তালমা কোথায়? যাদবপুর এইট বি থেকে দমদম বিমানবন্দর, হাওড়া স্টেশন থেকে নিউটাউন পর্যন্ত বাংলা সিনেমার যে পরিচিত প্রেক্ষাপটে চরিত্রগুলো ঘোরাফেরা করে, তালমা সেখান থেকে অনেক দূরে।
‘শিক্ষিত, রুচিশীল দর্শকের জন্য ছবি বানিয়েছেন অমুক।’
‘তমুকের ছবি গ্রামের দিকে দারুণ চলে।’
‘বহুদিন পরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্যে বাংলা ছবি করেছেন অমুক।’
‘তমুক জানেন গ্রামের দর্শককে কীভাবে হলে আনতে হয়।’
‘শহরের দর্শকের পালস অমুক যেমন ধরতে পারেন, আর কেউ পারে না।’
এই কথাগুলো এবং এই জাতীয় আরও অনেক ক্ষতিকর এবং/অথবা মিথ্যা বুলি পরম সন্তোষে প্রায় বিশ বছর ধরে আওড়ানোর পর আমরা এতদিনে টের পেয়েছি – বাংলা ছবি বলে যে জিনিসটা ছিল, সেটাকে অন্তর্জলি যাত্রায় পাঠানো হয়ে গেছে। টালিগঞ্জের মাত্রাছাড়া তোলাবাজি আর পেশিশক্তি হাজির হয়েছে ডোম হয়ে; মাল্টিপ্লেক্সের দুর্মূল্য টিকিট আর সারা পৃথিবীর ‘কনটেন্ট’ দেখার জন্যে সুলভ স্মার্টফোন এসেছে শাস্ত্র মতে প্রায়শ্চিত্ত করে মৃত্যু নিশ্চিত করার পুরুতঠাকুর হিসাবে। সেকালে নদীর ধারে শায়িত মানুষটার নাভিশ্বাস উঠতে দেখে তারই আত্মীয় পরিজন যেভাবে পরমানন্দে খোল করতাল বাজিয়ে মৃত্যু ত্বরান্বিত করত, সেভাবে পশ্চিমবাংলার সিনেমার তথাকথিত জনপ্রিয় পরিচালক, অভিনেতা প্রমুখ এখনো ফেলুদা-ব্যোমকেশ-একেন-সোনাদা আর রিমেক নিয়ে মেতে আছেন। অনেকে আবার নাকটাকে আকাশের দিকে তুলে আশা করছেন যে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল স্বর্গ থেকে তাঁদের সিনেমা বৈঠক ছেড়ে নেমে এসে বাংলা ছবিকে বাঁচাবেন। আশার কথা হল, বাঙালি সংস্কৃতির এই ধাপার মাঠে দাঁড়িয়েও শহর, গ্রাম, ধনী, গরিব নির্বিশেষে দেখবে এবং ভাল লাগবে – এমন বড় পর্দার ছবি বা ওটিটি কনটেন্ট বানানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গুটিকতক শিল্পী। তেমনই কয়েকজন মিলে উইলিয়ম শেক্সপিয়রের কাছে হাত পেতে নিয়ে এসেছেন তালমার রোমিও জুলিয়েট। সকলেই তো আর মজা দেখে না বা উদাসীন থাকে না, কেউ কেউ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে মুমূর্ষুর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টাও করে। কতটা পারলেন আর কতটা ব্যর্থ হলেন তা নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব। দর্শকরা তো রায় দেবেনই।
তালমা কোথায়? যাদবপুর এইট বি থেকে দমদম বিমানবন্দর, হাওড়া স্টেশন থেকে নিউটাউন পর্যন্ত বাংলা সিনেমার যে পরিচিত প্রেক্ষাপটে চরিত্রগুলো ঘোরাফেরা করে, তালমা সেখান থেকে অনেক দূরে। হইচই প্ল্যাটফর্মে সদ্য মুক্তি পাওয়া এই ওয়েব সিরিজের সৃজন নির্দেশক অনির্বাণ ভট্টাচার্য এর আগে একক নির্দেশনায় শেক্সপিয়রেরই আরেক বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ম্যাকবেথ স্বীকরণ করে তৈরি করেছিলেন মন্দার (২০২১)। সেখানেও বাঙালি সংস্কৃতির চেনা এলাকা ছাড়িয়ে তিনি দর্শককে নিয়ে গিয়েছিলেন গেইলপুর নামে সমুদ্র তীরবর্তী এক মফস্বলে। জায়গাটা দারুণ জীবন্ত হলেও নামটা ছিল কাল্পনিক। এখানে কিন্তু পরিচালক অর্পণ গড়াই, অনির্বাণ আর চিত্রনাট্যকার দুর্বার শর্মা জলপাইগুড়ি জেলার এক সত্যিকারের জনপদে নিয়ে ফেলেছেন শেক্সপিয়রের চিরকালীন প্রেমের আখ্যানকে। আমরা তালমা চিনি না, কারণ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি শিশিরবিন্দু দেখা আমাদের স্বভাব নয়। উত্তরবঙ্গ আমাদের কাছে বেড়াতে যাওয়ার জায়গা। উত্তরবঙ্গ মানেই পাহাড়, কাঞ্চনজঙ্ঘা, মেঘ। অথচ তালমার রোমিও রানা আর জুলিয়েট জাহানারা কিন্তু তাদের শেক্সপিয়র নির্ধারিত চিরবিচ্ছেদের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে প্রথমবার পাহাড়ে যায়। গেইলপুরের চরিত্রগুলোর ভাষা যেমন কলকাতার বাংলা নয়, তালমার ভাষাও তেমন কলকাতার তথাকথিত মান্য বাংলা নয়। তালমা স্রেফ শুটিংয়ের জায়গা নয় এই ওয়েব সিরিজে। এই গল্প একান্ত তালমার, সেখানকার মানুষের। ভুয়ো আধার কার্ড, বেআইনি অস্ত্র, ভেড়ুয়া পুলিস আর তোলাবাজির রাজনীতি সমেত। সেই কারণেই ৪০০ বছর আগেকার ইংরেজ নাট্যকারের ইতালি থেকে আমদানি করা আখ্যান আমাদের তালমার সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে যায়। যা একান্ত ব্যক্তিগত, তা-ই তো সর্বজনীন।
বস্তুত গেইলপুরের চেয়ে তালমা আরও জলজ্যান্ত। অতিকায় ট্র্যাজেডির ধারা মেনে এখানে মজুমদার বেকারীর মালিকদের বাড়ির ছোট ছেলে, ফুটবলার এবং ‘লুচ্চা’ রানা (দেবদত্ত রাহা) আর চৌধুরী বাড়ির আদুরে বড় মেয়ে জাহানারা (হিয়া রায়) আছে। দুর্ধর্ষ খলনায়ক মোস্তাক (অনির্বাণ) আছে। পুরনো শত্রুতায় পুড়তে থাকা মজুমদার বাড়ির কর্তা বাদল (কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়) আর চৌধুরী বাড়ির কর্তা লিয়াকত (জয়দীপ মুখার্জি) আছে। শেক্সপিয়রের টাইবল্টের জায়গা নেওয়া মোস্তাকের বিপরীতে বেনভোলিওর স্থানে আছে রানার দাদা সোমনাথ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়)। আছে সুযোগসন্ধানী পুলিস ইন্সপেক্টর সামন্ত (দেবদাস ঘোষ)। কিন্তু পাশাপাশি আছে সাধারণত্ব ছাড়া বিন্দুমাত্র অসাধারণত্ব নেই এমন অনেকে। যেমন শেক্সপিয়রের রোমিওর ঘনিষ্ঠ মার্কুশিওর মত রানার বন্ধু পাপাই (উজান চ্যাটার্জি) আর দীপ (শিলাদিত্য চ্যাটার্জি)। অমিতাভ বচ্চন, সলমান খান, রোনাল্ডো, জিদানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ছবি লাগিয়ে রাখা সেলুন মালিক টান্টু (রাজু ধর)। আছে সোমনাথের বাল্যবন্ধু তপন (দুর্বার), যার ট্র্যাভেল এজেন্সির ব্যবসা কিছুতেই সুবিধা করতে পারে না, প্রথমবার কাটা বন্দুক চালাতে গিয়ে যে ঘেমে চান হয়। কিন্তু সোমনাথের মাথায় মোস্তাক বন্দুক ধরলে যার পালটা বন্দুক তাক করতে হাত কাঁপে না। আর আছে রানার স্নেহশীল বৌদি মৌসুমি (পায়েল দে), যার অসাধারণ সাধারণত্ব আখ্যানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তালমায় আরও আছে ফাইনালে জিতলে নগদ টাকার সঙ্গে খাসি পুরস্কার আর হারলে কিছু কম টাকার সঙ্গে মুরগি পুরস্কার দেওয়ার ফুটবল টুর্নামেন্ট, ধন্যি মেয়ে (১৯৭১) ছবির সুখেন দাসের কথা মনে করিয়ে দেওয়া ঘোষক ও ধারাভাষ্যকার। আর আছে আজব উচ্চারণে হিন্দি, বাংলা, এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতের লাইন মিশিয়ে চকড়া বকড়া কোট পরা ঘোষক সমেত, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেখানো নানারকম ভেলকির সান্ধ্য বিনোদন। উত্তরবঙ্গের এমন মফস্বল আর এইরকম চরিত্রের দেখা পেয়েছিলাম বছর চারেক আগে সাহিত্যিক এণাক্ষী রায়ের সুখেন মুর্মুর চদরবদর গল্প সংকলনে। কিন্তু বাংলা সিনেমা, ওয়েব সিরিজের পর্দায় এদের দেখা পাওয়া যায় না। সবার দেখার মত কনটেন্টের সন্ধানে কলকাতা ছেড়ে এই বেরিয়ে পড়া তালমার রোমিও জুলিয়েট সিরিজের বড় গুণ। সাম্প্রতিককালে এই গুণ আমরা দেখেছি প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ওয়েব সিরিজ বিরহী (২০২১-২৩), প্রসূন চ্যাটার্জির দোস্তজী (২০২১) ছবির মত কিছু প্রয়াসে। সময় চলে যায়, মানুষ থাকে না। কিন্তু বলার মত গল্পগুলো থেকে যায়। সে গল্প খুঁজে পাওয়ার চোখ থাকা চাই। অর্পণ-দুর্বার-অনির্বাণ সেই চোখের প্রমাণ দিয়েছেন।
অনুরাগ কাশ্যপ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বলিউডি সিনেমা বাস্তবের থেকে দূরে সরে যায় একেবারে সিনেমা তৈরির সময়েই। আউটডোর শুটিং করতে গিয়ে ধুলোমাখা রাস্তা পেলে আগে জল দিয়ে সেই রাস্তা ধোয়া হয়। ওই নকল রাস্তায় আর আসল সিনেমা হবে কোত্থেকে? এই বানানো পরিচ্ছন্নতাকে সৌমিক হালদারের ক্যামেরার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেননি অর্পণ-অনির্বাণ। খাসির মাংসের দোকানের সাইনবোর্ডের ভুল বানান থেকে শুরু করে দোলের দিন রুপোলি রং মেখে ভূত ছেলে পর্যন্ত সবকিছুই তালমার রোজকার জীবনের একেকটা খণ্ড, তার বেশি কিছু নয়। সৌমিক তাঁর স্বভাবসিদ্ধ শৈল্পিকতায় ধ্বংসের পর শূন্য হয়ে যাওয়া নদীর কোলে কাত হওয়া নৌকো থেকে শুরু করে বিচ্ছেদকালীন সন্ধ্যার আকাশ, বাইসাইকেল কিকে গোলের উত্তেজক মুহূর্ত থেকে প্রতিশোধের তাড়নায় ছুটে বেড়ানোর ঠিক আগে বৌদ্ধমঠের প্রশান্তি ধরেছেন নিখুঁতভাবে। কিন্তু কখনো মনে হয় না এসব বানানো। ট্র্যাজেডির অনিবার্যতা যেন ভর করে সৌমিকের ক্যামেরায়।
রোমিও আর জুলিয়েটের আখ্যান ট্র্যাজেডি বটে, কিন্তু শেক্সপিয়রের অন্যান্য ট্র্যাজেডির সঙ্গে এই আখ্যানের এক বড় তফাত হল নিখাদ রোম্যান্টিকতা। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট বা জুলিয়াস সিজার নাটকের মত ক্ষমতার লোভ, নিষিদ্ধ যৌনতা, অপরাধবোধ ইত্যাদি কিন্তু এই আখ্যানের চালিকা শক্তি নয়। যদিও এর সবগুলোই এই আখ্যানেও আছে। ফলে অর্পণদের এত আয়োজন মাটি হয়ে যেত রানা আর জাহানারার প্রেমের তীব্রতায় ঘাটতি থাকলে। নবাগত দেবদত্ত আর হিয়া তা হতে দেননি। দুর্বারের চিত্রনাট্যের গুণ এইখানে যে, ট্র্যাজিক জুটির জন্য এক বুক আবেগ বজায় রেখেও একবিংশ শতাব্দীর ইনস্টারিল প্রজন্মের প্রেমে যে দায়িত্ববোধের অভাব, দেখনদারির প্রাবল্য ঢুকে পড়েছে তার এক ধরনের সমালোচনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রানা সেই কারণে শেক্সপিয়রের রোমিওর চেয়েও মানসিকভাবে দুর্বল। সে যতখানি আবেগপ্রবণ প্রেমিক, ততখানি সাহসী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নয়। দেবদত্ত চরিত্রের এই দুটো দিক চমৎকার দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। বেশ কয়েকদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকার পরে বৌদির স্নেহের ছোঁয়া পেয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলার দৃশ্যে আদৌ মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। অমন অভিনয় আজকাল সুলভ নয়।
হিয়ার প্রথম শক্তি হল তাঁর সৌন্দর্য। শেক্সপিয়রের রোমিও যখন জুলিয়েটকে বিখ্যাত ব্যালকনির দৃশ্যে দেখে, তখন তার মনে হয়েছিল ওদিকটা পূর্বদিক এবং জুলিয়েট হল সূর্য। তাঁকে চাঁদ হিংসা করছে। স্বর্গের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই তারা জুলিয়েটের চোখের মণি হয়ে বসেছে। দিনের আলো যেভাবে লণ্ঠনকে লজ্জা দেয়, সেভাবেই তার প্রোজ্জ্বল গাল লজ্জিত করে আকাশের তারাদের। সেই দ্বিতীয় দর্শনেই রোমিওর জুলিয়েটের হাতের দস্তানা হতে ইচ্ছে করেছিল, কারণ তাহলে তার গাল ছোঁয়া যেত। সুতরাং সুন্দর, নিষ্পাপ একখানা মুখ না থাকলে জাহানারার ট্র্যাজেডি দর্শককে ছুঁতে পারার কথা নয়। কিন্তু সুন্দর মুখই রোম্যান্টিক নায়িকা হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়, ট্র্যাজেডিতে তো নয়ই। হিয়া আসল রাগ, কপট রাগ, উদ্ধত যৌনতা – সবেতেই নিজের ছাপ রাখতে পেরেছেন। তবে তাঁকে কিছুটা দুর্বল দেখিয়েছে একেবারে শেষদিকে, অবাধ্য হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলোতে।
বরং চমকে দিয়েছেন মৌসুমির চরিত্রে পায়েল। উঁচু তারে বাঁধা নাটকীয় সিরিজে তিনি আটপৌরে গৃহবধূ হিসাবে আগাগোড়া নিচু স্বরের অভিনয় বজায় রেখেছেন। আখ্যানের এক মোক্ষম মুহূর্তে তাঁর রূপান্তর সেই কারণেই চমৎকৃত করে বেশি। বাদলের চরিত্রে কমলেশ্বর তাঁর অন্য অনেক অভিনয়ের মতই পরিমিত। এই সিরিজের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অভিনেতারাও যথাযথ। তবে চরিত্রের সঙ্গে দারুণ মানানসই চেহারা সত্ত্বেও লিয়াকতের চরিত্রে জয়দীপকে কিঞ্চিৎ দুর্বল লাগে। তালমার যে বাংলা উচ্চারণে অন্য সকলেই স্বচ্ছন্দ, তাতে তিনি ঠিক মানিয়ে নিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।
পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও, দুজন অভিনেতা যতক্ষণ পর্দায় থাকেন, চোখ ফেরানো যায় না। একজন সিদ্দিকীর চরিত্রে বুদ্ধদেব, অন্যজন তপনের চরিত্রে দুর্বার নিজে। মাথামোটা অথচ অনুগত, প্রভুর প্রয়োজনে হিংস্র অনুচরের ভূমিকায় বুদ্ধদেব অসামান্য। তেমনি ছাপোষা, কিছুটা বোকা, বন্ধু অন্তপ্রাণ অথচ নিরীহ, ভীতু চরিত্রে দুর্বার নিখুঁত। তাঁর অভিনয় আরও অবাক করে এইজন্যে যে তাঁকে এর আগে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিড়িয়াখানা অবলম্বনে ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল (২০২৩) সিরিজে ধুরন্ধর খুনি ভুজঙ্গধরের ভূমিকায় চকচকে তলোয়ারের মত দেখিয়েছিল।
সব শেষে যাঁর কথা বলতে হয় তিনি মোস্তাক, অর্থাৎ অনির্বাণ। শেক্সপিয়র টাইবল্টকে ভীতিপ্রদ করেই এঁকেছিলেন, দুর্বারের চিত্রনাট্য তাতে এক নতুন পরত যোগ করেছে। অনির্বাণ চরিত্রের দুদিকের জমিই সমান আধিপত্যে অধিকার করেছেন, তাঁর ছায়া আখ্যানের উপরে আরও দীর্ঘ হয়েছে। মোস্তাক কখনো ভয়ানক হিংস্র, কখনো ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুন। তাঁর সংলাপগুলোর মধ্যে ‘রিল্যাক্শ, ফুল বডি রিল্যাক্শ’ সিরিজের টিজার মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে গেছে। কিন্তু অভিনেতা অনির্বাণের জাত ঢের বেশি চেনা গেছে ‘দুনিয়ায় বাঁইচা থাকার থেকে বড় কোনো শাস্তি নাই’ বলার সময়ে, আর এমন একটি গোপন মুহূর্তে, যখন মোস্তাক অন্য মানুষ ছিল।
এইরকম কিছু মুহূর্ত, আর শেক্সপিয়রের নাটকে আসন্ন ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত ছড়ানো সংলাপগুলোর উচ্চতা ছুঁয়ে ফেলার মত কিছু সংলাপের জন্য বলতেই হচ্ছে যে এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি এর চিত্রনাট্য। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দুই ধর্মের প্রেমিক-প্রেমিকার রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি নিয়ে ওয়েব সিরিজ তৈরি করা হল অথচ সাম্প্রদায়িক স্টিরিওটাইপ ভেঙে দেওয়া হল – এও বড় কম কথা নয়। একথা ঠিক যে তালমার রাজনৈতিক দখল নিয়ে মজুমদার আর চৌধুরী পরিবারের রেষারেষি কিছুটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ফলে রানার দাদা সোমনাথ কেন পকেটের টাকা খরচ করে পরোপকার করে বেড়ায় তারও একটামাত্র সংলাপ ছাড়া সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। জাহানারার বোন শাহীনের চরিত্রটাও না থাকলে কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হত না। তবু বলতেই হবে যে এ এমন এক স্বীকরণ যা মূল আখ্যানে কিছু যোগ করতে পেরেছে। চারশো বছরে যুগ এত বদলে গেছে যে মৃত্যু আজ করুণতম ট্র্যাজেডি নয় – এই নিদারুণ সত্য তুলে ধরেছে তালমার রোমিও জুলিয়েট।
এই বিরাট কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে প্রাঞ্জল বিশ্বাস, দেবরাজ ভট্টাচার্য, দেবায়ন ব্যানার্জি, সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইমন চক্রবর্তীর গাওয়া গানগুলো। ইদানীং শোনার বহুক্ষণ পরেও গুনগুন করে গাইতে ইচ্ছে হয় এমন বাংলা গান খুঁজে পাওয়া ভার। একই সিরিজে সেরকম গোটা তিনেক গান উপহার দেওয়ার জন্যও সুরকার দেবরাজ ও বলরাম কংসবণিক এবং গীতিকার অনির্বাণ, অনির্বাণ সেনগুপ্ত, নীলাঞ্জন ঘোষালদের প্রশংসা প্রাপ্য। শুরুতেই ট্র্যাজেডির বিষাদ ছড়িয়ে দিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচিত গানের ব্যবহারও সার্থক।
সিরিজটা সফল হয়েছে না ব্যর্থ, তা ঠিক করবে জনতা জনার্দন আর মহাকাল। কিন্তু জনপ্রিয় বাংলা ছবি, ওয়েব সিরিজের জন্য এঁদের সন্ধানে যে যত্নের ছাপ দেখা গেছে তা তৃপ্তিদায়ক। অন্য কোনো যুগে হয়ত নির্মাতারা সাহস করে এ জিনিস বড় পর্দার জন্যেই করতে পারতেন। তেমন রসদ এতে আছে।
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের একানড়ে চমকে দেয়। কারণ তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একখানা সফল ভয়ের উপন্যাস লিখেছেন এক শিশুকে কেন্দ্রে রেখে।
পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে বীভৎসতার কোনো অভাব নেই। ভূত প্রেত দত্যি দানো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শীত জমে উঠলেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় যে অসংখ্য বইমেলা হয় এবং শীত বুড়িছোঁয়া করে কলকাতা ত্যাগ করার সময়ে করুণাময়ীতে যে বইমেলা হয়, সেগুলোতে একাধিক স্টলে বেশ কয়েকজন লেখকের কুচকুচে কালো বা টকটকে লাল রংয়ের ভয়াবহ দৃশ্যওলা প্রচ্ছদের প্রচুর বই দেখতে পাওয়া যায়। স্টলে খানিকক্ষণ সময় কাটালেই বোঝা যায় সেসব বইয়ের কাটতি ভালই। তবে প্রচ্ছদ পেরিয়ে বইয়ের ভিতরে ঢুকলে প্রায়শই ভয়ের চেয়ে হাসি পায় বেশি। মুণ্ডহীন ধড়ের বর্ণনায় লাল চোখের কথা লেখা হলে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও চিন্তার কথা এই যে, সেসব বইয়ের অনেকগুলোই শিশুপাঠ্য, কিশোরপাঠ্য হিসাবে বিক্রি হয়। শিশুদের জন্য প্রকাশিত শারদ সাহিত্যও এই ধরনের গল্প, উপন্যাসে ছেয়ে থাকে। সমস্যা শিশুদের জন্য ভূত প্রেতের গল্প লেখায় নয়। সারা পৃথিবীর শিশুরাই চিরকাল ওসব পড়তে ভালবাসে, পড়লে সর্বনাশ হবে এমনও নয়। কিন্তু শিশুদের জন্য বীভৎস রস পরিবেশন করতে গেলে যে সংবেদনশীলতা দরকার তা এইসব সাহিত্যকর্মে দেখা যায় না – সমস্যা সেইখানে।
এই আবহে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের একানড়ে চমকে দেয়। কারণ তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একখানা সফল ভয়ের উপন্যাস লিখেছেন এক শিশুকে কেন্দ্রে রেখে। সেই চরিত্র নির্মাণে যে সংবেদনশীলতা রয়েছে তা কেবল একজন যত্নশীল ভাষাশিল্পীর পক্ষেই রক্ষা করা সম্ভব। বাংলাভাষী শিশুদের দুর্ভাগ্য যে এই সংবেদনশীলতা তাদের জন্য লেখা ভয়ের গল্পে আজকাল থাকে না।
আসলে আজকের শিশুরা একা। বড়দের বহুযুগব্যাপী নিচতা, শঠতা, হিংস্রতা তাদের একা করে দিয়েছে। সেই একাকিত্ব ভয়ানক, রক্তাক্ত। বাঙালি ঘরে বহুকাল ধরে প্রচলিত একানড়ের গল্পকে আশ্রয় করে সেই ভয়াবহতার আখ্যান লিখেছেন শাক্যজিৎ। এই কাহিনি পড়তে গিয়ে ভয়ের গল্পের পরিচিত গা শিরশিরে ভাব অনুভব করতে করতে হঠাৎ দেখি এক অপরিচিত অতিকায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাতে নিজের বীভৎস চেহারা দেখে নিজেই চমকে উঠি। এক আতঙ্ক থেকে ক্রমশ আরেক আতঙ্কে তলিয়ে যাওয়া এক শিশুকে বাঁচাতে পারা যাচ্ছে না, যাবে না, আমাদেরই পাপের ফলে এমনটা ঘটছে – একথা উপলব্ধি করার অসহায়তা টুনুর পরেশমামার মত পাঠককেও পেঁচিয়ে ধরে। না ধরলে বুঝতে হবে, আমাদের মধ্যে আর অন্যের জন্যে বেদনা অনুভব করার সংবেদন অবশিষ্ট নেই। টুনুর বাবা, মা এবং মামাবাড়ির গ্রামের যেসব হৃদয়হীনদের পাপ টুনুকে একা করে দিয়েছে; আমরাও তাদের দলেই পড়ি। একটা ন বছরের ছেলে কতখানি একা হলে তার চোখে
হেমন্তের চাঁদ রক্তাক্ত হয়, ভরা পূর্ণিমায় গোল থালাটির দিকে তাকালে স্পষ্টত যে ক্ষরণ। নিঃশব্দ অন্ধকার জঙ্গলের ওপর থমথমে চাঁদটি যখন জ্যোৎস্নার আঁচল বিছিয়ে দিচ্ছে মাঠময়, টুনুর মনে হয়েছিল এই আলোতে চরাচরের আপাদমস্তক সে মুখস্থ করে ফেলতে পারে। সন্ধেবেলাই ঝট করে একবার বেরিয়ে তালগাছে নিচে চিঠি রেখে এসেছে, ফলত ঝিমঝিম রাত্রে সারা শরীরে সুখকর ব্যথাজ্বরকে চাখতে চাখতে টুনু ঘুমিয়েই পড়ত, কারণ অন্য অবকাশ কি উপদ্রব এই মুহূর্তে তার কাছে কিছুই ছিল না, যদি না অনিচ্ছা সত্বেও [মুদ্রণ প্রমাদ] নিজেকে টেনে হিঁচড়ে যেতে হত বাথরুমে। যেহেতু সে আর বিছানায় হিসি করবে না, আর রাগিয়ে দেবে না দিদাকে, তাই ঘুমের আগে বাথরুমে যাওয়া, জল না খাওয়া তেষ্টা পেলেও, এগুলোই রোজকার প্র্যাকটিস। এবং বাথরুমে যেতে গিয়েই টুনুর চোখে পড়ল ছোটোমামার ঘর।
বাড়ি ভর্তি লোক থাকা সত্ত্বেও শিশুর এই নিদারুণ একাকিত্ব এবং তার ফলে জীবিতের চেয়ে মৃতের সঙ্গে কথাবার্তা চালাবার অধিকতর আগ্রহ একানড়েকে জীবন্ত এবং ভয়াবহ করে তোলে। ভীষণদর্শন ভূত বা রক্তারক্তির বর্ণনা দিয়ে ভয়ের আবহ তৈরি করা বিশেষ শক্ত নয়, বরং ক্লান্তিকর। কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে তিলে তিলে দমবন্ধ করা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার যে মুনশিয়ানা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বা সত্যজিৎ রায়ের গল্পে দেখা যায়, তা এই বইয়ের পরতে পরতে রয়েছে। যদিও মামাবাড়িতে টুনুর অসহায় একাকিত্ব মনে পড়িয়ে দেয় বাংলা সাহিত্যের অন্য এক প্রবাদপ্রতিম শিশুচরিত্রকে – অপরাজিত উপন্যাসের কাজল। হয় সচেতনভাবে অথবা অবচেতনে শাক্যজিৎ, কাজল আর টুনুর মিলে, অমিলে লিপিবদ্ধ করেছেন বাঙালি সমাজের গত প্রায় এক শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া বিবর্তন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, যতদিন কাজলের দিদিমা জীবিত ছিলেন ততদিন তার আদর ছিল। টুনুর দিদিমা জীবিত, কিন্তু তাঁকে টুনুর বেশ দূরের মানুষ বলেই মনে হয়। কাজল জানত সে জন্মের পরেই মাকে হারিয়েছে, কিন্তু প্রবল হতাশার মধ্যেও তার মনে আশা ছিল – একদিন বাবা আসবে, তাকে যারা অনাদরে রেখেছে তাদের প্রত্যেককে বকে দেবে। কিন্তু একানড়ে যত এগোয়, টুনুর বিশ্বাস তত দৃঢ় হয় যে মা ফোনে যতই আশ্বাস দিক, তাকে আসানসোলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসবে না। আর টুনুর বাবার উপস্থিতি তো কেবল মায়ের সঙ্গে কলহের স্মৃতিতে।
বড়দের তৈরি এই হৃদয়হীন সমাজে আমাদের শিশুরা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনেই। আমরা খেয়াল করছি না। বাবান, সুতনু, গুবলু, টুনু – এরা সকলে আসলে একই পথ দিয়ে পাতালপ্রবেশ করছে। আমাদের ভয় পাওয়া দরকার, অথচ আমরা ভয় পাচ্ছি না। আমরা বুঝতে পারছি না, যে পাপ আমরা করে চলেছি তা থেকে আমাদের কারোর নিস্তার নেই। যেভাবে
কেউ মরে গেছে, কেউ পাগল হয়ে গেছে, গণেশকে যখ টেনে নিয়ে গিয়েছিল পুকুরের তলায়, রাত্রে বডি ভেসে ওঠে, কৃষ্ণ বাস চাপা পড়ে মরেছে, বাবাইকে ছাদের ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দিয়ে–
সেভাবে আমাদের সবাইকেই পাপের ফল ভোগ করতে হবে। শাক্যজিৎ ভয় দেখিয়ে দিলেন।
আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না।
ফেসবুককে আন্দোলনের হাতিয়ার বলে বহু মানুষ চিনেছিলেন কায়রোর তাহরীর স্কোয়ার থেকে আরম্ভ হওয়া মিশরের আন্দোলন থেকে। তাহরীর স্কোয়ারের আন্দোলনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট – দুটো আন্দোলনেই ফেসবুকের সাহায্য নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। দুটোই ২০১১ সালের ব্যাপার। তারপর এক যুগ কেটে গেছে, হোয়াটস্যাপ আর ইনস্টাগ্রামও ফেসবুকের করতলগত হয়েছে। মানে ফেসবুক মোটা হয়েছে আর নাম বদলে মেটা হয়েছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স বলছে মেটার মালিক মার্ক জুকেরবার্গ অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোসকে পিছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনীতম ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ফেসবুক আন্দোলনের হাতিয়ার – এমন কথা আজ বললে ঘোড়ায় হাসবে।
গুগল আর ফেসবুক – এই দুই প্রযুক্তি দানব নিজ নিজ ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করে। দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা, মানুষের হাতের ফোন থেকে তারই অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। গুগল সিইও সুন্দর পিচাই আর জুকেরবার্গ – দুজনকেই আমেরিকা ও ইউরোপে আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুজনের কেউই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রমাণ করতে পারেননি। আপনাকে জানতে হবে অমুকটা অফ করে রাখা যায়, তমুকটা অফ করে রাখতে হয় – এই সব বলে আত্মরক্ষা করেছেন। তবে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাইভেসি লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ নয়।
যেমন ২০২১ সালের মে মাসে ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজার ফ্রান্সেস হগেন পদত্যাগ করেন এবং পাতার পর পাতা আভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস করে দেন। তা থেকে দেখা যায় যে ফেসবুক জেনেশুনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় এমন পোস্ট চলতে দিয়েছে, ইথিওপিয়ার মত দেশে জাতিদাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া আটকায়নি। সেবছর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা করে মার্কিনী দক্ষিণপন্থীরা, তার আগে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো আটকাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফেসবুক। হগেন বলেছিলেন যে ফেসবুকে চাকরি করার সময়ে তিনি দেখতে পান, বিশেষত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ফেসবুক মানুষ পাচারকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অস্ত্র। ফেসবুক তা নিয়ে ভাবিতই নয়, কারণ তাদের লক্ষ্য কেবল মুনাফা করা। মানুষের যা ক্ষতি হয় হোক।
এমন অভিযোগ একা হগেনই করেননি, সারা বিশ্বে ফেসবুকের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ভারতেও পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, সিরিল স্যামরা লেখালিখি করেছেন। ওঁদের লেখার অনুবাদ বাংলা ভাষায় সাংবাদিক অর্ক দেবের সম্পাদনায় ‘ফেসবুক: মুখ ও মুখোশ’ নামে বইতে প্রকাশিতও হয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল সমেত ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নির্বাচনের সময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে বিপুল টাকা খরচ করে তাও প্রকাশিত তথ্য। তা বাদে বেনামি প্রোফাইল খুলে অন্য দলের নেতা-সদস্য-সমর্থকদের হয়রানি, হুমকি; ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের নামে প্রোফাইল বানিয়ে পোস্ট করা – এসব তো আছেই। ফেসবুক গোড়ার দিকে বাকস্বাধীনতার যুক্তি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। হগেনের মত হুইসল ব্লোয়ার এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের চাপে সাম্প্রতিককালে আরেক জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া টুইটারের (অধুনা এক্স) মতই কোনো পোস্টে হিংসা সম্পর্কে সতর্কবাণী দেওয়া, কোনো পোস্টে ভুয়ো হতে পারে বলে নোট দেওয়া – এসব চালু করেছে। কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় অ্যালগোরিদম এমনভাবে সাজানো যে প্রতিবাদকে বিপজ্জনক বলে দাগানো হয় বা মুছে দেওয়া হয়, অন্যায়কে তোল্লাই দেওয়া হয়।
ফেসবুক এভাবেই চলে, এভাবেই চলবে। কারণ এটা বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, আর ব্যবসায়ী কখনো বিপ্লবী হয় না। সে সর্বত্রই সংখ্যাগুরুর, ক্ষমতাসীনের পক্ষে। নরেন্দ্র মোদী কী পরম স্নেহে জুকেরবার্গকে ‘মার্ক’ বলে ডাকেন তা কি আমরা দেখিনি? নাকি ভারতে ফেসবুক যাঁরা চালান তাঁদের সঙ্গে বিজেপির সখ্যের কাহিনি আমাদের চোখে পড়েনি? ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিশ্ববিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন পর্যন্ত ভারতে ফেসবুক কীভাবে হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা ভাষণকে প্রশ্রয় দেয় তা নিয়ে ২০২০ সালে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তথ্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন – এই সমস্ত অভিযোগই টুইটারের বিরুদ্ধেও আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্যাঙাত ইলন মাস্ক মালিক হওয়ার পর অভিযোগের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
এত কিছু সত্ত্বেও বাঙালির ফেসবুকের প্রতি অচলা ভক্তি যায়নি। বাঙালি মাত্রেই কবি এবং কবি মাত্রেই ফেসবুকে লেখেন। নামকরা কবিরা আবার ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে ফেসবুকে কবিতা লেখেন। আজ অমুকের জন্মদিন, কাল তমুকের মৃত্যুদিন, পরশু অমুক নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, তরশু অমুক অলিম্পিকে পদক জিতেছে – বাঙালির প্রিয় কবি সঙ্গে সঙ্গে লেখেন। সম্প্রতি আবার কপিল শর্মার কমেডি শোতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছে বলে আহত হয়ে পোস্ট দিয়েছেন, আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। মাঝেমাঝে ভয় হয়, ফেসবুক না থাকলে বাঙালির কবিতা লেখাই বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে।
শুধু সাহিত্যচর্চা করলেও কথা ছিল, বাঙালি এখনো আন্দোলনের ডাক দেয় ফেসবুকে। মানুষ তাতে সাড়া দেন এবং দলীয়, অদলীয় সব ধরনের আন্দোলনকারীরই ধারণা হয়েছে যে ফেসবুকে ডাক না দিলে সাড়া পাওয়া যাবে না। তাই রাত দখল, ভোর দখল, দুপুর দখল, রাস্তা দখল – সব ডাকই ফেসবুকেই দেওয়া হয়। এর দাপটে ভোটের সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করাও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা কমিয়ে ফেলেছেন। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে প্রার্থী যাবেন, ফেসবুক লাইভ হবে, তাতে কয়েক লক্ষ লাইক পড়বে। সেই লাইক গুনে বিরোধীরা ভাববেন অমুক কেন্দ্রে আমরা জিতছিই, তমুক কেন্দ্রে দারুণ লড়ব, তারপর ফল বেরোলে দেখা যাবে ভাঁড়ে মা ভবানী, কারণ আপামর মানুষের সঙ্গে কোনো যোগ স্থাপনই হয়নি – এটাই পশ্চিমবঙ্গের নিয়ম হয়ে গেছে। ফলে রাজ্যটা প্রায় একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। অদলীয় এবং দলীয় রাজনীতিবিদরা খেয়াল করেন না যে সারা পৃথিবীতে ফেসবুক (ব্যাপকার্থে সোশাল মিডিয়া) এই কাণ্ডটাই ঘটিয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে অপরাজেয় মনে হচ্ছে। ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, মোদী, মমতা – সকলেই যে এই ফেসবুক সর্বস্বতায় লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু অন্যত্র অনেকে বুঝে ফেলেছেন। ফলে ২০২১ সালে হগেন মুখ খোলার পর বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ছেড়েছেন অনেক মানুষ। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ আস্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ফেসবুক ছাড়লে আর কী কী সোশাল মিডিয়া বিকল্প আছে তা নিয়ে। অনেকেই ফেসবুক, টুইটার ছেড়ে বা এগুলোতে সময় খরচ কমিয়ে ফেডিভার্সে চলে গেছেন। সেটা কী? নিজে খুঁজে দেখুন।
ফেসবুক বিশ্বজোড়া এমন ফাঁদ পেতেছে যে বেরনো শক্ত। নিজেদের ওয়েবসাইট চালাতে গিয়ে দেখেছি, ফেডিভার্সে আমাদের লেখা শেয়ার করে লাভ হয় না। কারণ বাঙালি পাঠক কিছুতেই সেখানে যেতে চান না। মেসেজিংয়ের বেলাতেও একই সমস্যা। বাঙালি, অবাঙালি কোনো পরিচিতকেই টেলিগ্রাম বা সিগনাল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যায় না। আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না। চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?
২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।
ভারতীয় বোলিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল, ব্যাটিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা থেকে। বোলার হিসাবে এঁদের মাঝারিয়ানা আগের লেখায় দেখিয়েছি, কিন্তু ভারতীয় দলের মেগাস্টার ব্যাটারদের মাঝারিয়ানা আরও সরেস। এতটাই সরেস যে এই দুজনের ব্যাটের হাত সাধারণ বোলারদের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাল না হলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের লজ্জায় ভারতকে অনেক আগেই পড়তে হত। কিন্তু ভারত এমন এক দেশ যেখানে ব্যাটারদের সাত খুন মাফ। তাই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা বছরের পর বছর রান না করেও কলার তুলে ঘুরতে পারেন। ভাগ্যিস নিউজিল্যান্ড ৩-০ করে দিয়ে গেছে। ওয়াংখেড়ের ‘ডেড রাবার’ যদি কোনোমতে ঋষভ পন্থ জিতিয়ে দিতেন, তাহলে এই যে এখন দীনেশ কার্তিকের মত প্রাক্তনরা ঢোঁক গিলে বিরাট, রোহিতকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বলছেন – এটুকুও হত না।
দেশে, বিদেশে গত এক যুগ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি থেকে বিরাট হয়ে রোহিতের আমল পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। তার অনেকখানি কৃতিত্ব অশ্বিন আর জাদেজার। বস্তুত গ্যারি সোবার্স, জাক কালিস, ইয়ান বোথাম, কপিলদেব, ইমরান খান, রিচার্ড হেডলির মত কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের বাদ দিলে টেস্টে অশ্বিন আর জাদেজার মত অতগুলো উইকেটের সঙ্গে এত রান করা ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া ভার। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারার পর থেকে এই নিউজিল্যান্ড সিরিজে হারের মাঝের যে সময়টা নিয়ে বিস্তর গর্ব আমাদের, সেই সময়কালের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয় এবং ড্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা। বিশেষত শেষ ৫-৬ বছরে উইকেটরক্ষক পন্থ আর বোলাররাই ভারতের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এমনকি ২০২০-২১ মরশুমে ব্রিসবেনের গাব্বায় যে জয় নিয়ে আমাদের যারপরনাই গর্ব, সেই টেস্টেও ব্যাট হাতে রোহিতের অবদান ছিল ৪৪, ৭। বিরাট সেই টেস্টে খেলেননি। প্রথম ইনিংসে শুভমান গিল, পূজারা, রাহানে, মায়াঙ্ক আগরওয়াল – কেউই সুবিধা করতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর আর শার্দূল ঠাকুর জোড়া অর্ধশতরান না করলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসেই বিরাট লিড পেয়ে যেত। দ্বিতীয় ইনিংসেও গিল (৯১) আর পূজারার (৫৬) লড়াই বৃথা যেত পন্থ (অপরাজিত ৮৯) আর ওয়াশিংটন (২২) না থাকলে।
চট করে প্রথম চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যাবে। তারপর কোনো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটার অশ্বিন, জাদেজা বা অন্য বোলারদের সঙ্গে নিয়ে ভদ্রস্থ রান তুলে দেবেন বা ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, নিদেনপক্ষে হার বাঁচিয়ে দেবেন – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। পৃথিবীর সর্বত্র, যে কোনো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। অথচ এবার ৩-০ হওয়ার পরে এমন ভান করা হচ্ছে যেন স্রেফ স্পিন খেলতে না পেরেই আমাদের এই অবস্থা হয়েছে এবং ভারি অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বারবার ঘটে চলা ব্যাটিং ব্যর্থতা খেয়াল করলে বোঝা যায় – এটাই প্রত্যাশিত ছিল। আগে কেন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।
বেশি পিছোতে হবে না। যে বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়ে দিয়েছি বলে কদিন আগেই পেশি ফোলালাম আমরা, তাদের সঙ্গেই সেপ্টেম্বরে চেন্নাইতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সকালে ৯৬ রানে চার উইকেট চলে গিয়েছিল আমাদের। তথাকথিত বিশ্বসেরা ওপেনার রোহিত আর তথাকথিত সর্বকালের সেরা ব্যাটার কোহলি আনকোরা হাসান মাহমুদের সুইং সামলাতে না পেরে ছখানা করে রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন। গিল তো খাতাই খুলতে পারলেন না। পন্থ ৩৯ রান করেছিলেন, সুপ্ত প্রতিভাসম্পন্ন কে এল রাহুল আবার ব্যর্থ। সেদিনও জাদেজা ৮৬ আর অশ্বিন শতরান না করলে শ দুয়েক রানেই গুটিয়ে যেত ভারতের ইনিংস। বিপক্ষ দলের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভাল হলে কী হত সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর প্রথম টেস্টে। প্রথম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন জোরে বোলিং সহায়ক আবহাওয়ায় ম্যাট হেনরি আর বাচ্চা ছেলে উইলিয়াম ও’রুর্ক ৪৬ রানে গুটিয়ে দিলেন ভারতের ইনিংস। স্কোরবোর্ড জুড়ে শূন্য আর দুইয়ের ছড়াছড়ি। রোহিত সুইং সামলাতে পারবেন না বুঝে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে দুই রানে বোল্ড, আর কোহলি দীর্ঘকায় ও’রুর্কের বাউন্স সামলাতে না পেরে লেগ স্লিপের হাতে বল জমা দিয়ে শূন্য রানে আউট। দ্বিতীয় ইনিংসের ভাল ব্যাটিং ইনিংস হার বাঁচানোর কাজটুকু করতে পেরেছিল। তাও রোহিত যেভাবে আউট হলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি সেই স্তরে পৌঁছেছেন যেখানে শরীর চলে তো মাথা কাজ করে না। নইলে নিজের ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ স্ট্রোকে মুগ্ধ হয়ে থেকে বলটা গড়িয়ে উইকেটে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করতে ভুলে যাবেন কেন?
ভারতীয় দল এবার অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বর্ডার-গাভস্কর ট্রফির অঙ্গ হিসাবে পাঁচখানা টেস্ট খেলতে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। তার একটা বড় কারণ – দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থ কোনো ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান, বা সম্ভাবনাময়, বা সিনিয়র, বা অধিনায়ক, বা রেকর্ড করবে – এই অজুহাতে তারা বয়ে বেড়ায়নি কোনোদিন। বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও ২০০৩ বিশ্বকাপের একবছর আগে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বয়স তখন ৩৭। ফর্ম নেহাত খারাপ ছিল না, অর্থাৎ বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। আর এদেশে আমরা কী করছি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৩৭ বছরের রোহিতের না শরীর চলছে, না মাথা ঠিকমত কাজ করছে (সদ্যসমাপ্ত সিরিজে অধিনায়কত্বে অজস্র ভুলও স্মর্তব্য)। তাঁর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বিরাটও সোজা ফুলটসে ক্রস ব্যাট চালিয়ে বোল্ড হচ্ছেন, বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতেই পারছেন না। অথচ এতদিনে এঁদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওসব পরামর্শ ৩০-৩২ বছরের ব্যাটারদের দিতে হয়, কারণ তাঁদের বয়স অনুযায়ী খেলা বদলে নিয়ে ফিরে আসার সময় থাকে। রোহিত, বিরাটের বয়সটা সটান বলে দেওয়ার সময় – বাপু, এবার মানে মানে বিদায় হও। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞরা, সাংবাদিকরা, নির্বাচকরা – কেউ সেকথা বলবেন না।
কোনোদিনই যে কেউ বলতেন না তা কিন্তু নয়। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। আর ঠোঁটকাটা জিওফ্রে বয়কট আরও সরাসরি বলেছিলেন ‘হি শুড ইম্প্রুভ অর রিটায়ার’। মানে উন্নতি করতে না পারলে ওর অবসর নেওয়া উচিত। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। বরং বলা হচ্ছে – কে জানে! হয়ত অস্ট্রেলিয়ার পিচে ওদের সুবিধাই হবে। এই আজগুবি তত্ত্বটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন খেলতে ভুলে গেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু ভাবখানা এমন, যেন জোরে বোলিং আমাদের ব্যাটাররা চমৎকার খেলেন।
অস্ট্রেলিয়ায় রোহিতদের স্বাগত জানাতে বসে আছেন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড আর প্যাট কামিন্স। এই অস্ট্রেলিয়াতেই গত সফরে অ্যাডিলেডে ভরদুপুরে ৩৬ অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বিশ্বসেরা, সর্বকালের সেরা প্রমুখরা। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছিল মেলবোর্নে পরের টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের শতরানের পাশে জাদেজার অর্ধশতরানের জন্যে। তবে তারপরেও সিডনিতেই ভারত হেরে যেত দুজন ক্রিকেটার অতিমানবিক ইনিংস না খেললে। একজনের নাম হনুমা বিহারী, অন্যজন সেই অশ্বিন। প্রথম জন পায়ে চোট নিয়ে দৌড়তে পারছিলেন না, দ্বিতীয় জন পিঠের ব্যথায় কাবু ছিলেন। সেভাবেই দুজনে মিলে মোট ২৮৯ খানা বল, অর্থাৎ প্রায় ৫০ ওভার, কেবল ব্লক করে আর বল ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দিয়েছিলেন। অন্য যে কোনো দেশে ওই টেস্টের পর থেকে যে কোনো ম্যাচে নির্বাচন সমিতির সভা শুরু হত বিহারীর নামটা প্রথমে লিখে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট কেবল ক্রিকেটিয় যুক্তিতে চলে না। তাই তারপর বিহারী খেলেছেন আর মাত্র চারখানা টেস্ট। সেগুলোতে তাঁর রান যথাক্রমে ২০, অপরাজিত ৪০, ৫৮, ৩১, ৩৫, ২০, ১১। মানে অসাধারণ নয়, কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতও নয়। কিন্তু উনি তো আইপিএলে খেলতে পারেন না, পকেটে বিজ্ঞাপনী চুক্তিও নেই। অতএব ২০২২ সালের পর থেকে তিনি আর আলোচনায় নেই। ওই গর্বের সিরিজ জয়ে কিন্তু ব্যাটিংয়ের দুই মহাতারকার অবদান যৎসামান্য। কোহলি একটা ম্যাচ খেলে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭৮ রান করেছিলেন আর রোহিত দুটো ম্যাচ খেলে সোয়া বত্রিশ গড়ে ১২৯ রান। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে নায়ক ছিলেন পন্থ আর পূজারা, সঙ্গতে গিল। পূজারার গড় ছিল মোটে ৩৩.৮৭। কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের মধ্যে, খেলেছিলেন ৯২৮ খানা বল।
মাঝারি শব্দটা ব্যবহার করলে আবার আমাদের দেশের ক্রিকেটতারকাদের ভক্তরা বেজায় রেখে যান। তার উপর রোহিত আর কোহলির ভক্তকুল রীতিমত সহিংস। বছর কয়েক আগে এক কোহলিভক্ত তার রোহিতভক্ত বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে বন্ধুটিকে খুনই করে ফেলে শেষপর্যন্ত। তাই এঁদের মাঝারি বলে প্রমাণ করতে গেলে আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। আগে রোহিতের ব্যাপারটাই আলোচনা করা যাক। কারণ একে টেস্টে তাঁর রান বিরাটের চেয়ে অনেক কম, তার উপর তাঁকে বিশ্বসেরা ওপেনার বলে দাবি করলেও সর্বকালের সেরাদের পাশে বসায় না আমাদের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র। যাঁকে বসায় তাঁকে নিয়ে তো আরও বেশি শব্দ খরচ করতে হবে।
বস্তুত, আজ ফর্ম পড়ে গেছে বলে নয়, রোহিত কোনোদিনই টেস্টে অসাধারণ ছিলেন না। যে যুগে পিচ ঢাকা থাকত না, হেলমেট ছিল না, সে যুগের কথা আলাদা। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে পঞ্চাশের ঘরে গড় না থাকলে কোনো ব্যাটারকে বিশ্বসেরাদের মধ্যে ধরা হয় না। রোহিতের গড় ৬৪ খানা টেস্ট খেলে ফেলার পরেও ৪২.২৭-এ আটকে আছে। বিদেশে তাঁর ব্যাটিংকে মাঝারি বললেও বাড়াবাড়ি করা হবে। এগারো বছর খেলে গড় ৩৩.৬০, শতরান মাত্র দুটো। তার একটা আবার আজকের দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারেননি। ইংল্যান্ডে শতরান করলেন ২০২১ সালে পৌঁছে। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। কোভিড বিধি মানা হয়েছে না হয়নি, আইপিএল খেলার তাড়া আছে না নেই – এই নিয়ে এক আশ্চর্য বিতর্কে বিরাট-শাস্ত্রীর দল দেশে ফেরত চলে আসে শেষ টেস্ট না খেলেই। পরের বছর ফেরত যায় পঞ্চম টেস্ট খেলতে এবং হেরে বসে। কিন্তু বলার কথাটা হল, ওই সিরিজেও বারবার ভারত ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। হেডিংলির তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ অল আউট হয়ে গিয়েছিল, ওভালে চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ২০০ পেরোতে পারেনি।
টেস্ট ক্রিকেটে রোহিতের শুরুটা নিঃসন্দেহে সাড়া জাগিয়ে হয়েছিল। অভিষেকে ইডেন উদ্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৭৭, পরের টেস্টে ওয়াংখেড়েতেও শতরান। তবে দুটোই ছ নম্বরে ব্যাট করে। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই কিন্তু দেখা গেল রোহিত অকুল পাথারে পড়েছেন। জোহানেসবার্গ আর ডারবানের চারটে ইনিংসে দুবার বোল্ড, একবার এলবিডব্লিউ। পরের দেড় বছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ঘুরে তিনি মাত্র চারটে অর্ধশতরান করেন। তৃতীয় টেস্ট শতরান আসে ২০১৭ সালে নাগপুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। অন্য কেউ হলে ততদিনে দল থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সকলেই রোহিতের ‘ট্যালেন্ট’ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তার উপর সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষত আইপিএলে, তিনি ততদিনে তারকা। ফলে দামি ব্র্যান্ড হয়ে গেছেন। উপরন্তু ধোনি শিখিয়েছিলেন ‘ইনটেন্ট’ নামক একটা পবিত্র জিনিস ব্যাটিংয়ে থাকতেই হবে। শাস্ত্রী আর বিরাটও মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন। ওটা না থাকার যুক্তিতে পূজারা, রাহানেকে বারবার বাদ দিয়েছেন। রোহিতের জিনিসটা ছিল। তাই তিনি অপরিহার্য।
যা-ই হোক, ২০১৭ সালের সেই শ্রীলঙ্কা সিরিজটায় রোহিত আরও দুটো অর্ধশতরান করেন। তারপর কিন্তু আবার খরা। সেবছর আর একটামাত্র অর্ধশতরান করেন বছরের শেষ টেস্টে মেলবোর্নে। তাঁকে দিয়ে যে চলবে না তার এর থেকে বেশি প্রমাণের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যিনি ব্র্যান্ড এবং যাঁর ট্যালেন্ট আর ইনটেন্ট আছে তাঁকে তো যে করেই হোক দলে রাখতে হবে। অতএব নতুন বছরে রোহিত হয়ে গেলেন ওপেনার। তখন ভারত সফরে এসেছে ভাঙাচোরা দক্ষিণ আফ্রিকা। সে দলে আন্তর্জাতিক মানের বোলার বলতে কাগিসো রাবাদা। অ্যানরিখ নর্খের সবে প্রথম সিরিজ। রোহিত প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই বেধড়ক পিটিয়ে শতরান করলেন। দ্বিতীয় টেস্টে পুনেতে রান পাননি, রাঁচিতে পৌঁছেই একেবারে ২১২। আর পায় কে? বলা শুরু হয়ে গেল, একদিনের ক্রিকেটের মত টেস্টেও উনি বিশ্বসেরা ওপেনার। এমন আর দুটো হয় না। দুঃখের বিষয়, রোহিতের এরপরের রানের বহর কিন্তু সেকথা বলছে না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো টেস্টে সর্বোচ্চ রান ২১। অতিমারী পেরিয়ে যখন আবার টেস্ট খেললেন অস্ট্রেলিয়ায়, চারটে ইনিংসে একবার ৫০ পেরোলেন। দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত ইনিংসে একটা বড় শতরান আর একটা অর্ধশতরান। তারপর থেকে কেবলই মাঝেমধ্যে একটা শতরান বা গোটা দুয়েক অর্ধশতরানের কাহিনি। বাকিটা ব্যর্থতার গল্প।
গত এক বছরে রোহিতকে দেখে মনে হয়, তিনিও জানেন যে বয়সের কারণে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা কমেছে। রিফ্লেক্স তো কমেছেই। অতএব তিনি এখন ঠিক করে নিয়েছেন অনেক বেশি ঝুঁকি নেবেন, তাতে যা রান হয়। এই পরিকল্পনা টি টোয়েন্টি এবং একদিনের ক্রিকেটে কার্যকরী, কারণ সাদা বল সুইং করে লাল বলের চেয়ে কম এবং ফিল্ডিং দলও অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজাতে বাধ্য। উপরন্তু নিজের দলের পক্ষেও এই কৌশল উপকারী। গতবছর ভারতের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবার পিছনে রোহিতের ঝোড়ো ইনিংসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ও জিনিস টেস্টে ভাল বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যে চলবে না তা নিউজিল্যান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ওই কৌশল খাটেনি। চারটে ইনিংসে রোহিতের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৩। এ যদি মাঝারিয়ানা না হয়, তবে মাঝারিয়ানা বলে কাকে? কোনো দলের ওপেনার তথা অধিনায়ক এত মাঝারি হলে সে দলের কপালে অনেক দুঃখ। সেই ধোনির আমল থেকে শাস্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলে গেছেন, এই দলটা নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। অথচ এই আমলে না নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা হয়েছে, না ইংল্যান্ডে – যা অতীতে একাধিক ভারতীয় দল করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধোনির দল অন্তত একবার সিরিজ ড্র রেখে আসতে পেরেছিল। কোহলির দল দুবার সুযোগ পেয়ে সেটুকুও করতে পারেনি। এমন নড়বড়ে ওপেনার থাকলে পারা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে সাই সুদর্শন বা অভিমন্যু ঈশ্বরনরা যতই রান করুন, তাঁদের দলে নেওয়া যাবে না। রোহিতের মত ব্র্যান্ডের মূল্য কি আর রান দিয়ে মাপা চলে?
বিরাট কিন্তু মাঝারিয়ানায় রোহিত-সুলভ নন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা রোহিতের মত হয়নি। টেস্ট জীবনের প্রথম বারোটা ইনিংসে দেশের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটো অর্ধশতরান ছাড়া বলার মত কিছুই ছিল না। ২০১১-১২ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম দুটো টেস্টে রান করতে না পেরে প্রায় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। পার্থ টেস্ট ছিল শেষ সুযোগ। সেখানে দুই ইনিংসেই রান করেন, পরের টেস্টে অ্যাডিলেডে প্রথম শতরান। তারপর থেকে সাফল্যের লেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। এটা পরিসংখ্যানের যুগ, সোশাল মিডিয়ার যুগ। তরুণ ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করেন ক্রিকেটারদের উৎকর্ষ, অপকর্ষ পুরোটাই স্কোরবোর্ডে আর ডেটা অ্যানালিটিক্সে ধরা থাকে। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন – স্কোরবোর্ড একটা গাধা। আমাদের দেশে তাঁর এমন কোনো উত্তরসূরি নেই যিনি ধরিয়ে দেবেন, যে স্কোরবোর্ড একেবারে গাধা না হলেও তার দৈর্ঘ্য প্রস্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ক্রিকেট খেলার মানবিক প্রয়াসের দিকটার অনেককিছুই স্কোরবোর্ডের পরিসরে ধরা পড়ে না। ফলে গোটা কেরিয়ারে অস্তগামী মিচেল জনসন ছাড়া একজনও সারাক্ষণ ৯০ মাইল+/ঘন্টার বোলারকে না খেললেও, নাথান লায়ন ছাড়া কোনো উঁচু দরের স্পিনারকে খেলতে না হলেও বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিংদের পাশে বসানো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন জগৎ বুদ্ধিমানের মত সর্বকালের সেরার (GOAT) মুকুটও সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে বিরাটের মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।
খেয়াল করা হয়নি, যে কোনো ব্যাটারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাগার ইংল্যান্ডে বিরাট একাধিকবার সফরে গিয়েও মূলত অসফল। সতেরোটা টেস্ট খেলে মাত্র দুটো শতরান, গড় মাত্র ৩৩.২১। আসলে বিরাটের সাফল্যকে বিরাটতর করে তুলেছিল তিনটে জিনিস – ১) একদিনের ক্রিকেটে শতরান করে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় শচীনের রেকর্ডকে ধাওয়া করা, ২) ২০১৩-১৪ মরশুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম থেকে শুরু করে বছর পাঁচেক টেস্টে রানের বন্যা, ৩) এই সময়কালে তাঁর অধিনায়কত্বে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, অশ্বিন-জাদেজার কল্যাণে দেশ বিদেশে শচীন, রাহুল দ্রাবিড়দের যুগের চেয়ে ভারতের বেশি ম্যাচ জেতা। লোভনীয় ব্র্যান্ডকে সে যত বড় তার চেয়েও বড় করে দেখানোর যে প্যাঁচ পয়জার চলে এবং এখনো চলছে তা নিয়ে আর আলাদা করে বলব না, কারণ তা পৃথক আলোচনা দাবি করে। সে আলোচনা আগেই করেছি এই লেখায়। কিন্তু ঘটনা হল, বিরাটের সমকক্ষ অন্তত তিনজন ব্যাটার যে তাঁর নিজের প্রজন্মেই রয়েছেন – সেকথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরাটকে আকাশে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর দ্রুত পতন হয়েছে গত ৫-৬ বছরে। আগেই বলেছি, নয়ের দশকের পর থেকে অন্তত ৫০ গড় না হলে আর বিশ্বসেরাদের দলে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সর্বকালের সেরা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিরাটের গড় এখন নামতে নামতে ৪৭.৮৩। নিজের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী জো রুট প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন, গড় ৫১.০১। স্টিভ স্মিথও অতিমারীর আগের ফর্মে নেই, তবু তাঁর গড় ৫৬.৯৭ – এখনো অসাধারণ। মোট রানের দিক থেকে একমাত্র কেন উইলিয়ামসনই এখনো বিরাটের থেকে পিছিয়ে, তবে তিনি ম্যাচও খেলেছেন কম। গড় যেহেতু ৫৪.৪৮, তাই বিরাটকে টপকে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা।
তবে এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় কথা হল, সেই ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইডেন উদ্যানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর থেকে বিরাটের ফর্ম সেই যে পড়তে শুরু করেছে, সে পতন থামছে না। তার ফল ভুগছে দল। ওই শতরানের পর থেকে ৩৪ খানা টেস্টের ৬০ ইনিংসে তিনি মাত্র ১৮৩৮ রান করেছেন ৩১.৬৮ গড়ে। শতরান মাত্র দুটো, অর্ধশতরান নটা, পাঁচবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। উপরন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে যে ঘূর্ণি উইকেটে সাধারণ স্পিনারদের মাথায় চেপে বসার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাইজুল ইসলাম থেকে মিচেল স্যান্টনার – সবাই বিরাটের পক্ষে একইরকম দমবন্ধ করা, বিপজ্জনক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাদা বলের ক্রিকেটেও তাঁকে বেঁধে রাখতে স্পিনারদের ব্যবহার করা শুরু করেছে দলগুলো। সুইং সামলাতেও যে বিরাট তেমন দড় নন তা তাঁর ইংল্যান্ডের রেকর্ড প্রমাণ করে। আজকাল তো দেশের মাঠেও ঘেমে উঠছেন বেঙ্গালুরুর মত। এই বয়সে শচীন কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ডেল স্টেইন আর মর্নি মর্কেলের বিরুদ্ধে তিনটে টেস্টে দুটো শতরান করেছেন। সুনীল গাভস্কর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্টে এমন একটা ইনিংস খেলেছেন, যাকে বলা হয় ঘূর্ণি পিচে স্পিন খেলার টিউটোরিয়াল।
সোজা কথা হল, যেরকম ব্যর্থতার কারণে পূজারা আর রাহানেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিরাট আর রোহিত এখনো নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। কারণ তাঁদের মাঝারিয়ানা কেউ স্বীকার করবে না। বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন না? সাংবাদিকরা কেন লিখছেন না? কারণ কিন্তু এটা নয় যে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, দুই হুজুর অস্ট্রেলিয়ায় ফের রান করে দিতে পারেন। সে তো পারেনই, কিন্তু তাতে তো গত ৫-৬ বছরের টানা ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কিন্তু ওই যে – ব্র্যান্ড মূল্য। টিভি খুললে, ওটিটি চালালে কতশত বিজ্ঞাপনে দুজনকে দেখতে পান তা খেয়াল করবেন। ক্রিকেট খেলা ভারতে যত বড় ব্যবসা, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তত বড় নয়। ফলে অত্যন্ত মাঝারি রাহুলকে (৫৩ টেস্ট খেলে ফেলার পর গড় ৩৩.৮৭) যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখার চেষ্টার পিছনেও এনডর্সমেন্ট। এঁরা খেললে এঁদের বিজ্ঞাপন দেখানোর মানে থাকবে। থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের টাকায় বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছে টিভি/ওটিটি নেটওয়ার্ক, তা উসুল হবে।
উপরন্তু ভারতের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচগুলোর প্রযোজনার দায়িত্বে থাকে বিসিসিআই নিজে। নিজেদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মন্দ কথা তারা মেনে নেবে না। অতএব ভারতীয় ক্রিকেটারদের দোষগুণ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেবে। সম্প্রচার সংস্থাকেও বাধ্য করতে পারে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাউকে বাদ দিতে। সে তিনি যত বড় বিশেষজ্ঞই হোন। টাকার পাহাড়ে বসে থাকা নিয়োগকর্তা বিসিসিআইয়ের কাছে গাভস্কর আর মুরলী কার্তিকের দর একই। তার উপর সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার কায়দাও আজকের ক্রিকেটারদের জানা আছে। সেভাবেও ধারাভাষ্যকারদের ভাতে মারা যায়। ব্যাপারটা একবার টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে, আরেকবার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। এই কারণেই ২০১৩ সালে ইয়ান চ্যাপেল ভারতে ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
আরেকটা কারণ হল খারাপ দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুজন ক্রিকেটার – শচীন আর ধোনি। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বকাপ জেতার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ভারতীয় দল পরপর আটটা টেস্টে হারে। স্পষ্ট বোঝা যায়, যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে আর চলবে না। অথচ একমাত্র দ্রাবিড় আর ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ ছাড়া কেউ এই সত্য মেনে নিলেন না। ওঁরা দুজন অবসর নিলেন, শচীন রয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরান আর দুশোতম টেস্ট খেলার রেকর্ড করার জন্যে। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসাবে, অধিনায়ক হিসাবে ব্যর্থ ধোনিকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর গডফাদার এন শ্রীনিবাসন। শচীন বহাল তবিয়তে ২০১৩ পর্যন্ত খেলে গেলেন আর ধোনি অধিনায়কত্ব চালিয়ে গেলেন ২০১৩-১৪ অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত। তারপর টেস্ট সিরিজের মাঝখানে দুম করে অবসর নিলেন।
যাঁরা আট টেস্টে হারের পরেও ধোনিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সেইসময় বলতেন ‘এখন ছাড়লে ক্যাপ্টেন হবে কে?’ সত্যিই তেমন কেউ ছিলেন না, কারণ প্রজন্ম বদলের কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি বোর্ড। তাই ধোনি বহাল তবিয়তে যতদিন ইচ্ছা খেলে যেতে পেরেছিলেন। এখন ভারতীয় ক্রিকেট ফের সেই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যে রাহুলকে বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে ভাবা হচ্ছিল, তিনি এখন দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছেন। ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নেমেও হাস্যকর কায়দায় আউট হচ্ছেন। গিল ধারাবাহিকতা হারিয়েছেন, পন্থ প্রতিভাবান কিন্তু এখনই নেতৃত্ব দিতে কি তৈরি? কেউ নিশ্চিত নয়।
অর্থাৎ গত এক যুগে এত জয় সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেট যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। ব্র্যান্ড সর্বস্বতা, বিশেষত মাঝারিয়ানা সর্বস্বতা, এভাবেই প্রগতি আটকায়।
ভারত টেস্ট ক্রিকেট খেলছে ১৯৩২ সাল থেকে, আর ভারতের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলা হয় ১৯৩৩ সালে। একানব্বই বছরের ইতিহাসে প্রথমবার তিন বা তার বেশি ম্যাচসম্পন্ন সিরিজের সবকটা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় যাঁরা এখন মুহ্যমান, তাঁদের মাঝারিয়ানা এবং অশ্বিন, জাদেজার প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা একটু বলে নেওয়া দরকার।
২০২৩-২০২৭ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচার জন্য যখন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালে আইপিএলে খেলা হবে ৭৪ খানা ম্যাচ, ২০২৫ ও ২০২৬ আইপিএলে ৮৪ এবং ২০২৭ আইপিএলে ৯৪। তবে এবছর সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিকইনফো ওয়েবসাইট এক প্রতিবেদনে জানায় – ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ২০২৫ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা না বাড়ানোই ভাল বলে মনে করছে, কারণ ভারত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার মত জায়গায় আছে। আর ফাইনাল হবে মে-জুন নাগাদ। সুতরাং আইপিএল বেশি লম্বা হলে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চাপ বেড়ে যাবে। এখনো আইপিএলের সূচি ঘোষণা হয়নি, ইতিমধ্যে ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় নিদেনপক্ষে চারটে টেস্ট জিততে না পারলে অন্য দলগুলোর জেতা-হারার উপর নির্ভর করতে হবে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতীয় দলের ব্যর্থতা বিসিসিআইয়ের কাছে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৮৪ ম্যাচের আইপিএল করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিতে পারে। বেশি ম্যাচ খেলা মানে খেলোয়াড়দের জন্যেও বেশি টাকা।
গন্ধটা খুব সন্দেহজনক লাগছে? কিছু করার নেই। এটাই আজকের ক্রিকেটের বাস্তবতা। ভারতের সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগটাই বিসিসিআইয়ের অনুগত বলে এসব নিয়ে বিশেষ লেখালিখি হয় না, কিন্তু ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের সাংবাদিক টিম উইগমোর সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন। শিরোনাম ‘হাউ ক্রিকেট এট ইটসেলফ’, অর্থাৎ ক্রিকেট কীভাবে নিজেকে খেয়ে ফেলল। সেই লম্বা প্রতিবেদনে টিম দেখিয়েছেন যে সারা পৃথিবীতে এখন এত বিপুল সংখ্যক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হচ্ছে যে প্রকৃতপক্ষে ৫০০ দিনের ক্রিকেট খেলা হচ্ছে ৩৬৫ দিনে। একই ক্রিকেটার সাত-আটটা লিগে খেলছেন, অনেকসময় একই সপ্তাহে তিনটে আলাদা আলাদা লিগে খেলছেন। ফলে এক লিগে খেলতে খেলতে অনেকেই চাইছেন যেন তাঁর দল হেরে যায়, যাতে তিনি অন্য একটা লিগে গিয়ে যোগ দিতে পারেন। কারণ তাতে রোজগার বাড়বে। অনেক লিগে আবার লগ্নি ব্যাপারটা এত গোলমেলে যে অনেক দলের মালিক নিজের দলের বিরুদ্ধেই বাজি ধরেন বেটিং সাইটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থাগুলো ঢালাও এইসব লিগকে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে আগাপাশতলা না ভেবে। ফলে এমন লিগও আছে যেগুলোতে দল গঠন করা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের নেওয়া হচ্ছে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে টাকা আসবে আশা করে। তারপর টাকা না আসায় একটা বলও খেলা হওয়ার আগেই লিগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার খেলোয়াড়রা টাকা পাচ্ছেন না বলে মাঠে পৌঁছে খেলতে নামতে চাইছেন না। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, আন্দ্রে রাসেলের মত লোকেরও এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
এসব খবর দিয়ে এই ইঙ্গিত করছি না যে ভারতীয় দল ইচ্ছা করে নিউজিল্যান্ডের কাছে গোহারা হেরেছে বা অস্ট্রেলিয়ায় ইচ্ছে করে হারবে। যাঁরা ক্রিকেট খেলা ন্যূনতম মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং অন্তত কিছুটা বোঝেন, তাঁদেরও বুঝিয়ে বলার দরকার নেই যে এই ভারতীয় দলের ইচ্ছে করে হারার যোগ্যতা নেই। তবু খবরগুলো দিলাম এইজন্যে যে ৩-০ হওয়ার পর থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে কোনো কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক এবং বহু ক্রিকেটপ্রেমী আইপিএলকে এই দুরবস্থার একমাত্র কারণ বলে ঠাওরাচ্ছেন এবং আইপিএল বন্ধ করা বা আইপিএলকে কম গুরুত্ব দেওয়ার নিদান দিচ্ছেন। প্রথম দুই অনুচ্ছেদ পড়লে দুটো জিনিস বুঝতে পারা উচিত – ১) ওসব দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ নেই, ২) কেবল আইপিএলের ঘাড়ে দোষ চাপালে চলবে না, কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে বাড়াবাড়ি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় হচ্ছে এবং তার ফলে একা ভারতীয় দল ভুগছে না।
ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজের পাশাপাশিই চলছিল পাকিস্তান-ইংল্যান্ড সিরিজ। ভারতে এসে নিউজিল্যান্ডের ৩-০ জয়কে বলা হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন, কিন্তু পাকিস্তানের সিরিজটাতে যা হয়েছে তাও কম চমকপ্রদ নয়। পাকিস্তান গত কয়েকবছর ধরে হাইওয়ের মত পিচ বানিয়ে যাচ্ছিল। ইংল্যান্ডের এর আগের পাকিস্তান সফরে সেইসব পিচে ম্যাককালাম-বেন স্টোকসের মস্তিষ্কপ্রসূত ব্যাজবল দারুণ কাজ দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা এত দ্রুত এত রান তুলছিলেন যে সেই রানের চাপেই পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসে পড়ছিল। ফলে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে ফিরেছিল। এবারেও প্রথম টেস্টে সেই একইরকম পিচ তৈরি করা হয়েছিল মুলতানে। সেখানে পাকিস্তানের ৫৫৬ রানের জবাবে ইংল্যান্ড সাত উইকেটে ৮২৩ রান করে, মারকুটে হ্যারি ব্রুক একাই ৩১৭। ওই রানের চাপে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান মাত্র ৫৪.৫ ওভারে ২২০ রানে গুটিয়ে যায়।
তারপর পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড কী করল? নির্বাচক কমিটি বদলে দিল। আকিব জাভেদের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি দায়িত্ব নিয়েই দলের খোলনলচে বদলে ফেলল। দলের এক নম্বর ব্যাটিং তারকা বাবর আজমকে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিল; বোলিং তারকা শাহীন আফ্রিদি, নাসিম শাহদেরও বসিয়ে দেওয়া হল। দলে এলেন ত্রিশোর্ধ্ব দুই স্পিনার নোমান আলি আর সাজিদ খান। আরও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত – দ্বিতীয় টেস্টও মুলতানের একই পিচে খেলা। শেষপর্যন্ত সবকটা সিদ্ধান্তই কিন্তু খেটে গেল। টানা দুটো টেস্ট হওয়া পিচে বল ঘুরল বনবনিয়ে আর ইংল্যান্ডের কুড়িটা উইকেটই তুলে নিলেন সাজিদ আর নোমান। দ্বিতীয় ইনিংসে তো ওই দুজন ছাড়া কাউকে বলই করতে হল না। দেখা গেল ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা পাটা উইকেটে যত রানই করুন, বল ঘুরলেই চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। রাওয়ালপিণ্ডির তৃতীয় টেস্টেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানে সাজিদ-নোমান প্রথম ইনিংসে নিলেন নটা উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে দশটাই।
ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে ধনী তিনটে ক্রিকেট বোর্ডের দুটো হল আমাদের বিসিসিআই আর স্টোকসদের ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। কোন দুটো বোর্ড ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে? এই দুটো দেশই। ভারতীয় ক্রিকেটে বিপণন থেকে দল নির্বাচন – সবকিছু আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডে আবার শুধু কুড়ি বিশের লিগ ‘টি টোয়েন্টি ব্লাস্ট’ নয়, ১০০ বলের খেলা ‘দ্য হান্ড্রেড’ বলেও একটা প্রতিযোগিতা চালু হয়েছে। পাঁচ বলের ওভার, বাহারি রংদার জামা, সাদা বল, ছোট মাঠ, একইসঙ্গে ছেলেদের আর মেয়েদের লিগ – সে এক মোচ্ছব। এত কাণ্ড করতে গিয়ে কাউন্টি ক্রিকেটের মরশুম বদলাতে হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গুরুত্ব কমেছে। এদিকে টেস্ট দল পড়েছে গাড্ডায়। জো রুটের আমলে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েও সিরিজ হারার পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্টোকস-ম্যাককালামকে। তাঁরা ব্যাজবল চালু করে দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে বেশ কিছুটা সাফল্য পেয়েছিলেন, পাকিস্তানে এসে সিরিজ জিতেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাশেজের ফলাফলের বিশেষ তারতম্য হয়নি, এবছরের গোড়ার দিকে ভারতে এসে সিরিজ হেরেছেন, এখন ছন্নছাড়া পাকিস্তানের কাছেও হারলেন। উপরন্তু ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে দুবার ফাইনাল হয়েছে, একবারও ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠতে পারেনি। ভারত সফরে আর সদ্যসমাপ্ত পাকিস্তান সফরে – দুবারই দেখা গেছে যে রুটকে বাদ দিলে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন একেবারেই খেলতে পারছেন না। এক-আধটা ইনিংসে অলিভার পোপ বা বেন ডাকেট রান করে ফেলছেন। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। সুতরাং স্পিন খেলতে না পারার দোষে শুধু রোহিত শর্মারা দুষ্ট নন। কুড়ি বিশের খেলা যে সব দলের ব্যাটারদেরই স্পিন খেলার দক্ষতার বারোটা বাজাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কেভিন পিটারসেন সেকথা স্পষ্ট বলেও দিয়েছেন।
কিন্তু মুশকিল হল, এসব বলে রোহিতরা পার পেতে পারেন না। কারণ প্রথমত, স্টোকসরা খেলছিলেন বিদেশে, রোহিতরা দেশে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে মাত্র দশবার কোনো দল নিজের দেশে তিন বা তার বেশি টেস্টের সিরিজের সবকটা ম্যাচে হেরেছে। দ্বিতীয়ত, স্টোকসদের জন্ম বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-ভেঙ্কটরাঘবন, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিংদের দেশে নয়। তৃতীয়ত, কিথ ফ্লেচার, অ্যালাস্টেয়ার কুক, পিটারসেন, রুটের মত কয়েকজনকে বাদ দিলে কোনোদিনই ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন খেলতে দারুণ পারদর্শী ছিলেন না।
ভারতীয়দের ইতিহাস ঠিক উল্টো। আমাদের দলকে যে ‘দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল’ বলা হত তার বড় কারণ – আমাদের নেহাত মাঝারি মানের ব্যাটাররা জোরে বলে চোখ বুজে ফেললেও স্পিনারদের ছিঁড়ে খেতেন। সেই কারণেই সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন ভারতের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ১৪ টেস্টে মাত্র একবার। তিনি যখন ১৯৯৮ সালে ভারতে প্রথম টেস্ট খেলতে আসেন, তখন শচীন তেন্ডুলকর ব্যাট করতে নামার আগেই ওয়ার্নকে মেরে আধমরা করে রাখতেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। ইনি কিন্তু ভারতের সর্বকালের সেরা ১৫ জন ব্যাটারের তালিকাতেও থাকবেন না। মুথাইয়া মুরলীধরনের ভারতের বিরুদ্ধে সাফল্য ওয়ার্নের চেয়ে বেশি, কিন্তু তারও বেশিরভাগটা শ্রীলঙ্কায়। ভারতে এসে তিনি এক ইনিংসে দুবারের বেশি পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি। দুজনেরই ভারতের বিরুদ্ধে গড় সামগ্রিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
ইংল্যান্ড থেকে সেই প্রাচীনকালের জিম লেকার আর ছয়, সাতের দশকের ডেরেক আন্ডারউড ছাড়া বিশ্বমানের স্পিনারই বা এসেছে কজন? ২০১২-১৩ মরশুমে তারা ভারতে এসে সিরিজ জিতেছিল যে দুজনের জন্যে, তাঁদের মধ্যে গ্রেম সোয়ান তো বেশিদিন খেললেনই না। আর মন্টি পানেসার সম্পর্কে ওয়ার্ন একবার বলেছিলেন – ও পঞ্চাশটা টেস্ট খেলেনি, একই টেস্ট পঞ্চাশবার খেলেছে। সাম্প্রতিক ভারত সফর আর পাকিস্তান সফরে প্রমাণ হয়ে গেছে যে এখনো ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা তেমন দরের স্পিনারদের বিরুদ্ধে অনুশীলনের সুযোগ পান না। জ্যাক লিচের সীমাবদ্ধতা অসীম, শোয়েব বশির আর রেহান আহমেদ ভবিষ্যতে কেমন হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে – কিন্তু এখনো ৩৮ বছরের নোমান আর ৩১ বছরের সাজিদের সমকক্ষ নন। এই সমস্যা তো রোহিত, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলদের নেই। তাঁরা এখন ঠাসা আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ঠ্যালায় না হয় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময় করতে পারেন না, উঠে এসেছিলেন তো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেই। সেখানে তো একগাদা ভাল মানের স্পিনারকে খেলতে হয়েছিল। যদি ধরে নিই এই ব্যাপারটা সাইকেল চালাতে শেখার মত নয়, ছোট থেকে শিখে আসা জিনিসও খেলোয়াড়রা ভুলে যান, তাহলেও ভারতীয় দলে এই মুহূর্তে এমন অন্তত দুজন স্পিনার আছেন যাঁদের একজনকে সারাক্ষণই আমাদের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সাংবাদিকরা ভারতের সর্বকালের সেরা বলেন – রবিচন্দ্রন অশ্বিন। অন্যজন বিশ্বের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, এমন দাবিও নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে পর্যন্ত শোনা গেছে – রবীন্দ্র জাদেজা। তা আমাদের ব্যাটাররা তো নেটে এঁদের বোলিংয়ে ব্যাট করেন। তা সত্ত্বেও এই ধেড়ে বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন না বলেই বিরাট, রোহিতরা স্পিনারদের বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি, আর রঞ্জি ট্রফিতে ফেরত গেলেই আবার তরতরিয়ে রান করতে শুরু করবেন? বিশ্বাস করা শক্ত।
আসল কথা হল, ভারতের টেস্ট দলের সদস্যদের মাঝারিয়ানা ধরা পড়ে গিয়েছে। বোর্ডের বিপুল অর্থবলে চালিত সর্বব্যাপী প্রচারযন্ত্র যে সত্য চাপা দিয়ে রেখেছিল, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিযোগিতামূলক ১২-১৩ বছর যে সত্যকে চেপে রাখা সম্ভব করেছিল, পরিশ্রমী নিউজিল্যান্ড দল সেই সত্যকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়েছে। তাই এখন রেখে ঢেকে সমালোচনা করে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে এ দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র।
ক্রিকেটভক্তরা এখনই তেড়ে আসবেন – ‘১২ বছরে দেশের মাঠে পরপর ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে যে দল, তারা মাঝারি? এই রেকর্ড আর কোনো দলের নেই তা জানেন?’ আজ্ঞে জানি। কথাটা একদম সত্যি। ঠিক যেমন ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটাও সত্যি। এক্ষেত্রে ‘ইতি গজ’-র হাতিটা একটা বড়সড় দাঁতাল। তার একটা দাঁত হল অতীতের ভারতীয় দলগুলোর ঘরের মাঠের রেকর্ড, যা নিয়ে কদিন আগেই এইখানে বিস্তারিত লিখেছি। সে দাঁতের কথা জেনেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বলবেন – আগের দলগুলো যতই জিতুক, বিরাট আর রোহিতের দলের মত পরপর ১৮ খানা তো জেতেনি। ঠিক। কেন এই রেকর্ডটা হয়েছে তা বোঝা যাবে অন্য দাঁতটার কথা বললে।
বিরাট-রবি শাস্ত্রী জমানার আগেও ভারতে ঘূর্ণি পিচই হত বটে, কিন্তু বল প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির আগে থেকেই ঘুরছে – এমনটা কমই দেখা যেত। বল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত ঘুরত তৃতীয় দিন থেকে। তার আগে পর্যন্ত স্পিনারদের ঘাম ঝরাতে হত। মূলত গতি আর লাইন, লেংথের বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে উইকেট নিতে হত। বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর থেকে আরম্ভ করে কুম্বলে-হরভজন ওরকম পিচেই বল করেছেন এবং ম্যাচ জিতিয়েছেন বছরের পর বছর। এই কথাটা অবশ্য পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করার উপায় নেই, কারণ এর কোনো পরিসংখ্যান হয় না। যাঁরা সেই যুগ থেকে খেলা দেখছেন তাঁরা হয় একবাক্যে একমত হবেন, নয় একেবারেই মানবেন না। তরুণরা তো মানতেই চাইবেন না, কারণ কুড়ি বিশ প্রজন্মের ইউটিউব থাকলেও ধৈর্য নেই। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার আছে যার প্রমাণ দেওয়া যায়।
বিরাট-শাস্ত্রী জমানার আগে পর্যন্ত কিন্তু প্রত্যেক সিরিজেই এমন এক-আধটা মাঠে খেলা দেওয়া হত যেখানকার পিচ, আবহাওয়া মিলিয়ে সফরকারী দলেরও কিছুটা সাহায্য পাওয়ার আশা থাকত। যেমন কলকাতার ইডেন উদ্যানে অনেক সময়েই বিপক্ষের জোরে বোলাররা গঙ্গার হাওয়াকে কাজে লাগাতে পারতেন, পিচেও অনেক সময় বেশ ঘাস থাকত। ইতিহাস বলছে ইডেনে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড জিতেছে দুবার করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে তিনবার আর পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাও একবার করে জিতেছে। সেই ইডেনে ভারত শেষ তিনটে টেস্ট খেলেছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। শেষ ম্যাচটা ছিল সেই ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের সেই অবিস্মরণীয় টেস্টের পর থেকে আর খেলাই হয়নি ইডেনে।
এমন আরেকটা মাঠ ছিল মোহালির পিসিএ স্টেডিয়াম। ওই মাঠে সফরকারী দলগুলো জিততে না পারলেও অন্তত ড্র করতে পারত। কোর্টনি ওয়ালশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ১৯৯৪ সালে গোটা সফরে কিছু জিততে না পারলেও ওখানে শেষ টেস্টে ভারতকে হারিয়েছিল। ওই মাঠে ইংল্যান্ড ড্র করেছে একবার, নিউজিল্যান্ড দুবার, পাকিস্তান একবার, শ্রীলঙ্কা একবার। সে মাঠেও গত ১১ বছরে খেলা হয়েছে মাত্র চারটে টেস্ট।
তাহলে আজকাল খেলা দেওয়া হয় কোথায়? এরও গোটা দুয়েক উদাহরণ দেওয়া যাক।
২০১৭ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হওয়া পুনের এমসিএ স্টেডিয়ামে সাত বছরের মধ্যে তিনটে ম্যাচ হয়ে গেল এবং তিনটেই ঘূর্ণি পিচে। রান উঠল কম। ২০১৭ সালের প্রথম খেলাটায় আমাদের রবি-অ্যাশ জুটিকে টপকে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় স্টিভেন ও’কিফ আর নাথান লায়ন। ২০১৯ সালে দুর্বল স্পিন আক্রমণের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অবশ্য ভারত ছশোর বেশি রান করেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ফলো অন করে হেরেছিল। এবারেও টেস্টে অনিয়মিত মিচেল স্যান্টনার ম্যাচে ১৩ খানা উইকেট তুলে নিলেন, আমাদের সর্বকালের সেরা দুই স্পিনারকে টেক্কা দিলেন। ভাগ্যে ওয়াশিংটন সুন্দর ছিলেন, নইলে অবস্থা আরও শোচনীয় হত।
আমেদাবাদের সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙেচুরে নতুন করে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে পরিণত করা হল, সেখানে প্রথম টেস্ট হল ২০২১ সালে। একেবারে পরপর দুটো টেস্ট। প্রথমটা শেষ হল দুদিনে, দ্বিতীয়টা তিনদিনে। প্রথম টেস্টে দুদলের কেউ দেড়শো পেরোতে পারেনি, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানে অল আউট। এরকম পিচ কুম্বলেরা গোটা জীবনে পাননি। মাত্র দুবছর বয়সী ওই স্টেডিয়ামে তিন নম্বর টেস্টও খেলা হয়ে গেছে গতবছর। আগের দুই টেস্টে পিচ নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেছে ভেবেই বোধহয় একেবারে ঢ্যাবঢেবে পিচ বানানো হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আড়াই খানা ইনিংস খেলা হয়েছিল, চারজন শতরান করেছিলেন। তাছাড়া ট্রেভিস হেড ৯০, অক্ষর প্যাটেল ৭৯।
তালিকা আরও লম্বা করা যায়, কিন্তু যাঁর বোঝার তিনি এতেই বুঝে নেবেন পরপর ১৮ খানা সিরিজ জেতার মাস্তানি আসলে কোথায়। অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা আরও পরিষ্কার হয় দেশের মাঠের সঙ্গে বিদেশের মাঠে তাঁদের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে। অশ্বিনের ৫৩৬ খানা উইকেটের মাত্র ১৪৯টা এসেছে বিদেশে, গড় ৩০.৪০। উনচল্লিশটা টেস্টে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার। এই পরিসংখ্যান খারাপ নয়, মাঝারি। দেশের মাঠে ৬৫ খানা টেস্ট খেলে নিয়েছেন ৩৮৩ খানা উইকেট, গড় ২১.৫৭, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ২৯ বার। মানে দুজন অশ্বিন একেবারে দুজন আলাদা বোলার।
জাদেজার পরিসংখ্যান দেখবেন? উনি ভারতের মাটিতে ৪৯ টেস্টে ২৩৮ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২০.৭১ গড়ে, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট ১৩ বার। কিন্তু বিদেশে? ২৬ খানা টেস্ট খেলে মোটে ৭৬ খানা উইকেট, গড় ৩২.৭৮। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মোটে দুবার। হিন্দি সিনেমা হলে দেখানো হত দেশে খেলেন জাদেজা, আর বিদেশে ভিলেন তাঁকে তালা বন্ধ ঘরে রেখে তাঁরই মত দেখতে অন্য একজনকে খেলতে নামায়। একথা ঠিকই যে প্রায় সব বোলারই নিজের দেশে বেশি ভাল বল করেন। কিন্তু সর্বকালের সেরার তকমাধারীদের পরিসংখ্যানে দেশে আর বিদেশে এত তফাত ঘটে না। আমাদের দেশের সবচেয়ে সফল স্পিনারদেরই দেখুন না:
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয়, অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে অনেক বড় স্পিনার ছিলেন অজিত ওয়াড়েকরের স্পিন ত্রয়ী। কারণ তাঁদের দেশে আর বিদেশে উইকেট সংখ্যা আর এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা প্রায় সমান। সেই কারণেই তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডেও সিরিজ জেতাতে পেরেছিলেন। কুম্বলে, হরভজন বিদেশে ওঁদের মত ভাল না হলেও নেহাত ফেলনা ছিলেন না। বিদেশে অন্তত দুটো টেস্ট ম্যাচের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে এঁরা দুজনে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন – ১) ২০০৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে হরভজন পাঁচ উইকেট নেন আর দ্বিতীয় ইনিংসে কুম্বলে ছয় উইকেট নিয়ে ৪৯ রানে ম্যাচ জেতান। ২) ২০০২ সালে লিডসের ইনিংস জয়ে তাঁদের অবদান আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ ভিজে আবহাওয়ায় পিচটা ছিল জোরে বোলারদের জন্য আদর্শ। সেখানে কুম্বলে-হরভজন বিপক্ষের কুড়িটা উইকেটের ১১ খানা তুলে নেন। অশ্বিন আর জাদেজা কিন্তু এমন দুজন বোলার যাঁদের উপমহাদেশের বাইরে একসঙ্গে খেলানোর কথা ভারত অধিনায়করাই ভেবে উঠতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হয় তার কারণ কিন্তু বোলিং নয়। সম্ভবত তার কারণ কোহলি-শাস্ত্রীর মত দ্রাবিড়-রোহিতেরও ধারণা ছিল, জাদেজা অশ্বিনের চেয়ে ব্যাট ভাল করেন।
নিউজিল্যান্ড সিরিজে ব্যাটাররা চূড়ান্ত ব্যর্থ, অথচ অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা নিয়ে এত বড় লেখা কেন লিখলাম? তার কারণ টেস্ট জিততে গেলে কুড়িটা উইকেট নিতে হয় এবং ভারতের মাটিতে জিততে গেলে স্পিনারদের সাফল্য অপরিহার্য। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মুহ্যমান হয়ে আলোচকরা অশ্বিন-জাদেজার ব্যর্থতাকে তত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ‘একটা সিরিজে হতেই পারে’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। লেখার এই পর্বে এ জন্যেই দেখানো দরকার ছিল যে এই ব্যর্থতা একটা সিরিজের ব্যাপার নয়। এতদিন এক বানানো স্বর্গের দেবদূত করে রাখা হয়েছিল ওঁদের। তাই এই পতন অনিবার্য ছিল। অতীতেও একাধিকবার ওঁদের মাঝারিয়ানা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন অন্য দেশের স্পিনাররা। কিন্তু ভারত শেষপর্যন্ত সিরিজ জিতে গেছে বলে চোখে পড়েনি। ভারতে এসে বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, কুম্বলে, হরভজনের থেকে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাওয়ার ক্ষমতা হয়নি ওয়ার্ন বা মুরলীদেরও। অথচ অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে বেশ কয়েকবার বেশি উইকেট নিয়েছেন সোয়ান-পানেসার, ও’কিফ-লায়ন, লায়ন-ম্যাট কুনেমান-টড মার্ফি, টম হার্টলি-বশির স্যান্টনার, আজাজ প্যাটেল, গ্লেন ফিলিপসরা।
রবি-অ্যাশের এই ব্যর্থতা ঢাকতে এখন নতুন কায়দা চালু করেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। বলা এবং লেখা হচ্ছে, যত দোষ টিম ম্যানেজমেন্টের। বেশি ঘূর্ণি উইকেট বানালে মুড়ি মিছরি এক দর হয়ে যায়। ফলে রবি-অ্যাশের মুনশিয়ানার আর দাম থাকে না। কিমাশ্চর্যমতৎপরম! ওঁরা যদি এত বড় স্পিনার হন যে যেখানে বল তেমন ঘোরে না সেখানেও কেরামতি দেখাতে পারেন, তাহলে যেখানে বল বেশি ঘোরে সেখানে তো ওঁদের ধারেকাছে অন্যদের আসতে পারার কথা নয়। কোনো ব্যাটার সম্পর্কে কখনো শুনেছেন যে ব্যাটিং সহায়ক পিচে অন্যরা বেশি রান করে দেয়, কিন্তু শক্ত পিচে সে-ই সেরা? তাছাড়া রবি-অ্যাশ বরাবর কম ঘূর্ণির পিচেই এত উইকেট নিয়ে এসেছেন – সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তা বলছে না। আর বিদেশে, যেখানে বল বিশেষ ঘোরে না, সেখানে তো ওঁদের একসঙ্গে খেলানোই যায় না।
আজ এ পর্যন্তই। ভারতীয় দলের তারকা ব্যাটাররাও যে মাঝারিয়ানার বানানো স্বর্গের দেবদূত, কেবল স্পিন খেলতে না পারা যে ৩-০ ফলাফলের কারণ নয়, সেসব কথা সবিস্তারে না লিখলে এই লেখা সম্পূর্ণ হবে না। সে কাজ পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।
একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।
মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।
বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।
আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।
ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?
অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।
এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।
বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।
সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।
১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মহেশ ভাটের ছবি কাশ, জনপ্রিয় সিনেমার এক ব্যর্থ নায়ক ও তার স্ত্রীর প্রেম-অপ্রেমের আখ্যান। সেই বেদনাবিধুর ছবিতে দুজনের মাঝখানে ছিল এক শিশুসন্তান। তার আসন্ন অনুপস্থিতি ছবিটিকে শেষপর্যন্ত এক ট্র্যাজিক অথচ শান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। এখন ২০২৪। মাঝের এই চার দশকে পৃথিবী আমূল বদলে গেছে, সিনেমাসহ সমস্ত শিল্পমাধ্যমের ভোল পালটে গেছে। জঁ লুক গোদারের মত দিকপাল স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেওয়ার আগে সিনেমার মৃত্যুই ঘোষণা করে গেছেন। এ যুগে প্রথমে দারুণ সফল, তারপর ‘আর্ট সাইকেলের নিয়মে’ ব্যর্থ এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যে বিশ্বাস করে সিনেমা স্রেফ দুরকম – ভাল আর খারাপ, এবং তার সফল অধ্যাপিকা স্ত্রীর সন্তানহীন জীবন অনেক বেশি জটিল তথা রোমাঞ্চকর হতে বাধ্য; সে শিল্পীর মনোজগতেই হোক বা বহির্জগতে। বলিউডি ছবি বানাতে গেলে দর্শককে কিছুটা শ্বাস ফেলার জায়গা দিতেই হয়। মহেশের সেই বাধ্যবাধকতা ছিল। নাটকের নির্দেশক অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সৌমিত দেবের কলমে বিজনে বিষের নীল নাটক, ইরা লেভিনের ডেথট্র্যাপ নাটকের স্বীকরণ হলেও, থ্রিলারের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে আজকের মানুষের একাকিত্ব, ঈর্ষা, অবসাদ, অবদমিত কামনা বিষয়ক রোমহর্ষক সন্দর্ভ।
বিজনে বিষের নীল টানটান নাটক, দর্শককে পলক ফেলতে দেয় না – এসবই ঠিক কথা, তবে আলাদা করে না বললেও চলে। দর্শককে সচকিত রাখতে যেসব কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোও নাটকের দর্শকদের কাছে যে খুব অভিনব তা নয়। যা অভিনব তা হল অভিনেতাদের, বিশেষত দুই মুখ্য চরিত্র সুদর্শন ব্যানার্জি আর মায়া চৌধুরীর ভূমিকায় যথাক্রমে অর্ণ আর উপাবেলার, ব্যক্তিগত জীবন আর অভিনয়ের সীমা মুছে দেওয়ার দুঃসাহসিক প্রয়াস। মঞ্চসজ্জায় নিজেদেরই অল্পবয়সের অন্তরঙ্গ ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া সেই দুঃসাহসের কণামাত্র। সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।
সিনেমার দুনিয়ায় একসময় গগনচারী, অধুনা পরপর তিনটে ফ্লপ ছবির পর দূরে নিক্ষিপ্ত নির্দেশক চরিত্রের অবসাদ আর ঈর্ষা শরীরে ফুটিয়ে তুলতে অর্ণ যে চঞ্চল পদচারণা, বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত এবং ক্রমাগত গা চুলকে যাওয়ার অবতারণা করেছেন তা বিস্ময়কর। নাটকের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর গা চুলকানোর যন্ত্রটাই যখন শিষ্য কণিষ্কের (অর্পণ ঘোষাল) হস্তগত হয়, তা চরিত্রগুলোর পালটাতে থাকা মানসিকতার চমৎকার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।
সুদর্শনের উকিল তলাপাত্র (সুমিত) এবং শালী হৈমন্তীর (তনুজা) চরিত্র এই নাটকে কেবল হাস্যরস উদ্রেককারী নয়, প্লটে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তবু নাটকের তিনটে পায়া সুদর্শন, মায়া আর কণিষ্কই। মূলত তাদের বিষেই নীল হয়ে থাকে মঞ্চ। ফলে অর্পণের সুদূর মফস্বল থেকে আসা ডোমসন্তানের অভিনয় এক চুল এদিক ওদিক হলে নাটকের বারোটা বাজতে পারত। বস্তুত চরিত্রটা বেশ জটিল। কারণ কণিষ্ক একদিকে আজন্ম হীনমন্যতার শিকার, অন্যদিকে তার মধ্যে আছে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সে বোকা সাজতে জানে। সুদর্শনের প্রতি তার যেমন শ্রদ্ধা আছে, তেমন তাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবল খিদেও আছে। কণিষ্কের মধ্যে আত্মসমর্পণ আছে, আবার আক্রান্ত হলে দ্বিগুণ আক্রোশে প্রত্যাঘাত করার সাহসও আছে। মুখে আপাত সরল হাসি ঝুলিয়ে রেখে এই বৈপরীত্য তুলে ধরার কাজটা চমৎকার করেছেন অর্পণ।
উপাবেলা মায়ার চরিত্রের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার পারিবারিক ক্ষমতার বিন্যাসে নারী হিসাবে সুদর্শনের নিচে থাকলেও, সেই নতিস্বীকার যে আসলে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা অন্যের হাতে জমা রাখা – তাও ধরিয়ে দিয়েছেন ঋজু অভিনয়ে, বিশেষত শেষাংশে।
অভিনেতাদের যোগ্য সঙ্গত করেছে আবহসঙ্গীত এবং আলোকসম্পাত। তবে মঞ্চের পিছনের পর্দার যে সিনেমাসুলভ ব্যবহার নটধা নাট্যদলের অন্য নাটক নক্ষত্র শিকার-এরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তা এখানে কোনো কোনো সময়ে বাহুল্য মনে হয়েছে। নাটকের শুরুতে সুদর্শনের মনোজগৎ, তার সিনেমারুচি বোঝাতে ওই পর্দা যথাযথ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু সর্বদা নাটকে যা চলছে তার লাগসই উদ্ধৃতি ওই পর্দায় ফুটিয়ে না তুললেই বোধহয় ভাল হত। ব্যাপারটা দর্শকের নিজের মত করে দৃশ্য ব্যাখ্যা করে নেওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো কখনো। হয়ত এমন দমবন্ধ করা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে মনোযোগ দিতে গিয়ে দর্শক গভীরতর বক্তব্য খেয়াল না-ও করতে পারেন – এমন আশঙ্কা থেকে ওই উদ্ধৃতিগুলো পর্দায় দেখানো হয়েছে। কিন্তু কেনই বা নির্দেশক নিজেকে শিক্ষক আর দর্শককে দুর্বল ছাত্রছাত্রী বলে ভাববেন? হাত ধরে পরীক্ষা বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়া তো নির্দেশকের কাজ নয়। তিনি এবং তাঁর সহশিল্পীরা নিজেদের যা বলার আছে, যা করার আছে, তাই তো করবেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দর্শককেই নিতে হবে। সবাই নিজের মত করে বুঝে নেবেন, সবাই হয়ত সবটা বুঝবেনও না। কে ঠিক বুঝলেন, কে ভুল বুঝলেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও তো শিল্পে স্থির করে দেওয়া নেই। মঞ্চে যা দেখা যাচ্ছে আর দর্শক যা দেখছেন, দুয়ে মিলেই তো নাটক। দুয়ের খানিক তফাত থাকলে ক্ষতি কী? দর্শকের বিনোদনের কথা বেশি ভাবতে গিয়েই বোধহয় দ্বিতীয়ার্ধ ঈষৎ দীর্ঘায়িতও হয়েছে। এইটুকু অনুযোগ রইল।
তৎসত্ত্বেও একথা না বললেই নয় যে, বর্তমান কালপর্বে আমাদের সকলের ভিতরেই যে জমা হয়েছে অনেক বিষ, সেই বিষে নীল হয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, বাইরে থেকে দেখাও যাচ্ছে না সবসময় – এই তেতো সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছে বিজনে বিষের নীল। এত কাছ থেকে সেই ভয়ানক সত্যকে দেখা গেছে এই নাটকে, যে যাঁরা সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে নিয়ে দেখতে যাবেন তাঁদের জন্য বিধিসম্মত সতর্কীকরণ হিসাবে বলা যায় – মনে হতে পারে আপনাদের ঝগড়া আড়ি পেতে শুনে নিয়েছেন নাট্যকার ও অভিনেতারা। সুতরাং কেবল থ্রিলারের অভিনয় দেখার রোমাঞ্চ নয়, আয়নার সামনে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ানোর অস্বস্তিও এই নাটক দেখার প্রাপ্তি।
তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে।
হপ্তা তিনেক আগে কলকাতায় এসেছিলেন ডাঃ কাফিল খান। সেই কাফিল, যিনি আদিত্যনাথশাসিত উত্তরপ্রদেশে নিজের পেশাগত দায়িত্বের ঊর্ধ্বে উঠে পকেটের পয়সা দিয়ে মরণাপন্ন শিশুদের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই শিশুদের মৃত্যুতে তাঁকেই অপরাধী সাজিয়ে কারাবাস করিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কাফিল কলকাতায় এসে আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার নিন্দা করে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টারও নিন্দা করেছেন। কিন্তু সঙ্গে আরও কিছু কথা বলেছেন, যার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় – ‘চলতি প্রতিবাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রশংসা প্রাপ্য, কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্রুদ্ধ ডাক্তারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁদের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন। আপনারা এখন যতই রেগে থাকুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন যে আজও বাংলায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। এটা উত্তরপ্রদেশ হলে সমস্ত প্রতিবাদীকে জেলে পোরা হত আর তাদের নামে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা ঠুকে দেওয়া হত।’
কাফিলের দোষ নেই। তিনি এ রাজ্যের মানুষ নন, রাজনীতির লোকও নন। ফলে এখানকার আন্দোলনের ইতিহাস বা তৃণমূল কংগ্রেস আমলে আর কী কী ঘটেছে – সেসব জানা তাঁর থেকে প্রত্যাশিত নয়। উপরন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষের বাংলা না জানা এবং এ রাজ্যের ইংরিজি জানা মানুষের বিজেপি-বিরোধিতা এবং/অথবা সিপিএম-বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার সফলভাবে নিজেদের যাবতীয় কুকীর্তি বাকি ভারতের কাছে ঢেকে রাখতে সমর্থ হয়েছে। ফলে কাফিলের কানে নিশ্চয়ই এ খবর পৌঁছয়নি, যে এ রাজ্যেও সরকারবিরোধীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।
মনে হয় না কাফিলকে যাঁরা কলকাতায় এনেছিলেন তাঁরা আনিস খানের কথাও জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে কোনো দাবিতে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই শাসক দল সেই প্রতিবাদকে মানুষের চোখে হেয় করার চেষ্টা করে রাজনীতির জুজু দেখিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এতদিন বলা হত ‘এর পিছনে বিজেপি আছে’। যেহেতু আর জি কর আন্দোলনে বিজেপি বহু চেষ্টা করেও পা রাখতে পারেনি এবং সকলেই টিভির পর্দায় লাইভ দেখে নিয়েছেন যে অভিজিৎ গাঙ্গুলির মত বিজেপি নেতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে কীভাবে তাঁদের বিতাড়িত করেছেন আন্দোলনকারীরা; সেহেতু এখন বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পিছনে সিপিএম আছে, অতিবাম শক্তি আছে। যেন এরা সব নিষিদ্ধ সংগঠন অথবা সংবিধানে লেখা আছে বিরোধীরা কোনো আন্দোলনে মদত দিতে পারবে না। কিন্তু সে বিতর্কে না গিয়ে ভাবা যাক যে আনিস তো বিজেপি, সিপিএম বা কংগ্রেস করতেন না। তবু প্রতিবাদী হওয়ার অপরাধে তাঁকে মরতে হয়েছে এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই সত্ত্বেও তাঁর পরিবার আজও বিচার পায়নি। বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্যেও পুলিস অনেককে বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। নৈহাটির মত শারীরিক আক্রমণের কথা না-ই বা বললাম। ফলে পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবাদের মরুদ্যান – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
মমতা প্রতিবাদীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এই প্রথম যাননি। ২০১৪ সালের হোক কলরব আন্দোলনও শেষ হয়েছিল তিনি শেষপর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করার পরে। ২০১৯ সালেও লোকসভা নির্বাচনের মুখে স্কুলশিক্ষকের চাকরির দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে মমতা গিয়েছিলেন আন্দোলন তুলে নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু দুবারই সেটা করেছিলেন আন্দোলন দমন করতে না পেরে, শেষে নিরুপায় হয়ে। এর কৃতিত্ব আন্দোলনকারীদের, এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রীকে মমতাময়ী আখ্যা দিলে সত্যের অপলাপ করা হয়। এবারেও মমতা নানা টালবাহানার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন অনন্যোপায় হয়ে। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সেই বৈঠকের পর মমতার যাবতীয় ঘোষণা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ডাক্তাররা একাধিক হাসপাতালে আক্রান্ত হয়েছেন। তার পরিণামেই চলতি অনশন। ইতিমধ্যে শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালে (এসএসকেএম) দুদল দুষ্কৃতীর মারামারিতে এক রোগীর আত্মীয়ও আহত হয়েছেন। সুতরাং এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জেলে পোরেন না, আলোচনা করেন – এই সন্তোষ হাস্যকর। তেমনই হাস্যকর মুখ্যমন্ত্রীর ধূর্ততা বুঝতে না পারা। সমাধান করতে আলোচনা করা আর ধামাচাপা দিতে আলোচনা করা – দুটোই একইরকম প্রশংসাযোগ্য হতে পারে না। ২০১৯ সালে ভোট মিটলেই চাকরি হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মমতা যে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের ২৯ দিনের অনশন প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আজও যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছেন।
বস্তুত, কোনো প্রতিবাদ, কোনো আন্দোলনকে পাত্তা না দেওয়াই তৃণমূল সরকারের ট্রেডমার্ক। আরও অনেককিছুর মত, এখানেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে মিল। নরেন্দ্র মোদীও ভেবেছিলেন কৃষকদের পাত্তা দেবেন না। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে তিনটে কৃষি আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন, প্রয়োগ করা ঠেকায় কে? চাষাভুষোরা থাক না রাস্তায় বসে। পাত্তা না দিলেই হল। উলটে তাদের পথে ব্যারিকেড বসিয়ে দাও, কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দাও, রাস্তায় আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দাও। দিল্লির প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে একসময় সুড়সুড় করে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। কৃষকরা মাঠেঘাটে কাজ করে অভ্যস্ত। পাঞ্জাবের ধনী কৃষকরাও নিজের জমিতে গায়ে গতরে খাটেন। ফলে শারীরিক কষ্ট তাঁদের অত সহজে কাবু করতে পারে না, যতটা বাঙালি ভদ্রসন্তানদের পারে। তার চেয়েও বড় কথা, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন পাকা মাথার অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরা। তাঁরা যেমন আক্রমণাত্মক হতে জানেন, কখন পিছিয়ে আসতে হয় তাও জানেন। ফলে সেই আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছিল। মোদী দিল্লি সীমান্তে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বটে, কিন্তু তাঁর সরকারকে মাথা নোয়াতে হয়েছিল, আইনগুলো প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। বিজেপির সদস্য, সমর্থক ছাড়া কেউ তার জন্যে মোদীর প্রশংসা করে না। বলে না যে আজও ভারতের নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে তারপর প্রতিবাদের সামনে মাথা নোয়ানোর জন্যে, কখনো বা মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার জন্যে শাসকের প্রশংসা করার ন্যাকা রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের আর কোথাও চলে না।
কিন্তু যেহেতু কৃষক আন্দোলনের কথা এসে পড়ল এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতের বাইরে নয়, সেহেতু চলমান আন্দোলনের ত্রুটিগুলোর দিকেও দৃষ্টি না দিয়ে উপায় নেই। শনিবার দুপুরে মুখ্যসচিবের ফোনে অনশনকারীদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং সোমবার বৈঠকের পরে হয়ত এই অনশন শিগগির উঠে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই আলোচনা প্রয়োজন।
#
আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা শুক্রবার সিনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী সোমবারের মধ্যে সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দশ দফা দাবি পূরণ না করলে মঙ্গলবার তাঁরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করবেন। কোনো সন্দেহ নেই, সরকার তাঁদের দাবিগুলোতে মোটেই আমল দেয়নি। আর জি করের ঘটনার পর প্রথম দিকে ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের তরফে (যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মুখ্যমন্ত্রীর বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে পড়া), এখন আর তাও দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সবটাই টিভি স্টুডিও আর সোশাল মিডিয়া থেকে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানোয়, হুমকি দেওয়ায় সীমাবদ্ধ। স্থানীয় স্তরেও তৃণমূল দলের কোনো কর্মসূচি নেই এই আন্দোলনকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্যে অথবা দাবিগুলোকে অসার প্রমাণ করার জন্যে। এর দুটো কারণ থাকতে পারে – ১) তৃণমূল মনে করছে এই আন্দোলন তাদের বৃহত্তম ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলছে না। অতএব ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে মরুক গে; কিছু এসে যায় না। ২) এই দশ দফা দাবি পূরণ করার ক্ষমতা সরকারের নেই। উদাসীনতার ভান না করলে কথাটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না।
প্রথম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, যতই অমানবিক হোক। ২০২৪ সালে এসেও এই সরকারের কাছে মানবিকতা আশা করার কোনো মানে হয় কি? যে সরকার বারবার ধর্ষণের মত ঘটনাকে ছোট্ট ঘটনা, প্রেম ছিল, খদ্দেরের সঙ্গে যৌনকর্মীর দরাদরি নিয়ে ঝামেলা ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা আজ হঠাৎ মানবিক হবে কী করে? আর মানবিক নয় বলেই ডাক্তারদের আমরণ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। এ হল ব্রহ্মাস্ত্র। আর কে না জানে, ব্রহ্মাস্ত্র রেখে দিতে হয়ে শেষ যুদ্ধের জন্য। যখন অন্য সব অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তূণ থেকে বার করতে হয়। এক্ষেত্রে আন্দোলনের সেই অবস্থা হয়েছিল কি? যতদিন কর্মবিরতি চালু ছিল, ততদিন তবু শাসক দল ডাক্তারদের গণশত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার মত কিছু পাচ্ছিল। কারণ সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ সম্পূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছিলেন না, তার কাঠামোগত ত্রুটির কারণ আড়াল করে গোটা দোষটা ডাক্তারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল। এই আন্দোলনের পিছনে বেসরকারি হাসপাতালের লবি কাজ করছে – এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও বাজারে চালানো যাচ্ছিল। কিন্তু কর্মবিরতি উঠে যাওয়ার পরে তো সেসব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টেও গত শুনানিতে ফের ধমক খেয়েছে রাজ্য সরকার। কেবল হাসপাতালের সুরক্ষায় নয়, সামগ্রিকভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন বিচারপতিরা। এমতাবস্থায় অনশনে বসা ছাড়া কি অন্য কোনো রাস্তা ছিল না? হ্যাঁ, একজন ডাক্তারও অনশন করতে গিয়ে মারা গেলে সরকারকে অভূতপূর্ব বিপদে পড়তে হবে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হল, নির্মম শাসক দল একের পর এক ডাক্তারের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আর অন্য কারোর অনশনে বসা দেখে বুঝে ফেলেছে যে এখানে কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনা কম। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি এ সম্পর্কে যে স্বভাবসিদ্ধ অসভ্য মন্তব্য করেছেন – তাতেই তাঁর দল এবং সরকারের এই মনোভাব পরিষ্কার। অর্থাৎ ডাক্তারদের ব্রহ্মাস্ত্র সরকার হজম করে ফেলেছে। ব্রহ্মাস্ত্রের পর যে অস্ত্রই প্রয়োগ করা হোক, তার প্রভাব কম হয়। ফলে এখন একদিনের ধর্মঘটকে সরকার কতটা গুরুত্ব দেবে বলা মুশকিল। এই ধর্মঘট অনশনের আগে ডাকা হলে ফল অন্যরকম হতে পারত।
এখানে প্রশ্ন উঠবে, সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ধর্মতলার অনশন মঞ্চে দেখা যাচ্ছে, তা কি মিথ্যা, নাকি অপ্রাসঙ্গিক? মিথ্যা তো নয় বটেই, কিন্তু সরকার হয়ত প্রাসঙ্গিক মনে করছে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সম্ভবত আসন্ন উপনির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রিয় হলেও সত্যি, ভোট ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ন্যায়-অন্যায় বিচার ভারতের গণতন্ত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারণেই কুণাল ঘোষ বুক ফুলিয়ে বলতে পেরেছেন, বিরোধীরা নির্বাচনে জিতে প্রমাণ করুক যে মানুষ তাদের পক্ষে।
যেমন ২০০২ সালের পর থেকে গুজরাটে বিজেপি হারেনি, তাই সেবছরের গণহত্যা সঠিক ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে যত বড় বড় কেলেঙ্কারিই প্রকাশিত হয়ে থাকুক, তৃণমূল হইহই করে ভোটে জিতেছে। অতএব সব ঠিক আছে। একইভাবে উপনির্বাচনে সাতটা আসনের অধিকাংশ জিতলেই কুণালরা বলে দেবেন, আর জি করে সরকারের কোনো অন্যায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও কোনো গোলমাল নেই। ‘সব চাঙ্গা সি’। এরকম মানসিকতার সরকারের বিরুদ্ধে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী?
একটা কথা সত্যি, যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনশন ব্যাপারটার এমন স্থান রয়েছে যে অনশন যে-ই করুক, যে কারণেই করুক, মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের জন্য অনশন করেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী অনশনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। কারণ এতে অন্য কারোর ক্ষতি করা হয় না, নিজের ছাড়া। ফলে মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে বাধ্য যে অনশনকারী নিজের ফায়দার জন্যে আন্দোলন করছে না। পরের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করছে। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা ইতিহাসসচেতন, তাঁরা নিঃসন্দেহে যতীন দাসের কথাও মনে রেখেছেন। ফলে অনশনে বসলে গরিব-বড়লোক, গেঁয়ো-শহুরে সব ধরনের মানুষের সহানুভূতিই পাওয়া যায়। মমতা স্বয়ং একসময় পেয়েছেন, আন্না হাজারের মত ভণ্ড আন্দোলনকারীও পেয়েছেন। ফলে ভাবা অমূলক নয় যে কর্মবিরতির সময়ে যত মানুষ ডাক্তারদের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ অনশন চালু হওয়ার পরে তাঁদের প্রতি নরম হয়েছেন। কিন্তু তাতে তো সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ে সুবিধা হবে না। কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, দুনিয়া জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংকট তো এটাই, যে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রভু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উপরন্তু একথাও মনে রাখা দরকার, যে গান্ধীর সমালোচক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, অহিংসা-অসহযোগ-অনশন নীতি সফল হতে পারে ‘অডিয়েন্স’ থাকলে, নচেৎ নয়। অরুন্ধতীর কথাটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, আবার ফেলে দেওয়ার মতও নয়। তৃণমূল সরকার যে খুব সহানুভূতিশীল ‘অডিয়েন্স’ নয়, তা কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অনশন মঞ্চের অনতিদূরে নির্বিকার কার্নিভালে প্রমাণিত, আজ মুখ্যমন্ত্রী যে সুরে ফোনে কথা বলেছেন, তাতেও প্রমাণিত।
এই আন্দোলন সম্পর্কে আরেকটা বড় প্রশ্ন হল, এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? নাকি এটা গণআন্দোলন? ৯ অগাস্টের পর থেকে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃতার ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে, রাজ্য সরকারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তাঁরা একে নিজেদের আন্দোলন করে নিয়েছেন। আর যে কোনো গণআন্দোলনই আদতে রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পরেও এই আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেরাই দ্বিধায় ভুগছেন বলে মনে হয়। নয়ত মাঝেমাঝেই গোপাল ভাঁড়ের গল্পের রাজার বিধবা পিসির লাউতে চিংড়ি আছে অভিযোগ শুনে ‘ছি, ছি, ছি’ বলে আর্তনাদ করার মত কোনো কোনো ডাক্তার নেতা ‘আমাদের আন্দোলন অরাজনৈতিক’ বলছেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই যে সিপিএম কর্মীরা কদিন আগে ধর্মতলায় দলীয় পতাকা নিয়ে না গেলেই পারতেন। কিন্তু গেছেন বলে মঞ্চ থেকে উত্তেজিত সাফাই গাওয়ারই বা দরকার কী? যে আন্দোলন স্পষ্টত সরকারের বিরুদ্ধে এবং যা সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে, সেখানে কে কোন পতাকা নিয়ে এল না এল – তার দায়িত্ব জুনিয়র ডাক্তাররা নেবেন কী করে এবং কেন? ভয় কি তৃণমূলের প্রোপাগান্ডা মেশিনারিকে? সে তো দিনরাত চলছেই। মঞ্চের সামনে পতাকা এসে পড়ার আগেও চলছিল, পরেও চলছে, না এলেও চলত। সরকার যে দলের হাতে তারা তো চাইবেই যেনতেনপ্রকারেণ এই আন্দোলনকে হেয় করতে। তা নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিচলিত হবেন কেন, যদি তাঁদের চোখ অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মত দশ দফা দাবিতেই নিবদ্ধ থাকে? আন্দোলন রাজনৈতিক মানেই অবৈধ – এই যুক্তিই বা তাঁরা মেনে নেবেন কেন? একথা তো অস্বীকার করা যায় না যে পৃথিবীর কোনো আন্দোলন কোনোদিন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বিভিন্ন ছোট বড় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন উদ্যোগ না নিলে আর জি কর আন্দোলনও যতটা ছড়িয়েছে তা ছড়াত না। ফলে ডাক্তারদের আন্দোলন এই গুরুত্ব পেত না। ব্যাপারটা বোঝার জন্যে বেশি দূরে তাকানোর দরকার নেই। এসএসসি, টেট, মাদ্রাসার চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের কথা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে।
বলা বাহুল্য, ডাক্তারদের আন্দোলনকে এত বড় আন্দোলনের রূপ দিয়েছে যে দল এবং সংগঠনগুলো, তারা সকলেই কোনো না কোনো মতের বামপন্থী। কারণ ঘটনার দিন থেকে কয়েকদিন পর পর্যন্ত অগ্নিমিত্রা পাল, সজল ঘোষরা আর জি কর নিয়ে সক্রিয় থাকলেও মিইয়ে গেছেন বহুদিন হল। বস্তুত অদ্ভুতুড়ে সংগঠনের নামে নবান্ন অভিযানের পর থেকেই বিজেপি বুঝে উঠতে পারছে না এই আন্দোলন নিয়ে কী করিতে হইবে। কারণ একে দাঙ্গা করার অভিজ্ঞতা হিন্দুত্ববাদীদের যতখানি, তার দু আনাও আন্দোলন করার ব্যাপারে নেই। তার উপর হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে বিস্তর বিষ ছড়িয়েও ব্যাপারটাকে কিছুতেই হিন্দু-মুসলমান বাইনারিতে ফেলা যায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ডাক্তারদের অবস্থানে যোগ দিতে গিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে বিজেপি নেতাদের। ফলে কখনো শুভেন্দু অধিকারী একেবারে তৃণমূল নেতাদের সুরেই আন্দোলনকারীদের নেশাখোর বলছেন, আবার কখনো তৃণমূলবিরোধী ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে সরকারি কার্নিভালের পালটা কার্নিভালকে সমর্থন করছেন। বিজেপির কুখ্যাত আই টি সেলের প্রধান অমিত মালব্য তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ৩ অক্টোবরের একখানা দুর্গার সঙ্গে আর জি কর মেলানো জগাখিচুড়ি ভিডিও পিন করে রেখেছেন। এই আন্দোলন নিয়ে মোটেই পোস্ট করছেন না। বিজেপির আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি তাঁর পোস্টগুলোতে রাজ্য সরকারের চেয়ে বেশি আক্রমণ করছেন সিপিএমকে। টিভি স্টুডিওতে আসা বিজেপি মুখপাত্রদের কথাবার্তা শুনলেও বোঝা যাচ্ছে তাঁরা তৃণমূলকে কিছু সাধারণ গালাগালি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। কোনোভাবেই যেন ডাক্তারদের আন্দোলনের উপরে ফোকাস না চলে যায় – সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক। বাকি রইল কংগ্রেস, যাদের কর্মী সমর্থক রাজ্যের খুব ছোট একটা এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এমতাবস্থায় নিজেদের আন্দোলন রাজনৈতিক নয় বলে চেঁচামেচি করার কোনো দরকার আছে কি? আন্দোলনকারী ডাক্তাররাও তো অধিকাংশই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্য।
এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? এই প্রশ্নের আরও একটা দিক আছে, যেদিক থেকে এই আন্দোলনের সমালোচনা হওয়া দরকার।
দশ দফা দাবি নিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা অনশনে বসার কিছুদিন আগেই এই আন্দোলনের সমালোচক এক বন্ধু বলছিলেন ‘ওটা ডাক্তারদের আন্দোলন। আর কারোর আন্দোলন নয়।’ তাঁর উষ্মা অকারণ ছিল না। সে পর্যন্ত ডাক্তাররা যা যা দাবি করছিলেন তার সবই নিজেদের নিরাপত্তা, সুযোগসুবিধা সংক্রান্ত। তিনি বলছিলেন, গত শতকের আটের দশকের ডাক্তারদের আন্দোলনের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে ডাক্তাররা প্রশ্ন তুলছেন না। সে কাজ না করলে এই আন্দোলন নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজিত হওয়া ভুল। নিম্নলিখিত দশ দফা দাবির পরে আর সেকথা বলা চলে না।
প্রথম দাবি সম্পর্কে সরকার বলতেই পারে যে এর সুরাহা আদালতের হাতে। দ্বিতীয় দাবি সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে এতে রোগীদের কিছু এসে যায় না। তবে সবকটা দাবিই জরুরি এবং ন্যায্য, ২-১০ পূরণ করাও সরকারের হাতে। কিন্তু ৩-৭ একেবারেই রোগীদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলোর যা হাল তাতে এগুলোর চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু হতে পারে না রোগীদের পক্ষে। এই দশ দফা দাবি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে হলে তৃণমূল সরকার যেসব দালাল চক্র, কুচক্রের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো ভাঙতে হবে। তার চেয়ে নিজের সরকার নিজে ভেঙে দিয়ে চলে যাওয়া সহজ। শুধু তাই নয়, ৩-৭ নম্বর দাবি পূরণ করলে একথা প্রকাশ্যে আসবে যে যেখানে যত ডাক্তার থাকা উচিত তত ডাক্তার নেই। যত শয্যা একটা হাসপাতালে আছে বলে দাবি করা হয়, তাও নেই। ফলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে সর্বরোগহর বড়ি হিসাবে দেখানো যে আসলে সরকারি ব্যবস্থার ফাঁক গোপন করতে, তাও প্রমাণিত হবে।
ডাক্তারদের আন্দোলন চালু হওয়ার পর থেকে তৃণমূল তো বটেই, স্বঘোষিত বামেরা অনেকেও বলে চলেছেন যে এই আন্দোলনকে আসলে চালাচ্ছে কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা, যাতে তাদের কাছে আরও বেশি সংখ্যক রোগী যায়। একে এই লেখার গোড়ার দিকে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলেছি। কারণ প্রথমত, একথা তথ্য দিয়ে কোনোদিন প্রমাণ করা যাবে না। যেমন প্রয়াত রতন টাটা কোনোদিন প্রমাণ করতে পারেননি যে মমতার সিঙ্গুরে কারখানা হতে না দেওয়ার আন্দোলনের পিছনে টাটার প্রতিদ্বন্দ্বী গাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোর হাত ছিল। দ্বিতীয়ত, মূলত যে শ্রেণির মানুষ আজও সরকারি হাসপাতালে যান, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা কর্পোরেট হাসপাতালের গেট পেরিয়ে ঢুকতেই পারবেন না। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বাড়িতেই মরতে দেবেন নিকটাত্মীয়কে। কারণ ওই হাসপাতালগুলোতে প্রথমবার গেলে যে ‘পেশেন্ট রেজিস্ট্রেশন’ করাতে হয় তার খরচই কোথাও হাজার টাকা, কোথাও দু হাজার টাকা। অথচ ওই শ্রেণির মানুষের অনেকের গোটা মাসের পারিবারিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। ওই হাসপাতালগুলোতে মরণাপন্ন রোগীকে নিয়ে দৌড়লেও এমার্জেন্সিতে ঢুকিয়েই আগে ‘ডিপোজিট মানি’ দিতে হয়। তার অঙ্কটা ওই শ্রেণির মানুষের বাড়িঘর বেচে দিলেও আসবে কিনা সন্দেহ। ফলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রায় আড়াই মাসের আন্দোলনে কর্পোরেট হাসপাতালগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে আর তার আগে কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটাচ্ছিল – এমন আষাঢ়ে গপ্প কার্তিক মাসে একেবারেই অচল।
হঠাৎ এমন ভান করা হচ্ছে যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর ভীষণ বিরোধী। ব্যাপারটা সত্যি হলে চমৎকার হত। কিন্তু সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করার দরকারই ছিল না। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিদিন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ডাক্তারদের আন্দোলন চলাকালীন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারের খরচ বেড়ে গেছে। তা থেকে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে যে এর কারণ এই পর্বে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করানো।
এখানে চেপে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা হল, আপনার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড না থাকলে এখন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাবেন, কিন্তু বেশকিছু খরচসাপেক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে না, কোনোরকম অস্ত্রোপচারও হবে না। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প থেকেই সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের খরচও দেওয়া হয়। অথচ এই প্রতিবেদনে কেবল সরকারের খরচ বেড়েছে বলা হয়েছে, কোন হাসপাতাল থেকে কত টাকার ‘ক্লেম’ এসেছে তা লেখা হয়নি। ফলে এই অঙ্কের সবটাই যে বেসরকারি হাসপাতালে হওয়া খরচ, তা মোটেই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর্থিক বর্ষের মাঝখানে, এত নির্দিষ্ট কয়েকটা দিনের সরকারি জমা, খরচের হিসাব এভাবে পাওয়া যায় কিনা, কে করল এই সমীক্ষা, সেসব প্রশ্ন না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।
কিন্তু যে কথা বলার, তা হল স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করা হয়েছে মানেই সরকার তো মেনে নিয়েছে যে তার নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজ্যের সব মানুষের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই মানুষকে বেসরকারি ব্যবস্থায় চিকিৎসা করানোর খরচও সরকার জোগাচ্ছে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে সরকার কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কীভাবে কমানো যায় তা দেখছে না কেন? এর উত্তর সরকারপন্থীদের ঠোঁটস্থ থাকা উচিত। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছিল যে কর্পোরেট হাসপাতালগুলোকে লাগাম পরানো হবে। সেই অনুযায়ী কলকাতায় ঘটা করে মালিকদের সঙ্গে অন-ক্যামেরা সভা করেছিলেন স্বয়ং মমতা। এমনকি জেলা সফরের সময়ে সেখানকার নার্সিংহোমগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সভা করেন দফায় দফায়।
২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কলকাতার টাউন হলের সভায় মমতা রীতিমত বকাঝকা করেছিলেন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিদের। তাদের যাবতীয় অনিয়ম, আকাশছোঁয়া বিল নিয়ে সরকারের কাছে অনেক অভিযোগ আছে বলে জানা গিয়েছিল। সেসব আটকাতে কমিশন তৈরি, আইন পাস করা ইত্যাদি অনেক কাণ্ড হয়েছিল। খুব ভাল কথা। কিন্তু তাহলে সাতবছর পরেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর খরচ একইরকম রয়ে গেল কেন? কর্পোরেট হাসপাতালের অসাধুতা, ডাক্তারদের অসাধুতার যে অভিযোগ এখন সরকারপন্থীরা তুলছেন সেগুলোরই বা সুরাহা হল না কেন? তার মানে ওখানেও ফাঁকি? একথা সত্যি যে সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা যথেষ্ট না হওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাক্তার না থাকার সমস্যা ২০১১ সাল থেকে তৈরি হয়নি। কিন্তু ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তো লুডো খেলতে দেওয়ার জন্য সরকার বদলে ফেলেননি? তাহলে এতদিন এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে বারণ করেছিল কে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ডাক্তাররা এই আন্দোলনেও চাইতে পারলেন না।
এছাড়াও কিছু প্রশ্ন আছে, যার জন্যে জবাবদিহি সরকারের পাশাপাশি ডাক্তার-সমাজকেও করতে হবে। যেমন ডাক্তাররা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতগুলো মৌলিক প্রশ্ন তুললেও নার্স এবং আয়াদের কথা কিন্তু তুললেন না। অথচ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো মানুষমাত্রই জানেন, রোগীর সারাদিনের পরিচর্যা থাকে ওঁদের হাতেই। সিনিয়র, জুনিয়র মিলিয়েও প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার এতই অপ্রতুল যে রোগীকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ রাখার জন্যে দক্ষ শ্রমিক নার্স আর অদক্ষ শ্রমিক আয়াদের ভূমিকা বিরাট। এঁদের দাবিদাওয়া বাদ দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে কোনো সংস্কার অপূর্ণই থেকে যাবে।
দ্বিতীয়ত, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দিয়ে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না তো বটেই; কয়েকশো পুলিস দিয়েও নিশ্চিত করা যাবে না, যদি রোগীর বাড়ির লোক আর ডাক্তারদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ থাকে। এই বাতাবরণ তৈরি হওয়ার জন্যে অনেকখানি দায়ী সরকার। কারণ বহু হাসপাতালে ডাক্তার থাকলেও চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকে না, ওষুধপত্র থাকে না। উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন রোগীর বাড়ির লোকেরা বোঝার অবস্থায় থাকেন না যে এতে ডাক্তারের কিছু করার নেই। তাঁরা ডাক্তারকে সামনে পান বলে তাঁকেই ধরে পিটিয়ে দেন। কিন্তু এই অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার পিছনে ডাক্তারদেরও খানিকটা দায় আছে। রোগী যখন দেখেন সিনিয়র ডাক্তাররা গুরুতর অবস্থার রোগীকেও দিনে একবার দেখতে আসেন, অথচ বাইরে চেম্বার আর নার্সিংহোম কামাই যায় না, তখন তাঁদের ভিতরে ক্ষোভ জমা হয়। সেই ক্ষোভের মার তারপর এসে পড়ে জুনিয়র ডাক্তার আর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর।
তৃতীয়ত, সংখ্যার বিচারে জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দশ শতাংশের কম হলেও, সিনিয়রদের বাইরের ব্যস্ততার কারণে তাঁরাই এই ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদের বিরুদ্ধেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানুষের নানা অভিযোগ থাকে। ‘যত্ন করে দেখেন না’, ‘ছোট ডাক্তারবাবুর ব্যবহার খারাপ’ ইত্যাদি। আর জি করের যে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হয়েছেন তিনি যে টানা ৩৬ ঘন্টা ডিউটি করে তারপর শুতে গিয়েছিলেন তা এখন আমরা সকলেই জানি। বস্তুত অধিকাংশ জুনিয়র ডাক্তারেরই ওটাই রুটিন। নাওয়া-খাওয়া দূরের কথা, শোয়ার সময়ও নেই। তেমন একজনের রোগীর প্রতি বা তাঁর পরিবারের প্রতি ব্যবহার ভাল হবে – এমন আশা করাই অন্যায়। যত্ন করে দেখবেন – এও প্রায় আবদারের পর্যায়ে পড়ে। বরং রোগী দেখতে গিয়ে যে রোজই ওঁরা চরম ভুলভাল করেন না তার জন্যেই প্রশংসা করা উচিত। এর সুরাহা কিন্তু অনেকটাই সিনিয়র ডাক্তারদের হাতে। তাঁরা যেভাবে আজকের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেভাবে যদি বছরে ৩৬৫ দিন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে খেপ খেলা বন্ধ করে সরকারি হাসপাতালে সময় দেন, তাহলেই জুনিয়ররা অনেকটা শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি পাবেন। রোগীর পরিবারেরও অসন্তোষ কমবে।
চতুর্থত, বহু হাসপাতালের বহু বিভাগে ডাক্তারের অভাবের একটা কারণ যেমন সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে, বদলি; বিজ্ঞাপন দেওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্র জমা না পড়াও একটা কারণ। কেন জমা পড়ে না আবেদনপত্র? সাধারণত বিশেষজ্ঞদের শূন্য পদ পূরণ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ সামাজিক। তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে। ১৯৮০-র দশক থেকে বাঙালি বাবা-মায়েদের মধ্যে একটা মৌলিক বদল এসেছে। তাঁরা ছেলেমেয়েদের প্রাণপণে কেবল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছেন। মানুষের সেবা করবে বলে নয়, অনেক টাকা কামাবে বলে। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে তাল মিলিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে সকলেরই। আজকাল অনেক শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিকও তো নিজের চারচাকার গাড়ি না থাকলে জীবন বৃথা মনে করেন। আজ হ্যাচব্যাক হলে কাল সেডান কিনতে চান। নইলে মনখারাপ হয়। সেখানে একজন ডাক্তার উচ্চতর বেতন, বিদেশযাত্রা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের হাতছানি এড়িয়ে আউটডোর, ইন-পেশেন্ট মিলিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার রোগী সামলানোর ঝামেলা ঘাড়ে নিতে সরকারি হাসপাতালে ঢুকবেন কেন?
#
অভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে আসা হল মনে হচ্ছে তো? রাজ্য সরকারও ঠিক এই কথা বলেই এসব মৌলিক প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দিতে চাইছে, যাতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে অভয়া কাণ্ড আবার হবে। এবারে একজন ডাক্তারের উপর অমন আক্রমণ হয়েছে, কাল একজন নার্সের উপর হতে পারে, পরশু কোনো আয়ার উপর হতে পারে, তার পরদিন কোনো শয্যাশায়ী রোগীর উপরেও হতে পারে। ডাক্তাররাও কি স্থিতাবস্থাই বজায় রাখতে চান স্রেফ নিজেদের কয়েকটা নির্দিষ্ট দাবি পূরণ করে নিয়ে? নাকি আমূল পরিবর্তন চান? এই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমূল পরিবর্তনে সেইসব মানুষের স্বার্থ জড়িত। কথাটা কিন্তু ডাক্তারদের মাথায় রাখতে হবে।
তবে এত কিছু বদলে দেওয়ার জন্যে লড়াই করার দায়িত্ব একা তাঁদের নয়। অনেকখানি দায়িত্ব সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের। উপরন্তু দলমত নির্বিশেষে যত মানুষ এতদিন ধরে লড়ছেন, দায়িত্ব তাঁদেরও। ডাক্তাররা বা রাজনৈতিক নেতারা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের সবার লোভ, লালসা বজায় থাকবে আর ডাক্তাররা নিষ্কাম কর্ম করবেন, নেতারা কেবল আমাদের কল্যাণের জন্যে কাজ করে যাবেন – এমন হয় না।
যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।
৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।
দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।
লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।
আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?
আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।
গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।
আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।
লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।
ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।
এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।
গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।
এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।
কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?
কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।
আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।
এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।
শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’
এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।