, লেকিন ভেদিক ইকনমিক্সে ওরা একদম ফেল আছে। রামায়ণ, মাহাভারাত কিচ্ছু ওরা মানে না। রাভাণ, মাহিষাসুরের মত ভিলেনদের ওরা পুজা করে। ওদেরকে ফালো করবেন তো কিচ্ছু ডেভেলাপমেন্ট হোবে না।
পার আমাদের বেঙ্গালিদের উপর ভিশোয়াস আছে। বেঙ্গালিরা সুইসাইড কোরবে না, তাদের মোদ্দে আনেক ইনটেলিজেন্ট মাইন্ডস আছে। আমাদের গালতি ভি সোশাল মিডিয়ায় ওরা এমোন ডিফেন্ড করে দেয় যে আমরা ভাবি “আরে ইয়ে তো গালতি থা হি নহি।“
উপার সে ইতনে সাল বাদ আমরা আপনাদের পার্টিশানের বদলা নেয়ার চান্স দিচ্ছি। আপনারা ছেড়ে দিবেন? রাভিন্দ্রনাথ টেগোর বোলেন, বাঙ্কিমচান্দ্র চাট্টোপাধ্যায় বোলেন, সোকোলেই বেঙ্গালিদের সাওধান করেছেন টার্মাইটদের বিরুদ্ধে। গদ্দার কমনিস্ট আর মমতাজ বেগম আপনাদের কাছে উয়ো সব লুকিয়ে রেখেছিল। এখোন আমরা ইতিহাস নয়া তারিকে সে লিখব তো দেখতে পাবেন।
বেঙ্গালি হিস্ট্রিতে লেকিন আনেক গদ্দার ভি আছে। ওদের এলমিনেট কোরতে হোবে। রামমোহান রয় আছে, ভিদিয়াসাগর আছে। হিন্দুধার্মের এরা যা শাতি কোরেছেন সব আমাদের রিভার্স কোরতে হোবে। তারপর মাইকেল মাদসুদান আছে। ক্রিশ্চান মিশনারিদের টাকায় রামজির বহুত বেইজতি কোরেছে। উসকা ভি উইচার আমরা কোরব। আর কোন কোন বেঙ্গালি এন্টি হিন্দুস্তান কাম করেছে উয়ো দেখার কাম আমরা কানভার্টেড বুদ্ধিজীউয়ীদের দিয়েছি। ওনাদের আর্ডিনারি বুদ্ধি নহি, এক্সট্রা আর্ডিনারি বুদ্ধি। সেগুলোর ইউজ কোরে নিতে হোবে। বাদ মে ওদের জন্যে ভি ডিটেনশন কেম্প হোবে। আমরা কোন বেঙ্গালির সাথে আন্যায় হোতে দিবো না, আপনারা দেখে নিবেন।
মনে রাখবেন, যারা দুর্গা মায়ের পূজা কোরে, রাষ্ট্রভাষা বোলে, তাদের কোন ভয় নাই। ভয় পাবে সির্ফ ভারত মাতার শত্রুরা।
ফির একবার সব বেঙ্গালিকে বহুত বহুত বাধাই।

মেধামেধ যজ্ঞ

মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে

আজ কলকাতায় মহোৎসব ছিল। এ বছরের আই পি এল এর প্রথম খেলা। রাজভবনের উল্টোদিকে বাস থেকে নেমে যখন বাঁয়ে ঘুরে হাঁটছি, তখন উলটোদিক থেকে জনস্রোত ধেয়ে আসছে। নানারকম মুখ। রংচঙে, ঝকঝকে, হাত ধরাধরি করে প্রেমিক প্রেমিকা, বাবার হাত ধরে ছেলে, নাইট রাইডার্সের জার্সি পরিহিত বন্ধুদল। সকলেরই মুখ দেখে বোঝা যায় ফুরফুরে মেজাজ, ভর্তি পেট। কারো কারো হাতে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। এঁদের সকলের কাছে মহোৎসবের আহ্বান এসেছে। কিছু কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে। স্বর্গের বাগানের টিকিট কেটেছেন এঁরা কড়কড়ে নোট খরচ করে। কেনই বা মেজাজ ফুরফুরে থাকবে না?

এঁদের পেরিয়ে ধর্মতলার বাস ডিপোর মধ্যে দিয়ে হাঁটছি, নাকে আসছে ফুটপাথে রাঁধা বিরিয়ানি, ডিমের কারি, মাছের ঝোল, শস্তার চাউমিন, মোগলাই পরোটা, এগ রোল, পেয়ারা, শসার গন্ধ। ধর্মতলার এই আনন্দযজ্ঞে দিনমজুর থেকে শুরু করে আমার মত এ সি ট্যাক্সি চাপতে সক্ষম মানুষ পর্যন্ত সবার নিমন্ত্রণ।

আর এইসব রূপ রস গন্ধের অনতিদূরেই বসে আছেন, বা মাথা ঘুরছে, গা বমি ভাব আসছে বলে শুয়ে আছেন — আমার মেয়ের হবু মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। একদিন দুদিন নয়, পঁচিশ দিন ধরে কিছু না খেয়ে। এমনও হতে পারে যে আগামী দিনে হয়ত এটাই নিয়ম হয়ে যাবে। এক বৃদ্ধকে দেখলাম একটি অসুস্থ মেয়ের পাশে বসে আছেন। সম্ভবত মেয়েটির বাবা। বলা যায় না, হয়ত আমার মেয়েকেও এরকম অনশনে বসতে হবে লেখাপড়া শিখে আর আমি তখন ঐ বৃদ্ধের জায়গায় গিয়ে বসব।

এই লড়াকু ছেলেমেয়েগুলোর প্রতি আমার অক্ষম, নীরব সমর্থন জানাতে কয়েক মিনিটের জন্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম পথপার্শ্বে, যেখানে এরা ত্রিপলের নীচে রাস্তায় বসে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাচ্ছে। বিশ্বাস করুন, জায়গাটায় কোন গ্ল্যামার নেই, কোন বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ নেই। কয়েকশো পরীক্ষায় পাশ তরুণ তরুণীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া বিশেষ কোন শব্দও নেই। সোশাল মিডিয়ায় অনেকেই ঠারেঠোরে যা বলতে চাইছেন বা সরকারপক্ষ হয়ত যে আশঙ্কায় এই আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করছেন, তেমন কোন রাজনৈতিক আগুনও জায়গাটায় জ্বলছে না। মানুষের পেট যেহেতু ভিসুভিয়াস নয়, সেহেতু পঁচিশ দিন কেটে যাওয়ায় জঠরাগ্নিও বোধহয় নিভে গেছে।

আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, মামারা, জ্যাঠারাও এই পেশায় ছিলেন, স্ত্রীও শিক্ষিকা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি যাঁদের জন্যে, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক। শুনেছি একসময় শিক্ষকদের সংসার চালানো দুর্বিষহ ছিল, লোকে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইত না শিক্ষক পাত্রের সাথে। কিন্তু তখনো শিক্ষকদের এমন অসম্মান করেনি বোধহয় কোন সরকার। বিধানচন্দ্রের সরকার আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর গুলি চালিয়েছিল, সেকথা বাদ দিলে।

বেশ মনে আছে, বামফ্রন্ট আমলে একসময় স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠত প্রায়ই। ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রার্থীদের অসন্তোষ থাকত। যোগ্য প্রার্থী ভাল ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়েও চাকরি পেতেন না। আমারই এক পরিচিত বহুদূর থেকে এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে স্টেশন থেকে স্কুলে যাওয়ার রিকশায় উঠেই চালকের মুখ থেকে শুনেছিলেন “আপনার চাকরি হবে না। সেক্রেটারির লোক আছে। তাকেই নেবে।”
সম্ভবত কতকটা সেই কারণেই কলেজের জন্যে যেমন নেট বা স্লেট পরীক্ষা, সেই আদলে এস এস সি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল। তার সুফল আমাদের প্রজন্মের বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে পেয়েছেন। আমাদের বাবা-মায়েরা জানতেন, পশ্চিমবঙ্গে আর কোন চাকরি না হোক, এস এস সি টা পাশ করতে পারলে স্কুলের চাকরি হবেই। কিন্তু তা বললে তো চলবে না। আগের সরকারের কোন ভাল কাজকেও যে পরের সরকার রেয়াত করবে, এমন দাবী এ দেশে আর করা চলে না। পরিবর্তন আর উন্নয়নের জোয়ারে পুরাতন যাক ভেসে যাক। অতএব যে পরীক্ষা প্রতি বছর হওয়ার কথা, সে পরীক্ষা প্রায় প্রতি বিশ্বকাপে হচ্ছে। সে পরীক্ষার ফলাফলে আবার এত বেশি মেধাবী ছেলেমেয়ের নাম উঠে আসছে যে মেধা তালিকা প্রকাশ করাই যাচ্ছে না। তবু এই শ দুয়েক ছেলেমেয়ে চৈত্রের গরমে রাস্তায় বসে আছে সরকারের শুভবুদ্ধি উদয়ের আশায়। অহো, কি দুঃসহ স্পর্ধা!

