অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি

অথৈ ভদ্রলোকের ছবি নয়। ভদ্রলোকেরা ভদ্রলোকের খেলার নাম করে যা যা অক্রিকেটিয় আচরণ করে, সেগুলোকে উলঙ্গ করে ফেলার ছবি। এ ছবির নায়ক একজন ‘ছোটলোক’, অথৈ লোধা, যার গোটা সম্প্রদায় স্বাধীনতার পরেও বেশ কিছুদিন দেশের আইনের চোখে অপরাধপ্রবণ জাত ছিল। আর খলনায়ক একজন ভদ্রলোক। যে সে ভদ্রলোক নয়, একেবারে কুলীন বামুন – অনগ্র চট্টোপাধ্যায়। সে আবার বিদেশে এক পা দিয়ে ফেলা ডাক্তার। এদের জন্যই আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবারের পাতায় ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে লেখা হয় – ব্রাহ্মণবংশীয়, প্রকৃত সুন্দরী মেয়ে চাই। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগৎ বরাবর এদেরই নিয়ন্ত্রণে। সিনেমা হলগুলোর মালিকদের মধ্যেও লোধাদের সংখ্যা যে শূন্য তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় (আজকাল তো আবার সিনেমা হল ঢুকে গেছে অতি ধনী, প্রায়শই অবাঙালি উচ্চবর্গীয় মালিকদের মলের পেটে)। তাই ছবিটাও আমাদের দেখতে হয় ভদ্রলোকের চোখ দিয়েই। অনগ্র স্বয়ং এই আখ্যানের সূত্রধার। সে ছোট থেকেই বাড়িতে আশ্রিত সমবয়স্ক অথৈকে ঈর্ষা করেছে, অথচ সবকিছুতেই তার কাছে হেরেছে। খালি পায়ের ফুটবলে তাকে কাটিয়ে ভূপতিত করে গোল করেছে অথৈ। ফলে অনগ্র ওরফে গোগোর প্রিয় খেলা ক্রিকেট। সে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের আদবকায়দা অনুসরণ করে অথৈকে চূড়ান্ত খেলাটায় হারিয়ে দিতে নেমেছে — দিয়াকে অথৈয়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার খেলা।

বহুতলবাসী, শহুরে, অরাজনৈতিক বাংলা ছায়াছবির একঘেয়ে জগতে বহুকাল পরে অথৈ একখানা আদ্যন্ত গ্রামীণ এবং রাজনৈতিক ছবি। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অর্ণ আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ সে রাজনীতি শুরু করেছেন একেবারে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নাম দেখানো থেকে। এ ছবির টাইটেল কার্ডে কারোর নামের সঙ্গে পদবি লেখা নেই। প্রয়োজনে অমুকদা, তমুকদি আছেন। দুজন কৌশিক থাকায় একজন কৌশিকদা আছেন আর একজন কৌশিকবাবু আছেন। অর্ণর চিত্রনাট্য অতীতের বহু শেক্সপিয়রাশ্রয়ী ছবির মত তাঁর আখ্যানকে অবলম্বন করেছে বটে, কিন্তু নিজের রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে ওথেলো ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে। বাংলায় জাতপাত নেই – ভদ্রলোকদের এই নিশ্চিন্ত, আত্মপ্রতারক ধারণার গোড়া ধরে টানতে গেলে ঈর্ষা দেখানো দরকার ছিল। যে ঈর্ষায় ভদ্রলোকেরা অথৈয়ের মত সংরক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রদের বলে – সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো। যৌন ঈর্ষার চেয়ে বড় ঈর্ষা নেই। তাই শেক্সপিয়রের নাটকে ইয়াগোর চক্রান্তের মূলে ছিল ক্যাসিওর প্রতি ঈর্ষা, কারণ ওথেলো তার বদলে ক্যাসিওর পদোন্নতি ঘটিয়েছে। অর্ণর চিত্রনাট্যে গোগোর ঈর্ষা কিন্তু অথৈকেই, এবং তা চরমে পৌঁছেছে নিজের কামনার বস্তু দিয়া অথৈকে ভালবেসে তার সঙ্গিনী হয়ে যাওয়ায়।

গোগোর চরিত্রের দিকনির্ণয় করে তার যৌন হতাশা। অথৈ জানে গোগো তার প্রাণের বন্ধু। দুজনের অনেক মিল। দুজনে একই পুরুষের অভিভাবকত্বে একই বাড়িতে বড় হয়েছে। একই স্কুলে, একই মেডিকাল কলেজে পড়েছে। কিন্তু অথৈয়ের শয্যায় থাকে দিয়া, গোগোর শয্যাসঙ্গিনী অকালমৃতা মায়ের ছবি। দুজনেই মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য স্বপ্নে দেখে ঘেমে নেয়ে জেগে ওঠে। কিন্তু অথৈকে শান্ত করে বিছানায় ফিরিয়ে আনার জন্য আছে দিয়া, গোগোর আছে শুধু অয়দিপাউস এষণা। মিলির সঙ্গে ভিনসুরার এক ভাঙা বাড়িতে সঙ্গমে তার শরীর সাময়িক সুখ পায়, তার মন শান্তি পায় না।

ভিনসুরা কোথায়? যাঁরা ভাবেন বাংলায় আছে ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়    ছোটো ছোটো গ্রামগুলি’, তাঁরা ভিনসুরাকে খুঁজে পাবেন না। কিন্তু যাঁরা গজদন্তমিনারে থাকেন না, তাঁরা জানেন ভিনসুরা যে কোনো শহরের মতই পাপবিদ্ধ। সেখানে সুন্দরী মেয়ের বাথরুমে উঁকি মারার চেষ্টা করে গ্রামের গাঁটকাটা, কোনো মেয়ের ফেলে যাওয়া ওড়না নিয়ে হস্তমৈথুন করে পাঁড় মাতাল, বোকা রসিকতায় একদল মেয়ের মন জয় করার চেষ্টা করে সুদর্শন যুবক, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দায়সারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হয় এবং তাতে মন ওঠে না গ্রামের অল্পবয়সীদের। ছেলেরা তো বটেই, গ্রামের মেয়েরাও চটুল আইটেম নাম্বারে মত্ত হয়ে নাচে।

বাঙালি দর্শকের সিনেমা দেখার চোখ কান হয় আবর্জনা, নয় ওপরচালাক ছবি দেখে দেখে এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সাধারণ দর্শক শুধু নয়, পেশাদার সিনেমা আলোচকরাও আইটেম নাম্বারে কেবল নর্তকীর শরীরটুকুই দেখতে পান। গানের কথাগুলো খেয়ালই করেন না। তাই এই ছবির আলোচনায় এক জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকে লেখা হয়েছে, আইটেম নাম্বারটা নাকি অপ্রয়োজনীয় এবং হাস্যকর। কী সেই গানের কথাগুলো?

ওরে তুই ভালোর দলে নাম লিখিয়ে
কী-ই বা পেলি বল
কে করল কদর তোর ভালোকে
(সবাই) পাল্টে নিল দল

(ওরে) আর কতকাল থাকবি বোকা
ভালোর ঘরে শুধুই ধোঁকা
(এসব) ভালোর পোকা পায়ে মাড়িয়ে
দ্বন্দ্ব ভুলে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা

ওরে তুই মন্দ হয়ে মজা পাবি
অন্ধকারে ঘর সাজাবি
থাকবি আলোর থেকে দূরে
সাঁতার দিবি রাত পুকুরে

দেখলি অনেক ভালোবেসে
শূন্য পেলি দিনের শেষে
(এবার) যুগের তালে মোহের বিষে
অন্ধ হয়ে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা।

সেই অ্যারিস্টটলের আমল থেকে ট্র্যাজেডি কী, ট্র্যাজিক নায়ককে কেন ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। পণ্ডিতরা বলেছেন ট্র্যাজিক নায়কের চরিত্রে এমন একটা উপাদান (tragic flaw) থাকে যা তাকে অনিবার্যভাবে ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দেয়। সেই উপাদানের নাম দেওয়া হয়েছে – হ্যামার্শিয়া (Hamartia)। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাকবেথের বেলায় সেই উপাদান উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হ্যামলেটের বেলায় সিদ্ধান্তহীনতা, ওথেলোর বেলায় সন্দেহ বা ঈর্ষা। কিন্তু আধুনিক সমালোচকদের মতে হ্যামার্শিয়া কোনো চারিত্রিক উপাদান নয়, আসলে ওটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভ্রান্তি (error of judgment)। অথৈয়ের ভ্রান্তিটা তাহলে কী?

সে ভিনসুরাকে, সেখানকার মানুষকে বড় বেশি ভালবাসে, সেই ভালবাসায় অন্ধ হয়ে তাদের ভাল করতে চায়। সে সগর্বে বলে ‘এটা আমার ভিনসুরা’। সে ভিনসুরার সকলকে নিজের মত মনে করে। মুকুলকে (ক্যাসিও), গোগোকে (ইয়াগো), এমনকি দিয়াকেও (ডেসডিমোনা)। কিন্তু তারা মোটেই অথৈয়ের মত নয়। একথা উপলব্ধি না করাই অথৈয়ের ট্র্যাজেডির কারণ। সে যদি মুকুলের এক রাতের মাতলামি ক্ষমা করে দিতে পারত, যদি গোগো তার সঙ্গে এক নোংরা খেলা খেলছে সন্দেহ করেও তাকে বিশ্বাস করে না বসত, যদি দিয়ার মুকুলের প্রতি স্নেহ বুঝতে পারত – তাহলে তার পরিণতি ট্র্যাজিক হত না। কিন্তু আসলে যে ভিনসুরা তার নয়, ভিনসুরার সবাই তার মত নয় – একথা বোঝার ব্যর্থতাই অথৈকে ট্র্যাজিক নায়কে পরিণত করে। ভদ্রলোকেদের ভিনসুরায় অথৈকে একা করে দেয় তার জাতি পরিচয়। সেই পরিচয়জনিত অতীতের বিষময় স্মৃতি, তা থেকে জন্ম নেওয়া হীনমন্যতাই দিয়ার প্রতি আর মুকুলের প্রতি তার সন্দেহকে পুষ্ট করে। অথচ ওই অতীতকে সে ভুলতে পারে না, কারণ সে সগর্বে বলে, অতীতটাই তার পুঁজি।

প্রিয় ভিনসুরার সঙ্গে তার এই অমিল ফুটিয়ে তুলতে যথার্থ ভূমিকা নিয়েছে ওই আইটেম নাম্বার। সকলের উদ্দাম নৃত্য দেখে অথৈ যখন দিয়াকে নিয়ে স্থানত্যাগ করে, তখন পর্দা জুড়ে লেগে থাকে বিষাদ। হাঁ করে আইটেম নাম্বারের আইটেমের দিকে তাকিয়ে থাকলে অবশ্য তা চোখ এড়িয়ে যাবে।

হয়ত নির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে অর্ণর এটা প্রথম ছবি বলে এবং সৃজনশীল পরিচালক হিসাবে সঙ্গে অনির্বাণ ছিলেন বলে এ ছবিতে সাবধানী হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষার কোনো খামতি নেই। কোনটা সফল হয়েছে, কোনটা ব্যর্থ – তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু বাংলা ছবির বাঁধা ছকের একেবারে বাইরে চলে গিয়ে যে এ ছবি বানানো হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতখানি পরীক্ষামূলক হওয়া সম্ভব হত না সৌমিকের অসাধারণ ক্যামেরার কাজ এবং সংলাপের সম্পাদনা ছাড়া। অর্ণ (অথৈ) আর অনির্বাণের (গোগো) অভিনয় দক্ষতার সবটুকু সৌমিকের ক্যামেরা চেটেপুটে নিয়েছে অসাধারণ সব ক্লোজ আপে, আলো আর অন্ধকারের বৈচিত্র্যে, রঙিন আলোর শিহরণ জাগানো ব্যবহারে। অবিস্মরণীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যখন দিয়ার (সোহিনী) প্রতি অথৈয়ের বিশ্বাস একেবারে ভেঙে পড়ে। তারই সঙ্গে ভেঙে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, শহিদ মিনার – স্মৃতির শহরের, ভদ্রলোকদের তৈরি প্রেমের শহরের একেকটা স্তম্ভ।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

আজকের বাংলা ছবির পক্ষে বিরল যত্ন রয়েছে এই ছবির শব্দ ব্যবহারেও। সুগত, দেবাশিস, প্রসূন, অনিন্দিতরা সচরাচর কানে আসে না নেপথ্যের যেসব শব্দ, সেগুলোকেও দর্শকের কানে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আখ্যান তার মধ্যে দিয়েও কথা বলেছে। দূরাগত মাইকের বা চলমান পথিকের গুনগুন গানও কানে এসেছে।

এবার অভিনয়ের কথায় আসা যাক। এই চিত্রনাট্য অতি উচ্চমানের অভিনয় দাবি করেছিল। সাধারণ অভিনয় দিয়ে ভিনসুরার লোধা ডাক্তার অথৈয়ের দুনিয়ার ভাঙনকে জলবায়ু পরিবর্তন বা গাজার গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। এই অসাধ্য সাধন করেছেন অর্ণ। গত কয়েক বছরে কলকাতার থিয়েটার জগতে যে তরুণ অভিনেতারা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছেন, অর্ণ তাঁদের অন্যতম। কিন্তু বড় পর্দায় এত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁকে আগে দেখা যায়নি। এই অভিনয় কেবল চোখে পড়ার মত নয়, মনে থেকে যাওয়ার মত। অনির্বাণের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মুহূর্তগুলোই হোক বা সোহিনীর সঙ্গে প্রেম-অপ্রেমের অতি দ্রুত যাতায়াতের মুহূর্ত – অর্ণর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সবকিছু কথা বলেছে। একজন সৎ, হৃদয়বান মানুষ থেকে পশুত্বে ক্রমাবতরণ তিনি নিজের মুখে এঁকেছেন সফলভাবে।

শেক্সপিয়রের ডেসডিমোনা আর বিশাল ভরদ্বাজের ডলি – দুজনের চেয়েই বেশি স্বাবলম্বী ও স্বাধীনচেতা এই ছবির দিয়া। তাকে নায়ক তুলে আনেনি, সে স্বেচ্ছায় নিজের পরিবার ও কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে অথৈয়ের সঙ্গে গণ্ডগ্রামে এসে ঘর বেঁধেছে। এই চরিত্রে সোহিনীর নারীবাদ কখনো শাপমোচন (১৯৫৫) ছবির সুচিত্রা সেনের মত নীরব আত্মবিশ্বাসী, আবার কখনো হলিউডি নায়িকাদের মত সোচ্চার। সোহিনী পর্দায় পাগলের মত প্রেম করেছেন, আবার যার জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করে আসা, তাকে ঠিক সময়ে ঘা মেরে বাঁচানোর চেষ্টাতেও তিনি সপাট। গলা তুলে বলেন, আসলে তো অথৈয়ের প্রশ্ন এটা নয় যে দিয়া মুকুলকে ভালবাসে কিনা। আসল প্রশ্ন হল সে মুকুলের সঙ্গে শুয়েছে কিনা। সোহিনীকে কিছুটা নিষ্প্রভ দেখিয়েছে ক্লাইম্যাক্সে, যখন চলে যাওয়া প্রেমের দিন স্মরণ করে দিয়া গাইছে ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’।

এই নিষ্প্রভতার কিছুটা দায় অবশ্য চিত্রনাট্যকারকেও নিতে হবে। কারণ ওই গান যে অথৈ আর দিয়ার ব্যক্তিগত গান ছিল, তা একবারও দুজনে মিলে গোটাটা না গাওয়ায় খুব ছাপ ফেলেনি। ফলে শেষে ওই গানের অভিঘাত তেমন তীব্র হয় না। চিত্রনাট্যের এই খামতির সঙ্গে একটা বাহুল্যের উল্লেখও করতে হয়। স্টিফেন মোফাত নির্মিত বিবিসির শার্লক ওয়েব সিরিজের পর থেকে অনেক সিরিজ এবং ছবিতেই দেখা যায়, ফ্ল্যাশব্যাক দেখানোর সময়ে বর্তমানের চরিত্র সেখানে উপস্থিত। অথৈ ছবিতেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে অথৈ আর গোগোর ছোটবেলা দেখাতে। কিন্তু ততক্ষণে গোগোর বর্ণনায় এবং অন্যান্য দৃশ্যের কারণে দর্শকের পক্ষে আর বোঝা শক্ত নয় যে ছোট ছেলে দুটো কে, কাদের শৈশব দেখানো হচ্ছে। সুতরাং সেখানে আর প্রাপ্তবয়স্ক গোগোকে না দেখালেও চলত।

‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ একবার শোনা গেছে অনির্বাণের গলায়, অথৈয়ের সংবর্ধনা সভায়। অনির্বাণ যে সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী তা এতদিনে বাংলা সিনেমা ও নাটকের দর্শকরা জেনে গেছেন। সেই অনির্বাণের ছবির প্রয়োজনে ঈষৎ বেসুরো করে গাওয়া মুনশিয়ানার পরিচায়ক। মঞ্চসফল অথৈ নাটকে অনির্বাণ প্রায় সারাক্ষণ মঞ্চে থাকতেন, ছবিতেও বেশিরভাগ সময়েই পর্দায় তিনি উপস্থিত। এতখানি পরিশ্রম তাঁর অভিনয়ে একবারও ছায়া ফেলেনি। ফুর্তিবাজ অথচ কুটিল, দিলখোলা অথচ নির্দয় গোগো হিসাবে তিনি সারাক্ষণই ফুরফুরে মেজাজ বজায় রাখতে সফল। বস্তুত তাঁর সূক্ষ্ম নির্দয়তা এত প্রবল যে মাঝে মাঝে হেমেন গুপ্তের ৪২ ছবির বিকাশ রায়ের কথা মনে পড়ে যায়। বাংলা ছবি নিয়ে সেই উন্মাদনার যুগ অতিক্রান্ত। নইলে বিকাশ রায়কে দেখে লোকে যেমন ঢিল ছুড়ত শোনা যায়, তেমন অনির্বাণের দিকেও হয়ত উড়ে যেত কিছু চটি জুতো। মোটামুটি ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহেও তাঁর দিকে বর্ষিত দু-একটা অভিশাপ কানে এল। এই চরিত্রের অভিনেতার জন্যে তা স্বর্ণপদকের সামিল। এই বহুস্তরীয় চরিত্রের জটিলতা বিচার করলে এটা কি এ পর্যন্ত সিনেমায় অনির্বাণের সেরা অভিনয়? তাঁর ভক্তরা ভেবে দেখতে পারেন।

মুকুলের চরিত্রে অর্পণ, মিলির চরিত্রে মিমি, পিঙ্কির চরিত্রে দিতিপ্রিয়া, রাধুর চরিত্রে সুমিত, মন্টুর চরিত্রে মিলন যথাযথ। গোগোর বাবার চরিত্রে প্রবীণ অভিনেতা কৌশিককে অবশ্য কিছুটা দ্বিধান্বিত মনে হয়। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি তাঁর কতটা কী করা উচিত।

শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটক কীভাবে শেষ হয় সকলেই জানেন, তাই এখানে স্পয়লার দেওয়ার ভয় নেই। অথৈও শেষ হয় একাধিক মৃত্যুতে। কিন্তু অনিবার্য মৃত্যুগুলোকে যে ক্যানভাসে এঁকেছে অর্ণর চিত্রনাট্য, তাতে যেন পড়া যায় অদৃশ্য কালিতে লেখা

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

ছোটলোক অথৈয়ের ট্র্যাজিক পরিণতি সত্ত্বেও ভদ্রলোক গোগোর চক্রান্ত তাই ব্যর্থ হয়ে যায়। ট্র্যাজেডির মারে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ার ছেড়ে ওঠা যায় না।

বাংলা সিনেমার পক্ষে অবশ্য এ ছবি ট্র্যাজেডি নয়, বরং রীতিমত আশাব্যঞ্জক। অর্ণ স্রেফ এমন একখানা চিত্রনাট্যের জন্যেই প্রশংসা পেতে পারতেন। সঙ্গে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার উঁচু দরের অভিনয়ও করেছেন। অনির্বাণও নির্দেশনার কাজে হাত লাগানোর পাশাপাশি ছবির গান লিখেছেন, এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনায়াস দক্ষতায় অভিনয় করেছেন। একই প্রজন্মে এমন দু-দুজন শিল্পী যে ইন্ডাস্ট্রির সিনেমায় আছেন, সেই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে একেবারে আশা ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।

এ ছবির পাশে দাঁড়াতে হবে না, স্বচ্ছন্দে সামনে বসা যায়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ইতিহাসের হদ্দমুদ্দ ও আধসেদ্ধ মার্কসবাদে চিঁড়েচ্যাপটা ব্যোমকেশ

ইদানীং পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে প্রবল ইতিহাসপ্রীতি তৈরি হয়েছে। ফলে ইতিহাসাশ্রিত গল্প, উপন্যাস, ছায়াছবি, ওয়েব সিরিজের আধিক্য। ইতিহাসের প্রেমে গুণী বাঙালিরা এতই ডগমগ যে গোয়েন্দা কাহিনি নিয়ে ছবিও তৈরি করা হচ্ছে পিরিয়ড পিস হিসাবে। সেই কাহিনিগুলির মধ্যে আবার পরিচালকদের বিশেষ পছন্দ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীকে। ইতিহাস শরদিন্দুর অতি প্রিয় লেখার বিষয়। একাধিক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন, ঐতিহাসিক গল্পও লিখেছেন অনেকগুলি। ব্যোমকেশের গল্প, উপন্যাসেও ইতিহাস টেনে এনেছেন অনেক জায়গাতেই। তেমনই একটি উপন্যাস দুর্গরহস্য। টালিগঞ্জ পাড়ার রাঘব বোয়ালদের ইতিহাসপ্রীতি ও গোয়েন্দাপ্রীতির ঠ্যালায় একই বছরে সেই দুর্গরহস্য নিয়ে দু-দুটো ছবি (একটি বড় পর্দার জন্যে, অন্যটি ওয়েব সিরিজ হিসাবে) তৈরি হয়ে গেল। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবির যা অবস্থা তাতে দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী (২০১৫) ছবির মত নিখুঁত সেট তৈরি করে যে সময়কাল দেখানো হচ্ছে তখনকার কলকাতা শহর বানিয়ে ফেলা অসম্ভব। কারণ অত রেস্ত নেই। তা সত্ত্বেও টালিগঞ্জের অকুতোভয় পরিচালকরা পিরিয়ড পিস বানিয়ে চলেছেন। ব্যাপারটি খুবই প্রশংসাযোগ্য হতে পারত, যদি ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গেলে ইতিহাস যে মন দিয়ে পড়তেও হয় – একথা তাঁরা মাথায় রাখতেন। সচরাচর রাখেন না, হইচই অ্যাপে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দুর্গ রহস্য (উপন্যাসের নামটিকে দুই শব্দে ভাঙার নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় তাৎপর্য আছে যা প্রাজ্ঞ দর্শক ধরে ফেলবেন) ওয়েব সিরিজের পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ও রাখেননি।

শিল্পীর স্বাধীনতা প্রয়োগ করে উপন্যাসের ঘটনাবলীকে তিনি বিশ শতকের প্রথমার্ধের বদলে ছয়ের দশকে স্থাপন করেছেন, যখন পশ্চিমবঙ্গ তথা সাঁওতাল পরগণায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অসুবিধা ছিল না, গোলমাল বেধেছে যেখানে উপন্যাসের অনুসরণেই সিপাহী বিদ্রোহ দেখানো হয়। সেই অংশে দুর্গ দখল করে নেওয়া সিপাহীদের দলের নেতা এক বাঙালি। ইতিহাস বলছে ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের হাত দিয়ে শুরু হয়ে থাকলেও বাংলায় সিপাহী বিদ্রোহ বিশেষ প্রভাব ফেলেনি। তবু শিল্পীর স্বাধীনতার খাতিরে বাঙালি নেতাকে না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু সেই নেতা ১৮৫৭ সালে বসে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” বলেন কী করে? একথা সর্বজনবিদিত যে ওই স্লোগানটির উৎস ফরাসী বিপ্লবের ‘ভিভা লা রেভল্যুসিওন’। ওই স্লোগান ভারতে এসে হসরত মোহানির কল্যাণে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এ পরিণত হয় বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ভারতীয় বামপন্থীদের লব্জে। আর সব স্লোগানের মতই ওই স্লোগানকে জনপ্রিয় করে তোলায় অনেকের ভূমিকা আছে, যাঁদের মধ্যে ভগৎ সিংও একজন। বাংলা ভাষায় ওই স্লোগান নিজস্ব চেহারা পেয়েছে হয় একই সময়ে অথবা আরও পরে। সিপাহী বিদ্রোহ তো এসবের ৭০-৮০ বছর আগেকার কথা। সেই বিদ্রোহের নেতার মুখে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” স্লোগান মেনে নেওয়া যায় বামপন্থীদের ব্যঙ্গ করে তৈরি কোনো ওয়েব সিরিজে, পিরিয়ড পিসে নয়।

পরিচালক শুধু ইতিহাসের হদ্দমুদ্দ করলেও কথা ছিল, এই স্লোগানটি ব্যবহার করে তিনি রাজনীতিরও সাড়ে বারোটা বাজিয়েছেন। কারণ কোনো মতের ঐতিহাসিকই সিপাহী বিদ্রোহের কোনো বিপ্লবী উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করেননি। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন “এই সিদ্ধান্ত এড়ানো শক্ত যে তথাকথিত প্রথম জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ না প্রথম, না জাতীয়, না স্বাধীনতার যুদ্ধ।” [ভাষান্তর আমার] রমেশচন্দ্রের ইতিহাস পাঠ অবশ্য মার্কসবাদীদের সঙ্গে মেলে না, আর সৃজিত এই ছবিতে প্রবল মার্কসবাদী (হয়ত মৃণাল সেনের বায়োপিক তৈরির মহড়া হিসাবে)। কিন্তু মার্কসবাদী হলে তো ‘বিদ্রোহ’ আর ‘বিপ্লব’ শব্দদুটির অর্থগত ফারাক বোঝা উচিত। বিশেষত মার্কসবাদীরা বিপ্লব বলতে যা বোঝেন তার সঙ্গে সিপাহী বিদ্রোহের লক্ষ্য যে একেবারেই মেলে না, সেকথা বোঝাও খুব শক্ত নয়। সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ ছিলেন লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে শাসনক্ষমতা হারানো বা কোণঠাসা হয়ে যাওয়া রাজন্যবর্গ। ওই বিদ্রোহের অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ের এই তথ্যগুলি জানলেও বোধহয় নকশাল আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল পরিচালক ওই স্লোগান সিপাহীদের মুখে বসাতেন না। পড়াশোনা করার সময় না থাকলে সত্যজিৎ রায়ের শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭) ছবিটা দেখে নিলেও চলত। সত্যজিৎ অ্যানিমেশন ব্যবহার করে প্রায় শিশুদের বোঝার যোগ্য করে ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি এবং তার ফলাফল বুঝিয়েছেন। কোথায় ইংরেজদের তাড়িয়ে দেশিয় রাজন্যবর্গের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিদ্রোহ আর কোথায় জোতদার জমিদার উচ্ছেদ করতে, ভারতে সমাজবিপ্লব আনতে নকশালবাড়ি আন্দোলন!

অবশ্য এই ওয়েব সিরিজের পরিচালক সত্যজিতের ছবি দেখতে যাবেন কোন দুঃখে? তিনি তো গোড়াতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সত্যজিতের প্রতিস্পর্ধী। তাঁর ব্যোমকেশও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) স্বয়ং উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ তার গিন্নী সত্যবতী (সোহিনী সরকার) আর বন্ধু অজিতকে নিয়ে চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) ছবিটি দেখতে গেছে। তারপর অজিত (রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জি) বেরিয়ে এসেই রেগেমেগে ঘোষণা করে দেয় যে সে আর কোনোদিন সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ – কাউকেই ব্যোমকেশ নিয়ে ছবি করতে দেবে না। কারণ সত্যজিৎ ব্যোমকেশকে চশমা পরিয়েছেন। এতদ্বারা সৃজিত আগের সবকটি সিজনের চশমা পরা ব্যোমকেশ অনির্বাণের চশমা হরণের একটি যুক্তি খাড়া করলেন (এত বকবকানির পরেও একটি বাহারি রোদচশমা কিন্তু পরানো হয়েছে)। এই কর্মটি ছাড়া, আর অনির্বাণকে উত্তমকুমারের সঙ্গে এক ফ্রেমে দাঁড় করিয়ে বাঙালির নস্ট্যালজিয়ায় সুড়সুড়ি দেওয়া ছাড়া, ওই দৃশ্যের আর যে কী সার্থকতা তা ছটি পর্বের আগাপাশতলা দেখেও বোঝা গেল না। পরিচালকের কেন যে মনে হল বাংলা ছবির প্রবাদপ্রতিম পরিচালকদের একালের লোকেদের মত গোয়েন্দা গল্প নিয়ে ছবি করার উৎসাহ ছিল – তাও বোঝা শক্ত। ইতিহাস তো বলছে সত্যজিৎ চিড়িয়াখানা ছবিটিও বানিয়েছিলেন তাঁর ইউনিটের দীর্ঘকালীন সহকর্মীরা বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন বলে। এমনকি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বলতে শুনেছি, জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯) ছবিটিও সত্যজিৎ করেছিলেন বিশেষ প্রয়োজনে। একমাত্র সোনার কেল্লা (১৯৭৪)-ই ভালবেসে তৈরি করা। ইতিহাসের কথা আর না বাড়ানোই ভাল, কারণ ওটি কোনোকালেই সৃজিতের জোরের জায়গা নয়। অনতি অতীতে দার্জিলিং দেখাতে গিয়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ভুল পতাকা দেখিয়ে ফেলেছিলেন, আটের দশকের কলকাতা বিমানবন্দরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়ার পোস্টার দেখিয়েছিলেন। গুমনামী নামের আস্ত ছবিটিই তো অনুজ ধর নামক এক ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিককে ঐতিহাসিক বানিয়ে করা। পরে সত্যিকারের ঐতিহাসিক সুগত বসুর মুখোমুখি হয়ে ছবির ইতিহাসের দিকটি সম্পর্কে উত্তর দিতে গিয়ে সৃজিত বিস্তর খাবি খেয়েছিলেন। অতএব এই ওয়েব সিরিজের অন্য দিকগুলি নিয়ে কথা বলা যাক।

সত্যতা থাকুক আর না থাকুক, তেলেভাজার দোকান সম্পর্কে একটি কথা খুব চালু। দোকানিরা নাকি একই তেলে দিনের পর দিন চপ, বেগুনি ইত্যাদি বানিয়ে যায়। সৃজিতের বরাবরের মুনশিয়ানা এই কাজটিতে। তিনি বিদেশি ছবির, জনপ্রিয় পুরনো বাংলা ছবির, অধুনা নিজের ছবিরও রিমেক, সিকুয়েল, প্রিকুয়েল ইত্যাদি বানাতে ওস্তাদ। তিনি পুরনো তেলেই ঈষৎ পরিবর্তিত রন্ধন প্রণালীতে তেলেভাজা বানান মাত্র কয়েক মাসে আর দর্শক তা লাইন দিয়ে খায় – এই হল তাঁর সাফল্যের ইতিহাস। তা দুর্গ রহস্যে কী কী পরিবর্তন এল? প্রথমত, সত্যবতীকে দিয়ে বেশকিছু নারীবাদী সংলাপ বলানো হল। অগাস্ট মাসে মুক্তি পাওয়া বিরসা দাশগুপ্তের ব্যোমকেশ ও দুর্গরহস্য ছবির মতই এখানেও সত্যবতী শরদিন্দুর অভিপ্রায় অনুযায়ী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দাদা সুকুমারের জিম্মায় না থেকে, ব্যোমকেশ আর অজিতের সঙ্গে রহস্যের অকুস্থলে গেছে। শুধু তাই নয়, বিরসা গর্ভবতী সত্যবতীকে দুর্গে পাঠিয়েছিলেন একেবারে শেষে। সৃজিতের সত্যবতী আরও তেজিয়ান, তার ব্যোমকেশের প্রতি প্রেম আরও প্রবল। তাই সে গর্ভাবস্থাতেও দুর্গে পৌঁছে যায়। বিরসা একটি অহেতুক রবীন্দ্রসঙ্গীত ঢুকিয়েছিলেন ব্যোমকেশ-সত্যবতীর প্রেম বোঝাতে, সৃজিত সঙ্গীতের সঙ্গে লাজুক যৌনতাও এনেছেন। স্বদেশ মিশ্র রচিত, তমালিকা গোলদার সুরারোপিত গানের মধ্যে দিয়ে সেসব এমনি এমনি এসেছে। সবই ঠিক ছিল, কেবল প্রসববেদনা ওঠার পরে নারীবাদী সত্যবতী কেন দুম করে সেকালের রাজপুত মহিলাদের মত “আগে ধর্ম, তারপর সহধর্মিণী। আগে সত্য, তারপর সত্যবতী” বাণী দিয়ে দিল তা দুর্বোধ্য। এই ওয়েব সিরিজের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা সৃজিত একজন পুরুষ। ফলত প্রসববেদনা অনুভব করা তাঁর পক্ষে যে সম্ভব নয় তা জানা কথা। কিন্তু সংবেদনশীলতা বলে একটি জিনিস আছে, যা যে কোনো মাধ্যমের শিল্পী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। সেটুকু থাকলেই বোঝা যায়, গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে যখন ব্যথার চোটে ঘাম দিচ্ছে, তখন একজন গর্ভবতীর পক্ষে দার্শনিক হয়ে ওঠা অসম্ভব। তবে রদ্দি হিন্দি ছবির নায়ক-নায়িকাদের বেদনা সহ্য করার ক্ষমতা অন্য স্তরের। সেই কবে আমরা অমিতাভ বচ্চনকে দেখেছি, অমৃতা সিং অনবরত চাবুক মেরে যাচ্ছেন, ক্ষতে নুন ছড়িয়ে মারছেন, তবুও অমিতাভ অনড়। অমৃতা রাগে গরগর করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল? ব্যথা লাগছে না? অমিতাভ উত্তর দিলেন “মর্দ কো দর্দ নহি হোতা।” সৃজিত যদি সত্যবতীর চরিত্রটি সেই আদর্শে লিখে থাকেন, তাহলে অবশ্য কিছু বলার নেই। তবে কিনা ওইরকম অতিনাটকীয় সংলাপ হিন্দি ছবিতেও লেখা হয় না আজ বিশ বছর।

হিন্দি ওয়েব সিরিজে আজকাল নায়িকা হয় মারকুটে পুলিস অফিসার (দহাড় সিরিজে সোনাক্ষী সিনহা)। সে বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু প্রেমিকের সঙ্গে নিয়মিত যৌনতা নিয়ে অপরাধবোধ নেই। গর্ভসঞ্চার আটকাতে গর্ভনিরোধক পিল খেয়ে নেয়। প্রেমিক অন্য শহরে চলে গেলে সেই সম্পর্ক যে রাখা সম্ভব হবে না তা মুখোমুখি বলে দিতেও সংকোচ বোধ করে না। মেয়ে গোয়েন্দা (চার্লি চোপড়া অ্যান্ড দ্য মিস্ট্রি অফ সোলাং ভ্যালি ওয়েব সিরিজে ওয়ামিকা গাব্বি) প্রেমিকের সঙ্গে যৌনতার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে দেয়, অপমানে কান্নাকাটি করে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই ফের সেই খুনের তদন্তে নেমে পড়ে, যাতে প্রেমিকটি বিনা দোষে অভিযুক্ত। কারণ কেসের নিষ্পত্তি না করে সে ছাড়বে না। এইসব করতে এই চরিত্রগুলিকে নারীবাদী বুলি আওড়াতে হয় না। তবে পুরনো তেলে চপ ভেজে গেলে অমন চরিত্র তৈরি করা সম্ভব হয় না।

শরদিন্দুর কাহিনিতে আরও একটি স্বকীয় মোচড় একেবারে শেষে দিয়েছেন সৃজিত, তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে। শুধু এটুকু বলা যাক, যে ও জিনিসও একমাত্র রদ্দি বলিউডি ছবিতেই সম্ভব। বিরসা আর সৃজিত – দুজনের কেউই নিজস্ব মোচড় দিয়ে শরদিন্দুর চেয়ে উন্নত ক্লাইম্যাক্স তৈরি করতে পারেননি। কেবল পরিবর্তনের স্বার্থে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। শরদিন্দুর খলনায়কদের যে মেধা, যে কুটিলতা থাকে, সৃজিতের খলনায়কে তাও ফোটেনি। চিত্রনাট্যে সে সুযোগই রাখা হয়নি। এত দ্রুত ভাজতে হলে হয়ত তেলেভাজার স্বাদে অত সূক্ষ্মতা আনাও যায় না। মা দুর্গার মত দশখানা হাত না থাকা সত্ত্বেও এক পুজোয় সৃজিত দুখানা ছবি বাজারে নামিয়ে দিলেন (বড় পর্দায় দশম অবতার, ওটিটিতে আলোচ্য ওয়েব সিরিজটি) – এতেই বোধহয় আমাদের কৃতার্থ থাকা উচিত। মণিলাল চরিত্রের অভিনেতা দেবরাজ ভট্টাচার্যের বেশভূষা অবিকল বল্লভপুরের রূপকথা ছবিতে তাঁর চরিত্রটির মত হয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া উচিত। ব্যস্ত পরিচালক সবেতে বদল ঘটানোর সময় পাবেন কখন? দেবরাজকে যেভাবে মেগা সিরিয়ালের গৃহবধূদের মত সকালে, বিকেলে, মাঝরাতে ফুলহাতা শার্ট আর গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাও নিশ্চয়ই পরিচালকের ব্যস্ততার পরিণাম।

সঞ্জীব
বল্লভপুরের রূপকথা ছবিতে সঞ্জীবের চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্য
ব্যোমকেশ
দুর্গ রহস্য ওয়েব সিরিজে মণিলালের চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্য

প্রথম পর্বে ব্যোমকেশকে সত্যজিতের চশমা পরানো নিয়ে অজিত যেখানে চটে ওঠে, সেখানে মূল কাহিনিতে পরিবর্তন আনার সপক্ষে ব্যোমকেশকে দিয়ে সৃজিত এমন সংলাপ বলিয়েছেন যাতে বোঝা যায়, তিনি ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ দেখেন এবং বোঝেন। যে দর্শকরা দেখে না তাদের শিক্ষিত করার প্রয়াস ধরা পড়েছে ওই সংলাপে। পরিচালকের এই আত্মরতি মেনে নেওয়া যেত যদি তিনি মাস্টারপিস না হলেও, অন্তত যত্নে নির্মিত একটি সিরিজ উপহার দিতেন। এত অযত্নে নির্মিত শিল্পকর্মের স্রষ্টার এহেন রেলা হজম করা শক্ত। বস্তুত, কাহিনির পরিবর্তনগুলি কাহিনিতে নতুন মাত্রা যোগ করলে দর্শকদেরও বেমানান মনে হয় না, পরিচালককেও তার পিছনে যুক্তি তৈরি করে ছবির মধ্যে ঢোকাতে হয় না। হইচই প্ল্যাটফর্মের জন্যই এর আগে সৃজন নির্দেশক (creative director) অনির্বাণ আর পরিচালক সুদীপ্ত রায় ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল বানিয়েছেন। সেখানে কাহিনির অনেক বেশি পরিবর্তন করা হয়েছিল। সৃজিতের সিরিজে ব্যোমকেশের কেবল চশমা নেই, সেখানে ছিল আরও বড় পরিবর্তন। ব্যোমকেশ চিরাচরিত ধুতি পাঞ্জাবির বদলে আগাগোড়া শার্ট, প্যান্ট পরেছিল। কেবল একেবারে শেষে ভোটদানের সময়ে তাকে ধুতি পাঞ্জাবি পরে দেখা যায়। এসবের যুক্তি দেওয়ার জন্যে আলাদা দৃশ্যনির্মাণের প্রয়োজন হয়নি, একটিও সংলাপ খরচ হয়নি। ওয়ার্ল্ড সিনেমায় পণ্ডিত সৃজিতবাবু এইটুকু আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারলেন না কেন কে জানে। বেদেদের দিয়ে মঙ্গলকাব্য উচ্চারণ করানোর কাজটা তো বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই করেছেন।

এত গোলমাল এবং মন্থর চিত্রনাট্য সত্ত্বেও সিরিজটি যে একটিবার দেখা যায় তার কারণ অভিনেতারা। বংশীধর, মুরলীধর, হরিপ্রিয়া, গদাধর, তুলসীর মত চরিত্রগুলির পর্দায় উপস্থিতি সামান্য। অন্য সব অভিনেতাই নিজের সামর্থ্যের সদ্ব্যবহার করেছেন।

বিরসার ব্যোমকেশরূপী দেব গোয়েন্দাগিরি কম করেছিলেন, সুপার হিরোগিরি বেশি। সৃজিতের ব্যোমকেশরূপী অনির্বাণকে একাধারে উত্তমকুমার, প্রেমিক স্বামী, গোয়েন্দা, সাপুড়ে – সবই হতে হয়েছে। অথচ সে চিড়িয়াখানা দেখে বেরিয়ে বেশ রং নিয়ে বলেছিল, উত্তমকুমারের মত সাপ ধরতে যাবে না। কারণ “আমি সাপুড়ে নই”। সেকথা কি পরিচালক সাপ ধরার দৃশ্য রচনা করার সময়ে ভুলে গিয়েছিলেন? নাকি বিরসার ব্যোমকেশ সাপ ধরেছে বলে সৃজিতের ব্যোমকেশকেও সাপ ধরতেই হত?। যা-ই হোক, এত ভার বইতে হওয়ায় অনির্বাণকে কখনো কখনো ক্লান্ত দেখিয়েছে। গোয়েন্দা হিসাবে নয়, বেশি বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেই। সোহিনী সরকারের সঙ্গে তাঁর চোখের ভাষা যতখানি মিলেছে তা আগের কোনো সিজনে রিধিমা ঘোষের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে প্রেম করার দৃশ্যগুলোতেও মেলেনি।

আরও পড়ুন দেব দেবী মহাদেব আছেন, সত্যান্বেষী নিরুদ্দেশ

এর কৃতিত্ব অবশ্য অনেকখানি সোহিনীরও। সেকেলে বউদের অতিপরিচিত সুরে কথা বলাই হোক আর উঁচু হয়ে থাকা পেট নিয়ে অস্বস্তি সামলে হাঁটাচলা করার অভিনয়ই হোক – কে বলবে তিনি সত্যি সত্যি সত্যবতী নন? গর্ভবতীর অভিনয় মানে যে কেবল পা ফাঁক করে হাঁটা নয়, তা যাঁদের প্রয়োজন তাঁরা এই অভিনয় দেখে শিখতে পারেন। কেবল অনির্বাণের সঙ্গে নয়, অজিতরূপী রাহুলের সঙ্গেও সোহিনী চমৎকার রসায়ন তৈরি করেছেন। চটে যাওয়া দেওরকে “ও-ও ঠাকুরপো” বলে ডেকে মান ভাঙানো দেখলে অনেক দর্শকেরই প্রয়াত জেঠিমা, মাসিমা, ঠাকুমা, দিদিমাদের মনে পড়বে।

প্রথমবার অজিতের চরিত্রে অভিনয় করা রাহুল একটি জিনিস ঘটিয়েছেন যা অতীতের কোনো অজিতরূপী অভিনেতাই সম্ভবত পারেননি। তিনি ব্যোমকেশ আর সত্যবতী, দুজনের সঙ্গেই দারুণ রসায়ন তৈরি করেছেন। ফলে স্রেফ ব্যোমকেশের উপগ্রহ হয়ে থাকেননি, সত্যিই শরদিন্দুর বর্ণনামাফিক বক্সী পরিবারের একজন অপরিহার্য সদস্য হয়ে উঠেছেন। ব্যোমকেশকে বাদ দিলেও অজিতের সঙ্গে যে সত্যবতীর একটি মিষ্টিমধুর সম্পর্ক আছে – এই একান্ত বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন রাহুল। উস্কোখুস্কো চুল, কখনো কখনো দিশেহারা ভাব সত্ত্বেও তিনি একবারের জন্যও কমিক রিলিফে পরিণত হন না। এর কৃতিত্ব পরিচালককেও দিতে হবে। কারণ ইদানীং ফেলুদার ছবিতে লালমোহনবাবুকে আর ব্যোমকেশের ছবিতে অজিতকে ভাঁড়ে পরিণত করা প্রায় সব পরিচালকেরই বদভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিনেতারাও ভাঁড়ের অভিনয়েই উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন। এই সিরিজটি ব্যতিক্রম। এর কৃতিত্ব অবশ্যই চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সৃজিতেরও।

এই পরিমিতিবোধ সার্বিক হলে সৃজিত কিছু অতি বুদ্ধিমান সংলাপের সাহায্যে ব্যোমকেশকে বামপন্থী প্রতিপন্ন করার হাস্যকর চেষ্টাটি করতেন না। শেষে ব্যোমকেশ-সত্যবতীর সন্তানের জন্মকে নকশালদের থানা দখলের সঙ্গে এক করে দিয়ে বিপ্লবের প্রতীকী সাফল্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও করতেন না। ঘটনা হল, নকশালবাড়ি আন্দোলন বিপ্লব আনতে পারেনি। পারেনি বলেই হয়ত যত দিন যাচ্ছে নস্ট্যালজিয়া হিসাবে তার দাম বাঙালি ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের মধ্যে ক্রমশ বাড়ছে। সৃজিত পুরনো তেলে ব্যোমকেশভাজা বানাতে গিয়ে রন্ধনে এই মশলাটি যোগ করেছেন।

প্রযোজক দেব আর পরিচালক বিরসার তেলেভাজার মশলাটি ছিল হিন্দুত্ববাদ, প্রযোজক শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস আর পরিচালক সৃজিতেরটি আধসেদ্ধ মার্কসবাদ। বেচারা ব্যোমকেশ।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত