মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে।

ললিপপ বনাম আমলকী। যে ভূখণ্ডে রাজনীতি করেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যোগেন মন্ডল, জ্যোতি বসু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন, মুজিবুর রহমানরা – সেই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ললিপপ বনাম আমলকীর বিতর্ক।

নিজেদের দূরদৃষ্টিহীন বিদেশনীতির চক্করে পড়ে যাওয়া ভারত সরকার শেষপর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়েছে। সেই বৈঠকে উত্তেজনার পারদ নেমেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিকার করতে যেমন বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হবে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা কমার নাম নেই। তাতে ধুয়ো দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর এ বিষয়ে গরম গরম কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না, সাংবিধানিক এক্তিয়ারও নেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতা, কর্মীরা লোকসভা নির্বাচনে এবং সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর ভেসে যেতে যেতে খড়কুটোর খোঁজ করছিলেন, চট্টগ্রামের অশান্তি তাঁদের পাড়ে তুলে দিয়েছে। ফলে তাঁরা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে, ওপারের হিন্দুদের প্রতি প্রবল প্রীতি প্রদর্শন করে এপারের হিন্দু ভোট একত্রিত করতে চাইবেন তা প্রত্যাশিত। তবলার বাঁয়ার মত যুদ্ধবাজ এবং টিআরপিবাজ মিডিয়ার সাংবাদিকরাও যে যা মুখে আসে তাই বলবেন তাও জানা কথা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির কী প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি সেনার কিছু অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক আর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) একজন নেতা, যাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন, তাঁদের মন্তব্যের জবাবে খোদ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলার ‘এত বড় হিম্মত, আপনাদের কেন, কারো নেই যে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সব নিয়ে নেবেন আর আমরা বসে বসে ললিপপ খাব’?

এর জবাবে আবার বিএনপির ওই নেতা, রুহুল কবীর রিজভি, বলেছেন ‘আপনারা যদি চট্টগ্রামের দিকে তাকান, তাহলে আমরা কি আমলকী মুখে চুষব?’

মানে দুই দেশের সরকার – যাদের হাতে বিদেশনীতি এবং প্রতিরক্ষা – তারা কেউ কারোর এলাকা দখল করার হুমকি দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতা আর বিজেপি প্রোপাগান্ডার প্রচারক (নামে সাংবাদিক) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন। তার জবাবে বাংলাদেশের কিছু লোক, যাঁদের কোনো ক্ষমতাই নেই, তাঁরা পালটা গা গরম করা মন্তব্য করলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই মন্তব্যের ততোধিক অর্থহীন জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন রাজ্যের আইনসভাকে। কেন? বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের আর বিএনপি নেতার মেজাজ কেন বিগড়ে গেল, সে ভাবনা ওঁদের দেশের মানুষের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর উত্তেজনার কারণ অনুসন্ধান করি।

বাংলাদেশের ঘটনাবলীতে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছে মমতা যেন কত কট্টরপন্থী প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বিজেপির সঙ্গে। ললিপপের বদলে আমলকীর হাস্যকর মন্তব্য করার সময়ে রিজভি এমন একটা কথা বলেছেন যা প্রণিধানযোগ্য। বলেছেন মমতাকে ওঁরা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বলে ভাবতেন। কিন্তু বাংলাদেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর কথা বলে মমতা নাকি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনিও আসলে কট্টরপন্থী হিন্দু। মমতার ওই প্রস্তাবে সত্যিই তা প্রমাণ হয় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই মন্তব্য বিজেপির চেয়েও চরমপন্থী। নরেন্দ্র মোদীর সরকার সেই জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে চলে আসা সর্বসম্মত বিদেশনীতি ত্যাগ করে বহু ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন প্যালেস্তাইনের প্রতি মিত্রতার নীতি ত্যাগ করে ইজরায়েলের বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে এখনো চিরকালীন নীতি বজায় রাখা হয়েছে, তা হল অন্য দেশের সঙ্গে ভারত সরকারের গোলমালকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসাবে দেখা। এমনকি কাশ্মীর সমস্যাকেও অতীতের কংগ্রেস এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলোর মতই মোদী সরকার ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসাবেই দেখে। কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায় না। অথচ মমতা সটান একটা সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যেখানকার সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হতে পারে, তাদের আভ্যন্তরীণ গোলমালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিবাহিনী পাঠানোর দাবি করে বসলেন!

মমতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ফলে তাঁর এত চরমপন্থী অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন নন এমন ভাবার কারণ নেই। যা হওয়ার তাই হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এহেন আচরণে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শান্তিবাহিনীর কথা বলায় খোদ বাংলাদেশ সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মহম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন ‘আমরা অবাক হয়েছি ওঁর মন্তব্যে। এক জন মুখ্যমন্ত্রীর তো কথার ওজন থাকবে? তা ছাড়া এখানে যাঁরা পড়তে বা কোনও কাজে এসেছেন, সেই ভারতীয়রা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, এমন কোনও খবর আমাদের কাছে নেই।’ এরপরেও মমতা সুর নরম করেননি। ললিপপ-আমলকীর যুদ্ধে এসে পৌঁছেছেন। এর একটাই অর্থ হয়। কোনো বিষয়ে আন্দোলন করে রাজ্য সরকারকে ফ্যাসাদে ফেলতে অক্ষম বঙ্গ বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনকে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছে, তাতে মমতা হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কা করছেন। আশঙ্কা সত্যি হলে ক্ষমতা হাতছাড়া হতে পারে। তাই আর বছর দেড়েক পরের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তিনি যে বিজেপির চেয়েও বড় হিন্দু তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হল কি না হল তা ভেবে দেখার সময় নেই।

বিজেপিকে আটকানোর তাড়নায় এবং বামপন্থীদের দুর্বলতায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে একমাত্র পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তার সুযোগ নিয়ে মমতা বাংলার মুসলমানদের প্রতি যথেচ্ছ অন্যায় করে চলেছেন। মমতার শাসনে এ রাজ্যের মুসলমানদের বলার মত আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অথচ সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে। রেড রোডে ঈদের নমাজে গিয়ে নির্বাচনী কথাবার্তা বলেও তিনি রাজ্যের মুসলমানদের বিপদ বাড়িয়েছেন। রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে যতজন ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সরকারি ভাতা দেওয়া সংখ্যালঘু তোষণ বলে মনে করেন, তার অর্ধেকও বোধহয় পুরোহিত ভাতার কথা মনে রাখেননি। দুর্গাপুজো করতে সরকারের টাকা দেওয়াও যে হিন্দু তোষণ, তা তিন শতাংশে নেমে আসা বামপন্থী ভোটারও মানতেই চান না। মমতা এসব ভালই বোঝেন। তাই সম্ভবত তিনি ঠিক করেছেন, ২০১১ সাল থেকে চালিয়ে আসা নরম হিন্দুত্ববাদ আর যথেষ্ট নয়। এবার একেবারে কট্টর হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠতে হবে।

অযোধ্যায় যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল ঠিক সেখানেই সুবিশাল রামমন্দির বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মোদী। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগেই কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও সেই মন্দির উদ্বোধন করেছেন। তাতে নির্বাচনী লাভ হয়েছে কি হয়নি তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ২০২৬ বিধানসভার অনেক আগেই মমতাও দীঘায় জগন্নাথধাম বানিয়ে, বাংলা খবরের চ্যানেলের ভাষায়, ‘পালটা দিলেন’। বাংলাদেশে যে ইস্কন এই মুহূর্তে আক্রান্ত বলে অভিযোগ, সেই সংগঠনের সাধুদের পাশে নিয়েই মমতা বুধবার ঘোষণা করলেন যে আগামী অক্ষয় তৃতীয়ায় ওই মন্দিরের উদ্বোধন হবে।

কে জানে মোদীর মত মমতাও প্রাণপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দায়িত্ব নিজেই পালন করবেন কিনা। তাঁর প্রগতিশীল সমর্থকরা যতই তাঁর উপর সাবল্টার্নত্ব আরোপ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণসন্তান তাতে তো ভুল নেই। সুতরাং করতেই পারেন। প্রধানমন্ত্রী ও জিনিস করায় আমরা বিস্তর চেঁচামেচি করেছিলাম রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের শ্রাদ্ধ করা হল অভিযোগ তুলে। কিন্তু সরকারি টাকায় জগন্নাথের মন্দির বানালেও যে একই কাজ হয় সেকথা আমরা বলিনি, বলবও না। কারণ আমরা বাঙালি প্রগতিশীলরা জানি, মমতার সিদ্ধান্তে তৈরি মন্দির হল ধর্মনিরপেক্ষ মন্দির। আর তিনি যদি নিজে হাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন তাহলে তা দেখে বিজেপির ভোটাররাও তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেবেন। সুতরাং সেটা হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার জয়।

শুভেন্দু সম্ভবত সেই আশঙ্কাতেই চেঁচামেচি আরম্ভ করেছেন। তিনি হঠাৎ রাষ্ট্র আর ধর্মের পৃথকীকরণ সম্পর্কে ভারি সচেতন হয়ে বলে উঠেছেন ‘সরকারি টাকায় কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরদোয়ারা করা যায় না…আমরা রামমন্দির বানিয়েছি হিন্দুদের টাকায়, সরকারের টাকায় নয়’। আরও বলেছেন, মমতা যা বানিয়েছেন ওটা নাকি মন্দিরই নয়। তিনি কাদের যেন মেদিনীপুরে নিয়ে এসে ধর্মসম্মেলন করে প্রমাণ করে দেবেন যে ওটা মন্দির নয়, ফলে মমতার ভণ্ডামি ফাঁস হয়ে যাবে। আরেক নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি আবার টিভি স্টুডিওতে বসে হুগলী আর মালদা জেলার দুটো মসজিদকে আসলে মন্দির বলে দাবি করে সেখানে পুজো দেওয়া যাবে কিনা সে প্রশ্ন খুঁচিয়ে তুলেছেন।

মোদ্দাকথা, ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ২০২১ সালের মত ২০২৬ সালের নির্বাচনও তৃণমূল সরকার পাঁচ বছরে কতটা কী কাজ করল না করল, তা নিয়ে হবে না। সরকারি দল এবং সরকারের দুষ্কর্ম বা দুর্নীতি নিয়েও নয়। কারণ কেবল সরকার নয়, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলও তা চায় না। আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আন্দোলনে তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি বলে ও ব্যাপারটা সকলে ভুলে গেলেই তারা খুশি হত। ঠিক সেটাই হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মিইয়ে গেছেন তো বটেই; মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু ডাক্তাররা ধান্দাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত – এই যুক্তিতে যাঁরা আর জি কর আন্দোলনের প্রাণপণ বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও আর খবর রাখছেন না যে সরকারি কর্মচারী সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে গেলে রাজ্য সরকারের যে অনুমতি প্রয়োজন সেটা সরকার দিচ্ছে না। তা নিয়ে তাঁরা সরকারের কৈফিয়ত তলব করছেন না, টুঁ শব্দটিও করছেন না। বরং অনেকে বলছেন, সন্দীপ ছাড়া কি আর কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার নেই রাজ্যে? একা ওকেই কেন শাস্তি পেতে হবে? সত্যিই তো। বেচারা সন্দীপ! যা নিয়ে টানা আড়াই মাস আন্দোলন চলল, মাস চারেক যেতেই যখন সে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়িয়েছে, তখন আগামী দেড় বছরে সরকার যা-ই করুক না কেন, সেগুলো ভুলতেও সময় লাগবে না।

তাহলে কোন প্রশ্নে ভোট হবে? বাংলাদেশ নিয়ে হাওয়া গরম করে রাজ্য বিজেপি এইটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে যে মমতাকেও হিন্দু ভোটের জন্যে ঝাঁপাতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের ভোটার হিসাবে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার যে কাজ সঙ্ঘ পরিবার সারা ভারতে করতে চায় এবং অনেকটা করেও ফেলেছে, তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের মাথায় সে কাজ মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ২০২১ সালে বিজেপিকে আটকাতে হবে – এই প্রশ্নে ভোট হয়েছিল। তাই বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তৃণমূলের কাজকর্মে বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এবার মমতাও কে বড় হিন্দু – সেই প্রশ্নের দিকেই নির্বাচনকে নিয়ে যাচ্ছেন। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে এতদিন দাবি করতেন, তাঁদের অনেকের গত একমাসে যে চেহারা বেরিয়ে পড়েছে তাতে বিজেপিকে আটকাতে তাঁরা সকলে আর আগ্রহী কিনা তাতে সন্দেহ আছে। হিন্দুত্ববাদের এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারত? এরপর মমতা হারলে হিন্দুত্ববাদ জিতবে তো বটেই, মমতা জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না।

অবশ্য মমতা হারবেন কেন? শুভেন্দু যতই লাফালাফি করুন, মোহন ভাগবত কি আর শুভেন্দুর মত কোনো মন্দিরকে ‘কালচারাল সেন্টার’ বলে হেলাফেলা করতে রাজি হবেন? বাংলাদেশ সম্পর্কে মমতা যা যা বলেছেন, সেগুলো কি মোদী বা অমিত শাহেরও মন কি বাত নয়? নেহাত প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত পদে থাকলে ওসব কথা বলা যায় না তাই। অন্য কেউ বলে দিলে মন্দ কী? যা নিয়ে কথা বললে মোদী, শাহদের পছন্দ না-ও হতে পারে তা নিয়ে তো মমতা বা তাঁর দল কিছু বলছে না। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে তো মনে হচ্ছে মহুয়া মৈত্র কংগ্রেস সাংসদ বা নির্দল। কারণ গৌতম আদানি নিয়ে আলোচনা চেয়ে রাহুল গান্ধীরা যে হল্লা করছেন তাতে মমতার দল যোগ দিতে চাইছে না। একা মহুয়াই সোশাল মিডিয়ায় আদানি নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণমূল বলেছে ওটা নাকি সাধারণ মানুষের ইস্যু নয়, যদিও আদানি গ্রুপে শুধু স্টেট ব্যাংক আর এলআইসির মাধ্যমে মধ্যবিত্তের টাকা আটকে আছে তা নয়। বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবসা থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের ব্যবসা পর্যন্ত সবেতে আদানি গ্রুপ থাকায় তাদের হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছেন গরিব মানুষও। আবার এই যে চতুর্দিকে মসজিদের নিচে, মাজারের নিচে মন্দির ছিল দাবি করে মামলা ঠুকছে হিন্দুত্ববাদীরা – তা নিয়েও ধর্মনিরপেক্ষ চূড়ামণি মমতা একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। কংগ্রেস হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে হারের সম্মুখীন হতেই ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব মমতার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত – এই মর্মে বয়ান দিতে শুরু করেছেন তৃণমূলের মুখপাত্ররা; সমর্থন করছেন অখিলেশ যাদব, শরদ পাওয়ার, লালুপ্রসাদ প্রমুখ। অথচ এইসব জাতীয় স্তরের ব্যাপার বা অখিলেশের রাজ্যের সম্ভলের সাম্প্রদায়িক হিংসা নিয়ে এক লাইন প্রতিক্রিয়া দেননি নেত্রী।

একমাত্র রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসাবে জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে কংগ্রেসের সঙ্গে একমত হয়েছে তৃণমূল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ অধিবেশনে অন্য দলের মত মমতার দলের সাংসদদেরও ধনখড় সাসপেন্ড না করলে কি সেটুকুও করা হত? সন্দেহ করতেই হচ্ছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে ধনখড়ের উত্তরসূরি সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে ‘কাম অন ফাইট, কাম অন ফাইট’ করার পরে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে রাজভবনের এক মহিলা কর্মীকে যৌন হয়রানি করার মত গুরুতর অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে বৈঠক করতে পর্যন্ত রাজ্যপালের কাছে যাবেন না বলার পরে হঠাৎ গত সোমবার কোন দেবতা সে, কার পরিহাসে, দুজনের ভাব হয়ে গেছে। ধনখড়ের বেলাতেও একটুখানি আড়ি আর সারাজীবন ভাব হয়েছিল। রাজ্যপাল পদে যাঁকে ঘোর অপছন্দ ছিল, উপরাষ্ট্রপতি পদে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে সমর্থন করেনি তৃণমূল।

এভাবে একে অন্যকে বিপদে না ফেলে এবং নিঃশব্দে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে যদি দিন চলে যায়, তাহলে আর মমতাকে হারানোর জন্যে বিজেপির উতলা হবার দরকার কী? তবে এখানে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে রাখা দরকার – পাশেই ওড়িশায় এমনই সাতে পাঁচে না থাকা, দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ বিজয়ী নবীন পট্টনায়ককে এবছর বিজেপির কাছে মসনদ খোয়াতে হয়েছে।

আরো পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

লেখাটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু ভারতের অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত আছে। অন্যত্র শাসক, বিরোধী – দুই পক্ষের সমালোচনা করলে মিটে যায়। কিন্তু এ রাজ্যে সেখানেই থেমে গেলে চলে না। প্রকৃত বিরোধীর অভাব এবং তেমন একটা শক্তির জন্যে মানুষের হাহাকার এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গায়ক, নায়ক, কবি – সকলের থেকেই তাঁরা বিরোধিতা দাবি করেন এবং দাবি পূরণ না হলে গাল দেন। ইদানীং লক্ষ করছি, আমাদের মত চুনোপুঁটি সাংবাদিকের লেখা পড়েও অনেকে মন্তব্য করছেন ‘অল্টারনেটিভটা কী’ বা ‘করণীয় কী’? অনেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে দিচ্ছেন যে বিকল্প না বলতে পারলে কিছু লেখাই উচিত নয়। যেন প্রশ্ন তোলা নয়, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই সংবাদমাধ্যমের কাজ। আবার কেউ কেউ ঘোষণা করে দিচ্ছেন, বিকল্প বলছে না মানে ও আসলে অমুক পক্ষে বা তমুক পক্ষে। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এই ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার জন্যে অবশ্য সাংবাদিকরাই দায়ী। আসলে যে নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না, বিশেষত আজকের পৃথিবীতে সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণাও বদলে ফেলা দরকার, তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি আছে। আগ্রহীরা উদাহরণ হিসাবে এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। তা সত্ত্বেও একথা ঠিকই যে সাংবাদিকরা তাঁদের উদ্দেশ্যকে সন্দেহ করার একাধিক কারণ রোজ জুগিয়ে চলেছেন।

ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রাজনীতির বাইরের লোকের মধ্যে বিরোধী খোঁজা এবং না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার জন্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। বিজেপি আর তৃণমূল যে মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ সেকথা কেউ না-ও মানতে পারেন, কিন্তু বিজেপি যে বিধানসভার ভিতরে বা বাইরে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে না তা সাদা চোখেই দেখা যায়। কংগ্রেস তো বামফ্রন্ট আমলেই প্রান্তিক শক্তি হয়ে গিয়েছিল, রইল বাকি বামপন্থীরা।

রাজ্যের বৃহত্তম বামপন্থী দল বিরোধিতা করবে কী; ইদানীং বুঝেই উঠতে পারে না তারা কোনো পার্টি, নাকি এনজিও, নাকি কোম্পানি। তাই কখনো কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জিকে পাহাড় থেকে সাগর হাঁটিয়ে ভাবে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো মনে করে অতিমারীতে বা অন্য সময়ে অসুস্থ মানুষের শুশ্রূষা করে বা অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো পতাকা বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলনে ঢুকে পড়ে জনসমর্থন ফেরত আসবে মনে করে, কখনো আবার পেশাদার লোক দিয়ে কিছু হিসাবনিকাশ করালেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করে। নির্বাচনের ফল বেরোলে কোনোটাই কাজে লাগল না দেখে সদস্য, সমর্থকরা অভিমান করেন আর সোশাল মিডিয়ায় — নেতৃত্বের বারণ অমান্য করে – সরকারি প্রকল্পে উপকৃত গরিব মানুষকে গালাগালি দেন। এই ‘বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি’ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তৃণমূল, বিজেপিকে পরাস্ত করার জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। নবীন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট না পুরনো নকশাল, নাকি প্রাচীন কংগ্রেস – কাদের সঙ্গে জোট করলে ভোট ফেরত আসবে তা ভাবতেই দিন যাবে।

সিপিএম বা বামফ্রন্টের বাইরেও কিছু বামপন্থী আছেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তাঁরা সিপিএমের শূন্যস্থান পূরণ করার কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি সিপিএম হীনবল হয়ে যাওয়ার পরেও।

সুতরাং হতাশাজনক হলেও, সত্যি কথাটা হল, ফ্যাসিবাদ বা হিন্দুত্ববাদকে পরাজিত করেছি বলে যে উল্লাস পশ্চিমবঙ্গবাসী ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর করেছিলেন তা যে অকারণ ছিল সেকথা স্বীকার করার সময় এসে গেছে। এখন ‘আমাদের ডান পাশে ধ্বস/আমাদের বাঁয়ে গিরিখাত…।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল।

এবারের নির্বাচনে লড়া দলগুলো শেষপর্যন্ত পরিষ্কার দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। এক পক্ষের অবিসংবাদী নেতৃত্বে বিজেপি, অন্য পক্ষের তর্কসাপেক্ষ নেতৃত্বে কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি বা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতাদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও এটা ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যত মিথ্যে কথা বলছেন, যত আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন, তার বেশিরভাগই কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে। ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মূল লক্ষ করেছেন গান্ধী পরিবারকে। ফলে অন্য অনেকের প্রতি তাঁর আক্রমণ আমাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ খেয়াল করলে দেখা যাবে, মোদী কিন্তু কোনো বক্তৃতাতেই তাঁদের ভুলছেন না। কারণ মোদী রন্ধ্রে রন্ধ্রে একজন আরএসএস প্রচারক; অরুণ শৌরি বা যশবন্ত সিনহাদের মত কংগ্রেসকে পছন্দ করেন না এবং আর্থসামাজিক ভাবনায় দক্ষিণপন্থী বলে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে বিজেপিতে যাওয়া লোক নন। ফলে মোদী আরএসএসের আদর্শগত শত্রুদের কখনো ভোলেন না। সেই কারণেই সংসদীয় শক্তি নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বক্তৃতার খানিকটা জুড়ে সবসময় থাকে কমিউনিস্ট এবং/অথবা নকশালরা। কংগ্রেস কত ভয়ঙ্কর তা বোঝাতেও তিনি বলেন – ওদের ইশতেহার তৈরি হয়েছে নকশাল চিন্তাভাবনা থেকে। একই কারণে মোদী এবং বিজেপির অন্যান্য শীর্ষনেতারা জওহরলাল নেহরুকে যত গালাগালি দেন, ততটা দেন না ইন্দিরা গান্ধীকে। রাজীব গান্ধীর নাম টেনে আনেন শুধুমাত্র সোনিয়া বা রাহুলকে আক্রমণ করার সময়ে। একই কারণে মোদী কখনোই ভোলেন না লালুপ্রসাদকে। তাঁর এবারের জনসভাগুলোর ভিডিও লক্ষ করলে দেখা যাবে, বারবার তিনি ইন্ডিয়া ব্লক কতখানি ভ্রষ্ট তা বোঝাতে গিয়ে বলেন একজন নেতার কথা, যাঁকে দেশের আদালত দুর্নীতিতে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছে। তবে তিনি এখন জামিনে বাইরে আছেন। মোদী বলেন, শাহজাদা এত ভ্রষ্ট যে সেই লোকটার সঙ্গে শ্রাবণ মাসে মাংস রান্নার ভিডিও শেয়ার করে হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করে! সেই নেতার এত দুঃসাহস যে তিনি বলেন দেশের সকলের সম্পদ কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেওয়া হবে! বলা বাহুল্য, প্রথম কথাটা অর্থহীন, কারণ দেশসুদ্ধ সব হিন্দু মোটেই শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না। আর দ্বিতীয় কথাটা ডাহা মিথ্যা। কিন্তু এখানে সে আলোচনায় যাব না। কথা বলব লালুপ্রসাদ সম্পর্কে, যিনি বয়স এবং স্বাস্থ্যের কারণে হীনবল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সরাসরি পরমাত্মা হতে আবির্ভূত হিন্দু হৃদয়সম্রাটের দুঃস্বপ্নে এখনো হানা দেন। কেন দেন? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব। এই আলোচনা আজই, এখনই করা দরকার। কারণ লালুর বয়স এখন ৭৫, শরীরের অবস্থাও বিশেষ ভাল নয়। যদি ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র এ যাত্রায় বেঁচে যায় এবং ২০২৯ সালে আবার নির্বাচনের মত নির্বাচন হয়, তখন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মানুষটি আর আমাদের মধ্যে থাকবেন কিনা ঠিক নেই।

প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটি পড়ে অনেক পাঠকই নাক কুঁচকোবেন। বিমানযাত্রায় গা গুলিয়ে উঠলে বমি করার জন্যে যে কাগজের ব্যাগ দেওয়া হয়, কেউ কেউ তার প্রয়োজনও বোধ করতে পারেন। কারণ কেবল বাঙালি ভদ্দরলোক নয়, অন্য রাজ্যের ভদ্রজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও দেখেছি, লালু সম্পর্কে একটা শব্দই সকলে জানে – ‘করাপ্ট’ (দুর্নীতিগ্রস্ত)। শুধু তাই নয়, সকলেই নিঃসন্দেহ যে ভারতের ইতিহাসে লালুর চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা আর আসেনি। অথচ লালু মূলত যে পশুখাদ্য নিয়ে দুর্নীতির মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী, সেই মামলাতেই বিহারের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রও যে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন সেকথা কারোর মনে নেই। দেশজুড়ে কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য দলের নেতা, মন্ত্রীদের বহু কেলেঙ্কারি মানুষ ভুলে গেছেন। বিজেপির সাম্প্রতিক ওয়াশিং মেশিনে তো হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারির কলঙ্ক ধুয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা আইন আদালতের চোখে। সাধারণ মানুষের চোখে চিরকালই বহু নেতার দুর্নীতি মাফ হয়ে চলেছে। কেবল লালুর কোনো মাফ নেই, তাঁর ছেলেমেয়েদেরও মাফ নেই। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারেরও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে এবং তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কখনো শুনেছেন তাঁকে স্রেফ ‘করাপ্ট’ বলে উড়িয়ে দিতে? তিনি মহারাষ্ট্রের বাইরেও রীতিমত সম্মানিত নেতা। কেবল রাজনৈতিক মহলের কথা বলছি না। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিও ছিলেন। কোনো ক্রীড়া সাংবাদিকও কখনো লেখেননি পাওয়ারের বিরুদ্ধে কী কী দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তাঁর সম্পর্কে বরং ভাল ভাল সব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। তামিলনাড়ুর দুই প্রবাদপ্রতিম নেতা এম করুণানিধি আর জয়ললিতা। তাঁদের বিরুদ্ধেও বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। মামলা, গ্রেফতারি সবকিছুই হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষককে দেখবেন না প্রধানত তা নিয়েই আলোচনা করছেন। ওঁদের বিরোধীরাও তা করেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁদের ভাবমূর্তি তেমন নয়। যত দোষ লালু ঘোষ।

লালু সম্পর্কে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা হল – অশিক্ষিত। লালুকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্দরলোকেরা সেই নয়ের দশক থেকে বলে আসছেন, ক্ষমতায় আসতে হলে একটা স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া জানা আইন করে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত। এঁরা খবর রাখেন না, যে লালু এলএলবি পাস। ইস্ট জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির মত মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। তারপর এম এ পাস করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। মানে পলিটিকাল সাইন্স, ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’ নয়। বস্তুত ছাত্র রাজনীতির পথেই তাঁর উত্থান, যেমন উত্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, সুব্রত মুখার্জি, বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, ভদ্রলোকদের ভগবান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মহম্মদ সেলিম বা আজকের সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধরদের।

পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ভদ্রসমাজ লালুকে এক বিশেষ চশমা দিয়ে দেখে। সে চশমার একদিকের লেন্সে দুর্নীতি, অন্য লেন্সে অশিক্ষা। লালুর বিরুদ্ধে আরও একটা অভিযোগ প্রবল। তিনি বিহারে গুন্ডারাজ চালিয়েছেন। একথায় জোর দিতে বিহারে বহু যুগ আগে যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, সে যুগের গল্প এমনভাবে শোনানো হয় যেন সে এক স্বর্ণযুগ ছিল। সেই শুণ্ডির মত মাঠে মাঠে ফসল, গাছে গাছে পাখি। লালু ক্ষমতায় এলেন আর বিহার ছারখার হয়ে গেল। অথচ পশুখাদ্য মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, অধুনা প্রয়াত জগন্নাথ মিশ্র কংগ্রেস আমলেই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ভারতের আর সব রাজ্যের রাজনীতি যেন একেবারে শীতকালের ডাউকি লেকের মত স্বচ্ছ এবং সমাজবিরোধীমুক্ত। নিঃসন্দেহে লালুর আমলে দুর্নীতি হয়েছে, গুন্ডারা অনেককিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু লালুর রাজনীতি যদি শুধু ওটুকুই হত, তাহলে ভারতের আর পাঁচজন নেতার সঙ্গে তাঁর তফাত থাকত না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদীকেও ঘুরে ফিরে তাঁকে আক্রমণ করতে হত না। কেন লালুর নীতি আর শিক্ষা ভদ্দরলোকেরা দেখতে পান না তা বুঝতে পারলেই মোদী কেন লালুকে ভুলতে পারেন না তা বোঝা যাবে।

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি আজকের টাকার হিসাবে মোটামুটি ৪,০০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, যাতে তাঁর সময়ের আগের সরকারও যুক্ত ছিল। এর চেয়ে অনেক বড় বড় কেলেঙ্কারি ভারতে ঘটে গেছে। যে সেচ কেলেঙ্কারিতে মহারাষ্ট্রের বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার যুক্ত বলে অভিযোগ, তা ৭০,০০০ কোটি টাকার ব্যাপার। ২জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা নিয়ে দুর্নীতিতে দেশের ১,৭৬,০০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন তৎকালীন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বিনোদ রাই। পশ্চিমবঙ্গের সারদা কেলেঙ্কারি যে ঠিক কত টাকার ব্যাপার তা আজও পরিষ্কার নয়, নিয়োগ কেলেঙ্কারির হিসাব বোধহয় কোনোদিন পাওয়াই যাবে না। তবে আমরা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার হতে দেখেছি। তা এইসব বড় বড় দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের কী হয় সাধারণত? কিচ্ছু হয় না। অজিত নিজের দলকে দুভাগ করে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিয়ে ধপধপে সাদা হয়ে গেছেন। আদর্শ আবাসন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা অশোক চ্যবনও বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে সাফসুতরো হয়ে গেছেন। স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে ডিএমকে নেতা এবং তৎকালীন টেলিকম মন্ত্রী এ রাজাকে বিচারাধীন বন্দি হিসাবে কারাবাস করতে হয়েছিল বটে, কিন্তু অভিযোগটা আদৌ প্রমাণ করা যায়নি। নারদ কেলেঙ্কারি অত টাকার ব্যাপার নয়, কিন্তু ক্যামেরার সামনে হাত পেতে টাকা নেওয়া নেতাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো পক্ষের কোনো উৎসাহ নেই। সেই নেতারা তারপরেও নির্বাচনের টিকিট পেয়েছেন, ভোটারদের ভোটও পেয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী তো দল বদলে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা পর্যন্ত হয়ে গেছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দলের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সবরকম নেতাই দুর্নীতিতে যুক্ত বলে অল্পবিস্তর প্রমাণ হওয়ার পরেও মমতা সততার প্রতীক বলে ভদ্দরলোকেরা এখনো বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় এঁদের সকলকেই ক্ষমাঘেন্না করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লালু তাঁর পুরনো বন্ধু নীতীশ কুমারের মত এক বা একাধিকবার পক্ষ বদল করে কংগ্রেস বা বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসেননি। সম্ভবত তাই তিনি কেবল অভিযুক্ত নন, শাস্তিপ্রাপ্ত। উপরন্তু একথাও প্রমাণিত যে তাঁকে মন্ত্রিত্বের প্রলোভন দেখিয়ে বা ইডি, সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে দলে টানা যায় না। স্বভাবতই তিনি এক দেশ, এক নির্বাচন, এক দল করতে চাওয়া একনায়কের মাথাব্যথার কারণ।

আরও পড়ুন যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

কিন্তু এ তো নেহাত ব্যবহারিক কারণ। গভীরতর আদর্শগত কারণও আছে। এই যে আমাদের ধারণা – লালু অশিক্ষিত, তাঁর পার্টির লোকেরাও সব অশিক্ষিত। এই ধারণার কারণ কী? কারণ হিন্দি সিনেমা, সিরিয়াল এবং অন্যান্য হিন্দিভাষী নেতাদের মুখে আমরা যে ভাষায় কথা শুনি; লালু সে ভাষায় কোনোদিন কথা বলেন না। তিনি পারতপক্ষে ইংরিজিও বলেন না। কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে বাজেট বক্তৃতাও দিতেন হিন্দিতে। মাঝে মাঝে যখন ইংরিজি বলতেন, সে উচ্চারণ ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত হত না। মানে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে সন্তুষ্ট করতে পারত না। অথচ বিহারের রাজনীতিতে লালু এবং তাঁর দলের উত্থান যথার্থই সাবল্টার্নের উত্থান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে নিজের হাবভাব, চালচলন বদলে ফেলা সফল মানুষ অসংখ্য পাওয়া যায়। কিন্তু লালু বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, পরে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হলেন, রেলমন্ত্রকের গুরুদায়িত্ব সামলালেন পোশাকআশাক তো বটেই, মুখের ভাষাটি পর্যন্ত না বদলে। বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার ফুলওয়াড়িয়া গ্রামের কুন্দন রায় আর মরছিয়া দেবীর মেজ ছেলে গোটা জীবন ধরে দেখিয়ে যাচ্ছেন যে দেশোয়ালি ভাষাতেই যাবতীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কথোপকথন চালানো যায়। তাঁর ভাষার কারণে কখনোই তাঁর রাজনীতি সবচেয়ে নিচের তলার মানুষটার মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যায় না। বরং সরসতার কারণে অনেক জটিল বিষয়ও তিনি সকলের বোধগম্য করে দিতে পারেন। আজকাল বড় একটা বেরোন না বাড়ি থেকে, আগেকার মত দীর্ঘ বক্তৃতাও দিতে পারেন না। কিন্তু যেটুকু বলেন সরসভাবেই বলেন এবং বক্তব্যে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকে না। যেমন যখন ইন্ডিয়া ব্লক গঠনের চেষ্টা চলছিল, তখন এক সভার পর সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – আপনি বিয়ে করছেন না কেন? আপনার মা আমাকে বলেছেন, আপনি কথা শুনছেন না, বিয়ে করছেন না। এখনো সময় আছে, বিয়ে করুন। আমরা সবাই বরযাত্রী যাব। উত্তরে রাহুল হেসে বলেন, আপনি যখন বলে দিয়েছেন তখন বিয়ে এবার হয়ে যাবে। কারোর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে লালু আসলে রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে জোটে থাকার ব্যাপারে ভরসা দিচ্ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসাবে। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে যে হিন্দি চলে, লালু তার ধারে কাছে গেলেন না কোনোদিন। ফলে দেশের উচ্চবর্গচালিত সংবাদমাধ্যম চিরকাল তাঁকে অশিক্ষিত বলে প্রচার করে গেল। লালু সকলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের রাজনীতি নিজের মত করে চালিয়ে গেলেন। এ জিনিস এক দেশ, এক ভাষা করতে চাওয়া একনায়ককে যন্ত্রণা দেবে না?

লালুর আরও বড় দোষ হল, তাঁর কথার দাম আছে। তিনি নীতীশের মত পালটি খান না, মমতার মত ক্ষমতায় আসার জন্যে ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ হচ্ছে’ বলার মত দক্ষিণপন্থী এজেন্ডা গ্রহণ করেন না, হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাত ধরেন না। আবার ক্ষমতায় এসে গেলে সংখ্যালঘু ভোটের কথা ভেবে মুসলমানদরদীও সাজেন না। তিনি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে চিরকাল কথা বলেন এবং কাজ করেন। তিনি একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি গোটা দেশে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়া লালকৃষ্ণ আদবানির রথ থামিয়ে তাঁকে গারদে পুরে দিয়েছিলেন। গত শতকের শেষ প্রান্তে যখন বারবার ত্রিশঙ্কু লোকসভা হচ্ছিল, তখন জয়প্রকাশ নারায়ণের অনেক শিষ্যই নিজেদের অবস্থান বদলেছেন নানা অজুহাতে। ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু লালু কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষ ত্যাগ করেননি। তিনি বা তাঁর দলের নেতারা মন্ত্রিত্ব পেলেন কিনা সে প্রশ্ন কখনো তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠেনি।

লালুই যে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা – এ সম্পর্কে দেশের সাংবাদিককুল, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং ভদ্দরলোকেরা এত নিশ্চিত যে তাঁকে নিয়ে নানাবিধ কৌতুক কাহিনি চালু আছে। যেমন

লালু একবার সংসদের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। সে দেশের এক সাংসদের বাড়িতে গেছেন। জানতে চেয়েছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

সাংসদ বলেছেন, আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

হ্যাঁ।

ফিফটি পার্সেন্ট।

পরের বছর সেই সাংসদ ভারতে এসে লালুর বাড়িতে গেছেন। জিজ্ঞেস করেছেন, আপনাদের এখানে করাপশন নেই?

আলবাত আছে।

কীরকম?

ওই দূরে একটা নদী দেখতে পাচ্ছেন?

পাচ্ছি।

তার উপরে একটা ব্রিজ?

কই, না তো!

হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

এসব গল্প বাঙালি ভদ্রজনের আড্ডায় আসর মাতিয়ে রেখেছে বছর তিরিশেক হল। অথচ এই লালু রেলমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষতিতে চলা ভারতীয় রেল লাভের মুখ দেখেছিল। তাঁর কর্মপদ্ধতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ানো শুরু হয়েছিল। এমনকি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকেও তাঁকে ছাত্রছাত্রীদের সামনে বলতে ডাকা হয়েছিল। এমন লোককে ‘মেরিট’-এর দোহাই দিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গালাগালি করা ভদ্রসমাজের কী করেই বা হজম হবে? লালুর রাজনীতি তো শতকরা একশো ভাগ সংরক্ষণের পক্ষে।

এসব কথা বহু বাঙালির তেতো লাগবে। তথ্য অস্বীকার করতে না পারলেও তাঁরা প্রশ্ন তুলবেন – বিহারের জন্যে লোকটা কী করেছে? একথা ঠিক যে লালুর নেতৃত্বাধীন সরকার বিহারকে অর্থনৈতিকভাবে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু বা কেরালার স্তরে নিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু লালু ক্ষমতায় আসার আগে বিহারে সব ভাল ছিল, এ নেহাত গালগল্প। অর্থনীতিবিদ আশিস বোস যখন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কাছে জমা দেওয়া এক রিপোর্টে দেশের রুগ্ন অংশ হিসাবে BIMARU (বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যগুলোর কথা উল্লেখ করেন তখনো লালু ক্ষমতায় আসেননি। লালুর রাষ্ট্রীয় জনতা দল একক ক্ষমতা হারিয়েছে তাও কম দিন হল না। অথচ দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রিয় কাজের মানুষ নীতীশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে তেমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারেননি বিহারে। পারলে এবারের নির্বাচনেও কর্মসংস্থান বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াত না, কয়েক মাসের সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রী থাকা লালুপুত্র তেজস্বীর চাকরি দেওয়ার প্রকল্প তাঁকে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলত না। কিন্তু সাহেবরা ঠিকই বলে – ‘Man cannot live with bread only’ (মানুষ কেবল খাবার খেয়ে বাঁচে না)। সুতরাং কেবল অর্থনৈতিক অবদান দিয়েই একজন নেতা বা তাঁর দলের রাজনীতিকে বিচার করা মূর্খামি এবং অন্যায়। লালুর বিহারের মানুষের প্রতি সবচেয়ে বড় অবদান আজকের লব্জে যাকে ‘উন্নয়ন’ বলে তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক সুদূরপ্রসারী।

মনে রাখতে হবে, লালু এমন এক পরিবারের ছেলে, যাদের জন্যে গ্রামে জলের কলটা পর্যন্ত আলাদা হত। বিশিষ্ট সাংবাদিক রাহুল শ্রীবাস্তব গতবছর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, লালু যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন, নিজের মাকে খবরটা দিতে গিয়ে বলেন ‘মা, আমি হাতুয়ার রাজা হয়ে গেছি’। হাতুয়া তাঁর গ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী বড় জায়গা। মা লেখাপড়া জানেন না, প্রান্তিক পরিবারের গৃহবধূ। মুখ্যমন্ত্রী মানে কী, তা তিনি বুঝবেন না। তাই লালুকে ওভাবে বলতে হয়েছিল। কিন্তু ওই অবস্থা থেকে ক্ষমতা হাতে পেয়ে অনেকেরই মাথা ঘুরে যায়। নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মত মানুষের থেকে সচেতনভাবেই তারা দূরে সরে যায়। লালুর বিশেষত্ব হল তিনি তা করেননি। জাতপাত এখনো বিহারে যথেষ্ট বড় বিষয়। সরকারি দফতরেও উঁচু জাতের চাপরাশি নিচু জাতের অফিসারকে খাওয়ার জল দেয় না। কিন্তু এই ব্যবস্থার মূলে লালুর আমলে যেভাবে কুঠারাঘাত করা হয়েছে তা ঐতিহাসিক। আট বা নয়ের দশকে বিহারে যাতায়াত ছিল এমন লোকেদের কাছে শোনা যায়, বাসে উঁচু জাতের লোক উঠলে নিচু জাতের লোকেদের উঠে দাঁড়িয়ে বসার জায়গা দিতে হত। সেসব লালুর আমলে তুলে দেওয়া হয়। একদিনে হয়নি। প্রবীণ সাংবাদিকরা বলেন, লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যখন নিজের বাসভবনে জনতার সঙ্গে দেখা করতেন, উঁচু জাতের আইএএস বা আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারদের দিয়ে খৈনি ডলাতেন। অনেকেই অপমানিত বোধ করতেন এবং অপমান করাই লালুর উদ্দেশ্য ছিল। তিনি উঁচু জাতের অফিসারদের এবং সামনে উপস্থিত নানা জাতের গরিবগুরবো মানুষকে বার্তা দিতে চাইতেন, যে জাত কোনো ব্যাপার নয়। যে পদে আছে, তাকে সবাই মানতে বাধ্য। উঁচু জাত বলে ছাড় পাবে না।

রাহুল শ্রীবাস্তবেরই বলা মুখ্যমন্ত্রী লালুর দুটো কীর্তির কথা বলে শেষ করি। বোঝা যাবে, লালু যখন থাকবেন না, কেন তখনো মোদীর মত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা লালুর ভূত দেখবে।

লালু হঠাৎ কিছুদিন রাতের বেলা সুট, বুট, হ্যাট পরে পুরোদস্তুর সাহেব সেজে পাটনার আশপাশের ইটভাটাগুলোতে যাওয়া শুরু করেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে খবর ছিল, উচ্চবর্ণের বাবুরা ইটভাটায় রাতে আসর জমান আর বিছানায় তাঁদের শিকার হতে হয় নিম্নবর্গীয় মহিলাদের। লালু স্বয়ং দলবল নিয়ে উপস্থিত হয়ে টানা কিছুদিন উত্তম মধ্যম দেওয়ার পরে বাবুদের মহফিল বন্ধ হয়।

দ্বিতীয় ঘটনা অভিজাত পাটনা ক্লাব নিয়ে। কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব বা ক্যালকাটা ক্লাবের মতই ওটাও অভিজাতদের আয়েশ করার জায়গা। তফাত বলতে সব বর্ণের লোককে ঢুকতে দেওয়া হত না। লালু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে বলেন, ওই ক্লাব আমি বন্ধ করে দেব সবাইকে ঢুকতে না দিলে। তারপর ক্লাবের নিয়ম ভেঙে প্রথম যে অসবর্ণ পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ওই ক্লাবে, তারা জাতিতে ডোম।

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।

আমার মায়ের দিদিমা রামদাসী চক্রবর্তী অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার আঠারোখাদা গ্রামের এক সম্পন্ন পরিবারের ধর্মপ্রাণ গৃহবধূ ছিলেন। রোজ গৃহদেবতার পুজো করতেন নিজের হাতে এবং সে দেবতার মূর্তি পরিবারের সচ্ছলতার সঙ্গে মানানসই আকারে বড় ছিল। রামদাসীর মেজ ছেলে জগন্নাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এক মুসলমান, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে স্থানীয় কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী। একদিন তাঁকে এবং অন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গ্রেফতার করতে গোটা গ্রাম চষে ফেলছে পুলিস। জগন্নাথ বন্ধুকে লুকিয়ে রাখার জায়গা ভেবে না পেয়ে নিয়ে এলেন মায়ের কাছে। যথাসময়ে পুলিস চক্রবর্তী বাড়িতেও হানা দিল, কারণ সে বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সভা-টভা হত। বাড়ির ছেলেমেয়েদেরও কংগ্রেসের সঙ্গে কিঞ্চিৎ যোগাযোগ আছে বলে খবর। কিন্তু গোটা বাড়ি তল্লাশ করেও পুলিস সেদিন যাকে খুঁজছিল, তাকে পেল না। কেন? কারণ রামদাসী তাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঠাকুরঘরে, গৃহদেবতার পিছনে। এই পর্যন্ত ইতিহাস। আমাদের পারিবারিক কিংবদন্তি বলে, বাঙালি দারোগার নাকি সন্দেহ হয়েছিল। সে রামদাসীকে হালকা চালে জিজ্ঞাসাও করে, ঠাকুরঘরটা দেখলাম না যে মাসিমা? রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।

বলা বাহুল্য, রামদাসী ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটা জানতেন না। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন হিন্দু বিধবার যা যা শাস্ত্র নির্ধারিত কর্তব্য তা থেকে এক চুল বিচ্যুত হননি। অথচ যাঁরা তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছেন তাঁদের মুখে শুনেছি, ওই ঘটনা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র পাপবোধ ছিল না। আবার ফলাও করে বলেও বেড়াতেন না। স্পষ্টতই তিনি মনে করতেন তাঁর ভগবানের ঘর একজন বিধর্মীর স্পর্শে অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই একজন মুসলমানকে ঠাকুরঘরে বসালে পাপ হয় না।

আনন্দ পট্টবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ তথ্যচিত্রে বিতর্কিত রাম জন্মভূমির আদালত নিযুক্ত পূজারী লালদাসকে দেখানো হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন হিন্দুধর্ম অনুযায়ী ভগবান যে বাড়িতে থাকেন সেটাই মন্দির। আলাদা করে ভগবানকে কোথাও নিয়ে গিয়ে মন্দির বানানোর প্রয়োজন পড়ে না, ভগবান যেখানে আছেন সেই ঘর ভেঙে দেওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না।

বোঝা যায়, আমার প্রমাতামহী রামদাসী কোনো ব্যতিক্রম নন। ভারতবর্ষ মুসলমানদের দেশ এবং রামদাসী, লালদাসের মত কোটি কোটি হিন্দুর দেশ। এঁরা নাস্তিক নন, সঙ্ঘ পরিবার যাকে ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী পাশ্চাত্য থেকে শেখা ধর্মনিরপেক্ষতা বলে, এঁরা তার আওতাতেও পড়েন না। এঁদের ধর্মবিশ্বাস এমন আত্মবিশ্বাসী যে অন্যকে আক্রমণ করে সে বিশ্বাস জাহির করতে হয় না। অন্যের ধর্মস্থান দখল করে নিজের দেবতার বিগ্রহও স্থাপন করতে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, ভগবানকে এঁরা এত ছোট মনে করেন না, যে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট মন্দিরে জায়গা না দিলে তিনি গৃহহীন হয়ে থাকবেন।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

রাম এঁদের সকলের আরাধ্য নন। সেই কারণেই সকলকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা বা ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতেই হবে এমন দাবি অসঙ্গত, অন্যায়। অযোধ্যায় ঝাঁ চকচকে রামমন্দির নির্মাণ, দিশি পিস্তলের গুলিতে হত লালদাসের ভাষায় বললে “রাজনৈতিক মুদ্দা” (রাজনৈতিক বিষয়)। আমরা চাইলেই অন্যের ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ধর্মস্থান গড়ে তুলতে পারি – এই অহঙ্কার প্রকাশ করা ছাড়া এর অন্য কোনো সার্থকতা নেই। অবশ্য এই অহঙ্কার সার্বিক প্রচারে মোহিত হয়ে যাওয়া সাধারণ হিন্দুদের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, চিকিৎসার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা ভুলে থাকতে আফিম হিসাবে কাজ করবে। আফিম খেয়ে সাধারণ হিন্দু ঝিমোবেন আর সেই সুযোগে তাঁদের ভোটগুলো পাওয়া যাবে – এই হল মহত্তর উদ্দেশ্য। মুসলমানদের তো আগেই অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির অবাঞ্ছিত নাগরিক করে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি রাখা হয়নি। তা দেখিয়ে উল্লাসে উন্মাদ করে দেওয়া হয়েছে সাধারণ হিন্দুদের। তাঁরা খেয়ালও করছেন না, প্রাচীন শহর অযোধ্যার ছোটখাটো হিন্দু ব্যবসায়ীর দোকানপাটও উড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য।

কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের বংশানুক্রমিক মহন্ত রাজেন্দ্রপ্রসাদ তিওয়ারি তাই বলেছেন, “অযোধ্যায় ওটা মন্দির নয়, মল। ওই ধরনের প্রথম মল ছিল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। তৃতীয়টা হবে মথুরায়।”

প্রতর্ক ব্লগে প্রকাশিত