দুটো বই নিয়ে দুটো কথা

যুগ বলছে নিজের ঢাক নিজেই পেটাও, নইলে কেউ শুনবে না। কিন্তু চক্ষুলজ্জা বলে একটা জিনিস আছে তো। তাই নিজের ঢাকের সাথে বন্ধুর ঢাকও পিটিয়ে নেওয়া গেল। মৃণাল শতপথী আর আমার বই নিয়ে দুজনের আলোচনা। তুলিরেখা ভিডিওটা তুলে সম্পাদনাও করে না দিলে অবশ্য সম্ভব হত না। আগ্রহীরা দেখবেন এবং মন্তব্য করবেন আশা রইল।

যে কথা ভিডিওতে নেই: কলকাতা বইমেলায় মৃণালের বই পাওয়া যাচ্ছে স্টল নং ৩৪৬ এ, আমারটা ৩২৭ এ।

ভ্রম সংশোধন: ভিডিওতে এক জায়গায় জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন মেগা কালচারগুলোর কথা বলেছি। মেগা কালচার মানে যে ভাষায় দশ লক্ষের বেশি লোক কথা বলে তেমন ভাষার সংস্কৃতির কথা বলেছি। ভুলটা আমারই। যে বিজ্ঞানী বন্ধু ব্যাপারটা আমাকে বলেছিল সে সংখ্যাটা মিলিয়নে বলেছিল। আমি লক্ষে পরিবর্তন করতে গিয়ে গুবলেট করেছি। সংখ্যাটা আসলে অনেক বেশি

দিলীপবাবুর দান

তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না

jd

মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কাছ থেকে ঠিক কী পাই আমরা? শিক্ষা বললে বোধহয় উত্তরটা দায়সারা হয়। কারণ শিক্ষা শুধু তাঁরাই দেন না। বাবা-মা দেন, আত্মীয়রা দেন, বন্ধুবান্ধবও নিজের অজান্তেই ভাল মন্দ নানারকম শিক্ষা দেয়। কিন্তু সেই সব শিক্ষাই যে আমাদের মনে থাকে এমন নয়। অথচ কোন মাস্টারমশাইয়ের কাছে শেখা কোন কোন জিনিস আমরা সারা জীবন ভুলতে পারি না। সত্যি কথা বলতে, দীর্ঘ কর্মজীবনের সব ছাত্রছাত্রীকে কোন মাস্টারমশাই বা দিদিমণিরই মনে থাকে না। অথচ এমন মানুষ পাওয়া বিরল যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের ক্লাস করতে হয়েছে তাঁদের কাউকে একেবারে ভুলে গেছে। এই বৈপরীত্যের কারণ শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে লেখাপড়া শেষ করা অব্দি কম শিক্ষক, শিক্ষিকার ক্লাস করে না একজন মানুষ। অথচ অনেক বৃদ্ধকেও দেখেছি স্কুলের মাস্টারমশাইদের দিব্যি মনে রেখেছেন। আসলে সম্ভবত আমরা শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে এমন অনেক জিজ্ঞাসা পাই যা সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকে। তার কিছু ক্লাসঘরেই, কিছু হয়ত ক্লাসঘরের বাইরে। প্রমথ চৌধুরীর কথা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে “সুশিক্ষিত লোক মাত্রেই স্বশিক্ষিত।” অতএব শিখতে হয় নিজেকেই, কেউ শেখাতে পারে না। কিন্তু কী শিখব, কেন শিখব, কোনটা শিখলে আমার ভাল লাগবে — প্রিয় মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা বোধহয় সেটাই ধরিয়ে দেন। কেউ খুব ভাল পারেন কাজটা, কেউ আবার তত ভাল পারেন না। যাঁরা ভাল পারেন তাঁরাই বোধহয় বেশি করে মনে থেকে যান। আজ সকালের কাগজে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে পাতা জোড়া লেখা পড়তে পড়তে যেমন আমার মনে পড়ছিল সেই মাস্টারমশাইয়ের কথা, যিনি জীবনানন্দে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
ক্লাস টেনে পড়ার সময়ে আমাদের পাঠ্য ছিল এই কবিতাটা:

তোমার বুকের থেকে একদিন চ’লে যাবে তোমার সন্তান

বাংলার বুক ছেড়ে চ’লে যাবে, যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে,

আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে

ডুবে যায়, — কুয়াশায় ঝ’রে পড়ে দিকে দিকে রূপশালী ধান

একদিন; — হয়তো বা নিমপেঁচা অন্ধকারে গা’বে তার গান,

আমারে কুড়ায়ে নেবে অন্ধকারে মেঠো ইঁদুরের মতো মরণের ঘরে —

হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে আছে আকাঙ্ক্ষার — তবুও তো

চোখের উপরে

নীল মৃত্যু উজাগর — বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণ —

কখন মরণ আসে কেবা জানে — কালীদহে কখন যে ঝড়

কমলের নাল ভাঙে — ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিখের প্রাণ

জানি নাকো;— তবু যেন মরি আমি এই মাঠ-ঘাটের ভিতর,

কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ

লেগে থাকে চোখেমুখে — রূপসী বাংলা যেন বুকের উপর

জেগে থাকে; তারি নীচে শুয়ে থাকি যেন আমি অর্ধনারীশ্বর।

আমাদের কবিতাটা পড়িয়েছিলেন দিলীপবাবু। তিনি গম্ভীর মানুষ। তাঁকে কখনো হা হা করে হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর হাসি স্মিত, তিনি রাগে ফেটে পড়তেন না, ফুটতেন। সর্বদা ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন। ফুল পাঞ্জাবীর হাতা কনুইয়ের উপর পর্যন্ত গোটানো থাকত। চোখে থাকত সেলুলয়েডের ফ্রেমের চশমা, চুল উলটে আঁচড়ানো। দূরদর্শনের সাদাকালো আমলে তোলা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যে ভিডিও এখনো মাঝেসাঝে দেখানো হয়, অনেকটা সেইরকম চেহারা। স্যার অবশ্য অতটা ছিপছিপে ছিলেন না। একটা হাত মুড়ে বুকের কাছে ধরা পাঠ্য বই আর ডাস্টার, অন্য হাতে চক নিয়ে দিলীপবাবু ক্লাসে আসতেন।
জীবনানন্দের কবিতাটা যত দিন ধরে আমাদের পড়িয়েছিলেন, তত দিন ধরে সম্ভবত অন্য কোন লেখা পড়াননি। প্রথম দিনই বললেন “এবার তোমরা যে কবিতাটা পড়তে যাচ্ছ, এর তুল্য কিছু আগে কখনো পড়নি।”
বেয়াড়া প্রশ্ন করার মত ছাত্র কোনকালে কম ছিল না। একজন জিজ্ঞেস করল “স্যার, ট্রামের তলায় কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে?”
আমরা তটস্থ। ভেবেছি রাশভারী দিলীপবাবু ভয়ানক রেগে যাবেন। কিন্তু তিনি স্মিত হেসে বললেন “কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে জানি না বাবা। তবে ইনি জীবনানন্দ দাশ, যে কোন মানুষ নন। এঁকে কোন ছকে ধরা যায় না। তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না। কবিতাটা বারবার পড়। এমনিতে আমাদের যা অভ্যেস আর কি। মানে বই পড়ব, বইটা পড়ব না। সেটা এঁর ক্ষেত্রে করেছ কি মরেছ।”
কবিতাটা পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝে আমাদের মুখগুলো দেখতেন। কোন মুখে একটু আগ্রহের উদ্ভাস, কোন মুখ একেবারে অনাগ্রহী, কোন মুখ দুর্বোধ্যতায় হাবুডুবু — এসবই খেয়াল করতেন বোধ করি। পড়াতে পড়াতে একদিন “কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ” পংক্তিতে পৌঁছেছেন। একজন প্রশ্ন করল “স্যার, ঢেউয়ের আবার গন্ধ হয় নাকি?”
“পুকুর বা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কোন গন্ধ পাওনি কখনো?”
ছেলেটি মাথা নেড়ে না বলায় দিলীপবাবু বড় অসহায়ের মত হাসলেন। তারপর বললেন “সত্যি। এ বড় অন্যায়। যাঁরা পাঠ্য ঠিক করেছেন তাঁদের বোধহয় এতখানি দাবী করা উচিৎ হয়নি তোমাদের কাছে। ক্লাসরুমে বসে কী করেই বা ঢেউয়ের গন্ধ বুঝবে তোমরা? তাছাড়া এত কিছু অনুভব করতে বলাও কি উচিৎ? অনুভব না করেই যখন পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায়। তবে বাবা কবিতা তো পাঠকের একটু বেশি মনোযোগ দাবী করে। কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও?”
আমাদের তখন দুর্বিনীত হওয়ার বয়স। আমি আর আমার এক বন্ধু তখন মনে করি আমাদের আশ্চর্য কাব্যপ্রতিভা আছে। আমরা দুজনেই তখন পাঠ্য কবিতার অক্ষম অনুকরণ দিয়ে কবিতার খাতা ভরিয়ে ফেলছি। অতএব যেদিন কবিতাটা পড়ানো শেষ হল এবং দিলীপবাবু বললেন কারো কোন প্রশ্ন থাকলে করতে, সেদিন আমার বন্ধুটি জিজ্ঞেস করল “স্যার, ভবিষ্যতে কোন কবি যদি জীবনানন্দের মত লিখতে পারে?”
দিলীপবাবু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন “সে হবার নয়। ইনি যে পথে হেঁটেছেন সে পথে বাংলা কবিতার ইতিহাসে আগেও কেউ হাঁটেননি, পরেও কেউ হাঁটেননি। যে হাঁটবে তার পরিণতি হবে জীবনানন্দের মতই। কত লোকে কত কথা বলেছে। কেউ বলেছে নৈরাশ্যবাদী কবি, কেউ বলেছে নির্জনতার কবি। এঁর মত হওয়া যায় না। আর হতে যাবেই বা কেন? নিজের মত হও।”
ক্লাসের শেষদিকে এসে বললেন “কবিতাটা তো পড়ালাম। কিন্তু বলে দিই, দেখা গেছে বোর্ডের পরীক্ষকরা জীবনানন্দের কবিতার প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেয়ার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। অতএব যারা বেশি নম্বর পেতে চায় তারা জীবনানন্দকে ছোঁয় না। তোমরাও নির্ঘাত তাই করবে। তবে কেবল নম্বর পাওয়ার জন্যে কবিতা পড়া খুবই দুর্ভাগ্যের। জীবনানন্দ তোমাদের নম্বর পাইয়ে দিতে পারবেন না। তবে যদি একটু ভাল লাগিয়ে নিতে পার, তাহলে এমন অনেক কিছু পেতে পার যা আমারও জানা নেই।”
যেন রহস্যোপন্যাস। শেষে সাংঘাতিক কিছু আছে সেই আভাসটুকু দিলেন কিন্তু কী আছে বললেন না। ঐ খোঁচাটুকুই আমায় বাধ্য করল রূপসী বাংলা বইটার খোঁজ করতে। পরে আরো অন্যান্য। আজও যখন জীবনানন্দ পড়তে গিয়ে কোন পংক্তিতে আটকে যাই, দুর্বোধ্য মনে হয়, স্যারের কথাগুলো মনে করি। “কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও।”
দিলীপবাবু আমায় জীবনানন্দ দিয়েছেন। তাঁর ক্লাসে আজও বসে আছি।

আখতারনামা : বিস্মৃত ইতিহাস

একজন শিয়া মুসলমানের কৃষ্ণভক্ত হওয়া লেখকের অসম্ভব কল্পনা বলে মনে হচ্ছে? যদি হয় তাহলে এই উপন্যাস আরো বেশি করে পড়া উচিৎ। কারণ ওয়াজিদ আলি শাহ এমন একজন নিষ্ঠাবান শিয়া মুসলমান যিনি ঝুলনের দিন স্বরচিত নৃত্যনাট্যে পরিখানার পরিদের নিয়ে নাচতেন, নিজে কৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করতেন। শুধু তাই নয়, লখনৌয়ের যোগিয়া মেলায় গেরুয়া আলখাল্লা পরে সারা গায়ে ছাই মেখে তিনি নাচতেন। আবার মহরমের দিন খালি পায়ে তাজিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাঁটতেন

akhtarnama

দর ও দীবার পে হসরত সে নজর করতে হৈঁ
খুশ রহো অহল-এ-বতন হম তো সফর করতে হৈঁ

বাঙাল পরিবারের ছেলে আমি। দেশভাগ দেখিনি, পৈতৃকবাড়িতে মানুষ হয়েছি। কিন্তু উদ্বাস্তুর রক্ত আমার গায়ে, উদ্বাস্তুর ভাষা আমার জিভে, উদ্বাস্তুর গান আমার গলায়। ছিন্নমূল মানুষের সাথে আমার নাড়ির টান। তাই বুঝতে পারি, শুধু দাফনের সময়েই রাজা আর প্রজা এক হয়ে যায় না, শিকড় থেকে ছিঁড়ে নিলেও একইরকম যন্ত্রণা হয় রাজা আর প্রজার। তাছাড়া রাজত্ব চলে গেলে আর রাজা কিসের? অবধের গদিচ্যুত, নির্বাসিত রাজা ওয়াজিদ আলি শাহের আখ্যান পড়তে আমার উৎসাহ মূলত এই কারণে। পৃথিবীজুড়ে উদ্বাস্তুদের মৃত্যুমিছিল দেখতে দেখতে, রোহিঙ্গাদের দেশহীন অস্তিত্ব আর আমাদের দেশপ্রেমিক মনুষ্যত্বহীনতার সাথে আপোষ করতে করতে তাই শামিম আহমেদের ‘আখতারনামা’ পড়তে শুরু করেছিলাম।
ফেলে আসা বাস্তুর অভাব যে বোধ করে না সে উদ্বাস্তু কিনা সেটা আমার কাছে এখনো খুব পরিষ্কার নয় কিন্তু ফেলে আসা বাড়ির দরজা জানালা, পথঘাট, জলহাওয়া, মানুষজনের জন্যে যার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় অবিরত তার উদ্বাস্তু পরিচয় অনিবার্য। অবধের শেষ রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ (সিপাহী বিদ্রোহের সময়টুকু তাঁর নাবালক পুত্র ব্রিজিস কদরের রাজত্ব বাদ দিলে) সেই অধিকারেই উদ্বাস্তু। নইলে কী করে তিনি লেখেন

দরজা দেখি দেয়াল দেখি ব্যর্থ আশে
দেশের মানুষ ভাল থেকো
চললাম এবার পরবাসে।

এ তো শুধু রাজত্ব হারানোর খেদ নয়। আখতারের (ওয়াজিদ যে নামে লিখতেন) এই যন্ত্রণার কথা পড়তে গিয়ে মনে পড়ে যায় ‘কোমল গান্ধার’ এর সেই দৃশ্য যেখানে ভৃগু অনসূয়াকে শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রার দৃশ্যের অভিনয় বোঝাতে মনে করিয়ে দিচ্ছে ৪৭ সালে পূর্ববঙ্গের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসার কথা। বলছে “ইমোশন মেমরি ইউজ কর না… মনে কর না, এই কলকাতাই তোমার তপোবন, ঐ যে মিছিল চলেছে ঐ হচ্ছে তোমার নবমালিকা, বনজ্যোৎস্না। ধর কোন ভিখিরি মেয়ে তোমার কাছে পয়সা চাইল… সেই মাতৃহীন হরিণশিশুটি। ভেবে দ্যাখো, যদি কোনদিন এই কলকাতা থেকে, এই বাংলাদেশ থেকে তোমাকে চলে যেতে হয়, এই কলকাতার সবকিছু তোমার পায়ে পায়ে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরবে না?”
এই অনুভূতিই ছিন্নমূল মানুষের অভিজ্ঞান। এই অনুভূতিই তো ধরা রয়েছে আখতারের মিসরায়, ঋত্বিক ঘটকের ফিল্মে। ভাবতে ভাবতেই খেয়াল হয়, যে পর্বের শুরুতে পড়ছি আখতার অবধ ছেড়ে কলকাতায় পৌঁছনোর পরেও তাঁর রাজ্য থেকে বহু মানুষ এসে বিলাপ করছেন, সেই পর্বটার নাম ‘বনপর্ব’। ঋত্বিকের মত শামিমবাবুও মহাভারতে ভর দিয়েছেন এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে। উদ্বাস্তুর ট্রাজেডি সততই এপিক — সে কপর্দকশূন্য রোহিঙ্গাই হোক আর রাজ্য হারানো বিপুল বিত্তশালী রাজা।
কিন্তু আখতার তো একমাত্র রাজা নন যাঁর রাজ্য ইংরেজরা প্রাক-সিপাহী বিদ্রোহযুগে সামান্য ছুতোয় গিলে নিয়েছিল। তাহলে এই ২০১৭য় দাঁড়িয়ে কেনই বা আখতারনামায় আলাদা করে উৎসাহ থাকতে যাবে আমাদের? বুঝতে হলে পড়ুন এই অংশটা

সেইমত যাত্রা শুরু হল। পূর্বে রইলেন জনা চারেক দক্ষ অশ্বারোহী, মধ্যখানে যুবরাজ ওয়াজিদ ও শাহজাদা সিকান্দার, পশ্চাতে কয়েকজন অনুচর। মধ্যাহ্নে যাত্রা শুরু করে তাঁরা সূর্যাস্তের সময় পৌঁছোলেন সিধৌলিতে। সীতাপুরের জমিদার রাত্রিযাপন ও ভোজনের আয়োজন করে রেখেছিলেন। পথশ্রমে ক্লান্ত অশ্বগুলির এই বিশ্রামের খুব প্রয়োজন ছিল। রাধাকৃষ্ণভক্ত যুবরাজ শুনলেন, এখানেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত কবি নরোত্তম দাস। তুলসীদাসের সময়ের এই কবি কৃষ্ণের মিত্র সুদামাকে নিয়ে লিখেছিলেন সুদামা-চরিত। বড়ো কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন সুদামা। স্ত্রী-পুত্রের গ্রাসাচ্ছাদনের ক্ষমতা পর্যন্ত তাঁর ছিল না। একদিন স্ত্রী সুশীলা বললেন, তুমি তোমার বন্ধু কৃষ্ণের কাছে গিয়ে তো সাহায্য চাইতে পারো, শুনেছি তিনি এখন বিরাট মানুষ। তুমি তাঁর শৈশবের বন্ধু, নিশ্চয়ই তোমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। সুদামা প্রাথমিকভাবে সম্মত হলেন না। কিন্তু স্ত্রীর পীড়াপীড়ি আর সন্তানদের মুখ চেয়ে গেলেন প্রিয় বন্ধুর কাছে। উপহার হিসাবে পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে গেলেন কৃষ্ণের প্রিয় খাদ্য, খুদ। সুদামাকে দেখে প্রফুল্ল কৃষ্ণ তাঁর অনেক আদরযত্ন করলেন। সুদামা খুব খুশি। তারপর তিনি একদিন সেখান থেকে চলে এলেন। কেন যে কৃষ্ণের কাছে তিনি গিয়েছিলেন, সেটাই বলতে ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে দেখেন, তাঁর পর্ণ কুটিরের জায়গায় বিরাট অট্টালিকা, স্ত্রী-সন্তানদের দামি বেশভূষা। চমকে গেলেন তিনি। কী করে হল? স্ত্রী সুশীলা বললেন, সবই তোমার মিত্র কৃষ্ণের কৃপা। তাঁর স্ত্রী রুক্মিণী যে স্বয়ং লক্ষ্মী। এই কাহিনি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লেন যুবরাজ। রাতে খোয়াবে দেখলেন, স্বয়ং কৃষ্ণ তাঁর গৃহের সব কষ্ট লাঘব করার জন্য সুদর্শন চক্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি খোয়াবে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারছেন না।

একজন শিয়া মুসলমানের কৃষ্ণভক্ত হওয়া লেখকের অসম্ভব কল্পনা বলে মনে হচ্ছে? যদি হয় তাহলে এই উপন্যাস আরো বেশি করে পড়া উচিৎ। কারণ ওয়াজিদ আলি শাহ এমন একজন নিষ্ঠাবান শিয়া মুসলমান যিনি ঝুলনের দিন স্বরচিত নৃত্যনাট্যে পরিখানার পরিদের নিয়ে নাচতেন, নিজে কৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করতেন। শুধু তাই নয়, লখনৌয়ের যোগিয়া মেলায় গেরুয়া আলখাল্লা পরে সারা গায়ে ছাই মেখে তিনি নাচতেন। আবার মহরমের দিন খালি পায়ে তাজিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাঁটতেন।
শকুন্তলার ছেলে ভরত, সেই ভরতের নামে যে ভূখন্ডের নাম ভারতবর্ষ, তা প্রাথমিকভাবে অধিবাসীদের ভাগ করে নেওয়া এক বিরাট মনোভূমি। ওয়াজিদ আলি শাহ ওরফে আখতার সেই মনোভূমির রক্তমাংসের প্রতীক। ইংরেজরা সেকথা বোঝেনি। তাই তাঁর ওসব কাণ্ডকারখানা দেখে তারা প্রচার করত রাজা উন্মাদ। ঠিক তেমনি আজকের শাসকরা যা কিছু ভারতের যৌথ সংস্কৃতি, তাকে নস্যাৎ করে দিতে চাইছে। বলছে তাজমহল ভারতীয় ঐতিহ্য নয়, মোগল শাসন আসলে হিন্দুদের পরাধীনতার যুগ ইত্যাদি। এই ইতিহাস নস্যাৎ করে দেওয়ার কালে আখতারনামা আমাদের বিশেষ প্রয়োজন ছিল।
ওয়াজিদ আলির শাসনকাল খুব বেশিদিন নয়, এ বই পড়তে পড়তে বোঝা যায় তিনি যে খুব দক্ষ শাসক ছিলেন তাও নয়। অন্তত যতবড় শিল্পী ছিলেন ততবড় শাসক যে ছিলেন না সেকথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। তবু একথা জোর দিয়ে বলা যাবে না যে এই ২০১৭ র ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শাসকদের তাঁর থেকে কিছুই শেখার নেই। অযোধ্যা আর কাশীর মত দুটো জায়গা ছিল যে শাসকের রাজ্যে, তিনি যেভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতেন তা থেকে আজকের শাসকদের শেখার আছে বইকি। বিশেষ করে যে শাসকরা দুর্গাপুজোর ভাসান আর মহরমের তাজিয়া কিভাবে একসাথে সামলাবেন ভেবে পান না। আখতার কিন্তু দোল আর মহরম একসাথে সামলেছিলেন।
শেষপর্যন্ত অবশ্য ইংরেজরা নিখুঁত চক্রান্তে সেই সম্প্রীতিও ধ্বংস করে। সেদিক থেকে এ বই ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, লুণ্ঠন, অতঃপর যত দোষ সব ভারতীয় শাসকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া — এসবেরও এক দলিল। বিশেষত আখতারের মৃত্যুর পর মেটিয়াবুরুজে তাঁর অবশিষ্ট স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি যে দ্রুততায় এবং নির্লজ্জায় হজম করা হয় তেমন বেহায়া চৌর্যবৃত্তি আমাদের যুগেও সুলভ নয়।
এই উপন্যাস নিয়ে অনুযোগের জায়গা কি নেই? আছে। প্রথমত, শামিমবাবু সাধারণত যেরকম পাহাড়ি ঝোরার মত গদ্য লেখেন (বিশেষ করে প্রথম উপন্যাস সাত আসমানে যা পাওয়া যায়) এখানে সেটার অভাববোধ করলাম। এ গদ্য যেন হিসেবী কর্পোরেশনের জল। হয়ত তার একটা কারণ বিষয়বস্তু। দ্বিতীয়ত, সময়ে সময়ে মনে হয় লেখক তথ্যে মনোযোগ দিতে গিয়ে গল্পের সুতোটা যেন ছেড়ে দিলেন। অবশ্য কখনোই এতটা ছাড়েননি যে ঘুড়ি কেটে যাবে কিন্তু বোধহয় কিছু তথ্য পরিশিষ্টে পাঠিয়ে দিতে পারলে ঘুড়িটা আরো নির্ভার হয়ে উড়তে পারত। যাঁর ঘুড়িতে এত রঙ তাঁর কাছে এই প্রত্যাশা পাঠকের থাকেই।
এর চেয়েও ভাল লেখা আমার মাস্টারমশাই নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে লিখবেন কিন্তু সন্দেহ নেই ‘আখতারনামা’ একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে — ওঁর নিজের লেখালিখিতে তো বটেই, হয়ত সমসাময়িক লেখালিখিতেও। কারণ এ বইটা আমাদের ভুলে যাওয়া অথচ জরুরী ইতিহাসের কিছু পাতা নতুন করে ছাপিয়েছে।

শ্রদ্ধেয়

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ”

gulzar

নাইন কি টেনে পড়ার সময়ে একবার বাবার কাছে প্রচন্ড বকা খেয়েছিলাম একজন বাজে লোককে প্রণাম করার জন্যে। আসলে কোন এক গুরুজন আমাকে তার কিছুদিন আগেই বলেছিলেন “বয়সে বড় কারোর সাথে আলাপ হলে প্রণাম করবে।” বাবা একজনের সাথে আলাপ করানোয় আমি সেটাই করেছিলাম।

বাবা বাড়ি ফিরে বলেছিল “ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করা স্বভাবটা আবার তোর কবে হল? জানিস না শুনিস না, একটা অত্যন্ত নোংরা লোককে প্রণাম করলি আজকে। আলাপ না করিয়ে উপায় ছিল না তাই করিয়েছি। তা বলে প্রণাম করতে হবে? কক্ষনো প্রণামের যোগ্য কিনা না জেনে কাউকে প্রণাম করবি না।”

লৌকিকতার খাতিরে বাবার এই নির্দেশটা অনেকসময়ই মেনে উঠতে পারিনি, আজও পারি না। এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে সত্যিই প্রণাম করতে ইচ্ছা করে এমন অনেককে তো আবার প্রণাম করে উঠতে পারি না তাঁদের কাছে পৌঁছনোর যোগ্যতা নেই বলে, অতএব ব্যাপারটা হরে দরে একই হয়ে যায়।

তা সেরকমই একজন লোক গুলজার। যে বয়সে নিজে নিজে কবিতা পড়তে শিখেছি তার আগে থেকেই ফিল্মের গানের মধ্যে দিয়ে গুলজারের লেখা কানে ঢুকেছে। তখুনি মরমে পশেছে বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, তবে বরাবরই অন্য ফিল্মের গানের চেয়ে আলাদা কিছু যে শুনছি সেটা বোধ করতাম। সম্ভবত সেটা আমার বাবারই কৃতিত্ব। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দাদুর আমলের একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। তখন আমাদের যা সামর্থ তাতে পুজোর সময়ে জামাকাপড়ের সঙ্গে দু একখানা এল পি রেকর্ড কেনা হত, তার বেশি নয়। বাবা যার বাড়িতেই যেত, পছন্দের রেকর্ড দেখতে পেলে কদিনের জন্য চেয়ে আনত। “দো নয়না ঔর এক কহানি” আমার সেখান থেকেই পাওয়া। মনে আছে বাবা ঐ রেকর্ডটা শোনার সময়ে বলেছিল “মন দিয়ে শোন। কি আশ্চর্য কথা! তুঝ সে নারাজ নহি জিন্দগি, হৈরান হুঁ ম্যায়। একটা লোক জীবনের সঙ্গে কথা বলছে।” যত বড় হয়েছি, আরো গান শুনেছি, আরো কবিতা পড়েছি তত গুলজারের দাম আমার কাছে বেড়ে গেছে, ওঁকে আরো অন্তরঙ্গ মনে হয়েছে। ২০১২-তে যখন একটা চাকরি ছেড়ে অন্যটায় যোগ দিতে যাচ্ছি তখন অনুজ সহকর্মীরা ভালবেসে গুলজারের ‘Selected Poems’ আর ‘Neglected Poems’ আমার ঝুলিতে ফেলে দিল। সেই থেকে গুলজার আমার আরো আপন।

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ।” ফলে শঙ্খ ঘোষের কবিতা না পড়ে আর উপায় রইল না। কিন্তু তবুও বেশি পড়লাম ওঁর গদ্য। সমৃদ্ধ হলাম, কিন্তু তেমন টান তৈরি হল তা নয়। সেটা হল এই কয়েক বছর আগে, অগ্রজ সাংবাদিক অম্লানদার সাথে কথাবার্তায় আমার প্রিয় কবি জয় গোস্বামী বনাম ওর মতে “last of the great Bengali poets” শঙ্খ ঘোষ — এরকম একটা আবহাওয়া তৈরি হওয়ায়। এবারে তাঁর পান্ডিত্য ভেদ করে শঙ্খ ঘোষ একেবারে বুকে এসে বিঁধলেন। তবে হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই যে মানুষটা শুধুই কবি নন। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিরাশি বছর বয়সেও নিরপেক্ষ মনীষী হয়ে না থেকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে যে বক্তৃতাটা তিনি দিয়েছেন, সেটাই প্রমাণ করে তিনি প্রণম্য।

এই দুই প্রণম্যকে এক মঞ্চে কলকাতায় পাওয়া যাবে জানতে পেরেছিলাম ফেসবুকের দৌলতেই। ভাগ্যিস শনিবার — আমার কর্পোরেট দাসত্ব থেকে সাপ্তাহিক বিরতির দিন, নইলে এমন একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিতই থাকতে হত। উপলক্ষ বাংলায় গুলজারের প্রথম বই প্রকাশ। একটা বাঙালিদের সাথে ওঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ — পান্তাভাতে। অন্যটা তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ — প্লুটো।

নন্দনের বাইরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে প্রথমে গুলজার এলেন। এমনিতেই তিনি সেদিনের মধ্যমণি, তার উপর কবি হলেও বলিউডের তারকাচূর্ণ তাঁর সর্বাঙ্গে। সেই কারণে কলকাতার সাহিত্য আর সিনেমা জগতের তারকারা তাঁকে প্রায় এসকর্ট করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। সেই ভিড়েও দেখলাম ঠোঁটে সেই চিরপরিচিত “আধি অধূরি” হাসি। তার কিছু পরেই এলেন বাংলা ভাষার জীবিত কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ — শঙ্খ ঘোষ। তাঁকে ঘিরে কোন বলয় ছিল না। বিখ্যাত বাঙালিরা ততক্ষণে কে গুলজারের কত কাছে থাকতে পারেন সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন হলের ভেতরে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর মানুষটার অবশ্য আজও দেখলাম লাঠির প্রয়োজন হয় না। যাক সে কথা।

স্মরণীয় সন্ধের শুরুটা খুব সুখকর হয়নি। নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম বোধহয় ঠিক করতে পারছিল না কোশিশের সঞ্জীব কুমার হবে না আঙ্গুরের সঞ্জীব কুমার হবে। যারপরনাই টাকা এবং সময় খরচ করে ওখানে পৌঁছনো আমরা স্বভাবতই অধৈর্য। শঙ্খ ঘোষের ধৈর্যচ্যুতি হওয়া অবশ্য বেশ শক্ত ব্যাপার। মিনিট পাঁচেক মঞ্চে ছিলেন। বললেন “দেশে বিদেশে অনেককে পেয়েছি যারা গীতাঞ্জলি ইংরেজি অনুবাদে পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। কিন্তু ‘Gardener’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ পড়তে আগ্রহী হয়েছেন, তারপর নিজের উদ্যোগে বাংলায় পড়েছেন, এমন মানুষ গুলজার ছাড়া আর একজনও পাইনি… অন্য ভাষায় কাজ করেও তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁকে আমাদের খুব কাছের লোক বলে মনে হয়।”

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত অনেকের দৃষ্টিপথ জুড়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে একগাদা টিভি ক্যামেরা এবং তার চালকেরা। শঙ্খ ঘোষের শান্ত থাকার আবেদনে আমল দেওয়া তাই বেশ শক্ত হচ্ছিল। তাতেই অবশ্য টের পাওয়া গেল গুলজারের সম্মোহনী শক্তি। বইপ্রকাশ, পান্তাভাতের কিছুটা অনুলেখিকার পাঠ করা — এসব পেরিয়ে যখন তাঁর হাতে মাইক পৌঁছল, তখনো এক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে কিসব বলছেন একতলার দর্শকাসন থেকে। গুলজার প্রথমেই বেশ মোলায়েম অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন “ভাইসাব, অভি আপ চুপ হো যাইয়ে। অব মেরি বারি হ্যায়।”

গুলজার বললে কে-ই বা না শুনে থাকতে পারে!
এরপর তিনি অনেকের স্মৃতি রোমন্থন করলেন। সবচেয়ে মনে রাখার মত “মেরা কুছ সামান” গান তৈরি হওয়ার গল্পটা।

দীর্ঘ কবিতাটা লিখে নিয়ে গুলজার গেছিলেন রাহুল দেববর্মনের কাছে, সুর করে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। রাহুল দৈর্ঘ্যটা দেখেই উড়িয়ে দেন “এত বড় গান হয়! এরপরে কোনদিন টাইমস অফ ইন্ডিয়া নিয়ে এসে বলবে এটায় সুর দিয়ে দে।” তারপর কাগজটা টেনে নিয়ে পড়েন আশা এবং আপন মনে একটা সুর দিয়ে “লওটা দো” গেয়ে ওঠেন। সেটাই রাহুলকে উৎসাহিত করে হঠাৎ এবং কোলবালিশ আর হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে খানিকক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এদেশের শ্রেষ্ঠ মনখারাপ করা প্রেমের গানগুলোর একটা।

এইসব কথাবার্তার মাঝে নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম কখন গুলজারের বাধ্য হয়ে উঠেছে। তারপর সন্ধে যত এগোল, গুলজার ঝমঝমে দিনের ময়ূরের মত পেখম মেলতে শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করতে গিয়ে তাঁর অনুভবের কথা বললেন, কেন অকিঞ্চিৎকর প্লুটো তাঁর কবিতার বইয়ের নাম হয়ে উঠল সেকথা বললেন। এবং অবশ্যই কবিতা। এখন কীভাবে সব ছেড়ে কবিতা নিয়ে পড়ে আছেন সেকথা বললেন।

দেশের ৩২টা ভাষার ২৭৫ জন কবির কবিতা এ পর্যন্ত অনুবাদ করে সংকলিত করে ফেলেছেন, সংখ্যাটা আরো বাড়বে। এঁরা সবাই গুলজারের জীবনকালের মধ্যে লিখেছেন, এমন কবি। এখনো লিখছেন, এমন কবি। চুরাশি বছরের লব্ধপ্রতিষ্ঠ মানুষটা বললেন “এই সংকলনটা করতে গিয়ে আমি অনেক জানলাম, শিখলাম।” কী শিখলেন?

প্রথমত, মারাঠি, মালয়ালম আর বাংলা ছাড়া কোনো ভারতীয় ভাষায় এই মুহূর্তে ছোটদের জন্য কবিতা লেখা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, দেশের সেরা কবিতাগুলো লেখা হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভাষাগুলোয়। আর “কমপার্টমেন্ট মে জীনে কি আদত হো গয়ি হ্যায় ইস দেশ মে হামলোগোঁ কো। আসাম মে কুছ হোগা তো সির্ফ আসাম কে লোগ হি লিখেঙ্গে উস পর। সাউথ সে কোঈ নহি লিখেগা। দিল্লী সে কোঈ নহি লিখেগা।”

তবে সন্ধ্যের সেরা সময়টা এল আরো পরে, যখন গুলজার নিজের কবিতা পড়তে শুরু করলেন। প্লুটো নামের যে বইটা প্রকাশ হল, তাতে মূল কবিতার বাংলা অনুবাদগুলো বাঙালিদের লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত। গোটা দুয়েক পড়া হতেই ব্যাপারটা বুঝে গুলজার অনুবাদককে আর পড়ার সুযোগ দিলেন না। তারপর শুধু গুলজার আর তাঁর গুণমুগ্ধরা ছিলেন সেখানে। অনুপুঙ্খ বিবরণ অবশ্য বলবে বাংলার এক কবি, প্লুটোর অনুবাদক, পান্তাভাতের অনুলেখিকা, বলিউডের এক জনপ্রিয় সুরকার — এঁরাও উপস্থিত ছিলেন।
শুধু ‘সরহদ’ এর মত পরিচিত এবং গ্রন্থিত কবিতা নয়, সুদূর ব্যালকনি থেকে দেখলাম কাগজে লেখা টাটকা কিছু কবিতাও গুলজার আমাদের উপহার দিলেন। ভাবছেন বুঝি চারিদিকের নানা সংকট থেকে বিযুক্ত হয়ে গুলজার আর আমরা কয়েক ঘন্টার জন্যে পলাতক হয়ে গেছিলাম? তাহলে একেবারে শেষদিকে পড়া একটা কবিতা উদ্ধৃত করি:

উসনে জানে কিঁউ অপনে দাঁয়ে কন্ধে পর

নীল গায় কা ইক ট্যাটু গুদওয়া থা

মর জাতা কল দঙ্গোঁ মে,

অচ্ছে লোগ থে…

গায় দেখকে ছোড় দিয়া!!

এই অবিস্মরণীয় সন্ধ্যায় আমার আর গিন্নী তুলিরেখার এক পাশে ছিল স্নেহভাজন অর্ণব আর স্বাগতা, অন্য পাশে সস্ত্রীক প্রিয় মাস্টারমশাই শামিমবাবু। এমন দিনের বন্ধুদের ভোলা যায়!

পূজার ছলে তোমায় ভুলে

যে লোক বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রাস্তায় নেমে এসে নেতৃত্ব দিয়েছে, রক্তকরবীর ভূমিকায় লিখেছে এই নাটক রূপক নয়, সরকারী গণহত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করেছে, কংগ্রেসের অধিবেশনের জন্য গান লিখেছে, নেতাজী কংগ্রেস ত্যাগে বাধ্য হওয়ায় রুষ্ট হয়ে গান্ধীজিকে চিঠি লিখেছে — সেই লোকের ছবি দেখিয়ে বাঙালি ছেলেমেয়েকে শেখায় “নম কর। ঠাকুর।” কোন বাঙালি? যে বাঙালি স্কুলের শেষ ধাপে থাকা ছেলেমেয়েকে পইপই করে শেখায় “কলেজে যাবে পড়াশোনা করতে, রাজনীতি করতে নয়”

rabindranath

একদা এক সহপাঠিনীকে আমার বেশ পছন্দ ছিল, প্রায় প্রেমে পড়ে যাই যাই অবস্থা। অন্য একজনের প্রতি আকর্ষণ প্রবলতর না হলে হয়ত প্রেমে পড়েই যেতাম সেইসময়। সে যা-ই হোক, সহপাঠিনীটির প্রতি আমার দুর্বলতার একটা বড় কারণ ছিল তার রবীন্দ্রপ্রীতি। মেয়েটিকে দেখতে বিলক্ষণ ভাল, আমার সাথে চিন্তাভাবনায় দিব্য মিল বলে মনে হত। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটির গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত চমৎকার লাগত। সে রবিবাবুর গল্প, কবিতা, উপন্যাসও গুলে খেয়েছিল। অতএব আমি ভীষণই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম একসময়। এখন ভেবে শিউরে উঠি, সত্যিই তার প্রেমে পড়ে গেলে কি দুর্দশাই না হত দুজনেরই।
অন্য অনেক হাফসোলপর্ব পেরিয়ে আমার গিন্নীর সাথে প্রেম, অতঃপর বিবাহের পরে ক্রমশ আবিষ্কার করলাম যে আমার সেই সহপাঠিনী আদ্যন্ত মুসলমানবিদ্বেষী। ভারতবর্ষ দেশটা যে হিন্দুদের এবং আর সকলেরই এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকা উচিৎ — এ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। জানতে পেরে শুধু অবাক নয়, রীতিমত আহত হয়েছিলাম। প্রেমিকা না-ই হল, বন্ধু তো বটে। এমন একজন মতের মানুষকে পরম বন্ধু ভেবে বসেছিলাম বুঝতে পারলে নিজের বোধবুদ্ধি সম্পর্কেই প্রশ্ন জাগে মনে। অবশ্য সেটা ২০১৪ গোড়ার দিক। অনেক কাছের লোককেই অচেনা লাগতে শুরু করার সময়। এখনকার মত অতটা গা সওয়া হয়নি তখনো ব্যাপারটা। কিন্তু অভ্যেস হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত আমার যেটা অবিশ্বাস্য লাগত সেটা হল রবীন্দ্রনাথে ডুবে থাকা একজন মানুষের মধ্যে মানবতাবোধের এরকম অভাব, ভারতীয়ত্ব সম্পর্কে এরকম একপেশে ধারণা কী করে জয়ী হয়?
পরবর্তীকালে আরো অনেকের সাথে মিলিয়ে দেখে যা বুঝলাম সেটা হল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের বাঙালিদের এত যে গর্ব, এত গদগদ ভাব — সব ভাঁওতা। রবীন্দ্রনাথকে আমরা বহুকাল হল বাদ দিয়েছি, পড়ে আছে এক ঠাকুর। লক্ষ্মীর পাঁচালি যেমন লোকে বুঝে বা না বুঝে গড়গড় করে পড়ে আমরা তেমন ওঁর গোটা কুড়ি গান আর ডজনদুয়েক কবিতা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিখি এবং পারফর্ম করি। কথাগুলো কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে না। ফলে যে প্রতিযোগিতায় ‘ভারততীর্থ’ আবৃত্তি করে প্রথম হয় সে রামমন্দির নির্মাণে করসেবা করতে অযোধ্যা চলে যায়। যে দিদিমণি রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় “বাংলার মাটি বাংলার জল” গায় সে মুসলমান ছাত্রীর এনে দেওয়া জল খায় না। আরো দেখলাম রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো বড় একটা কেউ পড়ে না। ফলে রবীন্দ্রনাথকে একজন অরাজনৈতিক, সাঁইবাবাসুলভ লোক বলেই বেশিরভাগ বাঙালি মনে করে।
কি আশ্চর্য! যে লোক বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রাস্তায় নেমে এসে নেতৃত্ব দিয়েছে, রক্তকরবীর ভূমিকায় লিখেছে এই নাটক রূপক নয়, সরকারী গণহত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করেছে, কংগ্রেসের অধিবেশনের জন্য গান লিখেছে, নেতাজী কংগ্রেস ত্যাগে বাধ্য হওয়ায় রুষ্ট হয়ে গান্ধীজিকে চিঠি লিখেছে — সেই লোকের ছবি দেখিয়ে বাঙালি ছেলেমেয়েকে শেখায় “নম কর। ঠাকুর।” কোন বাঙালি? যে বাঙালি স্কুলের শেষ ধাপে থাকা ছেলেমেয়েকে পইপই করে শেখায় “কলেজে যাবে পড়াশোনা করতে, রাজনীতি করতে নয়।”
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের শক্তি নন, আমাদের দুর্বলতা। যে কোন মধ্যমেধার চলচ্চিত্র পরিচালক বা নিম্নরুচির মেগা সিরিয়াল নির্মাতা একখানা লাগসই রবীন্দ্রসঙ্গীত গুঁজে দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে অন্তত পয়সা উঠে যাবে। লেখাপড়া জানা বাঙালিও এমন বিহ্বল হয়ে দেখবে যে মনে হবে ঋত্বিক বা সত্যজিতের ছবি দেখছে।
আসলে ভদ্রলোকের থেকে আমরা নিয়েছি লবডঙ্কা কিন্তু দিয়েই চলেছি — অবজ্ঞা। জেনে এবং না জেনে। “তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি”।

আদিখ্যেতা নিপাত যাক

বাংলা ছবির পোস্টারে আজকাল আকছার ছবির নাম, পাত্রপাত্রীদের নাম লেখা হয় রোমান হরফে। ছবি দেখতে ঢুকেও দেখা যায় নাম দেখানো হচ্ছে রোমানে। এসব দেখে দর্শকের কিছু মনেও হয় না কারণ অনেক দর্শক, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা, বাংলা অক্ষর পড়তেই পারেন না — এটাই তো বাস্তব। তাহলে আবার “আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই” উদ্ধৃত করার ন্যাকামি কেন?

বছরে দুটো দিন ভারতীয় বাঙালির বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম উথলে ওঠে। যেসব হতভাগ্য শিশু উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনি আর নাককাটা রাজাকে চেনে না, সুকুমারের আশ্চর্য জগৎ থেকে বঞ্চিত তাদের বাবা-মায়েরাও ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ বিদীর্ণ করে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে নানা কথা লেখে। ভারতবর্ষের বাঙালি এভাবে কাকে ফাঁকি দিতে চায় বুঝি না।
বাংলা টিভি সিরিয়ালে গল্পের পরিস্থিতি অনুযায়ী হিন্দি ছবির গান বাজানো হয়, দীর্ঘদিন হল বাংলা ছায়াছবি তৈরি হচ্ছে তামিল, তেলুগু ছবির গল্প টুকে, বলিউডি নাচ গান সহযোগে। সেসব সিনেমা, সিরিয়াল যে কেউ দেখছে না তা-ও নয়। উনিশশো আশি নব্বইয়ের দশকে, নাহয় সিপিএমের দোষেই, চালু হয়েছিল ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতা। সে স্কুল ভাল কি মন্দ দেখার দরকার নেই, নামটা কলকাতার কোন বিখ্যাত স্কুলের মত শোনালেই হল। এখন আবার নতুন প্রবণতা হয়েছে বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও সরিয়ে হিন্দীকে সেই জায়গাটা দেওয়া। সেটা না করে আর উপায় নেই কারণ বহুকাল হল কে কত শিক্ষিত তার প্রমাণ হিসাবে ধরা হয় তার গড়গড়িয়ে ইংরিজি বলতে পারার ক্ষমতাকে, ইদানীং আবার নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে গেলে কথার মধ্যে “ইয়ার”, “ঠিক হ্যায়,” “ক্যা বাত করতা হ্যায়” এসব বলা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। তা হোক। আপনি কেমন ভাষায় কথা বলবেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু তাহলে আবার একুশে ফেব্রুয়ারি বা পয়লা বৈশাখ নিয়ে গদগদ হওয়ার কী আছে?
বাংলা ছবির পোস্টারে আজকাল আকছার ছবির নাম, পাত্রপাত্রীদের নাম লেখা হয় রোমান হরফে। ছবি দেখতে ঢুকেও দেখা যায় নাম দেখানো হচ্ছে রোমানে। এসব দেখে দর্শকের কিছু মনেও হয় না কারণ অনেক দর্শক, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা, বাংলা অক্ষর পড়তেই পারেন না — এটাই তো বাস্তব। তাহলে আবার “আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই” উদ্ধৃত করার ন্যাকামি কেন?
দেখুন তো, কিরকম পিছিয়ে পড়া মানসিকতা আমার! বাংলা বাংলা করতে গিয়ে এই বিশ্বায়নের যুগে বাঙালিরা পিছিয়ে পড়ুক আর কি। আমি একেবারে মৌলবাদী, তাই না?
মজার কথা হচ্ছে বাঙালি যখন বাংলার কদর করত তখন তারও সারা ভারতবর্ষে কদর ছিল। আর বাংলার কদর করার জন্যে বাঙালি কখনো অন্য ভাষার দোর বন্ধ করে দেয়নি। ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এবং সবচেয়ে ভাল ইংরিজি বাঙালিই শিখেছিল। কিন্তু তারজন্যে আমাদের পূর্বসুরিরা মাতৃভাষাকে বিসর্জন দেননি। সতীদাহ প্রথা রদের জন্য দিল্লীশ্বরের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে যাওয়া রামমোহন রায় বহুভাষাবিদ ছিলেন, বাংলাতেও পন্ডিত। মাইকেল মধুসূদনের মত ইংরিজি পরবর্তীকালের কোন কনভেন্টশিক্ষিত বাঙালির আয়ত্ত হয়েছে কি?
বাংলা সাহিত্যও অন্য ভাষার সাহিত্যের রস টেনে স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে শুরু থেকেই, সে বিদ্যাসাগরের দিকেই তাকান আর বুদ্ধদেব বসুর দিকেই তাকান। আমাদের সেরা কবিদের উপর ইংরিজি এবং ফরাসী কবিতার প্রভাব নিয়ে আস্ত বই লেখা যায়। এমনকি যে কবি “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি/ তাই পৃথিবীর রূপ আমি খুঁজিতে যাই না আর” লিখেছেন তিনিও সব দরজা বন্ধ করে বসেছিলেন না।
বাংলার রঙ্গমঞ্চও তো গিরীশ ঘোষ থেকে শুরু করে শম্ভু মিত্র হয়ে সুমন মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত বিদেশী নাটকের থেকে যেমন নিয়েছে তেমন ফিরিয়েও দিয়েছে।
সুতরাং মাতৃভাষার চর্চা করার জন্য বাঙালির মৌলবাদী হওয়ার দরকার কখনো পড়েনি, পড়বেও না। বাঙালি কখনো ভাষা নিয়ে মৌলবাদী হয়নি বলেই ফাদার দ্যতিয়েন বলে এক দূরবিদেশী আজীবন বাংলার চর্চা করে গেলেন। বাংলা নাটকেরও তো পথ চলা শুরু রুশদেশের গেরাসিম লেবেদেফের হাত ধরে।
তবে আপনি বাংলার চর্চা করবেন কি করবেন না সেটা আপনার ব্যাপার। ইচ্ছে হলে আপনি, আপনার পরিবার খাঁটি সাহেব হয়ে উঠুন, কোন আপত্তি নেই। কিন্তু বছরে দুদিন বাংলা ভাষার জন্যে কান্নাকাটি কোন পাপ স্খালনের জন্যে?

জল পড়ে। পাতা নড়ে

এরপরে যা খেয়াল হওয়ায় চমকে উঠলাম তা হল বিশ্ববরেণ্য হয়ে ওঠার পরেও নিজের মানবিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সচেতনতা

vidyasagar

দুটো অতিপরিচিত লাইন সেদিন ঘোল খাইয়ে দিল ।
সন্ধ্যেবেলা এক অগ্রজ সাংবাদিকের ফোন “জল পড়ে । পাতা নড়ে । কার লেখা রে ?” অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পত্রপাঠ জবাব দিলাম “বিদ্যাসাগর । বর্ণপরিচয়ে আছে ।”
প্রতিপ্রশ্ন “ঠিক তো ? রবীন্দ্রনাথ নয় তো ?”
বাঙালির ছেলে । যে কোন বিষয়েই রবীন্দ্রনাথের নামটা চলে এলে একটু বেশি সতর্ক হতেই হয় । আমি তাই বললাম “আচ্ছা চেক করে জানাচ্ছি ।” সহকর্মীদের দু’একজনকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখি দুটো নামই উঠে আসছে । অগত্যা বিপদে পড়লে সমস্ত বুদ্ধিমান পুরুষের যা করা উচিৎ ঠিক তাই করলাম । গিন্নীর শরণ নিলাম । তিনি কন্যার বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ ঘেঁটে জানালেন “জল পড়ে । পাতা নড়ে ” কোথ্থাও নেই । প্রথম ভাগের তৃতীয় পাঠে আছে “জল পড়ে । মেঘ ডাকে ।” আর অষ্টম পাঠে আছে “জল পড়িতেছে । পাতা নড়িতেছে ।”
রহস্য ঘনীভূত হল দেখে এক অধ্যাপক বন্ধুকে ফোন করলাম । সে একবাক্যে “রবীন্দ্রনাথ” বলল । কিন্তু কোন্ বইতে আছে মনে করতে পারল না । আমারই মনে হল হয়ত সহজ পাঠ হবে । নিশ্চিত হওয়ার জন্যে আবার সহধর্মিনীর সাহায্য নিতে হল । তিনি জানালেন রবীন্দ্রনাথ রচিত সহজ পাঠের প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ তো বটেই এমনকি বিশ্বভারতী সংকলিত তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগেও জল পড়েনি, পাতা নড়েনি ।
রহস্যের সমাধান যে দূর অস্ত সেকথা সেই অগ্রজকে জানাতেই তিনি মনে করিয়ে দিলেন জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষারম্ভ’ অধ্যায়ে লিখেছেন
“আমরা তিনটি বালক একসঙ্গে মানুষ হইতেছিলাম । আমার সঙ্গীদুটি আমার চেয়ে দুই বছরের বড়ো । তাঁহারা যখন গুরুমশায়ের কাছে পড়া আরম্ভ করিলেন আমারও শিক্ষা সেই সময়ে শুরু হইল । কিন্তু সে-কথা আমার মনেও নাই ।
কেবল মনে পড়ে, “জল পড়ে পাতা নড়ে ।’ আমার জীবনে এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা ।”
অতএব লাইনদুটো রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা হতেই পারে না ।
অকাট্য যুক্তি । কিন্তু তাহলে রহস্য উদ্ঘাটন হবে কী করে ? কবিগুরুর আদিকবিটি তাহলে কে ? বিদ্যাসাগর না হলেও অন্য কেউ তো বটে ? নাকি জীবনস্মৃতি লেখার সময়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করায় নিত্য বর্তমান ঘটমান বর্তমানের চেহারা নিয়েছে ? এই সেদিন পর্যন্তও তো বঙ্গসন্তানদের লেখাপড়া বর্ণপরিচয় দিয়েই শুরু হত । আর রবীন্দ্রনাথের তো শিক্ষারম্ভ বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশাতেই ।
কোথায় পাব উত্তর ? গুগল জ্যাঠাকে জিজ্ঞেস করে দেখলাম বিন্দুবিসর্গ জানে না এব্যাপারে । আমার সিধুজ্যাঠা নেই বলে আফশোস করতে করতে বাড়ি পৌঁছলাম । তারপর হঠাৎ ক্যাপ্টেন স্পার্কের মত মস্তিষ্কে একটা স্পার্ক হল । মনে পড়ল প্রশান্ত পাল রচিত রবিজীবনীর কথা । কী যেন পড়েছিলাম এই ব্যাপারে ! খুলে বসলাম ।
দেখি প্রথম খন্ডের চতুর্থ অধ্যায়ে (রবীন্দ্রজীবনের চতুর্থ বৎসর) আছে
“যদিও রবীন্দ্রনাথের জন্য বিশেষ করে বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগ কেনার উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবু এই বইটিও তাঁর প্রথম শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই মনে হয় ।” এরপর জীবনস্মৃতির উপর্যুক্ত অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে প্রশান্ত পাল লিখছেন “এই বর্ণনা বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগকেই মনে করিয়ে দেয় । অবশ্য সে ক্ষেত্রেও আমাদের দ্বিধা সম্পূর্ণ কাটে না । কারণ উক্ত গ্রন্থের তৃতীয় পাঠে ‘জল পড়ে’ বাক্যটি থাকলেও ‘পাতা নড়ে’ বাক্যটি নেই এবং অষ্টম পাঠে বাক্যদুটিকে পাওয়া যায় একেবারে গদ্যাত্মক চেহারায় — ‘জল পড়িতেছে । পাতা নড়িতেছে ‘ — যাকে আদিকবির প্রথম কবিতা বলা শক্ত ।”
এরপর আছে আরেকটা বইয়ের আলোচনা যে বইতে রবীন্দ্রনাথ পড়েন “হিরণ্যকশিপুর পেট চিরছে নৃসিংহ অবতার” । অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেন সিদ্ধান্ত করেছেন এইটা শিশুবোধক নামে একটা বই এবং এটাকেই তিনি রবীন্দ্রনাথের পড়া প্রথম বইয়ের মর্যাদা দিয়েছেন । কিন্তু প্রশান্ত পাল ভিন্নমত । তিনি ঠাকুরবাড়ির ক্যাশবই দিয়ে প্রমাণ করেছেন ওটা রবীন্দ্রনাথের পড়া প্রথম বই নয় । তিনি লিখছেন “এই পর্বে দু-দফায় যে বই কেনা হয়েছে, তাতে আমরা ‘প্রথম ভাগ’ [দাম দেখে বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগ হওয়াই সম্ভব বলে মনে হয়], বর্ণপরিচয় ও শিশুশিক্ষা-র কথাই জানতে পেরেছি, শিশুবোধক কেনা হয়েছে এমন কোন ইঙ্গিত মেলেনি ।”
এর কিছু পরে প্রশান্ত পাল লিখছেন
“রবীন্দ্রনাথের শিক্ষারম্ভ হয়েছিল শিশুশিক্ষা দিয়ে এবং তার পরে সম্ভবতঃ বর্ণপরিচয়ের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটেছিল । তারও পরে পড়েছিলেন শিশুবোধক, আর এই শিশুবোধকেই পেয়েছিলেন মূলপাঠসহ চাণক্যশ্লোকের বাংলা পদ্যানুবাদ । আর এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পুরো ইতিহাসটিকে গুছিয়ে আনতে পারি এইভাবে : বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগ দিয়ে সোমেন্দ্রনাথ ও সত্যপ্রসাদ যখন ভাদ্র [Sep 1864] থেকে শিক্ষারম্ভ করেন, রবীন্দ্রনাথ তখন তাঁদের সঙ্গী ছিলেন না ; তিনি পাঠশালায় যেতে শুরু করলেন পৌষ মাস [Jan 1865] থেকে, শিশুশিক্ষা অবলম্বনেই তাঁর অক্ষর পরিচয় হয়, কিন্তু বর্ণযোজনা শেখেন বর্ণপরিচয় থেকে — ‘কর খল’ এবং ‘জল পড়িতেছে । পাতা নড়িতেছে” পাঠই তিনি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ভাবী মহাকবির সমস্ত চৈতন্য গদ্যের সেই সাদাসিধে রূপের অন্তরে নিহিত ছন্দটুকু আবিষ্কার করে গদ্যের ঘটমান বর্তমানকে কবিতার নিত্য বর্তমানে পরিণত করেছে ।”
রহস্যের সমাধান হল । আমাদের সকলের পরিচিত লাইনদুটো বিদ্যাসাগরের রচনা নয়, রবীন্দ্রনাথের রচনাও নয় ; একটা ভুল উদ্ধৃতিমাত্র ।
কিন্তু এরপরে যা খেয়াল হওয়ায় চমকে উঠলাম তা হল বিশ্ববরেণ্য হয়ে ওঠার পরেও নিজের মানবিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সচেতনতা । জীবনস্মৃতির মুখবন্ধে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন
“জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে — তাহা কোন্-এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা । তাহাতে নানা জায়গায় যে নানা রং পড়িয়াছে তাহা বাহিরের প্রতিবিম্ব নহে — সে-রঙ তাহার নিজের ভান্ডারের, সে-রঙ তাহাকে নিজের রসে গুলিয়া লইতে হইয়াছে ; সুতরাং পটের উপর যে ছাপ পড়িয়াছে তাহা আদালতে সাক্ষ্য দিবার কাজে লাগিবে না ।”
আমরা ওঁকে ঠাকুর বানিয়েছি কিন্তু উনি কখনোই আমাদের পাল্লায় পড়ে ভুলে যাননি যে আর পাঁচজনের মত ওঁরও ভুল হওয়া স্বাভাবিক এবং অনিবার্য।

ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা — যে সাহিত্য পাঠককে পড়িয়ে নেয়

কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত

ছোটবেলায় ‘শুকতারা’, ‘কিশোর ভারতী’ দিয়ে শুরু করে কৈশোরে ‘আনন্দমেলা’ হয়ে শারদ সাহিত্য পড়ার অভ্যেসটা যৌবনে ‘দেশ’, ‘আজকাল’, ‘নন্দন’ পর্যন্ত দিব্যি চলে এসেছিল । কিন্তু পরপর কয়েকবছর থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের স্বাদ নিতে হওয়ায় এবং কিছুটা জীবনের চাবুক খেয়ে ওসব পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করেছিলাম । গতবছর এক বন্ধুর কথায় জয় গোস্বামী আর শঙ্খ ঘোষের কবিতাদুটো পড়ব বলে শারদীয় দেশ কিনেছিলাম । কিনে দেখলাম ঐ দুজন বাদেও কবিতা বিভাগটা তবু পড়া যায়, গল্প উপন্যাসে পাতা পাঁচেকের বেশি এগোতেই পারছি না । তাই এবছরে আবার বিখ্যাত শারদসংখ্যাগুলোকে ত্যাগ করেছি । তারপর, সাহিত্যিক বন্ধু থাকলে যা হয়, মেদিনীপুর জেলার ‘আমার কাগজ’ পত্রিকায় বেরোনো একটি উপন্যাস পড়ার বড্ড ইচ্ছা হল । পত্রিকাটা না হলেও উপন্যাসটা লেখকের ভালবাসায় আমার ইনবক্সে চলে এল আব্দার করামাত্রই ।
আমরা গত কয়েক দশক ধরে যেসব বাংলা গল্প উপন্যাস জনপ্রিয় পত্রপত্রিকায় পড়তে অভ্যস্ত, যেসব বাংলা ছবি মাল্টিপ্লেক্সে দেখতে অভ্যস্ত তা ভীষণভাবেই নাগরিক । স্থান, কাল, পাত্র, বিষয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন — কোনটাই আমার মত মফঃস্বলের গেঁয়ো ভূতকে টানে না । অফিসের সময়টুকু বাদ দিলে আমার যে জীবন, আমার পরিপার্শ্ব, সেসবের গন্ধ কোথাও পাই না ।
কিন্তু ‘ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা’ নামে এই যে উপন্যাস তার পটভূমি কলকাতা থেকে বেশ দূরে — খড়গপুর, যেখানে আপনি দ্রুতগামী শতাব্দী এক্সপ্রেসে উঠলেও ঘন্টা দেড়েকের আগে পৌঁছবেন না । কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্র গ্রাম থেকে খড়গপুরে পড়তে আসা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে । আমার বড় চেনা । এমন কতজনের সঙ্গেই না হোস্টেলজীবন কাটিয়েছি যাদের কাছে কলকাতা তো বটেই, বেলুড়ও শহর ।
কিন্তু সত্যি বলতে কলকাতা বা তার আশেপাশের মফঃস্বলে যারা বেড়ে উঠেছে আমার মত, তারা মফঃস্বল আর তার কাছেদূরের গ্রামকে জানতেই পারে না কখনো । পৃথিবীর সব রং কলকাতায় — এমন একটা বিশ্বাস চেতনে বা অবচেতনে গড়ে ওঠে । এই উপন্যাসে লেখক যখন খড়গপুরের অলিগলি চেনাচ্ছিলেন, গিরি ময়দান স্টেশনের গুলমোহর গাছটার কথা বলছিলেন তখন আমার নবগ্রামের এমন সব পথ আর পুকুরঘাটকে ভালবাসতে ইচ্ছা করছিল যাদের ধারকাছ দিয়ে বহুকাল যাওয়া হয় না ।
কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত ।
আধুনিক হওয়ার সাথে কলকাতালগ্ন হওয়ার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা তো ভুলতেই বসেছিলাম ।
উপন্যাসটা আমার আরো আপন হয়ে ওঠে যখন এমন একজনের প্রসঙ্গ আসে যাকে দেখতে “অনেকটা আত্মগোপন করে থাকা নকশাল” এর মত । লোকটা আসলে সম্পাদক । এমন একজন সম্পাদক যে বড় শহরের বড় কাগজের চাকরি ছেড়ে এসেছে ছোট শহরে তৃণমূল স্তরের সাংবাদিকতা করবে বলে, যে বাতিলযোগ্য লুনা মোপেডে চড়ে খড়গপুর চষে বেড়ায় খবর আর সম্ভাবনাময় সাংবাদিকের খোঁজে । প্রেমের গল্প বলতে বলতে ঔপন্যাসিক আমায় শুনিয়ে দিলেন সেই গল্প — বড় শহরের মত ছোট শহরেও কিভাবে সাংবাদিকতা বদলে গেল খবরের ব্যবসায়, কিভাবে দুর্নীতিই হয়ে উঠল নিয়ম আর সৎ সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়াল বোকামি, কিভাবে বড় কাগজের জেলার পাতা সাড়ে সর্বনাশ করল জেলার সাংবাদিকতার । দেশজুড়ে এই ইতিহাস যে কত কাগজের !
কাদের নিয়ে ‘খবর খড়গপুর’ চালাতেন এই সম্পাদক —- শুভ্রর রণজয়দা ? আশ্চর্য কিছু চরিত্র । একজন আপাদমস্তক কবি, যে শ্মশান থেকে আহরণ করে তার বেশিরভাগ কবিতার লাইন । কেমন সে লাইনগুলো ? “তুমি সড়ক রমণীর আগুনতলে আশ্চর্য, দুর্বল / তুমি হাওয়ার গল্প, জুনের দিকে তীব্র যাওয়া… / তুমি পঠিত হচ্ছ বায়ুহারাদের দেশে, মুখে / হারিয়ে যাচ্ছ নিঃশব্দে ভ্রমিত কোন প্রেমে…”। বাসুদা, এই কবি, শ্মশানে মড়া পোড়াতে আসা একজনেরই প্রেমে পড়ে আর শ্মশানের মাটিতে শুয়েই বলে “জীবন, জীবনই শেষ কথা ।”
আরো ছিল রঘুদা — আশাহত কমিউনিস্ট বাবার আশাবাদী কমিউনিস্ট ছেলে । শহরের খালি দেওয়াল খুঁজে খুঁজে স্লোগান, কবিতার লাইন আর মার্কস, লেনিনের উক্তি লিখে বেড়ায় । সেইসব উক্তি যেগুলো তার পার্টি লোককে বলা বন্ধ করে দিয়েছে । রেলবস্তিতে বসে রঘুদা অবধারিত বিপথগামিতার আগে কিছু শিশুকে আঁকতে শেখায় ।
এছাড়াও ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নির্লজ্জ, অসাধু সৌমাল্যদা । এতই অসাধু যে মৃত বন্ধুর কবিতার খাতা চুরি করে নিজের কবিতায় জুড়ে দিতেও দ্বিধা বোধ করে না ।
ছিল সুপুরুষ, নির্ভীক সাংবাদিক, আমির খসরুভক্ত মাসুদদা, যার সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্কের বিপ্রতীপ কোণে দাঁড়াতে হয় শুভ্রকে ।
সবাইকে ছাপিয়ে ছিল কুন্তলা — খাঁচায় বন্দি এক মেয়ে যে আসলে কী চায় সম্ভবত তা-ই ভুলে গিয়েছিল, যেমনটা আমরা অনেকেই যাই । ফলে সে শুভ্রকে দিল দাগা, হয়ত নিজেকেও । কিন্তু তার আগে সে শুভ্রকে উপহার দিয়ে ফেলেছে এক অমর মুহূর্ত ।
শুভ্র। অপাপবিদ্ধ, সুলেখক, স্বপ্নালু শুভ্র । তারও অধঃপতন হয়, হলুদ সাংবাদিকতা তার মনের সমস্ত শ্যামলিমা কেটে সাফ করে দেয় অনবরত । কিন্তু শিকড়টা রয়েই যায় । একটি আত্মহত্যা কিংবা হত্যার পর গিরি ময়দান স্টেশনের বৃষ্টিতে পুনর্জীবন লাভ করে মনুষ্যত্ব । কী করে ? সেটা রহস্য হয়ে থাক ।
আরো অনেক রহস্য, অনেক একান্ত ব্যক্তিগত ভাললাগা অনেকেই খুঁজে পাবেন ‘বৃষ্টির পাখি’ তে । গল্পটা বিষাদে শেষ হয়নি, হয়েছে নতুন আশার সঞ্চারে । কিন্তু আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেল এই ভেবে যে বাসুদার মতই খড়গপুরে বা অন্য কোন মফঃস্বল শহরে কি গ্রামে হয়ত কত কবি, কত ঔপন্যাসিক মরে যাচ্ছেন, আমরা কেউ জানতে পারছি না । “উড়ে যাচ্ছে প্রসবকাতর এক শালিখ / ঠোঁটে নিয়ে আমাদের ব্যর্থ মনস্কাম ।”
অন্তত এই উপন্যাসটা যে আমার পড়া হল সেজন্য ঔপন্যাসিক এবং আমার বন্ধু মৃণালকে ধন্যবাদ দিলেও ছোট করা হবে । অরিন্দম দাসের লেখা অমন কবিতার লাইনগুলোই বা পেতাম কোথায় এই উপন্যাসটা না পড়লে ? কবি চলে গেছেন অকালে, নিঃশব্দে । কিন্তু জীবনই যে শেষ কথা তাতে ভুল নেই । নইলে মৃত্যুর দেড় দশক পরে মৃণালের হাত ধরে তাঁর লাইনগুলো আমার কাছে পৌঁছালই বা কী করে আর এভাবে আমাকে নাড়িয়ে দিলই বা কী করে ?

ভালবাসা কারে কয়

বেশ ছোটবেলাতেই আমার একটা বদভ্যাস হয়েছিল — প্রেমে পড়ার। জার্মান কবি শিলার একটা মজার কথা বলেছিলেন “মানুষ প্রেমে পড়ে বলে কবিতা লেখে না। কবিতা লেখে বলে প্রেমে পড়ে।” হয়ত সেভাবেও এই বদভ্যাসটা হয়ে থাকতে পারে।
যখন বিএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন দীর্ঘদিনের পরিচিত এক প্রাক্তন সহপাঠিনীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। সে বেচারি কিন্তু এর বিন্দু বিসর্গ জানে না। এক বন্ধুর থেকে ফোন নম্বর নিয়ে তার বাড়িতে ফোন করি। করে চুপ করে থাকি যতক্ষণ না সে হ্যালো হ্যালো বলতে বিরক্ত হয়ে ফোন ছেড়ে দেয়। অন্য কেউ ফোন ধরলে কেটে দিয়ে আবার করি। সেবার সরস্বতী পুজোর সময়ে রোখ চাপল এবার “প্রপোজ” করবই। কোনবার ঐ ছুটিতে বাড়ি আসতাম না। সেই উপলক্ষ্যে এলাম। এক বন্ধুর সেই মেয়েটির বাড়িতে প্রসাদ খাওয়ার নেমন্তন্ন ছিল। তার সহায়তায় আমারও নেমন্তন্ন হল। গেলাম। কখনো তাকে শাড়ি পরে দেখিনি। এমনিতেই আমি ক্যাবলা, আরো কেবলে গেলাম। প্রগল্ভ আমি সেদিন এতটাই চুপচাপ ছিলাম যে সে বলতে বাধ্য হল “তুই তো আজ কথাই বলছিস না।”
পরদিন বিকেলে হোস্টেলে ফেরত যাওয়া। রিকশায় ওঠার সময়ে বাবার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললাম আমি চলে গেলে ওটা পড়তে। বাবা অবাক। চিঠির প্রথম লাইনটা ছিল “বাবা, মনে হচ্ছে প্রেমে পড়েছি।” তারপর সেই মেয়েটির নামধাম ইত্যাদি।
হোস্টেলে ফেরার হপ্তাখানেক পরে বাবার চিঠি এল। তার সব কথা এখানে প্রাসঙ্গিক নয় কিন্তু বাবা লিখেছিল “Love is not just an emotion. It is a height to be achieved.” সেই উচ্চতায় উঠতে পেরেছি কিনা জানি না তবে চেষ্টা করে গেছি। আর শর্টকাট হিসাবে কখনো ভ্যালেন্টাইনস ডে কার্ড, ভেলভেটের হৃদপিন্ড, দামী চকোলেট — এসবের সাহায্য নিইনি। তাতেও কিন্তু আমাকে প্রেমিক হিসাবে অনেকেই অবিশ্বাস করেনি। যার সাথে গত ন’বছরের অভিন্ন জীবন, সে-ও করেনি।
আজকাল ভাবনা হয় আমার মেয়ের যখন প্রেমে পড়ার বয়স হবে তখন সে-ও বহুজাতিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়ে প্রেমকে উপহারের মূল্যে আর উদ্ঘাটনের প্রাবল্যে মাপতে শিখবে না তো?

%d bloggers like this: