হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী?

আলো আঁধারিতে ঢাকা একফালি জায়গা, তার এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট পিঁপড়ে। প্রথম চোটে তাই মনে হয় বটে, তবে কয়েক সেকেন্ড কাটতে না কাটতেই বোঝা যায় – জায়গাটা আসলে গাড়িঘোড়াহীন ফ্লাইওভার। যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা নিরুপায়, শ্রান্ত মানুষ। প্রতীক শাহের ক্যামেরায় লকডাউনে ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এভাবেই দেখিয়েছেন হোমবাউন্ড ছবির পরিচালক নীরজ ঘেওয়ান। মাল্টিপ্লেক্সের ঠান্ডা ঘরে বসে মনে হয়, যেন ধরে ফেলেছেন আমরা আসলে কীভাবে দেখি ওই মানুষগুলোকে, রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। ধরে ফেলেছেন বলেই ছবি শুরুর আগের, স্পষ্টতই সেন্সরের চাপে লিখিত, দীর্ঘ ‘ডিসক্লেমার’ দ্বিগুণ হাস্যকর মনে হয় ছবি শেষ হওয়ার পর। তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় ডিসক্লেমারের পরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দবন্ধ, যার অর্থ – সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

নীরজ, বরুণ গ্রোভার এবং শ্রীধর দুবে লিখিত এই ছবির সংলাপে করুণ মুহূর্তে নানা সূক্ষ্ম ও স্থূল রসিকতা থাকলেও, হোমবাউন্ড যে হাস্যরস উৎপাদন করে তার গায়ে ভিড়ে ঠাসাঠাসি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের মত করে লেগে থাকে চোখের জল। ইদানীং এদেশে ঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া মানুষ সর্বত্র খলনায়ক। এই ছবির দুই প্রধান চরিত্র মহম্মদ শোয়েব (ঈশান খট্টর) আর চন্দন কুমার বাল্মীকি (বিশাল জেঠওয়া) আবার সেই শ্রেণিতে পড়ে, যারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণার – অর্থাৎ সাদা কলারের কর্মী নয়, একেবারে গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য শ্রমজীবী না হলেও হয়ত বিশেষ তফাত হত না, কারণ নামেই প্রমাণ – প্রথম জন মুসলমান, দ্বিতীয় জন দলিত। হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী? যেমনটা এক সরকারি অফিসার তাকে বলেছে। এই ছবির লেখক দল – বরুণ, বশারত পীর, সুমিত রায় এবং নীরজ স্বয়ং – স্লোগানধর্মিতার দিকে না গিয়েও বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন শোয়েবরা কেন সুযোগ পেলেও দুবাই যেতে চায় না। চন্দনদের বিড়ম্বনাও দেখিয়ে দিয়েছেন। আসল পদবি লিখলে লোকে নিচু নজরে দেখে আর না লিখলে নিজের চোখে ছোট হয়ে যেতে হয়। সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মে পদবি লিখব কি লিখব না, ‘সংরক্ষিত’ লেখা বাক্সে টিক দেব কি দেব না – নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা লড়তে লড়তেই বয়স বেড়ে যায়।

ন্যাকা লাগছে ব্যাপারগুলো? লাগারই কথা। মানুষের চোখে পিঁপড়ের জীবনসংগ্রাম তো ন্যাকাই লাগে। ‘গেটেড কমিউনিটি’-র মধ্যে কাটানো নিশ্চিন্ত জীবন আর সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার সমান দারিদ্র্যে ক্রমশ বিভাজিত হতে থাকা এই দেশে হোমবাউন্ডের পাত্রপাত্রীদের জীবন মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের চোখে অলীক, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ তো সেই রাজ কাপুরের আমল নয় যে সিনেমার পর্দায় চালচুলোহীন শ্রী ৪২০-এর সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে বস্তির বাচ্চাদের লিখতে পড়তে শেখানো সুন্দরী নার্গিসের, আর তা দেখে মোহিত হবে আসমুদ্রহিমাচল হিন্দি সিনেমার দর্শক। নতুন ভারতের মহানগরে শ্রী ৪২০ হয়ে থাকাই যাবে না, আধার কার্ড দেখাতে হবে। শোয়েবের মত মুসলমান হলে সামান্য চাপরাশির চাকরি পাকা করতে কেবল নিজের আধার কার্ড নয়, বাবা-মায়ের আধার কার্ডও দেখাতে হবে। আজকের হিন্দি সিনেমায় বস্তিবাসী কি ফুটপাথবাসী তো দূরের কথা, শোয়েব আর চন্দনের মত গাঁয়ের লোকদেরও দেখা যায় না চট করে। সেই নয়ের দশক থেকে, প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আর অনাবাসী ভারতীয়রাই তো নায়ক, নায়িকা। ইদানীং আবার প্রাচীন ও অপ্রাচীন যোদ্ধা এবং ধর্মযোদ্ধারা নায়ক, নায়িকা হচ্ছেন। নীরজ উলটো পথের পথিক। এক দশক আগে নিজের প্রথম ছবি মসান-এ তিনি দেখিয়েছিলেন বারাণসীর ডোম পরিবারের ছেলের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মেয়ের প্রেমের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছিলেন – এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হয় না কেন? সেই প্রশ্নেরই যেন এবার উত্তর খুঁজেছেন দুই গ্রামের ছেলের কাহিনিতে।

দুঃখ শেষ হয় না, কারণ চন্দনের মায়ের রান্না যতই ভালো হোক, সে মিড ডে মিল রাঁধলে বাবা-মায়েরা স্কুলে পাঠাবেন না ছেলেমেয়েদের। চন্দনের দিদি স্কুলের বাচ্চাদের হেগো পোঁদ ধুইয়ে দেবে – ওই পর্যন্ত ঠিক আছে। ব্যতিক্রমী হেডমাস্টার যতই আইনের ভয় দেখান, তাতে কাজ হবে না। বাবাসাহেব আম্বেদকর দলিতদের বাড়ির বিয়েতে গৌতম বুদ্ধের পাশে যতই পূজিত হোন, সংবিধান বা আইন মানা হবে কিনা, কোথায় কতটুকু মানা হবে, তা ঠিক করবেন উচ্চবর্গীয়রাই। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ শোয়েবের মা যতই সুস্বাদু হালুয়া রাঁধুন আর শোয়েবের বিপণন ক্ষমতা যতই অসাধারণ হোক, শেষ কথা হল সে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কাকে সমর্থন করে এবং সে নিজে যা-ই মনে করুক, সবাই নিশ্চিত যে পাকিস্তান হারলে সে দুঃখ পায়। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ পথে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পুলিশ প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর মর্গে নিয়ে যেতে পত্রপাঠ সবাই হাজির। চারতলা পায়ের তলায় রাখবে তিনতলাকে, তিনতলা পায়ের তলায় রাখবে দোতলাকে, দোতলা পায়ের তলায় রাখবে একতলাকে – হাজার হাজার বছরের এই সুবিন্যস্ত শোষণব্যবস্থাকে কোনোরকম তত্ত্ব না কপচিয়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন নীরজ। দুই প্রাণের বন্ধুর একজন চাকরির পরীক্ষায় পাশ করল, অন্যজন করল না। অমনি কিন্তু সম্পর্ক চিড় খেল, একে অপরের ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি পরিচয় উল্লেখ করে দাঁত নখ বের করে ফেলল। আবার হতদরিদ্র চন্দনের পরিবার সর্বস্ব পণ করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যায় চন্দনের জন্যে, তার দিদির জন্যে নয়। দলিত মেয়ে সুধা ভারতী যতই প্রেমে পড়ুক, সে অন্তত গ্র্যাজুয়েট নয় এমন ছেলেকে – পুলিশের কনস্টেবলকে – বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ বাবার সরকারি চাকরির কল্যাণে সুধার জাত না বদলাক, শ্রেণি বদলে গেছে। এই হল নীরজের ভারত, আমাদের ভারত।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

অভিনেতার কাজই হল তিনি যে লোক নন সেই লোক হয়ে ওঠা। তবু হয়ত চারপাশের পরিস্থিতির কারণেই ঈশানকে মিতভাষী, অপমান বুকে চেপে রাখা গরিব মুসলমান যুবকের চরিত্রে এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে দেখে একটু বেশিই ভালো লাগে। নীরবে অপমানিত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে ঈশান সবচেয়ে বাঙ্ময়। ছবির শেষ প্রান্তে চরম অসহায়তার মুহূর্তে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন। তবে চমকে দেন চন্দনের চরিত্রে বিশাল। তাঁর চেহারার সবচেয়ে চোখে পড়ার মত জিনিস হল অস্বাভাবিক কটা চোখ। ওই চোখদুটোকে তিনি মরদানি ২ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন নারীবিদ্বেষী সাইকোপ্যাথের হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলতে। এখানে প্রায় ম্যাজিকের মত ব্যবহার করেছেন দলিতের গ্লানিকে মুখরতা দিতে। পছন্দের নারীর সামনে প্রেমিকের চিরকালীন ক্যাবলামি করতে করতে, ভেঙে পড়া বন্ধুকে কাঁদার জন্যে কাঁধ এগিয়ে দিতে দিতে ছবি যত এগিয়েছে, বিশাল বিশালতর হয়েছেন।

নীরজের ছবির নায়িকার গ্ল্যামার থাকে না, সুধারও নেই। সেই চরিত্রে জাহ্নবী কাপুর যথাযথ। তবে বিশালের সঙ্গে ঈশানের রসায়ন যত নিখুঁত, জাহ্নবী আর বিশালের রসায়ন ততটা জমেনি। পর্দায় বেশিক্ষণ না থাকলেও মনে থেকে যায় চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎস্যা আর ঈশানের বসের চরিত্রে শ্রীধরের অভিনয়। বরুণ অতীতে বহু ছবিতে একবার শুনলে কানে লেগে থাকার মত গান লিখেছেন। যাঁরা তাঁর কবিতার কথা জানেন, তাঁকে ঋজু বিদূষক হিসাবেও চেনেন, তাঁরা আরও ভালো করে জানেন তাঁর ভাষার উপর প্রশ্নাতীত দখলের কথা। সব মিলিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, অমিত ত্রিবেদী সুরারোপিত, জাভেদ আলি আর পাপোনের গাওয়া এই ছবির ‘ইয়ার মেরে’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

নীরজ একজন আশ্চর্য পরিচালক। তিনি গোটা ছবিতে মানুষের শঠতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুঃখকষ্ট দেখান। তারপরেও এক চিলতে আশায় ছবি শেষ করেন। মসান ছবিতে শ্মশানের বামুনের মেয়ে দেবী পাঠক (রিচা চাড্ডা) আর ডোমের ছেলে দীপক চৌধুরীর (ভিকি কৌশল) সমান্তরালভাবে চলতে থাকা জীবন একসাথে বয়ে গিয়েছিল সঙ্গমের দিকে। এখানেও শেষমেশ দুরকমভাবে ঘরে ফিরেছে দুই বন্ধু। নীরজ শেষপর্যন্ত এমন এক দেশের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছেন, যেখানে হিন্দু বন্ধুর গৃহপ্রবেশে দরজা ফুল দিয়ে সাজায় মুসলমান বন্ধু। এ দৃশ্যই এদেশে স্বাভাবিক ছিল, ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে – মুসলমান রোগী দেখেন বলে হিন্দু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তাই বুক দুরুদুরু করে। পরিচালককে প্রশ্ন করতে সাধ হয় ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি/হারিয়েছ দেশ কাল জানো না কি?’

অবশ্য হয়ত নীরজই ঠিক, আমরা যারা আশঙ্কিত, তারাই ভুল। সংখ্যাগুরুবাদীদের গত কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পরেও, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রচার চালানোর পরেও, হিন্দি সিনেমার দর্শকরা ঘৃণা ছড়ানো সিনেমাকে বাতিল করে দিলেন তো। তাছাড়া ধর্মা প্রোডাকশনসের মত বলিউডের বিরাট প্রযোজনা সংস্থা এ ছবির দায়িত্ব নিল তো। যতই মার্টিন স্করসেসি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হোন, অত বড় ব্যানারের ছায়া না থাকলে যে এ ছবি দর্শকের মুখ দেখত না, তা সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অতএব হয়ত এখনো আশা করা অযৌক্তিক নয় যে, ক্রিকেট খেলতে খেলতে মুসলমান বন্ধুকে কেউ তার ধর্ম তুলে ‘নিজেদের এলাকায় গিয়ে খেল গে যা’ বললে হিন্দু বন্ধুর মারপিট করতে যাওয়ার দিন এদেশে ফুরোবে না। এ যুগের কোনো কবিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারকে স্মরণ করে লিখতে হবে না ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধূ ধূ/খেলার বয়েস পেরোলেও একা ঘরে/বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে।

এক যুগ পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দুদিন আগে, যা এতদিনের অনভ্যস্ত কানে অবিশ্বাস্য মনে হল— ভারতের শাসক দল আর বিরোধী দল একমত হয়েছে। কোন বিষয়ে? ভোটচুরি সম্বন্ধে। যে সে লোক নয়, দেশের গদ্দারদের দেখলেই গুলি করার পক্ষপাতী যিনি, সেই অনুরাগ ঠাকুর স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঠিক তাই বললেন, যা লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা রাহুল গান্ধী তার হপ্তাখানেক আগে বলেছিলেন— ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে ভোটচুরি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, অনুরাগ রাহুলের বক্তব্যকে আরও জোরদার করে দিয়েছেন।

রাহুল তো বলেছিলেন তাঁর দলের লোকেরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কম্পিউটার স্ক্যানেরও অযোগ্য সাত ফুট উঁচু কাগজ ঘেঁটে ভোটচুরির প্রমাণ বের করেছেন মোটে একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একখানা বিধানসভা অঞ্চলে। চাইলে কমিশন বলতেই পারত যে এত বড় দেশে একটা লোকসভা কেন্দ্রে ভুলচুক হয়ে থাকতেই পারে। এ দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সারা দেশে এ জিনিস হয়েছে। কিন্তু অনুরাগ আরও গভীরে গবেষণা করেছেন। তিনি সারা দেশের নানা রাজ্যের আধ ডজন লোকসভা আসনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেগুলোতেও দেখা যাচ্ছে রাহুল-চিহ্নিত মাধবপুরা আসনের মতোই কাণ্ড ঘটেছে।

৭ আগস্ট ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ হিন্দুমতে লক্ষ্মীবার। সেদিন রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন এবং তারপর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তাতে মা লক্ষ্মী হিন্দুত্ববাদীদের উপর অপ্রসন্ন বলেই বোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির মতো একাধিক বিরোধী দল ভোটে কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছে। প্রায় সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই আঙুল উঠেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দিকে। কমিশন পাত্তা দেয়নি, বিজেপি তো দেয়নি বটেই। নিজেরা জিতলে বলেছে ‘হেরো পার্টি অজুহাত খুঁজছে’, আর বিরোধীরা জিতলে বলেছে ‘এবার কেন ওরা ইভিএমের কথা বলছে না?’ অথচ ইভিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না, অভিযোগকারীরা যে শলাপরামর্শ করে অভিযোগ করেছে তা-ও নয়। কেবল বিরোধীরাই অভিযোগ করেছে এমনও নয়। সাংবাদিকরা খবর করেছেন ইভিএম বেপাত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রদত্ত ভোট আর ইভিএমে গোনা ভোটের সংখ্যার তফাত হয়েছে প্রচুর আসনে— সবই মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতে আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও বিশ্বাস করেছেন যে বিরোধীরা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে না, তাই এসব বলে। যতটুকু যা কারচুপি হয় তা চিরকালই হত, যখন যে ক্ষমতায় থাকে সে-ই করে। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল।

কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রাহুল একেবারে অন্যদিক থেকে আক্রমণ করলেন। বললেন, গোড়ায় গলদ। ভোটার তালিকা ঘেঁটে বের করা তথ্য চোখের সামনে তুলে ধরলেন, দিস্তা দিস্তা কাগজ হাতে দেখিয়ে দিলেন— অভূতপূর্ব কারচুপি হচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকলেও, সেরা বৈশিষ্ট্য হল— মুকেশ আম্বানির একটা ভোট, আমার বাড়ির কাজের দিদিরও একটাই ভোট। ওটাই ভারতের গণতন্ত্রের জোর, আমাদের গর্বের জায়গা। এই জায়গাটা সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই স্বাধীন ভারতে তৈরি করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দিন থেকে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টান, উঁচু জাত-নিচু জাত— সবার ভোটাধিকার আছে, এই গর্ব করার অধিকার গোটা দুনিয়ায় একমাত্র আমাদের। এমনকি গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এই ইতিহাস নেই। আর ৭৮ বছরের অবহেলায় অর্থবল, বাহুবলের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে ভারতীয় গণতন্ত্র যেখানে পৌঁছেছে তাতে আজ আপামর ভারতবাসীর গণতান্ত্রিক সম্বল বলতে ওই ভোটটুকুই। সেটাই যে চুরি হয়ে যাচ্ছে তা রাহুল আক্ষরিক অর্থে কাগুজে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যতই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢাক বাজানো হোক, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ছাড়া আর কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার জানেন না। তাঁদের কাছে কাগজে ছাপা জিনিসের মর্যাদা এখনও বেশি। এই কথাটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, গরিব মানুষের পার্টি বলে যারা নিজেদের দাবি করে তারাও অনেকে বোঝে না। রাহুল বা কংগ্রেস যে সেটা বুঝেছে, সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলন তার প্রমাণ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দেশের বড় অংশের মানুষকে কিছুই বোঝানো যেত না, যদি রাহুল ইয়া মোটা মোটা বইয়ের মতো করে প্রমাণগুলো চোখের সামনে হাজির না করতেন। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হল, সাংবাদিকরা কিন্তু ইভিএম কারচুপির প্রশ্নও তুলেছিলেন। রাহুল সেদিকে গেলেনই না, বললেন আসল গলদ নির্বাচন কমিশনের। ওই জায়গাটা ঠিক না থাকলে ব্যালটেই ভোট হোক আর ইভিএমে— ভোটচুরি হবেই।

আরও পড়ুন বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

বিষ্যুদবারের ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা করতে করতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলল নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ-দেশের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের চৌবাচ্চার মতো। রাহুল জল বেরোবার এত বড় গর্ত করে দিয়েছেন যে জল ঢোকার নল দিয়ে কমিশন আর বিজেপি যতই জল ঢোকাক, চৌবাচ্চা দ্রুত খালি হয়ে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে কমিশন বলল হলফনামা জমা না দিলে রাহুলের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করব না। অবিলম্বে জানা গেল নিয়মানুযায়ী এতে হলফনামা জমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর নির্বাচন কমিশনের কর্ণাটকের সিইও একখানা হাস্যকর কাজ করে বসলেন। রাহুলকে নোটিস পাঠালেন, তিনি যেন অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ-সহ জমা দেন। একে তো যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ সে-ই দাবি করছে তার কাছে চুরির প্রমাণ দিতে হবে, তার উপর তারই কাছ থেকে নেওয়া নথিকে প্রমাণ বলে মানতে সে রাজি নয়। জনপ্রিয় বাংলা ছবির ফুটো মস্তানের সংলাপই এখানে পরিস্থিতির সবচেয়ে যথার্থ বর্ণনা দিতে পারে— ‘এ কে রে সান্তিগোপাল! এ তো আজব কালেকসন!’

এদিকে রাহুল ভাঙা বেড়া দেখিয়ে দিতেই শেয়ালরা বেরিয়ে এল পালে পালে। মহম্মদ জুবেরের মতো সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী, সাধারণ উৎসাহী মানুষ, এমনকি গোদি মিডিয়ার একটা অংশও (যেমন ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ) তদন্তে নেমে পড়ল এবং দেখা গেল, যেখানে ছাই উড়ছে সেখানেই অমূল্য রতন পাওয়া যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় রেফারির হয়ে মাঠে নামতে হত বিজেপির চাণক্যকে, যদি তিনি সত্যিই চাণক্যের মতো কূটবুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি স্পিকটি নট, মাঠে নামিয়ে দিলেন অনুরাগকে। তিনি ভাবলেন রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা রায়বেরিলি আর ওয়ায়নাড়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির জেতা ডায়মন্ড হারবার আসনের ভোটার তালিকাতেও গোলমাল আছে দেখালেই সব কোলাহল থেমে যাবে। কিন্তু বাপু তা কী হয়? অতি বুদ্ধিমান বাঙালি ভদ্রলোক আর সারা দেশের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া সকলেই বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি যে কাণ্ডটি ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে, তা চিরাচরিত ভোটের দিনের রিগিং নয়। পেশিশক্তির জোরে লোককে ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে না দেওয়া, নিজের লোক ঢুকিয়ে পরের পর ভোট দেওয়ানো বা ভোটার তালিকা দেখে অনুপস্থিত ভোটারের জায়গায় নিজের লোককে ভোট দেওয়ানো দেশের সব দলই করেছে কোনও না কোনও সময়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যাতে একটা নির্দিষ্ট দলের সমর্থকরা যতবার ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে ভোট দিতে পারে (এখনও আমরা জানি না ব্যাপারটা ঠান্ডা ঘরে বসে মেশিনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা), ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগ করা হচ্ছে একটা দলকে হারা আসনও জিতিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে— এ জিনিস অভূতপূর্ব। এটা চলতে থাকলে দেশে আর ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও আছে বলা যায় না। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া হয়ে উঠতে আর দেরি নেই আমাদের।

এই সেদিনও রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে উপযুক্ত নেতা বলে মনে করত না তৃণমূল কংগ্রেস। সেই অজুহাতে ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, গোয়ার মতো রাজ্যে জিতবে না জেনেও লড়তে চলে গেছে। সেই তৃণমূলের দু-নম্বর নেতা অভিষেক ৭ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনের পর থেকেই রাহুলের প্রত্যেক কথায় সায় দিচ্ছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দৃশ্যতই রাহুলের বাহিনীর সৈনিক হয়ে উঠেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসকে সাবোতাজ করতে গোয়া, গুজরাতের মতো রাজ্যে নির্বাচনে লড়তে চলে যাওয়া আম আদমি পার্টির সাংসদরা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরাও রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ১১ তারিখের নির্বাচন সদন অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার স্পর্ধা আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদবের মারমুখী মেজাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সহজবোধ্য। সামনে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশে। তেজস্বী আর অখিলেশ ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা, ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল তো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও হইহই করে জিতবে বলছেন বোদ্ধারা। বিরোধীরাও আড়ালে তা স্বীকার করে। আর আপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ঘাত স্বয়ং অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আশাবাদী নন, তাই এত বড় কাণ্ড নিয়ে একটা সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত করছেন না। তাহলে এই দুই দলের কংগ্রেসের সঙ্গে এমন শক্ত জোট বাঁধার কারণ কী?

কারণ গত এক সপ্তাহে যা ঘটছে তার সঙ্গে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার হরণ চলছে (এরপর পশ্চিমবঙ্গে এবং তারপর গোটা দেশে চলবে), তা মিলিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে— এরপর থেকে সব ভোটে জিতবে বিজেপিই। এখন বিজেপি বাদে সবাই একজোট না হলে কোনও দলেরই আর অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে একদিক থেকে রাহুল, অন্যদিক থেকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস ধরে আছেন— এই ভাইরাল ছবি আসলে মানুষের বিপদে জোট বাঁধার আদিম অভ্যাসের চিত্র। সবাই মিলে রাস্তার দখল নিয়ে, পাহাড়প্রমাণ আন্দোলনের ঢেউ তুলে যদি বিজেপির ইমারত ভাঙতে পারেন, তবেই আলাদা আলাদা দল করার মানে থাকবে। তখন কে ভালো কে মন্দ, কে কম রিগিং করে কে বেশি রিগিং করে, কে বুর্জোয়া কে কমিউনিস্ট, কোনটা ফ্যাসিবাদ কোনটা নয়া ফ্যাসিবাদ— এসব নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি করার ফুরসত পাওয়া যাবে। না পারলে কী হবে? তার ট্রেলার বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে ১১ তারিখেই। প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদ যখন পথে এবং দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করেছে, তখন কোনও আলোচনা ছাড়াই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে সংসদ থেকে, যার মধ্যে আছে নতুন আয়কর আইনও। এই আইন অনুযায়ী আয়কর বিভাগ যে কোনও করদাতার ইমেল, সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেখতে পারে। বলা বাহুল্য, এ কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। আইনের এই ধারা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী যে কোনও মানুষকে হয়রান করা সম্ভব, গ্রেপ্তার করাও সম্ভব। এই সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হলে আপনি দোষী না নির্দোষ তার বিচার কত কঠিন তা যদি না বুঝে থাকেন, শুধু দুটো নাম মনে করুন— স্ট্যান স্বামী আর উমর খালিদ।

বিরোধীশূন্য সংসদে বিল পাশ করানো সম্পর্কে সেদিন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কী বলেছিলেন?

‘কংগ্রেস পার্টি আর বিরোধীরা অনেক সময় নষ্ট করেছে। এখন আমরা আর দেশের সময়, সংসদের সময় নষ্ট করতে দেব না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ সব বিল পাশ করাতে চায়। আমরা আজ সেগুলো লোকসভা আর রাজ্যসভা— দুই জায়গাতেই পাশ করাব। দেশ একজন লোকের আর একটা পরিবারের বোকামির জন্যে এত ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। অনেক বিরোধী সাংসদও এসে বলেছেন তাঁরা নিরুপায়। তাঁদের নেতারা জোর করে গোলমাল পাকাতে বলে। আমরা প্রতিদিন একটা ইস্যু নিয়ে দেশের সময় আর সংসদের সময় নষ্ট হতে দেব না। সুতরাং আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাশ করাব।’

এই একটা ইস্যু কোনটা? ভোটচুরি। অর্থাৎ যা দিয়ে সংসদ তৈরি হয়েছে, সেটাকেই ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। সংসদ ব্যাপারটার গুরুত্বই আসলে স্বীকার করছে না, প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে— আমরা যা চাইব সেটাই আইনে পরিণত করব।

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে। তবে গণতন্ত্রের এখনও বাঁচার আশা আছে, কারণ এই অতি বুদ্ধিমান অবুঝরা সংখ্যায় কম এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। রাহুল, অখিলেশ, তেজস্বী, ব্রিটাসরা জানেন কোনটা নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা আর কোনটা ঐতিহাসিক প্রয়োজন। তাছাড়া ও পক্ষে আছেন অনুরাগের মতো কালিদাসের বংশধররা।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পাখির চোখ বাংলাদেশের হিন্দুর নিরাপত্তা, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোট?

তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখুন। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়।

একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

এই কথাটা বলামাত্র সেই ২০১২-১৩ সাল থেকে যেসব আত্মীয়-বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মী রেগে-আগুন তেলেবেগুন হয়েছেন, সম্পর্ক তুলে দিয়েছেন (বা আমিই তুলে দিয়ে বেঁচেছি), হঠাৎ সেদিন আবিষ্কার করলাম তাঁরা সকলে ঠিক ওই কথাটাই বলছেন। দেখে অ্যাইসা ফুর্তি হল যে লতা মঙ্গেশকরের মতো মিহি গলায় শতবর্ষে পা দেওয়া সলিল চৌধুরী রচিত ও সুরারোপিত ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের কানই জানিয়ে দিল যে আমার গলার সঙ্গে লতার গলার তফাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির মতো। ফলে চুপ করে গেলাম। ফুর্তিটাকেও কান ধরে টেনে নামিয়ে আনন্দের বেঞ্চে বসিয়ে দিলাম। একটু আনন্দ তো করাই উচিত। কারণ কবি বলেছেন— কেবল রাত্রির অবসান হলে প্রভাত হয় না। চিত্ত জাগলেও প্রভাত হয়। তা চারপাশে এত মানুষের চিত্ত জেগেছে মানে প্রভাত হয়েছে, অচিরেই প্রভাতফেরি বেরোবে, তার আওয়াজের ঠ্যালাতেই বাকি অন্ধকার দূরীভূত হবে— এরকম ভাবছিলাম আর কি। কিন্তু সে আনন্দও দিন দুয়েকের বেশি টেকানো গেল না। কেন? সে-কথাই বলব।

গোঁফ গজানোর বয়সে আমরা মাধুরী দীক্ষিত বলতে পাগল ছিলাম। যেহেতু বলিউডের হাত অনেক লম্বা, সেহেতু কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশেই তখন মাধুরী অধরা বলে নানা বয়সের পুরুষদের হৃদয় দাউদাউ করে জ্বলে। এতটাই, যে কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানিরা নাকি সকৌতুকে বলত ‘তোমরা মাধুরী আর শচীন তেন্ডুলকরকে দিয়ে দাও, আমরা কাশ্মিরের দাবি ছেড়ে দেব।’ তা সেই মাধুরী নেপালে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে একখানা কেলেঙ্কারি করে বসেছিলেন। আদর-আপ্যায়নে আহ্লাদিত হয়ে বলে বসেছিলেন— নেপাল তো ভারতেই ছিল… ইত্যাদি। সে অবশ্য ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। তখন ভারত সরকারের সঙ্গে নেপাল সরকারের সম্পর্ক মন্দ ছিল না, ফলে নায়িকা ক্ষমা-টমা চাওয়াতেই ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল। মুশকিল হল, বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিরা অনেকে এখনও মাধুরী হয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ হয়েছে। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখনও ওটাকে আলাদা দেশ বলে মেনে নিতে পারেন না। আরও সমস্যার কথা হল, যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা— বাংলাদেশের যে-কোনও ব্যাপারে ভারতের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার আছে। দুটো দেশের সরকার এবং মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে যেমন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত, তার বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে বড়দাসুলভ ব্যবহার করা উচিত— এমনটাই মনে করেন আমাদের ভাই-বেরাদররা অনেকে। ফলে যে যে-দলেরই সমর্থক হোন, বাংলাদেশে কোনও গোলমাল শুরু হলেই একযোগে আশ্চর্য সব দাবি করতে শুরু করেন এঁরা। যেমন এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষের মতো অনেক সিপিএম সমর্থককেও ভারতীয় সেনাবাহিনিকে দিয়ে বাংলাদেশ আক্রমণের দাবি তুলতে দেখা যাচ্ছে।

এমনিতে সজলবাবুকে যত গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম দেয় তত গুরুত্ব তাঁর নিজের দলের নেতা অমিত শাহও দেন না। দিলে সজলবাবুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কলকাতায় এসে আরজিকর-কাণ্ডে মৃতার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে যেতেন না। সুতরাং সজলবাবুর ওই চ্যানেল গরম করা মন্তব্যে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বা প্রধানমন্ত্রী মোদি কানই দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে বাঙালিরা যে এই দাবিকে ন্যায্য বলে মনে করছেন— তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একে তো অন্য একটা দেশ সম্পর্কে এত প্রবল অধিকারবোধ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে কয়েক লক্ষ লোক— এই ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর। তার উপর দেখা যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমর্থকরাও দাবি করছেন— এখানকার বামপন্থীদের বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে পথে নামতে হবে, তৃণমূল সমর্থকরা দাবি করছেন তাঁদের দলকেও পথে নামতে হবে। অবশ্য বামেরা যেহেতু ক্ষমতায় নেই, সেহেতু তাঁরা যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষের উপর ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তেমন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধেও মিছিল করা যেতে পারে (যদিও এখন পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল যা চালাচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পরিমাণগত বা গুণগত কোনও মিল নেই), তবে দুই মিছিলেরই গুরুত্ব প্রতীকী। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে পথে নামতে হবে— এ আবার কী আবদার? যে-কোনও দলের সরকারকেই ভারতের সংবিধান মেনে চলতে হয় আর সংবিধান অনুসারে বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তালিকাভুক্ত। নেহাত বাংলাদেশ প্রায় এক শতাব্দী আগে একই প্রদেশ ছিল এবং দুই জায়গার ভাষা অভিন্ন, দুইপারে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবার রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারে না। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একখানা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পথে নামতে যাবেন কেন? সত্যিই তো এ-ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মেনে নিতে তিনি বাধ্য। অথচ এই দাবি কেবল আইনকানুনের ধারণাবিহীন সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় তুলছেন তা নয়। এবিপি আনন্দের মতো জনপ্রিয় চ্যানেলে বসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও এই কিম্ভূত দাবি তুলে ফেলেছেন।

নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কেন এমন কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথবাবুর দর্শানো কারণটি চিত্তাকর্ষক। এতে নাকি মহম্মদ ইউনুসের সরকারের উপরে চাপ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজন বুকে বল পাবেন। বাংলাদেশ যত ছোট রাষ্ট্রই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে মিছিল করেছেন বলে চাপে পড়বে কেন? বিশেষত ভারত সমেত পৃথিবীর কোনও বড় রাষ্ট্রই যখন এই তদারকি সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি? আর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনই বা মমতার মিছিলে আলাদা করে সাহস কেন পাবেন? ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁদের আক্রমণ করলে কি মমতার পুলিশ বা অনুব্রত মণ্ডলের ঢাক তাঁদের বাঁচাতে যাবে? নাকি কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়ে, মমতা নিজের সিদ্ধান্তে তাঁদের কাউকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দিতে পারবেন?

কিমাশ্চর্যম অতঃপরম! মমতা এই হাস্যকর দাবি মেনে নিয়ে পথে নামলেন না বটে, আরও এককাঠি সরেস কাজ করলেন। দাবি করে বসলেন যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষা বাহিনি পাঠাতে হবে। তাঁর সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং মমতার একদা-স্নেহভাজন শুভেন্দু অধিকারীর বয়ান ‘রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন করছি, বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করুক’।

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের নতুন অশান্তিতে ঠিক কত মানুষ নিহত, কটা পরিবার বাস্তুহারা, কোনও নারীনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিনা— এসবের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম আমাদের জানাতে পারেনি। সজলবাবু, বিশ্বনাথবাবু, শুভেন্দুবাবু বা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও জানাননি। অথচ ক্রমাগত এরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য বেড়েই চলেছে। এসবের একটাই ফল— বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা তৈরি হওয়া। যেহেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকেই হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি এখন বাংলাদেশ বলতেই মুসলমান ভাবছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই এবারেও যে লড়াইয়ে লিপ্ত শক্তিগুলো সমসত্ত্ব নয় তা মেনে নিতে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের ঘোর আপত্তি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে হিন্দু নামগুলোর উপস্থিতিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন, তাতে ধুয়ো দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। যখন বাংলাদেশের রাস্তায় সোজা বুকে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছিল হাসিনার পুলিশ, তখনও হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে তার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছিল— ‘বাংলাদেশ আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে’, ‘বাংলাদেশে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্রোহ, তারপর নৈরাজ্য এবং অত্যাচারী শাসনের অজস্র উদাহরণ আছে। যেমন বলা যেতেই পারত বাংলাদেশ রোবসপিয়রের গিলোটিনের ফ্রান্স হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তুলনায় সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কথা বলা যেত। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বললেও চলত। তেমন কিছু না বলে আফগানিস্তান এবং তালিবানের কথা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— মাথায় ফেজ পরা, গালে লম্বা দাড়িওয়ালা মুসলমানের ছবি তুলে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো, যার সঙ্গে অপরিহার্যভাবে এসে পড়বে বোরখা পরা মহিলাদের ছবি। হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানের ঠিক যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের গেলাতে চায়। অথচ তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস কিন্তু কামানো গালের, মাথায় ফেজ না-পরা পুরুষ। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন হলেন সাঈদা রিজওয়ানা হাসান, যিনি ২৯ নভেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন যে গ্রেফতার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু তার জন্যে ইস্কনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার কোনও ভাবনা তদারকি সরকারের নেই। রিজওয়ানা বোরখা পরেন না, এমনকি হিজাবও নয়।

নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে মানেই যে একটা দেশ গণতান্ত্রিক পথে আছে তা নয়— এ-কথা বুঝতে আজকের ভারতীয়দের অন্তত কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশদ্রোহবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম-সহ আরও বহু মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার কাজ এ-দেশের ভোটে জিতে আসা সরকারই করে চলেছে দশ বছর ধরে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছে বিভিন্ন রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারগুলোই। কোনও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নিষেধকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জঘন্য পলাতক অপরাধীদের মতো করে প্রতিবাদীদের ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়ার কাজ করছে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার। গত দশ বছরে কতজন সংখ্যালঘুকে গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার বা স্রেফ বহন করার ‘অপরাধে’ মেরে ফেলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে মদত দিয়েছে, তার তালিকা চিনের প্রাচীরের মতো লম্বা হবে। কদিন হল মুসলমানদের উত্যক্ত করার নতুন কায়দা চালু হয়েছে। যে-কোনও মসজিদের নিচেই মন্দির ছিল কিনা মাটি খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা, আর আদালত পত্রপাঠ খোঁড়ার নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশে স্পষ্ট আইন আছে— ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যেখানে যে ধর্মস্থান ছিল সেগুলোর চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। সে আইনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি নিম্ন আদালতগুলোও। এই বেমক্কা রায়ের জেরে হিংসা ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষের প্রাণ গেছে। এখন এমনকি প্রাচীন আজমের শরীফ নিয়েও তেমন একটা মামলা ঠোকা হয়েছে। এমন রায় দেওয়ার পথ কিন্তু খুলে দিয়ে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, জ্ঞানবাপী মসজিদে মাটি খুঁড়ে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয় যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অধিকাংশ হিন্দু ভারতীয়, সাম্প্রদায়িক? একেবারেই না।

হাসিনার আমলেও বাংলাদেশে হিন্দু হত্যা ঘটেছে। আর সব ভুলে গিয়ে থাকলেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের কথা আশা করি এপারের হিন্দু বা মুসলমান কোনও বাঙালিই ভোলেননি। সেইসময় হিন্দুদের পুজোআচ্চায় আক্রমণ হয়েছে, সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সুতরাং ভোট হত আর হাসিনা জিততেন মানেই বাংলাদেশ দারুণ গণতান্ত্রিক ছিল— এ-কথা বলার কোনও মানে নেই। আবার সেই আমলে বা এই আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণও প্রমাণ করে না যে অধিকাংশ বাংলাদেশি, এমনকি অধিকাংশ মুসলমান বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িক।

কিন্তু সোশাল মিডিয়া আর ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে ঠিক উল্টো ছবিটাই গাঢ় রঙে আঁকা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বাঙালির মনে। তাই ‘একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব’— এই কথাটা তাঁরা আজ যখন বলছেন, তখন বলছেন বাংলাদেশের দিকে মুখ করে। নিজের দেশের দিকে না-তাকিয়ে। তাই আমার আনন্দ টিকল না। দেখলাম বিজেপি সমর্থকরা তো বটেই, সিপিএম সমর্থকরাও গোটা উপমহাদেশে সংখ্যাগুরুবাদের প্রসারের নিন্দা করে পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিবৃতিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। বলছেন, এসব চালাকি। বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা করতে গেলেই সঙ্গে এ-দেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার কথা কেন বলতে হবে? গোদা বাংলায় তাঁদের মত হল— বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে-দেশের সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু এ-দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ-দেশের সরকারের দায়িত্ব নয়।

এই তো সেদিন এ-রাজ্যের মহিলারা রাত দখল করলেন, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নামলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও, পরে নতুন আইনও পাশ করালেন বিধানসভায়। আন্দোলনকারীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল আরজিকর-কাণ্ডে দোষী একজন নয়, অনেকে। তাদের সকলের শাস্তি চাই। তা নিয়েও টানা আন্দোলন হল। অথচ আজ চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে, সে-অভিযোগে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাঁর নিজেরই সংগঠন— তা নিয়ে আলোচনা করতে দেখছি না এমনকি মহিলাদেরও। উনি অবশ্য সেই অভিযোগে গ্রেফতার হননি। কী অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন? তা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় বা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনা নেই। অর্থাৎ হয় এখানকার মানুষ জানার প্রয়োজন বোধ করেন না, নয়তো নিঃসংশয়ে জানেন ব্যাপারটা স্রেফ রাষ্ট্রের বদমাইশি। সেটা হওয়া অবশ্যই অসম্ভব নয়। কিন্তু একইরকম অভিযোগে উমর, শার্জিলের জামিনের তো শুনানিই হয় না এ-দেশে। তা নিয়ে কারও এত মাথাব্যথা নেই তো?

সব মিলিয়ে যা বুঝলাম, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা আমার নয়, শুভেন্দুবাবুর গাওয়া উচিত। কারণ রাজ্য বিজেপি যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হোক, যতই লোকসভা নির্বাচনে বা উপনির্বাচনে ভোট কমুক, দেশজুড়ে মোদি-ম্যাজিক যতই ফিকে হয়ে যাক, ঘৃণার জমি এমন চমৎকার চষা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে যে, সঙ্ঘ পরিবারের ফসল তোলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সে-ফসল ২০২৬ সালে তোলা হবে, নাকি আরও পরে— সে আলাদা কথা। নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করার ঘোষণা করে সজলবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ২০২৬ সালেই ফসল তুলতে। অনেক ডাক্তারও সগর্বে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করছেন বাংলাদেশি রোগী দেখবেন না। বহু ঘোষিত বিজেপিবিরোধীও এই সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছেন। কেন? না দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের পতাকার অবমাননা করা হয়েছে। ক-জন ওই কাজে লিপ্ত আর তাদের অপকর্মের দায় সমস্ত বাংলাদেশির ঘাড়ে চাপবে কেন— এই যুক্তিতর্কের পরিবেশই আর পশ্চিমবঙ্গে নেই। এ-তথ্যও প্রচারিত হচ্ছে না যে ২৮ নভেম্বরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ‘অতীব জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করে শিক্ষার্থীদের ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে সাহস দেওয়ার জন্যে মমতাকে মাঠে নামতে হবে বলেছেন, তিনি এই রাজ্যে এমন অমানবিক এবং ডাক্তারি নীতিবোধবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতাকে মুখ খুলতে হবে বলে দাবি করেছেন বলে শুনিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে মমতা নিজে থেকেও বলতে পারতেন— এ-জিনিস এখানে করতে দেওয়া হবে না, করলে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলেছেন কি? তাঁর দলের নেতা ফিরহাদ হাকিম তবু বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ফিরহাদ নিজে মুসলমান হওয়ায় যথারীতি তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর প্রতি দরদ বলে দেখা হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।

এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কুকর্ম সত্ত্বেও তাদের ভোট দেওয়াই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য— এ-কথা যে-যুক্তিতে ২০১৯ সাল থেকে বলা হয়ে আসছে, সেই যুক্তিটাকে আর বিশ্বাস করার মানে হয় না। বিজেপি এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতে সমাজে সঙ্ঘবাদের প্রসারে কোনও বাধা সৃষ্টি হয়নি। সঙ্ঘ একই মডেলে সর্বত্র লড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত ওড়িশা মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

ওড়িশায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসকে শেষ করে বিজেপিকেই তাঁর একমাত্র বিকল্প করে তুলেছিলেন। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোতে তিনি বিজেপিকে ঘাঁটাননি। তৃণমূল সাংসদদের মতোই নবীনের দলের সাংসদরাও বহু বিলে ভোটাভুটির সময়ে হয় ভোট দিতেন না, অথবা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন। ওড়িশায় বিজেপিও তাঁর দলকে হারাতে গা লাগায়নি বহুকাল, কেবল নিচুতলায় আরএসএস নিবিড় কাজ চালিয়ে গেছে। শেষমেশ ২০২৪ সালে এসে নবীনের রথ উল্টে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, কমিউনিস্টদের শেষ করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস। নিচুতলায় আরএসএসের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতেও তারা কোনও ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ নেই। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির কাজ আরও সহজ করে দেবে। তারপর কবে মমতার রথ উলটানো হবে, কীভাবে হবে— সেসব সিদ্ধান্ত বোধহয় দিল্লি থেকে নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

তা শুভেন্দুবাবুরা গান-টান করুন, কেবল হিন্দুদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আসল লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভোট পাওয়া, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়— তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়। বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি সত্যিই টান থাকলে এই উপমহাদেশের মুসলমান বাদে অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য যে আইন তথাগতবাবুদের সরকার তৈরি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট এ-দেশে আসার শেষ তারিখটা তুলে দিলেই তো হত। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র পরে বিপদে পড়া হিন্দুরা কি যথেষ্ট হিন্দু নন? আজ বাংলাদেশে যে হিন্দুরা বিপন্ন, তাঁদের জন্য তাহলে বিজেপির ভারতে কোনও জায়গা নেই? তাঁরা কেবল এ-দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করার খেলায় ব্যবহৃত বোড়ে?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

প্রশান্ত বুদবুদ ফেটে যাওয়ায় প্রশ্ন: গণতন্ত্র চালাচ্ছে মার্কেট রিসার্চ?

রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।

প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।

এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।

ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।

হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।

ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।

২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?

এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।

আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

আসল মোদী প্রকট হয়েছেন, এবার ভবিষ্যৎ বেছে নিন

রাকেশ শর্মা কেবল ভারতের একমাত্র মহাকাশচারীর নাম নয়। একই নামে একজন তথ্যচিত্র নির্মাতাও আছেন। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে আলোচিত ও পুরস্কৃত তথ্যচিত্রের নাম ফাইনাল সলিউশন (২০০৪)। এই মুহূর্তে ইউটিউব অথবা ভাইমিও ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নেওয়া সম্ভব, তবে দুটো জায়গাতেই মোটামুটি আড়াই ঘন্টার ছবি রয়েছে। কিন্তু ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে রাকেশ শর্মার এক বাঙালি সহকারীর সৌজন্যে যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই তথ্যচিত্রের দুটো প্রদর্শনী হয়েছিল। তাতে ঘন্টা চারেকের ছবি দেখেছিলাম আমরা অনেকে। দেখেছিলাম বলেই গত রবিবার রাজস্থানের বনসোয়াড়ায় নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা শুনে একটুও অবাক হইনি। ‘মুসলমানদের বেশি বাচ্চা হয়’ বলা বা মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বলা মোদীর পক্ষে অস্বাভাবিক তো নয়ই, নতুনও নয়। নতুন হল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে নির্বাচনী প্রচারে বলা। ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে মোদী এই ভাষাতেই কথা বলতেন বিজেপির সমাবেশে। বস্তুত আরও প্ররোচনামূলক, বর্বর ভাষায় কথা বলতেন। জানি না আড়াই ঘন্টার সম্পাদিত তথ্যচিত্রে তার কতটুকু দেখা যায়, তবে মনে হয় না রাকেশ খুব বেশি কাটছাঁট করেছিলেন। কারণ ছবিটাকে অটলবিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ সরকারের আমলে অনুপম খেরের নেতৃত্বাধীন সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (চালু লব্জে সেন্সর বোর্ড) প্রথমে ভারতে প্রদর্শনের অনুমতি দিতে চায়নি। কীভাবে রাকেশ সে ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা নিজেই এক রোমাঞ্চকর কাহিনি। পরে মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় এলে সেন্সরের ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে যখন মোদীর নতুন ভাবমূর্তি তৈরি করা হচ্ছিল, আজকের অনেক মোদীবিরোধীও লিখতে/বলতে শুরু করেছিলেন – এদেশে চণ্ডাশোক ধর্মাশোক হয়েছিলেন, মোদীও বদলে গেছেন; তখন রাকেশ তাঁর ছবি থেকে কেটে রাখা বেশকিছু ক্লিপ আলাদা করে প্রকাশ করেছিলেন। আগ্রহীরা সেগুলোও খুঁজে দেখতে পারেন।

এই ইতিহাস স্মরণ করানো এই কারণে, যে মোদীর বনসোয়াড়ার কুরুচিকর বক্তৃতা নিয়ে মোদীবিরোধীদের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া খুব বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। তা হল, প্রথম দফার নির্বাচনের পর মোদী বুঝেছেন যে হাওয়া ভাল নয়। ভোট আসছে না। চারশো পার দূরের কথা, দুশো পার হবে কিনা সন্দেহ। তাই ‘মোদী কি গ্যারান্টি’, ‘বিকাশ’ ইত্যাদি ছেড়ে দিয়ে চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা খেলেই ভোট কুড়োতে হবে। তাতে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও কিছু যায় আসে না। এই ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে সুধীর চৌধুরীর মত গোদি মিডিয়ার তারকা মোদীর বনসোয়াড়ার বক্তৃতায় মনমোহনের বক্তব্যকে যে বিকৃত করা হয়েছে তা ঘোষণা করে অনুষ্ঠান করছেন।

আরেক গোদি তারকা রাহুল কাঁওয়াল অমিত শাহকে ‘ওয়াশিং মেশিন’ নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়ে ফেলছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার ঈশানী দত্ত রায় আর দেবাশিস চৌধুরী তো অমিতকে সিএএ থেকে মণিপুর পর্যন্ত নানা বিষয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন করে একেবারে ল্যাজেগোবরে করে দিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে চলছে তার বিচারে এসব সাহস নয়, রীতিমত দুঃসাহস। শুধু তাই নয়। কদিন আগেও যেসব সেফোলজিস্ট (বাংলা কি ভোটজ্যোতিষী?) বিজেপি একাই ৩৫০-৩৮০ পেয়ে যাবে বলছিলেন জোর গলায়, তাঁরাও কেমন কিন্তু কিন্তু করছেন। অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার কর্ণধার প্রদীপ গুপ্ত একটা ওয়েবসাইটকে বলেছেন ১৩টা গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে (মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, গোয়া) এবং কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এনডিএ-র পক্ষে ২০১৯ সালের সমান আসন ধরে রাখা শক্ত। সেই খবরের লিঙ্ক অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করা হয়, প্রদীপ নিজে তা রিপোস্টও করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়। তারপর প্রদীপের সংস্থার করা সমীক্ষা বলে কিছু কম্পিউটার প্রিন্ট আউটের ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে এনডিএ আর ইন্ডিয়া প্রায় সমান ভোট পাবে এবং আসন সংখ্যাতেও খুব বেশি হেরফের হবে না। তা নিয়ে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া এফআইআর দায়ের করেছে। সংস্থার দাবি ওগুলো ভুয়ো, আদৌ তেমন কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। তারা প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা করেই না, শুধু বুথফেরত সমীক্ষা করে। কিন্তু তাহলে প্রদীপ কিসের ভিত্তিতে বললেন, ১৩ রাজ্যে কী হবে? সে প্রশ্ন রয়েই গেল। ওদিকে সিভোটার সংস্থার কর্ণধার যশবন্ত দেশমুখ বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে প্রথম দফায় এমন হয়ে থাকতেই পারে যে বিজেপির ভোটাররা অনেকে ভোট দিতে আসেননি। ভেবেছেন বিজেপির ওসব জায়গায় জেতার সম্ভাবনা নেই, তাই ভোট দিতে গিয়ে লাভ নেই।

এঁদের চেয়েও মানুষ কোন দিকে ঝুঁকছে তা ঢের ভাল বোঝে আরএসএস-বিজেপির সংগঠন। তাদের নয়নের মণি মোদী নিজেই ১৯ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটদানের পরে এক সমাবেশে ভোটারদের বলেছিলেন ভোট না দেওয়া ভাল নয়, ভোট দেওয়া নাগরিক কর্তব্য ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনিও কম ভোট পড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সুতরাং এমন হতেই পারে যে তারই প্রভাবে ২০০২ সালের মোদীকে ভিতর থেকে বার করে এনেছেন। রবিবারের পরে সোমবারই যেভাবে উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে ভোল বদলে ফেলে সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে কথা বলে ভারতীয় মুসলমানদের হজ করতে যাওয়ার কোটা কত বাড়িয়েছেন সেকথা ফলাও করে বলেছেন, তাতে আরও বেশি সন্দেহ হয় – মোদী বুঝতে পারছেন না এই নির্বাচনে জিততে গেলে কোনটা করলে বেশি ভাল হবে। মুসলমানদের যথাসম্ভব গালাগালি দিয়ে ২০০২ সালের মূর্তি ধরা, নাকি আপাতত হিন্দুত্বকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে মুসলমানদের ভোটও যাতে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা।

সবই সত্যি। কিন্তু এসব দেখে উল্লসিত হওয়া বোকামি হবে। কেবল এ জন্যে নয় যে এগুলো অনুমান মাত্র। এ জন্যেও যে রবিবারের মোদীই আসল মোদী এবং মোদীর জনপ্রিয়তা মূলত ওই মোদীরই জনপ্রিয়তা। গণতন্ত্রে মানুষের উপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া যেমন কোনো উপায় নেই, তেমন বিনা প্রমাণে মানুষকে স্বর্গীয় জীব বলে ভেবে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই। আপনার চারপাশের মানুষের মধ্যে গত এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে যে সংখ্যালঘুবিদ্বেষ দেখেছেন তা হঠাৎ কমে গেছে – এমন কোনো লক্ষণ দেখছেন কি? যদি না দেখেন, তাহলে মোদীর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার তাঁকে ভোটারদের কাছে আরও অপ্রিয় করবে এমন ভেবে নেওয়া অর্থহীন। মোদীর সাফল্যের রহস্যই হল, সংখ্যাগুরু মানুষ আগে যা নিজস্ব আড্ডায় চুপিচুপি বলাবলি করত তিনি তা প্রকাশ্যে বলা ফ্যাশনে পরিণত করেছেন। প্রথমে করেছিলেন গুজরাটে, ২০১৪ সালের পর ক্রমশ সারা ভারতে। একমাত্র কেরালা আর তামিলনাড়ুই এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অনেকখানি প্রতিহত করতে পেরেছে। তাই সেখানে আজও বিজেপি রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক শক্তি। তামিলনাড়ুতে বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে বলতে হয় তিনি রাজদীপ সরদেশাইয়ের সঙ্গে মুরগি খাবেন, আমিষ-নিরামিষ নিয়ে তাঁর বাছবিচার নেই। কেরালায় আবার এক বিজেপি প্রার্থী ২০১৭ সালে উপনির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন, জিতলে ভাল মানের গোমাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করবেন। আগামী ৪ জুনও ওই রাজ্যগুলোর ছবি বদলানোর সম্ভাবনা কম। কিন্তু ভারতের আর কোনো অংশই সংঘের ঘৃণার রাজনীতির আওতার বাইরে নেই।

মুসলমানদের চারটে বউ আর চল্লিশটা বাচ্চা – একথা আমার, আপনার মামা কাকা পিসে জ্যাঠা মাসি পিসিরাই প্রবলভাবে বিশ্বাস করে আজকাল। অথচ জিজ্ঞেস করলে দেখা যায় এমন কোনো মুসলমানকে তাঁরা চেনেন না যার একাধিক স্ত্রী। অনেকে জীবনে কখনো কোনো মুসলমান মহিলা বা পুরুষের সঙ্গে আলাপই করেননি। অথচ মোদী এ বিশ্বাস তাঁদের মধ্যে গেঁথে দিতে পেরেছেন যে তেমন মুসলমান দেশের কোথাও না কোথাও আছে। বামপন্থী দলের কর্মী, সমর্থকদেরও কত সহজে সোশাল মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট ভেঙে গেলে বলতে দেখা যায় – মুসলমানদের কখনো বিশ্বাস করা উচিত নয়। মুসলমানরাই ভোটের দিন মারামারি করে, বিভিন্ন দলের হয়ে তারাই বোমা ছোড়ে – এসব বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েই বলেন। নিজে কানেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে শুনেছি একজন বলছেন, আমাদের এলাকায় মুসলমান নেই বলেই ভোটে অশান্তি হয় না, অনেকে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন। গত পুজোতেই তো মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী – এমন বক্তব্যের একখানা বাংলা ছবি দিব্যি হিট হয়ে গেল।

এইসব প্রবণতাই ইংরেজ আমলের সমান বেকারত্ব আর আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির যুগেও মোদীর রক্ষাকবচ। তিনি ভাল করেই জানেন, যখন আর কিছু কাজ করবে না তখনো মুসলমানদের সম্পর্কে ভয় দেখানো কাজে লাগবে। হিন্দু মহিলাদের গলার মঙ্গলসূত্রটা পর্যন্ত কংগ্রেস ছিনিয়ে নিয়ে তাদের দিয়ে দেবে যাদের বাচ্চা বেশি হয় – হয়ত আপনি আশা করছেন এ তত্ত্ব হিন্দি বলয়ে আর কাজে লাগবে না। হয়ত আপনি ঠিকই ভাবছেন। কারণ যে ন্যাড়া আগে বেলতলায় গেছে সে যাওয়া থামাবে অন্যদের আগে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়ত দেখলেন আপনার উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার মামাই বিশ্বাস করে ফেলেছেন কথাটা। কারণ তিনি সারাদিনে পড়ার মধ্যে পড়েন হোয়াটস্যাপ আর তাতে দশ বছর ধরে পড়ে চলেছেন যে গোপাল পাঁঠা ছিলেন বলে তিনি আছেন, প্রেরক আছেন, হাওড়া ব্রিজ আছে।

এঁরা আদিবাসী নন, দলিত নন, সংখ্যালঘু নন। এঁরা আশৈশব কল্যাণকামী ভারত রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগসুবিধা পেয়ে সরকারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে মোটা মাইনের চাকরি বাগিয়েছেন। ভারতের গলতিওলা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুবাদে যা ইচ্ছে খেয়েছেন, যা ইচ্ছে পরেছেন, যেখানে ইচ্ছে বেড়িয়েছেন। তারপর মনমোহনী আমল থেকে ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছেন – ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, ‘গান্ধী, নেহরু মহা বদমাইশ’, ‘মুসলমানদের বিশ্বাস করতে নেই’, ‘ভাল ছেলেমেয়েরা সাইন্স পড়ে, সাইন্সে চান্স না পেলে আর্টস পড়তে হয়’, ‘ইতিহাস ফালতু সাবজেক্ট’ ইত্যাদি। এখন এঁরা ধেড়ে বয়সে এবং এঁদের সন্তানরা কচি বয়সে হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রছাত্রী। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়া বিজ্ঞান ভুলে, স্কুলে মুখস্থ করে খাতায় উগরে দিয়ে ভুলে যাওয়া ইতিহাস আর নাক সিঁটকে এড়িয়ে যাওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান টপাটপ শিখে ফেলছেন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক থেকে। সেখান থেকেই শিখেছেন – হিন্দু ঘরে জন্মে এতদিন তাঁরা অত্যাচারিত, নিপীড়িত ছিলেন। মোদীর আমলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারছেন। ভারতের অন্য সব রাজনৈতিক দলই মুসলমানদের তোষণ করে গেছে চিরকাল। অতএব বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি করা বহুযুগের অন্যায়ের প্রতিশোধ। রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল করা অন্যায় নয়। ক্রুদ্ধ রাম আর ক্রুদ্ধ হনুমান বাঙালির দেবতা।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

এই বাঙালিরা এখনো রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কপচান। নিজেদের ভারতের অন্য সব জাতির লোকেদের চেয়ে শিক্ষিত মনে করেন, কিন্তু হতে চান মাড়োয়ারিদের মত ধনী। হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় এঁদের শিখিয়েছে যে সেটা হওয়ার পথে একমাত্র বাধা বাংলাদেশ থেকে আসা কাতারে কাতারে মুসলমান, যাদের মোদী বনসোয়াড়ায় বলেছেন ‘ঘুসপেটিয়া’। আপনি যতই এই বাঙালিদের দ্য হিন্দু কাগজের এই প্রতিবেদনের মত তথ্য দিয়ে বোঝান যে মুসলমানদের গাদা গাদা বাচ্চা হয় আর হিন্দুরা সব একটি-দুটিতে থেমে থাকে এমনটা ঘটনা নয়, বা কাতারে কাতারে মুসলমান বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে এমনটাও নয়, এঁরা চোখ বন্ধ করে থাকবেন।

নিজেদের সুরক্ষিত অতীত আর আরামদায়ক বর্তমানে হেলান দিয়ে এঁরা ইদানীং হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন সফল করতে ভোট দেন, যাতে আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়। ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মত ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র যে খুব খারাপ তা এঁরা হোয়াটস্যাপ থেকে বিলক্ষণ শিখেছেন। কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্র নিয়ে গদগদ হওয়ার বেলায় সেসব মনে থাকে না। এঁদের মধ্যে যাঁদের বয়স কম, হিন্দুরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে তাঁদের জন্যেও বেদনাদায়ক হবে। কিন্তু কালিদাসের উত্তরাধিকারী তো এদেশে কম নেই। এই বাঙালিদের মোদী বিলক্ষণ চেনেন আর এও জানেন যে এরকম মানুষ কেবল বাংলায় নয়, সারা ভারতে রয়েছে। তাঁর বনসোয়াড়ার ভাষণের লক্ষ্য তারাই।

অর্থাৎ এবারের ভোট কেবল আপনার সাংসদ বেছে নেওয়ার বা কোন দল সরকার চালাবে তা বেছে নেওয়ার ভোট নয়। ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ারও। উন্নয়ন ইত্যাদি ঢক্কানিনাদে এখন আর মোদীও সময় ব্যয় করছেন না। ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ কথাটাও আর বলছেন না। এখন স্রেফ মুসলমানকে হিন্দুর শত্রু হিসাবে খাড়া করে, নিজের দলকে হিন্দুদের দল আর বিরোধী দলগুলোকে মুসলমানদের দল প্রতিপন্ন করেই ভোট চাইছেন। এবার আপনাকে বেছে নিতে হবে, আপনি সোশাল মিডিয়া থেকে গেলা বিষ পান করে আরও বিষ পান করার জন্যে ভোট দেবেন, না নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দেবেন। এবার মোদীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে অনেক বিষাক্ত আপনজনের বিরুদ্ধে যেতে হবে। অথচ আপনজনদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে তাছাড়া উপায় নেই। কবি তো ভরসা দিয়েছেন ‘তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে/তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না’।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

আমিষ খান বলে গাঙ্গুলি জেঠিমা, ঘোষ কাকুও দেশের মানুষ নন?

এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

প্রধানমন্ত্রী সমীপেষু,

আপনাকে যা লিখছি তার অনেকটাই ব্যক্তিগত। কারণ রাজনীতিটাকে একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে এসেছেন আপনিই। মানে গত শুক্রবার (১২ এপ্রিল, ২০২৪) উধমপুরে আপনার বক্তৃতা শোনার আগে পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসকে তো আমরা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই জানতাম। একথা ঠিক যে ২০১৫ সালেই আমরা জেনে গেছিলাম, বাড়ির ফ্রিজে কিসের মাংস রাখা আছে তা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। তার জন্য একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু তখন আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম এই ভেবে যে একমাত্র গরুর মাংসই মৃত্যুর কারণ হতে পারে, অন্যান্য প্রাণির মাংস বা মাছ খাওয়া নিয়ে কেউ কিছু বলবে না। আমরা অনেকে একথা ভেবেও নিশ্চিন্ত ছিলাম যে ওসব কিছু গুন্ডা বদমাইশের কাজ। সরকার কে কী খেল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, আর সমাজবিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে তো আইন আদালত আছেই। গত নয় বছরে অবশ্য আমরা বুঝে গেছি যে গোমাংস খাওয়া, বিক্রি করা বা গোমাংস হয়ে ওঠার জন্য গরু নিয়ে যাওয়ার সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা তেমন গুরুতর অপরাধ নয়। দিব্যি জামিন পাওয়া যায়, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াও এ দেশের অন্যান্য অপরাধের মতই অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। তবু আমাদের মধ্যে যারা গরুর মাংস খায় না তারা নিশ্চিন্ত ছিল। ও জিনিস তো এমনিই আমাদের খাওয়া বারণ। ‘প্রগতিশীল সাজতে’ না খেলেই কোনো অশান্তি নেই, কারোর আক্রমণের মুখে পড়তে হবে না। থানা পুলিস কোর্ট কাছারিহীন নিশ্চিন্ত জীবন কাটিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু শুক্রবার নির্বাচনের প্রচারে আপনি যা বলেছেন তাতে তো নিশ্চিন্তে আর থাকা যাচ্ছে না।

ব্যক্তিগত বিশ্বাস যা-ই হোক, কলার তুলে যে পরিচয়ই দিই না কেন, জন্মসূত্রে আমরা যারা হিন্দু, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু, তাদের তো আর নিশ্চিন্তে থাকার উপায় রইল না।

আইনে কিছু খাওয়া বারণ নেই, আপনিও কাউকে কিছু বারণ করেন না। কিন্তু শ্রাবণ মাসে যারা খাসির মাংস রান্না করে তার ভিডিও প্রচার করে – তারা দেশের মানুষকে আঘাত করে। তাদের আসল উদ্দেশ্যই নাকি দেশের মানুষকে আঘাত করা, মোগলদের মত। মোগলরা ভারত আক্রমণ করে এখানকার রাজাদের হারিয়েই সন্তুষ্ট হত না, মন্দির ভেঙে দিয়ে, ধর্মস্থান নষ্ট করে তবে তারা শান্তি পেত। ‘মাটন’ খাওয়া লোকেরাও সেইরকম। তারা দেশের লোককে উত্যক্ত করতেই চায় এবং নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক পাকা করতে চায়। এও বলেছেন যে ব্যাপারটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই আপনার দায়িত্ব এসব নিয়ে কথা বলা।

এরপর আর নিশ্চিন্ত থাকা যায়?

প্রথমত, আমি আমিষ রান্না করছি তার গন্ধেও নয়, স্রেফ ছবিতেই যদি কারোর মনে আঘাত লাগে, তাহলে তো ও জিনিস রান্না করাই বন্ধ করে দিতে হবে। নয়ত মাদক দ্রব্যের মত লুকিয়ে খেতে হবে। কারণ যার মনে আঘাত লাগবে সে যে দল পাকিয়ে এসে আমাকেও আখলাক আহমেদ বা পেহলু খান করে দেবে না তার গ্যারান্টি তো ‘মোদী কি গ্যারান্টি’-র মধ্যে পড়ে না দেখছি। তারপর কে কোন মাসে আমিষ খায় না তা ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখতে হবে। বাঙালি হিন্দুরা শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না, আপনি যে সময়টাকে নবরাত্রি বলেন তখন তো মোটেই নিরামিষ খায় না। অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুর ধর্মাচারে তেমন কিছু বলাই নেই। তবে অনেকে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন নিরামিষ খায় আর পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসে আমিষ গন্ধ। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কোনোদিন ঝগড়া করতে যায় না। আমি আজ নিরামিষ খাচ্ছি, তাই তোমাকেও নিরামিষ খেতে হবে – এমন দাবি বাঙালি হিন্দুরা কখনো করেনি। কিন্তু আজকাল বাঙালি পাড়া বলে আলাদা করে কিছু থাকছে না পশ্চিমবঙ্গের শহর আর শহর ঘেঁষা মফস্বলে। থাকা যে উচিত তাও নয়। সবাই সর্বত্র সম্পত্তি ভাড়া নেবে বা কিনবে – তবেই না দেশ সবার। সেইজন্যেই তো কাশ্মীরের জন্যে সংবিধানে থাকা ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করিয়েছেন আপনি। তা এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই এসে পড়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। দেশের মানুষ বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন? কেবল যারা শ্রাবণ মাসে বা সারাবছর নিরামিষ খায় তারাই দেশের মানুষ? বাকি সবাই বাইরের লোক? তাহলে কি দেশব্যাপী এনআরসি করার সময়ে এও খতিয়ে দেখা হবে যে কে কে আমিষ খায়? তারপর কেবল নিরামিষাশীরাই পাবে নাগরিকের তকমা? মোগলদের মন্দির ভাঙার সঙ্গে আমিষ রান্নার যে প্রতিতুলনা আপনি করেছেন তা-ই বা কী করে নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়? প্রথম মোগল সম্রাট বাবর যখন ভারতে এসে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তখন দিল্লির মসনদে কোনো হিন্দু রাজা ছিলেন না, ছিলেন পাঠান ইব্রাহিম লোদী। তিনিও মুসলমান। সুতরাং তাঁকে হারিয়ে মন্দির ভেঙে তবেই সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। মন্দির ভাঙলে লোদীর কী? কিন্তু সেকথা থাক। ধরে নিলাম আপনি পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের হাতে মন্দির ধ্বংসের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ইতিহাস তো আপনার বিষয় নয়, আপনার বিষয় হল ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’। সুতরাং ওটুকু বাদ দিলাম। কিন্তু কথা হল, আপনি কি বলতে চেয়েছেন লালুপ্রসাদ আর রাহুল গান্ধীর মত যারা শ্রাবণ মাসে আমিষ খায় তারা এ দেশের মানুষ নয়?

আপনার সাঙ্গোপাঙ্গরা অনেকেই আগে বলেছে বাঙালির মাছ খাওয়ার অভ্যেসটা মোটেই ভদ্রজনোচিত নয়। ২০১৭ সালে হঠাৎ ‘অল ইন্ডিয়া ফিশ প্রোটেকশন কমিটি’ নামে এক সংগঠনের উদয় হয় সোশাল মিডিয়ায়। তারা বলতে থাকে যে বিষ্ণু যেহেতু মৎস্যাবতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন একবার, সেহেতু মাছ খাওয়া মানে ভগবানকেই উদরস্থ করা। অতএব মাছ খাওয়া অনুচিত কাজ। আপনার দলের নেতা পরেশ রাওয়াল ২০২২ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন ‘গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আবার কমে যাবে, মুদ্রাস্ফীতিও উপর-নিচ হবে, লোকে চাকরিও পেয়ে যাবে। কিন্তু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আর বাংলাদেশিরা আপনার পাশে এসে থাকতে শুরু করলে কী করবেন, যেমন দিল্লিতে থাকে? গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কী করবেন? আগে বাঙালিদের জন্যে মাছ রান্না করবেন?’ সত্যি বলছি, মোদীজি। তখনো আমরা অনেকে ভেবেছিলাম বিপদ যা হবে রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিদেরই হবে। অনেকেরই মাথায় ঢোকেনি যে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির খাওয়াদাওয়ায় খুব তফাত নেই। পোশাক দেখে বা মুখের ভাষা শুনেও আলাদা করে চেনা শক্ত। এখন আপনি স্বয়ং মাছ মাংস যারা রান্না করে, খায় তাদের বিরুদ্ধে কামান দাগলে ভয় না পেয়ে উপায় কী?

ভুল বুঝবেন না। মুসলমান, খ্রিস্টান, আদিবাসীদের কী হবে তা নিয়ে ভাবছি না। ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিনই তো আপনি বলে দিয়েছেন যে নতুন যুগের সূচনা হল। এই যুগে হিন্দু বাদে অন্য ধর্মের লোকেদের তো তা-ই খেতে হবে যা হিন্দুরা খায়। যা হিন্দুরা খায় না তা খাওয়া যে চলবে না সে আর বলতে? কিন্তু আপনার শুক্রবারের ভাষণ শুনে আশঙ্কা হচ্ছে অনেক হিন্দুও যে মাছ মাংস কবজি ডুবিয়ে খায় তা আপনি জানেন না। আপনার দোষ নয়। হয়ত দিলীপবাবু, সুকান্তবাবু, অগ্নিমিত্রা দেবীরা আপনাকে বলেননি। তাই ভাবলাম একটু জানিয়ে দিই। আর পাঁচজনের কথা তো বলতে পারি না, নিজের কথাই বলি। ওই যে বললাম – ব্যাপারটা ব্যক্তিগত।

আমার ছোটবেলায় স্কুলমাস্টারদের মাইনে লোককে বলার মত ছিল না বলে বাড়িতে মাছ প্রতিদিন হত না। মাংস হত বাবার মাইনে পাওয়ার সপ্তাহে। বাড়িতে টেলিফোন থাকার প্রশ্নই নেই। তাই সুদূর বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে আমার বড়মামা এসে পড়তেন বিনা নোটিসে। পোস্টকার্ড লিখতেন, কিন্তু সেটা সাধারণত এসে পৌঁছত মামা ফিরে যাওয়ার পরে। একাধিকবার তিনি এসে পড়েছেন সরস্বতীপুজোর দিন বেশ রাতে। সেদিন হয়ত আমাদের মেনু – ডাল আর আলুসেদ্ধ। কিন্তু দাদাকে তাই খাওয়ালে স্বামীর মান থাকে না। তখন কী করতেন আমার মা? টুক করে পিছনের উঠোন পেরিয়ে চলে যেতেন গাঙ্গুলিজেঠুর বাড়ি। তাঁর বাড়িতে প্রতিবার বড় করে সরস্বতীপুজো হত আর সে পুজোর ভোগে খিচুড়ির সঙ্গে থাকত জোড়া ইলিশ। জেঠু নিজে হাতে রাঁধতেন। আমার মা গাঙ্গুলি জেঠিমার সঙ্গে গোপন আঁতাতে দু টুকরো ইলিশ আর একটু ঝোল নিয়ে আসতেন, বাবার মান বেঁচে যেত। গাঙ্গুলি বোঝেন তো? গঙ্গোপাধ্যায় – খাঁটি বামুন। অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের বিশেষ পরিচিত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা আপনার দলের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায় যেমন। আমার সেই পাড়ার জেঠু গলার পৈতেটা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতেন।

আরও পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

সেইসময় বাড়িতে মাংস হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হত মুরগির মাংস, কারণ লালুপ্রসাদ যে মাংস রান্না করছিলেন দেখে আপনি চটেছেন, তার দাম আরও বেশি। বসে থাকতাম শীতলাপুজোর অপেক্ষায়। কারণ আমাদের অঞ্চলের একটা বাড়ির নামই শীতলা বাড়ি। সে বাড়িতে প্রতিবছর ঘটা করে শীতলাপুজো হত। সে পুজোর ভোগই পাঁঠার মাংস। আমাদের নেমন্তন্ন থাকত, ফলে মাটির ভাঁড়ে চার-পাঁচ টুকরো মাংস জুটে যেত। বিশ্বাস করুন, সে বাড়ির লোকেরাও হিন্দু। পদবি সম্ভবত ঘোষ। আপনার দলের বর্ধমান দুর্গাপুর কেন্দ্রের প্রার্থী দিলীপবাবুর মত আর কি।

আর নিরামিষাশী বাঙালি হিন্দুর কথা শুনবেন? আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় রাঁধতে পারতেন না, আমিও তখন ছোট। মা গুরুতর অসুস্থ হলেন। সে কদিন দুবেলা রেঁধে বেড়ে আমাদের খাওয়াতেন মণ্ডল কাকিমা। নিজের রান্নাঘরে নিজের বাসনকোসনে রেঁধে ভাত, ডাল, তরকারি দিয়ে যেতেন আর দুবেলাই মুখ শুকনো করে আমার বাবাকে বলতেন ‘দাদা, আপনাদের খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে, না? আমি তো মাছ খাওয়াতে পারছি না।’ বাবা জবাবে বলতেন ‘ছি ছি! আপনি রেঁধে দিচ্ছেন বলে খাওয়া হচ্ছে, বৌদি। মাছ খাচ্ছি না তো কী হয়েছে? এ বাড়িতে এমনিতেও রোজ মাছ হয় না।’ কাকিমা মাছ খাওয়াতে পারতেন না কারণ ওঁরা অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। শুধু বাড়িতে আমিষ রান্না হত না তা নয়, কাকিমার দুই ছেলের বিয়েতেও নিমন্ত্রিতদের নিরামিষই খাওয়ানো হয়েছিল। পাড়ায় অমন পরিবার ওই একখানাই। অথচ কোনোদিন তাঁদের মনে আঘাত লাগেনি আর সব বাড়িতে আমিষ রান্না হওয়ায়। মণ্ডল মানে বুঝলেন তো? হিন্দু কিন্তু। আপনার দলের হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডলের মত।

বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদিতে কোন কোন মাংস খাওয়ার কথা লেখা আছে সেসব আলোচনায় আর গেলাম না মোদীজি। আপনি সাধু সন্ন্যাসী পরিবৃত হয়ে থাকেন, সেসব কি আর আপনার অজানা? শুধু শেষে আপনাকে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে আমাদের রেল বাজারের সবজির দরগুলো জানিয়ে দিই। একটু দেখে বলবেন, শেষমেশ যদি এ দেশে থাকতে গেলে আমিষ ছেড়েই দিতে হয়, এত দাম দিয়ে কিনে খেতে পারবে কজন? আপনি তো সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। করলেও আমার মত চুনোপুঁটির সেখানে জায়গা হত না। তাই হাটখোলা চিঠিতেই এত কথা বলতে হল। অপরাধ নেবেন না।

ঝিঙে ১০০/- কেজি
পটল ৮০/- কেজি
বেগুন ৮০/- কেজি
উচ্ছে ৮০/- কেজি
ঢ্যাঁড়স ৭০/- কেজি
পেঁপে ৬০/- কেজি
লাউ ৪০/- কেজি
সজনে ডাঁটা ৮০/- কেজি
শশা ৮০/- কেজি
টমেটো ৩০/- কেজি
বিট, গাজর ৫০/- কেজি
বিন ৮০/- কেজি
ক্যাপসিকাম ১০০/- কেজি
লঙ্কা ১০০/- কেজি
কুমড়ো ৩০/- কেজি
চিচিঙ্গা ৮০/- কেজি
মিষ্টি আলু ৬০/- কেজি
কাঁচকলা ১৫/- জোড়া
চালকুমড়ো ৬০/- কেজি

ইতি

একজন আমিষাশী হিন্দু সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

দুঃসময়ের পাঠ: ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা

ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়।

এমন দেশ বা জাতি নাই, যাহাতে ভগবান তাহাদের জন্য কোনো ধর্মগুরুকে পাঠান নাই।

হিন্দুস্থান কে দো পয়গম্বর, রাম ঔর কৃষ্ণ।

হিন্দুদের কোনো ধর্মগ্রন্থে আছে কথাগুলো? নাকি কোনো হিন্দু ধর্মগুরু বলেছেন?

কোনোটাই নয়। প্রথম বাক্যটা আছে কোরান শরীফে, আর ওই বাক্যকে আশ্রয় করেই দ্বিতীয় বাক্যটা উচ্চারণ করেছিলেন নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দরগার হাফিজ হুসেন নিজামী।

উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষিত হিন্দুদের আড্ডাতেও বারবারই উঠে আসে একটা কথা – হিন্দুধর্ম অনেক উদার, ইসলামে কড়াকড়ি অনেক বেশি। তাই মুসলমানদের অনেকে উদার হলেও, ওদের মধ্যে গোঁড়ামি বেশি। হিন্দু পরিবারে জন্মে একথা বারবার শুনতে শুনতে দুরকম প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব। এক, বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যাওয়া যে কথাটা ঠিক। দুই, কথাটা ঠিক কিনা খুঁজে দেখার ইচ্ছা তৈরি হওয়া। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া হলেও ব্যাপারটা নেহাত সহজ নয়। হিন্দুধর্মের কোনো একমেবাদ্বিতীয়ম পবিত্র গ্রন্থ নেই, আব্রাহামের সন্তানদের ধর্মগুলোর (জুডাইজম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম) ক্ষেত্রে সে সুবিধা আছে। কিন্তু কেবল কোরান পড়লেই ইসলামের সব জানা হয়ে যায় না (এবং হাদিশ পড়লেও নয়), কেবল বাইবেল পড়লেই খ্রিস্টধর্মের আদ্যোপান্ত আয়ত্ত হয় না। পৃথিবীর যে কোনো ধর্মের আগাপাশতলা জানতে পড়তে হয় প্রচুর বইপত্র, লেগে যায় গোটা জীবন। আমাদের অনেকের জীবনেরই আর বড়জোর অর্ধেক বাকি আছে। তাহলে আজকের সর্বগ্রাসী বিদ্বেষ, ভুয়ো ইতিহাস, ভুয়ো খবরের যুগে সত্য যাচাইয়ের উপায় কী? ভারতের প্রধান দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায় – হিন্দু আর মুসলমান। তাদের মধ্যে সংঘাতের যে অনস্বীকার্য দীর্ঘ ইতিহাস, তার মূল একেবারে ভাবনার জায়গাতেই কিনা, তা জানার উপায় কী? পাঠ্য ইতিহাসে যেটুকু পড়েছিলাম আমরা, সেটুকু তো পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়ার জন্যে মুখস্থ করা। ফলে পরীক্ষা দেওয়ার পাট চুকে যাওয়া মাত্রই বেমালুম ভুলে গেছি। এমতাবস্থায় আমার মত অপণ্ডিতদের একটাই উপায় – যাঁরা আজীবন এই প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাঁদের শরণাপন্ন হওয়া। ক্ষিতিমোহন সেন তেমনই একজন। তাঁর ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইটার নাম শুনেছি অনেক, কিন্তু চোখে দেখিনি আগে। যাঁদের লেখায় এই বইয়ের উল্লেখ পেয়েছি তাঁরা অনেক দূরের মানুষ। ফলে ধারণা ছিল, নির্ঘাত ওটা ইয়া মোটা একখানা বই এবং অমন একজন পণ্ডিতের লেখা যখন, তখন পড়তে গেলে মাথা চুলকেই দিন কেটে যাবে। ফলে এবারের কলকাতা বইমেলায় যখন ন্যাশনাল বুক এজেন্সির স্টলে ঢুকে আবিষ্কার করলাম বইটা দু আঙুলেই তুলে ফেলা যায়, পাতার সংখ্যা মাত্র ১১১, তখন কিনে ফেলতে দেরি করিনি।

পড়লাম, মনের অনেক অন্ধকার দূর হল। কিন্তু এত প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের আলোচনা আমার লেখা উচিত হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। দ্বিধা কাটল এই বইয়ের প্রকাশকালের সঙ্গে আমার কালের মিল উপলব্ধি করে। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারত দ্বিখণ্ডিত এবং স্বাধীন হয়, ১৯৪৮ সালে নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হন মহাত্মা গান্ধী আর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারত হিন্দুরাষ্ট্র না হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গ্রহণ করে। সেবছরই প্রকাশিত হয় এই বই। বস্তুত, পরিশিষ্টের ‘মহাবীর ভীষ্ম’ শীর্ষক লেখার উপরে ছোট অক্ষরে লেখা আছে:

মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ পাইবার অব্যবহিত পরে লেখা। যে ছাত্রটি দুঃসংবাদ বহন করিয়া লেখককে সঙ্গে করিয়া আশ্রম-কেন্দ্র, গৌর-প্রাঙ্গণে লইয়া গিয়াছিলেন, অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে তিনিও এক উন্মত্ত আততায়ী দলের হস্তে নিহত হন। ছাত্রটি তখন দূর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত অধ্যাপক।

লক্ষ করে দেখলাম, সেইসময় দাঁড়িয়ে লেখা এই বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত প্রায় সবটাই আমার সময়ে উদ্ধৃতিযোগ্য। অতএব যোগ্যতর আলোচকের সন্ধানে কালক্ষেপ না করে লিখে ফেলাই কর্তব্য। এই লেখার লক্ষ্য আমার মত ইতিহাসে অদীক্ষিত পাঠকরা – ইতিহাসবোধহীন জীবনযাপন যাদের জীবনকে ক্রমশ বিপদসংকুল করে তুলছে – তাদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বইয়ের সন্ধান দেওয়া, বইটা পড়তে উস্কানি দেওয়া।

এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত লাইনগুলো ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমানদের গোঁড়ামি সম্পর্কে বদ্ধমূল ধারণার পরিপন্থী। তবে ক্ষিতিমোহনের বইয়ের ঠিক ওই পাতাতেই আছে আরও কয়েকটি বাক্য, যা ওই ধারণার মূল ধরেই টান দেয়:

কুরান আরও বলেন, হজরতের পূর্বে যেসব মহাপুরুষ ধর্ম সম্বন্ধে যাহা কিছু উপদেশ দিয়া গিয়াছেন সেইসব সত্যও বিশ্বাস করিতে হইবে।

পূর্ববর্তী সব সত্যকে আরও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করাই কুরানের কাজ।

ওই অধ্যায়েই কিছু পরে ক্ষিতিমোহন লিখছেন:

নানাজনে কুরানকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ব্যাখ্যাতাদের ইমাম বলে। এই ব্যাখ্যানে হজরত প্রত্যেককেই প্রভূত স্বাধীনতা দিয়াছেন। তাঁহার নিজেরই কথা আছে যে, তাঁহার ধর্মে নানা যুক্তি অনুসারে তিয়াত্তরটি দল হইবে। তিনি বলিয়াছেন, আমার দলে যে মতের ভেদ হয় তাহা ভগবানেরই দয়া – ইখতিলাফু উম্মতি রহমতুন।

যে ধর্মগ্রন্থে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার জন্মেরও আগে অন্য যাঁরা যা উপদেশ দিয়েছেন তাও বিশ্বাস করতে বলা হয় এবং যে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই মতভেদকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে আখ্যা দেন, সেই ধর্মে মৌলিকভাবেই কড়াকড়ি বা গোঁড়ামি বেশি – এমনটা যে কেবল অজ্ঞানতাবশতই বলা সম্ভব তাতে সন্দেহ কী? তবে একথা অনস্বীকার্য যে কোনো ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে তা দিয়ে মানুষের – বিশেষ করে অন্য ধর্মের মানুষের – খুব একটা কিছু এসে যায় না। এসে যায় সেই ধর্মের মানুষ কীভাবে ধর্মপালন করছেন তা দিয়ে। অনেকে এই যুক্তিতেই বলবেন, কোরানে যা-ই বলা থাক আর হজরত মহম্মদ যা-ই বলে থাকুন, বাস্তবে দেখা যায় মুসলমানরা অন্য ধর্ম সম্পর্কে মোটেই সহিষ্ণু নয়। ধর্মাচরণে মোটেই উদার নয়। একথাও যে সত্য নয়, ভারতবর্ষীয় মুসলমানদের ধর্মাচরণ যে যুগে যুগে এর উল্টোটাই প্রমাণ করেছে, তা এই বই পড়লে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য কিছুটা উদারতা দেখিয়ে বলে থাকেন – ভারতীয় মুসলমানরা পৃথিবীতে অনন্য। এখানে বিশেষত সুফিদের উদ্যোগে হিন্দু-মুসলমানের সাধনা মিলেমিশে যাওয়ায় তাঁরা উদার। কিন্তু আরব মুসলমানরা এরকম নয়। এই মতেরও মূলে আছে অজ্ঞানতা। যেন সুফিবাদ আকাশ থেকে টুপ করে ভারতেই পড়েছিল। ক্ষিতিমোহন ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে একের পর এক সাধকের উল্লেখ করে তাঁদের উদারতা দেখিয়েছেন। তার মধ্যে যাঁর কথা উদার, অনুদার নির্বিশেষে হিন্দুদের সবচেয়ে চমৎকৃত করবে এবং গোঁড়া মুসলমানদের রুষ্ট করবে, তাঁর দৃষ্টান্তই নেওয়া যাক। তাঁর নাম অবু অল আলা মু-অররীর। ইনি মোটেই ভারতীয় নন। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোতে এঁর জন্ম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন তিনি বলতেন

পৌত্তলিকতা ছাড়িয়াছ বলিয়া তো গর্ব কর। ভাবিয়া দেখিয়াছ কি, তুমি নিজে কত বড়ো পৌত্তলিক? বিশেষ-শাস্ত্র বিশেষ-গ্রন্থ বিশেষ-ভাষা বিশেষ-দেশ বিশেষ-দিন ও বিশেষ-দিককেই যদি একমাত্র পবিত্র মানো তবে তাহাও তো পৌত্তলিকতা। দেবপূজা ছাড়িয়া দেবালয় অর্থাৎ মসজিদেরই পূজা যদি কর তবেই বা কম পৌত্তলিকতা কি?

এ পর্যন্ত এসে পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, ক্ষিতিমোহন কি বেছে বেছে মুসলমানদের উদারতার দৃষ্টান্তই তুলে ধরেছেন? নাকি আমিই তাঁর বই থেকে বেছে বেছে সেগুলো তুলে ধরছি? সম্ভবত এমন প্রশ্নের মোকাবিলা ক্ষিতিমোহনকেও করতে হত। তাই ‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে তিনি লিখছেন

হিন্দু-মুসলমান সাধনা এদেশে এমন যুক্ত হইয়া গিয়াছে যে রচনা দেখিয়া লেখক হিন্দু কি মুসলমান তাহা বলা অসম্ভব। দরাফ খাঁর রচিত সংস্কৃত গঙ্গাস্তব তো অতি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরও নিত্যপাঠ্য।

আবার তুলসী সাহেব হাথরসীর জন্ম ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বেদপরায়ণ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বংশে। যৌবনেই তিনি সন্ন্যাসী হইয়া যান। তাঁহার লেখা দেখিয়া মনে হয় যেন মুসলমানেরই লেখা। একটু নমুনা দেওয়া যাউক:

রোজা নিমাজ বাংগ অংদর মাহীঁ
আশীক মাশূক মিহর দিদা সাঈঁ।।

রোজা, নামাজ, নামাজের জন্য ডাক সবই অন্তরের মধ্যে। প্রেমিক, প্রেমাস্পদ, প্রেম, প্রেমময় স্বামীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ সবই আমাদের ভিতরে।

‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে ক্ষিতিমোহন এক নাতিদীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন, যা হিন্দুদের উদারতার তালিকা না মুসলমানদের উদারতার তালিকা তা বলা মুশকিল। গুজরাটের খোজা কাকাপন্থী ইমামশাহী মৌল-ইসলাম মতিয়া সংঘ; রাজপুতানার মেও, মিরাশি, লবানা, সখীসরবরের উপাসকদের কথা লিখেছেন। এঁদের বৈশিষ্ট্য হল এঁরা পুরোপুরি হিন্দু হয়েও মুসলমানি সাধনার সঙ্গে যুক্ত। এঁদের বাড়িতে নানা হিন্দু আচার, রামনবমী, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি পালিত হয়। সামসী সম্প্রদায়ের লোকেরা গীতাও মানেন, মুসলমান গুরুদেরও মানেন। রসুলসাহীরা তান্ত্রিক যোগসাধন করেন। গঞ্জামের আরুবারা, তৈলঙ্গের কাটিকরাও এইরকম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন, বোহরারা একদা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেক ব্রাহ্মণসুলভ আচার বিচার রয়ে গেছে। ডফালী, ঘোসীরাও আধা হিন্দু, আধা মুসলমান। এই জাতীয় ব্রাহ্মণদের বলা হয় হুসেনী ব্রাহ্মণ। এঁরা পাণ্ডার কাজ করেন। কোনো মন্দিরে নয়, আজমীরে মৈনুদ্দীন চিশতীর দরগায়। কাশীর ভর্তরীরা আবার যোগী। রীতিমত গেরুয়া ধারণ করেন, হিন্দু আচার পালন করেন। অন্তত ক্ষিতিমোহনের সময়ে হিন্দুদের ক্রিয়াকর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল তাঁদের গান। অথচ ভর্তরীদের গুরু মুসলমান।

হিন্দুধর্ম বলতে যাঁরা উঁচু পাঁচিল দেওয়া একটা নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড জাতীয় জিনিসকে বোঝেন, ‘হিন্দুধর্মে উদারতার বাণী’ অধ্যায়ের প্রথম দুটো অনুচ্ছেদে বলা কথাগুলো তাঁদের কতটা পছন্দ হবে তা বলা শক্ত:

ধর্ম সম্বন্ধে ভারতের ইতিহাস একটু বিচিত্র। যাহা বৈদিকধর্ম তাহাই যে ঠিক হিন্দুধর্ম এ কথা সত্য নহে। প্রাচীনকাল হইতেই এদেশে অবৈদিক বহু সংস্কৃতি ও ধর্ম ছিল। সেইসব অবলম্বন করিয়াই হিন্দুধর্ম। বৈদিকধর্ম কর্মকাণ্ড প্রধান, দ্রাবিড়ধর্ম ভক্তিপ্রধান। এইসব নানা সংস্কৃতির ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পলিমাটির স্তর পড়িয়া ভারতের ধর্মভূমি গড়িয়া উঠিয়াছে…

শৈব ও বৈষ্ণব প্রভৃতি ভাগবতধর্মে বৈদিক কর্মকাণ্ড বিশেষ কিছুই নাই। বেদ তিন ভাগে বিভক্ত, কর্মকাণ্ড, উপাসনাকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড, যে অংশে যজ্ঞাদি কর্মের বিধান আছে তাহা কর্মকাণ্ড। ভাগবতধর্মের প্রাণই হইল প্রেম ভক্তি ও পূজা। বাহির হইতে আগত গ্রিক হুণ শক প্রভৃতির দল বৈদিক দলে ঢুকিতে না পারিলেও ভক্তিপ্রধান ভাগবতধর্মে সকলে সাদরে গৃহীত হইয়াছেন।

অন্তত বেদকে যে অভিন্ন, অভ্রান্ত একটা জিনিস বলে ভাবব তারও জো নেই। ক্ষিতিমোহন লিখেছেন বেদ আর্য সাধনার প্রাচীনতম ভাণ্ডার, কিন্তু একই কালের বা একই দলের জিনিস নয়। বেদে বেদেও বিরোধ ছিল। মোটামুটি ঋগ্বেদই প্রাচীনতম, সামবেদ ও সামগান তুলনায় নতুন। মজার কথা

এই সামবেদকেও একদিন ঋগ্বেদ সহিতে পারে নাই। সামবেদ-গান ঋগ্বেদীয়দের কানে পেচক-শৃগাল-কুকুর-গাধার ডাকের মতোই মনে হইত।

‘সংগীত’ নামের এই অধ্যায়ে ভাগবত মুনিদের যুগের কথা এসেছে একটু পরেই। সেখানেও দেখা যায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরেই মুনিদের মধ্যে মতভেদ। ক্ষিতিমোহনের ভাষায়

এখনকার দিনেও রাজনীতিতে দেখা যায় কোনো একটা দল শক্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিলে তখন নানা দল দেখা দেয়। তখনকার দিনেও দেখা যায় সংগীতে ভাগবত-মত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে নানা মতবাদ চলিল। এমন একজন মুনি নাই যাঁহার সঙ্গে অন্যের মতভেদ না আছে।

নাসৌ মুনির্যস্য মতং ন ভিন্নম্।।

সংগীতের প্রসঙ্গেই ফিরে আসা যাক বাস্তবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কেমন আচরণ করেন সে প্রশ্নে। এই বইয়ের লেখক যেন পাঠক পড়তে পড়তে কী ভাববেন তা আগে থেকেই জানতেন। মনে প্রশ্ন ওঠামাত্রই দেখা যায় তার উত্তর হাজির

একটা কথাতে বড়োই বিস্ময় লাগে। সংগীতকলা মুসলমানশাস্ত্রে নিষিদ্ধ। অথচ বড়ো বড়ো ওস্তাদেরা তো প্রায় সকলেই মুসলমান। মুসলমানশাস্ত্রে যাহাই থাকুক মুসলমান-তীর্থে তো সংগীত খুবই প্রচলিত। আজমীরে মৈনউদ্দীন চিশতীর দরগা হইল ভারতে মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ। সেখানে মূল তোরণে প্রহরে প্রহরে নহবত বাজে। ভিতরে প্রত্যেক পবিত্র স্থানে গায়ক-গায়িকারা যাত্রীদের পুণ্যার্থ সংগীত করেন ও যাত্রীরা তাহার জন্য রীতিমত দক্ষিণা দেন।

স্বভাবতই কাশীর মন্দিরে মন্দিরে মুসলমান বাদকদের সানাই ও নহবতের কথা এসেছে। নাকাড়ার বহু গৎ যে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সেকথাও এসেছে। ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের বাজনা থেকে বিভিন্ন রাগ সৃষ্টি – সবেতেই যে মুসলমানদের বিপুল অবদান সেকথা সঙ্গীতপ্রেমী মাত্রেই জানেন। ক্ষিতিমোহন প্রত্যেকটা উদাহরণ সবিস্তারে লিখেছেন। ব্যাপারটা যে শুধু আমির খুসরো আর তানসেনের অবদানে শেষ নয়, আমাদের কালের ওস্তাদ বিসমিল্লা খানের সরস্বতীর প্রতি ভক্তি যে আকাশ থেকে পড়েনি এবং তাঁর বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে তাকে মুছে দেওয়াও যাবে না – তা স্পষ্ট হয় এই অধ্যায়ে। তবে চমকে দেওয়ার মত তথ্য এগুলো নয়। চমকে উঠতে হয় যখন ক্ষিতিমোহন ঔরঙ্গজেবের সঙ্গীতপ্রীতির আলোচনায় আসেন। সেই ঔরঙ্গজেব, যিনি প্রায় সব মতের ঐতিহাসিকদের ভাষ্যেই অত্যন্ত গোঁড়া মুসলমান এবং হিন্দুদের উপর দমনপীড়নের সবচেয়ে বড় প্রতিভূ।

লেখক বলছেন ঔরঙ্গজেব হিন্দি গীত-কবিতার অনুরাগী ছিলেন, তাঁর দরবারে বড় বড় গায়কও ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের জন্মদিনে নতুন ধ্রুপদ এবং খেয়াল রচিত হত। সেসব গান সুরক্ষিত আছে এবং ছাপার অক্ষরে প্রকাশিতও হয়েছে। রাগ টোড়ীতে রচিত এরকম একটা গানে আছে

অকবর সুত জহাঁগীর তাকে শাহজহাঁ
তাকো সুত ঔরংগজেব ভয়ো হৈ ভুর পর।

এরকম আরও অনেকগুলো গানের দৃষ্টান্ত কলাবতী-গীতসংগ্রহে পেয়েছেন বলে ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ঔরঙ্গজেবের দরবারে গীত-কবি হিসাবে ব্রাহ্মণবংশীয় আলম পণ্ডিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশশানকে যখন ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় শাসক হিসাবে, তখন তিনি প্রবাসের দুঃখ দূর করতে কবি আলমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলম তাঁর প্রেমিকাকে ছেড়ে অতদূর যেতে রাজি হননি। তখন আজিমুশশান চাইলেন আরেক কবি কলাবত কালিদাস ত্রিবেদীকে। তাঁকে আবার ঔরঙ্গজেব ছাড়তে চাইলেন না।

এসব প্রমাণ দেখে ক্ষিতিমোহনের অনুমান

ঔরংগজেব অতিশয় নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। চরিত্রগত নীতির শৈথিল্য তিনি সহিতে পারিতেন না। গায়ক ও কলাবতদের মধ্যে নীতিগত শৈথিল্যে হয়তো তিনি রুষ্ট হইয়া থাকিবেন; তাই তাঁহাদের গানকে তিনি নিষিদ্ধ করিয়া থাকিবেন।

অবশ্য সঙ্গীত, চিত্রকলা এবং স্থাপত্যশিল্পে অবদানের জন্যে অন্য মোগল সম্রাটদের অবিমিশ্র প্রশংসা করলেও বাদশাহ আলমগীর সম্পর্কে ক্ষিতিমোহনের ভাবনায় স্ববিরোধিতা রয়েছে বলে মনে হয়। কারণ ‘স্থাপত্যশিল্প’ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন:

ঔরংগজেব নানা উপায়ে পিতৃসিংহাসন অধিকার করিয়াই ধর্মের নামে শিল্পকে নির্বাসিত করিলেন আর গোঁড়া মুসলমান কারিগর ছাড়া আর সব শিল্পীদের তাড়াইয়া দিলেন। ইহার পরেই মোগল দরবারে শিল্পসৃষ্টির অবসান হইয়া গেল।

চিত্রশিল্পের আলোচনায় ক্ষিতিমোহন স্পষ্ট লিখেছেন

মুসলমান ধর্মের অনুশাসনে শিল্পসাধনা নানাভাবে বদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিতে না পারিলেও মোগল সম্রাটেরা বন্ধন দুঃখ অনেকটা ঘুচাইলেন। মোগল বাদশাবৃন্দের সময়ে মৃত্যুপাশ হইতে অনেক পরিমাণে মুক্ত হইয়া ভারতীয় মুসলমানদের শিল্পকলা একটু নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।

এই ‘চিত্রশিল্প’ অধ্যায় অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এই কারণে যে লেখক জানিয়েছেন, ইউরোপিয় চিত্রশিল্পের যেসব নিদর্শন নিয়ে আমরা সাধারণত উচ্ছ্বসিত হই তার অনেকগুলো ভারতীয় শিল্পের কাছে, বিশেষত মোগল যুগের শিল্পের কাছে, বিশেষভাবে ঋণী। প্যারিসের ল্যুভর এবং লন্ডনের মিউজিয়ামে ডাচ চিত্রশিল্পী রেমব্র্যান্টের যেসব বিশ্ববিখ্যাত কীর্তি রয়েছে তার অনেকগুলোই মোগল মিনিয়েচার পেন্টিংয়ের হুবহু নকল বা তা থেকেই উদ্ভূত। এই তথ্যের উৎস হিসাবে লেখক দুই ইউরোপিয় শিল্পরসিকের কথাই উল্লেখ করেছেন। আজকের ভারতে মোগলদের মন্দির ধ্বংসকারী, হিন্দুবিরোধী যে ভাবমূর্তি জনপ্রিয় হয়েছে তাতে এই অধ্যায়ে লেখকের ইতিহাস পাঠ অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ভারতে পৌঁছবার আগে মোঙ্গল আক্রমণ আরব সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। ফলে আরবরা পারস্যের সংস্কৃতির উপরে ছশো বছর ধরে যে জগদ্দল পাথর চাপিয়ে রেখেছিল তা সরে যায়। আবার পারস্যের সাম্রাজ্যও মোঙ্গলদের হাতেই ধ্বংস হয়। দুটোই কিন্তু মুসলমানদেরই সভ্যতা। ক্ষিতিমোহনের মতে মোঙ্গলরা গথ, হুনদের মত শুধু ধ্বংস করতে করতে এগোননি। একইসঙ্গে তাঁদের হাতে শিল্প, সাহিত্যের নির্জীব বন্ধনের অবসান এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এক ধাপ এগিয়ে তিনি লিখছেন

মনে হয়, ইউরোপে রেনাসাঁসের যুগ প্রবর্তনের প্রধান কারণই এই মোঙ্গলেরা। কারণ ইহাদেরই জন্য এতকাল খোরাসানের অন্ধকারে অবরুদ্ধ অটোমান তুর্কেরা কনস্টান্টিনোপলে আসিয়া সকলের দৃষ্টির সম্মুখে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিলেন। ইহাদেরই জন্য বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হইল। ইহাদেরই জন্য গ্রিক পণ্ডিতগণ তাঁহাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার লইয়া সারা ইউরোপে নানা স্থানে ছড়াইয়া পড়িলেন।

সেই ধারাতেই পাঠান, মোগলরা ভারতে এসে বহু সংস্কৃতি ও শিল্পশৈলীর সমন্বয় ঘটান। তাই মোগল আমলের শিল্পীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান – দুরকম শিল্পীই দেখা যায়। আকবরের আমলের চিত্রশিল্পীদের মধ্যে যাঁদের নাম পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে দুজন মুসলমান, আর সকলেই হিন্দু। তাঁদের মধ্যে আবার কায়স্থ, চিতেরা (চিত্রকর), শিলাবত (শিলাশিল্পী), খাটি (কাঠশিল্পী), এমনকি কাহার (পালকিবাহক) জাতের মানুষও ছিলেন। অর্থাৎ উঁচু জাত, নিচু জাতের বিভাজনও সেক্ষেত্রে কাজ করেনি। ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন নন্দলাল বসুর থেকে মোগল আমলের শিল্পীদের নামের এক তালিকা তিনি পান। তার মধ্যে ১০৮ জন হিন্দু, ৯১ জন মুসলমান।

ভারতীয় সঙ্গীত, শিল্প, স্থাপত্যে মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে তাজমহলের কথা। যদিও তাজের স্থাপত্যে যে হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র সংস্কৃতির চিহ্ন আছে তা সচরাচর কাউকে বলতে শুনি না। পি এন ওকের তেজো মহালয়ের আষাঢ়ে গপ্প হয়ত সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়ে। ক্ষিতিমোহন তাজমহল সম্পর্কে কী লিখেছেন দেখা যাক

তাজের ভারতীয়ত্বের একটা বড়ো প্রমাণ, তাজ পশ্চিমমুখী নহে। আর. এফ. চিজলম্ দেখাইয়াছেন তাজের চারি কোণাতে চারি মিনার, মধ্যে গম্বুজযুক্ত রচনা। এই রচনারীতি ঠিক যবদ্বীপের চণ্ডীসেবার পঞ্চরত্ন মন্দিরের নকশার সঙ্গে মেলে। হিন্দু শিল্পশাস্ত্রের পঞ্চরত্ন মন্দিরেরও এইরূপই গঠনপ্রণালী। অজন্তার চিত্রেও ঠিক তাজের নকশার নমুনা পাওয়া যায়। প্রথম গুহাচিত্রে বুদ্ধের কাছে মা ও শিশুর চিত্রে এবং অনুরাধাপুরে ও বরোবুদুরে বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে অনুরূপ নকশা পাওয়া যায়। শুধু তাজে নহে, আকবরের সেকেন্দ্রাতেও এমনসব শৈলী দেখা যায় যাহাকে ঠিক মুসলমানি বলা চলে না। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান – এই তিনজনেই সংস্কৃতি হিসাবে অনেকখানি ভারতীয় ছিলেন।

তাজশিল্পের ক্রমবিকাশের ইতিহাস খুঁজিতে ভারত ছাড়িয়া পারস্য দেশে বা মধ্য এশিয়াতে ঘুরিয়া মরা বৃথা। তাজের নির্মাণে যেমন কান্দাহার, কনস্টান্টিনোপল ও সমরখন্দের কারিগর ছিলেন, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে মুলতান লাহোরের কারিগরেরও অভাব ছিল না। দিল্লিরও বহু কারিগর ছিলেন। তাঁহাদের শিক্ষার মধ্যে ভারতীয় শৈলীই চলিত ছিল। একজন বড়ো ওস্তাদ ছিলেন চিরঞ্জীব লাল, তাঁহার অনুবর্তী ছিলেন ছোটেলাল, মন্নুলাল ও মনোহরলাল।

মুসলমানি য়ুনানী শাস্ত্র আর আয়ুর্বেদের মধ্যে কেমন দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে সম্পর্ক, সম্রাট আকবরের মন্ত্রী এবং রামচরিতমানস রচয়িতা তুলসীদাসের বন্ধু আবদুর রহীম খানখানাঁ কেমন সংস্কৃত ছন্দে হিন্দি, সংস্কৃত, ফারসি ভাষা মিশিয়ে লিখেছেন (‘করোম্যেব্ দুল্ রোহীমোইহং খুদাতালাপ্রসাদতঃ/পারসিয়পদৈর্যুক্তং খেটকৌতুকজাতকম্’) – সেসব দৃষ্টান্ত দিতে থাকলে এই আলোচনা কখনো শেষ হবে না। কিন্তু ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে দুজনের কথা উল্লেখ না করলে – মালিক মহম্মদ জায়সী আর কবীর। জায়সী ক্ষিতিমোহনের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে নিয়ে শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক সম্মিলনীতে আলাদা বক্তৃতাও দিয়েছিলেন।

জায়সী হলেন সেই কবি, যাঁর ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি লেখা পদুমাবতী (পদ্মাবতী) কাব্য ইদানীং ইতিহাস বলে গণ্য হচ্ছে। তারই জেরে দীপিকা পাড়ুকোনকে শূর্পনখা করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ইনি ক্ষিতিমোহনের ভাষায় ‘সাধকশ্রেষ্ঠ’। সংস্কৃত যোগশাস্ত্র, পুরাণ, কাব্য, অলংকার, ব্যাকরণে পণ্ডিত, ফকির জায়সীর চার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দুজন ছিলেন হিন্দু। মারা যাওয়ার সময়ে তিনি ব্রাহ্মণ বন্ধু গন্ধর্বরাজের ছেলেদের বলেন, আমার নিজের সন্তান নেই। তোমরা যেহেতু বন্ধুর সন্তান, তোমরাই আমার সন্তান। আমার পারিবারিক মালিক উপাধি যদি তোমরা বহন করো, তাহলে উপাধিটা লুপ্ত হবে না। আমার আশীর্বাদে যতদিন এই উপাধি নিয়ে তোমরা ভগবানের গুণগান করবে, ততদিন তোমাদের বংশে সুগায়কের অভাব হবে না। এই বইয়ের রচনাকালেও উত্তরপ্রদেশের বালিয়ার হলদী ও রায়পুর এলাকার কথকরা মালিক উপাধিই ব্যবহার করতেন। আজকের ভক্তরা জায়সীর কাব্য নিয়ে যা ব্যাখ্যাই করুন না কেন, ক্ষিতিমোহন লিখেছেন পদ্মাবতী কাব্যে আসলে যোগমার্গের গভীর তত্ত্বকথা রয়েছে। জায়সীর মতে রানি পদ্মিনী জীবাত্মার প্রতীক, রাজা রতন সেন পরমাত্মার আর আলাউদ্দীন পাপের। জায়সীর সমাধিমন্দির আবার আমেথির হিন্দু রাজার তৈরি। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, জায়সীর আশীর্বাদ পাওয়ার পরে তাঁর ছেলে হয়। ফলে তিনি জায়সীর ভক্ত হয়ে যান।

আরও পড়ুন আখতারনামা : বিস্মৃত ইতিহাস

কবীরের অপরাধ – তিনি হিন্দু, মুসলমানকে মেলাতে চেয়েছিলেন। ফলে দুই দলই তাঁর নামে বাদশার কাছে নালিশ করে। তলব পেয়ে দরবারে পৌঁছে অভিযোগকারীদের কাঠগড়ায় মোল্লা আর পণ্ডিতদের একসঙ্গে দেখে কবীর বলেন, হায়, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। তাহলে তোমরা ভুল করলে কেন? বিশ্ববিধাতার সিংহাসনের নিচে মিলিত হতে ডেকেছিলাম, সেখানে জায়গায় কুলোল না, কুলোল রাজসিংহাসনের নিচে! মেলাতে চেয়েছিলাম প্রেমে-ভক্তিতে, তোমরা মিলেছ বিদ্বেষে! বিদ্বেষের চেয়ে প্রেম-ভক্তির জায়গা কি বেশি চওড়া নয়? কবীরকে যদি বলা হত সাধনা সুরক্ষিত রাখতে সম্প্রদায় দরকার, তাহলে তিনি বলতেন ‘বেহা দীনহী খেতকো বেহ্রাহী খেত খায়’। অর্থাৎ বাইরের ছাগল, গরুর ভয়ে ক্ষেতে বেড়া দিলাম। দেখি বেড়াই ক্ষেত খেয়ে উজাড় করে দিল। ক্ষিতিমোহন উদ্ধৃত কবীরের অসংখ্য সহজ সরল রচনার মধ্যে এমন চারটে লাইন রয়েছে যা পড়লে মনে হয় এই সবে লেখা হল

জো খোদায় মসজিদ বসতু হৈ
ঔর মুলুক কেহিকেরা।
তীরথ মূরত রাম নিবাসী
বাহর করে কো হেরা।।

খোদা যদি মসজিদেই বাস করেন তবে বাকি জগৎটা কাহার? তীর্থে মূর্তিতেই যদি রাম রহেন তবে বাহিরকে দেখে কে?

কেবল ইতিহাস পাঠে নয়, সমসময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা কীভাবে ধরা পড়েছে তাও লেখক বিবৃত করেছেন। চট্টগ্রামের সাহিত্যসেবক আবদুল করীমের কাছে পাওয়া হোরান জরিপ (কোরান শরীফের প্রাকৃত উচ্চারণ) পুথি থেকে শুরু করে বাংলার গ্রামের মুসলমান পটুয়াদের কথা, যাঁদের পটের কাহিনি হয় হিন্দু দেবদেবী, পুরাণ ইত্যাদি নিয়ে – সবই খোলা মনের পাঠকের অপেক্ষায় আছে।

খোলা মন জিনিসটা কি আজ সুলভ? বিশেষ করে ধর্মের ব্যাপারে? এখন তো ধর্ম মূলত ধ্বজা। সে সম্পর্কে ক্ষিতিমোহন মহাভারতের অনুশাসন পর্ব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন

এক এব চরেদ্ ধর্মং ন ধর্মধ্বজিরো ভবেৎ।
ধর্মবাণিজ্যকা হ্যেতে যে ধর্মমুপভূঞ্জতে।।

ধর্ম হইল আপনার জীবনটি নিয়ন্ত্রিত ও শান্ত করিবার জন্য ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ধর্মকে ধ্বজার মতো ব্যবহার করিয়া কোনো বিরোধ ঘোষণা করা বা কোনো সুবিধা আদায় করার চেষ্টা অতিশয় অন্যায়।

ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়। সেই আশায় খোলা মনের মানুষ খুঁজে যাওয়া, তার কাছে এইসব বহুযুগের ওপার হতে আসা বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে আজ?

পুনশ্চ: কপিরাইট উঠে যাওয়া এই বইয়ের যে সংস্করণ আমার হাতে এসেছে তাতে বিকট অযত্নের ছাপ রয়েছে। একই ব্যক্তির নাম, একই বইয়ের নাম একেক জায়গায় একেকরকম বানানে লেখা হয়েছে। এমনকি বইয়ের নামও প্রচ্ছদে আর পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে আলাদা। মুদ্রণ প্রমাদ অগ্রাহ্য করলেও এই ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভাল সংস্কৃত, আরবি, উর্দু জানা কোনো পাঠক হয়ত উদ্ধৃতিগুলোতেও কিছু ভুল ধরতে পারবেন যা আমার বোধগম্য হয়নি। বইয়ের শেষের টীকাগুলো লেখার ভিতরে চিহ্নিতকরণেও অস্পষ্টতা, অসঙ্গতি রয়েছে। পরিশিষ্টে জায়সীকে নিয়ে যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে তা যে কী করে ৮ শ্রাবণ ১৯১২ তারিখে পঠিত হয়ে থাকতে পারে তা বোঝা অসম্ভব। ১৯১২ বঙ্গাব্দ আসতে এখনো শ পাঁচেক বছর দেরি আছে, অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান (ইংরিজি) ক্যালেন্ডারে শ্রাবণ নামে কোনো মাস নেই। এই দুঃসময়ে এই বই সুলভে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু এত মূল্যবান বইয়ের কি এই অযত্ন প্রাপ্য?

ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা
লেখক: ক্ষিতিমোহন সেন
প্রকাশক: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি
মূল্য: ১১০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সুবোধ কুমারের সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

– শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?

অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।

সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।

আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।

সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিংয়ের ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।

সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধ কুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।

আরও পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পারো না পারো, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”

বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।

এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”