কয়েকদিন আগেই ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ ছবিটা দেখছিলাম। নাজি অধিকৃত পোল্যান্ডের ক্রাকাউতে বন্দী শিবিরে দরকারী আর অদরকারী লোকেদের তালিকা বানানো হচ্ছে। একজন করে বন্দী এসে দাঁড়াচ্ছে আর নাজি কেরানি তার পেশা জিজ্ঞেস করছে। দরকারী বুঝলে পরিচয়পত্রে একরকম ছাপ, অদরকারী বুঝলে অন্যরকম। একজন বললেন “আমি ইতিহাস আর সাহিত্য পড়াই।” পত্রপাঠ অপ্রয়োজনীয় হওয়ার ছাপ পড়ে গেল। অসহায় শিক্ষক বিস্ফারিত নেত্রে বললেন “I teach history and literature. Since when it’s not essential?”

দেখে শিউরে উঠলাম। সাহিত্য, ইতিহাস — এসব পড়া যে দরকারী নয় তা তো আমরা ছোট থেকে শুনে আসছি। আর এই শেষ যৌবনে এসে দেখতে পাচ্ছি ওগুলো যাঁরা পড়ান তাঁরাও অদরকারী বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। এই তো সেদিন এক প্রথিতযশা সাংবাদিক (অধুনা বিচারাধীন বন্দী হিসাবে শ্রীঘরে থাকায় যশে কিঞ্চিৎ টান পড়েছে অবশ্য) সদর্পে ফেসবুকে লিখে দিলেন তুলনামূলক সাহিত্যের মত ফালতু বিষয় তুলে দেওয়া উচিৎ। এসব পড়ে কোন লাভ নেই। লিখলেন শুধু নয়, কয়েকশো লাইকও পেলেন। আর এস এস সি পাশ করা ছেলেমেয়েদের আন্দোলন শুরু হতেই সোশাল মিডিয়ায় অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব জন্মাচ্ছে — যারা বিজ্ঞান পড়ে তারা নাকি বেশিরভাগই ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রাজ্যের বাইরে চলে যায়। পড়ে থাকে মেধাহীন বাংলা, ইংরিজি, ইতিহাসের ছেলেমেয়েরা। তাদের এস এস সি ছাড়া গতি নেই, তাই তারাই নাকি যোগ্যতা না থাকলেও চাকরি দাবী করে রাস্তা জুড়ে বসে আছে।

যারা এসব বলছে তারা বোধহয় জানে না গোটা দেশে কত হাজার ইঞ্জিনিয়ার বেকার, কত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আসন পূরণ হচ্ছে না কারণ লোকে বুঝে গেছে ওখানেও চাকরি নেই। নির্ঘাত তারা এও জানে না যে ঐ “not essential” এর তালিকায় বিজ্ঞানের শিক্ষক, গবেষকরাও ঢুকে পড়েছেন।

গত মাসের ঘটনা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারপোষিত বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ গবেষকদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, শোন বাপু, এখন টাকাকড়ি নেই। অর্ধেক মাইনে দিচ্ছি, তাই নিয়ে চুপচাপ থাকো। পরে দেবখন বাকিটা। এদিকে খবরের কাগজ খুলে দেখুন। সরকারী বিজ্ঞাপনের কমতি নেই। যত অভাব মাস্টারমশাই, দিদিমণি, গবেষকদের মাইনে দেওয়ার বেলায়। এ রাজ্যেও যেমন শিক্ষকদের ডি এ, ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বেলায় শোনা যায় কোষাগার ফাঁকা। অথচ কার্নিভালের টাকা কম পড়ে না, থানা থেকে ডেকে ডেকে দুর্গাপুজোর টাকা দেওয়ার সময়েও টানাটানি হয় না।

আসলে ঐ যে “not essential”, ঐটেই হচ্ছে আসল কথা। যারা শেখায় তাদের যত অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া যাবে তত মানুষের শেখার আগ্রহ কমে যাবে, মগজ ধোলাই না করলেও সবাই বুঝে যাবে “বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান।” তবে না হীরকের রাজা ভগবান হবে?

আর ভগবান হতে সাহায্য করি আমরা, যারা ফেসবুক ভরে আছি। আমরা ভাবছি এসব ধরনা, অনশন তো করছে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা, যারা বাংলা মাধ্যমের স্কুলে চাকরি করতে চায়। এতে আমাদের কী? আমার ছেলেমেয়েকে তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াব, সে বড় হয়ে চাকরি করলে ওরকম স্কুলেই করবে। তো আমার ভারী বয়ে গেছে। কিন্তু এত নিশ্চিন্ত না থেকে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন দেখি, আপনি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে যে স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করেছেন সেই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা কত টাকা মাইনে পান? এ ছুতো সে ছুতোয় যে বিপুল পরিমাণ টাকা স্কুল কর্তৃপক্ষ আপনার থেকে নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত, তার কত শতাংশ শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মীদের বেতনে খরচ হচ্ছে? চিত্রটা কিন্তু ভাল নয়।

আসলে শিক্ষা এখন ব্যবসায় পরিণত। কিসের ব্যবসা? কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবসা। কাদের কাঁচামাল। কর্পোরেটের। আপনার ছেলেমেয়ে অঙ্ক করে মজা পাচ্ছে কিনা, তার মধ্যে ভবিষ্যতের গণিতবিদ তৈরি হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কেউ নিচ্ছে না। কারো সন্তান স্টিফেন হকিংয়ের মত মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে জীবন ব্যয় করুক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা চাইছে না। কারণ ওরকম ছাত্রছাত্রীকে মানবসম্পদ হিসাবে কোন কোম্পানি কিনবে না। আর যে শিক্ষা লাভের কড়ি উৎপাদনে কাজে লাগে না, তা “not essential.” একই কারণে সাহিত্য তথা তুলনামূলক সাহিত্যও ফালতু। কোন শিক্ষক বা শিক্ষিকার প্রণোদনায় (অনুপ্রেরণায় নয় কিছুতেই) যদি এক ঘর ছাত্রছাত্রী শিহরিত হয়ে আবিষ্কার করে জীবনানন্দের কোন পংক্তি আজকের প্যালেস্তাইনের কোন কবির প্রায় অনুবাদ বলে মনে হচ্ছে, তাতে আম্বানি বা জ্যাক মায়ের কী লাভ? উল্টে বিপদ। কারণ “এরা যত বেশি শেখে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।”

অতএব, এক দিকে ব্যাঙের ছাতার মত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে ওঠে, যেখানকার দেয় বেতন মহার্ঘ। অন্যদিকে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন সাধারণ পড়ুয়ার নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এ রাজ্যে কম বেশি যা-ই নম্বর পাও, কলেজে ভর্তি হতে হাজার হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকতে হয়, অথচ শিক্ষকের অভাবে স্কুল চলে না, ছাত্রসংখ্যা কমে যায়, স্কুল উঠে যায়।
দেখে শুনে আমি আপনি কী করব? বাবা-মা হিসাবে যেটুকু করতে পারি। অর্থাৎ সামর্থ্য আছে বলে বেসরকারী স্কুলে সরিয়ে নেব, বহুজাতিকের জন্যে মানবসম্পদ তৈরি করব। আর যে বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই, তাঁদের ছেলেমেয়ের আর লেখাপড়া শেখা হবে না, সে মানবসম্পদ হয়ে উঠতে পারবে না। আমরা “essential”, ওরা “not essential”। বিশ্বাস করুন, এখানে মেধার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কোন ভূমিকা নেই।

সাংবিধানিক সঙ্কট না পালে বাঘ?

আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?

১৯৯৩ সালের কোন একদিন কলকাতার তিলজলা এলাকায় ঢুকে পাঞ্জাব পুলিশ এক দম্পতিকে গুলি করে মারে এবং তাদের মৃতদেহ নিয়ে প্রস্থান করে। ঐ দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা নাকি খালিস্তানি জঙ্গি। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রচুর আলোড়ন হয়। অতঃপর আমৃত্যু মার্কসবাদী, প্রাক্তন সি পি আই (এম) নেতা এবং বামফ্রন্ট সরকারের একদা অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র সংবাদ প্রতিদিন কাগজে তাঁর কলামে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘সবার উপরে পঞ্জাব পুলিশ সত্য?’ সেই লেখা থেকে ঈষৎ দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক:

স্বাধীনতার পর প্রচুর ঢক্কানিনাদ সহকারে ১৯৪৯ সালে একটি সংবিধান রচনা করা হয়েছিলো, সেই সংবিধানের অনুশাসনে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা নাকি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশ যে-কোনো রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সার্বিক দায়িত্ব ঐ-রাজ্যের সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারেরও না, অন্য-কোনো রাজ্যের সরকারের তো না-ই। রাজ্য সরকারের অনুমতি না নিয়ে এমনকী কোন কেন্দ্রীয় বাহিনীরও কোনো উপলক্ষ্যেই রাজ্যে অনুপ্রবেশের অধিকার নেই। মাত্র একটি অবস্থায় এই রীতির ব্যত্যয় হতে পারে: কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসদমন ও অশান্ত অঞ্চল আইন যদি একটি রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’য়ে থাকে, তা’হলে। কিন্তু এই আইনের ধারাবলে এক রাজ্যের পুলিশ অন্য রাজ্যে ঢুকে যেতে পারে না, ঐ আইন কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হ’লে একমাত্র কেন্দ্রীয় পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীই রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়াই কোনো রাজ্যে ঢুকে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী আইনশৃঙ্খলার টহলদারীর ব্যবস্থা করতে পারে।

গতকাল সন্ধ্যা থেকে কলকাতার নগরপালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে যে অভূতপূর্ব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা নিয়ে যে কোন আলোচনায় উপর্যুক্ত কথাগুলো মনে রাখা দরকার, যদিও ১৯৯৩ এর ঘটনার সাথে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে তার অনেক তফাত।
আইন অনুযায়ী কোন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যায় না বা এমন কোন আইন প্রণয়ন করাও যায় না যা সংবিধানের যা বিরুদ্ধে যায়। এখন কথা হচ্ছে সিবিআই কোন আইন অনুযায়ী সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে? মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাদের তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন তাই তারা তদন্ত করছে — এই উত্তরটা অসম্পূর্ণ। কারণ সুপ্রিম কোর্টও আইনের ঊর্ধ্বে নন। স্বয়ং প্রধান বিচারপতিকেও রায় দিতে হয় দেশের আইন মেনেই, তিনি নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্ট যে সিবিআই বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে আব্দুল মান্নানের দায়ের করা মামলার তদন্তভার দিয়েছেন সেটাও আইনমাফিক। কী সে আইন যার বলে সিবিআই একটা অঙ্গরাজ্যের ঘটনার তদন্ত করতে পারে?
আইনটা হল The Delhi Special Police Establishment Act, 1946. গত ২৫শে নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে এই আইনেরই একটি সংশোধনী বিল লোকসভায় পেশ হয়, যার ফলে সিবিআই অধিকর্তা বেছে নেওয়ার জন্যে তিন সদস্যের কমিশন গঠন হয়। সেই কমিশনের সদস্য প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা তাঁর মনোনীত কোন বিচারপতি। মূল আইনের ছ নম্বর ধারায় কিন্তু বলা আছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা রেল বিভাগের এলাকায় এই কেন্দ্রীয় পুলিশকে তদন্ত করতে পারে কিন্তু কোন অঙ্গরাজ্যে তদন্ত করতে হলে রাজ্য সরকারের সম্মতি প্রয়োজন।
তাহলে সিবিআই সারা দেশে এত অভিযোগের তদন্ত করে কী করে? করতে পারে কারণ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার সম্মতি দেয়। সেই সম্মতির পোশাকি নাম general consent. পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই general consent দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার, ১৯৮৯ সালে। কে জানে কী আঁচ করে গত নভেম্বরে প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, এবং তারপর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় general consent প্রত্যাহার করে নেন৷ অর্থাৎ এর পর থেকে এ রাজ্যের কোন কেসের তদন্ত করতে হলে সিবিআইকে প্রত্যেক কেসের জন্যে আলাদা করে তদন্তের অনুমতি চাইতে হবে।
কিন্তু এই সম্মতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময়ে সম্ভবত দিদির খেয়াল ছিল না যে ইতিমধ্যেই চালু হয়ে যাওয়া কেসে এর কোন প্রভাব পড়বে না।
এই আইনী জটিলতা নিয়ে আমরা আমাদের মাথার সব চুল ছেঁড়ার সময় অবশ্য পাব না। আজই সিবিআইয়ের আবেদনে সাড়া দিয়ে মহামান্য প্রধান বিচারপতি গোগোই বসেছিলেন। সলিসিটর জেনারেলকে (অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের কৌঁসুলিকে) মৃদু ধমক দিয়ে বলেছেন, আপনাদের কাছে এমন কোন প্রমাণই নেই যা থেকে বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা পুলিশ প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করছে। একটা প্রমাণ দেখান যে সেই চেষ্টা করছে বা করার কথা ভাবছে। এদের এমন শিক্ষা দেব যে আফশোসের শেষ থাকবে না।
মহামান্য আদালত আবার কালই বসছেন। ফলত খুব শিগগির আমরা জেনে যাব কোন পক্ষ আইনভঙ্গ করেছে? রাজ্য সরকারের পুলিশকে না জানিয়ে অসাংবিধানিকভাবে, কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই সিবিআই কলকাতার নগরপালকে ধমকাতে গিয়েছিল? নাকি নগরপালই তদন্তে অসহযোগিতা করে নিয়ম ভাঙছিলেন, এবং সিবিআই সব আইনকানুন মেনেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল?
আইনী মীমাংসা তো নাহয় মহামান্য প্রধান বিচারপতি করে দেবেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না কতদিন চলবে? কার বিরুদ্ধে এই ধর্না? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? গতকাল নগরপালের বাড়ির সামনে মোদীর বিরিদ্ধে সংবিধানের পিণ্ডি চটকানোর অভিযোগ করে যখন ধর্নায় বসেছেন, তখন ধরে নেওয়া যায় ধর্না কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তা সেই ধর্না দিল্লীর ৭, রেসকোর্স রোডে না হয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে কেন?
যে ৩৫৬ র জুজু কেন্দ্রীয় সরকার দেখাচ্ছে বলে কাল মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করছিলেন বা স্টুডিওতে বিজেপি নেতারা হুমকি দিচ্ছিলেন, তা যদি সত্যি হয় তাহলে নিঃসন্দেহে মমতা ঠিকই করেছেন। তাঁর সরকারকে যদি কাজ করতে না দেওয়া হয়, নিশ্চয়ই তাঁর অধিকার আছে পথে নেমে আসার। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা হতে চলল, রাজ্যপাল চুপ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক চুপ। জুজুটা গেল কোথায়? তাহলে কি কাল সন্ধ্যের অতি তৎপরতা এবং ধর্না শেক্সপিয়রের ভাষায় “much ado about nothing”?
এতগুলো প্রশ্নের পরে আরো একটা প্রশ্ন আসে। সিবিআই তো বলছে তারা শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। তাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি কেন? এ কি সেই ঠাকুরঘরে কে জিজ্ঞেস করায় “আমি কলা খাইনি” উত্তর আসার মত ব্যাপার?
বিঃ দ্রঃ সংবিধানের ৩৫৬ ধারার কথা উঠতে মনে পড়ল, তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর একটা নির্বাচনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর দলের প্রাপ্ত ভোট ছিল শতাংশের হিসাবে ৩.৫৬। তিনি তৎকালীন রাজ্য সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন ভোটের শতাংশটা খেয়াল রাখবেন। বাড়াবাড়ি করলে পশ্চিমবঙ্গের ঐ অবস্থাই হবে।
ধন্য আশা কুহকিনী।

বেঁচে থাক ডিম ভাত

আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না

ডিম্ভাত নিয়ে চলা বিদ্রুপ এবং তার প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো কথা বলা দরকার যেগুলো মমতার ব্রিগেড সমাবেশ, বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ ছাড়িয়েও প্রাসঙ্গিক।
১) যাঁরা কোনোদিন কোনো রংয়ের রাজনৈতিক মিছিলে বা সমাবেশে যাননি এবং যাওয়াটা “down market” বলে মনে করেন তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, বহু মানুষের সাথে হাঁটলে অথবা দিগন্তবিস্তৃত মাঠে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে বসে থাকলে আর কিছু না হোক একটা জিনিস হয় সেটা হল ইগো নিয়ন্ত্রণে আসে। ছশো কোটি মানুষের দুনিয়ায় আপনি কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিৎকর সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। শুধু এই কারণেই নিয়মিত মিছিলে, মিটিঙে যাওয়া যেতে পারে। ল্যাজ মোটা হওয়া আটকানোর এর থেকে ভাল প্রতিষেধক নেই।
২) ব্রিগেডের সমাবেশে আসা লোকেদের উদ্দেশ্য বা কোন লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে তা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ নতুন কিছু নয়, বরাবর হয়ে আসছে। আমাদের বাল্যকালে, সিপিএম তথা বামফ্রন্ট যখন মধ্যগগনে, তখন একটি সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে দীর্ঘ লেখা বেরিয়েছিল, যাতে প্রশ্ন করা হয়েছিল “যে দেশে ব্রিগেড নেই সে দেশে কি গণতন্ত্র নেই?” পৃথিবীর সব দেশের গণতন্ত্র এক ছাঁচে ঢালা হোক, একই অর্থনীতি সব দেশে চলুক এই নিও লিবারেল বদমাইশি যাদের তত্ত্ব, বলা বাহুল্য তারাই এসব লিখেছিল। বিশ্বায়নের দুই দশকে আমরা, এ দেশের মধ্যবিত্তরা, এই বুলিগুলো মুখস্থ করে ফেলেছি। বহুজাতিক ব্র‍্যান্ডের জুতো আর জিনস পরতে পেরে আহ্লাদিত আমরাই এখন সগর্বে সকলকে বোঝাই গণতন্ত্র মানে হল পাঁচ বছর অন্তর ভোটটি দিয়ে বাকি সময়টা ঘুমিয়ে থাকা। বিরোধিতা মানেই “disruption” অতএব মিটিং, মিছিল, বনধ সবকিছুই কর্মনাশা। যাদের কর্ম নাশ হচ্ছে রোজ তারা ঘুমিয়ে থাকুক, আমাকে আমার কর্ম করতে দিক। এই চিন্তাভাবনা থেকেই ডিম্ভাত ব্যঙ্গ। এবং এই নিষ্ক্রিয়তার চাষবাসেরই ফল মমতা এবং মোদীর একনায়কত্ব, যেখানে প্রতিবাদ করলেন মানেই আপনি যথাক্রমে উন্নয়নবিরোধী এবং অ্যান্টি ন্যাশনাল। নিও লিবারেল অর্থনীতি, রাজনীতি এখন অস্তাচলে। জায়গা নিচ্ছে ট্রাম্প, ব্রেক্সিট, বলসোনারোর দল। অতএব ফ্রান্সে ব্রিগেড নেই, গণতন্ত্র আছে এবং সেখানে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন চলছে। স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানেও ব্রিগেড নেই। কিন্তু একনায়ক হতে চাওয়া রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রায় রোজ আপনারা যাকে “disruption” বলেন তা চলেছে। এমন অবস্থা যে মাঝেমধ্যেই সরকার ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। আপনি যদি এসব না জানেন বা জেনেও আন্দোলন, সমাবেশ দেখে নাক সিঁটকোন তার মানে একটাই — আপনি backdated বা আপনাদের ভাষায় uncool. অর্থাৎ down market.
৩) লড়াই, আন্দোলন, ইউনিয়ন — এসবকে অপ্রয়োজনীয়, “যাদের কোনো কাজ নেই তারা এসব করে” বলে গালাগাল দিতে হলে ভেবেচিন্তে দেবেন। জেট এয়ারওয়েজের কর্মীদের মত চাকরি থেকে রাতারাতি ছাঁটাই হয়ে গেলে আবার প্রকাশ কারাতের কাছে ছুটবেন না যেন। আরো একটা কথা ভেবে দেখবেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সত্যিই কোনো ব্রিগেড সমাবেশে আসা কয়েক লাখ লোকের কোন কাজ নেই, তাহলে সেটা জাতীয় সমস্যা। সেই সমস্যার সমাধানে আপনি কী করছেন? এই সমস্যার সমাধান দাবিও করেছেন কি কখনো? যদি না করে থাকেন তাহলে এই কর্মহীন লোকগুলোকে বিদ্রূপ করার বা নিন্দা করার অধিকার আপনার জন্মায় কী করে?
৪) “এদের তো কিনে নেওয়া খুব সোজা। এদের তো ডিম ভাত (মতান্তরে, স্থানান্তরে বা দিনান্তরে এক প্যাকেট বিরিয়ানি) খাইয়ে দিলেই চলে আসে”। এটা যদি মানুষের শস্তা হওয়ার প্রমাণ হয় তাহলে তো আপনি তো আরো শস্তা। এদের দূর দূরান্ত থেকে আনতে হলে অন্তত যে আনছে তাকে গাঁটের পয়সা খরচ করে বিরিয়ানি খাওয়াতে হয়। আপনি তো আলো ঝলমলে দোকান দেখলেই সপ্তাহান্তে সপরিবারে মলে চলে যান, যা দরকার নেই তা-ও নিজের পয়সা খরচ করে কেনেন, পাঁচ টাকার পপকর্ন দেড়শো টাকায় কেনেন। অর্থাৎ আপনাকে টুপি পরিয়ে আপনার চেয়ে অনেক বড়লোকেরা আরো বড়লোক হয়, এবং আপনার রুচি পছন্দকে কিনে ফ্যালে একটা সমাবেশ আয়োজনের চেয়ে অনেক কম খরচেই।
৫) উপর্যুক্ত কথাগুলো সবই “দেশটার কিস্যু হবে না” ধরণের, প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণপন্থী, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের প্রতি। এ ছাড়াও দুরকমের বামপন্থী আছেন। একদল তাঁদের অপছন্দের পার্টিকে গাল পাড়তে পারার আনন্দে ভুলেই গেছেন যে এই একই গালাগাল বরাবর তাঁদের পছন্দের পার্টিকে দেওয়া হয়েছে, কদিন পরেই আবার দেওয়া হবে। আরেক দল ঠান্ডা ঘরে বসে মার্কস, লেনিন, মাও মুখস্থ করা ছাড়া বিশেষ কিছুই করছেন না কিন্তু ব্রিগেড ফিগেডকে পাত্তা দেন না। কারণ তাঁরা তো কবেই বলেছেন যে কোনো মানুষই নিজের ইচ্ছায় ভোট দেন না এবং সকলকেই জোর করে ব্রিগেডে নিয়ে আসা হয়। এঁরা একদা ভাল করে বন্দুক চালাতে না শিখেই সশস্ত্র বিপ্লব করতে গিয়েছিলেন। সহযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করলেন, কেউ কেউ সারাজীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেলেন, এঁরা কে জানে কী করে আস্ত থেকে গেলেন। এখন হয় খবরের কাগজের স্তম্ভের আড়াল থেকে, নয় ফেসবুক ওয়ালের আড়াল থেকে শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এঁদের বোধ করি বেশি পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রথমোক্তরা কেউ বিমান বসুর মত আশি বছর বয়সে পুলিশের লাঠি খেতে যাবেন না। দ্বিতীয়োক্তরা কবিতা কৃষ্ণনের মত মাঠে ময়দানে রোজ ধর্ষণ, খুনের হুমকি অগ্রাহ্য করে রাজনীতি করবেন না। তবে মুখিয়ে আছি মোদীর মিটিংয়ের দিন এঁরা জোর করে আনা, ডিম ভাত খেতে আসা জনতা সম্বন্ধে কটা কথা বলেন তা দেখার জন্যে।
শেষে একটা কথা বলি। আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ (যে কোনো দলের) সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না।
আমার পকেটে হয়ত দুটো ডেবিট কার্ড, একটা ক্রেডিট কার্ড। সবকটা মিলিয়ে হয়ত আমার কাছে পাঁচশো ক্রেডিট পয়েন্ট আছে। ধরা যাক আমার স্ত্রীর পার্সেও দুটো ডেবিট কার্ড, আছে নশো ক্রেডিট পয়েন্ট। আমার বন্ধু প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, তার মোটে একটা স্যালারি অ্যাকাউন্টের কার্ড। তার সাথে তার বান্ধবী আছেন, যিনি হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে হাজার পাঁচেক টাকা আছে। আমাদের সাথে আমাদের পরিচারিকা আছেন, যাঁকে মাসে তিন হাজার টাকা মাইনে দিই। তাঁর কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। আমরা যদি কোনো সিনেমা হলে যাই বা মলে ঢুকি, পাঁচ জনের আত্মবিশ্বাস হবে পাঁচ রকমের। কারণ আমাদের ক্ষমতা ওই চত্বরে সমান নয়। কোনো কোনো জায়গায় পরিচারিকাকে হয়ত আমাদের সাথে বসতেই দেওয়া হবে না। কে জানে, হয়ত আমরাই চাইব উনি অন্য টেবিলে বসুন বা বাইরে অপেক্ষা করুন। কিন্তু আমরা যদি কোনো মিছিলে যাই বা ব্রিগেডে যাই, পাঁচজনেই সমান। আমাদের পরিচারিকার মত আমাদেরও ঘাসের উপর চটি পেতেই বসতে হবে। সুতরাং মিছিল বেঁচে থাক, মিটিং বেঁচে থাক, সেখানে যাওয়া মানুষের ক্ষিদে পেলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা বেঁচে থাক।
বরং “কেউ যদি বেশি খাও খাওয়ার হিসেব নাও, কেন না অনেক লোক ভাল করে খায় না।”

লেখাপড়া করে যে-ই

ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়

মোদ্দাকথা পড়াশোনা হোক সেটা সরকার চায় না। কেন্দ্রীয় সরকারও চায় না, রাজ্য সরকারও চায় না।
যাঁরা ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁদের মধ্যে দুরকম মত আছে। এক দল মনে করেন ছাত্রদের শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা উচিৎ, আর কিছু করা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। আরেক দল মানুষের মতে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সে রাজনীতির দাবীদাওয়া হওয়া উচিৎ একান্ত ছাত্রদের। ক্যাম্পাসের বাইরের কোন ঘটনার অভিঘাত সেখানে থাকা চলবে না। এই মতগুলোর ভাল মন্দের মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু দুরকম মতের লোকেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এ রাজ্যের এবং এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত কয়েক বছর ধরে যা চলছে তা সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফ্যালে। সুতরাং সেগুলোকে ভুলে বই মুখে গুঁজে বসে থেকে তাদের বিশেষ লাভ নেই। কারণ পড়ার পরিবেশ এবং উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
স্কুলে বাংলার শিক্ষক নেই। সে জায়গা পূরণ করা দীর্ঘদিনের দাবী। অথচ এসে হাজির হলেন উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ, হতেই পারে কিছু বাইরের লোকও তাদের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি করেছে। একটা এলাকার স্কুল কলেজের সাথে সেই এলাকার সমস্ত মানুষেরই স্বার্থ জড়িত আছে, বিশেষত সরকারপোষিত স্কুলগুলোর সাথে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এখন ছেলেমেয়েকে অমুক ইন্টারন্যাশনাল, তমুক পাবলিক স্কুলে পাঠাতে পারেন। গরীব, নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েদের জন্যে এখনো যে সরকারী স্কুলই ভরসা। ফলে বহিরাগত আপনি বলবেন কাকে? তাছাড়া কোন রাজনীতিবিদ এসে দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারলে যখন বহিরাগতর প্রশ্ন ওঠে না, তখন এ বেলাতেই বা সে প্রশ্ন কেন উঠবে?
ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে চাকরিটা যোগ্যতা থাকলেই পাওয়া যায় বলে লোকে জানত সেটা হল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। সেখানেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ঢুকে পড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নেট বা স্লেট পরীক্ষার আদলে স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা চালু হয়। বর্তমান সরকার আসার পরে সেই পরীক্ষা নিয়মিত হয় না, হলেও কে পাশ করল আর কে চাকরি পেল তা ভগবান আর সরকার ছাড়া কাক পক্ষীতেও টের পায় না। বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করা লোকেরা বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে আন্দোলন করার অধিকার হারিয়েছে, সরকারী কর্মচারীদের সে অধিকার বজায় আছে বলে জানা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের অধিকারের এমনই চেহারা যে এক সহকর্মীর ভোট করাতে গিয়ে রহস্যমৃত্যুর তদন্ত চাইলেও হাজতবাস করতে হয়, মার খেতে হয়। স্কুল চত্বরেও বিভিন্ন শ্রী সামলাতে সামলাতে লেখাপড়ার বিশ্রী অবস্থা মেনে নিতে হচ্ছে মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের।
এদিকে কলেজগুলো চলছে একগাদা আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের দিয়ে। তরুণ মেধাবীরা প্রায় ঠিকে ঝিতে পর্যবসিত। তারা এবং প্রবীণরা সর্বদাই আতঙ্কে আছেন, কখন ছাত্র সংসদ বা অন্য কারো কোপদৃষ্টি পড়ে। মারধোর না খেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরতেই পারলেই যথেষ্ট, পড়ানোয় আর মন দেবেন কখন?
উল্টোদিকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা তোলা দিতে হবে ছাত্র সংসদকে। অথচ ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু কলেজে। আন্দোলনের দাবী ন্যায্য, অন্যায্য যা-ই হোক, যাদবপুর থেকে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার এবং প্রধানদের সমাধান হল “পুলিশ ডাকো আর ঠ্যাঙাও।” এও মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ যে ছাত্রদের কোন দাবী থাকতে নেই। অতএব হোস্টেলে থাকার জায়গা আদায় করতে হলেও তাদের হয় মেডিকাল কলেজের মত অনশন করতে হবে, নয় প্রেসিডেন্সির মত কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে বলতে হবে “হোস্টেল দাও তবে তালা খুলব।” সুবিধামত সরকার কোথাও বলবে “এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” আর কোথাও “সরকারের টাকায় চলবে, সরকারের কথা শুনবে না?” ওদিকে মালদার স্বীকৃতিবিহীন কলেজটার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এখনো চলছে, কলকাতার বুকে। ওদের জন্যে কেউ কোন সমাধান খুঁজছেন কিনা কে জানে?
আপনি যদি শিক্ষিত যুবক/যুবতী বা তাদের বাবা-মা হন, আপনি ভাবতেই পারেন “এ রাজ্যটা একেবারে গেছে। ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।” কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। সমস্ত সরকারী বা বেসরকারী সমীক্ষায় দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রথম সারিতে (যদি প্রথম না হয়) থাকে, সেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী পার্টির ছাত্র সংগঠন মারদাঙ্গা করেও সংসদ দখল করতে পারেনি। সেই রাগে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতবিরোধী শক্তি” কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের ভারত সরকার শত্রু হিসাবে দেগে দিল। তার কয়েকদিন আগেই দিল্লীর জাকির হুসেন কলেজেও সংসদ নির্বাচনের দিন তাণ্ডব চলেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারত সরকারের নিশানায় জেএনইউ ছাড়াও এসেছে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় প্রভৃতি। ক্যান্টিনে এটা কেন, ওটা কেন নয়? অমুক জায়গায় তমুকের ছবি ঝুলছে কেন? আবোল তাবোল ছুতোয় পড়াশোনা নষ্ট করে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে, চলবে।
কোথায় কেমন লেখাপড়া হচ্ছে তা নিয়ে সরকার বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢাউস জাতীয় পতাকা টাঙাতে ব্যস্ত, সাঁজোয়া গাড়ি রাখতে চায়। অবশ্য শুধু চায় বললে এই সরকারের সক্রিয়তাকে নেহাতই অসম্মান করা হয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখটা সার্জিকাল স্ট্রাইক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে। সেদিন এন সি সি প্যারেড করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রশংসাসূচক ডিজিটাল বা সত্যিকারের কার্ড বানাতে হবে, দিল্লীতে এবং সব রাজ্যের রাজধানীতে এই উপলক্ষে যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ততটা পড়াশোনার জায়গা নয় যতটা দেশপ্রেমের প্রদর্শনীর জায়গা।
অবশ্য এর জন্যে মঞ্জুরি কমিশনের উপর রাগ না করাই ভাল। সে বেচারা নিজেই তো আর দুদিন পর থাকবে না। পরিকল্পনা কমিশন গিয়ে নীতি আয়োগ এসেছে, যার প্রয়োগ সম্বন্ধে রচনা লিখতে দিলে চেয়ারম্যান নিজেও মাথা চুলকোবেন। আগামী দিনে মঞ্জুরি কমিশন গিয়ে কোন এক জো হুজুরি কমিশন আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ওসবের দরকারই বা কী? এখনো তৈরি না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন সরকার স্বয়ং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়ে দিচ্ছেন তখন আর ন্যাক, ইউজিসি এসব রেখে আয়করদাতার পয়সা নষ্ট করা কেন?
এসবেও অবশ্য অনেকেরই আপত্তি নেই। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক বিমানের মডেল নিয়ে তো আলোচনা হয়েই গেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আধুনিক বিদ্যাগুলো সব ফালতু। ওগুলো শেখার কোন দরকারই নেই। অতএব উঠে যাক না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে খারাপ লাগে আমার সেইসব বোকা বন্ধুদের জন্যে, যারা গত এক দশক উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করে, এ দেশের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাত্রায় থেকেও ভুলতে পারেনি যে তার লেখাপড়ার খরচ অনেকদিন পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছে এ দেশের রিকশাওয়ালা, পানওয়ালা, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে যারা তারা। সেই বোকাগুলো দেশে ফিরে এসে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না তাদের যোগ্যতা কেন দেশে ফিরে আসার জন্যে যথেষ্ট হচ্ছে না। ভাবি তাদের মনে করিয়ে দেব “লেখাপড়া করে যে-ই/অনাহারে মরে সে-ই।/জানার কোন শেষ নাই/জানার চেষ্টা বৃথা তাই।/বিদ্যালাভে লোকসান/নাই অর্থ নাই মান”।
সরকার কেন খাল কেটে উদয়ন পণ্ডিত আনতে যাবে?

অনধিকার প্রবেশ

যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল

যাদবপুরে প্রবেশিকা পরীক্ষা হওয়া উচিৎ না অনুচিত এই নিয়ে মতপার্থক্য আছে বিভিন্ন মহলে এবং থাকারই কথা। সরকারপোষিত একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংজ্ঞানুযায়ী আমার, আপনার মত করদাতাদের যৌথ সম্পত্তি। ফলে তার কার্যকলাপ নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের সকলের মতামত থাকবে। এটা আমাদের অধিকার। কর্পোরেটচালিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁকজমক দেখে যতই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন, তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি, ভর্তির প্রক্রিয়া, পাঠক্রম নিয়ে চেঁচামেচি করার অধিকার আমার আপনার নেই, এটা মনে রাখবেন।
যাদবপুরের প্রতি আমাদের সে অধিকার আছে বলেই যাদবপুরকে তথা সরকারপোষিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুক দিয়ে আগলানো আমাদের কর্তব্য। এবং আমাদের সকলের অধিকার রক্ষা করার জন্যেই সরকারের কথায় যাদবপুর উঠবে বসবে, এমনটা হতে দেওয়া উচিৎ না।
সরকার মানেই নাগরিক নয়। সরকারের মতামত গণতন্ত্রের সবচেয়ে উন্নত অবস্থাতেও সব নাগরিকের মতামতের প্রমাণ নয়, বড়জোর সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের মতামতের প্রমাণ। সমস্ত ইস্যুতে তাও নয়। এমতাবস্থায় ঘরে বাইরে, কাগজে, চ্যানেলে, ফেসবুকে, হোয়াটস্যাপে বিতর্ক চলতে থাকুক কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে চলবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র তার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের হাতেই থাকতে হবে।
কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী রাজ্য সরকার পোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন “সরকার টাকা দিচ্ছে আর সরকারের কথা মানবে না?” যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল।
এভাবে তো লেখাপড়া হয় না।
উপরন্তু আজকের সরকার একরকম সিলেবাস ঠিক করবে, কাল অন্য সরকার এসে বলবে “এসব বাজে জিনিস পড়ানো হচ্ছে। কাল থেকে অন্য জিনিস পড়ানো হবে।“ আজকের সরকার বলছে “প্রবেশিকা পরীক্ষা তুলে দিতে হবে।“ কালকের সরকার বলবে “প্রবেশিকা পরীক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলে নাকি?” সরকার বদলের সাথে সাথে যদি লেখাপড়ার ধারা বদলায় তাহলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি থিসিসগুলো যে টোকা নয় সে কথা কে-ই বা বিশ্বাস করবে?
অনেক বড় বড় মাথা দেখতে পাচ্ছি প্রবেশিকা পরীক্ষা কেন ভাল নয় তার পক্ষে অনেক যুক্তি দিচ্ছেন। আমার নিজেরও দু একটা যুক্তি আছে কিন্তু সে বিতর্কে যাবই না। যেতাম যদি বুঝতাম রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে যাদবপুরের শ্রীবৃদ্ধি। কিন্তু সরকারের যে ভাবের ঘরে দিনে ডাকাতি। যে সরকারের আমলে সারা রাজ্যে কলেজের আসন কেনাবেচা হয়, সেই সরকারের যাদবপুরের উন্নতির চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না একথা নিঃস্বার্থ কেউ কেন বিশ্বাস করবে? যাদবপুরের অনেক ছাত্রছাত্রী দেখছি প্রশ্ন তুলছেন যে সেন্ট জেভিয়ার্স বা রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরও তো প্রবেশিকা পরীক্ষা নেয়, তাদেরকে সরকার জোর করছে না কেন? শুধু যাদবপুরের উন্নতিই কি সরকারের লক্ষ্য?
খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। উত্তর একাধিক, তবে খুব সোজা। সেন্ট জেভিয়ার্সের ইউনিয়ন অরাজনৈতিক, সেখানে টি এম সি পির ঢোকার জায়গা নেই। আর বিদ্যামন্দিরের ছাত্র সংসদ বাতাসের মত। সবাই জানে আছে কিন্তু চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। অতএব সেখানেও টি এম সি পি কে ঢোকানো যাবে না। বিদ্যামন্দিরের উপরি সুবিধা এই যে তাদের চোখ রাঙালে, মুখ্যমন্ত্রী জানেন, বিজেপি “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে তেড়ে আসবে।
যাদবপুরের প্রতি এই অহৈতুকী কৃপার অনেক কারণের একটা, স্পষ্টতই, তাদের তোলাবাজির এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারার ব্যর্থতা। আরো একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করুন। এমন দুটো ঘটনা যুগপৎ ঘটছে — কলেজ ভর্তি নিয়ে প্রকাশ্য দুর্নীতি আর যাদবপুরে অচলাবস্থা — যার প্রভাব রিকশাচালকের পরিবার থেকে উচ্চপদস্থ সরকারী আমলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত, অথচ সাম্প্রতিক ভোটগুলোর ফলাফল অনুযায়ী রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি স্পিকটি নট। আসলে ক্ষমতাসীন দলের মত তারাও চায় এ রাজ্যের লেখাপড়া গোল্লায় যাক৷ বিশেষ করে যাদবপুর গোল্লায় গেলে তো নাগপুরে মিষ্টান্ন বিতরণ হবে। মুক্ত চিন্তা এবং বামপন্থী চিন্তার আখড়াগুলো সঙ্ঘ পরিবারের কাছে পরের ছেলে পরমানন্দ। যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষককুলের মধ্যে বিভিন্ন তীব্রতার লাল রঙের পোঁচ মমতাদেবী এবং মোদীবাবুর মধ্যে সমান বিবমিষার উদ্রেক করে। ২০০৮-০৯ থেকে শুরু করে বামফ্রন্টকে পছন্দ নয় বলে যে বামপন্থীরা মমতাকেই প্রকৃত বামপন্থী বলে নন্দিত করেছেন, এখনো করেন, তাঁরা এবার ভুলটা বুঝলে ভাল হয়।
এই অসহনীয় অবস্থাতেও, যে কোন আন্দোলন শুরু হলেই যা হয়, আন্দোলনের ধরণ নিয়ে সমালোচনা করতে কেউ ছাড়ছে না। লেখাপড়ার বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে সরকার, তবু যাদবপুরের সুবোধ বালক বালিকাদের উচিৎ ছিল ধর্নায় না বসে, অনশন না করে বই মুখে বসে থাকা — এই কথা অনেকেই বলছেন এবং লিখছেন। যেন ছেলেমেয়েরা রুখে না দাঁড়ালে তাঁরাই ব্যাপারটা নিয়ে সরকারের সাথে কথা বলে বিহিত করতেন। যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা প্রতিবাদ করছে কেন তাই নিয়ে প্রাজ্ঞদের অপার বিস্ময় এবং বিপুল ক্রোধ।
আমার পরিচিত যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের এক প্রাক্তন ছাত্র দুঃখ করে বলল তুলনামূলক সাহিত্যের একজন নাকি অনশন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাতে নাকি অনেকে বলছে ঐ বিভাগটাই ফালতু। ওটা তুলে দেওয়াই উচিৎ কারণ ওটা পড়ে কেউ চাকরি পায় না। ছেলেটি ভেবেছিল আমার সহানুভূতি পাবে কিন্তু আমি তাকে বললাম শুধু তুলনামূলক নয়, সবরকম সাহিত্য পড়ানোই বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। তাতে আমার মত সাংবাদিকদের মস্ত সুবিধা। আমরা রোজ যে ছাইভস্ম লিখি সেগুলোকে ছাইভস্ম বলে চেনার মত আর কেউ থাকবে না। শুধু সাহিত্যও নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগও তুলে দেওয়া উচিৎ। কারণ এদেশে বহু ইঞ্জিনিয়ার বেকার বসে আছে। যত ইঞ্জিনিয়ার আছে তত চাকরি নেই। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।
আমার কথা শুনে ছেলেটির মুখের যা চেহারা হল তাতে আমার এত অপরাধবোধ হল যে ভাবলাম ওকে সন্দেশ বিস্কুট খাওয়াই। খাওয়াতে খাওয়াতে বললাম যে কাল একটা না তৈরি হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেশের সরকার আই আই টি, আই আই এস সি র সমান মর্যাদা দিয়েছে। যাদবপুরের কী হবে?
বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখে আমাদের স্কুলের জহরবাবুর জ্যামিতি ক্লাস নেওয়ার ঢঙে বললাম “আসলে একটা সাদা কাগজের উপর কয়েকটা বিন্দু একে অপরের থেকে অনেক দূরে দূরে বসে আছে। কিন্তু এগুলোকে জুড়লে দেখবি আসলে এগুলো একটা চতুর্ভুজের চারটে শীর্ষবিন্দু। একটা হল শিক্ষা ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসতে চাওয়া কর্পোরেট, একটা সেই কর্পোরেটের দাসানুদাস ফ্যাসিবাদী সরকার, আরেকটা উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি বেসরকারী হাতে চলে গেলেই সর্বোচ্চ যোগ্যতা না থাকলেও পড়িয়ে বা বই লিখে দু পয়সা কামিয়ে নেবে বলে ওঁত পেতে থাকা বুদ্ধিজীবী এবং চতুর্থটা হল এক শ্রেণীর ভদ্রলোক, যারা বরাবর চেয়েছে শুধু তাদের ছেলেমেয়েরাই লেখাপড়া শিখুক। চাষাভুষোর পড়াশোনা শিখে কী হবে?”

আতঙ্ক

এ রাজ্যে এখন স্কুল কলেজের শিক্ষক, অধ্যাপকরা ভীষণ বিপজ্জনক

আমাদের পাড়ায় একজন আছে যে বহু বছর আগে ইডেন গার্ডেন্সে একটা মোহনবাগান – ইস্টবেঙ্গল খেলা দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়েছিল। সেদিন ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আমার এই পাড়াতুতো কাকু জোর বেঁচে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সোজা হয়ে হাঁটতে পারেনি। শুধু তাই নয়, এই সেদিনও বসে থাকতে থাকতে অকারণেই হঠাৎ চমকে উঠত — ট্রমা এমনই প্রবল। এত দীর্ঘ না হলেও, একটা স্বল্পমেয়াদী ট্রমা আমারও হয়ে যাচ্ছে বোধহয় — কিছু ছবি, কিছু শব্দ এমনভাবে গেঁথে যাচ্ছে মনে।
সর্বশেষ যে ছবিটা ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল সেটা হচ্ছে আজ সকালের কাগজে দেখা শ্রীরামপুর কলেজের এক অধ্যাপিকার ছবি। আতঙ্কে এভাবে কাঁদতে কোন দিদিমণিকে কখনো দেখিনি। মুহূর্তে প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়কার দিদিমণিদের মুখগুলো ভিড় করতে শুরু করল। খবরে প্রকাশ “আন্দোলনকারী” ছাত্ররা দিদিমণিদের বাথরুমের দরজাও ভেঙে দিয়েছে। প্রাক্তন নয়, বর্তমানদের কীর্তি এটা। এর আগে অন্যত্র এক দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারার ঘটনাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেখানে সান্ত্বনা ছিল এটুকু যে কান্ডটা ঘটিয়েছে এক নেতা, দিদিমণির কোন ছাত্র বা ছাত্রী নয়। এবারে আর সেকথা ভেবে নিজেকে শান্ত করা যাচ্ছে না। নির্ভয়াকান্ডের পর যখন সেই ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ আমাদের সামনে আসছিল, তখন যেমন মধ্যে মধ্যে নিজেকেই ধর্ষক মনে হত, তেমনি আজ কেন যেন মনে হল আমিই আমার ছোটবেলার স্নেহময়ী দিদিমণিদের বাথরুমের দরজা ভেঙে দিয়েছি। শিউরে উঠলাম। কি ভয়ঙ্কর ছাত্রকুল তৈরি করেছি আমরা! অন্যায় দাবী আদায়ের জন্যে মাতৃসমা দিদিমণিদেরও চূড়ান্ত লাঞ্ছনা করতে বুক কাঁপে না এদের। শুনছি আজকাল নাকি মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের ভাগে খুন, ধর্ষণের হুমকিও বাদ যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র আন্দোলন, এমনকি উগ্র, হিংসাশ্রয়ী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। নকশাল আন্দোলনের সময়ে (যা ছাত্রদের নেতৃত্ব সত্ত্বেও ছাত্র আন্দোলনের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না) হিট লিস্টে মাস্টারমশাইদের নাম উঠে যাওয়া, হত্যা — এসবের কথা শুনেছি। কিন্তু তখনো দিদিমণিদের উপর এ হেন আক্রমণ হয়েছে বলে জানি না। তাছাড়া অধ্যাপকদের কারো কারো বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা সত্ত্বেও সেইসব ছাত্ররা যখন পুলিশ বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছে বা পঙ্গু হয়ে গেছে — মাস্টারমশাইদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। যার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ সম্ভবত খুন হওয়া ছাত্রের স্মৃতিতে অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতা

ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।

কয়েকবছর আগে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হল হোক কলরব আন্দোলনে তখন আলোচিত হয়েছিল একদা উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা, যিনি নিজে কংগ্রেসি ছিলেন। কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় একবার তাঁকে ফোন করে বলেন “তোমার ক্যাম্পাসে দুটো কমিউনিস্ট লুকিয়ে আছে। পুলিশ যাচ্ছে, ওদের তুমি বের করে দাও।” উত্তরে উপাচার্য বলেন “আমি বেঁচে থাকতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশ আমার ছেলেদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।” হোক কলরব আন্দোলনেও তো যাদবপুরের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ছাত্রছাত্রীদের সাথেই ছিলেন। ফলে বোঝা যায় যে যা ছাত্র আন্দোলন তা শিক্ষকবিরোধী হয় না। শিক্ষকবিরোধী হয় গুন্ডামি, যা কোন ইতিহাসের তোয়াক্কা করে না।
এ রাজ্যে এখন স্কুল কলেজের শিক্ষক, অধ্যাপকরা ভীষণ বিপজ্জনক। তাঁরা উন্নয়নবিরোধী, তাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা প্রচুর ছুটি পান (ঠিক সময়ে ইনক্রিমেন্ট, ডি এ ইত্যাদি যে পান না সেটা বলাও উন্নয়নবিরোধী), সবচেয়ে বড় কথা তাঁরা প্রতিবাদ করেন। অতএব এই বিপজ্জনক মানুষগুলোর হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে গেলে যা যা করার সে তো করতেই হবে। খুন, জখম, মারধোর, শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা যতটা সম্ভব। অতএব একদিকে তাঁরা খুন হচ্ছেন, খুনের সঠিক তদন্ত দাবী করে হাজতবাস করছেন। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের হাতে মার খাচ্ছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
এই যে অবস্থার অবনতি এর জন্যে অনেকেই আবার শিক্ষককুলকেই দাবী করে থাকেন। শিক্ষকদের রাজনীতিই পশ্চিমবঙ্গের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছে এই কথাটা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। সেই কারণে কিছু অভিজ্ঞতার কথা এই বেলা বলে ফেলি। আর কিছুদিন পরে এসব বললে হয় লোকে বলবে বানিয়ে বলছি, নয় মারতে আসবে।
আমি যে স্কুলে পড়েছি ক্লাস ফাইভ থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত, সেই স্কুল সেইসময় হুগলী জেলার অন্যতম সেরা স্কুল থেকে রাজ্যের অন্যতম সেরা হয়ে উঠছে। আগ্রহী যে কেউ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের থেকে মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ফলাফল যাচাই করে নিতে পারেন। শুধু পরীক্ষার রেজাল্টের দিক থেকেই নয়, আরো নানা দিক থেকেই আমাদের স্কুল ছিল ব্যতিক্রমী। সে নাহয় কোন সুসময়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে লেখা যাবে। এখন এর কৃতিত্ব কার? অবশ্যই একজনের নয়। কিন্তু আমাদের মাস্টারমশাইরা বলতেন “সুধীরবাবু না থাকলে স্কুল এই জায়গায় আসত না।”
সুধীরবাবু অর্থাৎ আমাদের হেডস্যার সুধীরকুমার মুখোপাধ্যায়। ভদ্রলোক ঘোর সিপিএম। আমি যখন ঐ স্কুলের ছাত্র তখন উনি নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA) র জেলা সম্পাদক। সুধীরবাবুর সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছি আমার প্রিয় ইংরিজির মাস্টারমশাই সোমনাথবাবুর মুখে। স্যার একদিন বলেছিলেন “সুধীরবাবুর আগে কমিটি মেম্বাররা মিটিঙে চলে আসত লুঙ্গি পরে। উনি জলদগম্ভীর স্বরে বলেন ‘বাড়ি থেকে প্যান্ট পরে আসুন। সুধীরবাবুকে ছাড়া এমন হতেই পারত না।’” সোমনাথবাবু কোন শিক্ষক সংগঠনের সদস্য ছিলেন জানি না কিন্তু ঘোর গান্ধীবাদী লোক। বারবার বলেছেন “ঘরে দুটো লোকের ছবি রাখবি, আর কাউকে লাগবে না জীবনে — মহাত্মা গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ।”
আমাদের স্কুলের এসিস্ট্যান্ট হেডস্যার তখন পূর্ণবাবু। তিনি ইতিহাসের শিক্ষক, মার্কসবাদীদের ঘোর অপছন্দ করেন। একবার আমায় বলেছিলেন “সুধীরবাবুর সাথে আমার খুব তর্ক হয়। আমি বলেছি, আপনারা তো মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে চান।”
মার্কসবাদী সুধীরবাবু, গান্ধীবাদী সোমনাথবাবু আর দক্ষিণপন্থী পূর্ণবাবুর কখনো মতপার্থক্য হয়নি এমনটা নিশ্চয়ই নয়, কারণ সেটা অসম্ভব। কিন্তু তা বলে আমাদের স্কুলের উন্নতি থেমে থাকেনি, তরতরিয়ে এগিয়েছে। কেউ উলটো উদাহরণ দিতেই পারেন কিন্তু দুরকম উদাহরণেরই উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে সমস্যাটা শিক্ষকদের রাজনীতি করা নয়, খারাপ রাজনীতি করা। অবশ্য যারা অত্যাচারিত হচ্ছে তাদের রাজনীতিকেই দায়ী করা নেহাত গা জোয়ারি। সেখানে এতসব যুক্তি দিয়ে লাভই বা কী?
তপন সিংহের ছবিতে এক নিরীহ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রশ্রয়প্রাপ্ত, সমাজবিরোধী হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ছাত্রকে খুন করতে দেখে ফেলেন। ছাপোষা, যুবতী মেয়ের বাবা মাস্টারমশাইকে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে মেনে নিতে হয় “আপনি কিন্তু কিছুই দ্যাখেননি, মাস্টারমশাই।” আমাদের মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের এবং আমাদেরও — এখন সেই অবস্থা। মানে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে বেঁচে আছি। ছবিতে শিক্ষকের কন্যার মত আমাদের কতজনের যে মুখ পুড়বে আগামীদিনে কে জানে! তবে সেই মাস্টারমশাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বার্ধক্যের লাঠিটাকে স্কুলজীবনের মত আবার শাস্তি দেওয়ার লাঠি করে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন ভয় দেখাতে আসা মস্তানকে।
মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের হাতে মার যারা খেয়েছে তারাই জানে সে মারের জোর কত। হয়ত এখনো পিঠ পাতার সময় হয়নি।