‘ওদের’ প্রতিবাদ

হিন্দু প্রতিরোধের যখন এত শক্তি যে অন্য ধর্মের ইমাম বদলে দিতে পারে তখন নিজের ধর্মে নিশ্চয়ই আরো বড় বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে? তাহলে খাপ পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক না

সারা পৃথিবীর উগ্র দক্ষিণপন্থীদের তো বটেই, সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষদের মধ্যে অনেকেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করেই থাকেন “ওরা নিজেদের ধর্মের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না।” যখন ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তর্কবিতর্কে আর সব যুক্তি ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন এই যুক্তিটাকে খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরে ভেসে ওঠার চেষ্টা করে অনেকে। সামগ্রিকভাবে এই অভিযোগটার সত্যতা বা অসত্যতা নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। আপাতত একটা ঘটনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছি।
কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের শাহি ইমাম বরকতিবাবু একের পর এক ফতোয়া জারি করে ইদানীং বেশ নাম করেছিল। ধর্মের চেয়ে রাজনীতিতেই যে বাবুর আগ্রহ বেশি তা বুঝতে কারো বাকি ছিল না। এবং লোকটি নিজেকে এতই মাতব্বর ভাবতে শুরু করেছিল যে সরকারী নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গাড়িতে লাল বাতি নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। লোকটার বিরুদ্ধে আমার হিন্দু বন্ধুবান্ধবদের মতই মুসলমান বন্ধুদের মধ্যেও বেশ কিছুদিন ধরে অসন্তোষ লক্ষ্য করছি — শুধু ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নয়, তার বাইরেও। আমাকে রোজই টিপু সুলতান মসজিদের সামনে দিয়েই অফিস যেতে হয়। ফলে প্রায় একবছর আগে থেকে আমার চোখে পড়েছে বিভিন্ন বিষয়ে ঐ এলাকার প্রধানত মুসলমান ব্যবসায়ীদের ঝোলানো পোস্টার, যেগুলো বরকতিবাবুর ঠিক উলটো কথা বলেছে। শেষমেশ গত সপ্তাহে দেখলাম একটা পোস্টারে বলা হয়েছে রাজনীতিকে মসজিদের বাইরে রাখা হোক। তারপরেই জানা গেল কয়েকদিন আগে মসজিদে ঢোকার মুখে বরকতিবাবুকে কিছু মুসলমান যুবক কয়েক ঘা দিয়েছেন। তারপর জানা গেল তার ইমাম পদটি গেছে।
মজার কথা আমাদের দক্ষিণপন্থীরা এখন বলতে শুরু করেছেন এটার কৃতিত্ব হিন্দুদের। মুসলমানরা এই রাজ্যটা দখল করে নিচ্ছিল। হিন্দুরা প্রবল প্রতিরোধ করেছে। তাতেই ঘাবড়ে গিয়ে নাকি মমতা এটা করালেন।
অর্থাৎ ডানদিকের বাবুরা মনে করেন মুসলমানদের মসজিদ, তাদের ইমাম — এসব তারা পরিচালনা করে না, তাদের নিজস্ব কোন মতামত নেই। বেশ কথা। তাহলে এরপর থেকে মুসলমানরা কেন প্রতিবাদ করে না এই কথাটা আর কখনো বলবেন না। মুসলমানরা যখন এতই ঠুঁটো জগন্নাথ তখন তারা আর প্রতিবাদ করবে কী করে? আপনারাই বলরাম হয়ে ওদের কাজগুলো করে দিন।
আরো অনুরোধ করি, হিন্দু প্রতিরোধের যখন এত শক্তি যে অন্য ধর্মের ইমাম বদলে দিতে পারে তখন নিজের ধর্মে নিশ্চয়ই আরো বড় বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে? তাহলে খাপ পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক না। সবর্ণ বিবাহের বিরুদ্ধে একটা হিন্দু প্রতিরোধ হোক। হিন্দুদের বাধ্য করুন পাত্র/পাত্রী চাই এর বিজ্ঞাপনে “caste no bar” লিখতে। রাজ্যে নাহয় আপনাদের ভাষায় মমতাজের সরকার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান — এসব রাজ্যে গোরক্ষকবাহিনীর মত একটা বাহিনী হোক না যারা দলিতদের কুয়োয় যারা কেরোসিন তেল ঢেলে দেয় তাদের বেদম পেটাবে। হিন্দু প্রতিরোধের শক্তিতেই তো এন্টি-রোমিও স্কোয়াড হয়েছে? তা ঐ শক্তি দিয়ে একটা এন্টি-হাঙ্গার স্কোয়াড করুন না। হিন্দু প্রতিরোধের এত শক্তি আর দেশের ৭৮% হিন্দুর একজনও যাতে খালি পেটে না ঘুমোয় তার ব্যবস্থা করতে পারবেন না? ২২% মুসলমানের কথা নাহয় না-ই ভাবলেন। তাদের তো এতবছর ধরে আমরা দেশদ্রোহীরা খাইয়েদাইয়ে মোটা করেছি। আপনাদের রাজত্বে নাহয় তারা না-ই খেল।

পূজার ছলে তোমায় ভুলে

যে লোক বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রাস্তায় নেমে এসে নেতৃত্ব দিয়েছে, রক্তকরবীর ভূমিকায় লিখেছে এই নাটক রূপক নয়, সরকারী গণহত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করেছে, কংগ্রেসের অধিবেশনের জন্য গান লিখেছে, নেতাজী কংগ্রেস ত্যাগে বাধ্য হওয়ায় রুষ্ট হয়ে গান্ধীজিকে চিঠি লিখেছে — সেই লোকের ছবি দেখিয়ে বাঙালি ছেলেমেয়েকে শেখায় “নম কর। ঠাকুর।” কোন বাঙালি? যে বাঙালি স্কুলের শেষ ধাপে থাকা ছেলেমেয়েকে পইপই করে শেখায় “কলেজে যাবে পড়াশোনা করতে, রাজনীতি করতে নয়”

rabindranath

একদা এক সহপাঠিনীকে আমার বেশ পছন্দ ছিল, প্রায় প্রেমে পড়ে যাই যাই অবস্থা। অন্য একজনের প্রতি আকর্ষণ প্রবলতর না হলে হয়ত প্রেমে পড়েই যেতাম সেইসময়। সে যা-ই হোক, সহপাঠিনীটির প্রতি আমার দুর্বলতার একটা বড় কারণ ছিল তার রবীন্দ্রপ্রীতি। মেয়েটিকে দেখতে বিলক্ষণ ভাল, আমার সাথে চিন্তাভাবনায় দিব্য মিল বলে মনে হত। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটির গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত চমৎকার লাগত। সে রবিবাবুর গল্প, কবিতা, উপন্যাসও গুলে খেয়েছিল। অতএব আমি ভীষণই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম একসময়। এখন ভেবে শিউরে উঠি, সত্যিই তার প্রেমে পড়ে গেলে কি দুর্দশাই না হত দুজনেরই।
অন্য অনেক হাফসোলপর্ব পেরিয়ে আমার গিন্নীর সাথে প্রেম, অতঃপর বিবাহের পরে ক্রমশ আবিষ্কার করলাম যে আমার সেই সহপাঠিনী আদ্যন্ত মুসলমানবিদ্বেষী। ভারতবর্ষ দেশটা যে হিন্দুদের এবং আর সকলেরই এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকা উচিৎ — এ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। জানতে পেরে শুধু অবাক নয়, রীতিমত আহত হয়েছিলাম। প্রেমিকা না-ই হল, বন্ধু তো বটে। এমন একজন মতের মানুষকে পরম বন্ধু ভেবে বসেছিলাম বুঝতে পারলে নিজের বোধবুদ্ধি সম্পর্কেই প্রশ্ন জাগে মনে। অবশ্য সেটা ২০১৪ গোড়ার দিক। অনেক কাছের লোককেই অচেনা লাগতে শুরু করার সময়। এখনকার মত অতটা গা সওয়া হয়নি তখনো ব্যাপারটা। কিন্তু অভ্যেস হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত আমার যেটা অবিশ্বাস্য লাগত সেটা হল রবীন্দ্রনাথে ডুবে থাকা একজন মানুষের মধ্যে মানবতাবোধের এরকম অভাব, ভারতীয়ত্ব সম্পর্কে এরকম একপেশে ধারণা কী করে জয়ী হয়?
পরবর্তীকালে আরো অনেকের সাথে মিলিয়ে দেখে যা বুঝলাম সেটা হল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের বাঙালিদের এত যে গর্ব, এত গদগদ ভাব — সব ভাঁওতা। রবীন্দ্রনাথকে আমরা বহুকাল হল বাদ দিয়েছি, পড়ে আছে এক ঠাকুর। লক্ষ্মীর পাঁচালি যেমন লোকে বুঝে বা না বুঝে গড়গড় করে পড়ে আমরা তেমন ওঁর গোটা কুড়ি গান আর ডজনদুয়েক কবিতা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিখি এবং পারফর্ম করি। কথাগুলো কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে না। ফলে যে প্রতিযোগিতায় ‘ভারততীর্থ’ আবৃত্তি করে প্রথম হয় সে রামমন্দির নির্মাণে করসেবা করতে অযোধ্যা চলে যায়। যে দিদিমণি রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় “বাংলার মাটি বাংলার জল” গায় সে মুসলমান ছাত্রীর এনে দেওয়া জল খায় না। আরো দেখলাম রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো বড় একটা কেউ পড়ে না। ফলে রবীন্দ্রনাথকে একজন অরাজনৈতিক, সাঁইবাবাসুলভ লোক বলেই বেশিরভাগ বাঙালি মনে করে।
কি আশ্চর্য! যে লোক বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রাস্তায় নেমে এসে নেতৃত্ব দিয়েছে, রক্তকরবীর ভূমিকায় লিখেছে এই নাটক রূপক নয়, সরকারী গণহত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করেছে, কংগ্রেসের অধিবেশনের জন্য গান লিখেছে, নেতাজী কংগ্রেস ত্যাগে বাধ্য হওয়ায় রুষ্ট হয়ে গান্ধীজিকে চিঠি লিখেছে — সেই লোকের ছবি দেখিয়ে বাঙালি ছেলেমেয়েকে শেখায় “নম কর। ঠাকুর।” কোন বাঙালি? যে বাঙালি স্কুলের শেষ ধাপে থাকা ছেলেমেয়েকে পইপই করে শেখায় “কলেজে যাবে পড়াশোনা করতে, রাজনীতি করতে নয়।”
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের শক্তি নন, আমাদের দুর্বলতা। যে কোন মধ্যমেধার চলচ্চিত্র পরিচালক বা নিম্নরুচির মেগা সিরিয়াল নির্মাতা একখানা লাগসই রবীন্দ্রসঙ্গীত গুঁজে দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে অন্তত পয়সা উঠে যাবে। লেখাপড়া জানা বাঙালিও এমন বিহ্বল হয়ে দেখবে যে মনে হবে ঋত্বিক বা সত্যজিতের ছবি দেখছে।
আসলে ভদ্রলোকের থেকে আমরা নিয়েছি লবডঙ্কা কিন্তু দিয়েই চলেছি — অবজ্ঞা। জেনে এবং না জেনে। “তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি”।

যারে কয় ব্যালান্স

মানে ব্যালান্স ব্যাপারটা কিরকম বুঝলেন তো? আইসিস অধ্যুষিত সিরিয়ায় দাঁড়িয়ে আমাকে বলতে হবে যে আমি ক্যাথলিক গোঁড়ামির তীব্র সমালোচক, নইলে ধরে নেওয়া হবে যে আমি আইসিসের নিন্দা করছি মুসলমান বিদ্বেষবশত। ওখানে তার শাস্তি কী জানেন তো? পিনারাই বিজয়ন আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যা করলে এখানে কোটিপতি হওয়ার অফার দেওয়া হয় আর কি। সিরিয়া এই জায়গাটায় আমাদের থেকে এগিয়ে আছে এখনো। ওদের কথা কম, কাজ বেশি

বাজারে একটা জিনিসের এখন দারুণ কাটতি — ভারসাম্য, বাংলায় আজকাল যারে কয় ব্যালান্স। সবেতেই ব্যালান্স রাখতে হবে। হিন্দুর বাঁদরামির নিন্দা করলেই মুসলমানেরও কোন একটা দোষ নিয়ে যারপরনাই গাল দিতে হবে, কোথাও দলিতদের বাড়িতে উঁচু জাতের লোকেরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে জেনে আমি যদি রেগে চিৎকার করি তাহলে সিগারেটের প্যাকেটের বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলতেই হবে যে দলিতরা যদি এরকম করত সেটাও অন্যায় হত। কোথাও কোন সাঁওতাল মেয়ের উপরে পুলিসী নির্যাতনের নিন্দা করলেই আমাকে বলতে হবে “যদিও আমি সাঁওতালদের দেশবিরোধী কার্যকলাপকে সমর্থন করি না” (মানে দেশটা আমার বাপের জমিদারী আর সাঁওতালরা আমার প্রজামাত্র এবং কোন সাঁওতাল সরকারবিরোধী কিছু করল মানেই মেয়ে-বউরা আমার বৈধ খাদ্য হয়ে গেল)। আমাকে আরো বলতে হবে যে আমি সবার সমানাধিকারের পক্ষে, কাউকে কোন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে। অর্থাৎ শিক্ষায় এবং চাকরিতে তফসিলি জাতি উপজাতির জন্য (আর ট্রেনে বাসে মহিলা ও বয়স্কদের ব্যাপারটা কী হবে?) আসন সংরক্ষণের বিপক্ষে। এই ভারসাম্য রক্ষা যদি আমি না করতে পারি তাহলেই আমি হিন্দুবিদ্বেষী/দেশদ্রোহী/মাওবাদী/সিকুলার। মনে রাখতে হবে এগুলো সমার্থক শব্দ।
মানে ব্যালান্স ব্যাপারটা কিরকম বুঝলেন তো? আইসিস অধ্যুষিত সিরিয়ায় দাঁড়িয়ে আমাকে বলতে হবে যে আমি ক্যাথলিক গোঁড়ামির তীব্র সমালোচক, নইলে ধরে নেওয়া হবে যে আমি আইসিসের নিন্দা করছি মুসলমান বিদ্বেষবশত। ওখানে তার শাস্তি কী জানেন তো? পিনারাই বিজয়ন আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যা করলে এখানে কোটিপতি হওয়ার অফার দেওয়া হয় আর কি। সিরিয়া এই জায়গাটায় আমাদের থেকে এগিয়ে আছে এখনো। ওদের কথা কম, কাজ বেশি।
তা এই যে জনগণ ব্যালান্স দাবি করছে আমার থেকে তা নিশ্চয়ই এই জন্যে যাতে আমাদের দেশের ব্যালান্স নষ্ট না হয়? তা দেখা যাক কিরকম ব্যালান্সের মধ্যে বাস করি আমরা।
দেশের ৭৫% এর বেশি যারা তাদের ধর্মীয় নেতারা গলা উঁচিয়ে বলবে অন্যদের যেন বাড়তে না দেওয়া হয়। “বড্ড বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ চারটে পাঁচটা করে বাচ্চার জন্ম দেওয়া যাতে আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকতে পারি।” মানে জনসংখ্যায় ব্যালান্স এসে যাচ্ছে বলে ভয় দেখানো এবং যেন না আসে তার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে বলা।
এরপরে আবার এদেশে ব্যালান্সের কথা বলা হয় কোন মুখে?
গেরুয়া পরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী জাগতিক দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসবে অনর্গল সাম্প্রদায়িক বিষ বমনের পর এবং তাকে বলা হবে জননেতা অথচ গৃহী মুসলমানকে বলা হবে “সাম্প্রদায়িক নেতা” যেহেতু তার গালে দাড়ি আর মাথায় ফেজ।
এই দেশে ব্যালান্স বজায় রাখতে হবে।
কারোর যথেষ্ট প্রমাণ না থাকতেও ফাঁসি হবে “সমবেত বিবেক” কে উপশম দিতে আর কেউ প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েও মন্ত্রী সান্ত্রী হবে, কোটি কোটি লোকের পূজনীয় হয়ে উঠবে। পঁচিশ বছর পর কাঠগড়ায় দাঁড়ালে লোকে এমন করবে যেন বেচারা ভগৎ সিং।
এই দেশে ব্যালান্স বজায় রাখতে হবে! আমরা কি নাগরিক না ট্রাপিজের খেলোয়াড়?
এক ভদ্দরলোক আবার সারাজীবন শীতকালে খোলামাঠে লাউডস্পিকারে গান গেয়ে পয়সা কামালেন, এখন লাউডস্পিকারে নামাজ শুনে ঘুমোতে পারছেন না। লোকে দ্বিচারিতাটা ধরে দিতেই ঝুলি থেকে ব্যালান্স বার করলেন — “গুরুদ্বার, মন্দির সবের কথাই বলছি। মসজিদে আপত্তি নেই, লাউডস্পিকারে আপত্তি।” মুম্বাই শহরে থেকে গণেশ চতুর্থীর হুজ্জত নিয়ে কিন্তু কোনদিন কিছু বলেছেন বলে অভিযোগ নেই। সেই সিরিয়ায় দাঁড়িয়ে ক্যাথলিকদের সমালোচনা আর কি। তবে এঁর চালাকিকে ব্যালান্স করার মত নির্বোধও তো আছে আমাগো দ্যাশে। তেমন একজনের কল্যাণে উনি এখন কামিয়ে কামানোর চেষ্টা করছেন। নাম কামাতে সফল হয়েছেন এর মধ্যেই, অনেকদিন পর। তবে পয়সা কামাতে হয়ত সফল হবেন না কারণ যে নির্বোধ দশ লাখ দেবে বলেছিল তার বোধহয় টাকা কম পড়েছে, তাই নতুন নতুন শর্ত দিচ্ছে। আসলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করতে হয় না তো (যাদের হয় তারা ফতোয়া দেয় না কারণ তাদের টাকার দাম আছে), তাই ব্যালান্স চেক করার অভ্যাসটা নেই।
একটা গোটা দেশের এহেন কেমিক্যাল ইমব্যালান্স নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।

নির্বাচিত ক্রোধ

অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে

taslima

১৯৮০ সালে মুক্তি পায় ‘হীরক রাজার দেশে’। অনেকেই মনে করেন ছবিটা ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়া। ওটা মুক্তি পাওয়ার সময়ে ভারতে “selective outrage” কথাটা চালু হয়নি। হয়নি বলেই কংগ্রেসিরা বা ইন্দিরা সমর্থকেরা প্রশ্ন তোলেনি “এমার্জেন্সির অত্যাচার নিয়ে ছবি করেছেন। ইংরেজের অত্যাচার নিয়ে ছবি করেননি কেন?”
“Selective” আর “outrage” দুটো শব্দই ইংরিজি ভাষায় থাকলেও পাশাপাশি বসিয়ে নতুন অর্থ দেওয়ার কথা সম্ভবত ১৯১৯ সালে ইংরেজদের মাথাতেও আসেনি। নইলে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করার পরে সরকার বাহাদুর বলতেই পারতেন “Where were you when Mughals killed Sikhs in Sikh-Mughal wars? Why this selective outrage?”
ভারতীয় দক্ষিণপন্থীদের এক অনন্য অবদান এই “selective outrage”। কী বাংলা হওয়া উচিৎ এর? “নির্বাচিত ক্রোধ?” আচ্ছা উন্মাদ ছাড়া কেউ কি সবেতেই রেগে যায়? নাকি সকলে একই জিনিসে ক্রুদ্ধ হন? আপনি কখনো কোন দক্ষিণপন্থীকে দেখেছেন ভারতে বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মুসলমান আর দলিতদের অস্বাভাবিক বেশি অনুপাত নিয়ে “outraged” হতে? পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মগুরুদের প্রভাব নিয়ে সরব হলেও গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় “outraged” হননি এরকম লোকেরাই তো এদেশে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। একেও কি “selective outrage” বলা উচিৎ? যাঁরা জাকির নায়েককে উস্কানিমূলক কথাবার্তার জন্য হাতকড়া পরাতে চান কিন্তু যোগী আদিত্যনাথকে একটা সুযোগ দিতে চান তাঁদের রাগকে কি নির্বাচিত ক্রোধের দলে ফেললে খুব অন্যায় হবে?
আসলে “outrage” বা ক্রোধ একটি মানবিক অনুভূতি, যা নির্ভর করে কোন বিষয়ে একজন মানুষের “opinion” বা মতামতের উপর। দক্ষিণপন্থীদের মত হল ভারতীয় মুসলমান এবং দলিতরা মায়ের পেট থেকেই পড়েই অপরাধী হয়ে যায়। সুতরাং অন্যদের চেয়ে তারা বেশি কারারুদ্ধ হবে, এতে আর ক্রুদ্ধ হওয়ার কী আছে? পাকিস্তান, বাংলাদেশের ধর্মগুরুরা অত্যন্ত রক্ষণশীল কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ হাইটেক প্রগতিশীল অতএব তাঁর কথা আলাদা — এই হচ্ছে তাঁর সমর্থকদের মতামত। সেইজন্যেই এনার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়েও এঁদের কোন outrage নেই। জাকির নায়েক যে ধর্মের লোক সে ধর্মের লোকেরা সন্ত্রাসবাদী হয় তাই তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা দরকার কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ যতই প্রকাশ্য সভায় বলে থাকুন যে “একজন হিন্দু মরলে আমরা এফ আই আর করতে যাব না, কম করে দশজন মুসলমানকে মারব”, তাঁর প্রশাসক হিসাবে একটা সুযোগ প্রাপ্য যেহেতু হিন্দুরা সন্ত্রাসবাদী হয় না, আজমের বিস্ফোরণে দোষী সাব্যস্ত হলেও “activist” হয়।
এই মতামতগুলো ভাল কি মন্দ, ন্যায় কি অন্যায় সে আলোচনায় যাচ্ছি না, কিন্তু দক্ষিণপন্থীদের ক্রোধও যে নির্বাচিত সেটা কিন্তু এ থেকে বোঝা যাচ্ছে। এবং সেজন্যে তাঁদের গাল পাড়ছি না কারণ তাঁদের মতামতানুসারেই তাঁরা ক্রুদ্ধ হবেন। সেটাই স্বাভাবিক। গাল পাড়ব মতামতগুলোর জন্য, নির্বাচিত রাগের মত কোন কাঁঠালের আমসত্ত্বের জন্য নয়।
অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে।
“শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে আছি কারণ আমি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু….” সেই নির্বাচিত ক্রোধের তত্ত্ব। ওঁকে কলকাতা থেকে যখন চলে যেতে বলা হয় তখন কিছু বলেনি কেন? এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। কোথায় ছিল এরা যখন তামিলনাডুর নাস্তিক এইচ ফারুককে হত্যা করা হল? খাগড়াগড় নিয়ে কবিতা লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? রোজ কত মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়, তসলিমাকেই কত হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়ে বলে না কেন?
“তখন বলেনি এখন বলছে কেন” যুক্তিটা কতটা খেলো সেটা আগেই বলেছি। দুরভিসন্ধিযুক্ত শাসক বা নিজের কুকীর্তি ঢাকতে ব্যস্ত কেউ ছাড়া অন্য লোক প্রতিবাদের বিরুদ্ধে এই যুক্তি খাড়া করে না। তসলিমা কেন করলেন সেটা ভাববার বিষয়। কিন্তু আর যা যা বলেছেন সেগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে।
এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কথাটা একশোভাগ সত্যি। এবার বলি, বেশ করে। এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে প্রথমেই মৌলবাদীরা যেটা করে সেটা হল তার ধর্মকে বিধর্মী আক্রমণ করেছে বলে চেঁচিয়ে মৌলবাদী নন এমন মানুষদেরও সহানুভূতি আদায় করা। তাই করেই মকবুল ফিদা হুসেনকে তাড়ানো হয়েছিল। তসলিমাও বেশ করেন কেবল মুসলমান মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। তিনিই বা কবে কালবুর্গি বা নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ব্যাপারে কড়া বিবৃতি দিলেন? উলটে বলেছিলেন কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রমাণ হয় না ভারত অসহিষ্ণু।
এবার তর্কের খাতির দূর করে বাস্তবে আসি। তসলিমা যথেষ্ট না জেনেই অভিযোগটা করে বসেছেন। শ্রীজাত ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লিখছেন। বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার বিরুদ্ধে তিনি এতটাই সরব ছিলেন যে কবীর সুমন তাঁকে মুসলমানবিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে প্রায় গালিগালাজ করেছিলেন ফেসবুকেই।
খাগড়াগড় নিয়ে লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? প্রশ্নগুলো এমন একজন করেছেন যিনি নাকি নিজে কবিতা লেখেন। অবাক লাগছে ভাবতে যে একজন কবি প্রায় রাজনৈতিক নেতার মত ভাষায় নির্ধারণ করতে চাইছেন কবিকে কোন কোন ঘটনা নিয়ে লিখতে হবে। কবি তা নিয়েই লিখবেন যা নিয়ে তাঁর লিখতে ইচ্ছা করে। কবি সাংবাদিক নন। এটা তসলিমা জানেন না? আর ধূলাগড়? একজনও মানুষ মারা গেছে ওখানে? একটিও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে? ঘরেদোরে আগুন ধরানো হয়েছিল। সেই সংক্রান্ত অপরাধে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিলকে তাল কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয় বলে জানি। সোশাল মিডিয়ার গুন্ডাদের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তসলিমাকে সেই দলে ফেলতে যে মন চায় না।
খাগড়াগড়? সে তো আরেক কান্ড। বিস্ফোরণের পর থেকে মৃত অভিযুক্তের নাম বদলাতে বদলাতে কোথা থেকে কোথায় যে গিয়ে পৌঁছেছে। হাজার হাজার ডক্টর হাজরা একেবারে। এন আই এ তদন্ত করছে, কয়েকজনকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, এদিকে যে নাকি নাটের গুরু সে গত ২৮শে মার্চ সিলেটে নিহত হয়েছে। এটা নিয়ে কবির কী লেখার ছিল বুঝলাম না। আচ্ছা একটা প্রতিপ্রশ্ন করি? এই যে কদিন আগে আজমের ব্লাস্টে দুই আর এস এস কর্মীর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হল, তসলিমার কি এই নিয়ে কিছু লেখা উচিৎ ছিল? যাক গে।
মন্দাক্রান্তাকে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে তসলিমা যা বলেছেন সেটা পড়ে হাসব না কাঁদব এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এরকম হুমকি তো কত মেয়েই পায়। এখন মন্দাক্রান্তা পেয়েছে বলে লোকে হৈ হল্লা করছে — এই হল তসলিমার খেদ। ঠিকই তো। ভারতে রোজ কত মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে, হঠাৎ নির্ভয়াকে নিয়ে সকলের অত চেগে ওঠার কী দরকার ছিল ভগবান জানে। বহু মেয়ে ধর্ষণের হুমকি পায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায়, চুপ করে যায়, অনেকসময় হুমকিবাজরা দেখিয়ে দেয় তারা মুখেন মারিতং জগৎ নয়। ধর্ষণের পর মেয়েটি আরো নীরব হয়ে যায়। মন্দাক্রান্তা সেনেরও উচিৎ ছিল চুপচাপ হয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে ফেসবুক ছেড়ে দেওয়া, অতঃপর দরজা জানালা এঁটে বাড়িতে বসে থাকা। এরকমটাই আপনার থেকে আশা করেছিলাম, তসলিমা দেবী। এই না হলে নারীবাদী?
আপনি চালিয়ে যান, ম্যাডাম। আপনি পুরো ব্যাপারটাকেই দাঁড় করালেন বুদ্ধিজীবী বনাম বুদ্ধিজীবী হিসাবে। আপনি শ্রীজাতর পাশে আছেন কিনা সেটা তো বড় কথা নয়, বড় কথা হল আপনি দাঙ্গাবাজের রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার পক্ষে না বিপক্ষে। সে ব্যাপারে আপনি একটা শব্দও খরচ করেননি। আপনার নীরবতা মুখর।

কয়েকটা প্রাসঙ্গিক লিঙ্ক

http://www.outlookindia.com/…/taslima-questions-sri…/1018138
http://m.economictimes.com/…/wont-…/articleshow/51564448.cms
http://twocircles.net/2014dec03/1417616083.html
http://www.timesnow.tv/…/mastermind-behind-2014-burdw…/58316

সাচ্চা মুসলমান

কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার সময়ে, কোন স্যারের ক্লাস করার সময়ে, কোন ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হওয়ার সময়ে আমি সতর্ক হয়ে তাঁদের মুসলমানত্ব খেয়াল করিনি কারণ তাঁরা আমার হিন্দুত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না। সরস্বতীপুজোর দিন আমি আর আমার বন্ধু মন দিয়ে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট সাঁটাচ্ছিলাম। ও মুসলমান হয়ে এই প্রসাদ খেয়ে ইসলামবিরোধী কাজ করছে কিনা এই গুরুতর সমস্যাটা নিয়ে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি

মহম্মদ শামির বউ কেন হিজাব ব্যবহার করেন না? মীর কেন সপরিবারে বড়দিন পালন করেন এবং অন্যদের শুভেচ্ছা জানান? এসব তো সাচ্চা মুসলমানের কাজ নয়।
এইসব কথাবার্তা শুনে যা বুঝছি, বহু মুসলমান বন্ধুর সাথে মেশা সত্ত্বেও, বহু মুসলমান মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, বহু মুসলমান অভিনেত্রীর প্রেমে পড়া সত্ত্বেও, বহু মুসলমান ক্রিকেটারের খেলা দেখা এবং প্রতিবেদন লেখায় যুক্ত থাকা সত্ত্বেও, মুসলমান কবিদের কবিতা পড়ে পাগল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখন অব্দি একজনও সাচ্চা মুসলমানকে আমি চিনি না। অবশ্য আমার দিক থেকে একটা বড় ভুল হয়েছে। কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার সময়ে, কোন স্যারের ক্লাস করার সময়ে, কোন ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হওয়ার সময়ে আমি সতর্ক হয়ে তাঁদের মুসলমানত্ব খেয়াল করিনি কারণ তাঁরা আমার হিন্দুত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না। সরস্বতীপুজোর দিন আমি আর আমার বন্ধু মন দিয়ে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট সাঁটাচ্ছিলাম। ও মুসলমান হয়ে এই প্রসাদ খেয়ে ইসলামবিরোধী কাজ করছে কিনা এই গুরুতর সমস্যাটা নিয়ে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি।
ম্যাকবেথ পড়ানোর সময়ে আমাদের মাস্টারমশাই শেক্সপিয়ারেই বুঁদ ছিলেন, আমার গায়ে পৈতে আছে কিনা সে ভাবনা ওঁর মাথায় আসেনি। আমিও ওঁর কন্ঠে উচ্চাকাঙ্ক্ষায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা একজন মানুষকেই খুঁজছিলাম। তিনি দিনে পাঁচবার নমাজ পড়েন কিনা এ প্রশ্নটা আমার মনে জাগেনি।
কি অদ্ভুতই না হত যদি ওয়াহিদা রহমান বোরখায় ঢেকে রাখতেন ঐ রহস্যময় সৌন্দর্য! কোন গীতিকারের মনেই আসত না পূর্ণিমার চাঁদের সংগে তাঁর তুলনা চলে। একবার ভাবুন, মহম্মদ রফি গানটা গাইতে গিয়ে যদি বলে উঠতেন “বলি হচ্ছেটা কী? ওয়াহিদার তো পর্দার নীচে থাকা উচিৎ। তার বদলে এসব কী ধ্যাষ্টামো? এই যে ভাই শাকিল, বলি তোমার কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই? নিজে মুসলমান হয়ে আরেকজন মুসলমান মহিলাকে নিয়ে এইসব গান লিখেছ? বলি নবীকে কী জবাব দেবে ভেবেছ?”
কান্ডটা সত্যিই ঘটলে আমি অন্তত কিছুটা দরিদ্র হয়ে থাকতাম। আমার বউ যখন রেগে যায় তখন তাকে মানানোর জন্যে যে যে গান বেসুরো গলায় গাই তা থেকে একটা কম পড়ে যেত। তা এই রফি সাহেব, ওয়াহিদা আর গীতিকার শাকিল বাদাউনি দেখছি সাচ্চা মুসলমান নন। নির্দেশক মহম্মদ সাদিক তো কাফের টাফের হবেন বোধহয়।
মধ্য কলকাতার এক বারে ভাল চিলি পর্ক পাওয়া যায়। আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে ঐ অপূর্ব জিনিসটি যিনি প্রথমবার খাইয়েছিলেন তাঁকেও দেখছি সাচ্চা মুসলমান বলা চলে না, যদিও ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর অনেক পড়াশোনা।
যা-ই হোক আমার জীবনে এরকম মেকি মুসলমানদের যা অবদান তাতে এদের সাচ্চাই নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না। গন্ডগোল পাকালেন আরেক মুসলমান। কাজী নজরুল নামের এই ভদ্রলোক বেশকিছু রসোত্তীর্ণ শ্যামাসংগীত লিখে বসে আছেন। অতএব এনাকেও ঐ মেকিদের দলেই ধরেছিলাম। তারপর দেখি ও বাবা! “ক্ষমা কর হজরত” বলে একখানা কবিতাও লিখেছেন। সে কবিতাটা পড়লে কেমন যেন যারা শামি আর মীরের পেছনে লেগেছে তাদেরকেই মেকি মুসলমান বলে মনে হচ্ছে যে! কি বিপদ!
তারপর ভাবলাম, যাকগে! এসব ওদের ধর্মের ব্যাপার। হিন্দুরা কিন্তু এরকম গোলমেলে নয়। হিন্দুরা ভীষণ উদার। এই যে সবাই মিলে চার হাত পা তুলে সান্টাক্লসের টুপি মাথায় দিয়ে বড়দিন পালন করছে, এতে একজনও কিছু বলেছে? বলেনি তো। এই ভেবে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে গিয়ে বিষম টিষম খেয়ে একাক্কার।
আসলে ফোনে ফেসবুকটা খোলা ছিল। এক বন্ধুর ওয়ালে দেখলাম কোন অভিনেত্রী নাকি টিভি সিরিয়ালে পার্বতী সাজে। সে বেড়াতে গিয়ে কেন বিকিনি পরেছে তাই নিয়ে বহু হিন্দু গোঁসা করেছে। তারপর দেখি সঈফ-করিনা কেন ছেলের নাম তৈমুর রেখেছে তা নিয়ে অনেক হিন্দুর অনেক বক্তব্য। কয়েকটি বরাহনন্দন আবার ঐ দুধের শিশুর ক্যান্সার কামনা করেছে। তারপরে আরো দেখলাম ইরফান পাঠানের ছেলে হওয়ায় কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছে “ভাই, ছেলের নাম কিন্তু দাউদ বা ইয়াকুব রেখো না।”
গর্বে বুকটা ফুলে উঠল, চোখে জল এসে গেল। বুঝলাম সব ধর্মের ইতরদের শ্রেষ্ঠ মিলনতীর্থ আমাদের এই ভারতবর্ষ। সম্যক বুঝলাম রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, নেহরু, আম্বেদকর, মৌলানা আজাদ — সব্বাই ভুল। সবার উপরে ডি এল রায় সত্য তাহার উপরে নাই। “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।”

যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়

যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা আলাদা করে বলেন তাহলে বলি ভারতবর্ষে ঐ অপরাধে কঠোর শাস্তি কারোরই হয় না। উল্টে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোক হলে নায়ক হয়ে যাওয়া যায়, মন্ত্রীও হওয়া যায়। বলুন তো বাল ঠাকরে শিয়া না সুন্নি? বাবু বজরংগি কি মুসলমান? মায়া কোদনানি? জগদীশ টাইটলার? সজ্জন কুমার? লালকৃষ্ণ আদবানি? উমা ভারতী?

আমি হিন্দু। কিন্তু আমি আজহারের ব্যাটিং দারুণ ভালবাসতাম। ও ফিক্সিং করেছে শুনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। মহম্মদ রফি আমার খুব ভাল লাগে, অনেকসময় কিশোরের চেয়েও বেশি। বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। আমার অনেক মুসলমান বন্ধু আছে। অতএব প্রমাণিত হল যে আমি সাম্প্রদায়িক নই। সুতরাং আমি একথা বলতেই পারি যে আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকে সব রাজনৈতিক দলই সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছে। সবেতেই ওদের বেশি সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, ওদের দোষগুলো সব ঢেকে রাখা হয়। এখনো ওরা যা ইচ্ছে মারদাঙ্গা করে, তাতে দোষ হয় না। মিডিয়া পর্যন্ত ওদের দোষ চেপে দেয়।

উপর্যুক্ত কথাগুলো যদি আপনার মনের কথা হয় তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি মোটেই অসাম্প্রদায়িক নন। বরং আপনি যুক্তি বা তথ্যের ধার না ধারা একজন মানুষ যিনি আবেগ দিয়ে সবকিছু বিচার করেন। আর্থসামাজিক মানদন্ডগুলোর প্রায় সবকটাতে মুসলমান সম্প্রদায় দেশের সবথেকে পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়। সরকারী চাকরিতেও। আমি বলছি না। ভারতের একমাত্র প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ পার্টির মন্ত্রী সংসদে বলেছেন। এই দেখুন https://www.google.co.in/…/muslim-working-proportion…/lite/…

এই যখন ঘটনা তখন সংখ্যালঘু তোষণটা হল কখন আর তার সুবিধাটা পেল কে?
এই যে বলছেন ওরা মারদাঙ্গা করলে কোন দোষ হয় না সেই নিয়েও বলা যাক তাহলে। ২০০১ এর জনগণনা অনুযায়ী আমাদের জনসংখ্যার ১৩% মুসলমান অথচ ঐসময়ে বিভিন্ন জেলে বন্দী ছিল যারা তাদের ২২% মুসলমান। নিজেই পড়ে দেখুন http://m.timesofindia.com/…/Muslim…/articleshow/45253329.cms

যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা আলাদা করে বলেন তাহলে বলি ভারতবর্ষে ঐ অপরাধে কঠোর শাস্তি কারোরই হয় না। উল্টে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোক হলে নায়ক হয়ে যাওয়া যায়, মন্ত্রীও হওয়া যায়। বলুন তো বাল ঠাকরে শিয়া না সুন্নি? বাবু বজরংগি কি মুসলমান? মায়া কোদনানি? জগদীশ টাইটলার? সজ্জন কুমার? লালকৃষ্ণ আদবানি? উমা ভারতী?

এবার আসুন মিডিয়ার কথায়। প্রথমত মিডিয়া কোন একটি সংস্থা নয়। প্রত্যেক মিডিয়া হাউসের নিজস্ব মতামত, কার্যপদ্ধতি, স্বার্থ আছে। সকলেই সেই অনুযায়ী খবর পরিবেশন করে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে সেটাকেই বোঝায়। ফলে খবরের সত্যতা যাচাই না করে যা ইচ্ছে লিখে, দেখিয়ে বাজার গরম করে এমন কাগজ এবং চ্যানেল যেমন আছে তেমনি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমও আছে। ভারতীয় সাংবাদিকতার যে অবনমন হয়েছে তা নিয়ে আজ কোন ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। তবু এখনো প্রায় সব কাগজ বা টিভি চ্যানেলই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কয়েকটা নিয়ম মেনে চলে। যেমন কোন সম্প্রদায়ের লোক কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ করেছে তা উল্লেখ না করা, কাদের বেশি ক্ষয়ক্ষতি, কাদের কম এসব আলোচনা না করা, সর্বোপরি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পরিস্থিতি যতক্ষণ না প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে ততক্ষণ তেমনভাবে রিপোর্টই না করা। কারণ দেখা গেছে তাতে উত্তেজনা নতুন নতুন এলাকায় ছড়ায় এবং দাঙ্গাবাজদের কাজ সহজ হয়। আজকাল অবশ্য অনেকেই মনে করছেন সোশাল মিডিয়ার এই যুগে এই পদ্ধতি অচল। এতে বরং যা নয় তাই গুজব ছড়ানোর ফাঁকা ময়দান তৈরি হয়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু মনে রাখবেন মিডিয়া দেখাচ্ছে না মানে কিন্তু শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরুদের কুকর্মগুলোও চাপা পড়ে থাকছে। আপনি হোয়াটস্যাপে যে ভিডিওটা দেখে লাফাচ্ছেন সেটাই একমাত্র সত্য নয়।
এত কথা বলছি মানে যে আমি আপনাকে দাঙ্গাবাজ বলছি তা নয়। এমন হতেই পারে যে আপনি যা বলছেন সরল বিশ্বাস থেকেই বলছেন। মানে আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে কথাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়। আমি আপনার সেই বিশ্বাসটাকেই প্রশ্ন করছি। ভেবে দেখুন তো আপনি সেই জার্মানদের মত হয়ে যাচ্ছেন না তো যারা নাজিদের এই প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করেছিল যে ইহুদীরাই জার্মানির সমস্ত দুর্দশার কারণ? তারপর কী হয়েছিল সেটা ইতিহাস। রক্তাক্ত, লজ্জাকর ইতিহাস। সে ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন না তো? জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়, তারা অভিশপ্ত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তারা করবেই।”

সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক

সে তখন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমান প্রধান এলাকার গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। চাকরিটা নিয়েছিল কলেজের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত নমো নমো করে করবে বলে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ওকে এমনভাবে ভালবাসায় বেঁধেছে যে ও পড়েছে দোটানায়। আমাকে ফোন করার কারণ ঐ স্কুলের পরিচালন সমিতির দুর্নীতি। স্কুলের উন্নয়নের জন্য আসা সরকারী টাকা অন্য খাতে খরচা করা হচ্ছে। প্রধানশিক্ষক ভাল মানুষ, পণ্ডিত। কিন্তু ঐ গ্রামেরই বাসিন্দা। ফলে জলে থেকে কুমীরের সাথে বিবাদ করতে ভয় পান। সেই সুযোগে স্কুলের উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুনেছে আমি সাংবাদিক। তাই ফোন করেছে। যদি কাগজে এই দুর্নীতির খবর ছাপা যায়, দোষীদের শাস্তি হয়

৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২ এবং তারপরের কয়েকদিন এখনো ছবির মত মনে আছে। খুব চেনা কোন কোন মানুষের ভেতরের পশুকে সেই প্রথম দেখতে পেয়েছিলাম। আমার বয়স তখন দশ। বড় হওয়ার গতিটা ঐ বয়সে বাড়তে শুরু করে। বলা যায় ৯২-৯৩ সালের ঐ দিনগুলো সেই গতিটাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এর প্রায় ছবছর পরে, ২৬শে জুলাই, ১৯৯৮ আমি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হই। আবাসিক কলেজ হওয়াতে বাড়ি ছেড়ে নিজ দায়িত্বে থাকার সেই শুরু। তার আগে ধর্মের আমার জীবনে কোন দৈনন্দিন ভূমিকা ছিল না। বাবা নাস্তিক, মা আস্তিক হলেও নিয়মিত পূজার্চনার পাট ছিল না বাড়িতে। রামকৃষ্ণ মিশনের ধর্মীয় পরিবেশ যে আমার বিশেষ ভাল লাগত না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দেদার আড্ডা দেওয়ার সুযোগ সে অস্বস্তি ভুলিয়ে দিত। কিছুটা সেইজন্যেই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজের তিনবছরও দিব্যি ওখানে কাটিয়ে দিয়েছি।
ঘটনাচক্রে বিদ্যামন্দিরে আমার পাঁচ বছর বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রথম এনডিএ সরকারের পাঁচ বছরের মধ্যেই পড়ে। সব ব্যাপারেই ধর্মের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা তখন শুরু হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও ধর্ম নিয়ে, ধর্মের ঝান্ডাধরা রাজনীতি নিয়ে প্রচণ্ড তর্কবিতর্ক হত। অবশ্য তখন মতান্তর মানেই মনান্তর ছিল না। যা-ই হোক আমার এক সহপাঠী ছিল যে মুসলমানদের দুচক্ষে দেখতে পারত না। সে বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসা হিন্দু। তাকে আমি এবং আরো কয়েকজন কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারতাম না যে তার মত অভিজ্ঞতা অনেক মুসলমানেরও বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। তার মানে যেমন সব হিন্দু খুনে নয়, তেমনি সব মুসলমানও তার পরিবারের উপর অত্যাচার করা লোকেদের মত নয়। সে কিছুতেই মানত না। সে ঘুরেফিরেই বলত “ওরা ঐরকমই”। ২০০৩ এ কলেজ ছাড়ার পর থেকে আর তার সাথে যোগাযোগ নেই।
২০১০ সালের এক সকাল। নাইট ডিউটি করে এসে আমার তখন মাঝরাত। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। আমার পেশায় এরকম হলে প্রথমেই লোকে ভাবে বসের ফোন। চাকরিটা গেছে হয়ত। আমি সেকথা ভেবেই ধড়মড়িয়ে উঠে ফোনটা ধরেছি। দেখি অজানা একটা নম্বর। বসের ফোন নয় যখন তখন কেটে দেব ভেবেছিলাম। তারপর মনে হল মিটিয়ে দেওয়াই ভাল, নইলে আবার করতে পারে। কথা বলতে গিয়ে দেখি এ আমার সেই বন্ধু।
আমার বন্ধু প্রতিবাদ করতে গিয়ে গালাগালি খেয়েছে ছাত্রছাত্রীদের সামনে। আমাদেরই কোন সহপাঠীর থেকে। সে তখন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমান প্রধান এলাকার গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। চাকরিটা নিয়েছিল কলেজের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত নমো নমো করে করবে বলে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ওকে এমনভাবে ভালবাসায় বেঁধেছে যে ও পড়েছে দোটানায়। আমাকে ফোন করার কারণ ঐ স্কুলের পরিচালন সমিতির দুর্নীতি। স্কুলের উন্নয়নের জন্য আসা সরকারী টাকা অন্য খাতে খরচা করা হচ্ছে। প্রধানশিক্ষক ভাল মানুষ, পণ্ডিত। কিন্তু ঐ গ্রামেরই বাসিন্দা। ফলে জলে থেকে কুমীরের সাথে বিবাদ করতে ভয় পান। সেই সুযোগে স্কুলের উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুনেছে আমি সাংবাদিক। তাই ফোন করেছে। যদি কাগজে এই দুর্নীতির খবর ছাপা যায়, দোষীদের শাস্তি হয়।
আমি তাকে বোঝালাম যে বহু গ্রামের স্কুলেই এই জিনিস ঘটে। ফলে বেশ বড় অংকের আর্থিক দুর্নীতি না হলে কাগজ ছাপতে রাজি হবে না। যদি হয়ও, শাস্তি দেওয়া তো কাগজের হাতে নয়। প্রশাসনিক নড়াচড়া না হলে দোষীদের রোষ এসে পড়বে ওরই উপরে। তাতে ওর ভীষণ বিপদ ঘটতে পারে। তাতে সে আমায় বলল “ঠিকই বলেছিস। কো এড স্কুল তো। কখন কি বদনাম দিয়ে দেবে! কিন্তু দুঃখটা কী জানিস তো? এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা কি গরীব তুই ভাবতে পারবি না। এত গরীব আমি তুই চোখে দেখিনি। তাদের জন্য স্কুল। কত কষ্ট করে একটু লেখাপড়া করে এরা। অধিকাংশ মুসলমান আর কিছু আদিবাসী। এদের জন্য সরকারের স্কিম আছে। সেই টাকা ছোটলোকগুলো মেরে নিচ্ছে! আমার আর কি? নেট পাশ করে গেছি, বেশি পেছনে লাগলে চলে যাব। কিন্তু এই ছেলেমেয়েগুলোর কী হবে বল তো, প্রতীক?” আমি পরামর্শ দিলাম গোপনে ডি আই প্রমুখের সাথে যোগাযোগ করতে। বন্ধু বারবার বলে গেল ছেলেমেয়েগুলো কত কষ্ট করে, ঐ গ্রামের লোককে কি প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বেঁচে থাকতে হয়। গ্রামের সরল সোজা মানুষের উপর মাতব্বররা কিভাবে ছড়ি ঘোরায় সেকথাও বলল। কিন্তু একবারও বলল না “মুসলমান তো। ওরা ঐরকমই।”
বন্ধুটি ধর্মান্ধ — এই ধারণা নিয়েই কলেজ ছেড়েছিলাম। সেদিন ভুল প্রমাণিত হলাম। সেই আনন্দে আমার সেই সকালে আর ঘুম এলো না

মৌলবাদী বনাম মৌলবাদী

এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে

বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে অত্যাচার হলে বোধহয় সবচেয়ে উল্লসিত হয় ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। কারণ তখন ওটা দেখিয়ে তারা বলতে পারে “কিছু বাঞ্চোদ তবুও বলবে ভারতে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে” (ভাষাটা দেখে কেউ নাক সিঁটকোবেন না দয়া করে। এই ভাষাতেই ওরা লেখে এগুলো)। কদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মন্দির, বিগ্রহ ভাঙা হয়েছে। হিন্দুবাড়িতে লুঠতরাজ, খুন, জখম ইত্যাদি করা হয়েছে। সেই ঘটনা নিয়েও উপরে যেমন বললাম তেমন পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। যে মানসিকতা নিয়ে এই জাতীয় পোস্ট করা হয় তারমধ্যে অনেকগুলো মনুষ্যেতর যুক্তি কাজ করে। যেমন:

১) হিন্দুরা করলেই দোষ হয়ে যায়। এখন যে ওরা (মুসলমানরা) করছে!

২) আমরা তো এখনো কিছুই করিনি (দাদরি ফাদরি ভুলে যান)। দেখাব মজা, দাঁড়াও না (অর্থাৎ গোটা দেশটাকে গুজরাট বানিয়ে দেবো। যদিও বলার সময় বলব গুজরাট নিয়ে মোদীকে মিথ্যে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত নির্দোষ ঘোষণা করেছে, ইত্যাদি)।

৩) আমাদের দেশের পাকিস্তানী এজেন্টগুলো (মানে কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং কিছু সাংবাদিক যারা এখনো সংঘচালিত নয়) বাংলাদেশ, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার নিয়ে তো কিছু বলে না। যত দরদ খালি মুসলমানদের জন্য, না? কই বাংলাদেশের কেউ তো হিন্দুদের জন্য চোখের জল ফেলছে না, এদের এত মড়াকান্না কিসের জন্য?

এক এক করে উত্তর দেওয়া যাক।

১) দোষ হিন্দুরা করলেও হয়, মুসলমানরা করলেও হয়। পৃথিবীর কোথাও এমন আইন আছে শুনেছেন যে খুনীকে মাপ করে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে আরো অনেকে খুন করেছে? এই যুক্তি একমাত্র সে-ই দেখায় যার উদ্দেশ্যই খুন করা।

২) এই যে তুলনামূলক আলোচনা করে বলছেন আমরা সহিষঞু, এতেই আপনারা নিজেরাই প্রমাণ করছেন সহিষঞু নন। তর্জনী উঁচিয়ে বলছেন “খবরদার অসহিষঞু বলবি না। কিছুই তো করিনি এখনো।” এ সেই সুকুমার রায়ের কবিতা হয়ে গেল “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে। সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে এমন ভয় পেলে।” কবিতাটা পড়ে যেমন সবাই হাসে, আপনাদের কথাবার্তাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত আপনাদের হাতে ক্ষমতা না থাকলে। বস্তুত নেহরু এবং প্যাটেল আপনাদের হেসেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং সেটাই ভুল হয়েছিল।

৩) এবার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে আসা যাক। প্রথমত, “পাকিস্তানী এজেন্ট” কথাটা ভীষণ বোকাবোকা। চীনা এজেন্ট বললে তাও ভেবে দেখা যেত। পাকিস্তান ভারতের রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক — এদের হাতখরচই দিয়ে উঠতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অগ্রগণ্য সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিলক্ষণ লেখালিখি, আলাপ আলোচনা হয়। আপনারা যথারীতি সেটা চেপে যান। রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে সময়ে ওদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলে। নিঃসন্দেহে এদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যতটা বলে ততটা বলে না। কেন বলবে? দলগুলো এদেশের। সংবিধান তাদের এদেশের মানুষের ভালমন্দের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এদেশের মানুষের দুর্দশা নিয়ে হইহল্লা না করে সারাক্ষণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে? মৌলবাদী মস্তিষ্ক ছাড়া এরকম চিন্তার উর্বর ক্ষেত্র পাওয়া মুশকিল।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খবর আপনি জানছেন
কি করে? জানাচ্ছে তো সেদেশের সংবাদমাধ্যম। সেগুলো চালায় কারা? সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংবাদিক কারা? সেদেশের মুসলমানরা। হিন্দুদের আক্রমণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বাকস্বাধীনতার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সামনের সারিতেই আছেন মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা। কতজনের প্রাণ গিয়েছে, কতজন দেশছাড়া হয়েছে জানেন না? নাকি না জানার ভান করছেন?
চতুর্থত, সাধারণ মানুষের কথা যদি বলেন, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ঘটনার পরেও দেখলাম ফেসবুকে সবচেয়ে সরব আমার বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধুরাই। আমি তো ঘটনাটার কথা প্রথম জানলাম তেমন এক বন্ধুর দেয়াল থেকেই। বন্ধুর কোন দেশ হয় না, ধর্ম হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে বন্ধুদের এই দুটো পরিচয় উল্লেখ না করে উপায় থাকল না, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। শাহবাগে দিনের পর দিন যারা মৌলবাদীদের শাস্তির দাবিতে হত্যে দিয়ে পড়েছিল তাদের অধিকাংশও মুসলমান। আমার অন্তত একজন বন্ধু তার মধ্যে ছিল, একথা বলতে আমি গর্ববোধ করি।
এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন। কারোর দিকে আঙুল তোলা আমাদের সাজে না।

শিয়রে শমন

বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এর পর থেকে বরাবরই ভারতে দারিদ্র্য ছিল, দুর্নীতি ছিল, অশিক্ষা ছিল, জাতের নামে বজ্জাতি ছিল, ধর্মান্ধতা এবং তজ্জনিত হিংসা ছিল । তবু যে ভারত পাকিস্তানের মত সর্বৈব ব্যর্থ এবং সন্ত্রাসবাদীচালিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি তার বড় কারণ — আমরা সেনাবাহিনীকে ব্যারাকের বাইরে এবং ধর্মগুরুদের ধর্মস্থানের বাইরে আসতে দিইনি । এক কথায় আমাদের সরকার, প্রশাসন কারোর গুরুর কথায় চলেনি, কোন সেনাপ্রধানের কথাতেও চলেনি ।
কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা যাবে কোথায় ? সেই স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে এক শ্রেণীর ভারতীয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা “ওরা পাকিস্তান বানিয়েছে, আমরা হিন্দুস্তান বানাব । উন্নত, ভাল দেশ হওয়ার দরকার নেই । পাকিস্তানের উল্টোপিঠ বানানো চাই ।” এই দাবি হতভাগা মহাত্মা গান্ধী আর তার চ্যালাচামুন্ডারা বানচাল করে দিয়েছিল । সেই রাগে ব্যাটাকে সাবড়ে দিয়েও লাভ হয়নি । গান্ধীর পয়লা নম্বর চ্যালা নেহরু আর পয়লা নম্বর বিরোধী আম্বেদকর তো বটেই এমনকি দেশের অন্য পার্টিগুলোও হিন্দুস্তানের দাবিকে পাত্তাই দেয়নি । শেষ অব্দি তাই এরা নিজেরাই একটা পার্টি বানিয়ে নেমে পড়ল । তা অনেকবছর ঘষটানোর পরে বছরদুয়েক হল বেশ হাত পা ছড়িয়ে গ্যাঁট হয়ে এরা সরকারে বসতে পেরেছে আর বসেই শুরু হয়ে গেছে হিন্দুস্তান নির্মাণ । তারই এযাবৎ সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা হল নাগা সাধুকে বিধানসভায় বাণী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ।
জ্ঞানের সাগর বাবা সেখানে বলেছেন ধর্ম আর রাজনীতি হল স্বামী স্ত্রীর মত । তাই স্ত্রীকে স্বামীর কথা শুনে চলতেই হবে । নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট ।তাঁদের আপত্তি বাবার নগ্নতা এবং যে রূপকটা ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়ে । কিন্তু সেসবের চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক বাবা যা বলেছেন তার নিহিতার্থ । “রাজনীতিকে ধর্মের কথা শুনে চলতেই হবে ।” অর্থাৎ সংবিধান ভুলে যান । ভারতকে বিজেপি বাবার সম্পত্তি করবার দিকে এগোচ্ছে । আইনসভায় একজন ধর্মগুরুর বক্তৃতা দেওয়ার কোন অধিকারই যেখানে নেই সেখানে একজন এসে বক্তৃতা তো দিলই আবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বলে দিয়ে গেল “এখন থেকে আমরা যা বলব তাই শুনে চলতে হবে ।” জল যে আমাদের গলা অব্দি উঠে এসেছে বুঝতে পারছেন কি ? এরপরে দাবিদাওয়া নিয়ে এমপি এমএলএ নয়, হরিসভায় ছুটতে হবে । গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণ শুরু হয়েছে । বাবার নগ্নতা আসলে প্রতীকি ।
বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে ।
আপনি নির্ঘাৎ বলবেন “জৈনরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । তাদের গুরুকে ডেকে আনা একটি ধর্মনিরপেক্ষ পদক্ষেপ । এতে হিন্দুত্ববাদীদের চক্রান্ত দেখা অন্যায় এবং হাস্যকর ।” যদি বলেন তাহলে আপনি হয় গোবেচারা নয় হাড়েবজ্জাত কারণ জৈনরা সংখ্যায় কম হলেও প্রচন্ড প্রভাবশালী । আপনি চোখ বুজে এক মিনিটে ভারতের যে কজন ধনী লোকের নাম মনে করতে পারবেন তাদের অধিকাংশ জৈন । আর জৈন সম্প্রদায়ের গুজরাতি, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল । মমতা হাওয়ার মধ্যেও বড়বাজারে বিজেপি কত ভোট পেয়েছিল খোঁজ নিয়ে দেখুন না । জৈন বলতেই যদি আপনি মহাবীর প্রতিষ্ঠিত সেই ব্রাক্ষ্মণ্যবাদবিরোধী ধর্মের কথা এখনো ভাবেন তাহলে আপনি ঘুমোচ্ছেন । শিগগির জাগুন ।
এত কথার পরে বলবেন না “ভারত হিন্দুস্তান হয়ে গেলে ক্ষতি কী ?” উত্তরে ধর্মনিরপেক্ষতা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে অনেক কথা বলা যায় । আমি সেসব বলব না । শুধু অনুরোধ করব একবার গুগল করে ১৯৭০-৮০র ইরান, লেবানন, আফগানিস্তান এইসব দেশের ছবি (আলোকচিত্র) দেখুন । তারপর এখনকার ছবিগুলো দেখুন ।

প্যারিসের শিক্ষা

যদি ভুল করে সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেও ফেলেন তো “these murderers are being funded from the middle east” অব্দি বলে থেমে যাবেন। সৌদি আরবের নাম করতে যাবেন না। ওদের নাম করলেই আবার আমেরিকার নাম চলে আসবে। মনে রাখবেন ও দেশে অনেক ভারতীয় যায় এবং আরও অনেকে যেতে চায়। অতএব ঐ দেশটা ধোয়া তুলসীপাতা

প্যারিসে নারকীয় সন্ত্রাসবাদী হানার পর ৪৮ ঘন্টা অতিক্রান্ত। ইতিমধ্যে অনেক কিছু শিখলাম। দেখুন তো ঠিক শিখেছি কি না ।
১) হিন্দুরা ভারতীয় বা বাংলাদেশি বা পাকিস্তানী। খ্রিস্টানরা ফরাসী, ইংরেজ, ওলন্দাজ, চীনা, জাপানী ইত্যাদি। কিন্তু মুসলমানরা সবাই মুসলমান। অতএব তাদেরই দায়িত্ব ইসলামিক স্টেটকে নিকেশ করা। বসিরহাটের ভাতডালখেকো মুসলমান যদি বলে “মশাই আমি ছা পোষা বাঙালি। জীবনে কলকাতা ছাড়া অন্য শহর দেখিনি। আমি ইরাক, সিরিয়ায় কি হচ্ছে তার কি করব?” সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে পাশের অমুসলমান লোকটাকে বলতে হয় “দেখেছেন কিরকম সেয়ানা! মুসলমান আবার বাঙালি”। তারপর ফেসবুকে লিখতে হবে “this tendency to live in denial is the bane of Islam” ইত্যাদি।

২) হিন্দুরা হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে কিন্তু বুঝতে হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বা পয়সা খেয়েছে। তাছাড়া কি এমন হয়েছে যে “হিন্দু মৌলবাদ” বলে চেঁচাতে হবে? আগে আই এসের মত লন্ডন, প্যারিসে শ’দুয়েক লোক মারুক। তখন দেখা যাবে।

৩) মুসলমানদের চেয়ে হিন্দু এবং খ্রিস্টানরা ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করে। কোরানের কোন্ অনুচ্ছেদে বা কোন্ হাদিশে লোকের মুন্ডু কাটতে বলা আছে তা বেশিরভাগ অমুসলমানেরই ক্লিকস্থ।

৪) ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের উৎস কোথায়, তার মদতদাতা কারা — এইসব আলোচনায় যাওয়া যাবে না। কারণ এইসব আলোচনা করা মানেই আপনি জেহাদি অথবা সিপিএম। নিদেনপক্ষে কংগ্রেস। আগামী বছর ভোটে দাঁড়াচ্ছেন; তাই এখন থেকে সংখ্যালঘু ভোট যোগাড়ে লেগেছেন।

৫) যদি ভুল করে সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেও ফেলেন তো “these murderers are being funded from the middle east” অব্দি বলে থেমে যাবেন। সৌদি আরবের নাম করতে যাবেন না। ওদের নাম করলেই আবার আমেরিকার নাম চলে আসবে। মনে রাখবেন ও দেশে অনেক ভারতীয় যায় এবং আরও অনেকে যেতে চায়। অতএব ঐ দেশটা ধোয়া তুলসীপাতা। ওদের এসব নোংরা অপবাদ দেওয়া বামপন্থীদের চক্রান্ত। ভুলে যাবেন না, যদিও কোনদিন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসেনি, তবু ভারতবর্ষের আজকের অবস্থার জন্যে ওরাই দায়ী। পৃথিবীর যেখানেই ওরা ক্ষমতায় ছিল সেখানেই মানবাধিকার বলে আর কিছু রাখেনি। তেমনই একটা দেশ আফগানিস্তান। সেদেশকে মুক্ত করতে আমেরিকার অবদান ভুলে গেলে চলবে না। তারাই তালিবানদের সাহায্যে ….
এই রে! না না আমি কিছু বলিনি। নমস্কার নমস্কার।