মর্গের মত ঠান্ডা প্রেক্ষাগৃহে দর্শককে উলঙ্গ করে দিলেন শিল্পীরা

সবশেষে বারবার ধর্ষিতারা উঠে দাঁড়ালেন, আর কেন্দ্রে থাকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য আমার এবং আমার ডানদিকে বসে থাকা বৃদ্ধের মাথা নিচু করে দিয়ে বিবস্ত্র হলেন।

উলঙ্গ

ভারতীয় ছেলেদের যে বয়সে পুরুষদেহ যে নারীদেহের চেয়ে আলাদা সেই চেতনা জাগ্রত হয়, নারীদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ এবং সেই কারণে কৌতূহল তৈরি হয়; সেই বয়সে বন্ধুদের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে পরিচয় হয়, ফলে উলঙ্গ নারীশরীর দেখার সুযোগ হয়। সেই বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে কথাবার্তা বলার, ঠাট্টা ইয়ার্কি করার বয়সে পৌঁছেছি, নগ্নতা আর যৌনতা সমার্থক হয়ে গেছে এবং সে সম্পর্কে আকর্ষণ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে – সেইসময় ওই পর্যন্ত গড়ে ওঠা সমস্ত ফ্যান্টাসি চুরমার করে দিয়েছিল একটা ছবি। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ১২ জন মহিলা নিজেদের জামাকাপড় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘকালীন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে। ২০০৪ সালে তাঁদের ওই উলঙ্গ প্রতিবাদের প্ররোচক ছিল আসাম রাইফেলসের হাতে থাংজাম মনোরমা নামে একটি মেয়ের ধর্ষণ ও খুন। ওই ১২ জনের হাতের সাদা ফেস্টুনে লাল কালিতে লেখা ছিল ‘INDIAN ARMY RAPE US’ (ভারতীয় সেনাবাহিনী, আমাদের ধর্ষণ করো)। অনেক পরে অগ্রজদের মুখে শুনেছি মহাশ্বেতা দেবীর গল্প অবলম্বনে মণিপুরী নাট্যকর্মী কানহাইয়ালাল হেইসনাম রচিত দ্রৌপদী নাটকের কথা। এক দাদা বলেছিলেন, শেষ দৃশ্যে অভিনেত্রী সাবিত্রী হেইসনাম যখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ালেন, তখন তিনি লজ্জা পাননি। লজ্জা পেয়েছিলেন, ভয় পেয়েছিলেন আমার দাদাটিই। একই অভিজ্ঞতা আমার কখনো হবে বলে ভাবিনি। হল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, বুধবার, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে।

ওই সন্ধেয় পরপর ছটি পরিবেশনার (অন্য কোনো শব্দের আওতায় সবকটিকে আনতে পারছি না। কারণ নাটক ছিল, নাচ ছিল, গল্প বলা ছিল, ছবি আঁকা ছিল, মূকাভিনয় ছিল) শেষে ছিল ক্যান্টিন আর্ট কালেক্টিভের মুজাহেমাৎ (প্রতিরোধ)। ছজন অভিনেত্রী, এক অভিনেতা (একজন বৃহন্নলার ভূমিকায়) এবং এক শিশুশিল্পী মঞ্চে নিজেদের শরীরে ফুটিয়ে তুললেন পাচার হয়ে যাওয়া, যৌনকর্মী হয়ে যাওয়া, তারপরেও ধর্ষিত হয়ে চলা মেয়েদের রক্তাক্ত জীবন। পুরুষ (জয়রাজ ভট্টাচার্য) সেখানে দুটি নির্বাক ভূমিকায় – একবার খদ্দের, পরেরবার চাবুক হাতে রাষ্ট্র। সবশেষে বারবার ধর্ষিতারা উঠে দাঁড়ালেন, আর কেন্দ্রে থাকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য আমার এবং আমার ডানদিকে বসে থাকা বৃদ্ধের মাথা নিচু করে দিয়ে বিবস্ত্র হলেন। আমাদের লজ্জা নিবারণের জন্য তাঁকে জাপটে ধরলেন অন্য শিল্পীরা, তুলে ধরলেন মণিপুরের স্মৃতি উস্কে দেওয়া সাদা ফেস্টুন। লাল কালিতে লেখা ‘KOLKATA POLICE RAPE US’।

তার আগেই প্রাচ্য নাট্যদলের ইনকিলাব নাটকের শিল্পীরা মঞ্চের একেবারে সামনে এসে আঙুল তুলে অভিযুক্ত করে দিয়েছেন ‘তুমি ধর্ষক, তুমি পুলিস, তুমি…’। ফলে আর পালাবার পথ নেই। দারিও ফো আর ফ্রাঙ্কা রামে-এর রচনা অবলম্বনে তৈরি সেই নাটকে ধর্ষণ, খুনের ধারাবিবরণীর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চে চলকে পড়েছে রক্ত। এক অভিনেত্রীর মত বমি ঠেলে উঠেছে আমার পেট থেকেও, অনেক কষ্টে সামলেছি। আমার বাঁদিকে বসা তরুণীর ফোঁপানোর আওয়াজ কানে এসেছে। তারও আগে অনিতা অগ্নিহোত্রীর দীর্ঘ কবিতা ‘পুনরুত্থান কাব্য’ অবলম্বনে তৈরি ইন্দুদীপা সিনহা নির্দেশিত নাটকের অভিনেত্রীরা দাঁড় করিয়েছেন মৌলিক প্রশ্নের সামনে – আমিও কখনো অজান্তে আমার স্ত্রীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করি না তো?

সন্ধের শুরু থেকেই অরাজনৈতিক চতুর্থ দেওয়াল ভেঙে দিয়েছেন সঞ্চালক সঞ্জিতা। মঞ্চের উপর মাইক হাতে বলতে শুরু করে কিছু পরেই দর্শকাসনে নেমে এসেছেন। কথা বলতে শুরু করেছেন আমাদের চোখে চোখ রেখে, খালি গলায়। সংগ্রাম মুখার্জি তাঁর নৃত্য পরিবেশনা ডান্স ফর হোয়াট-এ ব্যবহার করেছেন নিউজ চ্যানেলের কোলাহল, ডোনা গাঙ্গুলির সাউন্ড বাইট, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাউন্ড বাইট। ন্যাকা উচ্চারণে আমাদের ন্যাকামিকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘আমরা কী সুন্দর প্রতিবাদ করছি!’ তারপর নিরাময়ের মত ভেসে এসেছে তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবনের প্রধান শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতির কণ্ঠ। মঞ্চের শিল্পীরা কখন যে চরিত্রের আড়ালে রয়েছেন আর কখন যে দেখছি ভিতরের আসল মানুষটাকে – তা ক্রমশ গুলিয়ে গেছে। কারণ দেখতে পেয়েছি নিকটাত্মীয়ের হাতে যৌন নির্যাতনের কথা বলতে বলতে এক অভিনেত্রীর চোখ থেকে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। ওটা অভিনয় কিনা, পাঠক, আপনি সেদিন অ্যাকাডেমিতে উপস্থিত থাকলে আপনারও গুলিয়ে যেত। আসলে আমার মন তো জানে, যে কথাগুলোকে সংলাপ বলে ভাবছি, যে দৃশ্যগুলোকে সাজানো বলে মনে করছি মঞ্চে ঘটছে বলে, সেগুলো সত্যি সত্যি ঘটে চলে আমার আশেপাশে। হয়ত সেই সচেতনতায় আমার অ্যাকাডেমির ছোট্ট হলকে আরও ছোট মনে হতে শুরু করেছিল। সংগ্রাম নাচতে নাচতে এক ফাঁকে দর্শকদের বলেই দিলেন ‘You don’t deserve light’। ফলত আরও অন্ধকার, আরও ঠান্ডা মনে হচ্ছিল হলটাকে। ঠিক যেরকম ঠান্ডা লাগছিল বছর দুয়েক আগে এক নিকটাত্মীয়ের দেহ নিয়ে মর্গের ভিতর দাঁড়িয়ে।

শিল্পীরা এই পরিবেশনা দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শককে ঘেরাও করেন। শুরুতে মধুরিমা গোস্বামীর বিজয়লক্ষ্মী কোঠারি রচিত বাত কুছ দিল কি কথন আর সঙ্গে সঙ্গে ত্রিগুণার ছবি আঁকা রীতিমত সহনীয় ছিল, যদিও মানুষের অবচেতনের দিকে এক অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ছিল তার মধ্যে। সেখান থেকে পরতে পরতে দর্শকের অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়ে শেষবার যবনিকা পতনের আগে শ্রাবন্তীর ওইভাবে আমাদের ল্যাংটো করে দেওয়া – এক সুচিন্তিত আক্রমণ।

আরও পড়ুন হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক

বুধবার কলকাতায় রীতিমত দুর্যোগ, অন্ধকার নেমেছিল অন্যদিনের চেয়ে তাড়াতাড়ি। নাছোড় বৃষ্টিতে অ্যাকাডেমি, রবীন্দ্র সদন চত্বর সন্ধে থেকেই জনবিরল। অ্যাকাডেমি থেকে যখন ছাতা মাথায় বেরোলাম, তখন রীতিমত নির্জন। তাই হেঁটে এক্সাইড মোড় পর্যন্ত আসতে সুবিধা হল। ল্যাংটো অবস্থায় কে-ই বা অন্য মানুষের মুখোমুখি হতে চায়? মনে হচ্ছিল পথটা আরও দীর্ঘ হলে মন্দ হত না। সবচেয়ে ভাল হত হেঁটে হেঁটেই আমার গন্তব্যে পৌঁছনো গেলে। বাসে, ট্রেনে ওঠা মানেই ওই অবস্থায় অন্য মানুষের, বিভিন্ন নারীর মুখোমুখি হওয়া। বাড়ি ফেরা মানেও দুজন নারীর সামনে দাঁড়ানো। আরও দেরি হলে ভাল হত। নিজেকে একটু সামলে নেওয়া যেত। প্রবল অস্বস্তি নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছলাম, তখনো কানে বাজছে ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া/করিতে পারিনি চিৎকার।’

শিল্পীদের এমনি এমনি দ্রষ্টা বলা হয় না। কানহাইয়ালাল আর সাবিত্রী দ্রৌপদী নাটকে ওই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন মণিপুরের মহিলারা রাজপথে ওই প্রতিবাদ করার আগেই। কামনা করি, শ্রাবন্তীরা যেন দ্রষ্টা না হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের যেন মণিপুরের মেয়ে না হতে হয়। যদিও শিল্পীরা প্রশ্ন তুলে দিলেন ‘নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ’?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

 

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading