যোগাযোগ

মর্গের মত ঠান্ডা প্রেক্ষাগৃহে দর্শককে উলঙ্গ করে দিলেন শিল্পীরা

সবশেষে বারবার ধর্ষিতারা উঠে দাঁড়ালেন, আর কেন্দ্রে থাকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য আমার এবং আমার ডানদিকে বসে থাকা বৃদ্ধের মাথা নিচু করে দিয়ে বিবস্ত্র হলেন।

ভারতীয় ছেলেদের যে বয়সে পুরুষদেহ যে নারীদেহের চেয়ে আলাদা সেই চেতনা জাগ্রত হয়, নারীদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ এবং সেই কারণে কৌতূহল তৈরি হয়; সেই বয়সে বন্ধুদের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে পরিচয় হয়, ফলে উলঙ্গ নারীশরীর দেখার সুযোগ হয়। সেই বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে কথাবার্তা বলার, ঠাট্টা ইয়ার্কি করার বয়সে পৌঁছেছি, নগ্নতা আর যৌনতা সমার্থক হয়ে গেছে এবং সে সম্পর্কে আকর্ষণ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে – সেইসময় ওই পর্যন্ত গড়ে ওঠা সমস্ত ফ্যান্টাসি চুরমার করে দিয়েছিল একটা ছবি। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ১২ জন মহিলা নিজেদের জামাকাপড় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘকালীন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে। ২০০৪ সালে তাঁদের ওই উলঙ্গ প্রতিবাদের প্ররোচক ছিল আসাম রাইফেলসের হাতে থাংজাম মনোরমা নামে একটি মেয়ের ধর্ষণ ও খুন। ওই ১২ জনের হাতের সাদা ফেস্টুনে লাল কালিতে লেখা ছিল ‘INDIAN ARMY RAPE US’ (ভারতীয় সেনাবাহিনী, আমাদের ধর্ষণ করো)। অনেক পরে অগ্রজদের মুখে শুনেছি মহাশ্বেতা দেবীর গল্প অবলম্বনে মণিপুরী নাট্যকর্মী কানহাইয়ালাল হেইসনাম রচিত দ্রৌপদী নাটকের কথা। এক দাদা বলেছিলেন, শেষ দৃশ্যে অভিনেত্রী সাবিত্রী হেইসনাম যখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ালেন, তখন তিনি লজ্জা পাননি। লজ্জা পেয়েছিলেন, ভয় পেয়েছিলেন আমার দাদাটিই। একই অভিজ্ঞতা আমার কখনো হবে বলে ভাবিনি। হল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, বুধবার, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে।

ওই সন্ধেয় পরপর ছটি পরিবেশনার (অন্য কোনো শব্দের আওতায় সবকটিকে আনতে পারছি না। কারণ নাটক ছিল, নাচ ছিল, গল্প বলা ছিল, ছবি আঁকা ছিল, মূকাভিনয় ছিল) শেষে ছিল ক্যান্টিন আর্ট কালেক্টিভের মুজাহেমাৎ (প্রতিরোধ)। ছজন অভিনেত্রী, এক অভিনেতা (একজন বৃহন্নলার ভূমিকায়) এবং এক শিশুশিল্পী মঞ্চে নিজেদের শরীরে ফুটিয়ে তুললেন পাচার হয়ে যাওয়া, যৌনকর্মী হয়ে যাওয়া, তারপরেও ধর্ষিত হয়ে চলা মেয়েদের রক্তাক্ত জীবন। পুরুষ (জয়রাজ ভট্টাচার্য) সেখানে দুটি নির্বাক ভূমিকায় – একবার খদ্দের, পরেরবার চাবুক হাতে রাষ্ট্র। সবশেষে বারবার ধর্ষিতারা উঠে দাঁড়ালেন, আর কেন্দ্রে থাকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য আমার এবং আমার ডানদিকে বসে থাকা বৃদ্ধের মাথা নিচু করে দিয়ে বিবস্ত্র হলেন। আমাদের লজ্জা নিবারণের জন্য তাঁকে জাপটে ধরলেন অন্য শিল্পীরা, তুলে ধরলেন মণিপুরের স্মৃতি উস্কে দেওয়া সাদা ফেস্টুন। লাল কালিতে লেখা ‘KOLKATA POLICE RAPE US’।

তার আগেই প্রাচ্য নাট্যদলের ইনকিলাব নাটকের শিল্পীরা মঞ্চের একেবারে সামনে এসে আঙুল তুলে অভিযুক্ত করে দিয়েছেন ‘তুমি ধর্ষক, তুমি পুলিস, তুমি…’। ফলে আর পালাবার পথ নেই। দারিও ফো আর ফ্রাঙ্কা রামে-এর রচনা অবলম্বনে তৈরি সেই নাটকে ধর্ষণ, খুনের ধারাবিবরণীর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চে চলকে পড়েছে রক্ত। এক অভিনেত্রীর মত বমি ঠেলে উঠেছে আমার পেট থেকেও, অনেক কষ্টে সামলেছি। আমার বাঁদিকে বসা তরুণীর ফোঁপানোর আওয়াজ কানে এসেছে। তারও আগে অনিতা অগ্নিহোত্রীর দীর্ঘ কবিতা ‘পুনরুত্থান কাব্য’ অবলম্বনে তৈরি ইন্দুদীপা সিনহা নির্দেশিত নাটকের অভিনেত্রীরা দাঁড় করিয়েছেন মৌলিক প্রশ্নের সামনে – আমিও কখনো অজান্তে আমার স্ত্রীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করি না তো?

সন্ধের শুরু থেকেই অরাজনৈতিক চতুর্থ দেওয়াল ভেঙে দিয়েছেন সঞ্চালক সঞ্জিতা। মঞ্চের উপর মাইক হাতে বলতে শুরু করে কিছু পরেই দর্শকাসনে নেমে এসেছেন। কথা বলতে শুরু করেছেন আমাদের চোখে চোখ রেখে, খালি গলায়। সংগ্রাম মুখার্জি তাঁর নৃত্য পরিবেশনা ডান্স ফর হোয়াট-এ ব্যবহার করেছেন নিউজ চ্যানেলের কোলাহল, ডোনা গাঙ্গুলির সাউন্ড বাইট, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাউন্ড বাইট। ন্যাকা উচ্চারণে আমাদের ন্যাকামিকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘আমরা কী সুন্দর প্রতিবাদ করছি!’ তারপর নিরাময়ের মত ভেসে এসেছে তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবনের প্রধান শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতির কণ্ঠ। মঞ্চের শিল্পীরা কখন যে চরিত্রের আড়ালে রয়েছেন আর কখন যে দেখছি ভিতরের আসল মানুষটাকে – তা ক্রমশ গুলিয়ে গেছে। কারণ দেখতে পেয়েছি নিকটাত্মীয়ের হাতে যৌন নির্যাতনের কথা বলতে বলতে এক অভিনেত্রীর চোখ থেকে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। ওটা অভিনয় কিনা, পাঠক, আপনি সেদিন অ্যাকাডেমিতে উপস্থিত থাকলে আপনারও গুলিয়ে যেত। আসলে আমার মন তো জানে, যে কথাগুলোকে সংলাপ বলে ভাবছি, যে দৃশ্যগুলোকে সাজানো বলে মনে করছি মঞ্চে ঘটছে বলে, সেগুলো সত্যি সত্যি ঘটে চলে আমার আশেপাশে। হয়ত সেই সচেতনতায় আমার অ্যাকাডেমির ছোট্ট হলকে আরও ছোট মনে হতে শুরু করেছিল। সংগ্রাম নাচতে নাচতে এক ফাঁকে দর্শকদের বলেই দিলেন ‘You don’t deserve light’। ফলত আরও অন্ধকার, আরও ঠান্ডা মনে হচ্ছিল হলটাকে। ঠিক যেরকম ঠান্ডা লাগছিল বছর দুয়েক আগে এক নিকটাত্মীয়ের দেহ নিয়ে মর্গের ভিতর দাঁড়িয়ে।

শিল্পীরা এই পরিবেশনা দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শককে ঘেরাও করেন। শুরুতে মধুরিমা গোস্বামীর বিজয়লক্ষ্মী কোঠারি রচিত বাত কুছ দিল কি কথন আর সঙ্গে সঙ্গে ত্রিগুণার ছবি আঁকা রীতিমত সহনীয় ছিল, যদিও মানুষের অবচেতনের দিকে এক অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ছিল তার মধ্যে। সেখান থেকে পরতে পরতে দর্শকের অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়ে শেষবার যবনিকা পতনের আগে শ্রাবন্তীর ওইভাবে আমাদের ল্যাংটো করে দেওয়া – এক সুচিন্তিত আক্রমণ।

আরও পড়ুন হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক

বুধবার কলকাতায় রীতিমত দুর্যোগ, অন্ধকার নেমেছিল অন্যদিনের চেয়ে তাড়াতাড়ি। নাছোড় বৃষ্টিতে অ্যাকাডেমি, রবীন্দ্র সদন চত্বর সন্ধে থেকেই জনবিরল। অ্যাকাডেমি থেকে যখন ছাতা মাথায় বেরোলাম, তখন রীতিমত নির্জন। তাই হেঁটে এক্সাইড মোড় পর্যন্ত আসতে সুবিধা হল। ল্যাংটো অবস্থায় কে-ই বা অন্য মানুষের মুখোমুখি হতে চায়? মনে হচ্ছিল পথটা আরও দীর্ঘ হলে মন্দ হত না। সবচেয়ে ভাল হত হেঁটে হেঁটেই আমার গন্তব্যে পৌঁছনো গেলে। বাসে, ট্রেনে ওঠা মানেই ওই অবস্থায় অন্য মানুষের, বিভিন্ন নারীর মুখোমুখি হওয়া। বাড়ি ফেরা মানেও দুজন নারীর সামনে দাঁড়ানো। আরও দেরি হলে ভাল হত। নিজেকে একটু সামলে নেওয়া যেত। প্রবল অস্বস্তি নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছলাম, তখনো কানে বাজছে ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া/করিতে পারিনি চিৎকার।’

শিল্পীদের এমনি এমনি দ্রষ্টা বলা হয় না। কানহাইয়ালাল আর সাবিত্রী দ্রৌপদী নাটকে ওই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন মণিপুরের মহিলারা রাজপথে ওই প্রতিবাদ করার আগেই। কামনা করি, শ্রাবন্তীরা যেন দ্রষ্টা না হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের যেন মণিপুরের মেয়ে না হতে হয়। যদিও শিল্পীরা প্রশ্ন তুলে দিলেন ‘নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ’?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

 

বিচিত্র বিপন্নতার গল্প সংকলন

দেবতোষ দাশ থ্রিলার লেখেন (থ্রিলার লেখেন! ছিঃ!)। দেবতোষ দাশ জনপ্রিয় লেখক (এ মা! জনপ্রিয়!)।

এত বড় বড় অভিযোগ আজকাল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার খুব কম লেখক সম্পর্কেই করা যায়। দুটো অভিযোগই প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও দেবতোষ দাশ কোনো এক প্রণোদনায় ছোটগল্পও লেখেন, যার পাঠক দিনদিন কমছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গল্প লেখার গ্রুপে কমছে না, কিন্তু বইয়ের পাঠকদের মধ্যে কমছে। তা কি ফেসবুক গ্রুপের মত বইতে নিজেও লিখে লাইক পাওয়া যায় না বলে, নাকি বইয়ের গল্প মোবাইলে পড়ার সুবিধা নেই বলে? নাকি সত্যিই এমন গল্প পর্যাপ্ত পরিমাণে লেখা হচ্ছে না এই বাংলায়, যা পাঠককে টানে? পাঠককে কোন লেখা টানে, কেন টানে – এসবও গুরুতর প্রশ্ন বটে। এত প্রশ্নের সম্মুখীন সাহিত্যের এক ধারায় দেবতোষবাবু সাঁতরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প নামক তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন ধরে।

নামের মতই এই বইয়ের অধিকাংশ গল্পও কৌতূহলোদ্দীপক। লেখক যেমন বাংলা গল্পে সচরাচর অপরিচিত বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তেমন পরিচিত পরিবেশ, পরিস্থিতিকেও এমন এক চোখ দিয়ে দেখেছেন যা গল্পে নতুনত্ব আনে। তিব্বতে চীন রাষ্ট্রের হানাদারি নিয়ে বাংলায় কি নিয়মিত লেখা হয়? গল্প উপন্যাস দূরের কথা, প্রতিবেদনই বা কটা লেখা হয়? হয় না যে, তাতে হয়ত লেখকদের অধ্যয়ন আর কল্পনাশক্তির অভাবের পাশাপাশি এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত-চীনের সম্পর্কেরও ভূমিকা আছে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির যেসব ধারা বহমান, সেগুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষার লেখকদের বিভিন্ন সময়ের ঘনিষ্ঠতা এবং তজ্জনিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতি পক্ষপাতও সম্ভবত খানিকটা দায়ী। যাঁরা দেবতোষবাবুর অন্য লেখার সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা কিন্তু জানেন যে তিব্বতের রাজনীতি এই লেখকের প্রিয় বিষয়। এই সংকলনের ‘দখল’ গল্পেও সেই হানাদারির কাহিনি রয়েছে।

অফিসারের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে সে একটা বাক্যই বলেছিল – কীসের পারমিট, এই দেশ তো আমার!

গল্পের এই শেষ বাক্য যে বাস্তবের সামনে পাঠককে দাঁড় করায়, তাতে তিব্বতের মানুষের সঙ্গে তফাতের চেয়ে মিলের দিকটাই বেশি প্রকট হয়। সেই মিল হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত হয়ে ওঠে সংকলনের শেষ গল্পে, যার নাম ‘এনআরসি ও আমাদের অভিজ্ঞানপত্র’। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা বাঙাল বৃদ্ধ সুনীল ফোনে খবর পান – তাঁর আসামের অধিবাসী দিদির নাম ওঠেনি এনআরসিতে। তা নিয়ে তাঁর নিরাপত্তাহীনতা, দুশ্চিন্তা এই গল্পের কেন্দ্রে। মানুষকে রাষ্ট্রের কাছে অনবরত প্রমাণ করে যেতে হবে তার অস্তিত্বের বৈধতা, মানুষের তৈরি রাষ্ট্র মানুষকেই অবৈধ ঘোষণা করবে – বিশ্বজুড়ে অতিমারী হয়ে উঠেছে এই ব্যবস্থা। তার শিকার যেমন নামহীন তিব্বতি যুবক, তেমনই ৬০-৭০ বছর আগে পূর্ববাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমে চলে আসা বাঙালি বৃদ্ধ। লেখক তিব্বতি যুবকের জন্যে কোনো উপশম রাখেননি। তবে সুনীলের জন্য, কাল্পনিক হলেও, এক স্বস্তির পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন।

‘দিদি, তর নাম নাই রেজিস্টারে আর আমিও ছিঁড়ি উড়াই দিসি কাগজ! আমরা আর হিন্দুস্তানের না, দিদি চল চলি যাই ফেনী। আমগো ফেনী। মধুপুর! নিব না আমগোরে? নিব না? নিব না?’

স্বামীর বিড়বিড়ানি শুনে এগিয়ে আসেন মণিমালা। হাত রাখেন পিঠে।

হালকা হয়ে যান সুনীল। মাধ্যাকর্ষণটুকু যেন এখন অগ্রাহ্য করতে পারছেন। সীমানাও তিনি পেরিয়ে যেতে পারছেন সহজেই।

এই বিপন্নতাকে লেখক একেবারে নতুন প্রকরণে পেশ করেছেন ‘কাগজ’ গল্পে। সাংবাদিক আইরিন যা লিখতে চায় তা লিখতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ তা ‘পলিসির বিরুদ্ধে’। সেই চাকরি থেকে বেরিয়ে এসে যখন স্বাধীন সাংবাদিক হয়ে গেল সে, তখন

অফিস থেকে বেরিয়েই টের পেল স্বস্তি, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিলপিল করে উঠে আসছে।

কিন্তু অচিরেই

ইনডিপেন্ডেন্ট প্রেস বলে যে কিছু হয় না, কিছুদিন একা-একা কাজ করেই বুঝে গেল। আবার হয় না বললেও ভুল বলা হয়, হয়, একটু কায়দা করে প্রকাশ করলেই যা-বলার ইচ্ছে, বলা যায়। আর্ট অব ডাইভারশন।

কীভাবে এই ‘আর্ট অব ডাইভারশন’ ব্যবহার করে যা বলতে চায় তা বলে আইরিন – সেটাই গল্প। কিন্তু লেখক সে গল্প বলতে যেমন চলে গেছেন ‘আর্ট অব ডাইভারশন’-এর ইতিহাসে, তেমন ব্যবহার করেছেন চিত্রনাট্যের স্টোরি বোর্ডও। এভাবে গল্পের প্রকরণ বাদ দিয়ে একেবারে অন্য প্রকরণে গল্প লেখা যে সহজ নয় তা যাঁরা চেষ্টা করেছেন তাঁরা জানেন। যাঁরা কারদানি দেখানোর জন্য করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁরা হয়ত আরও বেশি জানেন। কিন্তু সে তো গেল লেখকদের কথা। পাঠককে এই নিরীক্ষার সামনে এসে থমকে দাঁড়াতেই হবে। সাহিত্য পড়া মানে যে এমন এক অভিজ্ঞতা যা পাঠককেও বদলে দেয়, তা টের পাওয়া যাবে। কারণ এই অভিজ্ঞতা নতুন।

আরও পড়ুন অবসাদের গল্প: বিপন্ন বিস্ময়ের গল্পকার গৌতম

লক্ষণীয় যে এই সংকলনের যে গল্পগুলো ছুঁয়ে যায়, ভাবায় – তার প্রত্যেকটাই নানাবিধ বিপন্নতার গল্প। যেগুলো তেমন ছাপ ফেলে না, সেগুলোতে বরং লেখক কিছু নিস্তরঙ্গ জীবনের আখ্যান পেশ করেছেন। সেসব গল্পের যে সংকট, সেগুলো হয় চরিত্রদের একান্ত ব্যক্তিগত অথবা আরোপিত। ‘শান’, ‘জন্মদিনের সেলফি’ বা ‘রি-ইউনিয়ন’ সেই ধরনের গল্প। বই বন্ধ করা মাত্রই ওই গল্পগুলো সম্ভবত বিস্মৃত হবেন পাঠক। কিন্তু ভোলা যাবে না ‘ম্যানিকিনের শরীর’-এর অটোচালক নন্দকে, যার উপলব্ধিতে ‘ম্যানিকিন হলেও, বলাৎকার তো বলাৎকারই!’ সংবেদনহীন সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে একজন বোকা নন্দ যে যুগপৎ অমূল্য এবং মূল্যহীন – তা লেখক উন্মোচন করেছেন পরতে পরতে

দেয়ালে দেয়ালে ঘুঁটের মতো আছড়ে পড়ে জনতার বিভিন্ন বয়ান।…

রাত আটটার টক-শোয়ে, উজ্জ্বল আলো ও ক্যামেরার সামনে এনে বসানো হয় নন্দকে। সেই অনুষ্ঠানে হাজির আরও একজন। এক ম্যানিকিন। নগ্নিকা। নন্দকে হতবাক করে, সঞ্চালক তাকে অভিনয় করে দেখাতে বলেন, কীভাবে সে ম্যানিকিনের সম্মান বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। তিনি নন্দ’র দিকে এগিয়ে দেন নগ্ন ম্যানিকিনের শরীর।…

‘শেষ ট্রেনের আলো’ বা ‘অনলাইন অফলাইন’-এর মত আপাত নিরীহ এবং ‘এরকম আগেও পড়েছি’ মনে হওয়া গল্পেও মানুষের বিপন্নতার আখ্যান বলতে ছাড়েননি লেখক। এমনকি এই সংকলনের সবচেয়ে পেলব যে গল্প, যার নামে বইয়ের নামকরণ হয়েছে, সেখানেও লেখক যেন এক নিষ্ঠুর শল্য চিকিৎসক। লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ছাড়াই পাঠককে পড়িয়ে দেন

বেরং সেই প্রাচীন মানুষটির কাছে গিয়ে আজ দাঁড়াবেন বহুদিন পরে যিনি গল্পে গল্পে বলবেন, যেন অবধারিত, বয়স বাড়ার লগে লগে পাকিস্তানের কথা ক্যান এত মনে পড়ে কইতে পার বউমা!

‘চামরমনি চালের ভাত ও বোয়ালের ঝাল’ এমন একটা গল্প, যেখানে কাহিনির কথককে সুখস্মৃতি আর নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনার মাঝে বাঁধা এক দড়ির তৈরি সাঁকো দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করেন লেখক।

ভাতের গন্ধ নাকে আসে আমার। এদিকে প্রশস্ত করিডোর জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নীরব শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিটি প্রশ্বাস ক্রমাগত শীতল। মৃত্যুপ্রবণ।

এই তিনটি লাইনে ধরা আছে গল্পের দোলাচল। হাঁটছে কথক। ক্যান্সার হয়েছে কি হয়নি সে খবর জানতে গিয়ে দেখা হয়ে গেছে বহুকাল আগে পরিচিত, আজ মৃত্যুপথযাত্রী উমাদার সঙ্গে, মানুষের ঘরে ফেরা যাঁর বিশেষ পছন্দের। কথক বাঁচল কি বাঁচল না, তা পাঠক পড়ে নেবেন। কিন্তু এই আলোচনায় যা বলার তা হল, এই অত্যন্ত সুখপাঠ্য খাঁটি গল্পটাতেও ঘুরে ফিরে ঘরে ফেরার অভিলাষ, ফিরতে না পারার আশঙ্কা ও বিপন্নতার কথাই বলেছেন লেখক।

এত কথার পর বলা বাহুল্য যে, এই সংকলন বর্তমান আলোচকের ভাল লেগেছে। কিন্তু এই বই নিয়ে আলোচনা করার এক মস্ত বিপদ আছে। তা হল, এই বইয়ের সেরা গল্প সম্পর্কে বেশি কিছু লেখা যাবে না। কারণ মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গেলেই গল্পটার বিশেষত্ব একেবারে ফাঁস হয়ে যাবে। শুধু এইটুকু বলা যাক, যৌন ঈর্ষা নিয়ে এরকম ভয় ধরিয়ে দেওয়া গল্প চট করে পাওয়া যায় না। গল্পের নাম ‘ৎ’। এরপরে বর্ণমালাতেও কেবল অনুস্বার, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু পড়ে থাকে। তাই লেখা শেষ করা যাক ওই গল্পের সামান্য উদ্ধৃতি দিয়ে, যাতে গল্পটার বিপজ্জনক গতিপথ খানিকটা বোঝা যায়।

নিষ্ক্রিয় এই দু’বছর সময়কালের আগে তাদের যে ছিল এক-দেড় বছরের বিবাহিত জীবন, ভুলতেই বসেছিল সে! সোহাগে-সংরাগে বাঁচতে বাঁচতে যখন সংসারে তৃতীয় জীবন আনার ইচ্ছা জাগ্রত, দু-জনেই সম্মত, এমনকি রথের মেলা থেকে দুটো ছোট্ট লাল জুতো কিনে আনে তারা, তখনই পরিমলের পতন। জগৎসংসার অচল। ভুবনজোড়া আকাশ ভেঙে পড়ে ঝুম্পার ছোট্ট মাথায়। দু’পায়ের ওপর বসে, বালতি থেকে মগ কেটে, ঝপঝপ করে জল ঢালে গায়ে-মাথায়। তলপেটে হাত বোলায়। মায়ার হাত। ঠান্ডা করে শরীর। শরীরের ভিতর মন। মনের ভিতর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাটুকুও পায় জল।

একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প
লেখক: দেবতোষ দাশ
প্রকাশক: বৈভাষিক
প্রচ্ছদ: মৃণাল শীল
দাম: ২৮০ টাকা

আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া।

কদিন হল বৃষ্টির পরে বেশ মিঠে রোদ উঠছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা-টেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে শরৎকাল এসে পড়ল বলে। এই সময়ে বাংলার বাঙালির মন উড়ু উড়ু হয়, আর প্রবাসী বাঙালির মন ঘুরু ঘুরু হয়। অর্থাৎ ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি চলে আসতে ইচ্ছে করে। তা এমন দিনে যদি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন উৎসবে ফিরে আসতে – তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার? অন্যান্য বছরে তো কেউ গোঁসা করে না। মুখ্যমন্ত্রী চারদিনের পুজোকে টানতে টানতে এক সপ্তাহের করেছেন, লোকে সোৎসাহে মহালয়া থেকেই সপরিবারে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়ছে, সরকারি টাকায় পুজোগুলোর বাজেট বছর বছর বাড়ছে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক কার্নিভাল বানিয়ে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কার প্যান্ডেল কত বড়, কার ঠাকুর এত লম্বা যে চাঁদ থেকে দেখা যায়— এসবের বাৎসরিক প্রতিযোগিতা হয়। বছরে একদিন রেড রোডে বসে মুসলমানরা নমাজ পড়ে বলে যাদের বাকি ৩৬৪ দিন ঘুম হয় না, তারাও রেড রোড জুড়ে দশমীর পরের কার্নিভাল হাঁ করে ইউটিউবে লাইভ দেখে। স্কুল কলেজে পুজোর ছুটি বাড়তে বাড়তে একমাস পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তা নিয়েও ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষকদের বেশিরভাগকেই উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। প্রায় দেড় দশক ধরে এই মজা পুরোদমে উপভোগ করছে যে রাজ্যের মানুষ, তারা যে এবারে পুজোর নাম শুনেই খচে বোম হবে, বেচারি মমতা ব্যানার্জি বুঝবেন কী করে? আমরা জানি তিনি উকিল, তিনি বহুভাষাবিদ, তিনি সাহিত্যিক, তিনি চিত্রশিল্পী। তা বলে তো জ্যোতিষী নন।

জননেতাদের অবশ্য অঙ্কে ভাল হতে হয়, কে কী ভাবতে পারে সেটা পাকা দাবা খেলোয়াড়দের মতো আগে থেকে হিসাব করে ফেলতে হয়। মমতা ব্যানার্জিও অঙ্কে ভালই ছিলেন অ্যাদ্দিন, নইলে এতবছর আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসা যায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকাও যায় না। তবে বয়স বাড়ায় বিশ্বনাথন আনন্দের ধার কমে গেছে, আর মমতার কমবে না তা কি হয়? আরজিকর-কাণ্ডের পর থেকেই নিজের চালে অন্যপক্ষের প্রতিক্রিয়া তাঁকে চমকে দিচ্ছে। আমোদগেঁড়ে বাঙালির আমোদগেঁড়েমির মাত্রাটা কেবল মমতা নয়, প্রতিবাদীরাও অনেকেই বেশি ভেবে ফেলেছিলেন। ফলে এখন মহা মুশকিল হয়েছে।

একটা জলজ্যান্ত মেয়ে ওভাবে মরেছে। এ নিয়ে বারবার নানারকম বিশ্লেষণ করতে ভালও লাগে না। নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। তাই চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে টুক করে লাইনে নেমে পালিয়ে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু টিকিট-কালেক্টর সোমেনদা যে মোবাইল চেকিং করে গ্রেফতার করবেন সেটা ঠাহর করতে পারিনি। অগত্যা বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার ধারণা লিখতে গিয়ে রীতিমতো রচনা হয়ে গেল। পর্শ গাড়িতে চেপে কাউকে চাপা না দিয়েও এত বড় শাস্তি আমায় ভোগ করতে হল। অতএব পাঠককেও শাস্তির ভাগ না দিয়ে ছাড়ব না। এর যা প্রতিক্রিয়া হবে, তার দায়িত্ব সোমেনদার। সরকারি হাসপাতালে হওয়া ঘটনার দায়িত্ব যদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এড়াতে পারেন, আমিও আমার লেখার দায়িত্ব এড়াব।

 

আন্দোলন

অনেকে অনেকরকম প্রত্যাশা নিয়ে এই আন্দোলনে নেমেছিলেন। রাজ্যজুড়ে মানুষের মনে যে এত ক্ষোভ জমে আছে তা সরকারও ভাবেনি, যাঁরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁরাও ভাবেননি। ফলে ১৪ আগস্ট রাতদখল কর্মসূচিকে রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেস একেবারেই বাধা দেয়নি। অনেক জায়গায় পুলিশ নিজে গিয়ে দোকানদারদের বলে এসেছিল ‘আজ সারারাত দোকান খোলা রাখবি। আন্দোলন আছে।’ পশ্চিমবঙ্গে আগের আমল থেকেই যা হয়— অটোচালক, টোটোচালক ইউনিয়নগুলো সরকারি দলের অনুগত। তারাও সব চালু রেখেছিল। মানে নিজেদের ইচ্ছা ছিল না বলছি না। কিন্তু নিজেদের ইচ্ছা থাকলেও, দাদাদের ইচ্ছা না থাকলে এ কাজ করার মতো গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি পশ্চিমবঙ্গে থাকত, তাহলে এই আন্দোলন এত বড় হয়ে উঠত না। কেন্দ্রের শাসক দল এবং রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপিও ভেবেছিল ‘দ্যাখ কেমন লাগে’। ফলে তাদের অধীন মেট্রো পরিষেবাও আন্দোলনকারীদের দাবিতে আন্দোলনের সুবিধার্থে সে রাতে দীর্ঘায়িত হয়েছিল। আবার কলকাতার অ্যাপ ক্যাব চালকদের মধ্যে যাদের ইউনিয়ন আছে, সেই সিপিএমের বদান্যতায় ওলা, উবেরও সারারাত চলেছিল। এরকম সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা কেন? উত্তরটা সহজ।

মমতার সরকার ও তাঁর দল ভেবেছিল সোশাল মিডিয়ায় ডাকা আন্দোলন, কত বড় আর হবে? লোকে খেপেছে যখন, রাস্তায় বেরিয়ে একটু চেঁচামেচি করে নিক। তাহলেই ভিতরের ক্ষোভ সব বেরিয়ে যাবে, তারপর স্বাধীনতা দিবসে ছুটি কাটিয়ে ১৬ তারিখ ঢেঁকুর তুলতে তুলতে সবাই অফিস চলে যাবে। আন্দোলন খতম। আন্দোলনের অভিমুখ নিয়েও আন্দোলনকারীরা যারপরনাই আশ্বস্ত করেছিলেন সরকারকে। আহ্বায়করা মা সারদার মতো আধ্যাত্মিক বাণী দিয়েছিলেন— কোনও দলকে এর ফায়দা তুলতে দেওয়া হবে না, কেউ কোনও দলের পক্ষ থেকে এলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। আন্দোলনটা তাহলে কার বিরুদ্ধে আর কার পক্ষে? এসব পার্থিব প্রশ্নের অনেক ঊর্ধ্বে ওঁরা। কোনও আহ্বায়ক আবার বেগম রোকেয়া শাখাওয়াতের স্তরের। তাঁর বক্তব্য হল তিনি ‘সিস্টেমিক চেঞ্জ’ করতে নেমেছেন, তার মধ্যে আরজিকরের মৃতা মেয়েটির জন্যে ‘জাস্টিস’ চাওয়াও আছে। ফলে সরকারের উতলা হওয়ার কিছু ছিল না। তাই মুখ্যমন্ত্রী ১৬ আগস্ট নিজেও আন্দোলনে নেমে পড়েছিলেন। কার বিরুদ্ধে জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না, কারণ আন্দোলন ইস্যুর চেয়ে বড়।

কিন্তু হিসাবে ভুল ছিল। সকলের হিসাবেই। যাঁরা রাতদখল আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরাও বোঝেননি যে আরজিকর কেবল বন্দুকের ঘোড়া টেপার কাজটা করেছে। বহুবছর ধরে সংগঠিত গণআন্দোলনের অভাবে রাজ্যের মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, যত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল সবটাই রাস্তায় উপচে পড়বে।

আমাদের মফস্বলের বিয়েবাড়িতে ক্যাটারিং ব্যবসার রমরমা হওয়ার আগে পাড়ার সেরা রাঁধুনিই রান্নার কাজে নিযুক্ত হতেন আর পাড়ার জোয়ানরা প্যান্টের উপর গামছা বেঁধে নিয়ে পরিবেশন করতেন। যদি তিনশো লোককে নেমন্তন্ন করা হত, রান্না করা হত আড়াইশো লোকের। কারণ জানা কথা যে জনা পঞ্চাশেক অনুপস্থিত থাকবে। শেষমেশ আসত ২৪০-৪৫ জন। যে ৫-১০ জনের রান্না বেঁচে যেত, তা দিয়ে বড় পরিবারের নিজেদেরই পরের দিনের খাওয়াদাওয়া সারা হত। ছোট পরিবার প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিত। কিন্তু কোনও কোনও বিয়েবাড়িতে একটা ঝামেলা বেধে যেত। হয়তো ২৮০-৯০ জন চলে এল। তখন দুম করে আরও ৪০-৪৫ জনের রান্না হবে কী করে? রান্না করতে গেলে অত পিস মাছ, মাংসও তো লাগবে? মিষ্টিও আনতে হবে। তখন হুলুস্থূল বেধে যেত। দেখা যেত একজন বসে থেকে থেকে পরের পদটা না পেয়ে রেগে উঠে যাচ্ছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টায় আয়োজক বাড়ির লোকজন হয়রান। আরেক নামকরা খাইয়ে রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে ছেলেটা তার ধারেকাছে আসছে না দেখে চেঁচামেচি করছে। ওদিকে যাকে কতজন খাচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সে বেপাত্তা। গৃহকর্তা অপমানে মুখ লাল করে রাঁধুনির উপর চোটপাট করছেন ‘এতদিন কাজ করছ, হিসাবে এত বড় ভুল কী করে হয়?’ সে বেচারা সাহস করে বলতে পারছে না ‘আপনিও তো এর আগে তিনটে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মালমশলার হিসাব করার সময়ে আপনিও তো বলতে পারতেন, এত কমে হবে না।’

১৪ আগস্টের পর ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম দাঁড়াল। ফেসবুক আহ্বায়করা নিজেদের ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করেছিলেন কতজন আসবে, কারা আসবে। তাদের স্লোগান-টোগান নিজেদের সুবিধামতো সামলে নেওয়া যাবে। সরকার ভেবেছিল ব্যাপারটা প্রেশারকুকারের সেফটিভালভের মতো কাজ করবে। সমাজের ভিতরে যত রাগ জমেছে, কয়েকটা সিটি মেরে উড়ে যাবে। কিন্তু না! পরিকল্পনা ছিল কেবল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জাস্টিস ফর আরজিকর’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল যার যা প্রাণ চায় বলছে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থকদের ‘এক হয়েছে বাঙাল ঘটি/ভয় পেয়েছে হাওয়াই চটি’ স্লোগানও এসে পড়েছে। আন্দোলনকারী অরাজনৈতিক (থুড়ি, অদলীয়) নেতৃত্ব বুঝলেন যে জনতা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। কাণ্ড দেখে মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর দলও বুঝলেন, লক্ষণ ভাল নয়। ফলে গত একমাসে আন্দোলনের দিকে বারবার ধেয়ে এসেছে তৃণমূলের উপর থেকে তলা পর্যন্ত নানাজনের নানাবিধ আক্রমণ। কখনও মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের হুমকি দিচ্ছেন— এখনও এফআইআর ঠুকিনি, ঠুকলে কিন্তু কেরিয়ারের সাড়ে বারোটা বেজে যাবে। কখনও কোনও মন্ত্রী বলছেন আন্দোলনকারীরা সব নেশাখোর। কখনও মুখপাত্ররা বলছেন বিরোধীরা সাধারণ মানুষের আন্দোলন হাইজ্যাক করছে, কখনও স্থানীয় নেতা গিয়ে রাস্তায় লেখা আন্দোলনের স্লোগান মুছে দিচ্ছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত’ আন্দোলনের মধুচন্দ্রিমা শেষ। আগে মুখ্যমন্ত্রী হুমকি দিয়েছিলেন, এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও সাবধান করেছেন— জুনিয়র ডাক্তাররা কাজে না ফিরলে রাজ্য সরকারকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে আটকাবেন না। যে কোনও আন্দোলনের বিরুদ্ধেই যে অভিযোগ তোলা হয়, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের বিরুদ্ধেও সেই আপত্তিই রাষ্ট্র তুলছে এবার— মানুষের অসুবিধা হচ্ছে, তাদের পরিষেবা বন্ধ করে আন্দোলন করা চলবে না। রাজ্যের কৌঁসুলি কপিল সিবাল কোত্থেকে কিছু সংখ্যাও জোগাড় করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যেই নাকি জুনিয়র ডাক্তাররা কাজ করছেন না বলে সারা রাজ্যে ২৩ জন রোগী মারা গেছেন। এই সংখ্যার উৎস কী? মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে দেখলাম স্বাস্থ্যসচিব বলছেন— সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী। কী অপূর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রক! টিভি দেখে, কাগজ পড়ে জানতে পারে কতজন রোগী মারা গেছেন। যা-ই হোক, সরকার যখন বলেছে ২৩ জন, তখন অঙ্ক ঠিক মিলিয়ে দেওয়া হবে। যেমন দুর্ঘটনায় প্রবল আঘাত পাওয়া কোন্নগরের বিক্রম ভট্টাচার্যের মৃত্যু সম্পর্কে আরজিকর হাসপাতালের ডাক্তাররা যা-ই বলুন না কেন, ওটাকে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির ফলে হওয়া মৃত্যু হিসাবে ধরতেই হবে। আন্দোলনরত ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের কথামতো কাজে ফিরবেন না। ফলে এরপর থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হওয়া প্রত্যেকটা মৃত্যুর দায় যে তাঁদের ঘাড়েই চাপবে— এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতদিন যে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম স্বভাববিরুদ্ধভাবে তাঁদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তারাও এবার ক্রমশ আন্দোলনবিরোধী হয়ে উঠবে ধরে নেওয়া যায়। কারণ এতদিন ছিল মধ্যবিত্ত দর্শক/পাঠক ধরে রাখার তাগিদ। তা বলে তো আর কর্পোরেটরা কোনও আন্দোলনের পক্ষে থাকার চিজ নয়। তার উপর এবার ক্রমশ গ্রাম, শহরের নিম্নবিত্ত দর্শককে/পাঠককে ধরে রাখার তাগিদ বড় হয়ে দেখা দেবে। কারণ?

এক জেলা হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল ‘দাদা, এই আন্দোলন এখন এলিটদের ইন্ধনে চলছে। গ্রামের লোক আমাদের উপর ক্ষিপ্ত।’ ডাক্তার ভাইটির ভয়— এরপর এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ চালাতে পারে তৃণমূল। ভয়টা যে অমূলক নয় তা তৃণমূলের অনেকের সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়া কথাবার্তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলন যে বৈধ, কেবল ডাক্তার বা নার্স নয়, এই পচাগলা ব্যবস্থা চলতে দিলে যে হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ মহিলারাও ধর্ষণ, খুনের শিকার হতে পারেন— এটা কেন রোগীদের বোঝাতে পারছ না? সব হাসপাতালে তো আরজিকরের মতো নিরাপত্তা দিতে সিআইএসএফ হাজির হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। এটা গ্রামাঞ্চলের রোগীদের কেন বোঝানো যাচ্ছে না? প্রশ্নের উত্তরে আমার ডাক্তার ভাই যা বলল, তা মোক্ষম।

‘আসলে আমরা খুব অসংগঠিত।’

বাইরের আন্দোলনের যে অরাজনৈতিক, সংগঠনহীনতার রোম্যান্টিকতা— তা দিয়ে ডাক্তাররা বাঁচতে পারবেন না। বাইরের আন্দোলনকারীরা ওঁদের বাঁচাতেও পারবে না। মেডিকেল কলেজগুলোতে যে হুমকি সংস্কৃতি সন্দীপ ঘোষ, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসরা চালু করেছেন গত ১৩ বছরে (যার কিছুই আমাদের বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানতেন না), তার ফলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত করে দেওয়া গিয়েছিল। তার উপর বাঙালি বাবা-মায়েরা তো ছেলেমেয়েদের এমনিতেই শিখিয়ে এসেছেন ‘কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করবে। পলিটিক্স করার দরকার নেই।’ এখন প্রাণের দায়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে, সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ও জিনিস কি দু-একদিনে শেখা যায়? স্বাস্থ্যবিভাগের যে ভয়ঙ্কর চেহারা এখন প্রকাশিত হচ্ছে (আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সোমা মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক প্রতিবেদন লক্ষণীয়), তার মধ্যেও এত বছর ধরে যেসব দুঃসাহসী ছেলেমেয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, তারাই এখন ভরসা। তাদেরই এখন ঠিক করতে হবে কী করে রোগীদের বিশ্বাস অর্জন করেও এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যায়। কারণ টালিগঞ্জের তারকারা যে যত জনপ্রিয়ই হোন, আর তথাকথিত নাগরিক সমাজের দলহীন নেতা-নেত্রীদের সোশাল মিডিয়ায় যত ফলোয়ারই থাকুক, ডাক্তাররা আন্দোলন বন্ধ করে দিলে বাইরের আন্দোলন এমনিই ঠান্ডা হয়ে যাবে। সোম থেকে শুক্র অফিস করে শনি, রবিবারে আন্দোলন করবেন— সে গুড়ে বালি। কারণ এবার গুন্ডাবাহিনি আসবে মারতে, যেমনটা নৈহাটিতে এসেছিল ৮ সেপ্টেম্বর রাতে। খান্না মোড়ের মহিলাদের মতো জবাব দিতে যাঁরা পারবেন না, তাঁদের এবার আন্দোলন গুটিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।

 

ন্যায়বিচার

শব্দটা নতুন লাগছে? অস্বাভাবিক নয়। কারণ আরজিকর নিয়ে আন্দোলনটা যেহেতু আমরা শুরু করেছি— আমরা যারা ইংরেজি বলতে পারি এবং ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে সবসময় হাত পঞ্চাশেক দূরে রাখি, যাদের একাধিক আত্মীয় বা বন্ধু বিদেশে আছে, তরুণ আত্মীয়রা প্রায় সবাই রাজ্যের বাইরে আছে— সেহেতু প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে সরকার ও পুলিশের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি না তুলে আকাশের দিকে মুখ করে #WeWantJustice, #JusticeforRGKar স্লোগান ছোড়া হচ্ছে। যার গায়ে লাগে লাগুক, আমার স্লোগান দেওয়ার আমি দিলাম, আমার বিবেক পরিষ্কার— ভাবখানা এইরকম। যদ্দিন সরকারের গায়ে লাগছিল না, তদ্দিন মাঝরাত্তিরেও মনের সুখে এই স্লোগান দিয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরা গেছে। এখন যে আর যাবে না সে-কথা আগেই প্রকাশ করেছি। এবার বলি, ন্যায়বিচার আদায় করতে গেলে যারা ইংরেজি জানে না, শহরে থাকে না, যাদের বাড়ির লোক রাজ্য বা দেশের বাইরে যায় কেবল শস্তার শ্রমিক হিসাবে— তাদের সমর্থন লাগবে। তার জন্যে আন্দোলনকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যদি ন্যায়বিচারের চেয়েও সহজ কোনও শব্দ ব্যবহার করলে তা সম্ভব হয়, তাহলে সেই শব্দটাই খুঁজে বার করতে হবে। তা করার তাগিদ অবশ্য আমাদের নেই, থাকার কথাও নয়। সে তাগিদ থাকার কথা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর, কারণ তাদের ভোটে জিততে হবে। আমাদের এবং আমাদের মহান অরাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ভোট-রাজনীতিকে ঘৃণা করেন, কারণ ভোট না দিলেও তাঁদের বেঁচে থাকতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। গরিব মানুষের হয়। গ্রামের গরিব মানুষের তো হয়ই। যদি তাঁদের বোঝানো যায় যে সন্দীপ, বিরূপাক্ষরা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যেদিকে নিয়ে গেছে তার প্রতিকার করতে না পারলে আগামীদিনে বেঘোরে তাঁরাই মরবেন বেশি; একমাত্র তাহলেই জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতিতে আজকের অসুবিধা সয়ে নিতে তাঁরা রাজি হবেন।

এটা বোঝানো শক্ত কাজ। কেবল আমার ডাক্তার ভাই যে কারণে বলেছে সে কারণে নয়। ভাইয়ের সিনিয়ররা গত ৩০-৩৫ বছর ধরে যেভাবে ডাক্তারি করেছেন তার জন্যেও। ২০১৯ সালে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর পরিবার-পরিজনের হাতে ডাক্তারদের নিগ্রহ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ঘটনার পরে রাজ্যজুড়ে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা ধর্মঘট করেছিলেন। তখন একাধিক ডাক্তার আত্মীয়-বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে যতদিন না নার্সদের এবং রোগীদের ভালমন্দ সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ডাক্তাররা কথা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে কর্পোরেট হাসপাতালের দাসত্ব করা বন্ধ করছেন, ঢালাও নার্সিংহোম খোলা আর পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা প্যাথলজিকাল সেন্টারগুলোকে টাকার বিনিময়ে সই বিলিয়ে যাওয়া বন্ধ করছেন, ততদিন রোগীরা ডাক্তারদের প্রতিপক্ষ ভাবা বন্ধ করবেন না। সেসব ব্যাপার আজও বদলায়নি।

শুধু তাই নয়। ২০১৯ সালের জুন মাসে সরকারি গোঁয়ার্তুমির চোটে পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে গেল, ডাক্তাররা সিনিয়র জুনিয়র নির্বিশেষে দলে দলে পদত্যাগ করতে লাগলেন, তখন অবস্থা সামাল দিতে মমতা নবান্নে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে টিভিক্যামেরার সামনে ঘটা করে এক সভা করেন এবং ছাত্রনেতাদের প্রায় সব দাবিই মেনে নেন। সুরক্ষা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সেদিন যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সব পূরণ হয়ে থাকলে আরজিকরের মেয়েটার ধর্ষণ ও মৃত্যু হয়তো ঘটত না। ১৪ আগস্ট রাতে আরজিকরে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তা তো অবশ্যই আটকানো যেত। এই নজরদারিটুকুও সিনিয়র ডাক্তাররা গত পাঁচ বছরে করেছেন কি? প্রশ্নটা কাউকে করতে দেখছি না। উত্তর বোধহয় স্বস্তিদায়ক হবে না।

এখন কথা হল, এর সঙ্গে তিলোত্তমার ন্যায়বিচারের সম্পর্ক কী?

নারীবাদীরা যত ইচ্ছে রাগ করুন। এটা বোঝা দরকার যে একজন নেশাড়ু হাসপাতালে ঢুকে সেখানকারই একজন ডাক্তারকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছে— ঘটনা যদি এইটুকু হত, তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্যে এত আন্দোলন করার দরকার হত না। ন্যায়বিচার আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে সকলের মনে— তাও ঘটত না। কারণ অভিযুক্ত সঞ্জয় রাইয়ের দ্রুত গ্রেফতারি প্রমাণ করছে যে তার বিরাট কোনও দাদা দিদি নেই। কিন্তু যে কলকাতা পুলিশ তাকে ঘটনার চারদিনের মধ্যেই গ্রেফতার করেছে, তারই কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে ডাক্তারদের আন্দোলন। কারণ ওই পুলিশই প্রাণপণে প্রমাণ লোপাট করেছে, ময়নাতদন্তে কারচুপি করেছে, সাততাড়াতাড়ি মৃতার দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; এমনকি মেয়ের বাবা-মাকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এগুলো তো আর সঞ্জয়কে বাঁচানোর জন্যে করা হয়নি। সুতরাং এই ঘটনায় বৃহত্তর অপরাধ খুন, সে খুনের কারণ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি। এতকিছু ঢাকতেই এমনভাবে প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে, সাধারণ নিয়মকানুনও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যে মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই শব্দটা শুনলেই প্রায় সিপিএম শব্দটা শোনার মতোই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন, তিনি প্রথম থেকেই সিবিআইয়ের হাতে এই মামলা তুলে দেওয়ার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন। কলকাতা পুলিশকে সাতদিন সময় দিয়েছিলেন।

কেন সাতদিন? এখন দেখা যাচ্ছে আদালত আগেই হস্তক্ষেপ করায় যে চারদিন সময় বিনীত গোয়েলের বাহিনি পেয়েছিল, তার মধ্যেই সাক্ষ্যপ্রমাণের এমন হাল করা হয়েছে যে সিবিআই আন্তরিক তদন্ত চালালেও সত্য উদ্ঘাটিত হবে কিনা সন্দেহ। ফলে ন্যায়বিচার বিশ বাঁও জলে। সিবিআই আন্তরিক হোক বা না হোক, সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ ভূমিকা নিক বা না নিক, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির আগের রাতে পথে নামলে আদালত প্রভাবিত হবে— এসব যাঁরা ভাবছেন তাঁরা ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাস সম্পর্কে খবর রাখেন না। সত্যি কথা বলতে, জনমত মাথায় রেখে কাজ করা আদালতের উচিতও নয়। কারণ তা করলে আইনের শাসনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবে জনতার আবেগের শাসন, যা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের বিপরীতে দাঁড়ায়।

তাহলে ন্যায়বিচার পেতে গরিব মানুষ, বিশেষত গ্রামের মানুষের সমর্থন দরকার কেন বলছি? কারণ আরজিকরের ঘটনায় ন্যায়বিচার বলতে যা পাওয়া সম্ভব তা হল— ১) যারা এই প্রমাণ লোপাটের কাজ করেছে তাদের শাস্তি (এটা ঘটলে ধর্ষণ, খুনের রহস্যভেদ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে); ২) ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনার বিনাশ। এ দুটো সম্ভব একমাত্র ২০২৬ সালে সরকার বদল হলে, নচেৎ নয়।

আরও পড়ুন অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

অনেকেই এ-কথায় মহা ক্ষেপে উঠবেন। প্রশ্ন তুলবেন— সরকার বদলালেই যে দুর্নীতি আর হবে না তার গ্যারান্টি কী? এ কেবল রাজনৈতিক অভিসন্ধির প্রকাশ। ঠিক কথা। কোনও গ্যারান্টি নেই যে আবার দুর্নীতি হবে না, নতুন র‍্যাকেট গড়ে উঠবে না। কিন্তু যে বাচ্চা জন্মায়নি তাকে যেমন স্কুলে ভর্তি করা যায় না, তেমনি যে সরকার এখনও ক্ষমতায় আসেনি তাকে দুর্নীতির জন্যে শাস্তি দেওয়াও যায় না। শাস্তি যে সরকার আছে তাকেই দিতে হয় আর গণতান্ত্রিক শাস্তির দৃষ্টান্ত ১৯৭৭ সালের কংগ্রেস বা ২০১১ সালের বামফ্রন্ট। এখন যদি বলেন ‘এদের সরকারে কী হয় আগে দেখেছি, এদের বিশ্বাস করি না’ তাহলে কাজটা হয়ে দাঁড়াবে আরও কঠিন। একটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প সংগঠন (অর্থাৎ রাজনৈতিক দল) গড়ে তুলতে হবে, তারপর এখন যারা সরকারে আছে তাদের হারাতে হবে। এমনও যে হয় না তা নয়। আন্দোলন থেকে দল উঠে আসার হাতেগরম ইতিহাস রয়েছে আম আদমি পার্টির। তবে দিল্লি কিন্তু রাজ্য হিসাবে ছোট্ট, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য। যাদবপুর এইট-বি মোড়ে বা শ্যামবাজারে নাচ করা, গান গাওয়া, ছবি আঁকা বা কবিতা বলার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ দিল্লির মতো ওইটুকু রাজ্যে একটা দল গড়ে ভোটে জেতা। পশ্চিমবঙ্গে যে কাজটা আরও বহুগুণ কঠিন তা বলাই বাহুল্য। পারলে লেগে পড়ুন আজ থেকেই, কারণ রাজনীতি করা ৩৬৫ দিনের কাজ।

অনেকে দিন গুনছেন দেখছি। ‘বিচারহীন ২৯ দিন, ৩০ দিন, ৩১ দিন…’ ইত্যাদি। ভুলেও এই ভুলটি করবেন না। দীর্ঘসূত্রিতা করলে যেমন ন্যায়বিচার হয় না, তেমন তাড়াহুড়ো করলেও ন্যায়বিচার হয় না। যত দিন গুনবেন, তত হতাশ হবেন। যত বেশি মানুষ হতাশ হবেন, তত আন্দোলনের জোর কমবে। আপনার চেয়েও বেশি তাড়া আছে রাজ্য সরকারের। তাই তড়িঘড়ি নিজেদের উদ্যোগ দেখাতে একটা অর্থহীন নতুন আইন পাশ করানো হয়েছে। এরপর কোনওমতে সঞ্জয় রাইকে দোষী প্রমাণ করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। মমতা, অভিষেক এবং তাঁদের পারিষদরা বলবেন ‘উন্নাও, হাথরাসে শাস্তি হয়নি। বানতলা, ধানতলায় শাস্তি হলেও ফাঁসি হয়নি। আমরা অপরাধীকে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিয়েছি। বিরোধীরা চক্রান্ত করে খামোখা আমাদের বদনাম করল।’ ইতিমধ্যে দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন বিচারাধীন বন্দি হিসাবে হাজতবাস করে অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত বন্দি হিসাবে কারাবাস করে সন্দীপও বেরিয়ে পড়বেন। তারপর সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। আমি, আপনি মাথা চুলকে ভাবব— কী হল কেসটা? তারপর একদিন সন্দীপদের ব্যবস্থার উৎপাদন কোনও এক ডাক্তার আপনার কোনও প্রিয়জনের কিডনি অপারেশন করতে গিয়ে লিভারটা কেটে বাদ দিয়ে দেবেন।

মানে ন্যায়বিচার পেতে গেলে টেস্ট ম্যাচ খেলার ধৈর্য থাকতে হবে। কিন্তু সরকার জানে আপনি আইপিএলের ভক্ত।

 

পুজো

আচ্ছা, পুজো হবে না এ-কথা পশ্চিমবঙ্গের একজন মানুষও বলেছে কি? পুজো হলেই যে উৎসব হবে তাও তো জানা কথা। তাহলে মমতা হঠাৎ উৎসবে ফেরার কথা বলতে গেলেন কেন? ওই যে শুরুতেই বলেছি, বয়স বাড়লে আনন্দেরও ভুল হয়। কিন্তু ওটাই একমাত্র কারণ নয়।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল সম্পর্কে এক প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন ‘লোকে এত ব্রাজিল ব্রাজিল করে। কিন্তু ভাব, রোমারিও আর বেবেতোকে ১২০ মিনিট গোল করতে দেয়নি বুড়ো ফ্রাঙ্কো বারেসি। অথচ বারেসি তখন, প্লেয়িং এন্টায়ারলি ফ্রম মেমরি।’ মানে একজন জাত রক্ষণভাগের খেলোয়াড় স্রেফ অভিজ্ঞতার জোরে বয়সের কারণে জোয়ান স্ট্রাইকারদের চেয়ে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থেকেও তাদের আটকে দিতে পারেন। মমতা এখন বারেসির খেলাই খেলছেন। তিনি জানেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে সবকিছুই হুজুগ হয়ে দাঁড়ায়। এই আন্দোলনের একটা বড় অংশ যেহেতু অসংগঠিত মানুষের আন্দোলন, সেহেতু হুজুগ আছে বইকি। হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে কেউ জিজ্ঞেস করছে ‘কী শাড়ি পরা উচিত বল তো? সাদা, না কালো?’ কেউ আবার ফেসবুকে প্রতিবাদী কবিতা পোস্ট করে লাইক গুনতে ব্যস্ত। মমতা জানেন, এই আন্দোলনকারীদের অন্য হুজুগে মাতিয়ে দিতে পারলেই সমস্যা অনেকটা মিটে যাবে। ইতিমধ্যে ডাক্তারদের যদি কোনওভাবে কাজে ফিরতে বাধ্য করা যায়, তাহলে তো কথাই নেই। এদের উৎসাহ আরও কমে যাবে। অতএব এই তো সময় পুজোর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার।

তাছাড়া মমতাকে নির্ঘাত চিন্তায় ফেলেছে বহু ক্লাবের সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত। সরকার কেন একটা ধর্মের উৎসবে টাকা দেবে— এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উঠেই গেছে। এমনকি কেউ একথাও জিজ্ঞেস করে না যে ক্লাবগুলো সরকারের থেকে টাকা পাওয়ার পরেও এলাকার লোকের থেকে চাঁদা তোলে কেন? কারণ অন্নপ্রাশন থেকে শ্রাদ্ধ— কোনওকিছুই বিরাট করে করতে না পারলে আমাদের আজকাল চলে না। সুতরাং দুর্গাপুজো যত বড় হয় তত ভাল। এমন এক গিগ-অর্থনীতিতে বাস করি আমরা, যে মানুষের ভোগ করার ইচ্ছে যত বাড়ে তত ভাল। ভোগ কমলেই সঙ্কট। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটুও লজ্জা না পেয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পুজোর সময়ে ঢাকিদের রোজগার হয়। বাকি বছরটা তারা কী করে সংসার চালায় সে প্রশ্ন একবার মনেও আসে না তাঁর? আজকাল পুজোগুলোর যা বাজেট হয় তার তুলনায় ঢাকিরা কতটুকু রোজগার করে সে খবর কি রাখেন মুখ্যমন্ত্রী? আসলে তাঁর দুশ্চিন্তা ওসব নিয়ে নয়। তিনি ক্লাবগুলোকে টাকা দেন যাতে সভ্যরা তাঁকে ভোট দেয়, যাদের উপর তাদের প্রভাব আছে তাদেরও দিতে বলে। বিশেষত পঞ্চায়েত বা পৌরসভার নির্বাচন যাঁরা মন দিয়ে অনুসরণ করেন, তাঁরা জানেন এই কৌশলের সাফল্য বিরাট। ফলে ক্লাবগুলো বেঁকে বসলে মুশকিল। সুতরাং উৎসবে ফিরে আসার পরামর্শ আসলে ক্লাবগুলোকে টাকা নিয়ে যেতে বলা।

অনেকে দেখছি ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে তা নিয়ে খুব চিন্তিত। চিন্তা প্রকাশ করার পরের বাক্যেই বলছেন ‘পুজোর সময়ে এ রাজ্যে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জিএসটি কালেকশন হয়। পুজো না হলে কী হবে?’ তথ্যটা সঠিক কিনা জানি না, কিন্তু তত্ত্বটা মজাদার। জিএসটি যে জমিদারি ট্যাক্স হয়ে উঠেছে তা এখন গোটা দেশের মানুষ জানেন। কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত এমন লজ্জায় পড়েছে যে জুলাই মাসে কত টাকা জিএসটি উঠেছে তা আর প্রকাশই করেনি। কারণ ধরা পড়ে যেত যে ছোট ব্যবসায়ীদের রক্ত চোষা হচ্ছে। এদিকে আমার পুজোবাদীরা জিএসটি কালেকশনকে রাজ্যের ছোট ব্যবসায়ীদের সমৃদ্ধির লক্ষণ বলে ধরছেন। গত কয়েক বছর ধরেই যে পুজোর সময়েও দোকানে তেমন ভিড় হচ্ছে না, কারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো পয়সা নেই— তা চোখ কান খোলা থাকলে, ছোট দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস থাকলেই জানা যায়।

কিন্তু আবার ওই প্রশ্নে ফিরে আসি। পুজো একেবারে করব না— এ-কথা কে বলেছে? কেউ না। জামাকাপড় কিনবই না— এমন ধনুর্ভঙ্গ পণ কে করেছে? কেউ না। কেনই বা করতে হবে? একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। যদি আমরা পুজোর হুজুগে তিলোত্তমার জন্য ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার কথা ভুলে না যাই, পুজোর ছুটিতে আন্দোলন থেকেও ছুটি নিয়ে না ফেলি, তাহলেই যথেষ্ট। বরং এই অবসরে পুজোর আড়ম্বর যদি একটু কমে, তাহলে অত্যধিক আলোয় চারপাশে জমে ওঠা যেসব অন্ধকার আমরা ঢেকে রাখি সেগুলো চোখে পড়বে। সরকারের পক্ষে সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তাই হুজুগান্তরে যাওয়ার তাড়া দেওয়া। এখন আমাদেরই প্রমাণ করতে হবে— এই আন্দোলন আমাদের আরেকটা হুজুগমাত্র নয়।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

Flag or no flag, the city of the protest march has risen

Even as the Left Front extended its winning streak, Kolkata became deeply anti-protest as a city, and West Bengal, an anti-protest state. The last Left chief minister of West Bengal, the late Buddhadeb Bhattacharya, played no mean part in this political emasculation of the people’s strength.

Since the days of British rule, Kolkata had been both famous and infamous for being the michhil nagori (city of protest march). The Hindu upper caste middle class, known as bhadralok, used to have a big presence in those marches because, apart from their own troubles, they had fellow feeling for the poor, downtrodden. All that rapidly changed after liberalisation in 1991.

The Bengali bhadralok, now upwardly mobile, started losing touch with the poor. The only relation that remained between the two classes was of master and domestic help, or master and driver of the car brought on loan. To this new middle class – whose earlier generations had stood like a rock behind leftist movements in the state – words like strike, protest, rally, march and Brigade (a ground owned by the Indian army, that hosts huge rallies of all political parties) became dirty words. From the 1990s, the Bengali middle class started believing that all of the above meant loss of time and working days. Only ‘jobless’ people – as if jobless because of their own fault – went to rallies and protest marches. The big newspapers published from Kolkata always wrote more about how many people missed their flights because of a protest march, than about what necessitated that march. Whenever there was a rally at Brigade, the papers would invariably run stories about people from rural Bengal visiting Alipore Zoo or Victoria Memorial after the rally. The suggestion was that they actually came to Kolkata for sightseeing sponsored by the party that called the meeting. The meeting at Brigade was a sideshow.

Thus, even as the Left Front extended its winning streak, Kolkata became deeply anti-protest as a city, and West Bengal, an anti-protest state. The last Left chief minister of West Bengal, the late Buddhadeb Bhattacharya, played no mean part in this political emasculation of the people’s strength. He went as far as to say that he unfortunately belonged to a party that calls for strikes.

The Mamata Banerjee-led Trinamool Congress has been making full use of this anti-protest, therefore anti-politics, psyche since 2011.

There have been multiple cases of rape and government denial since Banerjee became the chief minister. But the outrage remained local, at best spilled on to social media. Also, during her rule, the state has seen unprecedented corruption in the highest ranks of the ruling party (as Sarada scam, Narada scam, the School Service Commission scam etc bear out) but no large-scale popular movement against the government. Not only that, two consecutive panchayat elections (2018 and 2023) were literally stolen from the people. Even filing nomination became a matter of life and death for opposition candidates. In 2018, West Bengal broke a record. TMC won 20,076 seats out of 58,692 – the highest in terms of percentage since the first panchayat elections held in 1978. The number dipped last year but there were allegations that government officers played active roles in ensuring TMC win even during the counting of votes. The Calcutta high court suspended government officers for this.

Students of colleges have long forgotten what students’ union elections look like. Barring a few exceptions like Presidency and Jadavpur University, the last elections were held way back in 2017. Bengal has not seen a mass movement despite this. Almost three decades of vilification of protest politics had achieved what two centuries of British rule could not – making Bengalis silent sufferers who do not shout back.

All that has changed in last one month.

The stupor is over. It is sad that an aspiring doctor from an urban middle-class family had to go through inscrutable pain and die to impress upon the people of West Bengal and its capital the usefulness of protests. The fact that there are things more important than somebody being able to follow their daily routine has finally dawned on the bhadralok and bhadramohila (ladies and gentlemen). Sitting in stranded buses and cars, the very people who used to curse political parties and mass organisations are now looking for protest marches to join.

However, a section of the opinion-shaping urban middle class of Bengal is still averse to joining any protest held by the political opposition to Mamata Banerjee. Even though BJP is the main opposition party in the assembly, socio-culturally RSS-BJP is still unacceptable to many Bengalis. Even the BJP leaders know it. That is why they held a Nabanna Abhijan (seize the secretariat) programme under the banner of a ‘Paschimbanga Chhatra Samaj’, a name nobody had ever heard of.

On the other hand, it is still not deemed cool to march under the red flag of the Communist Party of India (Marxist) or other Left parties that were part of the Left Front government. Therefore, leaders of #ReclaimTheNight movement in and around Kolkata have declared that they would not allow any political flags in their programmes. Notwithstanding this arguable decision, their movement is drawing huge crowds. First held on August 14 night as a one-time protest, it has grown into a full-fledged movement and is catching on in rural Bengal. This became clear on the night of September 4. Ironically, at many places, it is the CPI(M) or its youth wing/students’ wing or the TMC that is egging people on to participate in these non-political marches.

Alumni associations of educational institutions, pensioners’ associations, local clubs and even school students are taking to the streets all over Bengal. Many of them find political parties nauseating. August 14 leaders of #ReclaimTheNight are on record, saying their movement is against rape culture and not just for justice in the R.G. Kar case. Rimjhim Sinha, one of the women who initiated the protest, said on a Bengali TV channel that no political party has created a safe environment for women. So, they have no faith in parties.

Under these circumstances, I was curious to know how successful the Left Front’s September 3 protest march against the alleged cover-up of RG Kar rape and murder case could be.

Even today, a large number of people turning up for something called by the Left Front or CPI(M) is common in most parts of Bengal. However, election results, particularly since 2016, have shown that those numbers hardly mean anything in terms of support. Therefore, I was keen to find out what kind of slogans were being raised, what kind of people had come to walk the talk and how the people outside the march received it.

Also read Falling from the sky: Insignificance of being human

The slogans were expectedly more directly aimed at the government than the abstract ‘We want justice’ or ‘Justice for RG Kar’ that are heard in the so-called apolitical marches. Those two slogans were not done away with. But in this rally flaunting red flags, some slogans promised a long vigil for the deceased doctor in polished Bangla, others demanded catching the kingpin of the RG Kar case in more mundane language. The more interesting part of the march was the composition of people. There were urban elites clad in branded attire as well as rural people in cheap shirts and trousers. Over-dependence on the former class and alienation from the latter have been major reasons for the Left’s decline in Bengal and the process started when they were in power. Bengal’s poor have been identifying Mamata Banerjee as one of their own for almost two decades now. As a result, their presence in left front’s protest marches in the last few years have not been as common as they should be. Hence this was something to take note of.

I could not reach the starting point (Rajabazar Tram Depot) by bus because so many people had started to gather that traffic had to be halted half-a-mile away. Experience told me that the passengers of the bus I was on would start cursing the organisers of this march, with the common refrain “They destroyed West Bengal with all these meetings and marches for 34 years. Here they come again.” But to my surprise, everyone got off without a word. A boy returning from school was telling his mother “I’m too tired. I can’t walk from here.” The mother scolded him “Of course you can. Try and adjust for a day.”

Right from the start of the march, I was looking at the roads that meet APC Road from both sides. APC Road is among Kolkata’s busiest arterial roads and once it is blocked, traffic comes to a halt on all those connecting roads as well. On a Tuesday afternoon like that, I expected a lot of irked – even angry – faces among the bike riders, car drivers and bus riders. There were none. On the contrary, many were shooting videos of the march.

The nearer the march got to the end point, the crazier the scenes on both sides of the road became. Families standing on the balconies of multi-storied buildings were shouting slogans at full pitch. Mothers, bringing their children home from school, stood by for the march to pass. A man from the march went and handed one of the children a big flag. The child found a high stool to stand on and started waving the flag with all the strength he had, the mothers sloganeering at the top of their voices. Working class people employed in the shops on the footpath poured on to the street and started sloganeering.

But the fiercest support came from palpably poor women. They had come to show their support, leaving whatever they were doing. Some were carrying their small children. Some had rushed out in the middle of housework. They joined in with the sloganeerings even more ferociously than those walking. At one point, their participation felt like a loud guard of honour to the walkers.

Mind you, this group is the core voters of TMC. These are women who have to work from dawn to dusk – just to survive. They are the prime beneficiaries of the TMC government’s pet project – Lakshmir Bhandar (purse of Lakshmi) that provides them with Rs 1,000 every month (Rs 1,200 for women of the Scheduled Caste and Scheduled Tribe communities). The influence of TMC in those areas could be seen from the party’s flags hanging from the buildings behind those women. Near Khanna crossing, there is an old building waiting to collapse. On its first floor stood some women leaning over the rusty railing, jostling for space and shouting slogans, throwing fists in the air. They had so much energy that I feared the balcony would fall at any moment. Interestingly, a triangular flag with angry Hanuman painted on it, was hanging from a rod.

It seemed to me that these women, at least for now, have no qualms shouting for the red flag. It could well be the case that they do not mind who carries which flag. They only know which flag they dislike today. This should set alarm bells ringing in the TMC. On the other hand, the Left Front should realise that this is the class they had abandoned.

Originally published on The Wire

আর জি কর নিয়ে একটি দলীয় রাজনৈতিক মিছিলে যা দেখলাম

নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ।

মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতায় একটি রাজনৈতিক মিছিল ছিল। অদলীয় রাজনীতির আড়ালও সে মিছিলে ছিল না। যাঁরা সংগঠিতভাবে এসেছিলেন তাঁরা লাল পতাকা হাতেই এসেছিলেন। কারোর পতাকায় লালের উপর সাদায় কাস্তে হাতুড়ি আঁকা, কারোর আবার লালের উপর হলুদ রংয়ের বাঘ। সাদার উপর লাল তারা আঁকা পতাকাও ছিল এই মিছিলে। মিছিলটি ঘোষিতভাবেই বামফ্রন্টের মিছিল, অর্থাৎ এ রাজ্যে ১৯৭৭-২০১১ যেসব দল জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল তাদের এবং তাদের বিভিন্ন গণসংগঠনের ডাকেই এই মিছিল। কয়েক হাজার লোকের এই মিছিলে কোনো জুনিয়র বা সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন কিনা জানি না, থাকলেও ডাক্তার পরিচয়ে ছিলেন না। পতাকা নিয়ে হাঁটা অসংখ্য মানুষের একেকজন হয়ে ছিলেন। মিছিল চিরকাল অনেকের, একের নয়।

তা বলে বামফ্রন্টের মিছিল ডাক্তারদের ভুলে গিয়ে, আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষিত ও নিহত মেয়েটিকে ভুলে গিয়ে কেবল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে মসনদে বসতে চাওয়ার মিছিল হয়ে দাঁড়ায়নি। পরিশীলিত শহুরে মধ্যবিত্তদের গলাগুলি স্লোগান তুলেছে

সময় যত দীর্ঘ হবে
আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।
বিচার যত থমকে রবে
আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।

আবার রংচটা জামা প্যান্ট, শস্তা ছাপা শাড়ি পরা পালিশবিহীন মানুষ স্লোগান দিয়েছেন

নেংটি ছেড়ে ধেড়ে ধরো
আর জি করের মাথা ধরো।

এই মিছিল শহুরের, এই মিছিল গেঁয়োর। এই মিছিল টি-শার্ট আর পনিটেলের, এই মিছিল ফেজ টুপি আর দাড়ির। এই মিছিল ক্রপ টপের, এই মিছিল হিজাবের। এই মিছিল স্নিকার্সের, এই মিছিল হাওয়াই চটির। আপনার প্রিয় টিভি চ্যানেল বা ইউটিউব চ্যানেল হয়ত দেখাবে না, তাই সবচেয়ে বেশি করে বলা প্রয়োজন – এই মিছিলে শুধু বহু মানুষ হাঁটেননি, যাঁরা হাঁটেননি তাঁরা পথের দুধার থেকে মিছিলকে আপন করে নিয়েছেন। তবে গোড়া থেকে শুরু করাই ভাল।

***

রাজাবাজার ট্রাম ডিপো থেকে তখনো মিছিল শুরু হয়নি, জমায়েত ক্রমে স্ফীত হচ্ছে। দেখি এক কাঁচাপাকা চুলের শীর্ণকায় ভদ্রলোক একটি সদ্য গোঁফদাড়ি ওঠা বাবুসোনা প্রজাতির ছেলেকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন এক বৃদ্ধার দিকে ‘দেখছ? অন্তত ৮০ বছর বয়স হবে ওনার।’ কানে খাপছাড়া কয়েকটি শব্দ যেতে সেই বৃদ্ধা এবং তাঁর সঙ্গিনীরা ঘুরে তাকালেন। ভদ্রলোক বললেন ‘খারাপ কথা বলছি না দিদিভাই। আপনার উদাহরণ দিচ্ছি। শেখাচ্ছি।’ ওঁরা হেসে এগিয়ে যেতেই ছেলেটিকে বললেন ‘উনি এত বয়সে মিছিলে আসতে পেরেছেন, তোমার অসুবিধাটা কী?’ অপ্রস্তুত ধোপদুরস্ত ছেলেটি সহসা কথা খুঁজে পেল না। উনি বললেন ‘অন্যের জন্যেও কিছু করতে হয় তো।’

অনতিদূরেই আরও ভাল দৃষ্টান্ত ছিল। ওঁর চোখে পড়েনি, আমার চোখে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই।

ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশি হবে না। কিন্তু কোনো গভীর অসুখ তাঁকে প্রায় চলচ্ছক্তিহীন করে ফেলেছে। হাত দুটো বেঁকে গেছে, পা দুটোও। কয়েক ইঞ্চি এগোতেও তাঁর কয়েক মিনিট সময় লাগে। দেখে ভেবেছিলাম ইনি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন, নিশ্চয়ই মিছিলে যাবেন না। কিন্তু সন্ধের মুখে শ্যামবাজারে নেতাজি মূর্তির পাদদেশে পুলিস যখন মিছিলের গতি রোধ করল, বিস্মিত হয়ে দেখলাম ওই ভদ্রলোক আমার পাশে এসে গেছেন আবার।

ওই পথ হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে তরুণ-তরুণী, মাঝবয়সীদের দল যেমন চোখে পড়েছে, তেমনি দেখেছি এমন বন্ধুদের যারা দুজনে স্রেফ একে অপরের হাত ধরে চলে এসেছে। তাদের মুখ বলছে, শরীরী ভাষা বলছে – আগে কখনো কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। তাই স্লোগানে গলা মেলাতে প্রথম প্রথম তারা রাঙা হয়ে উঠছিল, পরে লজ্জা ভেঙে গেল। মিছিল চিরকাল লজ্জা ভাঙে, ব্যক্তিকে সমষ্টির একজন হতে শেখায়। সমষ্টিতে মিশে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে ব্যক্তি। এ জিনিস যে মিছিলে ঘটে না, সে কি সত্যি মিছিল?

হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম – মানুষ কেন মিছিলে যায়? নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার জন্যে? এই মিছিলে মানুষ কেন গিয়েছিল? এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গে রোজ যে নানা সংগঠনের ডাকে মিছিল বেরোচ্ছে, মানুষ কেন যাচ্ছে সেসবে? ‘চরম অন্যায় দেখে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম আমার মত করে’ – ভবিষ্যতের এই তৃপ্তিটুকুর জন্যে? হয়ত তাই। তাতেই বা দোষ কী? কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজকের বহুনিন্দিত লাল পতাকার মিছিলে কেন এসেছেন এত মানুষ? কোনো পতাকাহীন মিছিলে গেলেও তো পাপস্খালনের অনুভূতি পাওয়া যায়। এ রহস্য উদ্ঘাটন আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু জানি না, কোনো পতাকা বা কোনো দলের প্রতি টান না থাকলে অতি বৃদ্ধ বাবাকে ছোট্ট ছেলের মত হাত ধরে মিছিলে নিয়ে আসতে পারে কিনা তাঁর ছেলে। ছেলেটি আমারই বয়সী। বেশভূষা দেখে এবং মুখের ভাষায় মনে হল, দূর গ্রাম থেকে এসেছেন ওঁরা। দুজনেরই ঘাড়ে লাল পতাকা। হয়ত জোয়ান বয়সে বাবাই মিছিলে হাঁটা শিখিয়েছিলেন ওই ছেলেকে, আজ দ্বিতীয় শৈশবে পৌঁছে সেই ছেলে তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে। এভাবেই তো মিছিল এগোয়। মিছিল, বিশেষত লাল পতাকার মিছিল, আসলে তো রিলে। অদলীয় মিছিলেও কি এমন হয়? জানি না।

***

সপ্তাহের গোড়ার দিকে এক কর্মব্যস্ত দিনে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ট্র্যাফিক স্তব্ধ করে দেওয়া কোনো মিছিল সম্পর্কে এত ভাল ভাল কথা লেখা প্রায় অসম্ভব ছিল আর জি করের ওই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও হত্যার আগে পর্যন্ত। যথাসময়ে নিজ নিজ কাজে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু যে থাকতে পারে, তা টের পাওয়ার জন্যে আমাদের একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ খোয়াতে হল। আজ যখন বিপুল জমায়েতের কারণে রাজাবাজার ট্রাম ডিপোয় পৌঁছবার আগেই বাস দাঁড়িয়ে পড়ল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের উপর, তখন ভেবেছিলাম বাসযাত্রীরা কর্মনাশা মিছিলকে দু-চারটে গালমন্দ করবেন। অবাক কাণ্ড! তেমন কিছু হল না। বাস খালি করতে করতে তাঁরা বলাবলি করলেন ‘একটা দিন একটু হেঁটে চলে যাব।’ স্কুলফেরত একটি ছেলে ক্লান্তি প্রকাশ করে মাকে বলছিল ‘আমি কিন্তু আর হাঁটতে পারব না।’ মা বললেন ‘ঠিক পারবি।’ মিছিল শুরু হওয়ার পর থেকে কেবলই তাকাচ্ছিলাম বিডন স্ট্রিটের মত শহরের যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এপিসি রোডে এসে মিশেছে, সেখানে আটকে থাকা বাসযাত্রী, বাইক আরোহী, চারচাকার আরোহীদের মুখের দিকে। যদি বিরক্তি থেকেও থাকে, কোনো মুখে তার বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ল না। এখনকার দস্তুর অনুযায়ী অনেকে বরং নিজের মোবাইলে ধরে রাখছিলেন মিছিলের ছবি। যা বিরক্তির কারণ তা কি কেউ সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্যে মোবাইলে ধরে রাখে? বোধহয় না।

পতাকাওলা, পতাকাহীন মিলিয়ে নয় নয় করে কম মিছিলে যাইনি গত ৩০-৩২ বছরে। কিন্তু মঙ্গলবারের মিছিল যত শ্যামবাজারের দিকে এগোল, তত যেসব দৃশ্য দেখলাম তা ইতিপূর্বে দেখিনি। রাস্তার ধারের বহুতলের বারান্দা জুড়ে সপরিবারে দাঁড়িয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে চিৎকার করছেন মানুষ। বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলফেরত মায়েরা দাঁড়িয়ে পড়েছেন মিছিল দেখে আর মিছিল থেকে কেউ গিয়ে একখানা লাল পতাকা ধরিয়ে দিয়েছে এক পড়ুয়ার হাতে। সে একখানা উঁচু জায়গায় উঠে সজোরে নাড়ছে সেই পতাকা, স্লোগান দেওয়া হচ্ছে সবাই মিলে।

আরও পড়ুন সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

রাস্তার ধারের দোকানের নীল কলারের কর্মচারীরা ফুটপাথ থেকে পথে নেমে এসে স্লোগান দিচ্ছেন। সবচেয়ে অবাক করলেন মহিলারা – নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরিব পরিবারের মহিলারা। যে যেভাবে পেরেছেন বেরিয়ে এসেছেন পথে। মলিন নাইটির উপর গামছা জড়িয়ে, বাচ্চা কোলে নিয়েও। এপিসি রোডের অন্য পারে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন মিছিলের লোকেদের চেয়েও বেশি উৎসাহে। রাস্তার দুপাশে এত মানুষ এত প্রাণ যোগ করলেন মিছিলে, মনে হচ্ছিল যাঁরা হাঁটছেন তাঁদের গার্ড অফ অনার দিচ্ছেন ওঁরা। সবচেয়ে আশ্চর্য, অনেক জায়গায় মহিলারা লাল পতাকার এই মিছিলকে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন জানাচ্ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকায় সজ্জিত এলাকায় দাঁড়িয়ে। খান্না মোড়ের সামান্য আগে একটি জরাজীর্ণ বাড়ি। তার দোতলার বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়েছিলেন জনা দশেক মহিলা। এত তাঁদের গলার জোর এবং ঘুণধরা কাঠের রেলিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে স্লোগান দেওয়ার উৎসাহ, যে ভয় হচ্ছিল, বাড়িটি তখনই ভেঙে পড়বে। আশ্চর্যের কথা, ওই বারান্দা থেকে কিন্তু ঝুলছিল একটি তিনকোণা ক্রুদ্ধ হনুমানের পতাকা।

স্পষ্টত, এ রাজ্যের গরিব মানুষও ক্রুদ্ধ। মহিলারা ক্রুদ্ধ। হতে পারে, এখন তাঁরা কার হাতে কোন পতাকা আছে তা দেখছেন না। তাঁরা কেবল জানেন, কোন পতাকা তাঁদের অপছন্দ। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই শ্রেণির মানুষ বামেদের থেকে ক্রমশ দূরে গেছেন বলেই ২০১১ সাল থেকে কমতে কমতে রাজ্যের ও দেশের আইনসভায় এ রাজ্যের বামেরা আজ শূন্য। অন্যদিকে এই শ্রেণির মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, আশীর্বাদই মমতা ব্যানার্জির সরকারের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সত্ত্বেও একের পর এক বিরাট নির্বাচনী জয়ের বড় কারণ। আর তা থেকেই সীমাহীন ঔদ্ধত্যের জন্ম, যে ঔদ্ধত্য গোটা রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিকে সন্দীপ ঘোষদের রাজত্ব করে রেখেছে। নইলে আজ হবু ডাক্তার মেয়েটিকে মরতে হত না।

লালবাজারে ডাক্তারদের অবরোধের কাছে শেষমেশ কলকাতার নগরপাল বিনীত গোয়েলের মাথা নোয়ানো আর ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস বরাবর অরাজনৈতিক মানববন্ধনে হয়ত চাপা পড়ে যাবে বামফ্রন্টের আপাদমস্তক রাজনৈতিক মিছিলের খবর। কিন্তু মিছিলের বাইরের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল না, তাঁদের রাজনীতি সম্পর্কে বা লাল পতাকা সম্পর্কে অন্তত এই মুহূর্তে কোনো ছুঁতমার্গ আছে। কে এই আন্দোলন থেকে ফায়দা তুলবে না তুলবে তা নিয়ে ওঁরা ভাবিত নন তথাকথিত নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের মত। অবশ্য নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যৎ কিন্তু রাজ্যের রাজধানীতে একদিনের মিছিল দিয়ে গড়া যাবে না।

মিছিলে
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪: খান্না মোড়

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।

এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।

২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।

তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।

তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?

ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র‍্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।

যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের

লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আরও পড়ুন সব ধর্ষণ সমান নয়

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক

সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।

‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।

যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’

লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।

পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?

একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন

স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।

দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –

১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে।
৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে।
৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।

ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।

হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।

এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।

আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।

মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?

এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।

যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।

আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।

আরও পড়ুন এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?

বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।

অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ষড়যন্ত্র না হলেও, ভিনেশ অবহেলার শিকার

ভিনেশ ফোগত যে প্যারিস থেকে খালি হাতে ফিরছেন, তা একরকম ভালই হল। কারণ তাঁর যে পদকটা প্রাপ্য, সেটা দেওয়ার সাধ্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) নেই। সে পদক আজ থেকে ৬৪ বছর আগে মহম্মদ আলি বিসর্জন দিয়েছেন ওহায়ো নদীর জলে। ঈশপের গল্পের মত কোনো দেবী উঠে এসে তো আর সে পদক ভিনেশের গলায় পরিয়ে দেবেন না। তার জায়গায় অন্য কোন পদক মানাবে?

খবরে প্রকাশ, শেষপর্যন্ত প্যারিস অলিম্পিকে কুস্তিতে ভারতকে পদক এনে দিলেন যিনি, সেই অমন শেরাওয়াতও ব্রোঞ্জ পদকের জন্য লড়াইয়ের আগের রাতে দু-এক কেজি নয়, সাড়ে চার কেজি বেশি ওজনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তারপর সেই ওজন কমাতে অমন আর তাঁর দুই কোচ – জগমন্দর সিং আর বীরেন্দর দাহিয়া – সারারাত কী করলেন? প্রথমে দুজনে অমনের সঙ্গে দেড় ঘন্টা কুস্তি লড়লেন ম্যাটে। তারপর এক ঘন্টার হট বাথ। তারপর রাত সাড়ে বারোটা থেকে এক ঘন্টা অমন ট্রিডমিলে একটুও না থেমে দৌড়ে গেলেন। অতঃপর আধ ঘন্টার বিরাম, যাতে ঘাম ঝরে এবং সেই সূত্রে ওজন খানিকটা কমে। তারপর পাঁচ মিনিট করে পাঁচবার সাওনায় বসা। তারপরেও অমনের ওজন ৫৭ কেজির চেয়ে ৯০০ গ্রাম বেশি ছিল। তারপর তাঁকে আচ্ছা করে দলাই মলাই করা হয় এবং দুই কোচ অমনকে হালকা জগিং করতে বলেন। এরপর পাঁচবার ১৫ মিনিট করে দৌড়। শেষে ভোর সাড়ে চারটের সময়ে দেখা যায় অমনের ওজন ৫৬.৯ কেজি হয়ে গেছে। তবে নিশ্চিন্দি।

এখন কথা হল, এক ভারতীয় কুস্তিগিরের ওজন যদি ঘন্টা দশেকের মধ্যে ৪.৬ কেজিরও বেশি কমিয়ে ফেলা যায়, তাহলে অন্য একজনের ওজন কিলো তিনেক কমানো গেল না কেন? ভারতীয় দলের চিফ মেডিকাল অফিসার দিনশ পারদিওয়ালা বলেছেন সম্ভাব্য সবকিছু করার পরেও ১০০ গ্রাম ওজন বেশি থেকেই গেছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, গোলমালটা পেকেছে হিসাবের ভুলে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও একদিনে তিনটে কুস্তি ম্যাচ খেলার পরেও ওজন বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। একথা কুস্তিগিররা জানেন, তাঁদের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা কোচ, ফিজিও, ডাক্তার, নিউট্রিশনিস্ট – সকলেই জানেন। কিন্তু ভিনেশের নিউট্রিশনিস্টের নাকি হিসাব ছিল, ওজন দেড় কেজি বাড়বে। অথচ জাপানের অপরাজেয় কুস্তিগির ইউয়ি সুসাকি সমেত তিনজনকে হারানোর পরে দেখা যায় ভিনেশের ওজন ২.৭ কেজি বেড়ে গেছে। সারারাত পরিশ্রম করেও শেষরক্ষা হয়নি। ভিনেশের চুল কেটে দিয়েও চেষ্টা করা হয়েছিল।

আমরা জানি, পৃথিবীতে বড় বড় ব্যাপারে দুরকমের ভুল হয় – ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত। দিয়েগো মারাদোনা যেমন ১৯৯৪ ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন এফিড্রিন নামক একটি নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবন করে ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়ে বলেছিলেন, তাঁর ডাক্তার তাঁকে কী ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন তিনি জানেন না। অর্থাৎ তিনি জানতেন না যে ওই ওষুধে কোনো নিষিদ্ধ ড্রাগ আছে। মারাদোনার দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি, কারণ তাঁর সেই ব্যক্তিগত ডাক্তারটিকে আর্জেন্টিনা শিবিরের ত্রিসীমানায় পাওয়া যায়নি। অবশ্য ডোপ করে ধরা পড়ার পরে অনেক অ্যাথলিটই ঠিক মারাদোনার যুক্তিই দিয়ে থাকেন। মারিয়া শারাপোভাও তাঁর আত্মজীবনীতে তেমনটাই লিখেছেন। সুতরাং মনে করার কারণ আছে যে ওটা ইচ্ছাকৃত ভুল। ভিনেশের বেলায় অবশ্য কোনো অসদুপায় অবলম্বন করার চেষ্টা ছিল না। কুস্তি এবং বক্সিং এমন দুটো খেলা, যেখানে ওজনের ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের ভাগ করা হয় এবং প্রায় সব খেলোয়াড়ই নিজের চেয়ে কিছুটা কম ওজনের বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাড়তি ওজনটুকু নিয়ামক সংস্থার ওজন যন্ত্রে ওঠার (যার পোশাকি নাম ওয়ে-ইন) আগে কমিয়ে ফেলেন নানা উপায়ে। ঠিক যেমন অমন কমিয়েছিলেন ব্রোঞ্জ পদকের জন্য ম্যাচের আগের রাতে। ভিনেশের অতখানি ওজন না কমালেও চলত। যেটুকু দরকার তাও যে করা গেল না, তার জন্য দায়ী কি ইচ্ছাকৃত ভুল, না অনিচ্ছাকৃত ভুল?

মজার কথা, অমনের কোচেরা বলেছেন যে ভিনেশের ঘটনায় তাঁরা তৎপর হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও ওই দুজন ভিনেশের ব্যক্তিগত কোচ নন (তাঁর কোচ বিদেশি, নাম ওলার অ্যাকোস), তবু এই কথা থেকে কি ধরে নেওয়া যায় যে ভারতীয় দল ভিনেশের ফাইনাল গুবলেট হওয়ার আগে পর্যন্ত গদাই লস্করি চালে চলছিল? ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে না গিয়েও বলা যায়, এরকম মনে করা ভুল নয়। কারণ নিউট্রিশনিস্টের ভুল যদি ঐতিহাসিক অনিচ্ছাকৃত ভুলও হয়, ভিনেশের হয়ে কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টে (ক্যাস) আবেদন জানাতে যে গড়িমসি করা হয়েছিল তা তো প্রকাশ করেই দিয়েছেন ভিনেশের আইনজীবী রাহুল মেহরা।

বস্তুত, ক্যাস ভিনেশের আবেদন গ্রহণ করে যে বিবৃতি দিয়েছিল তাতেও বলা হয়েছে, আবেদনকারী কোনো অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের আবেদন করেননি। করলে কিন্তু ভিনেশের বিভাগের ফাইনাল স্থগিত রাখার নির্দেশও দিতে পারত ক্যাস (রায় দান পিছোতে পিছোতে এখন ১৩ অগাস্ট তারিখ ধার্য হয়েছে)। কিন্তু সেসব হবে কী করে? ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (আইওএ) তো তখনো নিজেদের আইনজীবীই নিয়োগ করে উঠতে পারেনি। অলিম্পিক আয়োজকদের দ্বারা নিযুক্ত প্যারিস বারের ফরাসি আইনজীবীরাই উদ্যোগ নিয়ে ভিনেশের হয়ে আবেদন করেছেন। তাঁরা যতটুকু করেছেন, ততটুকুই হয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা দুর্বোধ্য, কারণ ভিনেশ যে ফাইনালে লড়তে পারবেন না সে খবর গত বুধবার আইওসি সরকারিভাবে ঘোষণা করার আগেই ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ – প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – ভিনেশের লড়াইকে সেলাম-টেলাম জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও মঙ্গলবার যখন অসাধ্য সাধন করে ভিনেশ পদক নিশ্চিত করলেন তখন প্রধানমন্ত্রী কোনো সোশাল মিডিয়া পোস্ট করেননি।

মোদ্দাকথা যতক্ষণে ভিনেশের হয়ে ক্যাসে আবেদন জানানো হয়েছে, ততক্ষণে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘটনা সম্পর্কে অবগত। তবু হরীশ সালভের মত বড় উকিলকে নিযুক্ত করতে দেরি হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমী ভিনেশের ঘটনায় যতটা মর্মাহত হয়েছেন, ভারতীয় কুস্তি বা অলিম্পিক সংস্থা কিম্বা দেশের হোমরা চোমরারা মোটেই ততটা হননি। বিজেপি আই টি সেলের পক্ষ থেকে ভিনেশকে কটাক্ষ করে নানারকম পোস্টও চালু হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত সংসদে বিরোধীদের হইচই, ওয়াক আউট এবং সোশাল মিডিয়ায় বেশিরভাগ মানুষের সহানুভূতি ভিনেশের দিকে থাকা – এই ত্র্যহস্পর্শে হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনের আগে জনমত আরও সরকারবিরোধী হয়ে যাওয়ার ভয়ে হোমরা চোমরারা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন।

এই কারণেই বলা, মহম্মদ আলির ফেলে দেওয়া পদকের ন্যায্য দাবিদার আমাদের ভিনেশ। আলি (তখন ক্যাসিয়াস ক্লে) দুনিয়ার সেরা বক্সার হয়েও সাদা চামড়ার লোকেদের রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের নিয়ে খাবার খেতে পারেননি, গলাধাক্কা খেয়েছিলেন। কারণ তিনি কালো মানুষ হয়ে জন্মেছিলেন। আর প্রায় কেরিয়ার শেষ করে দেওয়া আঘাত কাটিয়ে, অসম্ভব শারীরিক বেদনা সহ্য করে ভিনেশের কুস্তির ম্যাটে ফিরে আসা জয়যুক্ত হল না, কারণ তাঁর দেশে মেয়ে হয়ে জন্মালে কেবল ভাল খেলোয়াড় হওয়া যথেষ্ট নয়। কোনো সন্দেহ নেই, ভিনেশ যদি আমাদের দেশের লক্ষ্মী ছেলে ক্রিকেটারদের মত লক্ষ্মী মেয়ে হতেন, নিয়মিত শাসক দল বিজেপির বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেন, তাহলে তাঁর হয়ে সাত তাড়াতাড়ি ক্যাসে ছুটে যেত ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থা। বিশিষ্ট ক্রীড়াপ্রেমী নীতা আম্বানিও নির্ঘাত কিছু একটা করতেন, সেটা ন্যায্যই হোক আর অন্যায্যই হোক। কিন্তু ভিনেশ যে ম্যাটের বাইরেও কুস্তি বজায় রেখেছেন।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কুস্তিগিরদের হয়রানি ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন বলে মোদীজি অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ভিনেশের সোনা জেতার পথ রুদ্ধ করেছেন – এমন বলছি না। কারণ বলার মত যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু নিজের শরীরের ওজন ৫৬ কেজির আশেপাশে হওয়া সত্ত্বেও ভিনেশকে ৫০ কেজি ফ্রিস্টাইলে লড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, কারণ চোট সারানোর চিন্তা ছেড়ে, কুস্তি ছেড়ে তাঁকে রাস্তায় বসে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। দিল্লি পুলিস টানতে টানতে নিয়ে গেছে রাস্তা দিয়ে। সেসবের পর শেষমেশ লিগামেন্টের চোটের জন্য অস্ত্রোপচার হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে।

অস্ত্রোপচারের পর প্রথম যেদিন ম্যাটে পা রাখেন, সেদিন কয়েক পা হেঁটেই যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। এদিকে ততদিনে ৫৩ কেজি ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে উঠে এসেছেন অন্তিম পাঙ্ঘেল। ফলে আবার অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করতে হলে নিজের ওজনের চেয়ে আরও কম ওজনের বিভাগে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না ভিনেশের। এতখানি ওজন কমানো এবং প্রতিযোগিতা চলাকালীন কম রাখা মোটেই সহজ নয়। এবছর এপ্রিল মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে যোগ্যতার্জন প্রতিযোগিতার আগের রাতেও ওজন কমানোর জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল ভিনেশকে। কোচ অ্যাকোসের বন্ধুর বাড়ির সাওনায় ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় বসে থাকতে হয়েছিল ১৫+১৫ = ৩০ মিনিট। তখন আবার কোচ শুকনো ডাল পাতা দিয়ে তাঁকে মারছিলেন, যাতে ঘাম বেরোয়, ওজন কমে। অত লড়াই করতে হয়েছিল ৭০০ গ্রাম ওজন কমানোর জন্যে। এই লড়াইয়ে বারবার জেতা শক্ত। ২০১৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কুস্তির প্রথম রাউন্ড থেকে ফাইনাল পর্যন্ত লড়াই একই দিনে হত। সে নিয়ম চালু থাকলে হয়ত ভিনেশের ম্যাটের বাইরের লড়াইটা এত বড় হয়ে দাঁড়াত না।

থাক, না-ই বা জিতলেন অলিম্পিক পদক। সকলেই যদি জিতে যায়, তাহলে যারা কিছুই জেতে না তারা লড়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে কাকে দেখে? ভিনেশ তো ঠিকই বুঝেছেন। গোটা জীবনটাই তো কুস্তির ম্যাট। প্রতিপক্ষও অসংখ্য এবং নানারকম।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

জাতের নামে বজ্জাতিতেও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না।

চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।

এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!

চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।

জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।

মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।

এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।

আরও পড়ুন বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।

অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সাহসী পাঠকের জন্য সাহসী লেখকের প্রথম গল্পের বই

এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

সরকার থেকে একটা বড় যজ্ঞের আসর বসানো হয়েছে। ত্রিকালসিদ্ধ নাগা জ্যোতিষ আর একটা কানা গেরুয়া কৌপীনধারী যজ্ঞে ঘি ঢালছে। কেজি কেজি ঘি। মণ মণ বেলকাঠ। গম্ভীর মন্ত্রপাঠ। ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চারদিক। অনুভূতি যথাযথ করার জন্যে যজ্ঞ হচ্ছে। ভয়, বিরক্তি, খুশি, রাগ, দুঃখ, লজ্জা, আশ্চর্য/অবাক সব যেন ব্যাকরণমাফিক হয়। তারপর সমস্ত কিছু আগের মতো যথাযথ হয়ে গেলে এই গল্পগুলো মিথ হয়ে যাবে। মুখফেরতা আখ্যান। আর, আখ্যানের শেষে জেগে থাকবে, ‘And they lived happily ever after.’

এই অনুচ্ছেদটি যে বইয়ের শেষ অনুচ্ছেদ, সেই বইটির নাম আয়না উধাও, লেখক প্রবুদ্ধ ঘোষ। এটি উপন্যাস নয়, ছোটগল্পের বই। তবু এই বই পড়লে মনে হয়, লেখক আসলে একটিই আখ্যান নানাভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন। তার কারণ শুধু এটুকু নয় যে এক গল্পের চরিত্রকে অন্য গল্পেও পাওয়া যাচ্ছে। কেবল এটুকুও নয়, যে এক গল্পের পটভূমি ‘হরষেবিষাদ’ শহরের নাম সরকার পালটে ‘হরষবিলাসী’ করে দিচ্ছে অন্য এক গল্পে। এসবের চেয়ে বড় কথা হল, লেখক গোটা বইটি জুড়েই আমাদের জানা ঘটনাবলীকে, বিস্মৃত ঘটনাবলীকে অজানা করে তুলছেন গল্প বলার গুণে। আবার অজানাকে জানার গণ্ডির মধ্যে এনে ফেলছেন। এ কাজ করতে গিয়ে সাধারণত অপ্রিয় সত্যে প্রলেপ দেওয়া হয়, প্রবুদ্ধ করেছেন ঠিক উল্টো। তিনি কখনো পাঠকের স্মৃতির পুরুষাঙ্গে হাতুড়ি মেরেছেন, কখনো পাঠকের স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নিয়েছেন। এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে পৃষ্ঠপ্রচ্ছদ পর্যন্ত পাঠককে সুখী, মেদুর গল্পের সন্ধান দেওয়ার বদলে লেখক কেবলই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। কখনো কখনো তিনি পাঠকের প্রতি এতই নির্দয় যে গল্পের পিছনের আসল ঘটনাটি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন সংবাদমাধ্যম থেকে। যেমন ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’ গল্পের বন্ধনীর মধ্যে রাখা এই অংশটি

(পাঠক নিশ্চয় ভাবছেন, “এ-সব হয় নাকি সভ্য দেশে?” বা। “কেআরপি-র নামে কুৎসা রটানো” ভেবে অশ্লীলতার মামলা ঠুকতে তৈরি হচ্ছেন? প্লিজ রেগে যাবেন না। এগুলো হয়েছে। এরকমই হয়। সিএনএন-১৮ মিডিয়ার সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে বাস্তারের আদিবাসী মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাস্তারের মহিলাদের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করেছিলেন। প্রকাশিত হবার পরে কিছু হইচই হয়েছিল। “I was four months pregnant when I was raped. They (the security forces) did not care I was pregnant,” said a feeble voice, her face blurred by the channel. Another said, she had just delivered (eight hours before) and lactating. “They were not convinced and a cop squeezed my breasts to see if there was milk.” Another woman said “they groped me, sexually assaulted and beat me.”) সাংবাদিক তনুশ্রীর এই রেকর্ডিং এবং লেখার আগে ও পরে এমন অনেকবার হয়েছে। হরবখত হতেই থাকে। যেহেতু গল্পের মধ্যে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে হয়, তাই তথ্যসূত্র দেওয়া। অবিশ্যি আমাদের গণতন্ত্রে এ-সব অবিশ্বাস্য বা অলীক সংলাপ। যাই হোক, সত্যি লেখা লেখকের কাজ নয়, গল্প লেখা কাজ। আসুন, আবার গল্পে ফিরি।)

লেখক পাঠককে বারবার চমকে দেওয়ার ব্যাপারে কতখানি সচেতন তা বই পড়া শেষ করে গল্পগুলির নামের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যাচ্ছে – ১) ‘লোকটা এই পাড়াতেই কোথাও থাকে’, ২) ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’, ৩) ‘আলোমানুষ ও আগুনের লোককথা’, ৪) ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’, ৫) ‘উধাও-আয়না আর আকাশপ্রদীপের লোককথা’, ৬) ‘একটা ভীষণ সুখী সময় আর কয়েকটা থেমে যাওয়া ট্রামের গল্প’, ৭) ‘ক্যাপ্টেন আজ নিশ্চিন্তে ঘুমোবে’, ৮) ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’, ৯) ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’, ১০) ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’, ১১) ‘সরকার সব ঠিক ক’রে দেবে’।

প্রথম দুটি নামে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট, এবং গল্পদুটিও, পাঠক যত এগোবেন, তত তাঁকে এমন এক জগতের সন্ধান দেবে যেখানে লোকটা এবং আশু কিছুতেই থিতু হতে পারছে না। পাঠকও সেই অনিশ্চয়তার, অস্বস্তির ফাঁসে ছটফট করবেন, পালাতে পারবেন না। আলো আর আগুন পাশাপাশি দেখে যে আশঙ্কা মনে উঁকি দেয়, তৃতীয় গল্পে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ বিরাট আকার ধারণ করেছে। বিরাট করে তুলতে লোককথার প্রকরণের সার্থক ব্যবহার করেছেন লেখক। চতুর্থ গল্পের নামে বলেই দেওয়া হয়েছে যে এ মাত্র একটি ঘন্টার ভাবনা। কিন্তু এক ঘন্টার মধ্যে একজন মানুষের আস্ত জীবনভাবনা যখন সেঁধিয়ে যায় তখন তো চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতে হয়। তারপর ভাবুন, আয়নাবিহীন বাড়ির কথা ভাবলেই অস্বস্তি হয় না? অসম্ভব মনে হয় না? প্রায় প্রত্যেক গল্পেই কলমের খোঁচায় বাস্তবের নাড়ি ভুঁড়ি বার করে এনেছেন লেখক, পঞ্চম গল্পে তা তুঙ্গে উঠেছে। ষষ্ঠ গল্পের নামে পাঠকের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, গল্প চলে ঠিক উল্টো পথে। ফলে পাঠককে ফের চমকে উঠতে হয়। ক্রমশ পরিষ্কার হয় যে গল্পের নামে ‘সুখী’ শব্দটি নয়, ‘ভীষণ’ শব্দটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তম গল্পেও শিরোনামের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো মেরুতে পাঠককে নিয়ে যান লেখক। অষ্টম গল্পটি, এই আলোচকের মতে, এই বইয়ের সবচেয়ে সচকিত করার মত এবং সেরা গল্প। নামটি একইসঙ্গে মার্কেজ এবং মহাভারত মনে পড়িয়ে দেয়। গল্প সে উচ্চতায় না পৌঁছলে পরিতাপের বিষয় হত। কিন্তু লেখক নিপুণভাবে বিস্তৃত ক্যানভাসে অত্যাচারের আখ্যান লিখতে পেরেছেন। সে আখ্যান সত্যিই বাস্তবের ঊর্ধ্বে এবং পুতনার মত দৈত্যাকৃতি। নবম গল্পটির নাম প্রথম দুটি গল্পের মত কেবল অনিশ্চয়তা নয়, অকিঞ্চিৎকরতারও আভাস দেয়। আমরা সকলেই নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের পরিবার পরিজন ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অতিমারীর সময়ে অকিঞ্চিৎকর মানুষের যে আখ্যান রচনা করেছেন লেখক, তা পাঠককে নড়বড়ে করে দেবে। দশম গল্পে আনন্দের ময়দান ছেড়ে না পালানোর পরিণতিও পাঠককে সুখী করবে না। আর শেষ গল্পের নাম? এই লেখার প্রথম অনুচ্ছেদ আবার পড়ুন। সরকার কীভাবে সব ঠিক করে দেয় তার আঁচ পাবেন।

এখন কথা হল, গাঁটের কড়ি খরচ করে এমন ঘেঁটি ধরে নেড়ে দেওয়া বই পড়বেন কেন? প্রথমত, লেখক মনে করেছেন ভোরের বেলার তারার কাছে তাঁর কিছু কথা আছে। তাই তিনি লিখেছেন, পড়া না পড়া পাঠকের ব্যাপার। এটি প্রথম গল্পের বই হলেও প্রবুদ্ধ স্পষ্টতই পাঠকের মন জোগানোর কথা ভেবে লেখেননি। সে কারণেই গল্পগুলি ব্যতিক্রমী। যদি কোনো পাঠক নিজের পাঠাভ্যাসের বাইরে যেতে না চান, অজ্ঞাত অনুভূতির সন্ধান যদি তাঁর সাহিত্য পড়ার কারণ না হয়, তাহলে এ বই না পড়াই ভাল। যে পাঠক ঝুঁকি নিতে ভালবাসেন – এ বই তাঁর জন্য। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু পরিচিত চেহারায় নেই। যৌনতা আছে, হিংসা আছে প্রবলভাবে, গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মত রোমাঞ্চ আছে। কিন্তু রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের মত করে নয়। বরং গোয়েন্দাপ্রেমী পাঠককে গোটা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য সম্পর্কেই ভাবিয়ে তোলার মত গল্প ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’। যে পাঠক বিশ্বাস করেন সাহিত্য মানে তাতে দুটি জিনিস থাকতেই হবে – ভাষাশিল্প আর কল্পনাশক্তি, এ বই তাঁরও মনের খোরাক হবে। আলোচককে বিশ্বাস করা নিষ্প্রয়োজন। নিজেই পড়ে দেখুন ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’ গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের এই অংশ

বাপির কাটা মাথা ভেসে ওঠে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গয়ি, সিলা বদন ছিল্ গয়া’ গানটা ভেসে আসছে। বাবুদা রেডিয়ো শোনে এখনও। ক্ষয়া ক্ষয়া রেডিয়োর গায়ে আশি দশক থেকে ধুলো জমেছে। সুরেলা আওয়াজও তাই ধুলোমাখা ধূসর হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা। এ-সব সারাবে না কেউ আর। ‘বেচে দাও বাবুদা, ভালো ফোন কেনো একটা’ – এই অনুরোধের আসরে পাত্তা না দিয়েই বাবুদা চা পাতা ফোটায়। বাবুদার দোকানে উঠে যাওয়া গেঞ্জিকলের সুতো লেগে থাকে। ভেঙে যাওয়া ভেপার ল্যাম্পের ফিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। বাবুদার দোকানে এখনও তৃণমূল বা বিজেপির পতাকা লাগানোর ধক দেখায়নি কেউ। অথচ পাঁচটা দশের চা খেতে খেতে শ্যামল, বলাই, অমররা বাবুদার দোকানের পতাকা পালটে দেওয়ার আলোচনা করছে অনেক বছর ধরেই। প্রত্যেক পাড়াতেই একটা-দু’টো এমন দোকান থেকে যায়। রেডিয়োর নব ঘোরে, পছন্দের স্টেশন। সন্ধের মুখে সিলি হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শরীরে আনচান করে ফ্রিকোয়েন্সি মিলে গেলে। প্রতিমা বাপির মাথাটা দুলতে দেখে। সারা শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের দাগ নেই। ক্ষত নেই। শ্মশানে যখন বাপির বডিটা বাঁশের চ্যাঁচাড়িতে শোয়ানো হল, টুপ ক’রে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল।

বিশ শতকে একটা সময়ে অনেক গল্পকার বলতেন, পৃথিবীতে বলার মত গল্প শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং প্লটের আর গুরুত্ব নেই, এখন গল্পকারের কাজ হল কতরকমভাবে গল্প বলা যায় তা দেখানো। দেখতে দেখতে এই তত্ত্বের বয়সও কম হল না। কিন্তু আজকাল যাঁরা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করে গল্প লেখেন, প্রায়শই দেখা যায় তাঁরা গল্প লেখার অছিলায় প্রবন্ধ লিখছেন। তাঁরা মনে করেন, যা বলছেন তা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্লট তৈরি করার দরকার নেই। প্রবুদ্ধ যথেষ্ট গম্ভীর বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন, ভাষার উপর তাঁর যথেষ্ট দখল। তবুও তিনি অভিনব গল্প বলেছেন, প্লট নির্মাণে যত্ন নিয়েছেন। কোনো গল্পে একটি শহরের সমস্ত আয়না উধাও হয়ে যাচ্ছে, কোনো গল্পে একজন গোয়েন্দা হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তদন্ত শেষ করার আগেই তাকে নিরস্ত করছে একের পর এক মক্কেল। কেন? তা জানতে গেলে গল্পটি পড়তে হবে। প্রবুদ্ধ একটি গল্পে অনায়াসে ঘটনাকে কল্পনার জোরে বীভৎস রসে সিক্ত করে লোককথার সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছেন, তো আরেকটি গল্পে একেবারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কথোপকথন থেকে নিঃসৃত হচ্ছে তাঁর আখ্যান।

আরও পড়ুন অবসাদের গল্প: বিপন্ন বিস্ময়ের গল্পকার গৌতম

এর জন্য প্রবুদ্ধর প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু তাঁর কলমের জোর যেখান থেকে আসছে, হয়ত সেখানেই তাঁর দুর্বলতাও। প্রবুদ্ধর গল্পের রাজনীতির কথা বলছি। প্রবুদ্ধ ঠিক করে নিয়েছেন তিনি কাদের গল্প বলবেন, কাদের পক্ষে দাঁড়াবেন। এই স্থিরতা না থাকলে তাঁর গল্প এত তীক্ষ্ণ হত না। কিন্তু এর ফলে কোনো কোনো গল্পে বহু চরিত্র ভিড় করছে, কিন্তু কোনো চরিত্রই জ্যান্ত হয়ে উঠছে না। তাদের উপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন যত স্পষ্ট, মানুষগুলিকে কি তত স্পষ্ট দেখাচ্ছে? লেখক ভেবে দেখতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, বেশকিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গল্প অতিকথনের শিকার বলে মনে হয়। এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’ গল্পে। চমৎকার প্লট, চমৎকার বক্তব্য এবং তার যথোপযুক্ত ভাষা এই গল্পের। কিন্তু মনে হয় লেখক কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে তাঁর বক্তব্য পাঠক বুঝে উঠতে পারবেন কিনা। তাই একের পর এক ঘটনা যোগ করে গেছেন, যা গল্পটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা ছাড়া কিছু করতে পারেনি। কিংবা ধরা যাক, ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’ গল্পের এই কটি লাইন

‘ও’-র কোনো নাম নেই। থেকেই বা কী হবে? আধার আছে, নম্বর। খিদে আছে। ওদের দিকে তাচ্ছিল্যের বিস্কুট, ব্লিচিং আর রুটি ছুঁড়ে দেওয়া আছে। আমাদের পবিত্রস্তোত্র বা পুরাণকথনের থেকে বহুদূরে ও।

গল্পটি আসলে আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষাংশে গল্পের ব্যাখ্যা দেওয়া এই অংশের প্রয়োজন ছিল না। মনোযোগী পাঠক নির্ঘাত বুঝতে পারবেন ‘ও’ কেন একটি নামহীন চরিত্র। পাঠককে অস্বীকার করে গল্প লেখার যে সাহস এ বইতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবুদ্ধ দেখিয়েছেন, এখানে এসে সেই সাহস তিনি ত্যাগ করেছেন। এত প্রতিভাবান লেখকের এই দোলাচল কিঞ্চিৎ হতাশ করে। তবে ভরসার কথা, প্রবুদ্ধ অত্যন্ত তরুণ লেখক এবং এই তাঁর প্রথম গল্পের বই। ফলে সামলে নেওয়ার সময় এবং সুযোগ তাঁর আছে। আর যে জিনিসটি রসভঙ্গ করেছে দু-একটি গল্পে, সেটি হল স্লোগান অর্থে ‘নাড়া’ শব্দটি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, লেখক যে অঞ্চলের গল্পে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সে অঞ্চলের কথ্য হিন্দির কথা মাথায় রেখে ওই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ‘নারা’ লেখাই সমীচীন। কারণ হিন্দিতে ‘নাড়া’ বলা হয় পায়জামার দড়িকে বা গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে হাতে যে জিনিসটি বাঁধা হয় তাকে।

তবে এই বই লেখক প্রবুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে দিল। অদ্বয় চৌধুরীর প্রচ্ছদও প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ তা ছিমছাম অথচ ব্যতিক্রমী।

আয়না উধাও
লেখক: প্রবুদ্ধ ঘোষ
প্রকাশক: বৈভাষিক
প্রচ্ছদ: অদ্বয় চৌধুরী
দাম: ৩০০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত