বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল।

এবারের নির্বাচনে লড়া দলগুলো শেষপর্যন্ত পরিষ্কার দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। এক পক্ষের অবিসংবাদী নেতৃত্বে বিজেপি, অন্য পক্ষের তর্কসাপেক্ষ নেতৃত্বে কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি বা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতাদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও এটা ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যত মিথ্যে কথা বলছেন, যত আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন, তার বেশিরভাগই কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে। ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মূল লক্ষ করেছেন গান্ধী পরিবারকে। ফলে অন্য অনেকের প্রতি তাঁর আক্রমণ আমাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ খেয়াল করলে দেখা যাবে, মোদী কিন্তু কোনো বক্তৃতাতেই তাঁদের ভুলছেন না। কারণ মোদী রন্ধ্রে রন্ধ্রে একজন আরএসএস প্রচারক; অরুণ শৌরি বা যশবন্ত সিনহাদের মত কংগ্রেসকে পছন্দ করেন না এবং আর্থসামাজিক ভাবনায় দক্ষিণপন্থী বলে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে বিজেপিতে যাওয়া লোক নন। ফলে মোদী আরএসএসের আদর্শগত শত্রুদের কখনো ভোলেন না। সেই কারণেই সংসদীয় শক্তি নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বক্তৃতার খানিকটা জুড়ে সবসময় থাকে কমিউনিস্ট এবং/অথবা নকশালরা। কংগ্রেস কত ভয়ঙ্কর তা বোঝাতেও তিনি বলেন – ওদের ইশতেহার তৈরি হয়েছে নকশাল চিন্তাভাবনা থেকে। একই কারণে মোদী এবং বিজেপির অন্যান্য শীর্ষনেতারা জওহরলাল নেহরুকে যত গালাগালি দেন, ততটা দেন না ইন্দিরা গান্ধীকে। রাজীব গান্ধীর নাম টেনে আনেন শুধুমাত্র সোনিয়া বা রাহুলকে আক্রমণ করার সময়ে। একই কারণে মোদী কখনোই ভোলেন না লালুপ্রসাদকে। তাঁর এবারের জনসভাগুলোর ভিডিও লক্ষ করলে দেখা যাবে, বারবার তিনি ইন্ডিয়া ব্লক কতখানি ভ্রষ্ট তা বোঝাতে গিয়ে বলেন একজন নেতার কথা, যাঁকে দেশের আদালত দুর্নীতিতে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছে। তবে তিনি এখন জামিনে বাইরে আছেন। মোদী বলেন, শাহজাদা এত ভ্রষ্ট যে সেই লোকটার সঙ্গে শ্রাবণ মাসে মাংস রান্নার ভিডিও শেয়ার করে হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করে! সেই নেতার এত দুঃসাহস যে তিনি বলেন দেশের সকলের সম্পদ কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেওয়া হবে! বলা বাহুল্য, প্রথম কথাটা অর্থহীন, কারণ দেশসুদ্ধ সব হিন্দু মোটেই শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না। আর দ্বিতীয় কথাটা ডাহা মিথ্যা। কিন্তু এখানে সে আলোচনায় যাব না। কথা বলব লালুপ্রসাদ সম্পর্কে, যিনি বয়স এবং স্বাস্থ্যের কারণে হীনবল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সরাসরি পরমাত্মা হতে আবির্ভূত হিন্দু হৃদয়সম্রাটের দুঃস্বপ্নে এখনো হানা দেন। কেন দেন? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব। এই আলোচনা আজই, এখনই করা দরকার। কারণ লালুর বয়স এখন ৭৫, শরীরের অবস্থাও বিশেষ ভাল নয়। যদি ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র এ যাত্রায় বেঁচে যায় এবং ২০২৯ সালে আবার নির্বাচনের মত নির্বাচন হয়, তখন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মানুষটি আর আমাদের মধ্যে থাকবেন কিনা ঠিক নেই।

প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটি পড়ে অনেক পাঠকই নাক কুঁচকোবেন। বিমানযাত্রায় গা গুলিয়ে উঠলে বমি করার জন্যে যে কাগজের ব্যাগ দেওয়া হয়, কেউ কেউ তার প্রয়োজনও বোধ করতে পারেন। কারণ কেবল বাঙালি ভদ্দরলোক নয়, অন্য রাজ্যের ভদ্রজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও দেখেছি, লালু সম্পর্কে একটা শব্দই সকলে জানে – ‘করাপ্ট’ (দুর্নীতিগ্রস্ত)। শুধু তাই নয়, সকলেই নিঃসন্দেহ যে ভারতের ইতিহাসে লালুর চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা আর আসেনি। অথচ লালু মূলত যে পশুখাদ্য নিয়ে দুর্নীতির মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী, সেই মামলাতেই বিহারের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রও যে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন সেকথা কারোর মনে নেই। দেশজুড়ে কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য দলের নেতা, মন্ত্রীদের বহু কেলেঙ্কারি মানুষ ভুলে গেছেন। বিজেপির সাম্প্রতিক ওয়াশিং মেশিনে তো হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারির কলঙ্ক ধুয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা আইন আদালতের চোখে। সাধারণ মানুষের চোখে চিরকালই বহু নেতার দুর্নীতি মাফ হয়ে চলেছে। কেবল লালুর কোনো মাফ নেই, তাঁর ছেলেমেয়েদেরও মাফ নেই। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারেরও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে এবং তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কখনো শুনেছেন তাঁকে স্রেফ ‘করাপ্ট’ বলে উড়িয়ে দিতে? তিনি মহারাষ্ট্রের বাইরেও রীতিমত সম্মানিত নেতা। কেবল রাজনৈতিক মহলের কথা বলছি না। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিও ছিলেন। কোনো ক্রীড়া সাংবাদিকও কখনো লেখেননি পাওয়ারের বিরুদ্ধে কী কী দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তাঁর সম্পর্কে বরং ভাল ভাল সব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। তামিলনাড়ুর দুই প্রবাদপ্রতিম নেতা এম করুণানিধি আর জয়ললিতা। তাঁদের বিরুদ্ধেও বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। মামলা, গ্রেফতারি সবকিছুই হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষককে দেখবেন না প্রধানত তা নিয়েই আলোচনা করছেন। ওঁদের বিরোধীরাও তা করেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁদের ভাবমূর্তি তেমন নয়। যত দোষ লালু ঘোষ।

লালু সম্পর্কে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা হল – অশিক্ষিত। লালুকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্দরলোকেরা সেই নয়ের দশক থেকে বলে আসছেন, ক্ষমতায় আসতে হলে একটা স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া জানা আইন করে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত। এঁরা খবর রাখেন না, যে লালু এলএলবি পাস। ইস্ট জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির মত মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। তারপর এম এ পাস করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। মানে পলিটিকাল সাইন্স, ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’ নয়। বস্তুত ছাত্র রাজনীতির পথেই তাঁর উত্থান, যেমন উত্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, সুব্রত মুখার্জি, বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, ভদ্রলোকদের ভগবান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মহম্মদ সেলিম বা আজকের সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধরদের।

পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ভদ্রসমাজ লালুকে এক বিশেষ চশমা দিয়ে দেখে। সে চশমার একদিকের লেন্সে দুর্নীতি, অন্য লেন্সে অশিক্ষা। লালুর বিরুদ্ধে আরও একটা অভিযোগ প্রবল। তিনি বিহারে গুন্ডারাজ চালিয়েছেন। একথায় জোর দিতে বিহারে বহু যুগ আগে যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, সে যুগের গল্প এমনভাবে শোনানো হয় যেন সে এক স্বর্ণযুগ ছিল। সেই শুণ্ডির মত মাঠে মাঠে ফসল, গাছে গাছে পাখি। লালু ক্ষমতায় এলেন আর বিহার ছারখার হয়ে গেল। অথচ পশুখাদ্য মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, অধুনা প্রয়াত জগন্নাথ মিশ্র কংগ্রেস আমলেই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ভারতের আর সব রাজ্যের রাজনীতি যেন একেবারে শীতকালের ডাউকি লেকের মত স্বচ্ছ এবং সমাজবিরোধীমুক্ত। নিঃসন্দেহে লালুর আমলে দুর্নীতি হয়েছে, গুন্ডারা অনেককিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু লালুর রাজনীতি যদি শুধু ওটুকুই হত, তাহলে ভারতের আর পাঁচজন নেতার সঙ্গে তাঁর তফাত থাকত না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদীকেও ঘুরে ফিরে তাঁকে আক্রমণ করতে হত না। কেন লালুর নীতি আর শিক্ষা ভদ্দরলোকেরা দেখতে পান না তা বুঝতে পারলেই মোদী কেন লালুকে ভুলতে পারেন না তা বোঝা যাবে।

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি আজকের টাকার হিসাবে মোটামুটি ৪,০০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, যাতে তাঁর সময়ের আগের সরকারও যুক্ত ছিল। এর চেয়ে অনেক বড় বড় কেলেঙ্কারি ভারতে ঘটে গেছে। যে সেচ কেলেঙ্কারিতে মহারাষ্ট্রের বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার যুক্ত বলে অভিযোগ, তা ৭০,০০০ কোটি টাকার ব্যাপার। ২জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা নিয়ে দুর্নীতিতে দেশের ১,৭৬,০০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন তৎকালীন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বিনোদ রাই। পশ্চিমবঙ্গের সারদা কেলেঙ্কারি যে ঠিক কত টাকার ব্যাপার তা আজও পরিষ্কার নয়, নিয়োগ কেলেঙ্কারির হিসাব বোধহয় কোনোদিন পাওয়াই যাবে না। তবে আমরা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার হতে দেখেছি। তা এইসব বড় বড় দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের কী হয় সাধারণত? কিচ্ছু হয় না। অজিত নিজের দলকে দুভাগ করে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিয়ে ধপধপে সাদা হয়ে গেছেন। আদর্শ আবাসন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা অশোক চ্যবনও বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে সাফসুতরো হয়ে গেছেন। স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে ডিএমকে নেতা এবং তৎকালীন টেলিকম মন্ত্রী এ রাজাকে বিচারাধীন বন্দি হিসাবে কারাবাস করতে হয়েছিল বটে, কিন্তু অভিযোগটা আদৌ প্রমাণ করা যায়নি। নারদ কেলেঙ্কারি অত টাকার ব্যাপার নয়, কিন্তু ক্যামেরার সামনে হাত পেতে টাকা নেওয়া নেতাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো পক্ষের কোনো উৎসাহ নেই। সেই নেতারা তারপরেও নির্বাচনের টিকিট পেয়েছেন, ভোটারদের ভোটও পেয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী তো দল বদলে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা পর্যন্ত হয়ে গেছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দলের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সবরকম নেতাই দুর্নীতিতে যুক্ত বলে অল্পবিস্তর প্রমাণ হওয়ার পরেও মমতা সততার প্রতীক বলে ভদ্দরলোকেরা এখনো বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় এঁদের সকলকেই ক্ষমাঘেন্না করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লালু তাঁর পুরনো বন্ধু নীতীশ কুমারের মত এক বা একাধিকবার পক্ষ বদল করে কংগ্রেস বা বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসেননি। সম্ভবত তাই তিনি কেবল অভিযুক্ত নন, শাস্তিপ্রাপ্ত। উপরন্তু একথাও প্রমাণিত যে তাঁকে মন্ত্রিত্বের প্রলোভন দেখিয়ে বা ইডি, সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে দলে টানা যায় না। স্বভাবতই তিনি এক দেশ, এক নির্বাচন, এক দল করতে চাওয়া একনায়কের মাথাব্যথার কারণ।

আরও পড়ুন যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

কিন্তু এ তো নেহাত ব্যবহারিক কারণ। গভীরতর আদর্শগত কারণও আছে। এই যে আমাদের ধারণা – লালু অশিক্ষিত, তাঁর পার্টির লোকেরাও সব অশিক্ষিত। এই ধারণার কারণ কী? কারণ হিন্দি সিনেমা, সিরিয়াল এবং অন্যান্য হিন্দিভাষী নেতাদের মুখে আমরা যে ভাষায় কথা শুনি; লালু সে ভাষায় কোনোদিন কথা বলেন না। তিনি পারতপক্ষে ইংরিজিও বলেন না। কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে বাজেট বক্তৃতাও দিতেন হিন্দিতে। মাঝে মাঝে যখন ইংরিজি বলতেন, সে উচ্চারণ ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত হত না। মানে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে সন্তুষ্ট করতে পারত না। অথচ বিহারের রাজনীতিতে লালু এবং তাঁর দলের উত্থান যথার্থই সাবল্টার্নের উত্থান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে নিজের হাবভাব, চালচলন বদলে ফেলা সফল মানুষ অসংখ্য পাওয়া যায়। কিন্তু লালু বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, পরে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হলেন, রেলমন্ত্রকের গুরুদায়িত্ব সামলালেন পোশাকআশাক তো বটেই, মুখের ভাষাটি পর্যন্ত না বদলে। বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার ফুলওয়াড়িয়া গ্রামের কুন্দন রায় আর মরছিয়া দেবীর মেজ ছেলে গোটা জীবন ধরে দেখিয়ে যাচ্ছেন যে দেশোয়ালি ভাষাতেই যাবতীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কথোপকথন চালানো যায়। তাঁর ভাষার কারণে কখনোই তাঁর রাজনীতি সবচেয়ে নিচের তলার মানুষটার মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যায় না। বরং সরসতার কারণে অনেক জটিল বিষয়ও তিনি সকলের বোধগম্য করে দিতে পারেন। আজকাল বড় একটা বেরোন না বাড়ি থেকে, আগেকার মত দীর্ঘ বক্তৃতাও দিতে পারেন না। কিন্তু যেটুকু বলেন সরসভাবেই বলেন এবং বক্তব্যে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকে না। যেমন যখন ইন্ডিয়া ব্লক গঠনের চেষ্টা চলছিল, তখন এক সভার পর সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – আপনি বিয়ে করছেন না কেন? আপনার মা আমাকে বলেছেন, আপনি কথা শুনছেন না, বিয়ে করছেন না। এখনো সময় আছে, বিয়ে করুন। আমরা সবাই বরযাত্রী যাব। উত্তরে রাহুল হেসে বলেন, আপনি যখন বলে দিয়েছেন তখন বিয়ে এবার হয়ে যাবে। কারোর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে লালু আসলে রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে জোটে থাকার ব্যাপারে ভরসা দিচ্ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসাবে। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে যে হিন্দি চলে, লালু তার ধারে কাছে গেলেন না কোনোদিন। ফলে দেশের উচ্চবর্গচালিত সংবাদমাধ্যম চিরকাল তাঁকে অশিক্ষিত বলে প্রচার করে গেল। লালু সকলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের রাজনীতি নিজের মত করে চালিয়ে গেলেন। এ জিনিস এক দেশ, এক ভাষা করতে চাওয়া একনায়ককে যন্ত্রণা দেবে না?

লালুর আরও বড় দোষ হল, তাঁর কথার দাম আছে। তিনি নীতীশের মত পালটি খান না, মমতার মত ক্ষমতায় আসার জন্যে ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ হচ্ছে’ বলার মত দক্ষিণপন্থী এজেন্ডা গ্রহণ করেন না, হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাত ধরেন না। আবার ক্ষমতায় এসে গেলে সংখ্যালঘু ভোটের কথা ভেবে মুসলমানদরদীও সাজেন না। তিনি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে চিরকাল কথা বলেন এবং কাজ করেন। তিনি একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি গোটা দেশে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়া লালকৃষ্ণ আদবানির রথ থামিয়ে তাঁকে গারদে পুরে দিয়েছিলেন। গত শতকের শেষ প্রান্তে যখন বারবার ত্রিশঙ্কু লোকসভা হচ্ছিল, তখন জয়প্রকাশ নারায়ণের অনেক শিষ্যই নিজেদের অবস্থান বদলেছেন নানা অজুহাতে। ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু লালু কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষ ত্যাগ করেননি। তিনি বা তাঁর দলের নেতারা মন্ত্রিত্ব পেলেন কিনা সে প্রশ্ন কখনো তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠেনি।

লালুই যে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা – এ সম্পর্কে দেশের সাংবাদিককুল, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং ভদ্দরলোকেরা এত নিশ্চিত যে তাঁকে নিয়ে নানাবিধ কৌতুক কাহিনি চালু আছে। যেমন

লালু একবার সংসদের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। সে দেশের এক সাংসদের বাড়িতে গেছেন। জানতে চেয়েছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

সাংসদ বলেছেন, আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

হ্যাঁ।

ফিফটি পার্সেন্ট।

পরের বছর সেই সাংসদ ভারতে এসে লালুর বাড়িতে গেছেন। জিজ্ঞেস করেছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

কই, না তো!

হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

এসব গল্প বাঙালি ভদ্রজনের আড্ডায় আসর মাতিয়ে রেখেছে বছর তিরিশেক হল। অথচ এই লালু রেলমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষতিতে চলা ভারতীয় রেল লাভের মুখ দেখেছিল। তাঁর কর্মপদ্ধতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ানো শুরু হয়েছিল। এমনকি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকেও তাঁকে ছাত্রছাত্রীদের সামনে বলতে ডাকা হয়েছিল। এমন লোককে ‘মেরিট’-এর দোহাই দিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গালাগালি করা ভদ্রসমাজের কী করেই বা হজম হবে? লালুর রাজনীতি তো শতকরা একশো ভাগ সংরক্ষণের পক্ষে।

এসব কথা বহু বাঙালির তেতো লাগবে। তথ্য অস্বীকার করতে না পারলেও তাঁরা প্রশ্ন তুলবেন – বিহারের জন্যে লোকটা কী করেছে? একথা ঠিক যে লালুর নেতৃত্বাধীন সরকার বিহারকে অর্থনৈতিকভাবে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু বা কেরালার স্তরে নিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু লালু ক্ষমতায় আসার আগে বিহারে সব ভাল ছিল, এ নেহাত গালগল্প। অর্থনীতিবিদ আশিস বোস যখন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কাছে জমা দেওয়া এক রিপোর্টে দেশের রুগ্ন অংশ হিসাবে BIMARU (বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যগুলোর কথা উল্লেখ করেন তখনো লালু ক্ষমতায় আসেননি। লালুর রাষ্ট্রীয় জনতা দল একক ক্ষমতা হারিয়েছে তাও কম দিন হল না। অথচ দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রিয় কাজের মানুষ নীতীশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে তেমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারেননি বিহারে। পারলে এবারের নির্বাচনেও কর্মসংস্থান বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াত না, কয়েক মাসের সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রী থাকা লালুপুত্র তেজস্বীর চাকরি দেওয়ার প্রকল্প তাঁকে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলত না। কিন্তু সাহেবরা ঠিকই বলে – ‘Man cannot live with bread only’ (মানুষ কেবল খাবার খেয়ে বাঁচে না)। সুতরাং কেবল অর্থনৈতিক অবদান দিয়েই একজন নেতা বা তাঁর দলের রাজনীতিকে বিচার করা মূর্খামি এবং অন্যায়। লালুর বিহারের মানুষের প্রতি সবচেয়ে বড় অবদান আজকের লব্জে যাকে ‘উন্নয়ন’ বলে তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক সুদূরপ্রসারী।

মনে রাখতে হবে, লালু এমন এক পরিবারের ছেলে, যাদের জন্যে গ্রামে জলের কলটা পর্যন্ত আলাদা হত। বিশিষ্ট সাংবাদিক রাহুল শ্রীবাস্তব গতবছর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, লালু যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন, নিজের মাকে খবরটা দিতে গিয়ে বলেন ‘মা, আমি হাতুয়ার রাজা হয়ে গেছি’। হাতুয়া তাঁর গ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী বড় জায়গা। মা লেখাপড়া জানেন না, প্রান্তিক পরিবারের গৃহবধূ। মুখ্যমন্ত্রী মানে কী, তা তিনি বুঝবেন না। তাই লালুকে ওভাবে বলতে হয়েছিল। কিন্তু ওই অবস্থা থেকে ক্ষমতা হাতে পেয়ে অনেকেরই মাথা ঘুরে যায়। নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মত মানুষের থেকে সচেতনভাবেই তারা দূরে সরে যায়। লালুর বিশেষত্ব হল তিনি তা করেননি। জাতপাত এখনো বিহারে যথেষ্ট বড় বিষয়। সরকারি দফতরেও উঁচু জাতের চাপরাশি নিচু জাতের অফিসারকে খাওয়ার জল দেয় না। কিন্তু এই ব্যবস্থার মূলে লালুর আমলে যেভাবে কুঠারাঘাত করা হয়েছে তা ঐতিহাসিক। আট বা নয়ের দশকে বিহারে যাতায়াত ছিল এমন লোকেদের কাছে শোনা যায়, বাসে উঁচু জাতের লোক উঠলে নিচু জাতের লোকেদের উঠে দাঁড়িয়ে বসার জায়গা দিতে হত। সেসব লালুর আমলে তুলে দেওয়া হয়। একদিনে হয়নি। প্রবীণ সাংবাদিকরা বলেন, লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল। তিনি উঁচু জাতের অফিসারদের এবং সামনে উপস্থিত নানা জাতের গরিবগুরবো মানুষকে বার্তা দিতে চাইতেন, যে জাত কোনো ব্যাপার নয়। যে পদে আছে, তাকে সবাই মানতে বাধ্য। উঁচু জাত বলে ছাড় পাবে না।

রাহুল শ্রীবাস্তবেরই বলা মুখ্যমন্ত্রী লালুর দুটো কীর্তির কথা বলে শেষ করি। বোঝা যাবে, লালু যখন থাকবেন না, কেন তখনো মোদীর মত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা লালুর ভূত দেখবে।

লালু হঠাৎ কিছুদিন রাতের বেলা সুট, বুট, হ্যাট পরে পুরোদস্তুর সাহেব সেজে পাটনার আশপাশের ইটভাটাগুলোতে যাওয়া শুরু করেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে খবর ছিল, উচ্চবর্ণের বাবুরা ইটভাটায় রাতে আসর জমান আর বিছানায় তাঁদের শিকার হতে হয় নিম্নবর্গীয় মহিলাদের। লালু স্বয়ং দলবল নিয়ে উপস্থিত হয়ে টানা কিছুদিন উত্তম মধ্যম দেওয়ার পরে বাবুদের মহফিল বন্ধ হয়।

দ্বিতীয় ঘটনা অভিজাত পাটনা ক্লাব নিয়ে। কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব বা ক্যালকাটা ক্লাবের মতই ওটাও অভিজাতদের আয়েশ করার জায়গা। তফাত বলতে সব বর্ণের লোককে ঢুকতে দেওয়া হত না। লালু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে বলেন, ওই ক্লাব আমি বন্ধ করে দেব সবাইকে ঢুকতে না দিলে। তারপর ক্লাবের নিয়ম ভেঙে প্রথম যে অসবর্ণ পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ওই ক্লাবে, তারা জাতিতে ডোম।

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

আমিষ খান বলে গাঙ্গুলি জেঠিমা, ঘোষ কাকুও দেশের মানুষ নন?

এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

প্রধানমন্ত্রী সমীপেষু,

আপনাকে যা লিখছি তার অনেকটাই ব্যক্তিগত। কারণ রাজনীতিটাকে একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে এসেছেন আপনিই। মানে গত শুক্রবার (১২ এপ্রিল, ২০২৪) উধমপুরে আপনার বক্তৃতা শোনার আগে পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসকে তো আমরা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই জানতাম। একথা ঠিক যে ২০১৫ সালেই আমরা জেনে গেছিলাম, বাড়ির ফ্রিজে কিসের মাংস রাখা আছে তা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। তার জন্য একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু তখন আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম এই ভেবে যে একমাত্র গরুর মাংসই মৃত্যুর কারণ হতে পারে, অন্যান্য প্রাণির মাংস বা মাছ খাওয়া নিয়ে কেউ কিছু বলবে না। আমরা অনেকে একথা ভেবেও নিশ্চিন্ত ছিলাম যে ওসব কিছু গুন্ডা বদমাইশের কাজ। সরকার কে কী খেল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, আর সমাজবিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে তো আইন আদালত আছেই। গত নয় বছরে অবশ্য আমরা বুঝে গেছি যে গোমাংস খাওয়া, বিক্রি করা বা গোমাংস হয়ে ওঠার জন্য গরু নিয়ে যাওয়ার সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা তেমন গুরুতর অপরাধ নয়। দিব্যি জামিন পাওয়া যায়, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াও এ দেশের অন্যান্য অপরাধের মতই অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। তবু আমাদের মধ্যে যারা গরুর মাংস খায় না তারা নিশ্চিন্ত ছিল। ও জিনিস তো এমনিই আমাদের খাওয়া বারণ। ‘প্রগতিশীল সাজতে’ না খেলেই কোনো অশান্তি নেই, কারোর আক্রমণের মুখে পড়তে হবে না। থানা পুলিস কোর্ট কাছারিহীন নিশ্চিন্ত জীবন কাটিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু শুক্রবার নির্বাচনের প্রচারে আপনি যা বলেছেন তাতে তো নিশ্চিন্তে আর থাকা যাচ্ছে না।

ব্যক্তিগত বিশ্বাস যা-ই হোক, কলার তুলে যে পরিচয়ই দিই না কেন, জন্মসূত্রে আমরা যারা হিন্দু, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু, তাদের তো আর নিশ্চিন্তে থাকার উপায় রইল না।

আইনে কিছু খাওয়া বারণ নেই, আপনিও কাউকে কিছু বারণ করেন না। কিন্তু শ্রাবণ মাসে যারা খাসির মাংস রান্না করে তার ভিডিও প্রচার করে – তারা দেশের মানুষকে আঘাত করে। তাদের আসল উদ্দেশ্যই নাকি দেশের মানুষকে আঘাত করা, মোগলদের মত। মোগলরা ভারত আক্রমণ করে এখানকার রাজাদের হারিয়েই সন্তুষ্ট হত না, মন্দির ভেঙে দিয়ে, ধর্মস্থান নষ্ট করে তবে তারা শান্তি পেত। ‘মাটন’ খাওয়া লোকেরাও সেইরকম। তারা দেশের লোককে উত্যক্ত করতেই চায় এবং নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক পাকা করতে চায়। এও বলেছেন যে ব্যাপারটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই আপনার দায়িত্ব এসব নিয়ে কথা বলা।

এরপর আর নিশ্চিন্ত থাকা যায়?

প্রথমত, আমি আমিষ রান্না করছি তার গন্ধেও নয়, স্রেফ ছবিতেই যদি কারোর মনে আঘাত লাগে, তাহলে তো ও জিনিস রান্না করাই বন্ধ করে দিতে হবে। নয়ত মাদক দ্রব্যের মত লুকিয়ে খেতে হবে। কারণ যার মনে আঘাত লাগবে সে যে দল পাকিয়ে এসে আমাকেও আখলাক আহমেদ বা পেহলু খান করে দেবে না তার গ্যারান্টি তো ‘মোদী কি গ্যারান্টি’-র মধ্যে পড়ে না দেখছি। তারপর কে কোন মাসে আমিষ খায় না তা ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখতে হবে। বাঙালি হিন্দুরা শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না, আপনি যে সময়টাকে নবরাত্রি বলেন তখন তো মোটেই নিরামিষ খায় না। অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুর ধর্মাচারে তেমন কিছু বলাই নেই। তবে অনেকে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন নিরামিষ খায় আর পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসে আমিষ গন্ধ। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কোনোদিন ঝগড়া করতে যায় না। আমি আজ নিরামিষ খাচ্ছি, তাই তোমাকেও নিরামিষ খেতে হবে – এমন দাবি বাঙালি হিন্দুরা কখনো করেনি। কিন্তু আজকাল বাঙালি পাড়া বলে আলাদা করে কিছু থাকছে না পশ্চিমবঙ্গের শহর আর শহর ঘেঁষা মফস্বলে। থাকা যে উচিত তাও নয়। সবাই সর্বত্র সম্পত্তি ভাড়া নেবে বা কিনবে – তবেই না দেশ সবার। সেইজন্যেই তো কাশ্মীরের জন্যে সংবিধানে থাকা ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করিয়েছেন আপনি। তা এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই এসে পড়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। দেশের মানুষ বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন? কেবল যারা শ্রাবণ মাসে বা সারাবছর নিরামিষ খায় তারাই দেশের মানুষ? বাকি সবাই বাইরের লোক? তাহলে কি দেশব্যাপী এনআরসি করার সময়ে এও খতিয়ে দেখা হবে যে কে কে আমিষ খায়? তারপর কেবল নিরামিষাশীরাই পাবে নাগরিকের তকমা? মোগলদের মন্দির ভাঙার সঙ্গে আমিষ রান্নার যে প্রতিতুলনা আপনি করেছেন তা-ই বা কী করে নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়? প্রথম মোগল সম্রাট বাবর যখন ভারতে এসে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তখন দিল্লির মসনদে কোনো হিন্দু রাজা ছিলেন না, ছিলেন পাঠান ইব্রাহিম লোদী। তিনিও মুসলমান। সুতরাং তাঁকে হারিয়ে মন্দির ভেঙে তবেই সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। মন্দির ভাঙলে লোদীর কী? কিন্তু সেকথা থাক। ধরে নিলাম আপনি পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের হাতে মন্দির ধ্বংসের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ইতিহাস তো আপনার বিষয় নয়, আপনার বিষয় হল ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’। সুতরাং ওটুকু বাদ দিলাম। কিন্তু কথা হল, আপনি কি বলতে চেয়েছেন লালুপ্রসাদ আর রাহুল গান্ধীর মত যারা শ্রাবণ মাসে আমিষ খায় তারা এ দেশের মানুষ নয়?

আপনার সাঙ্গোপাঙ্গরা অনেকেই আগে বলেছে বাঙালির মাছ খাওয়ার অভ্যেসটা মোটেই ভদ্রজনোচিত নয়। ২০১৭ সালে হঠাৎ ‘অল ইন্ডিয়া ফিশ প্রোটেকশন কমিটি’ নামে এক সংগঠনের উদয় হয় সোশাল মিডিয়ায়। তারা বলতে থাকে যে বিষ্ণু যেহেতু মৎস্যাবতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন একবার, সেহেতু মাছ খাওয়া মানে ভগবানকেই উদরস্থ করা। অতএব মাছ খাওয়া অনুচিত কাজ। আপনার দলের নেতা পরেশ রাওয়াল ২০২২ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন ‘গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আবার কমে যাবে, মুদ্রাস্ফীতিও উপর-নিচ হবে, লোকে চাকরিও পেয়ে যাবে। কিন্তু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আর বাংলাদেশিরা আপনার পাশে এসে থাকতে শুরু করলে কী করবেন, যেমন দিল্লিতে থাকে? গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কী করবেন? আগে বাঙালিদের জন্যে মাছ রান্না করবেন?’ সত্যি বলছি, মোদীজি। তখনো আমরা অনেকে ভেবেছিলাম বিপদ যা হবে রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিদেরই হবে। অনেকেরই মাথায় ঢোকেনি যে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির খাওয়াদাওয়ায় খুব তফাত নেই। পোশাক দেখে বা মুখের ভাষা শুনেও আলাদা করে চেনা শক্ত। এখন আপনি স্বয়ং মাছ মাংস যারা রান্না করে, খায় তাদের বিরুদ্ধে কামান দাগলে ভয় না পেয়ে উপায় কী?

ভুল বুঝবেন না। মুসলমান, খ্রিস্টান, আদিবাসীদের কী হবে তা নিয়ে ভাবছি না। ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিনই তো আপনি বলে দিয়েছেন যে নতুন যুগের সূচনা হল। এই যুগে হিন্দু বাদে অন্য ধর্মের লোকেদের তো তা-ই খেতে হবে যা হিন্দুরা খায়। যা হিন্দুরা খায় না তা খাওয়া যে চলবে না সে আর বলতে? কিন্তু আপনার শুক্রবারের ভাষণ শুনে আশঙ্কা হচ্ছে অনেক হিন্দুও যে মাছ মাংস কবজি ডুবিয়ে খায় তা আপনি জানেন না। আপনার দোষ নয়। হয়ত দিলীপবাবু, সুকান্তবাবু, অগ্নিমিত্রা দেবীরা আপনাকে বলেননি। তাই ভাবলাম একটু জানিয়ে দিই। আর পাঁচজনের কথা তো বলতে পারি না, নিজের কথাই বলি। ওই যে বললাম – ব্যাপারটা ব্যক্তিগত।

আমার ছোটবেলায় স্কুলমাস্টারদের মাইনে লোককে বলার মত ছিল না বলে বাড়িতে মাছ প্রতিদিন হত না। মাংস হত বাবার মাইনে পাওয়ার সপ্তাহে। বাড়িতে টেলিফোন থাকার প্রশ্নই নেই। তাই সুদূর বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে আমার বড়মামা এসে পড়তেন বিনা নোটিসে। পোস্টকার্ড লিখতেন, কিন্তু সেটা সাধারণত এসে পৌঁছত মামা ফিরে যাওয়ার পরে। একাধিকবার তিনি এসে পড়েছেন সরস্বতীপুজোর দিন বেশ রাতে। সেদিন হয়ত আমাদের মেনু – ডাল আর আলুসেদ্ধ। কিন্তু দাদাকে তাই খাওয়ালে স্বামীর মান থাকে না। তখন কী করতেন আমার মা? টুক করে পিছনের উঠোন পেরিয়ে চলে যেতেন গাঙ্গুলিজেঠুর বাড়ি। তাঁর বাড়িতে প্রতিবার বড় করে সরস্বতীপুজো হত আর সে পুজোর ভোগে খিচুড়ির সঙ্গে থাকত জোড়া ইলিশ। জেঠু নিজে হাতে রাঁধতেন। আমার মা গাঙ্গুলি জেঠিমার সঙ্গে গোপন আঁতাতে দু টুকরো ইলিশ আর একটু ঝোল নিয়ে আসতেন, বাবার মান বেঁচে যেত। গাঙ্গুলি বোঝেন তো? গঙ্গোপাধ্যায় – খাঁটি বামুন। অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের বিশেষ পরিচিত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা আপনার দলের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায় যেমন। আমার সেই পাড়ার জেঠু গলার পৈতেটা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতেন।

আরও পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

সেইসময় বাড়িতে মাংস হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হত মুরগির মাংস, কারণ লালুপ্রসাদ যে মাংস রান্না করছিলেন দেখে আপনি চটেছেন, তার দাম আরও বেশি। বসে থাকতাম শীতলাপুজোর অপেক্ষায়। কারণ আমাদের অঞ্চলের একটা বাড়ির নামই শীতলা বাড়ি। সে বাড়িতে প্রতিবছর ঘটা করে শীতলাপুজো হত। সে পুজোর ভোগই পাঁঠার মাংস। আমাদের নেমন্তন্ন থাকত, ফলে মাটির ভাঁড়ে চার-পাঁচ টুকরো মাংস জুটে যেত। বিশ্বাস করুন, সে বাড়ির লোকেরাও হিন্দু। পদবি সম্ভবত ঘোষ। আপনার দলের বর্ধমান দুর্গাপুর কেন্দ্রের প্রার্থী দিলীপবাবুর মত আর কি।

আর নিরামিষাশী বাঙালি হিন্দুর কথা শুনবেন? আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় রাঁধতে পারতেন না, আমিও তখন ছোট। মা গুরুতর অসুস্থ হলেন। সে কদিন দুবেলা রেঁধে বেড়ে আমাদের খাওয়াতেন মণ্ডল কাকিমা। নিজের রান্নাঘরে নিজের বাসনকোসনে রেঁধে ভাত, ডাল, তরকারি দিয়ে যেতেন আর দুবেলাই মুখ শুকনো করে আমার বাবাকে বলতেন ‘দাদা, আপনাদের খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে, না? আমি তো মাছ খাওয়াতে পারছি না।’ বাবা জবাবে বলতেন ‘ছি ছি! আপনি রেঁধে দিচ্ছেন বলে খাওয়া হচ্ছে, বৌদি। মাছ খাচ্ছি না তো কী হয়েছে? এ বাড়িতে এমনিতেও রোজ মাছ হয় না।’ কাকিমা মাছ খাওয়াতে পারতেন না কারণ ওঁরা অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। শুধু বাড়িতে আমিষ রান্না হত না তা নয়, কাকিমার দুই ছেলের বিয়েতেও নিমন্ত্রিতদের নিরামিষই খাওয়ানো হয়েছিল। পাড়ায় অমন পরিবার ওই একখানাই। অথচ কোনোদিন তাঁদের মনে আঘাত লাগেনি আর সব বাড়িতে আমিষ রান্না হওয়ায়। মণ্ডল মানে বুঝলেন তো? হিন্দু কিন্তু। আপনার দলের হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডলের মত।

বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদিতে কোন কোন মাংস খাওয়ার কথা লেখা আছে সেসব আলোচনায় আর গেলাম না মোদীজি। আপনি সাধু সন্ন্যাসী পরিবৃত হয়ে থাকেন, সেসব কি আর আপনার অজানা? শুধু শেষে আপনাকে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে আমাদের রেল বাজারের সবজির দরগুলো জানিয়ে দিই। একটু দেখে বলবেন, শেষমেশ যদি এ দেশে থাকতে গেলে আমিষ ছেড়েই দিতে হয়, এত দাম দিয়ে কিনে খেতে পারবে কজন? আপনি তো সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। করলেও আমার মত চুনোপুঁটির সেখানে জায়গা হত না। তাই হাটখোলা চিঠিতেই এত কথা বলতে হল। অপরাধ নেবেন না।

ঝিঙে ১০০/- কেজি
পটল ৮০/- কেজি
বেগুন ৮০/- কেজি
উচ্ছে ৮০/- কেজি
ঢ্যাঁড়স ৭০/- কেজি
পেঁপে ৬০/- কেজি
লাউ ৪০/- কেজি
সজনে ডাঁটা ৮০/- কেজি
শশা ৮০/- কেজি
টমেটো ৩০/- কেজি
বিট, গাজর ৫০/- কেজি
বিন ৮০/- কেজি
ক্যাপসিকাম ১০০/- কেজি
লঙ্কা ১০০/- কেজি
কুমড়ো ৩০/- কেজি
চিচিঙ্গা ৮০/- কেজি
মিষ্টি আলু ৬০/- কেজি
কাঁচকলা ১৫/- জোড়া
চালকুমড়ো ৬০/- কেজি

ইতি

একজন আমিষাশী হিন্দু সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত