পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই সেই শনিবার থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপর চটে রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য— বিজেপির নির্বাচনী প্রচার করতে এসে কেন সেই প্রচারেরই পাশের মঞ্চ থেকে সরকারি কাজ করা হবে? এটা অনৈতিক। এত রাগ করার কোনো মানেই হয় না। আরে বাপু, রাজনীতি কথাটার মধ্যে আগে তো ‘রাজ’, পরে ‘নীতি’। তাছাড়া আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’ যিনি শাসক, তিনিই রাজা। কী বলছেন? ভারত রাজতান্ত্রিক দেশ নয়, গণতান্ত্রিক? হ্যাঁ সে তো বটেই। মোদীজি নিজেই তো বারবার বলেন যে আমরা হলাম পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আমাদের গর্ব হওয়া উচিত। ঠিকই বলেন। আমরা তো ভোট দিয়ে রাজা নির্বাচন করি, অতএব আমরা গণতন্ত্র।
এখন কথা হচ্ছে, এত বড় দেশের সবকিছু তো আর একজন রাজার পক্ষে চালানো সম্ভব নয় (এমনিতেই মোদীজি দিনে চার ঘন্টার বেশি ঘুমোন না)। তাই সবকিছুর জন্যে আবার আলাদা করে ছোট ছোট রাজা রাখতে হয়। ক্রিকেটের রাজা হলেন মোদীজির প্রধান মন্ত্রণাদাতা অমিত শাহের সুপুত্র জয় শাহ। ভারতকে বিশ্বগুরু করার যে স্বপ্ন মোদীজি দেখেছিলেন, তা আপাতত হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে বলে আপনারা অনেকে খিল্লি করছেন বটে, কিন্তু সে স্বপ্ন ক্রিকেটবিশ্বে সফল করে ফেলেছেন মোদীজির স্নেহভাজন জয়।
মোদীজির মত পরিশ্রমী মানুষকে ছোট থেকে দেখে বড় হওয়া জয় তাঁকেই যে জীবনের ধ্রুবতারা করেছেন তা একেবারে পদে পদে টের পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, মোদীজি যেমন সরকারে আর পার্টিতে তফাত করেননি ব্রিগেডে, জয়ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে তফাত করেন না। তিনি এখন আর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কেউ নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। অথচ ভারত জিতলে তিনি উল্লাস প্রকাশ করেন। ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে করেছিলেন, কয়েকদিন আগে ভারত কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও করেছেন। এবারে আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব আর কোচ গৌতম গম্ভীরকে সঙ্গে করে ট্রফিসুদ্ধ মন্দিরে নিয়ে গেছেন, পুজো দিয়েছেন। যেন তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের কর্তা নন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরই কর্তা। জয় প্রথম ভারতীয় নন যিনি আইসিসির মাথায় বসেছেন। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী (তথা প্রভাবশালী) ক্রিকেট বোর্ড হওয়ায়, ভারতীয় বোর্ডের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা অনেকেই পরে আইসিসি প্রধান হয়েছেন। আইসিসির সংবিধান বদল করার আগে সর্বোচ্চ পদ ছিল সভাপতির। বাংলা থেকে জগমোহন ডালমিয়া, মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শরদ পাওয়ার, বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শশাঙ্ক মনোহর সেই দায়িত্ব সামলেছেন। চেন্নাইয়ের এন শ্রীনিবাসন প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। ওঁদের কাউকেই এই কাণ্ড করতে দেখা যায়নি। যে অস্ট্রেলীয় আর ইংরেজ ক্রিকেট প্রশাসকদের একসময় আইসিসিতে একাধিপত্য ছিল, তাঁদের কাউকেও নিজের দেশের কোনো ট্রফি জয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়নি।
যাবেই বা কেন? যাঁর উপরে গোটা পৃথিবীর খেলাটার দায়িত্ব, তিনি কখনো নিজের দেশের সাফল্য নিয়ে মেতে থাকতে পারেন? থাকলে তাঁকে অন্যরা অভিভাবক হিসাবে বিশ্বাস করবে? ব্রিটিশ কিংবদন্তি অ্যাথলিট সেবাস্তিয়ান কো একসময় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনসের সভাপতি ছিলেন। অলিম্পিকে ব্রিটেনের অ্যাথলিটরা সোনা জিতলে তিনি লাফালাফি করছেন— এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায়নি। অবশ্য ওঁদের জয় কেনই বা অনুসরণ করতে যাবেন মোদীজির মত আদর্শ সামনে থাকতে? মোদীজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দিল্লির চেয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে যে আমেদাবাদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে, সেকথা কে না জানে? অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে আমেদাবাদে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবেই। মার্কিন রাষ্ট্রপতি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, চীনের রাষ্ট্রপতি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী— তালিকায় কে নেই? পুরনো সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামও তৈরি করা হয়েছে আমেদাবাদে, যদিও হালে যশপ্রীত বুমরা-অক্ষর প্যাটেল আসার আগে পর্যন্ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে ওই শহরের অবদান শূন্য বললে ভুল বলা হয় না। রঞ্জি সিং থেকে শুরু করে চেতেশ্বর পূজারা, রবীন্দ্র জাদেজা পর্যন্ত যে কজন ভারতীয় ক্রিকেটার গুজরাট রাজ্য থেকে জাতীয় দলে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছাপ ফেলেছেন, তাঁরা কেউই আমেদাবাদের ক্রিকেটার নন। ওঁরা খেলতেন সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে। আমেদাবাদ যে ক্রিকেট সংস্থার ঘরের মাঠ, সেই গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের দলটা আজ পর্যন্ত রঞ্জি ট্রফি জিতেছে মোটে একবার, তাও মোটে এক দশক আগে, ২০১৬-১৭ মরশুমে। মানে ঐতিহ্য বলতে তেমন কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় কথা— আমেদাবাদে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লির চেয়ে অনেক কম। কলকাতায় এবারের বিশ্বকাপেও ইতালি বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দেখতে মেলা লোক হয়েছিল, আমেদাবাদে ২০২৩ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে হয়েছে। সেই স্টেডিয়ামের উদ্বোধন আবার ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে হয়নি, হয়েছিল মোদী-ট্রাম্পের যুগ্ম সমাবেশ দিয়ে। সেদিন কিন্তু দর্শকের অভাব হয়নি।
স্পষ্ট বোঝা যায়, জয় মোদীজির যে জীবনাদর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন তা হল— সবার উপরে গুজরাট সত্য তাহার উপরে নাই। এ পথেই তিনি চলতেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব থাকার সময়ে, গোটা ভারত নিয়ে ভাবতেন না।
অতএব আইসিসি কর্তা হয়ে গিয়ে তাঁর ভারত নিয়েই মেতে থাকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বরং এই আচরণ যে রীতিমত প্রশংসনীয়, তা দেশের সংবাদমাধ্যমও মনে করছে। তাই গত শনিবার সিএনবিসি-টিভি১৮ ইন্ডিয়া বিজনেস লিডার অ্যাওয়ার্ডসে তাঁকে ক্রিকেটের প্রতি ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো! জয়ের আগে কে-ই বা নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে দেশসেবা করতে পেরেছে!
সেবা বলে সেবা? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড গত রবিবার ভারতের ২০২৬ কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী পুরুষদের দল এবং ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী দল, ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ছেলেদের দল, ২০২৫ পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ী মহিলাদের দল এবং ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী মেয়েদের দলকে সংবর্ধনা দিয়েছে। সেখানেও সশরীরে হাজির ছিলেন জয়। বোর্ড সভাপতি মিঠুন মনহাসের চেয়ে তাঁরই ছবি দেখা যাচ্ছে বেশি।
আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে
আবার ভারতের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন জয়কে সংবর্ধনা জানিয়েছে। সেখানে তিনি বড় মুখ করে বলেছেন, তিনি নাকি বোর্ডের কর্তা থাকার সময়ে একেবারে ২০২৮ অলিম্পিক পর্যন্ত কী কী করতে হবে তার পরিকল্পনা করে দিয়েছেন। এখন যাঁরা বোর্ড চালাচ্ছেন তাঁদের ২০৩৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কীভাবে কী করা হবে তা ছকে ফেলা উচিত। এখানেও জয় অনন্য। অতীতে কোনো ক্রিকেট প্রশাসককে ক্রীড়া সাংবাদিকরা সংবর্ধনা জানিয়েছেন কিনা খুঁজে বের করতে গবেষক লাগবে। প্রশাসকদের সাংবাদিকরা সংবর্ধনা দেবেন কী জন্যে? দিল্লির এডিটর্স গিল্ড কোনোদিন কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে সংবর্ধনা দিয়েছে নাকি? দেশ চালানোটাই কি একটা অভিনন্দনযোগ্য কাজ, যার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা প্রাপ্য? যদি তা না হয়, তাহলে ক্রীড়া সাংবাদিকরাই বা কোন অর্জনের জন্যে জয়কে সংবর্ধনা দিলেন? ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের জন্যে নাকি? তাহলে তো ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। বড় জোর বোর্ড সভাপতি বা সচিবদের। আইসিসি চেয়ারম্যানকে যদি ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের জন্যে সংবর্ধনা দেন, তাহলে তো…
যাকগে, অমৃতকালের ভারতে সবই সম্ভব। “পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ” গেয়ে খেলতে নামা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিকদের ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জেতার পর সেই ট্রফি নিয়ে যদি হিন্দু অধিনায়ক, কোচ আর জয় শাহ দেশের মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ালে দোষ না হয়, তাহলে সাংবাদিকরা প্রশাসকদের প্রশ্ন করার কর্তব্য ভুলে তাঁদের সংবর্ধনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও দোষ হয় না। শেষে “জয় জয় জয় জয় হে” গেয়ে নিলেই সাত খুন মাপ।
অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
