বায়রন যদি ব্রুটাস হন, তৃণমূল কে?

২০২১ সালে যে তৃণমূল নেতাদের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাঁরা বিজেপিতে গিয়ে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন, তাঁদের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর অনতিবিলম্বেই ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছিল।

অবাক হওয়ার ক্ষমতা কমে আসাই সম্ভবত বার্ধক্যের সবচেয়ে নিশ্চিত লক্ষণ। বায়রন বিশ্বাস কংগ্রেসের টিকিটে, সিপিএমের সমর্থনে মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় খুব একটা অবাক হতে পারিনি। ফলে বুঝলাম, বুড়ো হচ্ছি। আমি যখন ছাত্র, তখন আমাদের কলেজের সেমিনারে সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। পিঠে ভারি স্কুলব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাওয়া এক পরিচিত স্কুলছাত্রকে নাকি তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন “কেমন আছ?” সে উত্তর দিয়েছিল “ওই আছি আর কি। এবার গেলেই হয়।” তখনও এ-দেশে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়নি। তখনই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে আমার মতো চালসে পড়া লোকের তো বুড়ো হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। চারপাশ অতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এত দ্রুত, যে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে বদলানো প্রায় কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই বোধহয় সাহিত্য, সিনেমা, সোশাল মিডিয়া— সর্বত্র স্মৃতিমেদুরতার ছড়াছড়ি, একমাত্র নস্টালজিয়ার বাজারই সর্বদা সরগরম। বদল এমনিতে জীবনের লক্ষণ, তা মনোরঞ্জক এবং উত্তেজক। কিন্তু ঘনঘন বদল আবার একঘেয়ে হয়ে যায়। সর্বক্ষণ চার, ছয় হয় বলে যেমন আজকাল আর আইপিএল ম্যাচ দেখতে ভাল লাগে না। মনে হয়, এ তো জানা কথাই। খেলার মহান অনিশ্চয়তা বলে আর কিছু নেই। রাজনীতিও ক্রমশ মহান অনিশ্চয়তা হারাচ্ছে। এ রাজ্যের রাজনীতি তো বটেই।

অনেকেই চটে যাবেন। তবু না বলে পারছি না— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদল ব্যাপারটা এতই জলভাত হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে, যে বায়রনের দলবদল নিয়ে কংগ্রেস ও বাম নেতৃত্বের আহত হওয়া এবং বহু সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা হতাশায় ভোগা আমার কাছে প্রাথমিকভাবে কৌতুককর। পরে অন্য কিছু। আগেই বলেছি, অতি দ্রুত সবকিছু বদলালে নিরুপায় মানুষ স্মৃতির কাছেই আশ্রয় নেয়। অনতি-অতীতে ফিরে গেলেই দেখতে পাই, এ রাজ্যের সর্বত্র একেকটা পাড়া বা পরিবার সম্পর্কে অন্যরা বলত “ওরা পাঁড় কংগ্রেসি” বা “ওরা কট্টর সিপিএম”। কোনও কোনও মানুষ সম্পর্কে বলা হত “প্রথমদিন থেকে তৃণমূলে আছে”। আজকাল আর সেসব বলা যায় না। এক যুগ আগে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেখা গেছে রেজ্জাক মোল্লার মতো “ঘামের গন্ধওলা কমরেড” তৃণমূলে চলে যেতে পারেন। উদয়ন গুহর মতো পারিবারিকভাবে বামপন্থী নেতা দল বদলাতে পারেন। হাত-পা নেড়ে মার্কসবাদ কপচানো, পকেটে মঁ ব্লাঁ পেন আর হাতে আই ওয়াচ পরা সিপিএমের রাজ্যসভার সদস্য ঋতব্রত ব্যানার্জি তৃণমূলের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারেন নিঃসঙ্কোচে। এমনকি প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘদিনের মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের বিশ্বস্ত সৈনিক শঙ্কর ঘোষ বিজেপির নির্ভরযোগ্য ‘কারিয়াকার্তা’ হয়ে উঠতে পারেন। তালিকা দীর্ঘতর করা যেতেই পারে, কিন্তু বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। যেসব মানুষ কখনও বামপন্থীদের ভোট দেন না, দেবেন না— তাঁদেরও কিন্তু বরাবর প্রত্যাশা থাকে, আর যে যা-ই করুক, বামপন্থীরা এমন নীতিহীনতায় জড়াবেন না। সেই বামপন্থীদেরই এসব করতে দেখে ফেলার পর ধনী ব্যবসায়ী কংগ্রেসি বায়রনের কাছে অন্যরকম প্রত্যাশা থাকবেই বা কেন? তিনি তো দেখলাম ঘোরপ্যাঁচহীন সরল মানুষ। বলেছেন, তৃণমূল প্রার্থী করেনি বলে কংগ্রেসে গিয়েছিলেন। এখন যখন বিধায়ক হয়েই গেছেন, তখন আর দলের উপর রাগ করে থাকার দরকার কী?

সাগরদীঘির ভোটাররা রাগ করতে পারেন এই লোকটির বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, অধীর চৌধুরী রাগ করতে পারেন তাঁকে বোকা বানানো হয়েছে বলে। আমরা, বাকি রাজ্যের মানুষ, যদি রাগ করতে চাই তাহলে কয়েকটা কথা একটু স্মরণ করে নেওয়া দরকার।

এ রাজ্যের বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় দিনের পর দিন একাধিক বিধায়ককে বাইরে তৃণমূল, ভিতরে বিজেপি হয়ে থাকতে দিচ্ছেন। এঁদের মধ্যে মুকুল রায় বলে একজন আছেন, যিনি বিজেপির টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে পরে ঘটা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতিতে তৃণমূলে ফিরে এসেছেন বলে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তারপর যখন তাঁকে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিরোধীরা সমালোচনা করেন। কারণ সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী ওই পদটা প্রধান বিরোধী দলকে দেওয়া হয়ে থাকে। এই সমালোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী যুক্তি দেন, মুকুল তো বিজেপিরই বিধায়ক। কদিন আগেও মমতা একথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বিধানসভার বাইরে প্রায় প্রতিদিন গরম গরম মন্তব্য করে বিজেপিকে সংবাদের শিরোনামে রাখেন যে বিরোধী দলনেতা, জনসভার অনুমতি আদায় করতে বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে যাঁর ক্লান্তি নেই, সেই শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি-টুমকি দেননি কখনও। সুতরাং ধরে নিতে হয় মুকুল তৃণমূলেরও, বিজেপিরও। শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদামণি যেমন বলতেন “আমি সতেরও মা, অসতেরও মা।” তা এই ব্যবস্থায় যদি আমাদের রাগ না হয়, খামোকা বায়রনকে ব্রুটাসের সঙ্গে একাসনে বসানোর প্রয়োজন কী?

ওই লোকটি যে জনাদেশকে অসম্মান করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ রাজ্যের এক বড় অংশের মানুষ তো আবার তৃণমূল দল ভাঙালে তাতে জনাদেশের অসম্মান হয় বলে মনে করেন না। ঠিক যেভাবে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এবং সোশাল মিডিয়ায় বিজেপি কোনও রাজ্যের সরকার দল ভাঙিয়ে ভেঙে দিলে অমিত শাহকে চাণক্য বলা হয়, ব্যাপারটাকে মাস্টারস্ট্রোক বলা হয়, সেইভাবে এ রাজ্যেও তো অন্য দলের নেতা তৃণমূলে যোগ দিলে তা গণতন্ত্রের জয় বলেই ঘোষণা করেন বহু মানুষ। বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররাও গদগদ হয়ে বলেন, তৃণমূল দেখিয়ে দিল। বায়রনের দলবদলের পর যেমন বলা হচ্ছে, সাগরদীঘির পরাজয়ের জবাব দিল তৃণমূল। প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, জবাবটা কাকে দিল? ভোটারদের? যে ভোটাররা তৃণমূলকে দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন? তাহলে লড়াইটা কি শাসক দল বনাম ভোটারের? একেই তাহলে এখন গণতন্ত্র বলছি আমরা? পরপর হিমাচল প্রদেশ আর কর্নাটকে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে বিজেপি সম্পর্কে সর্বভারতীয় স্তরে একটা কথা চালু হয়ে গিয়েছিল— ভোটে যে-ই জিতুক, সরকার গড়বে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কি আলাদা কিছু করছে?

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন যে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল তা তো ইদানীং অভিষেকও ঠারেঠোরে স্বীকার করেন। এ বছরে সময় অতিক্রান্ত হলেও পঞ্চায়েত নির্বাচন করানো নিয়ে সরকারের কোনও উৎসাহ নেই। রাজ্যপাল রাজ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করছেন না, সরকারও তা নিয়ে সংঘাতে যাচ্ছে না। অথচ এমনিতে কত বিষয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে কত আকচা-আকচি চলে! ২০২১ সালে যে তৃণমূল নেতাদের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাঁরা বিজেপিতে গিয়ে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন, তাঁদের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর অনতিবিলম্বেই ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছিল। উপরন্তু বাবুল সুপ্রিয়র মতো দাঙ্গাবাজ বিজেপিফেরতকে উপনির্বাচনে প্রার্থী করে মন্ত্রীও বানানো হয়েছে। এগুলো জনাদেশকে সম্মান করার লক্ষণ? এই ধারাতেই তো কংগ্রেসের একমাত্র বিধায়ককে দলে টেনে নেওয়া হল। আবার মঞ্চে বসে অভিষেক জাঁক করে এও বললেন, যে বোতাম টিপলেই কংগ্রেসের চারজন সাংসদকে তৃণমূল নিয়ে নিতে পারে। একের পর এক দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় দল যখন টলমল করছে, দিদির দূত প্রকল্প ঘটা করে ঘোষণা করার পর জনরোষের চেহারা দেখে চুপিসাড়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে, নবজোয়ারে বেরিয়ে নিত্য ল্যাজেগোবরে হতে হচ্ছে— তখনও এভাবে বুক ফুলিয়ে দল ভাঙানোর হুমকি দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে অভিষেক মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নীতি একটা বাতিল পণ্য হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন চাকরি চুরির চাঁইদের শেষ অব্দি কী গতি হয়?

তাঁর ধারণা যথার্থ। বিজেপির বিরুদ্ধে চাট্টি গরম গরম কথা বললেই (এমনকি আরএসএসের বিরুদ্ধেও বলতে হয় না। মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেন আরএসএস খারাপ নয়) সরকারি দলের যাবতীয় অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি, গঙ্গারতি ও মন্দির নির্মাণ সত্ত্বেও বিজেপিকে আটকাতে তাদেরই ভোট দেওয়া আমাদের কর্তব্য— একথা যখন থেকে এ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখনই নীতির ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হয়ে গেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল বিজেপিকে আটকানো, রাজ্যের সরকারের কাজের মূল্যায়ন নয়। তাতে ক্ষতি নেই। গণতন্ত্রে ভোটাররা নিজেদের অ্যাজেন্ডা নিজেরাই তো ঠিক করবেন। কিন্তু আজ দুবছর পরে ভেবে দেখা দরকার, বিজেপিকে আটকানোর উদ্দেশ্যটুকুও সফল হয়েছে কি? বিজেপি তিনজন বিধায়ক নিয়ে এককোণে পড়ে থাকা দল থেকে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে তো বটেই, সরকারবিরোধী ভোটাররা যাতে বিজেপি ছাড়া আর কোনও দলের উপর ভরসা করতে না পারেন তার জন্যে শাসক দল আপ্রাণ চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় পক্ষের কাছে সামান্য একটা উপনির্বাচনে হারও তারা সহ্য করছে না। না হয় মেনে নেওয়া গেল, কংগ্রেস নিজেদের বিধায়ককে ধরে রাখতে পারে না বলে অপদার্থ। সিপিএম আরও অপদার্থ, কারণ তারা আদালতের মুখাপেক্ষী হয়ে আন্দোলন করে— এও না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপিই একমাত্র পদার্থ হিসাবে পড়ে থাক— এমন পরিস্থিতিই কি তৈরি করতে চেয়েছিলাম আমরা? বায়রনের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে চুটকি আর মিম বানানো বা ক্ষোভ প্রকাশ করার চেয়ে নিজেদের এই প্রশ্ন করা বেশি জরুরি। কারণ আবার নির্বাচন আসছে। গণতন্ত্রের ওইটুকু তলানিই তো পড়ে আছে আমাদের জন্যে— একটা ভোট দেওয়ার অধিকার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দলে দলে দলবদলের খেলায় বাঙালি এখন দিব্যি দড়

পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন।

টিভিতে ইউরো দেখছেন? হিংসা হচ্ছে না? প্রায় সব মাঠেই দর্শক আছে। অথচ এ দেশে আমরা ভয়ে ভয়ে বাজার যাচ্ছি, ট্রেন চলছে না বলে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে কাজে যেতে হচ্ছে, তিতিবিরক্ত মানুষ স্পেশাল ট্রেন আটকে দিচ্ছেন, ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজ যাওয়া ভুলে গেছে, বড় বড় পরীক্ষা বাতিল, খেলাধুলোর তো প্রশ্নই নেই। ফাঁকা মাঠে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ আর অর্ধেক ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া ভারতে দেখার মত খেলা হয়নি সেই গত বছরের মার্চ থেকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের খেলাপাগল লোকেদের খেলা দেখার তেষ্টা যে কমেনি, বরং বেড়েছে — সেকথা রাজ্যের নেতৃবৃন্দ বিলক্ষণ জানেন। অতএব নির্বাচনে স্লোগান হল “খেলা হবে”। ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে শ্রবণেন সোয়া ভোজনম তো বটে। সোয়াই বা কেন? এক জনসভায় তো মুখ্যমন্ত্রী হুইল চেয়ার থেকে দর্শকদের দিকে একটা সত্যিকারের ফুটবলই ছুঁড়লেন। হাড্ডাহাড্ডি খেলার মাঠে দর্শকদের প্রাণ যাওয়ার ইতিহাস সারা পৃথিবীতেই আছে। ইডেনে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখতে গিয়ে ১৬ জনের মৃত্যুর কথা এ রাজ্যের কে না জানে? এবারের নির্বাচনও ছিল মরণপণ লড়াই, অতএব বেশকিছু প্রাণ গেল।

তবে মাঠের খেলার সাথে রাজনীতির খেলার বড় তফাত হল মাঠের খেলার শুরু আছে, শেষ আছে। শেষ হলে জয়ী দলের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন পরাজিত অধিনায়ক বিরাট কোহলির কাঁধে মাথা রাখতে পারেন, কোহলি ঠেলে সরিয়ে দেন না। আইসিসির কাছে অকারণ নালিশ ঠুকে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন না। কিন্তু রাজনীতির খেলার সূচনা, উপসংহারের ঠিক নেই। অনেকে ভাবেন কেবল নির্বাচনটুকু খেলা। “খেলা হবে” স্লোগান যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনিও হয়ত তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফল বেরোনো মাত্রই পরাজিত বিজেপি বুঝিয়ে দিল, বিধানসভা নির্বাচনটা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের মত ‘ওয়ান-অফ’ খেলা নয়, লম্বা সিরিজ।

খেলা হবে আর আনুষঙ্গিক উত্তেজনাগুলো থাকবে না তা কি হয়? সৌরভোত্তর বাঙালি না হয় ক্রিকেটের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, কিন্তু তার সেরা খেলা এখনও ফুটবল। নইলে ইস্টবেঙ্গলকে আই এস এল খেলানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মাঠে নামেন? ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণ হল ‘ট্রান্সফার মার্কেট’। এই বিলিতি কথাটা হালের আমদানি। গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশক অব্দি যখন টিভির চ্যানেল ঘোরালেই ইউরোপের লিগ দেখা যেত না; সেইসময় আমরা বলতাম ‘দলবদল’। দিবারাত্র খবরের চ্যানেল ছিল না, ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না, কিন্তু সকালের কাগজ তেতে থাকত দলবদলের খবরে। আজ পড়লাম কৃশানু-বিকাশ মোহনবাগানে যাচ্ছেন, কালই ছবি বেরোল “ইস্টবেঙ্গলের গোপন আস্তানায় আড্ডার আসরে অভিন্ন জুটি”। সঙ্গে হয়ত পল্টু দাসের উক্তি “ওরা ঘরের ছেলে, আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে?” মহমেডান ছাড়ছেন চিমা? সুদীপ চ্যাটার্জি কি দল বদলাবেন? কার অফার নিয়ে ভাবছেন শিশির ঘোষ? বিজয়ন-সত্যেন কি সত্যিই কেরালা পুলিস ছেড়ে মোহনবাগানে আসছেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মাঠে বল পড়ার আগেই ফুটবল মরসুম শুরু হয়ে যেত। একসময় রীতিমত অপহরণের অভিযোগে জেরবার হয়ে আই এফ এ চালু করল টোকেন ব্যবস্থা। টোকেন যার, ফুটবলার তার। তখন আবার এক ক্লাবকে টোকেন দিয়ে ফেলে পুলিসে ডায়রি করা শুরু হল টোকেন হারিয়ে গেছে বা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে।

আই এস এল যুগের তরুণ বাঙালির কাছে এসব গল্পকথা মনে হবে। কলকাতা লিগকে দুয়োরানি করে দিয়েছিল যে আই-লিগ, তাও তো এখন সবার পিছে সবার নীচে। কিন্তু মাঝবয়সী বা বার্ধক্যে উপনীত ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই গত কয়েক মাস স্মৃতিমেদুরতায় ভুগছেন। ভোটের মরসুমে ফিরে এসেছে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগের উত্তেজনা। প্রত্যেকবার অমিত শাহ উড়ে আসার কয়েকদিন আগে থেকে চ্যানেলে, কাগজে, ফেসবুকে আলোচনা চলেছে কোন কোন তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যাচ্ছেন, কোন কোন সাংসদ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন, কোন সিপিএম কাউন্সিলর কোন দিনের সভায় বিজেপিতে যোগ দেবেন। সন্দেহ নেই বিজেপির রিক্রুটারদের কাছে সে আমলের টুটু বসু, পল্টু দাস, মহম্মদ ওমররা নস্যি। তৃণমূল মন্ত্রিসভার সদস্য শুভেন্দু অধিকারী থেকে প্রবীণ সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্যের ডান হাত শঙ্কর ঘোষ পর্যন্ত কাকে না বঁড়শিতে গেঁথেছেন? তৃণমূলও হাত গুটিয়ে বসে ছিল না, তবে দলে টানা লোকেদের ধারে এবং ভারে তারা পিছিয়ে ছিল। সৌমিত্র খাঁয়ের ঘর ভাঙা ছাড়া আর তেমন সাফল্য কোথায়? তাছাড়া কৃশানু এক দলে, বিকাশ অন্য দলে থাকলে লাভ কী?

ফুটবলের দলবদল শেষ হয়ে যেত মরসুম শুরু হওয়ার আগেই। ‘মিড-সিজন ট্রান্সফার উইন্ডো’ ব্যাপারটা ইউরোপ থেকে শেখা হল অনেক পরে। কিন্তু সে তো উইন্ডো, মানে জানলা। নির্বাচনের পরে যা খুলে গেছে তা সিংহদুয়ার। ধীরেন দে, জ্যোতিষ গুহ পর্যন্ত ফেল পড়ে যাবেন মুকুল রায়ের সামনে। বাংলা সংবাদমাধ্যমে তাঁকে চাণক্য বলা হচ্ছে ইদানীং, অচিরেই মোরিনহো বা গুয়ার্দিওলার সাথে তুলনা করতে হবে। যদিও তাঁদেরও এমন চৌম্বকশক্তি নেই। পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন। খেলার আরও রোমহর্ষক হয়ে উঠছে। মুকুলবাবু বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হতে চলেছেন। বিরোধীরা আপত্তি করেছিলেন, ও পদটায় বিরোধী দলের বিধায়ককে বসানোই তো দস্তুর। কারণ শাসক দলে থাকা বিধায়ক সরকারি হিসাবপত্র পরীক্ষা করলে যে গলতি মাপ করে দেবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই। জবাবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন মুকুলবাবু তো বিজেপিরই বিধায়ক, তৃণমূল তাঁকে সমর্থন করবে কেবল।

পিকে ব্যানার্জি আর অমল দত্ত যখন যথাক্রমে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের কোচ ছিলেন, তখন উত্তেজনার পারদ চড়েই থাকত। ডায়মন্ড ম্যাচের আগে সে কি প্রবল বাদানুবাদ! একবার ভাবুন তো, যদি পিকে একইসঙ্গে দুই দলেরই কোচ হতেন? সাইডলাইনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে বেড়াতেন, বাইচুংকে নির্দেশ দিতেন “অপেক্ষা করলে হবে না, বল কাড়তে হবে।” তারপর বাইচুং গোল করতেই বাসুদেব মণ্ডলকে বকতেন “হচ্ছেটা কী? তুই থাকতে বাইচুং সাপ্লাই পাচ্ছে কেন?” মুকুল রায় খেলাটাকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন, বাঙালি মুকুলবাবুর বিশ্বরূপ দেখছে। এদিকেও তিনি, ওদিকেও তিনি।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

যে সময়ের কথা বলে লেখা শুরু করেছিলাম, সে সময় বাঙালির গুমোর ছিল, আর যা-ই হোক, ফুটবলে আমরা ভারতসেরা, কলকাতা হল ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। সে গর্ব গোয়ায় গুঁড়িয়ে গেছে অনেককাল আগে। আরেক অহঙ্কার ছিল বাংলার রাজনীতি। এখানে মারামারি, খুনোখুনি হয়। কিন্তু আয়ারাম গয়ারাম সংস্কৃতি নেই, ওসব গোবলয়ের ব্যাপার। আজকের ট্রান্সফার মার্কেটে সে গর্বও ধূলিসাৎ।

অবশ্য রাজনীতি খেলা হয়ে দাঁড়ালে এসব হবেই। যে কোন ঘটনাই প্রথমবার ঘটলে চোখ কপালে ওঠে, দ্বিতীয়বার আর কেউ উচ্চবাচ্য করে না। ফলে খেলা যত এগোবে, নেতাদের যাওয়া আসা বাঙালিরও গা-সওয়া হয়ে যাবে। রবি শাস্ত্রী ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় উত্তেজক ম্যাচের শেষে বলতেন, আসলে জয়ী হল খেলাটা। এ ক্ষেত্রেও যে খেলাটাই জিতবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ হারবে, হারছে সাধারণ নাগরিক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত