লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ: আমাদের ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ দেশের মুখ

রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি ২০২০ সালে ক্রিকেট দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলার সময়ে বর্ণবৈষম্যবাদী কথা শুনতে হয়েছে অভিযোগ তুলে। স্যামি বলেছিলেন, ২০১৩ আর ২০১৪ মরশুমে তিনি যখন সানরাইজার্স হায়দরাবাদে খেলতেন, তখন ইশান্ত শর্মা তাঁর নামকরণ করেছিলেন ‘কালু’। দলের অনেকেই তাঁকে ওই নামেই সম্বোধন করতেন। স্যামি তখন জানতেও পারেননি, যত আদর করেই ওই নাম রাখা হয়ে থাক, ওটা আসলে তাঁর গায়ের রং নিয়ে নোংরা রসিকতা। ২০২০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড শ্বেতাঙ্গ পুলিসকর্মীর হাতে খুন হওয়ার পরে পৃথিবীজুড়ে বর্ণবৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথাবার্তা চালু হয়ে যায়, তখন স্যামি ইশান্তের কীর্তি প্রকাশ্যে আনেন। তখনকার সতীর্থদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, আমাকে কালু বলে তোমরা কী বোঝাতে চাইতে? এরপর কী হয়? কিচ্ছু না। এই ঘটনা ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশে প্রকাশ্যে এলে হয়তো সানরাইজার্স বা আইপিএল কর্তৃপক্ষ অথবা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কোনো তদন্ত শুরু করে দিত, যেমনটা আজীম রফিকের অভিযোগ নিয়ে ইয়র্কশায়ার কাউন্টি করেছিল। কিন্তু আমরা তো ভারতীয়, আমাদের তো ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, আরও নানা বকম বকম। অতএব আমরা বর্ণবৈষম্যবাদী হতেই পারি না। তাই স্রেফ ইশান্ত স্যামির সঙ্গে কথা বলে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন

কেন আবার এতদিন পরে এসব কথা? কারণ সম্প্রতি প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ ঘোষণা করেছেন যে তিনি আর ধারাভাষ্যকারের কাজ করবেন না। তিনি সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন এর কারণ— তিনি গায়ের রঙের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হতে ক্লান্ত। কালো বলে তাঁকে এত বছর ধারাভাষ্য দেওয়ার পরেও কোনোদিন টসের সময়ে মাঠে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

একথা অবিশ্বাস করার কারণ আছে, যেহেতু ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন জোরে বোলার ইয়ান বিশপ এবং জিম্বাবোয়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার পুমেলেলো বাঙ্গোয়াকে প্রায়ই টসে দেখা যায়। কিন্তু গতকাল দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের দুই সাংবাদিক – শ্রীরাম বীরা ও আর ভেঙ্কট কৃষ্ণ – এক দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন শিবরামকৃষ্ণণের সঙ্গে কথা বলে। সেই প্রতিবেদন পড়লে পরিষ্কার হয়, শিবরামকৃষ্ণণ নেহাত আন্দাজে এই অভিযোগ তোলেননি। আটের দশকে বিরল প্রতিভা হিসাবে চিহ্নিত এই লেগস্পিনার সেই খেলোয়াড় জীবন থেকেই গায়ের রঙের কারণে নিজের দেশে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। সুতরাং শিকারি বেড়াল যে তিনি গোঁফ দেখলেই চিনতে পারবেন— এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আমরা চিনি বা না-ই চিনি। তাছাড়া নিজেদের দিকে ভালো করে তাকালেই টের পাওয়া যাবে— আমরা আফ্রিকা-জাত খেলোয়াড়দের প্রতি যে সম্ভ্রম নিয়ে তাকাই, তা আমাদের আশপাশের কালো মানুষদের জন্য বরাদ্দ করি না। একদা কলকাতা ফুটবল মাতানো চিমা ওকোরি, ক্রিস্টোফার, প্রয়াত চিবুজোর, ওমোলো, ওডাফা ওকোলিদের নিয়ে আমরা নাচানাচি করতাম ঠিকই; তা বলে পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে ‘অমুক মেয়েটা কালো হলেও সুন্দর’ বলা বন্ধ করিনি। মজার কথা, ভারতীয়দের বর্ণবৈষম্য এমন বহুমাত্রিক যে তার মধ্যে এমন লিঙ্গবৈষম্যও মিশে থাকে যার শিকার ছেলেরা! কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মেয়ে বন্ধুদের আলোচনা করতে শুনতাম ‘অত ফরসা ছেলে আমার ভালো লাগে না, একেবারে মেয়েদের মত টুকটুকে গায়ের রং।’ সুতরাং শিবরামকৃষ্ণণকে যে টিভি প্রোডিউসার বলেছেন ‘বসরা আপনাকে টসে বা প্রেজেন্টেশনে না রাখতে’, তিনি খুব অবিশ্বাস্য কিছু বলেননি।

ক্রিকেট মাঠ যে ভারতীয় সমাজের বাইরে নয় তা বুঝতে হলে শিবরামকৃষ্ণণের এই আখ্যান অবশ্যপাঠ্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক (শচীন তেন্ডুলকরের আগে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেকের রেকর্ড) হওয়ার আগেই শিবরামকৃষ্ণণকে নেট বোলার থাকার সময়ে ভারতীয় দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার তাঁর জুতো পালিশ করে দিতে বলেছিলেন। টেস্ট দলে ঢুকে পড়ার পর এবং নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পরে কটুকাটব্য আরও বাড়ে। পাকিস্তান সফরে গিয়ে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে অধিনায়ক সুনীল গাভস্কর চকোলেট কেক আনান দলের সকলে মিলে জন্মদিন পালন করার জন্য। সেখানে দলের এক ক্রিকেটার বলেন ‘সানি, তুমি ঠিক রঙের কেক আনিয়েছ। কালো ছেলের জন্যে ডার্ক চকোলেট কেক।’ শিবরামকৃষ্ণণ বলেছেন, তিনি কেঁদে ফেলেন এবং কেক কাটতে চাননি। গাভস্কর বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করেন, কেক কাটা হয়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

আমরা শিবরামকৃষ্ণণের খেলা দেখেছি পরে সোশাল মিডিয়ার ক্লিপে বা ইউটিউবে, কারণ আমাদের জন্মের আগেই তাঁর স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা দেখেছেন এবং তাঁর প্রতিভায় চমৎকৃত হয়েছেন, তাঁরা বরাবরই বলেন যে শিবরামকৃষ্ণণের কেরিয়ার লম্বা না হওয়ার পিছনে দায়ী তিনি নিজেই। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মুখেও শুনেছি— শিবরামকৃষ্ণণ প্রথমে মদ খেতেন, পরে মদ তাঁকে খেয়েছে। কিন্তু এত বছর পরে তিনি বলছেন, ক্রমাগত টিটকিরি শুনতে শুনতে ওই ১৮-১৯ বছর বয়সে তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন এবং যখন স্বাভাবিক কারণেই ব্যর্থ হতে শুরু করেন, তখন কেউ পিঠে হাত দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়নি। উলটে তিনি খুব মদ খান— এই গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরও চমৎকৃত হওয়ার মত কথা হল, ওই ছোট্ট আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে শিবরামকৃষ্ণণ নিজের দলের ড্রেসিং রুমের চেয়ে বেশি স্বস্তি পেতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্রেসিং রুমে। বলেছেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন ডেসমন্ড হেইনস। অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড তাঁকে সর্বদা স্বাগত জানাতেন। মনে পড়ে যায় মহম্মদ আলির কথা, যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করে বলেছিলেন ‘ভিয়েত কংদের সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। কোনো ভিয়েত কং আমাকে কখনো নিগার বলেনি।’

শিবরামকৃষ্ণণ অবশ্য আলির মত সিংহহৃদয় লড়াকু কেউ নন। তিনি খুবই সাধারণ লোক, ফলে এই মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেননি। ছিটকে গিয়েছিলেন। সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা যেটুকু জানা যায়, তাও বেশ গোলমেলে। কিন্তু এখানে সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। দুর্ভাগ্যজনক হল— পরে ধারাভাষ্যকার হিসাবে যখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসেন, তখনো তাঁকে একই ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। ভারতীয় সমাজ যে এগোবার বদলে পিছিয়ে যাচ্ছে তা আমরা আজকাল অনেক ঘটনাতেই বুঝতে পারি, শিবরামকৃষ্ণণ আরও একটা প্রমাণ জুগিয়ে দিলেন।

ভারতীয় ক্রিকেটের ধারাভাষ্য বেশ কিছুদিন হল আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। চমৎকার ইংরিজি এবং গভীর বিশ্লেষণে একসময় মোহিত করে দেওয়া গাভস্কর, শিবরামকৃষ্ণণকে বুক দিয়ে আগলানো অধিনায়ক গাভস্কর এখন চটুল কথাবার্তা বলে নিজেকে জাতীয়তাবাদী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন সারাক্ষণ। রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন। একদা মুগ্ধ করে দেওয়া হর্ষ ভোগলেও এখন ভারতীয় ক্রিকেটার আর বিসিসিআইয়ের চাটুকারিতা ছাড়া কিছু করে উঠতে পারেন না। মহেন্দ্র সিং ধোনির অসন্তোষের কারণ হয়ে একবার ধারাভাষ্যের চুক্তি খুইয়েছিলেন, ফের কেন ঝুঁকি নিতে যাবেন? ঠেকে শেখেননি বলে সঞ্জয় মঞ্জরেকর তো ধারাভাষ্যের চুক্তি হারিয়েছেন চোখের সামনেই। রিকি পন্টিং, ম্যাথু হেডেনরাও হাওয়া বুঝে ভীষণ ভারতপ্রেমী হয়ে যান মাইক হাতে নিলেই। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, শিবরামকৃষ্ণণের ব্যাপারটা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হবে না। ফ্লয়েড হত্যার পরে ইংল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন মাইকেল হোল্ডিং স্কাই স্পোর্টসের সরাসরি সম্প্রচারে বর্ণবৈষম্য নিয়ে এক অবিস্মরণীয় আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, কিন্তু সাহেবদের মত ফরসা নাসের হুসেন, আর শ্বেতাঙ্গ এবোনি রেনফোর্ড-ব্রেন্ট।

অমনটা আমাদের এখানে হবে না। কারণ ভারতীয় সমাজে কোনো বৈষম্য নেই। আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমাদের দেশ একেবারে ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’। তাই ফ্লয়েডের স্মৃতিতে সেবারের আইপিএলে কিছু করার কথা ভাবেনি কর্তৃপক্ষ। এক হাঁটু মুড়ে বসে মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তোলার যে রীতি তখন প্রায় গোটা ক্রিকেট বিশ্বে চালু হয়েছিল, তা একক উদ্যোগে পালন করেছিলেন হার্দিক পান্ডিয়া। তাও ১৯ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া আইপিএলে ২৬ অক্টোবরের ম্যাচে। এই হার্দিককে আবার ভারতীয় ক্রিকেটভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় প্রায়ই ‘ছাপড়ি’ বলে গালি দেন। সদ্য কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও দিয়েছেন। হার্দিকের অপরাধ? তিনি বান্ধবীকে খোলা মাঠেই চুমু খাচ্ছিলেন। ভেবে দেখুন, অন্যের বান্ধবীও নয়। নিজের বান্ধবীকেই চুমু খাচ্ছিলেন। অত্যন্ত অশ্লীল আচরণ সন্দেহ নেই। বান্ধবী বা বউকে প্রকাশ্যে চুলের মুঠি ধরে পেটানো যেতে পারে, চুমু খাওয়া কি কোনো ভদ্রলোকের কাজ? ওসব যারা ‘ছাপড়ি’, তারাই করে। কথাটার মানে জানেন তো? ছাপরবন্দ বলে এক ‘ডি-নোটিফায়েড’ জনগোষ্ঠীর মানুষ। ওঁদের সংস্কৃতি আর অসভ্যতা সমার্থক। বুঝলেন কিনা?

এতদ্বারা প্রমাণিত হইল যে, শিবরামকৃষ্ণণ বাজে কথা বলেছেন। আমরা ভারতীয়রা কোনোরকম বৈষম্যে বিশ্বাস করি না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তুমি আর নেই সে সানি

যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি।

বিশ্ব একাদশের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে [হিলটন] অ্যাকারম্যান, এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে মজার মজার ঘটনা কল্পনা করত। যেমন ইন্তিখাব [আলম] আর ফারুক [ইঞ্জিনিয়ার] বেয়নেট হাতে মুখোমুখি; আমি যুদ্ধবিমান নিয়ে উড়ছি, আমাকে আরেকটা যুদ্ধবিমানে তাড়া করছে আসিফ মাসুদ; বিষেণ [সিং বেদি] আর জাহির [আব্বাস] পালানোর চেষ্টা করছে। আমরা খুব হাসতাম। অস্ট্রেলিয় খেলোয়াড়রা এমনিতে এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে মজা না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকত। কিন্তু রিচার্ড হাটন ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার বলেছিল যে ফারুক যদি ইন্তিখাবের পেটে আগে বেয়নেট ঢুকিয়েও দেয়, ইন্তিখাব [আলম] বেঁচে যাবে। কারণ ওর পেটে এত চর্বি যে তাতেই আঘাতটা সামলে দেবে।

বলতেই হবে যে, সেই সময়ে যা চলছিল তাতেও ভারতীয় আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। প্রায় প্রত্যেক সন্ধেবেলা আমরা একজন পাকিস্তানি মালিকের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। উনি বিভিন্ন রেডিও বুলেটিন থেকে খবর শুনতেন আর একটা পেপার ন্যাপকিনে উর্দুতে লিখে ইন্তিখাবকে দিতেন। ও সেটা ভালো করে দেখতও না, মুচড়ে ফেলে দিত।

উপরের অংশটা সুনীল গাভস্করের স্মৃতিকথা সানি ডেজ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬) বইয়ে রয়েছে (ভাষান্তর আমার)। এই ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের, যখন তিনি গারফিল্ড সোবার্সের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। তখন ভারত-পাক যুদ্ধ চলছে। ভেবে দেখুন, সেই যুদ্ধ চলাকালীন দেশপ্রেমিক গাভস্কর পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে একই দলে খেলছিলেন! শুধু তাই নয়, যে যুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকরা জীবনমরণ লড়াই করছিলেন, সেই যুদ্ধ নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটারদের রসিকতায় হাসাহাসিও করছিলেন! সেখানেই শেষ হলে কথা ছিল, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সন্ধেবেলা একজন পাকিস্তানির রেস্তোরাঁয় খেতেও যাচ্ছিলেন! কোনও সন্দেহ নেই— আজ এমন করলে তিনি যে কেবল সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনীর শিকার হতেন তা-ই নয়, তাঁর নামে দেশদ্রোহের মামলাও হয়ে যেত দেশের কোনও না কোনও আদালতে। দেশে ফিরতেই হয়তো বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যেতেন।

একেবারেই অন্যায় হত, কারণ যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি। ভারত আজ উন্মাদের যুক্তিতে চলে, ১৯৭১ সালে চলত না। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মদত দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জব্বর লড়াই করে তাদের হারিয়ে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুরও পরোয়া করেনি। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতির সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, ভারতের সৈনিকরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর থামিয়ে দিয়েছেন। এদিকে বৃদ্ধ সুনীল গাভস্কর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের হায়দ্রাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিককে আক্রমণ করছেন, কারণ তিনি পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবরার আহমেদকে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতার নিলাম থেকে নিজের মালিকানাধীন দলের জন্য কিনেছেন।

অর্থাৎ আজকের গাভস্কর ১৯৭১ সালের গাভস্করকে ট্রোল করছেন। নিজের মন্তব্যের যুক্তি হিসাবে গাভস্কর যা বলেছেন, তার সঙ্গে ট্রোলদের কথাবার্তার কোনও তফাত নেই। পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নাকি দলে নেওয়া উচিত নয়, কারণ তিনি যে টাকা আয় করবেন সে টাকা পাকিস্তানে যাবে। পাকিস্তানের টাকা ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দিতে খরচ হয়। সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে ভারতের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে একটা সামান্য লিগ জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতএব সানরাইজার্স লিডস দলের মালিক কাব্যা মারানের উচিত ছিল আবরারকে নিলাম থেকে না কেনা।

সন্ত্রাসবাদের এই অদ্ভুত ফ্লো চার্ট হাজির করেছেন গাভস্কর। সাংবাদিক মহলে প্রায় সবাই জানেন যে গাভস্কর চিরকাল বইপ্রেমী। কিন্তু এসব কথা শুনলে সন্দেহ হয়, ইদানীং বই পড়া ছেড়ে বোধহয় ধুরন্ধর জাতীয় বলিউডি সিনেমায় মন দিয়েছেন। যে কোনও পাকিস্তানি নাগরিক পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে যা রোজগার করেন, সবই পাকিস্তান থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ চালাতে ব্যবহৃত হয়— এই ঘৃণায় বাঁধানো অতি সরল আজগুবি তত্ত্ব আর কোথা থেকে শেখা সম্ভব? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী, তাহলে আবার গাভস্কর নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন। এবং সেটা শুধু ১৯৭১ সালের কার্যকলাপের জন্য নয়।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

মাত্র কয়েকদিন আগে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেটার পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন কারাবন্দি ইমরান খানের স্বাস্থ্যের যথাযথ যত্ন এবং তাঁর প্রতি যথাযথ ব্যবহার দাবি করে।[1] সেই ১৪ জনের মধ্যে ছিলেন আমাদের কপিলদেব এবং গাভস্কর। সব পাকিস্তানিই যদি সন্ত্রাসবাদী হয়, তাহলে গাভস্কর একজন সন্ত্রাসবাদীর প্রতি দরদে পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন বলতে হয়। ইমরানের বিরুদ্ধে গাভস্কর যখন খেলেছেন তখনও তো পাকিস্তানের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলেছে। এমনকি ইমরান যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখনও যে ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছিল তা নয়। তাহলে গাভস্কর সেসব ভুলে ইমরানের জন্যে মুখ খুলতে গেলেন কেন?

এর একটাই উত্তর হয়। গাভস্কর ভালো করেই জানেন যে পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী নয়। ফলে পৃথিবীর যেখানে যে পাকিস্তানি টাকা রোজগার করবে, সেই টাকাই পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে— এ-কথার কোনও ভিত্তি নেই। গাভস্কর অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতেই পারেন যে তিনি বলেছেন “indirectly contributes”, অর্থাৎ “পরোক্ষভাবে” ওই টাকার অবদান থাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে। কিন্তু এই কথাটা দলে পাকিস্তানি ক্রিকেটার না নেওয়ার যুক্তিকে আরও দুর্বল করে। যদি একজন করদাতা না-ই জানতে পারেন তাঁর করের টাকা পরোক্ষভাবে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে অপব্যবহারের জন্যে তো তাঁকে দোষী ঠাওরানো যায় না। তাঁর রোজগারের পথ বন্ধ করাও চলে না।

এর চেয়েও বড় কথা, কোনও কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে তাকে সে দেশের নিয়মকানুন মেনেই চলতে হয়। সান গ্রুপ ব্যবসা করছে ইংল্যান্ডে, আর চলবে ভারতীয়দের আবেগ অনুভূতি অনুযায়ী— এমন মামাবাড়ির আবদার কেমন করে করা যায়? তাছাড়া ভারতীয়দের টাকা পরোক্ষভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে গাভস্করের এতই যদি মাথাব্যথা, তিনি সদ্যসমাপ্ত কুড়ি-বিশের বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হওয়ার বিরোধিতা করলেন না কেন? আবরার দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতায় সানরাইজার্স লিডসের হয়ে খেলে পারিশ্রমিক পাবেন ১,৯০,০০০ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় আট কোটি পাকিস্তানি টাকা। তার কয়েকশো গুণ টাকা ভারত-পাক ম্যাচ থেকে কামিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। গাভস্কর একবারও বলেননি এটা হওয়া উচিত নয়। উলটে সে ম্যাচের ধারাভাষ্যে নিজে যুক্ত ছিলেন, মানে নিজেও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। তাঁর সঙ্গে ধারাভাষ্যে ছিলেন ওয়াসিম আক্রম, রামিজ রাজার মতো পাকিস্তানি প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও। তাঁরাও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। গাভস্করের যুক্তি মানলে সে টাকাও পরোক্ষভাবে বেশ কিছু ভারতীয়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সেসব আটকানোর কথা তিনি একবারও মুখ ফুটে বলেননি কেন?

তাহলে কি বুঝতে হবে, ১৯৯২ সালে মুম্বইয়ের দাঙ্গায় হিন্দু দাঙ্গাবাজদের সামনে এক মুসলমান পরিবারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া গাভস্কর আজ হিন্দুত্ববাদী দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল মাত্র? তাই যে ম্যাচ থেকে আরএসএস শাখা হয়ে দাঁড়ানো বিসিসিআইয়ের বিপুল আয় হয়, সেই ম্যাচে পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, অথচ ইংল্যান্ডের লিগে ভারতীয় মালিকের দলে পাকিস্তানের ক্রিকেটার খেললে তিনি খড়্গহস্ত?

জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ভারতীয়দের অনেক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন উপহার দিয়েছিলেন যে গাভস্কর, তিনি অস্ত গিয়েছেন। এখন ধান্দাবাজ ধর্মান্ধতায় ঢাকা তাঁর মুখ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

না হয় আজ চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ভারতীয় দলটা আসলে কার?

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে।

যদি বলি আজ গ্রহ, উপগ্রহগুলো চিন্তায় আছে— তাহলে হাসাহাসি করবেন না। ব্যাপার খুব গুরুতর। টানা দ্বিতীয়বার যদি ভারতীয় দল কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে কোনও কথা নেই। কিন্তু যদি হেরে যায়, তখন বৃহস্পতি কোন অবস্থানে থাকার জন্যে চরম মুহূর্তে ঈশান কিষণের হাত থেকে অমুক ক্যাচটা পড়ে গেল, অথবা শনির কোন চক্রান্তে যশপ্রীত বুমরার ইয়র্কারটা লেংথ মিস করে ফুলটস হয়ে গেল আর ড্যারিল মিচেল বোল্ড হওয়ার বদলে ছক্কা মেরে দিলেন— তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যেতে পারে। তাতে কোন জ্যোতিষীর কপাল পুড়বে আমরা জানি না। যাঁর পুড়বে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে বলতেই পারেন “আমার গণনায় ভুল ছিল না। হতভাগা শনি নিজের গতি কমিয়ে ফেলেছে চক্রান্ত করে। ভাগ্যিস বৃহস্পতিটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, তাই শেষ ওভার পর্যন্ত গেছে। নইলে দু ওভার আগেই খেল খতম হয়ে যেত।”

আষাঢ়ে গপ্পো লিখছি ভেবে অন্য লেখায় চলে যাচ্ছেন তো? আচ্ছা যাবেন নাহয়। যাওয়ার আগে শুনে যান, বাংলার সাংবাদিক বা ইউটিউবাররা আপনাকে খবরটা না দিলেও, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের সাংবাদিক দেবেন্দ্র পাণ্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগেরদিন লিখেছিলেন যে, ভারতীয় দলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল সন্ধে ছটা থেকে। কিন্তু যেহেতু সেদিন চন্দ্রগ্রহণ চলার কথা বিকেল তিনটে কুড়ি থেকে ছটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত, সেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে, এই অশুভ সময়ে শুভ কাজ করতে না যাওয়াই ভালো। তাই অনুশীলন শুরু হয় চন্দ্রগ্রহণের পরে।

শাস্ত্রে বলেছে— মহান ব্যক্তিরা যে পথে চলেন সেটাই সঠিক পথ। আর কে না জানে, ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলেই মহান! গৌতম গম্ভীর থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি মিঠুন মানহাস, সকলেই সনাতনী। ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখনও নাকি এসব হতো। তবে তফাতটা হল, তখন গম্ভীর আর কোচ বিজয় দাহিয়া বুক ফুলিয়ে বলতেন যে তাঁরাই এটা করাচ্ছেন। এখন কে যে চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না। দেবেন্দ্র পাণ্ডের ওই প্রতিবেদনেও বলা নেই। প্রতিবেদনে কেবল বলা আছে ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। সাধারণত এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় অধিনায়ক, কোচ আর নির্বাচকদের। আজকাল ‘সাপোর্ট স্টাফ’-ও গুরুত্বপূর্ণ, ফলে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটকও সিদ্ধান্তটা নিয়ে থাকতে পারেন। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ধর্মে চন্দ্রগ্রহণ অশুভ বলা আছে বলে তো জানা নেই। সিদ্ধান্তটা সূর্যকুমার যাদব, গম্ভীর, কোটক, নির্বাচন সমিতির প্রধান অজিত আগরকর— সকলে মিলেও নিয়ে থাকতে পারেন। দলে যতই সঞ্জু স্যামসনের মত খ্রিস্টান, অর্শদীপ সিংহের মতো শিখ আর মহম্মদ সিরাজের মত মুসলমান ক্রিকেটার থাকুন, দলটা তো সনাতনীদেরই। ফলে তাঁদের ধর্মে যে সময়টাকে অশুভ বলা হয়েছে, সেইসময় অনুশীলন করা যে কোনওভাবেই চলতে পারে না তাতে সন্দেহ কী?

এ মা! রেগে গেলেন নাকি? আরে আমি কি বলেছি যে ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে? আমি শুধু বলছি, অক্ষরে অক্ষরে শাস্তর মেনে পাঁজি-টাজি দেখে যখন মাঠে নামা হচ্ছে, তখন দল হেরে গেলে তার দোষ কখনওই খেলোয়াড়দের বা কোচদের হতে পারে না। সব গ্রহদোষ। এমনিতেও সর্বশক্তিমান জয় শাহ বিসিসিআই ছেড়ে আইসিসির চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার পরে বিসিসিআইয়ের কোনও সিদ্ধান্ত যে কে নেন তা কেউ বলে না। সিদ্ধান্তগুলো সর্বসমক্ষে জানান বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়া, কিন্তু নেন কে? সেকথা কিন্তু দেবজিৎও বলেন না।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে দেওয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? ভারত সরকার? না তো! বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ মোটেই এরকম কিছু বলেননি। তাঁদের মন্ত্রকের কোনও উচ্চপদস্থ অফিসারও বলেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্কেরও কোনও অবনতি হয়নি ওদেশের প্রাক-নির্বাচনী খুনোখুনির কারণে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে জয়শংকর, রাজনাথ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খালেদা-পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ও হয়েছে। তাহলে মুস্তাফিজুরের অপরাধটা কী? কেউ জানে না। আপাতত বাংলাদেশে হিন্দুবিদ্বেষী জামাত-এ-ইসলামি তো হেরে ভূত, তাহলে আইপিএলের সময়ে মুস্তাফিজুরকে ডেকে নেওয়া হবে কি? কেউ জানে না। কারণ তাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল তা-ই কেউ জানে না। কেবল দেবজিৎ একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— ওকে বাড়ি পাঠাতে হবে।

তেমনই পহলগামে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিয়ে অনেককে খুন করেছে বলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খেলবেন কিন্তু করমর্দন করবেন না, অর্থাৎ ‘যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, তাও কেউ জানে না। বলা হয়, বিসিসিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিসিআই কি গা ছমছমে হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ফিল্মে দেখা সর্বশক্তিমান কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়, মানুষ টেরই পায় না? বিসিসিআইয়ের তো একজন সভাপতি আছেন। বোর্ডের সংবিধান অনুযায়ী তিনিই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক। অথচ তিনি তো কই কিছু বলেননি! আচ্ছা কে এই ভদ্রলোক? চেনেন তাঁকে? না চিনলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। দিল্লির বাইরে তাঁকে বিশেষ কেউ চেনে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন্দ ব্যাট করতেন না, দিল্লির হয়ে খেলতেন। বিসিসিআইয়ের সভাপতির আসনে বসেছেন জগমোহন ডালমিয়া, এন শ্রীনিবাসনের মত নামকরা শিল্পপতিরা; কখনও এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতারা, কিম্বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার অথবা শশাঙ্ক মনোহরের মত ক্রিকেটপ্রেমী ক্ষমতাশালী লোকেরা। এই আসনে মিঠুনকে বসানো মানে হল “চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাক ধরে বাতি/ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল/শল্য হল রথী।” এই লজ্জাতেই হয়তো মিঠুন মুখ খোলেন না বা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে কিছু জানতেও চায় না, যা বলার দেবজিতই বলেন। তাহলে দেবজিৎ কি শ্রীরামকৃষ্ণ, আর মিঠুন গিরিশ ঘোষ? দেবজিতকে বকলমা দিয়েছেন? কেন দিলেন? কার নির্দেশে দিলেন? উত্তর নেই।

অবশ্য মিঠুনের পূর্বসুরি রজার বিনি, যাঁর ক্রিকেটিয় কীর্তি ভোলার নয় কারণ তিনি ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য, তিনিও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। যা ঘটত সবই যে তৎকালীন সচিব জয়ের নির্দেশে, তা নিয়ে তখন রাখঢাক ছিল না। ব্যাপারটা রেখে ঢেকে করা হতো সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন।

সাংবাদিক শারদা উগ্রা ২০২৩ সালেদ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবদনে লেখেন যে, সৌরভের আমলের শেষদিকে জয়ের নির্দেশে বিসিসিআইয়ের অন্যরা সৌরভের ফোনই ধরতেন না। সৌরভ যে বোর্ড সভাপতি হতে পেরেছিলেন জয়ের বাবা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুকূল্যে— সেকথা এখন অনেকেরই জানা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি নতুন সংবিধান ফের বদলাতে আদালতে বারবার আবেদন করে সৌরভ অনেকদিন পদে টিকে ছিলেন জয়ের সঙ্গে গলাগলি করে। তার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। যা-ই হোক, কথা হল, এখন তো আর জয় বিসিসিআই কর্তা নন। তাহলে বিসিসিআই চালাচ্ছে কে? এই প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তাই মনে রাখবেন— শারদার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Shah’s Playground: BJP’s Control of Cricket in India’।

অর্থাৎ বিসিসিআই হল জয়ের খেলার মাঠ তথা বিজেপির শাখা অফিস। এই কথাটি ক্রিকেটমহলে জানে সবাই, কিন্তু লেখার মত মেরুদণ্ড গোটা ভারতে হাতে গোনা যে কজনের আছে (বাংলায় কারও নেই), তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন শারদা। ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ইংরিজিতে লিখিত এবং বেশ দামি একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেই বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়েনি। পড়লেও যে খুব বিশ্বাস করতেন তা অবশ্য নয়। কারণ ক্রিকেট ভারতে ধর্মের স্তরে উন্নীত হয়েছে অনেককাল হলো। এই ধর্মের ভক্তরা আবার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টানদের চেয়েও এককাঠি সরেস। সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের গোঁড়া লোকেরা চিরকাল নিজের ধর্মের না হোক, অন্য ধর্মের দোষ দেখতে পায়। তা নিয়ে খুনোখুনি করে। সহিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা এবং নাস্তিকরা তাদের নিন্দা করেন। গত বিশ-তিরিশ বছরে যেহেতু বিজেপি এদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিজেপির বিরোধী তাঁরাও চারদিকে এত ধর্মের বাড়বাড়ন্তের নিন্দা করেন। সবেতে ধর্মকে টেনে আনা, নিজের ধর্মবিশ্বাসের উগ্র প্রকাশের মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের পিছনে লাগার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষ এদেশে এখনও পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই যেমন হিমাচল প্রদেশের এক যুবককে পেয়েছি, যিনি উন্মত্ত হিন্দু গুন্ডাদের হাত থেকে এক মুসলমান বৃদ্ধকে বাঁচাতে নিজের নাম বলেছেন মহম্মদ দীপক। কিন্তু ভারতে ক্রিকেট এমন এক ধর্ম, যার কোনো দোষ উপরে উল্লিখিত ধর্মগুলোর কেউই দেখতে পান না। ফলে দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছে বিজেপি— একথা নাস্তিক, ঘোর বামপন্থী ক্রিকেটপ্রেমীদের বললেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের মতই তাঁদের চোখে ভারতীয় ক্রিকেট দল আজও ফুলের মত নিষ্পাপ এবং ক্রিকেটাররা স্রেফ ননীচোর বালগোপাল।

বিজেপি আমলে যেমন, তেমনই চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে ক্রিকেট দল। বিসিসিআইকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত সম্প্রচারকারী সংস্থা একেবারে বিজেপির ঢঙেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, খেলোয়াড়ি মনোভাব বর্জিত কুরুচিকর প্রোমো প্রচার করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এশিয়া কাপ জিতে ক্রিকেট অধিনায়ক বলে দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদী নিজেই স্ট্রাইক নিয়ে রান করে দিলেন। ভাবা যায়!

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে। এদিকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী মহম্মদ শামি এখন আগরকরের কথা মতো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও দলে সুযোগ পাচ্ছেন না (কুড়ি বিশের দলে সুযোগ দেওয়া উচিত বলছি না)। সরফরাজ খান শয়ে শয়ে রান করেও নড়বড়ে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। হর্ষিত রানা আহত না হলে মহম্মদ সিরাজকেও চলতি বিশ্বকাপের ১৬ জনের মধ্যে রাখা যাচ্ছিল না। অথচ তিনি ভারতীয় পেসারদের মধ্যে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে ফিট, লম্বা লম্বা স্পেলে বল করেছেন, ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। এসবের কোনওটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের বিজেপি-চালিত হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ ওঁদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলেন, তাঁদের চোখেও ক্রিকেটাররা ‘নন-বায়োলজিকাল’।

যাঁরা বিজেপির দেশ শাসনের ব্যর্থতা দেখতে পান না, তাঁদের বিসিসিআইয়ের অপদার্থতা দেখতে না পাওয়ার মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রথমটা নিয়ে রীতিমতো সোচ্চার, তাঁরা ২০২৩ বিশ্বকাপের মতও এবারও টিকিট বিক্রির অব্যবস্থা নিয়ে টুঁ শব্দ করলেন না। স্রেফ গা জোয়ারি করে, বিসিসিআইয়ের জেদ বজায় রাখতে, জয়ের নেতৃত্বাধীন আইসিসির বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াও চার হাত-পা তুলে সমর্থন করলেন। এ হল বিশ্বের অষ্টমাশ্চর্য!

আরো পড়ুন ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড ক্রিকেট বাণিজ্যের মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে একদা প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোতেও যে খেলাটার কফিনে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে— সেকথা স্বীকার করার মানসিকতাও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা হারিয়েছেন। তাই সেমিফাইনালে হারার পর ইংল্যান্ড দল দেশে ফিরছে চার্টার্ড বিমানে আর আগেই হেরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতেই বসে থাকতে হচ্ছে— এ নিয়ে খেলোয়াড়রা অসন্তোষ প্রকাশ করলে সোশাল মিডিয়ায় কুযুক্তি এবং গালাগালির শিকার হচ্ছেন। কী আশ্চর্য দেখুন! যে সুনীল গাভাসকর আজকাল কথায় কথায় বিসিসিআইয়ের ধ্বজা ধরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অতীতের অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার তত্ত্ব আওড়ান, তিনি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটপ্রেমীরা একসময় গাভসকরের নামে গান বেঁধেছেন, নিজেদের দেশে রাস্তার নাম রেখেছেন, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের প্রতি বৈষম্য দেখেও তিনি কিন্তু চুপ। যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিসিসিআইয়ের, তাদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিসিসিআই (যদি সরল শিশুর মত ধরে নিই, আইসিসিকে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে না) চুপ। মুখ খুলেছেন কে? ইংল্যান্ডেরই প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ব্যবহার সব দলের প্রতি সমান হওয়া উচিত। কার আইসিসিতে কত প্রভাব তার ভিত্তিতে কাজ হওয়া উচিত নয়।

পণ্ডিতরা বলেন, হিন্দুশাস্ত্রে লেখা আছে “অতিথি দেবো ভব”। মানে অতিথি হল ঈশ্বর। সংবিধানকে মারো গুলি, আমাদের ক্রিকেটে সবই হিন্দু মতে চলছে। শুধু অতিথিদের বেলায় ব্যতিক্রম। অন্য দেশের সমর্থকরা যাতে বেশি সংখ্যায় বিশ্বকাপ দেখতে আসতে না পারে, তার ব্যবস্থা পাকা করা হয় ভিসা নিয়ে নানা গ্যাঁড়াকল করে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভিসা নিয়েও প্রতিবার ঝামেলা পাকানো হয়।

অ্যাঁ, কী বলছেন? বিজেপি ক্রিকেট চালাচ্ছে তো কী হল, আসল কথা হল মাঠে জেতা? আজ্ঞে তা তো বটেই। তবে কিনা জগতের নিয়ম হল, কোনো দেশ চিরকাল জেতে না। কে ভেবেছিল ক্লাইভ লয়েড, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আজকের অবস্থা হবে? কে-ই বা ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়া চলতি বিশ্বকাপের শেষ চারেও উঠতে পারবে না? কেবল খেলার মাঠে নয়, জগতের কোনও ময়দানেই কেউ চিরকাল জেতে না। হারার সময় যখন আসে, তখন মানসম্মান তাদেরই বজায় থাকে, যারা নিজেদের সুসময়ে পরাজিতকে সম্মান দিয়েছিল। বেপরোয়া মস্তানদের শেষ পরিণতি নিয়ে বিস্তর বই-টই, সিনেমা-টিনেমা হয়েছে। চ্যাটজিপিটিকে তালিকা বানিয়ে দিতে বলুন।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।

আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।

এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।

চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।

আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।

কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?

সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ব্যথার পূজারা হয়নি সমাপন

বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর।

আমার মায়ের দিদিমা ছিলেন ধর্মপ্রাণ হিন্দু বিধবা, নিয়মকানুন সবই পালন করতেন। কিন্তু কেউ মারা গেলে ঘটা করে শ্রাদ্ধশান্তি করা নাকি পছন্দ করতেন না। আমাদের পরিচিত মহলে প্রায়ই দেখা যেত, কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা নিজের ছেলেমেয়ের কাছে চূড়ান্ত অবহেলার শিকার হলেন। কিন্তু তিনি মারা যেতেই তারা দুশো লোক খাইয়ে শ্রাদ্ধ করছে, দানধ্যান করছে, খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে মৃত মানুষটার প্রিয় খাবারদাবার। তখনই আমার মা স্মরণ করতেন ‘দিদিমা বলত, থাকতে দিলে না ভাতকাপড়, মরলে পরে দানসাগর।’ গত রবিবার (২৪ অগাস্ট) চেতেশ্বর পূজারা অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার, পূজারার সহখেলোয়াড়, সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার এবং ক্রিকেটভক্তদের প্রতিক্রিয়া দেখে ঠিক ওই কথাটাই মনে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে ঠিক দশ বছর আগে, ২০১৫ সালের ২৮ অগাস্ট, কলম্বোয় শুরু হওয়া ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা সিরিজের তৃতীয় টেস্টের কথা স্মরণ করা দরকার। সেই সিরিজের প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে খেলানো হয়নি, কারণ প্রবল প্রতিভাবান রোহিত শর্মাকে টেস্ট দলে যেনতেনপ্রকারেণ থিতু করার চেষ্টা চলছিল। জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে পরপর শতরান করার পর থেকে পাঁচ-ছয় নম্বরে ব্যাট করে তিনি আর সুবিধা করতে পারছিলেন না। শ্রীলঙ্কার মাটি ভারতীয় ব্যাটারদের পক্ষে কোনোদিনই দুর্জয় ঘাঁটি নয়, আর ততদিনে শ্রীলঙ্কার বোলিংও অনেকটা নিরামিষ। তাই রান করার দেদার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে তিন নম্বরে খেলানো হয়েছিল রোহিতকে। গলে প্রথম টেস্টে তিনি করেন যথাক্রমে ৯ ও ৪; ভারত হারে। দ্বিতীয় টেস্টে রোহিতকে আগলাতে ফেরত পাঠানো হয় পাঁচ নম্বরে, তিনে আসেন অজিঙ্ক রাহানে। রোহিত করেন ৭৯ ও ৩৪। অজিঙ্ক প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও, দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান করেন। তার উপর ভারত জিতে যায়। ফলে তৃতীয় টেস্টেও পূজারার খেলার সম্ভাবনা ছিল না, যদিও তার আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে ৭৩ ও ২১ (রোহিত ৪৩ ও ৬) আর ব্রিসবেনে ১৮ ও ৪৩ (রোহিত ৩২ ও ০) করে এসেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীনই প্রারম্ভিক ব্যাটার মুরলী বিজয়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট মাথাচাড়া দিল। আরেক প্রারম্ভিক ব্যাটার শিখর ধাওয়ানেরও চোট ছিল। তাহলে কে এল রাহুলের সঙ্গে ইনিংস শুরু করবেন কে? যুক্তি বলে – রোহিত, কারণ তাঁরই তো দলে জায়গা পাকা করা দরকার। তাছাড়া তিনি এই সিরিজেই আগে তিন নম্বরে ব্যাটও করেছিলেন। ক্রিকেট মহলের চিরকালীন যুক্তি হল – যে তিন নম্বরে ব্যাট করতে পারে, সে প্রয়োজনে ইনিংস শুরু করবে। এই যুক্তিতে রাহুল দ্রাবিড় পর্যন্ত একাধিকবার ইনিংস শুরু করেছেন। কিন্তু ওসব যুক্তি রোহিতের মত প্রতিভাবানদের জন্য নয়। তিনি সেই পাঁচ নম্বরেই খেললেন, পূজারাকে বলা হল – ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে। ওপেন করতে হবে। পূজারা এলেন, দেখলেন এবং নিজস্ব ভঙ্গিমায় জয় করলেন। সাড়ে সাত ঘন্টার বেশি ব্যাট করে অপরাজিত ১৪৫। ভারত করেছিল মোটে ৩১২, বাকি ব্যাটাররা সবাই ব্যর্থ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর লেগস্পিনার অমিত মিশ্রের ৫৯। দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, পূজারার ওই শতরানের জন্যই ভারত প্রথম ইনিংসে শতাধিক রানে এগিয়ে যায় এবং ম্যাচ ও সিরিজ জেতে।

এরপর কী হওয়ার কথা? ভূয়সী প্রশংসা এবং দলে জায়গা পাকা হয়ে যাওয়া। কিন্তু পূজারার বেলায় তা হয়নি। বাকিদের কথা ছেড়ে দিন, স্বয়ং সুনীল গাভস্কর ধারাভাষ্য দিতে দিতে কী বলেছিলেন মনে করিয়ে দিই। পূজারা যখন অর্ধশতরান করেন ওই ইনিংসে, তখন সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন যে, পূজারা কি এবার দলে পাকা হলেন? উত্তরে গাভস্কর বলেন, ওই দলে টিকতে থাকতে গেলে নাকি শ দেড়েক রান করতে হবে। গোটা দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র পূজারাকে এভাবেই দেখে এসেছে বরাবর। সেই কারণেই আজ তাদের পূজারার বিদায়ে চোখের জল ফেলা দেখে ‘ন্যাকা’ বলতে ইচ্ছে করছে। পূজারার ওই ইনিংসের কয়েক দিনের মধ্যেই মুকুল কেশবন কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে একখানা উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন। তাতে গাভস্করকে ওই মন্তব্যের জন্য তীব্র আক্রমণ করেন। মুকুল প্রশ্ন তোলেন ‘What team of titans was this? And what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?’ গোদা বাংলায় – কী এমন ভগবানদের দল এই ভারতীয় দলটা? কোন ব্র্যাডম্যানদের দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন পূজারা? মুকুলের এই তীক্ষ্ণতা অত্যন্ত যৌক্তিক, কারণ ওই ইনিংস খেলতে খেলতে পূজারার গড় ৫০ পেরিয়ে যায়। সেইসময় রোহিত আর রাহানে তো বটেই, বিরাট কোহলির গড়ও পঞ্চাশের নিচে ছিল।

ভারতীয় ক্রিকেটের সমস্যা হল, ওই কথাগুলো কোনো ক্রীড়া সাংবাদিক লেখেননি। মুকুলের মত কলাম লেখক, যাঁরা আরও নানা বিষয়ে লেখেন, এইসব গোলমাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে তাঁদেরই কলম ধরতে হয়। ক্রীড়া সাংবাদিকরা কখনো যে সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন তার স্বার্থে, কখনো বা নিজের কায়েমি স্বার্থে, যা সত্য তা বলেন না। জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেন না। যেসব ক্রিকেটার পরিশ্রমী কিন্তু গ্ল্যামারবিহীন কারণ সাদা বলের ক্রিকেটে সাফল্য নেই, পকেটে মোটা টাকার আইপিএল চুক্তি নেই, তাঁদের কয়েকটা ব্যর্থতাতেই ‘একে দিয়ে হবে না’ জাতীয় কথাবার্তা চালু করে দেন। পঞ্চাশ করলে বলেন একশো করতে হবে, একশো করলে বলেন দেড়শো করতে হবে, দেড়শো করলে বলেন ধারাবাহিক হতে হবে। যেন বাকিরা ভীষণ ধারাবাহিক। এই যে বিদায়ী প্রজন্মকে এখন ঘটা করে সোনার প্রজন্ম বলা হচ্ছে, তাদের একেকজনের ব্যাটিং গড় দেখুন – বিরাট (৪৬.৮৫), পূজারা (৪৩.৬০), রোহিত (৪০.৫৭), রাহানে (৩৮.৪৬)। সেরা ব্যাটারটির গড় প্রায় ৪৭। পঞ্চাশের উপরে দূরের কথা, ধারেকাছেও কেউ নেই। এই যদি সোনার প্রজন্ম হয়, তাহলে বলতে হবে সোনাও যা পেতলও তাই।

আসলে গত শতকের শেষ থেকেই যত দিন যাচ্ছে, ভারতে ক্রিকেট ব্যবসা হিসাবে তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ব্যবসা যত বড় হচ্ছে, তত খেলার যে অনিশ্চয়তা, খেলোয়াড়দের সাফল্য-ব্যর্থতার যে স্বাভাবিক উত্থান পতন – তা মেনে নেওয়া লগ্নিকারীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে দিনকে রাত, রাতকে দিন করতেই হবে। যে খেলোয়াড়কে দেখতে শুনতে ভাল, কুড়ি বিশের ক্রিকেটে বা একদিনের ক্রিকেটে (ক্রমশ এটার প্রভাবও কমে যাচ্ছে) সাফল্য আছে – তার তেলা মাথাতেই তেল দিতে হবে। সোজা কথায়, যে খেলোয়াড়কে ব্র্যান্ডে পরিণত করে তার হাত দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি পণ্যের বিজ্ঞাপন করানো যায়, তার সাফল্যই সাফল্য এবং সে সামান্য সফল হলেও সেটাকে বেলুনের মত ফুলিয়ে বিরাট করে দেখাতে হবে। কেবল টেস্ট খেলা শান্তশিষ্ট ক্রিকেটার ব্র্যান্ড হিসাবে বিকোবে না। অতএব সে খেলার জোরে ব্র্যান্ডের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে দেখলেই সাবধান হও। তার সাফল্যকে কমিয়ে দেখাও, ব্যর্থতাকে বাড়িয়ে দেখাও।

বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর। এখন সোশাল মিডিয়ায় যতজন পূজারাকে পুরনো যৌথ পরিবারের অল্প আয়ের বড়দার মত দেখছেন বা ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা যায় না’ কথাটা দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন, তাঁরাও অনেকে পূজারা দুটো ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বলেছেন – এটাকে বাদ দেয় না কেন?

কারণ গোটা বাস্তুতন্ত্র আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছে, বাদ দিতে হলে আগে পূজারাকেই বাদ দেওয়া উচিত, যেহেতু তাঁর ‘ইনটেন্ট’ নেই। কথাটা ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন সাদা বলের ক্রিকেটে আমাদের দুটো বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, পরে ওটাকে মুদ্রাদোষে পরিণত করেন বিরাট আর তাঁর দাদাভাই রবি শাস্ত্রী। রান করলে কি করলে না, হারলে না জিতলে – সেসব বড় কথা নয়। বড় কথা হল ‘ইনটেন্ট’ আছে কিনা। একথা যে কতবার অধিনায়ক থাকার সময়ে বিরাট আর কোচ হিসাবে শাস্ত্রী বলেছেন তার ইয়ত্তা নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, হারলেই ওই শব্দটা বেশি ব্যবহার করতেন তাঁরা। কারণ ওরকম গালভরা কথা বললে হারের কারণ নিয়ে কথা বলা এড়িয়ে যাওয়া যায়, টিম ম্যানেজমেন্টের দোষত্রুটি ঢেকে ফেলা যায়। আর ধারাভাষ্যকার হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ক্রিকেটাররা তো বহুকাল হল ‘রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’ নীতি নিয়েছেন, যেহেতু ভারতে ক্রিকেট সম্প্রচারের দায়িত্ব পুরোপুরি বিসিসিআইয়ের হাতে এবং তাদের অলিখিত শর্ত হল – ভারতীয় দলের বা কোনো ক্রিকেটারের সমালোচনা করা যাবে না। টিম ম্যানেজমেন্ট যা বলবে তা-ই শিরোধার্য। তাই তাঁরাও দিনরাত ‘ইনটেন্ট’ নিয়ে হাত-পা নেড়ে বাণী দিয়ে গেছেন। তার উপর আছে সোশাল মিডিয়া এবং বিরাট, রোহিতদের মত তারকাদের জনসংযোগ মেশিনারি। ফলে পূজারা আরও কোণঠাসা হয়েছেন। এতকিছু সামলে তিনি যে শতাধিক টেস্ট খেলে গেলেন, কেবল তার জন্যেই একখানা প্রণাম প্রাপ্য।

সোজা কথাটা সোজা করেই বলা দরকার। বিরাট, রোহিত, রাহানে, পূজারাদের ব্যাটিং প্রজন্ম মোটেই সোনার ছিল না, ছিল মাঝারি মানের। তাঁদের সময়ে ভারতের বোলিং অতীতের বহু বোলিং আক্রমণের চেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উন্নত হওয়ায় বেশকিছু স্মরণীয় জয় পেয়েছে দল। আবেগ বাদ দিয়ে দেখলে এটুকুই সত্যি। যে ব্যাটিং লাইন আপে একজনের গড়ও পঞ্চাশের উপরে নয়, সে ব্যাটিং নিজের সময়ের বিশ্বসেরাও নয়। ভারতীয় দলের খেলা বেচার জন্যে ওভাবে ব্র্যান্ডিং করা দরকার ছিল, তাই করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সোনার প্রজন্ম ছিল শচীন তেন্ডুলকর (৫৩.৭৮), রাহুল দ্রাবিড় (৫২.৩১), বীরেন্দ্র সেওয়াগ (৪৯.৩৪), ভিভিএস লক্ষ্মণ (৪৫.৯৭), সৌরভ গাঙ্গুলিদের (৪২.১৭) প্রজন্ম। ক্রিকেটের যে কোনো যুগে যে কোনো দলে প্রথম দুজন থাকলেই অধিনায়ক বলবেন – আর যে ইচ্ছে খেলুক, চিন্তা নেই। তার সঙ্গে আবার শুরুতে মারকুটে সেওয়াগ, নিচের দিকে বিপদের দিনে ঠিক খেলে দেওয়া সৌরভ আর লক্ষ্মণ। অথচ পূজারাদের প্রজন্মের দিকে তাকালে দেখা যাবে – সৌরভ, লক্ষ্মণ যেসব সীমাবদ্ধতার কারণে আরও বড় ব্যাটার হতে পারেননি, ঠিক সেগুলোই বিরাট-রোহিত-রাহানে-পূজারাদের ছিল। এঁরা কেউ সব দেশে প্রায় সমান সফল নন। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে চারজনেই মোটের উপর ব্যর্থ, ইংল্যান্ডের রেকর্ডও সুবিধাজনক নয়। পূজারার রেকর্ড তো বেশ খারাপ (মাত্র একটা শতরান, গড় ২৯), বিরাটের রেকর্ড তত খারাপ দেখায় না ২০১৮ সালের সফরের সৌজন্যে। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় এঁরা খুব সফল, যেমন সফল ছিলেন লক্ষ্মণ।

ফলে এই যে পূজারা অবসর নেওয়ার পরে তাঁকে অতিমানবিক চেহারা দেওয়া হচ্ছে, কাব্যি উপচে পড়ছে – এর কোনো যুক্তি নেই। এটা করা হচ্ছে, কারণ এই মুহূর্তে পূজারাকে নিয়ে গদগদ হয়ে কিছু লিখলেই প্রচুর ক্লিক, হিট, লাইক পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ পূজারা এখন ‘ট্রেন্ডিং’। এই চক্করে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় পাঁচ নম্বরে থাকা রাহুলের (১৩,২৮৮) সমগোত্রীয় বলা হচ্ছে পূজারাকে (৭,১৯৫)। এতে পূজারার গৌরব বাড়ে না, দৈত্যাকৃতি রাহুলকে বনসাই করার অপচেষ্টা হয়। পূজারা সম্প্রতি ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজে ধারাভাষ্য দিলেন। তাতে দেখা গেল শাস্ত্রীসুলভ চড়া গলায় আবেগমথিত কথাবার্তা বলার লোক তিনি নন, বরং অল্প কথায় গভীর বিশ্লেষণই তাঁর শক্তি। সুতরাং মনে হয়, তিনিও জানেন যে রাহুলের সঙ্গে তাঁর একটাই মিল – দুজনেই তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন দীর্ঘ সময়। বাকি সব অতিকথন।

এতক্ষণে নব্য পূজারাভক্তরা নির্ঘাত আস্তিন গোটাচ্ছেন, বলছেন ‘পূজারা খতরে মে হ্যায়’। দাঁড়ান, অত চটবেন না। পূজারা একেবারে কিছুই নন – একথা বলছি না। টেস্ট ক্রিকেটে সাত হাজার রান করাও কম কথা নয়। কিন্তু মুশকিল হল, গা জোয়ারি তুলনা এবং অতিকথনে ওই সাত হাজার রানের দাম কমে যায়। পূজারাকে তাঁর সমসাময়িক ভারতীয় ব্যাটারদের সঙ্গে তুলনা করলেই সঠিক গুরুত্ব মালুম হয়।

গত কয়েক দিন ধরে মূলত তাঁর একখানা ইনিংস নিয়েই যাবতীয় ভজন পূজন চলছে। সোশাল মিডিয়া থেকে খবরের কাগজ – সর্বত্র চোখে পড়ছে তাঁর হেলমেট পরিহিত, বাউন্সার এড়াতে ঈষৎ ঝুঁকে পড়া ছবি। সে ছবিতে চিহ্নিত করা – শরীরের কোথায় কোথায় বল লেগেছিল, তবু তিনি আউট হননি। অর্থাৎ সেই ২০২১ সালের ১৫-১৯ জানুয়ারির গাব্বা টেস্টের কথা হচ্ছে। ওই ইনিংস অবশ্যই অবিস্মরণীয়। সোয়া পাঁচ ঘন্টা ব্যাট করে, গায়ে ডজনখানেক আঘাত সহ্য করে অমূল্য ৫৬ রান করেছিলেন চতুর্থ ইনিংসে ৩২৮ রান তাড়া করতে নেমে। কিন্তু ভাগ্যিস শুভমান গিল (৯১) আর ঋষভ পন্থ (অপরাজিত ৮৯) ছিলেন। টেস্টটা ড্র হয়ে গেলে বা ভারত হেরে গেলে পূজারার ব্যথার পূজা ব্যর্থ হত, আজ কেউ ওই ইনিংসের কথা বলত না। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র, আমি-আপনিও যার অঙ্গ, এই ধরনের ইনিংসকে তার গুণমানের জন্য পাত্তা দেয় না।

বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে বলুন দেখি হনুমা বিহারী এখন কোথায়? ঠিক তার আগের টেস্টেই আহত অবস্থায়, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হেরে যাওয়া ম্যাচ প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাট করে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বিহারী। নইলে ব্রিসবেনে সিরিজ জেতার সুযোগ পাওয়াই জেতা যেত না। অথচ ওই ম্যাচের পর মাত্র চারটে টেস্টে খেলানো হয়েছিল বিহারীকে। সেগুলোতে যে একেবারে রান করতে পারেননি তাও নয়। অথচ তিনি আজ বিস্মৃত। আসন্ন রঞ্জি ট্রফিতে ত্রিপুরার হয়ে খেলবেন ঠিক করেছেন, অর্থাৎ বুঝে গেছেন যে আর জাতীয় দলে ফেরা হবে না। সিডনির সেই ইনিংসে ব্যথায় নড়তে পারছিলেন না বিহারীর সঙ্গী অশ্বিনও। তবুও দু ঘন্টার বেশি ব্যাট করে গেছেন, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণ শক্তির বোলিং আক্রমণ তাঁকে আউট করতে পারেনি। তারপরেও টিম ম্যানেজমেন্টের বিশ্বাস হয়নি যে অশ্বিনের ব্যাটিং শক্তি রবীন্দ্র জাদেজার চেয়ে খারাপ নয়। অশ্বিনকে বিদেশের মাঠে সেই বাইরেই বসে থাকতে হয়েছে। সম্প্রতি নিজের পডকাস্টে রাহুলের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টাস্পষ্টি অশ্বিন বলেও দিয়েছেন যে ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বলেই তিনি অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এই হল ভারতীয় ক্রিকেট। এখানে পূজারার ওই ইনিংস মনে রাখা হত ম্যাচ না জিতলে?

উপরন্তু চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে, যেন ওই ইনিংস আর ওই সিরিজ ছাড়া আর বলার মত কিছু কোনোদিন করেননি পূজারা। অথচ এই লেখা শুরুই করা গেছে এমন একটা ইনিংসের কথা দিয়ে, যেখানে দলের ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো পূজারা জেতার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে পূজারার একমাত্র শতরানটাও কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে একা কুম্ভ হয়ে লড়ার দৃষ্টান্ত। ২০১৮ সালে সাদাম্পটনে সেই ইনিংসে ভারতের তাবড় ব্যাটাররা অনিয়মিত স্পিনার মঈন আলিকে পাঁচ উইকেট দিয়ে বসেন। মাত্র ৮৪.৫ ওভারে ২৭৩ রানে অল আউট হয়ে যায় দল, পূজারা অপরাজিত ১৩২। তাঁর পরে সর্বোচ্চ রান ছিল অধিনায়ক বিরাটের – ৪৬। ম্যাচটা অবশ্য দল হেরেছিল।

পূজারার আরও বড় কীর্তি কী?

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাঁর রান এবং শতরান বিরাটের চেয়ে কম হলেও, গড় প্রায় সমান (বিরাট ৪৬.৭২; পূজারা ৪৭.২৮)। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। কে কত বড় খেলোয়াড় তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভাবতেই হয় কার খেলা ম্যাচের ফলাফলকে কতখানি প্রভাবিত করেছে। আজকাল ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ কথাটাও খুব চালু। তা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পূজারা কিন্তু বিরাটের চেয়েও বড় ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার। বিরাটের অস্ট্রেলিয়ায় সেরা সিরিজ ছিল ২০১৪-১৫ মরশুমে। সেবার তিনি চারটে টেস্টে চারখানা শতরান করেন। সেই সিরিজ ভারত হেরেছিল। ২০১৮-১৯ মরশুমে ভারত যখন জিতল, বিরাটের গড় ছিল ৪০.২৮। পার্থে যে ম্যাচে শতরান করেন, সে ম্যাচে ভারত প্রায় দেড়শো রানে হেরে যায়। সেই সিরিজে রানের পাহাড় গড়েছিলেন পূজারা। চার ম্যাচে ৫২১ রান (গড় ৭৪.৪২; শতরান ৩, অর্ধশতরান ১)। শেষ টেস্টে সিডনিতে শুরুতেই ভারত অস্ট্রেলিয়ার ঘাড়ে ৬২২ রানের গন্ধমাদন চাপিয়ে দিতে পেরেছিল পূজারার ম্যারাথন ১৯৩ রানের সৌজন্যে (সঙ্গে ঋষভের স্বভাবসিদ্ধ অপরাজিত ১৫৯)। সেই ইনিংসটা নিয়েও বিশেষ কথা হচ্ছে না।

আরও পড়ুন শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

২০২০-২১ মরশুমে যখন ভারত দ্বিতীয়বার সিরিজ জেতে, তখন বিরাট প্রথম টেস্টের পরে আর খেলেননি। অ্যাডিলেডের দিন-রাতের সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৭৪ রান করেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ অল আউটের লজ্জার মধ্যে ৪। এই সিরিজে পূজারার রান দেখলে মনে হবে সাধারণ (চার টেস্টে ২৭১; গড় ৩৩.৮৭; অর্ধশতরান ৩)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে তিনি পরাস্ত করেছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাট করে। গোটা সিরিজে ব্যাট করেছিলেন ১,৩৬৬ মিনিট, অর্থাৎ ২২ ঘন্টার বেশি। সেবারে খুব বেশি রান ওঠেনি, ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন ঋষভ – পূজারার থেকে মাত্র তিন রান বেশি। শতরান করেছিলেন একমাত্র রাহানে। কিন্তু ভারতের জেতার পিছনে পূজারার ৯২৮ বল খেলার ভূমিকা যে কতখানি, তা এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরের মুখে স্পষ্ট করে দিয়েছেন স্বয়ং জশ হেজলউড। তিনি বলেছেন – পূজারা না থাকায় অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে।

সুতরাং তথাকথিত সোনার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সাফল্য – অস্ট্রেলিয়ায় পরপর দুবার টেস্ট সিরিজ জয় – মহানায়ক বিরাট কুমার বা রোহিত কুমারের জন্যে আসেনি, এসেছে ‘ইনটেন্ট’ না থাকা পূজারার জন্যে। তবু তাঁর টেস্ট কেরিয়ার শেষ হয়েছে ওই দুজনের আগেই। কারণ তাঁর উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করা ছিল না বিজ্ঞাপনদাতাদের। ফর্ম পড়ে যাওয়ার কারণ তাঁকে বাদ দেওয়া যায়, ব্র্যান্ডদের বাদ দেওয়ার আগে নানা নাটক করতে হয়। রোহিত সম্পর্কে রটাতে হয় নিজেই নিজেকে দল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিরাট অবসর নিয়ে ফেলার পরেও ফিরে আসার গুজব ছড়ানো চলতে থাকে। ২০২৩ সালের জুন মাসে শেষবার টেস্ট খেলার পরে পূজারা সাসেক্সের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন এবং হাজার দুয়েক রান করেছেন। কিন্তু তিনি টেস্ট দলে ফিরবেন – এমন গুজব ছড়ায়নি। বিরাট টেস্ট থেকে অবসর নিয়ে নেওয়ার পরেও ভারতের এবারের ইংল্যান্ড সফরের আগে বেশকিছু সংবাদমাধ্যম বলতে শুরু করেছিল – বিরাট নাকি কাউন্টি ক্রিকেট খেলবেন। তরুণ ভারতীয় দল লম্বা সিরিজে বিপদে পড়ে গেলে নাকি তিনি এসে উদ্ধার করবেন। বিরাট কাউন্টি খেলেননি, ভারতের তরুণ ব্যাটিংয়ের উদ্ধারকর্তার প্রয়োজনও হয়নি।

পূজারাকে নিয়ে অমন গুজব ছড়ানোর সুযোগও ছিল না, কারণ তিনি কমেন্ট্রি বক্সে হাজির ছিলেন। মুশকিল হল, তাঁর ব্যাটিংয়ের মতই ধারাভাষ্যও শান্তশিষ্ট, যুক্তিনিষ্ঠ। বৃদ্ধ গাভস্করও যে যুগে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখাচ্ছেন কমেন্ট্রি বক্সে, যুক্তির তোয়াক্কা না করে উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছেন সামান্যতম কারণে, সেখানে পূজারার ধারাভাষ্য কি চলতে দেওয়া হবে? নাকি তাঁকে এখানেও ঘাড়ধাক্কা খেতে হবে? এই আশঙ্কা থেকেই মনে হয়, পূজারার ব্যথার পূজা এখনো শেষ হয়নি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হাশিম আমলা, ভিভিএস লক্ষ্মণের সমগোত্রীয় বিরাট কোহলি

গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি? ১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে?

যদি কোনো অস্ট্রেলিয়কে জিজ্ঞেস করেন ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা ডন ব্র্যাডম্যানকে বাদ দিলে আপনাদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটার কারা?’ উত্তরে মোটামুটি সকলেই যে নামগুলো বলবেন সেগুলো হল – গ্রেগ চ্যাপেল (গড় ৫৩.৮৬), অ্যালান বর্ডার (৫০.৫৬), স্টিভ ওয় (৫১.০৬), রিকি পন্টিং (৫১.৮৫), স্টিভ স্মিথ (৫৬.৭৪)। একই প্রশ্ন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কাউকে করলে যে নামগুলো আসবে সেগুলোও সবার জানা – গারফিল্ড সোবার্স (৫৭.৭৮), ব্রায়ান লারা (৫২.৮৮), ভিভিয়ান রিচার্ডস (৫০.২৩)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের তিন ডব্লিউও – এভার্টন উইকস (৫৮.৬১), ক্লাইড ওয়ালকট (৫৬.৬৮), ফ্র্যাংক ওরেল (৪৯.৪৮) – আলোচনায় আসবেন। দু-একজন হয়ত জর্জ হেডলির (৬০.৮৩) নামও করতে পারেন, তবে হেডলি মাত্র ২২ খানা টেস্ট খেলেছেন।

ইংরেজদের এই প্রশ্ন করলে তাঁরা আধুনিক ক্রিকেটারদের মধ্যে জো রুটের নাম অবশ্যই করবেন, কারণ জো প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই (৫০.৮৭)। ইনিংস শুরু করার মত শক্ত কাজ করে প্রায় সাড়ে বারো হাজার রান করেছেন এবং অধিনায়কত্ব করেছেন বলে অ্যালাস্টেয়ার কুকের নামও এসে পড়বে (৪৫.৩৫)। কিন্তু ইংরেজরা কুকের চেয়ে বেশি করে বলবেন ওয়াল্টার হ্যামন্ড (৫৮.৪৫), কেন ব্যারিংটনের (৫৮.৬৭) কথা। পাকিস্তানিদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটারদের নাম জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই তাঁরা জাভেদ মিয়াঁদাদ (৫২.৫৭), ইনজামাম-উল হক (৪৯.৬০), ইউনিস খানের (৫২.০৫) নাম করবেন। পুরনো দিনের লোকেরা হয়ত জাহির আব্বাস (৪৪.৭৯), হানিফ মহম্মদের (৪৩.৯৯) কথাও বলতে পারেন। কিন্তু প্রথম তিনজনের কীর্তি যে এই দুজনকে ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে গেছে তা নিয়ে বিশেষ বিতর্কের অবকাশ নেই।

এই দেশগুলোর চেয়ে অনেক পরে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে শুরু করা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটপ্রেমীরা অনায়াসে বলবেন তাঁদের দেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটারের নাম কুমার সঙ্গকারা (১২,৪০০ রান, গড় ৫৭.৪০)। তাছাড়াও বলবেন মাহেলা জয়বর্ধনের (১১,৮১৪ রান, গড় ৪৯.৮৪) কথা। অরবিন্দ ডি সিলভার নাম আসবে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। তিনিই শ্রীলঙ্কার প্রথম তারকা ব্যাটার। কিন্তু সাফল্যে অনেক পিছিয়ে (৬৩৬১ রান, গড় ৪২.৯৭)। বর্ণবৈষম্যের কারণে নির্বাসনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেটে ফেরত এসেছে ১৯৯১ সালে। তাই সেদেশের দুজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাটার গ্রেম পোলক (৬০.৯৭) আর ব্যারি রিচার্ডস (৭২.৫৭) যথাক্রমে ২২ খানা আর চারখানা টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা সর্বকালের সেরা ব্যাটার বলতে জাক কালিস (৫৫.৩৭) আর এবি ডেভিলিয়ার্সের (৫০.৬৬) নাম করবেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে, দলের দুঃসময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে একশোর বেশি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে সফল হয়ে, ইনিংস শুরু করার গুরুদায়িত্ব পালন করেও প্রায় দশ হাজার রান করে ফেলা গ্রেম স্মিথের (৪৮.৭০) নামও বলবেন নির্ঘাত। এঁদের পরে হাশিম আমলার (৪৬.৬৪) নামও বলতে পারেন, কারণ তিনিও প্রায় দশ হাজার রান করেছেন। কিন্তু কখনোই ওই তিনজনের আগে আমলার কথা বলবেন না। ঠিক যেমন কোনো ক্যারিবিয়ান ভুলেও তাঁদের সর্বকালের সেরাদের পাশে বসাবেন না শিবনারায়ণ চান্দেরপলকে, যতই তিনি ৫১.৩৭ গড়ে ১১,৮৬৭ রান করুন। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন যে ৫০ থেকে ৫৫ গড়ের ব্যাটার আর ৪৭ গড়ের ব্যাটারের জাতই আলাদা। এদের এক বন্ধনীতে রেখে আলোচনা করার কোনো মানে হয় না। আর কুড়ি বিশের ক্রিকেটের পেটে চলে যাওয়া ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটরসিকরা আজও বোঝেন, শুধু ধারাবাহিকতা সর্বকালের সেরাদের ক্লাবের পাস নয়। সর্বোচ্চ মানের বোলিংয়ের ঘাড়ে চেপে বসার ক্ষমতাও থাকতে হয়। সেটা চান্দেরপলের ছিল না।

বিরাট কোহলির অবসরগ্রহণ নিয়ে লেখায় তিন-তিনটে অনুচ্ছেদ জুড়ে এই আলোচনা কেন? কারণ এই মুহূর্তে কোনো ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীকে ভারতের সর্বকালের টেস্ট ব্যাটারদের নাম বলতে বললে সুনীল গাভস্কর (৫১.১৪) আর শচীন তেন্ডুলকরের (৫৩.৭৮) সঙ্গে বিরাট কোহলির (৪৬.৮৫) নামই বলবেন, রাহুল দ্রাবিড়ের (৫২.৩১) নাম বলবেন না। এমনকি সোশাল মিডিয়ায় অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে বিরাটকেই ভারতের সর্বকালের সেরা বলে দিতে। অবশ্য এ আর নতুন কী? তাঁকে তো কবেই গোটা খেলাটার GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) আখ্যা দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। অথচ ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে মোট রান (১৩,২৮৮) এবং গড়ের দিক থেকে রাহুল ঠিক শচীনের (১৫,৯২১) পরেই। এমনকি গড়ের দিক থেকে বীরেন্দ্র সেওয়াগও (৪৯.৩৪) কোহলির চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু ৪৭ গড়ের ব্যাটার আর পঞ্চাশের উপরে গড় যে ব্যাটারদের, তারা যে কোনোভাবেই তুলনীয় নয় – সেকথা বললে এখন কেবল ক্রিকেটভক্তরা নয়, প্রাজ্ঞ ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও মানবেন না। কথাটা অন্য দেশের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে বললে মানতে পারেন, চাই কি ওকথার সপক্ষে চাট্টি যুক্তিও জুগিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এদেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে বললে, বিশেষত বিরাটকে নিয়ে বললে তো গাভস্কর, তেন্ডুলকরও মানবেন না। গাভস্কর তো ইদানীং এত মহান হয়েছেন (বা এত নিচে নেমেছেন) যে ধারাভাষ্যে ঋষভ পন্থের কঠোর সমালোচনা করে পরে আবার সেই সমালোচনাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি বিজ্ঞাপনে ঋষভের সঙ্গে মুখও দেখাচ্ছেন।

অতএব বিশেষজ্ঞ এবং ভক্তদের বিরাটপুজোর প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে এসে উনি টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকালের সেরাদের মধ্যে ঠিক কোথায় পড়েন তা নিয়ে একটা নির্মোহ আলোচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছি। তার সূচনা পরিসংখ্যান দিয়েই করতে হত। কারণ ফুটবল বা হকির চেয়ে ক্রিকেটে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেক বেশি পরিমাপযোগ্য এবং একজন ব্যাটারের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য রান আর গড়কে গুরুত্ব দেওয়া আদ্যিকাল থেকে চলে আসছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই, আজকাল ক্রিকেটালোচনায় যে পরিসংখ্যানসর্বস্বতা এসে পড়েছে তা পরিহার্য। ক্রিকেট সম্প্রচার প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতায় আজকাল এমন অনেক পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা চলে যা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোঁসাইবাগানের ভূত গল্পের অঙ্কের মাস্টার করালীবাবুর জন্যে মনোরঞ্জক হতে পারে, কিন্তু খেলাটা সম্পর্কে কোনো সত্য উদ্ঘাটন করে না। তাছাড়া খেলাটা খেলে মানুষ, তার মানবিক সুবিধা-অসুবিধা সুস্থতা-অসুস্থতা সমেত; খেলা হয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। এসবের যে প্রভাব খেলার উপর পড়ে, তা অতিক্রম করে মানবিক প্রয়াসের সাফল্য-ব্যর্থতাই ক্রিকেটকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। তার সবকিছু পরিসংখ্যানে ধরা পড়া অসম্ভব। নেভিল কার্ডাসের কথা অনুযায়ী স্কোরবোর্ড গাধা। তা যদি না-ও হয়, স্কোরবোর্ড যে সর্বজ্ঞ নয় তা মানতেই হবে। সুতরাং পরিসংখ্যান পেরিয়েও বিরাটের অবদান নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

সংখ্যাতীত

সমস্যা হল, সেটা করতে গেলে বিরাটকে বিরাট তো দেখাবেই না, উলটে আরও সাধারণ দেখাবে। কারণ সর্বকালের সেরা যেসব নামের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয় (যাঁদের নিয়ে প্রথম তিনটে অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে), তাঁদের আমলের তুলনায় বিরাটের আমলে টেস্ট ক্রিকেট যে অনেক সহজ হয়ে গেছে তা অস্বীকার করা শক্ত। কথাটা কেবল আমিই বলছি এমন নয়। হর্ষ ভোগলে ২০২২ সালে ‘দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড’ নামে এক পডকাস্টে কথাটা সবিস্তারে বলেছিলেন এবং সেজন্যে বিস্তর ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। প্রসঙ্গটা ছিল তার আগের ৭-৮ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য। তিনি যা বলেছিলেন তার বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায়

আমি চাই না কেউ মনে করুক একটা দারুণ রেকর্ডের মধ্যে আমি ছিদ্রান্বেষণ করছি। কিন্তু মন দিয়ে রেকর্ডটা দেখলে আপনি দেখবেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা জিতিনি, নিউজিল্যান্ডে জিতিনি, ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে ৪-১ হেরেছিলাম। ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নম্বর হওয়ার জন্যে এটাই সবচেয়ে সহজ সময়। ৪-০ ফলে অ্যাশেজ জিতলেও এই অস্ট্রেলিয়া অতীতের অস্ট্রেলিয়া দলগুলোর মত নয়। ইংল্যান্ডের অবস্থা বেশ খারাপ। দক্ষিণ আফ্রিকা দলটা নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল এখন। আমি জানি এটা বিতর্কিত মন্তব্য হয়ে যাচ্ছে। ওদের বোলিং এখনো ওদের দেশে দারুণ। কিন্তু এই দলটা কালিস, আমলা, ডেভিলিয়ার্স, ফ্যাফ, গ্রেম স্মিথের সেই দল নয়। এই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকায় হারাতে পারা উচিত ছিল।

এই লেখায় আমরা যখন অধিনায়ক বিরাটকে নিয়ে আলোচনা করব, তখন হর্ষের এই উক্তির কাছে আবার ফিরতে হবে। কিন্তু আপাতত এখানে তিনি যা বলেছেন তাকে বিরাটের ব্যাটিং বিচারে কাজে লাগালে কী পাব? বুঝতে পারব যে বিরাটের খেলোয়াড় জীবনের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যেসব বোলিং আক্রমণের মোকাবিলা তাঁকে করতে হয়েছে, সেগুলো ক্রিকেটের ইতিহাসে কোথাও জায়গা করে নেওয়ার মত নয়।

অতীতে টেস্ট ক্রিকেটে প্রায় সব দলেই অন্তত একজন সত্যিকারের ফাস্ট বোলার থাকতেন। ‘সত্যিকারের’ বলতে যে বোলারের গতিই মূল শক্তি, স্পিড গানের যুগে বলতে হবে – ঘন্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি। গাভস্করের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তেমন ৪-৫ জন ছিলেন – অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, কলিন ক্রফট, মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল। দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যেত না। অস্ট্রেলিয়ার ছিল ডেনিস লিলি আর জেফ থমসনের জুটি, সঙ্গী হিসাবে লেন প্যাসকোর মত কেউ কেউ জুটে যেতেন। ইংল্যান্ডের ছিলেন বব উইলিস, পাকিস্তানের ইমরান খান। নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হেডলি তো একাই একশো। শচীনের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছিল কার্টলি অ্যামব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশের জোড়া ফলা। সঙ্গে কখনো ইয়ান বিশপ, কখনো প্যাট্রিক প্যাটারসন, কখনো উইনস্টন বেঞ্জামিন বা কেনেথ বেঞ্জামিন, কখনো আবার সেই বার্বাডোজের বিভীষিকা ফ্র্যাংকলিন রোজ। পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে বিরাটের একটাও টেস্ট খেলা হল না, শচীনও অল্পই খেলেছেন। কিন্তু যখন খেলেছেন তখন পাকিস্তানের হয়ে বল করেছেন ওয়াসিম আক্রম-ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার। শচীনের ক্রিকেটজীবনের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার জোরে বোলার ছিলেন মার্ভ হিউজ, ক্রেগ ম্যাকডারমট, মার্ক হুইটনিরা। পরে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাদের বোলিং আক্রমণ। নেতৃত্বে গ্লেন ম্যাকগ্রা, যিনি ঠিক ‘ফাস্ট’ বোলার নন, কিন্তু নিখুঁত লাইন লেংথ এবং সুইং আর সিমের ব্যবহারে ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্য। গতি জোগাতে তাঁর পাশে এসে যান ব্রেট লি। তাছাড়াও ছিলেন জেসন গিলেসপি। পল রিফেল, মাইকেল কাসপ্রোউইচ, ড্যামিয়েন ফ্লেমিংরা আসা যাওয়া করেছেন। একমাত্র ইংল্যান্ডেই সে যুগে ডমিনিক কর্ক আর অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ ছাড়া সত্যিকারের জোরে বোলার আসেনি, কিন্তু নিউজিল্যান্ড পেয়েছিল শেন বন্ডকে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত শচীনের আমলে অ্যালান ডোনাল্ডের নেতৃত্বে এসে পড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জোরে বোলাররা – ব্রেট শুলজ, ব্রায়ান ম্যাকমিলান, গতি কম হলেও প্রায় ম্যাকগ্রার মত নিখুঁত ফ্যানি ডেভিলিয়ার্স, লান্স ক্লুজনার, শন পোলক; পরের প্রজন্মে মাখায়া এনতিনি, ডেল স্টেইন, মর্নি মর্কেল।

বিরাট খেললেন কাদের? সারা পৃথিবীতে ক্রিকেট যে হারে বেড়েছে তাতে জোরে বোলারদের পক্ষে গতি ধরে রাখা যে শক্ত তা বলাই বাহুল্য। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে গোটা বিশ্বে ১৪৫+ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করা বোলার হাতে গোনা। একমাত্র ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ মিচেল জনসনের সেই গতি ছিল, পরের দিকে ইংল্যান্ডের জোফ্রা আর্চার আর মার্ক উডের। কিন্তু আর্চার ভারতের বিরুদ্ধে মাত্র দুটো টেস্ট খেলেছেন, উড খেলেছেন চারটে। বিরাটের সময়ের বিশ্বসেরা বোলার বলতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা, ইংল্যান্ডের সুইং শিল্পীদ্বয় জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রড, অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়ী মিচেল স্টার্ক-জশ হেজলউড-প্যাট কামিন্স। রাবাদা, স্টার্ক আর কামিন্স নিজেদের সেরা দিনে নতুন বলে ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করেন। বল পুরনো হয়ে গেলে, পিচ বোলিং সহায়ক না হলে স্টার্ককে ভীষণই নিরামিষ দেখায়। এতটাই, যে ২০১৪ সালে শেন ওয়ার্ন বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন – স্টার্কের শরীরী ভাষা এবং পারফরম্যান্স ‘সফট’। ২০২২ সালে তো বলে দিয়েছিলেন স্টার্ককে দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত। কামিন্স তেমন নন, কিন্তু তিনিও কদাচিৎ ব্যাটারকে স্রেফ গতিতে পরাস্ত করেন। হেজলউডের তো গতি অস্ত্রই নয়। তিনি খানিকটা ম্যাকগ্রার মত, মূলত লাইন লেংথ আর বাউন্স ব্যবহার করে সুইং আর সিমের উপর নির্ভর করেন।

ব্রড আর অ্যান্ডারসন যখন তরুণ ছিলেন তখন রাবাদা বা স্টার্কের মত গতিতেই বল করতেন, কিন্তু বিরাটের কেরিয়ার যত এগিয়েছে তত ওঁদের বয়স বেড়েছে এবং গতি কমেছে। ওঁরা মূলত সুইং শিল্পী। তাতেই বিরাটকে বিস্তর নাকানি চোবানি খাইয়েছেন। সেই কারণেই ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে বিরাটের গড় মাত্র ৩৩.২১ (১০৪৯ রান, শতরান ২, অর্ধশতরান ৫)। সুইং বোলিং নির্ভর আরেকটা দেশ হল নিউজিল্যান্ড, যাদের দলে টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্টের মত বোলার ছিলেন এবং যারা বিরাটের যুগের অন্যতম সেরা টেস্ট দলও বটে। সেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বিরাট খেলেছেন মাত্র চারটে টেস্ট, গড় ৩৬। নিজের দেশে বা ইংল্যান্ডে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাটের রেকর্ড বলার মত নয়। সাউদি-বোল্টের দেশের বিরুদ্ধে মোট চোদ্দখানা টেস্ট খেলে এক হাজার রানও করে উঠতে পারেননি, গড় মাত্র ৩৮.৩৬।

তবু তো বেশকিছু বিশ্বমানের সুইং বোলারকে খেলতে হয়েছে, যে ঝামেলায় বিরাটকে একেবারেই পড়তে হয়নি, তা হল বছরের পর বছর উঁচু মানের স্পিনারদের খেলা। শচীন, লারা, পন্টিং, কালিসদের যুগের মত শেন ওয়ার্ন, মুথাইয়া মুরলীধরন, মুস্তাক আহমেদ, সাকলিন মুস্তাকদের মানের স্পিনার আজ একজনও নেই। নাথান লায়ন বড়জোর প্রয়াত ডেরেক আন্ডারউডের মানের। ঘরের মাঠে একটা সিরিজে গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসরের বিরুদ্ধে গোটা ভারতীয় ব্যাটিং লাইন-আপ ল্যাজেগোবরে হয়েছিল সেই ২০১২-১৩ মরশুমে, বিরাটও হয়েছিলেন। ওই দুজনের কেরিয়ার লম্বা হলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু সোয়ান দ্রুত অবসর নিয়ে নেন আর পানেসর নাইট ক্লাবে অত্যধিক পান করে ফেলে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ইংল্যান্ড দল থেকে বিতাড়িত হন, ফিরতে পারেননি। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে পাকিস্তানের হয়ে অন্তত দুজন বিশ্বমানের স্পিনার টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন – সঈদ আজমল আর ইয়াসির শাহ। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে বিরাটের খেলা হয়নি। কেরিয়ারের শেষদিকে ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের আনকোরা স্পিনারদের খেলতে গিয়েই বিরাটের কী হাল হয়েছে আমরা দেখেছি। বিরাটভক্তরা অবশ্য এর মধ্যেও তাঁর মহানতা খুঁজে বার করেন। তিনি নাকি অধিনায়ক হিসাবে জিততে চান বলে ভীষণ স্পিন সহায়ক পিচ বানাতে বলতেন, তাই তত রান করতে পারেননি। একই কারণে নাকি তাঁর সমসাময়িক রোহিত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে, চেতেশ্বর পূজারাও দেশের মাঠে স্পিনের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারেননি। এর চেয়ে হাস্যকর যুক্তি কিছু হতে পারে না। তার কারণ অনেকগুলো।

প্রথমত, ভারতে চিরকালই স্পিন সহায়ক পিচ হয়। এরকম পিচে খেলেই ভারতীয় ব্যাটাররা বড় হন। তাই শচীন, গাভস্কর, রাহুলের মত সর্বকালের সেরাদের কথা ছেড়ে দিন; নভজ্যোৎ সিং সিধুর মত সাধারণ ব্যাটারও দেশের মাঠে স্পিনারদের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করতেন। ওয়ার্ন এখানে এসে সুবিধা করতে পারেননি, মুরলীরও ভারতের মাটিতে গড় ৪৫.৪৫, যেখানে তাঁর গোটা কেরিয়ারে গড় ২২.৭২। অথচ ওঁদের দলের বিরুদ্ধে ভারতের কুম্বলে, হরভজন সিং প্রমুখ কিন্তু দিব্যি উইকেট নিয়ে গেছেন। সেওয়াগও স্পিনারদের ত্রাস ছিলেন, মহম্মদ আজহারউদ্দিন বা ভিভিএস লক্ষ্মণ ব্যাট করলে তো স্পিন বোলিং একটা করার যোগ্য কাজ বলেই মনে হত না। সুতরাং স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বিরাট এবং তাঁর প্রজন্মের অন্য ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিনটা ভাল খেলতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশের মাটিতে বিরাট কিন্তু অনেক রান করেছেন। চোদ্দটা শতরান সহ ৫৫ টেস্টে ৪৩৩৬ রান, গড় ৫৫.৫৮। এই রানগুলো কোন ধরনের পিচে হয়েছিল তাহলে?

তৃতীয়ত, যদি বলা হয় বিরাটের অধিনায়কত্বে এমন ঘূর্ণি পিচ বানানো হত যা ভারতে অভূতপূর্ব এবং তাতে যে কোনো স্পিনার বল করলেই খেলা শক্ত হত, তাহলে মানতে হবে যে ৬৮ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৪০ খানা জিতে নেওয়ার যে রেকর্ড, তাতে পিচের অবদান বিরাটের অধিনায়কত্বের চেয়ে বেশি। উপরন্তু, রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার কৃতিত্বও তাহলে যতখানি বলা হয় ততখানি নয়। যে কোনো দুজন স্পিনারই ওই ম্যাচগুলো জিতিয়ে দিতে পারতেন। বিরাটভক্তরা এ যুক্তি মানবেন কি?

বিরাটের অধিনায়কত্ব এবং তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যাটিং নিয়ে কথাবার্তা শেষ করে নেওয়া যাক। এই যে দেখা গেল সত্যিকারের ফাস্ট বোলার এবং উচ্চমানের স্পিনারদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিরাট শেষ করলেন ৪৭ গড়ে, তা থেকে কী কী প্রমাণ হয় ভাবি।

তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের মধ্যে তো পড়েনই না, এমনকি পরিসংখ্যানের দিক থেকে ভারতের সেরা পাঁচজন ব্যাটারের মধ্যে পড়লেও নৈপুণ্যে তিনি গাভস্কর, শচীন, রাহুলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। বরং লক্ষ্মণের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায়। দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় সফল আর লক্ষ্মণও কোনোদিন ইংল্যান্ডের মাটিতে সুবিধা করতে পারেননি। বিরাটের ওখানকার রেকর্ডটা তবু ভদ্রস্থ দেখায় ২০১৮ সালের দ্বিতীয় সফরটার জন্যে। ইংল্যান্ড সফরকে যে কোনো ব্যাটারের জাত চেনানোর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। সেখানে বিরাটের চেয়ে এমনকি দিলীপ বেঙ্গসরকর আর সৌরভ গাঙ্গুলিও বেশি সফল

তবে শুধু সেকথা নয়। গাভস্কর গোটা ক্রিকেটজীবনে কত হারা ম্যাচ বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার হিসাব করাই শক্ত। তা বাদে ১৯৭৬ সালে পোর্ট অফ স্পেনে চতুর্থ ইনিংসে ৪০৩ রান তাড়া করার সময়ে তাঁর ম্যাচ জেতানো শতরান বিপক্ষ বোলিং আর পরিস্থিতির বিচারে মহাকাব্যিক। তেমনই অবিশ্বাস্য ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ওভালে চতুর্থ ইনিংসে ৪৩৮ তাড়া করতে নেমে ২২১ রান, যা ভারতকে এক অভাবনীয় জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। এমনকি গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি?

১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে? পাকিস্তান ম্যাচটা তো তাও জেতাতে পারেননি শচীন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে চিপকের ঘূর্ণি উইকেটে সোয়ান-পানেসর জুটির বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে শতরান করে সে কাজও করে দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে সিডনিতে তাঁর অপরাজিত ২৪১ রানও ভোলার নয়। ওই ইনিংস যে ঋষিপ্রতিম সংযমের দৃষ্টান্ত, সেকথা বারবার বলা হয়। যা আমরা খেয়াল করি না, তা হল কতগুলো স্কোরিং শট তূণে থাকলে অফসাইডে ড্রাইভ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েও অতগুলো রান করা যায়। বিরাটের হাতে যদি অতরকম শট থাকত, তাহলে শেষ পাঁচ বছরে সাফল্যের লেখচিত্র এভাবে নামত না।

দুই লিটল মাস্টারের তবু অনেক ভক্ত আছে, বিস্তর লেখালিখি হয় ওঁদের নিয়ে। কিন্তু দ্রাবিড়? জীবনের প্রথম টেস্ট সিরিজ ইংল্যান্ডে, দলে তখন ডামাডোল। লর্ডসে অভিষেকেই ৯৫ চাপা পড়ে গিয়েছিল সৌরভের ঝলমলে শতরানের পাশে। কিন্তু নিজের নবম টেস্টেই সব গাছ ছাড়িয়ে ওঠে তাঁর মাথা। জোহানেসবার্গে ডোনাল্ড, পোলক, ম্যাকমিলান, ক্লুজনারের বোলিংয়ে ১৪৮ আর ৮১ করেন। ২০০২ সালে হেডিংলিতে সবুজ পিচে মেঘলা দিনে ১৪৮ তো প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে জেতার অসামান্য কাহিনি। এমনকি জীবনের শেষ ইংল্যান্ড সফরেও, যখন গোটা দলের ব্যাটিং ব্যর্থ, দ্রাবিড় চারটে টেস্টে তিনটে শতরান করে গেছেন। আর এই রত্নখচিত মুকুটের কোহ-ই-নূর অবশ্যই ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইডেন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের ১৮০। বিরাট কোন বিচারে এঁর চেয়ে বড় ব্যাটার?

বিরাট নিজের প্রজন্মেরও এক নম্বর ব্যাটার নন। স্মিথ আর রুট তো বটেই, কেন উইলিয়ামসনের (১০৫ টেস্টে ৯,২৭৬ রান; গড় ৫৪.৮৮, শতরান ৩৩) সঙ্গেও টেস্টে তাঁর তুলনা চলে না।

নিঃসংশয়ে বিরাট নিজের প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার। ব্যাট হাতে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অস্ট্রেলিয়ার মাঠে রীতিমত মস্তানি। ২০১৪-১৫ মরশুমে চার টেস্টে চারটে শতরান অবিস্মরণীয়। অ্যাডিলেডে দুই ইনিংসেই শতরানও অসাধারণ কীর্তি। পরবর্তীকালেও অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর সেরা খেলা বেরিয়ে এসেছে। ও দেশে সাতখানা শতরান, নিজের কেরিয়ারের গড়ের চেয়ে বেশি গড়ে রান করা যে কোনো ব্যাটারের পক্ষে গর্বের। তিরিশটা শতরান করেছেন, ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দ্বিশতরানও করেছেন। এ তো চাট্টিখানি কথা নয়।

পরিসংখ্যানের বাইরে চলে গেলে অবশ্য বলতে হয় যে গত শতকের তুলনায় এই শতকে অস্ট্রেলিয়ার পিচগুলোর চরিত্র বদলেছে অনেক। তাতে রান করা সহজ হয়েছে। ১৯৯১-৯২ সফরে ভারত যে পিচগুলোতে খেলেছিল তার প্রচণ্ড গতি এবং বাউন্স আজও টের পাওয়া যায় ইউটিউব খুললে। তার সঙ্গে গত ১০-১৫ বছরের পিচগুলোর তফাত বোঝা কঠিন নয়। এই তফাত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় ড্রপ-ইন পিচ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে। ভারতের এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে পার্থের অপটাস স্টেডিয়ামের পিচ বরং নয়ের দশকের ওয়াকা (Western Australia Cricket Association) মাঠের পিচের কাছাকাছি আচরণ করেছে। এখানে একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ পর্যন্ত মাত্র চারটে ত্রিশতরান হয়েছে। প্রথমটা এসেছিল ১৯৬৬ সালে মেলবোর্নে বব কাউপারের ব্যাট থেকে। বাকি তিনটেই এই শতাব্দীতে। প্রথমে ২০০৩ সালে ম্যাথু হেডেন পার্থে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৩৮০ করেন, তারপর ২০১২ সালে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাডিলেডে মাইকেল ক্লার্ক করেন অপরাজিত ৩২৯ আর ২০১৯ সালে সিডনিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ডেভিড ওয়ার্নার অপরাজিত ছিলেন ৩৩৫ রানে।

অধিনায়কত্ব ও উত্তরাধিকার

হর্ষ ভোগলের যে মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম গোড়ার দিকে, তার কাছে ফিরে যাওয়া যাক। মহেন্দ্র সিং ধোনি আর বিরাটের আমলে ভারতীয় দলের কোচ, টিম ডিরেক্টর ইত্যাদি পদে থাকা রবি শাস্ত্রী যা-ই বলে থাকুন, ঘটনা হল বিরাটের আমলে ভারতের টেস্ট দলের বিদেশে সাফল্য মোটেই ঈর্ষণীয় নয়। হর্ষ একেবারে সত্যি কথা বলেছিলেন। বিরাটের আমলে ভারত নিউজিল্যান্ডকে নিউজিল্যান্ডে হারাতে পারেনি, দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল দলটাকে সামনে পেয়েও দুবারের চেষ্টায় একবারও সিরিজ জিততে পারেনি। গর্ব করার মত সাফল্য বলতে পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। তার মধ্যে ২০২০-২১ মরশুমে কিন্তু প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে লজ্জাজনকভাবে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল বিরাটের ভারত। দ্বিতীয় টেস্ট থেকে তিনি ছিলেন না। মেলবোর্নে লড়াকু শতরান করেন অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানে, ভারত জেতে। তারপর সিডনির তৃতীয় টেস্টে হনুমা বিহারী আর অশ্বিন শেষদিনে অত্যাশ্চর্য ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচিয়ে দেন। ব্রিসবেনে চতুর্থ টেস্ট জিতে ভারত সিরিজ পকেটস্থ করে। এই জয়ের কৃতিত্বও অধিনায়ক বিরাটের হলে আইআইটি, আইআইএম তৈরির কৃতিত্ব ইংরেজদের।

আমাদের আজকাল তথ্যের প্রতি প্রবল অনীহা আর নাটকীয়তার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। তাই বিরাটের অবসর ঘোষণার পর থেকেই প্রচুর লেখালিখি হচ্ছে ২০২১ সালের লর্ডস টেস্ট নিয়ে। সেখানে চতুর্থ ইনিংসে ৬০ ওভার মত বল করার সুযোগ পেয়ে ভারত ইংল্যান্ডকে ৫১.৫ ওভারেই অল আউট করে ম্যাচ জিতে নেয়। শোনা গিয়েছিল, বিরাট ইংল্যান্ডের ইনিংস শুরুর আগে দলের সবাইকে বলেছেন ‘এই ৬০ ওভার যেন ওদের জন্যে নরক হয়ে দাঁড়ায়’। তারপর ওই জয়। সুতরাং বলা হচ্ছে – ওই আগ্রাসনই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিরাটের দান, ওই তাঁর উত্তরাধিকার। যা বলা হচ্ছে না, তা হল, ওই সিরিজটাও কিন্তু ভারত জেতেনি। ঠিক পরের টেস্টেই প্রথম ইনিংসে ভারত ৭৮ রানে অল আউট হয়ে যায়, বিরাট নিজে করেন সাত। আগ্রাসনের ‘আ’ দেখা যায়নি। ম্যাচটা ইনিংসে হারতে হয়।

ভারত ২-১ এগিয়ে থাকা অবস্থায় সিরিজের শেষ টেস্ট খেলাই হয়নি অদ্ভুত কারণে। শাস্ত্রী আর বিরাট কোভিডজনিত বায়ো বাবল ভেঙে এক বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন। তারপর দেখা যায় শাস্ত্রী, ফিল্ডিং কোচ শ্রীধর, বোলিং কোচ ভরত অরুণ কোভিড পজিটিভ। ফলে ভারত আর শেষ টেস্ট খেলতে চায়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের অবশ্য অভিযোগ – তার কয়েকদিন পরেই আইপিএল ফের চালু হওয়ার কথা ছিল। ভারতীয় ক্রিকেটাররা তার জন্যে সুস্থ থাকতেই টেস্টটা খেলতে চাননি। না হয় সেকথা আমরা বিশ্বাস করলাম না। কিন্তু যে বিরাট টেস্ট অন্তপ্রাণ ছিলেন বলে লেখালিখি চলছে, তিনি কোন আক্কেলে বায়ো বাবল ভেঙে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন ঠিক শেষ টেস্টের আগে? এ প্রশ্ন এতদিন কেউ তোলেননি, আর তুলেই বা কী হবে? যা-ই হোক, ওই পঞ্চম টেস্ট খেলা হয় পরের বছর জুলাইয়ে। ততদিনে বিরাটের টেস্ট অধিনায়কত্ব চলে গেছে। সে ম্যাচে ভারত হারে, সুতরাং সিরিজের ফল হয় ২-২। তার আগের সফরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, বিরাট প্রায় ছশো রান করলেও সিরিজটা কিন্তু ৪-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল।

একথা ঠিক যে বিরাটের নেতৃত্বে ভারতকে ভারতে কেউ হারাতে পারেনি। কিন্তু সে এমন কিছু চোখ কপালে তোলার মত ব্যাপার নয়। ভারত সম্পর্কে চিরকালই বলা হত – দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল। গতবছর নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩-০ হারার আগে ভারত ঘরের মাঠে শেষ সিরিজ হেরেছিল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে। তার আগে ২০০৪-০৫ মরশুমে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। তার আগের সিরিজ হার ছিল ১৯৯৯-২০০০ মরশুমে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের আগের সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড তো গতবছরই প্রথম জিতল। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে।

অন্যদিকে ভারতের বিদেশ সফরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইংল্যান্ডই একমাত্র দেশ যেখানে ভারত মাঝেমধ্যেই সিরিজ জিতেছে। অধিনায়ক হিসাবে অজিত ওয়াড়েকর জিতেছেন (১৯৭১), কপিল জিতেছেন (১৯৮৬), দ্রাবিড় জিতেছেন (২০০৭)। বিরাট পারেননি। এমনকি নিউজিল্যান্ডেও ভারত মনসুর আলি খান পতৌদি (১৯৬৭-৬৮) আর ধোনির আমলে (২০০৮-০৯) সিরিজ জিতেছিল। বিরাটের আমলে পারেনি।

ভারতকে জোরে বোলারদের দলে পরিণত করা বিরাটের উত্তরাধিকার বলে গণ্য করা হচ্ছে। যেন আটের দশকে ইমরান পাকিস্তানের জন্যে যা করেছিলেন, বিরাট তাই করেছেন। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করেছেন বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ, উমেশ যাদব, ভুবনেশ্বর কুমার প্রমুখকে। অথচ ঘটনা তা নয়, হওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ ভারতীয় দল সারাবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে বছর পঁচিশেক হয়ে গেল। তার উপর আছে আইপিএল। ফলে বিরাটের মত শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সুযোগই হয় না। কী করে জানবেন কোথায় কোন ভাল জোরে বোলার আছে? ওই কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয় তো দিতে হবে এই পর্বে যাঁরা নির্বাচক ছিলেন তাঁদের। বস্তুত ভারতে জোরে বোলারের সংখ্যা এবং গুণমান বাড়ার একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের সুবিধাই অধিনায়ক বিরাট পেয়েছেন। একসময় বেদিকে নতুন বলে বল করতে হত, এমনকি গাভস্করও করেছেন দু-একবার। সেখান থেকে বুমরা-শামিতে পৌঁছনো বিরাট নামক কোনো জাদুকরের ইন্দ্রজাল নয়। জিনিয়াস কপিল; তাঁর পিছু পিছু মধ্যমেধার চেতন শর্মা, মনোজ প্রভাকর; তারপর সত্যিকারের গতিময় জাভাগাল শ্রীনাথের সঙ্গে মূলত সুইং বোলার ভেঙ্কটেশ প্রসাদ; অতঃপর জাহির খান, আশিস নেহরা, ইরফান পাঠান, শান্তাকুমারণ শ্রীশান্ত, আর পি সিং; রঞ্জি ট্রফিতে সবুজ পিচ, ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির যত্ন – এত কিছু পেরিয়ে আজকের জোরে বোলাররা এসেছেন। বস্তুত বিরাট অধিনায়ক হওয়ার আগেই এসে পড়েছিলেন ইশান্ত শর্মা, উমেশ, ভুবনেশ্বর, বুমরা, শামি। এঁদের মধ্যে একমাত্র বুমরার টেস্ট অভিষেকই বিরাটের অধিনায়কত্বে।

তারপর যে জোরে বোলাররা এসেছেন তাঁরা কেউ কিন্তু এখনো ভরসা জাগানোর জায়গায় পৌঁছতে পারেননি। টানা দু-তিনটে সিরিজই খেলে উঠতে পারেন না ফিটনেসের সমস্যায়। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, আকাশ দীপ, হর্ষিত রানাদের উপরে পরবর্তী টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা এত কম যে পরপর ৪-৫ খানা টেস্টে সুযোগ দেয় না। অস্ট্রেলিয়া সফরে মেলবোর্নে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে অধিনায়ক পারলে বুমরাকে দিয়েই সবকটা ওভার করিয়ে নেন। তাঁকে নিজমুখে বলতে হল – আর পারছি না। শেষ টেস্টে খেলতেই পারলেন না। তাহলে কীরকম পেস ব্যাটারির উত্তরাধিকার অধিনায়ক বিরাটের? উত্তরাধিকার তো তাই, যা একজনের প্রস্থানের পরেও রয়ে যায়।

সুতরাং প্রচারের ঢক্কানিনাদ আর আবেগের বাষ্প সরালে যা দেখতে পাচ্ছি, তা হল বিরাট টেস্ট ব্যাটার হিসাবে সর্বকালের সেরাদের দলে পড়েন না। পড়েন আমলা, লক্ষ্মণদের দলে। এই দলে ঢুকে পড়াও বড় কম কথা নয়। অবশ্য আমলার খাতায় একটা ত্রিশতরান আছে, লক্ষ্মণের এমন একখানা ২৮১ আছে যার জন্যে তাঁর নাম ক্রিকেটের ইতিহাসে অক্ষয়। বিরাটের সেসব নেই। অধিনায়ক হিসাবে পরিসংখ্যানগতভাবে অবশ্যই তিনি ভারতের সেরা, কিন্তু তা ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির ধারাবাহিকতাতেই। শ্রীকান্তের পর থেকে যাঁরা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন তাঁদের সাফল্যের হার ক্রমশ বেড়েছে। আজহার অতীতের সকলের চেয়ে বেশি সফল, সৌরভ আজহারের চেয়ে বেশি সফল, ধোনি সৌরভের চেয়ে বেশি সফল, বিরাট ধোনির চেয়ে বেশি সফল। আর বিরাটের উত্তরাধিকার কী – সে প্রশ্ন আপাতত উত্তরকালের জন্যে তুলে রাখাই ভাল।

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।

ভারতীয় বোলিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল, ব্যাটিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা থেকে। বোলার হিসাবে এঁদের মাঝারিয়ানা আগের লেখায় দেখিয়েছি, কিন্তু ভারতীয় দলের মেগাস্টার ব্যাটারদের মাঝারিয়ানা আরও সরেস। এতটাই সরেস যে এই দুজনের ব্যাটের হাত সাধারণ বোলারদের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাল না হলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের লজ্জায় ভারতকে অনেক আগেই পড়তে হত। কিন্তু ভারত এমন এক দেশ যেখানে ব্যাটারদের সাত খুন মাফ। তাই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা বছরের পর বছর রান না করেও কলার তুলে ঘুরতে পারেন। ভাগ্যিস নিউজিল্যান্ড ৩-০ করে দিয়ে গেছে। ওয়াংখেড়ের ‘ডেড রাবার’ যদি কোনোমতে ঋষভ পন্থ জিতিয়ে দিতেন, তাহলে এই যে এখন দীনেশ কার্তিকের মত প্রাক্তনরা ঢোঁক গিলে বিরাট, রোহিতকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বলছেন – এটুকুও হত না।

দেশে, বিদেশে গত এক যুগ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি থেকে বিরাট হয়ে রোহিতের আমল পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। তার অনেকখানি কৃতিত্ব অশ্বিন আর জাদেজার। বস্তুত গ্যারি সোবার্স, জাক কালিস, ইয়ান বোথাম, কপিলদেব, ইমরান খান, রিচার্ড হেডলির মত কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের বাদ দিলে টেস্টে অশ্বিন আর জাদেজার মত অতগুলো উইকেটের সঙ্গে এত রান করা ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া ভার। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারার পর থেকে এই নিউজিল্যান্ড সিরিজে হারের মাঝের যে সময়টা নিয়ে বিস্তর গর্ব আমাদের, সেই সময়কালের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয় এবং ড্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা। বিশেষত শেষ ৫-৬ বছরে উইকেটরক্ষক পন্থ আর বোলাররাই ভারতের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এমনকি ২০২০-২১ মরশুমে ব্রিসবেনের গাব্বায় যে জয় নিয়ে আমাদের যারপরনাই গর্ব, সেই টেস্টেও ব্যাট হাতে রোহিতের অবদান ছিল ৪৪, ৭। বিরাট সেই টেস্টে খেলেননি। প্রথম ইনিংসে শুভমান গিল, পূজারা, রাহানে, মায়াঙ্ক আগরওয়াল – কেউই সুবিধা করতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর আর শার্দূল ঠাকুর জোড়া অর্ধশতরান না করলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসেই বিরাট লিড পেয়ে যেত। দ্বিতীয় ইনিংসেও গিল (৯১) আর পূজারার (৫৬) লড়াই বৃথা যেত পন্থ (অপরাজিত ৮৯) আর ওয়াশিংটন (২২) না থাকলে।

চট করে প্রথম চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যাবে। তারপর কোনো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটার অশ্বিন, জাদেজা বা অন্য বোলারদের সঙ্গে নিয়ে ভদ্রস্থ রান তুলে দেবেন বা ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, নিদেনপক্ষে হার বাঁচিয়ে দেবেন – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। পৃথিবীর সর্বত্র, যে কোনো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। অথচ এবার ৩-০ হওয়ার পরে এমন ভান করা হচ্ছে যেন স্রেফ স্পিন খেলতে না পেরেই আমাদের এই অবস্থা হয়েছে এবং ভারি অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বারবার ঘটে চলা ব্যাটিং ব্যর্থতা খেয়াল করলে বোঝা যায় – এটাই প্রত্যাশিত ছিল। আগে কেন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।

বেশি পিছোতে হবে না। যে বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়ে দিয়েছি বলে কদিন আগেই পেশি ফোলালাম আমরা, তাদের সঙ্গেই সেপ্টেম্বরে চেন্নাইতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সকালে ৯৬ রানে চার উইকেট চলে গিয়েছিল আমাদের। তথাকথিত বিশ্বসেরা ওপেনার রোহিত আর তথাকথিত সর্বকালের সেরা ব্যাটার কোহলি আনকোরা হাসান মাহমুদের সুইং সামলাতে না পেরে ছখানা করে রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন। গিল তো খাতাই খুলতে পারলেন না। পন্থ ৩৯ রান করেছিলেন, সুপ্ত প্রতিভাসম্পন্ন কে এল রাহুল আবার ব্যর্থ। সেদিনও জাদেজা ৮৬ আর অশ্বিন শতরান না করলে শ দুয়েক রানেই গুটিয়ে যেত ভারতের ইনিংস। বিপক্ষ দলের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভাল হলে কী হত সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর প্রথম টেস্টে। প্রথম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন জোরে বোলিং সহায়ক আবহাওয়ায় ম্যাট হেনরি আর বাচ্চা ছেলে উইলিয়াম ও’রুর্ক ৪৬ রানে গুটিয়ে দিলেন ভারতের ইনিংস। স্কোরবোর্ড জুড়ে শূন্য আর দুইয়ের ছড়াছড়ি। রোহিত সুইং সামলাতে পারবেন না বুঝে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে দুই রানে বোল্ড, আর কোহলি দীর্ঘকায় ও’রুর্কের বাউন্স সামলাতে না পেরে লেগ স্লিপের হাতে বল জমা দিয়ে শূন্য রানে আউট। দ্বিতীয় ইনিংসের ভাল ব্যাটিং ইনিংস হার বাঁচানোর কাজটুকু করতে পেরেছিল। তাও রোহিত যেভাবে আউট হলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি সেই স্তরে পৌঁছেছেন যেখানে শরীর চলে তো মাথা কাজ করে না। নইলে নিজের ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ স্ট্রোকে মুগ্ধ হয়ে থেকে বলটা গড়িয়ে উইকেটে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করতে ভুলে যাবেন কেন?

ভারতীয় দল এবার অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বর্ডার-গাভস্কর ট্রফির অঙ্গ হিসাবে পাঁচখানা টেস্ট খেলতে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। তার একটা বড় কারণ – দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থ কোনো ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান, বা সম্ভাবনাময়, বা সিনিয়র, বা অধিনায়ক, বা রেকর্ড করবে – এই অজুহাতে তারা বয়ে বেড়ায়নি কোনোদিন। বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও ২০০৩ বিশ্বকাপের একবছর আগে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বয়স তখন ৩৭। ফর্ম নেহাত খারাপ ছিল না, অর্থাৎ বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। আর এদেশে আমরা কী করছি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৩৭ বছরের রোহিতের না শরীর চলছে, না মাথা ঠিকমত কাজ করছে (সদ্যসমাপ্ত সিরিজে অধিনায়কত্বে অজস্র ভুলও স্মর্তব্য)। তাঁর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বিরাটও সোজা ফুলটসে ক্রস ব্যাট চালিয়ে বোল্ড হচ্ছেন, বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতেই পারছেন না। অথচ এতদিনে এঁদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওসব পরামর্শ ৩০-৩২ বছরের ব্যাটারদের দিতে হয়, কারণ তাঁদের বয়স অনুযায়ী খেলা বদলে নিয়ে ফিরে আসার সময় থাকে। রোহিত, বিরাটের বয়সটা সটান বলে দেওয়ার সময় – বাপু, এবার মানে মানে বিদায় হও। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞরা, সাংবাদিকরা, নির্বাচকরা – কেউ সেকথা বলবেন না।

কোনোদিনই যে কেউ বলতেন না তা কিন্তু নয়। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। আর ঠোঁটকাটা জিওফ্রে বয়কট আরও সরাসরি বলেছিলেন ‘হি শুড ইম্প্রুভ অর রিটায়ার’। মানে উন্নতি করতে না পারলে ওর অবসর নেওয়া উচিত। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। বরং বলা হচ্ছে – কে জানে! হয়ত অস্ট্রেলিয়ার পিচে ওদের সুবিধাই হবে। এই আজগুবি তত্ত্বটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন খেলতে ভুলে গেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু ভাবখানা এমন, যেন জোরে বোলিং আমাদের ব্যাটাররা চমৎকার খেলেন।

অস্ট্রেলিয়ায় রোহিতদের স্বাগত জানাতে বসে আছেন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড আর প্যাট কামিন্স। এই অস্ট্রেলিয়াতেই গত সফরে অ্যাডিলেডে ভরদুপুরে ৩৬ অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বিশ্বসেরা, সর্বকালের সেরা প্রমুখরা। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছিল মেলবোর্নে পরের টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের শতরানের পাশে জাদেজার অর্ধশতরানের জন্যে। তবে তারপরেও সিডনিতেই ভারত হেরে যেত দুজন ক্রিকেটার অতিমানবিক ইনিংস না খেললে। একজনের নাম হনুমা বিহারী, অন্যজন সেই অশ্বিন। প্রথম জন পায়ে চোট নিয়ে দৌড়তে পারছিলেন না, দ্বিতীয় জন পিঠের ব্যথায় কাবু ছিলেন। সেভাবেই দুজনে মিলে মোট ২৮৯ খানা বল, অর্থাৎ প্রায় ৫০ ওভার, কেবল ব্লক করে আর বল ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দিয়েছিলেন। অন্য যে কোনো দেশে ওই টেস্টের পর থেকে যে কোনো ম্যাচে নির্বাচন সমিতির সভা শুরু হত বিহারীর নামটা প্রথমে লিখে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট কেবল ক্রিকেটিয় যুক্তিতে চলে না। তাই তারপর বিহারী খেলেছেন আর মাত্র চারখানা টেস্ট। সেগুলোতে তাঁর রান যথাক্রমে ২০, অপরাজিত ৪০, ৫৮, ৩১, ৩৫, ২০, ১১। মানে অসাধারণ নয়, কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতও নয়। কিন্তু উনি তো আইপিএলে খেলতে পারেন না, পকেটে বিজ্ঞাপনী চুক্তিও নেই। অতএব ২০২২ সালের পর থেকে তিনি আর আলোচনায় নেই। ওই গর্বের সিরিজ জয়ে কিন্তু ব্যাটিংয়ের দুই মহাতারকার অবদান যৎসামান্য। কোহলি একটা ম্যাচ খেলে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭৮ রান করেছিলেন আর রোহিত দুটো ম্যাচ খেলে সোয়া বত্রিশ গড়ে ১২৯ রান। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে নায়ক ছিলেন পন্থ আর পূজারা, সঙ্গতে গিল। পূজারার গড় ছিল মোটে ৩৩.৮৭। কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের মধ্যে, খেলেছিলেন ৯২৮ খানা বল।

মাঝারি শব্দটা ব্যবহার করলে আবার আমাদের দেশের ক্রিকেটতারকাদের ভক্তরা বেজায় রেখে যান। তার উপর রোহিত আর কোহলির ভক্তকুল রীতিমত সহিংস। বছর কয়েক আগে এক কোহলিভক্ত তার রোহিতভক্ত বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে বন্ধুটিকে খুনই করে ফেলে শেষপর্যন্ত। তাই এঁদের মাঝারি বলে প্রমাণ করতে গেলে আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। আগে রোহিতের ব্যাপারটাই আলোচনা করা যাক। কারণ একে টেস্টে তাঁর রান বিরাটের চেয়ে অনেক কম, তার উপর তাঁকে বিশ্বসেরা ওপেনার বলে দাবি করলেও সর্বকালের সেরাদের পাশে বসায় না আমাদের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র। যাঁকে বসায় তাঁকে নিয়ে তো আরও বেশি শব্দ খরচ করতে হবে।

বস্তুত, আজ ফর্ম পড়ে গেছে বলে নয়, রোহিত কোনোদিনই টেস্টে অসাধারণ ছিলেন না। যে যুগে পিচ ঢাকা থাকত না, হেলমেট ছিল না, সে যুগের কথা আলাদা। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে পঞ্চাশের ঘরে গড় না থাকলে কোনো ব্যাটারকে বিশ্বসেরাদের মধ্যে ধরা হয় না। রোহিতের গড় ৬৪ খানা টেস্ট খেলে ফেলার পরেও ৪২.২৭-এ আটকে আছে। বিদেশে তাঁর ব্যাটিংকে মাঝারি বললেও বাড়াবাড়ি করা হবে। এগারো বছর খেলে গড় ৩৩.৬০, শতরান মাত্র দুটো। তার একটা আবার আজকের দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারেননি। ইংল্যান্ডে শতরান করলেন ২০২১ সালে পৌঁছে। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। কোভিড বিধি মানা হয়েছে না হয়নি, আইপিএল খেলার তাড়া আছে না নেই – এই নিয়ে এক আশ্চর্য বিতর্কে বিরাট-শাস্ত্রীর দল দেশে ফেরত চলে আসে শেষ টেস্ট না খেলেই। পরের বছর ফেরত যায় পঞ্চম টেস্ট খেলতে এবং হেরে বসে। কিন্তু বলার কথাটা হল, ওই সিরিজেও বারবার ভারত ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। হেডিংলির তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ অল আউট হয়ে গিয়েছিল, ওভালে চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ২০০ পেরোতে পারেনি।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিতের শুরুটা নিঃসন্দেহে সাড়া জাগিয়ে হয়েছিল। অভিষেকে ইডেন উদ্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৭৭, পরের টেস্টে ওয়াংখেড়েতেও শতরান। তবে দুটোই ছ নম্বরে ব্যাট করে। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই কিন্তু দেখা গেল রোহিত অকুল পাথারে পড়েছেন। জোহানেসবার্গ আর ডারবানের চারটে ইনিংসে দুবার বোল্ড, একবার এলবিডব্লিউ। পরের দেড় বছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ঘুরে তিনি মাত্র চারটে অর্ধশতরান করেন। তৃতীয় টেস্ট শতরান আসে ২০১৭ সালে নাগপুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। অন্য কেউ হলে ততদিনে দল থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সকলেই রোহিতের ‘ট্যালেন্ট’ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তার উপর সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষত আইপিএলে, তিনি ততদিনে তারকা। ফলে দামি ব্র্যান্ড হয়ে গেছেন। উপরন্তু ধোনি শিখিয়েছিলেন ‘ইনটেন্ট’ নামক একটা পবিত্র জিনিস ব্যাটিংয়ে থাকতেই হবে। শাস্ত্রী আর বিরাটও মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন। ওটা না থাকার যুক্তিতে পূজারা, রাহানেকে বারবার বাদ দিয়েছেন। রোহিতের জিনিসটা ছিল। তাই তিনি অপরিহার্য।

যা-ই হোক, ২০১৭ সালের সেই শ্রীলঙ্কা সিরিজটায় রোহিত আরও দুটো অর্ধশতরান করেন। তারপর কিন্তু আবার খরা। সেবছর আর একটামাত্র অর্ধশতরান করেন বছরের শেষ টেস্টে মেলবোর্নে। তাঁকে দিয়ে যে চলবে না তার এর থেকে বেশি প্রমাণের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যিনি ব্র্যান্ড এবং যাঁর ট্যালেন্ট আর ইনটেন্ট আছে তাঁকে তো যে করেই হোক দলে রাখতে হবে। অতএব নতুন বছরে রোহিত হয়ে গেলেন ওপেনার। তখন ভারত সফরে এসেছে ভাঙাচোরা দক্ষিণ আফ্রিকা। সে দলে আন্তর্জাতিক মানের বোলার বলতে কাগিসো রাবাদা। অ্যানরিখ নর্খের সবে প্রথম সিরিজ। রোহিত প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই বেধড়ক পিটিয়ে শতরান করলেন। দ্বিতীয় টেস্টে পুনেতে রান পাননি, রাঁচিতে পৌঁছেই একেবারে ২১২। আর পায় কে? বলা শুরু হয়ে গেল, একদিনের ক্রিকেটের মত টেস্টেও উনি বিশ্বসেরা ওপেনার। এমন আর দুটো হয় না। দুঃখের বিষয়, রোহিতের এরপরের রানের বহর কিন্তু সেকথা বলছে না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো টেস্টে সর্বোচ্চ রান ২১। অতিমারী পেরিয়ে যখন আবার টেস্ট খেললেন অস্ট্রেলিয়ায়, চারটে ইনিংসে একবার ৫০ পেরোলেন। দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত ইনিংসে একটা বড় শতরান আর একটা অর্ধশতরান। তারপর থেকে কেবলই মাঝেমধ্যে একটা শতরান বা গোটা দুয়েক অর্ধশতরানের কাহিনি। বাকিটা ব্যর্থতার গল্প।

গত এক বছরে রোহিতকে দেখে মনে হয়, তিনিও জানেন যে বয়সের কারণে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা কমেছে। রিফ্লেক্স তো কমেছেই। অতএব তিনি এখন ঠিক করে নিয়েছেন অনেক বেশি ঝুঁকি নেবেন, তাতে যা রান হয়। এই পরিকল্পনা টি টোয়েন্টি এবং একদিনের ক্রিকেটে কার্যকরী, কারণ সাদা বল সুইং করে লাল বলের চেয়ে কম এবং ফিল্ডিং দলও অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজাতে বাধ্য। উপরন্তু নিজের দলের পক্ষেও এই কৌশল উপকারী। গতবছর ভারতের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবার পিছনে রোহিতের ঝোড়ো ইনিংসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ও জিনিস টেস্টে ভাল বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যে চলবে না তা নিউজিল্যান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ওই কৌশল খাটেনি। চারটে ইনিংসে রোহিতের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৩। এ যদি মাঝারিয়ানা না হয়, তবে মাঝারিয়ানা বলে কাকে? কোনো দলের ওপেনার তথা অধিনায়ক এত মাঝারি হলে সে দলের কপালে অনেক দুঃখ। সেই ধোনির আমল থেকে শাস্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলে গেছেন, এই দলটা নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। অথচ এই আমলে না নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা হয়েছে, না ইংল্যান্ডে – যা অতীতে একাধিক ভারতীয় দল করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধোনির দল অন্তত একবার সিরিজ ড্র রেখে আসতে পেরেছিল। কোহলির দল দুবার সুযোগ পেয়ে সেটুকুও করতে পারেনি। এমন নড়বড়ে ওপেনার থাকলে পারা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে সাই সুদর্শন বা অভিমন্যু ঈশ্বরনরা যতই রান করুন, তাঁদের দলে নেওয়া যাবে না। রোহিতের মত ব্র্যান্ডের মূল্য কি আর রান দিয়ে মাপা চলে?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

বিরাট কিন্তু মাঝারিয়ানায় রোহিত-সুলভ নন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা রোহিতের মত হয়নি। টেস্ট জীবনের প্রথম বারোটা ইনিংসে দেশের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটো অর্ধশতরান ছাড়া বলার মত কিছুই ছিল না। ২০১১-১২ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম দুটো টেস্টে রান করতে না পেরে প্রায় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। পার্থ টেস্ট ছিল শেষ সুযোগ। সেখানে দুই ইনিংসেই রান করেন, পরের টেস্টে অ্যাডিলেডে প্রথম শতরান। তারপর থেকে সাফল্যের লেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। এটা পরিসংখ্যানের যুগ, সোশাল মিডিয়ার যুগ। তরুণ ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করেন ক্রিকেটারদের উৎকর্ষ, অপকর্ষ পুরোটাই স্কোরবোর্ডে আর ডেটা অ্যানালিটিক্সে ধরা থাকে। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন – স্কোরবোর্ড একটা গাধা। আমাদের দেশে তাঁর এমন কোনো উত্তরসূরি নেই যিনি ধরিয়ে দেবেন, যে স্কোরবোর্ড একেবারে গাধা না হলেও তার দৈর্ঘ্য প্রস্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ক্রিকেট খেলার মানবিক প্রয়াসের দিকটার অনেককিছুই স্কোরবোর্ডের পরিসরে ধরা পড়ে না। ফলে গোটা কেরিয়ারে অস্তগামী মিচেল জনসন ছাড়া একজনও সারাক্ষণ ৯০ মাইল+/ঘন্টার বোলারকে না খেললেও, নাথান লায়ন ছাড়া কোনো উঁচু দরের স্পিনারকে খেলতে না হলেও বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিংদের পাশে বসানো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন জগৎ বুদ্ধিমানের মত সর্বকালের সেরার (GOAT) মুকুটও সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে বিরাটের মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।

খেয়াল করা হয়নি, যে কোনো ব্যাটারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাগার ইংল্যান্ডে বিরাট একাধিকবার সফরে গিয়েও মূলত অসফল। সতেরোটা টেস্ট খেলে মাত্র দুটো শতরান, গড় মাত্র ৩৩.২১। আসলে বিরাটের সাফল্যকে বিরাটতর করে তুলেছিল তিনটে জিনিস – ১) একদিনের ক্রিকেটে শতরান করে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় শচীনের রেকর্ডকে ধাওয়া করা, ২) ২০১৩-১৪ মরশুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম থেকে শুরু করে বছর পাঁচেক টেস্টে রানের বন্যা, ৩) এই সময়কালে তাঁর অধিনায়কত্বে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, অশ্বিন-জাদেজার কল্যাণে দেশ বিদেশে শচীন, রাহুল দ্রাবিড়দের যুগের চেয়ে ভারতের বেশি ম্যাচ জেতা। লোভনীয় ব্র্যান্ডকে সে যত বড় তার চেয়েও বড় করে দেখানোর যে প্যাঁচ পয়জার চলে এবং এখনো চলছে তা নিয়ে আর আলাদা করে বলব না, কারণ তা পৃথক আলোচনা দাবি করে। সে আলোচনা আগেই করেছি এই লেখায়। কিন্তু ঘটনা হল, বিরাটের সমকক্ষ অন্তত তিনজন ব্যাটার যে তাঁর নিজের প্রজন্মেই রয়েছেন – সেকথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরাটকে আকাশে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর দ্রুত পতন হয়েছে গত ৫-৬ বছরে। আগেই বলেছি, নয়ের দশকের পর থেকে অন্তত ৫০ গড় না হলে আর বিশ্বসেরাদের দলে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সর্বকালের সেরা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিরাটের গড় এখন নামতে নামতে ৪৭.৮৩। নিজের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী জো রুট প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন, গড় ৫১.০১। স্টিভ স্মিথও অতিমারীর আগের ফর্মে নেই, তবু তাঁর গড় ৫৬.৯৭ – এখনো অসাধারণ। মোট রানের দিক থেকে একমাত্র কেন উইলিয়ামসনই এখনো বিরাটের থেকে পিছিয়ে, তবে তিনি ম্যাচও খেলেছেন কম। গড় যেহেতু ৫৪.৪৮, তাই বিরাটকে টপকে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা।

তবে এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় কথা হল, সেই ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইডেন উদ্যানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর থেকে বিরাটের ফর্ম সেই যে পড়তে শুরু করেছে, সে পতন থামছে না। তার ফল ভুগছে দল। ওই শতরানের পর থেকে ৩৪ খানা টেস্টের ৬০ ইনিংসে তিনি মাত্র ১৮৩৮ রান করেছেন ৩১.৬৮ গড়ে। শতরান মাত্র দুটো, অর্ধশতরান নটা, পাঁচবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। উপরন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে যে ঘূর্ণি উইকেটে সাধারণ স্পিনারদের মাথায় চেপে বসার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাইজুল ইসলাম থেকে মিচেল স্যান্টনার – সবাই বিরাটের পক্ষে একইরকম দমবন্ধ করা, বিপজ্জনক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাদা বলের ক্রিকেটেও তাঁকে বেঁধে রাখতে স্পিনারদের ব্যবহার করা শুরু করেছে দলগুলো। সুইং সামলাতেও যে বিরাট তেমন দড় নন তা তাঁর ইংল্যান্ডের রেকর্ড প্রমাণ করে। আজকাল তো দেশের মাঠেও ঘেমে উঠছেন বেঙ্গালুরুর মত। এই বয়সে শচীন কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ডেল স্টেইন আর মর্নি মর্কেলের বিরুদ্ধে তিনটে টেস্টে দুটো শতরান করেছেন। সুনীল গাভস্কর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্টে এমন একটা ইনিংস খেলেছেন, যাকে বলা হয় ঘূর্ণি পিচে স্পিন খেলার টিউটোরিয়াল।

সোজা কথা হল, যেরকম ব্যর্থতার কারণে পূজারা আর রাহানেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিরাট আর রোহিত এখনো নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। কারণ তাঁদের মাঝারিয়ানা কেউ স্বীকার করবে না। বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন না? সাংবাদিকরা কেন লিখছেন না? কারণ কিন্তু এটা নয় যে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, দুই হুজুর অস্ট্রেলিয়ায় ফের রান করে দিতে পারেন। সে তো পারেনই, কিন্তু তাতে তো গত ৫-৬ বছরের টানা ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কিন্তু ওই যে – ব্র্যান্ড মূল্য। টিভি খুললে, ওটিটি চালালে কতশত বিজ্ঞাপনে দুজনকে দেখতে পান তা খেয়াল করবেন। ক্রিকেট খেলা ভারতে যত বড় ব্যবসা, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তত বড় নয়। ফলে অত্যন্ত মাঝারি রাহুলকে (৫৩ টেস্ট খেলে ফেলার পর গড় ৩৩.৮৭) যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখার চেষ্টার পিছনেও এনডর্সমেন্ট। এঁরা খেললে এঁদের বিজ্ঞাপন দেখানোর মানে থাকবে। থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের টাকায় বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছে টিভি/ওটিটি নেটওয়ার্ক, তা উসুল হবে।

উপরন্তু ভারতের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচগুলোর প্রযোজনার দায়িত্বে থাকে বিসিসিআই নিজে। নিজেদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মন্দ কথা তারা মেনে নেবে না। অতএব ভারতীয় ক্রিকেটারদের দোষগুণ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেবে। সম্প্রচার সংস্থাকেও বাধ্য করতে পারে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাউকে বাদ দিতে। সে তিনি যত বড় বিশেষজ্ঞই হোন। টাকার পাহাড়ে বসে থাকা নিয়োগকর্তা বিসিসিআইয়ের কাছে গাভস্কর আর মুরলী কার্তিকের দর একই। তার উপর সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার কায়দাও আজকের ক্রিকেটারদের জানা আছে। সেভাবেও ধারাভাষ্যকারদের ভাতে মারা যায়। ব্যাপারটা একবার টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে, আরেকবার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। এই কারণেই ২০১৩ সালে ইয়ান চ্যাপেল ভারতে ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন

আরেকটা কারণ হল খারাপ দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুজন ক্রিকেটার – শচীন আর ধোনি। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বকাপ জেতার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ভারতীয় দল পরপর আটটা টেস্টে হারে। স্পষ্ট বোঝা যায়, যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে আর চলবে না। অথচ একমাত্র দ্রাবিড় আর ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ ছাড়া কেউ এই সত্য মেনে নিলেন না। ওঁরা দুজন অবসর নিলেন, শচীন রয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরান আর দুশোতম টেস্ট খেলার রেকর্ড করার জন্যে। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসাবে, অধিনায়ক হিসাবে ব্যর্থ ধোনিকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর গডফাদার এন শ্রীনিবাসন। শচীন বহাল তবিয়তে ২০১৩ পর্যন্ত খেলে গেলেন আর ধোনি অধিনায়কত্ব চালিয়ে গেলেন ২০১৩-১৪ অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত। তারপর টেস্ট সিরিজের মাঝখানে দুম করে অবসর নিলেন।

যাঁরা আট টেস্টে হারের পরেও ধোনিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সেইসময় বলতেন ‘এখন ছাড়লে ক্যাপ্টেন হবে কে?’ সত্যিই তেমন কেউ ছিলেন না, কারণ প্রজন্ম বদলের কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি বোর্ড। তাই ধোনি বহাল তবিয়তে যতদিন ইচ্ছা খেলে যেতে পেরেছিলেন। এখন ভারতীয় ক্রিকেট ফের সেই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যে রাহুলকে বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে ভাবা হচ্ছিল, তিনি এখন দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছেন। ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নেমেও হাস্যকর কায়দায় আউট হচ্ছেন। গিল ধারাবাহিকতা হারিয়েছেন, পন্থ প্রতিভাবান কিন্তু এখনই নেতৃত্ব দিতে কি তৈরি? কেউ নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ গত এক যুগে এত জয় সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেট যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। ব্র্যান্ড সর্বস্বতা, বিশেষত মাঝারিয়ানা সর্বস্বতা, এভাবেই প্রগতি আটকায়।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত।

সম্প্রতি কিংবদন্তি সুনীল গাভস্করের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন মহাতারকা বিরাট কোহলি। সামনেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বিরাট তার আগে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে প্রচুর রান করছেন (এই লেখার সময়ে ১৩ ইনিংসে ৬৬৮; গড় ৬৬.১০)। ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের অনেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে একদা সফল প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিরাটের স্ট্রাইক রেটের সমালোচনা করছিলেন। তাই একটি ম্যাচ জিতিয়ে বিরাট তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দেন। বিরাটের দল এবারের আইপিএলের হারতে হারতে প্রায় প্লে অফের ওঠার দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটের মন্থর ব্যাটিং এবং স্পিনারদের মারার অক্ষমতার সমালোচনা করছেন। বিরাট সেই সমালোচনা থেকে কিছু শেখার বদলে সমালোচকদের দিকেই তোপ দেগেছেন। বলে দিয়েছেন, যারা তাঁর পরিস্থিতিতে পড়েনি তাদের পক্ষে বক্সে বসে সমালোচনা করা সহজ। বাইরের লোক যা খুশি ভেবে নিতে পারে। তিনি বাইরের কে কী বলল তাতে কান দেন না। একথায় গাভস্কর বেজায় চটে বলে দিয়েছেন, বাইরের লোকের কথায় যদি কান না-ই দেয় তো কথার উত্তর দিচ্ছে কেন? আমরা যা দেখব তাই তো বলব। আমাদের তো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্ডা নেই। টিভির পর্দায় দেখা গেছে, গাভস্কর যখন একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে এসব কথা বলছেন, তখন কাছেই অনুশীলনরত বিরাট কথাগুলো শুনে কটমটিয়ে তাকিয়েছেন।

এমন হতে পারে না যে বিরাট জানেন না গাভস্কর কত বড় ব্যাটার ছিলেন। আর পাঁচজনের কথার দাম না থাক, গাভস্করের কথার অবশ্যই দাম আছে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কথারও বিলক্ষণ দাম আছে। নইলে তাঁদের সমালোচনায় বিরাট ক্ষেপে যেতেন না। তাহলে তিনি ওরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যা পাব, তা হল ঔদ্ধত্য। টেস্ট ক্রিকেটে যখন হেলমেট প্রায় ছিলই না, প্রত্যেক আন্তর্জাতিক দলেই এক বা একাধিক ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করা বোলার ছিল, সেইসময় যিনি প্রথম ব্যাটার হিসাবে দশ হাজার রান করেছিলেন বেশ দুর্বল একটা দলে খেলে, তাঁকে আমল না দেওয়ার ঔদ্ধত্য কী করে তৈরি হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়া যুগের এক অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে। প্রবণতাটা হল বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করে, এক ধরনের কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে নিজের সময়ের সেরাকে সর্বকালের সেরা প্রতিপন্ন করা। হালে একটি শব্দের জন্ম হয়েছে খেলার জগতে – GOAT, অর্থাৎ ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’। গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত। শচীন তেন্ডুলকরের আমল থেকে এনডর্সমেন্টের দুনিয়ায় কে সর্বকালের সেরা তা নিয়ে মশলাদার আলোচনা শুরু হয়। শচীনের বিদায়ের পর কবে যেন মহেন্দ্র সিং ধোনি গোট হয়ে গেলেন, তাঁর বিদায়ের পর বিরাট।

গাভস্করের হয়ে কথা বলার জন্যে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনী নেই, বিরাটের জন্যে আছে। তারা বলে দিয়েছে বিরাটই গোট, কেউ অন্য কিছু বললে দল বেঁধে তেড়ে আসে তাকে গাল দিতে। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও অনেকদিন ধরে বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস বা শচীনের সমান বা তার চেয়েও মহান ক্রিকেটারের তকমা দিয়ে চলেছেন। ফলে নির্ঘাত বিরাট নিজেও মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা। তাই গাভস্কর, ম্যাথু হেডেনরা এলেবেলে।

এই গোটে যে আজকাল কত বেড়া খেয়ে ফেলছে খেলার জগতে, তার হিসাব নেই। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে হাতের ফোনটাতেই চাইলে দেখে ফেলা যায় যে কোনো খেলার কিংবদন্তিদের স্মরণীয় এবং সাধারণ খেলাগুলো। বর্তমান প্রজন্ম চাইলেই পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফেলতে পারে। শচীন বা ভিভ তো বটেই, এমনকি ব্র্যাডম্যানের খেলারও এক-আধটা ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। সেগুলো দেখলে মাঠের তারতম্য, প্রতিপক্ষের গুণমানের তারতম্য নিজের চোখে দেখা যায়। অন্ধ ভক্ত না হলে বোঝাই যায়, এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের খেলোয়াড় তুলনীয় নয়। খেলার মান নির্ভর করে যে যে জিনিসগুলোর উপরে তার প্রায় কোনোটাই এক নেই, থাকার কথাও নয়। দুনিয়ার সবকিছুই তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। সেখানে সর্বকালের সেরা দশ বা পাঁচ বা এক মুখরোচক আড্ডার বিষয়বস্তু হতে পারে বড়জোর। এছাড়া কোনোরকম র‍্যাঙ্কিংয়ের কোনো মানে হয় না।

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

মুশকিল হল, অধিকাংশ ক্রীড়ামোদী সুচিন্তিত মতামতের মানুষ হয়ে গেলে একনিষ্ঠ ভক্তকুল গড়ে উঠবে না। সেটা না হলে জনপ্রিয় খেলোয়াড়রা যে শত শত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেগুলো চোখ বন্ধ করে কেনার লোক কমে যাবে। তাহলে স্পনসর পাওয়া যাবে না, খেলাধুলো করে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। তাই খেলোয়াড় নিজে, তার সোশাল মিডিয়া টিম, সংবাদমাধ্যম, খেলার সম্প্রচারক, ধারাভাষ্যকাররা – সকলে মিলে কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং গড়ে তোলেন। তাতে সমসাময়িক কাউকে সর্বকালের সেরার মুকুট দিয়ে দেন। যদি কোনো সম ক্ষমতার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে পোয়া বারো। কে সত্যিকারের গোট তা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে ব্যাপারটাকে আরও মুখরোচক করে তোলা হয়। ফুটবলে যেমন লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আমিই সেরা – এই কথা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৬ ঘন্টা শুনতে শুনতে কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে তিনিই সর্বকালের সেরা। তখন তিনি লিওনেল মেসির মত, রামছাগলের সঙ্গে ছবি তোলাতে পারেন বা বিরাটের মত, প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ফালতু মনে করতে পারেন।

কোনো খেলোয়াড় নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করলে এমনিতে বিশেষ ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে সেই মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়লে এখন যা হয়, তা হল তাঁদের অন্ধ ভক্তরা প্রাক্তন খেলোয়াড়দের এবং যারা তেমন ভক্ত নয় তাদের গালিগালাজ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। যখন অতীতের খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন কিন্তু গাভস্করের ভক্তরা বলত না – বিজয় মার্চেন্ট বা সি কে নাইডু ক্রিকেটের কী বোঝে? এমনকি শচীনের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের প্রথমদিকের ভক্তরাও বলত না গাভস্কর কী বোঝে? বলত না, কারণ গাভস্কর কখনো তেমন ভাবার মত আচরণ করতেন না। বরং আজীবন নিজের আগের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। শচীনও গাভস্করের সঙ্গে কথা বলতেন মাথা নিচু করে, কখনো ফর্ম পড়ে গেলে গাভস্করের পরামর্শ নিতেন। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে গাভস্করের সব রেকর্ডই তো শচীন ভেঙে দিয়েছেন। এখন কিন্তু বিরাটের ভক্তরা বলেন, গাভস্কর কে? ও কী বোঝে? রোহিত শর্মার ভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই বলে যান, রোহিত একদিনের ক্রিকেটে ভারতের গোট ক্রিকেটার। বিরাট দূরের কথা, শচীনও তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। এর কারণ আজকের খেলোয়াড়দের আচরণে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। কারোর কম, কারোর বেশি। কথায় কথায় কাল্পনিক, অযৌক্তিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে সেই ঔদ্ধত্য উস্কে দেওয়া হয়। কারণ ঔদ্ধত্যের ভাল বাজার আছে। আজকাল খেলার মাঠে সভ্যতা, ভদ্রতার চেয়ে ঔদ্ধত্য, অসভ্যতার কাটতি বেশি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

এখন চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচনেও বৈধ পথে জেতার উপায় না থাকলে বিরোধীদের ব্যালট নষ্ট করিয়ে দেওয়া হয় স্বয়ং নির্বাচনী অফিসারকে দিয়ে। এ যুগে তৃতীয় নয়নের উপরেও আস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।

ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএসের যুগে আম্পায়ারদের ডিকি বার্ড, ডেভিড শেপার্ড বা সাইমন টফেলের মত পরম শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার সুযোগ কমে গেছে। পড়ে আছে কুখ্যাত হওয়ার সুযোগ। কারণ আজকাল রান আউট বা স্টাম্প আউটের ক্ষেত্রে খুব সহজ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও মাঠের আম্পায়াররা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি নেন না, ঠান্ডা ঘরে বসা টিভি আম্পায়ারের হাতেই ব্যাপারটা ছেড়ে দেন। শ্যেনদৃষ্টির একাধিক ক্যামেরা আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে মাঠে দাঁড়িয়ে আম্পায়ারিংয়ের মত পরিশ্রমসাধ্য কাজ এখন আগের চেয়েও বেশি প্রশংসাহীন। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্যে বড় একটা কেউ প্রশংসা করবে না, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সমালোচনার বন্যা বয়ে যাবে ধারাভাষ্যকারদের বক্স থেকে সোশাল মিডিয়া পর্যন্ত। কারণ দুনিয়া সুদ্ধ লোক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্বচক্ষে, স্বকর্ণে জেনে ফেলবে যে সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। যদি ক্ষতিগ্রস্ত দল রিভিউ করে আর টিভি আম্পায়ার সিদ্ধান্ত বদলে দেন, তাহলে তো কথাই নেই। এমনটা এক ম্যাচে একাধিকবার ঘটে গেলেই বলাবলি, লেখালিখি শুরু হয়ে যাবে – এই আম্পায়ারটা ফালতু। ক্রিকেট লাভজনক ব্যবসা হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আম্পায়ারদের পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে। আজকের নীতিন মেননরা যা পারিশ্রমিক পান তা প্রয়াত বার্ড কোনোদিন পাননি। কিন্তু সেকথা তো ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও সত্যি। বিরাট কোহলি যা রোজগার করেন তা কি সুনীল গাভস্কর তাঁর খেলোয়াড় জীবনে স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? দুঃখের বিষয়, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্মান কমেনি, যা হয়েছে আম্পায়ারদের ক্ষেত্রে। আগে কুখ্যাত আম্পায়াররা ছিলেন ব্যতিক্রম এবং কুখ্যাতির কারণ কখনোই ভুল সিদ্ধান্ত হত না। হত আম্পায়ারের পক্ষে মানানসই নয় এমন কোনো আচরণ। তৃতীয় আম্পায়ার (অধুনা টিভি আম্পায়ার বলাই দস্তুর) এসে যাওয়ার পরে মাঠের আম্পায়াররা পান থেকে চুন খসলেই খলনায়ক হয়ে যান।

ইউটিউবের কিছু চ্যানেল বা সোশাল মিডিয়া এক্সের কিছু হ্যান্ডেলের পুরনো খেলার পোস্ট দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, আজকাল মাঠের আম্পায়াররা কিন্তু আগের চেয়ে অনেক কম ভুল করেন। তৃতীয় আম্পায়ার চালু হওয়ার আগের যুগে, এমনকি তারপরেও এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা দেখলে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে। যে দেশে খেলা হত সেই দেশের আম্পায়াররা যেসব সিদ্ধান্ত নিতেন তা অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হত, এখন সেসব ভিডিও ফিরে দেখলে আর সন্দেহ থাকে না। শ্রীলঙ্কার আম্পায়াররা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা সিরিজে তেমন সিদ্ধান্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। সনৎ জয়সূর্যের লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে পিচ পড়া বলে অ্যালেক স্টুয়ার্টকে এলবিডব্লিউ দেওয়া হয়েছে, তিনি আক্ষরিক অর্থে হাঁ হয়ে গেছেন। নিউজিল্যান্ড বনাম ইংল্যান্ডের একটা ম্যাচে আবার বোলার, উইকেটরক্ষক কেউ কোনো আবেদন না করা সত্ত্বেও আম্পায়ার ব্যাটারকে আউট দিয়ে দিয়েছিলেন। বল যদিও ব্যাটের ধারে কাছে আসেনি। ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার একটা একদিনের ম্যাচে তো আম্পায়ার চমৎকার কাণ্ড করেছিলেন। অজয় জাদেজা অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালালেন এবং ফস্কালেন। কেউ কোনো আবেদন করার আগেই আম্পায়ার ডান হাতের তর্জনী আকাশে তুলে দিলেন। তা দেখে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা উল্লাস আরম্ভ করতে যেতেই তিনি আঙুল নামিয়ে নিজের টুপিটা ধরে ফেললেন। অর্থাৎ নট আউট, উনি টুপি ধরার জন্যেই আঙুল তুলেছিলেন। এমন সব কাণ্ড ঘটত বলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্রমশ টেস্ট ম্যাচে দুই আম্পায়ারই নিরপেক্ষ দেশের হবেন, একদিনের ম্যাচে মাত্র একজন আয়োজক দেশের হবেন – এইসব নিয়ম চালু করতে হয়েছিল। প্রযুক্তির উন্নতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ার রাখার সিদ্ধান্ত কিন্তু হয়েছিল মাঠের আম্পায়ারদের সৎ ভুলগুলো শোধরানোর জন্যেই। তাই ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে যখন প্রথমবার তৃতীয় আম্পায়ার কাজ শুরু করেন, তখন তাঁকে অনেক ছোট গণ্ডির মধ্যে কাজ করতে হত।

এখনকার মত যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই তাঁর মত চাওয়া যেত না। খেলোয়াড়রা তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে আবেদন জানাতেও পারতেন না। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মাঠের আম্পায়ারদের আয়ত্তে ছিল।

সেই যুগে বা তারও আগে ক্রিকেট খেলায় যখন আদৌ তৃতীয় আম্পায়ার ছিল না, তখন কিন্তু খেলোয়াড়দের কাছে আম্পায়ারদের সম্মান ছিল আকাশছোঁয়া। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের আম্পায়ার শাকুর রানা যেমন পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করেছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংয়ের সঙ্গে, অথবা প্রবল নাক উঁচু (এবং সম্ভবত বর্ণবিদ্বেষী) ড্যারেল হেয়ার যেভাবে বেমক্কা পাকিস্তানকে বল বিকৃতিতে অভিযুক্ত করেছিলেন ২০০৬ সালে, তেমনটা না ঘটলে খেলোয়াড়রা আম্পায়ারদের ডাহা ভুল সিদ্ধান্তও মেনে নিতেন। সাময়িক উত্তেজনার বশে কখনো বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেলেও দলের অন্যরা সামলে নিতেন। যেমন গাভস্করের মত ঠান্ডা মাথার লোকও ১৯৮১ সালে মেলবোর্ন টেস্টে এলবিডব্লিউ হওয়ার পর রেগে গিয়ে পার্টনার চেতন চৌহানকে মাঠ থেকে বার করে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সীমানা পেরোবার আগেই ভারতীয় দলের ম্যানেজার শাহীদ দুরানি আর বাপু নাদকার্নি গাভস্করকে শান্ত করে চেতনকে ফেরত পাঠান। গাভস্কর অবশ্য পরে বলেছেন তিনি ভুল আউট দেওয়ার জন্যে আম্পায়ার রেক্স হোয়াইটহেডের উপর ততটা রাগ করেননি। চেতনকে নিয়ে একেবারে খেলা থেকেই দল প্রত্যাহার করে নিতে চেয়েছিলেন ডেনিস লিলির কটূক্তি সহ্য করতে না পেরে। আউটের সিদ্ধান্তটা কিন্তু সত্যিই ভুল ছিল। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড কাগজে লেখা হয়েছিল, বল পায়ে লাগার আগে ব্যাটের লাগার শব্দ গাছের গুঁড়িতে কুড়ুল মারার মত জোরে শোনা গিয়েছিল। রানা বনাম গ্যাটিং কাণ্ডেও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড গ্যাটিংকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিল, পাকিস্তানে ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নিজে মধ‍্যস্থতা করেছিলেন ঝামেলা মেটাতে। এমনকি গোটা দল দেশে ফিরে যেতে চাইলেও ইংল্যান্ডের বোর্ড প্রত্যেক ক্রিকেটারকে ১০০০ পাউন্ড করে ‘হার্ডশিপ অ্যালাউয়েন্স’ দিয়ে সফর শেষ করিয়েছিল। গ্যাটিং পরে বলেছেন, তিনিও বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন।

এর সঙ্গে তুলনা করুন আজকের আম্পায়ারদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের ব্যবহার। মাঠের আম্পায়ারদের নিজেদেরই আগেকার আত্মবিশ্বাস নেই, তাঁরা প্রযুক্তি হাতে থাকতে ভুল প্রমাণিত হওয়ার ঝুঁকি যে নেন না তা তো আগেই বলেছি। উপরন্তু ক্রিকেটাররাও আর তাঁদের ততখানি শ্রদ্ধার আসনে রাখেননি। বিশেষত মহাতারকারা তো টিভি আম্পায়ারকেও আমল দেন না। স্মরণ করুন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন টেস্টের কথা। তৃতীয় দিন দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক ডীন এলগারের বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউয়ের আবেদন নাকচ করে দেন টিভি আম্পায়ার। কারণ হক আই দেখায় ওটা নট আউট। তার জন্যে রুষ্ট ভারত অধিনায়ক কোহলি, তাঁর পারিষদ কে এল রাহুল এবং রবিচন্দ্রন অশ্বিন স্টাম্প মাইক্রোফোন ব্যবহার করে কেবল আয়োজক দেশের নাগরিক টিভি আম্পায়ার নয়, সম্প্রচারকারী সংস্থা এবং গোটা দেশটার মানুষ সম্পর্কেই কটূক্তি করেন। সবাই মিলে নাকি ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে নেমেছিল।

আরও পড়ুন এরপর কি মাঠে কুস্তি লড়বেন বিরাট কোহলিরা?

তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে প্রথম রান আউট হওয়া শচীন তেন্ডুলকর আর এখনকার কোহলির মাঝে যিনি ভারতীয় ক্রিকেটের এক নম্বর তারকা ছিলেন, সেই মহেন্দ্র সিং ধোনি আরও এককাঠি সরেস। ২০১৯ সালের আইপিএলে ধোনির চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে রাজস্থান রয়্যালসের একটা ম্যাচে বোলারের প্রান্তের আম্পায়ার বেন স্টোকসের ফুল টসে নো-বল ডাকলেও লেগ আম্পায়ার সেই সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেন। ধোনি, যিনি তার আগেই আউট হয়ে গেছিলেন, একেবারে পাড়ার টোক্কা ক্রিকেট প্রতিযোগিতার মত সটান মাঠে ঢুকে পড়েন সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে। আম্পায়ারদের নেহাতই বেচারা দেখিয়েছিল তাঁর সামনে। অবশ্য তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেননি।

এই দুটো ঘটনাই এই লেখার পাকা চুলের পাঠকদের যৌবনে সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটে অকল্পনীয় ছিল। অথচ তখন ভুল সিদ্ধান্তের সংখ্যা নিঃসন্দেহে বেশি ছিল, খেলোয়াড়দের আবেগ কিছুমাত্র কম ছিল না। তৃতীয় আম্পায়ার এসে পড়ার পরেও যে কত হাস্যকর ঘটনা ঘটিয়েছেন মাঠের আম্পায়াররা, তার ইয়ত্তা নেই। তবু তা নিয়ে খেলোয়াড়, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, দর্শক কাউকেই অত্যধিক উত্তেজিত হতে দেখা যেত না সচরাচর। ইডেন উদ্যানে ১৯৯৩ সালের হিরো কাপ ফাইনালের কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোল্যান্ড হোল্ডার অনিল কুম্বলের বলে বোল্ড হয়ে যান। অথচ সেটা দুই আম্পায়ারের কেউ খেয়াল করেননি। এমনকি ভারতের উইকেটরক্ষক বিজয় যাদবও খেয়াল করেননি। বলটা থার্ডম্যানে চলে যাওয়ায় দুই ব্যাটার যখন রান নেওয়ার তাল করছেন, তখন ফিল্ডার মনোজ প্রভাকর বল কুড়িয়ে নিয়ে প্রশ্ন করেন – বেল পড়ে গেল কী করে? শেষমেশ টিভি আম্পায়ার শেখর চৌধুরী জানান – আসলে বোল্ড হয়েছেন হোল্ডার। ১৯৯৯ সালের অ্যাডিলেড টেস্টে শচীন তেন্ডুলকরকে অস্ট্রেলিয় আম্পায়ার ড্যারিল হার্পার কাঁধে লাগা বলে এলবিডব্লিউ দিয়েছিলেন। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্কও হয়েছিল। কিন্তু শচীন আম্পায়ারকে দুকথা শোনাতে যাননি। তিনি এবং সৌরভ গাঙ্গুলি একসময় নিয়মিত আম্পায়ারের ভুলে আউট হতেন। ১৯৯৯ সালেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় চেন্নাই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সৌরভকে দুবার ড্রপ পড়া বলে ক্যাচ আউট দেওয়া হয়। বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার স্টিভ ডান আর লেগ আম্পায়ার (যিনি সৌরভ বাঁ হাতি হওয়ায় তখন অফে দাঁড়িয়েছিলেন) ভি কে রামস্বামী তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য নেওয়ার কথা আদৌ ভাবেননি! একে সেটা ছিল ভারত বনাম পাকিস্তান টেস্ট, তার উপর লেগ আম্পায়ার ছিলেন ভারতীয়, ভারত শচীনের অসামান্য শতরান সত্ত্বেও ম্যাচটা একটুর জন্যে হেরে যায়। তবুও আম্পায়ারদের ভুল নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা খুব বেশি বাক্য ব্যয় করেননি। প্রাক্তনরা সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি কথা খরচ করা হয়েছিল শচীনের এবং পাকিস্তান দলের প্রশংসায়। চিপক স্টেডিয়ামের দর্শকরা পাকিস্তান দলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন। আম্পায়ারদের একটা ভুল নিয়ে নষ্ট করার মত সময় সাংবাদিকদেরও ছিল না।

শেষ করা যাক ২০০৭-০৮ মরশুমে ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ার সিডনি টেস্ট দিয়ে। একটা ম্যাচে অতগুলো ভুল সিদ্ধান্ত বিরল। মাঠের দুই আম্পায়ার মার্ক বেনসন আর স্টিভ বাকনর তো বটেই, এমনকি তৃতীয় আম্পায়ার ব্রুস অক্সেনফোর্ডও গাদা গাদা ভুল করেন। মাইকেল হাসি আর অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস একাধিকবার আউট ছিলেন, দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে শেষদিন। মাইকেল ক্লার্ক সৌরভের ব্যাট থেকে বেরনো বল মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরে ধরে ক্যাচের আবেদন করেন। আম্পায়াররা তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য না নিয়ে অস্ট্রেলিয় অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের কথায় সৌরভকে আউট দিয়ে দেন। ধারাভাষ্যের দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন ক্রিকেটাররা সঙ্গত কারণেই কঠোর সমালোচনা করেন আম্পায়ারদের এবং অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের। ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বলেন, এই ম্যাচে কেবল একটা দলই ক্রিকেটের সহবত অনুযায়ী খেলছিল। কিন্তু মাঠের মধ্যে একজন ভারতীয় ক্রিকেটারও আম্পায়ারদের সঙ্গে অসদাচরণ করেননি।

আসলে ক্রিকেটাররা তো আকাশ থেকে পড়েন না, সমাজ থেকেই উঠে আসেন। তখনকার ভারতীয় সমাজে জয়ের দাম ছিল, কিন্তু যে কোনো মূল্যে জিততে হবে – এই মনোভাব সর্বব্যাপী ছিল না। এখন চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচনেও বৈধ পথে জেতার উপায় না থাকলে বিরোধীদের ব্যালট নষ্ট করিয়ে দেওয়া হয় স্বয়ং নির্বাচনী অফিসারকে দিয়ে। এ যুগে তৃতীয় নয়নের উপরেও আস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।

সংবাদ প্রতিদিনের রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত

ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।

আজ পর্যন্ত অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গড়ের দিক থেকে আবার সবচেয়ে ভাল ফল পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের। দ্রুত এই তালিকায় উপরে উঠছে চীন। প্রত্যেক অলিম্পিকের পরেই পদক তালিকায় চোখ বুলোলে প্রথম চার-পাঁচটা স্থানে যে দেশগুলোর নাম দেখা যায় সেগুলো অর্থনীতিতেও বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় একশো বছরের ইতিহাসও অনুরূপ। সবচেয়ে ধনী মহাদেশ ইউরোপের পাঁচটা দেশ মিলে বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে ১২ বার (পশ্চিম জার্মানি/জার্মানি ৪, ইতালি ৪, ফ্রান্স ২, ইংল্যান্ড ১, স্পেন ১)। অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সত্ত্বেও গরিব লাতিন আমেরিকার তিনটে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে সব মিলিয়ে দশবার (ব্রাজিল ৫, আর্জেন্টিনা ৩, উরুগুয়ে ২)। এশিয়া আর আফ্রিকার কোনো দেশ আজ অবধি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

আগামীকাল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। তার আগে এসব কথা বলা এইজন্যে যে উপরের ঘটনাগুলোর পিছনে সফলতর ধনী দেশগুলোর কোনো চক্রান্ত নেই, সমস্ত খেলোয়াড়কে দিয়ে মাদক সেবন করানো নেই, রেফারি বা জাজদের ঘুষ খাওয়ানো নেই। যা আছে তা হল টাকার জোর। যে কোনো খেলার সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে সফল হতে গেলে একটা দেশকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। ২০১৬ অলিম্পিকের পর অভিনব বিন্দ্রা হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে এক কলামে লিখেছিলেন, “দেশ হিসাবে আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছতে চাই কিনা যেখানে পদক তালিকায় প্রথম পাঁচে শেষ করতে পারি। সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিনা, মানসম্মানের প্রশ্ন কিনা… আমরা উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের দেশে দারিদ্র্য আছে। সুতরাং আমাদের ঠিক করতে হবে অলিম্পিককে আমরা তার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার দেব কিনা। কিন্তু যদি আমরা চাই আমাদের অ্যাথলিটরা জিতুক, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি করা দরকার। ব্যাপারটা জটিল।” বলা বাহুল্য, দলগত খেলায় ব্যাপারটা আরও বেশি জটিল। গত দুই দশক ধরে ভারতীয় ক্রিকেট অর্থের দিক থেকে সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জায়গায়। এর প্রতিফলন খেলার মাঠে পড়তে বাধ্য। তাই চলতি বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট দলের আধিপত্যকে ব্যাখ্যা করতে কোনো ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা নেহাতই হাস্যকর। বরং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারেনি তা নিতান্তই লজ্জাজনক। আর কোনো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের এত বড় প্রতিভার মানবজমিন নেই, সেই জমিনে গজানো প্রতিভাকে সার জল দিয়ে বড় করার সামর্থ্য নেই। তা সত্ত্বেও যদি এ দেশ থেকে মহম্মদ শামি, যশপ্রীত বুমরা, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলরা উঠে না আসেন তাহলে কোন দেশ থেকে আসবেন?

ক্রিকেট দুনিয়ায় আর্থিকভাবে দু নম্বর এবং তিন নম্বর স্থানে আছে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। লক্ষ করুন, ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই। ইংল্যান্ডও হয়ত শেষ চারে থাকত, যদি ২০ ওভার আর ৫০ ওভারের খেলায় তফাত করতে ভুলে না যেত, কিছু অনিচ্ছুক বুড়িয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকে দলে না রাখত আর তাদের উদ্ধত ক্রিকেট বোর্ড টালবাহানার পর কেন্দ্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ করার জন্যে ক্রিকেটারদের এমন এক তালিকা প্রকাশ না করত, যা প্রায় কাউকে খুশি করেনি। যাঁরা আইপিএল নিলামের বাইরেও ক্রিকেটের অর্থনীতির খবর রাখেন তাঁরা জানেন যে গত এক দশকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের আর্থিক ব্যবধান অস্বাভাবিক বাড়িয়ে তুলে ক্রিকেট দুনিয়াকে ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করে তুলেছে এই ‘বিগ থ্রি’ – ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সর্বোপরি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত একদা শক্তিশালী দলগুলোর অনেক পিছিয়ে পড়ার পিছনে এর ভূমিকা কম নয়। ত্রিদেবের এই প্রতাপে বছর বিশেক আগে জিম্বাবোয়ে, কেনিয়ার মত যে দেশগুলো দ্রুত উঠে আসছিল তারাও ক্রিকেট মানচিত্রের বাইরে ছিটকে পড়েছে। অল্প কিছুদিন আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও কেউ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না। ফিফা যেখানে ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়াচ্ছে, সেখানে আইসিসি ২০১১ আর ২০১৫ সালের ১৪ দলের বিশ্বকাপকে গত বিশ্বকাপ থেকেই নামিয়ে এনেছে দশ দলের বিশ্বকাপে। শুধুমাত্র ব্যবসা বাড়াতে দলের সংখ্যা বাড়ানো ভাল নয় – এ যুক্তি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কমানো হল কার ভালর জন্যে? তাছাড়া ত্রিদেবের সকলের উপর ছড়ি ঘোরানোর পিছনে ব্যবসা ছাড়া আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে? ‘বিগ থ্রি মডেল’ কীভাবে ক্রিকেট দুনিয়ার সংকোচন ঘটাচ্ছে, অনেক দেশকে শুকিয়ে মারছে তা নিয়ে গত একবছর বারবার লিখেছি। বিস্তারিত পাবেন এই লেখায়

শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলো আইসিসির আয় বন্টনের এই অসাম্য থেকে বাঁচতে যে রাস্তা বার করেছে তা হল আইপিএলের আদলে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজন করা। যে দেশের ভারতের মত আইপিএলের বাইরেও অনেকগুলো প্রথম শ্রেণির দল নেই, ঘরোয়া পঞ্চাশ ওভারের খেলার পরিকাঠামো তেমন নয়, সে দেশে এর অনিবার্য পরিণতি কী, তা এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। এমন বোলার পাওয়া দুষ্কর যারা দশ ওভার ভাল বল করতে পারে। আরও শক্ত এমন ব্যাটার পাওয়া যার গোটা ১৫ বলে চার, ছয় মারতে না পারলেই নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় না। আইপিএলের মত রোজগার অন্য দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো থেকে হয় না। ফলে ওই দেশগুলোর ক্রিকেটাররা সারা পৃথিবী ঘুরে একাধিক লিগে খেলে বেড়ান। এত খেললে গড়ে ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করার বোলার পাওয়া যাবে না, আজকাল যায়ও না। তাছাড়া কুড়ি বিশের আদলে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যেভাবে মাঠ ছোট করে আনা হয়েছে তাতে অত জোরে বল করে লাভই বা কী? ব্যাটের কানায় লাগলেও ছয় হয়ে যাবে। ব্যাটারদেরও ইনিংস গড়ে তোলার ধৈর্য থাকছে না। সুইং বা স্পিন সামলানোর ক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। কুড়ি ওভারের খেলায় বোলাররা তো সারাক্ষণ রান আটকাতে বৈচিত্র্য আনতে ব্যস্ত। তাই ক্রস সিম, নাকল বল, স্লোয়ার ইত্যাদি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শামি বা বুমরার মত সিম সোজা রেখে খাঁটি সুইং বা সিম করানোর ক্ষমতা থাকছে না। চলতি বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, সাদা বলের ক্রিকেটে প্রথম দু-এক ওভারের মধ্যে উইকেট নেওয়ার জন্যে প্রসিদ্ধ শাহীনশাহ আফ্রিদিও নতুন বল সুইং করানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। ট্রেন্ট বোল্টেরও প্রায় একই সমস্যা হল। সারাবছর কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে হঠাৎ অভ্যাস বদলে ফেলা যায় না। এতকিছু সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সেমিফাইনালে লড়ে যাওয়া এটুকুই প্রমাণ করে যে ক্রিকেটে মহান অনিশ্চয়তা কিছুটা অবশিষ্ট আছে।

ওসব সমস্যা ভারতের ক্রিকেটারদের নেই। তাঁরা ভারতীয় দলের হয়ে খেলে আর আইপিএল খেলেই যা রোজগার করেন তার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন গড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের রোজগারের তুলনা চলে না। তাঁদের দেশে দেশে খেলে বেড়াতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আইপিএলের ব্র্যান্ড মূল্য বজায় রাখতে বিসিসিআই তাঁদের অন্য লিগে খেলার অনুমতিও দেয় না। ফলে বুমরা, শামি বা মহম্মদ সিরাজ, কুলদীপ যাদবরা ক্রিকেটের সাবেকি দক্ষতাগুলোয় শান দেওয়ার সুযোগ পান। গত একবছর চোটের কারণে না খেলা বুমরার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীর বিশ্রাম পেয়েছে। শামি আবার ভারতীয় কুড়ি বিশের দলে নিয়মিত নন, একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। সেটাও এক্ষেত্রে সুবিধা। আর ব্যাটাররা? কোহলি, রোহিত, রাহুলরা গতবছর পর্যন্ত বলের চেয়ে বেশি রান করার দর্শনকে পাত্তাই দেননি। তাই বারবার দল ব্যর্থ হয়েছে। পাত্তা না দেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে আয়ের নিশ্চয়তা। ভারতীয় বোর্ডের অর্থকরী কেন্দ্রীয় চুক্তি আর আইপিএল – দুটোই। এই নিরাপত্তা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হয়ে যাওয়ায় তাঁরা কুড়ি বিশ বা ৫০ ওভার, কোনো ধরনের খেলাতেই আদৌ ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারই ফল গত দেড়-দুই বছরের হারগুলো। বিশ্বকাপেও সেই ধারা চালু রাখলে ফলাফল অন্যরকম হত না, বোলাররা যতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুন। কারণ ভারতীয় বোলিং কয়েকটা খারাপ দিন বাদ দিলে টেস্ট আর একদিনের ম্যাচে বেশ কয়েকবছর ধরেই অসাধারণ। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে থেকে তিন নিরাপদ ব্যাটারের মধ্যে একজন, রোহিত শর্মা, ঠিক করলেন আক্ষরিক অর্থে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেবেন। আগের কয়েকটা সিরিজে এ জিনিস অনুশীলন করেছেন, অবশেষে বিশ্বকাপে সাফল্য পেতে শুরু করলেন। ফলে বাকিদের নিজেকে কমবেশি না বদলে উপায় রইল না। অর্থাৎ ওই বোলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং। তার উপর ঘরের মাঠের চেনা পরিবেশ, চেনা পিচের সুবিধা তো আছেই। এতসব মিলিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে এই দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া জিতে গেলেও এগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। এর জন্যে আলাদা করে সমস্ত ম্যাচ ‘ফিক্স’ করার প্রয়োজন পড়ে না। এই দলের যা শক্তি, তাতে পিচ বদল করাও নিষ্প্রয়োজন। এদেশের যে কোনো পিচেই এই দল জিততে পারত। অন্য দেশে বিশ্বকাপ হলে অন্য কথা ছিল।

সুতরাং ভারত আগামীকাল বিশ্বকাপ জিতলে তিনটে খেতাবের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে দাপুটে জয় হবে এটা। কিন্তু সকলের জন্যে সবচেয়ে আনন্দের জয় বলা যাবে কি? বিশ্বকাপ উপলক্ষ, বিজেপি সরকারের মহিমা প্রচার এবং শাসক দলের রাজনৈতিক প্রকল্প অনুযায়ী সবকিছু চালানোই যে লক্ষ্য তা সেই ৫ অক্টোবর থেকেই পরিষ্কার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, এদিকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বলিউডি শিল্পীদের ডেকে এনে ধুমধাম হল। আগামীকাল আবার ম্যাচের আগে মোচ্ছব, মাঝে মোচ্ছব, পরে মোচ্ছব। শুধু তাই নয়, দেশের সেনাবাহিনীকেও নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে খেলার আঙিনায় শক্তি প্রদর্শন করতে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবাহিনী খেল দেখাবে।

মজার কথা, আইসিসির এসব আপত্তি নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে ভারতের বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে বসেছেন, সর্বজনবিদিত যে এই ঘটনায় স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবদান ছিল। তাতেও আইসিসির আপত্তি নেই। অথচ বিশ্বকাপ চলতে চলতেই শ্রীলঙ্কার বোর্ডকে সাসপেন্ড করা হল সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। যারা স্রেফ ভারতের সাফল্য নিয়ে গদগদ হতে রাজি নয়, ভারতীয় বোর্ডের কার্যকলাপ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তুলছে, তাদের ঠিক বিজেপি সরকারের কায়দাতেই ভারতবিরোধী বলে দেগে দেওয়ার সংস্কৃতি দেশের ক্রিকেটমহলে চালু করে দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মত ক্রিকেট সাংবাদিকতাও গোদি মিডিয়ার দখলে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা বস্তুত বোর্ড এবং/অথবা বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জনসংযোগ আধিকারিকে পরিণত হয়েছেন। তাই ভারতের খুব অল্প সংবাদমাধ্যমেই যথাযোগ্য গুরুত্বে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর, যে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক অর্জুনা রণতুঙ্গা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের দুর্দশার জন্যে দায়ী বিসিসিআই সচিব জয় শাহ। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই নাকি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট চলে।

অভিযোগটা সত্যি হোক আর মিথ্যেই হোক, ভারতের, বিশেষত বাংলার, নামকরা ক্রিকেট সাংবাদিকদের স্রেফ চেপে যাওয়ার কারণ কী? দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া, নাকি বোর্ডের আনুকূল্য বন্ধ হয়ে যাওয়া? ধরে নেওয়াই যেত, রণতুঙ্গা বিশ্বকাপে দেশের ভরাডুবি দেখে হতাশায় প্রলাপ বকেছেন। শ্রীলঙ্কার বিদায়ের পর তাদের এক সাংসদ যেমন বলেছিলেন, ব্যাটিং কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে নাকি বিসিসিআইয়ের প্রভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ককে বলেছিলেন টসে জিতে ফিল্ডিং নিতে। মুশকিল হল, শ্রীলঙ্কার সরকার রণতুঙ্গার মন্তব্যের জন্যে বিসিসিআই সচিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছে একেবারে সংসদের অধিবেশনে। উপরন্তু পর্যটন মন্ত্রী বলেছেন, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নাকি শাহকে ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। যদি ভারতীয় বোর্ডের এত প্রভাব থাকে একেবারে শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর, তাহলে ক্রিকেট বোর্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা আর কী এমন ব্যাপার? বোর্ড প্রভাব না খাটালেও ফল একই হত, আর প্রভাব খাটায়নি – এ দুটো কিন্তু এক নয়। অটো ফন বিসমার্কের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায় – রাজনীতিতে কোনোকিছু বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না সেটা অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।

ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালের পিচ বদলানোর অভিযোগকেও নস্যাৎ করেছেন ভারতের সাংবাদিককুল, প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটভক্তরা। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য, আইসিসি থেকে বিশ্বকাপের পিচগুলোর সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যান্ডি অ্যাটকিনসন তাদের ইমেলে জানিয়েছেন, তাঁর অজ্ঞাতসারে সেমিফাইনালে যে পিচে খেলা হওয়ার কথা ছিল তা বদলে দেওয়া হয়। একই ইমেলে অ্যাটকিনসন এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে ফাইনালের জন্য তিনি যে পিচ পছন্দ করেছেন তাও ভারতীয় দলের সুবিধার্থে বদলে দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে হইচই পড়ে যাওয়ায় আইসিসি সেমিফাইনাল চলাকালীন একটা বিবৃতি দেয়। সেই বিবৃতিতে কিন্তু বলা হয়নি যে পিচ বদলানোর অভিযোগ মিথ্যা। শুধু বলা হয়েছে, এমনটা করা হয়েই থাকে এবং অ্যাটকিনসনকে জানানো হয়েছিল (“was apprised of the change”)। এই বয়ান যদি সঠিক হয়, তাহলে হয় অ্যাটকিনসন মিথ্যা বলেছেন অথবা তাঁকে জানানো হয়েছিল পিচ বদলে ফেলার পরে। সত্যানুসন্ধান করতে হলে কোনটা ঘটেছে তা অ্যাটকিনসনের কাছে জানতে চাওয়া উচিত ছিল। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কিন্তু সেসবের মধ্যে যাননি। তাঁরা আইসিসির বিবৃতিকে তুলে ধরে রায় দিয়ে দিলেন, এসব ভারতের কাছে হেরে যাওয়া লোকেদের মড়াকান্না। যাহা সরকারি বিবৃতি তাহাই সত্য – ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে তলানিতে পড়ে থাকা দেশে এটাই যে নিয়ম তা অবশ্য বলাই বাহুল্য। আরও মজার কথা, সেমিফাইনালে প্রচুর রান হওয়ার ঘটনাকে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা বলা হল – এই তো। নতুন পিচ নয় বলে আপত্তি করার কী ছিল? পিচটা তো মোটেই মন্থর ছিল না। অর্থাৎ নিয়ম মানা হল কি হল না, তা আলোচ্য নয়। আলোচ্য হল ফলাফলটা কী? কোনো সাংবাদিক বা প্রাক্তন ক্রিকেটার কিন্তু আইসিসির নিয়মাবলী তুলে দেখাননি যে অ্যাটকিনসনকে জানিয়েই কাজ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অ্যাটকিনসন রাবার স্ট্যাম্প মাত্র। উলটে নানারকম অক্রিকেটিয় যুক্তি উঠে এসেছে।

কেউ বলেছেন ভারত যে এতদিনে ইংরেজদের প্রভুত্ব নাশ করে ক্রিকেটে শেষ কথা হয়ে উঠেছে এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না, তাই ভারতকে ছোট করতে এসব বাজে কথা বলা। ইংল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন ক্রিকেটার মার্ক রামপ্রকাশ একথা বলে আবার লিখেছেন, দিল্লির প্রবল বায়ুদূষণ নিয়ে যারা কথা বলছে তারাও নাকি এই উদ্দেশ্যেই ওসব বলছে। এ তো গেল ঋষি সুনকসুলভ ভারতপ্রেমের দৃষ্টান্ত। সুনীল গাভস্করের মত শতকরা একশো ভাগ ভারতীয় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ভারতকে এদের দরকার কারণ ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক টাকা রোজগার হয়। অথচ এরা ভারতের দিকেই আঙুল তোলে। মানে এরা চায় ভারতকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে, কিন্তু ভারত নিজের সুবিধা দেখলেই এদের অসুবিধা। আরও বলেছেন, পিচ যদি বদলানো হয়েই থাকে তো আইসিসিকে জানিয়েই হয়েছে। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি। আইসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটার যদি কিছু বলার সাহস না থাকে, তাহলে আইসিসিকে ধরো। বিসিসিআইয়ের দিকে আঙুল তুলো না। সংবাদসংস্থা পিটিআই গতকাল একটি নামহীন বিসিসিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছিল, অ্যাটকিনসনের কাজ নাকি শেষ। তিনি দেশে ফিরে গেছেন। অথচ আজ তাঁকে আমেদাবাদে পিচ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।

বৃদ্ধ কিংবদন্তির এই প্রবল জাতীয়তাবাদ খুবই প্রশংসনীয় হত, যদি হাস্যকর না হত। হাস্যকর এই কারণে, যে বিসিসিআই বাকি দেশগুলোর উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে ওই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েই। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নয়। ঠিক কথাই যে তাদের ভারতকে দরকার, কিন্তু ভারতও ঘুরে ফিরে তাদের সঙ্গেই খেলে। অন্যদের সঙ্গে খেলতে চায় না। কারণ এদের সঙ্গে খেললেই টিভি সম্প্রচার থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

অর্থাৎ অন্যায় ঢাকতে জাতীয়তাবাদ টেনে আনা, লোক খেপাতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলা আর ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই দেশগুলোর সঙ্গেই হাত মেলানো, পাকিস্তানকে দিনরাত খলনায়ক বলে দাগানো আর টাকা উঠবে বলে তাদের বিরুদ্ধে খেলা নিয়েই উদ্বাহু নৃত্য করা এবং সেই উন্মাদনাকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো – ভারতের শাসক দলের রাজনীতির সব বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় ক্রিকেট শরীরে ধারণ করে ফেলেছে এই বিশ্বকাপে। কাল হবে ফাইনাল। জিতলে জবরদস্ত নির্বাচনী প্রচার। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেয়ার বলসোনারো যেভাবে নির্বাচনে ব্রাজিল ফুটবল দলকে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদীও সেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যবহার করা শুরু করবেন নিজের নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম থেকেই। নেইমাররা বলসোনারোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরাটরা তো সেই ২০১৪ সাল থেকেই দাঁড়াচ্ছেন। এবার না হয় নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চেই দাঁড়াবেন। উপরি হিসাবে থাকবেন গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকররা। বারাণসী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শিলান্যাসে চার মারাঠি ব্রাহ্মণ প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক (গাভস্কর, দিলীপ ভেঙসরকর, রবি শাস্ত্রী, তেন্ডুলকর) যেতে পারেন, ভোটের প্রচারে নামতে আর আপত্তি কী?

হারলে কী হবে? যত দোষ শামি, সিরাজদের হবে নিশ্চয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত