‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ একটা না-হওয়া বাংলা ছবি

নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

প্রিয় ইমতিয়াজ,

আপনার নতুন ছবি দেখতে যাওয়ার মূল কারণ ছিল প্রেম। প্রেমের গল্প পড়তে ভালো লাগে, প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে এবং রোম্যান্টিক সিনেমা বানানোয় আপনার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। জব উই মেট তো আমার প্রজন্মের অনেকের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি। সেই কারণে বলিউডের যুদ্ধের বাজারে আপনি প্রেমের ছবি বানিয়েছেন জেনেই দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। যাদের রুচিকে ভরসা করি, তারা অনেকে দেখে এসে প্রশংসা করায় দেখার ইচ্ছে আরও বেড়েছিল। একটু-আধটু লিখি এবং লিখলে কেউ কেউ মন দিয়ে পড়ে, তাই ছবিটা দেখে লিখব বলেও ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে গিয়ে সব গোলমাল হয়ে গেল। মানে ভেবেছিলাম, যেভাবে আর পাঁচটা ছবি নিয়ে লিখে এসেছি এতদিন, সেভাবেই চুলচেরা বিচার করব। প্রবাদপ্রতিম নাসিরুদ্দীন শাহের অভিনয়, এ আর রহমানের সেই রোজা (১৯৯২) ছবির মত অপাপবিদ্ধ সঙ্গীত, তরুণ ও নয়নাভিরাম নায়ক-নায়িকা (বেদাঙ্গ রায়না ও শর্বরী ওয়াঘ) আর দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘দিল’ জিতে নেওয়া অভিনয়, প্লেব্যাক শিল্পীদের প্রতি (বিশেষত দীপালি সহায়ের প্রতি) আমার মুগ্ধতা, আপনার গল্প বলার চিরাচরিত মুনশিয়ানা ইত্যাদি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়, কারণ এ ছবি অত্যন্ত ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং ব্যক্তিগত কথাগুলোই বলা যাক। বাংলা ভাষার সুবিধা হল, এ চিঠি আপনার কাছে পৌঁছবে না। অতএব আপনাকে বলার অছিলায়, যাদের কাছে পৌঁছবে তাদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিমত ভাগ করে নেওয়া, তাদের ভাবনাকে উস্কে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রেম ঢেলে দেওয়ার জন্যে যেমন একজন পাত্র লাগে, তেমন মনের কথা খুলে বলতেও একজন পাত্র লাগে। তাই আপনাকে খাড়া করা।

ছবির ক্রেডিট রোল হওয়া শুরু হতেই ১৯৯০-৯১ সালের কথা মনে পড়ে গেল, বুঝলেন? তখন আমার বয়স ৮-৯ বছর। একদিন গভীর রাতে বাবা টিভি চালিয়েছেন সিনেমা দেখবেন বলে। আমিও সিনেমার আকর্ষণে জেগে রয়েছি (সদ্য দ্বিতীয়বার মা হওয়ায় আমার মা আমাকে বকে ঘুম পাড়ানোর অবস্থায় নেই, বাবা বরাবর প্রশ্রয়দাতা)। ছবিটা বাংলা, কিন্তু সিনেমার শুরুতে নাম দেখানোর সময়ে নারীকণ্ঠে ঝাঁ ঝাঁ করে এমন একখানা গান বেজে উঠল, যে ধরনটা আমার একেবারে অপরিচিত। তার কথাগুলো

আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর
কলাতলায় বিয়া
আইলেন গো সুন্দরী জামাই
মুটুক মাথায় দিয়া।

সঙ্গে উলুর শব্দ ছিল, বাবাও বললেন— এটা বিয়ের গান, সাবেকি বাঙালি বিয়ের গান। ছবিটা পুরো দেখেছিলাম, কিন্তু বিশেষ বুঝতে পারিনি তখন। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম, দুটো কারণে— ১) বাবা ছবিটা দেখতে দেখতে কাঁদলেন, ২) ছবিটায় কোনো বিয়ের দৃশ্য নেই। তাহলে শুরুতে বিয়ের গান কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বারো বছর, আমাদের বাংলা মতে এক যুগ। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক বাংলার পাঠ্যবইতে ঋত্বিক কুমার ঘটকের একখানা প্রবন্ধ ছিল, যার শিরোনাম ‘আমার ছবি’। উনিই ছোটবেলায় প্রথম দেখা সেই ছবির পরিচালক। ওই লেখায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে শুরুতেই বিয়ের গান রেখেছিলেন, কারণ তাঁর অন্তরের অভিলাষ— আলাদা হয়ে যাওয়া দুই বাংলার মিলন হোক। বিয়ে মানেই তো মিলন। এই ছবিটা— কোমল গান্ধার (১৯৬১)— নির্ঘাত আপনার দেখা। নইলে আপনার ছবিতে বিভক্ত পাঞ্জাব প্রেমিক-প্রেমিকার (ঈশার আর আফসানা) না-হওয়া বিয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় কেমন করে? যে মিলন হল না, তা নিয়েই তো আপনার আখ্যান। ঋত্বিক যে বাসনা বিমূর্ত রেখেছিলেন, তা-ই যেন আপনার ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

কাঁচা বয়সের বুক টনটন করা প্রেম, টিন্ডার/বাম্বল যুগের বাঁধন এড়াতে চাওয়া প্রেম, বুকের গভীরে সারাজীবন প্রদীপের মত জ্বালিয়ে রাখা প্রেম— সবই আপনি দেখিয়েছেন একেবারে জ্যান্ত করে। সে প্রত্যাশা আপনার কাছে ছিলই। কিন্তু আপনি যে ঘৃণা পেরিয়েও প্রেমের বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে বলে দেখাবেন, তা-ও আবার দেশভাগের সময়কার বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুপুঙ্খ উল্লেখ সমেত— এতটা কল্পনা করিনি। আসলে পূর্বপুরুষের প্রেমের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া নির্বৈর সিং গ্রেওয়ালের যুগে দাঁড়িয়ে, ঘৃণার পর্ব পেরিয়েও যে প্রেম টিকে থাকে— এই বিশ্বাস রাখা আমাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কে যেন বলেছিলেন, হলোকস্ট দেখার পরে আর কবিতা লেখা যায় না? গরুর জন্যে মানুষ হত্যা দেখার পরে, গাজা দেখার পরেও কি আর প্রেমে বিশ্বাস রাখা যায়? আপনি রেখেছেন, তাই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা যে এক সিংহহৃদয় ছবি তা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই। তবে সব ভালোলাগা পেরিয়েও বাঙালি হিসাবে আপনার ছবি আমার মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। নির্বৈর পূর্বপুরুষের প্রেম সন্ধান করতে করতে পাপেরও হদিশ পেয়েছে। আমারও সেই দশা। খুলে বলি।

আপনি যে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তু আর বাঙালি উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাকে একই নজরে দেখেন তার পর্যাপ্ত প্রমাণ এই ছবিতে রেখেছেন। একটা নিদারুণ গানে চার লাইন বাংলা রেখেছেন, স্টক শটে বাঙালি উদ্বাস্তুদের দেখিয়েছেন তো বটেই, এমনকি ট্রেনে সরগোধা ত্যাগ করে গ্রেওয়াল পরিবারের সীমান্তের এপারে চলে আসার সময়কার সাদাকালো শটগুলো দেখলে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫০) মনে পড়তে বাধ্য। আর এখানেই আমার হতাশা। দেশভাগের যে অলীক, হাস্যকর অথচ বীভৎস বাস্তবতা আপনি পর্দায় তুলে এনেছেন তা কোনো বাংলা ছবিতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আবার দেশভাগ কীভাবে পাঞ্জাবি হিন্দু, শিখ ও মুসলমানের প্রেম, সখ্য, পারিবারিক আত্মীয়তা ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল, তাও কোনো বাংলা ছবির পরিচালক আজ পর্যন্ত দেখিয়ে উঠতে পারলেন না। ঋত্বিক আর নিমাই ছাড়া আর কোনো পরিচালক তো দেশভাগকে বিষয় হিসাবে পাত্তাই দিলেন না। বরিশালের মানুষ ঋত্বিক আস্ত ট্রিলজি বানিয়েছেন, কিন্তু সেগুলোও দেশভাগোত্তর ট্রমা নিয়ে। দেশভাগ ব্যাপারটা কেমন ছিল, তার আগেকার পূর্ববঙ্গের জীবন কেমন ছিল— সেসব তাঁর ছবিতেও পাই না। আমাদের সিনেমার আরেক দিকপাল, মৃণাল সেন, ফরিদপুরের মানুষ। তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতেও দেশভাগ অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায়কে তবু এই যুক্তিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় যে তাঁর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগ ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোরের আমলেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সত্যজিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পূর্ববঙ্গের জীবন বা উদ্বাস্তু জীবন তাঁর উপলব্ধির বাইরে। আর বাংলা জনপ্রিয় সিনেমা? কোনো বিদেশি সেই সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে জানতেই পারবে না যে দেশভাগ, বাংলা ভাগ বলে এত বড় একটা ব্যাপার কোনোদিন ঘটেছিল। আশ্চর্য! এই কারণেই ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা দেখতে দেখতে আমার পূর্বপুরুষদের উপরে রাগ হচ্ছিল, এই ছবিটা বাংলায় হয়নি বলে।

আরও পড়ুন হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

অথচ না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আপনার ছবিতে প্রাক-দেশভাগ পর্ব যে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভা থেকে শুরু হয়, সেই সংগঠনে বাঙালিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য ছিল। মুনশি প্রেমচন্দ আজ থেকে বিশ-তিরিশ বছর আগে পর্যন্তও বাঙালি পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। উপরন্তু, যেসব বাঙাল পরিবারকে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আপনার ছবির গ্রেওয়াল পরিবারের মত সিলুয়েট হয়ে, তাদের অনেকেরই যে মুজফফরের মত প্রতিবেশী ছিল তা কিন্তু পারিবারিক গল্পকথায় পাওয়া যায়। মুজফফররা ছিল বলেই আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেকে প্রাণ হাতে করে হলেও এপারে চলে আসতে পেরেছিলেন। অথচ সেই প্রতিবেশীদের আমাদের সিনেমায় কোনোদিন দেখা গেল না। কেন গেল না? উত্তরটা অস্বস্তিকর। সম্ভবত ও জিনিস সত্যনিষ্ঠভাবে দেখাতে গেলে নির্বৈরের দাদুর প্রেমের মত আমাদের দাদুদের প্রেম নয়, পাপই উঠে আসত। ধরা পড়ে যেত এই সত্য যে, বাঙালি ভদ্রলোকেরা, যারা আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্প, সঙ্গীত, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমার চিরকালীন কর্ণধার, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা মুসলমানদের বিয়ে করা দূরে থাক, তাদের সঙ্গে প্রেম করার কথাও স্বপ্নে ভাবত না। মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও যতটা প্রয়োজনের, ততটা প্রাণের ছিল না। ফলে আমাদের সিনেমায় কোনো আফসানা থাকা সম্ভব নয়।

অশোক মিত্র, বীণা দাস, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়দের আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সেইসব পাপের সাক্ষ্য রয়েছে। অশোক লিখেছেন, কীভাবে তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপ মামারা স্রেফ জমির আল দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে বাবুদের দেখে আল থেকে নেমে না যাওয়ায় পেরেক বসানো কাঠ দিয়ে গরিব মুসলমান প্রজাকে পিটিয়েছিলেন। বীণা লিখেছেন, কীভাবে এক মুসলমান যুবতী তাঁকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন যে হিন্দু বাড়িতে কুকুর বেড়াল পাতের কাছে গেলে সে ভাত খাওয়া চলে, কিন্তু মুসলমানের ছোঁয়া লাগলে চলে না। এই শতাব্দীর শুরুতে অতীন আজকাল কাগজের এক রবিবাসরীয় নিবন্ধে লিখেছিলেন, ছোটবেলায় দেখেছেন মুসলমান বন্ধুর ঠাকুমা গল্প করতে আসতেন তাঁর ঠাকুমার সঙ্গে। দুই পরিবারে সম্পর্কও ছিল জমাট। কিন্তু বন্ধুর ঠাকুমার জন্যে আলাদা একখানা পিঁড়ি ঠিক করা ছিল। স্বভাবতই আমাদের লক্ষ্মী ছেলে দাদুরা তাঁদের ভরা যৌবনে কোনো আফসানার প্রেমে পড়তেন না। এই যদি না হবে, তাহলে প্রফুল্ল রায়ের কেয়াপাতার নৌকো ছাড়া আমাদের সাহিত্যেই বা অবিভক্ত বাংলায় দুই সম্প্রদায়ের প্রেমের গল্প বিরল কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো জনপ্রিয় লেখকের লেখায় ওপার বাংলায় ছেড়ে আসা মুসলমান বাল্যবন্ধুর জন্যে দু ফোঁটা চোখের জল পাই না কেন? বাঙালদের পারিবারিক গল্পকথাতেই বা যত আফসোস ছেড়ে আসা জমিজমা পুকুর বা তুলসীমঞ্চের জন্য, তার সিকি ভাগ কোনো প্রতিবেশী বন্ধু বা প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার জন্যে নয় কেন?

ইমতিয়াজ, আপনি হয়তো জানেন না, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে থেকে যাওয়ার কৃতিত্ব কার, তা নিয়ে গোল বেধেছিল আমাদের রাজ্যে। তখন বিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সুদীর্ঘ লেখায় দেখিয়ে দেন যে এতে আলাদা করে কারও কৃতিত্ব নেই। আসলে দুই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, বাংলা ভাগ করার পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলা ভাগ আমাদের পূর্বপুরুষরা চেয়েছিলেন। এমন বললে নেহাতই সত্যের অপলাপ হবে যে আমাদের ছাপোষা পূর্বপুরুষরা চাননি, সিদ্ধান্তটা নেতারা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তা-ই হত, তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস আমাদের কাছে উদযাপনের বিষয় হত না, বরং কে কাণ্ডটার জন্যে দায়ী তা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হত নেতাদের। আসল কথাটা হল, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা যেমন সত্যি, তাঁদের জাতভাইরাই যে বাংলা ভাগ চেয়েছিলেন তা-ও সত্যি। উপরন্তু, আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক বয়ানে ব্যাপারটা একতরফা। এপার থেকেও যে ওপারে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়েছিল মানুষকে, তাদের যন্ত্রণাও যে কম নয়, তা আমাদের সিনেমায় নেই। ওপারের প্রাক-স্বাধীনতা যুগের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক তো নেই-ই। এমনকি সাহিত্যেও, ও জিনিসটা আমরা ওপারের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় যত স্পষ্ট করে পাই, এপারের লেখকদের লেখায় পাই না। বাংলার কোনো সাদত হাসান মান্টো নেই ইমতিয়াজ। আপনাদের পাঞ্জাবিদের আছে। তাই আমাদের টোবা টেক সিংদের কথা কেউ লিখে রাখেনি। দেশভাগের পর্বে পাঞ্জাবের মেয়েদের মর্মন্তুদ কাহিনি যেভাবে আপনি আর আপনার সহলেখক নয়নিকা মাহতানি লিপিবদ্ধ করেছেন, বাংলা সিনেমা তা করেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই ন্যাকা নৈতিকতার পাপ করেছেন, যাকে আপনার নির্বৈর বিদূষক হয়ে ব্যঙ্গ করে “র‍্যাডক্লিফ বললেন, গান্ধী বলেছেন খারাপ জিনিস দেখতে নেই। তাই আমি দেখব না।”

এই পাপের ফল কী? ফল এই যে, পূর্ববাংলার মুজফফরদের কথাও আমাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। সুতরাং আজ খুব সহজেই পশ্চিমবঙ্গে এই বয়ান খাড়া করা যাচ্ছে যে দেশভাগের সব দায় একটা সম্প্রদায়ের, অন্য সম্প্রদায় শুধুই তার শিকার। এ-ও সহজেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে যে হিন্দু, মুসলমান চিরকালই একে অপরের শত্রু ছিল; কখনো তাদের মধ্যে মৈত্রী ছিল না। আপনার ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন বিরতির ঠিক আগে একটা উঠোনকে দুভাগ করে দিয়ে রক্তের রঙে ফুটে উঠছে পর্দায়, আর আজকের বাংলা ছবিতে র‍্যাডক্লিফ লাইন পর্দায় ফুটে উঠছে সাম্প্রদায়িক আইটেম নাম্বারে দুই বাংলা জুড়ে যাওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখাতে। সে ভয় ঋত্বিককে নিয়ে ফেসবুকে গদগদ হওয়া বাঙালির পছন্দ হচ্ছে, তারা হলও ভরাচ্ছে। তাই আমাদের কোনো ইমতিয়াজ নেই, আমাদের কোনো ইমতিয়াজ অদূর ভবিষ্যতে হবেও না। বরং সম্ভব হলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও একের পর এক র‍্যাডক্লিফ লাইন টেনে দেব, যতক্ষণ না বাঙালি বলে জাতিটাই অবলুপ্ত হয়ে যায় হিন্দু আর মুসলমানে ভাগ হতে হতে।

আপনাকে নমস্কার জানিয়ে স্বীকার করে নিই, আপনারা পাঞ্জাবিরা ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। তাই আপনাদের পার্টিশন মিউজিয়াম আছে। তাতে শুধু ঘৃণায় ইন্ধন জোগানোর কাজ হয় না, একে অপরের ঘায়ে হাত বুলিয়ে উপশমের কাজও হয়। তাই হয়তো শিখ মহিলাদের, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচতে সপরিবার আত্মহত্যার পাশাপাশি ভারত থেকে পাকিস্তানগামী মুসলমান উদ্বাস্তুদের ট্রেনে শিখ দাঙ্গাবাজদের হত্যালীলার মাঝে মুসলমান সেজে থাকা এক শিখের দৃশ্য উঠে আসতে পেরেছে আপনার ক্যামেরায়। ট্রমা অতিক্রম করে আমৃত্যু প্রেম করার মুরোদ আপনাদের আছে ইমতিয়াজ। আমাদের নেই। একথা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কয়েক মাস আগেই আরেক পাঞ্জাবি, বরুণ গ্রোভার, তাঁর ঋজু বিদূষণায় শিখদের দেশভাগের ট্রমা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে রসিকতা করেছেন। তারপর বলেছেন, তাঁর পরিবার অধুনা পাকিস্তানে তাঁদের ভিটে ছেড়ে আসার সময়ে একখানা প্রদীপ জ্বেলে রেখে এসেছিল, এই আশায় যে শিগগির ওবাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে। সীমান্তের এপারে এসে যেখানে আশ্রয় নেওয়া হল, সেখানেও একখানা প্রদীপ জ্বলছিল। মানে এবাড়ি যে পরিবার ছেড়ে গেছে, তাদেরও আশা ছিল তারা ফিরে আসবে। রূঢ় বাস্তব হল, “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” বলে গিয়ে কেউ আর সে যুগে ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু বরুণদের নতুন বাড়িতে সেই প্রদীপ রোজ জ্বালানো হত এই আশায় যে, পুরনো বাড়িতে যে পরিবার গেছে তারাও ওঁদের জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ জ্বেলে রাখছে। এভাবেই “মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থাকে যায়”।

কথাটা বরিশাল থেকে আসা বাঙালি কবির লেখা হলেও, দেখা যাচ্ছে এপারের বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিকদের ওতে বিশ্বাস কম। আপনাদের মত পাঞ্জাবি শিল্পীদেরই বেশি বিশ্বাস। তাই বাঙালি হিসাবে আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা রইল, আমার পূর্বপুরুষদের জন্য রইল অভিসম্পাত।

ইতি

এক অপাংক্তেয় বাঙালি।

নজরুলকে নিয়ে রহমানাতঙ্ক: বাঙালি সংস্কৃতি কারে কয়?

বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল?

নজরুল
ছবি পিনটারেস্ট থেকে

ক্যালেন্ডার বলছে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে এখনো ঢের দেরি, বৈশাখ মাস তো আরও দূরে। এবার বাঙালি ভাবাবেগ (আজকাল বাঙালিরা হিন্দিভাষী নেতাদের বক্তৃতা শুনে শুনে যেটাকে ‘অস্মিতা’ বলে আর কি) মরসুম অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের প্রকাশ্য ও গোপন আক্রমণ বাঙালি জাতির উপর চলছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে আক্রান্ত জাতির মধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যেও সেসব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার উৎসাহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কারোর মধ্যে দেখা যায় না। না, একটু ভুল হল। সোশাল মিডিয়া খুললে মনে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই লড়ার জন্যে কোমর বেঁধে তৈরি। কিন্তু লড়তে গেলে ঠিক কী যে করতে হবে তার কোনো নীল নকশা কারোর কাছে নেই। যারা কিঞ্চিৎ সংগঠিত তারা ঠিক করেছে হিন্দিভাষী মানুষকে ধমকানো চমকানোই একমাত্র রাস্তা। তার বাইরে যে কয়েকজনের মাথায় দু-একটা পরিকল্পনা আছে, তাদের সঙ্গ দিতে গেলে নিজের জীবনচর্যায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হবে, বেশকিছু ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধিকাংশ বাঙালি সেসব করতে তৈরি নয়। না করার একগুচ্ছ অজুহাতও পকেটে বা হাতব্যাগে সবসময় থাকে। বলামাত্রই বার করে ফেলে। এদিকে সোজাসুজি “পারব না বাপু বাঙালিয়ানা করতে। অনেক কাজ আছে” বলে হাত ঝেড়ে ফেলার ক্ষমতাও নেই। কারণ কতকগুলো বিগ্রহ বাড়িতে এবং/অথবা জীবনে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গুরুজনেরা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি। বিগ্রহগুলোর নিয়মিত পুজো করতে হয়, নইলে মনে পাপবোধ তৈরি হয়। কিন্তু বিগ্রহের তো চর্চা বলে কিছু হয় না। ফলে যে সংস্কৃতি বিগ্রহনির্ভর তার চর্চা বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়, আর যে সংস্কৃতির চর্চা নেই তাকে শেষ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও প্রায় ফাঁকা মাঠে জিতে যাচ্ছে। বাঙালি কী করছে? অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। যদি বাঙালি সংস্কৃতি মানে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি হয়, তাহলে এই প্রবণতা সেই সংস্কৃতির ঠিক উলটো পিঠ।

হ্যাঁ, আল্লারাখা রহমান সুরারোপিত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানের সূত্রেই এত কথা বলছি। প্রথম চোটে গোটা ১৫ সেকেন্ড শুনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাল লাগছিল না বলে। কিন্তু ওই গান এবং তা নিয়ে বাঙালির প্রতিক্রিয়া সংবাদ হয়ে উঠেছে আর কোনো ওয়েবসাইট যা সংবাদ তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে লিখতে হবে, তাই শুনতে হল। অন্য অনেকের মত আমার কানেও মোটেই সুবিধের লাগল না। রহমান মহান শিল্পী, কিন্তু তাঁর সুরারোপিত কিছু হিন্দি গান আছে যেগুলো শুনলে মনে হয় তিনি কথাগুলোকে ঠিক সামলে উঠতে পারেননি, তাই কিছু অর্থহীন ধ্বনি ঢুকিয়ে দিয়ে ছেঁড়া মশারিতে তালি মেরেছেন (স্বদেশ ছবির ‘ইয়ে যো দেস হ্যায় তেরা’, লগান ছবির ‘কোঈ হম সে জিত ন পাওয়ে’ স্মর্তব্য)। এই গান শুনেও তেমনটাই মনে হল। আরও বড় গোলমাল হল, কথা যাচ্ছে লন্ডন আর সুর যাচ্ছে টোকিও। নজরুলের গানের কথায় বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবল উদ্যম এবং গনগনে রাগ আছে।

কিন্তু রহমানের সুর শুনলে মনে হচ্ছে এ গান ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ জাতীয় আনন্দের গান। সবাই মিলে বেশ নেচেকুঁদে নেওয়া যায় এই গান শুনতে শুনতে। যাঁরা গেয়েছেন তাঁদের হাসি হাসি মুখগুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফলে জ্ঞানত এই সুরারোপকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। সুরকার এবং তাঁর গায়েনরা গানের কথাগুলো বুঝে উঠতে পারেননি বলে সন্দেহ হয়।

গান ভাল না লাগলে নিন্দা করার অধিকার মানুষের জন্মগত, ভাল লাগলে প্রশংসা করার অধিকারের মতই। সুতরাং যখন কোনো শিল্পী নিজের কাজ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তখন তাঁকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। নইলে অবস্থা হয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর মত। ছবি ফ্লপ হলে বলতে হয়, গীতার চেয়ে তো প্লেবয় বেশি বিক্রি হয়। তা বলে কি গীতাকে ফ্লপ বলব? কিন্তু অমুক গান আমার ভাল লাগেনি বলা এক জিনিস, আর অমুক গান তৈরি করাই অনুচিত হয়েছে, নজরুলকে অপমান করা হয়েছে, বাঙালি জাতিকে অপমান করা হয়েছে, অবাঙালি বলেই এমন করতে পারল, বাঙালিরা কিছু বলে না বলে… ইত্যাদি চেঁচামেচি করা আরেক জিনিস। এই কোলাহল কিছুদূর পর্যন্ত স্রেফ হাস্যকর, তারপর ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই এত বেশি ধুলো ওড়ানো হয়েছে যে পিপ্পা ছবির নির্মাতারা বিবৃতি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। সেই বিবৃতিতে অবশ্য একটি মোক্ষম কথা বলা হয়েছে “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী গানটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে শ্রদ্ধা জানানো, যে চুক্তি আমাদের গানের কথাগুলিকে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিল” (Our intent was to pay homage to the cultural significance of the song while adhering to the terms set forth in our agreement, which permitted us to use the lyrics with a new composition)।

বিবৃতিতে প্রকাশ, চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী এবং পৌত্র অনির্বাণ কাজী। এখন বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ দেখে অনির্বাণ এবং তাঁর ভাইবোনেরা আমতা আমতা করছেন। জল্পনা চলছে ‘পরিবারেরই ভুলে কি বিকৃতি নজরুল-গীতে?’ কবির পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই দায় ঝেড়ে ফেলতে। গোটা দুনিয়ার বাঙালির চোখে তাঁরা এখন অভিযুক্ত। অপরাধ কী? না নজরুলের রচিত একটি গানকে অন্য সুরে গাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফেলেছেন। এখন নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজীকেও বলতে হচ্ছে “যা হয়েছে তা শুধু নজরুল ইসলামকে নয়, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিকে অপমান!”

কী হয়েছে? না নজরুলের একটি একদা জনপ্রিয় গানকে অন্যরকম সুরে গাওয়া হয়েছে এবং সে সুর বাঙালির পছন্দ হয়নি। এতদ্বারা বাঙালি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে জানিয়ে দিল, নজরুলের গান বেদ, কোরান, বাইবেল বা আবেস্তার মত একটি অপরিবর্তনীয় বস্তু। এদিক ওদিক করলে মহাপাতক হয়। এ স্রেফ শিল্প নয়, যে তুমি পুনর্নির্মাণ করবে। চুক্তি-টুক্তিতে চিঁড়ে ভিজবে না। কপিরাইট আইনকে মারো গুলি। আমাদের বিগ্রহের লেখা গান আমাদের সবার সম্পত্তি। দেশের আইন যা-ই বলুক। আবেগের কাছে আইন, শিল্পের ইতিহাস – এসবের আবার কোনো দাম আছে নাকি? ঠিক যেমন ইতিহাসে রামের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, আমাদের আবেগ যখন বলছে ওখানে রাম জন্মেছিলেন, তখন মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে।

নজরুলের প্রতি অন্যায় করা হল বলে যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না, তারা খেয়ালও করছে না, একজন শিল্পীর প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল তাঁর কপিরাইটকে সম্মান না করা। স্লোগান সকলের সম্পত্তি, গান অবশ্যই শিল্পীর একার। কারণ তিনি একাই তা সৃষ্টি করেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মত মহান সৃষ্টির পিছনে যে পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থাকে তার তুলনা একমাত্র প্রসববেদনা। ও জিনিসের ভাগ হয় না। শিশুকে যে যতই আদর করুক, সে একমাত্র তার মায়ের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পরেও। একজন শিল্পী অন্য এক শিল্পীর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তা নিয়ে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেই পারেন। সফল হলে প্রশংসা করা আর বিফল হলে নিন্দা করার বেশি অধিকার শ্রোতা, দর্শক বা পাঠকের নেই। যা করা হয়েছে তা শিল্প হিসাবে ভাল-খারাপ ছাড়িয়ে ক্ষতিকর মনে হলে অন্যকে সে কথা বলতে পারেন, পয়সা দিয়ে ও জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যাস।

এরপরেও একটা কথা আছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদী শিল্পের যে ধারা (protest art), তাতে অনেক সময় কোনো গানের রচয়িতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সেই গানটা সকলের হয়ে যায়। সে গানের অসংখ্য সংস্করণ তৈরি হয়ে যায়। নজরুলের গানের যে পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলে হাত-পা ছোড়া হচ্ছে, সেই পবিত্রতা তখন চুলোয় যায়। সেখানেই গানটার সাফল্য। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ আর ‘বেলা চাও’। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই গানদুটোর নানা রূপ। সাধারণত দেখা যায় সুর এক আছে, কথা পালটে গেছে। কেবল বাংলা ভাষাতেই ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানের অন্তত দুটো রূপ (‘আমরা করব জয়’, ‘একদিন সূর্যের ভোর’) পাওয়া যায়। এ যদি অন্যায় না হয়, তাহলে সুর বদল হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? নাকি রাগের কারণ আসলে একটা আশঙ্কা, যে নজরুলের উপর আমাদের মৌরসি পাট্টা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আর কেবল বাঙালির থাকবেন না?

তার মানে! যে যেমন ইচ্ছা আমাদের সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকাবে আর বাঙালি চুপচাপ বসে দেখবে?

তা কেন? বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নজরুলের ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতাটা জানে? বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে কী কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল সে খবর আজকালকার কনভেন্ট শিক্ষিত, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে হিন্দি পড়া ছেলেমেয়েদের জানানোর জন্যে কী উদ্যোগ নিচ্ছে নজরুলপ্রেমী বাঙালি সমাজ? গোঁফের রেখা ওঠা ছেলেরা আর মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ানো মেয়েরা এখনো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ পড়ছে? মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে রাস্তার সিগনাল – সর্বত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তো বাজছে, নজরুলগীতি গাওয়া হয় কটা জায়গায়?

মেগা সিরিয়াল বলতে খেয়াল হল – কেবল আবহসঙ্গীতে নয়, মেগায় যে পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই আস্ত হিন্দি ছবির গান বাজানো হয় তাতে হিন্দি আগ্রাসন দেখতে পান না? কোনো প্রতিবাদ হয়? মহিলা পুরুত দিয়ে করানো প্রগতিশীল বাঙালির বিয়েতে বর-কনের শেরওয়ানি আর ঘাগরা কি বাঙালি সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকায় না? কোন এ আর রহমান এসে বাঙালি মেয়েদের মাথায় বন্দুকে ঠেকিয়ে বিয়ের আগে মেহেন্দি অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করে তুলেছেন? ধনতেরাস উপলক্ষে ঝাঁটা না কিনলে মানসম্মান থাকছে না বাঙালি সংস্কৃতির কোন ধারা অনুযায়ী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সোশাল মিডিয়ায় রে রে করে কোনো শিল্পীর দিকে তেড়ে যাওয়া অনেক সহজ। তাতে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ, নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের ক্ষেত্রে আবার উপরি পাওনা বিগ্রহের মান বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ। ধর্মান্ধরা কোনোদিনই বোঝে না যে তাদের দেবতা তাদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি নিজেকে নিজেই বাঁচাতে পারেন, চুনোপুঁটি ভক্তদের মুখাপেক্ষী নন। সাংস্কৃতিক বিগ্রহের পূজারী বাঙালিও বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এত সামান্য শিল্পী নন যে তাঁদের বাঁচাতে হবে। ১৯৯১ সালে যখন আইন মোতাবেক রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট উঠে যাওয়ার কথা ছিল, তখন কেবল বিশ্বভারতী নয়, প্রায় সমস্ত শিক্ষিত (ডিগ্রিধারী অর্থে) বাঙালি গেল গেল রব তুলেছিল। কপিরাইট উঠে গেলেই নাকি সর্বনাশ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেবে লোকে, লেখাগুলোর কী যেন একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেবার এত দাপাদাপি শুরু হল যে ভারতের সংসদ দেশের আইন পরিবর্তন করে ফেলল। কপিরাইটের মেয়াদ ছিল স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর পর্যন্ত। তা বাড়িয়ে করা হল ৬০ বছর পর পর্যন্ত। শেষমেশ ২০০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র কপিরাইটের আওতার বাইরে এসেছে। গত ২২ বছরে বিশ্বভারতী ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আর কোন সৃষ্টি তিনি যেমন ছেড়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের হয়ে গেছে? একথা ঠিক, আজকাল একেকজন এত বাজনা সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন যে গান ছাড়া আর সবকিছু শোনা যায়। কেউ আবার কালোয়াতি করে বোঝাতে চান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি একজন ওস্তাদ। কেউ বা বাহাদুরি করে মাঝখান থেকে গান শুরু করেন। কিন্তু তাতে কী? যার যেমন রুচি সে তেমনই শোনে। যার যেটা ভাল লাগে না, সে সেটা শোনে না। এসবে গীতিকার রবীন্দ্রনাথের কী ক্ষতি হয়েছে?

প্রগতিশীল বাঙালিরা নিজস্ব দেবতাকুল বানিয়ে নিয়েছেন, তাতে নতুন নতুন বিগ্রহও যোগ করে যাচ্ছেন। গত বিশ বছরে যোগ হওয়া এক বিগ্রহের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটা পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছিলেন টিভির জন্যে (প্রযোজকদের সঙ্গে গোলমালে নাকি সে কাজে শেষ পর্যন্ত থাকেননি)। শাশুড়ি-বউমার কোন্দল আর এক পুরুষের দুই নারী ছকের বাইরে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী মেগা সিরিয়াল – গানের ওপারে। রবীন্দ্রনাথকে যারা বিগ্রহ বানিয়ে রাখে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকীকরণের দ্বন্দ্ব ছিল সেই সিরিয়ালের মূল উপজীব্য। সেখানে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত এমনভাবে গাওয়া হয়েছিল যা অভ্যস্ত কানে মোটেই সইবে না।

তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ত সমৃদ্ধ হয়নি, কিন্তু দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঋতুপর্ণকেও আজ আর সে কাজের জন্যে কেউ রহমানের মত আক্রমণ করে না। তখন যারা করেছিল তারাও ক্ষমা করে দিয়েছে। সে কি তিনি বাঙালি বলে, নাকি তিনি নিজেই বিগ্রহে পরিণত হয়েছেন বলে?

আরও পড়ুন সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

মজা হল, বাঙালির এই শতকের বিগ্রহরা কেউ বাংলার সঙ্গে হিন্দি, ইংরিজির মিশেল ছাড়া চলতে পারেন না। সৌরভ গাঙ্গুলির মুখের ভাষা শুনলেই টের পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় বিগ্রহ হতে চলা গৌতম ভট্টাচার্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তার নাম আবার বিশ্বকাপ তুঝে সেলাম। এসবে তাঁদের কারোর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না, কেউ বাংলার সংস্কৃতির সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে না। যত দোষ এ আর রহমানের। যেহেতু তিনি বাঙালি নন, যেহেতু আক্রমণকারী বনাম আক্রান্তের বয়ান খাড়া করার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক।

ব্যর্থ শিল্পপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ বলে বুঝে নিয়ে অন্য জিনিসে মন দেওয়ার নির্লিপ্তি না থাকলে, শিল্পে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে অনমনীয় হলে যা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তাই হচ্ছে। গড়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তির সংস্কৃতি। সাহিত্য ভূতে, গোঁজামিল ইতিহাসে আর রহস্য রোমাঞ্চে ছয়লাপ। কারণ ‘ওটা পাবলিক খায়’। সিনেমার বড় অংশ জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন। তাও আবার একই গল্পকে একবার, দুবার, তিনবার পর্দায় আনা হচ্ছে। আরেকটা অংশ? এই শতকের প্রথম দিকে চলছিল দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনরাবৃত্তি, তারপর থেকে চলছে পুরনো জনপ্রিয় বাংলা ছবির পুনরাবৃত্তি। পুনর্নির্মাণ বলা যাবে না। কারণ এসব ছবি মূল বয়ানে নতুন কিছু যোগ করে না, কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় না।

এরই পিছু পিছু এসে পড়েছে জেরক্স সংস্কৃতি।

‘অপরাজিত ছবিটা দারুণ হয়েছে।’

কেন? না সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে দেখতে অবিকল সত্যজিতের মত। পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলো একেবারে পথের পাঁচালীর মত। এদিকে পরিচালক অনীক দত্ত সাহস করে চরিত্রের নামটাই সত্যজিৎ রাখতে পারেননি, সে চরিত্রের তৈরি পুরস্কৃত ছবির নামও করে দিয়েছেন পথের পদাবলী।

‘মৃণাল সেনের বায়োপিকটা দারুণ হবে।’

কেন? না টিজারে দেখা গেছে মৃণালের চরিত্রাভিনেতাকে অবিকল তাঁর মত দেখাচ্ছে।

নির্দেশকরা কেনই বা এই ছকের বাইরে যেতে যাবেন? ছক ভাঙতে গিয়ে রহমানাতঙ্কের মত কিছুর কবলে পড়ার ঝুঁকি কে নেবে বাপু?

বাঙালি সংস্কৃতিকে এই বিষচক্র থেকে এবং হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র বাঙালি। কিন্তু তা করতে হলে রহমানাতঙ্ক কাটিয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী সে প্রশ্ন তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একদা সভাপতি তথাগত রায়, সোশাল মিডিয়ায় হিন্দি আগ্রাসনবিরোধী বাঙালির বাপ বাপান্ত করাই ইদানীং যাঁর জীবনের ব্রত, প্রায়ই মন্তব্য করেন যে বাঙালির সর্বনাশ করেছে ‘রসুন’ সংস্কৃতি। অর্থাৎ রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল। তৃতীয়জনকে নিয়ে তথাগতবাবুর আপত্তির কারণ অতি সহজবোধ্য আর বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্থান আদৌ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাশে নয়। তাই ও নিয়ে আলোচনা করা সময় নষ্ট। কিন্তু বাকি দুজন যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেকখানি তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আরএসএসের দীক্ষায় দীক্ষিত তথাগতবাবুর ওই দুজনকে প্রবল অপছন্দ প্রমাণ করে তাঁরা স্রেফ শৈল্পিক উৎকর্ষে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় এবং কার্যকলাপেও যথার্থ মানবতাবাদী, অতএব প্রয়োজনীয়। কথা হল, ওঁদের নিয়ে আমাদের যে উথাল পাথাল আবেগ প্রকাশ পায় ক্ষণে ক্ষণে, তা কি খাঁটি? যদি খাঁটি হয়, তাহলে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে লাইন দিয়ে অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে তৈরি প্যান্ডেল দেখতে গিয়েছিল কারা? যারা নজরুলের অপমান নিয়ে বেজায় উত্তেজিত তাদেরই ভাই বেরাদররা তো। রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি, ফেসবুক পোস্ট, আইনি ব্যবস্থার হুমকি কত কী দেওয়া হচ্ছে এখন। বিখ্যাতরাও দিচ্ছেন। তখন এত প্রতিবাদ ছিল কোথায়? নাকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান, কবিতাই কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ; তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবনা নয়, জীবনচর্যাও নয়?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত