সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন সোবার্স

যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না।

খেলাধুলোর ইতিহাস বলে আগামিদিনে কিছু থাকবে কি না জানি না, কারণ এখন ইতিহাসকে ‘নস্ট্যালজিয়া’ বলে দেগে দিয়ে বর্তমানের সবকিছুকেই সর্বকালের সেরা বলার যুগ। এ-যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার মতো চল্লিশোর্ধ্বদের বেশ অসুবিধে হয়। আমার বাড়াবাড়ি রকমের দুষ্টু বন্ধুদের পাড়ার জ্যাঠামশাই থেকে স্কুলের মাস্টারমশাই প্রকাশ্যে ‘হনুমান’ বলে অপমান করতেন। এখন সেই বন্ধুরা ভাবে ‘একবার যদি দিনগুলো ফিরে পাই, স্যরদের দেখে নেব।’ আমি অঙ্ক ভুল করে কানমলা খেয়ে ধমক শুনতাম ‘ছাগল’। এখন দেখছি, কাউকে ছাগল বলে না মানলে তাকে অপমান করা হয়। আমরা জানতাম A for apple, B for bat যেমন, তেমনই G for goat। এখন দেখি ছোটবেলায় শেখা ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করে লিখতে হয় GOAT. কিন্তু সেকথার ছাগল ছাড়াও একটা গূঢ়তর, বৃহত্তর অর্থ আছে— সর্বকালের সেরা (Greatest of All Time)। তাই সকল ভক্তকুল নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কেই ছাগল বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

অবশ্য ব্যাপারটা ভক্তকুলের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা আর গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। যে ফুটবলারকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করালে সবচেয়ে বেশি জিনিস বিক্রি হয়, তাঁকে ছাগলের সঙ্গে বসিয়ে ফটোশুট, মাঠের মধ্যে তাঁর ছায়া হিসাবে একখানা ছাগলের ছায়া দেখিয়ে ছবি তৈরি— সুচারু ব্যবস্থা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও নিদারুণ। গোটের ছড়াছড়ি। সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে নাকি বিরাট কোহলি গোট, একদিনের ক্রিকেটে নাকি রোহিত শর্মা গোট, রবিচন্দ্রন অশ্বিন অবসর নেওয়ার সময়ে শুনলাম তিনিও গোট, ইদানীং শোনা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে রবীন্দ্র জাদেজা গোট, এমনকী, মাঝেসাঝে খেলে এক-আধটা ম্যাচ জিতিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টার জন্যে হার্দিক পান্ডিয়াও গোট হয়ে যান। এর ওপর আছেন ‘ইউনিভার্স বস’ ক্রিস গেল এবং ‘গড’ শচীন তেন্ডুলকর। মানে ক্রিকেট মাঠে দিন-দিন মানুষই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। এমন দিনে কি তারে বলা যায় যে, গ্যারি সোবার্স বলে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, যিনি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তখন টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড (৩৬৫) তাঁর দখলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মোট সর্বোচ্চ রানও তাঁর?

শুধু তাই নয়, ৯৩ খানা টেস্ট খেলে প্রায় ৫৮ গড় ধরে রাখার রেকর্ড আজও খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এই ২০২৬ সালেও গড়ের দিক থেকে তিনি টেস্টের ইতিহাসে ১১ নম্বরে। কিন্তু ওপরের দশজনের চারজন ৩০ খানা টেস্টও খেলেননি। এদিকে অবসরের সময়ে সোবার্স ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী (লান্স গিবসের পরেই)। কী বল করতেন? আঙুলের কারিকুরিতে স্পিন, কবজির মোচড়ে স্পিন, সুইং, সিম— এককথায় যতরকম বোলিং সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। স্লিপে আর ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে তাঁর মতো ফিল্ডারও ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব বেশি আসেনি।

পরিসংখ্যানের খাতিরে বলা যেতে পারে, তিনি টেস্টে ১০৯ খানা ক্যাচ নিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি ক্যাচ সেইসময় একমাত্র কলিন কাউড্রে আর ওয়াল্টার হ্যামন্ডের ছিল। কিন্তু ওই পরিসংখ্যান আসল কথা নয়। অমন ফিল্ডার যে বিরল, সেকথা বলেছেন কারা? যাঁরা সোবার্সের খেলা দেখেছেন, তাঁরা, যাঁরা ওঁর সঙ্গে বা বিরুদ্ধে খেলেছেন, তাঁরাও। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলা ছেড়েছেন ১৯৭৪ সালে। স্বভাবতই তাঁর খেলার খুব বেশি ভিডিও সংরক্ষিত নেই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, ভিডিও আবিষ্কারের আগে, দিনরাত যাবতীয় খেলার সরাসরি সম্প্রচারের আগেও পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল। তখনও মানুষ প্রেম করত, সন্তানের জন্ম দিত, তাকে বুক দিয়ে লালন করত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গান গাইত এবং খেলাধুলো করত। কারণ এসব করতে ভাল লাগত। যারা দেখত, তারাও ভাল লাগত বলেই দেখত। আর যা দেখতে ভাল লাগে, তা মানুষ শতমুখে বলে এবং লিখে অন্যকে জানায়। তাই ব্র্যাডম্যান, সোবার্স, পেলে, রড লেভার, দিয়েগো মারাদোনাদের মহত্ত্বের লিখিত ইতিহাস আছে। তাঁদের কেউ গোট বলত না, কারণ কে সবার সেরা— তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না।

খেলার প্রাথমিক উদ্দেশ্য আনন্দ পাওয়া— যে খেলে তার পক্ষেও, যে দেখে তার পক্ষেও। তারপর আসে স্কোরবোর্ড, হার-জিতের হিসেব। তারও পরে আসত খেলাকে ঘিরে ব্যবসা। সেটা মন্দ নয়, কারণ খেলা যদি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দিতে পারে, তাহলে তাঁরা আরও মন দিয়ে খেলতে পারবেন। কিন্তু সোবার্স যে যুগের ক্রিকেটার, তখন ক্রিকেট নিয়ে ব্যবসা হত, ব্যবসার জন্যে ক্রিকেট হত না। ব্র্যাডম্যান, সোবার্সদের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার তাগিদ ছিল না। তাঁদের ব্র্যান্ড করে তোলার জন্যে পাকা মাথার লোকেরা দিবারাত্র লেগেও থাকত না। ফলে দর্শক, সাংবাদিক, সমালোচক— সকলের কাছেই মুহূর্তের মূল্য ছিল, সৌন্দর্যের দাম ছিল। অতি সফল অলরাউন্ডার সোবার্সের জন্য সবাই পাগল হত, কিন্তু জর্জ হেডলি বা রয় ফ্রেডরিক্সকেও কেউ ভুলত না। যে-দল হেরে গেল, সে-দলের ক্রিকেটারদের জন্যও জয়ী দলের সমর্থকদের ভালবাসা থাকত।

সে-যুগের লোক বলেই সোবার্স ওরকম ঝুঁকি নিতে পারতেন, যা নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হিসাবে ১৯৬৮ সালে পোর্ট অফ স্পেনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্টে। তিনি এমন এক সময়ে দ্বিতীয় ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, যখন ইংল্যান্ডকে ঘণ্টাদুয়েক ব্যাট করতে হবে আর জিততে গেলে দরকার মাত্র ২১৫ রান। সোবার্সের ধারণা ছিল, ইংল্যান্ড ওইটুকু সময়ও টিকতে পারবে না, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে যাবে। কিন্তু কাউড্রের ইংল্যান্ড অনায়াসে সাত উইকেটে জেতে। কেন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘দ্য গার্ডিয়ান ’ কাগজে সোবার্সকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভিক মার্কস জানিয়েছেন, সোবার্সের উত্তর ছিল, ‘সিরিজটা বড্ড বোরিং ছিল। প্রথম তিনটে টেস্ট ড্র হয়েছিল। ইংল্যান্ড ঘণ্টায় ১২-১৩ ওভার করে বল করছিল। আমি ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম। আমি ক্রিকেট বলতে যা বুঝি, ওটা তা নয়।’ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আর বেন স্টোকসের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা যেভাবে দর্শকদের আশীর্বাদ পেলেও ক্রিকেটমহলে সমালোচিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায়— পৃথিবী বদলে গেছে। এখানে জেতাটাই বড় কথা, কারণ জয়ই বিক্রয়যোগ্য। পরাজয় নয়। জয়ীই ব্র্যান্ড হয়। তাই সারাক্ষণ তর্ক লাগিয়ে রাখতে হবে— মেসি গোট, না রোনাল্ডো? বিরাট গোট, না জো রুট? কখনও বিশ্বকাপ না জেতা জোহান ক্রুয়েফ বা অতি সামান্য টেস্ট খেলতে সুযোগ পাওয়া ব্যারি রিচার্ডসকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় আনা যাবে না। তাছাড়া কোনওমতেই যা করা যাবে না, তা হল অতীতের কেউ বর্তমানের কারও চেয়ে মহান খেলোয়াড় ছিলেন, তা বলা। কারণ ওটা বিপণনবিরোধী ব্যাপার। কোনও কোম্পানি কি তার এখনকার ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে বলতে পারে ‘এই যেটা বের করেছি এটা ভাল, তবে আগেরটা আরও ভাল ছিল?’ খেলাকে এবং সফল খেলোয়াড়কে বিক্রি করাই আজকের খেলার উদ্দেশ্য। তাঁদের ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব বিজ্ঞাপন দেখানোই উদ্দেশ্য। তাই আইপিএলে আছে ‘টাইম আউট’, ফুটবল বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক।’ কুড়ি-বাইশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সন্ধে-রাতের খেলায় মিনিট কুড়ি অন্তরই নাকি খেলোয়াড়দের বিরতির দরকার হচ্ছে।

ব্যাপারটা সব খেলাতেই হচ্ছে, দুদ্দাড় করে সব রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। কাল যে রেকর্ডকে মনে হত ধরাছোঁয়ার বাইরে, আজ সে রেকর্ড ধুলোয় লুটোচ্ছে। শচীনের একদিনের ক্রিকেটে শতরানের রেকর্ড বিরাট ভেঙে দিয়েছেন। সে-রেকর্ড হয়তো আর ভাঙবে না, কারণ খেলাটাই থাকবে না। কিন্তু কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা চলছেই। আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশী এক মরশুমেই সবথেকে বেশি ছয়, অভিষেক হওয়া খেলোয়াড় হিসেবে সবথেকে বেশি রান, সবচেয়ে কম বয়সে ৭০০-র বেশি রান আর এক মরশুমে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার জেতার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। আর্লিং হাল্যান্ড যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে অনেকে মনে করছেন মেসির গোল করার যাবতীয় রেকর্ডও তিনি ভেঙে দিতে পারেন। খেলা যেহেতু আর প্রাথমিকভাবে আনন্দ পাওয়ার, সৌন্দর্যের রসাস্বাদন করার জিনিস নেই, তাই খেলোয়াড়দের মহত্ত্বের মাপকাঠি হয়ে গেছে পরিসংখ্যান। যাঁর পরিসংখ্যান দুর্দান্ত নয় বা পাওয়া যায় না, তাঁরা সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় ঢুকতে পারেন না। তাই ক্রিকেটে গোটের আলোচনায় কখনও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বা অ্যালান নট আসেন না। ফুটবলের গোটের আলোচনায় লেভ ইয়াশিন বা গর্ডন ব্যাংকস, ববি মুর, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বা ফ্র্যাংকো বারেসির নাম আসে না।

আরও পড়ুন বেদি আর ববিকে ভোলা বিবেকের কাছে অপরাধ

সুতরাং, যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না। আসলে বিপণনের লোকেদের এক্সেল শিটই দরকার। সব খেলাই এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, তাই সব খেলাতেই ব্র্যান্ড নির্মাণ আর এক্সেল শিট তৈরি চলছে সচেতনভাবে। খেলার সৌন্দর্যকে (এবং মহান অনিশ্চয়তাকে) মারো গুলি। টেনিস নিয়ে এই কথা ক’দিন আগে বলেছেন স্বয়ং রজার ফেডেরার। এক পডকাস্টে তিনি বলেছেন, সমস্ত প্রতিযোগিতায় কোর্ট অল্পবিস্তর একইরকম করে দেওয়া হচ্ছে, বলও। যাতে শেষমেশ ফাইনালে পৌঁছন কার্লোস আলকারাজ আর ইয়ানিক সিনার। ঘাসের কোর্ট, হার্ড কোর্ট, ক্লে কোর্টে টেনিস খেলার আলাদা চ্যালেঞ্জ ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বদলানো দরকার।

তাই বলতে হবে, সোবার্স এবারে সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। আগামী ২৮ তারিখ নব্বইয়ে পা দেওয়ার কথা ছিল, নির্ঘাত অনেকেই সেদিন তাঁর শতায়ু কামনা করতেন। কিন্তু শততম জন্মদিনে কি আর কেউ স্মৃতিচারণ করত, বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১-’৭২ মরশুমে ডেনিস লিলিকে তছনছ করে দেওয়া ২৫৪ রানের কথা? ও জিনিসের মূল্য দিতে গেলে তো বুঝতে হবে, লিলি কেমন ছিলেন? আজকের প্রজন্ম তো পরিসংখ্যান দেখে বলবে— টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় লিলি অনেক নীচে। তাঁকে পেটানো আর এমন কী ব্যাপার? লিলির গতি বা সোবার্সের স্ট্রোকের শৌর্য ও সৌন্দর্য আলোচ্যই নয়।

তুমি আর নেই সে সানি

যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি।

বিশ্ব একাদশের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে [হিলটন] অ্যাকারম্যান, এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে মজার মজার ঘটনা কল্পনা করত। যেমন ইন্তিখাব [আলম] আর ফারুক [ইঞ্জিনিয়ার] বেয়নেট হাতে মুখোমুখি; আমি যুদ্ধবিমান নিয়ে উড়ছি, আমাকে আরেকটা যুদ্ধবিমানে তাড়া করছে আসিফ মাসুদ; বিষেণ [সিং বেদি] আর জাহির [আব্বাস] পালানোর চেষ্টা করছে। আমরা খুব হাসতাম। অস্ট্রেলিয় খেলোয়াড়রা এমনিতে এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে মজা না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকত। কিন্তু রিচার্ড হাটন ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার বলেছিল যে ফারুক যদি ইন্তিখাবের পেটে আগে বেয়নেট ঢুকিয়েও দেয়, ইন্তিখাব [আলম] বেঁচে যাবে। কারণ ওর পেটে এত চর্বি যে তাতেই আঘাতটা সামলে দেবে।

বলতেই হবে যে, সেই সময়ে যা চলছিল তাতেও ভারতীয় আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। প্রায় প্রত্যেক সন্ধেবেলা আমরা একজন পাকিস্তানি মালিকের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। উনি বিভিন্ন রেডিও বুলেটিন থেকে খবর শুনতেন আর একটা পেপার ন্যাপকিনে উর্দুতে লিখে ইন্তিখাবকে দিতেন। ও সেটা ভালো করে দেখতও না, মুচড়ে ফেলে দিত।

উপরের অংশটা সুনীল গাভস্করের স্মৃতিকথা সানি ডেজ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬) বইয়ে রয়েছে (ভাষান্তর আমার)। এই ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের, যখন তিনি গারফিল্ড সোবার্সের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। তখন ভারত-পাক যুদ্ধ চলছে। ভেবে দেখুন, সেই যুদ্ধ চলাকালীন দেশপ্রেমিক গাভস্কর পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে একই দলে খেলছিলেন! শুধু তাই নয়, যে যুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকরা জীবনমরণ লড়াই করছিলেন, সেই যুদ্ধ নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটারদের রসিকতায় হাসাহাসিও করছিলেন! সেখানেই শেষ হলে কথা ছিল, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সন্ধেবেলা একজন পাকিস্তানির রেস্তোরাঁয় খেতেও যাচ্ছিলেন! কোনও সন্দেহ নেই— আজ এমন করলে তিনি যে কেবল সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনীর শিকার হতেন তা-ই নয়, তাঁর নামে দেশদ্রোহের মামলাও হয়ে যেত দেশের কোনও না কোনও আদালতে। দেশে ফিরতেই হয়তো বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যেতেন।

একেবারেই অন্যায় হত, কারণ যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি। ভারত আজ উন্মাদের যুক্তিতে চলে, ১৯৭১ সালে চলত না। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মদত দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জব্বর লড়াই করে তাদের হারিয়ে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুরও পরোয়া করেনি। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতির সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, ভারতের সৈনিকরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর থামিয়ে দিয়েছেন। এদিকে বৃদ্ধ সুনীল গাভস্কর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের হায়দ্রাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিককে আক্রমণ করছেন, কারণ তিনি পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবরার আহমেদকে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতার নিলাম থেকে নিজের মালিকানাধীন দলের জন্য কিনেছেন।

অর্থাৎ আজকের গাভস্কর ১৯৭১ সালের গাভস্করকে ট্রোল করছেন। নিজের মন্তব্যের যুক্তি হিসাবে গাভস্কর যা বলেছেন, তার সঙ্গে ট্রোলদের কথাবার্তার কোনও তফাত নেই। পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নাকি দলে নেওয়া উচিত নয়, কারণ তিনি যে টাকা আয় করবেন সে টাকা পাকিস্তানে যাবে। পাকিস্তানের টাকা ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দিতে খরচ হয়। সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে ভারতের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে একটা সামান্য লিগ জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতএব সানরাইজার্স লিডস দলের মালিক কাব্যা মারানের উচিত ছিল আবরারকে নিলাম থেকে না কেনা।

সন্ত্রাসবাদের এই অদ্ভুত ফ্লো চার্ট হাজির করেছেন গাভস্কর। সাংবাদিক মহলে প্রায় সবাই জানেন যে গাভস্কর চিরকাল বইপ্রেমী। কিন্তু এসব কথা শুনলে সন্দেহ হয়, ইদানীং বই পড়া ছেড়ে বোধহয় ধুরন্ধর জাতীয় বলিউডি সিনেমায় মন দিয়েছেন। যে কোনও পাকিস্তানি নাগরিক পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে যা রোজগার করেন, সবই পাকিস্তান থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ চালাতে ব্যবহৃত হয়— এই ঘৃণায় বাঁধানো অতি সরল আজগুবি তত্ত্ব আর কোথা থেকে শেখা সম্ভব? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী, তাহলে আবার গাভস্কর নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন। এবং সেটা শুধু ১৯৭১ সালের কার্যকলাপের জন্য নয়।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

মাত্র কয়েকদিন আগে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেটার পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন কারাবন্দি ইমরান খানের স্বাস্থ্যের যথাযথ যত্ন এবং তাঁর প্রতি যথাযথ ব্যবহার দাবি করে।[1] সেই ১৪ জনের মধ্যে ছিলেন আমাদের কপিলদেব এবং গাভস্কর। সব পাকিস্তানিই যদি সন্ত্রাসবাদী হয়, তাহলে গাভস্কর একজন সন্ত্রাসবাদীর প্রতি দরদে পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন বলতে হয়। ইমরানের বিরুদ্ধে গাভস্কর যখন খেলেছেন তখনও তো পাকিস্তানের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলেছে। এমনকি ইমরান যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখনও যে ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছিল তা নয়। তাহলে গাভস্কর সেসব ভুলে ইমরানের জন্যে মুখ খুলতে গেলেন কেন?

এর একটাই উত্তর হয়। গাভস্কর ভালো করেই জানেন যে পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী নয়। ফলে পৃথিবীর যেখানে যে পাকিস্তানি টাকা রোজগার করবে, সেই টাকাই পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে— এ-কথার কোনও ভিত্তি নেই। গাভস্কর অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতেই পারেন যে তিনি বলেছেন “indirectly contributes”, অর্থাৎ “পরোক্ষভাবে” ওই টাকার অবদান থাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে। কিন্তু এই কথাটা দলে পাকিস্তানি ক্রিকেটার না নেওয়ার যুক্তিকে আরও দুর্বল করে। যদি একজন করদাতা না-ই জানতে পারেন তাঁর করের টাকা পরোক্ষভাবে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে অপব্যবহারের জন্যে তো তাঁকে দোষী ঠাওরানো যায় না। তাঁর রোজগারের পথ বন্ধ করাও চলে না।

এর চেয়েও বড় কথা, কোনও কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে তাকে সে দেশের নিয়মকানুন মেনেই চলতে হয়। সান গ্রুপ ব্যবসা করছে ইংল্যান্ডে, আর চলবে ভারতীয়দের আবেগ অনুভূতি অনুযায়ী— এমন মামাবাড়ির আবদার কেমন করে করা যায়? তাছাড়া ভারতীয়দের টাকা পরোক্ষভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে গাভস্করের এতই যদি মাথাব্যথা, তিনি সদ্যসমাপ্ত কুড়ি-বিশের বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হওয়ার বিরোধিতা করলেন না কেন? আবরার দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতায় সানরাইজার্স লিডসের হয়ে খেলে পারিশ্রমিক পাবেন ১,৯০,০০০ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় আট কোটি পাকিস্তানি টাকা। তার কয়েকশো গুণ টাকা ভারত-পাক ম্যাচ থেকে কামিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। গাভস্কর একবারও বলেননি এটা হওয়া উচিত নয়। উলটে সে ম্যাচের ধারাভাষ্যে নিজে যুক্ত ছিলেন, মানে নিজেও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। তাঁর সঙ্গে ধারাভাষ্যে ছিলেন ওয়াসিম আক্রম, রামিজ রাজার মতো পাকিস্তানি প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও। তাঁরাও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। গাভস্করের যুক্তি মানলে সে টাকাও পরোক্ষভাবে বেশ কিছু ভারতীয়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সেসব আটকানোর কথা তিনি একবারও মুখ ফুটে বলেননি কেন?

তাহলে কি বুঝতে হবে, ১৯৯২ সালে মুম্বইয়ের দাঙ্গায় হিন্দু দাঙ্গাবাজদের সামনে এক মুসলমান পরিবারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া গাভস্কর আজ হিন্দুত্ববাদী দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল মাত্র? তাই যে ম্যাচ থেকে আরএসএস শাখা হয়ে দাঁড়ানো বিসিসিআইয়ের বিপুল আয় হয়, সেই ম্যাচে পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, অথচ ইংল্যান্ডের লিগে ভারতীয় মালিকের দলে পাকিস্তানের ক্রিকেটার খেললে তিনি খড়্গহস্ত?

জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ভারতীয়দের অনেক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন উপহার দিয়েছিলেন যে গাভস্কর, তিনি অস্ত গিয়েছেন। এখন ধান্দাবাজ ধর্মান্ধতায় ঢাকা তাঁর মুখ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

প্রিয় স্মৃতির ফাইনাল

ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার।

যে কোনো নিরপেক্ষ বিচারে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ফাইনাল হিসাবে প্রথমেই উঠে আসে ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা। সর্বকালের সেরা একদিনের ম্যাচের তালিকাতেও ওই ম্যাচের স্থান হবে উপর দিকে। কিন্তু তাতে কী? প্রিয় ব্যাপারটা একান্ত ব্যক্তিগত। যে খেলছে না তার কাছে খেলা যেহেতু এক প্রদর্শনী, সেহেতু কোন খেলার কোন মুহূর্ত যে তার কাছে গোটা খেলাটাকে অবিস্মরণীয় করে তুলবে তা বলা মুশকিল। তার উপর আছে স্মৃতির ভূমিকা। যে খেলা দেখতে দেখতে মনে হয় জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না, সামান্য সময় পেরোলেই তা ফিকে হয়ে যায়। আবার যে খেলা দেখার সময়ে অসাধারণ মনে হয়নি, তা বহুকাল পরেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিনেমার মত। কেন এমন হয় জানি না। কখনো খেলার বাইরের কোনো ঘটনা প্রভাবিত করে স্মৃতিকে, কখনো বা খেলা দেখার সঙ্গীদের স্মৃতিও এমন কাণ্ড ঘটায়। এমনটা না ঘটলে কোনো প্রিয় খেলা থাকত না একা একা জাবর কাটার জন্যে। কোনো আড্ডায় বা লেখায় সেই খেলার গল্প করে আরও অনেকের যে ওই খেলাটা প্রিয়, তা আবিষ্কার করার আনন্দও মাটি হয়ে যেত।

আমার অনেক বেশি প্রিয় ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনাল।

তখনো ভূগোল বলতে বুঝি জল থেকে কীভাবে মেঘ তৈরি হয় আর মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি হয় – এইসব। গ্লোব জিনিসটা দেখেছি কেবল বড়লোক আত্মীয়ের বাড়িতে। ফলে বাবা রাতভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে টিভিতে খেলা দেখছেন – এ জিনিস দেখে বিস্মিত হওয়ার বয়স চলে যায়নি। আমার বয়সী অনেকেরই ওই বিশ্বকাপ নিয়ে মুগ্ধতা আজও কাটেনি, কাটবেও না। কারণ ক্রিকেট খেলায় অত রং আগে কখনো দেখিনি। ১৯৮৭ বিশ্বকাপের সময়ে আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না, ’৯২ বিশ্বকাপের সময়ে হয়েছে সাদাকালো পোর্টেবল টিভি। বাড়ির উল্টোদিকের লাইব্রেরিতে স্পোর্টস্টারের পাতায় জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো অধিনায়কদের গ্রুপ ফটোতে দেখা জার্সির রংগুলো মনে রেখে দিয়েছিলাম। খেলা দেখার সময়ে সেই রং লাগিয়ে নিতাম খেলোয়াড়দের পোশাকে, মাঠে, আকাশে। কথা ছিল, মহম্মদ আজহারউদ্দিনের দল ফাইনালে উঠলে পাড়ায় যে দু-একজনের বাড়িতে রঙিন টিভি আছে সেখানে গিয়ে খেলা দেখব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে যায় ফাইনালের অনেক আগেই।

বাবার দ্বিতীয় পছন্দের দল ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারাও সেবার সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। তবে মেরুন জার্সির ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিন্তু দাপটে হারিয়েছিল কচি কলাপাতা জার্সির পাকিস্তানকে – একেবারে ১০ উইকেটে। দিনটা ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, জায়গাটা মেলবোর্ন। পরবর্তী এক মাসে ইমরান খান আর তাঁর দলবল যে রূপকথা রচনা করেন তা গল্পের বইয়ের বাইরে একমাত্র পাকিস্তানের ক্রিকেট দলই পারে। আজকের পাকিস্তানিরা তাকে বলেন ‘কুদরত কা নিজাম’, অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়ম। ২৭ ফেব্রুয়ারি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে হোবার্টে দুর্বল জিম্বাবোয়েকে দাপটে হারানোর পর ১ মার্চ অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ৭৪ রানে অল আউট হয়ে যান ইমরান, মিয়াঁদাদরা। সেদিন পাকিস্তানকে আক্ষরিক অর্থেই কুদরত বাঁচিয়ে দেয়। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১৬ ওভারে ৬৩ রান করতে হত জেতার জন্যে। কিন্তু এত বৃষ্টি নামে যে খেলা ভেস্তে যায়, পাকিস্তান পেয়ে যায় একটা মহামূল্যবান পয়েন্ট। তারপর সিডনিতে ভারতের কাছে হার, ব্রিসবেনে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। পার্থে অস্ট্রেলিয়াকে হারাবার পরেও পাকিস্তানের সেমিফাইনালে যাওয়া অনিশ্চিত ছিল। পয়েন্ট টেবিলে এতটাই পিছিয়ে পড়েছিল যে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পরেও রাউন্ড রবিন লিগের শেষ খেলায় নিউজিল্যান্ডকে না হারালে বিদায় নিতে হত।

বিশ্বকাপে তখন পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডই সবচেয়ে নিখুঁত দল। সব ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। শুধু তাই নয়, অধিনায়ক মার্টিন ক্রো ব্যাট করছেন রাজার মত। তাঁর দুটো অভিনব চালে কিস্তিমাত হচ্ছে প্রতিপক্ষ। এক, বোলিং শুরু করাচ্ছেন স্পিনার দীপক প্যাটেলকে দিয়ে। তাঁর বলে বিশেষ রান করা যাচ্ছে না। দুই, ব্যাটিং শুরু করাচ্ছেন প্রথম দুই ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকা মার্ক গ্রেটব্যাচকে দিয়ে। গ্রেটব্যাচ শুরু থেকেই ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে মারছেন। ১৯৯২ সালে ওই আক্রমণ অভূতপূর্ব। তার উপর পাকিস্তান দলে ইমরান আর মিয়াঁদাদের মধ্যে গণ্ডগোল। ইমরান নিজে পুরো সুস্থ নন। বোলার ইমরানের থেকে যতটা পাওয়া সম্ভব, তা পাচ্ছে না পাকিস্তান।

ক্রাইস্টচার্চের সেই ম্যাচে তারা অসাধ্য সাধন করল। লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদকে দিয়ে গ্রেটব্যাচকে শান্ত রাখলেন ইমরান। ফর্মে থাকা ক্রো ২০ বল খেলে তিন রানের বেশি করতে পারলেন না, আক্রম তাঁকে সুদ্ধ চারজনকে আউট করলেন। রামিজ রাজার শতরানে সহজেই জিতে গেল পাকিস্তান। অকল্যান্ডের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফের রোমাঞ্চকর জয়। ২৫ মার্চের ফাইনাল খেলতে সেই মেলবোর্নে ফেরত এল পাকিস্তান। সামনে আবার ইংল্যান্ড। জীবন সকলকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না, পাকিস্তানকে একসঙ্গে দুটো দিল।

ফাইনালেও ইংল্যান্ডেরই পাল্লা ভারি ছিল নিঃসন্দেহে। কারণ সেরা দল নিউজিল্যান্ড ছাড়া আর কেউ তাদের বেগ দিতে পারেনি। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে হার নেহাতই অঘটন। ব্যাটে বলে বিশ্বকাপ মাতাচ্ছিলেন বুড়ো ইয়ান বোথাম। গ্রেম হিক, অ্যালেক স্টুয়ার্ট, নিল ফেয়ারব্রাদাররা নিয়মিত রান করছিলেন। অলরাউন্ডার ক্রিস লুইস আর মিডিয়াম পেসার ডেরেক প্রিঙ্গলও ফর্মে।

কিন্তু ফাইনাল খেলল অন্য পাকিস্তান। একে অপরকে কোনোদিন পছন্দ না করা ইমরান আর মিয়াঁদাদ তৃতীয় উইকেটে ১৩৯ রান যোগ করলেন। তাও মিয়াঁদাদ সেদিন পুরো ফিট ছিলেন না, শেষদিকে রানার নিতে হয়েছিল। স্লগ ওভারে দারুণ মেরে দলের রান আড়াইশোর কাছে নিয়ে গেলেন ইনজামাম উল হক (৩৫ বলে ৪২) আর দুর্দম আক্রম (১৮ বলে ৩৩)। প্রিঙ্গল তিনটে উইকেট নিলেও বোথাম আর লুইস মার খেয়ে গেলেন।

আমার জ্যাঠতুতো, পিসতুতো দিদিদের মধ্যে তখন সুদর্শন ইমরানের প্রবল জনপ্রিয়তা, তবে দ্রুত তাঁর বাজার দখল করছেন আক্রম। আমাদের বাঙাল পাড়ায় সেই ২৫ মার্চ অনেকেই হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান সমর্থক; আমার বাবাও। সুতরাং আমিও। ইংল্যান্ডের প্রথম চারজন যখন ৬৯ রানের মধ্যে ফিরে গেলেন, তখন আমরা উল্লসিত। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠলেন ফেয়ারব্রাদার আর অ্যালান ল্যাম্ব। বাবা একের পর এক বিড়ি শেষ করছেন, রান হয়ে যাচ্ছে, উইকেট পড়ছে না। শেষমেশ ইমরান ফেরত আনলেন আক্রমকে। তিনি রাউন্ড দ্য উইকেট দৌড়ে এসে পরপর দুবার ম্যাজিক করলেন। অ্যালান ল্যাম্ব আর ক্রিস লুইসের হতভম্ব স্টাম্পগুলো আমাদের উদ্বেগের অবসান ঘটাল।

ইংল্যান্ড আর বেগ দিতে পারেনি। ইমরান যখন ক্রিস্টালের ট্রফিটা হাতে নিয়ে দলের কথা ভুলে কেবল মা শওকত খানুমের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল করার সংকল্প বর্ণনা করে চলেছেন, তখন আমি আর বাবা গিয়ে বসলাম পল্লী মঙ্গল সমিতির মাঠে। সেখানে আক্রমের স্তুতি চলছে, কোনো কাকু আবার বলছেন তাঁর মতে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ইনজামাম। একজন বললেন “বেল পাকলে কাকের কী?” অন্য এক কাকু রুখে উঠলেন “কেন? কাগজে তো দেখলাম গাভাসকার বলেছে ’৮৩ সালে যখন আমরা কাপ জিতলাম, ওরা খুব আনন্দ করেছিল। আমরা আনন্দ করব না? হাজার হোক এশিয়ার টিম।” এক জেঠুর মন্তব্য “হারাইছে তো ইংল্যান্ড রে। অগো ক্যান সাপোর্ট করুম? করতে অইলে পাকিস্তানরেই করা ভাল।”

আজকাল এই স্মৃতিকেও ছাপিয়ে যায় ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনাল।

ততদিনে ক্রিকেটের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্রেফ দর্শক আর প্রদর্শনীর নয়। তিনটে খবরের কাগজের খেলার পাতায় কাজ করা হয়ে গেছে, চতুর্থ চাকরিতে সাংবাদিক হিসাবে বিশ্বকাপ কভারেজের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাড়িতে রঙিন টিভি এসে গেছে, কিন্তু বাবার সঙ্গে বসে খেলা দেখা আর হয় না। যত বড় খেলা হয়, আমার তত বেশি কাজ থাকে। অফিসের হাই ডেফিনিশন টিভিতেই দেখি বেশিরভাগ খেলা।

সহকর্মীরা অনেকেই একমত হচ্ছিলেন না, কিন্তু আমি শুরু থেকে বলছিলাম, এবার ভারত চ্যাম্পিয়ন না হলে অবাক হব। কারণ আমাদের শচীন শুরু থেকেই ফর্মে। একা শচীনে রক্ষে নেই, বীরেন্দ্র সেওয়াগ দোসর। হেলায় ম্যাচ শুরু করছেন চার মেরে। জাহির খান বল হাতে নিলে উইকেট পড়া যেন সময়ের অপেক্ষা। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি রান পাচ্ছেন না, কিন্তু ইংল্যান্ডের সঙ্গে টাই হয়ে যাওয়া ম্যাচেও স্নায়ুর চাপে অধিনায়কত্বে ভুলচুক করেননি। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ গৌতম গম্ভীর ধারাবাহিক। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ যুবরাজ সিং। হয় ব্যাটে নয় বলে তিনি ভরসার জায়গা হয়ে উঠছিলেন। আর কী লাগে বিশ্বকাপ জিততে? ’৯২ বিশ্বকাপে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করতাম বাবাকে, সেবার বাবার প্রশ্ন করার পালা। খেলার পাতায় কাজ করি, অতএব বাবার ধারণা আমি একটু বেশি জানি। আমি আমার এইসব যুক্তি বলি, বাবা নীরবে শোনেন। একমত হলেন কিনা জিজ্ঞেস করার সময়ও আমার থাকে না।

এমন চলতে চলতেই ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল। আমাকে যেতে হল আমেদাবাদে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, মানে ক্রিকেটের ব্রাজিল। যাদের বিশ্বকাপের যে কোনো স্তরে হারানো প্রায় বিশ্বকাপ জেতার মতই কঠিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় বোলিংকে ছিঁড়ে খাওয়া রিকি পন্টিং আবার শতরান করলেন। যুবরাজ মোক্ষম সময়ে ব্র্যাড হ্যাডিন আর মাইকেল ক্লার্কের উইকেট না নিলে লক্ষ্য আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারত। সেমিফাইনালে উঠতে দরকার ২৬১, সেওয়াগ বেশিক্ষণ টিকলেন না। শচীন সাবলীল ব্যাট করছেন দেখে শততম শতরানের আলাদা কপি লিখতে শুরু করেছি, এমন সময় শন টেটের বলে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে তিনি আউট। গম্ভীরের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না বিরাট কোহলি। গম্ভীরও কাজ শেষ করে যেতে পারলেন না, ধোনি ফের ব্যর্থ। সিঁদুরে মেঘ দেখছি প্রেস বক্সে বসে, যুবরাজ খেলতে শুরু করলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। সুরেশ রায়নাকে সঙ্গে নিয়ে শেষপর্যন্ত আড়াই ওভার আগেই খেলা শেষ করে দিলেন। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনের ঘরে এসে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সম্মান জানালেন ভারতীয়, অভারতীয় সমস্ত সাংবাদিক। ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর জানা যাবে, তিনি গোটা বিশ্বকাপ খেলেছেন শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা – এসব নিয়েই।

আরও পড়ুন দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ? 

বিশ্বকাপ যত এগোয়, জেতা তত কঠিন হয়। কিন্তু সেমিফাইনালে পাকিস্তান খুব দৃঢ় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারল না। ব্যাটে আর কেউ বেশি রান করতে না পারলেও শচীন আবার খেলে দিলেন, যুবরাজ ব্যাটে ব্যর্থ হলেও দুটো জরুরি উইকেট নিলেন। তবে আজ যে তরুণদের স্মৃতিতে ২০১১ নেই, তারা এখনকার শ্রীলঙ্কাকে দেখে কল্পনা করতে পারবে না সেই ফাইনাল কত কঠিন ছিল। শ্রীলঙ্কা গোটা বিশ্বকাপে হেরেছিল শুধু পাকিস্তানের কাছে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে সহজে হারিয়েছিল। ফাইনালের দিন জাহির যথারীতি নতুন বলে উইকেট নিলেন, কিন্তু মুনাফ প্যাটেল ছাড়া সবাইকে মেরে দিলেন শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের অন্যতম মাহেলা জয়বর্ধনে এবং অন্যরা। তবু তো কুমার সাঙ্গাকারাকে ৪৮ রানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যুবরাজ।

বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌনে তিনশো রান তাড়া করার চাপ অতুলনীয়, আর সেদিনই কিনা প্রথম ওভারে শূন্য রানে আউট হয়ে গেলেন সেওয়াগ। একটু পরেই শচীন। কোহলি তখনো চেজমাস্টার হয়ে ওঠেননি, গম্ভীরের সঙ্গে তাঁর জুটি সেদিন জমল না। এরপর নিজের অধিনায়কত্ব, নিজের কেরিয়ারের তোয়াক্কা না করে ব্যাট করতে নামলেন ধোনি। কোনো ক্রিকেটপ্রেমীকে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই পরের কয়েকটা ঘন্টা।

খবরের কাগজ তৈরি করে ছাপাখানায় পাঠানো যাদের চাকরি, তারা বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। অমন দিনে দেরি হয় আরও বেশি। আমি বাড়ি ফিরলে সাধারণত ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলে দিতেন বাবা। সে রাতেও তিনিই খুলে দেন, তবে একেবারে সজাগ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন “দারুণ দেখলাম, বুঝলি? একেবারে সাধ মিটিয়ে।” তখনো জানি না, বাবাও জানেন না, তাঁর ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। তিনি দেখে ফেলেছেন শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল।

আরও অনেক ফাইনাল হবে, কোনোটা স্মৃতিতে এভাবে অক্ষয় হবে কিনা জানি না। স্মৃতিতেই তো সঞ্চিত থাকে আমাদের সত্তা, ভবিষ্যৎ।

সংবাদ প্রতিদিন কাগজের রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত