ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রকল্পের অঙ্গ পতৌদি ট্রফির নাম বদল

আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির।

২০২২ সালে করোনা অতিমারীর চোটে স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপর পাঠ্যক্রমের ভার কমানোর দোহাই দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার অঙ্গ হিসাবে ধাপে ধাপে গত তিন বছরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) তাদের বিভিন্ন ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে মোগল যুগ একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফল কী? সারা দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অধীন স্কুল এবং বহু রাজ্যের বোর্ডের স্কুল এনসিইআরটি-র বই পড়ায়। সেইসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা মোগল সম্রাটদের শাসন সম্পর্কে জানবে না, তাঁদের ভাল কাজ মন্দ কাজ জানবে না। ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়ের ইতিহাসে মোগলদের অবদান সম্পর্কেও কিছু জানবে না। ঋজু বিদূষক বরুণ গ্রোভার সকৌতুকে বলেছেন, তাজমহল কারা বানিয়েছিল – এ প্রশ্নের উত্তর হল ‘ইউ পি পি ডব্লিউ ডি কে এক ইঞ্জিনিয়ার থে… শ্রীবাস্তব সাহব। উনহো নে বিজলি বিভাগ কা এক দফতর বনওয়ায়া থা, ইস লিয়ে মিনার হ্যাঁয়… চার সাইড পে চার মিনার হ্যাঁয়, উস সে চার ফেজ – এ বি সি ডি – নিকলতে হ্যাঁয়। আগ্রা কে চার হিসসোঁ মে বিজলি জাতি থি ইয়হাঁ সে। ১৫২৬ মে পানিপথ কি পহলি লড়াই মে ইব্রাহিম লোদী কো হরা কর ইন্ডিয়া মে শ্রীবাস্তব ডাইনেস্টি আয়ি থি। করীবন তিনসো সাল উনহো নে রাজ কিয়া, ফির ১৮৫৭ মে কুইন ভিক্টোরিয়া আঈ, শ্রীবাস্তব সাহব কো পকড়ি, মুহ দবাঈ, বোলি বিয়া হো গয়া তুমহারা? শ্রীবাস্তব সাহব কি থোড়ি ফট গঈ… বোলি কাঁপ কাহে রহে হো? শ্রীবাস্তব সাহব বোলে অচ্ছা ঠিক হ্যায়, হম নিকল লেতে হ্যাঁয়। আপ দেখ লো আপ কো জো করনা হ্যায়।’

এই কৌতুকের বাংলা তরজমা করার প্রয়োজন নেই, কারণ আজকের বাঙালি এটুকু হিন্দি জানে। কিন্তু একথা বলা এইজন্যে যে ভারতের ইতিহাস থেকে নিজেদের অপছন্দের পর্বগুলো মুছে দেওয়ার যে হাস্যকর কিন্তু ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতে চালু করেছে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, তা এবার স্কুলপাঠ্য বই থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছে ক্রিকেট মাঠেও। আপনি যদি বোকা বা ন্যাকা না হন, তাহলে অস্বীকার করবেন না যে বিশ্ব ক্রিকেটকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। জাতীয়তাবাদী হলে তো আপনি এ নিয়ে গর্বিতই হবেন। বিসিসিআই বহুদিন ধরেই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে টাকার জোরে, আর এখন তো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্পাদকই হয়ে বসেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস যা-ই থাক, এখন কিন্তু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের লেজুড় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের ঘাড়ে কটা মাথা, যে ভারতীয় বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ট্রফির নাম বদল করবে? ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের বিজয়ীকে দেয় ট্রফির নাম ২০০৭ সালে রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি। সে নাম বদলে ফেলা হয়েছে বেমালুম। ২০ জুন থেকে যে সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে জয়ী দলকে দেওয়া হবে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। এটাও ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা।

২০০৭ সালে কেন ট্রফির নাম রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি? কারণ সেবার ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরের ৭৫ বছর পূর্তি হল। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এমন একটা নাম রাখা হয়, যে নামের সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটই জড়িয়ে আছে। ইফতিকার আলি খান পতৌদি ভারত, ইংল্যান্ড – দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্বও করেছেন। ক্রিকেটার হিসাবে সাধারণ ছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর একটা কাজের অসাধারণত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন বডিলাইন কৌশল (লেগ সাইডে যত বেশি সম্ভব ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বল করে যাওয়া) অবলম্বন করেন ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে, তখন ইফতিকার বলেন যে ওটা ক্রিকেট নয় এবং তিনি লেগ সাইডে ফিল্ডিং করবেন না। ফলে অধিনায়ক জার্ডিন তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং কথিত আছে যে হুমকি দিয়েছিলেন, আর কোনোদিন ইফতিকার ইংল্যান্ড দলে জায়গা পাবেন না। ইফতিকার কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেননি। মনে রাখা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা তখন দূর অস্ত। ফলে আর কখনো টেস্ট খেলা হবে না – এ সম্ভাবনা জেনেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ক্রিকেট ইফতিকারের পেশা ছিল না। তাঁর মত ধনীর দুলালের টেস্ট না খেললে কী-ই বা এসে যেত? তাই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু পরাধীন দেশের একজন ক্রিকেটারের শাসক জাতির অধিনায়কের বিরুদ্ধে ওই অবস্থান যে ইংরেজদেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ আছে। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন একখানা টিভি মিনি সিরিজ নির্মাণ করে ওই বডিলাইন সিরিজ নিয়ে। সেখানে জার্ডিন আর ইফতিকারের ওই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। নয়ের দশকে দূরদর্শনে আমরা কেউ কেউ সেই সিরিজ খানিকটা দেখেছি। আজকের তরুণরা, যাঁরা মনে করেন যা নাই ইন্টারনেটে তা নাই ভুবনে – তাঁরা এই লিংকে ক্লিক করে দৃশ্যটা দেখে নিতে পারেন।

কিন্তু ইফতিকারের চেয়ে ক্রিকেটার এবং ভারত অধিনায়ক হিসাবে অনেক বড় ছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে অনেক মহত্তর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর ছেলে মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁরও ইংল্যান্ড, ভারত – দুই দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই সম্পর্ক। ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আর সাসেক্স কাউন্টির হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। মনসুর মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারত অধিনায়ক হন। তার আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিংয়ের অনেকখানি ক্ষতি হয়। ছেচল্লিশটা টেস্ট খেলে ছটা শতরান সমেত ৩৪.৯১ গড়ে ২৭৯৩ রান একজন সাধারণ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ব্যাট করতে দেখেছেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেছেন, লিখেছেন যে দুটো চোখই ঠিক থাকলে তিনি হয়ত বিশ্বের সেরা ব্যাটার হতে পারতেন। সেই আমলে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি যে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, সেকথা বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাওয়া যায়। ওসব না হয় বাদই দেওয়া গেল। এটুকুই যথেষ্ট যে মনসুর সেই অধিনায়ক যিনি ভারতকে প্রথমবার বিদেশে সিরিজ জেতান (নিউজিল্যান্ড, ১৯৬৭-৬৮)। বস্তুত ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান। বিদেশের মাঠে, যেখানে স্পিন সহায়ক পিচ হয় না, সেখানেও তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত তাঁরই। সেটাই ইতিহাস বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডের ওই ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন অফস্পিনার এরাপল্লি প্রসন্ন, সঙ্গে ছিলেন বিষাণ সিং বেদি। প্রবাদপ্রতিম বেদি কারোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার লোক ছিলেন না, কিন্তু তিনিও আজীবন বলেছেন, মনসুর তাঁদের সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে মনসুর ভারতীয়ত্ব জাগিয়ে তোলেন।

অর্থাৎ আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির। দুঃখের বিষয়, ভারতের সমাজের কোনো শাখাতেই সুঅভ্যাসগুলো বেশিদিন টেকে না। ফলে মনসুরের প্রস্থানের পর প্রাদেশিকতা, স্বজনপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফিরে এসেছিল। একুশ শতকের শুরুতে আবার সেসব দূর করে জাতীয় দলকে যথার্থ ভারতীয় দল করে তুলতে দেখা গিয়েছিল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। মনসুর আর সৌরভের যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য ছিল। স্বভাবতই অধিনায়ক সৌরভের সাফল্য অনেক বেশি। সৌরভের পরবর্তীকালের মহেন্দ্র সিং ধোনি বা বিরাট কোহলিরা আরও বেশি সফল হয়েছেন অধিনায়ক হিসাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিকড় ছাড়া গাছ হয় না; ইতিহাস ছাড়া মানুষ হয় না। ফলে টাইগার ছাড়া আজকের বিরাটও হয় না। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করা আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ামকদের পক্ষে অসম্ভব। ভারত নামক ‘একটি বিরাট হিয়া’ জাগিয়ে তুলতে মোগল শাসকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করা সংঘ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব, কারণ তাহলে ‘ভারত আসলে একটি হিন্দুরাষ্ট্র’ – এই তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, ভারতীয় ক্রিকেট আজ পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে যে চেহারা নিয়েছে তার শিকড় যে একজন মুসলমান অধিনায়ক – সেকথাও স্বীকার করা চলে না। হিন্দুরাষ্ট্রের জনতার আফিম যে ক্রিকেট, তা যে আদ্যোপান্ত হিন্দুদের হাতেই তৈরি – এমনটা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চলবে কেন? ইতিহাসে অন্য কিছু থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে।

টাইগার পতৌদিকে ব্যক্তি হিসাবেও অপছন্দ করার কারণ আছে সংঘ পরিবারের। তিনি বিয়ে করেছিলেন বাঙালি বামুনের মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরকে। তাঁদের ছেলে সঈফ দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বউ অমুসলমান। সংঘ পরিবারের আজকের লব্জে যাকে বলে ‘লভ জিহাদ’। টাইগার-শর্মিলার মেয়ে সোহার বর আবার কেবল হিন্দু নন, একেবারে কাশ্মীরী পণ্ডিত। কুণাল খেমুর জন্মও শ্রীনগরে। ভারতের সর্বত্র কাশ্মীরী পণ্ডিতদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেই মুসলমানরা কত খারাপ সেকথা প্রচার করে থাকে হিন্দুত্ববাদীরা, অথচ এই পরিবারের সকলে মিলে সব ধর্মীয় গোঁড়ামির বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। শর্মিলা, অমৃতা বা করিনাকে হিজাব বা বোরখা পরে ঘুরতে দেখা যায়নি। কুণালকেও সোহার সঙ্গে বিয়ের পর দাড়ি রেখে ফেজ পরে ঘুরতে দেখা যায় না। মুসলমানদের যে যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের সামনে তুলে ধরে ভয় দেখায় সংঘ পরিবার, তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত নস্যাৎ করে চলা পরিবারের নাম কী করে জড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এক নম্বর জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে? পারে না বলেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০১৩ সালে চালু হওয়া বার্ষিক পতৌদি স্মারক বক্তৃতাও বন্ধ করে দিয়েছে ২০২০ সালের পর থেকে।

লক্ষণীয়, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, এদেশের জনপরিসর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি মুছে দেওয়ার সযত্ন প্রচেষ্টা চলছে। বলিউডে ক্রমাগত মুসলমানবিরোধী, ইতিহাসবিকৃত, যুদ্ধবাজ ছবি বানানো হচ্ছে। উপরন্তু বলিউড শাসন করতেন যে তিন খান – তাঁদের বিরুদ্ধেও নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শাহরুখ খানের ছেলেকে অতি সামান্য অভিযোগে হাজতবাস করানো হয়েছে, সলমন খানকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছে, আমির খানের ছবি মুক্তি পাওয়ার সময় এলেই দক্ষিণপন্থী আই টি সেল বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর বাইরে মনসুর-শর্মিলার ছেলেকেও খুনের চেষ্টা হয়েছে কিছুদিন আগে।

এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিষ্ঠোতে দেওয়া হবে পতৌদি পিতা-পুত্রকে? কক্ষনো না। বরং থাকুন বাধ্য মারাঠি ব্রাহ্মণ তেন্ডুলকর, যিনি হাসিমুখে অযোধ্যার রামমন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকুন সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের একজন – জেমস অ্যান্ডারসন। তাহলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

যাঁদের এখনো ধারণা ক্রিকেট খেলা হয় শুধু মাঠের ভিতরে, এসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা নেহাত বাচালতা (অল্পবয়সীদের ভাষায় ‘ফেসবুকের কাকুদের হ্যাজ’), তাঁরা বলবেন শচীনের মত মহান ক্রিকেটারের নামে ট্রফির নাম রাখা হলে আপত্তির কী আছে? লোকটা টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান এবং শতরান করেছে। সে কি অযোগ্য? নাকি অ্যান্ডারসন অযোগ্য? তিনি তো জোরে বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন (৭০৪)। আজ্ঞে না, দুজনের কেউই অযোগ্য নন। সমস্যা অন্য জায়গায়। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বাবা-মায়ের ছেলে যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে বলে ‘বাড়িটা ওঁদের নামে থাকবে কেন? আমার যোগ্যতা বেশি, বাড়ি আমার নামে করে নেব’, তাহলে কি আমরা হাততালি দেব? অবশ্য আজকের ভারতে দেব হয়ত। কারণ এই ভারতের ইতিহাস তো ২০১৪ সাল থেকে শুরু। তার আগে ভারতীয়রা নাকি খুবই লজ্জা পেতেন নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসও শুরু করতে হবে ক্রিকেট নামক ধর্মের ভগবান শচীন থেকে।

তাই হোক, তবে তাই হোক। বরাবর কামনা করেছি, লালকৃষ্ণ আদবানি শতায়ু হোন। যাতে তাঁর রথযাত্রার চাকার নিচে গোটা দেশটার তলিয়ে যাওয়া তাঁকে দেখে যেতে হয়। এখন থেকে কামনা করব, শচীনও শতায়ু হোন। যাতে বছর দশেক পরেই তাঁকে দেখতে হয়, এই ট্রফির নাম বদলে হয়ে গেল কোহলি-রুট ট্রফি। তার বছর দশেক পরে হয়ত জয়সোয়াল-ব্রুক ট্রফি। তারপর আর টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকুক না থাকুক, শচীন আর বিরাট যেন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। পূর্বসুরিদের অস্বীকার করার অসম্মান যেন তাঁদেরও ভোগ করতে হয়। যে দেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের জীবনের দাম ফুটো পয়সার সমানও নয় আর ক্রিকেটাররা হয়ে গেছেন ভগবান, সেদেশে কোনো ভগবানই যে চিরায়ু নন – এই উপলব্ধি যেন তাঁদের ইহকালেই হয়।

আর দেশটার কী হবে? সেকথা বোধহয় জর্জ সান্তায়ানার এই উক্তিতে আছে ‘Those who cannot remember the past are condemned to repeat it.’ অর্থাৎ যারা ইতিহাস ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার অভিশাপে অভিশপ্ত।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

আমিষ খান বলে গাঙ্গুলি জেঠিমা, ঘোষ কাকুও দেশের মানুষ নন?

এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

প্রধানমন্ত্রী সমীপেষু,

আপনাকে যা লিখছি তার অনেকটাই ব্যক্তিগত। কারণ রাজনীতিটাকে একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে এসেছেন আপনিই। মানে গত শুক্রবার (১২ এপ্রিল, ২০২৪) উধমপুরে আপনার বক্তৃতা শোনার আগে পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসকে তো আমরা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই জানতাম। একথা ঠিক যে ২০১৫ সালেই আমরা জেনে গেছিলাম, বাড়ির ফ্রিজে কিসের মাংস রাখা আছে তা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। তার জন্য একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু তখন আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম এই ভেবে যে একমাত্র গরুর মাংসই মৃত্যুর কারণ হতে পারে, অন্যান্য প্রাণির মাংস বা মাছ খাওয়া নিয়ে কেউ কিছু বলবে না। আমরা অনেকে একথা ভেবেও নিশ্চিন্ত ছিলাম যে ওসব কিছু গুন্ডা বদমাইশের কাজ। সরকার কে কী খেল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, আর সমাজবিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে তো আইন আদালত আছেই। গত নয় বছরে অবশ্য আমরা বুঝে গেছি যে গোমাংস খাওয়া, বিক্রি করা বা গোমাংস হয়ে ওঠার জন্য গরু নিয়ে যাওয়ার সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা তেমন গুরুতর অপরাধ নয়। দিব্যি জামিন পাওয়া যায়, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াও এ দেশের অন্যান্য অপরাধের মতই অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। তবু আমাদের মধ্যে যারা গরুর মাংস খায় না তারা নিশ্চিন্ত ছিল। ও জিনিস তো এমনিই আমাদের খাওয়া বারণ। ‘প্রগতিশীল সাজতে’ না খেলেই কোনো অশান্তি নেই, কারোর আক্রমণের মুখে পড়তে হবে না। থানা পুলিস কোর্ট কাছারিহীন নিশ্চিন্ত জীবন কাটিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু শুক্রবার নির্বাচনের প্রচারে আপনি যা বলেছেন তাতে তো নিশ্চিন্তে আর থাকা যাচ্ছে না।

ব্যক্তিগত বিশ্বাস যা-ই হোক, কলার তুলে যে পরিচয়ই দিই না কেন, জন্মসূত্রে আমরা যারা হিন্দু, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু, তাদের তো আর নিশ্চিন্তে থাকার উপায় রইল না।

আইনে কিছু খাওয়া বারণ নেই, আপনিও কাউকে কিছু বারণ করেন না। কিন্তু শ্রাবণ মাসে যারা খাসির মাংস রান্না করে তার ভিডিও প্রচার করে – তারা দেশের মানুষকে আঘাত করে। তাদের আসল উদ্দেশ্যই নাকি দেশের মানুষকে আঘাত করা, মোগলদের মত। মোগলরা ভারত আক্রমণ করে এখানকার রাজাদের হারিয়েই সন্তুষ্ট হত না, মন্দির ভেঙে দিয়ে, ধর্মস্থান নষ্ট করে তবে তারা শান্তি পেত। ‘মাটন’ খাওয়া লোকেরাও সেইরকম। তারা দেশের লোককে উত্যক্ত করতেই চায় এবং নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক পাকা করতে চায়। এও বলেছেন যে ব্যাপারটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই আপনার দায়িত্ব এসব নিয়ে কথা বলা।

এরপর আর নিশ্চিন্ত থাকা যায়?

প্রথমত, আমি আমিষ রান্না করছি তার গন্ধেও নয়, স্রেফ ছবিতেই যদি কারোর মনে আঘাত লাগে, তাহলে তো ও জিনিস রান্না করাই বন্ধ করে দিতে হবে। নয়ত মাদক দ্রব্যের মত লুকিয়ে খেতে হবে। কারণ যার মনে আঘাত লাগবে সে যে দল পাকিয়ে এসে আমাকেও আখলাক আহমেদ বা পেহলু খান করে দেবে না তার গ্যারান্টি তো ‘মোদী কি গ্যারান্টি’-র মধ্যে পড়ে না দেখছি। তারপর কে কোন মাসে আমিষ খায় না তা ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখতে হবে। বাঙালি হিন্দুরা শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না, আপনি যে সময়টাকে নবরাত্রি বলেন তখন তো মোটেই নিরামিষ খায় না। অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুর ধর্মাচারে তেমন কিছু বলাই নেই। তবে অনেকে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন নিরামিষ খায় আর পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসে আমিষ গন্ধ। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কোনোদিন ঝগড়া করতে যায় না। আমি আজ নিরামিষ খাচ্ছি, তাই তোমাকেও নিরামিষ খেতে হবে – এমন দাবি বাঙালি হিন্দুরা কখনো করেনি। কিন্তু আজকাল বাঙালি পাড়া বলে আলাদা করে কিছু থাকছে না পশ্চিমবঙ্গের শহর আর শহর ঘেঁষা মফস্বলে। থাকা যে উচিত তাও নয়। সবাই সর্বত্র সম্পত্তি ভাড়া নেবে বা কিনবে – তবেই না দেশ সবার। সেইজন্যেই তো কাশ্মীরের জন্যে সংবিধানে থাকা ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করিয়েছেন আপনি। তা এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই এসে পড়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। দেশের মানুষ বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন? কেবল যারা শ্রাবণ মাসে বা সারাবছর নিরামিষ খায় তারাই দেশের মানুষ? বাকি সবাই বাইরের লোক? তাহলে কি দেশব্যাপী এনআরসি করার সময়ে এও খতিয়ে দেখা হবে যে কে কে আমিষ খায়? তারপর কেবল নিরামিষাশীরাই পাবে নাগরিকের তকমা? মোগলদের মন্দির ভাঙার সঙ্গে আমিষ রান্নার যে প্রতিতুলনা আপনি করেছেন তা-ই বা কী করে নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়? প্রথম মোগল সম্রাট বাবর যখন ভারতে এসে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তখন দিল্লির মসনদে কোনো হিন্দু রাজা ছিলেন না, ছিলেন পাঠান ইব্রাহিম লোদী। তিনিও মুসলমান। সুতরাং তাঁকে হারিয়ে মন্দির ভেঙে তবেই সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। মন্দির ভাঙলে লোদীর কী? কিন্তু সেকথা থাক। ধরে নিলাম আপনি পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের হাতে মন্দির ধ্বংসের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ইতিহাস তো আপনার বিষয় নয়, আপনার বিষয় হল ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’। সুতরাং ওটুকু বাদ দিলাম। কিন্তু কথা হল, আপনি কি বলতে চেয়েছেন লালুপ্রসাদ আর রাহুল গান্ধীর মত যারা শ্রাবণ মাসে আমিষ খায় তারা এ দেশের মানুষ নয়?

আপনার সাঙ্গোপাঙ্গরা অনেকেই আগে বলেছে বাঙালির মাছ খাওয়ার অভ্যেসটা মোটেই ভদ্রজনোচিত নয়। ২০১৭ সালে হঠাৎ ‘অল ইন্ডিয়া ফিশ প্রোটেকশন কমিটি’ নামে এক সংগঠনের উদয় হয় সোশাল মিডিয়ায়। তারা বলতে থাকে যে বিষ্ণু যেহেতু মৎস্যাবতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন একবার, সেহেতু মাছ খাওয়া মানে ভগবানকেই উদরস্থ করা। অতএব মাছ খাওয়া অনুচিত কাজ। আপনার দলের নেতা পরেশ রাওয়াল ২০২২ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন ‘গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আবার কমে যাবে, মুদ্রাস্ফীতিও উপর-নিচ হবে, লোকে চাকরিও পেয়ে যাবে। কিন্তু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আর বাংলাদেশিরা আপনার পাশে এসে থাকতে শুরু করলে কী করবেন, যেমন দিল্লিতে থাকে? গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কী করবেন? আগে বাঙালিদের জন্যে মাছ রান্না করবেন?’ সত্যি বলছি, মোদীজি। তখনো আমরা অনেকে ভেবেছিলাম বিপদ যা হবে রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিদেরই হবে। অনেকেরই মাথায় ঢোকেনি যে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির খাওয়াদাওয়ায় খুব তফাত নেই। পোশাক দেখে বা মুখের ভাষা শুনেও আলাদা করে চেনা শক্ত। এখন আপনি স্বয়ং মাছ মাংস যারা রান্না করে, খায় তাদের বিরুদ্ধে কামান দাগলে ভয় না পেয়ে উপায় কী?

ভুল বুঝবেন না। মুসলমান, খ্রিস্টান, আদিবাসীদের কী হবে তা নিয়ে ভাবছি না। ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিনই তো আপনি বলে দিয়েছেন যে নতুন যুগের সূচনা হল। এই যুগে হিন্দু বাদে অন্য ধর্মের লোকেদের তো তা-ই খেতে হবে যা হিন্দুরা খায়। যা হিন্দুরা খায় না তা খাওয়া যে চলবে না সে আর বলতে? কিন্তু আপনার শুক্রবারের ভাষণ শুনে আশঙ্কা হচ্ছে অনেক হিন্দুও যে মাছ মাংস কবজি ডুবিয়ে খায় তা আপনি জানেন না। আপনার দোষ নয়। হয়ত দিলীপবাবু, সুকান্তবাবু, অগ্নিমিত্রা দেবীরা আপনাকে বলেননি। তাই ভাবলাম একটু জানিয়ে দিই। আর পাঁচজনের কথা তো বলতে পারি না, নিজের কথাই বলি। ওই যে বললাম – ব্যাপারটা ব্যক্তিগত।

আমার ছোটবেলায় স্কুলমাস্টারদের মাইনে লোককে বলার মত ছিল না বলে বাড়িতে মাছ প্রতিদিন হত না। মাংস হত বাবার মাইনে পাওয়ার সপ্তাহে। বাড়িতে টেলিফোন থাকার প্রশ্নই নেই। তাই সুদূর বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে আমার বড়মামা এসে পড়তেন বিনা নোটিসে। পোস্টকার্ড লিখতেন, কিন্তু সেটা সাধারণত এসে পৌঁছত মামা ফিরে যাওয়ার পরে। একাধিকবার তিনি এসে পড়েছেন সরস্বতীপুজোর দিন বেশ রাতে। সেদিন হয়ত আমাদের মেনু – ডাল আর আলুসেদ্ধ। কিন্তু দাদাকে তাই খাওয়ালে স্বামীর মান থাকে না। তখন কী করতেন আমার মা? টুক করে পিছনের উঠোন পেরিয়ে চলে যেতেন গাঙ্গুলিজেঠুর বাড়ি। তাঁর বাড়িতে প্রতিবার বড় করে সরস্বতীপুজো হত আর সে পুজোর ভোগে খিচুড়ির সঙ্গে থাকত জোড়া ইলিশ। জেঠু নিজে হাতে রাঁধতেন। আমার মা গাঙ্গুলি জেঠিমার সঙ্গে গোপন আঁতাতে দু টুকরো ইলিশ আর একটু ঝোল নিয়ে আসতেন, বাবার মান বেঁচে যেত। গাঙ্গুলি বোঝেন তো? গঙ্গোপাধ্যায় – খাঁটি বামুন। অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের বিশেষ পরিচিত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা আপনার দলের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায় যেমন। আমার সেই পাড়ার জেঠু গলার পৈতেটা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতেন।

আরও পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

সেইসময় বাড়িতে মাংস হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হত মুরগির মাংস, কারণ লালুপ্রসাদ যে মাংস রান্না করছিলেন দেখে আপনি চটেছেন, তার দাম আরও বেশি। বসে থাকতাম শীতলাপুজোর অপেক্ষায়। কারণ আমাদের অঞ্চলের একটা বাড়ির নামই শীতলা বাড়ি। সে বাড়িতে প্রতিবছর ঘটা করে শীতলাপুজো হত। সে পুজোর ভোগই পাঁঠার মাংস। আমাদের নেমন্তন্ন থাকত, ফলে মাটির ভাঁড়ে চার-পাঁচ টুকরো মাংস জুটে যেত। বিশ্বাস করুন, সে বাড়ির লোকেরাও হিন্দু। পদবি সম্ভবত ঘোষ। আপনার দলের বর্ধমান দুর্গাপুর কেন্দ্রের প্রার্থী দিলীপবাবুর মত আর কি।

আর নিরামিষাশী বাঙালি হিন্দুর কথা শুনবেন? আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় রাঁধতে পারতেন না, আমিও তখন ছোট। মা গুরুতর অসুস্থ হলেন। সে কদিন দুবেলা রেঁধে বেড়ে আমাদের খাওয়াতেন মণ্ডল কাকিমা। নিজের রান্নাঘরে নিজের বাসনকোসনে রেঁধে ভাত, ডাল, তরকারি দিয়ে যেতেন আর দুবেলাই মুখ শুকনো করে আমার বাবাকে বলতেন ‘দাদা, আপনাদের খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে, না? আমি তো মাছ খাওয়াতে পারছি না।’ বাবা জবাবে বলতেন ‘ছি ছি! আপনি রেঁধে দিচ্ছেন বলে খাওয়া হচ্ছে, বৌদি। মাছ খাচ্ছি না তো কী হয়েছে? এ বাড়িতে এমনিতেও রোজ মাছ হয় না।’ কাকিমা মাছ খাওয়াতে পারতেন না কারণ ওঁরা অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। শুধু বাড়িতে আমিষ রান্না হত না তা নয়, কাকিমার দুই ছেলের বিয়েতেও নিমন্ত্রিতদের নিরামিষই খাওয়ানো হয়েছিল। পাড়ায় অমন পরিবার ওই একখানাই। অথচ কোনোদিন তাঁদের মনে আঘাত লাগেনি আর সব বাড়িতে আমিষ রান্না হওয়ায়। মণ্ডল মানে বুঝলেন তো? হিন্দু কিন্তু। আপনার দলের হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডলের মত।

বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদিতে কোন কোন মাংস খাওয়ার কথা লেখা আছে সেসব আলোচনায় আর গেলাম না মোদীজি। আপনি সাধু সন্ন্যাসী পরিবৃত হয়ে থাকেন, সেসব কি আর আপনার অজানা? শুধু শেষে আপনাকে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে আমাদের রেল বাজারের সবজির দরগুলো জানিয়ে দিই। একটু দেখে বলবেন, শেষমেশ যদি এ দেশে থাকতে গেলে আমিষ ছেড়েই দিতে হয়, এত দাম দিয়ে কিনে খেতে পারবে কজন? আপনি তো সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। করলেও আমার মত চুনোপুঁটির সেখানে জায়গা হত না। তাই হাটখোলা চিঠিতেই এত কথা বলতে হল। অপরাধ নেবেন না।

ঝিঙে ১০০/- কেজি
পটল ৮০/- কেজি
বেগুন ৮০/- কেজি
উচ্ছে ৮০/- কেজি
ঢ্যাঁড়স ৭০/- কেজি
পেঁপে ৬০/- কেজি
লাউ ৪০/- কেজি
সজনে ডাঁটা ৮০/- কেজি
শশা ৮০/- কেজি
টমেটো ৩০/- কেজি
বিট, গাজর ৫০/- কেজি
বিন ৮০/- কেজি
ক্যাপসিকাম ১০০/- কেজি
লঙ্কা ১০০/- কেজি
কুমড়ো ৩০/- কেজি
চিচিঙ্গা ৮০/- কেজি
মিষ্টি আলু ৬০/- কেজি
কাঁচকলা ১৫/- জোড়া
চালকুমড়ো ৬০/- কেজি

ইতি

একজন আমিষাশী হিন্দু সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

দুঃসময়ের পাঠ: ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা

ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়।

এমন দেশ বা জাতি নাই, যাহাতে ভগবান তাহাদের জন্য কোনো ধর্মগুরুকে পাঠান নাই।

হিন্দুস্থান কে দো পয়গম্বর, রাম ঔর কৃষ্ণ।

হিন্দুদের কোনো ধর্মগ্রন্থে আছে কথাগুলো? নাকি কোনো হিন্দু ধর্মগুরু বলেছেন?

কোনোটাই নয়। প্রথম বাক্যটা আছে কোরান শরীফে, আর ওই বাক্যকে আশ্রয় করেই দ্বিতীয় বাক্যটা উচ্চারণ করেছিলেন নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দরগার হাফিজ হুসেন নিজামী।

উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষিত হিন্দুদের আড্ডাতেও বারবারই উঠে আসে একটা কথা – হিন্দুধর্ম অনেক উদার, ইসলামে কড়াকড়ি অনেক বেশি। তাই মুসলমানদের অনেকে উদার হলেও, ওদের মধ্যে গোঁড়ামি বেশি। হিন্দু পরিবারে জন্মে একথা বারবার শুনতে শুনতে দুরকম প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব। এক, বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যাওয়া যে কথাটা ঠিক। দুই, কথাটা ঠিক কিনা খুঁজে দেখার ইচ্ছা তৈরি হওয়া। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া হলেও ব্যাপারটা নেহাত সহজ নয়। হিন্দুধর্মের কোনো একমেবাদ্বিতীয়ম পবিত্র গ্রন্থ নেই, আব্রাহামের সন্তানদের ধর্মগুলোর (জুডাইজম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম) ক্ষেত্রে সে সুবিধা আছে। কিন্তু কেবল কোরান পড়লেই ইসলামের সব জানা হয়ে যায় না (এবং হাদিশ পড়লেও নয়), কেবল বাইবেল পড়লেই খ্রিস্টধর্মের আদ্যোপান্ত আয়ত্ত হয় না। পৃথিবীর যে কোনো ধর্মের আগাপাশতলা জানতে পড়তে হয় প্রচুর বইপত্র, লেগে যায় গোটা জীবন। আমাদের অনেকের জীবনেরই আর বড়জোর অর্ধেক বাকি আছে। তাহলে আজকের সর্বগ্রাসী বিদ্বেষ, ভুয়ো ইতিহাস, ভুয়ো খবরের যুগে সত্য যাচাইয়ের উপায় কী? ভারতের প্রধান দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায় – হিন্দু আর মুসলমান। তাদের মধ্যে সংঘাতের যে অনস্বীকার্য দীর্ঘ ইতিহাস, তার মূল একেবারে ভাবনার জায়গাতেই কিনা, তা জানার উপায় কী? পাঠ্য ইতিহাসে যেটুকু পড়েছিলাম আমরা, সেটুকু তো পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়ার জন্যে মুখস্থ করা। ফলে পরীক্ষা দেওয়ার পাট চুকে যাওয়া মাত্রই বেমালুম ভুলে গেছি। এমতাবস্থায় আমার মত অপণ্ডিতদের একটাই উপায় – যাঁরা আজীবন এই প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাঁদের শরণাপন্ন হওয়া। ক্ষিতিমোহন সেন তেমনই একজন। তাঁর ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইটার নাম শুনেছি অনেক, কিন্তু চোখে দেখিনি আগে। যাঁদের লেখায় এই বইয়ের উল্লেখ পেয়েছি তাঁরা অনেক দূরের মানুষ। ফলে ধারণা ছিল, নির্ঘাত ওটা ইয়া মোটা একখানা বই এবং অমন একজন পণ্ডিতের লেখা যখন, তখন পড়তে গেলে মাথা চুলকেই দিন কেটে যাবে। ফলে এবারের কলকাতা বইমেলায় যখন ন্যাশনাল বুক এজেন্সির স্টলে ঢুকে আবিষ্কার করলাম বইটা দু আঙুলেই তুলে ফেলা যায়, পাতার সংখ্যা মাত্র ১১১, তখন কিনে ফেলতে দেরি করিনি।

পড়লাম, মনের অনেক অন্ধকার দূর হল। কিন্তু এত প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের আলোচনা আমার লেখা উচিত হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। দ্বিধা কাটল এই বইয়ের প্রকাশকালের সঙ্গে আমার কালের মিল উপলব্ধি করে। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারত দ্বিখণ্ডিত এবং স্বাধীন হয়, ১৯৪৮ সালে নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হন মহাত্মা গান্ধী আর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারত হিন্দুরাষ্ট্র না হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গ্রহণ করে। সেবছরই প্রকাশিত হয় এই বই। বস্তুত, পরিশিষ্টের ‘মহাবীর ভীষ্ম’ শীর্ষক লেখার উপরে ছোট অক্ষরে লেখা আছে:

মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ পাইবার অব্যবহিত পরে লেখা। যে ছাত্রটি দুঃসংবাদ বহন করিয়া লেখককে সঙ্গে করিয়া আশ্রম-কেন্দ্র, গৌর-প্রাঙ্গণে লইয়া গিয়াছিলেন, অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে তিনিও এক উন্মত্ত আততায়ী দলের হস্তে নিহত হন। ছাত্রটি তখন দূর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত অধ্যাপক।

লক্ষ করে দেখলাম, সেইসময় দাঁড়িয়ে লেখা এই বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত প্রায় সবটাই আমার সময়ে উদ্ধৃতিযোগ্য। অতএব যোগ্যতর আলোচকের সন্ধানে কালক্ষেপ না করে লিখে ফেলাই কর্তব্য। এই লেখার লক্ষ্য আমার মত ইতিহাসে অদীক্ষিত পাঠকরা – ইতিহাসবোধহীন জীবনযাপন যাদের জীবনকে ক্রমশ বিপদসংকুল করে তুলছে – তাদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বইয়ের সন্ধান দেওয়া, বইটা পড়তে উস্কানি দেওয়া।

এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত লাইনগুলো ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমানদের গোঁড়ামি সম্পর্কে বদ্ধমূল ধারণার পরিপন্থী। তবে ক্ষিতিমোহনের বইয়ের ঠিক ওই পাতাতেই আছে আরও কয়েকটি বাক্য, যা ওই ধারণার মূল ধরেই টান দেয়:

কুরান আরও বলেন, হজরতের পূর্বে যেসব মহাপুরুষ ধর্ম সম্বন্ধে যাহা কিছু উপদেশ দিয়া গিয়াছেন সেইসব সত্যও বিশ্বাস করিতে হইবে।

পূর্ববর্তী সব সত্যকে আরও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করাই কুরানের কাজ।

ওই অধ্যায়েই কিছু পরে ক্ষিতিমোহন লিখছেন:

নানাজনে কুরানকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ব্যাখ্যাতাদের ইমাম বলে। এই ব্যাখ্যানে হজরত প্রত্যেককেই প্রভূত স্বাধীনতা দিয়াছেন। তাঁহার নিজেরই কথা আছে যে, তাঁহার ধর্মে নানা যুক্তি অনুসারে তিয়াত্তরটি দল হইবে। তিনি বলিয়াছেন, আমার দলে যে মতের ভেদ হয় তাহা ভগবানেরই দয়া – ইখতিলাফু উম্মতি রহমতুন।

যে ধর্মগ্রন্থে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার জন্মেরও আগে অন্য যাঁরা যা উপদেশ দিয়েছেন তাও বিশ্বাস করতে বলা হয় এবং যে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই মতভেদকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে আখ্যা দেন, সেই ধর্মে মৌলিকভাবেই কড়াকড়ি বা গোঁড়ামি বেশি – এমনটা যে কেবল অজ্ঞানতাবশতই বলা সম্ভব তাতে সন্দেহ কী? তবে একথা অনস্বীকার্য যে কোনো ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে তা দিয়ে মানুষের – বিশেষ করে অন্য ধর্মের মানুষের – খুব একটা কিছু এসে যায় না। এসে যায় সেই ধর্মের মানুষ কীভাবে ধর্মপালন করছেন তা দিয়ে। অনেকে এই যুক্তিতেই বলবেন, কোরানে যা-ই বলা থাক আর হজরত মহম্মদ যা-ই বলে থাকুন, বাস্তবে দেখা যায় মুসলমানরা অন্য ধর্ম সম্পর্কে মোটেই সহিষ্ণু নয়। ধর্মাচরণে মোটেই উদার নয়। একথাও যে সত্য নয়, ভারতবর্ষীয় মুসলমানদের ধর্মাচরণ যে যুগে যুগে এর উল্টোটাই প্রমাণ করেছে, তা এই বই পড়লে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য কিছুটা উদারতা দেখিয়ে বলে থাকেন – ভারতীয় মুসলমানরা পৃথিবীতে অনন্য। এখানে বিশেষত সুফিদের উদ্যোগে হিন্দু-মুসলমানের সাধনা মিলেমিশে যাওয়ায় তাঁরা উদার। কিন্তু আরব মুসলমানরা এরকম নয়। এই মতেরও মূলে আছে অজ্ঞানতা। যেন সুফিবাদ আকাশ থেকে টুপ করে ভারতেই পড়েছিল। ক্ষিতিমোহন ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে একের পর এক সাধকের উল্লেখ করে তাঁদের উদারতা দেখিয়েছেন। তার মধ্যে যাঁর কথা উদার, অনুদার নির্বিশেষে হিন্দুদের সবচেয়ে চমৎকৃত করবে এবং গোঁড়া মুসলমানদের রুষ্ট করবে, তাঁর দৃষ্টান্তই নেওয়া যাক। তাঁর নাম অবু অল আলা মু-অররীর। ইনি মোটেই ভারতীয় নন। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোতে এঁর জন্ম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন তিনি বলতেন

পৌত্তলিকতা ছাড়িয়াছ বলিয়া তো গর্ব কর। ভাবিয়া দেখিয়াছ কি, তুমি নিজে কত বড়ো পৌত্তলিক? বিশেষ-শাস্ত্র বিশেষ-গ্রন্থ বিশেষ-ভাষা বিশেষ-দেশ বিশেষ-দিন ও বিশেষ-দিককেই যদি একমাত্র পবিত্র মানো তবে তাহাও তো পৌত্তলিকতা। দেবপূজা ছাড়িয়া দেবালয় অর্থাৎ মসজিদেরই পূজা যদি কর তবেই বা কম পৌত্তলিকতা কি?

এ পর্যন্ত এসে পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, ক্ষিতিমোহন কি বেছে বেছে মুসলমানদের উদারতার দৃষ্টান্তই তুলে ধরেছেন? নাকি আমিই তাঁর বই থেকে বেছে বেছে সেগুলো তুলে ধরছি? সম্ভবত এমন প্রশ্নের মোকাবিলা ক্ষিতিমোহনকেও করতে হত। তাই ‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে তিনি লিখছেন

হিন্দু-মুসলমান সাধনা এদেশে এমন যুক্ত হইয়া গিয়াছে যে রচনা দেখিয়া লেখক হিন্দু কি মুসলমান তাহা বলা অসম্ভব। দরাফ খাঁর রচিত সংস্কৃত গঙ্গাস্তব তো অতি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরও নিত্যপাঠ্য।

আবার তুলসী সাহেব হাথরসীর জন্ম ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বেদপরায়ণ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বংশে। যৌবনেই তিনি সন্ন্যাসী হইয়া যান। তাঁহার লেখা দেখিয়া মনে হয় যেন মুসলমানেরই লেখা। একটু নমুনা দেওয়া যাউক:

রোজা নিমাজ বাংগ অংদর মাহীঁ
আশীক মাশূক মিহর দিদা সাঈঁ।।

রোজা, নামাজ, নামাজের জন্য ডাক সবই অন্তরের মধ্যে। প্রেমিক, প্রেমাস্পদ, প্রেম, প্রেমময় স্বামীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ সবই আমাদের ভিতরে।

‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে ক্ষিতিমোহন এক নাতিদীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন, যা হিন্দুদের উদারতার তালিকা না মুসলমানদের উদারতার তালিকা তা বলা মুশকিল। গুজরাটের খোজা কাকাপন্থী ইমামশাহী মৌল-ইসলাম মতিয়া সংঘ; রাজপুতানার মেও, মিরাশি, লবানা, সখীসরবরের উপাসকদের কথা লিখেছেন। এঁদের বৈশিষ্ট্য হল এঁরা পুরোপুরি হিন্দু হয়েও মুসলমানি সাধনার সঙ্গে যুক্ত। এঁদের বাড়িতে নানা হিন্দু আচার, রামনবমী, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি পালিত হয়। সামসী সম্প্রদায়ের লোকেরা গীতাও মানেন, মুসলমান গুরুদেরও মানেন। রসুলসাহীরা তান্ত্রিক যোগসাধন করেন। গঞ্জামের আরুবারা, তৈলঙ্গের কাটিকরাও এইরকম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন, বোহরারা একদা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেক ব্রাহ্মণসুলভ আচার বিচার রয়ে গেছে। ডফালী, ঘোসীরাও আধা হিন্দু, আধা মুসলমান। এই জাতীয় ব্রাহ্মণদের বলা হয় হুসেনী ব্রাহ্মণ। এঁরা পাণ্ডার কাজ করেন। কোনো মন্দিরে নয়, আজমীরে মৈনুদ্দীন চিশতীর দরগায়। কাশীর ভর্তরীরা আবার যোগী। রীতিমত গেরুয়া ধারণ করেন, হিন্দু আচার পালন করেন। অন্তত ক্ষিতিমোহনের সময়ে হিন্দুদের ক্রিয়াকর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল তাঁদের গান। অথচ ভর্তরীদের গুরু মুসলমান।

হিন্দুধর্ম বলতে যাঁরা উঁচু পাঁচিল দেওয়া একটা নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড জাতীয় জিনিসকে বোঝেন, ‘হিন্দুধর্মে উদারতার বাণী’ অধ্যায়ের প্রথম দুটো অনুচ্ছেদে বলা কথাগুলো তাঁদের কতটা পছন্দ হবে তা বলা শক্ত:

ধর্ম সম্বন্ধে ভারতের ইতিহাস একটু বিচিত্র। যাহা বৈদিকধর্ম তাহাই যে ঠিক হিন্দুধর্ম এ কথা সত্য নহে। প্রাচীনকাল হইতেই এদেশে অবৈদিক বহু সংস্কৃতি ও ধর্ম ছিল। সেইসব অবলম্বন করিয়াই হিন্দুধর্ম। বৈদিকধর্ম কর্মকাণ্ড প্রধান, দ্রাবিড়ধর্ম ভক্তিপ্রধান। এইসব নানা সংস্কৃতির ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পলিমাটির স্তর পড়িয়া ভারতের ধর্মভূমি গড়িয়া উঠিয়াছে…

শৈব ও বৈষ্ণব প্রভৃতি ভাগবতধর্মে বৈদিক কর্মকাণ্ড বিশেষ কিছুই নাই। বেদ তিন ভাগে বিভক্ত, কর্মকাণ্ড, উপাসনাকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড, যে অংশে যজ্ঞাদি কর্মের বিধান আছে তাহা কর্মকাণ্ড। ভাগবতধর্মের প্রাণই হইল প্রেম ভক্তি ও পূজা। বাহির হইতে আগত গ্রিক হুণ শক প্রভৃতির দল বৈদিক দলে ঢুকিতে না পারিলেও ভক্তিপ্রধান ভাগবতধর্মে সকলে সাদরে গৃহীত হইয়াছেন।

অন্তত বেদকে যে অভিন্ন, অভ্রান্ত একটা জিনিস বলে ভাবব তারও জো নেই। ক্ষিতিমোহন লিখেছেন বেদ আর্য সাধনার প্রাচীনতম ভাণ্ডার, কিন্তু একই কালের বা একই দলের জিনিস নয়। বেদে বেদেও বিরোধ ছিল। মোটামুটি ঋগ্বেদই প্রাচীনতম, সামবেদ ও সামগান তুলনায় নতুন। মজার কথা

এই সামবেদকেও একদিন ঋগ্বেদ সহিতে পারে নাই। সামবেদ-গান ঋগ্বেদীয়দের কানে পেচক-শৃগাল-কুকুর-গাধার ডাকের মতোই মনে হইত।

‘সংগীত’ নামের এই অধ্যায়ে ভাগবত মুনিদের যুগের কথা এসেছে একটু পরেই। সেখানেও দেখা যায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরেই মুনিদের মধ্যে মতভেদ। ক্ষিতিমোহনের ভাষায়

এখনকার দিনেও রাজনীতিতে দেখা যায় কোনো একটা দল শক্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিলে তখন নানা দল দেখা দেয়। তখনকার দিনেও দেখা যায় সংগীতে ভাগবত-মত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে নানা মতবাদ চলিল। এমন একজন মুনি নাই যাঁহার সঙ্গে অন্যের মতভেদ না আছে।

নাসৌ মুনির্যস্য মতং ন ভিন্নম্।।

সংগীতের প্রসঙ্গেই ফিরে আসা যাক বাস্তবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কেমন আচরণ করেন সে প্রশ্নে। এই বইয়ের লেখক যেন পাঠক পড়তে পড়তে কী ভাববেন তা আগে থেকেই জানতেন। মনে প্রশ্ন ওঠামাত্রই দেখা যায় তার উত্তর হাজির

একটা কথাতে বড়োই বিস্ময় লাগে। সংগীতকলা মুসলমানশাস্ত্রে নিষিদ্ধ। অথচ বড়ো বড়ো ওস্তাদেরা তো প্রায় সকলেই মুসলমান। মুসলমানশাস্ত্রে যাহাই থাকুক মুসলমান-তীর্থে তো সংগীত খুবই প্রচলিত। আজমীরে মৈনউদ্দীন চিশতীর দরগা হইল ভারতে মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ। সেখানে মূল তোরণে প্রহরে প্রহরে নহবত বাজে। ভিতরে প্রত্যেক পবিত্র স্থানে গায়ক-গায়িকারা যাত্রীদের পুণ্যার্থ সংগীত করেন ও যাত্রীরা তাহার জন্য রীতিমত দক্ষিণা দেন।

স্বভাবতই কাশীর মন্দিরে মন্দিরে মুসলমান বাদকদের সানাই ও নহবতের কথা এসেছে। নাকাড়ার বহু গৎ যে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সেকথাও এসেছে। ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের বাজনা থেকে বিভিন্ন রাগ সৃষ্টি – সবেতেই যে মুসলমানদের বিপুল অবদান সেকথা সঙ্গীতপ্রেমী মাত্রেই জানেন। ক্ষিতিমোহন প্রত্যেকটা উদাহরণ সবিস্তারে লিখেছেন। ব্যাপারটা যে শুধু আমির খুসরো আর তানসেনের অবদানে শেষ নয়, আমাদের কালের ওস্তাদ বিসমিল্লা খানের সরস্বতীর প্রতি ভক্তি যে আকাশ থেকে পড়েনি এবং তাঁর বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে তাকে মুছে দেওয়াও যাবে না – তা স্পষ্ট হয় এই অধ্যায়ে। তবে চমকে দেওয়ার মত তথ্য এগুলো নয়। চমকে উঠতে হয় যখন ক্ষিতিমোহন ঔরঙ্গজেবের সঙ্গীতপ্রীতির আলোচনায় আসেন। সেই ঔরঙ্গজেব, যিনি প্রায় সব মতের ঐতিহাসিকদের ভাষ্যেই অত্যন্ত গোঁড়া মুসলমান এবং হিন্দুদের উপর দমনপীড়নের সবচেয়ে বড় প্রতিভূ।

লেখক বলছেন ঔরঙ্গজেব হিন্দি গীত-কবিতার অনুরাগী ছিলেন, তাঁর দরবারে বড় বড় গায়কও ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের জন্মদিনে নতুন ধ্রুপদ এবং খেয়াল রচিত হত। সেসব গান সুরক্ষিত আছে এবং ছাপার অক্ষরে প্রকাশিতও হয়েছে। রাগ টোড়ীতে রচিত এরকম একটা গানে আছে

অকবর সুত জহাঁগীর তাকে শাহজহাঁ
তাকো সুত ঔরংগজেব ভয়ো হৈ ভুর পর।

এরকম আরও অনেকগুলো গানের দৃষ্টান্ত কলাবতী-গীতসংগ্রহে পেয়েছেন বলে ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ঔরঙ্গজেবের দরবারে গীত-কবি হিসাবে ব্রাহ্মণবংশীয় আলম পণ্ডিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশশানকে যখন ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় শাসক হিসাবে, তখন তিনি প্রবাসের দুঃখ দূর করতে কবি আলমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলম তাঁর প্রেমিকাকে ছেড়ে অতদূর যেতে রাজি হননি। তখন আজিমুশশান চাইলেন আরেক কবি কলাবত কালিদাস ত্রিবেদীকে। তাঁকে আবার ঔরঙ্গজেব ছাড়তে চাইলেন না।

এসব প্রমাণ দেখে ক্ষিতিমোহনের অনুমান

ঔরংগজেব অতিশয় নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। চরিত্রগত নীতির শৈথিল্য তিনি সহিতে পারিতেন না। গায়ক ও কলাবতদের মধ্যে নীতিগত শৈথিল্যে হয়তো তিনি রুষ্ট হইয়া থাকিবেন; তাই তাঁহাদের গানকে তিনি নিষিদ্ধ করিয়া থাকিবেন।

অবশ্য সঙ্গীত, চিত্রকলা এবং স্থাপত্যশিল্পে অবদানের জন্যে অন্য মোগল সম্রাটদের অবিমিশ্র প্রশংসা করলেও বাদশাহ আলমগীর সম্পর্কে ক্ষিতিমোহনের ভাবনায় স্ববিরোধিতা রয়েছে বলে মনে হয়। কারণ ‘স্থাপত্যশিল্প’ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন:

ঔরংগজেব নানা উপায়ে পিতৃসিংহাসন অধিকার করিয়াই ধর্মের নামে শিল্পকে নির্বাসিত করিলেন আর গোঁড়া মুসলমান কারিগর ছাড়া আর সব শিল্পীদের তাড়াইয়া দিলেন। ইহার পরেই মোগল দরবারে শিল্পসৃষ্টির অবসান হইয়া গেল।

চিত্রশিল্পের আলোচনায় ক্ষিতিমোহন স্পষ্ট লিখেছেন

মুসলমান ধর্মের অনুশাসনে শিল্পসাধনা নানাভাবে বদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিতে না পারিলেও মোগল সম্রাটেরা বন্ধন দুঃখ অনেকটা ঘুচাইলেন। মোগল বাদশাবৃন্দের সময়ে মৃত্যুপাশ হইতে অনেক পরিমাণে মুক্ত হইয়া ভারতীয় মুসলমানদের শিল্পকলা একটু নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।

এই ‘চিত্রশিল্প’ অধ্যায় অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এই কারণে যে লেখক জানিয়েছেন, ইউরোপিয় চিত্রশিল্পের যেসব নিদর্শন নিয়ে আমরা সাধারণত উচ্ছ্বসিত হই তার অনেকগুলো ভারতীয় শিল্পের কাছে, বিশেষত মোগল যুগের শিল্পের কাছে, বিশেষভাবে ঋণী। প্যারিসের ল্যুভর এবং লন্ডনের মিউজিয়ামে ডাচ চিত্রশিল্পী রেমব্র্যান্টের যেসব বিশ্ববিখ্যাত কীর্তি রয়েছে তার অনেকগুলোই মোগল মিনিয়েচার পেন্টিংয়ের হুবহু নকল বা তা থেকেই উদ্ভূত। এই তথ্যের উৎস হিসাবে লেখক দুই ইউরোপিয় শিল্পরসিকের কথাই উল্লেখ করেছেন। আজকের ভারতে মোগলদের মন্দির ধ্বংসকারী, হিন্দুবিরোধী যে ভাবমূর্তি জনপ্রিয় হয়েছে তাতে এই অধ্যায়ে লেখকের ইতিহাস পাঠ অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ভারতে পৌঁছবার আগে মোঙ্গল আক্রমণ আরব সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। ফলে আরবরা পারস্যের সংস্কৃতির উপরে ছশো বছর ধরে যে জগদ্দল পাথর চাপিয়ে রেখেছিল তা সরে যায়। আবার পারস্যের সাম্রাজ্যও মোঙ্গলদের হাতেই ধ্বংস হয়। দুটোই কিন্তু মুসলমানদেরই সভ্যতা। ক্ষিতিমোহনের মতে মোঙ্গলরা গথ, হুনদের মত শুধু ধ্বংস করতে করতে এগোননি। একইসঙ্গে তাঁদের হাতে শিল্প, সাহিত্যের নির্জীব বন্ধনের অবসান এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এক ধাপ এগিয়ে তিনি লিখছেন

মনে হয়, ইউরোপে রেনাসাঁসের যুগ প্রবর্তনের প্রধান কারণই এই মোঙ্গলেরা। কারণ ইহাদেরই জন্য এতকাল খোরাসানের অন্ধকারে অবরুদ্ধ অটোমান তুর্কেরা কনস্টান্টিনোপলে আসিয়া সকলের দৃষ্টির সম্মুখে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিলেন। ইহাদেরই জন্য বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হইল। ইহাদেরই জন্য গ্রিক পণ্ডিতগণ তাঁহাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার লইয়া সারা ইউরোপে নানা স্থানে ছড়াইয়া পড়িলেন।

সেই ধারাতেই পাঠান, মোগলরা ভারতে এসে বহু সংস্কৃতি ও শিল্পশৈলীর সমন্বয় ঘটান। তাই মোগল আমলের শিল্পীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান – দুরকম শিল্পীই দেখা যায়। আকবরের আমলের চিত্রশিল্পীদের মধ্যে যাঁদের নাম পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে দুজন মুসলমান, আর সকলেই হিন্দু। তাঁদের মধ্যে আবার কায়স্থ, চিতেরা (চিত্রকর), শিলাবত (শিলাশিল্পী), খাটি (কাঠশিল্পী), এমনকি কাহার (পালকিবাহক) জাতের মানুষও ছিলেন। অর্থাৎ উঁচু জাত, নিচু জাতের বিভাজনও সেক্ষেত্রে কাজ করেনি। ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন নন্দলাল বসুর থেকে মোগল আমলের শিল্পীদের নামের এক তালিকা তিনি পান। তার মধ্যে ১০৮ জন হিন্দু, ৯১ জন মুসলমান।

ভারতীয় সঙ্গীত, শিল্প, স্থাপত্যে মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে তাজমহলের কথা। যদিও তাজের স্থাপত্যে যে হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র সংস্কৃতির চিহ্ন আছে তা সচরাচর কাউকে বলতে শুনি না। পি এন ওকের তেজো মহালয়ের আষাঢ়ে গপ্প হয়ত সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়ে। ক্ষিতিমোহন তাজমহল সম্পর্কে কী লিখেছেন দেখা যাক

তাজের ভারতীয়ত্বের একটা বড়ো প্রমাণ, তাজ পশ্চিমমুখী নহে। আর. এফ. চিজলম্ দেখাইয়াছেন তাজের চারি কোণাতে চারি মিনার, মধ্যে গম্বুজযুক্ত রচনা। এই রচনারীতি ঠিক যবদ্বীপের চণ্ডীসেবার পঞ্চরত্ন মন্দিরের নকশার সঙ্গে মেলে। হিন্দু শিল্পশাস্ত্রের পঞ্চরত্ন মন্দিরেরও এইরূপই গঠনপ্রণালী। অজন্তার চিত্রেও ঠিক তাজের নকশার নমুনা পাওয়া যায়। প্রথম গুহাচিত্রে বুদ্ধের কাছে মা ও শিশুর চিত্রে এবং অনুরাধাপুরে ও বরোবুদুরে বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে অনুরূপ নকশা পাওয়া যায়। শুধু তাজে নহে, আকবরের সেকেন্দ্রাতেও এমনসব শৈলী দেখা যায় যাহাকে ঠিক মুসলমানি বলা চলে না। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান – এই তিনজনেই সংস্কৃতি হিসাবে অনেকখানি ভারতীয় ছিলেন।

তাজশিল্পের ক্রমবিকাশের ইতিহাস খুঁজিতে ভারত ছাড়িয়া পারস্য দেশে বা মধ্য এশিয়াতে ঘুরিয়া মরা বৃথা। তাজের নির্মাণে যেমন কান্দাহার, কনস্টান্টিনোপল ও সমরখন্দের কারিগর ছিলেন, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে মুলতান লাহোরের কারিগরেরও অভাব ছিল না। দিল্লিরও বহু কারিগর ছিলেন। তাঁহাদের শিক্ষার মধ্যে ভারতীয় শৈলীই চলিত ছিল। একজন বড়ো ওস্তাদ ছিলেন চিরঞ্জীব লাল, তাঁহার অনুবর্তী ছিলেন ছোটেলাল, মন্নুলাল ও মনোহরলাল।

মুসলমানি য়ুনানী শাস্ত্র আর আয়ুর্বেদের মধ্যে কেমন দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে সম্পর্ক, সম্রাট আকবরের মন্ত্রী এবং রামচরিতমানস রচয়িতা তুলসীদাসের বন্ধু আবদুর রহীম খানখানাঁ কেমন সংস্কৃত ছন্দে হিন্দি, সংস্কৃত, ফারসি ভাষা মিশিয়ে লিখেছেন (‘করোম্যেব্ দুল্ রোহীমোইহং খুদাতালাপ্রসাদতঃ/পারসিয়পদৈর্যুক্তং খেটকৌতুকজাতকম্’) – সেসব দৃষ্টান্ত দিতে থাকলে এই আলোচনা কখনো শেষ হবে না। কিন্তু ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে দুজনের কথা উল্লেখ না করলে – মালিক মহম্মদ জায়সী আর কবীর। জায়সী ক্ষিতিমোহনের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে নিয়ে শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক সম্মিলনীতে আলাদা বক্তৃতাও দিয়েছিলেন।

জায়সী হলেন সেই কবি, যাঁর ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি লেখা পদুমাবতী (পদ্মাবতী) কাব্য ইদানীং ইতিহাস বলে গণ্য হচ্ছে। তারই জেরে দীপিকা পাড়ুকোনকে শূর্পনখা করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ইনি ক্ষিতিমোহনের ভাষায় ‘সাধকশ্রেষ্ঠ’। সংস্কৃত যোগশাস্ত্র, পুরাণ, কাব্য, অলংকার, ব্যাকরণে পণ্ডিত, ফকির জায়সীর চার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দুজন ছিলেন হিন্দু। মারা যাওয়ার সময়ে তিনি ব্রাহ্মণ বন্ধু গন্ধর্বরাজের ছেলেদের বলেন, আমার নিজের সন্তান নেই। তোমরা যেহেতু বন্ধুর সন্তান, তোমরাই আমার সন্তান। আমার পারিবারিক মালিক উপাধি যদি তোমরা বহন করো, তাহলে উপাধিটা লুপ্ত হবে না। আমার আশীর্বাদে যতদিন এই উপাধি নিয়ে তোমরা ভগবানের গুণগান করবে, ততদিন তোমাদের বংশে সুগায়কের অভাব হবে না। এই বইয়ের রচনাকালেও উত্তরপ্রদেশের বালিয়ার হলদী ও রায়পুর এলাকার কথকরা মালিক উপাধিই ব্যবহার করতেন। আজকের ভক্তরা জায়সীর কাব্য নিয়ে যা ব্যাখ্যাই করুন না কেন, ক্ষিতিমোহন লিখেছেন পদ্মাবতী কাব্যে আসলে যোগমার্গের গভীর তত্ত্বকথা রয়েছে। জায়সীর মতে রানি পদ্মিনী জীবাত্মার প্রতীক, রাজা রতন সেন পরমাত্মার আর আলাউদ্দীন পাপের। জায়সীর সমাধিমন্দির আবার আমেথির হিন্দু রাজার তৈরি। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, জায়সীর আশীর্বাদ পাওয়ার পরে তাঁর ছেলে হয়। ফলে তিনি জায়সীর ভক্ত হয়ে যান।

আরও পড়ুন আখতারনামা : বিস্মৃত ইতিহাস

কবীরের অপরাধ – তিনি হিন্দু, মুসলমানকে মেলাতে চেয়েছিলেন। ফলে দুই দলই তাঁর নামে বাদশার কাছে নালিশ করে। তলব পেয়ে দরবারে পৌঁছে অভিযোগকারীদের কাঠগড়ায় মোল্লা আর পণ্ডিতদের একসঙ্গে দেখে কবীর বলেন, হায়, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। তাহলে তোমরা ভুল করলে কেন? বিশ্ববিধাতার সিংহাসনের নিচে মিলিত হতে ডেকেছিলাম, সেখানে জায়গায় কুলোল না, কুলোল রাজসিংহাসনের নিচে! মেলাতে চেয়েছিলাম প্রেমে-ভক্তিতে, তোমরা মিলেছ বিদ্বেষে! বিদ্বেষের চেয়ে প্রেম-ভক্তির জায়গা কি বেশি চওড়া নয়? কবীরকে যদি বলা হত সাধনা সুরক্ষিত রাখতে সম্প্রদায় দরকার, তাহলে তিনি বলতেন ‘বেহা দীনহী খেতকো বেহ্রাহী খেত খায়’। অর্থাৎ বাইরের ছাগল, গরুর ভয়ে ক্ষেতে বেড়া দিলাম। দেখি বেড়াই ক্ষেত খেয়ে উজাড় করে দিল। ক্ষিতিমোহন উদ্ধৃত কবীরের অসংখ্য সহজ সরল রচনার মধ্যে এমন চারটে লাইন রয়েছে যা পড়লে মনে হয় এই সবে লেখা হল

জো খোদায় মসজিদ বসতু হৈ
ঔর মুলুক কেহিকেরা।
তীরথ মূরত রাম নিবাসী
বাহর করে কো হেরা।।

খোদা যদি মসজিদেই বাস করেন তবে বাকি জগৎটা কাহার? তীর্থে মূর্তিতেই যদি রাম রহেন তবে বাহিরকে দেখে কে?

কেবল ইতিহাস পাঠে নয়, সমসময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা কীভাবে ধরা পড়েছে তাও লেখক বিবৃত করেছেন। চট্টগ্রামের সাহিত্যসেবক আবদুল করীমের কাছে পাওয়া হোরান জরিপ (কোরান শরীফের প্রাকৃত উচ্চারণ) পুথি থেকে শুরু করে বাংলার গ্রামের মুসলমান পটুয়াদের কথা, যাঁদের পটের কাহিনি হয় হিন্দু দেবদেবী, পুরাণ ইত্যাদি নিয়ে – সবই খোলা মনের পাঠকের অপেক্ষায় আছে।

খোলা মন জিনিসটা কি আজ সুলভ? বিশেষ করে ধর্মের ব্যাপারে? এখন তো ধর্ম মূলত ধ্বজা। সে সম্পর্কে ক্ষিতিমোহন মহাভারতের অনুশাসন পর্ব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন

এক এব চরেদ্ ধর্মং ন ধর্মধ্বজিরো ভবেৎ।
ধর্মবাণিজ্যকা হ্যেতে যে ধর্মমুপভূঞ্জতে।।

ধর্ম হইল আপনার জীবনটি নিয়ন্ত্রিত ও শান্ত করিবার জন্য ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ধর্মকে ধ্বজার মতো ব্যবহার করিয়া কোনো বিরোধ ঘোষণা করা বা কোনো সুবিধা আদায় করার চেষ্টা অতিশয় অন্যায়।

ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়। সেই আশায় খোলা মনের মানুষ খুঁজে যাওয়া, তার কাছে এইসব বহুযুগের ওপার হতে আসা বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে আজ?

পুনশ্চ: কপিরাইট উঠে যাওয়া এই বইয়ের যে সংস্করণ আমার হাতে এসেছে তাতে বিকট অযত্নের ছাপ রয়েছে। একই ব্যক্তির নাম, একই বইয়ের নাম একেক জায়গায় একেকরকম বানানে লেখা হয়েছে। এমনকি বইয়ের নামও প্রচ্ছদে আর পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে আলাদা। মুদ্রণ প্রমাদ অগ্রাহ্য করলেও এই ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভাল সংস্কৃত, আরবি, উর্দু জানা কোনো পাঠক হয়ত উদ্ধৃতিগুলোতেও কিছু ভুল ধরতে পারবেন যা আমার বোধগম্য হয়নি। বইয়ের শেষের টীকাগুলো লেখার ভিতরে চিহ্নিতকরণেও অস্পষ্টতা, অসঙ্গতি রয়েছে। পরিশিষ্টে জায়সীকে নিয়ে যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে তা যে কী করে ৮ শ্রাবণ ১৯১২ তারিখে পঠিত হয়ে থাকতে পারে তা বোঝা অসম্ভব। ১৯১২ বঙ্গাব্দ আসতে এখনো শ পাঁচেক বছর দেরি আছে, অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান (ইংরিজি) ক্যালেন্ডারে শ্রাবণ নামে কোনো মাস নেই। এই দুঃসময়ে এই বই সুলভে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু এত মূল্যবান বইয়ের কি এই অযত্ন প্রাপ্য?

ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা
লেখক: ক্ষিতিমোহন সেন
প্রকাশক: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি
মূল্য: ১১০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত

“আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর।”

দুজন রাজনীতিবিদ। দুজনেই নিজের রাজ্যের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ – একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। একজন মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, অন্যজন অধুনালুপ্ত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শেষ মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমজন বিজেপির নংথমবাম বীরেন সিং, দ্বিতীয়জন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা পিডিপির মহবুবা মুফতি। এই দুজন অতি সম্প্রতি দুই মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে এমন দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যা পাশাপাশি রেখে দেখলে শুধু মণিপুরি বা কাশ্মীরী নয়, বাঙালিদেরও শিউরে উঠতে হবে। বস্তুত, বাঙালিদেরই শিউরে ওঠার কথা। কাশ্মীরী আর মণিপুরিদের তো সর্বনাশের মাথায় বাড়ি পড়েই গেছে। তাঁদের আর নতুন করে শিউরে ওঠার কী আছে?

২ জুলাই (রবিবার) মহবুবার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুর। সেই সাক্ষাৎকারের প্রায় প্রত্যেকটা কথাই উদ্ধৃতিযোগ্য, কিন্তু আমাদের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ের দেওয়ার মত কথাটা হল “আমি পাটনায় বিরোধী নেতাদের [সাম্প্রতিক বৈঠকে] বলেছি, মণিপুরে যা ঘটছে সেটাই ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারা এবং কেউ কিছু করে উঠতে পারবে না। মণিপুর আমাদের আয়না দেখাচ্ছে।”

গোটা সাক্ষাৎকারে একটাও আশাব্যঞ্জক বাক্য বলেননি মহবুবা। অবশ্য ২০১৯ সালের ৫ অগাস্টের পর কোনো কাশ্মীরীর মুখ থেকে আশার বাণী শোনার আশা করা মানে হয় আপনি কাশ্মীরের ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, নয় মুখে দরদ দেখাচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন “ভাল টাইট হয়েছে ব্যাটারা”। এই টাইট হওয়ার ব্যাপারটাই ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মানুষের, ভাল করে বোঝা প্রয়োজন এবং বুঝতে গেলে বীরেনের সাক্ষাৎকারের কাছে যেতে হবে। প্রণয় ও রাধিকা রায়ের বিতাড়নের পর এনডিটিভিও যে রবীশ কুমার নামাঙ্কিত গোদি মিডিয়ার অংশ হয়ে গেছে তা সর্বজনবিদিত। সেই চ্যানেল সমেত অন্য অনেক চ্যানেলকেই বীরেন কেন ৩০ জুন (শুক্রবার) পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত করলেন না, তা নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সর্বত্র প্রায় একই কথা বলেছেন, এখানে এনডিটিভির সাক্ষাৎকার নিয়েই আলোচনা করব।

পদত্যাগ করতে চাওয়ার কারণ হিসাবে যা জানিয়েছেন তাতে চমকে ওঠার মত কিছু নেই। লোকে যতক্ষণ তাঁর খড়ের পুতুল পোড়াচ্ছিল ততক্ষণ ঠিক ছিল। তা বলে মোদীজির কুশপুত্তলিকা দাহ করবে! অহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা! ওই স্পর্ধা দেখে বীরেন আর স্থির থাকতে পারেননি। তিনি ব্যথিত হন এবং ভাবেন, লোকে যখন তাঁকে বিশ্বাসই করছে না, শ্রদ্ধাই করছে না, তখন চেয়ারে বসে থেকে কী হবে? এসব কথায় প্রশাসক হিসাবে বীরেনের যোগ্যতা বা অযোগ্যতা নয়, প্রকট হয় ফুয়রারের সেনাপতি হিসাবে তাঁর বিশ্বস্ততা। প্রায় ২৮ মিনিটের সাক্ষাৎকারে দেশের বাকি অংশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ মিনিট আষ্টেক।

প্রায় দুমাস ধরে চলা মণিপুরের দাঙ্গা কেন, কোন ঘটনা থেকে শুরু হল তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে গেছে বহু আগেই। প্রায় সমস্ত সংবাদমাধ্যম, এমনকি এই ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে, যে ঘটনার সূত্রপাত ৩ মে মণিপুরের সমস্ত উপজাতিদের এক সম্মিলিত পদযাত্রা থেকে। কী জন্যে আয়োজিত হয়েছিল সেই পদযাত্রা? মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মেইতেইরা দাবি তুলেছে তাদের তফসিলি উপজাতি বলে ঘোষণা করতে হবে। ২০ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে বলে, এই দাবি দশ বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে যেন রাজ্য সরকার চার সপ্তাহের মধ্যে এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারকে তার সুপারিশ জানায়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই ওই পদযাত্রা বেরোয় এবং দাঙ্গা শুরু হয়। মূল সংঘর্ষ যে মূলত উপত্যকায় বসবাসকারী মেইতেইদের সঙ্গে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী কুকি এবং নাগাদের, সেকথাও কারোর অজানা নেই। কোনো রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং আর্থসামাজিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা সম্প্রদায় সংরক্ষণ দাবি করছে, এমনটা ২০১৪ সালের আগে বিশেষ দেখা যেত না। উপরন্তু মুখ্যমন্ত্রী বীরেন নিজে মেইতেই। এসব কারণেই যে মণিপুরের উপজাতিদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তাও এখন সবার জানা। কিন্তু বীরেন এনডিটিভির সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে এই দুমাসব্যাপী দাঙ্গার এক সম্পূর্ণ নতুন কারণ নির্দেশ করেছেন। বলেছেন মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করার আইনি নির্দেশ নাকি আদৌ এসবের কারণ নয়। তাঁর বক্তব্য “সরকার তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি ঘোষণা করার সুপারিশ এখনো পাঠায়নি। তাহলে সেদিন পদযাত্রা বার করা হয়েছিল কিসের দাবিতে? যারা করেছিল তাদের জিজ্ঞাসা করুন।” তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছেন এবং সেই উত্তরে আলোচনার অভিমুখই বদলে দিয়েছেন।

বলেছেন তাঁর সন্দেহ, এর পিছনে আসলে অনুপ্রবেশকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীরা। বলেছেন মণিপুরের পার্বত্য এলাকায় নাকি জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য (“demographic balance”) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেইতেই এবং নাগা এলাকায় সব ঠিক আছে, কিন্তু কুকি এলাকায় নাকি জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যের মায়ানমার সীমান্তবর্তী তিন জেলায় নাকি গত কয়েক বছরে প্রায় ১,০০০ নতুন গ্রাম গড়ে উঠেছে। একথা জানতে পারার পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে ওই এলাকার মানুষের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র পরীক্ষা করতে বলেন। সেই উদ্দেশ্যে ক্যাবিনেট সাব-কমিটি গড়া হয়। তাঁর সাফাই “সেই কমিটির চেয়ারম্যান করি লেপাও হাওকিপকে, যে নিজেই একজন কুকি। আমার যদি কুকিদের সম্পর্কে খারাপ মনোভাব থাকত, তাহলে এটা করতাম কি?” তিনি এও বলেন যে মণিপুরের কুকিরা তাঁর ভাই, তাদের নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বাইরে থেকে আসছে তাদের বরদাস্ত করা যায় না। তা সেই সাব-কমিটি নাকি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ২,১৭৪ জন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ফেলে। বীরেন ভারি নরম গলায় বলেন “আমি বললাম, এরা নিরীহ লোক। বিপদে পড়ে এখানে এসেছে, এদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র দিয়ে শেল্টার হোম বানিয়ে রাখা হোক যাতে ভারতীয় নাগরিক না হতে পারে। মায়ানমারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া যাবেখন। তা এসব করেছি বলে এই গণ্ডগোল করা হয়ে থাকতে পারে।” টানা দুমাস দাঙ্গা চলার পরে, বহু মানুষের মৃত্যুর পরে, বহু মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পরেও রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক সঠিক কারণ বলতে পারলেন না। হাওয়ায় কিছু অভিযোগ ভাসিয়ে দিলেন।

এরপরেই তিনি যোগ করলেন “তাছাড়া ২০১৯ সাল থেকে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছি। তাতে দু হাজারের বেশি লোক গ্রেফতার হয়েছে জঙ্গলের এলাকা থেকে। তার মধ্যে একজন গ্রামপ্রধানও আছেন। সুতরাং এই সঙ্কট যারা আফিম চাষ করে সেই মাফিয়ারা আর যারা মায়ানমার থেকে অনুপ্রবেশে প্রশ্রয় দেয়, তারা মিলিতভাবে তৈরি করে থাকতে পারে।”

এই কয়েক মিনিটের কথায় জ্বলন্ত মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী কী কী করলেন একবার দেখে নেওয়া যাক:

১) গোটা অশান্তির দায় কুকিদের উপর চাপিয়ে দিলেন। মেইতেইদের কোনো দোষ নেই। অর্থাৎ একটা রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সুচতুরভাবে একটা সম্প্রদায়ের (তাঁর নিজের সম্প্রদায়) পক্ষ নিয়ে নিলেন।
২) কুকিদের মধ্যে অনেকেই আসলে অনুপ্রবেশকারী – এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলেন। অর্থাৎ কুকিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন।
৩) কুকিরা পার্বত্য এলাকায়, অরণ্য এলাকায় গ্রামে গ্রামে আফিম চাষ করে। কুকি মানেই সন্দেহজনক, কুকি মানেই অপরাধী হতে পারে – এই ভাষ্য প্রচার করে দিলেন।

এই কায়দা কি নতুন? একেবারেই নয়। গোটা ভারতে মুসলমানদের সম্পর্কে ঠিক এই ভাষ্যই চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। কুকির বদলে মুসলমান বসিয়ে নিন আর তৃতীয় ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকা, অরণ্য এলাকার বদলে মাদ্রাসা বসিয়ে নিন। আফিম চাষের বদলে সন্ত্রাসবাদী চাষ বসিয়ে নিন।

সুতরাং বীরেন যা বলেছেন তা বস্তুত বর্তমান ভারতে প্রচলিত সংখ্যাগুরুবাদী ভাষ্যের মণিপুরি রূপ। এবার আসা যাক, বাঙালিদের কেন সচকিত হওয়া উচিত সেই প্রসঙ্গে।

এই ভাষ্যের অসমিয়া রূপটা নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে। সেখানে সংখ্যাগুরু অসমিয়ারা, আর জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ বাঙালিদের বিরুদ্ধে। অতএব ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনআরসি)। সেই ব্যবস্থার প্রকোপে কত মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে কাটাতে হচ্ছে, কত মানুষের সেখানে মৃত্যু হয়েছে ইতিমধ্যেই, কতজন যে কোনো সময়ে অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন – তার সঠিক সংখ্যা কারোর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা শুধু একটা সংখ্যাই নির্দিষ্টভাবে জানি – ১৯ লক্ষ। ৩১ অগাস্ট ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি থেকে বাদ পড়ে এতগুলো মানুষের নাম। বলা হয়, এঁরা ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। এঁদের সম্পর্কেও বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশ সে কথায় আমল দেয়নি, মায়ানমারও দেবে না, পৃথিবীর কোনো দেশই দিত বলে মনে হয় না। এদিকে অসমিয়া সংখ্যাগুরুবাদীরা কিন্তু এনআরসি থেকে ‘মাত্র’ ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ যাওয়ায় অখুশি। তারা আরও নিখুঁত (অর্থাৎ আরও বেশি মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মত) এনআরসি চায়। কোনো মানুষকে বেআইনি বলাই যে অমানবিক, সে আলোচনায় না গিয়েও এনআরসি যে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া তা বলাই যায়। নইলে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যরা এ দেশের নাগরিক নয় – একথা এনআরসিতে প্রমাণিত হল কী করে?

নাগরিকত্বের ধারণাতেই যে মৌলিক গোলমাল আছে সে তর্কে এই আলোচনায় ঢুকব না, অন্য কথা বলি। এ দেশের নাগরিকদের হাতে একাধিক পরিচয়পত্র বহুকাল ধরে আছে। সেসবে এমনিতেই পাহাড়প্রমাণ ভুল থাকে যার জন্য নাগরিকরা নন, সরকারি ব্যবস্থা দায়ী। যে কোনোদিন দেশের যে কোনো মহকুমা আদালতে খানিকক্ষণ বসে থাকলেই দেখা যায় বহু মানুষ আসেন শুধু নাম এফিডেভিট করাবেন বলে। একেক নথিতে একেকরকম নাম ছাপা হয়েছে একেকরকম বানানে। সেইসব মানুষের অধিকাংশই হয় মুসলমান, নয় নিম্নবর্গীয় হিন্দু। কারণ পরিচয়পত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা সরকারি আধিকারিকদের মধ্যে হিন্দু উচ্চবর্গীয়রা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁরা এঁদের নামগুলো জম্মে শোনেননি, শুনলেও বানান জানেন না। জেনে নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তাই ভুলের বেশিরভাগটা মুসলমান ও হিন্দু নিম্নবর্গীয়দের কাগজপত্রেই হয়ে থাকে। বন্যা ইত্যাদি দুর্যোগে কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বাদই দিলাম। তা এই এনআরসি সারা দেশেই করার অভিপ্রায় ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের। উদ্দেশ্য স্পষ্ট – যেসব সম্প্রদায় হিন্দুরাষ্ট্রে অবাঞ্ছিত, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া। যেহেতু হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না এত কোটি মানুষ, তাই গণহত্যায় যদি না মরে তো থাকবে। কিন্তু শাসক সংখ্যাগুরুর অধীনস্থ প্রজা হিসাবে থাকবে। এত বড় দেশে ব্যাপারটা করা অসম্ভব, যদি না যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে তাদের মধ্যেই সমর্থন তৈরি করা যায়। তাই ঝোলানো হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নামক গাজর। ফলে এনআরসি বরাক উপত্যকার বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সমর্থন পেয়ে গেল, পশ্চিমবঙ্গেও ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের পর এপারে আসা বাঙালদের উত্তরপুরুষের এনআরসি সম্পর্কে মতামত হয়ে গেল “সরকার একটা ভাল জিনিস করলে বিরোধিতা করব কেন?” সঙ্গে মিশে থাকল পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর গল্প শুনে বড় হওয়া মস্তিষ্কের প্রতিশোধস্পৃহা। বরাবরের পশ্চিমবঙ্গীয়দের তো কথাই নেই। তাঁরা নিশ্চিন্ত – “আমি যে ছিলাম এই গ্রামেতেই”। যাঁরা এরকম মানসিকতার নন, তাঁরাও ভাবলেন সিএএবিরোধী আন্দোলন করার প্রয়োজন মুসলমানদের। নাগরিকত্ব গেলে তো তাদের যাবে, হিন্দুরা তো এনআরসিতে জায়গা না পেলেও ফের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মতুয়ারা রীতিমত আশান্বিত হলেন বহু প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব এইবার পাওয়া যাবে ভেবে। নাগরিকত্ব পেতে গেলে যেসব অলীক শর্ত পূরণ করার কথা আইনে বলা আছে সেদিকে খুব বেশি লোকের চোখই পড়ল না।

দেশজুড়ে পথে পথে আন্দোলন এবং কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসের নিচে এনআরসি চাপা পড়ে গেল। সম্ভবত সেই কারণেই আন্দোলন বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও সিএএ অনুযায়ী কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়ার তাগিদ আর নরেন্দ্র মোদী সরকারের নেই। আসল উদ্দেশ্য তো অনেককে বাদ দেওয়া, কাউকে কাউকে যোগ করা নয়। যাঁরা ভেবেছিলেন আরএসএস-বিজেপি এনআরসির কথা ভুলে গেছে, তাঁদের বীরেনের কথা মন দিয়ে শোনা উচিত। তাঁর তৈরি ক্যাবিনেট সাব-কমিটি যা করছিল বলছেন, তা তো আসলে এনআরসির কাজই। কিছু মানুষকে অনাগরিক চিহ্নিত করে আলাদা জায়গায় রাখা। বীরেন খেলার মাঠের লোক ছিলেন বলে বোধহয় মনটা নরম, তাই ডিটেনশন সেন্টার না বলে শেল্টার হোম বলেছেন। লক্ষণীয় যে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা হয়েছে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র দিয়ে, অর্থাৎ আধার কার্ড। এই জিনিসটি যে একেবারে ফালতু, সেকথা এখন নেহাত নিরক্ষর মানুষও জেনে গেছেন। আধার জাল করা অত্যন্ত সহজ, নিত্যই আধার জাল করে লোকের টাকাপয়সা মেরে দেওয়ার কাহিনি কাগজে, টিভিতে, ওয়েবসাইটে দেখা যায়। আর বায়োমেট্রিক? প্রায়শই শোনা যায় অমুকের আঙুলের ছাপ আর মিলছে না, তমুকের চোখের মণি মিলছে না। ফলে অমুক সরকারি প্রকল্পের টাকা তোলা যাচ্ছে না, রেশন তোলা যাচ্ছে না। এই গোলযোগে ঝাড়খণ্ডে লুখি মুর্মু নামে এক মহিলা অনাহারে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ আছে। সেই আধার কার্ড দিয়ে নাগরিক চিনে নিচ্ছে বীরেনের সরকার।

তবে এনআরসির চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছে তাঁর ক্যাবিনেট কমিটি। কারণ গোটা রাজ্যের মানুষের নাগরিকত্বের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, হচ্ছে শুধু সংখ্যালঘু কুকিদের। আগামীদিনে কি তাহলে এভাবেই অন্য নামে এনআরসি হবে সারা দেশে? যে যেখানে সংখ্যালঘু কেবল তাদেরই নাগরিকত্বের পরীক্ষায় বসানো হবে, যাতে আসামের এনআরসির চেয়ে অনেক সহজ, সুশৃঙ্খল হয় কাজটা, আরও বেছে বেছে অপছন্দের জনগোষ্ঠীর মানুষকে বাদ দেওয়া যায়? আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। যাঁরা জানেন না তাঁরা বলবেন, এ তো মেইতেই-নাগা জাতিগত রেষারেষির ব্যাপার। এর মধ্যে আরএসএস, হিন্দুত্ব, হিন্দুরাষ্ট্র আসছে কোথা থেকে? তাঁদের জন্য উল্লেখ থাক, মেইতেইরা প্রধানত হিন্দু। কুকিরা প্রধানত খ্রিস্টান। গত দুমাসে কয়েকশো গির্জা এবং মন্দির পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে মণিপুরে।

ভারতে তো আজকাল আর এসব পড়ে মানুষ হিসাবে খারাপ লাগে না অনেকের। ফলে শুধু সংখ্যালঘুদের জন্য এনআরসি করার আশঙ্কাতেও শিউরে উঠবেন না অনেকেই, যদি তিনি যেখানে আছেন সেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হন। তাই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ভারতবর্ষ এমন এক সাড়ে বত্রিশ ভাজা যে এদেশে সকলেই কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু। মারোয়াড়ি বা গুজরাটি নিজের রাজ্যে ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে এসে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা দিল্লিতে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি মুসলমান হিন্দি বলয়ে গেলে আবার জাতিগত ও ধর্মীয় – দুভাবেই সংখ্যালঘু। দেড়শো কোটি ভারতীয়ের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া খুব শক্ত যে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যেখানেই যাবে সেখানেই সবদিক থেকে সংখ্যাগুরুই থাকবে। অথচ করমণ্ডল এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় যাত্রা করা দিনমজুর থেকে শুরু করে লোরেটো হাউসের প্রাক্তনী আই টি মজুর পর্যন্ত সকলকেই জীবিকার টানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেতে হবে, সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে হবে। যতই ফড়ফড়িয়ে ইংরিজি বলুন আর গড়গড়িয়ে হিন্দি, নাম দেখে বাঙালি বলে ঠিক চিনে ফেলা যাবে। ফলে নিশ্চিন্ত থাকার উপায় কারোরই নেই।

এই কারণেই মহবুবা যা বলেছেন তা অভ্রান্ত। আসামে এনআরসি নাম দিয়ে বা মণিপুরে ক্যাবিনেট সাব-কমিটির নাম দিয়ে যা করা হচ্ছিল তা আসলে ভারতের প্রতিটি রাজ্যের জন্য সযত্নে আলাদাভাবে তৈরি একেকটা হিন্দুত্ববাদী মডেল (যদিও উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে এনআরসির পথ করে দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধী)। হিন্দুত্ববাদের লক্ষ্য অখণ্ড ভারত, কিন্তু আসলে যা করছে এবং এই কর্মপদ্ধতি একমাত্র যা করে উঠতে পারে, তা হল ভারতের বালকানায়ন (Balkanisation)। অর্থাৎ খণ্ড খণ্ড ভারত। যত এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক পুলিস, এক নির্বাচন, এক দেওয়ানি বিধি ইত্যাদি ধারণা গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাড়ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিপুত্রদের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের মত রক্ষণশীল দাবিও বাড়ছে। দুই রাজ্যের পুলিসের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। এভাবে চললে সব রাজ্যেই ‘ভিনরাজ্যের লোক হটাও’ অভিযান শুরু হবে। এর ট্রেলারও ইতিমধ্যেই কিছু কিছু জায়গায় দেখানো হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার যুগে কোনো রাজ্যকে এসব ইস্যুতে মণিপুর করে দেওয়া কয়েক মিনিটের ব্যাপার। সংরক্ষণের মত কোনো বড় ইস্যুর প্রয়োজনই পড়বে না।

আরো পড়ুন স্রেফ বলপ্রয়োগে মণিপুর সমস্যা আরো বাড়বে

তবে হিন্দুত্ববাদী মডেল যারা তৈরি করে তাদের আর যা-ই হোক, অবধানের এবং পরিশ্রমের খামতি নেই। একই মডেল যে সব রাজ্যে চলবে না তা তারা বিলক্ষণ জানে। তারা বোঝে যে কিছু রাজ্য আছে যেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে এভাবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সরাসরি লড়িয়ে দেওয়া যাবে না। অন্য কৌশল দরকার হবে। আবার জম্মু ও কাশ্মীরের মত রাজ্যও ছিল, যেখানে হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড় ঘোষিত শত্রু মুসলমানরাই সংখ্যাগুরু। সেক্ষেত্রে রাজ্যটাকেই ভেঙে দেওয়া দরকার। সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। কিন্তু আধিপত্য স্থায়ী করতে হলে দরকার রাজ্যটার চরিত্রই বদলে দেওয়া। জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করার যে অভিযোগ কুকিদের বিরুদ্ধে বীরেন করেছেন, মহবুবা সঙ্কর্ষণকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন প্রায় সে জিনিসই ৫ অগাস্ট ২০১৯ তারিখের পর থেকে কাশ্মীরে করা হচ্ছে। “আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর। বালি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বিরাট আবিষ্কার লিথিয়াম – সবকিছু বাইরের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাও দুর্নীতি করে,” বলেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

তাহলে মোদ্দা কথা হল, যে রাজ্যের সংখ্যাগুরু (ধর্মীয় বা জাতিগত) হিন্দুত্বের পতাকা নিজেই তুলে নেবে না সে রাজ্যকে ভেঙে দেওয়া হবে। সেখানকার অর্থনীতির লাগাম তুলে দেওয়া হবে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাজ্যগুলোর ধনী ব্যবসায়ীদের হাতে। বদলানোর চেষ্টা হবে জনবিন্যাস। ফলে যারা ছিল সংখ্যাগুরু, তারা হয়ে যেতে পারে ভীত সন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু। এ হল হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার আরেকটা মডেল। পশ্চিমবঙ্গবাসীর শিউরে ওঠা উচিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গে একইসঙ্গে মণিপুর মডেল এবং কাশ্মীর মডেল প্রয়োগ করা সম্ভব।

ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একেকজন নেতা উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করা নিয়ে একেকরকম কথা বলে রেখেছেন। এমনকি কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জীবন সিং এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বছর জানুয়ারি মাসে দাবি করেছিলেন, আলাদা কামতাপুর রাজ্যের দাবি নিয়ে নাকি কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলছে। মধ্যস্থতা করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। একথা সত্যি যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো ভাবনাচিন্তা আছে বলে ঘোষণা করা হয়নি। তবে মনে রাখা ভাল, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে আগের দিন সন্ধেবেলাও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন তৎকালীন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক। অবশ্য যিনি বলেন রাজভবনের ফ্যাক্স মেশিন খারাপ ছিল বলে মহবুবার সরকার গঠন করার দাবি জানতে পারেননি, তাঁকে বিশ্বাস করা চলে না। কিন্তু সঙ্কর্ষণের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মহবুবাও বলেছেন “হপ্তাখানেক ধরে গুজব শুনছিলাম…সেইজন্যেই আমি, ওমর আবদুল্লা এবং অন্যরা মিলে রাজ্যপালের কাছে যাই জানতে যে সত্যিই ৩৭০ রদ করা হবে কিনা। উনি আমাদের বলেন ‘আমি আপনাদের বলছি, সেরকম কিচ্ছু হবে না’। পরদিন সকালে কী হল সে তো জানেনই। আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল বটে, কিন্তু যতক্ষণ না পরেরদিন আমাদের মাথায় বাজ পড়ার মত করে ব্যাপারটা ঘটল, আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি।”

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির লাগাম এমনিতেই অনেকটা হিন্দিভাষীদের হাতে। রাজ্য ভাগ করলে বাঙালি হিন্দুরা উত্তরবঙ্গে নানা জাতি, উপজাতির মধ্যে হয়ে পড়বেন সংখ্যালঘু। কাশ্মীরী মুসলমানদের দুর্গতি দেখে ২০১৯ সালে যাঁরা উল্লসিত হয়েছিলেন তাঁরা সেদিন বিপুল অপরাধবোধে ভুগতে পারেন।

দক্ষিণবঙ্গে হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সারা দেশের লোকসভা, বিধানসভার আসনগুলোর ভোটার পুনর্বিন্যাস করার কথা। গোটা বা ভাঙা দক্ষিণবঙ্গে এমন হতেই পারে যে বেশকিছু আসনে বাঙালিরা নয়, হিন্দিভাষীরাই হয়ে গেলেন নির্ণায়ক শক্তি। অথচ মণিপুরের মতই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, অনুপ্রবেশকারীতে ভরে যাচ্ছে – এ অভিযোগ বিজেপির বহুকালের (সংসদে এ অভিযোগ প্রথম তোলেন অবশ্য মমতা ব্যানার্জি)। বীরেন যেমন সংখ্যালঘু কুকিদের মায়ানমার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী বলে সন্দেহ ছড়াচ্ছেন, তেমনই বাঙালি মুসলমানরা আসলে বাংলাদেশি – এই সন্দেহ সারা ভারতে ইতিমধ্যেই ছড়ানো হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তার ফল ভোগ করেছেন শুধুমাত্র ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়, ধর্ম বা শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালি মাত্রেই যে বাংলাদেশি (হ্যাঁ, হিন্দু উচ্চবর্গীয়রাও। কারণ দেশভাগের ফলে বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দুর এ পারে চলে আসার কথা আই টি সেলের প্রত্যেকটি কর্মী জানে) – এই ধারণার প্রচার পুরোদমে চলছে। রাজ্য ভেঙে গেলে চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, ঘোষ, বোসদেরও অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হতে সময় লাগবে না।

আরও পড়ুন প্রজাতন্ত্রসাধনা

কাশ্মীরীরা আজ কেমন আছে জিজ্ঞেস করায় মহবুবা যা বলেছেন তা একেবারে জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিক উপন্যাস নাইন্টিন এইট্টি ফোর মনে পড়ায়। “কাশ্মীরীরা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে। তারা ঘরের মধ্যেও মন খুলে কথা বলত পারে না, কারণ তারা ভীত, তাদের বেঁচে থাকার বোধটাকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বন্দুক আর বুটের নিচে বাস করছি।” যেসব জনগোষ্ঠীকে হিন্দুত্ব নিজেদের শত্রু বলে মনে করে, তাদের কিন্তু এভাবেই রাখতে পছন্দ করে। কেবল বাঙালি মুসলমান নয়, বাঙালি হিন্দুরাও যে মোটেই আরএসএসের পছন্দের জনগোষ্ঠী নয় তার বহু প্রমাণ আছে, খামোকা এ লেখার কলেবর বাড়িয়ে লাভ নেই। কিছুই খুঁজে না পেলে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রচারসভায় “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগান খেয়াল করুন। নিদেন বাংলায় অনুবাদ করে নিয়ে “ভারতমাতার জয়” বলাও বিজেপি কর্মীদের না-পসন্দ।

কেউ অবশ্য বলতেই পারেন, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য, বাঙালিরাও অনেক বড় জাতি। সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গবাসী হিন্দু তো বটে। সুতরাং মণিপুর, কাশ্মীর নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার কী? অমন ব্যবহার আমাদের প্রতি আরএসএস-বিজেপি করতে যাবে কেন? বড় রাজ্য, বড় জাতিকে ছোট করে নেওয়ার কায়দা যে হিন্দুত্ববাদীদের জানা আছে তা তো আগেই ব্যাখ্যা করেছি। ফলে বিরাটাকার নিয়ে ভরসা করে বোধহয় লাভ নেই। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যবাসীর হিন্দুরাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠার ক্ষমতার উপর হয়ত ভরসা রাখা যায়। যেভাবে চতুর্দিক হিন্দিভাষীতে ভরে যাওয়া নিয়ে নিচু গলায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে করতে নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুলের দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি করে দিচ্ছেন কলকাতা ও শহরতলির ভদ্রলোকেরা, বাঙালি হিন্দুর বহুকালের উৎসব রথযাত্রার চেয়ে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন গণেশপুজোয়, যেভাবে বারাণসীর ঢঙে কলকাতার ঘাটে গঙ্গারতি চালু করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, দীঘাকে করে তুলছেন পুরীর মত তীর্থস্থান, শাসক দল রামনবমীর মিছিল করছে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, বজরংবলীর পুজো হচ্ছে ঘটা করে, বাংলা মেগাসিরিয়ালে বাজছে হিন্দি ছবির গান, বাংলা ছবির পোস্টার সারা ভারতে মুক্তির দোহাই দিয়ে লেখা হচ্ছে দেবনাগরী হরফে আর বাঘাযতীনের চেহারা হয়ে যাচ্ছে অক্ষয় কুমারের কেশরী ছবির পাঞ্জাবি যোদ্ধার মত – তাতে বিনাযুদ্ধে শুধু মেদিনীপুর নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুরাষ্ট্রের সবচেয়ে লক্ষ্মীসোনা রাজ্য হয়ে গেলেও আশ্চর্য হওয়া যাবে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

ওদের গুজরাটের মত, উত্তরপ্রদেশের মত শিক্ষা দেওয়া যাবে কী করে? সে আশাতেই তো বিরাট হিন্দু নেতাদের ভোট দেয়া। কিন্তু ওদের শিক্ষা দিতে দিতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অশিক্ষিত হয়ে যাবে না তো?

শুনুন ধর্মাবতার,

হিন্দুরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে হিন্দু নাগরিক হিসাবে যা যা অপরাধ করে ফেলেছি সেসব স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে এই চিঠি লিখছি।

অ্যাঁ, কী বলছেন? ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র? আজ্ঞে হ্যাঁ, তা তো বটেই। সংবিধান নামে ওই যে মোটা বইটা আছে, যেটার নামে নেতা, মন্ত্রীরা শপথ নেন এবং ভুলেও মনে রাখেন না – সে বইতে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে লেখা আছে তো বটেই। স্কুল কলেজে পড়েছিলুম সেসব। এমনকি দরকারে পড়ে দেখব বলে আর ছেলেপুলেকে শেখাব বলে বাড়িতে এক কপি কিনেও রেখেছি। কিন্তু কথা হচ্ছে, বইতে তো কত কথাই লেখা থাকে। সব মেনে চললে তো বাঁচা যাবে না। যেমন ধরুন ‘সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা বলিলে পাপ হয়’। এরকম কথা ছোটবেলায় কত বইতে পড়েছি। তা বলে কি সবসময় সব জায়গায় সত্যি কথা বলে বেড়াই? সকলে সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হয়ে গেলে আর আইন আদালত কোন কাজে লাগবে? কে সত্যি বলছে, কে মিথ্যে বলছে তার বিচার করতেই তো বিচারকরা আছেন। তা সংবিধানও একটা বই বৈ তো নয়। তার উপর আবার ইয়া মোটা। আজকাল তিন প্যারার বেশি ফেসবুক পোস্টই পড়ে ওঠা যায় না, অত মোটা বই কে পড়তে যাবে? ওসব জলাঞ্জলি দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, নয় কি? হোয়াটস্যাপেই এঁটে যাবে – দয়া করে এমন একটি সহজ ও ছোট সংবিধান বানিয়ে দিন না, মোটা ঝামেলাটি চিরতরে চুকে যাক। নতুন সংবিধানে ভারত যে হিন্দুরাষ্ট্র হবে তাতে তো সন্দেহ নেই, মানে চাদ্দিকে সবাই যখন বলছে দেশটা হিন্দুদের। তাই এখনই ক্ষমা-টমা চেয়ে পাপস্খালন করে রাখতে চাইছি আর কি, নইলে তখন যদি গদ্দার বলে শূলে চড়ানো হয়? মরণকালে হরিনাম করলে তো আর জীবন ফিরে পাওয়া যায় না, তাই প্রাণের মায়ায় কাজটা সেরে রাখছি।

প্রথম অপরাধটি করেছিলুম সেই ১৯৯২ সালে। আমার কোনো দোষ নেই, মাইরি বলছি। যত রাজ্যের হিন্দুবিরোধী খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেল দেখে বিশ্বাস করেছিলুম অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ভারি অন্যায় কাজ হয়েছে। ব্যাটা সেকুলার মিডিয়া আর পার্টিগুলো মিলে বুঝতেই দেয়নি যে বাল্মীকি, তুলসীদাস প্রমুখ রামায়ণ রচয়িতারা ভগবান শ্রীরামের জন্মস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ, মৌজা ও দাগ নম্বর লিখে না গিয়ে থাকলেও অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, উমা ভারতী, মুরলী মনোহর যোশীর মত দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা ঠিকই জানতেন যে একেবারে রামের ভূমিষ্ঠ হওয়ার জায়গাটিতেই পাপিষ্ঠ বাবর মসজিদ বানিয়ে ছেড়েছিল। আমার অজ্ঞানতা ক্ষমা করুন প্রভু।

সেই থেকে একের পর এক পাপ করেই চলেছি। এই ধরুন বাঙাল পরিবারের ছেলে হয়েও শিখে ফেলেছি দেশভাগের দায় হিন্দু, মুসলমান কোনো পক্ষের কম নয়। আরও শিখেছি ওপার থেকে যেমন ভিটেমাটি ছেড়ে অনেক হিন্দুকে এপারে চলে আসতে হয়েছিল, এপার থেকেও বিস্তর মুসলমান সব ফেলে ওপারে চলে গেছে। ওপারের লোক মোটেই সাধ করে চলে আসেনি, এপারের লোকও যে ড্যাং ড্যাং করে ওপারে পাড়ি দিয়েছে ঠিক তা নয়। এসব ঘোর বিজাতীয় কথাবার্তা যাঁরা শিখিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে দেহ রেখেছেন, ধর্মাবতার। ফলে আপনার কাজ কমেছে। যখন এক হোয়াটস্যাপ মেসেজ লম্বা সংবিধান অনুযায়ীও হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ শেষ হবে, তখন আর তেনাদের শাস্তি দেয়ার দরকার হবে না। আপনাদের হয়ে বরং আমিই তেনারা যা যা শিখিয়ে যেতে পারেননি তার জন্যে দু-চাট্টি গাল পেড়ে নিই।

যেখানে ইচ্ছে যত ইচ্ছে অন্যায় করে সবই বাবর ও তার চোদ্দ গুষ্টির পাপের শোধ তোলা হচ্ছে বলে ব্যাখ্যা করতে তাঁরা শিখিয়ে যাননি। মুসলমান মানেই মোগল আর মোগল মানেই রক্তপিশাচ বজ্জাত – এ কথাটি শিখিয়ে যাননি, মায় ওদের যে একটু শিক্ষা দিয়ে রাখা উচিত তা অবধি শিখিয়ে যাননি। কী ঝামেলা বলুন দেখি? অমৃতকালটি যে চেটেপুটে উপভোগ করব তার ব্যবস্থাই করে গেলেন না! তবে আর কী ছেলেপুলে মানুষ করলেন? ঘোর কলি। এখন দাড়িওলা, বন্দে ভারতে সওয়ার কল্কি অবতার যদি এর প্রতিকার করেন তবেই এ অধমের স্বর্গবাসের রাস্তা খোলে।

একটু ধৈর্য ধরুন, ধর্মাবতার। আমার পাপের এখানেই শেষ নয়। দ্বিগুণ পাপ করলুম ২০০২ সালে। ২৪ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরায় মহান করসেবকদের ট্রেনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর কয়েকদিন সামান্য একটু প্রতিক্রিয়া হল। অথচ ফের হিন্দুবিরোধী মিডিয়ার কথায়, ছবিতে বিশ্বাস করলুম ঘোর অন্যায় হচ্ছে। নারোদা পাটিয়া, নারোদা গাম, গুলবার্গ সোসাইটি – এসব জায়গার নাম মুখস্থ করে ফেললুম। আহসান জাফরিকে খুন করা হয়েছেবিলকিস বানোকে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে, পুলিস দেখেও কিছু দেখেনি, এমনকি মায়া কোদনানির মত মন্ত্রীসান্ত্রীরা দাঁড়িয়ে থেকে এসব করিয়েছেন – এমন গালগল্পে বিশ্বাস করে ফেললুম। একবারও ভেবে দেখলুম না, এক নিষ্ঠাবান হিন্দু মহিলা যাঁর নামেই রয়েছে মায়া, তিনি এমন মায়াদয়াহীন হতেই পারেন না। এসব হিন্দু সমাজকে বদনাম করার চক্রান্ত। গুজরাট মানে আসলে ভাইব্র্যান্ট গুজরাট, যেখানে মাঠে মাঠে ফসল আছে, গাছে গাছে পাখি আছে, ঘরে ঘরে চাকরি, থুড়ি ব্যবসা, আছে। যারা অন্য কথা বলে তাদের হিন্দু হৃদয়সম্রাটকে গাল পাড়া ছাড়া আর কাজ নেই – এই সহজ কথাটা বুঝে উঠতে পারিনি। চাকরি সূত্রে ও রাজ্যে থাকা আত্মীয়স্বজন শুভানুধ্যায়ীরা অনেকবার বলেছে, তেমন কিছুই হয়নি ওখানে। কেবল মায়ের পেট থেকে পড়েই আরডিএক্স চিনে যায় যারা, তাদের একটু শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এমন শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে এখন গুজরাটের মত শান্ত রাজ্য আর নেই। কিন্তু সেকথা শুনে বিশ্বাস করিনি। কাউকে কাউকে মুখের উপর বলে দিয়েছি, ওটা শ্মশানের শান্তি।

ছ্যা ছ্যা! কী পাপ বলুন দেখি! একেবারেই উচিত হয়নি এসব বলা। এই তো কেমন ধীরে ধীরে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, কেবল নারোদা পাটিয়া বা নারোদা গাম কেন, ২০০২ সালে গুজরাটের কোথাও কেউ কাউকে খুন করেনি। ধর্ষণ যারা করেছিল তারাও সব নিপাট ভালমানুষ, বামুন বাড়ির ভদ্র ছেলেপুলে। তাই তাদের খামোকা সারাজীবন জেলের অন্ধকূপে আটকে রাখার মানে হয় না। তাদের এত সুখ আছে, এত সাধ আছে। সবকিছু থেকে বঞ্চিত হবে? না হয় তাদের দেখে কিছু লোক সাহস পেয়েছে, না হয় কাশ্মীরের কাঠুয়ায় বছর আষ্টেকের শিশুকেও ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে, না হয় ধর্ষকদের বাঁচাতে হিন্দুরা গোটা কতক মিছিল মিটিংই করেছে, মৃত শিশুর উকিলকে খুনের হুমকি দিয়েছে। সে আর তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, বোকো হারামের অপরাধের তুলনায় কতটুকু? গেরুয়া পরে তো কেউ সন্ত্রাসবাদী হতে পারে না, ওসব কংগ্রেসি প্রোপাগান্ডা। গেরুয়া পরে কেবল এমপি, এমএলএ, মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়। কারণ তালিবানদের কেউ ভোট দেয় না, গেরুয়া পরে বোম ফিট করার অভিযোগ উঠলে দেয়। কারণ ওটি বীরত্ব।

আরও পড়ুন বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

দেশটা এখন বীরে বীরে বীরাক্কার। এদিকে আমার বীরেদের মর্যাদা দিতেও শেখা হয়নি। সেকুলাররা মাথাটা এমন খেয়েছে, কী বলব ধর্মাবতার, গোমাতাকে মাংস বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বা খাচ্ছে – এই অভিযোগে কাউকে উচিত শাস্তি দেয় যারা তাদের আমি ভেবেছি ‘লিঞ্চ মব’। এইসব সাহেবদের শেখানো কথাবার্তা, বুঝলেন কিনা? আমাদের দেশের কোনো ভাষায় ও কথাটা আছে? নেই, কারণ আমাদের দেশে ওরকম হয় না। আমাদের এখানে কেবল গোমাতার অসম্মান করলে উচিত শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা যারা দেয় তারা সব খোদ রাণাপ্রতাপের লোক, মানে সেই যিনি হলদিঘাটের যুদ্ধে আকবরের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। এই দেখুন, যত পাপই করে থাকি, আমার কিন্তু শুধরে নেওয়ার চেষ্টা আছে। যত রাজ্যের কমুনিস্টের লেখা ইতিহাস পড়ে শিখেছিলুম রাণাপ্রতাপ নাকি হেরে গেছিলেন। তা আবার হয় নাকি? ওই গরুখেকো মোগলদের কাছে আমাদের বিরাট হিন্দু রাজপুতরা কখনো হারতে পারে?

এত বছরের এত পাপ সব আপনার পায়ে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলুম। এবার থেকে একেবারে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে যাব, কথা দিচ্ছি। শুধু একটা ব্যাপারেই মনটা একটু খচখচ করছে, আপনি মাইবাপ, তাই আপনাকেই বলছি। হিন্দুরাষ্ট্র হওয়া যে দরকার তাতে সন্দেহ নেই। নইলে ওদের গুজরাটের মত, উত্তরপ্রদেশের মত শিক্ষা দেওয়া যাবে কী করে? সে আশাতেই তো বিরাট হিন্দু নেতাদের ভোট দেয়া। কিন্তু ওদের শিক্ষা দিতে দিতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অশিক্ষিত হয়ে যাবে না তো? ডারউইন বলেছিলেন মানুষ বাঁদর ছিল। আমাদের মুনি ঋষিরা বলেননি, তাই বোধহয় ওসব বই থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারভিউতে “অমৃতস্য পুত্রাঃ” বলে-টলে আমাদের ছেলেপুলেগুলো চাকরি বাকরি পাবে তো, ধর্মাবতার? না, মানে বলছি চাকরি বাকরি তো এদেশে বিশেষ নেই, বিদেশেই খোঁজ করতে হবে। সেখানে এসব বললে আবার হাঁকড়ে দেবে না তো অশিক্ষিত লালমুখো সাহেবগুলো?

আর আপনার সময় নষ্ট করব না ধর্মাবতার। কেবল একখানা শেষ প্রশ্ন আছে। বলি বিলকিস বানোর ওই যে ভালমানুষ ধর্ষকগুলি, তাদের আবার মুসলমানদের শিক্ষা দেয়া হয়ে গেলে আমাদের মেয়েদের শিক্ষা দেয়ার প্ল্যান আছে নাকি? না, মানে হিন্দুরাষ্ট্রে কি মুসলমান থাকতে দেয়া হবে? না হলে এই লক্ষ লক্ষ বীরেরা করবেটা কী? শিক্ষা দেয়া ছাড়া আর কোনো বিদ্যে কি এদের আছে?

অপরাধ নেবেন না হুজুর। এসব প্রশ্ন করব কাকে? কল্কি অবতার তো আর প্রেস কনফারেন্স করেন না, তেনার এজলাসও নেই। অগত্যা আপনাকেই করলুম আর কি। তাছাড়া আমাদের সাধুসন্তরা বলেছেন, সবই মায়া। তাই ছোট মুখে বড় কথা বলে অপরাধ হয়ে থাকলে মায়া বলে মামলা ডিসমিস করে দেবেন, এই আশা রাখি।

বিনয়াবনত

হিন্দুরাষ্ট্রের এক হিন্দু নাগরিক

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কতদিন রামের চেয়ে পিছিয়ে থাকবেন কৃষ্ণ?

কোভিডে যখন আমরা ঘরবন্দি, তখন দূরদর্শন তাদের জনপ্রিয় হিন্দি ধারাবাহিকের অনেকগুলোই পুনঃপ্রচার করছিল। বাসু চ্যাটার্জির ব্যোমকেশ বক্সীর প্রায় সবকটা পর্বই ফের গোগ্রাসে গিললাম। বি আর চোপড়ার মহাভারত দেখার তেমন উৎসাহ ছিল না, তবে কিছু পর্ব চোখে পড়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে একটা ছিল কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এবং ঝড়ের রাতে বসুদেবের কৃষ্ণকে মাথায় নিয়ে গোকুলযাত্রা। দেখতে দেখতে মনে পড়ল নীতীশ ভরদ্বাজের কথা। দূরদর্শনে সম্প্রচারিত রামানন্দ সাগরের রামায়ণ কীভাবে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে তা নিয়ে বইপত্র লেখা হয়েছে। কিন্তু সেই রামায়ণের রাম অরুণ গোভিলও পাননি, এমন এক সম্মান পেয়েছিলেন চোপড়ার মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রাভিনেতা নীতীশ। তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষের সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই জয়ে তাঁর কৃষ্ণ চরিত্রে অভিনয়ই একমাত্র কারণ ছিল না নিশ্চয়ই, কিন্তু ভারতের দর্শক যে অভিনয় আর বাস্তবে প্রায়শই তফাত করতে পারেন না তার অজস্র প্রমাণ আছে। হেমেন গুপ্তের ‘বিয়াল্লিশ’ ছবিতে অত্যাচারী পুলিস অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করার পর বিকাশ রায়ের বাড়িতে ঢিল পড়ার কিংবদন্তিও সে কথাই প্রমাণ করে।

কিন্তু পর্দার কৃষ্ণের রাজনৈতিক লাভ হলেও বিষ্ণুর দুই অবতারের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণই কিন্তু হিন্দুত্ব রাজনীতিতে উপেক্ষিত। রামজন্মভূমি আন্দোলন গোটা ভারতের ইতিহাসই বদলে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে রামনবমী হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক বিবৃতির মঞ্চ। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সশস্ত্র মিছিল করবে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এলাকায় এমন আচরণ করবে যেন বানরসেনার মত তারাও রাবণবধে বেরিয়েছে – এ যেন নিয়ম হয়ে গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিবিরোধীরা এর উত্তরে প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্ব করতে নেমে পাল্টা রামনবমী মিছিল, বজরংবলী পুজো ইত্যাদি করবে – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে। সেই তুলনায় জন্মাষ্টমী এখনো শান্তিপূর্ণ উৎসব। ‘অ্যাংগ্রি রাম’, ‘অ্যাংগ্রি হনুমান’-এর মত ‘অ্যাংগ্রি কৃষ্ণ’ স্টিকারও দেখা যায় না পথচলতি গাড়ির গায়ে। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আস্ত বক্তৃতা দিয়ে থাকলেও শ্রীকৃষ্ণের বাঁশরী আর শিখীর পাখা এখনো সুদর্শনকে ঢাকা দিয়ে রেখেছে।

অবশ্য তাতে আশ্বস্ত হওয়ার কারণ নেই। হিন্দুত্ব প্রকল্পে অযোধ্যার পরে যে কাশী এবং শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান মথুরার জায়গা – তা তো হিন্দুত্ববাদীদের স্লোগানেই বলা আছে। গত ১৩ অগাস্ট দিল্লিতে কয়েকজন সাধুসন্ত হিন্দুরাষ্ট্রের ৩২ পাতার খসড়া সংবিধান প্রকাশ করেছেন। তাতে উল্লেখ না থাকলেও, হিন্দুত্বের পিতা সাভারকরের কৃষ্ণ তথা গীতাপ্রীতি মাথায় রাখলে হিন্দুরাষ্ট্রের পতাকায় অশোক চক্রের জায়গা নেবে সুদর্শন চক্র – এমন কল্পনা অন্যায় হবে না।

আরও পড়ুন লাঠালাঠি নয়, গলাগলি

দেবতোষ দাশের বিন্দুবিসর্গ উপন্যাস পড়তে গিয়ে জানলাম, কার্ল মার্কস জগদ্বিখ্যাত দাস কাপিটাল বইতে বিষ্ণুকে উল্লেখ করেছেন পুঁজিবাদী বলে (‘Enough, that the world still jogs on, solely through the self chastisement of this modern penitent, of Vishnu, the capitalist.’)। সে অর্থে বর্তমানে গোটা দুনিয়াটাই বিষ্ণুর দখলে, ভারত তো বটেই। সেই বিষ্ণুর লোকপ্রিয় অবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিকে কি বেশিদিন নরেন্দ্র মোদীরা স্রেফ একটা ছুটির দিন হয়ে থাকতে দেবেন? তুলসীদাসের প্রজারঞ্জক রামকে দিয়ে তাঁদের কাজ চলে না। যশোদার আদরের বালগোপাল বা রাধার প্রেমিক শ্যামকে দিয়ে কি চলবে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত