গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর।
পৃথিবীর যে কোনো দলগত খেলায় বিশ্বকাপ হয় চার বছর অন্তর। দর্শকরা ওই এক-দেড় মাসের অপেক্ষায় থাকেন, খেলোয়াড়রাও আজীবন স্বপ্ন দেখেন – বিশ্বকাপে খেলব, দেশকে জেতাব, ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের মণি হব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বয়স প্রায় দেড়শো বছর হলেও বিশ্বকাপটা অন্য অনেক খেলার চেয়ে নবীন। বিশ্বকাপ ফুটবল সাত বছর পরেই শতবর্ষে পড়বে, অথচ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি। ইতিমধ্যেই তার রমরমা কমে এল। চার বছর পরে বিশ্বকাপ হলে যে প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশা বিশ্বকাপকে বিরাট করে তোলে তা বেশ খানিকটা লঘু করে ফেলেছে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, নিজেই। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি হয় এক বছর অন্তর এবং দুটো পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপের মাঝের বছরগুলোতে। ফলে সব দলকে একই প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখার যে অভিনবত্ব তা কমে গেছে। খেলোয়াড়দের নায়ক হওয়ার সুযোগও বেড়েছে।
আমরা যারা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট ভালবাসি, তারা বুঝতে পারি যে টেস্ট ক্রিকেটের ধাঁচে এই খেলাতেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ফিরে আসা যায়। এই ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে শেষে ফেটে পড়ার রোমাঞ্চ টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে নেই। সেরা টি টোয়েন্টি ইনিংসও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে করা দ্বিশতরানের মত মহাকাব্যিক হওয়া সম্ভব নয়, কারণ মহাকাব্য হয়ে ওঠার সময়টাই নেই ওখানে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তায় একদিনের ক্রিকেট অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তার কোনো সুরাহা এই বিশ্বকাপ করতে পারল বলে মনে হয় না।
একদিনের ক্রিকেট বা তার বিশ্বকাপ চালু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট সম্পর্কে শীতল হয়ে পড়া দর্শকদের মাঠে ফেরানোর প্রয়োজনে। টি টোয়েন্টি আর তার বিশ্বকাপের জন্ম কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে অনীহা এসে যাওয়া দর্শককে মাঠে ফেরাতে হয়নি। ২০০৭ সাল নাগাদ সারা পৃথিবীর দর্শক মোটেই একদিনের ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। সেই সমস্যা ছিল মূলত ইংল্যান্ডে, যেখানে ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল। বস্তুত সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কুড়ি ওভারের ক্রিকেট জিনিসটা ঠিক কী, তা অনেক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশেরই খুব একটা জানা ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া, টি টোয়েন্টি সম্পর্কে প্রথম দিকে রীতিমত অনাগ্রহী ছিল। ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকটা তাদের চোখে পড়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেতাব জিতে ফেলার পর। সেটাই কাল হল একদিনের ক্রিকেটের। ২০০৭-০৮ সালে বিসিসিআই প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে খেলার অপরাধে এক দল ভারতীয় ক্রিকেটারকে নির্বাসন দেয় (সেই তালিকায় অন্যতম পরিচিত নাম হল আম্বাতি রায়ুডু), পরে নিজেরাই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খুলে বসে। ২০১১ সালে ভারত একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপও জিতে ফেলে। সে বছর অক্টোবরে চালু হয় একদিনের ক্রিকেটে দু প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলার নিয়ম, টি টোয়েন্টির দেখাদেখি বাউন্ডারির দড়ি ক্রমশ ঢুকে আসতে শুরু করে মাঠের ভিতর। ব্যাট, বলের লড়াই একতরফা করে দিয়ে ছোটে রানের ফুলঝুরি আর একদিনের ক্রিকেট ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠতে থাকে।
সেই ধারায় কোনো পরিবর্তন এল কি এই বিশ্বকাপে? যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের কাছে সবসময় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা থাকে নতুন কিছুর – নতুন তারকা, নতুন কৌশল, খেলার দর্শনের কোনো নতুন দিক, ভবিষ্যতের নতুন দিশা। তেমন কিছু কি পাওয়া গেল? যা যা নতুন দেখা গেল সেগুলো কি খুব আশাব্যঞ্জক?
ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে একদিনের ক্রিকেট দেখতে মাঠে লোক হয় না, সে খবর অনেকদিন হল ঠোঙা হয়ে গেছে। গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর। চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মত দু-একটা কেন্দ্র ছাড়া ভারত নেই অথচ গ্যালারি ভর্তি – এ দৃশ্য প্রায় দেখাই যায়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়াম বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধিত আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামই উদ্বোধনী ম্যাচে ছিল শুনশান। একই দৃশ্য ধরমশালার মত জায়গাতেও দেখা গেছে। আরও গণ্ডগোলের ব্যাপার হল, গ্যালারি শূন্য থাকলেও যে সাইট থেকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে সেই সাইট দেখিয়েছে প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ কি ভুল, নাকি কেলেঙ্কারি? ভারতে অবশ্য কেলেঙ্কারির যুগ অতীত। অমিত শাহ, জয় শাহদের আমলে কোনো কেলেঙ্কারি হয় না।
আরেকটা নতুন জিনিসও দেখা গেল এবার বিশ্বকাপে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলে কিছু হয় না, হয় আয়োজকদের পছন্দের ম্যাচে নাচগান। এবারে সেই ম্যাচ ছিল ১৭ অক্টোবর আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ। সে ম্যাচের নাচগান আবার এমন স্বর্গীয় জিনিস যে টিভিতে তার সরাসরি সম্প্রচার হয় না, কেবল মাঠে যাওয়া দর্শকরা দেখতে পান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও দুটো জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রথমত, খেলা উপলক্ষ, মোচ্ছবই লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপ মানে সব দলের সমান গুরুত্ব নয়। আয়োজক দেশ অন্যদের দয়া করে যতটা আপ্যায়ন করবে, তাতেই মানিয়ে নিতে হবে।
প্রথমটার প্রমাণ খেলার মাঝেই মাঠ অন্ধকার করে লেজার শো। ব্যাপারটা দর্শকদের জন্যে যতই আমোদের হোক, খেলোয়াড়দের জন্যে যে অসুবিধাজনক সেকথা ম্যাক্সওয়েল বলেও দিলেন দিল্লিতে নেদারল্যান্ডসে বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর। কিন্তু কেউ কান দিল না। লেজার শো চলছে, চলবে। নির্ঘাত ফাইনালেও হবে।
অবশ্য এখানেই চলে আসছে দ্বিতীয় ব্যাপারটা। ভারত ফাইনালে উঠেছে যখন, তখন মাঠের দর্শকদের জন্য আরেক দফা এক্সক্লুসিভ নাচগান, লেজার শো ইত্যাদি হবে হয়ত। কিন্তু রোহিত শর্মারা ফাইনালে না উঠলে কী হত? মানে আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কি সব দলের ম্যাচ নিয়ে সমান উৎসাহী ছিল এই বিশ্বকাপে? বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলে যে কোনো দেশকে নিয়ামক সংস্থার সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়, ভারতীয় বোর্ডও করেছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল বিভিন্ন দেশের দল নয়, সে দেশের সাংবাদিক এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের সহজে ভিসা দেওয়া, খেলার টিকিটের ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতীয় বোর্ড সেসবের তোয়াক্কা করেনি। ফলে বহু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আসতেই পারেননি। কর্তারা, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা এবং দিশি ক্রিকেটভক্তরা অবশ্য উল্লসিত গ্যালারিতে নীল সমুদ্র তৈরি হচ্ছে বলে। বাড়তি উল্লাসের কারণ, পাকিস্তানের অতি অল্প সংখ্যক সাংবাদিককে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। অনেক সমর্থক এবং সাংবাদিক এসে পৌঁছন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পরে। পাকিস্তানিদের অপছন্দ হওয়ায় এই ব্যবস্থায় অনেকেই খুশি। মুশকিল হল, আগামী বিশ্বকাপগুলোতে কোনো আয়োজক দেশের যদি ভারতীয়দের অপছন্দ হয়, তখন এরকম ব্যবহারের প্রতিবাদ করলে তারা পাত্তা দেবে না।
নিজের দেশের ক্রিকেটারদের মত অন্য দেশের ক্রিকেটারদের ভাল খেলাতেও আনন্দ পাওয়া এবং বাহবা দেওয়ার সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে যে একচোখা উগ্রতা এসে পড়েছে তারও একাধিক নিদর্শন এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। ভারতীয় ব্যাটার চার, ছয় মারলে গ্যালারি উত্তাল আর বিপক্ষের ব্যাটার মারলে পিন পতনের স্তব্ধতা অনেকদিনই নিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দুর্বল দলের সমর্থকের প্রতিও গ্যালারিতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার দৃশ্য নতুন। এতেও অসুবিধা একটাই। এই দৃষ্টান্ত অন্যেরা অনুসরণ করলে কী হবে? ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলো কি খুব আনন্দের হবে সেক্ষেত্রে?
ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার।
যে কোনো নিরপেক্ষ বিচারে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ফাইনাল হিসাবে প্রথমেই উঠে আসে ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা। সর্বকালের সেরা একদিনের ম্যাচের তালিকাতেও ওই ম্যাচের স্থান হবে উপর দিকে। কিন্তু তাতে কী? প্রিয় ব্যাপারটা একান্ত ব্যক্তিগত। যে খেলছে না তার কাছে খেলা যেহেতু এক প্রদর্শনী, সেহেতু কোন খেলার কোন মুহূর্ত যে তার কাছে গোটা খেলাটাকে অবিস্মরণীয় করে তুলবে তা বলা মুশকিল। তার উপর আছে স্মৃতির ভূমিকা। যে খেলা দেখতে দেখতে মনে হয় জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না, সামান্য সময় পেরোলেই তা ফিকে হয়ে যায়। আবার যে খেলা দেখার সময়ে অসাধারণ মনে হয়নি, তা বহুকাল পরেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিনেমার মত। কেন এমন হয় জানি না। কখনো খেলার বাইরের কোনো ঘটনা প্রভাবিত করে স্মৃতিকে, কখনো বা খেলা দেখার সঙ্গীদের স্মৃতিও এমন কাণ্ড ঘটায়। এমনটা না ঘটলে কোনো প্রিয় খেলা থাকত না একা একা জাবর কাটার জন্যে। কোনো আড্ডায় বা লেখায় সেই খেলার গল্প করে আরও অনেকের যে ওই খেলাটা প্রিয়, তা আবিষ্কার করার আনন্দও মাটি হয়ে যেত।
তখনো ভূগোল বলতে বুঝি জল থেকে কীভাবে মেঘ তৈরি হয় আর মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি হয় – এইসব। গ্লোব জিনিসটা দেখেছি কেবল বড়লোক আত্মীয়ের বাড়িতে। ফলে বাবা রাতভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে টিভিতে খেলা দেখছেন – এ জিনিস দেখে বিস্মিত হওয়ার বয়স চলে যায়নি। আমার বয়সী অনেকেরই ওই বিশ্বকাপ নিয়ে মুগ্ধতা আজও কাটেনি, কাটবেও না। কারণ ক্রিকেট খেলায় অত রং আগে কখনো দেখিনি। ১৯৮৭ বিশ্বকাপের সময়ে আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না, ’৯২ বিশ্বকাপের সময়ে হয়েছে সাদাকালো পোর্টেবল টিভি। বাড়ির উল্টোদিকের লাইব্রেরিতে স্পোর্টস্টারের পাতায় জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো অধিনায়কদের গ্রুপ ফটোতে দেখা জার্সির রংগুলো মনে রেখে দিয়েছিলাম। খেলা দেখার সময়ে সেই রং লাগিয়ে নিতাম খেলোয়াড়দের পোশাকে, মাঠে, আকাশে। কথা ছিল, মহম্মদ আজহারউদ্দিনের দল ফাইনালে উঠলে পাড়ায় যে দু-একজনের বাড়িতে রঙিন টিভি আছে সেখানে গিয়ে খেলা দেখব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে যায় ফাইনালের অনেক আগেই।
বাবার দ্বিতীয় পছন্দের দল ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারাও সেবার সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। তবে মেরুন জার্সির ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিন্তু দাপটে হারিয়েছিল কচি কলাপাতা জার্সির পাকিস্তানকে – একেবারে ১০ উইকেটে। দিনটা ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, জায়গাটা মেলবোর্ন। পরবর্তী এক মাসে ইমরান খান আর তাঁর দলবল যে রূপকথা রচনা করেন তা গল্পের বইয়ের বাইরে একমাত্র পাকিস্তানের ক্রিকেট দলই পারে। আজকের পাকিস্তানিরা তাকে বলেন ‘কুদরত কা নিজাম’, অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়ম। ২৭ ফেব্রুয়ারি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে হোবার্টে দুর্বল জিম্বাবোয়েকে দাপটে হারানোর পর ১ মার্চ অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ৭৪ রানে অল আউট হয়ে যান ইমরান, মিয়াঁদাদরা। সেদিন পাকিস্তানকে আক্ষরিক অর্থেই কুদরত বাঁচিয়ে দেয়। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১৬ ওভারে ৬৩ রান করতে হত জেতার জন্যে। কিন্তু এত বৃষ্টি নামে যে খেলা ভেস্তে যায়, পাকিস্তান পেয়ে যায় একটা মহামূল্যবান পয়েন্ট। তারপর সিডনিতে ভারতের কাছে হার, ব্রিসবেনে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। পার্থে অস্ট্রেলিয়াকে হারাবার পরেও পাকিস্তানের সেমিফাইনালে যাওয়া অনিশ্চিত ছিল। পয়েন্ট টেবিলে এতটাই পিছিয়ে পড়েছিল যে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পরেও রাউন্ড রবিন লিগের শেষ খেলায় নিউজিল্যান্ডকে না হারালে বিদায় নিতে হত।
বিশ্বকাপে তখন পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডই সবচেয়ে নিখুঁত দল। সব ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। শুধু তাই নয়, অধিনায়ক মার্টিন ক্রো ব্যাট করছেন রাজার মত। তাঁর দুটো অভিনব চালে কিস্তিমাত হচ্ছে প্রতিপক্ষ। এক, বোলিং শুরু করাচ্ছেন স্পিনার দীপক প্যাটেলকে দিয়ে। তাঁর বলে বিশেষ রান করা যাচ্ছে না। দুই, ব্যাটিং শুরু করাচ্ছেন প্রথম দুই ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকা মার্ক গ্রেটব্যাচকে দিয়ে। গ্রেটব্যাচ শুরু থেকেই ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে মারছেন। ১৯৯২ সালে ওই আক্রমণ অভূতপূর্ব। তার উপর পাকিস্তান দলে ইমরান আর মিয়াঁদাদের মধ্যে গণ্ডগোল। ইমরান নিজে পুরো সুস্থ নন। বোলার ইমরানের থেকে যতটা পাওয়া সম্ভব, তা পাচ্ছে না পাকিস্তান।
ক্রাইস্টচার্চের সেই ম্যাচে তারা অসাধ্য সাধন করল। লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদকে দিয়ে গ্রেটব্যাচকে শান্ত রাখলেন ইমরান। ফর্মে থাকা ক্রো ২০ বল খেলে তিন রানের বেশি করতে পারলেন না, আক্রম তাঁকে সুদ্ধ চারজনকে আউট করলেন। রামিজ রাজার শতরানে সহজেই জিতে গেল পাকিস্তান। অকল্যান্ডের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফের রোমাঞ্চকর জয়। ২৫ মার্চের ফাইনাল খেলতে সেই মেলবোর্নে ফেরত এল পাকিস্তান। সামনে আবার ইংল্যান্ড। জীবন সকলকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না, পাকিস্তানকে একসঙ্গে দুটো দিল।
ফাইনালেও ইংল্যান্ডেরই পাল্লা ভারি ছিল নিঃসন্দেহে। কারণ সেরা দল নিউজিল্যান্ড ছাড়া আর কেউ তাদের বেগ দিতে পারেনি। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে হার নেহাতই অঘটন। ব্যাটে বলে বিশ্বকাপ মাতাচ্ছিলেন বুড়ো ইয়ান বোথাম। গ্রেম হিক, অ্যালেক স্টুয়ার্ট, নিল ফেয়ারব্রাদাররা নিয়মিত রান করছিলেন। অলরাউন্ডার ক্রিস লুইস আর মিডিয়াম পেসার ডেরেক প্রিঙ্গলও ফর্মে।
কিন্তু ফাইনাল খেলল অন্য পাকিস্তান। একে অপরকে কোনোদিন পছন্দ না করা ইমরান আর মিয়াঁদাদ তৃতীয় উইকেটে ১৩৯ রান যোগ করলেন। তাও মিয়াঁদাদ সেদিন পুরো ফিট ছিলেন না, শেষদিকে রানার নিতে হয়েছিল। স্লগ ওভারে দারুণ মেরে দলের রান আড়াইশোর কাছে নিয়ে গেলেন ইনজামাম উল হক (৩৫ বলে ৪২) আর দুর্দম আক্রম (১৮ বলে ৩৩)। প্রিঙ্গল তিনটে উইকেট নিলেও বোথাম আর লুইস মার খেয়ে গেলেন।
আমার জ্যাঠতুতো, পিসতুতো দিদিদের মধ্যে তখন সুদর্শন ইমরানের প্রবল জনপ্রিয়তা, তবে দ্রুত তাঁর বাজার দখল করছেন আক্রম। আমাদের বাঙাল পাড়ায় সেই ২৫ মার্চ অনেকেই হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান সমর্থক; আমার বাবাও। সুতরাং আমিও। ইংল্যান্ডের প্রথম চারজন যখন ৬৯ রানের মধ্যে ফিরে গেলেন, তখন আমরা উল্লসিত। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠলেন ফেয়ারব্রাদার আর অ্যালান ল্যাম্ব। বাবা একের পর এক বিড়ি শেষ করছেন, রান হয়ে যাচ্ছে, উইকেট পড়ছে না। শেষমেশ ইমরান ফেরত আনলেন আক্রমকে। তিনি রাউন্ড দ্য উইকেট দৌড়ে এসে পরপর দুবার ম্যাজিক করলেন। অ্যালান ল্যাম্ব আর ক্রিস লুইসের হতভম্ব স্টাম্পগুলো আমাদের উদ্বেগের অবসান ঘটাল।
ইংল্যান্ড আর বেগ দিতে পারেনি। ইমরান যখন ক্রিস্টালের ট্রফিটা হাতে নিয়ে দলের কথা ভুলে কেবল মা শওকত খানুমের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল করার সংকল্প বর্ণনা করে চলেছেন, তখন আমি আর বাবা গিয়ে বসলাম পল্লী মঙ্গল সমিতির মাঠে। সেখানে আক্রমের স্তুতি চলছে, কোনো কাকু আবার বলছেন তাঁর মতে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ইনজামাম। একজন বললেন “বেল পাকলে কাকের কী?” অন্য এক কাকু রুখে উঠলেন “কেন? কাগজে তো দেখলাম গাভাসকার বলেছে ’৮৩ সালে যখন আমরা কাপ জিতলাম, ওরা খুব আনন্দ করেছিল। আমরা আনন্দ করব না? হাজার হোক এশিয়ার টিম।” এক জেঠুর মন্তব্য “হারাইছে তো ইংল্যান্ড রে। অগো ক্যান সাপোর্ট করুম? করতে অইলে পাকিস্তানরেই করা ভাল।”
ততদিনে ক্রিকেটের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্রেফ দর্শক আর প্রদর্শনীর নয়। তিনটে খবরের কাগজের খেলার পাতায় কাজ করা হয়ে গেছে, চতুর্থ চাকরিতে সাংবাদিক হিসাবে বিশ্বকাপ কভারেজের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাড়িতে রঙিন টিভি এসে গেছে, কিন্তু বাবার সঙ্গে বসে খেলা দেখা আর হয় না। যত বড় খেলা হয়, আমার তত বেশি কাজ থাকে। অফিসের হাই ডেফিনিশন টিভিতেই দেখি বেশিরভাগ খেলা।
সহকর্মীরা অনেকেই একমত হচ্ছিলেন না, কিন্তু আমি শুরু থেকে বলছিলাম, এবার ভারত চ্যাম্পিয়ন না হলে অবাক হব। কারণ আমাদের শচীন শুরু থেকেই ফর্মে। একা শচীনে রক্ষে নেই, বীরেন্দ্র সেওয়াগ দোসর। হেলায় ম্যাচ শুরু করছেন চার মেরে। জাহির খান বল হাতে নিলে উইকেট পড়া যেন সময়ের অপেক্ষা। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি রান পাচ্ছেন না, কিন্তু ইংল্যান্ডের সঙ্গে টাই হয়ে যাওয়া ম্যাচেও স্নায়ুর চাপে অধিনায়কত্বে ভুলচুক করেননি। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ গৌতম গম্ভীর ধারাবাহিক। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ যুবরাজ সিং। হয় ব্যাটে নয় বলে তিনি ভরসার জায়গা হয়ে উঠছিলেন। আর কী লাগে বিশ্বকাপ জিততে? ’৯২ বিশ্বকাপে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করতাম বাবাকে, সেবার বাবার প্রশ্ন করার পালা। খেলার পাতায় কাজ করি, অতএব বাবার ধারণা আমি একটু বেশি জানি। আমি আমার এইসব যুক্তি বলি, বাবা নীরবে শোনেন। একমত হলেন কিনা জিজ্ঞেস করার সময়ও আমার থাকে না।
এমন চলতে চলতেই ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল। আমাকে যেতে হল আমেদাবাদে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, মানে ক্রিকেটের ব্রাজিল। যাদের বিশ্বকাপের যে কোনো স্তরে হারানো প্রায় বিশ্বকাপ জেতার মতই কঠিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় বোলিংকে ছিঁড়ে খাওয়া রিকি পন্টিং আবার শতরান করলেন। যুবরাজ মোক্ষম সময়ে ব্র্যাড হ্যাডিন আর মাইকেল ক্লার্কের উইকেট না নিলে লক্ষ্য আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারত। সেমিফাইনালে উঠতে দরকার ২৬১, সেওয়াগ বেশিক্ষণ টিকলেন না। শচীন সাবলীল ব্যাট করছেন দেখে শততম শতরানের আলাদা কপি লিখতে শুরু করেছি, এমন সময় শন টেটের বলে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে তিনি আউট। গম্ভীরের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না বিরাট কোহলি। গম্ভীরও কাজ শেষ করে যেতে পারলেন না, ধোনি ফের ব্যর্থ। সিঁদুরে মেঘ দেখছি প্রেস বক্সে বসে, যুবরাজ খেলতে শুরু করলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। সুরেশ রায়নাকে সঙ্গে নিয়ে শেষপর্যন্ত আড়াই ওভার আগেই খেলা শেষ করে দিলেন। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনের ঘরে এসে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সম্মান জানালেন ভারতীয়, অভারতীয় সমস্ত সাংবাদিক। ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর জানা যাবে, তিনি গোটা বিশ্বকাপ খেলেছেন শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা – এসব নিয়েই।
বিশ্বকাপ যত এগোয়, জেতা তত কঠিন হয়। কিন্তু সেমিফাইনালে পাকিস্তান খুব দৃঢ় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারল না। ব্যাটে আর কেউ বেশি রান করতে না পারলেও শচীন আবার খেলে দিলেন, যুবরাজ ব্যাটে ব্যর্থ হলেও দুটো জরুরি উইকেট নিলেন। তবে আজ যে তরুণদের স্মৃতিতে ২০১১ নেই, তারা এখনকার শ্রীলঙ্কাকে দেখে কল্পনা করতে পারবে না সেই ফাইনাল কত কঠিন ছিল। শ্রীলঙ্কা গোটা বিশ্বকাপে হেরেছিল শুধু পাকিস্তানের কাছে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে সহজে হারিয়েছিল। ফাইনালের দিন জাহির যথারীতি নতুন বলে উইকেট নিলেন, কিন্তু মুনাফ প্যাটেল ছাড়া সবাইকে মেরে দিলেন শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের অন্যতম মাহেলা জয়বর্ধনে এবং অন্যরা। তবু তো কুমার সাঙ্গাকারাকে ৪৮ রানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যুবরাজ।
বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌনে তিনশো রান তাড়া করার চাপ অতুলনীয়, আর সেদিনই কিনা প্রথম ওভারে শূন্য রানে আউট হয়ে গেলেন সেওয়াগ। একটু পরেই শচীন। কোহলি তখনো চেজমাস্টার হয়ে ওঠেননি, গম্ভীরের সঙ্গে তাঁর জুটি সেদিন জমল না। এরপর নিজের অধিনায়কত্ব, নিজের কেরিয়ারের তোয়াক্কা না করে ব্যাট করতে নামলেন ধোনি। কোনো ক্রিকেটপ্রেমীকে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই পরের কয়েকটা ঘন্টা।
খবরের কাগজ তৈরি করে ছাপাখানায় পাঠানো যাদের চাকরি, তারা বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। অমন দিনে দেরি হয় আরও বেশি। আমি বাড়ি ফিরলে সাধারণত ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলে দিতেন বাবা। সে রাতেও তিনিই খুলে দেন, তবে একেবারে সজাগ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন “দারুণ দেখলাম, বুঝলি? একেবারে সাধ মিটিয়ে।” তখনো জানি না, বাবাও জানেন না, তাঁর ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। তিনি দেখে ফেলেছেন শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল।
আরও অনেক ফাইনাল হবে, কোনোটা স্মৃতিতে এভাবে অক্ষয় হবে কিনা জানি না। স্মৃতিতেই তো সঞ্চিত থাকে আমাদের সত্তা, ভবিষ্যৎ।
ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।
আজ পর্যন্ত অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গড়ের দিক থেকে আবার সবচেয়ে ভাল ফল পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের। দ্রুত এই তালিকায় উপরে উঠছে চীন। প্রত্যেক অলিম্পিকের পরেই পদক তালিকায় চোখ বুলোলে প্রথম চার-পাঁচটা স্থানে যে দেশগুলোর নাম দেখা যায় সেগুলো অর্থনীতিতেও বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় একশো বছরের ইতিহাসও অনুরূপ। সবচেয়ে ধনী মহাদেশ ইউরোপের পাঁচটা দেশ মিলে বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে ১২ বার (পশ্চিম জার্মানি/জার্মানি ৪, ইতালি ৪, ফ্রান্স ২, ইংল্যান্ড ১, স্পেন ১)। অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সত্ত্বেও গরিব লাতিন আমেরিকার তিনটে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে সব মিলিয়ে দশবার (ব্রাজিল ৫, আর্জেন্টিনা ৩, উরুগুয়ে ২)। এশিয়া আর আফ্রিকার কোনো দেশ আজ অবধি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
আগামীকাল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। তার আগে এসব কথা বলা এইজন্যে যে উপরের ঘটনাগুলোর পিছনে সফলতর ধনী দেশগুলোর কোনো চক্রান্ত নেই, সমস্ত খেলোয়াড়কে দিয়ে মাদক সেবন করানো নেই, রেফারি বা জাজদের ঘুষ খাওয়ানো নেই। যা আছে তা হল টাকার জোর। যে কোনো খেলার সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে সফল হতে গেলে একটা দেশকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। ২০১৬ অলিম্পিকের পর অভিনব বিন্দ্রা হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে এক কলামে লিখেছিলেন, “দেশ হিসাবে আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছতে চাই কিনা যেখানে পদক তালিকায় প্রথম পাঁচে শেষ করতে পারি। সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিনা, মানসম্মানের প্রশ্ন কিনা… আমরা উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের দেশে দারিদ্র্য আছে। সুতরাং আমাদের ঠিক করতে হবে অলিম্পিককে আমরা তার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার দেব কিনা। কিন্তু যদি আমরা চাই আমাদের অ্যাথলিটরা জিতুক, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি করা দরকার। ব্যাপারটা জটিল।” বলা বাহুল্য, দলগত খেলায় ব্যাপারটা আরও বেশি জটিল। গত দুই দশক ধরে ভারতীয় ক্রিকেট অর্থের দিক থেকে সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জায়গায়। এর প্রতিফলন খেলার মাঠে পড়তে বাধ্য। তাই চলতি বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট দলের আধিপত্যকে ব্যাখ্যা করতে কোনো ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা নেহাতই হাস্যকর। বরং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারেনি তা নিতান্তই লজ্জাজনক। আর কোনো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের এত বড় প্রতিভার মানবজমিন নেই, সেই জমিনে গজানো প্রতিভাকে সার জল দিয়ে বড় করার সামর্থ্য নেই। তা সত্ত্বেও যদি এ দেশ থেকে মহম্মদ শামি, যশপ্রীত বুমরা, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলরা উঠে না আসেন তাহলে কোন দেশ থেকে আসবেন?
ক্রিকেট দুনিয়ায় আর্থিকভাবে দু নম্বর এবং তিন নম্বর স্থানে আছে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। লক্ষ করুন, ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই। ইংল্যান্ডও হয়ত শেষ চারে থাকত, যদি ২০ ওভার আর ৫০ ওভারের খেলায় তফাত করতে ভুলে না যেত, কিছু অনিচ্ছুক বুড়িয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকে দলে না রাখত আর তাদের উদ্ধত ক্রিকেট বোর্ড টালবাহানার পর কেন্দ্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ করার জন্যে ক্রিকেটারদের এমন এক তালিকা প্রকাশ না করত, যা প্রায় কাউকে খুশি করেনি। যাঁরা আইপিএল নিলামের বাইরেও ক্রিকেটের অর্থনীতির খবর রাখেন তাঁরা জানেন যে গত এক দশকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের আর্থিক ব্যবধান অস্বাভাবিক বাড়িয়ে তুলে ক্রিকেট দুনিয়াকে ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করে তুলেছে এই ‘বিগ থ্রি’ – ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সর্বোপরি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত একদা শক্তিশালী দলগুলোর অনেক পিছিয়ে পড়ার পিছনে এর ভূমিকা কম নয়। ত্রিদেবের এই প্রতাপে বছর বিশেক আগে জিম্বাবোয়ে, কেনিয়ার মত যে দেশগুলো দ্রুত উঠে আসছিল তারাও ক্রিকেট মানচিত্রের বাইরে ছিটকে পড়েছে। অল্প কিছুদিন আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও কেউ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না। ফিফা যেখানে ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়াচ্ছে, সেখানে আইসিসি ২০১১ আর ২০১৫ সালের ১৪ দলের বিশ্বকাপকে গত বিশ্বকাপ থেকেই নামিয়ে এনেছে দশ দলের বিশ্বকাপে। শুধুমাত্র ব্যবসা বাড়াতে দলের সংখ্যা বাড়ানো ভাল নয় – এ যুক্তি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কমানো হল কার ভালর জন্যে? তাছাড়া ত্রিদেবের সকলের উপর ছড়ি ঘোরানোর পিছনে ব্যবসা ছাড়া আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে? ‘বিগ থ্রি মডেল’ কীভাবে ক্রিকেট দুনিয়ার সংকোচন ঘটাচ্ছে, অনেক দেশকে শুকিয়ে মারছে তা নিয়ে গত একবছর বারবার লিখেছি। বিস্তারিত পাবেন এই লেখায়।
শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলো আইসিসির আয় বন্টনের এই অসাম্য থেকে বাঁচতে যে রাস্তা বার করেছে তা হল আইপিএলের আদলে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজন করা। যে দেশের ভারতের মত আইপিএলের বাইরেও অনেকগুলো প্রথম শ্রেণির দল নেই, ঘরোয়া পঞ্চাশ ওভারের খেলার পরিকাঠামো তেমন নয়, সে দেশে এর অনিবার্য পরিণতি কী, তা এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। এমন বোলার পাওয়া দুষ্কর যারা দশ ওভার ভাল বল করতে পারে। আরও শক্ত এমন ব্যাটার পাওয়া যার গোটা ১৫ বলে চার, ছয় মারতে না পারলেই নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় না। আইপিএলের মত রোজগার অন্য দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো থেকে হয় না। ফলে ওই দেশগুলোর ক্রিকেটাররা সারা পৃথিবী ঘুরে একাধিক লিগে খেলে বেড়ান। এত খেললে গড়ে ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করার বোলার পাওয়া যাবে না, আজকাল যায়ও না। তাছাড়া কুড়ি বিশের আদলে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যেভাবে মাঠ ছোট করে আনা হয়েছে তাতে অত জোরে বল করে লাভই বা কী? ব্যাটের কানায় লাগলেও ছয় হয়ে যাবে। ব্যাটারদেরও ইনিংস গড়ে তোলার ধৈর্য থাকছে না। সুইং বা স্পিন সামলানোর ক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। কুড়ি ওভারের খেলায় বোলাররা তো সারাক্ষণ রান আটকাতে বৈচিত্র্য আনতে ব্যস্ত। তাই ক্রস সিম, নাকল বল, স্লোয়ার ইত্যাদি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শামি বা বুমরার মত সিম সোজা রেখে খাঁটি সুইং বা সিম করানোর ক্ষমতা থাকছে না। চলতি বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, সাদা বলের ক্রিকেটে প্রথম দু-এক ওভারের মধ্যে উইকেট নেওয়ার জন্যে প্রসিদ্ধ শাহীনশাহ আফ্রিদিও নতুন বল সুইং করানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। ট্রেন্ট বোল্টেরও প্রায় একই সমস্যা হল। সারাবছর কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে হঠাৎ অভ্যাস বদলে ফেলা যায় না। এতকিছু সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সেমিফাইনালে লড়ে যাওয়া এটুকুই প্রমাণ করে যে ক্রিকেটে মহান অনিশ্চয়তা কিছুটা অবশিষ্ট আছে।
ওসব সমস্যা ভারতের ক্রিকেটারদের নেই। তাঁরা ভারতীয় দলের হয়ে খেলে আর আইপিএল খেলেই যা রোজগার করেন তার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন গড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের রোজগারের তুলনা চলে না। তাঁদের দেশে দেশে খেলে বেড়াতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আইপিএলের ব্র্যান্ড মূল্য বজায় রাখতে বিসিসিআই তাঁদের অন্য লিগে খেলার অনুমতিও দেয় না। ফলে বুমরা, শামি বা মহম্মদ সিরাজ, কুলদীপ যাদবরা ক্রিকেটের সাবেকি দক্ষতাগুলোয় শান দেওয়ার সুযোগ পান। গত একবছর চোটের কারণে না খেলা বুমরার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীর বিশ্রাম পেয়েছে। শামি আবার ভারতীয় কুড়ি বিশের দলে নিয়মিত নন, একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। সেটাও এক্ষেত্রে সুবিধা। আর ব্যাটাররা? কোহলি, রোহিত, রাহুলরা গতবছর পর্যন্ত বলের চেয়ে বেশি রান করার দর্শনকে পাত্তাই দেননি। তাই বারবার দল ব্যর্থ হয়েছে। পাত্তা না দেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে আয়ের নিশ্চয়তা। ভারতীয় বোর্ডের অর্থকরী কেন্দ্রীয় চুক্তি আর আইপিএল – দুটোই। এই নিরাপত্তা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হয়ে যাওয়ায় তাঁরা কুড়ি বিশ বা ৫০ ওভার, কোনো ধরনের খেলাতেই আদৌ ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারই ফল গত দেড়-দুই বছরের হারগুলো। বিশ্বকাপেও সেই ধারা চালু রাখলে ফলাফল অন্যরকম হত না, বোলাররা যতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুন। কারণ ভারতীয় বোলিং কয়েকটা খারাপ দিন বাদ দিলে টেস্ট আর একদিনের ম্যাচে বেশ কয়েকবছর ধরেই অসাধারণ। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে থেকে তিন নিরাপদ ব্যাটারের মধ্যে একজন, রোহিত শর্মা, ঠিক করলেন আক্ষরিক অর্থে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেবেন। আগের কয়েকটা সিরিজে এ জিনিস অনুশীলন করেছেন, অবশেষে বিশ্বকাপে সাফল্য পেতে শুরু করলেন। ফলে বাকিদের নিজেকে কমবেশি না বদলে উপায় রইল না। অর্থাৎ ওই বোলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং। তার উপর ঘরের মাঠের চেনা পরিবেশ, চেনা পিচের সুবিধা তো আছেই। এতসব মিলিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে এই দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া জিতে গেলেও এগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। এর জন্যে আলাদা করে সমস্ত ম্যাচ ‘ফিক্স’ করার প্রয়োজন পড়ে না। এই দলের যা শক্তি, তাতে পিচ বদল করাও নিষ্প্রয়োজন। এদেশের যে কোনো পিচেই এই দল জিততে পারত। অন্য দেশে বিশ্বকাপ হলে অন্য কথা ছিল।
সুতরাং ভারত আগামীকাল বিশ্বকাপ জিতলে তিনটে খেতাবের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে দাপুটে জয় হবে এটা। কিন্তু সকলের জন্যে সবচেয়ে আনন্দের জয় বলা যাবে কি? বিশ্বকাপ উপলক্ষ, বিজেপি সরকারের মহিমা প্রচার এবং শাসক দলের রাজনৈতিক প্রকল্প অনুযায়ী সবকিছু চালানোই যে লক্ষ্য তা সেই ৫ অক্টোবর থেকেই পরিষ্কার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, এদিকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বলিউডি শিল্পীদের ডেকে এনে ধুমধাম হল। আগামীকাল আবার ম্যাচের আগে মোচ্ছব, মাঝে মোচ্ছব, পরে মোচ্ছব। শুধু তাই নয়, দেশের সেনাবাহিনীকেও নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে খেলার আঙিনায় শক্তি প্রদর্শন করতে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবাহিনী খেল দেখাবে।
মজার কথা, আইসিসির এসব আপত্তি নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে ভারতের বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে বসেছেন, সর্বজনবিদিত যে এই ঘটনায় স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবদান ছিল। তাতেও আইসিসির আপত্তি নেই। অথচ বিশ্বকাপ চলতে চলতেই শ্রীলঙ্কার বোর্ডকে সাসপেন্ড করা হল সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। যারা স্রেফ ভারতের সাফল্য নিয়ে গদগদ হতে রাজি নয়, ভারতীয় বোর্ডের কার্যকলাপ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তুলছে, তাদের ঠিক বিজেপি সরকারের কায়দাতেই ভারতবিরোধী বলে দেগে দেওয়ার সংস্কৃতি দেশের ক্রিকেটমহলে চালু করে দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মত ক্রিকেট সাংবাদিকতাও গোদি মিডিয়ার দখলে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা বস্তুত বোর্ড এবং/অথবা বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জনসংযোগ আধিকারিকে পরিণত হয়েছেন। তাই ভারতের খুব অল্প সংবাদমাধ্যমেই যথাযোগ্য গুরুত্বে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর, যে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক অর্জুনা রণতুঙ্গা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের দুর্দশার জন্যে দায়ী বিসিসিআই সচিব জয় শাহ। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই নাকি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট চলে।
অভিযোগটা সত্যি হোক আর মিথ্যেই হোক, ভারতের, বিশেষত বাংলার, নামকরা ক্রিকেট সাংবাদিকদের স্রেফ চেপে যাওয়ার কারণ কী? দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া, নাকি বোর্ডের আনুকূল্য বন্ধ হয়ে যাওয়া? ধরে নেওয়াই যেত, রণতুঙ্গা বিশ্বকাপে দেশের ভরাডুবি দেখে হতাশায় প্রলাপ বকেছেন। শ্রীলঙ্কার বিদায়ের পর তাদের এক সাংসদ যেমন বলেছিলেন, ব্যাটিং কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে নাকি বিসিসিআইয়ের প্রভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ককে বলেছিলেন টসে জিতে ফিল্ডিং নিতে। মুশকিল হল, শ্রীলঙ্কার সরকার রণতুঙ্গার মন্তব্যের জন্যে বিসিসিআই সচিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছে একেবারে সংসদের অধিবেশনে। উপরন্তু পর্যটন মন্ত্রী বলেছেন, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নাকি শাহকে ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। যদি ভারতীয় বোর্ডের এত প্রভাব থাকে একেবারে শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর, তাহলে ক্রিকেট বোর্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা আর কী এমন ব্যাপার? বোর্ড প্রভাব না খাটালেও ফল একই হত, আর প্রভাব খাটায়নি – এ দুটো কিন্তু এক নয়। অটো ফন বিসমার্কের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায় – রাজনীতিতে কোনোকিছু বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না সেটা অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।
ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালের পিচ বদলানোর অভিযোগকেও নস্যাৎ করেছেন ভারতের সাংবাদিককুল, প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটভক্তরা। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য, আইসিসি থেকে বিশ্বকাপের পিচগুলোর সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যান্ডি অ্যাটকিনসন তাদের ইমেলে জানিয়েছেন, তাঁর অজ্ঞাতসারে সেমিফাইনালে যে পিচে খেলা হওয়ার কথা ছিল তা বদলে দেওয়া হয়। একই ইমেলে অ্যাটকিনসন এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে ফাইনালের জন্য তিনি যে পিচ পছন্দ করেছেন তাও ভারতীয় দলের সুবিধার্থে বদলে দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে হইচই পড়ে যাওয়ায় আইসিসি সেমিফাইনাল চলাকালীন একটা বিবৃতি দেয়। সেই বিবৃতিতে কিন্তু বলা হয়নি যে পিচ বদলানোর অভিযোগ মিথ্যা। শুধু বলা হয়েছে, এমনটা করা হয়েই থাকে এবং অ্যাটকিনসনকে জানানো হয়েছিল (“was apprised of the change”)। এই বয়ান যদি সঠিক হয়, তাহলে হয় অ্যাটকিনসন মিথ্যা বলেছেন অথবা তাঁকে জানানো হয়েছিল পিচ বদলে ফেলার পরে। সত্যানুসন্ধান করতে হলে কোনটা ঘটেছে তা অ্যাটকিনসনের কাছে জানতে চাওয়া উচিত ছিল। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কিন্তু সেসবের মধ্যে যাননি। তাঁরা আইসিসির বিবৃতিকে তুলে ধরে রায় দিয়ে দিলেন, এসব ভারতের কাছে হেরে যাওয়া লোকেদের মড়াকান্না। যাহা সরকারি বিবৃতি তাহাই সত্য – ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে তলানিতে পড়ে থাকা দেশে এটাই যে নিয়ম তা অবশ্য বলাই বাহুল্য। আরও মজার কথা, সেমিফাইনালে প্রচুর রান হওয়ার ঘটনাকে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা বলা হল – এই তো। নতুন পিচ নয় বলে আপত্তি করার কী ছিল? পিচটা তো মোটেই মন্থর ছিল না। অর্থাৎ নিয়ম মানা হল কি হল না, তা আলোচ্য নয়। আলোচ্য হল ফলাফলটা কী? কোনো সাংবাদিক বা প্রাক্তন ক্রিকেটার কিন্তু আইসিসির নিয়মাবলী তুলে দেখাননি যে অ্যাটকিনসনকে জানিয়েই কাজ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অ্যাটকিনসন রাবার স্ট্যাম্প মাত্র। উলটে নানারকম অক্রিকেটিয় যুক্তি উঠে এসেছে।
কেউ বলেছেন ভারত যে এতদিনে ইংরেজদের প্রভুত্ব নাশ করে ক্রিকেটে শেষ কথা হয়ে উঠেছে এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না, তাই ভারতকে ছোট করতে এসব বাজে কথা বলা। ইংল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন ক্রিকেটার মার্ক রামপ্রকাশ একথা বলে আবার লিখেছেন, দিল্লির প্রবল বায়ুদূষণ নিয়ে যারা কথা বলছে তারাও নাকি এই উদ্দেশ্যেই ওসব বলছে। এ তো গেল ঋষি সুনকসুলভ ভারতপ্রেমের দৃষ্টান্ত। সুনীল গাভস্করের মত শতকরা একশো ভাগ ভারতীয় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ভারতকে এদের দরকার কারণ ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক টাকা রোজগার হয়। অথচ এরা ভারতের দিকেই আঙুল তোলে। মানে এরা চায় ভারতকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে, কিন্তু ভারত নিজের সুবিধা দেখলেই এদের অসুবিধা। আরও বলেছেন, পিচ যদি বদলানো হয়েই থাকে তো আইসিসিকে জানিয়েই হয়েছে। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি। আইসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটার যদি কিছু বলার সাহস না থাকে, তাহলে আইসিসিকে ধরো। বিসিসিআইয়ের দিকে আঙুল তুলো না। সংবাদসংস্থা পিটিআই গতকাল একটি নামহীন বিসিসিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছিল, অ্যাটকিনসনের কাজ নাকি শেষ। তিনি দেশে ফিরে গেছেন। অথচ আজ তাঁকে আমেদাবাদে পিচ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।
বৃদ্ধ কিংবদন্তির এই প্রবল জাতীয়তাবাদ খুবই প্রশংসনীয় হত, যদি হাস্যকর না হত। হাস্যকর এই কারণে, যে বিসিসিআই বাকি দেশগুলোর উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে ওই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েই। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নয়। ঠিক কথাই যে তাদের ভারতকে দরকার, কিন্তু ভারতও ঘুরে ফিরে তাদের সঙ্গেই খেলে। অন্যদের সঙ্গে খেলতে চায় না। কারণ এদের সঙ্গে খেললেই টিভি সম্প্রচার থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে।
অর্থাৎ অন্যায় ঢাকতে জাতীয়তাবাদ টেনে আনা, লোক খেপাতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলা আর ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই দেশগুলোর সঙ্গেই হাত মেলানো, পাকিস্তানকে দিনরাত খলনায়ক বলে দাগানো আর টাকা উঠবে বলে তাদের বিরুদ্ধে খেলা নিয়েই উদ্বাহু নৃত্য করা এবং সেই উন্মাদনাকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো – ভারতের শাসক দলের রাজনীতির সব বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় ক্রিকেট শরীরে ধারণ করে ফেলেছে এই বিশ্বকাপে। কাল হবে ফাইনাল। জিতলে জবরদস্ত নির্বাচনী প্রচার। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেয়ার বলসোনারো যেভাবে নির্বাচনে ব্রাজিল ফুটবল দলকে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদীও সেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যবহার করা শুরু করবেন নিজের নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম থেকেই। নেইমাররা বলসোনারোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরাটরা তো সেই ২০১৪ সাল থেকেই দাঁড়াচ্ছেন। এবার না হয় নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চেই দাঁড়াবেন। উপরি হিসাবে থাকবেন গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকররা। বারাণসী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শিলান্যাসে চার মারাঠি ব্রাহ্মণ প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক (গাভস্কর, দিলীপ ভেঙসরকর, রবি শাস্ত্রী, তেন্ডুলকর) যেতে পারেন, ভোটের প্রচারে নামতে আর আপত্তি কী?
বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল?
ছবি পিনটারেস্ট থেকে
ক্যালেন্ডার বলছে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে এখনো ঢের দেরি, বৈশাখ মাস তো আরও দূরে। এবার বাঙালি ভাবাবেগ (আজকাল বাঙালিরা হিন্দিভাষী নেতাদের বক্তৃতা শুনে শুনে যেটাকে ‘অস্মিতা’ বলে আর কি) মরসুম অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের প্রকাশ্য ও গোপন আক্রমণ বাঙালি জাতির উপর চলছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে আক্রান্ত জাতির মধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যেও সেসব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার উৎসাহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কারোর মধ্যে দেখা যায় না। না, একটু ভুল হল। সোশাল মিডিয়া খুললে মনে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই লড়ার জন্যে কোমর বেঁধে তৈরি। কিন্তু লড়তে গেলে ঠিক কী যে করতে হবে তার কোনো নীল নকশা কারোর কাছে নেই। যারা কিঞ্চিৎ সংগঠিত তারা ঠিক করেছে হিন্দিভাষী মানুষকে ধমকানো চমকানোই একমাত্র রাস্তা। তার বাইরে যে কয়েকজনের মাথায় দু-একটা পরিকল্পনা আছে, তাদের সঙ্গ দিতে গেলে নিজের জীবনচর্যায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হবে, বেশকিছু ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধিকাংশ বাঙালি সেসব করতে তৈরি নয়। না করার একগুচ্ছ অজুহাতও পকেটে বা হাতব্যাগে সবসময় থাকে। বলামাত্রই বার করে ফেলে। এদিকে সোজাসুজি “পারব না বাপু বাঙালিয়ানা করতে। অনেক কাজ আছে” বলে হাত ঝেড়ে ফেলার ক্ষমতাও নেই। কারণ কতকগুলো বিগ্রহ বাড়িতে এবং/অথবা জীবনে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গুরুজনেরা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি। বিগ্রহগুলোর নিয়মিত পুজো করতে হয়, নইলে মনে পাপবোধ তৈরি হয়। কিন্তু বিগ্রহের তো চর্চা বলে কিছু হয় না। ফলে যে সংস্কৃতি বিগ্রহনির্ভর তার চর্চা বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়, আর যে সংস্কৃতির চর্চা নেই তাকে শেষ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও প্রায় ফাঁকা মাঠে জিতে যাচ্ছে। বাঙালি কী করছে? অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। যদি বাঙালি সংস্কৃতি মানে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি হয়, তাহলে এই প্রবণতা সেই সংস্কৃতির ঠিক উলটো পিঠ।
হ্যাঁ, আল্লারাখা রহমান সুরারোপিত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানের সূত্রেই এত কথা বলছি। প্রথম চোটে গোটা ১৫ সেকেন্ড শুনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাল লাগছিল না বলে। কিন্তু ওই গান এবং তা নিয়ে বাঙালির প্রতিক্রিয়া সংবাদ হয়ে উঠেছে আর কোনো ওয়েবসাইট যা সংবাদ তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে লিখতে হবে, তাই শুনতে হল। অন্য অনেকের মত আমার কানেও মোটেই সুবিধের লাগল না। রহমান মহান শিল্পী, কিন্তু তাঁর সুরারোপিত কিছু হিন্দি গান আছে যেগুলো শুনলে মনে হয় তিনি কথাগুলোকে ঠিক সামলে উঠতে পারেননি, তাই কিছু অর্থহীন ধ্বনি ঢুকিয়ে দিয়ে ছেঁড়া মশারিতে তালি মেরেছেন (স্বদেশ ছবির ‘ইয়ে যো দেস হ্যায় তেরা’, লগান ছবির ‘কোঈ হম সে জিত ন পাওয়ে’ স্মর্তব্য)। এই গান শুনেও তেমনটাই মনে হল। আরও বড় গোলমাল হল, কথা যাচ্ছে লন্ডন আর সুর যাচ্ছে টোকিও। নজরুলের গানের কথায় বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবল উদ্যম এবং গনগনে রাগ আছে।
কিন্তু রহমানের সুর শুনলে মনে হচ্ছে এ গান ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ জাতীয় আনন্দের গান। সবাই মিলে বেশ নেচেকুঁদে নেওয়া যায় এই গান শুনতে শুনতে। যাঁরা গেয়েছেন তাঁদের হাসি হাসি মুখগুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফলে জ্ঞানত এই সুরারোপকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। সুরকার এবং তাঁর গায়েনরা গানের কথাগুলো বুঝে উঠতে পারেননি বলে সন্দেহ হয়।
গান ভাল না লাগলে নিন্দা করার অধিকার মানুষের জন্মগত, ভাল লাগলে প্রশংসা করার অধিকারের মতই। সুতরাং যখন কোনো শিল্পী নিজের কাজ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তখন তাঁকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। নইলে অবস্থা হয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর মত। ছবি ফ্লপ হলে বলতে হয়, গীতার চেয়ে তো প্লেবয় বেশি বিক্রি হয়। তা বলে কি গীতাকে ফ্লপ বলব? কিন্তু অমুক গান আমার ভাল লাগেনি বলা এক জিনিস, আর অমুক গান তৈরি করাই অনুচিত হয়েছে, নজরুলকে অপমান করা হয়েছে, বাঙালি জাতিকে অপমান করা হয়েছে, অবাঙালি বলেই এমন করতে পারল, বাঙালিরা কিছু বলে না বলে… ইত্যাদি চেঁচামেচি করা আরেক জিনিস। এই কোলাহল কিছুদূর পর্যন্ত স্রেফ হাস্যকর, তারপর ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই এত বেশি ধুলো ওড়ানো হয়েছে যে পিপ্পা ছবির নির্মাতারা বিবৃতি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। সেই বিবৃতিতে অবশ্য একটি মোক্ষম কথা বলা হয়েছে “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী গানটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে শ্রদ্ধা জানানো, যে চুক্তি আমাদের গানের কথাগুলিকে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিল” (Our intent was to pay homage to the cultural significance of the song while adhering to the terms set forth in our agreement, which permitted us to use the lyrics with a new composition)।
বিবৃতিতে প্রকাশ, চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী এবং পৌত্র অনির্বাণ কাজী। এখন বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ দেখে অনির্বাণ এবং তাঁর ভাইবোনেরা আমতা আমতা করছেন। জল্পনা চলছে ‘পরিবারেরই ভুলে কি বিকৃতি নজরুল-গীতে?’ কবির পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই দায় ঝেড়ে ফেলতে। গোটা দুনিয়ার বাঙালির চোখে তাঁরা এখন অভিযুক্ত। অপরাধ কী? না নজরুলের রচিত একটি গানকে অন্য সুরে গাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফেলেছেন। এখন নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজীকেও বলতে হচ্ছে “যা হয়েছে তা শুধু নজরুল ইসলামকে নয়, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিকে অপমান!”
কী হয়েছে? না নজরুলের একটি একদা জনপ্রিয় গানকে অন্যরকম সুরে গাওয়া হয়েছে এবং সে সুর বাঙালির পছন্দ হয়নি। এতদ্বারা বাঙালি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে জানিয়ে দিল, নজরুলের গান বেদ, কোরান, বাইবেল বা আবেস্তার মত একটি অপরিবর্তনীয় বস্তু। এদিক ওদিক করলে মহাপাতক হয়। এ স্রেফ শিল্প নয়, যে তুমি পুনর্নির্মাণ করবে। চুক্তি-টুক্তিতে চিঁড়ে ভিজবে না। কপিরাইট আইনকে মারো গুলি। আমাদের বিগ্রহের লেখা গান আমাদের সবার সম্পত্তি। দেশের আইন যা-ই বলুক। আবেগের কাছে আইন, শিল্পের ইতিহাস – এসবের আবার কোনো দাম আছে নাকি? ঠিক যেমন ইতিহাসে রামের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, আমাদের আবেগ যখন বলছে ওখানে রাম জন্মেছিলেন, তখন মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে।
নজরুলের প্রতি অন্যায় করা হল বলে যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না, তারা খেয়ালও করছে না, একজন শিল্পীর প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল তাঁর কপিরাইটকে সম্মান না করা। স্লোগান সকলের সম্পত্তি, গান অবশ্যই শিল্পীর একার। কারণ তিনি একাই তা সৃষ্টি করেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মত মহান সৃষ্টির পিছনে যে পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থাকে তার তুলনা একমাত্র প্রসববেদনা। ও জিনিসের ভাগ হয় না। শিশুকে যে যতই আদর করুক, সে একমাত্র তার মায়ের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পরেও। একজন শিল্পী অন্য এক শিল্পীর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তা নিয়ে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেই পারেন। সফল হলে প্রশংসা করা আর বিফল হলে নিন্দা করার বেশি অধিকার শ্রোতা, দর্শক বা পাঠকের নেই। যা করা হয়েছে তা শিল্প হিসাবে ভাল-খারাপ ছাড়িয়ে ক্ষতিকর মনে হলে অন্যকে সে কথা বলতে পারেন, পয়সা দিয়ে ও জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যাস।
এরপরেও একটা কথা আছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদী শিল্পের যে ধারা (protest art), তাতে অনেক সময় কোনো গানের রচয়িতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সেই গানটা সকলের হয়ে যায়। সে গানের অসংখ্য সংস্করণ তৈরি হয়ে যায়। নজরুলের গানের যে পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলে হাত-পা ছোড়া হচ্ছে, সেই পবিত্রতা তখন চুলোয় যায়। সেখানেই গানটার সাফল্য। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ আর ‘বেলা চাও’। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই গানদুটোর নানা রূপ। সাধারণত দেখা যায় সুর এক আছে, কথা পালটে গেছে। কেবল বাংলা ভাষাতেই ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানের অন্তত দুটো রূপ (‘আমরা করব জয়’, ‘একদিন সূর্যের ভোর’) পাওয়া যায়। এ যদি অন্যায় না হয়, তাহলে সুর বদল হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? নাকি রাগের কারণ আসলে একটা আশঙ্কা, যে নজরুলের উপর আমাদের মৌরসি পাট্টা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আর কেবল বাঙালির থাকবেন না?
তার মানে! যে যেমন ইচ্ছা আমাদের সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকাবে আর বাঙালি চুপচাপ বসে দেখবে?
তা কেন? বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নজরুলের ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতাটা জানে? বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে কী কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল সে খবর আজকালকার কনভেন্ট শিক্ষিত, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে হিন্দি পড়া ছেলেমেয়েদের জানানোর জন্যে কী উদ্যোগ নিচ্ছে নজরুলপ্রেমী বাঙালি সমাজ? গোঁফের রেখা ওঠা ছেলেরা আর মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ানো মেয়েরা এখনো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ পড়ছে? মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে রাস্তার সিগনাল – সর্বত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তো বাজছে, নজরুলগীতি গাওয়া হয় কটা জায়গায়?
মেগা সিরিয়াল বলতে খেয়াল হল – কেবল আবহসঙ্গীতে নয়, মেগায় যে পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই আস্ত হিন্দি ছবির গান বাজানো হয় তাতে হিন্দি আগ্রাসন দেখতে পান না? কোনো প্রতিবাদ হয়? মহিলা পুরুত দিয়ে করানো প্রগতিশীল বাঙালির বিয়েতে বর-কনের শেরওয়ানি আর ঘাগরা কি বাঙালি সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকায় না? কোন এ আর রহমান এসে বাঙালি মেয়েদের মাথায় বন্দুকে ঠেকিয়ে বিয়ের আগে মেহেন্দি অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করে তুলেছেন? ধনতেরাস উপলক্ষে ঝাঁটা না কিনলে মানসম্মান থাকছে না বাঙালি সংস্কৃতির কোন ধারা অনুযায়ী?
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সোশাল মিডিয়ায় রে রে করে কোনো শিল্পীর দিকে তেড়ে যাওয়া অনেক সহজ। তাতে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ, নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের ক্ষেত্রে আবার উপরি পাওনা বিগ্রহের মান বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ। ধর্মান্ধরা কোনোদিনই বোঝে না যে তাদের দেবতা তাদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি নিজেকে নিজেই বাঁচাতে পারেন, চুনোপুঁটি ভক্তদের মুখাপেক্ষী নন। সাংস্কৃতিক বিগ্রহের পূজারী বাঙালিও বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এত সামান্য শিল্পী নন যে তাঁদের বাঁচাতে হবে। ১৯৯১ সালে যখন আইন মোতাবেক রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট উঠে যাওয়ার কথা ছিল, তখন কেবল বিশ্বভারতী নয়, প্রায় সমস্ত শিক্ষিত (ডিগ্রিধারী অর্থে) বাঙালি গেল গেল রব তুলেছিল। কপিরাইট উঠে গেলেই নাকি সর্বনাশ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেবে লোকে, লেখাগুলোর কী যেন একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেবার এত দাপাদাপি শুরু হল যে ভারতের সংসদ দেশের আইন পরিবর্তন করে ফেলল। কপিরাইটের মেয়াদ ছিল স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর পর্যন্ত। তা বাড়িয়ে করা হল ৬০ বছর পর পর্যন্ত। শেষমেশ ২০০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র কপিরাইটের আওতার বাইরে এসেছে। গত ২২ বছরে বিশ্বভারতী ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আর কোন সৃষ্টি তিনি যেমন ছেড়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের হয়ে গেছে? একথা ঠিক, আজকাল একেকজন এত বাজনা সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন যে গান ছাড়া আর সবকিছু শোনা যায়। কেউ আবার কালোয়াতি করে বোঝাতে চান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি একজন ওস্তাদ। কেউ বা বাহাদুরি করে মাঝখান থেকে গান শুরু করেন। কিন্তু তাতে কী? যার যেমন রুচি সে তেমনই শোনে। যার যেটা ভাল লাগে না, সে সেটা শোনে না। এসবে গীতিকার রবীন্দ্রনাথের কী ক্ষতি হয়েছে?
প্রগতিশীল বাঙালিরা নিজস্ব দেবতাকুল বানিয়ে নিয়েছেন, তাতে নতুন নতুন বিগ্রহও যোগ করে যাচ্ছেন। গত বিশ বছরে যোগ হওয়া এক বিগ্রহের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটা পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছিলেন টিভির জন্যে (প্রযোজকদের সঙ্গে গোলমালে নাকি সে কাজে শেষ পর্যন্ত থাকেননি)। শাশুড়ি-বউমার কোন্দল আর এক পুরুষের দুই নারী ছকের বাইরে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী মেগা সিরিয়াল – গানের ওপারে। রবীন্দ্রনাথকে যারা বিগ্রহ বানিয়ে রাখে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকীকরণের দ্বন্দ্ব ছিল সেই সিরিয়ালের মূল উপজীব্য। সেখানে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত এমনভাবে গাওয়া হয়েছিল যা অভ্যস্ত কানে মোটেই সইবে না।
তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ত সমৃদ্ধ হয়নি, কিন্তু দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঋতুপর্ণকেও আজ আর সে কাজের জন্যে কেউ রহমানের মত আক্রমণ করে না। তখন যারা করেছিল তারাও ক্ষমা করে দিয়েছে। সে কি তিনি বাঙালি বলে, নাকি তিনি নিজেই বিগ্রহে পরিণত হয়েছেন বলে?
মজা হল, বাঙালির এই শতকের বিগ্রহরা কেউ বাংলার সঙ্গে হিন্দি, ইংরিজির মিশেল ছাড়া চলতে পারেন না। সৌরভ গাঙ্গুলির মুখের ভাষা শুনলেই টের পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় বিগ্রহ হতে চলা গৌতম ভট্টাচার্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তার নাম আবার বিশ্বকাপ তুঝে সেলাম। এসবে তাঁদের কারোর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না, কেউ বাংলার সংস্কৃতির সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে না। যত দোষ এ আর রহমানের। যেহেতু তিনি বাঙালি নন, যেহেতু আক্রমণকারী বনাম আক্রান্তের বয়ান খাড়া করার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক।
ব্যর্থ শিল্পপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ বলে বুঝে নিয়ে অন্য জিনিসে মন দেওয়ার নির্লিপ্তি না থাকলে, শিল্পে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে অনমনীয় হলে যা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তাই হচ্ছে। গড়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তির সংস্কৃতি। সাহিত্য ভূতে, গোঁজামিল ইতিহাসে আর রহস্য রোমাঞ্চে ছয়লাপ। কারণ ‘ওটা পাবলিক খায়’। সিনেমার বড় অংশ জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন। তাও আবার একই গল্পকে একবার, দুবার, তিনবার পর্দায় আনা হচ্ছে। আরেকটা অংশ? এই শতকের প্রথম দিকে চলছিল দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনরাবৃত্তি, তারপর থেকে চলছে পুরনো জনপ্রিয় বাংলা ছবির পুনরাবৃত্তি। পুনর্নির্মাণ বলা যাবে না। কারণ এসব ছবি মূল বয়ানে নতুন কিছু যোগ করে না, কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় না।
এরই পিছু পিছু এসে পড়েছে জেরক্স সংস্কৃতি।
‘অপরাজিত ছবিটা দারুণ হয়েছে।’
কেন? না সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে দেখতে অবিকল সত্যজিতের মত। পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলো একেবারে পথের পাঁচালীর মত। এদিকে পরিচালক অনীক দত্ত সাহস করে চরিত্রের নামটাই সত্যজিৎ রাখতে পারেননি, সে চরিত্রের তৈরি পুরস্কৃত ছবির নামও করে দিয়েছেন পথের পদাবলী।
‘মৃণাল সেনের বায়োপিকটা দারুণ হবে।’
কেন? না টিজারে দেখা গেছে মৃণালের চরিত্রাভিনেতাকে অবিকল তাঁর মত দেখাচ্ছে।
নির্দেশকরা কেনই বা এই ছকের বাইরে যেতে যাবেন? ছক ভাঙতে গিয়ে রহমানাতঙ্কের মত কিছুর কবলে পড়ার ঝুঁকি কে নেবে বাপু?
বাঙালি সংস্কৃতিকে এই বিষচক্র থেকে এবং হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র বাঙালি। কিন্তু তা করতে হলে রহমানাতঙ্ক কাটিয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী সে প্রশ্ন তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একদা সভাপতি তথাগত রায়, সোশাল মিডিয়ায় হিন্দি আগ্রাসনবিরোধী বাঙালির বাপ বাপান্ত করাই ইদানীং যাঁর জীবনের ব্রত, প্রায়ই মন্তব্য করেন যে বাঙালির সর্বনাশ করেছে ‘রসুন’ সংস্কৃতি। অর্থাৎ রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল। তৃতীয়জনকে নিয়ে তথাগতবাবুর আপত্তির কারণ অতি সহজবোধ্য আর বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্থান আদৌ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাশে নয়। তাই ও নিয়ে আলোচনা করা সময় নষ্ট। কিন্তু বাকি দুজন যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেকখানি তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আরএসএসের দীক্ষায় দীক্ষিত তথাগতবাবুর ওই দুজনকে প্রবল অপছন্দ প্রমাণ করে তাঁরা স্রেফ শৈল্পিক উৎকর্ষে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় এবং কার্যকলাপেও যথার্থ মানবতাবাদী, অতএব প্রয়োজনীয়। কথা হল, ওঁদের নিয়ে আমাদের যে উথাল পাথাল আবেগ প্রকাশ পায় ক্ষণে ক্ষণে, তা কি খাঁটি? যদি খাঁটি হয়, তাহলে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে লাইন দিয়ে অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে তৈরি প্যান্ডেল দেখতে গিয়েছিল কারা? যারা নজরুলের অপমান নিয়ে বেজায় উত্তেজিত তাদেরই ভাই বেরাদররা তো। রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি, ফেসবুক পোস্ট, আইনি ব্যবস্থার হুমকি কত কী দেওয়া হচ্ছে এখন। বিখ্যাতরাও দিচ্ছেন। তখন এত প্রতিবাদ ছিল কোথায়? নাকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান, কবিতাই কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ; তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবনা নয়, জীবনচর্যাও নয়?
আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া।
ফুটবল আর ক্রিকেট – দুটোই আমরা শিখেছি সাহেবদের থেকে। তাদের কাছে প্রথমটা স্রেফ খেলা, কিন্তু দ্বিতীয়টা ‘জেন্টলম্যান’স গেম’। আমরা বাঙালিরাও ফুটবল নিয়ে গদগদ, জনপ্রিয় গানে লেখা হয়ে গেছে “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”। কিন্তু ‘ভদ্রলোকের খেলা’ বলি ক্রিকেটকে। কারণ ক্রিকেটে আছে এমন একটা জিনিস যা আর কোনো খেলায় নেই – স্পিরিট অফ ক্রিকেট। ‘জেন্টলম্যান’স গেম’ কথাটার সর্বজনমান্য বাংলা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ তৈরি হয়ে আছে বহুকাল ধরে। কিন্তু ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’ কথাটার বাংলা কী? কাউকে তো লিখতে বা বলতে দেখি না। কথাটার হিন্দিও কোথাও দেখি না। রবিচন্দ্রন অশ্বিন আইপিএল ম্যাচে জস বাটলার বল হওয়ার আগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন দেখে তাঁকে রান আউট করে দিলে বা ভারতের দীপ্তি শর্মা ইংল্যান্ডের শার্লট ডীনকে একইভাবে রান আউট করে দিলে ভারতের সব ভাষাভাষী লোক (বিদেশিরাও) যা নিয়ে আলোচনা করে তা ওই ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’।
কথাটার বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, মালয়ালম – কোনো অনুবাদই পাওয়া দুষ্কর। কারণ জিনিসটা খেতে হয় না মাখতে হয় – তা এই ক্রিকেটপাগল দেশের কোনো জাতির একজন ক্রিকেটবোদ্ধারও বোধহয় হৃদয়ঙ্গম হয়নি। যা হৃদয়ঙ্গম হয় তাকে মানুষ নিজের ভাষায় ডাকে। আমাদের বাঙাল পাড়ার কাকা জ্যাঠারা অনেকেই ফুটবল খেলাকে বলতেন ‘জাম্বুরা লাথান’। ক্রিকেট খেলার ঝিঁঝি নামটা তো বাঙাল, ঘটি সকলেই জানে। ঘোর পশ্চিমবঙ্গীয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘ক্রিকেট মানে ঝিঁঝি’ নামে একখানা আস্ত গল্প লিখে গেছেন।
হৃদয়ঙ্গম হবে কী করে? স্পিরিট অফ ফুটবল বা স্পিরিট অফ টেনিস শুনেছেন কখনো? সকলেই জানে এই খেলাগুলোর কিছু নিয়মকানুন আছে। সেই অনুযায়ী খেলা চলে, নিয়ম ভাঙলে ভুলের ওজন অনুযায়ী মাশুল দিতে হয়। দিয়েগো মারাদোনার হাত দিয়ে গোল করা অন্যায় হয়েছিল, কারণ নিয়ম অনুযায়ী হাত দিয়ে গোল দেওয়া চলে না। সে গোলের সমর্থনে মারাদোনা নানারকম মন্তব্য করেছিলেন, ফুটবল রোম্যান্টিকরাও নানা কথা বলে। কিন্তু অতি বড় আর্জেন্টিনা সমর্থকও বলে না, গোলটা বৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবল অনুযায়ী ঠিক। কোনো ইংল্যান্ড ভক্তও কখনো বলেনি, গোলটা অবৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবলের বিরুদ্ধে। স্বীকার্য যে সব খেলারই কিছু সহবত আছে যেগুলো নিয়ম হিসাবে লিপিবদ্ধ নেই। যেমন ফুটবলে একজনকে ট্যাকল করে মাটিতে ফেলে দিয়েই আবার হাত বাড়িয়ে দিই উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু তা না করলে কেউ স্পিরিট অফ ফুটবল লঙ্ঘন হল বলে তেড়ে আসে না। যদি বাড়াবাড়ি করে যাকে মাটিতে ফেলেছি তাকে ফের লাথি মারি, তাহলে শাস্তির বিধান আইনেই আছে। আলাদা করে স্পিরিটের দোহাই দেওয়ার দরকার পড়ে না।
কিন্তু ক্রিকেটের কথা আলাদা। ফুটবলের মত সাধারণ চাকুরে, শ্রমিক প্রমুখ মিলে ক্রিকেট ক্লাবগুলোর গোড়াপত্তন করেননি বিলেতে। সায়েবসুবোদের মধ্যেও উচ্চকোটির লোকেরাই নিজেদের মধ্যে খেলত ধপধপে সাদা জামাপ্যান্ট পরে। রাজারাজড়ার খেলায় যখন অন্যরা ঢুকে পড়ল, তখন আবার শ্রেণিবিভাগ করা হল – জেন্টলমেন আর প্লেয়ার্স। আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া। ক্রিকেট ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে যে দেশে গেছে সেদেশেই উচ্চকোটির মানুষের খেলা হয়ে থেকেছে বহুকাল। নিজের সময়ের অন্যতম সেরা স্পিনার হওয়া সত্ত্বেও পলওয়ঙ্কর বালু দলিত বলে বম্বের কোয়াড্রেনিয়ালে খেলতে কতটা বেগ পেয়েছেন সে ইতিহাস রামচন্দ্র গুহ সবিস্তারে লিখেছেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ব্যাপারটা একইরকম ছিল অনেকদিন। সেখানকার নন্দিত লেখক সিএলআর জেমস লিখেছেন, ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে তিনি বুঝতেই পারেননি, যে কোনটা ক্রিকেটিয় আর কোনটা ক্রিকেটিয় নয় তার যে ধারণা তাঁর মাথায় তৈরি হয়েছিল, তা আসলে দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি করে দেওয়া। মজার কথা, যে কোর্টনি ওয়ালশকে ঢাল করে আজ শাকিব আল হাসানকে দুয়ো দেওয়া চলছে, সেই ওয়ালশের জামাইকার প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার জর্জ হেডলি আদর্শ অধিনায়ক মনে করতেন বডিলাইন সিরিজের কুখ্যাত ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিনকে।
স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক ভদ্রলোকের সুবিধাটি (privilege) একবার করে ধাক্কা খায়, খানিকটা খসে পড়ে। তখন নিয়ামকরা অগত্যা আইন বদলে একই অধিকার সকলকে দেন। ভারতে জন্মানো স্কটিশ (ব্রিটিশ নয় কিন্তু) জার্ডিন বড় ধাক্কা মেরেছিলেন। ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে তিনি ব্যাটারদের শরীর লক্ষ করে বল করানো শুরু করেন আইন মোতাবেক। ফলে নিয়ামকরা আইন বদলে লেগ আম্পায়ার আর উইকেটরক্ষকের মাঝে দুজনের বেশি ফিল্ডার রাখা নিষিদ্ধ করেন। আউট করতে গিয়ে ব্যাটারকে আঘাত করা চলবে না – এটা এতদ্বারা আইনের মধ্যে এসে পড়ে। তার আগে অবধি বাবুদের ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহারে বিশ্বাস ছিল, অর্থাৎ কারোর শরীর লক্ষ করে বল ছোড়া হবে না।
রাজছত্র ভেঙে পড়ে, ভদ্রলোকের সুবিধা কিন্তু টিকে থাকে। কারণ ওটা যাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি, তাদের মাথাতেও বেদবাক্য হয়ে ঢুকে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানে যাকে ‘হেজিমনি’ বলে। তাই অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ভাবেন মাঠে নামার আগে দেখে নেওয়ার দরকার নেই হেলমেটটা খেলার যোগ্য আছে কিনা। মাঠে নেমেও ভাবেন যত খুশি সময় নিতে পারেন, স্পিরিট অফ ক্রিকেট বাঁচিয়ে দেবে। আর শাকিব কোনো অন্যায় না করেও দুনিয়াসুদ্ধ লোকের গাল খান। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লোকের, কারণ এ রাজ্যে ক্রিকেট তো সত্যিই আজও ভদ্রলোকের খেলা। বাংলা থেকে ভারতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের অধিকাংশ কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর সন্তান। ছোটলোকেরা বাংলার ক্রিকেটে এখনো প্রান্তিক।
ভারতীয় জোরে বোলারদের মধ্যে কপিলদেব নয়, যশপ্রীত বুমরাই গোট – একথাও এখনই বলা শুরু হয়ে গেছে। স্পিনারদের মধ্যে অশ্বিন গোট। ফলে বিষাণ সিং বেদিকে আর কে মনে রাখবে?
বিরাট কোহলি একটা করে শতরান করেন আর নতুন করে তর্ক শুরু হয় – সর্বকালের সেরা কে? কোহলি নাকি শচীন তেন্ডুলকর? চলতি বিশ্বকাপে বিরাট ইতিমধ্যেই একটা শতরান করে ফেলায় এবং আরেকটা শতরানেরও খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় দুজনের ভক্তরা এ নিয়ে ধুন্ধুমার চালিয়ে যাচ্ছেন। দুপক্ষই প্রধানত পরিসংখ্যানকেন্দ্রিক। ক্রিকেট খেলার পরিসংখ্যান আজকাল মোবাইল ফোনের কল্যাণে সকলের আঙুলের ডগায়। তার উপর ক্রিকেট যত বাড়ছে, পরিসংখ্যানগুলো তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফলে ও নিয়ে তর্ক করাই সুবিধাজনক। যে কোনো খেলাই খেলে মানুষ। ফলে খেলার পরিবেশ, পরিস্থিতি, একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এবং অবস্থানের মত বিষয় যে পরিসংখ্যানের সমান, বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি, গুরুত্বপূর্ণ তা বেশিরভাগ আলোচনাতেই উঠে আসে না। কেবল সাধারণ ভক্তরা নন, বিশেষজ্ঞরাও আজকাল এই দোষে দুষ্ট। ফলে যা সাম্প্রতিক তা-ই সবচেয়ে ভাল – এই অলিখিত বাক্যটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) বলে একটা আশ্চর্য শব্দ দিনরাত ছোড়াছুড়ি হয় আজকাল। হয় কোহলি নয় তেন্ডুলকর গোট। ভারতীয় ক্রিকেটের বহু যুদ্ধের একক নায়ক সুনীল গাভস্করের নামও ক্রিকেটভক্তদের আলোচনায় ধারাভাষ্য বাদে আসে না আর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেছে, তাই ভিভিয়ান রিচার্ডসের মত ব্যাটারও আলোচনার বাইরে। ভারতীয় জোরে বোলারদের মধ্যে কপিলদেব নয়, যশপ্রীত বুমরাই গোট – একথাও এখনই বলা শুরু হয়ে গেছে। স্পিনারদের মধ্যে অশ্বিন গোট। ফলে বিষাণ সিং বেদিকে আর কে মনে রাখবে?
ভারতের বিখ্যাত স্পিন চতুষ্টয়ের অন্যতম এবং প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক, জাতীয় দলের প্রাক্তন কোচ বেদি ক্রিকেট বিশ্বকাপের মধ্যে মারা গেলেন। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন হয়নি, কোনো দলের ক্রিকেটার কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেননি। হয়ত আগামী রবিবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রোহিত শর্মারা সে কাজটা করবেন। কিন্তু প্রবল প্রতাপান্বিত ভারতীয় বোর্ড চাইলে অন্য দলগুলোও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে দ্বিধা করত না। কেনই বা করবে? ক্রিকেটের সমঝদারদের কাছে বেদির এখনো যথেষ্ট দাম আছে। ইয়ান চ্যাপেল, জিওফ্রে বয়কটরা এখনো বোঝেন বেদির ২৬৬টা টেস্ট উইকেটের মূল্য। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর ঝুলিতে ১,৫৬০টা উইকেট। অথচ নিজের দেশের ক্রিকেটভক্তরাই বেদিকে ভুলে বসে আছেন।
সেদিক থেকে ববি চার্লটন ভাগ্যবান। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্ব ফুটবল খেতাব জয়ের অন্যতম স্থপতির নামও যে ইদানীংকালের ইংল্যান্ড সমর্থক বা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের তরুণ ভক্তরা দিনরাত আলোচনা করেন তা নয়। কিন্তু ও দেশের খেলাধুলোর সংস্কৃতি আলাদা। এখানকার মত রাজনৈতিক নেতাদের নামে স্টেডিয়াম হয় না চট করে, স্টেডিয়ামের বাইরে মূর্তি বসানো হয় প্রবাদপ্রতিম খেলোয়াড়দের। তাই ববির মৃত্যুর পর তাঁর ক্লাব ইউনাইটেড চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচের সাংবাদিক সম্মেলনের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছে। আরও নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফুটবলপ্রেমীরা লাইন দিয়ে ফুলের তোড়া হাতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন। এক ভক্ত তো তাঁর মূর্তি বেয়ে উঠে গলায় পর্যন্ত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকারী স্কার্ফ জড়িয়ে দিয়েছেন।
ববি বা বেদি এক অন্য জগতের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরা সারাজীবনে শুধু খেলোয়াড় হিসাবে যা আয় করেছেন, আজকের লায়োনেল মেসি বা কোহলি সম্ভবত এক দিনে তা আয় করেন। কিন্তু তাঁরা কিছু আদর্শ নিয়ে চলতেন। বেদি যেমন শুধু স্পিনকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন বলেই স্মরণীয় নন। ১৯৭৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে অধিনায়ক বেদি মাত্র ৩০৬ রানে ছয় উইকেট পড়ার পরেই ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে দেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা ভারতীয় ব্যাটারদের আউট করতে নয়, আহত করতে নেমেছিলেন। যা বিশ্বাস করেন তা নিয়ে অকপট থাকা ববিরও অভিজ্ঞান। নিজের যোগ্যতা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করার পরেও তিনি বলতেন, ১৯৫৮ সালের মিউনিখ বিমান দুর্ঘটনায় ম্যাট বাজবির সোনার ছেলেরা মারা না গেলে তিনি বড় ফুটবলার হয়ে উঠতেন না।
আজকাল অনেক প্রিয় খেলোয়াড়ের মাঠের বাইরের আচরণ আমাদের আহত করে। কারণ দেখা যায়, মাঠে দারুণ লড়াকু আমাদের নায়ক মাঠের বাইরে ক্ষমতার সামনে একেবারে নতজানু। এঁরা কিন্তু কাঁড়ি কাঁড়ি উইকেট নিলে বা ঝুড়ি ঝুড়ি রান করলেও শিরদাঁড়ার দিক থেকে বেদির ধারেকাছে আসতে পারবেন না। আজীবন দিল্লিতে ক্রিকেট খেলা, দিল্লির হয়ে দুবার রঞ্জি ট্রফি খেতাব জেতা বেদির নামে ফিরোজ শাহ কোটলার একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা যেই স্টেডিয়ামের নাম বদলে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম করে দিলেন, আর কেউ কোনো প্রতিবাদ না করলেও বেদি কর্তাদের চিঠি দিয়ে জানান তাঁর নামাঙ্কিত স্ট্যান্ডটার নাম যেন বদলে দেওয়া হয়। দিল্লির ক্রিকেট সংস্থার সদস্যপদও তাঁর আর দরকার নেই। ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজনকে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী যেন স্মরণে রাখেন, তার জন্যে যে বোর্ডের দিক থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেই তার কিন্তু এটাও অন্যতম কারণ। বেদিকে মনে থাকলেই তো এসবও মনে থাকবে ভক্তদের।
ইদানীং পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে প্রবল ইতিহাসপ্রীতি তৈরি হয়েছে। ফলে ইতিহাসাশ্রিত গল্প, উপন্যাস, ছায়াছবি, ওয়েব সিরিজের আধিক্য। ইতিহাসের প্রেমে গুণী বাঙালিরা এতই ডগমগ যে গোয়েন্দা কাহিনি নিয়ে ছবিও তৈরি করা হচ্ছে পিরিয়ড পিস হিসাবে। সেই কাহিনিগুলির মধ্যে আবার পরিচালকদের বিশেষ পছন্দ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীকে। ইতিহাস শরদিন্দুর অতি প্রিয় লেখার বিষয়। একাধিক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন, ঐতিহাসিক গল্পও লিখেছেন অনেকগুলি। ব্যোমকেশের গল্প, উপন্যাসেও ইতিহাস টেনে এনেছেন অনেক জায়গাতেই। তেমনই একটি উপন্যাস দুর্গরহস্য। টালিগঞ্জ পাড়ার রাঘব বোয়ালদের ইতিহাসপ্রীতি ও গোয়েন্দাপ্রীতির ঠ্যালায় একই বছরে সেই দুর্গরহস্য নিয়ে দু-দুটো ছবি (একটি বড় পর্দার জন্যে, অন্যটি ওয়েব সিরিজ হিসাবে) তৈরি হয়ে গেল। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবির যা অবস্থা তাতে দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী (২০১৫) ছবির মত নিখুঁত সেট তৈরি করে যে সময়কাল দেখানো হচ্ছে তখনকার কলকাতা শহর বানিয়ে ফেলা অসম্ভব। কারণ অত রেস্ত নেই। তা সত্ত্বেও টালিগঞ্জের অকুতোভয় পরিচালকরা পিরিয়ড পিস বানিয়ে চলেছেন। ব্যাপারটি খুবই প্রশংসাযোগ্য হতে পারত, যদি ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গেলে ইতিহাস যে মন দিয়ে পড়তেও হয় – একথা তাঁরা মাথায় রাখতেন। সচরাচর রাখেন না, হইচই অ্যাপে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দুর্গ রহস্য (উপন্যাসের নামটিকে দুই শব্দে ভাঙার নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় তাৎপর্য আছে যা প্রাজ্ঞ দর্শক ধরে ফেলবেন) ওয়েব সিরিজের পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ও রাখেননি।
শিল্পীর স্বাধীনতা প্রয়োগ করে উপন্যাসের ঘটনাবলীকে তিনি বিশ শতকের প্রথমার্ধের বদলে ছয়ের দশকে স্থাপন করেছেন, যখন পশ্চিমবঙ্গ তথা সাঁওতাল পরগণায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অসুবিধা ছিল না, গোলমাল বেধেছে যেখানে উপন্যাসের অনুসরণেই সিপাহী বিদ্রোহ দেখানো হয়। সেই অংশে দুর্গ দখল করে নেওয়া সিপাহীদের দলের নেতা এক বাঙালি। ইতিহাস বলছে ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের হাত দিয়ে শুরু হয়ে থাকলেও বাংলায় সিপাহী বিদ্রোহ বিশেষ প্রভাব ফেলেনি। তবু শিল্পীর স্বাধীনতার খাতিরে বাঙালি নেতাকে না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু সেই নেতা ১৮৫৭ সালে বসে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” বলেন কী করে? একথা সর্বজনবিদিত যে ওই স্লোগানটির উৎস ফরাসী বিপ্লবের ‘ভিভা লা রেভল্যুসিওন’। ওই স্লোগান ভারতে এসে হসরত মোহানির কল্যাণে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এ পরিণত হয় বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ভারতীয় বামপন্থীদের লব্জে। আর সব স্লোগানের মতই ওই স্লোগানকে জনপ্রিয় করে তোলায় অনেকের ভূমিকা আছে, যাঁদের মধ্যে ভগৎ সিংও একজন। বাংলা ভাষায় ওই স্লোগান নিজস্ব চেহারা পেয়েছে হয় একই সময়ে অথবা আরও পরে। সিপাহী বিদ্রোহ তো এসবের ৭০-৮০ বছর আগেকার কথা। সেই বিদ্রোহের নেতার মুখে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” স্লোগান মেনে নেওয়া যায় বামপন্থীদের ব্যঙ্গ করে তৈরি কোনো ওয়েব সিরিজে, পিরিয়ড পিসে নয়।
পরিচালক শুধু ইতিহাসের হদ্দমুদ্দ করলেও কথা ছিল, এই স্লোগানটি ব্যবহার করে তিনি রাজনীতিরও সাড়ে বারোটা বাজিয়েছেন। কারণ কোনো মতের ঐতিহাসিকই সিপাহী বিদ্রোহের কোনো বিপ্লবী উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করেননি। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন “এই সিদ্ধান্ত এড়ানো শক্ত যে তথাকথিত প্রথম জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ না প্রথম, না জাতীয়, না স্বাধীনতার যুদ্ধ।” [ভাষান্তর আমার] রমেশচন্দ্রের ইতিহাস পাঠ অবশ্য মার্কসবাদীদের সঙ্গে মেলে না, আর সৃজিত এই ছবিতে প্রবল মার্কসবাদী (হয়ত মৃণাল সেনের বায়োপিক তৈরির মহড়া হিসাবে)। কিন্তু মার্কসবাদী হলে তো ‘বিদ্রোহ’ আর ‘বিপ্লব’ শব্দদুটির অর্থগত ফারাক বোঝা উচিত। বিশেষত মার্কসবাদীরা বিপ্লব বলতে যা বোঝেন তার সঙ্গে সিপাহী বিদ্রোহের লক্ষ্য যে একেবারেই মেলে না, সেকথা বোঝাও খুব শক্ত নয়। সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ ছিলেন লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে শাসনক্ষমতা হারানো বা কোণঠাসা হয়ে যাওয়া রাজন্যবর্গ। ওই বিদ্রোহের অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ের এই তথ্যগুলি জানলেও বোধহয় নকশাল আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল পরিচালক ওই স্লোগান সিপাহীদের মুখে বসাতেন না। পড়াশোনা করার সময় না থাকলে সত্যজিৎ রায়ের শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭) ছবিটা দেখে নিলেও চলত। সত্যজিৎ অ্যানিমেশন ব্যবহার করে প্রায় শিশুদের বোঝার যোগ্য করে ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি এবং তার ফলাফল বুঝিয়েছেন। কোথায় ইংরেজদের তাড়িয়ে দেশিয় রাজন্যবর্গের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিদ্রোহ আর কোথায় জোতদার জমিদার উচ্ছেদ করতে, ভারতে সমাজবিপ্লব আনতে নকশালবাড়ি আন্দোলন!
অবশ্য এই ওয়েব সিরিজের পরিচালক সত্যজিতের ছবি দেখতে যাবেন কোন দুঃখে? তিনি তো গোড়াতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সত্যজিতের প্রতিস্পর্ধী। তাঁর ব্যোমকেশও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) স্বয়ং উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ তার গিন্নী সত্যবতী (সোহিনী সরকার) আর বন্ধু অজিতকে নিয়ে চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) ছবিটি দেখতে গেছে। তারপর অজিত (রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জি) বেরিয়ে এসেই রেগেমেগে ঘোষণা করে দেয় যে সে আর কোনোদিন সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ – কাউকেই ব্যোমকেশ নিয়ে ছবি করতে দেবে না। কারণ সত্যজিৎ ব্যোমকেশকে চশমা পরিয়েছেন। এতদ্বারা সৃজিত আগের সবকটি সিজনের চশমা পরা ব্যোমকেশ অনির্বাণের চশমা হরণের একটি যুক্তি খাড়া করলেন (এত বকবকানির পরেও একটি বাহারি রোদচশমা কিন্তু পরানো হয়েছে)। এই কর্মটি ছাড়া, আর অনির্বাণকে উত্তমকুমারের সঙ্গে এক ফ্রেমে দাঁড় করিয়ে বাঙালির নস্ট্যালজিয়ায় সুড়সুড়ি দেওয়া ছাড়া, ওই দৃশ্যের আর যে কী সার্থকতা তা ছটি পর্বের আগাপাশতলা দেখেও বোঝা গেল না। পরিচালকের কেন যে মনে হল বাংলা ছবির প্রবাদপ্রতিম পরিচালকদের একালের লোকেদের মত গোয়েন্দা গল্প নিয়ে ছবি করার উৎসাহ ছিল – তাও বোঝা শক্ত। ইতিহাস তো বলছে সত্যজিৎ চিড়িয়াখানা ছবিটিও বানিয়েছিলেন তাঁর ইউনিটের দীর্ঘকালীন সহকর্মীরা বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন বলে। এমনকি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বলতে শুনেছি, জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯) ছবিটিও সত্যজিৎ করেছিলেন বিশেষ প্রয়োজনে। একমাত্র সোনার কেল্লা (১৯৭৪)-ই ভালবেসে তৈরি করা। ইতিহাসের কথা আর না বাড়ানোই ভাল, কারণ ওটি কোনোকালেই সৃজিতের জোরের জায়গা নয়। অনতি অতীতে দার্জিলিং দেখাতে গিয়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ভুল পতাকা দেখিয়ে ফেলেছিলেন, আটের দশকের কলকাতা বিমানবন্দরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়ার পোস্টার দেখিয়েছিলেন। গুমনামী নামের আস্ত ছবিটিই তো অনুজ ধর নামক এক ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিককে ঐতিহাসিক বানিয়ে করা। পরে সত্যিকারের ঐতিহাসিক সুগত বসুর মুখোমুখি হয়ে ছবির ইতিহাসের দিকটি সম্পর্কে উত্তর দিতে গিয়ে সৃজিত বিস্তর খাবি খেয়েছিলেন। অতএব এই ওয়েব সিরিজের অন্য দিকগুলি নিয়ে কথা বলা যাক।
সত্যতা থাকুক আর না থাকুক, তেলেভাজার দোকান সম্পর্কে একটি কথা খুব চালু। দোকানিরা নাকি একই তেলে দিনের পর দিন চপ, বেগুনি ইত্যাদি বানিয়ে যায়। সৃজিতের বরাবরের মুনশিয়ানা এই কাজটিতে। তিনি বিদেশি ছবির, জনপ্রিয় পুরনো বাংলা ছবির, অধুনা নিজের ছবিরও রিমেক, সিকুয়েল, প্রিকুয়েল ইত্যাদি বানাতে ওস্তাদ। তিনি পুরনো তেলেই ঈষৎ পরিবর্তিত রন্ধন প্রণালীতে তেলেভাজা বানান মাত্র কয়েক মাসে আর দর্শক তা লাইন দিয়ে খায় – এই হল তাঁর সাফল্যের ইতিহাস। তা দুর্গ রহস্যে কী কী পরিবর্তন এল? প্রথমত, সত্যবতীকে দিয়ে বেশকিছু নারীবাদী সংলাপ বলানো হল। অগাস্ট মাসে মুক্তি পাওয়া বিরসা দাশগুপ্তের ব্যোমকেশ ও দুর্গরহস্য ছবির মতই এখানেও সত্যবতী শরদিন্দুর অভিপ্রায় অনুযায়ী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দাদা সুকুমারের জিম্মায় না থেকে, ব্যোমকেশ আর অজিতের সঙ্গে রহস্যের অকুস্থলে গেছে। শুধু তাই নয়, বিরসা গর্ভবতী সত্যবতীকে দুর্গে পাঠিয়েছিলেন একেবারে শেষে। সৃজিতের সত্যবতী আরও তেজিয়ান, তার ব্যোমকেশের প্রতি প্রেম আরও প্রবল। তাই সে গর্ভাবস্থাতেও দুর্গে পৌঁছে যায়। বিরসা একটি অহেতুক রবীন্দ্রসঙ্গীত ঢুকিয়েছিলেন ব্যোমকেশ-সত্যবতীর প্রেম বোঝাতে, সৃজিত সঙ্গীতের সঙ্গে লাজুক যৌনতাও এনেছেন। স্বদেশ মিশ্র রচিত, তমালিকা গোলদার সুরারোপিত গানের মধ্যে দিয়ে সেসব এমনি এমনি এসেছে। সবই ঠিক ছিল, কেবল প্রসববেদনা ওঠার পরে নারীবাদী সত্যবতী কেন দুম করে সেকালের রাজপুত মহিলাদের মত “আগে ধর্ম, তারপর সহধর্মিণী। আগে সত্য, তারপর সত্যবতী” বাণী দিয়ে দিল তা দুর্বোধ্য। এই ওয়েব সিরিজের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা সৃজিত একজন পুরুষ। ফলত প্রসববেদনা অনুভব করা তাঁর পক্ষে যে সম্ভব নয় তা জানা কথা। কিন্তু সংবেদনশীলতা বলে একটি জিনিস আছে, যা যে কোনো মাধ্যমের শিল্পী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। সেটুকু থাকলেই বোঝা যায়, গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে যখন ব্যথার চোটে ঘাম দিচ্ছে, তখন একজন গর্ভবতীর পক্ষে দার্শনিক হয়ে ওঠা অসম্ভব। তবে রদ্দি হিন্দি ছবির নায়ক-নায়িকাদের বেদনা সহ্য করার ক্ষমতা অন্য স্তরের। সেই কবে আমরা অমিতাভ বচ্চনকে দেখেছি, অমৃতা সিং অনবরত চাবুক মেরে যাচ্ছেন, ক্ষতে নুন ছড়িয়ে মারছেন, তবুও অমিতাভ অনড়। অমৃতা রাগে গরগর করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল? ব্যথা লাগছে না? অমিতাভ উত্তর দিলেন “মর্দ কো দর্দ নহি হোতা।” সৃজিত যদি সত্যবতীর চরিত্রটি সেই আদর্শে লিখে থাকেন, তাহলে অবশ্য কিছু বলার নেই। তবে কিনা ওইরকম অতিনাটকীয় সংলাপ হিন্দি ছবিতেও লেখা হয় না আজ বিশ বছর।
হিন্দি ওয়েব সিরিজে আজকাল নায়িকা হয় মারকুটে পুলিস অফিসার (দহাড় সিরিজে সোনাক্ষী সিনহা)। সে বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু প্রেমিকের সঙ্গে নিয়মিত যৌনতা নিয়ে অপরাধবোধ নেই। গর্ভসঞ্চার আটকাতে গর্ভনিরোধক পিল খেয়ে নেয়। প্রেমিক অন্য শহরে চলে গেলে সেই সম্পর্ক যে রাখা সম্ভব হবে না তা মুখোমুখি বলে দিতেও সংকোচ বোধ করে না। মেয়ে গোয়েন্দা (চার্লি চোপড়া অ্যান্ড দ্য মিস্ট্রি অফ সোলাং ভ্যালি ওয়েব সিরিজে ওয়ামিকা গাব্বি) প্রেমিকের সঙ্গে যৌনতার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে দেয়, অপমানে কান্নাকাটি করে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই ফের সেই খুনের তদন্তে নেমে পড়ে, যাতে প্রেমিকটি বিনা দোষে অভিযুক্ত। কারণ কেসের নিষ্পত্তি না করে সে ছাড়বে না। এইসব করতে এই চরিত্রগুলিকে নারীবাদী বুলি আওড়াতে হয় না। তবে পুরনো তেলে চপ ভেজে গেলে অমন চরিত্র তৈরি করা সম্ভব হয় না।
শরদিন্দুর কাহিনিতে আরও একটি স্বকীয় মোচড় একেবারে শেষে দিয়েছেন সৃজিত, তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে। শুধু এটুকু বলা যাক, যে ও জিনিসও একমাত্র রদ্দি বলিউডি ছবিতেই সম্ভব। বিরসা আর সৃজিত – দুজনের কেউই নিজস্ব মোচড় দিয়ে শরদিন্দুর চেয়ে উন্নত ক্লাইম্যাক্স তৈরি করতে পারেননি। কেবল পরিবর্তনের স্বার্থে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। শরদিন্দুর খলনায়কদের যে মেধা, যে কুটিলতা থাকে, সৃজিতের খলনায়কে তাও ফোটেনি। চিত্রনাট্যে সে সুযোগই রাখা হয়নি। এত দ্রুত ভাজতে হলে হয়ত তেলেভাজার স্বাদে অত সূক্ষ্মতা আনাও যায় না। মা দুর্গার মত দশখানা হাত না থাকা সত্ত্বেও এক পুজোয় সৃজিত দুখানা ছবি বাজারে নামিয়ে দিলেন (বড় পর্দায় দশম অবতার, ওটিটিতে আলোচ্য ওয়েব সিরিজটি) – এতেই বোধহয় আমাদের কৃতার্থ থাকা উচিত। মণিলাল চরিত্রের অভিনেতা দেবরাজ ভট্টাচার্যের বেশভূষা অবিকল বল্লভপুরের রূপকথা ছবিতে তাঁর চরিত্রটির মত হয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া উচিত। ব্যস্ত পরিচালক সবেতে বদল ঘটানোর সময় পাবেন কখন? দেবরাজকে যেভাবে মেগা সিরিয়ালের গৃহবধূদের মত সকালে, বিকেলে, মাঝরাতে ফুলহাতা শার্ট আর গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাও নিশ্চয়ই পরিচালকের ব্যস্ততার পরিণাম।
বল্লভপুরের রূপকথা ছবিতে সঞ্জীবের চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্যদুর্গ রহস্য ওয়েব সিরিজে মণিলালের চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্য
প্রথম পর্বে ব্যোমকেশকে সত্যজিতের চশমা পরানো নিয়ে অজিত যেখানে চটে ওঠে, সেখানে মূল কাহিনিতে পরিবর্তন আনার সপক্ষে ব্যোমকেশকে দিয়ে সৃজিত এমন সংলাপ বলিয়েছেন যাতে বোঝা যায়, তিনি ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ দেখেন এবং বোঝেন। যে দর্শকরা দেখে না তাদের শিক্ষিত করার প্রয়াস ধরা পড়েছে ওই সংলাপে। পরিচালকের এই আত্মরতি মেনে নেওয়া যেত যদি তিনি মাস্টারপিস না হলেও, অন্তত যত্নে নির্মিত একটি সিরিজ উপহার দিতেন। এত অযত্নে নির্মিত শিল্পকর্মের স্রষ্টার এহেন রেলা হজম করা শক্ত। বস্তুত, কাহিনির পরিবর্তনগুলি কাহিনিতে নতুন মাত্রা যোগ করলে দর্শকদেরও বেমানান মনে হয় না, পরিচালককেও তার পিছনে যুক্তি তৈরি করে ছবির মধ্যে ঢোকাতে হয় না। হইচই প্ল্যাটফর্মের জন্যই এর আগে সৃজন নির্দেশক (creative director) অনির্বাণ আর পরিচালক সুদীপ্ত রায় ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল বানিয়েছেন। সেখানে কাহিনির অনেক বেশি পরিবর্তন করা হয়েছিল। সৃজিতের সিরিজে ব্যোমকেশের কেবল চশমা নেই, সেখানে ছিল আরও বড় পরিবর্তন। ব্যোমকেশ চিরাচরিত ধুতি পাঞ্জাবির বদলে আগাগোড়া শার্ট, প্যান্ট পরেছিল। কেবল একেবারে শেষে ভোটদানের সময়ে তাকে ধুতি পাঞ্জাবি পরে দেখা যায়। এসবের যুক্তি দেওয়ার জন্যে আলাদা দৃশ্যনির্মাণের প্রয়োজন হয়নি, একটিও সংলাপ খরচ হয়নি। ওয়ার্ল্ড সিনেমায় পণ্ডিত সৃজিতবাবু এইটুকু আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারলেন না কেন কে জানে। বেদেদের দিয়ে মঙ্গলকাব্য উচ্চারণ করানোর কাজটা তো বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই করেছেন।
এত গোলমাল এবং মন্থর চিত্রনাট্য সত্ত্বেও সিরিজটি যে একটিবার দেখা যায় তার কারণ অভিনেতারা। বংশীধর, মুরলীধর, হরিপ্রিয়া, গদাধর, তুলসীর মত চরিত্রগুলির পর্দায় উপস্থিতি সামান্য। অন্য সব অভিনেতাই নিজের সামর্থ্যের সদ্ব্যবহার করেছেন।
বিরসার ব্যোমকেশরূপী দেব গোয়েন্দাগিরি কম করেছিলেন, সুপার হিরোগিরি বেশি। সৃজিতের ব্যোমকেশরূপী অনির্বাণকে একাধারে উত্তমকুমার, প্রেমিক স্বামী, গোয়েন্দা, সাপুড়ে – সবই হতে হয়েছে। অথচ সে চিড়িয়াখানা দেখে বেরিয়ে বেশ রং নিয়ে বলেছিল, উত্তমকুমারের মত সাপ ধরতে যাবে না। কারণ “আমি সাপুড়ে নই”। সেকথা কি পরিচালক সাপ ধরার দৃশ্য রচনা করার সময়ে ভুলে গিয়েছিলেন? নাকি বিরসার ব্যোমকেশ সাপ ধরেছে বলে সৃজিতের ব্যোমকেশকেও সাপ ধরতেই হত?। যা-ই হোক, এত ভার বইতে হওয়ায় অনির্বাণকে কখনো কখনো ক্লান্ত দেখিয়েছে। গোয়েন্দা হিসাবে নয়, বেশি বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেই। সোহিনী সরকারের সঙ্গে তাঁর চোখের ভাষা যতখানি মিলেছে তা আগের কোনো সিজনে রিধিমা ঘোষের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে প্রেম করার দৃশ্যগুলোতেও মেলেনি।
এর কৃতিত্ব অবশ্য অনেকখানি সোহিনীরও। সেকেলে বউদের অতিপরিচিত সুরে কথা বলাই হোক আর উঁচু হয়ে থাকা পেট নিয়ে অস্বস্তি সামলে হাঁটাচলা করার অভিনয়ই হোক – কে বলবে তিনি সত্যি সত্যি সত্যবতী নন? গর্ভবতীর অভিনয় মানে যে কেবল পা ফাঁক করে হাঁটা নয়, তা যাঁদের প্রয়োজন তাঁরা এই অভিনয় দেখে শিখতে পারেন। কেবল অনির্বাণের সঙ্গে নয়, অজিতরূপী রাহুলের সঙ্গেও সোহিনী চমৎকার রসায়ন তৈরি করেছেন। চটে যাওয়া দেওরকে “ও-ও ঠাকুরপো” বলে ডেকে মান ভাঙানো দেখলে অনেক দর্শকেরই প্রয়াত জেঠিমা, মাসিমা, ঠাকুমা, দিদিমাদের মনে পড়বে।
প্রথমবার অজিতের চরিত্রে অভিনয় করা রাহুল একটি জিনিস ঘটিয়েছেন যা অতীতের কোনো অজিতরূপী অভিনেতাই সম্ভবত পারেননি। তিনি ব্যোমকেশ আর সত্যবতী, দুজনের সঙ্গেই দারুণ রসায়ন তৈরি করেছেন। ফলে স্রেফ ব্যোমকেশের উপগ্রহ হয়ে থাকেননি, সত্যিই শরদিন্দুর বর্ণনামাফিক বক্সী পরিবারের একজন অপরিহার্য সদস্য হয়ে উঠেছেন। ব্যোমকেশকে বাদ দিলেও অজিতের সঙ্গে যে সত্যবতীর একটি মিষ্টিমধুর সম্পর্ক আছে – এই একান্ত বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন রাহুল। উস্কোখুস্কো চুল, কখনো কখনো দিশেহারা ভাব সত্ত্বেও তিনি একবারের জন্যও কমিক রিলিফে পরিণত হন না। এর কৃতিত্ব পরিচালককেও দিতে হবে। কারণ ইদানীং ফেলুদার ছবিতে লালমোহনবাবুকে আর ব্যোমকেশের ছবিতে অজিতকে ভাঁড়ে পরিণত করা প্রায় সব পরিচালকেরই বদভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিনেতারাও ভাঁড়ের অভিনয়েই উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন। এই সিরিজটি ব্যতিক্রম। এর কৃতিত্ব অবশ্যই চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সৃজিতেরও।
এই পরিমিতিবোধ সার্বিক হলে সৃজিত কিছু অতি বুদ্ধিমান সংলাপের সাহায্যে ব্যোমকেশকে বামপন্থী প্রতিপন্ন করার হাস্যকর চেষ্টাটি করতেন না। শেষে ব্যোমকেশ-সত্যবতীর সন্তানের জন্মকে নকশালদের থানা দখলের সঙ্গে এক করে দিয়ে বিপ্লবের প্রতীকী সাফল্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও করতেন না। ঘটনা হল, নকশালবাড়ি আন্দোলন বিপ্লব আনতে পারেনি। পারেনি বলেই হয়ত যত দিন যাচ্ছে নস্ট্যালজিয়া হিসাবে তার দাম বাঙালি ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের মধ্যে ক্রমশ বাড়ছে। সৃজিত পুরনো তেলে ব্যোমকেশভাজা বানাতে গিয়ে রন্ধনে এই মশলাটি যোগ করেছেন।
প্রযোজক দেব আর পরিচালক বিরসার তেলেভাজার মশলাটি ছিল হিন্দুত্ববাদ, প্রযোজক শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস আর পরিচালক সৃজিতেরটি আধসেদ্ধ মার্কসবাদ। বেচারা ব্যোমকেশ।
কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস।
১৯৮৭ সালে যখন প্রথমবার এদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয় তখন দুনিয়াটাই অন্যরকম ছিল। তাই সেকথা থাক, বরং ১৯৯৬ সালের কথা ভাবা যাক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলা আর আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে যে টাকার হিমালয়ে চড়েছে তা টেথিস সাগরের মত উঁচু হতে শুরু করেছিল ওই সময় থেকেই। প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের ক্রিকেটপাগল জনতার বাজার কত লোভনীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সেই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার দিয়ে এত টাকা কামাতে পারে ভারতীয় বোর্ড, যে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করা যাবে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার চোখরাঙানি সহ্য করার বদলে তাদেরই চোখ রাঙানো যাবে। তবে ডালমিয়া ছিলেন খাঁটি ব্যবসায়ী। কামানোর জন্য খরচ করতে তাঁর আপত্তি ছিল না। বিশেষত টাকা যখন বোর্ডের, নিজের পকেটের নয়। ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে হওয়া সেবারের বিশ্বকাপে জাঁকজমকের খামতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ থেকে বিস্তর আয় হয়েছিল এবং তার অনেকটা ডালমিয়া পকেটে পুরেছেন – এমন অভিযোগ পরে উঠেছিল। সেসব মামলা মোকদ্দমার জেরেই একসময় তাঁকে বোর্ডছাড়া হতে হয়, পরে আবার ফিরেও আসেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন যে জবরদস্ত হয়েছিল তা কেউ অস্বীকার করে না। ইডেন উদ্যানে বহু অর্থ খরচ করে বিরাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, গঙ্গার হাওয়া এসে অদৃষ্টপূর্ব লেজার শোকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল। ভারত সেমিফাইনালে শোচনীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ার পরে লেখালিখি হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চটাই নাকি যত নষ্টের গোড়া। ওটা তৈরি করতে গিয়েই নাকি পিচের বারোটা বেজে গিয়েছিল, ফলে সেমিফাইনালের দিন অরবিন্দ ডি সিলভা আর মুথাইয়া মুরলীধরন এক জাতের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় হওয়া বিশ্বকাপেও জাঁকজমক কম ছিল না। সেবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। তদ্দিনে ভারত হিমালয়ে উঠে পড়েছে, বোর্ডের টাকার অভাব নেই। ফলে বাকি বিশ্বকাপটাও হয়েছিল বিশ্বকাপের মত। আর এবার?
আজ গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু করবে। কিন্তু তার আগে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে না, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড খুবই মিতব্যয়ী। চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে শুধু আইপিএল শুরুর দিনে। ১৯৯৬ সালে বোর্ড সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি ডালমিয়া, এখন শিল্পপতি জয় শাহ। ও না! ভুল হল। বোর্ড সভাপতি ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রজার বিনি, জয় হলেন সচিব। আসলে বিনিকে দেখা যায় কম, শোনা যায় আরও কম। তাই খেয়াল থাকে না। মানে তাঁর অবস্থা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মত। তিনি সাংবিধানিক প্রধান বটে, সবেতেই তাঁর স্বাক্ষর লাগে বটে, কিন্তু নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তাঁকে ডাকাই হয় না। রাজদণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মোদীজি। ক্রিকেট বোর্ডের সর্বেসর্বাও এখন শাহজি, বিনিজি অন্তঃপুরবাসী। যাঁর নাম জয় আর পদবি শাহ, তিনি সর্বেসর্বা হবেন না তো হবে কে? সে যতই তিনি এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধনা একাই সোনা জিতেছেন মনে করুন না কেন।
কথা হল, জগমোহনের বিশ্বকাপ আয়োজন করা নিয়ে যা উৎসাহ ছিল, জয়ের তার অর্ধেকও দেখা যাচ্ছে না। তাই এবারের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১০০ দিন আগে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়ে যায় বছরখানেক আগে। আগামী বছর জুন মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সূচি যেমন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। কারণ বিভিন্ন দেশের মানুষকে খেলা দেখতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশে পৌঁছতে হবে। যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যত কম সময় পাওয়া যাবে খরচ বেড়ে যাবে ততই। অব্যবস্থা দেখা দেবে, যে দেশে খেলা সেই দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ওসব ভাবনা রাজা বাদশাহরা কবেই বা করলেন? তাঁরা চলেন নিজের নিয়মে, বাকি সকলকে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্বকাপ এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতা, ফলে সূচি ঘোষণা করার কথা তাদের। কিন্তু আয়োজক দেশকেই ঠিক করতে হয় সূচিটা। একথাও কারোর জানতে বাকি নেই যে ফুটবল দুনিয়াকে ফিফা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আইসিসির মুরোদ নেই তা করার। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবল এত বেশি যে আইসিসি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। অনতি অতীতে আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে (অর্থাৎ পরবর্তী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্ধারিত সূচিতে) আইপিএলের জন্য যে আরও বেশি ফাঁক রাখা হবে তা ঘোষণা করে দিয়েছেন শাহজিই, আইসিসি নয়। তা নিয়ে আইসিসি ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি। ফলে এত দেরিতে বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণার দায় আইসিসির ঘাড়ে চাপানো চলে না।
তবে অস্বাভাবিক দেরিতে সূচি ঘোষণাতেই অব্যবস্থার শেষ নয়, বরং সূচনা। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বিভিন্ন আয়োজক রাজ্য সংস্থা তাদের স্টেডিয়ামে যেদিন ম্যাচ দেওয়া হয়েছে সেদিন আয়োজন সম্ভব নয় বলছে। খোদ কলকাতাতেই যেমন কালীপুজোর দিন ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচ রাখা হয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষও বোঝেন যে সেদিন ম্যাচ আয়োজন করা অসম্ভব, কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র বোঝেন না। ক্রীড়াসূচি তৈরি করার সময়ে যে যেখানে খেলা সেখানকার আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, সম্ভবত তাও তিনি বোঝেন না। নইলে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের আয়োজকরা নিশ্চয়ই এত বোকা নন যে কালীপুজোর দিন ম্যাচ করতে রাজি হবেন? জয় শাহীর মজা হল, হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা অমিত শাহের পুত্র সর্বেসর্বা হলেও বিশ্বকাপের সূচি বানানোর সময়ে বোর্ডের খেয়ালই ছিল না যে ১৫ অক্টোবর নবরাত্রি উৎসবের সূচনা, সেদিন আমেদাবাদ শহরে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ করা সম্ভব নয়। এহেন প্রশাসনিক নৈপুণ্যের কারণে অনেক দেরিতে সূচি ঘোষণা করার পরেও সব মিলিয়ে গোটা দশেক ম্যাচের দিনক্ষণ বদল করতে হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি নিয়ে যা চলছে তা প্রাক-২০১৪ ভারতে সম্ভবত তদন্তযোগ্য কেলেঙ্কারি বলে গণ্য হত এবং সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলে দিনরাত এ নিয়েই তর্কাতর্কি চলত। একে তো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, তার উপর বিশ্বকাপের টিকিট অনলাইনে কিনতে গিয়ে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। ঘন্টা চারেক ‘কিউ’-তে পড়ে থেকেও টিকিট পাননি অনেকে। আইসিসি এখন পর্যন্ত বলেনি কত টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল আর কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির দায়িত্বে থাকা বুকমাইশো সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, তাদের হাতে নাকি সীমিত সংখ্যক টিকিটই আছে। এত টিকিট গেল কোথায়? এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যত লেখালিখি হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে তত হয়নি। ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে তবু খানিকটা হয়েছে, বাংলার কথা না বলাই ভাল। একদিকে টিকিটের আকাল, অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আজকে উদ্বোধনী ম্যাচে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নাকি ৪০,০০০ মহিলাকে দর্শক হিসাবে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে গুজরাট বিজেপি। আমেদাবাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হোয়াটস্যাপে আমন্ত্রণ পাঠিয়ে নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে গেলে বিজেপির সদস্য বা সমর্থক হতে হবে? সেকথা যদি ঠিক না-ও হয়, এই বিশ্বকাপে হক যে অন্য সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটের বেশি, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। ভারতে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা বা চেন্নাইয়ের চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মত ঐতিহ্যশালী মাঠের যে সৌভাগ্য হয়নি সেই সৌভাগ্যই এবার হয়েছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ওখানে, ফাইনাল ওখানে, আবার ক্রিকেটবিশ্বের সকলের চোখ থাকে যে ম্যাচের দিকে – সেই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচও ওই মাঠেই।
কেন ঘটছে এসব? জলের মত সরল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা, সম্প্রতি দ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম Shah’s playground: BJP’s Control of Cricket in India। সেই প্রতিবেদনে বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, অমিতপুত্র বোর্ড চালান একেবারেই একনায়কত্বের ঢঙে। মিনমিনে বিনির সময় থেকে নয়, সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই। অনেকসময় তিনি বোর্ডের অন্যদের সৌরভের ফোন ধরতে বারণ করতেন। যদি সৌরভ বলতেন অমুক ম্যাচটা ওইদিন হতে হবে, অবধারিতভাবে অন্য কোনোদিন ধার্য করা হত। জয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের সভাপতি পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া সৌরভ এসব মেনে নিয়েই পদ আঁকড়ে পড়েছিলেন। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিশ্বকাপ আয়োজনে এত ডামাডোল। যাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি যদি একনায়কের কায়দায় এত বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাহলে এর চেয়ে উন্নত আর কী হওয়া সম্ভব?
যোগ্যতার অভাবের পাশাপাশি সদিচ্ছার অভাবটাও অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালে একদিনের ক্রিকেটের রমরমা ছিল, এখন বিশ্বজুড়েই ৫০ ওভারের খেলা অবাঞ্ছিত। ১৯৭০-এর দশকে একদিনের ক্রিকেটের দরকার হয়েছিল টেস্টের একঘেয়েমি কাটিয়ে মাঠে দর্শক ফেরাতে। সেই চেষ্টা সফল হয়। পরে খেলায় আরও বিনোদন আনতে কেরি প্যাকার চালু করেন রঙিন জামা, সাদা বলে দিনরাতের একদিনের ম্যাচ। প্রথম দিকে তিনি বিদ্রোহী তকমা পেলেও শেষপর্যন্ত কর্তারা বোঝেন এতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। প্যাকারের ক্রিকেটই হয়ে দাঁড়ায় মান্য একদিনের ক্রিকেট। এখন আর সে দিন নেই। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা তাকে যথেচ্ছ বাড়তেও দিচ্ছেন, কারণ ওতেই পকেট ভরে যাচ্ছে। যদি একদিনের ক্রিকেটের প্রতি মমতা থাকত, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোতে লাগাম দিতেন। টি টোয়েন্টির মত একদিনের ক্রিকেটেও দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা চালু করে, মাঠের সীমানা দৃষ্টিকটুভাবে ছোট করে এনে, ইনিংসের সবকটা ওভারকেই ফিল্ডিং সাজানোর নানাবিধ নিষেধের আওতায় নিয়ে এসে ব্যাট-বলের লড়াইকে দুদলের ব্যাটারদের চার, ছয় মারার প্রতিযোগিতায় পরিণত করতেন না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কথায় কথায় সাড়ে তিনশো-চারশো রান হচ্ছে, দ্বিশতরান হচ্ছে মুহুর্মুহু। পুরুষদের একদিনের ক্রিকেটে ২০১০ সালে শচীন তেন্ডুলকার প্রথম দ্বিশতরান করার পর থেকে গত ১৩ বছরে আরও নখানা দ্বিশতরান হয়ে গেছে, একা রোহিত শর্মার ঝুলিতেই তিনখানা। অথচ একদিনের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। ঘন্টা তিনেক লাগাতার চার-ছক্কা দেখতে ভাল লাগে, ছ-সাত ঘন্টা ধরে ও জিনিস দেখা সাধারণত ক্লান্তিকর। শেষের দিকের ওভারগুলোতে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া বোলারদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। স্পিনারদেরও চকচকে নতুন বলে চার, ছয় না খাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ওয়াসিম আক্রাম, শেন ওয়ার্নরা এখন খেললে কোনো তফাত গড়ে দিতে পারতেন কিনা বলা মুশকিল।
খেলোয়াড়রাও ইদানীং ৫০ ওভারের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা রোজগার করা যাচ্ছে কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে। ফলে ওটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেট আর ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলে শরীরেও আর এত তাগদ থাকছে না যে একদিনের ক্রিকেট খেলবেন। গত বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার বেন স্টোকস তো গতবছর একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকর্তারা অনেক বলে কয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলতে রাজি করিয়েছেন। বিশ্বকাপের পর কী হবে কেউ জানে না। নিউজিল্যান্ডের সেরা বোলার ট্রেন্ট বোল্টও নিজের দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ কমে গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতের সাদা বলের অধিনায়ক রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিও সাম্প্রতিককালে একদিনের ম্যাচের সিরিজে একটা ম্যাচ খেলেন তো দুটো ম্যাচে বিশ্রাম নেন। বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটো সিরিজ ছিল এশিয়া কাপ আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। তারও সব ম্যাচ খেললেন না।
কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস। ইএসপিএন ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটকে তিনি বলেছেন, একদিনের ক্রিকেট আগামীদিনে বিশ্বকাপের বাইরে আর হওয়ার মানে হয় না। এমসিসি এখন আর ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা নয়, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে এখনো তাদের মতামতের বিস্তর গুরুত্ব আছে আর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডগুলোই জয় শাহের বোর্ডের পরে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বস্তুত তারা ভারতীয় বোর্ডের নন্দী, ভৃঙ্গী। অনেকের ধারণা ভারতই ৫০ ওভারের খেলাটাকে ধরে রেখেছে এবং এবারের বিশ্বকাপটা জমজমাট হলে খেলাটা বেঁচে যাবে। এককথায়, ভারতই পারে বাঁচাতে। পারে হয়ত, কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে যে অযত্ন প্রকট তাতে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না। আগামী কয়েক মরসুমে আইপিএলকে আরও লম্বা করার যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে সেটাও একদিনের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার লক্ষণ নয়। অতএব ২০২৭ সালে আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে সম্ভবত কোনো খেলার বিশ্বকাপ শুরু হয়নি এর আগে।
এতগুলো রাজ্যের ভোট নিয়ে যেরকম হইচই হওয়ার কথা, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদী নিজে প্রচারে নামলে যেরকম হয়ে এসেছে ২০১৪ সাল থেকে – তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।
আজ আমরা ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে বেড টি খাওয়ার আগেই নিউজক্লিক ওয়েবসাইটের সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ; ওই সাইটের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক অভিসার শর্মা, অনিন্দ্য চক্রবর্তী, অরিত্রী, ভাষা সিং, উর্মিলেশ; ইতিহাসবিদ সোহেল হাশমি, দিল্লি সাইন্স ফোরামের সঙ্গে যুক্ত ডি রঘুনন্দন, ঋজু বিদুষক সঞ্জয় রাজৌরার বাড়িতে হানা দেয় দিল্লি পুলিস। তাঁদের ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করা হয় ১৭ অগাস্ট দায়ের করা একটি কেসের ‘তদন্তের স্বার্থে’। যে যে আইনে এই কেস করা হয়েছে তার মধ্যে কুখ্যাত ইউএপিএ-ও রয়েছে। যখন এই লেখা লিখছি, তখন জানা যাচ্ছে স্বাধীন সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা এবং মুম্বাইয়ের বাসিন্দা সমাজকর্মী তিস্তা শেতলবাদের বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়েছে। তিস্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, রঘুনন্দন আর সঞ্জয়কে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন অব্দি অবশ্য কোনো গ্রেফতারির খবর নেই। শুধু সাংবাদিক, সমাজকর্মী, বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ নয়; নিউজক্লিক ওয়েবসাইটের সাধারণ কর্মীদের বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়েছে। নিয়ে নেওয়া হয়েছে তাঁদের ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদিও। সেই সূত্রেই সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির নামে বরাদ্দ একটি বাড়িতেও হানা দেওয়া হয়। সেখানে সপরিবারে থাকেন সিপিএমের কৃষক সংগঠনের কিছু কর্মী। তাঁদের পরিবারে নিউজক্লিকের একজন কর্মচারী আছেন।
নিউজক্লিক সংবাদ সংগঠনের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান এই প্রথম নয়। গত কয়েক বছর ধরে বারবার ইডি তাদের দফতরে হানা দিয়েছে, ঘন্টার পর ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সম্পাদকমশাইকে, সর্বস্ব ঘেঁটে দেখা হয়েছে, এ অ্যাকাউন্ট সে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। আপত্তিকর, বেআইনি কিছুই পাওয়া যায়নি। এবারের হানা নিউইয়র্ক টাইমস কাগজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে, যাতে অভিযোগ করা হয়েছিল নিউজক্লিক নাকি চীনের হয়ে প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে টাকা পেয়েছে। এখন পর্যন্ত তার বিন্দুমাত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া হয় অভিযোগটা সত্যি, তাহলেও নিউজক্লিক সাইটে বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন যাঁরা, সেখানকার কর্মচারী যাঁরা, তাঁদের বাড়িতে হানা দেওয়া এবং যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করার একটাই যুক্তি হতে পারে – ভয় দেখানো, চুপ করানো।
চুপ করানোর দরকার যে পড়েছে তাতে সন্দেহ নেই। সামনে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। বিজেপি নেতারা যথারীতি পুরোদমে প্রচার করছেন। কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও তাঁর দলকে ভোট দেওয়ার জন্যে নিজের সরকারের একটা কাজ তুলে ধরতে পারছেন না। ২০১৪ সাল থেকে বাজিয়ে আসা বস্তাপচা সিডিগুলোই বাজিয়ে চলেছেন। মানুষের কানে যে সেগুলো একঘেয়ে লাগছে তা যে বুঝছেন না তাও নয়। কারণ গোদি মিডিয়াও বুক ঠুকে বলতে পারছে না বিজেপি বা তার জোট তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, মিজোরামের মধ্যে অন্তত তিনটে রাজ্যে জিতবেই। উলটে শোনা যাচ্ছে মণিপুরের প্রভাবে মিজোরামে বিজেপি অচ্ছুত হয়ে গেছে। সঙ্গী দল ক্ষমতাসীন মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ) ইতিমধ্যেই একতরফা ৪০ আসনের মধ্যে ৩৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে। সম্প্রতি লোকসভায় বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবে এমএনএফের একমাত্র সাংসদ সি লালরোসাঙ্গা সরকারের বিরুদ্ধে ভোটও দেন মণিপুরে বিজেপির ভূমিকার প্রতিবাদে।
এদিকে চাণক্য সংস্থার সার্ভে চলছে তেলেঙ্গানায়। তাদের কর্মী পার্থ দাস এলাকা ঘুরে ঘুরে টুইট করছেন। তাঁর মতে ওই রাজ্যে বিজেপি এক অঙ্কের আসন পাবে, সম্ভবত কংগ্রেস সরকার হবে। ছত্তিসগড়ে কংগ্রেস হারবে, এমন দাবি অতি বড় বিজেপি সমর্থককেও করতে দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রদেশে নেতাদের বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রায় রোজ, মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের যে দাপট প্রচার পর্বে দেখতে পাওয়ার কথা, তাও দেখা যাচ্ছে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যাওয়া জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকেও মিইয়ে যাওয়া থিন অ্যারারুট বিস্কুটের মত দেখাচ্ছে। ওদিকে রাজস্থানে অশোক গেহলত আর শচীন পাইলটের মধ্যে ঝগড়া হয় না অনেকদিন। কর্ণাটকে পর্যুদস্ত হওয়া বিজেপি ইউনিটের মত রাজস্থানেও বিজেপির কোনো অবিসংবাদী নেতা নেই যাঁকে গেহলত বা পাইলটের প্রতিস্পর্ধী বলে ভাবা চলে। শোনা যাচ্ছে এমতাবস্থায় গোদি মিডিয়াকে এই নির্বাচনগুলোর খবর নিয়ে মাতামাতি করতে বারণ করা হয়েছে। এই গুজব সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, কারণ এতগুলো রাজ্যের ভোট নিয়ে যেরকম হইচই হওয়ার কথা, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদী নিজে প্রচারে নামলে যেরকম হয়ে এসেছে ২০১৪ সাল থেকে – তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। মোদীজির সভা লাইভ দেখানো চলছে, কিন্তু বিজেপি জিতবেই, কংগ্রেস জিতলে তা হবে পাকিস্তানের জয় – এই জাতীয় ঘোষণা করে দিনরাত চিৎকৃত সাংবাদিকতা কোথায়? মণিপুরে তো বিজেপি ল্যাজেগোবরে বললেও কম বলা হয়, কারণ অবস্থা এতই সঙ্গিন যে উন্মত্ত জনতা মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের বাড়ি আক্রমণ করছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজ্য পুলিসের চুলোচুলি বেধে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিহারের জেডিইউ-আরজেডি-বাম-কংগ্রেস সরকার প্রকাশ করে দিল জাতিভিত্তিক জনগণনার ফল। অর্থাৎ একা রামে রামভক্তদের রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। হিন্দি বলয়ের রাজ্য মধ্যপ্রদেশ আর রাজস্থানে নির্বাচন। ওই রাজ্যগুলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দিক থেকে বিহারের কাছাকাছি। হিন্দুদের মধ্যে ভেদাভেদ নেই, উঁচু নিচু সব হিন্দুরই অভিন্ন শত্রু মুসলমান – এই রাজনীতির সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে এই ফল। যে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের বিজেপি গত দশকের শুরু থেকে দলে টানতে পেরেছিল ত্রাতা হওয়ার ভান করে, তারা এবার নিজেদের সঠিক সংখ্যা জেনে গেল। তার চেয়ে অনেক কম সংরক্ষণ যে তারা পায় সেকথাও প্রকাশ পেয়ে গেল। এই গণনাকে স্বাগত জানালে আরও বেশি সংরক্ষণের দাবি উঠতে পারে, সে দাবি মেটাতে গেলে বিজেপি-আরএসএসের আদর্শগত কর্তৃত্ব যাদের হাতে সেই উচ্চবর্গীয়রা চটবে। আবার এর কড়া নিন্দা করলে নিম্নবর্গীয়দের ভোটের মায়া ত্যাগ করতে হবে। তাদের ভোট না পেলে আজ আরএসএস হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারত না। ২০২৪ জিততে গেলেও তাদের ভোট ছাড়া চলবে না। জাতপাতের সমীকরণ বদলে যাওয়া বিজেপির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল উত্তরপ্রদেশেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মোদী-শাহের মাথায় হাত পড়েছে গতকাল। প্রধানমন্ত্রী ভোটের প্রচারে বেরিয়ে কিছু আবোল তাবোল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিরোধীরা আগেও জাতপাতের ভিত্তিতে দেশকে ভাগ করেছে, আবার সেই ব্যবস্থাই করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ও কথায় উচ্চবর্গীয়রা বেজায় খুশি হলেও নিম্নবর্গীয়দের চিড়ে ভিজবে না। তাই বিজেপি মুখপাত্ররা জনে জনে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন না। তাদের টুইটার হ্যান্ডেলও চুপচাপ। মনে কী দ্বিধা!
এমন দিনে তারে বলা যায় – ওই ওরা সব দেশদ্রোহী। চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। শতমুখে বলার জন্যে তৈরি আছে গোদি মিডিয়া। তাদের তারকা সাংবাদিকদের কদিন আগেই বয়কট করেছে ইন্ডিয়া জোট, তাই পাণ্ডারা বাকস্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে বলে চিৎকার চেঁচামেচি করেছে। অথচ দেশদ্রোহের অভিযোগ তুলে দিলেই তারা বাকস্বাধীনতার পাঠ ভুলে অন্য সাংবাদিকদের উপর এই রাষ্ট্রীয় আক্রমণের পক্ষে দাঁড়াবে, সারা দেশের সাধারণ মানুষকে গলাবাজি করে বোঝাবে – ভারতের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। মোদীজিই একমাত্র এদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে পারেন। মানুষ যদি এ কথায় আরও একবার বিশ্বাস করে তাহলে ভোট বৈতরণী পার হওয়া সহজ হয়।
ফলে যত দিন যাবে, লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে তত আক্রমণ বাড়বে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের উপর। এনডিটিভিকে গৌতম আদানির হাত দিয়ে কিনে নেওয়া গেছে। কিন্তু নিউজক্লিক শেয়ার বাজারে নেই, কর্পোরেট অর্থে চলে না। তাই তাকে কিনে নেওয়া যাচ্ছে না। যে সংবাদমাধ্যমকে কেনা যায় না তার চেয়ে বিপজ্জনক আর কী আছে সরকারের পক্ষে? অতএব তাকে গলা টিপেই চুপ করাতে হবে। উপরি পাওনা ভোটারদের দেশদ্রোহী জুজু দেখিয়ে ভোট আদায়।
এমনিতে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ এ দেশে এই প্রথম হল এমন নয়। একা বিজেপি সরকার এমন আক্রমণ করে তাও নয়। কিন্তু মনে রাখা ভাল, জরুরি অবস্থার সময়েও স্রেফ কোনো সংবাদমাধ্যমে লেখালিখি করেন বলে কাউকে আক্রমণ করার ঘটনা বিরল। সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সমাজকর্মী, ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞানীদের উপর একযোগে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জরুরি অবস্থা ছাড়া অন্য সময়ে এ দেশে বিশেষ ঘটেনি। এর তুলনা নাজি জার্মানিতে বা ফ্যাসিবাদী ইতালিতে পাওয়া যেতে পারে। অবশ্যই এখনো কিছু লোক বেড়ার উপর বসে পা দোলাবে অথবা বলবে ‘নিশ্চয়ই কিছু করেছে। এমনি এমনি কি আর কারোর বাড়িতে পুলিস যায়?’ তাদের বাড়িতে পুলিস আসা কিন্তু সময়ের অপেক্ষা। বেগতিক বুঝলে আসন্ন সমস্ত নির্বাচন ভেস্তে দিতে কেবল বিরোধী রাজনীতিবিদ নয়, যে কোনো ধরনের বিরোধী স্বরকেই দেশদ্রোহে অভিযুক্ত করতে, উমর খালিদের মত বিনা বিচারে বছরের পর বছরে অন্ধকূপে ফেলে রাখতে কসুর করবে না এই সরকার। আমাদের যে কারোর বাড়িতেই সাতসকালে হাজির হতে পারে পেয়াদারা, বেড টি খাওয়ার আগেই।
সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।
সালটা ১৯৯৬। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে উদগ্রীব দেশের অকংগ্রেস, অবিজেপি দলগুলো। এই প্রস্তাবে সায় দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলছে সিপিএমের মধ্যে। সেইসময় আমাদের এলাকার সিপিএমের একেবারে নিচুতলার এক তরুণ কর্মী বলেছিলেন, ছোট থেকে শুনে আসছি আমাদের দলের নামে একটা ‘আই’ আছে। সেটার গুরুত্ব কী তা তো কোনোদিন টের পেলাম না। জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে গোটা দেশ টের পাবে। সেদিনের আড্ডায় অন্য এক কর্মী কংগ্রেসের সমর্থনে সরকারে যাওয়ার বিরোধিতা করে বলেছিলেন, আজ কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়ব, তারপর বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে কোন মুখে ভোট চাইতে যাব লোকের কাছে? শেষপর্যন্ত যিনি ‘আই’-এর প্রভাব দেখার আশা করেছিলেন তাঁকে আশাহত হতে হয়েছিল। জ্যোতিবাবু স্বয়ং সেই নিচুতলার কমরেডের চেয়ে কিছু কম নিরাশ হননি। সরকারে না যাওয়ার পার্টিগত সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েও বলেছিলেন, ঐতিহাসিক ভুল হল। জ্যোতিবাবুর জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির শরিক সেই কমরেড অতি সম্প্রতি প্রয়াত হলেন আর যিনি বিরোধিতা করেছিলেন তিনিও এখন বয়সের কারণে খানিকটা নিষ্প্রভ। ইতিমধ্যে সাতাশটা বছর কেটে গেছে, কিন্তু সিপিএমের ‘আই’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে পার্টির নিজেরই দ্বিধা এখনো কাটল না। ইন্ডিয়া জোটের ‘আই’-তে ‘আই’ মেলানো নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন তারই প্রমাণ।
সেইসময় সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে ঘোষিত যুক্তি ছিল, এমন কোনো সরকারে যাব না যে সরকার মার্কসবাদী কর্মসূচি লাগু করে উঠতে পারবে না। কিন্তু সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের বহু নেতা সরকারে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন এবং তাঁরা মনে করেন ‘কেরালা লবি’ জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। কথাটা সত্যি হোক বা না হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব নেতাও যে সরকারে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না তা সর্বজনবিদিত। এবারেও দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পক্ষপাতী নয়। ইন্ডিয়া জোটে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেস – দুই দলই থাকলেও, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং অন্যতম নেতা সুজন চক্রবর্তী বারবারই বলছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আর তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও একই কথা বলছেন, কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে এক জোটে থাকা ঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্বের দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে গেছে কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে সদস্য না রাখার সিদ্ধান্তে। যদি গোড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হত তাহলে তবু বোঝা যেত। ইন্ডিয়া জোটের সব দল ওই কমিটিতে নেই। কিন্তু যখন কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা হয়, তখন সিপিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তাদের প্রতিনিধির নাম পরে জানানো হবে। পরবর্তীকালে হঠাৎ কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত হল কেন?
সিপিএম নেতৃত্বের এই দ্বিধার সমালোচনায় অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু অনস্বীকার্য যে বিজেপিবিরোধিতা আর তৃণমূলবিরোধিতার মধ্যে একটি বেছে নেওয়া আজকের সিপিএমের পক্ষে কঠিন। তাদের বিজেপিবিরোধিতার ইতিহাসে কোনো ছেদ নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের মত তারা কখনো বিজেপির সঙ্গে জোট সরকার গড়েনি, বিজেপির মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হননি কোনো সিপিএম নেতা। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সরকারকে বিজেপি, সিপিএম দুই দলই সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সেবার নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। উপরন্তু স্বল্প সময়ে ভিপি সিংয়ের সরকার মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ লাগু করা, একজন মুসলমানকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করার মত অভূতপূর্ব কাজ করেছিল। সেই সরকারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি বাবরি মসজিদ ভেঙে উঠতে পারেনি, বাধা পেয়েই সমর্থন প্রত্যাহার করে। অর্থাৎ বিজেপির কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে দেওয়া হয়নি, উল্টে হিন্দুত্ববাদের অতি অপছন্দের গোটা দুয়েক কাজ সেই সরকার করে ফেলেছিল। স্বভাবতই সিপিএম বিজেপিবিরোধী জোটের স্বাভাবিক সদস্য।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু মানুষ যে এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন তা বুঝতে বড় নেতা হতে হয় না। ট্রেনে বাসে বাজারে দোকানে খুচরো কথাবার্তায় গরিব, বড়লোক নির্বিশেষে মানুষের সরকারকে গাল দেওয়ার এরকম উৎসাহ শেষ দেখা গিয়েছিল বামফ্রন্ট আমলের শেষ পর্বে। এই অসন্তোষের কারণ যেমন ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়া অর্থাৎ যাবতীয় নিয়োগ দুর্নীতি, তেমনই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা নিয়ে দুর্নীতি, একশো দিনের কাজ না পাওয়ার মত বিষয়ও। পরের দুটি বিষয় সরাসরি গ্রামের গরিব মানুষের গায়ে লাগে। তা না হলে মনোনয়ন পর্ব থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত পুকুর চুরির পরেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীরা এতগুলো আসনে জিততে পারত না, বাম-কংগ্রেসের ভোটও বাড়ত না। সংসদীয় রাজনীতিতে জনমতের এই স্রোতকে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বিরোধী দল অগ্রাহ্য করতে পারে না।
এমতাবস্থায় সিপিএম কী করতে পারত? ইন্ডিয়া জোটে না গিয়ে বলতে পারত আমরা নিজেদের মত করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ব। সেক্ষেত্রে তৃণমূল তো বটেই, সব রঙের সমালোচক সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলে দেগে দিত। ইন্ডিয়া জোটে থাকায় যেমন বিজেপি তৃণমূলের দালাল বলছে এবং নিজেদের সদস্য, সমর্থকরাও সন্দেহের চোখে দেখছে। কথা হল, সমালোচকরা কী বলবে তা ভেবে রাজনীতি করা দিশাহীনতার লক্ষণ। এতদিনের দিশাহীনতাই আজকের গাড্ডায় ফেলেছে সিপিএমকে। ইন্ডিয়া জোটে না গেলেই সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলার সুযোগ পাওয়া যাবে কারণ ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে সিপিএমের সক্রিয়তার অভাবে বিরোধী পরিসর দখল করতে শুরু করে বিজেপি। তৃণমূল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে গায়ের জোরে প্রহসনে পরিণত করার পর নিচের তলার হতাশ সদস্য, সমর্থকরা বিজেপির দিকে ভিড় জমান এবং ২০১৯ সালের লোকসভা আর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তার ফায়দা তোলে। সিপিএম শূন্যে পৌঁছয়। ফলে ‘পার্টি লাইন’ যা-ই হোক, সিপিএমই বিজেপিকে পুষ্ট করছে – একথা পাটিগাণিতিক সত্য হয়ে যায়। সেই বদনামের ভারে সিপিএম এখন ন্যুব্জ।
এই পরিস্থিতি তৈরিই হত না, যদি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে নেতৃত্ব বাম রাজনীতির লড়াকু বিরোধিতার ঐতিহ্য বজায় রাখতেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর অনতিবিলম্বে সারদা কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস হয়। অথচ সিপিএম একদিনের জন্যও তা নিয়ে জনজীবন অচল করে দেওয়ার মত আন্দোলন করেনি। নারদের ক্যামেরায় শাসক দলের নেতাদের নগদ টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায়। সেইসময় বিরোধী নেত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি হলে কলকাতা অচল হয়ে যেত, সূর্যকান্ত মিশ্ররা কেবল বিবৃতি দিয়ে গেছেন। গতবছর মার্চে সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পরে এবং মীনাক্ষী মুখার্জির উদ্যোগে সিপিএমের আন্দোলনে ঝাঁজ আসে। তার আগে পর্যন্ত রাস্তার চেয়ে টিভির পর্দায় এবং ফেসবুক লাইভেই বেশি দেখা যেত সিপিএম নেতাদের। সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।
এই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার মূল্য হিসাবে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও শূন্য পাওয়া তেমন বড় কিছু নয়, যদি বিরোধী হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও ফেরত আনা যায়। সিপিএম নেতৃত্বের এবং বিজেপিবিরোধী সিপিএম সমালোচকদেরও ভেবে দেখা উচিত, সিপিএম ইন্ডিয়া জোট থেকে আলাদা হয়ে লড়লেই ভাল হয় কিনা। কারণ সিপিএম তৃণমূলবিরোধিতা না করলে আখেরে বিজেপিরই লাভ, তারা আরও বেশি করে তৃণমূলবিরোধী ভোট পাবে। মনে রাখা ভাল, ধূপগুড়ি বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপি হেরেছে মাত্র হাজার চারেক ভোটে। ওই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থীর (কংগ্রেস সমর্থিত) জামানত জব্দ হলেও তিনি পেয়েছেন তেরো হাজারের বেশি ভোট। এতগুলো তৃণমূলবিরোধী ভোট কিন্তু বিজেপির ঝুলিতে যেত তৃতীয় পক্ষ না থাকলে। এভাবে ভাবতে হলে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্বকে ঠিক করতে হবে লোকসভা নির্বাচনে মূল লক্ষ্য কোনটা। জ্যোতি বসু, হরকিষেণ সিং সুরজিৎদের অন্তত সেই দ্বিধা ছিল না। তাঁরা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকাতে ১৯৯৬ পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের সংখ্যালঘু সরকারকে চলতে দিয়েছিলেন।