তসলিমার জয়ধ্বনি: রাজনীতি ভুলে সংস্কৃতি চর্চা স্থগিত রাখলে হয় না?

ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে।

কারও কাছে কিছু দাবি করা চলবে না। নেতাদের কাছ থেকে তাদের কাজের কৈফিয়ত দাবি করা চলবে না। ফুটবলারদের কাছ থেকে অন্য ফুটবলারদের অপমানে প্রতিবাদ দাবি করা চলবে না। দেশের যুবসমাজের উন্মাদনা এবং পকেটের পয়সায় যারা কোটিপতি, সেই খেলোয়াড় বা অভিনেতাদের কাছ থেকে ওই যুবসমাজের উপর দমনপীড়ন নেমে এলে তার বিরোধিতা দাবি করা চলবে না। সংবাদমাধ্যমের কাছে সত্যনিষ্ঠা দাবি করা চলবে না। এমনকী সাহিত্যিকরা বিবেকবান হবেন, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের ও সংখ্যাগুরুবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে দেশছাড়া, তিনি অন্য দেশের মৌলবাদ ও সংখ্যাগুরুবাদের সঙ্গে আপস করবেন না— এ দাবিও করা চলবে না। এমনটাই আমাদের সময়ের দাবি।

কারণ? সকলেরই নাকি রুটিরুজির প্রশ্ন আছে, অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যেন ইতিহাসের একমাত্র এই কালখণ্ডেই সত্যি কথা বলতে হলে, প্রতিবাদ করতে হলে মানুষকে নিজের রোজগার, নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেন অতীতে সর্বদেশে সর্বকালে প্রতিবাদ করা ভারি আরামের কাজ ছিল। দমনপীড়নে বিশ্বাসী সরকার বা মৌলবাদীরা প্রতিবাদীদের চাকরি দিত, চাকুরে হলে মাইনে বাড়িয়ে দিত, বোনাস দিত, মাঝেমধ্যে পুরস্কারও দিত। একে-৪৭ হাতে নিয়ে ভিন্ন মতের মানুষের বাড়ির বাইরে নিজেরাই পাহারা দিত, বলত “আমি আপনার বিরোধী হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করব।”

মজা হল, রুটিরুজির যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কেউ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ নন। সরকারি দমন বা সংখ্যাগুরুবাদী গুন্ডাদের হাতে মারধর, হয়রানির ভয় সকলের আছে (এই লেখকেরও আছে)। নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ১৫ বছরের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত যেভাবে সদলবলে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে ভয় পেলে কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের রবীন্দ্র পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তেতো সত্য হল— ভোগবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে আমরা এমন গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি যে ওসব ছাড়াও যে বাঁচা যায় তা আমাদের পাড়ার ছাপোষা গোঁসাই থেকে শুরু করে নামকরা কবি গোঁসাই পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সকলের বাড়িতেই আয়না আছে। যিনি যত বিখ্যাত, তাঁর আয়না তত বড়। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের এই চেহারা দেখে আমাদের সকলেরই লজ্জা করে। সেই লজ্জা ঢাকতে পাতার পোশাক হল “রুটিরুজি”। এ রাজ্যের বাংলা ভাষার লেখকরা ভালো করেই জানেন (এখন সোশাল মিডিয়ার দৌলতে অনেক পাঠকও জেনে ফেলেছেন) যে বাংলায় সাহিত্য রচনা করে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় না। লেখকদের প্রায় সকলেরই অন্য পেশা আছে, যাঁদের নেই তাঁরা অন্য পেশার খোঁজে আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পসার বিখ্যাত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রয়্যালটি দিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন শোনা যায়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র আরেকজনের সঙ্গে মিলে আস্ত প্রকাশনা সংস্থা খুলে ফেলেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শংকরও বহুবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু সেসব দিন চলে গেছে। আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের বইও পাঁচশো বা হাজার কপি বিক্রি হয় বলে তাঁদের প্রকাশকদের দাবি করতে দেখা যায় না। সেই কারণে কি পুরস্কারই কি রুটিরুজি হয়ে দাঁড়িয়েছে? যাঁদের ব্যাপারটা তাই, তাঁরা মনের সুখে তসলিমা থেকে সন্তোষী মা— যাকে খুশি বন্দনা করুন, আপত্তি নেই। যাঁদের তেমন স্বার্থ নেই, তাঁরাও নিজ নিজ প্রিয় সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যদি এমন করতে চান তো করুন। কিন্তু একে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো বলে তত্ত্বায়ন করা চলছে। তাই কিছু কথা না বলে থাকা যাচ্ছে না।

বাংলার কালচার্ড বাবু-বিবি আজও যাঁকে নিয়ে “আহা! সত্যিকারের ভদ্রলোক ছিলেন” বলে হাহুতাশ করে, সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের দলের তথা ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে, তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরা কেউ কেউ আজকাল জনান্তিকে স্বীকার করেন। পার্টি স্বীকার করে না, হয়তো কোনওদিন করবেও না। তাতে অবশ্য ইতিহাস বদলাবে না। বুদ্ধদেব সরকারের যেসব ভুলভাল সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে তার অন্যতম হল কলকাতা থেকে তসলিমা নাসরিনকে বিদায় নিতে বাধ্য করা। হাতে ২৩৫ জন বিধায়ক আর তিরিশের বেশি সাংসদ থাকা সত্ত্বেও, দিন দুয়েকের কলকাতাকেন্দ্রিক অশান্তিতে যদি কোনও সরকারের মনে হয়ে থাকে যে একজন সাহিত্যিককে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারবে না, তাহলে সেই সরকার অযোগ্য। জ্যোতি বসুর আমলে ভারতজুড়ে শিখ গণহত্যার সময়ে এ রাজ্যে কেউ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙা-পরবর্তী দাঙ্গাও পশ্চিমবঙ্গে লাগামছাড়া হতে পারেনি। সেখানে বুদ্ধবাবুরা একজন সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে কিছু সংগঠিত অশান্তিতে ঘাবড়ে গেলেন এবং তাঁকে রাজ্যছাড়া করলেন। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিবিধ সুবিধা পেয়ে গেল। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের গোটা মুসলমান সমাজ ভীষণ অসহিষ্ণু— এ-কথা প্রচার করার পরিসর তৈরি হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু তোষণ করে, মুসলমান মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়— এ-কথা বলার জন্যেও চিরকালীন দৃষ্টান্ত হাতে এসে গেল। তসলিমা যে স্বমহিমায় তার আগে বহুবছর কলকাতায় ছিলেন, সেই সত্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। আজ দেখা যাচ্ছে অনেকের সে-কথা মনেই নেই। না থাকা দোষেরও নয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা ফেলে দেওয়ার পর কাটা দুধ আগে ভালো ছিল বলে বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনবে না। যে সময়ে দিল্লি, মুম্বইতে শিবসেনার হুমকিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হতে পারত না সেইসময় এই কলকাতাতেই যে ম্যাচ হয়েছে, বা এই বামফ্রন্ট সরকারই যে কাশীতে শুটিং করতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতাকে কলকাতায় শুটিং করলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— সেই সত্য তসলিমার বিতাড়নে নতুন অর্থ পরিগ্রহ করে। হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে বলা সহজ হয়ে যায় যে ওগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কমিউনিস্টরা আসলে হিন্দুবিরোধী, তাই ওগুলো করেছিল। বাকস্বাধীনতার পক্ষে বলে করেনি।

এই পর্যন্ত মানতে অসুবিধা আজকের সাহিত্যিক, শিল্পী, বাকস্বাধীনতাপ্রেমী নাগরিকদের প্রায় কারও নেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব বুঝেও কী করে যে তসলিমার এতদিন পরে কলকাতায় আগমনকে বাকস্বাধীনতার জয় বলে অভিনন্দিত করা যাচ্ছে তা বোঝা দায়। তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কী করে থাকছে? যে-ই আনুক, যে উদ্দেশ্যেই আনুক— এটা আপাতদৃষ্টিতে ভারি উদার যুক্তি মনে হলেও, আসলে হাস্যকর। যাদের অধীনে থাকা সাহিত্য আকাদেমি এমএম কলবুর্গির মতো লেখকের হত্যার কোনও নিন্দা করেনি, যারা অপছন্দের কথা লেখার জন্যে (সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রে, স্রেফ লিখতে পারে ভেবেই) সারা দেশে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কঠোরতম আইনে মামলা ঠুকে দিনের পর দিন কারাবন্দি করে রাখে, যারা তাদের অপছন্দের কথা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে নিত্য লেখক, শিল্পীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করছে, এমনকি দলবদ্ধভাবে বাড়ি গিয়ে ভয়ও দেখাচ্ছে, তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। সেই দল তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার স্বার্থে নয়— এ-কথায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? বা উদ্দেশ্য সেটা হলেও ব্যাপারটা ভালো— এ-কথারই বা মানে কী? তাহলে আগামীকাল তালিবানরা যদি অরুন্ধতী রায়কে কাবুলে ডেকে সংবর্ধনা দেয়, আমরা তালিবানদের প্রশংসা করব? বলব, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালো?

তা-ই করব হয়তো, কারণ আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পীরা তো সেরকমই। তাঁরা একেবারে আজকের জয় গোস্বামীর মতই, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তত ২০১১ সালের পর থেকে তাই। ২০১৫ সালে যখন সারা ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনিতে হত্যা; কলবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মানুষের হত্যা এবং তা নিয়ে সাহিত্য আকাদেমির মতো সংস্থাগুলোর নীরবতার প্রতিবাদে, তখন এই বাংলা থেকে কেবল মন্দাক্রান্তা সেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ। আজ তসলিমার নামে জয়ধ্বনি করা, আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় তাঁর গুণগান করা জয় গোস্বামীই বা কোথায় ছিলেন আর বাকিরাই বা কটা মিটিং, মিছিল করেছিলেন? আচ্ছা, জাতীয় স্তরের ব্যাপারস্যাপার থাক। তসলিমাকে ফেরানোর দাবিতেই বা কটা মিটিং, মিছিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে? জয়-সহ কত গুণীজনই তো মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তখন উদ্যোগ নেননি কেন? আজ জয় বলছেন, আরও অনেকেই বলছেন, তাঁরা নাকি চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন হুমকি সংস্কৃতির কারণে। তাহলে সোজা মেনে নিলেই তো হয়— আমরা ভীতু, তাই মুখ খুলতে পারব না। আবার তত্ত্বায়নের দরকার কী? কালের নিয়মে যখন বিজেপি সরকার চলে যাবে, তখন আবার বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্যপ্রেমীরা বলবেন না তো “আমাদের দিয়ে জোর করে তসলিমা বন্দনা করানো হয়েছিল?”

তসলিমা কলকাতায় আসার পর থেকে অভ্যর্থনা আর শেষ হচ্ছে না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার নিয়ে দেশে ফেরার পরে বা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা দিয়ে ফেরার পরেও এই শহরে এরকম লাগাতার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়নি। জয়কে দুয়ো দিয়ে যারা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে তারা যদি ভেবে থাকে বিরাট কাজ করেছে, তাহলে তারা নেহাতই বোকা। পরদিন পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয় যে কাগজ, তার প্রথম পাতার তসলিমামুখী কলামটা কিন্তু জয়ই লিখেছেন। একদা যে শহরে ছিলেন সে শহরে ফিরে এসেছেন বলে নামকরা পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে কোনও কবির কবিতা— এমনটাই বা আমাদের অকাব্যিক যুগে কতবার কোন শহরে ঘটেছে? তসলিমার বেলায় কলকাতায় ঘটল। কলকাতার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম খবর হয়ে গেছেন তসলিমা। তিনি স্রেফ কলকাতায় পা রাখতেই ধন্য হল ধন্য হল আমাদের বাঙালি জীবন। সমস্তটাই বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সংবাদমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া— এই যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে মা দুর্গা সত্যি, মহিষাসুর সত্যি, ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

এবার কেউ চোখ রাঙিয়েই বলতেই পারেন “তবে রে, এসব সত্যি না হলে সত্যিটা কী?” সবিনয়ে বলব, আজ্ঞে সত্যিটা হল তসলিমা এই বাংলায় একে একটি বিক্রয়যোগ্য ব্র্যান্ড, তার উপর ডবল ইঞ্জিন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে যে ছাঁচে ঢালতে চায় তার পক্ষেও নিখুঁত। কারণ তিনি কেবল মুসলমান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চরিত্র নন। একবার টুইটারে ইংল্যান্ডের মুসলমান ক্রিকেটার মঈন আলি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তিনিও সন্ত্রাসবাদী হতে পারেন বলে রসিকতা করেছিলেন খাঁটি হিন্দুত্ববাদী কায়দায়। ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান ক্রিকেটাররা দল বেঁধে প্রতিবাদ করায় বুঝতে পারেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তখন টুইটটি মুছে দিয়ে দাবি করেন ওটা নাকি সারকাজম ছিল। বলা বাহুল্য, সে-কথা সত্যি হলে টুইট মুছে দেওয়ার দরকার ছিল না। যা-ই হোক, লম্বা দাড়ি মানেই মৌলবাদী, হিজাব বা বোরখা পরে মানেই মৌলবাদের শিকার— এগুলো আমার মতো পশ্চিমবঙ্গীয় ভদ্রলোকের খুব পছন্দের স্টিরিওটাইপ। অতএব তসলিমাকে দিয়ে সেইসব বয়ান বাঙালি সমাজে চারিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, যেগুলো বাকি ভারত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ আন্দোলন তার প্রমাণ।

সুতরাং তসলিমার আগমন, জয়ের গমন— সবই রাজনৈতিক। আমরা যে খুবই কালচারাল জাতি তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। নইলে বিপুল উৎসাহে ঠিক অন্য সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যুগেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মতো আইকনদের ক্যানসেল কালচারে ফেলে দিই? তাই করতে করতে এখন এমন হাল হয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র পড়েছেন জুতোর তলায়, আর তসলিমা চড়েছেন মাথায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক হওয়ার চেষ্টা অন্তত এবারটা না করলেই নয়?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী?

আলো আঁধারিতে ঢাকা একফালি জায়গা, তার এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট পিঁপড়ে। প্রথম চোটে তাই মনে হয় বটে, তবে কয়েক সেকেন্ড কাটতে না কাটতেই বোঝা যায় – জায়গাটা আসলে গাড়িঘোড়াহীন ফ্লাইওভার। যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা নিরুপায়, শ্রান্ত মানুষ। প্রতীক শাহের ক্যামেরায় লকডাউনে ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এভাবেই দেখিয়েছেন হোমবাউন্ড ছবির পরিচালক নীরজ ঘেওয়ান। মাল্টিপ্লেক্সের ঠান্ডা ঘরে বসে মনে হয়, যেন ধরে ফেলেছেন আমরা আসলে কীভাবে দেখি ওই মানুষগুলোকে, রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। ধরে ফেলেছেন বলেই ছবি শুরুর আগের, স্পষ্টতই সেন্সরের চাপে লিখিত, দীর্ঘ ‘ডিসক্লেমার’ দ্বিগুণ হাস্যকর মনে হয় ছবি শেষ হওয়ার পর। তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় ডিসক্লেমারের পরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দবন্ধ, যার অর্থ – সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

নীরজ, বরুণ গ্রোভার এবং শ্রীধর দুবে লিখিত এই ছবির সংলাপে করুণ মুহূর্তে নানা সূক্ষ্ম ও স্থূল রসিকতা থাকলেও, হোমবাউন্ড যে হাস্যরস উৎপাদন করে তার গায়ে ভিড়ে ঠাসাঠাসি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের মত করে লেগে থাকে চোখের জল। ইদানীং এদেশে ঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া মানুষ সর্বত্র খলনায়ক। এই ছবির দুই প্রধান চরিত্র মহম্মদ শোয়েব (ঈশান খট্টর) আর চন্দন কুমার বাল্মীকি (বিশাল জেঠওয়া) আবার সেই শ্রেণিতে পড়ে, যারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণার – অর্থাৎ সাদা কলারের কর্মী নয়, একেবারে গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য শ্রমজীবী না হলেও হয়ত বিশেষ তফাত হত না, কারণ নামেই প্রমাণ – প্রথম জন মুসলমান, দ্বিতীয় জন দলিত। হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী? যেমনটা এক সরকারি অফিসার তাকে বলেছে। এই ছবির লেখক দল – বরুণ, বশারত পীর, সুমিত রায় এবং নীরজ স্বয়ং – স্লোগানধর্মিতার দিকে না গিয়েও বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন শোয়েবরা কেন সুযোগ পেলেও দুবাই যেতে চায় না। চন্দনদের বিড়ম্বনাও দেখিয়ে দিয়েছেন। আসল পদবি লিখলে লোকে নিচু নজরে দেখে আর না লিখলে নিজের চোখে ছোট হয়ে যেতে হয়। সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মে পদবি লিখব কি লিখব না, ‘সংরক্ষিত’ লেখা বাক্সে টিক দেব কি দেব না – নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা লড়তে লড়তেই বয়স বেড়ে যায়।

ন্যাকা লাগছে ব্যাপারগুলো? লাগারই কথা। মানুষের চোখে পিঁপড়ের জীবনসংগ্রাম তো ন্যাকাই লাগে। ‘গেটেড কমিউনিটি’-র মধ্যে কাটানো নিশ্চিন্ত জীবন আর সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার সমান দারিদ্র্যে ক্রমশ বিভাজিত হতে থাকা এই দেশে হোমবাউন্ডের পাত্রপাত্রীদের জীবন মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের চোখে অলীক, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ তো সেই রাজ কাপুরের আমল নয় যে সিনেমার পর্দায় চালচুলোহীন শ্রী ৪২০-এর সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে বস্তির বাচ্চাদের লিখতে পড়তে শেখানো সুন্দরী নার্গিসের, আর তা দেখে মোহিত হবে আসমুদ্রহিমাচল হিন্দি সিনেমার দর্শক। নতুন ভারতের মহানগরে শ্রী ৪২০ হয়ে থাকাই যাবে না, আধার কার্ড দেখাতে হবে। শোয়েবের মত মুসলমান হলে সামান্য চাপরাশির চাকরি পাকা করতে কেবল নিজের আধার কার্ড নয়, বাবা-মায়ের আধার কার্ডও দেখাতে হবে। আজকের হিন্দি সিনেমায় বস্তিবাসী কি ফুটপাথবাসী তো দূরের কথা, শোয়েব আর চন্দনের মত গাঁয়ের লোকদেরও দেখা যায় না চট করে। সেই নয়ের দশক থেকে, প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আর অনাবাসী ভারতীয়রাই তো নায়ক, নায়িকা। ইদানীং আবার প্রাচীন ও অপ্রাচীন যোদ্ধা এবং ধর্মযোদ্ধারা নায়ক, নায়িকা হচ্ছেন। নীরজ উলটো পথের পথিক। এক দশক আগে নিজের প্রথম ছবি মসান-এ তিনি দেখিয়েছিলেন বারাণসীর ডোম পরিবারের ছেলের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মেয়ের প্রেমের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছিলেন – এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হয় না কেন? সেই প্রশ্নেরই যেন এবার উত্তর খুঁজেছেন দুই গ্রামের ছেলের কাহিনিতে।

দুঃখ শেষ হয় না, কারণ চন্দনের মায়ের রান্না যতই ভালো হোক, সে মিড ডে মিল রাঁধলে বাবা-মায়েরা স্কুলে পাঠাবেন না ছেলেমেয়েদের। চন্দনের দিদি স্কুলের বাচ্চাদের হেগো পোঁদ ধুইয়ে দেবে – ওই পর্যন্ত ঠিক আছে। ব্যতিক্রমী হেডমাস্টার যতই আইনের ভয় দেখান, তাতে কাজ হবে না। বাবাসাহেব আম্বেদকর দলিতদের বাড়ির বিয়েতে গৌতম বুদ্ধের পাশে যতই পূজিত হোন, সংবিধান বা আইন মানা হবে কিনা, কোথায় কতটুকু মানা হবে, তা ঠিক করবেন উচ্চবর্গীয়রাই। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ শোয়েবের মা যতই সুস্বাদু হালুয়া রাঁধুন আর শোয়েবের বিপণন ক্ষমতা যতই অসাধারণ হোক, শেষ কথা হল সে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কাকে সমর্থন করে এবং সে নিজে যা-ই মনে করুক, সবাই নিশ্চিত যে পাকিস্তান হারলে সে দুঃখ পায়। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ পথে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পুলিশ প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর মর্গে নিয়ে যেতে পত্রপাঠ সবাই হাজির। চারতলা পায়ের তলায় রাখবে তিনতলাকে, তিনতলা পায়ের তলায় রাখবে দোতলাকে, দোতলা পায়ের তলায় রাখবে একতলাকে – হাজার হাজার বছরের এই সুবিন্যস্ত শোষণব্যবস্থাকে কোনোরকম তত্ত্ব না কপচিয়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন নীরজ। দুই প্রাণের বন্ধুর একজন চাকরির পরীক্ষায় পাশ করল, অন্যজন করল না। অমনি কিন্তু সম্পর্ক চিড় খেল, একে অপরের ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি পরিচয় উল্লেখ করে দাঁত নখ বের করে ফেলল। আবার হতদরিদ্র চন্দনের পরিবার সর্বস্ব পণ করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যায় চন্দনের জন্যে, তার দিদির জন্যে নয়। দলিত মেয়ে সুধা ভারতী যতই প্রেমে পড়ুক, সে অন্তত গ্র্যাজুয়েট নয় এমন ছেলেকে – পুলিশের কনস্টেবলকে – বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ বাবার সরকারি চাকরির কল্যাণে সুধার জাত না বদলাক, শ্রেণি বদলে গেছে। এই হল নীরজের ভারত, আমাদের ভারত।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

অভিনেতার কাজই হল তিনি যে লোক নন সেই লোক হয়ে ওঠা। তবু হয়ত চারপাশের পরিস্থিতির কারণেই ঈশানকে মিতভাষী, অপমান বুকে চেপে রাখা গরিব মুসলমান যুবকের চরিত্রে এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে দেখে একটু বেশিই ভালো লাগে। নীরবে অপমানিত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে ঈশান সবচেয়ে বাঙ্ময়। ছবির শেষ প্রান্তে চরম অসহায়তার মুহূর্তে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন। তবে চমকে দেন চন্দনের চরিত্রে বিশাল। তাঁর চেহারার সবচেয়ে চোখে পড়ার মত জিনিস হল অস্বাভাবিক কটা চোখ। ওই চোখদুটোকে তিনি মরদানি ২ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন নারীবিদ্বেষী সাইকোপ্যাথের হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলতে। এখানে প্রায় ম্যাজিকের মত ব্যবহার করেছেন দলিতের গ্লানিকে মুখরতা দিতে। পছন্দের নারীর সামনে প্রেমিকের চিরকালীন ক্যাবলামি করতে করতে, ভেঙে পড়া বন্ধুকে কাঁদার জন্যে কাঁধ এগিয়ে দিতে দিতে ছবি যত এগিয়েছে, বিশাল বিশালতর হয়েছেন।

নীরজের ছবির নায়িকার গ্ল্যামার থাকে না, সুধারও নেই। সেই চরিত্রে জাহ্নবী কাপুর যথাযথ। তবে বিশালের সঙ্গে ঈশানের রসায়ন যত নিখুঁত, জাহ্নবী আর বিশালের রসায়ন ততটা জমেনি। পর্দায় বেশিক্ষণ না থাকলেও মনে থেকে যায় চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎস্যা আর ঈশানের বসের চরিত্রে শ্রীধরের অভিনয়। বরুণ অতীতে বহু ছবিতে একবার শুনলে কানে লেগে থাকার মত গান লিখেছেন। যাঁরা তাঁর কবিতার কথা জানেন, তাঁকে ঋজু বিদূষক হিসাবেও চেনেন, তাঁরা আরও ভালো করে জানেন তাঁর ভাষার উপর প্রশ্নাতীত দখলের কথা। সব মিলিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, অমিত ত্রিবেদী সুরারোপিত, জাভেদ আলি আর পাপোনের গাওয়া এই ছবির ‘ইয়ার মেরে’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

নীরজ একজন আশ্চর্য পরিচালক। তিনি গোটা ছবিতে মানুষের শঠতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুঃখকষ্ট দেখান। তারপরেও এক চিলতে আশায় ছবি শেষ করেন। মসান ছবিতে শ্মশানের বামুনের মেয়ে দেবী পাঠক (রিচা চাড্ডা) আর ডোমের ছেলে দীপক চৌধুরীর (ভিকি কৌশল) সমান্তরালভাবে চলতে থাকা জীবন একসাথে বয়ে গিয়েছিল সঙ্গমের দিকে। এখানেও শেষমেশ দুরকমভাবে ঘরে ফিরেছে দুই বন্ধু। নীরজ শেষপর্যন্ত এমন এক দেশের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছেন, যেখানে হিন্দু বন্ধুর গৃহপ্রবেশে দরজা ফুল দিয়ে সাজায় মুসলমান বন্ধু। এ দৃশ্যই এদেশে স্বাভাবিক ছিল, ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে – মুসলমান রোগী দেখেন বলে হিন্দু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তাই বুক দুরুদুরু করে। পরিচালককে প্রশ্ন করতে সাধ হয় ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি/হারিয়েছ দেশ কাল জানো না কি?’

অবশ্য হয়ত নীরজই ঠিক, আমরা যারা আশঙ্কিত, তারাই ভুল। সংখ্যাগুরুবাদীদের গত কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পরেও, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রচার চালানোর পরেও, হিন্দি সিনেমার দর্শকরা ঘৃণা ছড়ানো সিনেমাকে বাতিল করে দিলেন তো। তাছাড়া ধর্মা প্রোডাকশনসের মত বলিউডের বিরাট প্রযোজনা সংস্থা এ ছবির দায়িত্ব নিল তো। যতই মার্টিন স্করসেসি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হোন, অত বড় ব্যানারের ছায়া না থাকলে যে এ ছবি দর্শকের মুখ দেখত না, তা সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অতএব হয়ত এখনো আশা করা অযৌক্তিক নয় যে, ক্রিকেট খেলতে খেলতে মুসলমান বন্ধুকে কেউ তার ধর্ম তুলে ‘নিজেদের এলাকায় গিয়ে খেল গে যা’ বললে হিন্দু বন্ধুর মারপিট করতে যাওয়ার দিন এদেশে ফুরোবে না। এ যুগের কোনো কবিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারকে স্মরণ করে লিখতে হবে না ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধূ ধূ/খেলার বয়েস পেরোলেও একা ঘরে/বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত