ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

বিরোধী

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

2 thoughts on “ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে”

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading