অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

দুটো বিপরীতার্থক শব্দ নিয়ে বাঙালির দুই আইকন বিস্তর ভাবনা চিন্তা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ “বিশ্বনাগরিক” শব্দটা আমাদের দিয়েছেন, আর সত্যজিৎ রায় তাঁর সারাজীবনের কাজে সিধু জ্যাঠা, প্রফেসর শঙ্কুর মত বিশ্বনাগরিককে আঁকার পর শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ পর্যটক মনমোহনের মাধ্যমে “কূপমণ্ডূক” হতে বারণ করেছেন। বাঙালি নিজেকে বিশ্বনাগরিক বলে পরিচয় দিতে বিলক্ষণ ভালবাসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যত দিন যাচ্ছে, তার মধ্যে কূপমণ্ডূকতার লক্ষণগুলোই প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েও গর্বের শেষ নেই। সংস্কৃতি প্রায় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনেকের ধারণা কালচার শব্দটা বাংলাই। সেই কালচারেই আপাদমস্তক কূপমণ্ডূকতা দেখা যাচ্ছে। গোপালকৃষ্ণ গোখেল দেড়শো বছর আগে বলেছিলেন আজ বাংলা যা ভাবে, কাল ভারত তাই ভাবে। তা নিয়ে আমরা আজও গর্ব করি। অথচ এখন শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা — সবেতেই ভারত আজ যা ভাবছে, বাংলা আগামী পরশুও ভেবে উঠতে পারবে বলে ভরসা হচ্ছে না।

গুরুগম্ভীর ব্যাপার বাদ দিয়ে হাসি তামাশা নিয়েই আলোচনা করা যাক। হাতে হাতে স্মার্টফোন আর শস্তা ইন্টারনেটের কারণে এখন অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের মত ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর ইউটিউবের রমরমা। এসবে বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা আর ওয়েব সিরিজ বোঝায় না, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও বোঝায়। মানে একজন শিল্পী মাইক হাতে লোক হাসান। ব্যাপারটা কিছুটা বক্তৃতা, কিছুটা অভিনয়। কিন্তু উদ্দেশ্য লোক হাসানো। সারা পৃথিবীতেই ব্যাপারটা এখন দারুণ জনপ্রিয়। তবে এই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা শুধু লোক হাসানোয় থেমে নেই। সারা পৃথিবীতে গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের সঙ্কটে এঁরা প্রতিবাদী স্বর। এই বিদূষকদের পিচকিরি থেকে ছুটে আসা রসিকতার রঙে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, জেয়ার বলসোনারো, নরেন্দ্র মোদী, অ্যাঞ্জেলা মেরকেল, জাস্টিন ট্রুডো — সকলের কাপড় চোপড় নষ্ট হচ্ছে। ট্রেভর নোয়া, হাসান মিনহাজরা রীতিমত তারকা হয়ে উঠেছেন অল্প সময়েই। ব্রিটিশ কমেডিয়ান জন অলিভার হাসানোর শিল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর শো লাস্ট উইক টুনাইট রীতিমত খবরের বুলেটিন। শুধু পরিবেশনের আঙ্গিকে নয়, বিষয় নির্বাচন আর গবেষণার গভীরতাতেও। সারা পৃথিবীর শাসক, ক্ষমতাশালী, অতি ধনীরা তাঁর রসিক বুলেটিনের চাঁদমারি।

ইউরোপ, আমেরিকার বিদূষকদের সুবিধা এই, যে তাঁদের বিরুদ্ধে গণ আক্রমণ বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হয়নি এখনো। ভারতে হয়েছে, হচ্ছে। কুণাল কামরা শো করতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন একাধিক জায়গায়, অনলাইন হুমকি তো পেয়েই থাকেন। আরেক বিদূষক বরুণ গ্রোভার তো একটা শোতে হাসতে হাসতে বলেছিলেন “আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে ‘এত যে হুমকি পান, ভয় করে না?’ আমি বলি আমার আগে তো কামরার নম্বর আছে। ওর ভাল মন্দ কিছু একটা হয়ে যাক, তারপর ভয় পাব।” এসবের ফলে যা হয়েছে, তা হল ভারতে বিদূষকরা হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রতিবাদের মুখ। ক্ষমতা যত টুঁটি টিপে ধরছে, এঁরা তত বেপরোয়া হচ্ছেন। কুণালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়, তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। তার কয়েক মাস আগেই জনপ্রিয় দক্ষিণপন্থী সংবাদ পরিবেশককে তাঁরই কায়দায় প্রশ্ন করার “অপরাধে” কুণালের বিমানে চড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় ছ মাসের জন্য। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মুনাওয়ার ফারুকির উপর আক্রমণ। শোতে ঢুকে পড়ে তিনি কী বলতে পারেন (বলেননি কিন্তু), তা ধরে নিয়ে গ্রেপ্তারি এবং দিনের পর দিন বিনা জামিনে হাজতবাস করানো হয়েছে দিনের পর দিন। স্বাধীন ভারতে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা কোন মানুষের সাথে রাষ্ট্রের এরকম ব্যবহার বিরল। কুণাল মুনাওয়ারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আইনি লড়াইয়ে সবরকম সাহায্য করেছেন।

দেশ বিদেশের বিদূষকরা যখন এরকম ধুন্ধুমার কাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন, তখন বাংলার বিদূষকদের দেখুন। বিভিন্ন বাংলা চ্যানেলে লাফটার চ্যালেঞ্জ মার্কা একাধিক অনুষ্ঠান দেখা যায়। তার উপর আছে ফেসবুক, ইউটিউব চ্যানেল। এতজন হাস্যরস উৎপাদন করছেন অথচ কারোর রসিকতা কোন নেতা নেত্রী আমলা ব্যবসায়ীর গায়ে লাগছে না। কারণ লোক হাসাতে বাঙালি বিদূষকরা কেবল বেঁটে লোককে বেঁটে, মোটা লোককে মোটা বলছেন আর অতি স্থূল, নারীবিদ্বেষী যৌন রসিকতা করছেন। নিজস্ব কুয়োয় নিরাপদ হাসি চলছে। অথচ এমন নয় যে বাংলার রাজনীতি বৈকাল হ্রদের মত নির্মল আর ডেড সি-র মত শান্ত। গত এক-দেড় দশকে জানা গেছে এখানে একজন রাজনীতিবিদ আছেন, যিনি প্রতিপক্ষকে খুনের হুমকি দেন কারণ তাঁর মস্তিষ্কে ঠিকমত অক্সিজেন যায় না। আরেকজন আছেন, যিনি সাংবাদিকের পশ্চাদ্দেশে পিন ফোটাতে চান। আরো একজন আছেন, যিনি গরুর দুধ থেকে নিষ্কাশন করতে পারেন। অতি সম্প্রতি আবার এক দম্পতিকে পাওয়া গেছে, যাঁদের বৈবাহিক জীবনের সবকিছুই রাজনীতির স্বার্থে প্রকাশ্য। তার উপর আছে দলবদলান্তে ভোল বদল। এক কথায় বাংলার জমি এখন হাসি তামাশার পক্ষে অতি উর্বর। কুণাল কামরার ভাষায় বলতে গেলে “কাঁহা মিলেগা ইতনা কনটেন্ট?” এমনও বলা যায় না যে সাধারণ দর্শক এসব নিয়ে হাসি তামাশা পছন্দ করেন না। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে তাঁরা বাংলার রাজনীতি নিয়ে অনর্গল রসিকতা করছেন, রসিকতা শেয়ার করছেন। আসলে বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

হাস্যরস উৎপাদনে বাঙালির এই কূপমণ্ডূকতা দ্বিগুণ দুঃখজনক, কারণ উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হুতোম প্যাঁচার নকশার প্রবল শ্লেষ থেকে শুরু করে শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত, সুকুমার রায়, রাজশেখর বসু হয়ে সদ্য শতবর্ষ পার করা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ যে হাস্যরসের পরম্পরা প্রতিষ্ঠা করেছেন বাঙালির সাহিত্যে, সিনেমায়, মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাস্যকৌতুক বলায় — তা কখনো সমকালীন সমাজ, রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে যায়নি। উদাহরণের তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু এইটুকু বলা থাক, ভানুবাবুর ‘নবরামায়ণ’ যদি এ যুগে অ্যামাজন বা নেটফ্লিক্সের জন্য তৈরি করা হত, তাহলে ক্ষমতাসীনরা প্রবল তাণ্ডব করতেন। হয়ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্বাসনের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হত। উনি অবশ্য পিছু হটতেন বলে মনে হয় না। সে যুগে বামপন্থী সংগঠন করার জন্য টালিগঞ্জে কাজ না পেয়ে ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে যাত্রা করতে চলে গিয়েছিলেন। এ যুগে হয়ত বলতেন “তগো ইন্ডাস্ট্রি নিয়া তোরা থাক। আমাগো ইউটিউব চ্যানেলে আমি ড্যাং ড্যাং কইরা অভিনয় করুম।”

উত্তরবঙ্গে সংবাদে প্রকাশিত