জাতের নামে বজ্জাতিতেও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না।

চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।

এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!

চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।

জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।

মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।

এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।

আরও পড়ুন বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।

অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

প্রশান্ত বুদবুদ ফেটে যাওয়ায় প্রশ্ন: গণতন্ত্র চালাচ্ছে মার্কেট রিসার্চ?

রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।

প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।

এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।

ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।

হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।

ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।

২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?

এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।

আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মোদীর গ্যারান্টিতে খুব বেশি ভারতীয় নাগরিক বিশ্বাস করেননি। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নেও খুব বেশি মানুষের গায়ে পুলক লেগে চোখে ঘোর ঘনায়নি। একাই তিনশোর বেশি এবং জোটে সাড়ে তিনশোর বেশি আসনের কৈলাস পর্বত থেকে ভোটাররা পরমাত্মা নরেন্দ্র মোদীকে টেনে নামিয়েছেন জোট রাজনীতির মাটিতে। তবে যেহেতু বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রাক-নির্বাচনী জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২ আসনের বেশি পাচ্ছে, তাই হয়ত ফের মোদী তাঁর প্রিয় আসনে বসতে পারবেন। অবশ্য মোদী-অমিত শাহের ভয়ে যাঁরা এতদিন এনডিএতে ছিলেন, তাঁরা ভয় কমে যেতেই যদি কেটে পড়ার তাল করেন তাহলে অনেককিছু ঘটতে পারে। তা যদি না-ও ঘটে, বিজেপিই যে একক বৃহত্তম দল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই একে তারা জয় বলে দাবি করতেই পারে, যতই তাদের তৈরি আলেখ্য স্পষ্টত প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাক। কিন্তু এ লেখা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যারা হেরে ভূত হয়ে গেছে তাদের কথা বলার জন্যে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষত জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর কথা বলছি।

২০১৪ সাল থেকে কারা গোদি মিডিয়া হয়ে গেছে তা আজ কাউকে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। যেসব সংবাদমাধ্যমকে সচরাচর ওই তালিকায় ফেলা হয় না, আজও নিরপেক্ষ বলেই মনে করেন বিজেপিবিরোধী দর্শকরা, তারাও গত এক-দেড় বছরে ভোল বদলেছে। গোদি মিডিয়ার হত্তাকত্তারা নিউজক্লিকের দিকে, অন্য বিকল্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দিকে সিবিআই, ইডিকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনে উল্লসিত হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করে আহ্লাদিত হয়েছিলেন। আর তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম প্রবীর পুরকায়স্থের মত সাংবাদিকদের সমর্থনে টুঁ শব্দ করেনি। বাংলায় তো রিপাবলিক বাংলা ছাড়া গোদি মিডিয়া নেই বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এখানে দিদি মিডিয়া আছে। তা সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক, কোনো মিডিয়াই আর পাঁচটা গ্রেফতারির খবরের মত করে সংবাদটি পাঠক/দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বেশি তেমন কিছু করেনি। বাংলার স্বনামধন্য (অনেকের মত কিংবদন্তি) সাংবাদিকরা নিজেদের ব্লগে বা ভ্লগে, মায় ফেসবুক পোস্টেও এর প্রতিবাদ করেননি। সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কালে নীরবতা অবশ্যই সম্মতির লক্ষণ। কারা নীরব ছিলেন মনে করে দেখুন। গোদি মিডিয়া সমেত তাঁদেরও উলঙ্গ করে দিল নির্বাচনের ফল, কারণ মাত্র তিনদিন আগে তাঁদেরই চ্যানেলে চ্যানেলে বুথফেরত সমীক্ষায় ৩০০-৪০০ আসন দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল মহামতি মোদীকে।

কেবল জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। বুথফেরত সমীক্ষা আর পাঁচটা সমীক্ষার মতই একটা সমীক্ষা মাত্র। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আজ যখন ইন্ডিয়া টুডের স্টুডিওতে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা এসে নিজের পাহাড়প্রমাণ ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন, তখন রাজদীপ সরদেশাই, রাহুল কাঁওয়ালরা পরম স্নেহে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে তাঁকে বোঝাচ্ছিলেনও বটে, যে মানুষ মাত্রেই ভুল করে।

কিন্তু মুশকিল হল, এর চেয়ে অনেক ছোট ভুলে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে একজন সাংবাদিককে বিস্তর কৈফিয়ত দিতে হয়, লিখিত শোকজের জবাব দিতে হতে পারে, চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ২০২০-২১ সালে ভারতের যেসব সংবাদমাধ্যম করোনা অতিমারীর দোহাই দিয়ে কয়েক হাজার সাংবাদিককে ব্যবস্থা উদ্বৃত্ত ঘোষণা করে ছাঁটাই করেছিল, তারাই টাকা খরচ করে এইসব বুথফেরত সমীক্ষা করিয়েছে এবং প্রচার করিয়েছে। যে সাংবাদিকরা ছাঁটাই হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ বা সি-ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের চেয়ে বড় ভুল করেননি। করলে চাকরি আগেই যেত। অবশ্য যদি গুপ্তা, দেশমুখরা সত্যিই ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাই ভুল করতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে করেছিল। আবার সব সংস্থা এক ভুলও করতে পারে। কিন্তু সব সমীক্ষাকারী সংস্থা একসঙ্গে একই ভুল করলে সেটা কাকতালীয় ঘটনা হিসাবে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। বিশেষ করে সব সমীক্ষাতেই যদি স্রেফ কোথায় কটা আসন আছে সেই তথ্যে ভুল থাকে বা কোন দল কটা আসনে লড়ছে সেই তথ্যে ভুল থাকে। গোদি মিডিয়া অবশ্য সেখানেও থামেনি। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা বুথফেরত সমীক্ষা যে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফল নয়, সেকথা বারবার করে দর্শকদের বলাই দস্তুর। অথচ এবারের বুথফেরত সমীক্ষায় ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেস গোহারান হারছে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মোদী তৃতীয় মেয়াদে কী কী করবেন, ভারতকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন – এসব গভীর আলোচনাও চালানো হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। আজ তক নেটওয়ার্কের বিখ্যাত গোদি অ্যাঙ্কর অঞ্জনা ওম কাশ্যপ রীতিমত নাকের পাটা ফুলিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁদের মত বড় চ্যানেলে বিরোধীদের কোনো পরিসরই দেওয়া উচিত নয়।

এই সাংবাদিকের যে সাংবাদিকতা করা উদ্দেশ্য নয়, তার এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ হয় না। লোকসভায় বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির পর কী করবেন অঞ্জনা? সে তিনি ভাববেন, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে অঞ্জনা বরং সরল বা বোকা বা উদ্ধত। তাই প্রকাশ্যে ওকথা বলেছেন। তাঁর চেয়ে চালাক চতুর সাংবাদিকরাও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে ভান করতে জানেন। গত এক দশকে ভারতের প্রায় প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এই ধরনের মেধাহীন, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকদেরই দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেছেন। সত্যিকারের সাংবাদিকদের হয় রবীশ কুমার বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর মত নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে হয়েছে, নয় মুখ বুজে পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে ফ্যাসিবাদীদের হয়ে দিনরাত মিথ্যা প্রচারের কাজই করে যেতে হয়েছে। তৎসত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে, কখন মুনাফাখোর মালিকের মনে হয় – এত সাংবাদিক আমার দরকার নেই। শেষ দফার নির্বাচনের পরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওতে রবীশ বলেছেন যে চ্যানেলগুলোতে খরচ কমাতে রিপোর্টার যত কমানো হয়েছে, তত রমরমা হয়েছে অঞ্জনা জাতীয় অ্যাঙ্করদের। অর্থাৎ খবরকে এক ধরনের অসুস্থ বিনোদনে পরিণত করে মানুষের মন বিষিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে, মোদীকে দোষগুণের অতীত এক সত্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজই করে গেছে টিভি চ্যানেলগুলো। দিনরাত মোদীকে দেখানো, বিরোধীদের প্রায় না দেখানো, দেখালেও তাদের বক্তব্য এমনভাবে বিকৃত করা যাতে মোদীর সুবিধা হয় – এইসব কৌশল ইদানীং মোদীভক্তরাও বুঝে ফেলছিলেন। পুরাণে নির্মোক নৃত্যের কথা লেখা আছে, আজকাল যাকে বলা হয় স্ট্রিপটিজ। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক দশকব্যাপী এই স্ট্রিপটিজে কোমরে যে সরু অন্তর্বাসটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও খুলে ফেলা হল এবারের বুথফেরত সমীক্ষায়।

আসল ফল যে অন্যরকম হবে, একথা প্রায় সব সাংবাদিক জানতেন। কিন্তু নিজের সংস্থার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে (নাকি অন্য কারোর অর্থানুকূল্যে?) এই বুথফেরত সমীক্ষাগুলো করিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১ জুন ২০২৪। অঞ্জনা, সুধীর চৌধুরী বা রাহুল কাঁওয়ালের মত অন্ধ সাংবাদিক ভেকধারীদের অবশ্য অভিজ্ঞতা বা নৈপুণ্য – কোনোটাই নেই। তাঁরা অত উপরে উঠেছেন মেধাহীন বদমাইশি নির্লজ্জভাবে করতে পারেন বলেই। ৪ জুন ২০২৪ কেবল প্রদীপ বা যশবন্ত নন, কেবল গোদি সাংবাদিকরাও নন, উদোম হয়ে গেলেন তাঁদের নিয়োগকারীরা। সবার চোখে ধরা পড়ে গেল, তাঁরা আসলে কিসের ব্যবসা করেন।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

তবে ও ব্যবসায় কিন্তু কেবল মার্কামারা গোদি মিডিয়াই যুক্ত তা নয়। যদি তা হত, তাহলে গত কয়েক মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সবেতেই দোষ দেখা এবং বিজেপির সবেতেই গুণ দেখা অতি বুদ্ধিমান সুটবুট পরা বাঙালি বাবু সুমন দে ওই বুথফেরত সমীক্ষা নিজের চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখাতে দিতেন না। মনে রাখবেন, সুমন দে-র মত বিভিন্ন চ্যানেলে সর্বেসর্বা যে অ্যাঙ্কররা আছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অংশ। সাধারণ কর্মচারী নন। রাজদীপ সরদেশাইদের প্রজন্ম মাথার সব চুল পেকে গেলেও মুশাহারদের গ্রামে চলে যান খবর করতে। আজকের রাহুল কাঁওয়াল বা সুমন দে-রা রিপোর্টিং বলতে বোঝেন ঠান্ডা ঘরে বসে অমুক নেতা, তমুক নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎকারে বিশেষ কিছুই করার থাকে না। কারণ আগেই স্থির করা থাকে যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভান করতে করতে আসলে নেতা আপন মনে শেক্সপিয়ারের চরিত্রের মত যা খুশি বলে যাবেন, সাংবাদিক ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত মুখ করে শুনে যাবেন আর মাঝে মাঝে দন্তবিকাশ করে গল্প হলেও সত্যি ছবির ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানান দেবেন ‘থেমো না দাদা, বলে যাও। বড় ভাল বলছ।’

এ কাজ যে যত ভাল করতে পারে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখন তার তত দাম। সংসদে বিরোধীদের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় এবার কিন্তু এই জাতের সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। কারণ দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্লান্তি এসেছে। সরকারভক্ত দর্শক/পাঠকরাও ইদানীং সেই কারণেই বিকল্প সংবাদমাধ্যম – অর্থাৎ ছোট-বড় ওয়েবসাইট, ইউটিউবার, ফেসবুকারদের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারের শক্তি কমে যাওয়ার একটা মানে হল উলটো বয়ান শুনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরেকটা মানে হল, আগামীদিনে ওই সংখ্যা আরও বাড়বে। কেবল ময়ূখ ঘোষদের নয়, সুমন দে-দেরও সাবধান হওয়ার সময় বোধহয় এসে পড়ল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল।

এবারের নির্বাচনে লড়া দলগুলো শেষপর্যন্ত পরিষ্কার দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। এক পক্ষের অবিসংবাদী নেতৃত্বে বিজেপি, অন্য পক্ষের তর্কসাপেক্ষ নেতৃত্বে কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি বা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতাদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও এটা ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যত মিথ্যে কথা বলছেন, যত আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন, তার বেশিরভাগই কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে। ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মূল লক্ষ করেছেন গান্ধী পরিবারকে। ফলে অন্য অনেকের প্রতি তাঁর আক্রমণ আমাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ খেয়াল করলে দেখা যাবে, মোদী কিন্তু কোনো বক্তৃতাতেই তাঁদের ভুলছেন না। কারণ মোদী রন্ধ্রে রন্ধ্রে একজন আরএসএস প্রচারক; অরুণ শৌরি বা যশবন্ত সিনহাদের মত কংগ্রেসকে পছন্দ করেন না এবং আর্থসামাজিক ভাবনায় দক্ষিণপন্থী বলে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে বিজেপিতে যাওয়া লোক নন। ফলে মোদী আরএসএসের আদর্শগত শত্রুদের কখনো ভোলেন না। সেই কারণেই সংসদীয় শক্তি নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বক্তৃতার খানিকটা জুড়ে সবসময় থাকে কমিউনিস্ট এবং/অথবা নকশালরা। কংগ্রেস কত ভয়ঙ্কর তা বোঝাতেও তিনি বলেন – ওদের ইশতেহার তৈরি হয়েছে নকশাল চিন্তাভাবনা থেকে। একই কারণে মোদী এবং বিজেপির অন্যান্য শীর্ষনেতারা জওহরলাল নেহরুকে যত গালাগালি দেন, ততটা দেন না ইন্দিরা গান্ধীকে। রাজীব গান্ধীর নাম টেনে আনেন শুধুমাত্র সোনিয়া বা রাহুলকে আক্রমণ করার সময়ে। একই কারণে মোদী কখনোই ভোলেন না লালুপ্রসাদকে। তাঁর এবারের জনসভাগুলোর ভিডিও লক্ষ করলে দেখা যাবে, বারবার তিনি ইন্ডিয়া ব্লক কতখানি ভ্রষ্ট তা বোঝাতে গিয়ে বলেন একজন নেতার কথা, যাঁকে দেশের আদালত দুর্নীতিতে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছে। তবে তিনি এখন জামিনে বাইরে আছেন। মোদী বলেন, শাহজাদা এত ভ্রষ্ট যে সেই লোকটার সঙ্গে শ্রাবণ মাসে মাংস রান্নার ভিডিও শেয়ার করে হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করে! সেই নেতার এত দুঃসাহস যে তিনি বলেন দেশের সকলের সম্পদ কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেওয়া হবে! বলা বাহুল্য, প্রথম কথাটা অর্থহীন, কারণ দেশসুদ্ধ সব হিন্দু মোটেই শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না। আর দ্বিতীয় কথাটা ডাহা মিথ্যা। কিন্তু এখানে সে আলোচনায় যাব না। কথা বলব লালুপ্রসাদ সম্পর্কে, যিনি বয়স এবং স্বাস্থ্যের কারণে হীনবল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সরাসরি পরমাত্মা হতে আবির্ভূত হিন্দু হৃদয়সম্রাটের দুঃস্বপ্নে এখনো হানা দেন। কেন দেন? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব। এই আলোচনা আজই, এখনই করা দরকার। কারণ লালুর বয়স এখন ৭৫, শরীরের অবস্থাও বিশেষ ভাল নয়। যদি ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র এ যাত্রায় বেঁচে যায় এবং ২০২৯ সালে আবার নির্বাচনের মত নির্বাচন হয়, তখন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মানুষটি আর আমাদের মধ্যে থাকবেন কিনা ঠিক নেই।

প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটি পড়ে অনেক পাঠকই নাক কুঁচকোবেন। বিমানযাত্রায় গা গুলিয়ে উঠলে বমি করার জন্যে যে কাগজের ব্যাগ দেওয়া হয়, কেউ কেউ তার প্রয়োজনও বোধ করতে পারেন। কারণ কেবল বাঙালি ভদ্দরলোক নয়, অন্য রাজ্যের ভদ্রজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও দেখেছি, লালু সম্পর্কে একটা শব্দই সকলে জানে – ‘করাপ্ট’ (দুর্নীতিগ্রস্ত)। শুধু তাই নয়, সকলেই নিঃসন্দেহ যে ভারতের ইতিহাসে লালুর চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা আর আসেনি। অথচ লালু মূলত যে পশুখাদ্য নিয়ে দুর্নীতির মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী, সেই মামলাতেই বিহারের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রও যে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন সেকথা কারোর মনে নেই। দেশজুড়ে কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য দলের নেতা, মন্ত্রীদের বহু কেলেঙ্কারি মানুষ ভুলে গেছেন। বিজেপির সাম্প্রতিক ওয়াশিং মেশিনে তো হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারির কলঙ্ক ধুয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা আইন আদালতের চোখে। সাধারণ মানুষের চোখে চিরকালই বহু নেতার দুর্নীতি মাফ হয়ে চলেছে। কেবল লালুর কোনো মাফ নেই, তাঁর ছেলেমেয়েদেরও মাফ নেই। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারেরও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে এবং তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কখনো শুনেছেন তাঁকে স্রেফ ‘করাপ্ট’ বলে উড়িয়ে দিতে? তিনি মহারাষ্ট্রের বাইরেও রীতিমত সম্মানিত নেতা। কেবল রাজনৈতিক মহলের কথা বলছি না। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিও ছিলেন। কোনো ক্রীড়া সাংবাদিকও কখনো লেখেননি পাওয়ারের বিরুদ্ধে কী কী দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তাঁর সম্পর্কে বরং ভাল ভাল সব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। তামিলনাড়ুর দুই প্রবাদপ্রতিম নেতা এম করুণানিধি আর জয়ললিতা। তাঁদের বিরুদ্ধেও বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। মামলা, গ্রেফতারি সবকিছুই হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষককে দেখবেন না প্রধানত তা নিয়েই আলোচনা করছেন। ওঁদের বিরোধীরাও তা করেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁদের ভাবমূর্তি তেমন নয়। যত দোষ লালু ঘোষ।

লালু সম্পর্কে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা হল – অশিক্ষিত। লালুকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্দরলোকেরা সেই নয়ের দশক থেকে বলে আসছেন, ক্ষমতায় আসতে হলে একটা স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া জানা আইন করে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত। এঁরা খবর রাখেন না, যে লালু এলএলবি পাস। ইস্ট জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির মত মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। তারপর এম এ পাস করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। মানে পলিটিকাল সাইন্স, ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’ নয়। বস্তুত ছাত্র রাজনীতির পথেই তাঁর উত্থান, যেমন উত্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, সুব্রত মুখার্জি, বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, ভদ্রলোকদের ভগবান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মহম্মদ সেলিম বা আজকের সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধরদের।

পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ভদ্রসমাজ লালুকে এক বিশেষ চশমা দিয়ে দেখে। সে চশমার একদিকের লেন্সে দুর্নীতি, অন্য লেন্সে অশিক্ষা। লালুর বিরুদ্ধে আরও একটা অভিযোগ প্রবল। তিনি বিহারে গুন্ডারাজ চালিয়েছেন। একথায় জোর দিতে বিহারে বহু যুগ আগে যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, সে যুগের গল্প এমনভাবে শোনানো হয় যেন সে এক স্বর্ণযুগ ছিল। সেই শুণ্ডির মত মাঠে মাঠে ফসল, গাছে গাছে পাখি। লালু ক্ষমতায় এলেন আর বিহার ছারখার হয়ে গেল। অথচ পশুখাদ্য মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, অধুনা প্রয়াত জগন্নাথ মিশ্র কংগ্রেস আমলেই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ভারতের আর সব রাজ্যের রাজনীতি যেন একেবারে শীতকালের ডাউকি লেকের মত স্বচ্ছ এবং সমাজবিরোধীমুক্ত। নিঃসন্দেহে লালুর আমলে দুর্নীতি হয়েছে, গুন্ডারা অনেককিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু লালুর রাজনীতি যদি শুধু ওটুকুই হত, তাহলে ভারতের আর পাঁচজন নেতার সঙ্গে তাঁর তফাত থাকত না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদীকেও ঘুরে ফিরে তাঁকে আক্রমণ করতে হত না। কেন লালুর নীতি আর শিক্ষা ভদ্দরলোকেরা দেখতে পান না তা বুঝতে পারলেই মোদী কেন লালুকে ভুলতে পারেন না তা বোঝা যাবে।

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি আজকের টাকার হিসাবে মোটামুটি ৪,০০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, যাতে তাঁর সময়ের আগের সরকারও যুক্ত ছিল। এর চেয়ে অনেক বড় বড় কেলেঙ্কারি ভারতে ঘটে গেছে। যে সেচ কেলেঙ্কারিতে মহারাষ্ট্রের বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার যুক্ত বলে অভিযোগ, তা ৭০,০০০ কোটি টাকার ব্যাপার। ২জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা নিয়ে দুর্নীতিতে দেশের ১,৭৬,০০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন তৎকালীন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বিনোদ রাই। পশ্চিমবঙ্গের সারদা কেলেঙ্কারি যে ঠিক কত টাকার ব্যাপার তা আজও পরিষ্কার নয়, নিয়োগ কেলেঙ্কারির হিসাব বোধহয় কোনোদিন পাওয়াই যাবে না। তবে আমরা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার হতে দেখেছি। তা এইসব বড় বড় দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের কী হয় সাধারণত? কিচ্ছু হয় না। অজিত নিজের দলকে দুভাগ করে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিয়ে ধপধপে সাদা হয়ে গেছেন। আদর্শ আবাসন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা অশোক চ্যবনও বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে সাফসুতরো হয়ে গেছেন। স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে ডিএমকে নেতা এবং তৎকালীন টেলিকম মন্ত্রী এ রাজাকে বিচারাধীন বন্দি হিসাবে কারাবাস করতে হয়েছিল বটে, কিন্তু অভিযোগটা আদৌ প্রমাণ করা যায়নি। নারদ কেলেঙ্কারি অত টাকার ব্যাপার নয়, কিন্তু ক্যামেরার সামনে হাত পেতে টাকা নেওয়া নেতাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো পক্ষের কোনো উৎসাহ নেই। সেই নেতারা তারপরেও নির্বাচনের টিকিট পেয়েছেন, ভোটারদের ভোটও পেয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী তো দল বদলে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা পর্যন্ত হয়ে গেছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দলের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সবরকম নেতাই দুর্নীতিতে যুক্ত বলে অল্পবিস্তর প্রমাণ হওয়ার পরেও মমতা সততার প্রতীক বলে ভদ্দরলোকেরা এখনো বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় এঁদের সকলকেই ক্ষমাঘেন্না করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লালু তাঁর পুরনো বন্ধু নীতীশ কুমারের মত এক বা একাধিকবার পক্ষ বদল করে কংগ্রেস বা বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসেননি। সম্ভবত তাই তিনি কেবল অভিযুক্ত নন, শাস্তিপ্রাপ্ত। উপরন্তু একথাও প্রমাণিত যে তাঁকে মন্ত্রিত্বের প্রলোভন দেখিয়ে বা ইডি, সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে দলে টানা যায় না। স্বভাবতই তিনি এক দেশ, এক নির্বাচন, এক দল করতে চাওয়া একনায়কের মাথাব্যথার কারণ।

আরও পড়ুন যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

কিন্তু এ তো নেহাত ব্যবহারিক কারণ। গভীরতর আদর্শগত কারণও আছে। এই যে আমাদের ধারণা – লালু অশিক্ষিত, তাঁর পার্টির লোকেরাও সব অশিক্ষিত। এই ধারণার কারণ কী? কারণ হিন্দি সিনেমা, সিরিয়াল এবং অন্যান্য হিন্দিভাষী নেতাদের মুখে আমরা যে ভাষায় কথা শুনি; লালু সে ভাষায় কোনোদিন কথা বলেন না। তিনি পারতপক্ষে ইংরিজিও বলেন না। কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে বাজেট বক্তৃতাও দিতেন হিন্দিতে। মাঝে মাঝে যখন ইংরিজি বলতেন, সে উচ্চারণ ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত হত না। মানে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে সন্তুষ্ট করতে পারত না। অথচ বিহারের রাজনীতিতে লালু এবং তাঁর দলের উত্থান যথার্থই সাবল্টার্নের উত্থান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে নিজের হাবভাব, চালচলন বদলে ফেলা সফল মানুষ অসংখ্য পাওয়া যায়। কিন্তু লালু বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, পরে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হলেন, রেলমন্ত্রকের গুরুদায়িত্ব সামলালেন পোশাকআশাক তো বটেই, মুখের ভাষাটি পর্যন্ত না বদলে। বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার ফুলওয়াড়িয়া গ্রামের কুন্দন রায় আর মরছিয়া দেবীর মেজ ছেলে গোটা জীবন ধরে দেখিয়ে যাচ্ছেন যে দেশোয়ালি ভাষাতেই যাবতীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কথোপকথন চালানো যায়। তাঁর ভাষার কারণে কখনোই তাঁর রাজনীতি সবচেয়ে নিচের তলার মানুষটার মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যায় না। বরং সরসতার কারণে অনেক জটিল বিষয়ও তিনি সকলের বোধগম্য করে দিতে পারেন। আজকাল বড় একটা বেরোন না বাড়ি থেকে, আগেকার মত দীর্ঘ বক্তৃতাও দিতে পারেন না। কিন্তু যেটুকু বলেন সরসভাবেই বলেন এবং বক্তব্যে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকে না। যেমন যখন ইন্ডিয়া ব্লক গঠনের চেষ্টা চলছিল, তখন এক সভার পর সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – আপনি বিয়ে করছেন না কেন? আপনার মা আমাকে বলেছেন, আপনি কথা শুনছেন না, বিয়ে করছেন না। এখনো সময় আছে, বিয়ে করুন। আমরা সবাই বরযাত্রী যাব। উত্তরে রাহুল হেসে বলেন, আপনি যখন বলে দিয়েছেন তখন বিয়ে এবার হয়ে যাবে। কারোর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে লালু আসলে রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে জোটে থাকার ব্যাপারে ভরসা দিচ্ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসাবে। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে যে হিন্দি চলে, লালু তার ধারে কাছে গেলেন না কোনোদিন। ফলে দেশের উচ্চবর্গচালিত সংবাদমাধ্যম চিরকাল তাঁকে অশিক্ষিত বলে প্রচার করে গেল। লালু সকলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের রাজনীতি নিজের মত করে চালিয়ে গেলেন। এ জিনিস এক দেশ, এক ভাষা করতে চাওয়া একনায়ককে যন্ত্রণা দেবে না?

লালুর আরও বড় দোষ হল, তাঁর কথার দাম আছে। তিনি নীতীশের মত পালটি খান না, মমতার মত ক্ষমতায় আসার জন্যে ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ হচ্ছে’ বলার মত দক্ষিণপন্থী এজেন্ডা গ্রহণ করেন না, হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাত ধরেন না। আবার ক্ষমতায় এসে গেলে সংখ্যালঘু ভোটের কথা ভেবে মুসলমানদরদীও সাজেন না। তিনি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে চিরকাল কথা বলেন এবং কাজ করেন। তিনি একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি গোটা দেশে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়া লালকৃষ্ণ আদবানির রথ থামিয়ে তাঁকে গারদে পুরে দিয়েছিলেন। গত শতকের শেষ প্রান্তে যখন বারবার ত্রিশঙ্কু লোকসভা হচ্ছিল, তখন জয়প্রকাশ নারায়ণের অনেক শিষ্যই নিজেদের অবস্থান বদলেছেন নানা অজুহাতে। ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু লালু কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষ ত্যাগ করেননি। তিনি বা তাঁর দলের নেতারা মন্ত্রিত্ব পেলেন কিনা সে প্রশ্ন কখনো তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠেনি।

লালুই যে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা – এ সম্পর্কে দেশের সাংবাদিককুল, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং ভদ্দরলোকেরা এত নিশ্চিত যে তাঁকে নিয়ে নানাবিধ কৌতুক কাহিনি চালু আছে। যেমন

লালু একবার সংসদের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। সে দেশের এক সাংসদের বাড়িতে গেছেন। জানতে চেয়েছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

সাংসদ বলেছেন, আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

হ্যাঁ।

ফিফটি পার্সেন্ট।

পরের বছর সেই সাংসদ ভারতে এসে লালুর বাড়িতে গেছেন। জিজ্ঞেস করেছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

কই, না তো!

হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

এসব গল্প বাঙালি ভদ্রজনের আড্ডায় আসর মাতিয়ে রেখেছে বছর তিরিশেক হল। অথচ এই লালু রেলমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষতিতে চলা ভারতীয় রেল লাভের মুখ দেখেছিল। তাঁর কর্মপদ্ধতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ানো শুরু হয়েছিল। এমনকি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকেও তাঁকে ছাত্রছাত্রীদের সামনে বলতে ডাকা হয়েছিল। এমন লোককে ‘মেরিট’-এর দোহাই দিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গালাগালি করা ভদ্রসমাজের কী করেই বা হজম হবে? লালুর রাজনীতি তো শতকরা একশো ভাগ সংরক্ষণের পক্ষে।

এসব কথা বহু বাঙালির তেতো লাগবে। তথ্য অস্বীকার করতে না পারলেও তাঁরা প্রশ্ন তুলবেন – বিহারের জন্যে লোকটা কী করেছে? একথা ঠিক যে লালুর নেতৃত্বাধীন সরকার বিহারকে অর্থনৈতিকভাবে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু বা কেরালার স্তরে নিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু লালু ক্ষমতায় আসার আগে বিহারে সব ভাল ছিল, এ নেহাত গালগল্প। অর্থনীতিবিদ আশিস বোস যখন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কাছে জমা দেওয়া এক রিপোর্টে দেশের রুগ্ন অংশ হিসাবে BIMARU (বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যগুলোর কথা উল্লেখ করেন তখনো লালু ক্ষমতায় আসেননি। লালুর রাষ্ট্রীয় জনতা দল একক ক্ষমতা হারিয়েছে তাও কম দিন হল না। অথচ দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রিয় কাজের মানুষ নীতীশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে তেমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারেননি বিহারে। পারলে এবারের নির্বাচনেও কর্মসংস্থান বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াত না, কয়েক মাসের সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রী থাকা লালুপুত্র তেজস্বীর চাকরি দেওয়ার প্রকল্প তাঁকে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলত না। কিন্তু সাহেবরা ঠিকই বলে – ‘Man cannot live with bread only’ (মানুষ কেবল খাবার খেয়ে বাঁচে না)। সুতরাং কেবল অর্থনৈতিক অবদান দিয়েই একজন নেতা বা তাঁর দলের রাজনীতিকে বিচার করা মূর্খামি এবং অন্যায়। লালুর বিহারের মানুষের প্রতি সবচেয়ে বড় অবদান আজকের লব্জে যাকে ‘উন্নয়ন’ বলে তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক সুদূরপ্রসারী।

মনে রাখতে হবে, লালু এমন এক পরিবারের ছেলে, যাদের জন্যে গ্রামে জলের কলটা পর্যন্ত আলাদা হত। বিশিষ্ট সাংবাদিক রাহুল শ্রীবাস্তব গতবছর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, লালু যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন, নিজের মাকে খবরটা দিতে গিয়ে বলেন ‘মা, আমি হাতুয়ার রাজা হয়ে গেছি’। হাতুয়া তাঁর গ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী বড় জায়গা। মা লেখাপড়া জানেন না, প্রান্তিক পরিবারের গৃহবধূ। মুখ্যমন্ত্রী মানে কী, তা তিনি বুঝবেন না। তাই লালুকে ওভাবে বলতে হয়েছিল। কিন্তু ওই অবস্থা থেকে ক্ষমতা হাতে পেয়ে অনেকেরই মাথা ঘুরে যায়। নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মত মানুষের থেকে সচেতনভাবেই তারা দূরে সরে যায়। লালুর বিশেষত্ব হল তিনি তা করেননি। জাতপাত এখনো বিহারে যথেষ্ট বড় বিষয়। সরকারি দফতরেও উঁচু জাতের চাপরাশি নিচু জাতের অফিসারকে খাওয়ার জল দেয় না। কিন্তু এই ব্যবস্থার মূলে লালুর আমলে যেভাবে কুঠারাঘাত করা হয়েছে তা ঐতিহাসিক। আট বা নয়ের দশকে বিহারে যাতায়াত ছিল এমন লোকেদের কাছে শোনা যায়, বাসে উঁচু জাতের লোক উঠলে নিচু জাতের লোকেদের উঠে দাঁড়িয়ে বসার জায়গা দিতে হত। সেসব লালুর আমলে তুলে দেওয়া হয়। একদিনে হয়নি। প্রবীণ সাংবাদিকরা বলেন, লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল। তিনি উঁচু জাতের অফিসারদের এবং সামনে উপস্থিত নানা জাতের গরিবগুরবো মানুষকে বার্তা দিতে চাইতেন, যে জাত কোনো ব্যাপার নয়। যে পদে আছে, তাকে সবাই মানতে বাধ্য। উঁচু জাত বলে ছাড় পাবে না।

রাহুল শ্রীবাস্তবেরই বলা মুখ্যমন্ত্রী লালুর দুটো কীর্তির কথা বলে শেষ করি। বোঝা যাবে, লালু যখন থাকবেন না, কেন তখনো মোদীর মত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা লালুর ভূত দেখবে।

লালু হঠাৎ কিছুদিন রাতের বেলা সুট, বুট, হ্যাট পরে পুরোদস্তুর সাহেব সেজে পাটনার আশপাশের ইটভাটাগুলোতে যাওয়া শুরু করেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে খবর ছিল, উচ্চবর্ণের বাবুরা ইটভাটায় রাতে আসর জমান আর বিছানায় তাঁদের শিকার হতে হয় নিম্নবর্গীয় মহিলাদের। লালু স্বয়ং দলবল নিয়ে উপস্থিত হয়ে টানা কিছুদিন উত্তম মধ্যম দেওয়ার পরে বাবুদের মহফিল বন্ধ হয়।

দ্বিতীয় ঘটনা অভিজাত পাটনা ক্লাব নিয়ে। কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব বা ক্যালকাটা ক্লাবের মতই ওটাও অভিজাতদের আয়েশ করার জায়গা। তফাত বলতে সব বর্ণের লোককে ঢুকতে দেওয়া হত না। লালু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে বলেন, ওই ক্লাব আমি বন্ধ করে দেব সবাইকে ঢুকতে না দিলে। তারপর ক্লাবের নিয়ম ভেঙে প্রথম যে অসবর্ণ পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ওই ক্লাবে, তারা জাতিতে ডোম।

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

শুধু মোদী নয়, আম্বানি-আদানিদের হাত থেকেও উদ্ধার পাওয়া দরকার

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ঋজু বিদূষক কুণাল কামরা তাঁর কমেডি রুটিনের একখানা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মুকেশ আম্বানি কীভাবে ভারতের অর্থনীতির উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গৌতম আদানির নাম তখনো মুখে মুখে ফেরার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সেই ভিডিওর শুরুতেই কুণাল বলেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজাসুজি আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারব না? আমাদের আম্বানির সঙ্গে কোনো ঝামেলা আছে? বানাও না পিএম।’ তারপর বলেন ‘আমার সত্যিই মনে হয় কর্পোরেশনগুলোর ভোটে লড়া উচিত। যেমন মুকেশ আম্বানি বনাম রতন টাটা – লড়ো ২০১৯। সত্যিই দারুণ ভোট হবে। ওরা তো একটা বিষয় নিয়েই কথা বলবে – ডেভেলপমেন্ট। বিকাশ। ওরা তো আর কিছু জানেই না। ধরুন রতন টাটা তো আর উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ঘর ভর্তি লোকের দিকে তাকিয়ে বলবে না, মন্দির ইয়হি বনেগা।’ বলা বাহুল্য কথাগুলো ঠাট্টা করে বলা, লোক হাসাতে বলা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিদূষকরা চিরকাল রসিকতা করতে করতে তেতো সত্যও বলে এসেছেন। তা করতে না পারলে বিদূষক হওয়ার মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিদূষক গল্প দ্রষ্টব্য। উপরন্তু আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে কুণাল, আকাশ ব্যানার্জিরা যে কাজ করছেন তা বিদূষকের সীমায় আটকে নেই। রীতিমত সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে। ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কাজ জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ারা করে থাকেন। সুতরাং কুণালের রসিকতাতেও খুঁজলে হাসির আড়ালের সত্যগুলো অনায়াসেই পাওয়া যাবে।

আসলে কুণাল ঠাট্টা করে যা বলেছিলেন তা পৃথিবী জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভালমন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তারই অঙ্গ। কোনো দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রই কোনোদিন অতিধনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সব দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের মনেই এই সন্দেহ দেখা দিয়েছে, যে অতিধনীরাই হয়ত গণতন্ত্রের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, সোশাল মিডিয়া আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জনমত প্রভাবিত করার উপায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল টাকা দেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোই কোথায় কে সরকার গড়বে আর কে সরকার চালাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা – এ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কথা হচ্ছে। কুণাল যে কাল্পনিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছিলেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আগেই অর্ধেক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আম্বানির মতই একজন ধনকুবের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের সারিতে বসানো যেত না। আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর না গেলেও সরকারি নীতি নির্ধারণে যে কর্পোরেট শক্তি বড় ভূমিকা নিচ্ছে তার একাধিক প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যাদের সন্দেহ ছিল তারাও দেখে ফেলেছে নির্বাচনী বন্ডে কোথা থেকে কে কত টাকা পেয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থে আইন বদলে আদিবাসীদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। কতগুলো বন্দর, বিমানবন্দর আদানির হাতে গেছে; আম্বানি কীভাবে খুচরো ব্যবসা থেকে শুরু করে খনিজ তেল – দেশের সমস্ত ব্যবসায় জাল বিছিয়েছেন তা-ও অনেকেরই জানা। ফলে কিছুদিন আগে অবধি ক্রোনি পুঁজিবাদ কথাটা যার শোনা ছিল না, সেও জেনে গেছে।

কোনো সন্দেহ নেই, এদেশে ক্রোনি পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তোলায় সবচেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তাঁর নাম রাহুল গান্ধী। সপ্তদশ লোকসভায় বামপন্থী দলগুলোর সাংসদ ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, সংসদের বাইরেও তাঁদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এমন অবস্থায় পুঁজিবাদ বা ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে দিনরাত আওয়াজ তোলার মত কেউ ছিলেন না। সংসদের ভিতরে তো নয়ই। রাহুলই প্রথমে সংসদের বাইরে নাম করে আম্বানি, আদানি দেশের সম্পদ কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন তা বলা শুরু করলেন। তারপর সংসদের ভিতরে আদানি আর নরেন্দ্র মোদীর একত্র ছবি এনলার্জ করে দেশের সামনে তুলে ধরলেন। মোদীর প্রাণভোমরা যে সত্যিই আরএসএস নয়, কর্পোরেটের হাতে – তা প্রমাণ হয়ে যায় কিছুদিন পরেই রাহুলকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করার ঘটনায়। রাহুল আদালত ঘুরে সংসদে ফিরে আসার পরেও আম্বানি, আদানিকে আক্রমণ করা ছাড়েননি। তবু এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন কিন্তু সেই মোদী। ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতই আলোচনা হোক, এত বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে দুজন পুঁজিপতির নাম নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে – এমন ঘটনা বিরল।

মিথ্যা বলা, সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবারের নির্বাচনে জলভাত করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নানা কথা বলে চলেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে। অনেকেই বলছিলেন নিজের দলের ইশতেহার সম্পর্কে একটিও বাক্য খরচ না করে কেবলই কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে অপপ্রচার আসলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের প্রকাশ। তিনি সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ৪০০ আসন পার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে যে প্রবণতার খোঁজ তিনি পাচ্ছেন তা ৫৬ ইঞ্চি বুকে ভরসা জোগাচ্ছে না। তাই সেই লালকৃষ্ণ আদবানির আমল থেকে বিজেপির যে পরীক্ষিত জয়ের ফর্মুলা, তাতেই ফিরে গেছেন – মুসলমানের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট কুড়াও।

এর না হয় তবু একটা ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোটের পরে তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যে কথা মোদী বললেন, তার পিছনে যুক্তি কী? পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেসের শাহজাদা সকাল থেকে মালা জপার মত আম্বানি, আদানির নাম বলতেন। ভোট ঘোষণা হতেই কেন এদের নাম বলা বন্ধ হয়ে গেল? নির্ঘাত আম্বানি, আদানির কাছ থেকে টেম্পো করে বস্তা বস্তা মাল কংগ্রেসের কাছে গেছে? শাহজাদা জবাব দিন – এই তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে তো বটেই, নির্বাচনী প্রচারেও প্রত্যেকটা শব্দ মেপে খরচ করাই নিয়ম। তার উপর দশ বছর ধরে শুনে আসছি মোদী ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি না ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারেন? তাহলে হঠাৎ নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধুদের এভাবে বিরোধী দলকে গোপনে টাকা দেওয়ায় অভিযুক্ত করতে গেলেন কেন? অতীতে সংসদে রাহুল তথা বিরোধীরা আদানির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও তিনি তো মুখ খোলেননি। তাহলে ভোটের ভরা বাজারে কেন এমন করলেন? ওই বক্তৃতার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওই কথায় বিজেপির সদস্য সমর্থকদের মধ্যে কোনো নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার তো হয়নি বটেই, উল্টে রাহুলের ভিডিও জবাব ভাইরাল হয়ে গেছে। সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও মোদীর কথার সঙ্গে সমান গুরুত্বে সেই জবাব সম্প্রচারিত হয়েছে এবং রাহুলের জবাবে রক্ষণাত্মক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। বরং তিনি পালটা আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে ফের ক্রোনি পুঁজিবাদ চালানোয় অভিযুক্ত করেছেন মোদী সরকারকে। বলেছেন, মোদী সরকার ২২ জন অতিধনী তৈরি করেছে, আমরা কয়েক কোটি লাখপতি বানাব। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশে এক সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, যখন কেউ ভয় পেয়ে যায় তখন আপন লোকেদের ডাকাডাকি করতে থাকে। মোদী হারের ভয় পেয়েছেন। তাই আম্বানি, আদানির নাম করছেন যাতে তাঁরা ওঁকে বাঁচান।

আমরা রাহুলের এসব কথায় বিশ্বাস করব না। কারণ নির্বাচনী প্রচারে গরম গরম কথা বলতেই হয়, বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের নেতা হলে। আমরা খানিকক্ষণের জন্য একথাও ভুলে যাই, যে মোদী এক্ষেত্রেও মিথ্যাভাষণ করেছেন। রাহুল মোটেই ভোটের প্রচারে আম্বানি, আদানির নাম বলা বন্ধ করে দেননি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাহুল সাতবার সাতটা বক্তৃতায় ওই দুজনের নাম করেছেন।

আমরা বরং তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোদী সত্যি কথাই বলছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি টেম্পোয় করে টাকা পাঠানোর কথাটা লোকের বুঝতে সুবিধা হবে বলে মোদী বলেছেন। মোদ্দাকথা হল, আম্বানি আর আদানি কংগ্রেসকে টাকা দিচ্ছেন এই নির্বাচনে। যদি একথা সত্যি হয়, তাও কিন্তু বিজেপির পক্ষে দুঃসংবাদ। কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকারের মাথার উপর থেকে যদি ভারতের সবচেয়ে ধনী দুই ব্যবসায়ীর হাত সরে গিয়ে থাকে তাহলে মোদীর সমূহ বিপদ। কারণ তাহলে বুঝতে হবে, তাঁরা হাওয়া খারাপ বুঝে পরবর্তী সরকারে নির্ণায়ক শক্তি হবে যারা, তাদের তুষ্ট করবেন ঠিক করেছেন। বস্তুত, অনেকেই খেয়াল করেছেন যে মোদীর এই বক্তব্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে আদানির মালিকানাধীন চ্যানেল এনডিটিভি সেদিন মাতামাতি করছিল স্যাম পিত্রোদার মন্তব্য নিয়ে, যে মন্তব্যের সঙ্গে কংগ্রেস একমত নয় বলে পত্রপাঠ জানায়। তারপর পিত্রোদাকে কংগ্রেসের বৈদেশিক শাখার কর্তার পদ ছাড়তেও বাধ্য করা হয় সেইদিনই। কিন্তু পরদিন এনডিটিভি যা করেছে তা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। সন্দেশখালির বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের গোপন ক্যামেরার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানোর চক্রান্ত যেদিন ফাঁস হল, সেদিন থেকে সমস্ত গোদি মিডিয়ার মত এনডিটিভিও খবরটা যথাসম্ভব চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বুধবার মোদীর ওই বক্তৃতার পরে বৃহস্পতিবার যখন রেখা পাত্রের ভিডিও প্রকাশ্যে এল, সে খবর এনডিটিভি দেখিয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।

এ কিন্তু মোদীর পক্ষে অশনি সংকেত। আদানি আর আম্বানি মিলে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকখানি দখল করে আছেন। ক্রোনি পুঁজিবাদ ভারতের সংবাদমাধ্যমেও মোদীর আমলে কাজ করেছে পুরোদমে। নিজের চা বিক্রেতার অতীত থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মত বহু নড়বড়ে সত্যের উপরে মোদীর যে বিশালকায় ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে তা সম্ভব হত না এতগুলো সংবাদমাধ্যমের শতকরা একশো ভাগ সমর্থন না থাকলে। সেই সমর্থন যদি সরতে শুরু করে, ওই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়তে বিশেষ সময় লাগবে না। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবকিছু ঘটে বড্ড তাড়াতাড়ি। নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় এক দীর্ঘ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখনো চারটে দফা বাকি, প্রথম তিন দফায় বিজেপি দারুণ ফল করবে এমনটা মোদীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না। সে ভরসা থাকলে তাঁকে মরিয়া হয়ে আম্বানি, আদানির নাম করে রাহুলকে আক্রমণ করতে হত না। এমতাবস্থায় টিভি কভারেজ কমে গেলে মোদী যাবেন কোথায়? বিশেষত জি নেটওয়ার্কের মালিক এবং মোদীর একদা ঘনিষ্ঠ সুভাষ চন্দ্র যখন আগে থেকেই চটে আছেন ফের রাজ্যসভার টিকিট না পেয়ে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে উপলক্ষে বলে বসেছেন যে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই ভাল জায়গায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, গোদি মিডিয়ার অন্যতম মুখ দীপক চৌরাসিয়াকে জি নিউজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সুধীর চৌধুরীর মত লোকও হঠাৎই মোদীর বক্তৃতার মিথ্যা দর্শকদের সামনে উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছেন। এ সময় আম্বানি, আদানিকে কেউ চটায়?

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এই যে ভারতের মত এত বড় দেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছেন দুজন পুঁজিপতি – এটাই প্রমাণ করে একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের উপরে কতখানি নির্ভরশীল। বিজেপি মুখপাত্ররা অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বলছেন – ঠিকই বলছেন – যে রাহুল উঠতে বসতে আম্বানি-আদানির চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেন, সেই রাহুলের দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই ওই দুজনের শিল্প নিজের রাজ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দ্বিচারিতা কেন? কথা হল, পুঁজিবাদ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাহায্যে এই শতকে গণতন্ত্রের ঘাড়ে এমনই চেপে বসেছে যে এই দ্বিচারিতা না করে কোনো সরকারে থাকা দলের উপায় নেই। সরকারি সম্পত্তি, সরকারি শিল্পগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকেই। সেই প্রকল্পের দ্রুততা বাড়িয়ে মোদী সরকার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই তুলে দিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। এখন যে সরকার জনকল্যাণমুখী হতে চায়, তার নিজের টাকা রোজগারের পথ এত সংকীর্ণ হয়েছে যে পুঁজিপতিদের উপরে নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তারা তা হতে দেবে না। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকে পরিষেবা দিতে সক্ষম হলে কর্পোরেটের থেকে পরিষেবা কিনবে কে? সরকারি হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে হলে, ভাল চিকিৎসা শস্তায় করে দিলে বেসরকারি হাসপাতালে কে যাবে?

সুতরাং রাহুলের আসল পরীক্ষা শুরু হবে সরকারে আসতে পারলে। এখন মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কয়েক কোটি লাখপতি তৈরি করার কথা বলা সোজা। কিন্তু মোদীর চেয়ারে বসার সুযোগ পাওয়া গেলে দলের ইশতেহারে যে গুচ্ছ গুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পূরণ করতে গেলে আম্বানি, আদানিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, বিরোধিতা হবে তাঁর নিজের দলের ভিতর থেকেও। সেসব সামলে কি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে? পারলে তা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ক্রোনি পুঁজিবাদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ এখন সব দেশেই খোঁজা হচ্ছে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে মোদীর বদলে কে – এই প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এখন অনেক দেশেরই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মনের কথা – ‘খালি চেয়ারও চলবে’

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?

ভারত জুড়ে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচন আছে অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় সব বিশ্লেষক বলছেন, ওই রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হবে মহিলাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গেও যে মহিলাদের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানতে কারোর বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ৩.৭৩ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষদের চেয়ে মাত্র ১২ লক্ষ কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের বারবার ভোটে জেতার অন্যতম কারণ মমতা ব্যানার্জির মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও জোরদার করতেই নাকি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এমন একটা রাজ্যে ভোটের সময়ে মহিলাদের গুরুত্ব সব দলের কাছেই আকাশছোঁয়া হবে। নির্বাচনী প্রচার ভরে থাকবে মহিলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত এমন একটা দেশ যে দেশে সাধারণ বুদ্ধি বিশেষ কাজে লাগে না। এখানে সারাক্ষণই অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকে। এখন যেমন পশ্চিমবঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে মহিলারাই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্যে ‘এই করব, সেই দেব, তাই বানিয়ে দেব’ বলছে বলে নয়। বরং দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল মহিলাদের সম্মানকে দড়ি টানাটানির বিষয়বস্তু করে তুলেছে বলে।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন গরীবের সম্মান নামের এক বাংলা ছবির পোস্টার লেগেছিল আমাদের হোস্টেলের পাড়ার বেশকিছু দেওয়ালে। তা দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে দেশে গরিবের কোনো সম্মান নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বহু আলোচিত মহিলাদের সম্মান সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি – দুপক্ষ থেকেই যত ফিল্মি সংলাপ ছোড়া হচ্ছে, তত পরিষ্কার হচ্ছে আসলে মহিলাদের সম্মান নয়, তাঁদের ভোটই অভীষ্ট লক্ষ্য। সন্দেশখালিতে আসলে কোনো ধর্ষণ হয়নি, বিজেপি মহিলাদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়েছে – এই মর্মে বিজেপিরই অঞ্চল সভাপতি গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোমবার এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘মেয়েদের কাছে টাকার চেয়ে শাড়ির আঁচল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। বেশি চক্রান্ত করো না। সব কিছু পরিকল্পনা (করে) করেছে।’ পালটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ‘মমতা দিদি আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। আপনি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, আপনার নাকের ডগায় হাজার হাজার বোনের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হয়েছে। কিন্তু আমি আজ বলতে চাই, সন্দেশখালিতে যে অত্যাচার করেছে, সে যদি পাতালেও লুকিয়ে থাকে… মমতা দিদি তাঁদের পাতালে লুকিয়ে রাখলেও সেখান থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকাব।’

শাহের বক্তব্যের পুরোটাই ফেনা, অতএব তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রথম বাক্য বাদ দিয়ে বাকিটা বিচার করা যাক। তাঁর বক্তব্য সত্যি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। নাগরিক ডট নেট যেহেতু বিজেপি নেতার ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তদন্ত করেনি, করার উপযুক্তও নয়, সেহেতু ওতে প্রযুক্তিগত কারিকুরি আছে কিনা তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু যেভাবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক খবরের চ্যানেলে গঙ্গাধর স্বীকার করেছিলেন – ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি উনিই এবং ওই কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল, তাতে পরবর্তীকালে স্পষ্টতই দলের নির্দেশে তিনি যে ভিডিও বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি এখানে কোনোমতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এটুকুই বলতে পেরেছেন যে তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলানো হয়েছিল। কীভাবে? প্রলোভন দেখিয়ে, নাকি ভয় দেখিয়ে? সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি তখন। এমনকি পরে বিবৃতি বদলে ফেলেও তা বলেননি, বলেছেন এতে যান্ত্রিক কারচুপি আছে। অর্থাৎ দুটো বিবৃতি পরস্পরবিরোধী। গঙ্গাধরের কথা অনুযায়ী যে ব্যক্তি এসবের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীও এই ভিডিও অসত্য – এ কথার অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। যাঁরা ধর্ষণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র তবু টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছেন, গঙ্গাধরকে ভয় দেখিয়ে তৃণমূল এসব করে থাকতে পারে। কিন্তু সে তো তাঁর বিশ্বাস। এখন কথা হল, মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন এই ভিডিও বিজেপির ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, তাহলে নির্বাচনী প্রচারে তাদের বদমাইশি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে না কেন? ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়ে একটা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা – এগুলো তো মারাত্মক অপরাধ। কেউ এই অপরাধ করেছেন জানলে স্রেফ বাদানুবাদে থেমে থাকবে কেন একটা রাজ্যের সরকার? কেনই বা যে মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, পুলিস তাঁরা কী বলছেন তা জানার চেষ্টা করবে না? একথা তো সত্যি, যে আইনত গঙ্গাধর সত্যি বলে থাকলেও প্রমাণ হয় না সব সাজানো। একজন অভিযোগকারী মহিলা কী বলছেন সেটাই বিচার্য।

এখানেই সন্দেহ হয়, সন্দেশখালিতে সত্যিই মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন কি হননি তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ততটা মাথাব্যথা নেই। তিনি শুধু রাজ্যের মহিলা ভোটারদের কাছে একথা প্রমাণ করতে চান যে বিজেপি এতই হীন একটা দল, যে মহিলাদের মানসম্মানের তোয়াক্কা করে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্যে তাঁদের দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করাতেও পিছপা হয় না। রাজ্যের আরেকটা ঘটনাতেও এই একই সন্দেহ হয় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেটাও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা।

রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছেন রাজভবনের এক অস্থায়ী কর্মচারী। হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেছেন। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে রাজ্যপাল এমন একটা কাজও করেননি যাতে তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার আন্তরিকতা বোঝা যায়। তিনি কেবল রাজভবনে পুলিসের আর মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রবেশ নিষেধ করেছেন। বিবৃতি দিয়ে বলেছেন এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত। এমন নয় যে অতীতে কখনো কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া আনন্দ বোসের মত হয়নি।

২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল পদ ছাড়তে হয়েছিল নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। কারণ রাজভবনে তাঁর যৌন কীর্তিকলাপের টেপ প্রকাশ্যে এসেছিল এবং বিরোধীরা সমস্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, যদি তিওয়ারি পদত্যাগ করতে রাজি না হন তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত। অভিযোগ ওঠার পরে আনন্দ বোসের মত বুক ফুলিয়ে চলা তিওয়ারির পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনস্বীকার্য যে অভিযোগ উঠেছে মানেই বোস অপরাধী তা নয়। অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সে তো তদন্তসাপেক্ষ, আর রাজ্যপাল পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় বোসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করাও সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পদত্যাগ করার নামটি নেই; উল্টে রাজভবনের কর্মীদেরও এ বিষয়ে শমন অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়া, পুলিসকে সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ার আদেশ করার মত ঔদ্ধত্য রাজ্যপালের আসে কোথা থেকে?

উত্তরটা খুব শক্ত নয়। তিওয়ারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সময়ে কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাজ্যপাল নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিওয়ারি অবশ্যই বুঝেছিলেন যে কেন্দ্রের সরকার তাঁর পদ বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। তাই মানে মানে কেটে পড়েন। বোস নির্ঘাত জানেন, এই অভিযোগের কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সরে যেতে বলবেন না। শুধু বোস কেন, আপনি-আমিও জানি যে যৌন অপরাধের অভিযোগ বিজেপির কাছে কোনো অভিযোগের মধ্যেই পড়ে না। তাদের সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষক বলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়, জেল থেকে বেরোবার পর মালা পরিয়ে বরণ করে। ওই দলের নেতা আট বছরের মেয়ে আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করায় অভিযুক্তদের সমর্থনে মিছিল করে। পদক জয়ী অলিম্পিয়ানরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং গ্রেফতার হন না। ঝামেলা খুব বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কুস্তি ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে তাঁরই ডানহাতকে ওই পদে বসানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় আর নির্বাচনের টিকিটটা তাঁকে না দিয়ে তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের মেয়েটার কী হাল করা হয়েছিল তাও আমরা জানি। সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদনে রূপায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তার পরিবারকে আজও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে আর ধর্ষকরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কর্ণাটকে তো বিজেপির নেতাই অভিযোগ করেছেন, প্রোজ্জ্বল রেবন্ন নামক নরকের কীটটি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন এবং জেডিএসের সঙ্গে জোটে থাকা উচিত হচ্ছে না বলেছিলেন। কেউ কান দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রধানমন্ত্রী এক বছরে একবারও মণিপুরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, কুকি মহিলাদের উলঙ্গ করে হাঁটানোর নিন্দা করতে সময় নেন আড়াই মাস, তিনি সামান্য শ্লীলতাহানির অভিযোগেই একজন রাজ্যপালকে সরতে বলবেন? যাঃ!

প্রমাণ হয়ে গেছে, বোসের অনুমান নির্ভুল। প্রধানমন্ত্রী ওই অভিযোগ ওঠার পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোটের প্রচার করে গেছেন, রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেখানকার কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানে সন্দেশখালির প্রধান অভিযুক্তের নাম শাহজাহান না হলে বা সে বিজেপির সদস্য হলে সিবিআই তদন্তের কথা হয়ত উঠত না। গঙ্গাধর সত্যি বলছেন না মিথ্যে, তা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হত না। কিন্তু এখন নির্বাচনের মরসুম, সন্দেশখালিতে বিজেপির ‘দোনো হাথ মে লাড্ডু’ হয়ে গেছে। একে হিন্দু বনাম মুসলমান বয়ান তৈরি করা গেছে (গোদি মিডিয়ার সহায়তায় দিব্যি চেপে যাওয়া গেছে যে শাহজাহানের দুই প্রধান স্যাঙাতই হিন্দু), তার উপর ভোটের বাজারে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের সামনে তৃণমূলকে নারীবিরোধী প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সত্যিই নারীর সম্মান মূল্যবান মনে করলে আনন্দ বোসকে আপাতত পদ ছেড়ে দিতে বলা হত।

কিন্তু এ তো বিজেপির সন্দেহাতীত ব্যবহার। এই ঘটনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে বলছি কেন? তার কারণ মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এই কাণ্ড নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে তিনি আগেই জানতেন। প্রশ্ন হল, জানলে আগেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে এই রাজ্যপালকে সরানোর ব্যবস্থা করেননি কেন? তাহলে কি তিনি নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? রাজভবনের কর্মচারী মহিলার অভিযোগকে কি তিনি স্রেফ বিজেপিকে মহিলাবিরোধী এবং নিজের দলকে মহিলাবান্ধব প্রমাণ করার কাজে লাগাচ্ছেন? অর্থাৎ সন্দেহ হয়, এখানেও উদ্দেশ্য সেই মহিলাদের ভোট, মহিলাদের সম্মানরক্ষা নয়।

আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দিলে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারিকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে যাবে হয়ত। যারা রাজ্যের তৃতীয় শক্তি এবং এই নির্বাচনে আরও শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার।

বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম, আর কংগ্রেস, দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই মহিলাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিকল্পনার কথা আছে। সিপিএমের ইশতেহারে ‘women’ শব্দটা আছে ৪৯ বার, কংগ্রেসের ইশতেহারে ৪০ বার। দুই দলেরই ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্যে অনেক ভাল ভাল পরিকল্পনা আছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদেরও যে কাজে লাগবে তা বলাই বাহুল্য। সিপিএম এবারে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছে। কিন্তু এখানে আমরা যে দুটো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলো সম্পর্কে দুই দলেরই অবস্থান অস্পষ্ট বা আপত্তিকর।

সন্দেশখালির শাহজাহানবিরোধী আন্দোলনে সিপিএম তথা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী নিরাপদ সর্দার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুলিস তাঁকে গ্রেফতারও করেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জি সমেত অন্যান্য বাম নেতৃত্বকে সন্দেশখালি যেতে বাধাও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির মত কেবল হিন্দু মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এমন দাবি না করে থাকলেও মহিলাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সিপিএমও সরব ছিল। কংগ্রেস ওই এলাকায় প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু তারাও ওই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন গঙ্গাধরকে নিয়ে কী করা হবে সেটা দুই দলের নেতৃত্ব কি বুঝে উঠতে পারছেন না?

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং বহরমপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ঘুরে ফিরে মমতাকেই দায়ী করেছেন। কেন তা বোঝা শক্ত। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিম বলেছেন রাজ্যের যেখানে যা কুকর্ম হয় সবেতেই হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি অথবা দুই দলই যুক্ত থাকে। বিজেপি নিজের সুবিধা করতে গিয়ে তৃণমূলের দুঃশাসনের সুবিধা করে দিয়েছে গত দশ বছরে। এ কথারই বা মানে কী? গঙ্গাধরের কথায় সিপিএম বিশ্বাস করছে, নাকি ওটা তৃণমূলের চক্রান্ত বলেই ধরছে? সত্যিই ধর্ষণ হয়নি, নাকি হয়েছিল? স্থানীয় সিপিএম জানে না সত্যিটা কী? কিছুই পরিষ্কার হল না। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা এবং দমদম কেন্দ্রের কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী যা বলেছেন তা আরও অদ্ভুত।

সেলিমের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তিনি জিমন্যাস্টের মত ব্যালান্স বিমের উপরে রয়েছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই পড়ে যাবেন, প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন। আইন এবং সহবত বলে, তদন্ত ছাড়াই কোনো মহিলার লাঞ্ছনার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার উপর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার মহিলা। তাই সেলিম ধর্ষণের অভিযোগগুলোকে এখনই মিথ্যে বলতে পারছেন না। ওদিকে গঙ্গাধরের ভিডিওটাও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা না বোঝার লোক তিনি নন। এর উপর আছে তৃণমূল ও বিজেপি, দুপক্ষই খারাপ – এই অবস্থান বজায় রাখার দায়িত্ব। সুজন যা বলেছেন তাতে আবার মনে হয় তিনি সেলিমের সঙ্গে একমত নন। তিনি নিশ্চিত জানেন যে গঙ্গাধরের ভিডিও ভুয়ো। একই পার্টির দুজন নেতা যদি এরকম প্রায় পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেন, তাহলে পার্টির মত কোনটা তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। যদি স্রেফ ভোট বৈতরণী পার হওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও এমন গোলমেলে অবস্থান কোনো দলের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।

তবে এ নিয়ে তবু বাম-কংগ্রেস কোনো একটা অবস্থান নিয়েছে। রাজভবনের কাণ্ডে তাদের অবস্থান কী তা এখন পর্যন্ত অজানা। একমাত্র বিমান বসু ‘অন রেকর্ড’ মতামত দিয়েছেন, যদি একে কোনো মতামত বলা যায় – ‘রাজ্যপালের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। সবটা না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’ অধীর চৌধুরীর রাজ্যপালকে আক্রমণ না করা তবু মেনে নেওয়া যায়। হাজার হোক তিনি কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার সময়ে রাজ্যপালদের দিয়ে কী কী করানো হয়েছে তা হয়ত তাঁর মনে আছে। তাই তিনি রাজ্যপালের খুব একটা দোষ ধরেন না। কিন্তু সিপিএম নেতাদের রাজ্যপালের প্রতি এত সম্ভ্রম কৌতূহলোদ্দীপক।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই বঙ্গ সিপিএমের নেতারা রাজ্যপালদের সম্পর্কে খুব সাবধানী হয়ে উঠেছেন। বরাবর কিন্তু এমন ছিল না। সিপিএম দল একসময় রাজ্যপাল পদটারই অবলুপ্তি দাবি করত। এবারের ইশতেহারেও লেখা রয়েছে ‘It [CPI(M)] stands for a Governor to be chosen out of a panel of three eminent persons proposed by the chief minister…’। অর্থাৎ সিপিএম চায়, রাজ্যপাল বেছে নিক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা প্রস্তাবিত তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্যানেল। কেরালার রাজ্যপালের সঙ্গে গত কয়েকমাস ধরে ধুন্ধুমার চলছে সে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের। পার্টির ছাত্র সংগঠন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছে। অথচ এ রাজ্যের সিপিএম নেতারা সেই জগদীপ ধনখড়ের আমল থেকেই রাজ্য সরকার আর রাজ্যপালের সংঘাত হলে দুপক্ষই খারাপ – একথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জ্যোতি বসু আর তাঁর প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রাজ্যের পক্ষ নিতেন। বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলোকে একজোট করে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। সারকারিয়া কমিশন অনেকটা সেই পরিশ্রমের ফসল। মোদী সরকারের আমলে যে রাজ্যপাল আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নররা সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন বারবার, সেকথা কিন্তু সিপিএমের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যন্ত লেখা হয়েছে। অথচ মমতা সরকারের সঙ্গে যতবার ধনখড়ের সংঘাত হয়েছে, সিপিএম নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দোষ যে দুজনেরই তা প্রমাণ করতে। বোস আসার পরেও প্রথম দিকে ব্যাপারটা বদলায়নি, ইদানীং অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বোস যখন গতবছর রাজনৈতিক হিংসায় আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সেলিম বলেছিলেন, এটা রাজ্যপালের কাজ নয়। রাজ্যপাল শাহের নির্দেশে বিজেপি নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এবং হিংসা চলছে অভিযোগ করে বোস বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন গতমাসে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একযোগে বলে – রাজ্যপালের এ কাজ করার এক্তিয়ার নেই।

সেসব না হয় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপার। বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে মতামত দেওয়া তো তুলনায় সহজ। যে সহবতের কারণে সেলিম সন্দেশখালির মহিলাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারছেন না, সেই সহবত অনুযায়ীই বলতে পারার কথা যে রাজ্যপালের উচিত সরে গিয়ে তদন্তের পথ করে দেওয়া। তিনি দোষী না নির্দোষ তা পরে দেখা যাবে। রাজ্যের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটারের কথা ভেবেও বাম, কংগ্রেস নেতারা এইটুকু বলে উঠতে পারছেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এসএসসি কেলেঙ্কারি: বনলতা সেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পরের ছেলে

রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি।

ছোটবেলায় এক নিকটাত্মীয়কে দেখতাম ‘গনি খান’ বলতে অজ্ঞান। তখনো আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরী কংগ্রেসের কত বড় নেতা, কোথাকার নেতা, কী তাঁর দোষ বা গুণ – সেসব জানার বয়স আমার হয়নি। এটুকু জানতাম যে তিনি কংগ্রেস নেতা এবং কংগ্রেস আমাদের শত্রু। কারণ কংগ্রেস আমলে আমার বাবাকে অন্য পার্টি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে, পরিবারের অন্যদের উপরেও দমনপীড়ন চলেছে। ফলে ওই আত্মীয়ের গনি-মুগ্ধতা দেখে রাগে ফুলতাম। একদিন আমার মা বোঝালেন ‘আরে রাগ করিস কেন? গনি খানের জন্যে চাকরি পেয়েছেন উনি। নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না?’ বড় হয়ে জেনেছি, গনি খান রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে অনেক বঙ্গসন্তানকেই রেলে চাকরি দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে বহু পরিবার আজীবন তাঁকে ভগবানের মত ভক্তি করত। তাঁর ভাইপো ঈশা খান যদি মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতেন, তাতেও ওই কাজের কিছুটা অবদান থাকবে। সেই বঙ্গসন্তানরা সকলেই কি যোগ্য ছিল? আমার আত্মীয় কি যোগ্য ছিলেন? জানি না। তখন যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, আদৌ কিছু ছিল কিনা – তাও জানি না। মোদ্দাকথা গনি খান যে বিস্তর লোককে ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন তা একটি সর্বজনবিদিত গোপনীয় তথ্য। শুনেছি কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলেও বহু পরিবার আছে যারা একসময় সোমেন মিত্র বলতে অজ্ঞান ছিল অনেকটা একই কারণে। বামফ্রন্ট আমলেও পার্টি-ঘনিষ্ঠ বলেই যে অনেকে চাকরি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদাহরণও আমার পরিচিতদের মধ্যে আছে। তারা সকলে যে অযোগ্য তা নয়, কিন্তু পার্টি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু ওসবের সঙ্গে এখন যে নিয়োগ দুর্নীতির রায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সেই দুর্নীতির কোনো তুলনা চলে না।

কেন চলে না সে ব্যাখ্যায় আসব, তার আগে বলে নিই প্রথম অনুচ্ছেদেই কংগ্রেস আমল, বাম আমলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়োগের কথা কেন বললাম। বনলতা সেনগিরি (‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’) যে কোনো আলোচনাকে লাইনচ্যুত করে। ওই বিড়ালটি প্রথম রাত্রে মেরে রাখার জন্যেই বললাম। বিচারপতিদের কলমের এক আঁচড়ে পঁচিশ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গেল যে দুর্নীতির জেরে, তার সঙ্গে অতীতে কোনো আমলে শাসকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে পাওয়া চাকরির তুলনা চলে না প্রথমত এই কারণে, যে সেখানে শাসক চাকরি বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসেনি। এখন অবধি যতটুকু আদালতে প্রমাণিত এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, তাতেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্কুলের চাকরি কেনাবেচার রাজ্যজোড়া বাজার খুলে বসেছিলেন। ও জিনিস এ রাজ্যে অভূতপূর্ব। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির সঙ্গে হয়ত তুলনা চলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মাপকাঠির প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল ধরে কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা চালু থাকলেও স্কুলশিক্ষক নিয়োগের কোনো মাপকাঠি ছিল না। স্কুলগুলো শূন্য পদ থাকলে নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিত, ইন্টারভিউ নিত, নিয়োগ করত। এই ব্যবস্থারই সুযোগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ চলত। সে রাস্তা বন্ধ করতেই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করা হয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সর্বভারতীয় নেট (National Eligibility Test) বা রাজ্যস্তরের স্লেট (State Level Eligibility Test) পরীক্ষার মত ১৯৯৭ সালে আইন করে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা (প্রথম পরীক্ষা ১৯৯৮ সালে)। অর্থাৎ রাজ্যের সব সরকারপোষিত স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য একটিই পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা এবং কমিশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে ইন্টারভিউতে পাস করলেই স্কুলের চাকরির পাকাপাকি ব্যবস্থা।

বাম আমলের শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জানত, এ রাজ্যে তাদের জন্যে আর কিছু না থাক, একটা সরকারি চাকরি আছেই – স্কুলের চাকরি। ১৯৯৮-২০১০ – এক যুগ এই পরীক্ষা হয়েছে, মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, নিয়োগ হয়েছে। যোগ্যতার যে মাপকাঠি এসএসসি ঠিক করেছিল সেটাই সঠিক কিনা, যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তারাই যে অযোগ্য তার প্রমাণ কী – এসব সূক্ষ্ম তর্ক করাই যায়। কিন্তু ওই বছরগুলোতে অমুককে টপকে তমুক চাকরি পেয়ে গেল কী করে, অমুক তমুকের থেকে কম নম্বর পেয়েছে তাও আগে চাকরি পেল কী করে – এইসব অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিস মামলা মোকদ্দমা হয়নি। অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগ করে কাউকে রাজপথে বসে থাকতে হয়নি একদিনও। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য গতবছর মার্চে বলেছিলেন যে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বাম আমলেও ৪৬,০০০ নিয়োগে অনিয়ম ছিল। তাঁদের সরকার ভদ্রতাবশত সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে যেভাবে তৃণমূল সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজনীতি করছে বিরোধীরা, তাতে এইবার মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি যা বলবেন তাই হবে। ব্রাত্যবাবু কি আজও জানাননি, নাকি মুখ্যমন্ত্রী এখনো চিরশত্রু বামেদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন? জানি না। সেইসময় ব্রাত্যবাবু বলেছিলেন ১৯৯৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে যত নিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। সেই শ্বেতপত্রই বা কোথায় গেল?

এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না
যা-ই হোক, এসএসসি পরীক্ষা চালু রেখেই কীভাবে চাকরি বিক্রির বাজার খোলা যায়, সে বুদ্ধি সম্ভবত তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। তাই ব্যবস্থাটাকেই ধসিয়ে দেওয়া হল ক্রমশ। ২০১৩-১৪ থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে, ২০১৬ থেকে অভিযোগের বন্যা। এখন যে ছেলেমেয়েরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা তারা অনেকেই ত্যাগ করেছে। এসএসসি পরীক্ষা আর কখনো সুষ্ঠুভাবে হয়ে স্কুলে তাদের চাকরি হবে বলে তারা মনে করে না। এই হতাশা নেহাত যুক্তিহীন বলা যাবে না। কারণ আজকাল নিজের ঘরে আগুন লাগার আগে পর্যন্ত কেউ কোথাও আগুন লেগেছে দেখলে গা করে না, আর স্কুলে নিয়োগের সংকট শেষ বিচারে খুব বেশি সংখ্যক পশ্চিমবঙ্গবাসীর সংকট নয়। যাদের চাকরি গেল তাদের সংকট, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সংকট, হয়ত যারা দেবে ভেবেছিল তাদের মানসিক হতাশার কারণ। আর সংকট স্কুল চালাতে নাকের জলে চোখের জলে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যাঁরা আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ের পরে আরও বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে গেছি যে অনেক স্কুলে আর কোনো স্থায়ী শিক্ষকই থাকবেন না ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা ব্যক্তিরা বরখাস্ত হওয়ার পর। অনেক স্কুলে কোনো কোনো বিষয় আর পড়ানো যাবে না শিক্ষক নেই বলে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক আর বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশীদি এই রায় দেওয়ার অনেক আগে থেকেই তো জানা যাচ্ছিল, কোথাও মাসিক তিন-চার হাজার টাকা বেতনে আংশিক সময়ের শিক্ষক চাইছে স্কুল, কোথাও আবার স্থানীয় মানুষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে – যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এসে অমুক বিষয়টা বিনামূল্যে পড়িয়ে দিয়ে যান তো ভাল হয়। স্কুলে ওই বিষয়ের শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্রছাত্রী আছে।

কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষের সমস্যা। যাঁরা পড়ান তাঁদের সমস্যা, যারা পড়ে তাদের আর তাদের বাবা-মায়েদের সমস্যা। এ নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্য টিভি বিতর্ক হয় না। আজকাল তো এতরকম সমীক্ষা হয়। কেউ যদি সমীক্ষা করে, কলকাতার সম্পাদকদের কতজনের ছেলেমেয়ে সরকারপোষিত স্কুলে পড়ে আর যাঁরা স্টুডিওতে এসে গলা ফাটান তাঁদের কতজনের সন্তান ওসব স্কুলে পড়ে – তাহলেই বোঝা যাবে কেন সান্ধ্য বিতর্ক হয় না। এবারে নির্বাচন পর্বের মধ্যে এতগুলো লোকের চাকরি গেছে তাই, নইলে রাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতদূর পাত্তা দিত সন্দেহ আছে। কলকাতা নাকি প্রতিবাদের শহর। সেখানে কয়েকশো ছেলেমেয়ে হাজার দিনের বেশি রাস্তায় বসে আছে (সকলে চাকরির দাবি করেও নয়, অনেকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দাবি করে), অথচ সরকারি স্কুলশিক্ষায় কিছু এসে যায় না এমন কজন মানুষ একবার গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানে? টিভি ক্যামেরাও পৌঁছয় কখনো সরকার বা বিরোধী পক্ষের কোনো নেতার কথায়, কি আদালতের খোঁচায় এই ইস্যু উঠে এলে তবেই। এমনকি এই ১১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা চাকরি পেয়ে যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও কোনোদিন মনে পড়েনি। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসলেন কখন? যখন রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতার দাবি উড়িয়ে দিল। তার আগে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে একটাও মিছিল করেছেন এসএসসির যুগে চাকরি পাওয়া নবীন বা তার আগের যুগে চাকরি পাওয়া প্রবীণ শিক্ষকরা? একদিনও আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে বসেছেন পথে?

২০১৯ সালে যখন ধর্মতলায় প্রায় একমাস ধরে অনশন করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা, তখন একদিন অফিস যাওয়ার পথে গিয়েছিলাম সেখানে। সেদিনও প্রবল গরম আর অদূরে ইডেন উদ্যানে আইপিএলের প্রথম খেলা। কাতারে কাতারে মানুষ ইডেনমুখো। তার মধ্যে ভরদুপুরে মুখ অন্ধকার করে শহরের একেবারে মধ্যিখানে বসেছিল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। কখনো বিমান বসু গেছেন বলে টিভি ক্যামেরা গেছে, কখনো কোনো বিজেপি নেতা গেছেন বলে গেছে। সেবার ব্যাপারটা একটু বিপজ্জনক দিকে চলে যাওয়ায় (আসলে বোধহয় সেটাও নির্বাচনের বছর হওয়ায়) শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে গিয়ে চাকরি হবে আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন। চাকরি হয়নি। কিন্তু সেকথা কে মনে রেখেছিল এতদিন? যে কোনো আন্দোলন অবশ্য এ রাজ্যে এমন প্রতিক্রিয়াই পায়। ছন্দা সাহা, রেবতী রাউত, তাপস বর – এই মানুষগুলোর কারোর মনে আছে আজ? করুণাময়ী মোড় থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে যখন রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আন্দোলনকারীদের নিয়ে গেছে পুলিস, তখন মনে করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কারণ টিভিতে দেখা গেছে, কাগজে ছবি বেরিয়েছে। ব্যাস ওটুকুই।

এখন হাজার পঁচিশেক মানুষের চাকরি গেছে শুনে প্রায় অর্ধশতক আগের বেকারত্বের হারে পৌঁছে যাওয়া দেশের কিছু মানুষ আশ্চর্য রকম খুশি। কেন খুশি জানি না। এদের অনেককেই তো বেকারত্ব নিয়ে অন্য সময়ে চিন্তিত দেখি। ওই যে অটোর পিছনে লেখা থাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ – তেমন কোনো ধর্ষকাম মানসিকতা ছাড়া এর কোনো ব্যাখ্যা নেই বলেই মনে হয়। অবশ্য যে মানুষ পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে দেখে বালতি ভরে জল নিয়ে দৌড়ে যাওয়া দূরে থাক, হায় হায় বলে আর্তনাদও করে না, সে যে ধর্ষকাম তাতে আর সন্দেহ কী? এ যুগে ক্ষেত্রবিশেষে আমরা সবাই ধর্ষকাম। সুতরাং আমাদের তৈরি রাষ্ট্র যে ধর্ষকাম হবে তা বলাই বাহুল্য। আদালত বারবার চাইলেও নিয়ামক সংস্থা কারা পাস করেছিল আর কারা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে তা ঝাড়াই বাছাই করার জন্যে প্রয়োজনীয় ওএমআর শিট জমা দেয় না। সরকার ওএমআর শিট তিনবছর রেখে দেওয়ার নিয়ম বদলে একবছর করে দেয়, তারপর বিপদ বুঝে বলে – এবার থেকে দশবছর রাখা থাকবে। আর আদালত ঝাড়াই বাছাই করা যাচ্ছে না বলে সকলেরই চাকরি খায়।

এমনিতে যে ভারতীয় আদালতে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার গতি সবচেয়ে বেশি, সেটা হল হিন্দি সিনেমার আদালত – আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় পুলিস তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারপতি সাক্ষী সাবুদ যাচাই করে রায় দিয়ে দেন। এদেশের অন্য সব আদালতই রাবীন্দ্রিক – এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না। কিন্তু এই মামলায় দেখা গেল আদালত রীতিমত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। গত ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলার একত্রে বিচার করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে অনুরোধ করেছিল। তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে যাদের চাকরি গিয়েছিল তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশও ছমাসের জন্য রদ করে দিয়েছিল, যাতে ইতিমধ্যে বিশেষ বেঞ্চ বিচারের কাজ শেষ করতে পারে। পাঁচ মাস ২১ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করে দিলেন মহামান্য বিচারপতিরা। এমন নির্দিষ্ট তারিখ মেনে দেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগের বিচারও যদি হত! বোঝা যাচ্ছে আদালতের তাড়া ছিল। এত তাড়া ছিল যে তিনবার বৈধ চাকুরেদের তালিকা দিতে বলা সত্ত্বেও যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন দিল না, তখন তার চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করানো বা বরখাস্ত করার সময় পেল না আদালত। গোটা কেলেঙ্কারিতে ক্যাবিনেটের দায় আছে বোঝা সত্ত্বেও যিনি এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তাঁকেও তখনই ধরতে বলা হল না সিবিআইকে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মামলায় ঘুষ কে বা কারা নিয়েছে তার খোঁজ পরে হবে, আগে বরখাস্ত হল যারা ঘুষ দিয়েছে তারা। সঙ্গে যারা ঘুষ দেয়নি বলে আদালতেরও বিশ্বাস, তারাও।

পরের ছেলে পরমানন্দ
বিচারকদের তাড়া থাকতেই পারে। কার রাজ্যপাল হওয়ার তাড়া, কার সাংসদ হওয়ার তাড়া তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমরা আইন-টাইনও তত বুঝি না। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ঘুষ নেওয়ার চেয়েও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ দেওয়া। আমাদের উদাসীনতা বা ধর্ষকাম মানসিকতা স্বীকার করে নিয়ে মনে করিয়ে দিই, আমরা এমন এক রাজ্যে বাস করি যেখানে কয়েক বছর আগে যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে গেলে শাসক দলের ছাত্র সংসদকে মোটা টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছিল। সেই রাজ্যে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়াকে ঠিক কতখানি অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকে দিয়ে উঠতে পারছি না। আইনে সবকিছু মোটা হরফে লেখা আছে, নীতি ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বসে সন্দেহ করা আদৌ অন্যায় নয় যে যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এমন প্রার্থী আছেন, যিনি সসম্মানে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। কিন্তু অমুক দাদা বা তমুক দিদি হয়ত ডেকে বলেছিলেন, অমুক পরিমাণ টাকা না দিলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না।

এমন কোনো মতলব না থাকলে পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এসএমএসে যোগ্য প্রার্থীদের জানানো হবে বলেছিলেন কেন? পাবলিক পরীক্ষায় কে কে পাস করেছে সে তথ্য প্রাইভেট হবে কেন? এ তো নির্বাচনী বন্ডের মত হয়ে গেল – কে টাকা দিল, কাকে টাকা দিল তা তৃতীয় ব্যক্তি যেন জানতে না পারে। শুধু যে টাকা পেল সে জানবে আর যে দিল সে জানবে। এক্ষেত্রেও যে চাকরি পেল শুধু সে-ই জানল আর যে চাকরি দিল সে জানল। নির্বাচনী বন্ডে ওই ব্যবস্থা করার পক্ষে তবু একটা অজুহাত ছিল। কোন দলকে কে চাঁদা দিচ্ছে জানলে অন্য দল দাতার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি। বরং বহু চাকরিপ্রার্থীই একবার পাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। আর এখন হাজার জোরাজুরিতেও কমিশন জানিয়ে উঠতে পারছে না যে কারা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? এ তো বড় রঙ্গ যাদু।

এই কারণেই না ভেবে উপায় নেই যে আদালতকে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সাহায্য না করার কারণ আসলে অনুত্তীর্ণরা। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জোর দিয়ে বলছেন চাকরি যাওয়া ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে মাত্র ৫,২৫০ জন অযোগ্য। অথচ ‘(বাকিরা যে প্রত্যেকে যোগ্য) সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। পুরোপুরি শংসাপত্র দিতে পারব না।’ কেন পারবেন না? ওএমআর শিট নেই বলে? কেন নেই? ঠিক ২০১৬ সালেই নিয়ম বদলে ওএমআর শিট তিন বছরের বদলে এক বছর রাখলেই চলবে এই নিয়ম করা হয়েছিল বলে? সেই নিয়ম কি করাই হয়েছিল ওএমআর শিট পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে? পুড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো কি আজকের মত পরিস্থিতির কথা ভেবে করা হয়েছিল? যদি আদালতকে ২০,৫০৩ জন যোগ্য প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেওয়া হত তাহলে তাঁদের চাকরি যেত না। যেত কেবল বাকিদের। তখন ওই হাজার পাঁচেক মানুষ সদলবলে যাঁদের হাতে টাকা দিয়েছেন তাঁদের কাছে টাকা ফেরত চাইতেন এবং ব্যাপারটা একেবারে অহিংস থাকত, এমন সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আদালতের রায়ে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অপরাধের কারবারীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থে বেঁচে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর ভাইপো, শিক্ষামন্ত্রী, এসএসসি চেয়ারম্যান – সকলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে বলতে পারছেন, এই তো আবেদন করেছি। কোনো চিন্তা নেই।

ঘটনা হল, আবেদন করলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিতই হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন নির্দেশে)। সেই বেঞ্চের রায় কি একেবারে উল্টে দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা? বড়জোর তমলুকের বিজেপি প্রার্থী, থুড়ি প্রাক্তন বিচারপতি, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ের যেমন প্রয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্যে, তেমন কিছু হতে পারে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তা হলে তৃণমূলের লাভ, না হলে বিজেপির। যাঁদের চাকরি গেল তাঁদের অবস্থা উনিশ-বিশ হবে আর যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের দুর্দশারও কোনো সুরাহা হবে না। ইতিমধ্যে যারা ঘুষ নিয়েছিল তারা হয়ত বাঙ্কার-টাঙ্কার বানাবে অথবা য পলায়তি স জীবতি উপদেশ শিরোধার্য করবে।

আর আমরা? কদিন পরেই যোগ্য, অযোগ্য, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না পাওয়া – সকলের কথাই ভুলে যাব। তারপর হয়ত একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবে। তাতে যদি রায় উল্টে যায় তাহলে যাঁদের চাকরি বেঁচে গেল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবার পরিজনের কাছে তৃণমূল স্বচ্ছ দল হয়ে যাবে; যদি হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে তাঁরা সুদ্ধ সকলের কাছে তৃণমূল চোর বলে প্রমাণিত হবে। বাংলার লক্ষ স্কুল নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল হয়ে গেলে তৃণমূলের কী, বিজেপির কী, আদালতের কী আর আমাদেরই বা কী? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর ওসব স্কুলে পড়ে না। ওগুলো না হয় কদিন পরে উঠে যাবে বা বেসরকারি হয়ে যাবে। সকলেই জানে – বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে।

অতএব ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। নির্বাচনে কে জিতল সেটাই আসল কথা।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

দেশের রাজধানী এমনিতেই রাজনৈতিক কানাকানির কারখানা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পর তো আরও বেশি। তিনি কারান্তরালে থেকেই সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সাংবিধানিক বাধা না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও কিছু করে উঠতে পারছে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক ভয়ও আছে। এমনিতেই নাকি দিল্লির মানুষ কেজরিওয়ালের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছেন। গোদি মিডিয়ার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ পোলে দেখা গেছে গতবারের মত দিল্লিতে লোকসভার সাতটা আসনের সাতটাই বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রায় অন্তর্হিত। এখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আম আদমি পার্টির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে যদি কেজরিওয়াল আরও সহানুভূতি পেয়ে যান! তাই ও পথে এখনো যায়নি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কেজরিওয়ালের আপ্ত সহায়ককে বহু পুরনো মামলা দেখিয়ে বরখাস্ত করা, খালি পদে অফিসার নিয়োগ না করা, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে দিয়ে মন্ত্রিসভাকে ব্যতিব্যস্ত করা ইত্যাদি ঘুরপথেই হয়রান করছে। কানাকানির কারখানা বলছে, দল গঠনের সময় থেকে কেজরিওয়ালের সঙ্গে থাকা কোনো এক ওজনদার আপ নেতা নাকি দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। ইতিমধ্যেই কেজরিওয়ালের মন্ত্রিসভার এক সদস্য পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসাবে যা দেখিয়েছেন তা ২০২১ সালে দলে দলে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক নেতা যা বলেছিলেন তার কাছাকাছি। যদিও ইনি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেননি। ওদিকে আপের আরেক তরুণ এবং প্রভাবশালী নেতা রাঘব চাড্ডা বহুদিন হল বেপাত্তা। বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়াকে বিয়ে করার পর থেকে তিনি আমেরিকায় না ইউরোপে, কেউ জানে না। বস্তুত, দলের এই সংকট মুহূর্তে আপের দশজন রাজ্যসভার সাংসদের মধ্যে সাতজনই নীরব। কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পরে আপ নেত্রী আতিশী মারলেনা দাবি করেছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে এবং আরও কয়েকজন আপ নেতাকে গ্রেফতার করার ফন্দি এঁটেছে। শুক্রবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার তালে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, গোটা দলটাকেই তুলে দেওয়ার অভিলাষ পোষণ করছে বিজেপি। কেবল আপ নয়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, একথা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না যে দেশে অন্য কোনো দল থাকুক তা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল চায় না।

সবচেয়ে বেশি রাজ্যে বিজেপির লড়াই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাই আয়কর বিভাগকে দিয়ে বহু পুরনো রিটার্নে অসঙ্গতি দেখিয়ে নোটিস পাঠিয়ে তাদের টাকাপয়সা খরচ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইনি পথে আবেদন করে লাভ হয়নি। পরে বোধহয় ব্যাপারটা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অসন্তোষ প্রকাশ করায় সরকারের জ্ঞান হল যে এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাই আপাতত আয়কর বিভাগ জানিয়েছে তারা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। কংগ্রেসের পর বিজেপির সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্যই আপ। তারা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে পরপর দুবার বিজেপিকে দুরমুশ করার পর পাঞ্জাবেও ক্ষমতায় এসেছে। আরও মুশকিল হল, দিল্লিতে তবু আপকে লোকসভায় বিজেপি পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। পাঞ্জাবে আপ অল্পদিনের মধ্যেই প্রবেশ করে ক্ষমতায় পৌঁছে গেল। ওদিকে বিজেপি বহুবছর চেষ্টা করেও এখন ভোঁ ভাঁ হয়ে গেছে। এমনকি মোদী সরকারের কৃষকবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে দীর্ঘদিনের সঙ্গী পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দল, শিরোমণি অকালি দলও বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছে। অতি বড় বিজেপি সমর্থকও জানেন, লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবে বিজেপি শূন্য ছাড়া কিছুই পাবে না। তাই আপ হল দ্বিতীয় লক্ষ্য।

আপের দুই, তিন এবং চার নম্বর নেতা মনীশ সিসোদিয়া, সত্যেন্দ্র জৈন এবং সঞ্জয় সিংকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা হয়েছে। মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। সঞ্জয়কে জামিন দেওয়ার পিছনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অন্যতম যুক্তি ছিল সেটাই। এত সবেও আপ অনড় দেখেই হয়ত একেবারে এক নম্বর নেতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেজরিওয়াল পদত্যাগ করলেই আপের বাকি নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করা হবে। তারপর একই কায়দায় পাঞ্জাবের সরকারকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। আগেই এ চেষ্টা ঝাড়খণ্ডে করা হয়েছিল, কিন্তু সাফল্য আসেনি। এখন এভাবে দুটো রাজ্যের সরকার ফেলে দেওয়া গেলে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, তেলেঙ্গানার রেবন্ত রেড্ডি, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির মত সমস্ত বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করে সরকার ফেলে দেবে বিজেপি। অর্থাৎ এক দেশ এক নির্বাচন তো পরের কথা, ২০২৪ লোকসভাতেই এক দল এক নির্বাচন সম্ভব হবে। অতজন নেতা গ্রেফতার হয়ে গেলে নির্বাচনের প্রচার করবে কে আর সংগঠন চালাবে কে? হতোদ্যম বিরোধী দলগুলোকে দেখে ভোটই বা দেবেন কোন ভোটার? তাঁদের মধ্যেও কি আতঙ্ক কাজ করবে না?

বলা যেতেই পারে, কেজরিওয়ালের পদত্যাগ না করাকে সমর্থন করতে গিয়ে সৌরভ কষ্টকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের মনে। সত্যিই ওরকম একনায়কতন্ত্র মোদীর লক্ষ্য হলে আদৌ নির্বাচন করাচ্ছেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব সোজা। আজকের একনায়করা কেউ একনায়ক তকমাটা পছন্দ করেন না। তাঁরা চান একনায়কের লাগামহীন ক্ষমতার সঙ্গে গণতন্ত্রের গ্ল্যামার। একজন শাসক ধর্মে মুসলমান বা রাজনীতিতে কমিউনিস্ট না হলে বাকি পৃথিবীর কাছে গণতান্ত্রিক বলে পরিচিতি পাওয়া খুব কঠিনও নয়। তাই তুরস্কের রচপ তায়িপ এর্দোগান বা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও নিজের দেশে নির্বাচন করান, আর বিশ্বগুরু মোদী করাবেন না?

কোনো দেশে একনায়কের জন্ম হঠাৎ করে হয় না। পরিবারে, সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একনায়কত্বের প্রতি সমর্থন তৈরি না হলে একটা বিরাট গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতায় একনায়ককে চাইবেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই, ভারতে পরিবার থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস পর্যন্ত সর্বত্র একনায়করা বিচরণ করে। তেমন একজন বসের অধীনে কাজ করার সময়ে আমার এক তিতিবিরক্ত সহকর্মী একটা মন্তব্য করেছিলেন, যা বিজেপি-আরএসএসের ক্ষেত্রে দারুণ লাগসই। ‘বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?’ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

সেই দলগুলোর কথা আজ স্মরণ করা জরুরি। কারণ ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি রাতারাতি এতখানি শক্তি সঞ্চয় করেনি। বহু রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক, এবং তার চেয়েও বড় কথা সামাজিক স্বীকৃতি পাইয়ে দিয়েছে এই দলগুলো। নইলে সংঘ পরিবারের নানা সামাজিক সংগঠনের ৩৬৫ দিনের কাজ সত্ত্বেও এত নির্বাচনী সাফল্য সম্ভব হত কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কোন দলগুলোর কথা বলছি? আসুন, একেবারে ভারতের মানচিত্রের উপর দিক থেকে শুরু করা যাক।

ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি
ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীর উপত্যকার সুপ্রাচীন দল। কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লার। স্বাধীন ভারতে তিনি, তাঁর ছেলে ফারুক এবং নাতি ওমর – তিনজনেই দলের নেতা হিসাবে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৯৬ পর্যন্ত ফারুক ছিলেন বিজেপির সোচ্চার সমালোচক। অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীর হয়ত মনে আছে, ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বামপন্থীদের উদ্যোগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী ফ্রন্টের যে সমাবেশ হয়েছিল, তাতে ফারুক বিজেপির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর দল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারকে সমর্থন দেয়। তখন ফারুকের দল কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন।

কাশ্মীরের রাজনীতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হল মুফতি মহম্মদ সঈদ প্রতিষ্ঠিত দল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)। ১৯৮৯ সালে জনতা দল নেতা ভি পি সিংয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রে যে সরকার হয়েছিল সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুফতি সাহেব (এ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মুসলমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)। সেই সরকারের প্রতি বিজেপিরও সমর্থন ছিল বটে, কিন্তু সে ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা সরকার। বামপন্থীরাও সেই সরকারকে সমর্থন করেছিল। উপরন্তু রামমন্দিরের দাবিতে রথযাত্রায় বেরনো লালকৃষ্ণ আদবানিকে বিহারের লালুপ্রসাদ (তখন জনতা দলেই) সরকার গ্রেফতার করলে বিজেপি ভিপির সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এছাড়া পিডিপির কখনো বিজেপির সঙ্গে সখ্য হয়নি। বরং মুফতি নিজে সুদূর অতীতে যেমন ন্যাশনাল কনফারেন্সে ছিলেন, তেমনি কংগ্রেসেও ছিলেন। কিন্তু সেই মুফতিই ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তারপর মুখ্যমন্ত্রী হন তাঁর মেয়ে মেহবুবা। বিজেপি সেই সরকার ফেলে দেয় ২০১৮ সালের ১৯ জুন।

তারপর থেকে কাশ্মীরের মানুষ কীরকমভাবে বেঁচে আছেন আমরা সবাই জানি। এই দুই দলের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে দেওয়ার পরে গোটা কাশ্মীরকে যখন জেলখানা করে তোলা হয়েছিল, তখন আবদুল্লা বা মুফতিরা বিজেপিসঙ্গের ইতিহাস থাকার জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি। তাঁদেরও গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এখন ফারুক-ওমরের মত মেহবুবাও ঠুঁটো জগন্নাথ। দুই দলেরই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুই দলই ইন্ডিয়া ব্লকের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী জোট তৈরি করার প্রশ্নে দুপক্ষই অনড়। ফলে কাশ্মীরের চারটে লোকসভা আসনে দুই দলই প্রার্থী দিয়ে বসে আছে।

শিরোমণি অকালি দল
ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম পাঞ্জাবের এই আঞ্চলিক দল। দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় সংযোগ এবং পাঞ্জাব রাজ্যের গঠনেও গুরুতর ভূমিকা থাকায় এই দলের পাঞ্জাবে বিপুল সমর্থন ছিল দীর্ঘকাল। এই দলও প্রয়াত প্রকাশ সিং বাদলের নেতৃত্বে বিজেপির জোটসঙ্গী হয়েছিল সেই ১৯৯৬ সালেই, অর্থাৎ বাজপেয়ী সরকারের আমলে। পরিণতি কী?

পাঞ্জাবি পরিচিতি এবং পাঞ্জাবিদের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখাই যে দলের মতাদর্শ, নরেন্দ্র মোদীর আমলে তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক আন্দোলনের সময়ে সেই দলের অবস্থা হয়েছিল শ্যাম রাখি না কুল রাখি। শেষমেশ তারা কুল রাখারই সিদ্ধান্ত নেয়। নেত্রী হরসিমরত কৌর বাদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর দল এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিজেপি কিন্তু চেয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে আবার জোট হোক। অকালি দল পাত্তা দেয়নি। তারা বড় দেরিতে বুঝতে পেরেছে যে বিজেপি অন্য দলের ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে ওঠায় বিশ্বাসী। বিজেপির সঙ্গে থাকায় যা হয়েছে তা হল পাঞ্জাবিদের স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসাবে বাদল পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। পাঞ্জাবের কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়লেও ফাঁক ভরাট করতে ঢুকে পড়েছে আপ। এখন শিরোমণি অকালি দল ভুগছে অস্তিত্বের সংকটে।

বহুজন সমাজ পার্টি
দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরেও ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যও বটে। কারণ এই রাজ্যেই অযোধ্যা, কাশী, মথুরা। রাম না থাকলে যেমন রামায়ণ লেখা হত না, তেমনি এই জায়গাগুলো না থাকলে সারা ভারতের হিন্দুদের মনে খতরার ধারণা তৈরি করাও সম্ভব হত না সংঘ পরিবারের পক্ষে। বাবরি মসজিদ বাঁচাতে সমাজবাদী পার্টির সরকার গুলি চালাল, কিছু মানুষের মৃত্যু হল – তবে না রণহুঙ্কারে পরিণত হল ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ স্লোগান? এই সংঘর্ষে মতাদর্শের দিক থেকে ভাবলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংঘ পরিবারের বিপক্ষেই থাকার কথা ছিল আম্বেদকরপন্থী কাঁসিরামের হাতে তৈরি বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি)। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট সরকার চালানোর পর কাঁসিরামের উত্তরাধিকারী মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে ১৯৯৫ সালের ২ জুন সমর্থন প্রত্যাহার করেন। কী আশ্চর্য! ঠিক পরদিনই বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন করেন মায়াবতী। সেই থেকে বহুজন সমাজ পার্টির চিরশত্রু হয়ে যায় সমাজবাদী পার্টি, বিজেপি নয়। যদিও বিজেপি তাঁর সরকারকে সে বছরের অক্টোবর মাসেই ফেলে দেয়। তারপরেও তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মায়াবতী, এমনকি ফের বিজেপির সমর্থনেও। শুধু ২০০৭-১২ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ কাটাতে পেরেছিলেন।

ভারতের আর পাঁচটা দলের মত মায়াবতীর দলের বিরুদ্ধেও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কিন্তু তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বে উত্তরপ্রদেশে যে নেহাত খারাপ উন্নয়ন হয়নি তাও স্বীকার করেন অনেক বিরোধী। তবু আজ ‘বহেনজি’ উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে গেছেন। জাতপাতের সমীকরণ ভেঙে দিয়ে যে অভিন্ন হিন্দু পরিচিতি তৈরি করার রাজনীতি বাজারে এনেছে মোদী-অমিত শাহ-যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি, তাতে মায়াবতীর চিরাচরিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলমান ভোটাররা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। স্পষ্টতই বিজেপির সঙ্গে জোট করে লাভ হয়েছে বিজেপির, বিএসপির নয়। দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে হাতিয়ার করে একদা ভারতীয় রাজনীতির দাপুটে নেত্রী মায়াবতীকে এতটাই নখদন্তহীন করে দেওয়া গেছে যে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর দলের সাংসদ দানিশ আলিকে মুসলমান বলে যা খুশি গালাগালি দিয়ে গেলেন বিজেপির রমেশ বিধুরী। বহেনজি রা কাড়লেন না। স্বভাবতই দানিশ সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতী কী আশায় একলা লড়ছেন তা কেউ জানে না। কংগ্রেস কিন্তু তাঁকে ইন্ডিয়া ব্লকে যোগ দিতে ডেকেছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস
উপরে উল্লিখিত কাশ্মীরের দল দুটো যদি বলে বিজেপির হাত ধরা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না, তাহলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সেই জওহরলাল নেহরুর আমলে অন্যায়ভাবে শেখ আবদুল্লাকে কারারুদ্ধ করার সময় থেকেই দিল্লিতে যে দলের সরকারই থাক, শ্রীনগরের সরকারকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়নি (অনুচ্ছেদ ৩৭০ কাশ্মীরিদের অধিকারের চেয়ে বাকি ভারতের কাছে বদনাম দিয়েছে বেশি)। একাধিক মহলের মতে কাশ্মীরের মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকারের কারচুপি করা নির্বাচন। শক্তি সামন্তের কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) দেখে যে কাশ্মীরকে চেনা যায়, আসল কাশ্মীর যে তার চেয়ে বিশাল ভরদ্বাজের হায়দর (২০১৪) ছবিরই বেশি কাছাকাছি তা বুঝতে কয়েকশো বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে হয় না। চোখ, কান আর মন খোলা রাখলেই বোঝা যায়। তাই মেহবুবা যখন সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুরকে বলেন যে বিজেপির সঙ্গে জোট করার তিনি বিরোধী ছিলেন এবং বাবা মুফতি তাঁকে বলেন, এটা না করে কোনো উপায় নেই – তখন তাঁকে বিশ্বাস করা যায়। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করছে, মুফতি ভুল ভাবেননি। বাজপেয়ী সরকারের আমলেও কার্গিল যুদ্ধ বাদ দিলে কাশ্মীর যে মোটামুটি শান্ত ছিল সে হয়ত ন্যাশনাল কনফারেন্স ওই সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল বলেই। অন্য দুটো দল, অর্থাৎ শিরোমণি অকালি দল আর বহুজন সমাজ পার্টি কিন্তু এই যুক্তি দিতে পারে না। তবে উভয়ের রাজনীতিরই জন্ম কংগ্রেসবিরোধিতা থেকে। ভারতের আরও অনেক রাজ্যের আঞ্চলিক দলেরই তাই। তৃণমূল কংগ্রেস এই তালিকায় সম্ভবত একমাত্র দল যাদের ইতিহাস উলটো।

এই দলের জন্ম কংগ্রেস ভেঙে এবং মূল রাজনীতি বামবিরোধিতা। নিম্নবর্গীয় মানুষের জন্য সামাজিক ন্যায়ের দাবি বা বাঙালি পরিচিতি সত্তাও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের কারণ নয়। যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করছিলেন কংগ্রেস যথেষ্ট বামবিরোধিতা করছে না, তাই তিনি ক্রমশ জঙ্গি আন্দোলনের পথ নেন। তা নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাত আর অজিত পাঁজার মত কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতার সমর্থন লাভই তৃণমূলের জন্মের কারণ। জনশ্রুতি হল, তাতেও তৃণমূলের জন্ম হত না কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থন না থাকলে। কিন্তু জনশ্রুতির কথা থাক, যা সর্বসমক্ষে আছে তা নিয়েই আলোচনা করি। শেষপর্যন্ত মমতার যা ঘোষিত একমাত্র এজেন্ডা – বামফ্রন্ট সরকারের অপসারণ – প্রায় এক যুগ বিজেপির হাত ধরেও বাস্তবায়িত করা যায়নি। বরং সেই পর্বে তৃণমূলকে ২০০৪ লোকসভা এবং ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের হাত ধরেই ২০১১ সালে মমতার লক্ষ্যপূরণ হয়।

কিন্তু মমতার সঙ্গে জোট করে বিজেপির নিঃসন্দেহে লাভ হয়েছে। কখনো পশ্চিমবঙ্গের এই কোণে, কখনো ওই কোণে একটা কি দুটো বিধানসভা আসন জেতা বিজেপি এ রাজ্য থেকে সাংসদ পেয়েছে ওই জোট তৈরি হওয়ার পর। ২০১১ সালের পর থেকে কেবল বিজেপির নয়, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের সংগঠনও বেড়েছে হু হু করে। দক্ষিণবঙ্গে কংগ্রেস ক্রমশ তৃণমূলে মিশে গেছে, সরাসরি সংঘাতে বামপন্থীরাও এঁটে উঠতে পারেনি শাসক দলের সঙ্গে। এত বড় শূন্যতা ভরাট করে আজ পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। এ রাজ্যের রাজনীতিতে যা বছর বিশেক আগেও অভাবনীয় ছিল, আজ ঠিক তাই ঘটছে। বহু আসনে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটাররা।

কেউ বলতে পারেন, বিজেপির লাভ হয়েছে না হয় বোঝা গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষতি হল কোথায়? বিলক্ষণ ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার রাজপথ তৈরি হয়ে গেছে। ফলে কখন কোন ঘটনার ভিত্তিতে, কোন প্রলোভনে বা আতঙ্কে দলটা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে তা মমতা নিজেও সম্ভবত জানেন না। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যাঁরা ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না’ বলে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁদের যুক্তি না হয় বোঝা গেল। তাঁরা যে কোনো মূল্যে জয়ী দলে থাকতে চান, তৃণমূল হেরে গেলে ফিরতেন না। কিন্তু মমতা যে তাঁদের ফিরিয়ে নিলেন, এ থেকে কি প্রমাণ হয় না যে তাঁর ঘর আসলে তাসের ঘর? ক্ষমতার ঠেকনা দিয়ে খাড়া রাখা হয়েছে, সরিয়ে নিলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে? মুকুল রায় যে শ্রডিংগারের বেড়ালের মত বিজেপিতেও আছেন আবার তৃণমূলেও আছেন হয়ে থেকে গেলেন – তাও কি এটাই প্রমাণ করে না যে তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, একটা তাস এদিক ওদিক হলেই বাকিগুলো ভেঙে পড়বে? এমন নড়বড়ে সরকার চালাতে কি মমতা পছন্দ করেন? কোনো নেতারই কি পছন্দ করার কথা? ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

বিজেপি প্রধান বিরোধী হয়ে যাওয়ায় শাসক হিসাবে তৃণমূলের কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই হয়েছে। যেমন, বিধানসভায় কাজের বিতর্ক প্রায় হয়ই না। রাজ্য সরকারের কাজ নিয়ে বিরোধী দলনেতা যত কৈফিয়ত চান সবই বিধানসভা ভবনের বাইরে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে। তাছাড়া রাজ্য রাজনীতির আলোচ্য বিষয়গুলোই এমন হয়ে গেছে যাতে কাজের কাজ না করলেও চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা প্রায় বন্ধ। বাজেটেও কেবল চালু ভাতাগুলোর টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে দিলেই চলে যায়। অযোধ্যার মন্দিরের পালটা দীঘার মন্দিরের কথা হয়। ইমাম ভাতায় কেউ চটে গেলে পুরোহিত ভাতা দিলেই যথেষ্ট। রামনবমীর বিপরীতে বজরংবলী পুজো হয়। তাতেও কাজ হচ্ছে না বুঝলে রামনবমীতে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। তারপরেও খোঁজ করতে হয়, চিরশত্রু বামেরা কত ভোট পাবে। এত নড়বড়ে, পরনির্ভরশীল, তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৬ সালেও ছিল না। এই কারণেই ইন্ডিয়া ব্লকে মমতা ছিলেন বটে, কিন্তু এখনো আছেন না নেই, তা দেবা ন জানন্তি।

এখানে একটা মজার কথা স্মর্তব্য। বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। বহু বছর পরে দেখা যায়, আজীবন কংগ্রেসি হলেও আরএসএস তাঁকে রীতিমত শ্রদ্ধা করে। নিজেদের অনুষ্ঠানে বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়, তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বক্তৃতাও দিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে বিজেপির সরকার তাঁকে ভারতরত্ন পুরস্কারও দেয়।

জনতা দল ইউনাইটেড
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আর যা-ই ঘটে যাক না কেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠবেই আর নীতীশ কুমারই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। ব্যাপার কতকটা এরকমই দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াত না, যদি মণ্ডল রাজনীতির সন্তান, লালুপ্রসাদের এক সময়কার সতীর্থ নীতীশ বারবার বিজেপির সঙ্গে ঘর না করতেন। বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতে আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও একসময় তাঁর আশঙ্কা হল, নিজের চেয়ার বাঁচাতে গিয়ে দলটা চলে যাচ্ছে বিজেপির পেটে। তাই পালটি খেয়ে পুরনো বন্ধু লালু, পুরনো শত্রু কংগ্রেস আর বামপন্থীদের সঙ্গে জোট করে মুখ্যমন্ত্রী রইলেন। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। তবে বোধহয় এবার আরও বড় স্বপ্ন ছিল। তাই উদ্যোগ নিয়ে বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে একজোট করে ইন্ডিয়া ব্লক তৈরি করলেন। তাঁর প্রবীণতাকে সম্মান দিয়ে সকলে আহ্বায়ক হিসাবে তাঁকে মেনেও নিল। তারপর ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’, নীতীশ হঠাৎ একদিন সকালে আবার এনডিএ-তে ফিরে গেলেন। বিকেলবেলা নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে গেলেন।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তেজস্বী বন্ধুপুত্রের তেজ সহ্য হল না, নাকি রাহুল গান্ধী যেমন বলেছেন – ইডি, সিবিআই বা আয়কর বিভাগের ভয়ে নীতীশ এমনটা করলেন, তা হয়ত ভবিষ্যতের কোনো ঐতিহাসিক খুঁজে বার করবেন। তবে সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন, বিহারের মানুষের কাছে নীতীশের এবং তাঁর দলের আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই। লোকসভায় যা ভোট পাবেন সে-ও মোদীর কল্যাণে, আর আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নাকি তাঁর দলকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। এতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে নীতীশ বহু ভাল কাজ করেছেন তা বিরোধীরাও অস্বীকার করেন না। কিন্তু সেসবই নাকি এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে ভোটারদের কাছে। সম্ভবত নীতীশও তা জানেন, নইলে কেবলই সঙ্গী খুঁজে হয়রান হবেন কেন? একলা লড়তে ভয় পাবেন কেন?

বিজু জনতা দল
বিজু পট্টনায়ক ওড়িশার প্রবাদপ্রতিম নেতা। একসময় কংগ্রেসে ছিলেন, পরে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সংঘাতে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, জনতা পার্টিতে যোগ দেন, পরবর্তীকালে জনতা দলে। ওড়িশার এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে নবীনই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজুর নামাঙ্কিত দলের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা। তিনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং শোনা যায় ওড়িয়া ভাষায় ভাল করে কথাও বলতে পারেন না। তবু ওড়িশা রাজ্যটাকে এই শতকের শুরু থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রায় বিরোধীশূন্য অবস্থায়। কংগ্রেস ফিকে হয়ে গেছে, বিজেপি সেই জায়গায় উঠে এসেছে। উঠে আসার পিছনে নবীন স্বয়ং। ১৯৯৭ সালে জনতা দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেই তিনি এনডিএ-তে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়ে যান। ওড়িশায় ক্ষমতা দখলও করেন বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেই। ২০০৯ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে এনডিএ ত্যাগ করলেও সংসদে বড় বড় ইস্যুতে নবীনের দলের সাংসদরা কখনো বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেননি। জাতীয় রাজনীতি নিয়ে নবীন প্রায় কথাই বলেন না। বিজেপিও, কোনো অজ্ঞাত কারণে, অন্যান্য রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার জন্যে যতখানি আক্রমণাত্মক হয়েছে, ওড়িশায় আজও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বা দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে বলেও চট করে শোনা যায় না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ওড়িশা সরকার আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেছে। তবে ওড়িশায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে শিল্প-টিল্প দিব্যি হয়, স্কুলে মিড ডে মিল দেওয়ার টাকা থাকে না, শিক্ষকরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না, তা নিয়ে আন্দোলনও করেন। এদিকে সরকার ভুবনেশ্বরে ঝাঁ চকচকে হকি স্টেডিয়াম বানায়, ভারতীয় হকি দলের স্পনসর হয়। অন্যান্য অবিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন হলে গোদি মিডিয়া সে রাজ্যের সরকারকে তুলে আছাড় মারে। ওড়িশাকে কিন্তু দেখতেই পায় না। ওই রাজ্যে লোকসভার বছরেই বিধানসভা নির্বাচন হয়। ২০১৪ আর ২০১৯ – দুবারই দেখা গিয়েছিল বিধানসভায় বিজেডি হইহই করে জিতেছে আর লোকসভায় বিজেপি বেশ কয়েকটা আসন পেয়েছে।

এতদিন এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চালিয়ে হঠাৎ এবার ভোটের আগে কোনো কারণে নবীন বুঝতে পেরেছেন, তাঁর অজান্তেই তাঁর রাজ্য বিজেপির গ্রাসে চলে যাচ্ছে। তাই আসন সমঝোতার কথাবার্তা চালিয়েও শেষ মুহূর্তে আলাদা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নেতাদের বিজেপি গমন কিন্তু ঠেকাতে পারেননি। নবীনের দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং অন্যান্য নেতা বিজেপিতে চলে গেছেন। তার মধ্যে একজন ছবারের সাংসদ, আরেকজন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত আদিবাসী নেত্রী। ভোটের ফল বেরোলেই বোঝা যাবে নবীন ঘর সামলাতে পারলেন, নাকি নীতীশের মত অবস্থা হল।

তেলুগু দেশম, ওয়াইএসআর কংগ্রেস
ব্রিগেডের যে সভায় ফারুক আবদুল্লা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই সভায় চন্দ্রবাবু নাইডুও ছিলেন। তেলুগু দেশমের জন্মও কংগ্রেসবিরোধিতার মধ্যে দিয়ে, ইন্দিরার আমলে। জন্মদাতা ছিলেন চন্দ্রবাবুর শ্বশুরমশাই, তেলুগু সিনেমার এককালের জনপ্রিয় নায়ক, এন টি রামারাও। তাঁর মতই চন্দ্রবাবুও জাতীয় স্তরে তৃতীয় শক্তির অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রে বাজপেয়ীর পাকাপোক্ত সরকার হতেই চন্দ্রবাবুর কংগ্রেসবিরোধিতা বিজেপিবিরোধিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া তিনিও নবীনের মত ‘উন্নয়নমুখী’ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন কেন? বিশ্বায়নের প্রথম যুগে শহরে মাখনের মত রাস্তা আর গাদা গাদা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকেই যারা উন্নয়ন মনে করে তাদের মতে দেশের সেরা মুখ্যমন্ত্রীদের একজন ছিলেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু সে মলাট ছিঁড়তে বেশি সময় লাগেনি। অন্ধ্রের গ্রামে যে উন্নয়নের আলো বিশেষ পৌঁছয়নি তা বোঝা যায় ২০০৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। তার একবছর আগেই একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচেছেন। পিপলস ওয়ার ল্যান্ডমাইন পেতে রেখেছিল তাঁর জন্যে।

২০১৪ সালে তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফেরেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় কেন্দ্র অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়ায়। ২০১৯ সালে চন্দ্রবাবুর তেলুগু দেশম কংগ্রেস এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে হেরে যায় জগন্মোহন রেড্ডির নতুন দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের কাছে।

জগনের উত্থানও কংগ্রেসের বিরোধিতা করেই। অবিভক্ত অন্ধ্রে চন্দ্রবাবুর পরেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি। ২০০৯ সালে কপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। জগন সোজা বাবার চেয়ারে বসতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড সে গুড়ে বালি দেওয়ায় নিজেই দল খুলে ফেলেন। ইনিও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার লোক নন। তাই বিজেপির সঙ্গে জোট না থাকলেও বেশ মিষ্টিমধুর সম্পর্ক ছিল। সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিলের ভোটাভুটিতে জগনের দল সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়ে এসেছে। অন্ধ্রে বিজেপি এখনো ক্ষমতাসীন দলকে চিন্তায় ফেলে দেওয়ার মত শক্তি নয়। সেখান থেকে তাদের কোনো সাংসদ নেই। অনেকে ভেবেছিলেন বিজেপি তুলনায় শক্তিশালী জগনকেই এনডিএ-তে চাইবে। কিন্তু সকলকে অবাক করে কদিন আগেই দুর্নীতির মামলায় হাজতবাস করা চন্দ্রবাবুকে বেছে নিয়েছে বিজেপি, সঙ্গে থাকছে জন সেনা পার্টি।

চন্দ্রবাবু এনডিএ-তে ফিরে যাওয়ার যুক্তি হিসাবে বলেছেন, জগনের অপশাসন থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য লাগবে। বিজেপি কেন জগনকে হতাশ করে তাঁকে বেছে নিল তা খোলসা করেনি। হতে পারে রাজ্য সরকার তাঁকে হাজতবাস করানোয় তিনি ভোটারদের সহানুভূতি পাবেন বলে বিজেপির বিশ্বাস। তবে এতে যা হল, তা হচ্ছে এতদিন সুসম্পর্ক বজায় রাখায় জগনের বিজেপির প্রতি আক্রমণ ভোঁতা হয়ে গেল। অন্যদিকে চন্দ্রবাবু ভাল ফল করলেও বিজেপির অবাধ্য হতে পারবেন না।

ভারত রাষ্ট্র সমিতি
তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হওয়ার পিছনে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (এখন ভারত রাষ্ট্র সমিতি) এবং তাদের সর্বোচ্চ নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সুবাদে পরে তারা তেলেঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচন জেতে এবং কেসিআর মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে তার আগেই ২০০৯ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রের ভোটে তেলুগু দেশম ও বিজেপির সঙ্গে জোট করেছিল বিআরএস। যদিও রাজ্য আলাদা হওয়ার আগে দলটা বলার মত নির্বাচনী সাফল্য পায়নি। বিজেপি কিন্তু কেসিআরের হাত ধরে ঢুকে পড়তে পেরেছে ওই রাজ্যে। ২০২০ সালে রাজধানী হায়দরাবাদের পৌর নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। তখন মনে করা হয়েছিল তেলেঙ্গানায় বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজেপি ক্ষমতা দখল করবে। শেষপর্যন্ত তা হয়নি এবং কংগ্রেস অনেক পিছন থেকে শুরু করেও জয়ী হয়। তবে বিজেপির ভোট শতাংশ আগেরবারের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রশান্ত কিশোরের মত কেউ কেউ আবার মনে করছেন, লোকসভায় তেলেঙ্গানায় দুই বা এক নম্বরে থাকবে বিজেপি। স্পষ্টত, নিজেদের রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, বিজেপিকে বিশেষ আক্রমণ না করার সুবিধা বিআরএস পায়নি। বিজেপিই পেয়েছে।

জনপ্রিয় সাংসদ বন্ডি সঞ্জয় কুমারকে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য বিজেপির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভোটের সপ্তাহখানেক আগে কংগ্রেস নেতাদের বাড়িতে ইডি হানা থেকে অনেকেরই সন্দেহ হয়েছিল যে বিজেপি বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে না। চাইছে কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা আটকাতে। একে বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

শিবসেনা, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি
শোলে ছবির জয় আর বীরুর বন্ধুত্ব কোনোদিন ভেঙে যেতে পারে একথা কল্পনা করাও কঠিন। তার চেয়েও কঠিন ছিল বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার বিচ্ছেদ কল্পনা করা। কিন্তু সেটাও হয়ে গেল মহারাষ্ট্রে গত বিধানসভা নির্বাচনের পর। সংঘ পরিবারের বাইরে বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত এই দলটার সঙ্গেই বিজেপির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাবনার মিল ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে রামমন্দির আন্দোলন থেকে শুরু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি – সমস্ত আদর্শগত ব্যাপারেই শিবসেনার সমর্থন উপভোগ করে এসেছে বিজেপি। মহারাষ্ট্রে একসঙ্গে সরকারও চালিয়েছে। কিন্তু ঠাকরের মৃত্যুর পর দলের কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর ছেলে উদ্ধব আর ভাইপো রাজের মধ্যে কোন্দলে সব গোলমাল হয়ে গেল। দেখা গেল হাবভাবে, আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় বালাসাহেবের সঙ্গে তাঁর ছেলের চেয়ে ভাইপোরই মিল বেশি। উদ্ধব তুলনায় নরম। কিন্তু বিস্তর দড়ি টানাটানির পরে উদ্ধবই কর্মীবাহিনীকে নিজের দিকে টেনে রাখতে সফল হলেন। তাই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা তৈরি করে রাজ এককোণে পড়ে রইলেন (এবার অবশ্য আবার তাঁর ডাক পড়েছে), বিজেপি উদ্ধবকেই আপন করে নিল।

কিন্তু নীতীশ কুমারের মত উদ্ধবও ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পরে টের পেলেন, মোদী-শাহের বিজেপি তাঁর উপর ছড়ি ঘোরাতে চাইছে। তাই জোট ভেঙে দিয়ে কংগ্রেস আর শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। যে কল বিজেপি বহু রাজ্যে করে থাকে, সেই কল করেই এভাবে তুলে আছাড় মারবেন উদ্ধব তা বিজেপি নেতারা ভাবেননি। কিন্তু এই অপমানের শোধ না তুলে ছেড়ে দেওয়ার লোক মোদী-শাহ নন। তাই তিন বছরের বেশি চলতে পারল না উদ্ধবের সরকার। তাঁরই দলের বেশকিছু বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিয়ে, রাজ্যপালের বদান্যতায় একনাথ শিন্ডেকে সাক্ষী গোপাল মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গড়ে ফেললেন বিজেপি নেতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। সেখানেই শেষ নয়। বালাসাহেবের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে শিবসেনার প্রতীক তীর ধনুকটা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শিন্ডেদের দলত্যাগ বিরোধী আইনে শাস্তি হওয়া দূরে থাক, আইনত তাঁরাই আসল শিবসেনা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। উদ্ধবের ডান হাত সঞ্জয় রাউতকে বেশ কিছুদিন হাজতবাস করতে হয়েছে।

কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পরে আজকাল উদ্ধবের দলেরা নেতারা এবং তাঁর ছেলে আদিত্য বেশ ধর্মনিরপেক্ষ গোছের কথাবার্তা বলেন। তাতে সততা কতটা আর অস্তিত্বের সংকট কতটা কে জানে? তবে তরুণরা শিবসেনাকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে দেখে, এক মঞ্চে রাহুল গান্ধী আর উদ্ধবকে বক্তৃতা দিতে দেখে যতই অবাক হোন না কেন, প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে শিবসেনার উত্থান কংগ্রেসেরই মদতে। উদ্দেশ্য ছিল মুম্বাইয়ের ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে প্রবল শক্তিশালী বামপন্থীদের একেবারে শারীরিকভাবে শেষ করে দেওয়া। তারই অঙ্গ হিসাবে বালাসাহেব ‘মারাঠি মানুস’ তত্ত্ব খাড়া করেন অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের কোণঠাসা করতে। বামপন্থীদের নিকেশ করতে সফল হয়েছিল বলেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল শিবসেনা। বিজেপিকেও দীর্ঘকাল বালাসাহেবের মর্জি মত চলতে হয়েছে। কিন্তু যে কোনো কাল্টের যা হয়, তাঁর মৃত্যুর পর শিবসেনারও তাই হয়েছে। উদ্ধবের তাই আপাতত ইন্ডিয়া ব্লকের সদস্য হয়ে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই। একনাথ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটা পেয়েছেন বটে, কিন্তু প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বা সাংবাদিক সম্মেলনেই বিজেপি টের পাইয়ে দেয় যে তিনি ঠুঁটো জগন্নাথ। মানে একদা মুম্বাই শাসন করা শিবসেনা বিজেপির ছোঁয়ায় এখন দ্বিখণ্ডিত এবং বিপন্ন।

অবশ্য উদ্ধবের চেয়েও করুণ অবস্থা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারের। তিনি কেবল নিজের রাজ্যের প্রবীণতম নেতাই নন, কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন একসময়, লোকসভায় বিরোধী দলনেতাও। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শীর্ষ পদেও আসীন ছিলেন। মহারাষ্ট্রে তাঁর বিপুল সম্পত্তি এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃণমূল স্তরে একসময় দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল। এমন অমিত ক্ষমতাধর শরদকে একেবারে ক্ষমতাহীন করে দিয়েছে তাঁর পুরনো সঙ্গী বিজেপি। বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে সরকার চালিয়েছে পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)। ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণটাও বেশ বিজেপিসুলভ। ‘বিদেশিনী’ সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিতে তাঁর আপত্তি ছিল। তিনি, প্রয়াত পূর্ণ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার মিলে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এই পার্টি গড়ে তোলেন। কথিত আছে এর পিছনে মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজনের হাত ছিল। তা সত্যি হোক আর না-ই হোক, ২০১৪-১৯ তাঁর দল যে মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল তা তো আর মিথ্যা নয়। আসলে বরাবরই ক্ষমতা যেখানে পাওয়ার সেখানেই থাকতে চেয়েছেন। যে সোনিয়ার জন্যে কংগ্রেস ছাড়লেন তাঁর সভাপতিত্বের কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারেই আবার মন্ত্রী হয়ে কাটিয়েছেন ২০০৪-১৪। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকেই তাঁর সব হিসাব গুলিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। তাঁর একসময়ের অনুগত নেতা ছগন ভুজবলকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। চূড়ান্ত আঘাতটা অবশ্য এসেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। শরদের ভাইপো অজিতকেও নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অজিতকে একেবারে উপমুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত শরদের পার্টির প্রতীকও কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বলা হয়েছে অজিতের দলটাই নাকি আসল এনসিপি। তাই দলের প্রতীক অ্যালার্ম ঘড়ি তাঁরাই ব্যবহার করতে পারবেন, প্রতিষ্ঠাতা শরদের দলকে অন্য প্রতীকে লড়তে হবে।

অর্থাৎ ২০২৪ শরদের কাছেও অস্তিত্বের লড়াই। কী কুক্ষণে বিজেপির সঙ্গে ভাব করতে গিয়েছিলেন!

বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

ডিএমকে, এআইএডিএমকে
এই তালিকায় বিজেপির সঙ্গে সবচেয়ে কম সময়ের সম্পর্ক সম্ভবত তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (ডিএমকে)। তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে আবর্তিত হচ্ছে দুই দ্রাবিড় ভাবাদর্শের দল ডিএমকে আর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (এআইএডিএমকে) মধ্যে। ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া বাজপেয়ী সরকারেরও শরিক ছিল জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে। কিন্তু সেই সরকার পড়ে যায় জয়ললিতা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায়। দাবি ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রত্যাহার করাতে হবে এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার ফেলে দিতে হবে। দাবি না মেটানোয় জয়ললিতা সরকার তো ভেঙে দিলেন বটেই, ১৯৯৯ সালের ভোটে উল্টে ডিএমকে নেতা এম করুণানিধি জোট করে ফেললেন বিজেপির সঙ্গে।

আজ করুণানিধির নাতি দয়ানিধি স্ট্যালিনের মুখে যে সনাতন ধর্মবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী কথাবার্তা বিজেপির গাত্রদাহের কারণ – সেগুলো নতুন কিছু নয়। ওই ভাবাদর্শই ডিএমকে-র ভিত্তি। সেদিক থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়ানো বিজেপির সঙ্গে কেন জোট করেছিলেন করুণানিধি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন, কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে বিবাদ করে সরকার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। কারণ তামিলনাড়ুতে কোনো পক্ষেরই দুর্নীতি কিছু কম ছিল না। জয়ললিতা ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির মামলায় ৭৮ বছর বয়সী করুণানিধিকে রাত দুটোর সময়ে গ্রেফতারও করিয়েছিলেন। কথিত আছে যে ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যার পর থেকেই ডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিল, কারণ তাদের সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান আর খ্রিস্টান। শেষমেশ ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এআইএডিএমকে কিন্তু বারবার বিজেপির কাছে ফিরে গেছে। ১৯৯৯ সালে জোট ভেঙে দেওয়ার পর আবার ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তামিলনাড়ুতে বিজেপি-এআইএডিএমকে জোট হয়। কিন্তু সেই জোট শূন্য পায়, বিজেপি অবিলম্বে জোট ভেঙে দেয়। ২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পরে যখন এআইএডিএমকে নেতৃত্ব দিশেহারা, তখন আবার বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে। কিন্তু তাতেও বিজেপি শূন্যের গেরো কাটাতে পারেনি, এআইএডিএমকে জেতে মাত্র একটা আসন। তবু ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত এই জোট বজায় ছিল। গতবছর মে মাস নাগাদ এআইএডিএমকে মনে করতে থাকে বিজেপির সঙ্গে থাকলে তাদের ক্ষতি হচ্ছে। এআইএডিএমকে নেতা সি পোন্নাইয়ান প্রকাশ্যে বলে দেন যে বিজেপি এআইএডিএমকের ক্ষতি করে নিজেদের সংগঠন বাড়াচ্ছে।

তারপরেও হয়ত জোট ভাঙত না। কিন্তু তামিলনাড়ু বিজেপির প্রধান কে আন্নামালাই গত এক বছরে পরপর এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা এআইএডিএমকে সহ্য করলে তামিল দল হিসাবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত লাগত। আন্নামালাই প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা সব আদালতের হাতে শাস্তিপ্রাপ্ত এবং রাজ্যটা ভারতের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোর অন্যতম। এআইএডিএমকে তখনই জেপি নাড্ডা আর অমিত শাহকে বলেছিল আন্নামালাইকে থামাতে, কিন্তু বিজেপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর আন্নামালাই ডিএমকে প্রতিষ্ঠাতা সিএন আন্নাদুরাই সম্পর্কেও কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। শেষমেশ ২৫ সেপ্টেম্বর এআইএডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা যা বলছে তা এআইএডিএমকে-র জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। বিজেপি যে খাতা খুলতে পারবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, অনেকে বলছে তাদের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের মাসুল এখানেও দিতে হচ্ছে আঞ্চলিক দলটাকেই। বিজেপির প্রেমে পড়েছ কি মরেছ।

আরও পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। এবার যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে আসি – আম আদমি পার্টি। আজ যেভাবে চক্রব্যূহে ফেলা হয়েছে দলটাকে, গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা থাকলে যে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তবে তাদের আজ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাও কিন্তু একার্থে আরএসএস-বিজেপির সঙ্গে আশনাইয়ের পরেই। ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ বলে যে সংগঠন থেকে আপ দলের উদ্ভব, তার পিছনে কারা ছিল তা এখন অনেকটা পরিষ্কার। রামলীলা ময়দানের সেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের গুরু হয়ে বসেছিলেন যে আন্না হাজারে, তাঁর স্বরূপও উদ্ঘাটিত হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট স্মার্ট দুর্নীতির অভিযোগে নীরবতা এবং সম্প্রতি কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি সমর্থন করা থেকে। কিরণ বেদির মত মানুষের আসল চেহারাও দেখা গেছে।

তবে হ্যাঁ। সংঘ পরিবারের প্রেমে নানাভাবে সিক্ত দল এবং ব্যক্তিদের ইতিহাস কাজে লাগবে তখনই, যদি ভারতের গণতন্ত্র বাঁচে। নইলে এরা তো স্বখাতসলিলে ডুববেই, এদের বিচার করার মতও কেউ থাকবে না।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

ইন্দিরা হতে অর্ধশতক পরে মোদীর হাত ধরে ফিরেছে জরুরি অবস্থা

এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক।

আগামী ৪ জুন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে। তার ঠিক ২১ দিন পরেই জরুরি অবস্থা ৪৯ পেরিয়ে পঞ্চাশে পা দেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই দিনটা কাউকে ভুলতে দেয় না। প্রতিবছরই ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ওই ২১ মাস ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার সময়। এবার যদি মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারেন, হয়ত গোটা বছর ধরেই বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে ইন্দিরা গান্ধী কী মারাত্মক স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দেশের কত ক্ষতি করেছে ইত্যাদি। সুখের কথা, তার জন্যে আলাদা করে আয়োজন না করলেও চলবে। কারণ মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে। ইনস্টা রিল প্রজন্মের অনেকেই জানত না কীভাবে সারা ভারতে বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, সাংবাদিকদেরও কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। দশ বছরের মোদী রাজত্বে সেসব দেখানো হয়েছে। তবে ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বকণ্ঠে নতুন কালের সূচনা ঘোষণা করার পরে তাও ঘটেছে যা জরুরি অবস্থার সময়ে ঘটেনি – দুটো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করেছে।

তথ্যের খাতিরে অবশ্য বলতে হবে যে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী জেএমএম নেতা হেমন্ত সোরেন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে আগেভাগেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার চম্পাই সোরেনকে সঁপে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের মত ঝাড়খণ্ডের জোট সরকারকেও ভেঙে ফেলাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। হেমন্ত আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটো আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন। হেমন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে কারাবরণ করার পর, বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন জোট সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেজরিওয়াল ঠিক করেছেন পদত্যাগ করবেন না, কারারুদ্ধ থেকেই প্রশাসন চালিয়ে যাবেন। হয়ত এমনটা করবেন ঠিক করে রেখেছিলেন বলেই তিনি গতমাসে দিল্লি বিধানসভায় নিজেই আস্থা প্রস্তাব এনে আরও একবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি অভূতপূর্ব ঘটনা। ফলে সম্ভব-অসম্ভবের কথা আলাদা, আইনত এমনটা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায়। অমৃতকালে বোধহয় এমনই হয়ে থাকে।

কেবল দুই মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারিই অবশ্য একমাত্র অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে আয়কর বিভাগ। বিশ বছর আগের কর নাকি বকেয়া আছে, এই যুক্তিতে জরিমানা হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের তহবিলে পাহাড়প্রমাণ টাকা জড়ো করেছে বিজেপি, তা তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের প্রথম দফার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ২১ মার্চ বন্ডের নম্বরগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে আরও নানা তথ্য। তার অন্যতম হল দিল্লি সরকারের আবগারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক কাহিনি।

এই সেই নীতি, যা দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে, আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন কেজরিওয়ালকেও গ্রেফতার করা হল। একই মামলায় এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন তেলেঙ্গানার সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতা। এঁদের সকলের গ্রেফতারির পিছনেই রাজসাক্ষী পি শরৎ চন্দ্র রেড্ডির বয়ান। ইনি হায়দরাবাদের অরবিন্দ ফার্মা লিমিটেডের অন্যতম ডিরেক্টর। স্ক্রোল ওয়েবসাইটের তদন্ত বলছে, ২০২২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পাঁচদিন পরে শরৎ বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং কী আশ্চর্য! ইডি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি! তারপরেই তিনি দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান।

অতঃপর শরৎ বিজেপিকে আরও ২৫ কোটি টাকা দেন। এর সঙ্গে কেজরিওয়ালদের গ্রেফতারির সম্পর্ক বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, পাঠক বুদ্ধিমান।

হেমন্তের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। দেশজুড়ে যতজন বিরোধী নেতাকে ইডি গ্রেফতার করেছে, তাঁদের কারোর বিরুদ্ধেই মামলা কিন্তু কোথাও পৌঁছচ্ছে না। প্রায়শই এ আদালত সে আদালতের বিচারক ইডিকে ধমকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনারা কি সত্যিই মামলার নিষ্পত্তি চান? শিবসেনার সঞ্জয় রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুখ্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে সঞ্জয়ের জামিন আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ইডির আচরণ কোথাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কয়েকদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, ইডি কাউকে গ্রেফতার করলে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয়।

অর্থাৎ দেশের সরকার কোনোরকম কার্যকারণ না দেখিয়েই মানুষকে গ্রেফতার করার অধিকার দাবি করেছিল। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ আইনটার অবশ্য বদনামই আছে অযৌক্তিক দমনমূলক আইন হিসাবে। কিন্তু সে অন্য আলোচনার বিষয়। আমরা বরং দেখি, জরুরি অবস্থার ইন্দিরা-সঞ্জয়কেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত কী কী কাজ হয়ে চলেছে লোকসভা নির্বাচনের মুখে।

বিদায়ী সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে দুই কক্ষ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষের ১৪৬ জন সাংসদকে নানা ছুতোয় সাসপেন্ড করে একতরফা পাস করিয়ে নেওয়া হল নতুন টেলিকম আইন আর পুরনো ফৌজদারি আইন বাতিল করা তিনটে নতুন আইন, যেগুলো মারাত্মক দমনমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামান্য চণ্ডীগড়ের কর্পোরেশনও যাতে বিরোধী জোটের হাতে না যায় তার জন্যে অনিল মাসি নামক এক নির্লজ্জ আধিকারিককে দিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যালট বিকৃতি ঘটিয়ে আপের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হল বিজেপি প্রার্থীকে। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করা মাত্রই দেখা গেল কয়েকজন আপ কাউন্সিলর দলবদল করে ফেলেছেন। মোদীজির নেতৃত্বে হঠাৎ আস্থা জেগে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত কড়া অবস্থান নেওয়ায় চণ্ডীগড় কর্পোরেশনে ভোটারদের রায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনকেও ছাড়া হচ্ছে না। সেখানেও রাত দুটোর সময়ে এক প্রার্থীকে বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন।

হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভা নির্বাচনের ভোটাভুটির আগে কংগ্রেসের কয়েকজন বিধায়ক উধাও হয়ে গেলেন। সেই ছজন কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ‘টাই’ হয়ে যায়। টসে জিতে যান বিজেপি প্রার্থী। ওই বিধায়কদের স্পিকার পরে সাসপেন্ড করেন। একই দিনে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনেও ক্রস ভোটিংয়ের ফলে বিজেপির একজন অতিরিক্ত প্রার্থী জিতে যান। সবই অবশ্য বিবেকের সহসা জাগরণ, মোদীজির নেতৃত্বে ভারতের দুর্বার অগ্রগতিতে আস্থা তৈরি হওয়ার ফল।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে দ্বিখণ্ডিত করে একনাথ শিন্ডেকে সমর্থন দিয়ে সরকার গড়েছিল বিজেপি। অতঃপর নির্বাচন কমিশন দল ভেঙে বেরিয়ে আসা শিন্ডে গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে শিবসেনার প্রতীক তাদেরই দিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে রাজ্যের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির প্রতিও। শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ ছিল। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই হয়ে গেলেন ধপধপে সাদা। তারপর নির্বাচন কমিশন তাঁর গোষ্ঠীকেই আসল এনসিপি গণ্য করে দলীয় প্রতীক দিয়ে দিল। দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা শরদের দলকে এখন লড়তে হবে অন্য প্রতীকে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৪০০ পার করার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করারই অঙ্গ এসব। রাজ্যসভা, লোকসভা – দুই কক্ষেই দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই বিজেপির। নইলে সংবিধানের ল্যাজা মুড়ো বদলে দেওয়া যাবে না, ২০২৫ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করাও স্বপ্নই থেকে যাবে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত চেয়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল তা অসম্ভব। কীভাবে সম্ভব করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত সাফল্যের পর বিজেপি বা এনডিএর পক্ষে আসন আরও বাড়ানোও অনেকের অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির হাতে ছিল কেবল দলীয় কর্মীবাহিনী আর রাজ্য প্রশাসন। মোদীর হাতে আছে যাবতীয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি।

নির্বাচন কমিশনটাকেও করতলগত করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্যে গঠিত কমিটিতে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। মোদী সরকার নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে ঢুকিয়েছে মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে, অর্থাৎ বিরোধী দলনেতার ভূমিকা হয়ে গেল দর্শকের। নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করে যেমন সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল, তেমন এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেও মামলা হয়েছে। সে মামলার শুনানি হওয়ার আগেই সাত তাড়াতাড়ি সভা ডেকে দুজন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছে সরকার। বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে শ দুয়েক নামের তালিকা হাতে ধরিয়ে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। মামলা গ্রহণ করে বিচারপতিরা বলেছেন, নির্বাচন এসে যাওয়ায় ওই আইনে স্থগিতাদেশ দিতে চান না। কিন্তু আর যা যা বলেছেন, তাতে আইনটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সদয় বলে মনে হচ্ছে না। সরকারের এত তাড়া কিসের – সে প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু তাতে কী? যতদিনে এ মামলার রায় বেরোবে, ততদিনে হয়ত নির্বাচন মিটে যাবে। ঠিক যেমন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে মামলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, রায় বেরোল ২০২৪ সালে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আবার চেয়েছিল নির্বাচন পর্ব চুকলে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য প্রকাশ করতে। তারপর সুপ্রিম কোর্টের ধমকের জোর যত বাড়ল, তথ্য প্রকাশের গতিও তত বাড়ল। এখন দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ডের মামলায় নিজেদের রায় রিজার্ভ করার পরেও বিজেপি সরকার বন্ড ছাপা বন্ধ করেনি। ২০২৪ সালের তৃতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই ৮,৩৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড ছাপা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৮ সাল থেকে বন্ডে মোট ৮,২৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। আর যে যে দল বন্ডে টাকা নিয়েছে তারা সকলে মিলেও এত টাকা পায়নি। এর পাশে রাখুন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া, টাকা কেড়ে নেওয়া। কোনো সন্দেহ নেই, এরপর কংগ্রেস অনেক আসনে প্রার্থী দিতেই খাবি খাবে। ইতিমধ্যেই গুজরাটের এক আসনে নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়া প্রার্থী প্রথমে বাবা অসুস্থ – এই কারণ দেখিয়ে নিজের নাম তুলে নেন, তারপর পার্টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁকে আর তাঁর বাবাকে নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব চরম অসম্মান করে এসেছেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস নেতারা সনাতন ধর্মকে সম্মান করেন না।

এরপর কী হতে যাচ্ছে, কোন বিরোধী নেতা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন আমরা জানি না। শনিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের বাড়িতেও সিবিআই হানা দেয় এবং শূন্য হাতে ফিরে যায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সরকারবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চাতক পাখির মত আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই – যদি এমন কোনো রায় দেওয়া হয় যাতে সরকার কোণঠাসা হয়। এমনটা যে দেশে হয়, বুঝতে হবে সে দেশের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেই এমন হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত লোকেরা আবার অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝেন রক্তপাতহীন নির্বাচন। সেই সরলমতি মানুষগুলোর উদ্দেশে বলা যাক, এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক। এমনিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে নির্বাচন কমিশনের ভারি অনীহা। উত্তর দিয়ে দিলে কথা ছিল না, কিন্তু আলোচনাই করতে না চাওয়া যে প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে তাকে গোদা বাংলায় বলে ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’, ‘আমি তো কলা খাইনি।’ আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না, তাই কেবল একটা তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দ্য কুইন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, একটা-দুটো নয়, মোট ৩৭৩ আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে গোনা ভোটের বিস্তর তফাত ছিল। এই তফাতের কোনো ব্যাখ্যা কমিশন আজ পর্যন্ত দেয়নি।

তাহলে করণীয় কী? আমার-আপনার মত সাধারণ নাগরিকের কী করা উচিত জানি না, বিরোধী দলগুলোর অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে পথেঘাটে আন্দোলনে নামা উচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ নির্বাচনে তারা যাতে নিজেদের শক্তি অনুযায়ীও লড়তে না পারে সরকারের তরফে তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়ত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যে বিরোধীপক্ষের সেরা বক্তারা প্রায় সবাই কারান্তরালে থাকবেন প্রচার পর্বে। সুতরাং এখন আর আলাদা করে প্রচার, আসন সমঝোতা – এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী? পথে নামা ছাড়া বিরোধীদের সামনে প্রচারেরই বা আর কোন পথ খোলা আছে? প্রায় কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই তো বিরোধীদের জায়গা দেবে না। টাকাপয়সার বিপুল অসাম্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠাও তৃণমূল কংগ্রেসের মত দু-একটা দল ছাড়া বাকিদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রাস্তাই একমাত্র রাস্তা নয় কি?

অথচ আমরা কী দেখছি? কংগ্রেসের তিন প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখছি। ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন নিবেদন করতে দেখছি। দিল্লির রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কবে দেখব? কেরালায় কংগ্রেস, সিপিএম দুই দলই পথে নেমেছে। কিন্তু দেশজুড়ে বিরোধীদের পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলন কবে দেখব? এদেশের বিরোধীরা কি তেমন আন্দোলন করতে ভুলে গেছেন? ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে দিল্লির চেহারা এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আম আদমি পার্টির উত্থানই তো রামলীলা ময়দান আঁকড়ে পড়ে থাকা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। সে আন্দোলনে যিনি কেজরিওয়ালের গুরু ছিলেন, সেই আন্না হাজারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত ছিলেন। কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর জেগে উঠে সংবাদসংস্থা এএনআইকে বিবৃতি দিয়ে গ্রেফতার সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণটি জব্বর।

ওসব কথা থাক। প্রশ্ন হল, নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময়ে আন্দোলন, রাজনীতি সম্পর্কে যে বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিকদের মনে, বিজেপিবিরোধীরা কি এখন তারই ফাঁদে পড়েছেন? ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকেই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, এমনকি এই শতাব্দীর গোড়া থেকে এ রাজ্যের কমিউনিস্ট শাসকদেরও আমরা বলতে দেখেছি – মিছিল মানুষকে অসুবিধায় ফেলে, বনধ কর্মনাশা ইত্যাদি। তাই বোধহয় এখন আন্দোলনের বদলে আদালতে ভরসা রাখতে হচ্ছে। যেসব দলের নির্বাচনে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে মাইনাসে, তারাও গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে কে কোন আসনে লড়বে তা নিয়ে দরাদরি করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে ‘অমুক আসন আমাদের সেন্টিমেন্ট’, ‘কেউ বলছে তমুক আসনে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী’। যেন দাঁড়ালেই ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ হয়ে যাবে।

এদেশের বিপন্ন মানুষ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসায় না থেকে নিজের মত করে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশের কৃষকরা আবার পথে। মোদী সরকার তাঁদের পথে আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা পিছু হটছেন না। যদিও সরকারের বদান্যতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, সোশাল মিডিয়া থেকেও কৃষক আন্দোলনের খবর উধাও।

লাদাখের মানুষও গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে রোজ রাস্তায় নামছেন, পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে সুবিখ্যাত সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছেন।

ভারতের মত বিরাট দেশের অমিত ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের আন্দোলন যে একেবারেই সফল হতে পারে না তা নয়। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনই দেখিয়ে দিয়েছে গণআন্দোলনের ক্ষমতা কতখানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে না এমন আন্দোলনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আছে। ২০১৯-২০ সালের এনআরসি, সিএএবিরোধী আন্দোলনেরও সেই সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েনি, আন্দোলনকে এবং তার দাবিগুলোকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেয়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা হয়ে যায় – এটা মুসলমানদের সমস্যা, তাই ওরা আন্দোলন করছে। একইভাবে এখনো বহু মানুষ ভাবছেন কৃষি আইনগুলো কৃষকদের সমস্যা, লাদাখের ব্যাপারটা লাদাখের মানুষের সমস্যা আর মণিপুর তো বিস্মৃত, কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্পনাতেও নেই। এককথায় দেশের বিরোধী রাজনীতি সময়ের চেয়ে, পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। যতদিন পিছিয়ে থাকবে তত দ্রুত ভারত ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তায়িপ এরদোগানের তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। এখন জরুরি অবস্থা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত