পুরস্কার কতখানি দামি?

রুষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী, সমর্থক এবং পেটোয়া মিডিয়া এঁদের ‘অ্যাওয়ার্ড ওয়াপসি গ্যাং’ আখ্যা দিয়েছিল। সেই গ্যাংয়ে মন্দাক্রান্তা সেন বাদে কোনো বাঙালি নাম কি ছিল?

হলিউডের কোনো শ্রীজাত আছেন কিনা জানি না, যিনি বিধ্বংসী দাবানলের পর আসন্ন অস্কার পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান সম্পর্কে এরকম কিছু লিখবেন

এর পরেও টক শো আর কথা
এর পরেও কবিতা উৎসব
এর পরেও বিশ্বাস, প্রণতি
এর পরেও ঘুম আসবে চোখে
এর পরেও বাকি আছে ক্ষতি
এর পরেও ভোট দেবে লোকে।

হে পাঠক, আপনি বলতেই পারেন, ‘এ কী অশিক্ষিত রে বাবা! হলিউড একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। তার আবার কবি থাকতে যাবে কেন? তাছাড়া শ্রীজাত কি টলিউডের লোক নাকি?’ আরও বলতে পারেন ‘কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা! শ্রীজাত কবিতাটা লিখেছিলেন একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে কিছু মানুষের প্রাণ যাওয়ার পরে। ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলে জনা পঁচিশেক মানুষের প্রাণ গেছে আর বহু মানুষের বাড়িঘর পুড়ে গেছে তো প্রকৃতির রোষে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কোন পাগলে কবিতা লেখে?’ তা সবিনয়ে কয়েকটি কথা নিবেদন করি।

কবির সঙ্গে ফিলিমের একেবারে সম্পর্ক নেই এমনটা বলা কি উচিত হবে? আমরা তো অনেকসময় সিনেমা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলে ফেলি ‘আহা! কবিতার মত’। অবশ্য সিনেমাবোদ্ধারা বলতে পারেন ওটা কতিপয় অশিক্ষিত দর্শকের কাজ, কিন্তু আব্বাস কিয়ারোস্তামির মত লোককে নিয়ে কী করা হবে তাহলে? তিনি তো সিনেমাও বানিয়েছেন আবার কবিতাও লিখেছেন। সুদূর ইরানে যাওয়ারও দরকার নেই। বাংলাতেই প্রেমেন্দ্র মিত্র আর পূর্ণেন্দু পত্রী দুটো কাজই করেছেন। স্বয়ং শ্রীজাত সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন। সিনেমার গান তো তিনি বহুকাল ধরেই লিখছেন। সুতরাং তাঁকে টলিউডের লোক বললে কি বিষ্যুদবারে আমিষ ভক্ষণের চেয়ে বেশি পাপ হবে? তবে দ্বিতীয় প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কিসের তুলনা? এর উত্তর কিঞ্চিৎ বিস্তারে দেওয়া দরকার।

হলিউডে দাবানল ছড়াল কেন? আগুন জ্বলেই চলেছে দিনের পর দিন, থামানো যাচ্ছে না কেন? হলিউড সেই কবে থেকে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে – এই নিয়ে ছবি বানিয়ে চলেছে। সেসব ছবির মধ্যে যেমন আমেরিকাকে রক্ষাকর্তা হিসাবে দেখানো ছবি তৈরি হয়েছে, তেমন সারা পৃথিবীর সর্বনাশ হবে, কেবল কিছু মানুষ আগে থেকে সতর্ক হওয়ায় বা কিছু বিশেষ সুযোগ পাওয়ায় বেঁচে যাবে – এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেও ছবি তৈরি হয়েছে। যেমন দ্য ডে আফটার টুমরো (২০০৪) বা ২০১২ (২০০৯)। কিন্তু ধ্বংসের কারণ হিসাবে ভিনগ্রহের জীবের আক্রমণ (ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস, ২০০৫) থেকে শুরু করে ভূমিকম্প, পরিবেশ ধ্বংস (ওয়াল-ই, ২০০৮) পর্যন্ত অনেককিছু দেখানো হলেও রাষ্ট্রশক্তির সচেতন মূঢ়তা আর অতিধনীদের লোভের দায় খুব বেশি জায়গায় দেখানো হয়নি। গত এক দশকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন দেশে অতি দক্ষিণপন্থার উত্থান তথা জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করার প্রবণতার কারণে হয়ত সেই ধারায় পরিবর্তন আসছে। রাষ্ট্র আর অতিধনীদের এই আঁতাতকে একেবারে ল্যাংটো করে দিয়েছে (আক্ষরিক অর্থে) ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ডোন্ট লুক আপ।

সেই ছবিতে দুই মহাকাশবিজ্ঞানী (অভিনয়ে লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও আর জেনিফার লরেন্স) আবিষ্কার করে ফেলেন এক বিশাল ধূমকেতুকে, যা সোজা পৃথিবীর দিকে ধাবমান এবং এসে পড়লে এক মুহূর্তে গোটা গ্রহটা ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ তাঁদের কথায় কেউ পাত্তা দেয় না, এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রপতিও (অভিনয়ে মেরিল স্ট্রিপ) স্রেফ চেপে যেতে বলেন। সংবাদমাধ্যম, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, রাষ্ট্রশক্তি, বিখ্যাত ব্যক্তিরা – সকলে মিলে অনিবার্য ধ্বংসের সাবধানবাণী অস্বীকার করেন এবং সাধারণ মানুষকে উল্টো বোঝাতে প্রচার করেন ‘উপরদিকে তাকাবেন না।’ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পরিচালক অ্যাডাম ম্যাক্কে দেখাচ্ছেন ধূমকেতু, কিন্তু বোঝাচ্ছেন জলবায়ু পরিবর্তন। এই ধরনের অন্যান্য হলিউড ছবির সঙ্গে এই ছবির বড় তফাত হল, কয়েকজনের বেঁচে যাওয়া বা শেষ মুহূর্তে কোনো নাটকীয় ঘটনায় গোটা পৃথিবীর রক্ষা পাওয়া দেখানো হয়নি। এমনকি অ্যানিমেশন ছবি ওয়াল-ই-র মত পৃথিবীতে জীবনের প্রত্যাবর্তন দেখানোর মত কোনো আশার দৃশ্য দিয়েও ছবিটা শেষ হয় না। ওই ছবি বিশ্বজুড়ে অতিমারী চলাকালীন সামান্য কিছু হলে এবং তার দুই সপ্তাহের মধ্যে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায়। বহু মানুষ দেখেন, কিন্তু ব্যাপক সমালোচনা হয়। হাস্যকর, বাড়াবাড়ি করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে – এইসব অভিযোগ তোলেন সমালোচকরা।

ক্যালিফোর্নিয়ার যে দাবানলে লস এঞ্জেলস পুড়ে গেল, হলিউডের মেগা তারকাদের ঘরদোর ছাই হয়ে গেল; সেই দাবানলের পিছনে কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যাওয়া এবং বনাঞ্চল একেবারে শুকনো হয়ে থাকা প্রবলভাবে দায়ী। আর আগুন নেভাতে যে পর্যাপ্ত জল পাওয়া গেল না, তার দায় প্রায় শতকরা একশো ভাগ অতিধনীদের। ক্যালিফোর্নিয়ার মোট জলের সিংহভাগ এক কোটিপতি দম্পতির দখলে। এই কারণেই সরকারি দমকল যখন জলের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরেছে তখন বেসরকারি দমকল গ্যালন গ্যালন জল ব্যবহার করতে পেরেছে।

অথচ এসব কথা স্বীকার করতে ওদেশে এখনো অনেকেই রাজি নয়। ম্যাক্কের ছবির রাষ্ট্রপতির মতই সত্যিকারের রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পও দোষ চাপাচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নরের ঘাড়ে। সেটা করতে গিয়ে ট্রাম্প যা বলেছেন তা যে একেবারে বানানো কথা, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেছে

হলিউডের তারকারা তাও নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন, কারণ তাঁদের মহার্ঘ বিমা আছে। সেসব বিমা কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের গরজে বেসরকারি দমকল ডেকে নিয়ে এসেছিল। যাঁদের সম্পত্তি তাতেও বাঁচেনি তাঁরাও বিমা কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবেন। কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা সঙ্গীন। কারণ এই দাবানলের মাত্র কয়েকমাস আগে বেশকিছু বিমা কোম্পানি বিশেষত প্যাসিফিক প্যালিসেডস, অ্যাল্টাডেনার মত অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ এলাকাগুলোতে কয়েক হাজার বাড়ি, দোকানপাটের বিমা বাতিল করে দিয়েছিল। কেন? আসলে ২০১৭-১৮ সালে এইসব এলাকায় যে দাবানল হয় তাতে কোম্পানিগুলোকে অনেক টাকা বহু মানুষকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে হয়েছিল। অমন করলে কি আর ব্যবসা চলে? বিমা ব্যবসায় তো ক্ষতিপূরণ না দেওয়াই হল ব্যবসা। তাই বেশকিছু কোম্পানি ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে কেটে পড়ে। কিছু কোম্পানি আবার এই শর্তে থাকতে রাজি হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার তাদের আরও বেশি প্রিমিয়াম আদায় করতে দেবে। এবারের দাবানলের পরে তারাও কেটে পড়তে পারে।

সুতরাং গোল্ডেন গ্লোব, গ্র্যামি, অস্কার ইত্যাদি পুরস্কারের এই মরশুমে হলিউড ও সংলগ্ন এলাকায় এই যে ধ্বংস দেখা যাচ্ছে তার জন্যে মানুষের দায় প্রকৃতির চেয়ে কম নয়। ফলে শ্রীজাতর মত কবিতা যদি কেউ লিখেই ফেলেন, মন্দ হবে না। বস্তুত এবারের অস্কার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে মৃদুমন্দ বিতর্ক আরম্ভও হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ায় অনেক শিল্পী বলতে শুরু করেছেন, বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান করার চেয়ে সেই টাকা ত্রাণে কাজে লাগানো উচিত বা দমকলকর্মীদের জন্যে কিছু করা উচিত। শিল্পীদের কাছেও এই বিপর্যয়ের মধ্যে অস্কার পুরস্কার আর তত দামি নেই – এমন সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অস্কারের মনোনয়ন তালিকায় আছেন ইসাবেলা রোসেলিনি। তিনি ইনস্টাগ্রামে একখানা পোড়া অস্কার স্ট্যাচেটের ছবি পোস্ট করেছেন দিন পাঁচেক আগে, লিখেছেন ছবিটা তাঁর ভাইয়ের পাঠানো। লস এঞ্জেলস আর হলিউডের কথা ভাবতে গেলে তাঁর কেবল চোখে জল আসছে। পরে অবশ্য জানা গেছে ছবিটা ভুয়ো। কিন্তু এই মুহূর্তে শিল্পীদের কাছে অস্কারের দাম কতটুকু, তা ইসাবেলের পোস্ট থেকে সম্ভবত কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

এইসব জানার পরে কিছু হিং টিং ছট প্রশ্ন মাথার মধ্যে কামড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কি কোনো ঘটনার ভিত্তিতেই পুরস্কার সম্পর্কে এত নিস্পৃহ হতে পারবেন? আমাদের জন্মের বহু আগে শিশিরকুমার ভাদুড়ি কেন্দ্রীয় সরকারের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু আমাদের জীবনে কতজনকেই বা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে বা বাকি ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকদের মত পুরস্কার ফিরিয়ে দিতে দেখেছি? অথচ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় তো কম পড়েনি আমাদের। ২০১৫ সালে কন্নড় সাহিত্যিক এম এম কলবুর্গীর হত্যার পর হিন্দি ভাষার আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক উদয় প্রকাশ তাঁর পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। পরপর কলবুর্গী, গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকরদের হত্যা এবং সেসব নিয়ে আকাদেমির নীরবতার প্রতিবাদে বিভিন্ন ভাষার জনা চল্লিশেক লেখক নিজেদের পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন সেইসময়। রুষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী, সমর্থক এবং পেটোয়া মিডিয়া এঁদের ‘অ্যাওয়ার্ড ওয়াপসি গ্যাং’ আখ্যা দিয়েছিল। সেই গ্যাংয়ে মন্দাক্রান্তা সেন বাদে কোনো বাঙালি নাম কি ছিল? অবশ্য কেউ বলতেই পারেন, ‘খেটেখুটে পুরস্কার পেয়েছি। ফেরাতে যাব কেন ভাই?’ বললে অন্যায় হবে না। পুরস্কারের দাম সত্যিই সকলের কাছে এক নয়। কার কাছে কোনটা দাবানল তা ঠিক করতে পারেন কেবল তিনি নিজে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি নতুন পুরস্কার তৈরি করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে সাহিত্যিক হিসাবে পুরস্কৃত করেছে বলে যেমন নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রত্না রাশিদ ব্যানার্জি। ওঁর কাছে ওটাই পুরস্কার ছুড়ে ফেলে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট।

আরো পড়ুন আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে নিজের কাজের চেয়েও, সেই কাজ উদ্দিষ্ট দর্শক বা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেয়েও, পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যগ্রতা কি বেশি? এ প্রশ্নও কামড়ায়। নইলে ঋতুপর্ণ ঘোষ বাড়িওয়ালি ছবিতে কিরণ খেরের গলা যে রীতা কয়রাল ডাব করেছিলেন তা কী করে ভুলে গেলেন জাতীয় পুরস্কারের গন্ধে? কেনই বা এখনকার ‘জনপ্রিয় সাহিত্য লিখি না’ বলে জাঁক করা রাজ্য সরকারের ঘোষিত বিরোধী সাহিত্যিকরাও শীত এসে পড়লেই সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পাওয়ার চিঠি পোস্ট করেন ফেসবুকে?

নাঃ, আর প্রশ্ন তুলে কাজ নেই। আমেরিকার দাবানল আমেরিকাতেই থাক।

প্রতর্ক ব্লগে প্রকাশিত

নজরুলকে নিয়ে রহমানাতঙ্ক: বাঙালি সংস্কৃতি কারে কয়?

বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল?

নজরুল
ছবি পিনটারেস্ট থেকে

ক্যালেন্ডার বলছে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে এখনো ঢের দেরি, বৈশাখ মাস তো আরও দূরে। এবার বাঙালি ভাবাবেগ (আজকাল বাঙালিরা হিন্দিভাষী নেতাদের বক্তৃতা শুনে শুনে যেটাকে ‘অস্মিতা’ বলে আর কি) মরসুম অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের প্রকাশ্য ও গোপন আক্রমণ বাঙালি জাতির উপর চলছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে আক্রান্ত জাতির মধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যেও সেসব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার উৎসাহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কারোর মধ্যে দেখা যায় না। না, একটু ভুল হল। সোশাল মিডিয়া খুললে মনে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই লড়ার জন্যে কোমর বেঁধে তৈরি। কিন্তু লড়তে গেলে ঠিক কী যে করতে হবে তার কোনো নীল নকশা কারোর কাছে নেই। যারা কিঞ্চিৎ সংগঠিত তারা ঠিক করেছে হিন্দিভাষী মানুষকে ধমকানো চমকানোই একমাত্র রাস্তা। তার বাইরে যে কয়েকজনের মাথায় দু-একটা পরিকল্পনা আছে, তাদের সঙ্গ দিতে গেলে নিজের জীবনচর্যায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হবে, বেশকিছু ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধিকাংশ বাঙালি সেসব করতে তৈরি নয়। না করার একগুচ্ছ অজুহাতও পকেটে বা হাতব্যাগে সবসময় থাকে। বলামাত্রই বার করে ফেলে। এদিকে সোজাসুজি “পারব না বাপু বাঙালিয়ানা করতে। অনেক কাজ আছে” বলে হাত ঝেড়ে ফেলার ক্ষমতাও নেই। কারণ কতকগুলো বিগ্রহ বাড়িতে এবং/অথবা জীবনে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গুরুজনেরা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি। বিগ্রহগুলোর নিয়মিত পুজো করতে হয়, নইলে মনে পাপবোধ তৈরি হয়। কিন্তু বিগ্রহের তো চর্চা বলে কিছু হয় না। ফলে যে সংস্কৃতি বিগ্রহনির্ভর তার চর্চা বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়, আর যে সংস্কৃতির চর্চা নেই তাকে শেষ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও প্রায় ফাঁকা মাঠে জিতে যাচ্ছে। বাঙালি কী করছে? অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। যদি বাঙালি সংস্কৃতি মানে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি হয়, তাহলে এই প্রবণতা সেই সংস্কৃতির ঠিক উলটো পিঠ।

হ্যাঁ, আল্লারাখা রহমান সুরারোপিত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানের সূত্রেই এত কথা বলছি। প্রথম চোটে গোটা ১৫ সেকেন্ড শুনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাল লাগছিল না বলে। কিন্তু ওই গান এবং তা নিয়ে বাঙালির প্রতিক্রিয়া সংবাদ হয়ে উঠেছে আর কোনো ওয়েবসাইট যা সংবাদ তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে লিখতে হবে, তাই শুনতে হল। অন্য অনেকের মত আমার কানেও মোটেই সুবিধের লাগল না। রহমান মহান শিল্পী, কিন্তু তাঁর সুরারোপিত কিছু হিন্দি গান আছে যেগুলো শুনলে মনে হয় তিনি কথাগুলোকে ঠিক সামলে উঠতে পারেননি, তাই কিছু অর্থহীন ধ্বনি ঢুকিয়ে দিয়ে ছেঁড়া মশারিতে তালি মেরেছেন (স্বদেশ ছবির ‘ইয়ে যো দেস হ্যায় তেরা’, লগান ছবির ‘কোঈ হম সে জিত ন পাওয়ে’ স্মর্তব্য)। এই গান শুনেও তেমনটাই মনে হল। আরও বড় গোলমাল হল, কথা যাচ্ছে লন্ডন আর সুর যাচ্ছে টোকিও। নজরুলের গানের কথায় বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবল উদ্যম এবং গনগনে রাগ আছে।

কিন্তু রহমানের সুর শুনলে মনে হচ্ছে এ গান ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ জাতীয় আনন্দের গান। সবাই মিলে বেশ নেচেকুঁদে নেওয়া যায় এই গান শুনতে শুনতে। যাঁরা গেয়েছেন তাঁদের হাসি হাসি মুখগুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফলে জ্ঞানত এই সুরারোপকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। সুরকার এবং তাঁর গায়েনরা গানের কথাগুলো বুঝে উঠতে পারেননি বলে সন্দেহ হয়।

গান ভাল না লাগলে নিন্দা করার অধিকার মানুষের জন্মগত, ভাল লাগলে প্রশংসা করার অধিকারের মতই। সুতরাং যখন কোনো শিল্পী নিজের কাজ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তখন তাঁকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। নইলে অবস্থা হয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর মত। ছবি ফ্লপ হলে বলতে হয়, গীতার চেয়ে তো প্লেবয় বেশি বিক্রি হয়। তা বলে কি গীতাকে ফ্লপ বলব? কিন্তু অমুক গান আমার ভাল লাগেনি বলা এক জিনিস, আর অমুক গান তৈরি করাই অনুচিত হয়েছে, নজরুলকে অপমান করা হয়েছে, বাঙালি জাতিকে অপমান করা হয়েছে, অবাঙালি বলেই এমন করতে পারল, বাঙালিরা কিছু বলে না বলে… ইত্যাদি চেঁচামেচি করা আরেক জিনিস। এই কোলাহল কিছুদূর পর্যন্ত স্রেফ হাস্যকর, তারপর ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই এত বেশি ধুলো ওড়ানো হয়েছে যে পিপ্পা ছবির নির্মাতারা বিবৃতি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। সেই বিবৃতিতে অবশ্য একটি মোক্ষম কথা বলা হয়েছে “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী গানটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে শ্রদ্ধা জানানো, যে চুক্তি আমাদের গানের কথাগুলিকে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিল” (Our intent was to pay homage to the cultural significance of the song while adhering to the terms set forth in our agreement, which permitted us to use the lyrics with a new composition)।

বিবৃতিতে প্রকাশ, চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী এবং পৌত্র অনির্বাণ কাজী। এখন বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ দেখে অনির্বাণ এবং তাঁর ভাইবোনেরা আমতা আমতা করছেন। জল্পনা চলছে ‘পরিবারেরই ভুলে কি বিকৃতি নজরুল-গীতে?’ কবির পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই দায় ঝেড়ে ফেলতে। গোটা দুনিয়ার বাঙালির চোখে তাঁরা এখন অভিযুক্ত। অপরাধ কী? না নজরুলের রচিত একটি গানকে অন্য সুরে গাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফেলেছেন। এখন নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজীকেও বলতে হচ্ছে “যা হয়েছে তা শুধু নজরুল ইসলামকে নয়, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিকে অপমান!”

কী হয়েছে? না নজরুলের একটি একদা জনপ্রিয় গানকে অন্যরকম সুরে গাওয়া হয়েছে এবং সে সুর বাঙালির পছন্দ হয়নি। এতদ্বারা বাঙালি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে জানিয়ে দিল, নজরুলের গান বেদ, কোরান, বাইবেল বা আবেস্তার মত একটি অপরিবর্তনীয় বস্তু। এদিক ওদিক করলে মহাপাতক হয়। এ স্রেফ শিল্প নয়, যে তুমি পুনর্নির্মাণ করবে। চুক্তি-টুক্তিতে চিঁড়ে ভিজবে না। কপিরাইট আইনকে মারো গুলি। আমাদের বিগ্রহের লেখা গান আমাদের সবার সম্পত্তি। দেশের আইন যা-ই বলুক। আবেগের কাছে আইন, শিল্পের ইতিহাস – এসবের আবার কোনো দাম আছে নাকি? ঠিক যেমন ইতিহাসে রামের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, আমাদের আবেগ যখন বলছে ওখানে রাম জন্মেছিলেন, তখন মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে।

নজরুলের প্রতি অন্যায় করা হল বলে যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না, তারা খেয়ালও করছে না, একজন শিল্পীর প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল তাঁর কপিরাইটকে সম্মান না করা। স্লোগান সকলের সম্পত্তি, গান অবশ্যই শিল্পীর একার। কারণ তিনি একাই তা সৃষ্টি করেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মত মহান সৃষ্টির পিছনে যে পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থাকে তার তুলনা একমাত্র প্রসববেদনা। ও জিনিসের ভাগ হয় না। শিশুকে যে যতই আদর করুক, সে একমাত্র তার মায়ের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পরেও। একজন শিল্পী অন্য এক শিল্পীর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তা নিয়ে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেই পারেন। সফল হলে প্রশংসা করা আর বিফল হলে নিন্দা করার বেশি অধিকার শ্রোতা, দর্শক বা পাঠকের নেই। যা করা হয়েছে তা শিল্প হিসাবে ভাল-খারাপ ছাড়িয়ে ক্ষতিকর মনে হলে অন্যকে সে কথা বলতে পারেন, পয়সা দিয়ে ও জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যাস।

এরপরেও একটা কথা আছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদী শিল্পের যে ধারা (protest art), তাতে অনেক সময় কোনো গানের রচয়িতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সেই গানটা সকলের হয়ে যায়। সে গানের অসংখ্য সংস্করণ তৈরি হয়ে যায়। নজরুলের গানের যে পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলে হাত-পা ছোড়া হচ্ছে, সেই পবিত্রতা তখন চুলোয় যায়। সেখানেই গানটার সাফল্য। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ আর ‘বেলা চাও’। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই গানদুটোর নানা রূপ। সাধারণত দেখা যায় সুর এক আছে, কথা পালটে গেছে। কেবল বাংলা ভাষাতেই ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানের অন্তত দুটো রূপ (‘আমরা করব জয়’, ‘একদিন সূর্যের ভোর’) পাওয়া যায়। এ যদি অন্যায় না হয়, তাহলে সুর বদল হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? নাকি রাগের কারণ আসলে একটা আশঙ্কা, যে নজরুলের উপর আমাদের মৌরসি পাট্টা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আর কেবল বাঙালির থাকবেন না?

তার মানে! যে যেমন ইচ্ছা আমাদের সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকাবে আর বাঙালি চুপচাপ বসে দেখবে?

তা কেন? বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নজরুলের ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতাটা জানে? বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে কী কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল সে খবর আজকালকার কনভেন্ট শিক্ষিত, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে হিন্দি পড়া ছেলেমেয়েদের জানানোর জন্যে কী উদ্যোগ নিচ্ছে নজরুলপ্রেমী বাঙালি সমাজ? গোঁফের রেখা ওঠা ছেলেরা আর মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ানো মেয়েরা এখনো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ পড়ছে? মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে রাস্তার সিগনাল – সর্বত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তো বাজছে, নজরুলগীতি গাওয়া হয় কটা জায়গায়?

মেগা সিরিয়াল বলতে খেয়াল হল – কেবল আবহসঙ্গীতে নয়, মেগায় যে পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই আস্ত হিন্দি ছবির গান বাজানো হয় তাতে হিন্দি আগ্রাসন দেখতে পান না? কোনো প্রতিবাদ হয়? মহিলা পুরুত দিয়ে করানো প্রগতিশীল বাঙালির বিয়েতে বর-কনের শেরওয়ানি আর ঘাগরা কি বাঙালি সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকায় না? কোন এ আর রহমান এসে বাঙালি মেয়েদের মাথায় বন্দুকে ঠেকিয়ে বিয়ের আগে মেহেন্দি অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করে তুলেছেন? ধনতেরাস উপলক্ষে ঝাঁটা না কিনলে মানসম্মান থাকছে না বাঙালি সংস্কৃতির কোন ধারা অনুযায়ী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সোশাল মিডিয়ায় রে রে করে কোনো শিল্পীর দিকে তেড়ে যাওয়া অনেক সহজ। তাতে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ, নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের ক্ষেত্রে আবার উপরি পাওনা বিগ্রহের মান বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ। ধর্মান্ধরা কোনোদিনই বোঝে না যে তাদের দেবতা তাদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি নিজেকে নিজেই বাঁচাতে পারেন, চুনোপুঁটি ভক্তদের মুখাপেক্ষী নন। সাংস্কৃতিক বিগ্রহের পূজারী বাঙালিও বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এত সামান্য শিল্পী নন যে তাঁদের বাঁচাতে হবে। ১৯৯১ সালে যখন আইন মোতাবেক রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট উঠে যাওয়ার কথা ছিল, তখন কেবল বিশ্বভারতী নয়, প্রায় সমস্ত শিক্ষিত (ডিগ্রিধারী অর্থে) বাঙালি গেল গেল রব তুলেছিল। কপিরাইট উঠে গেলেই নাকি সর্বনাশ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেবে লোকে, লেখাগুলোর কী যেন একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেবার এত দাপাদাপি শুরু হল যে ভারতের সংসদ দেশের আইন পরিবর্তন করে ফেলল। কপিরাইটের মেয়াদ ছিল স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর পর্যন্ত। তা বাড়িয়ে করা হল ৬০ বছর পর পর্যন্ত। শেষমেশ ২০০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র কপিরাইটের আওতার বাইরে এসেছে। গত ২২ বছরে বিশ্বভারতী ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আর কোন সৃষ্টি তিনি যেমন ছেড়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের হয়ে গেছে? একথা ঠিক, আজকাল একেকজন এত বাজনা সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন যে গান ছাড়া আর সবকিছু শোনা যায়। কেউ আবার কালোয়াতি করে বোঝাতে চান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি একজন ওস্তাদ। কেউ বা বাহাদুরি করে মাঝখান থেকে গান শুরু করেন। কিন্তু তাতে কী? যার যেমন রুচি সে তেমনই শোনে। যার যেটা ভাল লাগে না, সে সেটা শোনে না। এসবে গীতিকার রবীন্দ্রনাথের কী ক্ষতি হয়েছে?

প্রগতিশীল বাঙালিরা নিজস্ব দেবতাকুল বানিয়ে নিয়েছেন, তাতে নতুন নতুন বিগ্রহও যোগ করে যাচ্ছেন। গত বিশ বছরে যোগ হওয়া এক বিগ্রহের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটা পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছিলেন টিভির জন্যে (প্রযোজকদের সঙ্গে গোলমালে নাকি সে কাজে শেষ পর্যন্ত থাকেননি)। শাশুড়ি-বউমার কোন্দল আর এক পুরুষের দুই নারী ছকের বাইরে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী মেগা সিরিয়াল – গানের ওপারে। রবীন্দ্রনাথকে যারা বিগ্রহ বানিয়ে রাখে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকীকরণের দ্বন্দ্ব ছিল সেই সিরিয়ালের মূল উপজীব্য। সেখানে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত এমনভাবে গাওয়া হয়েছিল যা অভ্যস্ত কানে মোটেই সইবে না।

তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ত সমৃদ্ধ হয়নি, কিন্তু দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঋতুপর্ণকেও আজ আর সে কাজের জন্যে কেউ রহমানের মত আক্রমণ করে না। তখন যারা করেছিল তারাও ক্ষমা করে দিয়েছে। সে কি তিনি বাঙালি বলে, নাকি তিনি নিজেই বিগ্রহে পরিণত হয়েছেন বলে?

আরও পড়ুন সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

মজা হল, বাঙালির এই শতকের বিগ্রহরা কেউ বাংলার সঙ্গে হিন্দি, ইংরিজির মিশেল ছাড়া চলতে পারেন না। সৌরভ গাঙ্গুলির মুখের ভাষা শুনলেই টের পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় বিগ্রহ হতে চলা গৌতম ভট্টাচার্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তার নাম আবার বিশ্বকাপ তুঝে সেলাম। এসবে তাঁদের কারোর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না, কেউ বাংলার সংস্কৃতির সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে না। যত দোষ এ আর রহমানের। যেহেতু তিনি বাঙালি নন, যেহেতু আক্রমণকারী বনাম আক্রান্তের বয়ান খাড়া করার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক।

ব্যর্থ শিল্পপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ বলে বুঝে নিয়ে অন্য জিনিসে মন দেওয়ার নির্লিপ্তি না থাকলে, শিল্পে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে অনমনীয় হলে যা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তাই হচ্ছে। গড়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তির সংস্কৃতি। সাহিত্য ভূতে, গোঁজামিল ইতিহাসে আর রহস্য রোমাঞ্চে ছয়লাপ। কারণ ‘ওটা পাবলিক খায়’। সিনেমার বড় অংশ জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন। তাও আবার একই গল্পকে একবার, দুবার, তিনবার পর্দায় আনা হচ্ছে। আরেকটা অংশ? এই শতকের প্রথম দিকে চলছিল দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনরাবৃত্তি, তারপর থেকে চলছে পুরনো জনপ্রিয় বাংলা ছবির পুনরাবৃত্তি। পুনর্নির্মাণ বলা যাবে না। কারণ এসব ছবি মূল বয়ানে নতুন কিছু যোগ করে না, কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় না।

এরই পিছু পিছু এসে পড়েছে জেরক্স সংস্কৃতি।

‘অপরাজিত ছবিটা দারুণ হয়েছে।’

কেন? না সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে দেখতে অবিকল সত্যজিতের মত। পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলো একেবারে পথের পাঁচালীর মত। এদিকে পরিচালক অনীক দত্ত সাহস করে চরিত্রের নামটাই সত্যজিৎ রাখতে পারেননি, সে চরিত্রের তৈরি পুরস্কৃত ছবির নামও করে দিয়েছেন পথের পদাবলী।

‘মৃণাল সেনের বায়োপিকটা দারুণ হবে।’

কেন? না টিজারে দেখা গেছে মৃণালের চরিত্রাভিনেতাকে অবিকল তাঁর মত দেখাচ্ছে।

নির্দেশকরা কেনই বা এই ছকের বাইরে যেতে যাবেন? ছক ভাঙতে গিয়ে রহমানাতঙ্কের মত কিছুর কবলে পড়ার ঝুঁকি কে নেবে বাপু?

বাঙালি সংস্কৃতিকে এই বিষচক্র থেকে এবং হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র বাঙালি। কিন্তু তা করতে হলে রহমানাতঙ্ক কাটিয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী সে প্রশ্ন তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একদা সভাপতি তথাগত রায়, সোশাল মিডিয়ায় হিন্দি আগ্রাসনবিরোধী বাঙালির বাপ বাপান্ত করাই ইদানীং যাঁর জীবনের ব্রত, প্রায়ই মন্তব্য করেন যে বাঙালির সর্বনাশ করেছে ‘রসুন’ সংস্কৃতি। অর্থাৎ রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল। তৃতীয়জনকে নিয়ে তথাগতবাবুর আপত্তির কারণ অতি সহজবোধ্য আর বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্থান আদৌ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাশে নয়। তাই ও নিয়ে আলোচনা করা সময় নষ্ট। কিন্তু বাকি দুজন যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেকখানি তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আরএসএসের দীক্ষায় দীক্ষিত তথাগতবাবুর ওই দুজনকে প্রবল অপছন্দ প্রমাণ করে তাঁরা স্রেফ শৈল্পিক উৎকর্ষে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় এবং কার্যকলাপেও যথার্থ মানবতাবাদী, অতএব প্রয়োজনীয়। কথা হল, ওঁদের নিয়ে আমাদের যে উথাল পাথাল আবেগ প্রকাশ পায় ক্ষণে ক্ষণে, তা কি খাঁটি? যদি খাঁটি হয়, তাহলে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে লাইন দিয়ে অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে তৈরি প্যান্ডেল দেখতে গিয়েছিল কারা? যারা নজরুলের অপমান নিয়ে বেজায় উত্তেজিত তাদেরই ভাই বেরাদররা তো। রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি, ফেসবুক পোস্ট, আইনি ব্যবস্থার হুমকি কত কী দেওয়া হচ্ছে এখন। বিখ্যাতরাও দিচ্ছেন। তখন এত প্রতিবাদ ছিল কোথায়? নাকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান, কবিতাই কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ; তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবনা নয়, জীবনচর্যাও নয়?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অনন্ত আনন্দধারার খানিকটা ধরা পড়েছে নীহারিকা ছবিতে

নীহারিকা এমন একটা কাজ করেছে যা বাংলা সিনেমা শুধু নয়, বাংলা সাহিত্য থেকেও আমাদের কালে উবে গেছে। তা হল জীবন সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলা। কাকে বলে আনন্দ? কোনটা স্বাধীনতা? ভাল থাকা বেশি জরুরি, নাকি সাফল্যে থাকা? এসব প্রশ্ন আমার সময়ের কোন বাংলা ছবিকে তুলতে দেখেছি? মনে পড়ে না।

বেশ কিছুকাল হল, পশ্চিমবঙ্গে বসে বাংলা ছবি দেখা বেশ শক্ত। কারণ বাংলা ছবি তৈরি হয় কম। টালিগঞ্জ পাড়া থেকে প্রধানত দুরকম ছবি বেরোয় – ‘wannabe হিন্দি’ ছবি আর ‘wannabe ইংরিজি’ ছবি। সেসব ছবির বাঙালিয়ানা বলতে সংলাপটুকু। দ্বিতীয় ধরনের ছবিতে আবার সংলাপও বেশ খানিকটা ইংরিজি। অতি সাম্প্রতিককালে তৃতীয় এক ধরনের ছবি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো ‘wannabe সর্বভারতীয়’। ফলে নীহারিকা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাংলা ছবি দেখতে তৃষিত হৃদয় জয় করে ফেলে, কারণ প্রথম ফ্রেম থেকেই পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য একখানা খাঁটি বাংলা ছবি দেখান।

এ ছবির গৃহবধূরা গা ভর্তি গয়না পরে থাকে না, কাঞ্জিভরম পরে শুতে যায় না। স্কুলপড়ুয়া মেয়ের মা পরনের সাধারণ শাড়ির আঁচলটা কোমরে বেঁধে নিয়ে নাচ শেখান। যেমনটা চিরকাল বাঙালি মায়েদের করে আসতে দেখেছি। কয়েক মিনিট যেতেই পরিষ্কার হয়ে যায়, পরিচালক ইন্দ্রাশিস এবং ক্যামেরার দায়িত্বে থাকা শান্তনু দে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ঘরের সব জায়গায় সমান আলো পৌঁছনোর দরকার নেই। ইন্টেরিয়র ডেকরেটরের হাতে সাজানো ছবির মত ঘর তাঁরা দেখাতে চান না। কলকাতার পুরনো বাড়ির সেইসব সিঁড়ি, যেগুলো দিনের বেলাতেও অন্ধকার থাকে, সেগুলোকে সেভাবেই পর্দায় আনা হয়েছে। এখানে স্নান করে খালি গায়ে গামছা পরেই ঘরে আসেন ভুঁড়িওলা জ্যাঠামশাই। পরিচালক সিক্স প্যাক খুঁজতে বেরোননি। এখানে মাতাল বাবা বাইরে থেকে নেশা করে এসে মাকে পাড়া জানিয়ে নোংরা কথা বলে এবং দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে পেটায়। ঢুলুঢুলু আলোয় ড্রইংরুমে বসে স্কচ খেয়ে চার অক্ষরের ইংরিজি গালি দেয় না।

চারিদিকের ঝলমলে আলোয় যাঁদের ক্লান্ত লাগে, আজকের জীবনযাত্রার প্রচণ্ড গতিতে যাঁদের হাঁসফাস লাগে – নীহারিকা ছবিটা তাঁদের জন্য। প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে পর্দার নরম আলোর উপশম পেতে হলে এই ছবি দেখে ফেলুন। ক্রমশ গতি বাড়িয়ে চলা জীবনের নানাবিধ শব্দে যদি আপনার কান এবং মস্তিষ্ক পরিশ্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলেও ঘন্টা দুয়েক সময় বার করে এই ছবি দেখে আসা ভাল। শান্তনু যেমন আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি, সঙ্গীত পরিচালক জয় সরকারও নেপথ্য সঙ্গীতের ব্যবহার করেছেন অতি সামান্য। নৈঃশব্দ্য কথা বলেছে দর্শকের কানে কানে, যার জন্যে সাউন্ড ডিজাইনার সুকান্ত মজুমদারেরও বাহবা প্রাপ্য। শব্দ পরিহার করার এই সংযমও আজকের বাংলা ছবিতে সুলভ নয়। তবে এসব তো খুঁটিনাটি। সবচেয়ে বড় কথা, নীহারিকা এমন একটা কাজ করেছে যা বাংলা সিনেমা শুধু নয়, বাংলা সাহিত্য থেকেও আমাদের কালে উবে গেছে। তা হল জীবন সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলা। কাকে বলে আনন্দ? কোনটা স্বাধীনতা? ভাল থাকা বেশি জরুরি, নাকি সাফল্যে থাকা? এসব প্রশ্ন আমার সময়ের কোন বাংলা ছবিকে তুলতে দেখেছি? মনে পড়ে না। ইতিমধ্যেই বহু আলোচিত এই ছবির যৌনতার দিকটা। সেখানেও বেশকিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন পরিচালক। কোনটা সম্মতি, কোনটা স্বাভাবিকতা, কোনটাই বা বিকৃতি? এসবের উত্তর যে সাদায় কালোয় হয় না সবসময়, শান্তনুর ক্যামেরায় ফুটে ওঠা আলো আর আঁধারের মাঝখানেও লুকিয়ে থাকতে পারে – তা সাহস করে দেখিয়েছেন।

বছর বিশেক আগেও কাহিনিচিত্র কথাটা বাংলায় রীতিমত ব্যবহৃত হত। শনি বা রবিবার দূরদর্শনে বাংলা ছবি শুরু হওয়ার আগে ঘোষক/ঘোষিকা বলতেন “আজ দেখবেন বিজ্ঞাপনদাতা দ্বারা আয়োজিত কাহিনিচিত্র…”। ইদানীং যে শব্দটা আমরা ভুলে গেছি, তার একটা কারণ বোধহয় এই, যে আমাদের পরিচালকরা সিনেমায় গল্প কীভাবে বলতে হয় তা ভুলে গেছেন। যদি এমন হত যে তাঁরা বাংলা সিনেমাকে গল্পের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছেন, এমন সব অবিস্মরণীয় ফ্রেম তৈরি করছেন যে কেবল তার জন্যেই ছবিটা দেখা যায় – তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে যে কয়েকটা হাতে গোনা ছবি ‘হিট’ হয়েছে সেগুলোর সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্যের কথা বলতে বললেও একাধিকবার ছবিটা দেখা দর্শক মাথা চুলকোবেন। অথচ ক্যামেরা, আলো, সম্পাদনা – সবেরই তো মান বেড়েছে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে। নীহারিকা কিন্তু এদিক থেকেও ব্যতিক্রমী। এর গল্প (সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ইন্দ্রাশিসের রচনা) যেমন বাঁধা গতের নয়, তেমনই একাধিক নয়নাভিরাম দৃশ্য তৈরি করেছেন পরিচালক।

শান্ত জনপদ শিমুলতলায় সন্ধেবেলা লোডশেডিং হয়ে যাওয়ার পর দীপার ঘুরঘুট্টি অন্ধকার মামাবাড়ি জেগে থাকে পর্দা জুড়ে। তারপর একতলায় জ্বলে ওঠে দুটো আলোর বিন্দু – সম্ভবত হ্যারিকেন। একটা আলোর বিন্দু কয়েক সেকেন্ডের জন্যে চলে যায় চোখের আড়ালে, শেষে আবির্ভূত হয় দোতলায়। এ দৃশ্য মনে রাখার মত। আবার অনেক দর্শক নিশ্চয়ই বাড়ি যাবেন সিলুয়েটে দীপার (অনুরাধা মুখার্জি) নাচের রেশ নিয়ে। সংলাপ নয়, স্রেফ ছবি দিয়ে গল্প বলা যে শক্ত কাজ তা গত কয়েক বছরের বাংলা ছবি দেখলে বেশ টের পাওয়া যায়। পরিচালকের পরিমিতিবোধ না থাকলে এ জিনিস অসম্ভব। ইন্দ্রাশিসের সেই পরিমিতিবোধে চমৎকার সঙ্গত করেছেন সম্পাদক লুব্ধক চ্যাটার্জি। বিশেষত কোনো কান্নাকাটি, হইচই ছাড়াই দীপার মায়ের মৃত্যু নিঃশব্দে স্রেফ দুটো শটে দেখিয়ে ফেলার মুনশিয়ানা ভোলার নয়।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

যে ছবিতে চাকচিক্য বর্জন করা হয় সে ছবি দাঁড়িয়ে থাকে অভিনয় ক্ষমতার উপর ভর দিয়ে। নীহারিকা ছবিতে সেই গুরুদায়িত্ব যথাযথ পালন করেছেন অভিনেতারা। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অনুরাধা ব্যক্তিগত জীবনের অশান্তি এবং শান্তিময়তা দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন, যদিও স্বামী রঙ্গনের (অনিন্দ্য সেনগুপ্ত) উপর ফোনে চেঁচানোর সময়ে তাঁকে কিঞ্চিৎ বেশি কোমল মনে হয়েছে। ছবির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দীপার ছোটমামা। অভিনেতা শিলাজিৎ সিনেমায় অভিনয় করছেন কম দিন হল না। কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষ থেকে সন্দীপ রায় – কেউই তাঁকে এত বড় অথচ আপাত বিশেষত্বহীন চরিত্রে ভাবেননি। স্বনামধন্য শিলাজিৎ কিন্তু অনায়াসে ঘুমন্ত মফস্বলের ব্যস্ত ডাক্তার হয়ে গেছেন, যাঁর চরিত্রের তলদেশে আবার ঘুমিয়ে আছে এমন একটা জিনিস যাকে অন্তত তিনি নিজে বলেন বিকৃতি। পরিচালক নিথর দাম্পত্যের একাকিত্ব বোঝাতে শিলাজিৎকে দিয়ে অন্ধকার বারান্দায় ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব’ গাইয়ে নিয়েছেন। ওই অমূল্য মুহূর্ত সৃষ্টি করার কৃতিত্ব যতখানি পরিচালকের, ঠিক ততটাই শিলাজিতের।

চমকে উঠতে হয় অবশ্য ছোটমামীর চরিত্রে মল্লিকা মজুমদারকে দেখে। গোটা ছবিতে তিনি টানা টানা চোখ ব্যবহার করে যে অভিনয় করে যান (যা তুঙ্গে ওঠে ‘মলয় বাতাসে’ গানে) তাতে স্রেফ চরিত্রটা নয়, মানুষটার জন্যেও কষ্ট হয়। কারণ উপলব্ধি করা যায়, নিম্নমেধার সিরিয়াল/মেগা সিরিয়াল একজন শিল্পীর ক্ষমতার প্রতি কতটা অবিচার করে।

এতকিছু সত্ত্বেও দু-একটা খটকা থেকে যায়। যেমন ছবিতে কোন সময় দেখানো হচ্ছে তা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়। কারণ শিমুলতলার জীবনে এমনকি ব্যস্ত ডাক্তারবাবুকেও মোবাইলে কথা বলতে দেখা যায় না, কিন্তু বিয়ের পর দীপা আর রঙ্গন কলকাতায় চলে আসতেই মোবাইল ফোন তো বটেই, ল্যাপটপেরও ব্যবহার দেখা যায়। এ যদি বর্তমানের গল্প হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, শিমুলতলা কি এখনো এতটা প্রযুক্তিবর্জিত? নাকি বেশ আগে লেখা বইয়ের গল্পকে পর্দায় নিয়ে আসতে গিয়ে এই বিভ্রাট হয়েছে? দেওঘরের প্যাথোলজিস্ট পরিচিত ডাক্তারকে “মিস্টার চ্যাটার্জি” বলে সম্বোধন করেন – এই ব্যাপারটাও একটু অদ্ভুত লাগে। সাধারণত তো ডাক্তারবাবুদের “ডক্টর” বলেই সম্বোধন করা হয়। আরেকটি প্রশ্নও না করে থাকা যায় না। দীপা পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ পেল – নিজের সঙ্গে থাকার স্বাধীনতা। কিন্তু তা করতে গেলে তো অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও প্রয়োজন হয়। সে সম্পর্কে কোনো সংবাদ কিন্তু পেলাম না। দীপা এম এ করেছে, তারপর গবেষণা করবে – এই পর্যন্ত জানা গিয়েছিল রঙ্গনের সঙ্গে বিয়ের আগে। তারপর সোজা বিয়ে, মা হওয়া দেখলাম। ওরই মধ্যে বা পরে কি সে কোনো কাজে যোগ দিয়েছিল? তার হদিশ পেলাম না।

কেউ বলতেই পারেন এ নেহাত ছিদ্রান্বেষণ। কিন্তু ছবিটা এত বেশি প্রত্যাশা জাগায় এবং পূরণ করে বলেই কথাগুলো মনে আসে। বাজার চলতি বাংলা ছবির মত একখানা পরিচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে যেখানে পারা যায় গুঁজে না দিয়ে যে পরিচালক নায়িকাকে দিয়ে দ্বিজেন্দ্রগীতি গাওয়ান, তাঁর কোথাও ভুলচুক হয়ে গেল কিনা তা নিয়ে তো উদ্বেগ তৈরি হবেই। রবীন্দ্রসঙ্গীতও আছে অবশ্য। কিন্তু সে গানের এর চেয়ে উপযুক্ত ব্যবহার অসম্ভব ছিল।

পপকর্ন খেতে খেতে দেখে ভুলে যেতে চাইলে নীহারিকা আপনার জন্যে নয়। যদি প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার বহুক্ষণ পরেও দেখা ছবির রোমন্থন করতে ভাল লাগে, তাহলে এই ছবি আপনার।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত