ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই।

ব্যাট, বল, উইকেট, প্যাড, গ্লাভস, এমনকি মাঠের মালিকও আপনি হতে পারেন। কিন্তু খেলতে হলে আরেকটা দল লাগে। কথাটা বাচ্চারাও বোঝে, কিন্তু বড়রা ভুলে যায়— টাকার গরমে, এবং অনেক টাকা যে বিপুল ক্ষমতা দেয় তার মদে মত্ত হয়ে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) ঠিক তাই হয়েছে। অসুখটা আজকের নয়, অনেকদিনের। কিন্তু চলতি বছরের আগে টাকা আছে এবং ক্ষমতা আছে বলে যা ইচ্ছে তাই করার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ হয়নি, ফলে সেরকম ল্যাজেগোবরেও হতে হয়নি, যা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে হল। আপনি হাঁই হাঁই করে উঠতে পারেন এই বলে যে, মোটেই বিসিসিআই ল্যাজেগোবরে হয়নি। হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। আপনার দোষ নেই। আপনার সন্ধেবেলার টিভি চ্যানেল, সকালবেলার খবরের কাগজ আর হাতের মোবাইল ফোন আপনাকে একথাই বোঝাচ্ছে। অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক তো এমনও লিখছেন এবং বলছেন যে প্রথমে রেলা নিয়ে খেলবে না বলার পর, শেষমেশ পাকিস্তান ম্যাচটা খেলার জন্য ভিখারির মত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ছুটে গেছে। কথাগুলো ঠিক কিনা তা বিচার করার জন্যে আমরা স্রেফ সেটুকু নিয়েই আলোচনা করব যা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ ‘সূত্রের খবর’ কথাটার কী পরিমাণ অপব্যবহার এদেশের সাংবাদিকরা করে থাকেন তা এখন প্রায় সবাই জানেন। অতএব ওসব থাক।

তথ্য বনাম মনগড়া তত্ত্ব

প্রথমেই খেয়াল করুন, পাকিস্তানই রবিবারের ম্যাচটা খেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল (বা ভিক্ষা চেয়েছিল আইসিসির কাছে)— এমন বলার মত কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি। ভিক্ষা চাইতে ভিখারিকেই যেতে হয়। কোনোদিন এমন হয়েছে, আপনি কোনো ভিখারির বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছেন ভিক্ষা দেবেন বলে? খুঁজে বের করে ভিখারির হাতে পায়ে ধরেছেন ‘ওগো, আমার থেকে ভিক্ষা নাও গো’? পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলব না বলার পরে আমরা কী দেখলাম? পিসিবির কোনো কর্তাকে দুবাইতে আইসিসির দফতরে যেতে দেখলাম কি? না, বরং উলটোটা ঘটল। আইসিসি চিফ এক্সিকিউটিভ সংযোগ গুপ্তাই পাকিস্তানে উড়ে গেলেন পিসিবি প্রধান মহসীন নকভির সঙ্গে কথা বলতে। সেই বৈঠকে গেলেন বিশ্বকাপ থেকে আগেই বিতাড়িত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

সেই বৈঠকে কে কী বলেছিল, পাকিস্তান কী কী দাবি করেছিল আর আইসিসি ফুৎকারে কোন কোন দাবি উড়িয়ে দিয়েছে— তা নিয়ে এখন বাজার গরম করছেন বিভিন্ন প্রথিতযশা ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিক। অন্যদিকে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম বোঝানোর চেষ্টা করছে— তাদের ক্রিকেট বোর্ড যা চেয়েছিল তাই পেয়েছে। আমরা এই আকচা-আকচির মধ্যে ঢুকবই না। এদের কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, কারণ বৈঠকটা ছিল রুদ্ধদ্বার। কোনো সাংবাদিকই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অতএব এ ওকে ভিক্ষা দিল, না ও একে— সে তর্ক ট্রোলরা করুক গে। বরং দেখা যাক, সেই বৈঠকের পরে কী কী ঘটল।

প্রথমত, আমিনুল দেশে ফিরে একখানা বিবৃতি দিলেন। সেই বিবৃতিতে তিনি পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানালেন সংকট মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, কামনা করলেন— এই সৌভ্রাতৃত্ব যেন দিন দিন বাড়ে। তারপর ‘সম্পূর্ণ ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সুবিধার্থে’ অনুরোধ করলেন ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচটা খেলতে। দ্বিতীয়ত, আইসিসি একখানা লম্বা বিবৃতি দিল। সেই বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, সংযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকা দুঃখজনক।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও অনেক ভালো ভালো কথা বলার পাশাপাশি এই বিবৃতিতে লেখা হয়েছে যে বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না বা জরিমানা করা হবে না। বরং তারা চাইলে আইসিসির ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-র কাছেও আবেদন করতে পারে এই গোলমাল নিয়ে। উপরন্তু ২০৩১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেই তাদের কোনো একটা আইসিসি প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সোজা কথায়, বিশ্বকাপ না খেলতে পারায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা খানিকটা পূরণ করার ব্যবস্থা হল। দোষটা বাংলাদেশেরই ছিল— এমনটা মানলে নিশ্চয়ই তা করা হত না। আইসিসির গোটা বিবৃতিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নামগন্ধ নেই। স্রেফ বলা আছে, আইসিসি, পিসিবি ও বিসিবি অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে খেলাটার স্বার্থে আলাপ আলোচনা, সহযোগিতা এবং গঠনমূলক ব্যবস্থাপনার প্রতি দায়বদ্ধ।

অপারেশন সিঁদুরের সময়ে একদিন রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ দখল করে ফেলেছিল। অনেকটা সেই কায়দায় ৯ তারিখের ওই বৈঠকের আগে পর্যন্ত ভারতের প্রায় গোটা ক্রিকেট মিডিয়া বলে যাচ্ছিল— বাংলাদেশ নিজেদের কত বড় ক্ষতি করল জানে না। এরপর ওদের দেশে কেউ খেলতে যাবে না। ভারত তো যাবেই না। ওদের সমস্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে আইসিসি নিষিদ্ধও করে দিতে পারে ইত্যাদি। একইভাবে পাকিস্তান যেই বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ভারত ম্যাচ খেলতে চাইল না, অমনি বলা হচ্ছিল, না খেললে পাকিস্তান বিরাট বিপদে পড়বে। বিশ্বকাপের সম্প্রচারকারীকে অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)-কে আইসিসি নিষিদ্ধ করে দেবে, সমস্ত আইসিসি প্রতিযোগিতা থেকে ওদের বাদ দিয়ে দেবে ইত্যাদি প্রভৃতি।

তথ্য অগ্রাহ্য না করলে এবং ইতিহাস-বিস্মৃত না হলে এসব দিনের পর দিন বলে/লিখে যাওয়া মুশকিল। কারণ প্রথমত, সম্প্রচারকারীর চুক্তি হয় আইসিসির সঙ্গে। কেবল কোনো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে নয়। যদি ধরেও নিই ক্ষতিপূরণের টাকা আইসিসি পাকিস্তানের থেকেই আদায় করত, তাহলেও আইসিসিকে প্রমাণ করতে হত যে পিসিবি অকারণে ম্যাচ বয়কট করছে। খেলব না— এই ঘোষণা কিন্তু এসেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। কোনো দেশের কোনো খেলার ফেডারেশনই সেদেশের সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না।

ভারত এই যুক্তিতেই পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসাবে পাকিস্তান ভারতে আসে না বা ভারত পাকিস্তানে যায় না। সে কারণেই বাংলাদেশ নিজের সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ‘ভারতে খেলতে যাব না’ বলায় তাদের বাদ দেওয়া আইসিসির অন্যায় হয়েছে বলা হচ্ছে। আইসিসি বলতে পারে না— ক যা করলে ঠিক, খ আর গ করলে সেটা বেঠিক। আর যেকথা গত কয়েকদিনে কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলতে দেখলাম না, সেটা হল, আইসিসি তেমন কিছু বললেও বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কাছে এমন একটা জায়গার দরজা খোলা থাকত, যেখানে বিসিসিআই বা আইসিসির বিশেষ প্রভাব নেই। জায়গাটার নাম কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট (ক্যাস)। এই ঝামেলা সেখানে চলে গেলে কী হত বলা যায় না। একথা ঠিক যে আইসিসি এখন পর্যন্ত নিজেদের ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-কেই সর্বোচ্চ বলে মানে এবং ক্রিকেটের ঝামেলা ক্যাস পর্যন্ত কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি, কিন্তু ক্রিকেট এখন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির আওতায় এসে পড়েছে। ২০২৮ লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে খেলা হবে। এমতাবস্থায় ক্যাসকে মানব না বলা যায় কি?

দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যায়নি। তার জন্যে তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া ছাড়া আর কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। ২০০৩ বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় যায়নি। সেক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। মামলা মোকদ্দমা হলে এসব দৃষ্টান্ত আইসিসির বিপক্ষেই যেত। আর পিএসএল? সেটা ঘরোয়া লিগ, তাকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আইসিসির নেই। যেমন আইপিএলকেও আইসিসি নিষিদ্ধ করতে পারে না। যা-ই হোক, এত আইনি জটিলতার দরকার পড়েনি, কারণ আইসিসির সঙ্গে পিসিবি আর বিসিবির বৈঠক সফল হয়েছে।

রাজনৈতিক হার

কে জিতল কে হারল তা নিয়ে কাজিয়ার মধ্যে মহসীন ১০ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, ভারতের ম্যাচ বয়কট করার পিছনে তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল— বাংলাদেশের সঙ্গে যে অবিচার হয়েছে তার প্রতিকার করা। তাই বাংলাদেশের দাবিই তাঁদের দাবি, নিজেদের অন্য কোনো দাবি ছিল না। বাংলাদেশের সম্মান পুনরুদ্ধার হয়েছে বলেই তাঁরা খেলতে রাজি হয়েছেন। কথাটা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থরক্ষা যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই, আর পাকিস্তান এই কাণ্ড না করলেও যে স্বার্থরক্ষা হত তার গ্যারান্টি নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, পিসিবি এ জিনিস করল কেন? পাকিস্তান এক মহান দেশ বলে? নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও ক্রিকেটভক্তদের দুঃখে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বুকের ভিতরটা হু হু করছিল বলে? দুটোর কোনোটাই নয়। পাকিস্তান যে কোনো মহান দেশ নয় তা আমরা ভারতীয়রা ভালো করেই জানি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যাওয়া বাংলাদেশীরাও জানেন।

আসলে মহসীন একজন দুঁদে রাজনীতিবিদ। তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সদস্য। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এবং ক্রিকেট নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে দেবজিৎ শইকিয়াদের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড রাজনীতিতেই ল্যাজেগোবরে হল। স্রেফ সোশাল মিডিয়া ট্রোলদের কথায় কান দিয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে তাড়ানো হয়েছিল। অথচ এর কোনো রাজনৈতিক যুক্তি ছিল না, কারণ পাকিস্তানের মত বাংলাদেশ আমাদের শত্রু রাষ্ট্র নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোদিন যুদ্ধ হয়নি, বরং তাদের ইতিহাসের একমাত্র যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরাই সহায়তা করেছিলাম। বাংলাদেশে যে দলের সরকারই এসে থাক, কোনোদিন আমাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারতই আশ্রয় দিয়েছে, আবার বর্তমান তদারক সরকারের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক বজায় আছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে শোকপ্রকাশ করতে আমাদের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্বয়ং বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। সেই দেশের ক্রিকেটারকে আমাদের দেশের লিগে খেলতে দেওয়া হল না কোন যুক্তিতে?

মুসলমানবিদ্বেষ, এবং বোর্ডের সেক্রেটারি দেবজিৎ যে রাজ্যের লোক সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার স্পষ্ট বাঙালিবিদ্বেষ— এছাড়া আর কোনো যুক্তিই খাটে না। সেই যুক্তি প্রয়োগ করেই গণ্ডগোলটা পাকাল বিসিসিআই। জবাবে বিসিবি ভারতে খেলতে আসতে অস্বীকার করল। আইসিসি যে বিসিসিআইয়ের দুবাই শাখা মাত্র, সেকথা নিতান্ত বোকা আর ন্যাকা ছাড়া ক্রিকেট-দুনিয়ার সবাই জানে। তা যদি না হত, তাহলে আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে নিয়ে তাদের শ্রীলঙ্কায় খেলতে দিত। ঠিক যেমন গতবছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতকে পাকিস্তানের বদলে সংযুক্ত আরব আমীরশাহীতে খেলতে দিয়েছিল। বাংলাদেশের নিরাপত্তার অভাববোধ করার দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আইসিসির নিরাপত্তা দল যা-ই বলে থাক। কারণ ততদিনে কলকাতা নাইট রাইডার্সে মুস্তাফিজুরকে নেওয়ার জন্যে শাহরুখ খানকে এবং মুস্তাফিজুরকে ভারতের শাসক দলের নেতারা হুমকি দিয়ে ফেলেছেন। শেষ মুহূর্তে সূচি পরিবর্তন করা মোটেই কঠিন নয়।

কিন্তু তাতে ভারত আর বাংলাদেশকে সমানভাবে দেখা হয়ে যেত। আইসিসি মানে তো আসলে বিসিসিআই। নইলে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারত জিতলে বাচ্চা ছেলের মত লাফালাফি করেন কেন? সেই লোকের অধীন আইসিসি মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে পারে না। ফলে বাংলাদেশের দাবি মানা হল না। ক্রিকেটপাগল দেশের জনগণ, যাদের মধ্যে এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে ভারতবিরোধিতা দিন দিন বাড়ছে, তাদের বাদ দিয়ে দেওয়া হল বিশ্বকাপ থেকে। এই সুযোগটাই নিলেন মহসীন। গোটা ঘটনাবলীতে সবচেয়ে ক্ষতি হল ভারতের বিদেশনীতির। ‘বিজেপিচালিত’ ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসির নৈপুণ্যে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের শত্রু রাষ্ট্রটির সঙ্গে পূর্ব সীমান্তের বন্ধু রাষ্ট্রটির গলাগলি হয়ে গেল। এবার বাংলাদেশের নির্বাচনে যে দলই জিতুক, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে ভারত সরকারকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে।

কেলোর কীর্তি এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণদিকের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক মোটের উপর বরাবরই ভালো, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত না থাকায় শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক যৎসামান্য। একসময় বরং একটু গোলমেলেই হয়ে গিয়েছিল, কারণ ২০০৯ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানে খেলতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার শিকার হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা। এবারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছে কলম্বোয়, সেহেতু ম্যাচটা না হলে শ্রীলঙ্কার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। তাই তারাও পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছিল ম্যাচটা খেলতে। পাকিস্তান শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে যাওয়ার পরে শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী ও পর্যটন মন্ত্রী সোশাল মিডিয়া পোস্টে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কাকে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আর পিসিবিকে। উপরন্তু লিখেছেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়ি মনোভাব, মিত্রতা এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শক্তির নিদর্শন। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার থেকেও হাততালি কুড়িয়ে নিল পাকিস্তান, আইসিসি নয়।

অতি দর্পে…

সেই জগমোহন ডালমিয়ার আমলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ একত্রে বিশ্ব ক্রিকেটে উপমহাদেশের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা শুরু করেছিল এবং সফল হয়েছিল। কারণটা ব্যবসায়িক। যতগুলো দেশ ক্রিকেট খেলে, তার মধ্যে খেলাটার জনপ্রিয়তা এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি এবং প্রত্যেকটা জনবহুল দেশ। এখন যুক্ত হয়েছে নেপাল আর আফগানিস্তান। ফলে এই উপমহাদেশই স্পনসরদের জন্যে সবচেয়ে বড় বাজার। অন্যান্য কুড়ি বিশের লিগের তুলনায় আইপিএলের রমরমাও এই কারণেই বেশি, বিসিসিআইও এই কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হতে পেরেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের হাত থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের রাশ কেড়ে নেওয়ার পরে ডালমিয়া চেষ্টা করেছিলেন ক্রিকেটকে আরও ছড়িয়ে দিতে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনায় নিয়ে আসা সেই চেষ্টারই অংশ। সে আমলেই অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর মধ্যে ক্রিকেট আরও ছড়াচ্ছিল। কেনিয়া ভাগ্যের সামান্য সহায়তা পেয়ে ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল। সিঙ্গাপুর, টরন্টো, নাইরোবির মত নতুন নতুন জায়গায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর বসছিল। কিন্তু এন শ্রীনিবাসনের আমল থেকে, বলা ভালো, আইপিএলের টাকায় পকেট ভীষণ গরম হওয়ার পর থেকে, উপমহাদেশীয় ঐক্যের তোয়াক্কা না করে বিসিসিআই এককালে সকলের উপর ছড়ি ঘোরানো অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের সঙ্গেই জোট বেঁধে তৈরি করেছে ‘বিগ থ্রি’ মডেল।

এই মডেল অনুযায়ী, আইসিসির আয়ের সিংহভাগ নিয়ে নেয় এই তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড। বাকিদের দিকে কাঁটা কুটো ছুড়ে দেওয়া হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত জায়গায় একাধিক কারণে ক্রিকেটের নাভিশ্বাস উঠে গেছে গত ১০-১৫ বছরে। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর অবস্থা স্বভাবতই আরও সঙ্গীন। দুর্বল দেশগুলোকে বেশি সাহায্য করাই তো যে কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থার দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিন্তু ত্রিদেবের যুক্তি হল— আমাদের এখান থেকে আইসিসির সবচেয়ে বেশি টাকা আয় হয়, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব।

অর্থাৎ পুঁজিবাদের যতরকম মডেল হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে শোষণমূলক মডেলটাতেই চালানো হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেট। টাকার নেশায় চুর এই ক্রিকেট প্রশাসকদের মাথায় ঢোকে না যে, পুঁজিবাদের যুক্তি অনুযায়ীই বাজার ক্রমাগত বড় করে যেতে হয়, ছোট করলে ব্যবসার পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পথ খুলে দেওয়া হয়। ফলে বিসিসিআই তার দুই স্যাঙাতের সঙ্গেই বারবার খেলছে, বেশি ম্যাচের সিরিজ খেলছে। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। আফগানিস্তান আর আয়ারল্যান্ডকে তো টেস্ট খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে নামেই। তারা টেস্ট দূরের কথা, বড় দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বা কুড়ি বিশ বা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলারও সুযোগ পায় না। নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই। তার যাতে আগ্রহ নেই, আইসিসি তা করতে পারবে না।

এই ব্যবস্থায় বিসিসিআই ফুলে ফেঁপে উঠছে, ফলে তার গোদি মিডিয়া (প্রাক্তন ক্রিকেটার সমেত) আপনাকে সারা বছর বোঝাচ্ছে— এটাই ঠিক ব্যবস্থা। যখন সাহেবদের ক্ষমতা ছিল সাহেবরা যা করত, আমরাও তাই করছি। একে তো খ-এর আজকের খারাপ কাজটা ক আগে করত বলেই সেটা ভালো কাজ হয়ে যায় না, তার উপর একথা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে যে সাহেবদের সঙ্গে গলাগলি করেই ব্যাপারটা করছি। এটা মোটেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়। যা-ই হোক, ব্যাপারটা চলছিল ভালোই। কিন্তু এক মাঘে যে শীত যায় না সেটা ভুলে গিয়েই গোলমাল হয়ে গেল। ক্রিকেটের অর্থনীতি যে ভিতর থেকে ফোঁপরা হয়ে গেছে, তা প্রকাশ হয়ে গেল পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকার করতেই। দেখা গেল, যে যার নিজের দেশে কুড়ি বিশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করে নিজেদের পকেট যতটা পারছে ভরাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভিতেই উই ধরে গেছে। বাকি ম্যাচগুলোকে অবহেলা করতে করতে আর ভারত-পাক ম্যাচের বেলুনে ফুঁ দিতে দিতে (২০২৩ বিশ্বকাপে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। মনে আছে তো? ঝলমলে নাচাগানা হয়েছিল ভারত-পাক ম্যাচের দিন) এত বড় করা হয়েছে যে ওই ম্যাচের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে সকলের আয়। কোনো কোনো হিসাব বলছে, আইসিসি প্রতিযোগিতায় একটা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে ২,২০০ কোটি টাকার বেশি উঠে আসে (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার)। মানে ভারত-পাক রাজনৈতিক উত্তেজনার আগুনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রান্নাবাড়ি চলছে। আচ্ছা তা-ও নাহয় মানা গেল। কিন্তু কথাটা যখন জানাই আছে, তখন ম্যাচটা খেলতে গেলে যে পাকিস্তানকে লাগবে একথা তো বোঝা উচিত ছিল। সেক্ষেত্রে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার কী প্রয়োজন ছিল?

দেশপ্রেম বনাম ডলার-প্রেম

এই প্রশ্নটা শুনেই অনেকে তেড়ে এসে বলবেন ‘পাকিস্তান আমাদের দেশের এত ক্ষতি করেছে, ওদের সঙ্গে কি গলাগলি করতে হবে?’ আজ্ঞে না, গলাগলি করা একেবারেই অনুচিত। দেশপ্রেমের যুক্তি বলে, পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হানার পরে খেলাই উচিত নয় তাদের সঙ্গে। মানে ভারতেরই বরং পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট করা উচিত। কী হবে তাতে? দুটো পয়েন্ট কাটা যাবে। আমাদের তো বিশ্বসেরা দল, তারা সে ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে খেতাব জিততে পারবে না? নির্ঘাত পারবে। তাহলে আমরা খেলি কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?

শুধু খেলি তা নয়। বিসিসিআই যে আইসিসির ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেট চালায়, সেটা আমাদের অনেকেরই গর্বের বিষয়। অথচ তা সত্ত্বেও সব আইসিসি প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে আমাদের গ্রুপেই রাখা হয়, যাতে নিদেনপক্ষে একবার ভারত-পাক ম্যাচ হয়। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) আয়োজিত এশিয়া কাপে তো ভারত-পাক ম্যাচ হতেই হবে, এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু ২০২৫ এশিয়া কাপে এমন ব্যবস্থা করা হল যে ফাইনালের আগেই দু-দুবার এই দুই দলের খেলা হল, ফাইনালে আরও একবার।

রাজনৈতিক কারণে এক দেশের আরেক দেশের বিরুদ্ধে না খেলা কিন্তু পৃথিবীর কোনো খেলাতেই বিরল ব্যাপার নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনা নামানোর প্রতিবাদে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বয়কট করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত ৬০ খানার বেশি দেশ। তার বদলা নিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার বন্ধু দেশগুলো ১৯৮৪ সালের লস এঞ্জেলস অলিম্পিক বয়কট করে। আস্ত অলিম্পিক বয়কট করতে পেরেছে অতগুলো দেশ, আমরা একটা ম্যাচ বয়কট করতে পারি না?

আরো পড়ুন ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

কেন পারি না? উত্তর একটাই। ওই ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ও হিসাবটা তবু পাওয়া যায়, এই খেলা ঘিরে যে উন্মাদনা তাকে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম, তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যে কত টাকা রোজগার করেন তার হিসাব পাওয়াও সম্ভব নয়। ওই ভাগটা কেউই ত্যাগ করতে রাজি নয়। তাই পাকিস্তান বয়কটের কথা বলতেই, বিসিসিআইয়ের চেয়েও বেশি উৎসাহে এই ম্যাচ না খেলা কেন পাকিস্তানের অন্যায়, তা আপনার মাথায় ঢোকাতে কদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা। এদিকে দেশপ্রেমও দেখাতে হবে। তাই কী বুদ্ধি বের করেছিল বিসিসিআই?

খেলব, কিন্তু খেলার মাঠের দস্তুর অনুযায়ী পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আমাদের ক্রিকেটাররা হাত মেলাবেন না। উপরন্তু আমাদের অধিনায়ক সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন। গোদি মিডিয়া হাততালি দেবে, আপনাকে জানাবে যে পহলগামের মুখের মত জবাব এইটাই। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। এক বাংলা কাগজে তো লেখা হয়েছিল, ভারত এতদ্বারা পাকিস্তানকে বলল ‘চল ফোট’।

এই নাটুকেপনা পৃথিবীর অন্য কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থা করতে দিত না। তার প্রমাণ— এশিয়া কাপে যেদিন (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) সূর্যকুমার যাদবের দল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেলেছিল, সেদিনই কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কিন্তু এশিয়া কাপে ফাইনালের পরে আরও বড় নাটক করে ভারতীয় দল। তারা নাকি কোনো পাকিস্তানির হাত থেকে কাপ নেবে না। অথচ আগে থেকেই জানা ছিল যে, এসিসির প্রধান এখন মহসীন নকভি। ফলে কাপ জিতলে তাঁর হাত থেকেই নিতে হবে। জেদ করে সেই কাপ না নিয়েই ফিরে এসেছিলেন সূর্যকুমাররা।

তখনো ভারতের প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকরা এবারকার মতই প্রবল জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং রেলা নিয়ে লিখেছিলেন, ও কাপ নাকি দিয়ে যেতে বাধ্য হবেন নকভি। পাঁচ মাস হয়ে গেল, আজও সে কাপ এল না। বিসিসিআই এ নিয়ে আইসিসির কাছে, মানে প্রবল পরাক্রমশালী জয় শাহের কাছে, ছুটে গিয়েছিল। তিনিও সুবিধা করতে পারেননি। তাঁর আইসিসি মধ্যস্থতা করার জন্যে একখানা কমিটি গড়ে দিয়েছিল, সেই কমিটি ততটাই সফল হয়েছে যতটা গাজার গণহত্যা থামাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সফল। মহসীন বলেছেন, কাপটা রাখাই আছে। একখানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি, এসে নিয়ে যেতে হবে এসিসি অফিস থেকে। হয়ত বিসিসিআই ভিখারি নয় বলেই হকের কাপ নিতেও ক্রিকেটারদের পাঠাতে রাজি নয়।

এসব অসোয়াস্তি এড়ানো যায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মায়া ছাড়তে পারলে। কিন্তু তা তো হয় না, গোটা ক্রিকেট-দুনিয়ার দায়িত্ব যেখানে আমাদের ঘাড়ে। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর কী কী যে করতে হবে? দেখুন আবার, আজ থেকে ফের পাকিস্তানিদের সঙ্গে করমর্দন শুরু করতে হয় কিনা। গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে করমর্দনের প্রশ্ন উঠতেই সূর্যকুমার যেভাবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করেছেন, তাতে সন্দেহ হয়, তাঁকেও বলা হয়েছে ‘জো আপ উচিত সমঝো।’ তাঁকে অবশ্য এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিতে পারে কলম্বোর বৃষ্টি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।

আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।

এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।

চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।

আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।

কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?

সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

যত দোষ ক্রিকেট খেললে: ভারত-পাক বৈরিতার আজব শর্তাবলী

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়।

 

শচীন তেন্ডুলকর-পরবর্তী প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার বিরাট কোহলি যে খেলোয়াড়জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ আজ পর্যন্ত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর একটি টেস্টও খেলা হয়নি। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের টেস্ট দল যথেষ্ট সমীহ করার মত। বাঁহাতি পেসার শাহীন আফ্রিদি তিন ধরনের ক্রিকেটেই নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়ার ব্যাপারে দারুণ ধারাবাহিক। সঙ্গে আছেন তরুণ গতিময় পেসার নাসিম শাহ আর জীবনের প্রথম ছটা টেস্টেই ৩৮ উইকেট নিয়ে ফেলা লেগস্পিনার অবরার আহমেদ। এই বোলিংয়ের বিরুদ্ধে বিরাটদের দাঁড় করিয়ে দিলে খেলা কতটা চিত্তাকর্ষক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম এই মুহূর্তে সব ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং নয়নাভিরাম ব্যাটারদের একজন। মহম্মদ রিজওয়ান ব্যাট হাতে এত সফল যে এখন তিনি কখনো কখনো স্রেফ ব্যাটার হিসাবে খেলছেন, উইকেটরক্ষা করছেন প্রাক্তন অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। পাকিস্তান বহুকাল পরে পেয়ে গেছে একজন ওপেনারকে, যাঁর বয়স এখন মাত্র ২৩, কিন্তু এমন কিছু কাণ্ড করে বসে আছেন যা অতীতে শুধুমাত্র সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। যেমন প্রথম ছটা টেস্টে তিনি যত রান করেছিলেন তার চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড আছে শুধুমাত্র সুনীল গাভস্কর, ডন ব্র্যাডম্যান আর জর্জ হেডলির। এই মুহূর্তে ১৪টা টেস্ট খেলে শফিকের রান ১২২০। এর মধ্যেই চারটে শতরান করে ফেলেছেন, যার একটা আবার দ্বিশতরান। এই পাক ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ বা অশ্বিন-জাদেজার একটা লড়াইয়ের কথা ভাবলে জিভে জল আসবে যে কোনো ক্রিকেটরসিকের। আস্ত সিরিজ হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখানেই মুশকিল।

কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা না ঘটলে কোহলি অবসর নেওয়ার আগে এরকম সিরিজ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। যদি দুই দলই ২০২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে তাহলে হয়ত একবার এই ঘটনা ঘটতে দেখা যেতে পারে, কারণ বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত খেললে ভারত সরকার বা ভারতীয় বোর্ড আপত্তি করে না। বিশেষত যদি খেলাটা হয় তৃতীয় কোনো দেশে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ? নৈব নৈব চ। কেন? এককথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হবে “সিয়াচেন মেঁ জওয়ান হমারে লিয়ে লড় রহে হ্যাঁয়।”

ব্যাপারটার সূত্রপাত ২০০৮ সালে। সে বছর ১৮ অগাস্ট বিরাট প্রথমবার ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন আর ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনায় দেড়শোর বেশি মানুষের প্রাণ যায়। আক্রমণকারীদের পাক যোগ প্রমাণিত হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৯ সালে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর ভারতে প্রায় সব মহল একমত হয় যে ওই পরিবেশে ক্রিকেট খেলা হওয়া সঙ্গত নয়। ফলে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের আর পাকিস্তানে যাওয়া হয়নি। সেবছরই লাহোরে সফররত শ্রীলঙ্কা দলের টিম বাস এবং আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারিদের গাড়ির উপর সন্ত্রাসবাদীরা গুলি চালায়। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার, রিজার্ভ আম্পায়ার এহসান রাজা এবং শ্রীলঙ্কার সহকারী কোচ পল ফারব্রেস আহত হন। আটজন পাকিস্তানি নাগরিক মারাও যান। স্বভাবতই তারপর বহুবছর কোনো দেশের দলই পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলতে যেতে রাজি হয়নি। তারপর থেকে দীর্ঘকাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দুবাই বা শারজার মাঠই হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের ‘হোম গ্রাউন্ড’।

তারপর কিন্তু গঙ্গা এবং সিন্ধু দিয়ে বিস্তর জল গড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতির নিয়ম মেনে অসংখ্যবার সরকার বদল হয়েছে, পাক আদালতের রায়ে জামাত-উদ দাওয়া প্রধান হাফীজ সঈদের মত কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীর কারাবাস হয়েছে। ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান সম্পর্কে খড়্গহস্ত হলেও তাদের প্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদী আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইকে অভূতপূর্ব স্বাধীনতা দিয়ে ভারতের পাঠানকোট সেনা ছাউনিতে ‘তদন্ত’ করতে দিয়েছে ভারত সরকার। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের কথা উঠলেই – সিয়াচেন… । এই পর্বে পাকিস্তান দল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এসে একদিনের ম্যাচ এবং টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলে গেছে। তবে তখনো ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। মোদীজি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর দ্বিপাক্ষিক সফর হয়নি। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়। সম্ভবত বহুকাল পরে এই দুই দলের একটা ম্যাচের টিকিট ও বিজ্ঞাপন থেকে যত টাকা রোজগার করে যতগুলো পক্ষ, তাতে আদিগন্ত বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানের কষ্ট চাপা পড়ে যায়।

ব্যবস্থাটা ততদিন দিব্যি চলছিল যতদিন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ভারত পাকিস্তানে যাবে না, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের ভারতে এসে খেলতে হবে – এটা সুবোধ বালকের মত মেনে নিচ্ছিল। এখন আর মানতে চাইছে না। কারণ সাত বছর হল সফলভাবে পাকিস্তান সুপার লিগ আয়োজিত হচ্ছে, যেখানে ভারত ছাড়া আর সব দেশের ক্রিকেটাররা খেলতে যান। উপরন্তু গত দুবছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশও পাকিস্তানে এসে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে গেছে। ফলে টাকার জোরে এবং/অথবা রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় বোর্ড তাদের যেখানে ইচ্ছে খেলতে বাধ্য করবে, অথচ নিজেরা পাকিস্তানে খেলতে যাবে না – এ জিনিস পাক বোর্ড মানবে কেন? তাই সম্প্রতি এশিয়া কাপ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বহুকাল আগে থেকে ঠিক ছিল এবারের এশিয়া কাপ হবে পাকিস্তানে। কিন্তু ভারতীয় দল কিছুতেই পাকিস্তানে যাবে না। বিস্তর দড়ি টানাটানির পর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটা বাদে অন্যগুলো নিজের দেশে খেলবে আর ভারত খেলবে শ্রীলঙ্কায়; সুপার ফোর স্তরের খেলাগুলো দুই দেশ মিলিয়ে খেলা হবে এবং ফাইনালও হবে শ্রীলঙ্কায় – এরকম দোআঁশলা ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অন্যায় আবদার চিরকাল চলবে না।

চলার প্রয়োজন কী – সে প্রশ্নটাও তোলার সময় এসেছে। ২৬/১১-র পরেও বহুবার অন্য খেলার পাকিস্তান দল ভারত সফরে এসেছে, ভারতীয় দলও পাকিস্তানে গেছে। ২০২০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে এক মজার কাণ্ড হয়েছিল। ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রক এবং সর্বভারতীয় সংস্থা দাবি করেছিল তারা নাকি কোনো দলকে পাঠায়নি, ওদিকে ওয়াগা সীমান্ত পার হয়ে আস্ত একটি দল পাকিস্তানে হাজির হয়।

এ মাসেই চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হকিতে পাকিস্তান খেলে গেল। এসবে বোধহয় সিয়াচেনের বরফও গলে না, ২৬/১১-তে মৃত মানুষদের স্মৃতিকেও অসম্মান করা হয় না। মজার এখানেই শেষ নয়। আসন্ন এশিয়ান গেমসে সোনা জিতলে ভারতীয় হকি দল সরাসরি প্যারিস অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু না পারলে যোগ্যতার্জন পর্বের খেলায় যোগ দিতে হবে, যা হবে পাকিস্তানে। হকি ইন্ডিয়ার প্রধান দিলীপ তিরকে ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, সেরকম হলে দল পাকিস্তানে খেলতে যাবে।

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

তাহলে কি অলিম্পিক টিকিটের চেয়ে জওয়ান, শহিদ, মৃত নাগরিকদের প্রাণের দাম কম? নাকি একমাত্র ক্রিকেট দলেরই দায়িত্ব তাঁদের প্রাণের দাম দেওয়া? সে দায়িত্বও বিশ্বকাপ-টাপ এসে পড়লে কদিনের জন্য ভুলে থাকার লাইসেন্স দেওয়া আছে নাকি বোর্ডকে? এ তো বড় রঙ্গ জাদু!

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত।

ম্যাচে তখন টানটান উত্তেজনা। টিভির পর্দায় দেখা গেল ওভারের মাঝখানে দীর্ঘদেহী হার্দিকের খর্বকায় রিজওয়ানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। চমকে যাওয়ার পর রিজওয়ানও ভালবেসে টেনে নিলেন হার্দিকের হাত। ম্যাচের আগের কদিন টুইটারে ভাইরাল হয়েছিল একটা ভিডিও। চোটের কারণে এশিয়া কাপ ক্রিকেট থেকে ছিটকে যাওয়া শাহীন আফ্রিদি মনমরা হয়ে প্র্যাকটিসের মাঠের ধারে বসেছিলেন। বিরাট কোহলিকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বিরাট জিজ্ঞেস করলেন পা কেমন আছে। আফ্রিদি বললেন, আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, যেন আপনার ফর্ম ফিরে আসে।

এই আবহে খেলা হল রবিবারের ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ। এর আগের ম্যাচ হয়েছিল ২৪ অক্টোবর ২০২১, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি উপলক্ষে। সে ম্যাচ দাপটে জিতেছিল পাকিস্তান। এবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। শেষপর্যন্ত তফাত গড়ে দিলেন পান্ড্য, ভারত জিতল। কিন্তু কোনো ম্যাচেই কোনো অবাঞ্ছিত উত্তাপ তৈরি হয়নি। বরং সাম্প্রতিককালে ভারত বনাম ইংল্যান্ড খেলা হলে ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝে বেশ কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা গেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশীর খেলা বরং ঠিক সেভাবেই হল যেভাবে হওয়া উচিত – ব্যাট বলের লড়াইতে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ল না, কিন্তু মুখের হাসিটি বজায় রইল। শুধু তা-ই নয়, পাক ব্যাটার ফখর জমান আউটের আবেদন না হলেও বল ব্যাটে লেগেছে বুঝতে পেরে নিজেই হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। তবু কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে সিরিজ খেলা হবে না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

শেষ ভারত-পাকিস্তান টেস্ট খেলা হয়েছিল ২০০৭ সালে আর শেষ একদিনের ম্যাচ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে। দীর্ঘকাল হল ভারত বহুদলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। আবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বহুদলীয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। কেন খেলে না? কারণ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার ভাষায় “জওয়ান সীমা পে লড় রহে হ্যাঁয়”। তাহলে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? শান্ত হয়ে বসে টিভিতে খেলা দেখেন? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত। প্রক্সি ওয়ারে সীমান্তের এপারে ওপারে নিয়মিত যে জওয়ানদের প্রাণ যায়, সেগুলো বেঁচে যাবে। আসল কথা, নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যেকটা ম্যাচ নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা আর সম্ভব হবে না। মাঠে ক্রিকেটারদের হাসিঠাট্টা, স্বাভাবিক ব্যবহার দেখতে দেখতে এপারের দেড়শো কোটি আর ওপারের কোটি পঁচিশেক মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রতিবেশী দেশের মানুষ মানেই ইবলিশের বাচ্চা বা রক্তপিপাসু জেহাদি সন্ত্রাসবাদী নয়, তাহলে সমূহ বিপদ দুই দেশের শাসকদেরই। তখন দেশের বেকারত্ব, দেশের মুদ্রাস্ফীতি, দেশের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সে বিপদ এড়াতে কালেভদ্রে ম্যাচ হবে, পিচে পপিং ক্রিজ চিহ্নিত করতে টানা লাইনটাকে নিয়ন্ত্রণরেখার সাথে তুলনা করে সম্প্রচারকারী সংস্থা বিজ্ঞাপন দেবে আর প্রগলভ রবি শাস্ত্রীর কণ্ঠে শোনানো হবে – এটা স্টেডিয়াম নয়, কলিসিয়াম। ওরা ক্রিকেটার নয়, গ্ল্যাডিয়েটর। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই খেলার মাঠ লড়াইয়ের মাঠ হয়ে উঠবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত