আমার মায়ের দিদিমা রামদাসী চক্রবর্তী অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার আঠারোখাদা গ্রামের এক সম্পন্ন পরিবারের ধর্মপ্রাণ গৃহবধূ ছিলেন। রোজ গৃহদেবতার পুজো করতেন নিজের হাতে এবং সে দেবতার মূর্তি পরিবারের সচ্ছলতার সঙ্গে মানানসই আকারে বড় ছিল। রামদাসীর মেজ ছেলে জগন্নাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এক মুসলমান, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে স্থানীয় কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী। একদিন তাঁকে এবং অন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গ্রেফতার করতে গোটা গ্রাম চষে ফেলছে পুলিস। জগন্নাথ বন্ধুকে লুকিয়ে রাখার জায়গা ভেবে না পেয়ে নিয়ে এলেন মায়ের কাছে। যথাসময়ে পুলিস চক্রবর্তী বাড়িতেও হানা দিল, কারণ সে বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সভা-টভা হত। বাড়ির ছেলেমেয়েদেরও কংগ্রেসের সঙ্গে কিঞ্চিৎ যোগাযোগ আছে বলে খবর। কিন্তু গোটা বাড়ি তল্লাশ করেও পুলিস সেদিন যাকে খুঁজছিল, তাকে পেল না। কেন? কারণ রামদাসী তাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঠাকুরঘরে, গৃহদেবতার পিছনে। এই পর্যন্ত ইতিহাস। আমাদের পারিবারিক কিংবদন্তি বলে, বাঙালি দারোগার নাকি সন্দেহ হয়েছিল। সে রামদাসীকে হালকা চালে জিজ্ঞাসাও করে, ঠাকুরঘরটা দেখলাম না যে মাসিমা? রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।
বলা বাহুল্য, রামদাসী ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটা জানতেন না। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন হিন্দু বিধবার যা যা শাস্ত্র নির্ধারিত কর্তব্য তা থেকে এক চুল বিচ্যুত হননি। অথচ যাঁরা তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছেন তাঁদের মুখে শুনেছি, ওই ঘটনা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র পাপবোধ ছিল না। আবার ফলাও করে বলেও বেড়াতেন না। স্পষ্টতই তিনি মনে করতেন তাঁর ভগবানের ঘর একজন বিধর্মীর স্পর্শে অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই একজন মুসলমানকে ঠাকুরঘরে বসালে পাপ হয় না।
আনন্দ পট্টবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ তথ্যচিত্রে বিতর্কিত রাম জন্মভূমির আদালত নিযুক্ত পূজারী লালদাসকে দেখানো হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন হিন্দুধর্ম অনুযায়ী ভগবান যে বাড়িতে থাকেন সেটাই মন্দির। আলাদা করে ভগবানকে কোথাও নিয়ে গিয়ে মন্দির বানানোর প্রয়োজন পড়ে না, ভগবান যেখানে আছেন সেই ঘর ভেঙে দেওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না।
বোঝা যায়, আমার প্রমাতামহী রামদাসী কোনো ব্যতিক্রম নন। ভারতবর্ষ মুসলমানদের দেশ এবং রামদাসী, লালদাসের মত কোটি কোটি হিন্দুর দেশ। এঁরা নাস্তিক নন, সঙ্ঘ পরিবার যাকে ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী পাশ্চাত্য থেকে শেখা ধর্মনিরপেক্ষতা বলে, এঁরা তার আওতাতেও পড়েন না। এঁদের ধর্মবিশ্বাস এমন আত্মবিশ্বাসী যে অন্যকে আক্রমণ করে সে বিশ্বাস জাহির করতে হয় না। অন্যের ধর্মস্থান দখল করে নিজের দেবতার বিগ্রহও স্থাপন করতে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, ভগবানকে এঁরা এত ছোট মনে করেন না, যে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট মন্দিরে জায়গা না দিলে তিনি গৃহহীন হয়ে থাকবেন।
আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি
রাম এঁদের সকলের আরাধ্য নন। সেই কারণেই সকলকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা বা ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতেই হবে এমন দাবি অসঙ্গত, অন্যায়। অযোধ্যায় ঝাঁ চকচকে রামমন্দির নির্মাণ, দিশি পিস্তলের গুলিতে হত লালদাসের ভাষায় বললে “রাজনৈতিক মুদ্দা” (রাজনৈতিক বিষয়)। আমরা চাইলেই অন্যের ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ধর্মস্থান গড়ে তুলতে পারি – এই অহঙ্কার প্রকাশ করা ছাড়া এর অন্য কোনো সার্থকতা নেই। অবশ্য এই অহঙ্কার সার্বিক প্রচারে মোহিত হয়ে যাওয়া সাধারণ হিন্দুদের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, চিকিৎসার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা ভুলে থাকতে আফিম হিসাবে কাজ করবে। আফিম খেয়ে সাধারণ হিন্দু ঝিমোবেন আর সেই সুযোগে তাঁদের ভোটগুলো পাওয়া যাবে – এই হল মহত্তর উদ্দেশ্য। মুসলমানদের তো আগেই অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির অবাঞ্ছিত নাগরিক করে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি রাখা হয়নি। তা দেখিয়ে উল্লাসে উন্মাদ করে দেওয়া হয়েছে সাধারণ হিন্দুদের। তাঁরা খেয়ালও করছেন না, প্রাচীন শহর অযোধ্যার ছোটখাটো হিন্দু ব্যবসায়ীর দোকানপাটও উড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য।
কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের বংশানুক্রমিক মহন্ত রাজেন্দ্রপ্রসাদ তিওয়ারি তাই বলেছেন, “অযোধ্যায় ওটা মন্দির নয়, মল। ওই ধরনের প্রথম মল ছিল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। তৃতীয়টা হবে মথুরায়।”
প্রতর্ক ব্লগে প্রকাশিত
