বাকস্বাধীনতা এখন রীতিমতো কমেডি

পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?”

দেশ স্বাধীন হতে না হতেই কমিউনিস্টরা স্লোগান তুললেন “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”;অর্থাৎ এই স্বাধীনতা মিথ্যা। তাঁদের বক্তব্য— এ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, দেশের গরিব নিপীড়িত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে সেটা স্বাধীনতাই নয়। কেবল স্লোগান তুললে তো রাজনীতি হয় না,যে কোনো পার্টিকেই তার বার্তা উদ্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক পথ বের করতে হয়। আজকের রিলের যুগে যেমন, সে যুগেও তেমন গানের মাধ্যমে বার্তা দিলে অনেক সহজে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। বিশেষ করে গান একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষের কাছেও বার্তা পৌঁছে দিতে পারে,যা অনেকসময় বক্তৃতা বা প্যামফ্লেট পারে না। তাই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা,ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে গান বাঁধলেন—মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য। বাংলার প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের প্রকরণ মেনে তাতে ভারতের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হল স্রেফ ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবে। “মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন/কার হাতে থুইয়া গেলায়ো।” সেই গানে মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী নয়, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মত মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও একেবারে নাম করে প্রচণ্ড ব্যঙ্গ করা হয়। সে গান নিষিদ্ধ করেনি ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই গান যাতে ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিল বলেও জানা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি ওই ১৯৪৮ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ওই গানের জন্যে নয়।

বছর চল্লিশেক এগিয়ে আসা যাক। ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বিরোধীরা স্লোগান তোলেন “গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।” কারণ তার কিছুদিন আগেই অভিযোগ উঠেছে— ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানি বোফর্সের কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘুষ খেয়েছেন। গোটা নির্বাচন পর্ব এই স্লোগান চলে,আমরা দেখতাম দেয়াল জুড়ে এই স্লোগান লেখা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। রাজীব তথা কংগ্রেস আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস জনসমর্থন হারায়। একদা রাজীবের মন্ত্রিসভার সদস্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একবারের জন্যও রাজীব নিজে বা কংগ্রেস বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা সাংবিধানিক, তাঁকে চোর বলা মারাত্মক পাপ। অথবা যারা তাঁকে চোর বলছে তারা দেশদ্রোহী, বা তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। ফলে আজ আরও প্রায় ৪০ বছর পরে যখন প্রধানমন্ত্রীকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে ফেলার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; ১৫ বছরের মেয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে এবং তার মাকে এমন ভয় দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; যারা প্রধানমন্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা, কার্টুনের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে এবং উন্মত্ত জনতা তাঁদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সত্যিই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “ইয়ে আজাদী সচ হ্যায় ইয়া ঝুঠা হ্যায়?”এই স্বাধীনতা সত্য না মিথ্যা?

যে দেশে প্রকাশ্যে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে গেলে শতবার ভাবতে হয়— বাড়িতে পুলিশ অথবা গুন্ডাবাহিনী আসবে কিনা, সে দেশে বাকস্বাধীনতা যে ঘোর বিপদে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু যে আমাদের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ বিচারে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই মনে হচ্ছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু সরকার বা আদালতের নয়। কৃতিত্ব দেশের নাগরিকদের। যাবতীয় হুমকি,পুলিশের পেরেক বসানো লাঠি, এ কে ৪৭, জলকামান,কাঁদানে গ্যাস,বুলডোজার সহ্য ও অগ্রাহ্য করে এদেশের সবুজ, অবুঝ,কাঁচা নাগরিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন— বাঁধন যত শক্ত হবে তত বাঁধন টুটিয়ে দেওয়ার সাহস তাঁদের আছে। নিজেদের মর্ত্যে আগত ভগবান মনে করা যে নেতাদের চিরাচরিত প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা যাচ্ছিল না, তাঁদের দম ফাটানো হাসি দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন নাগরিকরা। প্রধানমন্ত্রী নিজের ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে গর্ব করেছিলেন, এখন সেই ৫৬ ইঞ্চিকেই ব্যুমেরাং করে তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কী করে বাঁচবেন তার আঘাত থেকে? ভাবতে গিয়ে রাতে না ঘুম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর, না তাঁর কোটি কোটি টাকা মাইনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের। এক্স আর মেটাকে বলে সব অপছন্দের ভিডিও মোছানোর ব্যবস্থা করছে সরকার। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী নীতিন গড়করি তো সোজা আদালতে চলে গেছেন তাঁর সম্পর্কে পোস্ট মোছানোর জন্যে। কিন্তু কত মোছা হবে? যা ছড়িয়ে গেছে তা তো ছড়িয়েই গেছে,মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার তো কোনো উপায় নেই। তার উপর সোশাল মিডিয়া এমন এক গ্যাঁড়াকল যে যত পোস্ট মোছা হয়, তত নতুন পোস্ট এসে পড়ে। এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? ক্ষমতাশালীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ,প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।

এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও সংসদ চত্বরেই প্রধানমন্ত্রীকে বাঁদর বলছে,তাঁর যাকে তাকে জড়িয়ে ধরার অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

এমন নয় যে কংগ্রেস যতদিন সরকারে ছিল ততদিন ভারত বাকস্বাধীনতার স্বর্গ ছিল আর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই নরক হয়ে গেছে। রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরার আমলেই ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তখন খবরের কাগজের অফিসে সরকারি অফিসার এসে বসে থাকতেন কোথায় কী ছাপা হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে। বাবু দেখে মাথা দোলাবেন, তবে ছাপা হবে। তার প্রতিবাদে সেইসময় কোনো কাগজ সম্পাদকীয় স্তম্ভ খালি রেখেছিল, কেউ বা কাটা চিহ্ন ছেপে দিয়েছিল। অবাধ্য সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি তো ছিলই,অবাধ্য হওয়ায় কিশোরকুমারের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। এমনকী ইন্দিরার সঙ্গে নায়িকার চরিত্রের মিল আছে— এই অলিখিত অভিযোগে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীবকুমার অভিনীত, গুলজারের ছবি আন্ধী। খোদ পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

বাকস্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আরও অজস্র দৃষ্টান্ত আছে স্বাধীন ভারতে। রাজীবের প্রধানমন্ত্রিত্বেই সলমন রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান মৌলবাদীদের চাপে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার ইতিহাস আছে,মৌলবাদীদের সামান্য গণ্ডগোলের ভয়ে তসলিমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করে দেওয়ার ইতিহাসও আছে। একবার তো কলকাতা ফিল্মোৎসবে আসা একখানা ছবিতে (টরাস) লেনিনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা রাজ্য সরকারের পছন্দ হয়নি বলে চলতে দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও উঠেছিল। ফলে শিল্প,সাহিত্যের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাই ধারাবাহিকভাবে ভালো নয়। কিন্তু গত এক যুগে মোদী সরকারের আমলে বা ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলোর শাসনে যা হয়েছে তার মধ্যে বিলক্ষণ নতুনত্ব আছে।

এর আগে বিভিন্ন মতকে বিভিন্ন সময়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, এমনকী ইতিহাস রচনাতেও একটাই বয়ান সর্বত্র সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু, ইন্দিরার ঘোষিত জরুরি অবস্থার বছর দুয়েক (১৯৭৫-৭৭) বাদ দিলে, যাবতীয় সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরে তাকে দিয়ে সরকারি বয়ান বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিমাচল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিরল। মোদী সরকারের আমলে কিন্তু সব মিডিয়ার এক রা,জরুরি অবস্থার ঘোষণা ছাড়াই। যে কারণে গোদি মিডিয়া কথাটার উদ্ভব হয়েছে। ভারত জুড়ে এত সাংবাদিকের গ্রেফতার ও হত্যার খতিয়ানও কোনো রাজ্যে পাওয়া যাবে না। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আমাদের দেশের অবস্থা দেখে বাস কন্ডাক্টরদের মত বলতে হয় “পেছন দিকে এগিয়ে যান।”

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তবে মানুষ এত অদ্ভুত জীব, ভারত এমন আশ্চর্য দেশ যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেও কোথাও কোনো বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে না— এমনটা বেশিদিন হয় না। যেমন রাজনীতিতে হয় না, তেমনি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও হয় না। এখন যে ঠাট্টার স্রোতে স্বয়ং মোদী টালমাটাল এবং রাহুল যাকে রাজনীতির ভাষা করে তুলছেন,সেটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ঋজু বিদূষকরা। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে,পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?” ক্ষমতাকে এইভাবে খেলো করে দেওয়ার পথ কিন্তু দেখিয়েছেন ঋজু বিদূষকরা। কুণাল কামরার ২০১৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায়,তিনি বলছেন— প্রত্যেকবার রামনবমীতে নেতারা তলোয়ার হাতে এসে বলেন, মন্দির ইয়হি বনায়েঙ্গে। তলোয়ার দেখেই মুড খারাপ হয়ে যায়। এত ট্যাক্স দিই, তাও এই ব্যাকডেটেড ওয়েপন! রকেট লঞ্চার-টঞ্চার আনুন, যাতে পাবলিকেরও আস্থা থাকে যে নেতা ঠিকঠাক এগোচ্ছেন। প্রায় এই ভাষাই উঠে এসেছে পাটনার ওই যুবকের মুখে।

এই হাস্যরস যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমান বিপজ্জনক তা বুঝতে পেরে এই বিদূষকদের উপর বহুদিন ধরেই খড়্গহস্ত ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলো। কুণাল, মুনাওয়ার ফারুকি সমেত অনেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা মোকদ্দমা হয়েছে; উন্মত্ত জনতার আক্রমণ হয়েছে; তাঁদের শো করার অপরাধে হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুনাওয়ারকে তো কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকী এসব নিয়েও ঠাট্টা করেছেন বরুণ গ্রোভার,যাঁকে কুণালরা ওঁদের গুরু বলে মানেন। বরুণ তাঁর ‘নাথিং মেকস সেন্স’ শীর্ষক শোয়ের শুরুতেই বলেন— এমন হতে পারে যে কিছুদিন পরে আপনাদের পুলিশ স্টেশন থেকে ডাক এল। ভয় পাবেন না,শুধু তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন। প্রথমত, শো কোথায় দেখেছেন? বলবেন,অ্যান্টিলায়। দ্বিতীয়ত,কমেডিয়ান কে ছিল?বলবেন,সময় রায়না। তৃতীয়ত,জোক কাকে নিয়ে ছিল?বলবেন,রাহুল গান্ধী।

তাহলে ভারতে এখন বাকস্বাধীনতার অবস্থা কি ভালো, না খারাপ? উত্তরটাও বরুণের কথাতেই দেওয়া যাক।

“ভারতে এখন কমেডি করা খুব শক্ত কাজ, কারণ কমেডির সরাসরি প্রতিযোগিতা বাস্তবের সঙ্গে।”

সত্যি কথা। নইলে সরকার বদলের পর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করে দিল কর্তৃপক্ষ, আজ এক দল শিল্পী গিয়ে সাদা করে দিলেন, আবার কাল আরেক দল শিল্পী এসে গেরুয়া রং করলেন লাল রং নিয়ে আপত্তি জানিয়ে— এ কি সম্ভব?

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ইন্দিরা হতে অর্ধশতক পরে মোদীর হাত ধরে ফিরেছে জরুরি অবস্থা

এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক।

আগামী ৪ জুন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে। তার ঠিক ২১ দিন পরেই জরুরি অবস্থা ৪৯ পেরিয়ে পঞ্চাশে পা দেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই দিনটা কাউকে ভুলতে দেয় না। প্রতিবছরই ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ওই ২১ মাস ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার সময়। এবার যদি মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারেন, হয়ত গোটা বছর ধরেই বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে ইন্দিরা গান্ধী কী মারাত্মক স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দেশের কত ক্ষতি করেছে ইত্যাদি। সুখের কথা, তার জন্যে আলাদা করে আয়োজন না করলেও চলবে। কারণ মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে। ইনস্টা রিল প্রজন্মের অনেকেই জানত না কীভাবে সারা ভারতে বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, সাংবাদিকদেরও কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। দশ বছরের মোদী রাজত্বে সেসব দেখানো হয়েছে। তবে ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বকণ্ঠে নতুন কালের সূচনা ঘোষণা করার পরে তাও ঘটেছে যা জরুরি অবস্থার সময়ে ঘটেনি – দুটো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করেছে।

তথ্যের খাতিরে অবশ্য বলতে হবে যে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী জেএমএম নেতা হেমন্ত সোরেন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে আগেভাগেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার চম্পাই সোরেনকে সঁপে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের মত ঝাড়খণ্ডের জোট সরকারকেও ভেঙে ফেলাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। হেমন্ত আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটো আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন। হেমন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে কারাবরণ করার পর, বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন জোট সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেজরিওয়াল ঠিক করেছেন পদত্যাগ করবেন না, কারারুদ্ধ থেকেই প্রশাসন চালিয়ে যাবেন। হয়ত এমনটা করবেন ঠিক করে রেখেছিলেন বলেই তিনি গতমাসে দিল্লি বিধানসভায় নিজেই আস্থা প্রস্তাব এনে আরও একবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি অভূতপূর্ব ঘটনা। ফলে সম্ভব-অসম্ভবের কথা আলাদা, আইনত এমনটা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায়। অমৃতকালে বোধহয় এমনই হয়ে থাকে।

কেবল দুই মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারিই অবশ্য একমাত্র অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে আয়কর বিভাগ। বিশ বছর আগের কর নাকি বকেয়া আছে, এই যুক্তিতে জরিমানা হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের তহবিলে পাহাড়প্রমাণ টাকা জড়ো করেছে বিজেপি, তা তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের প্রথম দফার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ২১ মার্চ বন্ডের নম্বরগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে আরও নানা তথ্য। তার অন্যতম হল দিল্লি সরকারের আবগারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক কাহিনি।

এই সেই নীতি, যা দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে, আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন কেজরিওয়ালকেও গ্রেফতার করা হল। একই মামলায় এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন তেলেঙ্গানার সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতা। এঁদের সকলের গ্রেফতারির পিছনেই রাজসাক্ষী পি শরৎ চন্দ্র রেড্ডির বয়ান। ইনি হায়দরাবাদের অরবিন্দ ফার্মা লিমিটেডের অন্যতম ডিরেক্টর। স্ক্রোল ওয়েবসাইটের তদন্ত বলছে, ২০২২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পাঁচদিন পরে শরৎ বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং কী আশ্চর্য! ইডি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি! তারপরেই তিনি দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান।

অতঃপর শরৎ বিজেপিকে আরও ২৫ কোটি টাকা দেন। এর সঙ্গে কেজরিওয়ালদের গ্রেফতারির সম্পর্ক বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, পাঠক বুদ্ধিমান।

হেমন্তের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। দেশজুড়ে যতজন বিরোধী নেতাকে ইডি গ্রেফতার করেছে, তাঁদের কারোর বিরুদ্ধেই মামলা কিন্তু কোথাও পৌঁছচ্ছে না। প্রায়শই এ আদালত সে আদালতের বিচারক ইডিকে ধমকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনারা কি সত্যিই মামলার নিষ্পত্তি চান? শিবসেনার সঞ্জয় রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুখ্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে সঞ্জয়ের জামিন আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ইডির আচরণ কোথাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কয়েকদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, ইডি কাউকে গ্রেফতার করলে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয়।

অর্থাৎ দেশের সরকার কোনোরকম কার্যকারণ না দেখিয়েই মানুষকে গ্রেফতার করার অধিকার দাবি করেছিল। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ আইনটার অবশ্য বদনামই আছে অযৌক্তিক দমনমূলক আইন হিসাবে। কিন্তু সে অন্য আলোচনার বিষয়। আমরা বরং দেখি, জরুরি অবস্থার ইন্দিরা-সঞ্জয়কেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত কী কী কাজ হয়ে চলেছে লোকসভা নির্বাচনের মুখে।

বিদায়ী সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে দুই কক্ষ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষের ১৪৬ জন সাংসদকে নানা ছুতোয় সাসপেন্ড করে একতরফা পাস করিয়ে নেওয়া হল নতুন টেলিকম আইন আর পুরনো ফৌজদারি আইন বাতিল করা তিনটে নতুন আইন, যেগুলো মারাত্মক দমনমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামান্য চণ্ডীগড়ের কর্পোরেশনও যাতে বিরোধী জোটের হাতে না যায় তার জন্যে অনিল মাসি নামক এক নির্লজ্জ আধিকারিককে দিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যালট বিকৃতি ঘটিয়ে আপের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হল বিজেপি প্রার্থীকে। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করা মাত্রই দেখা গেল কয়েকজন আপ কাউন্সিলর দলবদল করে ফেলেছেন। মোদীজির নেতৃত্বে হঠাৎ আস্থা জেগে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত কড়া অবস্থান নেওয়ায় চণ্ডীগড় কর্পোরেশনে ভোটারদের রায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনকেও ছাড়া হচ্ছে না। সেখানেও রাত দুটোর সময়ে এক প্রার্থীকে বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন।

হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভা নির্বাচনের ভোটাভুটির আগে কংগ্রেসের কয়েকজন বিধায়ক উধাও হয়ে গেলেন। সেই ছজন কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ‘টাই’ হয়ে যায়। টসে জিতে যান বিজেপি প্রার্থী। ওই বিধায়কদের স্পিকার পরে সাসপেন্ড করেন। একই দিনে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনেও ক্রস ভোটিংয়ের ফলে বিজেপির একজন অতিরিক্ত প্রার্থী জিতে যান। সবই অবশ্য বিবেকের সহসা জাগরণ, মোদীজির নেতৃত্বে ভারতের দুর্বার অগ্রগতিতে আস্থা তৈরি হওয়ার ফল।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে দ্বিখণ্ডিত করে একনাথ শিন্ডেকে সমর্থন দিয়ে সরকার গড়েছিল বিজেপি। অতঃপর নির্বাচন কমিশন দল ভেঙে বেরিয়ে আসা শিন্ডে গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে শিবসেনার প্রতীক তাদেরই দিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে রাজ্যের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির প্রতিও। শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ ছিল। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই হয়ে গেলেন ধপধপে সাদা। তারপর নির্বাচন কমিশন তাঁর গোষ্ঠীকেই আসল এনসিপি গণ্য করে দলীয় প্রতীক দিয়ে দিল। দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা শরদের দলকে এখন লড়তে হবে অন্য প্রতীকে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৪০০ পার করার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করারই অঙ্গ এসব। রাজ্যসভা, লোকসভা – দুই কক্ষেই দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই বিজেপির। নইলে সংবিধানের ল্যাজা মুড়ো বদলে দেওয়া যাবে না, ২০২৫ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করাও স্বপ্নই থেকে যাবে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত চেয়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল তা অসম্ভব। কীভাবে সম্ভব করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত সাফল্যের পর বিজেপি বা এনডিএর পক্ষে আসন আরও বাড়ানোও অনেকের অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির হাতে ছিল কেবল দলীয় কর্মীবাহিনী আর রাজ্য প্রশাসন। মোদীর হাতে আছে যাবতীয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি।

নির্বাচন কমিশনটাকেও করতলগত করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্যে গঠিত কমিটিতে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। মোদী সরকার নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে ঢুকিয়েছে মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে, অর্থাৎ বিরোধী দলনেতার ভূমিকা হয়ে গেল দর্শকের। নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করে যেমন সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল, তেমন এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেও মামলা হয়েছে। সে মামলার শুনানি হওয়ার আগেই সাত তাড়াতাড়ি সভা ডেকে দুজন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছে সরকার। বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে শ দুয়েক নামের তালিকা হাতে ধরিয়ে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। মামলা গ্রহণ করে বিচারপতিরা বলেছেন, নির্বাচন এসে যাওয়ায় ওই আইনে স্থগিতাদেশ দিতে চান না। কিন্তু আর যা যা বলেছেন, তাতে আইনটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সদয় বলে মনে হচ্ছে না। সরকারের এত তাড়া কিসের – সে প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু তাতে কী? যতদিনে এ মামলার রায় বেরোবে, ততদিনে হয়ত নির্বাচন মিটে যাবে। ঠিক যেমন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে মামলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, রায় বেরোল ২০২৪ সালে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আবার চেয়েছিল নির্বাচন পর্ব চুকলে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য প্রকাশ করতে। তারপর সুপ্রিম কোর্টের ধমকের জোর যত বাড়ল, তথ্য প্রকাশের গতিও তত বাড়ল। এখন দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ডের মামলায় নিজেদের রায় রিজার্ভ করার পরেও বিজেপি সরকার বন্ড ছাপা বন্ধ করেনি। ২০২৪ সালের তৃতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই ৮,৩৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড ছাপা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৮ সাল থেকে বন্ডে মোট ৮,২৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। আর যে যে দল বন্ডে টাকা নিয়েছে তারা সকলে মিলেও এত টাকা পায়নি। এর পাশে রাখুন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া, টাকা কেড়ে নেওয়া। কোনো সন্দেহ নেই, এরপর কংগ্রেস অনেক আসনে প্রার্থী দিতেই খাবি খাবে। ইতিমধ্যেই গুজরাটের এক আসনে নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়া প্রার্থী প্রথমে বাবা অসুস্থ – এই কারণ দেখিয়ে নিজের নাম তুলে নেন, তারপর পার্টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁকে আর তাঁর বাবাকে নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব চরম অসম্মান করে এসেছেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস নেতারা সনাতন ধর্মকে সম্মান করেন না।

এরপর কী হতে যাচ্ছে, কোন বিরোধী নেতা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন আমরা জানি না। শনিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের বাড়িতেও সিবিআই হানা দেয় এবং শূন্য হাতে ফিরে যায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সরকারবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চাতক পাখির মত আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই – যদি এমন কোনো রায় দেওয়া হয় যাতে সরকার কোণঠাসা হয়। এমনটা যে দেশে হয়, বুঝতে হবে সে দেশের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেই এমন হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত লোকেরা আবার অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝেন রক্তপাতহীন নির্বাচন। সেই সরলমতি মানুষগুলোর উদ্দেশে বলা যাক, এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক। এমনিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে নির্বাচন কমিশনের ভারি অনীহা। উত্তর দিয়ে দিলে কথা ছিল না, কিন্তু আলোচনাই করতে না চাওয়া যে প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে তাকে গোদা বাংলায় বলে ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’, ‘আমি তো কলা খাইনি।’ আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না, তাই কেবল একটা তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দ্য কুইন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, একটা-দুটো নয়, মোট ৩৭৩ আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে গোনা ভোটের বিস্তর তফাত ছিল। এই তফাতের কোনো ব্যাখ্যা কমিশন আজ পর্যন্ত দেয়নি।

তাহলে করণীয় কী? আমার-আপনার মত সাধারণ নাগরিকের কী করা উচিত জানি না, বিরোধী দলগুলোর অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে পথেঘাটে আন্দোলনে নামা উচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ নির্বাচনে তারা যাতে নিজেদের শক্তি অনুযায়ীও লড়তে না পারে সরকারের তরফে তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়ত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যে বিরোধীপক্ষের সেরা বক্তারা প্রায় সবাই কারান্তরালে থাকবেন প্রচার পর্বে। সুতরাং এখন আর আলাদা করে প্রচার, আসন সমঝোতা – এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী? পথে নামা ছাড়া বিরোধীদের সামনে প্রচারেরই বা আর কোন পথ খোলা আছে? প্রায় কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই তো বিরোধীদের জায়গা দেবে না। টাকাপয়সার বিপুল অসাম্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠাও তৃণমূল কংগ্রেসের মত দু-একটা দল ছাড়া বাকিদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রাস্তাই একমাত্র রাস্তা নয় কি?

অথচ আমরা কী দেখছি? কংগ্রেসের তিন প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখছি। ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন নিবেদন করতে দেখছি। দিল্লির রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কবে দেখব? কেরালায় কংগ্রেস, সিপিএম দুই দলই পথে নেমেছে। কিন্তু দেশজুড়ে বিরোধীদের পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলন কবে দেখব? এদেশের বিরোধীরা কি তেমন আন্দোলন করতে ভুলে গেছেন? ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে দিল্লির চেহারা এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আম আদমি পার্টির উত্থানই তো রামলীলা ময়দান আঁকড়ে পড়ে থাকা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। সে আন্দোলনে যিনি কেজরিওয়ালের গুরু ছিলেন, সেই আন্না হাজারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত ছিলেন। কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর জেগে উঠে সংবাদসংস্থা এএনআইকে বিবৃতি দিয়ে গ্রেফতার সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণটি জব্বর।

ওসব কথা থাক। প্রশ্ন হল, নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময়ে আন্দোলন, রাজনীতি সম্পর্কে যে বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিকদের মনে, বিজেপিবিরোধীরা কি এখন তারই ফাঁদে পড়েছেন? ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকেই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, এমনকি এই শতাব্দীর গোড়া থেকে এ রাজ্যের কমিউনিস্ট শাসকদেরও আমরা বলতে দেখেছি – মিছিল মানুষকে অসুবিধায় ফেলে, বনধ কর্মনাশা ইত্যাদি। তাই বোধহয় এখন আন্দোলনের বদলে আদালতে ভরসা রাখতে হচ্ছে। যেসব দলের নির্বাচনে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে মাইনাসে, তারাও গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে কে কোন আসনে লড়বে তা নিয়ে দরাদরি করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে ‘অমুক আসন আমাদের সেন্টিমেন্ট’, ‘কেউ বলছে তমুক আসনে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী’। যেন দাঁড়ালেই ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ হয়ে যাবে।

এদেশের বিপন্ন মানুষ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসায় না থেকে নিজের মত করে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশের কৃষকরা আবার পথে। মোদী সরকার তাঁদের পথে আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা পিছু হটছেন না। যদিও সরকারের বদান্যতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, সোশাল মিডিয়া থেকেও কৃষক আন্দোলনের খবর উধাও।

লাদাখের মানুষও গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে রোজ রাস্তায় নামছেন, পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে সুবিখ্যাত সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছেন।

ভারতের মত বিরাট দেশের অমিত ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের আন্দোলন যে একেবারেই সফল হতে পারে না তা নয়। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনই দেখিয়ে দিয়েছে গণআন্দোলনের ক্ষমতা কতখানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে না এমন আন্দোলনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আছে। ২০১৯-২০ সালের এনআরসি, সিএএবিরোধী আন্দোলনেরও সেই সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েনি, আন্দোলনকে এবং তার দাবিগুলোকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেয়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা হয়ে যায় – এটা মুসলমানদের সমস্যা, তাই ওরা আন্দোলন করছে। একইভাবে এখনো বহু মানুষ ভাবছেন কৃষি আইনগুলো কৃষকদের সমস্যা, লাদাখের ব্যাপারটা লাদাখের মানুষের সমস্যা আর মণিপুর তো বিস্মৃত, কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্পনাতেও নেই। এককথায় দেশের বিরোধী রাজনীতি সময়ের চেয়ে, পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। যতদিন পিছিয়ে থাকবে তত দ্রুত ভারত ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তায়িপ এরদোগানের তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। এখন জরুরি অবস্থা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত