এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে?

গোপালকৃষ্ণ গোখেলের একটা বাক্যকে সম্বল করে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা প্রায় একশো বছর ধরে রেলা নিয়েই চলেছি – ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’ (বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে)। অথচ কথাটা বহুদিন হল অর্থহীন হয়ে গেছে। একে তো গোখেল যে বাংলার কথা বলেছিলেন, সে বাংলার অর্ধেকটা এখন আলাদা দেশ। তার উপর বাংলার রাজনীতির সর্বভারতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও দীর্ঘকাল হল অন্তর্হিত। বাংলার সাংসদদের সমর্থন ছাড়া সরকার পড়ে যাবে – এমন সরকার দিল্লিতে শেষবার হয়েছিল ২০০৪ সালে। বাংলার রাজনীতিতে যোগ্য রাজনীতিবিদের এখন এতই আকাল, যে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, পরপর তিনবার বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা শাসক দলকেও নির্বাচনে প্রার্থী বেছে নিতে বারবার বাংলা সিনেমা বা বাংলার ক্রিকেট, ফুটবলের দ্বারস্থ হতে হয়। সব কুড়িয়ে কাচিয়েও ৪২ খানা আসনে বাংলা থেকে প্রার্থী দিয়ে উঠতে পারেনি বাঙালির শাসক দল, কিছু শূন্যস্থান রয়েই গিয়েছিল। সেগুলো পূরণ করতে বিহার থেকে প্রাক্তন বলিউড অভিনেতা, গুজরাট থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেকে আনতে হয়েছে। অথচ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই দলেরই প্রচারের অন্যতম অভিমুখ ছিল – তৃণমূল কংগ্রেসই বাঙালির দল। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল স্লোগান – ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। এখন দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ‘পরের ছেলে’-কে পাশে দাঁড় না করালে নিজের মেয়ের কাজ চলে না।

এ অবস্থাতেও গত এক দশকে বাঙালি বামপন্থী ও উদারপন্থীদের গর্বের শেষ ছিল না কিছু ব্যাপার নিয়ে – এ রাজ্যের রাজনীতি গোবলয়ের মত নয়। এখানে নাকি জাতপাতের রাজনীতি চলে না, হিন্দুত্ব চলে না, ধর্ম নির্বাচনে কোনো ইস্যু হয় না, আরও নানা ভাল ভাল ব্যাপার।

কিন্তু সেই ২০১১ সাল থেকেই দেখা গেছে যে মতুয়ারা বাংলার ভোটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখা যাচ্ছে কুড়মিরাও আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ।

হিন্দুত্বও দিব্যি চলে। নইলে রামনবমী এলেই দাঙ্গা, বকরি ঈদ এসে পড়লেই সোশাল মিডিয়ায় হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষদের নিরীহ গবাদি পশুদের জন্যে প্রাণ কেঁদে ওঠা, সর্বোপরি বিধানসভায় ৭৭ খানা আসন পেয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান বিরোধী দল হয়ে বসা সম্ভব হত না। ২০২১ সালের ফলাফল দেখে যে সরলমতি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিরা হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আটকে দিলেন ভেবে প্রবল আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছেন, তাঁরা আসলে কল্পনার জগতে বাস করেন। নইলে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নিতে পারতেন – কতগুলো আসনে কয়েকশো, হাজার দুয়েক, হাজার তিনেক – এরকম ব্যবধানে ফয়সালা হয়েছিল। একটা আসনে তো সাত ভোটের ব্যবধানেও ফয়সালা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়েছিল জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আর আতঙ্কিত সংখ্যালঘু মানুষের ভোট। সংখ্যাগুরু বাঙালির দুর্গাপুজোর সময়ে চাগাড় দিয়ে ওঠা ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ মার্কা বাছাই করা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।

ধর্মকে যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ইস্যু করে তোলা যায় তা গত দেড় দশকে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর বিষাক্ত প্রচার জয়যুক্ত হওয়ার পর আর বাঙালিদের বড় বড় কথা না বলাই ভাল। বিজেপি আইটি সেলের তৈরি মমতাকে ‘মমতাজ’ নাম দিয়ে নানারকম রসিকতা যেভাবে কট্টর সিপিএম সমর্থকরাও হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে শেয়ার করেন তাতে ধর্মের মদ এক চুমুকও খায় না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যে দুষ্কর হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করা মানে নিজেকে ঠকানো।

সুতরাং গুজরাট-রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-বিহার-ঝাড়খণ্ডের নাগরিকদের যে জাতপাত নির্ভরতা, যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব, যে ধর্মসর্বস্বতায় অভিযুক্ত করে এসেছে সুমিত, প্রমিত বাঙালি; এবারের নির্বাচনে গোটা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই সেই দোষগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাকি দেশের সঙ্গে ব্যবধান চোখে পড়ার মত বেশি। কী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে, কী মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থানে, গোটা দেশের প্রবণতার বিপরীতে চলছে বাংলার ভোট।

বাকি দেশের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকালে সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত আলেখ্য নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করার খেলায় হেরে গেছেন। মোদী কি গ্যারান্টি নামের ইশতেহার প্রকাশ করে বিকশিত ভারতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু অনতিবিলম্বেই – কংগ্রেসের ইশতেহারে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার কথা আছে, ওটা মুসলিম লিগ মার্কা ইশতেহার, ওরা হিন্দুদের সম্পত্তি শুধু নয় মহিলাদের মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেবে – এইসব আষাঢ়ে গল্প বলতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক,

এইসব ভুয়ো তথ্য ছড়িয়েও যে মোদী প্রত্যাশিত মাত্রায় ভোট আদায় করতে পারছেন না, তার প্রমাণ হল তিনি আবার মাঝে এক সাক্ষাৎকারে বলে বসেছেন, যে তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক প্রচার করেন না। যেদিন করবেন সেদিন জনজীবনে থাকার অধিকার হারাবেন। পরদিন আবার জনসভায় ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ফিরে গেছেন। ফলে রাহুল গান্ধী বলতে বাধ্য হয়েছেন, মোদীজি কি গজনী হয়ে গেছেন? কিছুই মনে থাকে না!

কিন্তু এত আক্রমণ সত্ত্বেও কংগ্রেস বা তার জোটসঙ্গী রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, জেএমএম, সিপিআই, সিপিএম, লিবারেশন এই সাম্প্রদায়িক কাদা ছোড়াছুড়িতে প্রশ্রয় দেয়নি। তারা কেবলই সংবিধান বাঁচানোর কথা, জাতভিত্তিক আদমশুমারির প্রতিশ্রুতির কথা, বিপুল বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের দুর্দশার কথা বলে যাচ্ছে। নিজেরা ক্ষমতায় এলে এসবের কী সমাধান করবে তার উত্তরও বেশ বিস্তারিতভাবেই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো দিয়ে চলেছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে চাকরির পরীক্ষা হলেই প্রশ্ন ফাঁস হয় যায় বলে অভিযোগ, কিন্তু আদিত্যনাথ প্রিয় মোদীজির জন্যে যে বিরোধীদের এই প্রশ্নপত্র আসতে চলেছে তা আগে থেকে জেনে উঠতে পারেননি বোধহয়। ফলে তথাকথিত দারুণ বক্তা মোদীকে এবার নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। মাতৃগর্ভে জন্মাননি, পরমাত্মা থেকে সরাসরি জন্ম হয়েছে – এসব রূপকথার গল্পই তাঁর নির্বাচনী প্রচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিসেম্বর মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোবার পর যেসব নির্বাচন-জ্যোতিষী এবং সাংবাদিক ঘোষণা করে দিয়েছিলেন বিজেপি ২০২৪ জিতেই গেছে, তাঁরা এখন সাবধানী সুরে কথা বলছেন।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নীতীশ কুমার কেটে পড়ার পরে ইন্ডিয়া ব্লককে তাসের ঘরের মত মনে হচ্ছিল। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটে রাজ্যেই শেষপর্যন্ত জমাট জোট হয়েছে – উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা প্রায় সকলেই একমত যে এবারের ভোটের ফল নির্ধারিত হবে পাঁচটা রাজ্যের ফল দিয়ে। উপরিলিখিত তিনটে, কর্ণাটক আর পশ্চিমবঙ্গ। কর্ণাটকে কংগ্রেস সদ্য বিপুল ভোটে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকারে এসেছে, তার উপর বিজেপির জোটসঙ্গী জেডিএসের হাসান কেন্দ্রের সাংসদ প্রোজ্জ্বল রেবন্নর পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের কাণ্ড প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় বিজেপি বিপাকে। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব আর রাহুল যেভাবে একসঙ্গে একের পর এক জনসভা করছেন তাতে বিজেপির বিরুদ্ধে যে আন্তরিক লড়াই করছে ইন্ডিয়া ব্লক, তাতে সন্দেহ থাকে না। একই দৃশ্য বিহারেও। সেখানে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব আর রাহুলের রসায়ন যে দারুণ জমেছে তা বিরাট বিরাট জনসভায় দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রেও শেষপর্যন্ত উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আর শরদ পাওয়ারের এনসিপির সঙ্গে কংগ্রেসের জোট জমাট বেঁধেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বলে দিয়েছিলেন ‘এখানে তৃণমূলই ইন্ডিয়া’।

তেরো বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা মনেই করেননি তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের কোনো অংশের কোনো অসন্তোষ থাকতে পারে। টানা এতদিন ক্ষমতায় থাকলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক তাও তিনি বিশ্বাস করেননি। তাই যখন জোটের কথাবার্তা চলছিল তখনো তিনি এবং তাঁর দলের মুখপাত্ররা কংগ্রেস বিজেপিকে হারাতে কত অযোগ্য, রাহুল কতবার সর্বভারতীয় নেতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন – এইসব বলে নিজেদের ওজনের ভারে কংগ্রেসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিজেপিশাসিত মণিপুর আর আসাম বাদ দিলে এই রাজ্যের সরকারই রাহুলের ন্যায় যাত্রার সময়ে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল। অমুক জায়গায় রাত্রিবাস করা যাবে না, তমুক জায়গা দিয়ে যাওয়া যাবে না – এসব নানাবিধ বায়নাক্কা ছিল প্রশাসনের। এমনকি ন্যায় যাত্রার পালের হাওয়া কেড়ে নিতে ঠিক ন্যায় যাত্রার এলাকাতেই পদযাত্রা করেছিলেন মমতা স্বয়ং। শেষমেশ একতরফা ৪২ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়া হয় ব্রিগেডের জনগর্জন সভা থেকে। তখনো মমতা রীতিমত খড়্গহস্ত ছিলেন কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া ব্লকের প্রতি। যুক্তি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আর সিপিএম তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে। তাই তাদের সঙ্গে জোট করা যায় না। উপরন্তু তৃণমূল একাই বিজেপিকে হারিয়ে দিতে পারে, বিধানসভায় হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতৎসত্ত্বেও মমতা সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করেননি। মমতাকে যা আক্রমণ করার তা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা, বিশেষত সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। মমতা সেটাকেই বিজেপির সহায়তা করা বলে গণ্য করেছেন।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এত প্রবীণ এবং পোড়খাওয়া একজন জননেত্রী যদি মনে করেন তিনি একাই একশো, তাতে আপত্তির কিছু নেই। মুশকিল হল প্রচার শুরু হতেই বাকি ভারতে যে কৌশলে বিজেপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে বিরোধীরা, মমতা তার উল্টো পথে হেঁটেছেন। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে। বাকি ভারতের চেয়েও নিম্নগামী।

বিজেপির কৌশলে অবশ্য কিছুমাত্র বদল হয়নি। তাদের ১৮ জন সাংসদ বলার মত কোনো কাজ করেননি, প্রচারে কী আর বলবেন? বিজেপির সেই ২০১৯ সাল থেকে একটাই কাজ – তৃণমূলকে হিন্দুবিরোধী দল হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাওয়া। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ কাজে এবার তারা ব্যবহার করল সন্দেশখালির ঘটনাবলীকে। মূল অভিযুক্ত যেহেতু শাহজাহান, তাই তাদের কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। প্রচার পর্বের প্রথম দিকটা তৃণমূলকে কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেতে হয়েছে। বিজেপি কর্মী গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ পায়। কে সত্যি বলছে কে মিথ্যে বলছে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো পক্ষ অবলম্বন না করেও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিজেপি ফাঁপরে পড়েছে ওই ভিডিও নিয়ে। বিশেষত যখন মহিলারা একের পরে এক মামলা প্রত্যাহার করতে শুরু করলেন, ভিডিও ক্যামেরার সামনে বললেন তাঁদের ভুল বুঝিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে পুলিসে অভিযোগ করানো হয়েছিল। বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী রেখা পাত্র স্বয়ং বলে বসলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্ষিতা বলে যে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের তিনি চেনেন না। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি এই চক্রান্তের মাথা বলে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, তিনিও কোনো সদুত্তর দিয়ে উঠতে পারেননি। না পারার আক্রোশে সাংবাদিকদের খিস্তি দিতে পেরেছিলেন কেবল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বামাল সমেত যদি বিজেপির চক্রান্তকারীরা ধরা পড়েই থাকে, তাহলে তারা গ্রেফতার হল না কেন? গঙ্গাধরবাবু মন মজায়ে লুকালেন কোথায়? পুলিস তাঁকে এই জঘন্য চক্রান্তের জন্য গ্রেফতার করেছে বলে তো আমাদের জানা নেই। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম তিনি নাকি পুলিসের কাছে কাদের বিরুদ্ধে কীসব অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে। সেই অভিযোগেরই বা কী হল? কদিন সন্দেশখালি নিয়ে প্রচণ্ড হইচই হওয়ার পরে, দুই প্রধান প্রতিপক্ষের সমস্ত নির্বাচনী সভায় সন্দেশখালি নিয়ে বাদানুবাদ হওয়ার পরে দুপক্ষই কি ঠিক করল সন্দেশখালিতে সন্দেশ নাই? কজন মহিলার অভিযোগ সত্যি, কজনের অভিযোগ মিথ্যা, আদৌ কোনোটা সত্যি কিনা – তা তো আমাদের জানা হল না। লাভের লাভ যা হল, তা হচ্ছে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান বিজেপি চাইল না, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ বা অকাজ নিয়েও তৃণমূলের প্রচারে কথাবার্তা কমে গেল। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে কটা সভায় কথা বলেছেন মমতা বা অভিষেক? কর্মসংস্থানের অভাব নিয়েই বা কবার আক্রমণ করেছেন মোদীকে? মোদী, শাহরাই বা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে গোদাভাবে তৃণমূলকে চোর বলা ছাড়া কী সমালোচনা করেছেন? নির্দিষ্ট করে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েই বা কতটা কথা বলেছেন? মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তো কোনো পক্ষই পারতপক্ষে কথা বলছে না। সেসব আলোচনা কেবল শোনা যাচ্ছে বাম, কংগ্রেস জোটের প্রার্থীদের মিটিং মিছিলে।

সাংসদের সংখ্যার বিচারে রাজ্যের দুই বৃহত্তম শক্তি কী নিয়ে তর্ক চালাচ্ছে? প্রথমে চলল সন্দেশখালিতে ধর্ষণ হয়েছে নাকি হয়নি। তারপর চলল রাজ্যপালের রিপুকর্ম নিয়ে বাদানুবাদ। সে বাদানুবাদও কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিমুখ নিল না। মুখ্যমন্ত্রী একবার রাজ্যপালের পদত্যাগের দাবি তুললেন, প্রধানমন্ত্রী মুখই খুললেন না, রাজ্যপাল অভিযোগকারিণী মহিলার সম্মান এবং প্রাইভেসির অধিকারের তোয়াক্কা না করে সাংবাদিকদের রাজভবনে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে দিলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো রাজ্য পুলিসের ‘সূত্র’ উদ্ধৃত করে জানাল, পুলিসের কাছে নাকি বিস্ফোরক তথ্য আছে। এবিপি আনন্দের মত সদ্য গোদি মিডিয়া হয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলের বিশেষজ্ঞ ও সঞ্চালকরা আবার, কোন জাদুতে কে জানে, নিঃসন্দেহে বলে গেলেন সবটাই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে তৃণমূলের চক্রান্ত। এমতাবস্থায় শ্লীলতাহানিতে অভিযুক্ত রাজ্যপালকে সরে দাঁড়াতে বলার সভ্যতা যে বিজেপির নেই, তা জানতে কারোর বাকি নেই। আর সেই নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সময় ও সদিচ্ছা যে ভোটের মরশুমে তৃণমূলের নেই তাও পরিষ্কার হয়ে গেল।

তাহলে? সন্দেশখালি বা রাজ্যপাল – কোনোটাই নির্বাচনের ইস্যু নয়, তাই তো? কিন্তু দিব্যি ভোটারদের ওই আলোচনাতেই ব্যস্ত রাখা গেল। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী চালু করলেন সেই খেলা, যা মোদীর ভীষণ পছন্দের। মমতা মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের নাম করে বললেন, ওঁকে সাধু বলেই মনে করেন না। কারণ ওঁর কাছে খবর আছে, ওই সন্ন্যাসী ভোটে তৃণমূলের এজেন্ট বসতে দেন না। মানে পুরোদস্তুর রাজনীতি করেন। একইসঙ্গে ইস্কন আর রামকৃষ্ণ মিশনও নিজেদের ভক্তদের বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করে বসলেন।

হিন্দুপ্রধান ভারতে ইসলামিক ধর্মীয় সংগঠন মানেই সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া – এই ধারণা সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি, সিনেমা আর সংবাদমাধ্যম মিলে বহু যুগ ধরে জনমানসে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনগুলো যে ধোয়া তুলসীপাতা নয়, সেকথা চট করে কেউ বলে না। গেরুয়া সন্ত্রাস নিয়ে এস এম মুশরিফের বইগুলোর কথা এখনো বিশেষ আলোচিত না হলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস যে বহুকাল ধরে তলে তলে এদেশের অনেককিছুতে ছড়ি ঘুরিয়েছে তা এখন অনেকের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বহু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আরএসএসের শিক্ষায় শিক্ষিত। উপরন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিত্তরঞ্জন দাশ অবসর নেওয়ার সময়ে বিদায়ী ভাষণে খোশমেজাজে জানিয়েছেন, তিনি বরাবর আরএসএসের সঙ্গে ছিলেন। আরেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তো আজ অবসর নিয়ে কাল বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গেছেন। তাঁর মুখের ভাষা এমন, যে ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশনও চক্ষুলজ্জার খাতিরে মমতার বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যের কারণে অভিজিৎকে ২৪ ঘন্টা প্রচারে নিরস্ত করেছে।

আরও পড়ুন যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

ভারত সেবাশ্রমের কার্তিক মহারাজ মুখ্যমন্ত্রীকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে বলেছেন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই তার মুখের মত জবাব দেবেন, নতুবা ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু কার্তিক মহারাজ যে ওই তল্লাটে রীতিমত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান তার পর্যাপ্ত ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। সেসব ভিডিওতে তাঁকে মোটেই সর্বত্যাগী, সংসারে আসক্তিহীন সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না। বরং তাঁর শরীরী ভাষা ও মুখের ভাষা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসা গোরক্ষ মঠের যোগীর বেশি কাছাকাছি।

বিদেশি মুদ্রায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক সংগঠন ইস্কন তার ভক্তমণ্ডলীকে বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে কিনা সে খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে থাকতেই পারে। তেমনটা ঘটা আদৌ অসম্ভব নয়। কারণ আরএসএস এক আদ্যন্ত বাঙালিবিদ্বেষী সংগঠন, আর ইস্কনের মধ্যে যে বাঙালিবিদ্বেষ পুরোমাত্রায় আছে তার প্রমাণ একবছর আগেই পাওয়া গিয়েছিল, যখন অমোঘ লীলা দাস বলে ওই সংগঠনের এক সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দকে সিদ্ধপুরুষ বলে মানতে অস্বীকার করেন তিনি আমিষ খেতেন, চুরুট খেতেন বলে। ইস্কন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল লোকটির বিরুদ্ধে? কয়েকদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে বলা হয়েছিল। ব্যাস!

আসলে বাঙালির মান-অপমান বোধ সম্পর্কে কারোরই খুব উচ্চ ধারণা নেই। বাঙালির আদরের সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশনেরও নেই। থাকলে সেইসময় তারা অমোঘ লীলাকে বুঝিয়ে দিত শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মাচরণে কেন আমিষ-নিরামিষ ভেদ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ আদতে একজন ধর্মগুরু হলেও সত্যের সন্ধান করেছেন গবেষকের মত। শিষ্যদের মধ্যেও অনুসন্ধিৎসা উস্কে দিতেন, বলতেন ‘সাধুকে দিনে দেখবি, রাতে দেখবি’। অর্থাৎ পরখ করে নিবি, লোকটা সত্যিই সাধু কিনা। ফলে ‘যত মত তত পথ’ কথাটা তিনি স্রেফ বাণী বিতরণ করার জন্যে বলেননি। কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন, খ্রিস্টধর্মও অবলম্বন করে দেখেছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন আধ্যাত্মিক সত্য। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেখানে যেখানে তা পাওয়া গেছে, সেই সব পথকেই সত্য বলতে তাঁর কোথাও বাধেনি। ফলে আমিষাশী তন্ত্রসাধক বা নিরামিষাশী বৈষ্ণব – কেউই তাঁর কাছে ব্রাত্য নয়, অহিন্দুও নয়। সেই কারণেই রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের আমিষ খাওয়ায় বারণ নেই। সিদ্ধপুরুষ কী করে হতে হয় বা আদৌ হওয়া যায় কিনা তা অন্য তর্ক। কিন্তু রামকৃষ্ণের তত্ত্বানুযায়ী, তাঁর কোনো শিষ্যের এই কারণেই আমিষ খেয়েও সিদ্ধপুরুষ হতে বাধা নেই।

মিশন কিন্তু এসব ধর্মালোচনায় যায়নি। কারণ হিন্দু উদারপন্থী – এমনকি বামপন্থী – বাঙালির ন্যাকা আবদার রক্ষা করে ধর্মীয়, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ, জগাখিচুড়ি হওয়ার কোনো দায় রামকৃষ্ণ মিশনের নেই। তারা পুরোদস্তুর ধর্মীয় সংগঠন এবং বিশাল আকারের কারণে রীতিমত ব্যবসায়িক সংগঠন বললেও ভুল হয় না। বউবাজারের গয়নার দোকানগুলো যেমন নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে না, রামকৃষ্ণ মিশনও ইস্কন বা ভারত সেবাশ্রমের সঙ্গে কোনোরকম তর্কে জড়ায় না। উপরন্তু দেশে হিন্দু আধিপত্যবাদী সরকার হলে এরা সকলেই খুশি হয়, কারণ কলাটা মুলোটা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার থাকার সময়েই সুদৃশ্য বেলুড় মঠ স্টেশন তৈরি করে হাওড়া-বেলুড় মঠ লোকাল ট্রেন চালু হয়েছিল। বিশেষ উৎসবের দিন ছাড়া সে ট্রেনে কাকপক্ষীও চাপত না। অথচ অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে দেওয়ায় উৎসাহী একটা সরকারও ওই লাইন তুলে দেওয়ার কথা ভাবেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের মোদীমুগ্ধতাও এমন কিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় করার জিনিস নয়। তিনি যখন বেলুড় মঠে এসে রাত্রিযাপন করেছিলেন, সেইসময় তাঁর সঙ্গে দন্তবিকাশ করে সন্ন্যাসীদের সেলফি তোলার বহর আমরা সকলেই দেখেছি। একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে মিশনের সন্ন্যাসীদের এমন নালে ঝোলে অম্বলে হতে দেখলে কী মনে করতেন মিশনের সেইসব প্রতিষ্ঠাতা সন্ন্যাসীরা, যাঁদের জন্যে ভগিনী নিবেদিতাকে মিশনের সংস্রব ত্যাগ করতে হয়েছিল, কারণ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছিলেন?

যা-ই মনে করুন, মোদ্দাকথা হল, মমতা পশ্চিমবঙ্গের তিনটে জনপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা মোটেই পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়ার জিনিস নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো তো আজ ঘটতে শুরু করেনি। কার্তিক মহারাজের দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তা বেআইনি কাজ, তাঁর বিরুদ্ধে পুলিসি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সংগঠনের নিজেদের সদস্যদের কোনো বিশেষ দলকে ভোট দিতে বলা তো বেআইনি নয়। তাছাড়া মমতা নিজেই তো রাজ্যে ইমাম ভাতা, পুরোহিত ভাতা চালু করেছেন, সরকারি টাকায় দীঘায় বিরাট মন্দির বানাচ্ছেন। আবার ঈদের নমাজে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতাও দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাজনীতি বিযুক্ত হয়ে থাকবে – এমনটা আশা করা কি যৌক্তিক? তাহলে নির্বাচনে এই কথাগুলো মমতা কেন বললেন? মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে? তাহলে গোটা দেশে অনর্গল মিথ্যাভাষণ আর ধর্মীয় মেরুকরণ করে মোদী নির্বাচনটাকে যেভাবে নিজের দিকে টেনে আনতে চাইছেন, সেভাবেই কি মমতাও চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হয়ে দাঁড়াক হিন্দু বনাম মুসলমানের? ভারত সেবাশ্রম, ইস্কন ও রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে অসন্তোষ জ্ঞাপন করেছেন আর বিজেপি নেতারা মহানন্দে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন – মমতা সংখ্যালঘু তোষণ করার জন্যে এখন হিন্দু সাধু সন্তদের আক্রমণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গকে মনে হচ্ছে নয়ের দশকের উত্তরপ্রদেশ, যেখানে রাজনৈতিক আলেখ্য আবর্তিত হয় অমুক স্বামী, তমুক সরস্বতী, অমুক শঙ্করাচার্যকে ঘিরে।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এই তবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অবদান।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এসএসসি কেলেঙ্কারি: বনলতা সেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পরের ছেলে

রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি।

ছোটবেলায় এক নিকটাত্মীয়কে দেখতাম ‘গনি খান’ বলতে অজ্ঞান। তখনো আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরী কংগ্রেসের কত বড় নেতা, কোথাকার নেতা, কী তাঁর দোষ বা গুণ – সেসব জানার বয়স আমার হয়নি। এটুকু জানতাম যে তিনি কংগ্রেস নেতা এবং কংগ্রেস আমাদের শত্রু। কারণ কংগ্রেস আমলে আমার বাবাকে অন্য পার্টি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে, পরিবারের অন্যদের উপরেও দমনপীড়ন চলেছে। ফলে ওই আত্মীয়ের গনি-মুগ্ধতা দেখে রাগে ফুলতাম। একদিন আমার মা বোঝালেন ‘আরে রাগ করিস কেন? গনি খানের জন্যে চাকরি পেয়েছেন উনি। নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না?’ বড় হয়ে জেনেছি, গনি খান রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে অনেক বঙ্গসন্তানকেই রেলে চাকরি দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে বহু পরিবার আজীবন তাঁকে ভগবানের মত ভক্তি করত। তাঁর ভাইপো ঈশা খান যদি মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতেন, তাতেও ওই কাজের কিছুটা অবদান থাকবে। সেই বঙ্গসন্তানরা সকলেই কি যোগ্য ছিল? আমার আত্মীয় কি যোগ্য ছিলেন? জানি না। তখন যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, আদৌ কিছু ছিল কিনা – তাও জানি না। মোদ্দাকথা গনি খান যে বিস্তর লোককে ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন তা একটি সর্বজনবিদিত গোপনীয় তথ্য। শুনেছি কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলেও বহু পরিবার আছে যারা একসময় সোমেন মিত্র বলতে অজ্ঞান ছিল অনেকটা একই কারণে। বামফ্রন্ট আমলেও পার্টি-ঘনিষ্ঠ বলেই যে অনেকে চাকরি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদাহরণও আমার পরিচিতদের মধ্যে আছে। তারা সকলে যে অযোগ্য তা নয়, কিন্তু পার্টি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু ওসবের সঙ্গে এখন যে নিয়োগ দুর্নীতির রায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সেই দুর্নীতির কোনো তুলনা চলে না।

কেন চলে না সে ব্যাখ্যায় আসব, তার আগে বলে নিই প্রথম অনুচ্ছেদেই কংগ্রেস আমল, বাম আমলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়োগের কথা কেন বললাম। বনলতা সেনগিরি (‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’) যে কোনো আলোচনাকে লাইনচ্যুত করে। ওই বিড়ালটি প্রথম রাত্রে মেরে রাখার জন্যেই বললাম। বিচারপতিদের কলমের এক আঁচড়ে পঁচিশ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গেল যে দুর্নীতির জেরে, তার সঙ্গে অতীতে কোনো আমলে শাসকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে পাওয়া চাকরির তুলনা চলে না প্রথমত এই কারণে, যে সেখানে শাসক চাকরি বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসেনি। এখন অবধি যতটুকু আদালতে প্রমাণিত এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, তাতেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্কুলের চাকরি কেনাবেচার রাজ্যজোড়া বাজার খুলে বসেছিলেন। ও জিনিস এ রাজ্যে অভূতপূর্ব। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির সঙ্গে হয়ত তুলনা চলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মাপকাঠির প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল ধরে কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা চালু থাকলেও স্কুলশিক্ষক নিয়োগের কোনো মাপকাঠি ছিল না। স্কুলগুলো শূন্য পদ থাকলে নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিত, ইন্টারভিউ নিত, নিয়োগ করত। এই ব্যবস্থারই সুযোগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ চলত। সে রাস্তা বন্ধ করতেই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করা হয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সর্বভারতীয় নেট (National Eligibility Test) বা রাজ্যস্তরের স্লেট (State Level Eligibility Test) পরীক্ষার মত ১৯৯৭ সালে আইন করে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা (প্রথম পরীক্ষা ১৯৯৮ সালে)। অর্থাৎ রাজ্যের সব সরকারপোষিত স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য একটিই পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা এবং কমিশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে ইন্টারভিউতে পাস করলেই স্কুলের চাকরির পাকাপাকি ব্যবস্থা।

বাম আমলের শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জানত, এ রাজ্যে তাদের জন্যে আর কিছু না থাক, একটা সরকারি চাকরি আছেই – স্কুলের চাকরি। ১৯৯৮-২০১০ – এক যুগ এই পরীক্ষা হয়েছে, মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, নিয়োগ হয়েছে। যোগ্যতার যে মাপকাঠি এসএসসি ঠিক করেছিল সেটাই সঠিক কিনা, যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তারাই যে অযোগ্য তার প্রমাণ কী – এসব সূক্ষ্ম তর্ক করাই যায়। কিন্তু ওই বছরগুলোতে অমুককে টপকে তমুক চাকরি পেয়ে গেল কী করে, অমুক তমুকের থেকে কম নম্বর পেয়েছে তাও আগে চাকরি পেল কী করে – এইসব অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিস মামলা মোকদ্দমা হয়নি। অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগ করে কাউকে রাজপথে বসে থাকতে হয়নি একদিনও। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য গতবছর মার্চে বলেছিলেন যে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বাম আমলেও ৪৬,০০০ নিয়োগে অনিয়ম ছিল। তাঁদের সরকার ভদ্রতাবশত সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে যেভাবে তৃণমূল সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজনীতি করছে বিরোধীরা, তাতে এইবার মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি যা বলবেন তাই হবে। ব্রাত্যবাবু কি আজও জানাননি, নাকি মুখ্যমন্ত্রী এখনো চিরশত্রু বামেদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন? জানি না। সেইসময় ব্রাত্যবাবু বলেছিলেন ১৯৯৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে যত নিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। সেই শ্বেতপত্রই বা কোথায় গেল?

এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না
যা-ই হোক, এসএসসি পরীক্ষা চালু রেখেই কীভাবে চাকরি বিক্রির বাজার খোলা যায়, সে বুদ্ধি সম্ভবত তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। তাই ব্যবস্থাটাকেই ধসিয়ে দেওয়া হল ক্রমশ। ২০১৩-১৪ থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে, ২০১৬ থেকে অভিযোগের বন্যা। এখন যে ছেলেমেয়েরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা তারা অনেকেই ত্যাগ করেছে। এসএসসি পরীক্ষা আর কখনো সুষ্ঠুভাবে হয়ে স্কুলে তাদের চাকরি হবে বলে তারা মনে করে না। এই হতাশা নেহাত যুক্তিহীন বলা যাবে না। কারণ আজকাল নিজের ঘরে আগুন লাগার আগে পর্যন্ত কেউ কোথাও আগুন লেগেছে দেখলে গা করে না, আর স্কুলে নিয়োগের সংকট শেষ বিচারে খুব বেশি সংখ্যক পশ্চিমবঙ্গবাসীর সংকট নয়। যাদের চাকরি গেল তাদের সংকট, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সংকট, হয়ত যারা দেবে ভেবেছিল তাদের মানসিক হতাশার কারণ। আর সংকট স্কুল চালাতে নাকের জলে চোখের জলে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যাঁরা আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ের পরে আরও বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে গেছি যে অনেক স্কুলে আর কোনো স্থায়ী শিক্ষকই থাকবেন না ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা ব্যক্তিরা বরখাস্ত হওয়ার পর। অনেক স্কুলে কোনো কোনো বিষয় আর পড়ানো যাবে না শিক্ষক নেই বলে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক আর বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশীদি এই রায় দেওয়ার অনেক আগে থেকেই তো জানা যাচ্ছিল, কোথাও মাসিক তিন-চার হাজার টাকা বেতনে আংশিক সময়ের শিক্ষক চাইছে স্কুল, কোথাও আবার স্থানীয় মানুষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে – যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এসে অমুক বিষয়টা বিনামূল্যে পড়িয়ে দিয়ে যান তো ভাল হয়। স্কুলে ওই বিষয়ের শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্রছাত্রী আছে।

কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষের সমস্যা। যাঁরা পড়ান তাঁদের সমস্যা, যারা পড়ে তাদের আর তাদের বাবা-মায়েদের সমস্যা। এ নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্য টিভি বিতর্ক হয় না। আজকাল তো এতরকম সমীক্ষা হয়। কেউ যদি সমীক্ষা করে, কলকাতার সম্পাদকদের কতজনের ছেলেমেয়ে সরকারপোষিত স্কুলে পড়ে আর যাঁরা স্টুডিওতে এসে গলা ফাটান তাঁদের কতজনের সন্তান ওসব স্কুলে পড়ে – তাহলেই বোঝা যাবে কেন সান্ধ্য বিতর্ক হয় না। এবারে নির্বাচন পর্বের মধ্যে এতগুলো লোকের চাকরি গেছে তাই, নইলে রাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতদূর পাত্তা দিত সন্দেহ আছে। কলকাতা নাকি প্রতিবাদের শহর। সেখানে কয়েকশো ছেলেমেয়ে হাজার দিনের বেশি রাস্তায় বসে আছে (সকলে চাকরির দাবি করেও নয়, অনেকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দাবি করে), অথচ সরকারি স্কুলশিক্ষায় কিছু এসে যায় না এমন কজন মানুষ একবার গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানে? টিভি ক্যামেরাও পৌঁছয় কখনো সরকার বা বিরোধী পক্ষের কোনো নেতার কথায়, কি আদালতের খোঁচায় এই ইস্যু উঠে এলে তবেই। এমনকি এই ১১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা চাকরি পেয়ে যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও কোনোদিন মনে পড়েনি। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসলেন কখন? যখন রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতার দাবি উড়িয়ে দিল। তার আগে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে একটাও মিছিল করেছেন এসএসসির যুগে চাকরি পাওয়া নবীন বা তার আগের যুগে চাকরি পাওয়া প্রবীণ শিক্ষকরা? একদিনও আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে বসেছেন পথে?

২০১৯ সালে যখন ধর্মতলায় প্রায় একমাস ধরে অনশন করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা, তখন একদিন অফিস যাওয়ার পথে গিয়েছিলাম সেখানে। সেদিনও প্রবল গরম আর অদূরে ইডেন উদ্যানে আইপিএলের প্রথম খেলা। কাতারে কাতারে মানুষ ইডেনমুখো। তার মধ্যে ভরদুপুরে মুখ অন্ধকার করে শহরের একেবারে মধ্যিখানে বসেছিল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। কখনো বিমান বসু গেছেন বলে টিভি ক্যামেরা গেছে, কখনো কোনো বিজেপি নেতা গেছেন বলে গেছে। সেবার ব্যাপারটা একটু বিপজ্জনক দিকে চলে যাওয়ায় (আসলে বোধহয় সেটাও নির্বাচনের বছর হওয়ায়) শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে গিয়ে চাকরি হবে আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন। চাকরি হয়নি। কিন্তু সেকথা কে মনে রেখেছিল এতদিন? যে কোনো আন্দোলন অবশ্য এ রাজ্যে এমন প্রতিক্রিয়াই পায়। ছন্দা সাহা, রেবতী রাউত, তাপস বর – এই মানুষগুলোর কারোর মনে আছে আজ? করুণাময়ী মোড় থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে যখন রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আন্দোলনকারীদের নিয়ে গেছে পুলিস, তখন মনে করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কারণ টিভিতে দেখা গেছে, কাগজে ছবি বেরিয়েছে। ব্যাস ওটুকুই।

এখন হাজার পঁচিশেক মানুষের চাকরি গেছে শুনে প্রায় অর্ধশতক আগের বেকারত্বের হারে পৌঁছে যাওয়া দেশের কিছু মানুষ আশ্চর্য রকম খুশি। কেন খুশি জানি না। এদের অনেককেই তো বেকারত্ব নিয়ে অন্য সময়ে চিন্তিত দেখি। ওই যে অটোর পিছনে লেখা থাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ – তেমন কোনো ধর্ষকাম মানসিকতা ছাড়া এর কোনো ব্যাখ্যা নেই বলেই মনে হয়। অবশ্য যে মানুষ পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে দেখে বালতি ভরে জল নিয়ে দৌড়ে যাওয়া দূরে থাক, হায় হায় বলে আর্তনাদও করে না, সে যে ধর্ষকাম তাতে আর সন্দেহ কী? এ যুগে ক্ষেত্রবিশেষে আমরা সবাই ধর্ষকাম। সুতরাং আমাদের তৈরি রাষ্ট্র যে ধর্ষকাম হবে তা বলাই বাহুল্য। আদালত বারবার চাইলেও নিয়ামক সংস্থা কারা পাস করেছিল আর কারা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে তা ঝাড়াই বাছাই করার জন্যে প্রয়োজনীয় ওএমআর শিট জমা দেয় না। সরকার ওএমআর শিট তিনবছর রেখে দেওয়ার নিয়ম বদলে একবছর করে দেয়, তারপর বিপদ বুঝে বলে – এবার থেকে দশবছর রাখা থাকবে। আর আদালত ঝাড়াই বাছাই করা যাচ্ছে না বলে সকলেরই চাকরি খায়।

এমনিতে যে ভারতীয় আদালতে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার গতি সবচেয়ে বেশি, সেটা হল হিন্দি সিনেমার আদালত – আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় পুলিস তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারপতি সাক্ষী সাবুদ যাচাই করে রায় দিয়ে দেন। এদেশের অন্য সব আদালতই রাবীন্দ্রিক – এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না। কিন্তু এই মামলায় দেখা গেল আদালত রীতিমত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। গত ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলার একত্রে বিচার করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে অনুরোধ করেছিল। তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে যাদের চাকরি গিয়েছিল তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশও ছমাসের জন্য রদ করে দিয়েছিল, যাতে ইতিমধ্যে বিশেষ বেঞ্চ বিচারের কাজ শেষ করতে পারে। পাঁচ মাস ২১ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করে দিলেন মহামান্য বিচারপতিরা। এমন নির্দিষ্ট তারিখ মেনে দেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগের বিচারও যদি হত! বোঝা যাচ্ছে আদালতের তাড়া ছিল। এত তাড়া ছিল যে তিনবার বৈধ চাকুরেদের তালিকা দিতে বলা সত্ত্বেও যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন দিল না, তখন তার চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করানো বা বরখাস্ত করার সময় পেল না আদালত। গোটা কেলেঙ্কারিতে ক্যাবিনেটের দায় আছে বোঝা সত্ত্বেও যিনি এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তাঁকেও তখনই ধরতে বলা হল না সিবিআইকে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মামলায় ঘুষ কে বা কারা নিয়েছে তার খোঁজ পরে হবে, আগে বরখাস্ত হল যারা ঘুষ দিয়েছে তারা। সঙ্গে যারা ঘুষ দেয়নি বলে আদালতেরও বিশ্বাস, তারাও।

পরের ছেলে পরমানন্দ
বিচারকদের তাড়া থাকতেই পারে। কার রাজ্যপাল হওয়ার তাড়া, কার সাংসদ হওয়ার তাড়া তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমরা আইন-টাইনও তত বুঝি না। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ঘুষ নেওয়ার চেয়েও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ দেওয়া। আমাদের উদাসীনতা বা ধর্ষকাম মানসিকতা স্বীকার করে নিয়ে মনে করিয়ে দিই, আমরা এমন এক রাজ্যে বাস করি যেখানে কয়েক বছর আগে যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে গেলে শাসক দলের ছাত্র সংসদকে মোটা টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছিল। সেই রাজ্যে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়াকে ঠিক কতখানি অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকে দিয়ে উঠতে পারছি না। আইনে সবকিছু মোটা হরফে লেখা আছে, নীতি ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বসে সন্দেহ করা আদৌ অন্যায় নয় যে যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এমন প্রার্থী আছেন, যিনি সসম্মানে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। কিন্তু অমুক দাদা বা তমুক দিদি হয়ত ডেকে বলেছিলেন, অমুক পরিমাণ টাকা না দিলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না।

এমন কোনো মতলব না থাকলে পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এসএমএসে যোগ্য প্রার্থীদের জানানো হবে বলেছিলেন কেন? পাবলিক পরীক্ষায় কে কে পাস করেছে সে তথ্য প্রাইভেট হবে কেন? এ তো নির্বাচনী বন্ডের মত হয়ে গেল – কে টাকা দিল, কাকে টাকা দিল তা তৃতীয় ব্যক্তি যেন জানতে না পারে। শুধু যে টাকা পেল সে জানবে আর যে দিল সে জানবে। এক্ষেত্রেও যে চাকরি পেল শুধু সে-ই জানল আর যে চাকরি দিল সে জানল। নির্বাচনী বন্ডে ওই ব্যবস্থা করার পক্ষে তবু একটা অজুহাত ছিল। কোন দলকে কে চাঁদা দিচ্ছে জানলে অন্য দল দাতার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি। বরং বহু চাকরিপ্রার্থীই একবার পাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। আর এখন হাজার জোরাজুরিতেও কমিশন জানিয়ে উঠতে পারছে না যে কারা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? এ তো বড় রঙ্গ যাদু।

এই কারণেই না ভেবে উপায় নেই যে আদালতকে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সাহায্য না করার কারণ আসলে অনুত্তীর্ণরা। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জোর দিয়ে বলছেন চাকরি যাওয়া ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে মাত্র ৫,২৫০ জন অযোগ্য। অথচ ‘(বাকিরা যে প্রত্যেকে যোগ্য) সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। পুরোপুরি শংসাপত্র দিতে পারব না।’ কেন পারবেন না? ওএমআর শিট নেই বলে? কেন নেই? ঠিক ২০১৬ সালেই নিয়ম বদলে ওএমআর শিট তিন বছরের বদলে এক বছর রাখলেই চলবে এই নিয়ম করা হয়েছিল বলে? সেই নিয়ম কি করাই হয়েছিল ওএমআর শিট পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে? পুড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো কি আজকের মত পরিস্থিতির কথা ভেবে করা হয়েছিল? যদি আদালতকে ২০,৫০৩ জন যোগ্য প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেওয়া হত তাহলে তাঁদের চাকরি যেত না। যেত কেবল বাকিদের। তখন ওই হাজার পাঁচেক মানুষ সদলবলে যাঁদের হাতে টাকা দিয়েছেন তাঁদের কাছে টাকা ফেরত চাইতেন এবং ব্যাপারটা একেবারে অহিংস থাকত, এমন সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আদালতের রায়ে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অপরাধের কারবারীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থে বেঁচে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর ভাইপো, শিক্ষামন্ত্রী, এসএসসি চেয়ারম্যান – সকলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে বলতে পারছেন, এই তো আবেদন করেছি। কোনো চিন্তা নেই।

ঘটনা হল, আবেদন করলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিতই হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন নির্দেশে)। সেই বেঞ্চের রায় কি একেবারে উল্টে দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা? বড়জোর তমলুকের বিজেপি প্রার্থী, থুড়ি প্রাক্তন বিচারপতি, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ের যেমন প্রয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্যে, তেমন কিছু হতে পারে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তা হলে তৃণমূলের লাভ, না হলে বিজেপির। যাঁদের চাকরি গেল তাঁদের অবস্থা উনিশ-বিশ হবে আর যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের দুর্দশারও কোনো সুরাহা হবে না। ইতিমধ্যে যারা ঘুষ নিয়েছিল তারা হয়ত বাঙ্কার-টাঙ্কার বানাবে অথবা য পলায়তি স জীবতি উপদেশ শিরোধার্য করবে।

আর আমরা? কদিন পরেই যোগ্য, অযোগ্য, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না পাওয়া – সকলের কথাই ভুলে যাব। তারপর হয়ত একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবে। তাতে যদি রায় উল্টে যায় তাহলে যাঁদের চাকরি বেঁচে গেল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবার পরিজনের কাছে তৃণমূল স্বচ্ছ দল হয়ে যাবে; যদি হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে তাঁরা সুদ্ধ সকলের কাছে তৃণমূল চোর বলে প্রমাণিত হবে। বাংলার লক্ষ স্কুল নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল হয়ে গেলে তৃণমূলের কী, বিজেপির কী, আদালতের কী আর আমাদেরই বা কী? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর ওসব স্কুলে পড়ে না। ওগুলো না হয় কদিন পরে উঠে যাবে বা বেসরকারি হয়ে যাবে। সকলেই জানে – বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে।

অতএব ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। নির্বাচনে কে জিতল সেটাই আসল কথা।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

আইএসএফের সঙ্গে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

খবরে প্রকাশ, সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি শিলিগুড়িতে এক সভায় বলেছেন, শিলিগুড়ি পৌর নিগম বামেদের হাতছাড়া হয়েছে সবে কয়েক মাস। কিন্তু এর মধ্যেই তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেছে। সিপিএম তথা বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধুতি পাঞ্জাবির মত শ্বেতশুভ্র ছিল, কোথাও দুর্নীতির লেশমাত্র ছিল না – এমনটা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতির যে পরিমাণ এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে নির্লজ্জা এ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে তা একান্তই তৃণমূল কংগ্রেসের দান। তার মধ্যে কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। আবু বরকত আলি গনিখান চৌধুরীরা সেকালের জমিদারদের কায়দায় রাজনীতি করতেন, অধীর চৌধুরীর মত লোকেরা তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন পেশিশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সেখানেও পরিমাণ মত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে রবিন হুড মার্কা ভাবমূর্তি তৈরি করার প্রয়াস থাকত। বাম আমলেও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজবিরোধীরা অন্তত নিজের এলাকায় গরীবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, অমুক বড়লোককে ‘চমকে’ দিয়ে তমুক গরীবকে একটু স্বস্তি দেওয়া – এসব করত।

কিন্তু মাত্র এগারো বছরের শাসনেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তদন্ত এগোলে অগাধ গোপন সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। অনুব্রত মন্ডলের মত বাহুবলীরা নিজেরাই নেতা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তো বটেই, এমনকি দেশের বাইরেও নেতাদের সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে অনুব্রতর মত নেতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ববি হাকিম বাঘ বেরিয়ে এলেই শেয়ালরা পালাবে ইত্যাদি আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। সাধারণ মানুষ টিভির পর্দায় পাহাড়প্রমাণ টাকা দেখে ফেলায় কদিন নিচু হয়ে থাকা শাসকের গলা আবার সপ্তমে চড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষ যদি ভেবে নেন, শীর্ষ নেতৃত্বের আশীর্বাদেই এত দুর্নীতি চলছে রাজ্যে, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। উপরন্তু মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্যে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের যতটা চোখে লাগে, কর্মসংস্থানের হাহাকার পড়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভাব অনেক বেশি গায়ে লাগাই স্বাভাবিক।

ফলে মীনাক্ষীর কথা বেশকিছু শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্ভবত পারছেও। সেই কারণেই ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে আবার ভিড় হতে দেখা যাচ্ছে। স্রেফ কৌতূহলী জনতার ভিড় নয়, মধ্যবয়স্ক বা পাকা চুলের মানুষের ভিড় নয় – তরুণ তরুণীদের ভিড়। স্কুল নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বছর দশেক হতে চলল, কিন্তু গত এক বছরে যে তীব্রতা এসেছে আন্দোলনে – তাও আগে দেখা যায়নি। এর পিছনেও যে সিপিএমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ, তা এই আন্দোলনকে নিয়মিত নজরে রাখা সাংবাদিকরা সকলেই জানেন। মীনাক্ষী, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্তের মত সিপিএমের ছাত্র, যুব সংগঠনের নেতারা যে এই আন্দোলন নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন, কম্পাস ঠিক করতে সাহায্য করছেন তা তো কারোর কাছেই অবিদিত নেই। যে রাত্রে করুণাময়ী থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক তুলে দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে সাক্ষী গোপাল করে, সে রাত্রেও এঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন উচ্ছেদ আটকাতে। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে সিপিএমের হাবভাব বদল চোখে পড়ার মত। পূর্বতন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলে এই আন্দোলন চলছিল নিজের মত করে। কলকাতার মাঝখানে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে চাকরিপ্রার্থীরা যখন অনশন করছিলেন, তখন পথচারীরা পর্যন্ত উঁকি মেরে দেখতেন না এরা কারা, কেন এখানে বসে আছে। সিপিএম বলত তারা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করতে চায় না বলে ওর মধ্যে প্রবেশ করছে না, কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে আছে। পাশে থাকা মানে কোনোদিন বিমান বসু, কোনোদিন অন্য কোনো নেতার মেয়ো রোড গমনের ফেসবুক লাইভ। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর থেকে স্বয়ং বেশ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের কাছে গেছেন, এই ইস্যু নিয়ে পার্টির পতাকা নিয়ে অথবা নাগরিক মিছিলের নাম দিয়ে একাধিক কর্মসূচি পালন হয়েছে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কড়া রায় তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলেছে আদালতের ভিতরে। কিন্তু আদালতের লড়াইকে রাস্তায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএমের।

কিন্তু রাজ্যের পরিস্থিতির সাপেক্ষে যে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা হল পথে ঘাটে সিপিএমের প্রতি সমর্থন ফেরত এলেও, ব্যালট বাক্সে আসবে কি? কোনো সন্দেহ নেই, কলকাতার ধর্মতলায় সারা রাজ্যের ছাত্র, যুবদের একত্র করে শক্তি প্রদর্শন আর ভোট আদায় এক জিনিস নয়। ২০২৪ এখনো ঢের দেরি, সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। সে নির্বাচনে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল। হয়ত বেশি প্রভাবশালী হবে সিপিএমের হেল্পলাইন, যেখানে মানুষ ফোন করে স্থানীয় দুর্নীতির কথা বলতে পারেন। সিপিএম নেতাদের দাবি দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকায় গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা এবং ডেপুটেশনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যা শুভেন্দু-অভিষেক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে, তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু তেমন ক্ষোভ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও ছিল। সে নির্বাচন অনেকটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে গণভোটে পরিণত হওয়ায় এবং দুয়ারে সরকার আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কল্যাণে তৃণমূল শেষপর্যন্ত হইহই করে জিতেছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোট অন্য ব্যাপার। ইতিমধ্যে দুয়ারে সরকার নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলেরই একাধিক গোষ্ঠীকে কারা কী পেল, কারা পেল না তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে দেখা যাচ্ছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত নিষ্প্রভ। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে কি পারবে সিপিএম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। বামফ্রন্ট, তুমি আজিও আছ কি? কারণ সিপিএম যখন মধ্যগগনে, তখনো বহু জায়গায় তাদের চেয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির মত ফ্রন্টের অন্য দলগুলোরই আধিপত্য বেশি ছিল। তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি যেমন হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সময়ে এই সমীকরণ বামফ্রন্টের হাত শক্তও করেছে। মুর্শিদাবাদে কী অবস্থা আরএসপির? কোচবিহারে উদয়ন গুহর প্রস্থানের পর কেমন আছে ফরোয়ার্ড ব্লক? প্রবাদপ্রতিম চিত্ত বসুর পার্টির উত্তর ২৪ পরগণাতেই বা কী হাল? বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল কংগ্রেস আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মুসলমান এবং হিন্দু নিম্নবর্গীয় মানুষের হাত ধরার জন্যই নাকি শেষোক্ত দলটিকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গেই বা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এইসব প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে বামেরা এ রাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তার উত্তর। কারণ এ রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক করেও নির্বাচনের দিন খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের মোকাবিলা করতে না পারলে ভোটে জেতা যায় না। গোটা রাজ্যে একা তার মোকাবিলা করার মত সংগঠন সিপিএমের এখন নেই, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হবেও না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত