না হয় আজ চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ভারতীয় দলটা আসলে কার?

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে।

যদি বলি আজ গ্রহ, উপগ্রহগুলো চিন্তায় আছে— তাহলে হাসাহাসি করবেন না। ব্যাপার খুব গুরুতর। টানা দ্বিতীয়বার যদি ভারতীয় দল কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে কোনও কথা নেই। কিন্তু যদি হেরে যায়, তখন বৃহস্পতি কোন অবস্থানে থাকার জন্যে চরম মুহূর্তে ঈশান কিষণের হাত থেকে অমুক ক্যাচটা পড়ে গেল, অথবা শনির কোন চক্রান্তে যশপ্রীত বুমরার ইয়র্কারটা লেংথ মিস করে ফুলটস হয়ে গেল আর ড্যারিল মিচেল বোল্ড হওয়ার বদলে ছক্কা মেরে দিলেন— তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যেতে পারে। তাতে কোন জ্যোতিষীর কপাল পুড়বে আমরা জানি না। যাঁর পুড়বে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে বলতেই পারেন “আমার গণনায় ভুল ছিল না। হতভাগা শনি নিজের গতি কমিয়ে ফেলেছে চক্রান্ত করে। ভাগ্যিস বৃহস্পতিটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, তাই শেষ ওভার পর্যন্ত গেছে। নইলে দু ওভার আগেই খেল খতম হয়ে যেত।”

আষাঢ়ে গপ্পো লিখছি ভেবে অন্য লেখায় চলে যাচ্ছেন তো? আচ্ছা যাবেন নাহয়। যাওয়ার আগে শুনে যান, বাংলার সাংবাদিক বা ইউটিউবাররা আপনাকে খবরটা না দিলেও, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের সাংবাদিক দেবেন্দ্র পাণ্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগেরদিন লিখেছিলেন যে, ভারতীয় দলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল সন্ধে ছটা থেকে। কিন্তু যেহেতু সেদিন চন্দ্রগ্রহণ চলার কথা বিকেল তিনটে কুড়ি থেকে ছটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত, সেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে, এই অশুভ সময়ে শুভ কাজ করতে না যাওয়াই ভালো। তাই অনুশীলন শুরু হয় চন্দ্রগ্রহণের পরে।

শাস্ত্রে বলেছে— মহান ব্যক্তিরা যে পথে চলেন সেটাই সঠিক পথ। আর কে না জানে, ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলেই মহান! গৌতম গম্ভীর থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি মিঠুন মানহাস, সকলেই সনাতনী। ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখনও নাকি এসব হতো। তবে তফাতটা হল, তখন গম্ভীর আর কোচ বিজয় দাহিয়া বুক ফুলিয়ে বলতেন যে তাঁরাই এটা করাচ্ছেন। এখন কে যে চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না। দেবেন্দ্র পাণ্ডের ওই প্রতিবেদনেও বলা নেই। প্রতিবেদনে কেবল বলা আছে ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। সাধারণত এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় অধিনায়ক, কোচ আর নির্বাচকদের। আজকাল ‘সাপোর্ট স্টাফ’-ও গুরুত্বপূর্ণ, ফলে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটকও সিদ্ধান্তটা নিয়ে থাকতে পারেন। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ধর্মে চন্দ্রগ্রহণ অশুভ বলা আছে বলে তো জানা নেই। সিদ্ধান্তটা সূর্যকুমার যাদব, গম্ভীর, কোটক, নির্বাচন সমিতির প্রধান অজিত আগরকর— সকলে মিলেও নিয়ে থাকতে পারেন। দলে যতই সঞ্জু স্যামসনের মত খ্রিস্টান, অর্শদীপ সিংহের মতো শিখ আর মহম্মদ সিরাজের মত মুসলমান ক্রিকেটার থাকুন, দলটা তো সনাতনীদেরই। ফলে তাঁদের ধর্মে যে সময়টাকে অশুভ বলা হয়েছে, সেইসময় অনুশীলন করা যে কোনওভাবেই চলতে পারে না তাতে সন্দেহ কী?

এ মা! রেগে গেলেন নাকি? আরে আমি কি বলেছি যে ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে? আমি শুধু বলছি, অক্ষরে অক্ষরে শাস্তর মেনে পাঁজি-টাজি দেখে যখন মাঠে নামা হচ্ছে, তখন দল হেরে গেলে তার দোষ কখনওই খেলোয়াড়দের বা কোচদের হতে পারে না। সব গ্রহদোষ। এমনিতেও সর্বশক্তিমান জয় শাহ বিসিসিআই ছেড়ে আইসিসির চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার পরে বিসিসিআইয়ের কোনও সিদ্ধান্ত যে কে নেন তা কেউ বলে না। সিদ্ধান্তগুলো সর্বসমক্ষে জানান বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়া, কিন্তু নেন কে? সেকথা কিন্তু দেবজিৎও বলেন না।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে দেওয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? ভারত সরকার? না তো! বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ মোটেই এরকম কিছু বলেননি। তাঁদের মন্ত্রকের কোনও উচ্চপদস্থ অফিসারও বলেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্কেরও কোনও অবনতি হয়নি ওদেশের প্রাক-নির্বাচনী খুনোখুনির কারণে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে জয়শংকর, রাজনাথ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খালেদা-পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ও হয়েছে। তাহলে মুস্তাফিজুরের অপরাধটা কী? কেউ জানে না। আপাতত বাংলাদেশে হিন্দুবিদ্বেষী জামাত-এ-ইসলামি তো হেরে ভূত, তাহলে আইপিএলের সময়ে মুস্তাফিজুরকে ডেকে নেওয়া হবে কি? কেউ জানে না। কারণ তাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল তা-ই কেউ জানে না। কেবল দেবজিৎ একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— ওকে বাড়ি পাঠাতে হবে।

তেমনই পহলগামে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিয়ে অনেককে খুন করেছে বলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খেলবেন কিন্তু করমর্দন করবেন না, অর্থাৎ ‘যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, তাও কেউ জানে না। বলা হয়, বিসিসিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিসিআই কি গা ছমছমে হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ফিল্মে দেখা সর্বশক্তিমান কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়, মানুষ টেরই পায় না? বিসিসিআইয়ের তো একজন সভাপতি আছেন। বোর্ডের সংবিধান অনুযায়ী তিনিই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক। অথচ তিনি তো কই কিছু বলেননি! আচ্ছা কে এই ভদ্রলোক? চেনেন তাঁকে? না চিনলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। দিল্লির বাইরে তাঁকে বিশেষ কেউ চেনে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন্দ ব্যাট করতেন না, দিল্লির হয়ে খেলতেন। বিসিসিআইয়ের সভাপতির আসনে বসেছেন জগমোহন ডালমিয়া, এন শ্রীনিবাসনের মত নামকরা শিল্পপতিরা; কখনও এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতারা, কিম্বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার অথবা শশাঙ্ক মনোহরের মত ক্রিকেটপ্রেমী ক্ষমতাশালী লোকেরা। এই আসনে মিঠুনকে বসানো মানে হল “চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাক ধরে বাতি/ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল/শল্য হল রথী।” এই লজ্জাতেই হয়তো মিঠুন মুখ খোলেন না বা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে কিছু জানতেও চায় না, যা বলার দেবজিতই বলেন। তাহলে দেবজিৎ কি শ্রীরামকৃষ্ণ, আর মিঠুন গিরিশ ঘোষ? দেবজিতকে বকলমা দিয়েছেন? কেন দিলেন? কার নির্দেশে দিলেন? উত্তর নেই।

অবশ্য মিঠুনের পূর্বসুরি রজার বিনি, যাঁর ক্রিকেটিয় কীর্তি ভোলার নয় কারণ তিনি ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য, তিনিও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। যা ঘটত সবই যে তৎকালীন সচিব জয়ের নির্দেশে, তা নিয়ে তখন রাখঢাক ছিল না। ব্যাপারটা রেখে ঢেকে করা হতো সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন।

সাংবাদিক শারদা উগ্রা ২০২৩ সালেদ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবদনে লেখেন যে, সৌরভের আমলের শেষদিকে জয়ের নির্দেশে বিসিসিআইয়ের অন্যরা সৌরভের ফোনই ধরতেন না। সৌরভ যে বোর্ড সভাপতি হতে পেরেছিলেন জয়ের বাবা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুকূল্যে— সেকথা এখন অনেকেরই জানা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি নতুন সংবিধান ফের বদলাতে আদালতে বারবার আবেদন করে সৌরভ অনেকদিন পদে টিকে ছিলেন জয়ের সঙ্গে গলাগলি করে। তার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। যা-ই হোক, কথা হল, এখন তো আর জয় বিসিসিআই কর্তা নন। তাহলে বিসিসিআই চালাচ্ছে কে? এই প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তাই মনে রাখবেন— শারদার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Shah’s Playground: BJP’s Control of Cricket in India’।

অর্থাৎ বিসিসিআই হল জয়ের খেলার মাঠ তথা বিজেপির শাখা অফিস। এই কথাটি ক্রিকেটমহলে জানে সবাই, কিন্তু লেখার মত মেরুদণ্ড গোটা ভারতে হাতে গোনা যে কজনের আছে (বাংলায় কারও নেই), তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন শারদা। ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ইংরিজিতে লিখিত এবং বেশ দামি একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেই বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়েনি। পড়লেও যে খুব বিশ্বাস করতেন তা অবশ্য নয়। কারণ ক্রিকেট ভারতে ধর্মের স্তরে উন্নীত হয়েছে অনেককাল হলো। এই ধর্মের ভক্তরা আবার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টানদের চেয়েও এককাঠি সরেস। সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের গোঁড়া লোকেরা চিরকাল নিজের ধর্মের না হোক, অন্য ধর্মের দোষ দেখতে পায়। তা নিয়ে খুনোখুনি করে। সহিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা এবং নাস্তিকরা তাদের নিন্দা করেন। গত বিশ-তিরিশ বছরে যেহেতু বিজেপি এদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিজেপির বিরোধী তাঁরাও চারদিকে এত ধর্মের বাড়বাড়ন্তের নিন্দা করেন। সবেতে ধর্মকে টেনে আনা, নিজের ধর্মবিশ্বাসের উগ্র প্রকাশের মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের পিছনে লাগার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষ এদেশে এখনও পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই যেমন হিমাচল প্রদেশের এক যুবককে পেয়েছি, যিনি উন্মত্ত হিন্দু গুন্ডাদের হাত থেকে এক মুসলমান বৃদ্ধকে বাঁচাতে নিজের নাম বলেছেন মহম্মদ দীপক। কিন্তু ভারতে ক্রিকেট এমন এক ধর্ম, যার কোনো দোষ উপরে উল্লিখিত ধর্মগুলোর কেউই দেখতে পান না। ফলে দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছে বিজেপি— একথা নাস্তিক, ঘোর বামপন্থী ক্রিকেটপ্রেমীদের বললেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের মতই তাঁদের চোখে ভারতীয় ক্রিকেট দল আজও ফুলের মত নিষ্পাপ এবং ক্রিকেটাররা স্রেফ ননীচোর বালগোপাল।

বিজেপি আমলে যেমন, তেমনই চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে ক্রিকেট দল। বিসিসিআইকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত সম্প্রচারকারী সংস্থা একেবারে বিজেপির ঢঙেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, খেলোয়াড়ি মনোভাব বর্জিত কুরুচিকর প্রোমো প্রচার করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এশিয়া কাপ জিতে ক্রিকেট অধিনায়ক বলে দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদী নিজেই স্ট্রাইক নিয়ে রান করে দিলেন। ভাবা যায়!

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে। এদিকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী মহম্মদ শামি এখন আগরকরের কথা মতো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও দলে সুযোগ পাচ্ছেন না (কুড়ি বিশের দলে সুযোগ দেওয়া উচিত বলছি না)। সরফরাজ খান শয়ে শয়ে রান করেও নড়বড়ে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। হর্ষিত রানা আহত না হলে মহম্মদ সিরাজকেও চলতি বিশ্বকাপের ১৬ জনের মধ্যে রাখা যাচ্ছিল না। অথচ তিনি ভারতীয় পেসারদের মধ্যে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে ফিট, লম্বা লম্বা স্পেলে বল করেছেন, ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। এসবের কোনওটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের বিজেপি-চালিত হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ ওঁদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলেন, তাঁদের চোখেও ক্রিকেটাররা ‘নন-বায়োলজিকাল’।

যাঁরা বিজেপির দেশ শাসনের ব্যর্থতা দেখতে পান না, তাঁদের বিসিসিআইয়ের অপদার্থতা দেখতে না পাওয়ার মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রথমটা নিয়ে রীতিমতো সোচ্চার, তাঁরা ২০২৩ বিশ্বকাপের মতও এবারও টিকিট বিক্রির অব্যবস্থা নিয়ে টুঁ শব্দ করলেন না। স্রেফ গা জোয়ারি করে, বিসিসিআইয়ের জেদ বজায় রাখতে, জয়ের নেতৃত্বাধীন আইসিসির বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াও চার হাত-পা তুলে সমর্থন করলেন। এ হল বিশ্বের অষ্টমাশ্চর্য!

আরো পড়ুন ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড ক্রিকেট বাণিজ্যের মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে একদা প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোতেও যে খেলাটার কফিনে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে— সেকথা স্বীকার করার মানসিকতাও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা হারিয়েছেন। তাই সেমিফাইনালে হারার পর ইংল্যান্ড দল দেশে ফিরছে চার্টার্ড বিমানে আর আগেই হেরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতেই বসে থাকতে হচ্ছে— এ নিয়ে খেলোয়াড়রা অসন্তোষ প্রকাশ করলে সোশাল মিডিয়ায় কুযুক্তি এবং গালাগালির শিকার হচ্ছেন। কী আশ্চর্য দেখুন! যে সুনীল গাভাসকর আজকাল কথায় কথায় বিসিসিআইয়ের ধ্বজা ধরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অতীতের অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার তত্ত্ব আওড়ান, তিনি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটপ্রেমীরা একসময় গাভসকরের নামে গান বেঁধেছেন, নিজেদের দেশে রাস্তার নাম রেখেছেন, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের প্রতি বৈষম্য দেখেও তিনি কিন্তু চুপ। যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিসিসিআইয়ের, তাদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিসিসিআই (যদি সরল শিশুর মত ধরে নিই, আইসিসিকে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে না) চুপ। মুখ খুলেছেন কে? ইংল্যান্ডেরই প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ব্যবহার সব দলের প্রতি সমান হওয়া উচিত। কার আইসিসিতে কত প্রভাব তার ভিত্তিতে কাজ হওয়া উচিত নয়।

পণ্ডিতরা বলেন, হিন্দুশাস্ত্রে লেখা আছে “অতিথি দেবো ভব”। মানে অতিথি হল ঈশ্বর। সংবিধানকে মারো গুলি, আমাদের ক্রিকেটে সবই হিন্দু মতে চলছে। শুধু অতিথিদের বেলায় ব্যতিক্রম। অন্য দেশের সমর্থকরা যাতে বেশি সংখ্যায় বিশ্বকাপ দেখতে আসতে না পারে, তার ব্যবস্থা পাকা করা হয় ভিসা নিয়ে নানা গ্যাঁড়াকল করে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভিসা নিয়েও প্রতিবার ঝামেলা পাকানো হয়।

অ্যাঁ, কী বলছেন? বিজেপি ক্রিকেট চালাচ্ছে তো কী হল, আসল কথা হল মাঠে জেতা? আজ্ঞে তা তো বটেই। তবে কিনা জগতের নিয়ম হল, কোনো দেশ চিরকাল জেতে না। কে ভেবেছিল ক্লাইভ লয়েড, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আজকের অবস্থা হবে? কে-ই বা ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়া চলতি বিশ্বকাপের শেষ চারেও উঠতে পারবে না? কেবল খেলার মাঠে নয়, জগতের কোনও ময়দানেই কেউ চিরকাল জেতে না। হারার সময় যখন আসে, তখন মানসম্মান তাদেরই বজায় থাকে, যারা নিজেদের সুসময়ে পরাজিতকে সম্মান দিয়েছিল। বেপরোয়া মস্তানদের শেষ পরিণতি নিয়ে বিস্তর বই-টই, সিনেমা-টিনেমা হয়েছে। চ্যাটজিপিটিকে তালিকা বানিয়ে দিতে বলুন।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকরাই এখন ক্রিকেট বোর্ডের ‘চিয়ারলিডার’

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

নয়ের দশকে অক্ষয় কুমার অভিনীত একখানা হিন্দি ছবিতে একটি মহা চটুল গান ছিল। গানের স্থায়ীতে নায়কের বক্তব্য হল— কোথা থেকে প্রেম শুরু করব বুঝতে পারছি না।
লিখতে বসে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। কারণ অ2অনুস্বর সম্পাদক যে বিষয়টি বেছে দিয়েছেন তা নিয়ে অনেককিছু বলার আছে। আমাকে উদ্ধার করলেন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিবেদন লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক। তাঁর নামটি উহ্যই থাক, কামটি যখন গর্ব করার মতো নয়। তবে সোশাল মিডিয়ার দৌলতে তাঁর কামটি দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে ফেলেছে।
২৬ ফেব্রুয়ারির ভারত-জিম্বাবোয়ে ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের আলোচ্য সাংবাদিকটি জিম্বাবোয়ের পক্ষ থেকে আসা ক্রিকেটারটিকে প্রশ্ন করেন— আপনাদের দলের ব্যাটাররা ব্রায়ান বেনেটকে শতরান করার সুযোগ দিল না কেন? ভিডিওতে ক্রিকেটারটির মুখের চেহারা দেখে আপনার স্কুলজীবনের সেইসব বন্ধুদের মনে পড়বে, যারা ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর কণ্ঠস্থ করে স্কুলে পৌঁছে আবিষ্কার করত যে সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা।

আপনি যদি না জেনে থাকেন যে সাংবাদিক সম্মেলনে কোন ক্রিকেটার এসেছিলেন, তাহলে আপনি হয়তো ভাবছেন—এভাবে লেখার কী আছে? প্রশ্নটা তো সঙ্গত। দল তো এমনিতেও হারত, বেচারা ৯৭ রানে অপরাজিত রয়ে গেল। সতীর্থরা একটু চেষ্টা করলে কি ওর শতরানটা হয়ে যেত না?

আবার আপনি যদি ভারতীয় ক্রিকেট ব্যক্তিসর্বস্ব বলে মনে করেন, তাহলে ভাবছেন— ঠিকই তো করেছে। দলগত খেলায় কে সেঞ্চুরি পেল না পেল তা নিয়ে ভাববে কেন? দয়া করে অত গভীরে ভাবতে যাবেন না। কারণ সাংবাদিক সম্মেলনে যিনি এসেছিলেন তিনিই বেনেট।
তিনি প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে, কী প্রশ্ন করা হল জিজ্ঞেস করছেন দেখেও, সাংবাদিকটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নটি বুঝিয়ে বলেন। তখন বেনেটকে বলতে হয়— আমিই বেনেট। তাতে হাসির রোল ওঠে এবং লজ্জাজনক ব্যাপারটির মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়। এই হল আমাদের দেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা। এমন সব দুর্দান্ত পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান লোকেরা কাজটা করছে যে, কার সাংবাদিক সম্মেলনে বসে আছে তা-ই জেনে উঠতে পারছে না।

অবশ্য অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও কথিত আছে যে তিনি নাকি একবার ট্রেনে উঠে টিকিট হারিয়ে ফেলে যারপরনাই লজ্জিত বোধ করছিলেন, তখন টিকিট চেকার তাঁকে আশ্বস্ত করেন— আমি জানি আপনি ডক্টর আইনস্টাইন। টিকিট নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আপনি যখন বলছেন টিকিট কেটেছিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আইনস্টাইন আশ্বস্ত হলেন না, কারণ টিকিটটার দরকার চেকারের নয়, তাঁর নিজেরই। কোথায় যাচ্ছেন সেটাই ভুলে বসে আছেন যে।

এটি ঘটনাই হোক আর রটনাই হোক, ব্যবহার করা হয় একথা বোঝাতে যে জিনিয়াসরা এমন সব ভুল করে থাকেন যা সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর। তা আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটি যদি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব জাতীয় কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, তাহলে তাঁকেও জিনিয়াস বলে মেনে নিয়ে প্রমাণস্বরূপ এই ঘটনাটি প্রচার করা যাবেখন। কিন্তু আপাতত এ ঘটনা থেকে একটি জিনিসই প্রমাণিত হচ্ছে— এদেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতা করতে এখন ন্যূনতম যোগ্যতারও প্রয়োজন হচ্ছে না।

একথায় অনেক সাংবাদিকই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পরে যেমন জ্বলে উঠেছিলেন, তার কারণ আরেকখানা ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, এক সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাচের পরে পৌঁছে গেছেন একেবারে মাঠের মাঝখানে, যেখানে কোনো সাংবাদিক যাওয়ার অনুমতি পান না। গিয়ে কী করছেন? ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ডেভিড মিলারকে দাঁড় করিয়ে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাচ্ছেন। ব্যাপারটি পড়তে যত ন্যাকা ন্যাকা লাগছে, আসলে তার চেয়েও বেশি ন্যাকা ছিল।
তবে সে ভিডিও আর দেখতে পাবেন না, কারণ সাংবাদিকদের রাগ এবং কিছু ক্ষিপ্ত ক্রিকেটভক্তের অশ্লীল মন্তব্যের ঠ্যালায় সেই ইনফ্লুয়েন্সার মহিলা ভিডিওটি মুছে দিয়েছেন। তবে তিনি একা নন, আরও কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার চলতি বিশ্বকাপে এমন গুরুত্ব পাচ্ছেন আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের থেকে, যা নিয়ে সাংবাদিকরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট হয়েছেন।

এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্রিকেটারদের এত কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, স্টেডিয়ামের এমন সব জায়গা থেকে তাঁরা ভিডিও করার সুযোগ পাচ্ছেন যেখানে কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক (আলোকচিত্রী এবং ক্যামেরাপার্সনদের ধরে বলছি) যাওয়ার অধিকার পান না। অধিকার পেয়ে যেসব কনটেন্ট এই ইনফ্লুয়েন্সাররা তৈরি করছেন, তাতে ক্রিকেটের ক নেই। বিনোদন আছে, তাও অত্যন্ত মেধাহীন বিনোদন। যে কোনো খেলা থেকে একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ যে ধরনের বিনোদন পেতে পারে, সে জিনিস নয়।

কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড সাংবাদিকদের চেয়ে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? সে প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে খুঁজতে গেলে এদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কে এত তেতো সব কথা উঠে আসবে, যে নিমপাতা মিষ্টি মনে হবে।

একটু পিছন থেকে শুরু করা যাক। ললিত মোদী ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ চালু করার কিছুদিনের মধ্যে যেই বুঝে গেলেন যে এখান থেকে অভূতপূর্ব টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে, অমনি নিয়ম করে দিলেন— খেলার দিন খেলার মাঠে কোনে সংবাদমাধ্যম ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবে না। মানে ভিডিও তোলা তো এমনিতেই বারণ, কারণ ভিডিও স্বত্ব সম্প্রচারকারীর দখলে; কাগজে ছাপার জন্য বা টিভির খবরে দেখানোর জন্য স্টিল ছবিও তোলা যাবে না।

তাহলে কী হবে? আইপিএল আয়োজকরা কি নিজেদের খেলার প্রচার কমিয়ে ফেলতে চান? মোটেই তা নয়। নিয়ম করা হল, ছবি নিতে হবে শুধুমাত্র আইপিএলের নিজের ওয়েবসাইট থেকে। ভারতের সংবাদমাধ্যম বিনা প্রতিবাদে এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। নিজেদের মত করে ছবি তুলতে না পারা যে নিজের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ— সেকথা মিডিয়ার বাবুদের কারও মাথায় আসেনি। আইপিএলের ছবি আইপিএলের হাত থেকে নেওয়া মানেই হল, যেসব ছবি তারা প্রকাশিত হতে দিতে চায়, কেবল সেসব ছবিই প্রকাশিত হবে। আয়োজকদের পক্ষে অপ্রীতিকর কোনো দৃশ্যের অবতারণা হলে তা সংবাদমাধ্যমের চোখে পড়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হল। সংবাদমাধ্যম সোনামুখ করে এই ব্যবস্থা সেদিন মেনে নিয়েছিল।

যা অপ্রিয় তা প্রকাশ করাই যে আমাদের কাজ এবং খেলার মাঠেও তেমন কিছু ঘটতেই পারে— একথা হয় খেয়াল করেনি, অথবা সংবাদমাধ্যমের মালিক আর উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই এমনটি ঘটিয়েছিলেন। কোন আশঙ্কাটি ঠিক তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ তখন মূলধারার মিডিয়ায় (বস্তুত তখন ওই একটি ধারাই ছিল) কাজ করলেও অত উচ্চপদস্থ আমি কোনোদিনই ছিলাম না।

ললিতবাবু পরে আইপিএল সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পদচ্যুত হন এবং দেশত্যাগ করেন। ছবি সম্পর্কে ওই নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু অধিকার এমন জিনিস যে একবার ছাড়তে শুরু করলে ক্ষমতাবান ক্রমশ একটু একটু করে তা কেড়েই নিতে থাকে।

আইপিএলের মুনাফার ফলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে এবং অর্থের জোরে তার শক্তিও বাড়তে থাকে। ভারতের মাটিতে যে কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজের টিভি প্রযোজনা বোর্ড নিজের হাতে তুলে নিল। মানে সম্প্রচার স্বত্ব যে সংস্থার হাতেই যাক, প্রযোজনা করবে বিসিসিআই। মানে দর্শক টিভিতে কী দেখতে পাবেন, কোনটা পাবেন না— সবই চলে গেল বোর্ডের হাতে। যে সংস্থার হাতেই ক্যামেরা থাকুক, তাদের ঘাড়ে কটা মাথা যে এমন কিছু দেখাবে যা বিসিসিআইয়ের বাবুরা লোককে দেখতে দিতে চান না? আপনি বলবেন, ক্রিকেট খেলার সরাসরি সম্প্রচারে এমন কী দেখানোর থাকতে পারে, যা ক্রিকেট বোর্ড লুকোতে চায়? যাঁর বছরের পর বছর মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ কভার করার অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকে এটা বোঝানো শক্ত।

একটা নিরীহ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আপনি অনুমান করে নিতে পারেন আর কী কী না দেখানো সম্ভব। মহেন্দ্র সিং ধোনি তখনো একদিনের দলের অধিনায়ক, যদিও টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন। রাঁচিতে একটা একদিনের ম্যাচ কভার করতে গেছি, ম্যাচ চলাকালীন বারবারই বিরাট কোহলি মিড অফ বা মিড অনে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং বদলাচ্ছিলেন, বোলারকে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ধোনি দর্শকের ভূমিকায়। প্রেস বক্সেও টিভি চলে, সেখানে কিন্তু একবারও এ দৃশ্য দেখানো হয়নি।

তবে প্রযোজনা বিসিসিআই নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ায় আসল ক্ষতি দৃশ্যের দিক থেকে হয়নি, হয়েছে শ্রাব্যের দিক থেকে। মোটামুটি নয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পরিমাণ সরাসরি সম্প্রচার দেখার সুযোগ হচ্ছে ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের। যাঁদের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন ধারাভাষ্য কোথা থেকে কোথায় নেমেছে। আগে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ধারাভাষ্য মন দিয়ে শুনলে খেলাটা সম্পর্কে সত্যিই অনেককিছু শেখা যেত। কারণ রিচি বেনো, সুনীল গাভস্কর, জিওফ্রে বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল প্রমুখ ধারাভাষ্যকার তাঁদের বিপুল অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের সদ্ব্যবহার মাঠে যা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ করতেন। তার চেয়েও বড় কথা, দল নির্বিশেষে ভালো খেলার প্রশংসা করতেন এবং নিজের দেশের খেলোয়াড়রা খারাপ খেললেও নির্মম সমালোচনা করতেন।

আর এখন? বেনো আর টনি গ্রেগ প্রয়াত। বয়কট স্বাস্থ্যের কারণে এবং চ্যাপেল বয়সের কারণে আর ধারাভাষ্যে নেই। মাইকেল হোল্ডিং সরে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন বটে যে, আর মন চাইছে না; কিন্তু তিনি যেভাবে কমেন্ট্রির মাইক হাতে নিয়ে খেলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে খেলোয়াড় জীবনের মতই ভীষণ গতির বাউন্সার হাঁকাতেন, তাতে তাঁর প্রস্থানে কারা খুশি হয়েছে তা বুঝে নেওয়া শক্ত নয়। তবে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ভারতীয় ধারাভাষ্যের।

সেকালের সুরেশ সারাইয়া, নরোত্তম পুরীরা অসাধারণ ছিলেন না; প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটারও ছিলেন না। কিন্তু কোদালকে কোদাল বলতেন। অনেকদিন পর্যন্ত হর্ষ ভোগলেও তাই। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন আর ধোনির টুইটের ঠ্যালায় একবার বিসিসিআইয়ের চুক্তি হারাবার পর থেকে তিনি ভারতীয়দের বেলায় কোদাল দেখলে কেবল চুপ করে থাকেন না, অনেকসময় কোদালকে এরোপ্লেনও বলে দেন। রবি শাস্ত্রী তো চিরকালই প্রশাসকদের চিৎকৃত আনুগত্য দেখিয়েছেন। তার পুরস্কারস্বরূপ ভারতীয় দলের ম্যানেজারি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কমেন্ট্রি বক্সে ফেরত এসেও একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল বিরাট বা রোহিত শর্মা নন, শাস্ত্রীর ধারাভাষ্য অনুসারে সূর্যকুমার যাদব, অক্ষর প্যাটেল, হার্দিক পান্ডিয়া, বরুণ চক্রবর্তীরাও একেকজন ‘গ্রেট’।

ভারতীয় দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা নামিবিয়াকে হারালেও ঐতিহাসিক জয় হয় আর পরপর সিরিজ হারলেও শাস্ত্রী ও সম্প্রদায় বলে যান— একটা হার একটা বিশ্বসেরা দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না। কী করে যে বিশ্বসেরা প্রমাণ হল তা বোঝা মুশকিল, তবে এই আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ শিগগির মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারি শাস্ত্রীর নামাঙ্কিত হতে চলেছে।

আকাশ চোপড়া ও অন্যান্য প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার, যাঁরা একইভাবে সমস্ত ভারতীয় ক্রিকেটারকে অন্য গ্রহের জীব বলে প্রচার করতে সদাব্যস্ত এবং বিসিসিআই ও জয় শাহের গুণগান করতে পিছপা নন, তাঁরাও আশা করতে পারেন এরকম কিছু পুরস্কার পাবেন। ভারতে তো আর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অভাব নেই, যতই সেখানে খেলা দেখতে যাওয়া সাধারণ দর্শকের কাছে নরকযন্ত্রণা হোক। এই নুন খাও আর গুণ গাও ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে পারলেন না বলে, সঞ্জয় মঞ্জরেকর বহুদিন হয়ে গেল নিয়মিত ধারাভাষ্য দেওয়ার ডাক পান না। এই সাইট সেই সাইটের বিশেষজ্ঞ হয়ে কাটে। অথচ তাঁর চেয়ে ভাষার উপর অনেক কম দখল থাকা এবং অগভীর বিশ্লেষণ করা বহু প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রত্যেক সিরিজে এবং আইপিএলে ধারাভাষ্যকার হিসাবে থাকেন।

ভাবছেন তো, ধারাভাষ্যকারদের কথাবার্তা বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে ক্রিকেট সাংবাদিকতার কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রথমত, ধারাভাষ্য ব্যাপারটাও ক্রীড়া সাংবাদিকতারই একটা দিক। ওখানেও সত্যি কথাটা বলাই কাজ। সে কাজ আজও ইয়ান বিশপ, ইয়ান স্মিথ, নাসের হুসেন, মাইকেল অ্যাথারটনদের করতে দেখা যায়। তাঁরা ভারতের সমালোচনা করেন বলে আপনি হয়ত রুষ্ট এবং ওঁদের কথায় বর্ণবৈষম্য খুঁজছেন। কিন্তু অ্যাশেজ চলাকালীন ইংল্যান্ডের কী তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নাসের আর অ্যাথারটন, সেটা সোশাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আমাদের ধারাভাষ্যকাররা কী করেন? শুধু যে নিজেদের ক্রিকেটারদের কোনো দোষ দেখেন না তা নয়, ইদানীং আবার হিন্দুত্ববাদের প্রচারও করেন। কথায় কথায় লাইভ ম্যাচে মা ভবানী, বিষ্ণু, ভোলেনাথ প্রমুখ ভগবানের নাম নেন বিবেক রাজদানরা। উপরন্তু দল নির্বাচনে যত ভুলই হোক, কমেন্ট্রি বক্সে বসে সেটাকে প্রাণপণে ঠিক বলে প্রমাণ করাই তাঁদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মিথ্যাচারের ফল কিন্তু ভুগছে ভারতীয় ক্রিকেট। বহু যোগ্য ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছেন না, অযোগ্যরা খেলেই যাচ্ছেন। যদি বলেন খেলায় ফলাফলই শেষ কথা, তাহলে নিজেই বলুন, টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের সাফল্যের লেখচিত্র উঠছে না নামছে? একদিনের দলও নড়বড় করতে শুরু করেছে। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর থেকে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতলেও, দুর্বল শ্রীলঙ্কার কাছে ২৭ বছর পরে সিরিজ হেরেছে। নতুন বছরের শুরুতেই ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছেও হারল। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জয়ের পর জয় এলেও, বিশ্বকাপ শুরু হতেই নড়বড়ে দেখাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে তো মনে হল দুই দলের মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান। কিন্তু ধারাভাষ্যে কান দিন। সেই এক কথা শুনবেন— একটা ম্যাচ বা একটা সিরিজ হারলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অধঃপতন হয়েছে গাভস্করের। তিনি এখন ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চেয়েও বেশি প্রশংসা করেন বিসিসিআইয়ের। এমন ভালো বোর্ড নাকি ক্রিকেটের ইতিহাসে হয়নি। ক্রিকেট দুনিয়ায় যা কিছু ভালো হচ্ছে সবই নাকি বিসিসিআইয়ের দাক্ষিণ্যে, আর যা যা খারাপ হচ্ছে? সেগুলো সবই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যখন ক্রিকেট দুনিয়াকে শাসন করত তখন আরও খারাপ ছিল। অতএব বিসিসিআই যা করছে বেশ করছে।
এবার ভাবুন, যদি কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড বুঝতে পারে যে টাকার জোরে তারা তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের দিয়ে যা খুশি বলিয়ে নিতে পারে, বলতে না চাইলে মুখ বন্ধ করিয়ে দিতে পারে, তাহলে মাস মাইনেয় বিভিন্ন কাগজে বা টিভি চ্যানেলে অথবা ওয়েবসাইটে কাজ করা সাংবাদিকদের তো এলেবেলে জ্ঞান করবেই। তাদের গলা টিপে ধরবেই। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত যে গত এক-দেড় দশকে ক্রমাগত নিচে নামছে, সেকথা তো এখন সবাই জেনে গেছেন।

সাংবাদিকদের গ্রেফতার হওয়া বা খুন হওয়ার খবরেও আজকাল আমরা আর অবাক হই না। অমুক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ঢোকা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তমুক জায়গায় বিশেষ একটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের ঢোকা বারণ— এসবও আজকাল প্রায়ই আমরা জানতে পারি। কিন্তু ভারত সরকার বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো এ কাজ নিয়মিত শুরু করার আগেই করেছিল বিসিসিআই। করোনা অতিমারীর সময়ে অকালমৃত আমার একদা সহকর্মী রুচির মিশ্র, নাগপুরের সাংবাদিক হয়েও জীবনের শেষ ৫-৭ বছর বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে (যে মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হয়) ঢুকতে পারেননি। কারণ তিনি ওই ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদের বিপক্ষে যায়, এমন একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।
স্বভাবতই, দ্য হিন্দু বা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর মত দু-একটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও আপনি এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পড়বেন না যে, বিসিসিআই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে দর্শকরা দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা বাথরুম পান। খাবার জলের সুব্যবস্থাও থাকে না প্রায়শই। কেবল দর্শকদেরই এই অভিজ্ঞতা হয় তা নয়। আমি নিজে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিবেদন লিখতে আমেদাবাদে গিয়ে দেখেছি, প্রেস বক্সের বাথরুমের অবস্থা কোনো মফসসলের রেলস্টেশনের বাথরুমের থেকেও খারাপ।

কিন্তু এসব তখনো লেখা যেত না, এখনো অধিকাংশ জায়গায় যায় না। লিখলেও ছাপা হবে না, বস বলবেন ‘এটা খবর নয়।’ প্রতিবেদক বেশি চাপাচাপি করলে বেঘোরে চাকরিটা খোয়াতে হতে পারে।

ভাবুন। আপনি দর্শক, আপনার জন্যেই ক্রিকেট চলে কিন্তু। আপনি টিকিট কেটে মাঠে যান বলে বোর্ডের আয় হয়। তার থেকেও বহুগুণ বেশি আয় হয় আপনারা টিভিতে বা ওটিটিতে খেলা দেখেন বলে। আপনাদের বিজ্ঞাপনদাতারা নিজের পণ্য বা পরিষেবা চেনাতে চায় বলে বড় বড় কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয়, সে বাবদ টাকা নিয়েই বিসিসিআই আর আইসিসি ধনী হচ্ছে। নিজেদের আইপিএল ছাড়াও, আইসিসির টাকার সিংহভাগ বিসিসিআই নিয়ে নিচ্ছে আপনার ঘাড়ে বন্দুক রেখে ‘আমাদের জন্যেই তো এত টাকা ওঠে’ যুক্তি দিয়ে। অথচ আপনি যে ন্যূনতম পরিষেবা পান না, সেটা খবর নয়। খবর তাহলে কোনটা? গৌতম গম্ভীর কখন কালীঘাটে পুজো দিতে যাবেন।

মোদ্দাকথা, ভারতের ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন বিসিসিআইয়ের ‘চিয়ারলিডার’। কথাটার বাংলা নেই, তবে রবীশ কুমার ভারতের রাজনৈতিক মিডিয়ার একাংশকে চিহ্নিত করেছেন গোদি মিডিয়া বলে। কারণ তারা নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোলে বসে শাসক দল যা বলায় তাই বলে। সেভাবে এই ক্রিকেট সাংবাদিকদেরও গোদি মিডিয়া বলা যেতে পারে। এঁরা প্রলয় দেখেও অন্ধ সেজে থাকতে পারেন এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু দায়িত্ব প্রতিবেদন লেখা বা শুট করা দিয়ে শেষ হয় না, সেহেতু সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ঠিক সেই কাজই করে থাকেন, যার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘বাবু যত বলে/পারিষদ দলে/বলে তার শতগুণ।’
ধরুন, মহম্মদ শামি প্রথম শ্রেণি, লিস্ট এ, কুড়ি বিশ— সবরকম ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও কেন বাদ? সরফরাজ খান আর কত রান করলে টেস্ট দলে জায়গা পাবেন? বিশেষত যেখানে দল সিরিজের পর সিরিজ হেরেই চলেছে। মুখ্য নির্বাচক অজিত আগরকর এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উঠতে পারছেন না, এদিকে এই সাংবাদিকরা একশো যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। কে এঁদের দায়িত্ব দিল? কেনই বা নির্বাচকদের যে কোনো সিদ্ধান্তের সপক্ষে এঁদের যুক্তি জোগাতেই হবে? উত্তর একটাই। এঁরা বোঝেন না বা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন যে এঁরা সাংবাদিক, বোর্ডের মুখপাত্র নন। একই কাজ এঁরা অনেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের হয়েও করেন। দুর্জনে বলে মোটেই নিষ্কাম কর্ম নয় এগুলো, তবে প্রমাণাভাবে সে প্রশ্নে যাচ্ছি না।
এখন কথা হল, বিনা পয়সার চিয়ারলিডারদের বিসিসিআই বা ক্রিকেটাররা কেনই বা গুরুত্ব দেবে, সম্মান করবে? প্রযুক্তির প্রভাবে খবরের কাগজ পড়া অনেক কমে গেছে। টিভির খবরের প্রতিও মানুষের আকর্ষণ দ্রুত কমছে। বহু ক্রিকেটপ্রেমীই এখন খেলার পাশাপাশি খেলার খবরও দেখেন হাতের মোবাইলেই। তাঁদের কাছে পৌঁছবার জন্যে সত্যিই তো সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক ভালো মাধ্যম ইনস্টাগ্রামার বা ইউটিউবাররা। তাঁদের আচার আচরণ আমাদের চোখে যতই কুরুচিকর মনে হোক।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

ক্রিকেটার ও প্রশাসকদের চিয়ারলিডার হয়ে যাওয়া অবশ্য শুরু করেছিলেন আগের প্রজন্মের সাংবাদিকরা। বিশেষত পশ্চিমবাংলার ক্রিকেট সাংবাদিকরা সাংবাদিকতাকে ‘পেজ থ্রি’ সাংবাদিকতায় পরিণত করার ব্যাপারে পথিকৃৎ। কী কুক্ষণে কবি বিষ্ণু দে একবার লিখে ফেলেছিলেন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে, বাংলার কিছু সাংবাদিক কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে ফেলে ক্রিকেটের প্রতিবেদনে কাব্যি করা শুরু করে দিলেন। হয়ত খেলাটাকে বোঝা এবং বিশ্লেষণ করতে পারার খামতি ঢাকতেই। যেহেতু ওঁরা জনপ্রিয় কাগজের সাংবাদিক ছিলেন, তাই ওটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওসব পড়ে শিখল— ক্রিকেট সাংবাদিকতা মানে হল, মাঠে কী ঘটছে সেটা বাদ দিয়ে ড্রেসিংরুমের অন্দরের কার সঙ্গে কার ঝগড়া হল বা গলাগলি হল, কে রাতের অন্ধকারে কোন নায়িকার সঙ্গে প্রেম করতে বেরোল— এইসব সুললিত গদ্যে লেখা।

এরকম সাংবাদিকতা করার একটা মস্ত সুবিধা আছে। কারও সমালোচনা করতে হয় না, কেউ খুব একটা চটে না। সকলের প্রিয় থাকা যায় এবং ইনি কী বললেন আর উনি কী বললেন, তাই লিখেই দিনের পর দিন চালিয়ে দেওয়া যায়। খেলোয়াড় আর প্রশাসকদের খুশি রাখতে পারলে কাঁড়ি কাঁড়ি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। তাতে পরিশ্রম আরও কমে যায়। যদ শুনিতং তদ লিখিতং। উচ্চ পদে উঠে গেলে শুনে শুনে লেখার পরিশ্রমটাও করতে হয় না।
একসময় এক প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, যাঁর কাজ বলতে ছিল রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে কোনো একজন নামকরা বর্তমান বা প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া। তারপর সেটা নিজে টাইপ করার পরিশ্রমটুকুও করতেন না। কোনো একজন অধীনস্থ সাংবাদিকের হাতে রেকর্ডারটি ধরিয়ে দিতেন। তারপর একদিন গোটা পাতা বা অর্ধেক পাতা জুড়ে সেই হাজার হাজার শব্দের উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হত। কার সাক্ষাৎকার নেবেন তার পিছনেও কোন ভাবনাচিন্তা থাকত না। যাকে পেতেন তারই সাক্ষাৎকার নিতেন, খবরের দিক থেকে তাঁর ওই সময়ে কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাক আর না-ই থাক।

এর নাম নাকি সাংবাদিকতা। এ জিনিস দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে গেলে একটি ব্যাপারই খেয়াল রাখতে হয়— ক্ষমতাশালীদের খুশি রাখা। সে কাজটা আমার সেই বস এবং তাঁর সমসাময়িক বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদকরা, খুব মন দিয়েই করতেন। আমার বসটি তো একবার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের নির্বাচনের আগেরদিন জগমোহন ডালমিয়া গোষ্ঠীর ইশতেহারই কাগজে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেসব পাপের ফলই এখন ফলছে। এসব হল খোলা বাজার অর্থনীতি ভারতে চালু হওয়ার পরের সাংবাদিকতার নিদর্শন। তখন সারা ভারতের সংবাদমাধ্যম সবে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার খোলস ছাড়তে শুরু করেছে, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা টাকা করার নতুন নতুন রাস্তা খুঁজছেন।

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে তৈরি হয়ে গেল এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কেউ কারও ভুল ধরে না। আমিও ভালো, তুমিও ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর লাভের গুড়। ইতিমধ্যে এসে পড়েছে হিন্দুত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ। প্রথমে সরকারের গোদি মিডিয়া এই বয়ানটি দাঁড় করাল যে, সরকার মানেই দেশ। এখন বিসিসিআইয়ের গোদি মিডিয়া এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করিয়েছে যে, জাতীয় ক্রিকেট দল মানেই দেশ। ফলে এখন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা পেতে আর সরকারের সমালোচনা করতে হয় না, ক্রিকেট দলের সমালোচনা করাই যথেষ্ট। সমালোচনা করতে না হলে বিশ্লেষণ করতে হয় না, বিশ্লেষণ করতে না হলে পরিশ্রম করতে হয় না, মেধার দরকার হয় না। অতএব ক্রিকেট সাংবাদিকরা ক্রমশ ডোডোপাখি হয়ে যাবেন, দাপিয়ে বেড়াবেন ইনফ্লুয়েন্সাররা।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারত মোহালির সবুজ পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে শোচনীয়ভাবে তৃতীয় টেস্টে হেরে যাওয়ার পর মতি নন্দী লিখেছিলেন ‘বিনোদ কাম্বলির ব্যাটিং বাহাদুরি সবই দেশি মন্থর বাউন্সহীন পিচে। পাথরের ওপর মাটি ফেলে তৈরি মোহালির শক্ত নিখুঁত নতুন পিচের বাউন্স এবং ওয়ালশের বলে নাক ফেটে যাওয়া প্রভাকরের রক্তাক্ত মুখ দেখার পর ভারতীয় ব্যাটিংয়ের অবস্থাটা ধরা পড়ল স্কোর বোর্ডে— এক কথায় সেটি হল ভয়।’ সমালোচনার তীক্ষ্ণতায় এর ধারেকাছে পৌঁছতে পারে এমন কোনো লেখা ভারত দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে রসগোল্লা পাওয়ার পরে আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা কেউ লিখেছেন কি? মতিবাবু আজ এমন লিখলে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর মা-মাসিকে ধর্ষণের হুমকি দিতেন তথাকথিত ক্রিকেটপ্রেমীরাই। অন্য সাংবাদিকরাও পোস্ট করতেন, এসব লেখা অন্যায়। একটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
অতএব ব্রায়ান বেনেটকে না চিনে সাংবাদিক সম্মেলনে বসাই যুগোপযোগী।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দল হারলেও গুহার চিচিং বনধ হতে দেবে না ক্রিকেট বোর্ড

এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর।

রবিচন্দ্রন অশ্বিন খেললেই কি ভারত ওভালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতে যেত? যশপ্রীত বুমরা যদি ফিট থাকতেন এবং খেলতেন, তাহলে কি ভারত জিতে যেত? ঋষভ পন্থ যদি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে অন্যের এবং নিজের জীবন বিপন্ন করে শয্যাশায়ী না হতেন, তাহলে কি শেষ ইনিংসে ৪৪৪ রান তাড়া করার বিশ্বরেকর্ড করে জিতিয়ে দিতেন? এগুলোর কোনো ঠিক বা ভুল উত্তর হয় না, কারণ কী হলে কী হত কেউ বলতে পারে না। তবে তথ্য বলছে, ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই তিনজনই খেলেছিলেন। তবু ভারত হেরেছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে এই তিনজনের উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও ভারত সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টেই খেতাব জেতেনি। শুধু টেস্ট ক্রিকেটের কথাই যদি বলি, গত দশ বছরে দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া ভারতের আর কোনো বলার মত সাফল্য নেই। দেশের মাঠে দাপটে যে কোনো দলকে হারিয়ে দেওয়ার রেকর্ড ভারতের টেস্ট ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কিন্তু অতীতে একাধিক ভারতীয় দল ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ জিতেছে, নিউজিল্যান্ডে জিতেছে। এর একটাও রবি শাস্ত্রী-বিরাট কোহলি, রাহুল দ্রাবিড়-কোহলি বা দ্রাবিড়-রোহিত শর্মার দ্বারা হয়ে ওঠেনি। এমনকি গত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভাঙাচোরা, নতুন মুখদের নিয়ে তৈরি দলটার কাছেও হেরে এসেছে এই দল। সুতরাং এই একটা ম্যাচে অমুক, অমুক আর অমুক থাকলেই ভারত জিতে যেত কিনা সে প্রশ্ন না তুলে বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা আছে কিনা দেখুন।

১) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে যতজন নির্বাচক থাকার কথা ততজন নেই
২) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে প্রধান নির্বাচক বলে কেউ নেই?
৩) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের জাতীয় দল নির্বাচনের পর কোনো সাংবাদিক সম্মেলন হয় না?

জানেন কি, এই তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর ভারত? যে কোনো খেলার আন্তর্জাতিক স্তরটাকে যাঁরা পেশাদার এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের ব্যাপার বলে মনে করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে দিনের পর দিন এই ফাজলামি চালিয়ে গিয়ে বিশ্ব খেতাব কেন, কোনো সিরিজই জেতার আশা করা উচিত নয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পাঁচজন নির্বাচক থাকার কথা। কিন্তু আছেন চারজন – শিবসুন্দর দাস, সুব্রত ব্যানার্জি, সলিল আঙ্কোলা আর শ্রীধরণ শরথ। এ বছর জানুয়ারি মাসে পাঁচ সদস্যের নির্বাচক কমিটিই ঘোষণা করা হয়েছিল, তার একজন চেয়ারম্যানও ছিলেন – চেতন শর্মা। কিন্তু পরের মাসেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয় একটা স্টিং অপারেশনে নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ফলে। তারপর চার মাস কেটে গেছে। ভারত দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ও একদিনের সিরিজ খেলল। প্রথম দুটো টেস্টের দল নির্বাচনের সময়ে চেতন ছিলেন। তারপর থেকে দল নির্বাচন করেছেন ওই ভাঙাচোরা নির্বাচন সমিতি এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান শিবসুন্দর। মনে রাখা ভাল, এ বছর অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একদিনের সিরিজটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার দল নির্বাচনও করে ওই ভাঙা নির্বাচন কমিটি। বলা বাহুল্য, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দল নির্বাচনের সময়েও পঞ্চম নির্বাচককে নিয়োগ করার কথা ভাবেনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। এভাবে বোধহয় পয়সা বাঁচানো হচ্ছে। বোর্ড সভাপতি জয় শাহের ক্রিকেটবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, গত কয়েক বছরে তাঁর সম্পত্তি যেভাবে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে তাতে তাঁর ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে তো আর প্রশ্ন তোলা চলে না।

মজার কথা, নির্বাচন সমিতি নিয়ে এই ধাষ্টামোর সূচনা কিন্তু চেতনের পদত্যাগ থেকে শুরু হয়নি। গত নভেম্বরে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ থেকে ভারত বিদায় নেওয়ার পর এর আগের নির্বাচন সমিতিকে ঘটা করে বরখাস্ত করে বোর্ড। সেই নির্বাচন সমিতিতেও চারজন সদস্যই ছিলেন, এবং কী আশ্চর্য! তখনো চেয়ারম্যান ছিলেন চেতনই। অর্থাৎ যে ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে চাপিয়ে অন্য তিন নির্বাচক সুনীল যোশী, দেবাশিস মোহান্তি আর হরবিন্দর সিংকে বিদায় করে দেওয়া হল; সেই ব্যর্থতার কাণ্ডারী চেতনকে আবার নির্বাচন সমিতির চেয়ারম্যান করে নিয়ে আসা হয়েছিল।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ক্রিকেট বোর্ড দল নির্বাচনকে তেমন জরুরি ব্যাপার বলে মনে করে না। সেটা দল ঘোষণার ভঙ্গিতেও পরিষ্কার। ভারতীয় ক্রিকেটে দস্তুর ছিল প্রধান নির্বাচক সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দল ঘোষণা করেন। ক্রিকেটজীবনে অতি সাধারণ এমএসকে প্রসাদ, প্রশাসক হিসাবে বিশালকায় রাজ সিং দুঙ্গারপুর বা ক্রিকেটার হিসাবেও যথেষ্ট সফল দিলীপ ভেংসরকার – কেউ প্রধান নির্বাচক হয়ে এর অন্যথা করেননি। কিন্তু সেসব বন্ধ হয়ে গেছে জয় বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর থেকে। এখন দিনের কোনো একটা সময়ে বোর্ড প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খেলোয়াড় তালিকা জানিয়ে দেয়। তারপর কে বাদ পড়লেন আর কাকে বিশ্রাম দেওয়া হল তা নিয়ে গুজব পল্লবিত হয়।

সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হল, ঘরোয়া ক্রিকেটে দিনের পর দিন ভাল খেলেও যে তরুণ ক্রিকেটাররা দলে সুযোগ পান না, তাঁদের কেন নেওয়া হল না তার জন্য জবাবদিহি করা হয় না। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের টপ অর্ডার ফর্মে নেই কোভিড অতিমারীর আগে থেকে। কালে ভদ্রে এক-আধটা অর্ধশতরান বা শতরান করে উদ্ধার করেন। অধিকাংশ ইনিংসে শেষদিকে পন্থ, রবীন্দ্র জাদেজা বা শার্দূল ঠাকুর সম্মানজনক স্কোরে পৌঁছে দেন দলকে। সেই কারণেই বোলার হিসাবে বিদেশের মাঠে কল্কে না পেলেও ওঁদেরই খেলানো হয় সেরা বোলার অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে। যেদিন জাদেজা, শার্দূলরাও পেরে ওঠেন না, সেদিন মধ্যাহ্নভোজনের আগেই খেলা শেষ হয়ে যায়, যেমন রবিবার ওভালে হল। অথবা দল খটখটে রোদের দিনেও ৩৬ অল আউট হয়ে যায়, যেমনটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অ্যাডিলেডে।

এভাবে সিরিজ বা বড় ম্যাচ জেতা সম্ভব নয় বলেই ভারত অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেতে না। অথচ ঘুরে ফিরে সেই রোহিত, সেই চেতেশ্বর পূজারা, সেই অজিঙ্ক রাহানে, সেই কোহলি খেলেই চলেছেন। এদিকে মুম্বাইয়ের ২৫ বছরের ছেলে সরফরাজ খান ৩৭ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে সাড়ে তিন হাজার রান করে বসে আছেন প্রায় ৮০ গড়ে। তিনি কেন সুযোগ পান না জবাব দেওয়ার কেউ নেই। বাংলা দলের অভিমন্যু ঈশ্বরন (৮৭ ম্যাচে ৬৫৫৬ রান, গড় প্রায় ৪৮) পরপর বেশ কয়েকটা রঞ্জি ট্রফিতে ধারাবাহিকভাবে রান করে যাচ্ছেন। তাঁরও মেঘে মেঘেই বেলা বাড়ছে। এরকম আরও নাম আছে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

বাদ গিয়ে ফেরত আসা রাহানে ওভালে দুই ইনিংসেই ভারতের সেরা ব্যাটার ছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে রোহিত আর কোহলিও বেশ ভাল ব্যাট করলেন। কিন্তু দেখা গেল, তাঁদের যথেষ্ট ভাল ফর্মও আর দলের জন্য যথেষ্ট নয়। ভারত দুশোর বেশি রানে হারল। ক্রিকেট জগতে একথার একটাই মানে হয়। এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর। খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারীদের প্রাণ তাদের হাতে, আর সম্প্রচারই হল বোর্ডের ধনরত্নে ভরা গুহা। হারজিতের কথা ভেবে কি আর ও গুহার চিচিং বনধ হতে দেওয়া যায়? যায় না বলেই বয়সের যুক্তিতে ঋদ্ধিমান সাহাকে রাহুল দ্রাবিড় বলে দিতে পেরেছিলেন, এবার তুমি এসো। কিন্তু কোহলিদের বয়স চোখে দেখতে পান না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত