দুটো বই নিয়ে দুটো কথা

যুগ বলছে নিজের ঢাক নিজেই পেটাও, নইলে কেউ শুনবে না। কিন্তু চক্ষুলজ্জা বলে একটা জিনিস আছে তো। তাই নিজের ঢাকের সাথে বন্ধুর ঢাকও পিটিয়ে নেওয়া গেল। মৃণাল শতপথী আর আমার বই নিয়ে দুজনের আলোচনা। তুলিরেখা ভিডিওটা তুলে সম্পাদনাও করে না দিলে অবশ্য সম্ভব হত না। আগ্রহীরা দেখবেন এবং মন্তব্য করবেন আশা রইল।

যে কথা ভিডিওতে নেই: কলকাতা বইমেলায় মৃণালের বই পাওয়া যাচ্ছে স্টল নং ৩৪৬ এ, আমারটা ৩২৭ এ।

ভ্রম সংশোধন: ভিডিওতে এক জায়গায় জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন মেগা কালচারগুলোর কথা বলেছি। মেগা কালচার মানে যে ভাষায় দশ লক্ষের বেশি লোক কথা বলে তেমন ভাষার সংস্কৃতির কথা বলেছি। ভুলটা আমারই। যে বিজ্ঞানী বন্ধু ব্যাপারটা আমাকে বলেছিল সে সংখ্যাটা মিলিয়নে বলেছিল। আমি লক্ষে পরিবর্তন করতে গিয়ে গুবলেট করেছি। সংখ্যাটা আসলে অনেক বেশি

Advertisements

দিলীপবাবুর দান

jd

মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কাছ থেকে ঠিক কী পাই আমরা? শিক্ষা বললে বোধহয় উত্তরটা দায়সারা হয়। কারণ শিক্ষা শুধু তাঁরাই দেন না। বাবা-মা দেন, আত্মীয়রা দেন, বন্ধুবান্ধবও নিজের অজান্তেই ভাল মন্দ নানারকম শিক্ষা দেয়। কিন্তু সেই সব শিক্ষাই যে আমাদের মনে থাকে এমন নয়। অথচ কোন মাস্টারমশাইয়ের কাছে শেখা কোন কোন জিনিস আমরা সারা জীবন ভুলতে পারি না। সত্যি কথা বলতে, দীর্ঘ কর্মজীবনের সব ছাত্রছাত্রীকে কোন মাস্টারমশাই বা দিদিমণিরই মনে থাকে না। অথচ এমন মানুষ পাওয়া বিরল যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের ক্লাস করতে হয়েছে তাঁদের কাউকে একেবারে ভুলে গেছে। এই বৈপরীত্যের কারণ শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে লেখাপড়া শেষ করা অব্দি কম শিক্ষক, শিক্ষিকার ক্লাস করে না একজন মানুষ। অথচ অনেক বৃদ্ধকেও দেখেছি স্কুলের মাস্টারমশাইদের দিব্যি মনে রেখেছেন। আসলে সম্ভবত আমরা শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে এমন অনেক জিজ্ঞাসা পাই যা সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকে। তার কিছু ক্লাসঘরেই, কিছু হয়ত ক্লাসঘরের বাইরে। প্রমথ চৌধুরীর কথা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে “সুশিক্ষিত লোক মাত্রেই স্বশিক্ষিত।” অতএব শিখতে হয় নিজেকেই, কেউ শেখাতে পারে না। কিন্তু কী শিখব, কেন শিখব, কোনটা শিখলে আমার ভাল লাগবে — প্রিয় মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা বোধহয় সেটাই ধরিয়ে দেন। কেউ খুব ভাল পারেন কাজটা, কেউ আবার তত ভাল পারেন না। যাঁরা ভাল পারেন তাঁরাই বোধহয় বেশি করে মনে থেকে যান। আজ সকালের কাগজে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে পাতা জোড়া লেখা পড়তে পড়তে যেমন আমার মনে পড়ছিল সেই মাস্টারমশাইয়ের কথা, যিনি জীবনানন্দে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
ক্লাস টেনে পড়ার সময়ে আমাদের পাঠ্য ছিল এই কবিতাটা:

তোমার বুকের থেকে একদিন চ’লে যাবে তোমার সন্তান

বাংলার বুক ছেড়ে চ’লে যাবে, যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে,

আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে

ডুবে যায়, — কুয়াশায় ঝ’রে পড়ে দিকে দিকে রূপশালী ধান

একদিন; — হয়তো বা নিমপেঁচা অন্ধকারে গা’বে তার গান,

আমারে কুড়ায়ে নেবে অন্ধকারে মেঠো ইঁদুরের মতো মরণের ঘরে —

হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে আছে আকাঙ্ক্ষার — তবুও তো

চোখের উপরে

নীল মৃত্যু উজাগর — বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণ —

কখন মরণ আসে কেবা জানে — কালীদহে কখন যে ঝড়

কমলের নাল ভাঙে — ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিখের প্রাণ

জানি নাকো;— তবু যেন মরি আমি এই মাঠ-ঘাটের ভিতর,

কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ

লেগে থাকে চোখেমুখে — রূপসী বাংলা যেন বুকের উপর

জেগে থাকে; তারি নীচে শুয়ে থাকি যেন আমি অর্ধনারীশ্বর।

আমাদের কবিতাটা পড়িয়েছিলেন দিলীপবাবু। তিনি গম্ভীর মানুষ। তাঁকে কখনো হা হা করে হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর হাসি স্মিত, তিনি রাগে ফেটে পড়তেন না, ফুটতেন। সর্বদা ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন। ফুল পাঞ্জাবীর হাতা কনুইয়ের উপর পর্যন্ত গোটানো থাকত। চোখে থাকত সেলুলয়েডের ফ্রেমের চশমা, চুল উলটে আঁচড়ানো। দূরদর্শনের সাদাকালো আমলে তোলা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যে ভিডিও এখনো মাঝেসাঝে দেখানো হয়, অনেকটা সেইরকম চেহারা। স্যার অবশ্য অতটা ছিপছিপে ছিলেন না। একটা হাত মুড়ে বুকের কাছে ধরা পাঠ্য বই আর ডাস্টার, অন্য হাতে চক নিয়ে দিলীপবাবু ক্লাসে আসতেন।
জীবনানন্দের কবিতাটা যত দিন ধরে আমাদের পড়িয়েছিলেন, তত দিন ধরে সম্ভবত অন্য কোন লেখা পড়াননি। প্রথম দিনই বললেন “এবার তোমরা যে কবিতাটা পড়তে যাচ্ছ, এর তুল্য কিছু আগে কখনো পড়নি।”
বেয়াড়া প্রশ্ন করার মত ছাত্র কোনকালে কম ছিল না। একজন জিজ্ঞেস করল “স্যার, ট্রামের তলায় কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে?”
আমরা তটস্থ। ভেবেছি রাশভারী দিলীপবাবু ভয়ানক রেগে যাবেন। কিন্তু তিনি স্মিত হেসে বললেন “কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে জানি না বাবা। তবে ইনি জীবনানন্দ দাশ, যে কোন মানুষ নন। এঁকে কোন ছকে ধরা যায় না। তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না। কবিতাটা বারবার পড়। এমনিতে আমাদের যা অভ্যেস আর কি। মানে বই পড়ব, বইটা পড়ব না। সেটা এঁর ক্ষেত্রে করেছ কি মরেছ।”
কবিতাটা পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝে আমাদের মুখগুলো দেখতেন। কোন মুখে একটু আগ্রহের উদ্ভাস, কোন মুখ একেবারে অনাগ্রহী, কোন মুখ দুর্বোধ্যতায় হাবুডুবু — এসবই খেয়াল করতেন বোধ করি। পড়াতে পড়াতে একদিন “কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ” পংক্তিতে পৌঁছেছেন। একজন প্রশ্ন করল “স্যার, ঢেউয়ের আবার গন্ধ হয় নাকি?”
“পুকুর বা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কোন গন্ধ পাওনি কখনো?”
ছেলেটি মাথা নেড়ে না বলায় দিলীপবাবু বড় অসহায়ের মত হাসলেন। তারপর বললেন “সত্যি। এ বড় অন্যায়। যাঁরা পাঠ্য ঠিক করেছেন তাঁদের বোধহয় এতখানি দাবী করা উচিৎ হয়নি তোমাদের কাছে। ক্লাসরুমে বসে কী করেই বা ঢেউয়ের গন্ধ বুঝবে তোমরা? তাছাড়া এত কিছু অনুভব করতে বলাও কি উচিৎ? অনুভব না করেই যখন পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায়। তবে বাবা কবিতা তো পাঠকের একটু বেশি মনোযোগ দাবী করে। কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও?”
আমাদের তখন দুর্বিনীত হওয়ার বয়স। আমি আর আমার এক বন্ধু তখন মনে করি আমাদের আশ্চর্য কাব্যপ্রতিভা আছে। আমরা দুজনেই তখন পাঠ্য কবিতার অক্ষম অনুকরণ দিয়ে কবিতার খাতা ভরিয়ে ফেলছি। অতএব যেদিন কবিতাটা পড়ানো শেষ হল এবং দিলীপবাবু বললেন কারো কোন প্রশ্ন থাকলে করতে, সেদিন আমার বন্ধুটি জিজ্ঞেস করল “স্যার, ভবিষ্যতে কোন কবি যদি জীবনানন্দের মত লিখতে পারে?”
দিলীপবাবু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন “সে হবার নয়। ইনি যে পথে হেঁটেছেন সে পথে বাংলা কবিতার ইতিহাসে আগেও কেউ হাঁটেননি, পরেও কেউ হাঁটেননি। যে হাঁটবে তার পরিণতি হবে জীবনানন্দের মতই। কত লোকে কত কথা বলেছে। কেউ বলেছে নৈরাশ্যবাদী কবি, কেউ বলেছে নির্জনতার কবি। এঁর মত হওয়া যায় না। আর হতে যাবেই বা কেন? নিজের মত হও।”
ক্লাসের শেষদিকে এসে বললেন “কবিতাটা তো পড়ালাম। কিন্তু বলে দিই, দেখা গেছে বোর্ডের পরীক্ষকরা জীবনানন্দের কবিতার প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেয়ার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। অতএব যারা বেশি নম্বর পেতে চায় তারা জীবনানন্দকে ছোঁয় না। তোমরাও নির্ঘাত তাই করবে। তবে কেবল নম্বর পাওয়ার জন্যে কবিতা পড়া খুবই দুর্ভাগ্যের। জীবনানন্দ তোমাদের নম্বর পাইয়ে দিতে পারবেন না। তবে যদি একটু ভাল লাগিয়ে নিতে পার, তাহলে এমন অনেক কিছু পেতে পার যা আমারও জানা নেই।”
যেন রহস্যোপন্যাস। শেষে সাংঘাতিক কিছু আছে সেই আভাসটুকু দিলেন কিন্তু কী আছে বললেন না। ঐ খোঁচাটুকুই আমায় বাধ্য করল রূপসী বাংলা বইটার খোঁজ করতে। পরে আরো অন্যান্য। আজও যখন জীবনানন্দ পড়তে গিয়ে কোন পংক্তিতে আটকে যাই, দুর্বোধ্য মনে হয়, স্যারের কথাগুলো মনে করি। “কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও।”
দিলীপবাবু আমায় জীবনানন্দ দিয়েছেন। তাঁর ক্লাসে আজও বসে আছি।

আখতারনামা : বিস্মৃত ইতিহাস

akhtarnama

দর ও দীবার পে হসরত সে নজর করতে হৈঁ
খুশ রহো অহল-এ-বতন হম তো সফর করতে হৈঁ

বাঙাল পরিবারের ছেলে আমি। দেশভাগ দেখিনি, পৈতৃকবাড়িতে মানুষ হয়েছি। কিন্তু উদ্বাস্তুর রক্ত আমার গায়ে, উদ্বাস্তুর ভাষা আমার জিভে, উদ্বাস্তুর গান আমার গলায়। ছিন্নমূল মানুষের সাথে আমার নাড়ির টান। তাই বুঝতে পারি, শুধু দাফনের সময়েই রাজা আর প্রজা এক হয়ে যায় না, শিকড় থেকে ছিঁড়ে নিলেও একইরকম যন্ত্রণা হয় রাজা আর প্রজার। তাছাড়া রাজত্ব চলে গেলে আর রাজা কিসের? অবধের গদিচ্যুত, নির্বাসিত রাজা ওয়াজিদ আলি শাহের আখ্যান পড়তে আমার উৎসাহ মূলত এই কারণে। পৃথিবীজুড়ে উদ্বাস্তুদের মৃত্যুমিছিল দেখতে দেখতে, রোহিঙ্গাদের দেশহীন অস্তিত্ব আর আমাদের দেশপ্রেমিক মনুষ্যত্বহীনতার সাথে আপোষ করতে করতে তাই শামিম আহমেদের ‘আখতারনামা’ পড়তে শুরু করেছিলাম।
ফেলে আসা বাস্তুর অভাব যে বোধ করে না সে উদ্বাস্তু কিনা সেটা আমার কাছে এখনো খুব পরিষ্কার নয় কিন্তু ফেলে আসা বাড়ির দরজা জানালা, পথঘাট, জলহাওয়া, মানুষজনের জন্যে যার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় অবিরত তার উদ্বাস্তু পরিচয় অনিবার্য। অবধের শেষ রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ (সিপাহী বিদ্রোহের সময়টুকু তাঁর নাবালক পুত্র ব্রিজিস কদরের রাজত্ব বাদ দিলে) সেই অধিকারেই উদ্বাস্তু। নইলে কী করে তিনি লেখেন

দরজা দেখি দেয়াল দেখি ব্যর্থ আশে
দেশের মানুষ ভাল থেকো
চললাম এবার পরবাসে।

এ তো শুধু রাজত্ব হারানোর খেদ নয়। আখতারের (ওয়াজিদ যে নামে লিখতেন) এই যন্ত্রণার কথা পড়তে গিয়ে মনে পড়ে যায় ‘কোমল গান্ধার’ এর সেই দৃশ্য যেখানে ভৃগু অনসূয়াকে শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রার দৃশ্যের অভিনয় বোঝাতে মনে করিয়ে দিচ্ছে ৪৭ সালে পূর্ববঙ্গের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসার কথা। বলছে “ইমোশন মেমরি ইউজ কর না… মনে কর না, এই কলকাতাই তোমার তপোবন, ঐ যে মিছিল চলেছে ঐ হচ্ছে তোমার নবমালিকা, বনজ্যোৎস্না। ধর কোন ভিখিরি মেয়ে তোমার কাছে পয়সা চাইল… সেই মাতৃহীন হরিণশিশুটি। ভেবে দ্যাখো, যদি কোনদিন এই কলকাতা থেকে, এই বাংলাদেশ থেকে তোমাকে চলে যেতে হয়, এই কলকাতার সবকিছু তোমার পায়ে পায়ে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরবে না?”
এই অনুভূতিই ছিন্নমূল মানুষের অভিজ্ঞান। এই অনুভূতিই তো ধরা রয়েছে আখতারের মিসরায়, ঋত্বিক ঘটকের ফিল্মে। ভাবতে ভাবতেই খেয়াল হয়, যে পর্বের শুরুতে পড়ছি আখতার অবধ ছেড়ে কলকাতায় পৌঁছনোর পরেও তাঁর রাজ্য থেকে বহু মানুষ এসে বিলাপ করছেন, সেই পর্বটার নাম ‘বনপর্ব’। ঋত্বিকের মত শামিমবাবুও মহাভারতে ভর দিয়েছেন এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে। উদ্বাস্তুর ট্রাজেডি সততই এপিক — সে কপর্দকশূন্য রোহিঙ্গাই হোক আর রাজ্য হারানো বিপুল বিত্তশালী রাজা।
কিন্তু আখতার তো একমাত্র রাজা নন যাঁর রাজ্য ইংরেজরা প্রাক-সিপাহী বিদ্রোহযুগে সামান্য ছুতোয় গিলে নিয়েছিল। তাহলে এই ২০১৭য় দাঁড়িয়ে কেনই বা আখতারনামায় আলাদা করে উৎসাহ থাকতে যাবে আমাদের? বুঝতে হলে পড়ুন এই অংশটা

সেইমত যাত্রা শুরু হল। পূর্বে রইলেন জনা চারেক দক্ষ অশ্বারোহী, মধ্যখানে যুবরাজ ওয়াজিদ ও শাহজাদা সিকান্দার, পশ্চাতে কয়েকজন অনুচর। মধ্যাহ্নে যাত্রা শুরু করে তাঁরা সূর্যাস্তের সময় পৌঁছোলেন সিধৌলিতে। সীতাপুরের জমিদার রাত্রিযাপন ও ভোজনের আয়োজন করে রেখেছিলেন। পথশ্রমে ক্লান্ত অশ্বগুলির এই বিশ্রামের খুব প্রয়োজন ছিল। রাধাকৃষ্ণভক্ত যুবরাজ শুনলেন, এখানেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত কবি নরোত্তম দাস। তুলসীদাসের সময়ের এই কবি কৃষ্ণের মিত্র সুদামাকে নিয়ে লিখেছিলেন সুদামা-চরিত। বড়ো কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন সুদামা। স্ত্রী-পুত্রের গ্রাসাচ্ছাদনের ক্ষমতা পর্যন্ত তাঁর ছিল না। একদিন স্ত্রী সুশীলা বললেন, তুমি তোমার বন্ধু কৃষ্ণের কাছে গিয়ে তো সাহায্য চাইতে পারো, শুনেছি তিনি এখন বিরাট মানুষ। তুমি তাঁর শৈশবের বন্ধু, নিশ্চয়ই তোমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। সুদামা প্রাথমিকভাবে সম্মত হলেন না। কিন্তু স্ত্রীর পীড়াপীড়ি আর সন্তানদের মুখ চেয়ে গেলেন প্রিয় বন্ধুর কাছে। উপহার হিসাবে পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে গেলেন কৃষ্ণের প্রিয় খাদ্য, খুদ। সুদামাকে দেখে প্রফুল্ল কৃষ্ণ তাঁর অনেক আদরযত্ন করলেন। সুদামা খুব খুশি। তারপর তিনি একদিন সেখান থেকে চলে এলেন। কেন যে কৃষ্ণের কাছে তিনি গিয়েছিলেন, সেটাই বলতে ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে দেখেন, তাঁর পর্ণ কুটিরের জায়গায় বিরাট অট্টালিকা, স্ত্রী-সন্তানদের দামি বেশভূষা। চমকে গেলেন তিনি। কী করে হল? স্ত্রী সুশীলা বললেন, সবই তোমার মিত্র কৃষ্ণের কৃপা। তাঁর স্ত্রী রুক্মিণী যে স্বয়ং লক্ষ্মী। এই কাহিনি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লেন যুবরাজ। রাতে খোয়াবে দেখলেন, স্বয়ং কৃষ্ণ তাঁর গৃহের সব কষ্ট লাঘব করার জন্য সুদর্শন চক্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি খোয়াবে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারছেন না।

একজন শিয়া মুসলমানের কৃষ্ণভক্ত হওয়া লেখকের অসম্ভব কল্পনা বলে মনে হচ্ছে? যদি হয় তাহলে এই উপন্যাস আরো বেশি করে পড়া উচিৎ। কারণ ওয়াজিদ আলি শাহ এমন একজন নিষ্ঠাবান শিয়া মুসলমান যিনি ঝুলনের দিন স্বরচিত নৃত্যনাট্যে পরিখানার পরিদের নিয়ে নাচতেন, নিজে কৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করতেন। শুধু তাই নয়, লখনৌয়ের যোগিয়া মেলায় গেরুয়া আলখাল্লা পরে সারা গায়ে ছাই মেখে তিনি নাচতেন। আবার মহরমের দিন খালি পায়ে তাজিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাঁটতেন।
শকুন্তলার ছেলে ভরত, সেই ভরতের নামে যে ভূখন্ডের নাম ভারতবর্ষ, তা প্রাথমিকভাবে অধিবাসীদের ভাগ করে নেওয়া এক বিরাট মনোভূমি। ওয়াজিদ আলি শাহ ওরফে আখতার সেই মনোভূমির রক্তমাংসের প্রতীক। ইংরেজরা সেকথা বোঝেনি। তাই তাঁর ওসব কাণ্ডকারখানা দেখে তারা প্রচার করত রাজা উন্মাদ। ঠিক তেমনি আজকের শাসকরা যা কিছু ভারতের যৌথ সংস্কৃতি, তাকে নস্যাৎ করে দিতে চাইছে। বলছে তাজমহল ভারতীয় ঐতিহ্য নয়, মোগল শাসন আসলে হিন্দুদের পরাধীনতার যুগ ইত্যাদি। এই ইতিহাস নস্যাৎ করে দেওয়ার কালে আখতারনামা আমাদের বিশেষ প্রয়োজন ছিল।
ওয়াজিদ আলির শাসনকাল খুব বেশিদিন নয়, এ বই পড়তে পড়তে বোঝা যায় তিনি যে খুব দক্ষ শাসক ছিলেন তাও নয়। অন্তত যতবড় শিল্পী ছিলেন ততবড় শাসক যে ছিলেন না সেকথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। তবু একথা জোর দিয়ে বলা যাবে না যে এই ২০১৭ র ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শাসকদের তাঁর থেকে কিছুই শেখার নেই। অযোধ্যা আর কাশীর মত দুটো জায়গা ছিল যে শাসকের রাজ্যে, তিনি যেভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতেন তা থেকে আজকের শাসকদের শেখার আছে বইকি। বিশেষ করে যে শাসকরা দুর্গাপুজোর ভাসান আর মহরমের তাজিয়া কিভাবে একসাথে সামলাবেন ভেবে পান না। আখতার কিন্তু দোল আর মহরম একসাথে সামলেছিলেন।
শেষপর্যন্ত অবশ্য ইংরেজরা নিখুঁত চক্রান্তে সেই সম্প্রীতিও ধ্বংস করে। সেদিক থেকে এ বই ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, লুণ্ঠন, অতঃপর যত দোষ সব ভারতীয় শাসকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া — এসবেরও এক দলিল। বিশেষত আখতারের মৃত্যুর পর মেটিয়াবুরুজে তাঁর অবশিষ্ট স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি যে দ্রুততায় এবং নির্লজ্জায় হজম করা হয় তেমন বেহায়া চৌর্যবৃত্তি আমাদের যুগেও সুলভ নয়।
এই উপন্যাস নিয়ে অনুযোগের জায়গা কি নেই? আছে। প্রথমত, শামিমবাবু সাধারণত যেরকম পাহাড়ি ঝোরার মত গদ্য লেখেন (বিশেষ করে প্রথম উপন্যাস সাত আসমানে যা পাওয়া যায়) এখানে সেটার অভাববোধ করলাম। এ গদ্য যেন হিসেবী কর্পোরেশনের জল। হয়ত তার একটা কারণ বিষয়বস্তু। দ্বিতীয়ত, সময়ে সময়ে মনে হয় লেখক তথ্যে মনোযোগ দিতে গিয়ে গল্পের সুতোটা যেন ছেড়ে দিলেন। অবশ্য কখনোই এতটা ছাড়েননি যে ঘুড়ি কেটে যাবে কিন্তু বোধহয় কিছু তথ্য পরিশিষ্টে পাঠিয়ে দিতে পারলে ঘুড়িটা আরো নির্ভার হয়ে উড়তে পারত। যাঁর ঘুড়িতে এত রঙ তাঁর কাছে এই প্রত্যাশা পাঠকের থাকেই।
এর চেয়েও ভাল লেখা আমার মাস্টারমশাই নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে লিখবেন কিন্তু সন্দেহ নেই ‘আখতারনামা’ একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে — ওঁর নিজের লেখালিখিতে তো বটেই, হয়ত সমসাময়িক লেখালিখিতেও। কারণ এ বইটা আমাদের ভুলে যাওয়া অথচ জরুরী ইতিহাসের কিছু পাতা নতুন করে ছাপিয়েছে।