প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের নিভু নিভু আগুন

গত দশ বছরে তৃণমূল নেত্রীর উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে খোদ সূর্যকান্ত মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে কম কটাক্ষ করা হয়নি। ‘টুম্পা’ তেমন উচ্চারণকেই বাম রাজনীতির ভাষা করে দিল।

ভাষা

বেশিদিন আগের কথা নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক ভরে গিয়েছিল নারী কণ্ঠে গাওয়া ভূপেন হাজারিকা খ্যাত ও গঙ্গা তুমি গানে। সেখানে গায়িকা প্রথমে পল রোবসনের ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ গাইছিলেন। তারপর ঐ গানের অনুসরণে রচিত ‘ও গঙ্গা তুমি’। বলা হচ্ছিল গলাটা কলম্বিয়ান শিল্পী শাকিরার। কয়েক দিন পরে জানা গেল, আসলে ঐ কণ্ঠ পূরবী মুখার্জির। যিনি এক সময়কার পরিচিত শিল্পী, প্রচুর গণসঙ্গীত গেয়েছেন। বাঙালি, বিশেষত বামপন্থী বাঙালি, নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কত দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তা দেখে অবাক লেগেছিল। সেই বিস্মৃতি আরো কুৎসিত চেহারায় প্রতিভাত হয়েছে গত কয়েক দিনে। বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশের প্রাক্কালে ঐ সভায় যোগ দেওয়ার আহ্বান হিসাবে মোবাইল থেকে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে জনপ্রিয় গান টুম্পার প্যারডি

কুৎসিত বলায় সিপিএম কর্মীরা রাগ করবেন। কাগজে পড়ছি কেবল শতরূপ ঘোষের মত তরুণ তুর্কিরাই নয়; মহম্মদ সেলিম, শমীক লাহিড়ির মত বর্ষীয়ান নেতারাও “শতফুল বিকশিত হোক”, “বয়সের নিজস্ব ভাষা” প্রভৃতি যুক্তিতে সিপিএম ডিজিটালের সদস্যদের তৈরি এই প্যারডির পক্ষে চেতেশ্বর পূজারার মত ব্যাট করছেন।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে অকথা কুকথার বান ডেকেছে। লাইভ টিভিতে বিজেপি আর তৃণমূলের দুই নেতা একে অপরের জন্মদাতাকে পর্যন্ত গালাগালি করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে এবং তাঁর ভাইপোকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে বিজেপির দিক থেকেও। বামপন্থীরা সঙ্গত কারণেই দুপক্ষেরই সমালোচনা করছিলেন, বলছিলেন সাধারণ মানুষের ইস্যু বাদ দিয়ে কদর্য ভাষায় কুৎসিত রাজনীতি করা হচ্ছে, যা বাংলার সংস্কৃতির পরিপন্থী। সেই আবহে হিন্দি মিশ্রিত, অভিধান বহির্ভূত শব্দ সম্বলিত টুম্পাকে ব্রিগেডে নিয়ে যাওয়ার সঙ্কল্প কোন সংস্কৃতিকে ধারণ করছে কে জানে! ইদানীং কিছু ভোজপুরি গান নানা উপলক্ষে বাজতে শোনা যায়। সেগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য কয়েকটা শব্দ পরে পরেই শিল্পীর কণ্ঠের সাথে এক যান্ত্রিক আওয়াজের ক্যাকোফোনি। মূল ‘টুম্পা’ গানটা সেই ধারা অনুসরণ করেছে, প্যারডিও তাই। বামপন্থীরা যে ইস্যুভিত্তিক বিতর্কের কথা বলছিলেন, এ গানে তা-ই বা কোথায়? কেবল তৃণমূল-বিজেপির ‘সেটিং’-এর কথা রয়েছে, মমতা বা মোদী সরকারের কার্যকলাপের কড়া সমালোচনাও নেই। শুধু বার দুয়েক চাকরির প্রসঙ্গ আছে। অর্থাৎ এই প্যারডি রাজনৈতিক বক্তব্যে দুর্বল এবং আঙ্গিকে অবাঙালি। তবুও ভাইরাল, সুতরাং জনপ্রিয়। এতেই বাম নেতারা উল্লসিত। ভাইরাল মানেই ভোট বলে ভাবছেন হয়ত। ঠিক ভাবছেন কিনা তা সময় বলবে। তবে মজা লাগল অন্য কারণে।

আরও পড়ুন বাঙালির চেতনার রঙে শিল্প হল গো অ্যাজ ইউ লাইক

গত দশ বছরে তৃণমূল নেত্রীর উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে খোদ সূর্যকান্ত মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে কম কটাক্ষ করা হয়নি। ‘টুম্পা’ তেমন উচ্চারণকেই বাম রাজনীতির ভাষা করে দিল। নীচের তলার বাম কর্মীদের আকছার বলতে শোনা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বাঙালির “কালচারে আলকাতরা মিশে গেছে”। টুম্পার প্রেমে পড়ে এখন দেখছি কালচারের ধারণাটাকেই তাঁরা “এলিটিস্ট” আখ্যা দিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর লেখা কবিতা নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করতেন ওঁরা, আর মমতাপ্রেমী বুদ্ধিজীবীরা বলতেন কে কবি কে নয়, তা দাগিয়ে দেওয়া ভদ্রলোকদের এলিটিজম। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় এমন অসাহিত্যিক প্রলাপ শুনে শিউরে উঠতাম। এখন ‘টুম্পা’-র পক্ষে দেখছি একইরকম যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। শমীকবাবু বলেছেন “উচ্চাঙ্গসঙ্গীতই যে একমাত্র সংস্কৃতি, সেটা কোথায় সিদ্ধান্ত হল?”

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত মনে পড়ল অথচ গণসঙ্গীত মনে পড়ল না! জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার করে প্রতিবাদী গান বাঁধার কথা বললেই যে কোন ইতিহাস সচেতন কমিউনিস্টের মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য মনে পড়ার কথা। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে ব্যঙ্গ করে তৈরি সেই গান মঙ্গলকাব্যের ভাষায় হওয়ায় অক্ষর পরিচয় না থাকা মানুষকেও ছুঁয়ে ফেলত।

আর আজ কমিউনিস্টরা মনে করছেন সাধারণ মানুষের ভাষা মানে কিছু অভিধান বহির্ভূত শব্দ।

অবশ্য হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরীদের যুগ কবেই চলে গেছে। তখন সম্ভবত সংসদীয় কমিউনিস্টরাও চাইতেন মানুষকে বিকল্প বৈপ্লবিক সংস্কৃতির খোঁজ দিতে। এখন পাবলিক যা খাচ্ছে, সেটাকেই ব্যবহার করে ভোটে জিততে চান।

টুম্পা দীর্ঘজীবী হোক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading