স্পিরিট অফ ক্রিকেট খায় না মাথায় দেয়?

আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া।

স্পিরিট

ফুটবল আর ক্রিকেট – দুটোই আমরা শিখেছি সাহেবদের থেকে। তাদের কাছে প্রথমটা স্রেফ খেলা, কিন্তু দ্বিতীয়টা ‘জেন্টলম্যান’স গেম’। আমরা বাঙালিরাও ফুটবল নিয়ে গদগদ, জনপ্রিয় গানে লেখা হয়ে গেছে “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”। কিন্তু ‘ভদ্রলোকের খেলা’ বলি ক্রিকেটকে। কারণ ক্রিকেটে আছে এমন একটা জিনিস যা আর কোনো খেলায় নেই – স্পিরিট অফ ক্রিকেট। ‘জেন্টলম্যান’স গেম’ কথাটার সর্বজনমান্য বাংলা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ তৈরি হয়ে আছে বহুকাল ধরে। কিন্তু ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’ কথাটার বাংলা কী? কাউকে তো লিখতে বা বলতে দেখি না। কথাটার হিন্দিও কোথাও দেখি না। রবিচন্দ্রন অশ্বিন আইপিএল ম্যাচে জস বাটলার বল হওয়ার আগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন দেখে তাঁকে রান আউট করে দিলে বা ভারতের দীপ্তি শর্মা ইংল্যান্ডের শার্লট ডীনকে একইভাবে রান আউট করে দিলে ভারতের সব ভাষাভাষী লোক (বিদেশিরাও) যা নিয়ে আলোচনা করে তা ওই ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’।

কথাটার বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, মালয়ালম – কোনো অনুবাদই পাওয়া দুষ্কর। কারণ জিনিসটা খেতে হয় না মাখতে হয় – তা এই ক্রিকেটপাগল দেশের কোনো জাতির একজন ক্রিকেটবোদ্ধারও বোধহয় হৃদয়ঙ্গম হয়নি। যা হৃদয়ঙ্গম হয় তাকে মানুষ নিজের ভাষায় ডাকে। আমাদের বাঙাল পাড়ার কাকা জ্যাঠারা অনেকেই ফুটবল খেলাকে বলতেন ‘জাম্বুরা লাথান’। ক্রিকেট খেলার ঝিঁঝি নামটা তো বাঙাল, ঘটি সকলেই জানে। ঘোর পশ্চিমবঙ্গীয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘ক্রিকেট মানে ঝিঁঝি’ নামে একখানা আস্ত গল্প লিখে গেছেন।

হৃদয়ঙ্গম হবে কী করে? স্পিরিট অফ ফুটবল বা স্পিরিট অফ টেনিস শুনেছেন কখনো? সকলেই জানে এই খেলাগুলোর কিছু নিয়মকানুন আছে। সেই অনুযায়ী খেলা চলে, নিয়ম ভাঙলে ভুলের ওজন অনুযায়ী মাশুল দিতে হয়। দিয়েগো মারাদোনার হাত দিয়ে গোল করা অন্যায় হয়েছিল, কারণ নিয়ম অনুযায়ী হাত দিয়ে গোল দেওয়া চলে না। সে গোলের সমর্থনে মারাদোনা নানারকম মন্তব্য করেছিলেন, ফুটবল রোম্যান্টিকরাও নানা কথা বলে। কিন্তু অতি বড় আর্জেন্টিনা সমর্থকও বলে না, গোলটা বৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবল অনুযায়ী ঠিক। কোনো ইংল্যান্ড ভক্তও কখনো বলেনি, গোলটা অবৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবলের বিরুদ্ধে। স্বীকার্য যে সব খেলারই কিছু সহবত আছে যেগুলো নিয়ম হিসাবে লিপিবদ্ধ নেই। যেমন ফুটবলে একজনকে ট্যাকল করে মাটিতে ফেলে দিয়েই আবার হাত বাড়িয়ে দিই উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু তা না করলে কেউ স্পিরিট অফ ফুটবল লঙ্ঘন হল বলে তেড়ে আসে না। যদি বাড়াবাড়ি করে যাকে মাটিতে ফেলেছি তাকে ফের লাথি মারি, তাহলে শাস্তির বিধান আইনেই আছে। আলাদা করে স্পিরিটের দোহাই দেওয়ার দরকার পড়ে না।

কিন্তু ক্রিকেটের কথা আলাদা। ফুটবলের মত সাধারণ চাকুরে, শ্রমিক প্রমুখ মিলে ক্রিকেট ক্লাবগুলোর গোড়াপত্তন করেননি বিলেতে। সায়েবসুবোদের মধ্যেও উচ্চকোটির লোকেরাই নিজেদের মধ্যে খেলত ধপধপে সাদা জামাপ্যান্ট পরে। রাজারাজড়ার খেলায় যখন অন্যরা ঢুকে পড়ল, তখন আবার শ্রেণিবিভাগ করা হল – জেন্টলমেন আর প্লেয়ার্স। আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া। ক্রিকেট ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে যে দেশে গেছে সেদেশেই উচ্চকোটির মানুষের খেলা হয়ে থেকেছে বহুকাল। নিজের সময়ের অন্যতম সেরা স্পিনার হওয়া সত্ত্বেও পলওয়ঙ্কর বালু দলিত বলে বম্বের কোয়াড্রেনিয়ালে খেলতে কতটা বেগ পেয়েছেন সে ইতিহাস রামচন্দ্র গুহ সবিস্তারে লিখেছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ব্যাপারটা একইরকম ছিল অনেকদিন। সেখানকার নন্দিত লেখক সিএলআর জেমস লিখেছেন, ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে তিনি বুঝতেই পারেননি, যে কোনটা ক্রিকেটিয় আর কোনটা ক্রিকেটিয় নয় তার যে ধারণা তাঁর মাথায় তৈরি হয়েছিল, তা আসলে দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি করে দেওয়া। মজার কথা, যে কোর্টনি ওয়ালশকে ঢাল করে আজ শাকিব আল হাসানকে দুয়ো দেওয়া চলছে, সেই ওয়ালশের জামাইকার প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার জর্জ হেডলি আদর্শ অধিনায়ক মনে করতেন বডিলাইন সিরিজের কুখ্যাত ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিনকে।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক ভদ্রলোকের সুবিধাটি (privilege) একবার করে ধাক্কা খায়, খানিকটা খসে পড়ে। তখন নিয়ামকরা অগত্যা আইন বদলে একই অধিকার সকলকে দেন। ভারতে জন্মানো স্কটিশ (ব্রিটিশ নয় কিন্তু) জার্ডিন বড় ধাক্কা মেরেছিলেন। ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে তিনি ব্যাটারদের শরীর লক্ষ করে বল করানো শুরু করেন আইন মোতাবেক। ফলে নিয়ামকরা আইন বদলে লেগ আম্পায়ার আর উইকেটরক্ষকের মাঝে দুজনের বেশি ফিল্ডার রাখা নিষিদ্ধ করেন। আউট করতে গিয়ে ব্যাটারকে আঘাত করা চলবে না – এটা এতদ্বারা আইনের মধ্যে এসে পড়ে। তার আগে অবধি বাবুদের ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহারে বিশ্বাস ছিল, অর্থাৎ কারোর শরীর লক্ষ করে বল ছোড়া হবে না।

রাজছত্র ভেঙে পড়ে, ভদ্রলোকের সুবিধা কিন্তু টিকে থাকে। কারণ ওটা যাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি, তাদের মাথাতেও বেদবাক্য হয়ে ঢুকে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানে যাকে ‘হেজিমনি’ বলে। তাই অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ভাবেন মাঠে নামার আগে দেখে নেওয়ার দরকার নেই হেলমেটটা খেলার যোগ্য আছে কিনা। মাঠে নেমেও ভাবেন যত খুশি সময় নিতে পারেন, স্পিরিট অফ ক্রিকেট বাঁচিয়ে দেবে। আর শাকিব কোনো অন্যায় না করেও দুনিয়াসুদ্ধ লোকের গাল খান। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লোকের, কারণ এ রাজ্যে ক্রিকেট তো সত্যিই আজও ভদ্রলোকের খেলা। বাংলা থেকে ভারতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের অধিকাংশ কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর সন্তান। ছোটলোকেরা বাংলার ক্রিকেটে এখনো প্রান্তিক।

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading