সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ইতিবাচক না লিখলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে না — এই ঘোষণা প্রমাণ করে অগণতান্ত্রিকতা জয়যুক্ত হয়েছে। এই জয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমের অবদানও ফেলে দেওয়ার মত নয়।

ব্যোমকেশ জানালার দিক্ হইতে চক্ষু ফিরাইয়া বলিল— “কিছুদিন থেকে কাগজে একটা মজার বিজ্ঞাপন বেরুচ্ছে, লক্ষ্য করেছ?”

আমি বলিলাম— “না। বিজ্ঞাপন আমি পড়ি না।”

ভ্রূ তুলিয়া একটু বিস্মিতভাবে ব্যোমকেশ বলিল— “বিজ্ঞাপন পড় না? তবে পড় কি?”

“খবরের কাগজে সবাই যা পড়ে, তাই পড়ি— খবর।”

“অর্থাৎ মাঞ্চুরিয়ায় কার আঙুল কেটে গিয়ে রক্তপাত হয়েছে আর ব্রেজিলে কার একসঙ্গে তিনটে ছেলে হয়েছে, এই পড়! ওসব পড়ে লাভ কি? সত্যিকারের খাঁটি খবর যদি পেতে চাও, তাহলে বিজ্ঞাপন পড়।”

— পথের কাঁটা (ব্যোমকেশ সমগ্র, আনন্দ পাবলিশার্স; পঞ্চদশ মুদ্রণ, মে ২০১১)

বাংলার সংবাদমাধ্যমের যা অবস্থা হয়েছে, তাতে আজও সত্য জানার আগ্রহে যাঁরা খবরের কাগজ পড়েন তাঁরা সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের সাথে এই প্রশ্নে একমত না হয়ে পারবেন না। তা বলে কখনোই কোনো কাজের খবর ছাপা হয় না বললে নিদারুণ অবিচার হবে। যেমন কয়েকদিন আগেই সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা সংবাদপত্রের সংক্ষিপ্ত খবরের স্তম্ভে একটি দারুণ কাজের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বয়ানটি এইরকম

‘পজিটিভ খবর’ ও সরকারি বিজ্ঞাপন

জেলার পত্র-পত্রিকা তথা সংবাদমাধ্যম উন্নয়নের খবর অনেক বেশি করে। তারা যাতে সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত না হয়, প্রশাসনকে তা দেখার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাওড়া শরৎ সদনে বৃহস্পতিবার জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, “পজিটিভ (ইতিবাচক) খবর করুন। বিজ্ঞাপন পাবেন।” প্রশাসনিক বৈঠকে এ দিন জেলার সংবাদমাধ্যমের তরফে এক জন প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রীকে জানান, তাঁদের আর্থিক অবস্থা সঙ্গিন। বারবার বলেও তাঁরা সরকারি বিজ্ঞাপন পাচ্ছেন না। বিষয়টি শুনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “নিশ্চয়ই বিজ্ঞাপন পাবেন। এলাকার উন্নয়নের খবর আপনারা ভাল করে করুন।” মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ছাপার পরে সেগুলি জেলাশাসক, পুলিশ সুপার ও স্থানীয় থানার আইসি-র কাছে পাঠাবেন। তাঁরা দেখে নেবেন, খবর ‘পজিটিভ’ না ‘নেগেটিভ’। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বড় সংবাদমাধ্যম এক দিন অল্প করে খবর করে। অনেক সময় ‘নেগেটিভ’ ভাবে প্রচারও করে। কিন্তু জেলার ছোট কাগজ সরকারের কাজের কথা গ্রামে গ্রামে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। সেই জন্যই তাদের বিজ্ঞাপন পেতে যাতে অসুবিধা না হয়, তা নজর রাখার জন্য প্রশাসনিক কর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সিপিএম ও বিজেপি নেতাদের মতে, জরুরি অবস্থার সময়ে সংবাদ প্রকাশের আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হত। এখন আবার ‘অন্য রকম জরুরি অবস্থা’ এসেছে, যখন বিজ্ঞাপনের জন্য সরকারের শংসাপত্র নিতে হবে।

এখন কী হয় জানি না, বছর দশেক আগেও খবরের কাগজে শিক্ষানবিশির সময়ে প্রথমেই শেখানো হত কী করে এরকম সংক্ষিপ্ত খবর লিখতে হয়। কারণ অনেকটা জায়গা জুড়ে হাজার-দেড় হাজার শব্দে প্রতিবেদন লেখা সহজ, এত অল্প পরিসরে সমস্ত কাজের কথা লিখে ফেলাই কঠিন। যেমন প্রতিবেদকের পক্ষে কঠিন, তেমনি প্রতিবেদন যে সম্পাদনা করে তার পক্ষেও কঠিন। ফলে এই কাজটা শিখে ফেললে বড় প্রতিবেদন লেখা বা সম্পাদনা করা জলভাত হয়ে যায়। সেদিক থেকে এই খবরটি (নিউজরুমের ভাষায় ‘ব্রিফ’) সাংবাদিকতার ক্লাসে পাঠ্য হওয়ার যোগ্য। মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যেকটি জরুরি বাক্য, রীতিমত ব্যাখ্যা সমেত ১৭৮ শব্দের মধ্যে ধরে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবেদকদের ছোট থেকে পই পই করে বলে দেওয়া হয়, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য যে কোনো খবরে সব পক্ষের বক্তব্য দেওয়া আবশ্যক। এখানে তা-ও করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সম্বন্ধে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির বক্তব্য তো লেখা হয়েছে বটেই, এমনকি শূন্য পাওয়া সিপিএমকেও বঞ্চিত করা হয়নি। রাজ্যের গণতন্ত্রের সামগ্রিক ছবি তুলে ধরার জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রতিবেদন গত দশ বছরের কাগজ ঘাঁটলেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

খবরটি থেকে কী কী জানা যাচ্ছে?

প্রথমত, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবরই করতে হবে। সরকারি আইন যা-ই বলুক, সরকারের সমালোচনা করলে, দোষত্রুটি ধরলে বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সরকারি বিজ্ঞাপন প্রকৃতপক্ষে সরকারি আনুকূল্য। সে বাবদ যে টাকা পত্রপত্রিকাগুলি পেয়ে থাকে তা করদাতার টাকা নয়, সরকারের পৈতৃক সম্পত্তি। সরকারের নেকনজরে থাকলে পাওয়া যাবে, নচেৎ নয়। এককথায়, সংবাদমাধ্যমকে সরকারি প্রচারযন্ত্র হয়ে উঠতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জেলার পত্রপত্রিকা, চ্যানেল ইত্যাদি সরকারের কাজের প্রচার অনেক বেশি করে। তার উপযুক্ত প্রতিদান যেন তারা পায়, তা দেখা সরকারি আধিকারিকদের কাজের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ জেলাশাসক যেমন খবর রাখেন জেলার কোথাও বন্যাদুর্গত মানুষ না খেয়ে আছেন কিনা, তেমনি তাঁকে খেয়াল রাখতে হবে জেলার কোনো কাগজ বন্যাত্রাণে সরকারের কাজের ঢালাও প্রচার করেও সরকারি বিজ্ঞাপন না পেয়ে আছে কিনা।

তৃতীয়ত, সংবাদমাধ্যম মুখ্যমন্ত্রীকে একজন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসক মনে করছে না। প্রশাসনিক বৈঠকে গিয়ে কেবল তাঁর কার্যকলাপের যথাযথ প্রতিবেদন তৈরি ও মূল্যায়ন তার কাজ নয়। মুখ্যমন্ত্রী মাইবাপ, তাই নিজেদের আর্জি পেশ করাও কাজ। বাঁচালে মুখ্যমন্ত্রীই বাঁচাবেন।

চতুর্থত, বড় সংবাদমাধ্যম সরকারের যথেষ্ট স্তুতি করছে না। এমনকি মাঝেমধ্যে নিন্দে-বান্দাও করছে। বাংলা যে সোনার বাংলা হয়ে উঠেছে, সে খবর গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিচ্ছে ছোট সংবাদমাধ্যমই। তারা সরকারকে দেখছে, অতএব তাদের দেখাও সরকারের কর্তব্য।

পঞ্চমত, সরকারের যথেষ্ট প্রশংসা করা হয়েছে কিনা তা ঠিক করবেন জেলাশাসক, পুলিস সুপার এবং স্থানীয় থানার আইসি। অর্থাৎ যাঁদের ফৌজদারি ক্ষমতা আছে। কিন্তু সরকারি যে দপ্তরগুলি আইনত বিজ্ঞাপন দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেগুলি এলেবেলে।

মোদ্দা কথা, পশ্চিমবঙ্গে এখন সরকারি বিজ্ঞাপন একটি ঘোষিত লাঠি, যা উঁচিয়ে সংবাদমাধ্যমকে সরকার নিজের ইচ্ছামত ওঠবোস করায়। ঘোষিত কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে তৈরি হওয়া দুটি প্রেস কমিশন দেশের সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন, সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার জন্য যা যা সুপারিশ করেছিল তার অনেককিছুই অনেক দলের সরকারই মানেনি। অনেক কথা সংবাদমাধ্যমও মানেনি। প্রেস কাউন্সিল নামে একটি ঠুঁটো জগন্নাথ আছে, তাদের কথাও দু পক্ষের কেউ শোনে না। এর উপর আছে সংবাদমাধ্যম চালানোর, বিশেষত খবরের কাগজ চালানোর, বিপুল খরচ। সেই সুবাদে গত ৭৫ বছর ধরে অনেক দলের অনেক সরকারই সরকারি বিজ্ঞাপনকে লাঠি হিসাবে ব্যবহার করেছে। যে কোনো গবেষক যে কোনো রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস আর সংবাদমাধ্যমগুলির সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার তথ্য পাশাপাশি রেখে পড়লেই তার অজস্র প্রমাণ পাবেন। কিন্তু প্রবল প্রতাপান্বিত নরেন্দ্র মোদীর সরকারের আগে কোনো সরকার রীতিমত আইন প্রণয়ন করে সংবাদমাধ্যমকে তোতাপাখি করে ফেলার চেষ্টা করেনি।১ ঠিক তেমনি, অন ক্যামেরা সরকারি বৈঠকে বসে, ইতিবাচক খবর করলে তবে সরকারি বিজ্ঞাপন দেব — এ কথা ঘোষণা করার সাহসও পশ্চিমবঙ্গে অতীতে কোনো মুখ্যমন্ত্রীর হয়নি।

যে কোনো কাজ, যা বরাবর লুকিয়ে করা হত, তা প্রকাশ্যে করা বিরাট পরিবর্তনের প্রমাণ। অন্য সম্প্রদায়ের লোকেদের নিয়ে ভিত্তিহীন, কুৎসিত আলোচনা ভারতীয়রা চিরকাল করে থাকে। কিন্তু ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত ওই সম্প্রদায়ের মানুষের সামনে করা হত না, এখন হয়। এ থেকে প্রমাণিত হয়, চক্ষুলজ্জাও দূরীভূত, কারণ পরজাতিবিদ্বেষ এখন ক্ষমতার আশীর্বাদধন্য। তেমনি সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ইতিবাচক না লিখলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে না — এই ঘোষণা প্রমাণ করে অগণতান্ত্রিকতা জয়যুক্ত হয়েছে। এই জয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমের অবদানও ফেলে দেওয়ার মত নয়। এতবড় খবর যে একটি বড় সংবাদপত্রের ব্রিফে জায়গা পেয়েছে এবং অন্যত্র আদৌ জায়গা পায়নি, তার একটিমাত্র ব্যাখ্যাই সম্ভব বলে মনে হয়। “মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষপাত জেলার ছোট সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতি। অতএব বেল পাকলে কাকের কী?” আরও নৈরাশ্যবাদী হলে অবশ্য আরেকটি ব্যাখ্যাও করা সম্ভব। “এই নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে যদি যা পাচ্ছি তা-ও বন্ধ করা হয়?”

গত এক দশকে ভারতীয় গণতন্ত্র, পিছু পিছু ভারতীয় সাংবাদিকতা, যে পথে গেছে তাতে পরিষ্কার হয়ে গেছে, আয়ের যে পথ অবলম্বন করে এ দেশে সাংবাদিকতা এতকাল চলেছে তা বাতিল করতে হবে। নইলে সংবাদমাধ্যমের পক্ষে সত্য বলা, সত্য দেখানো অসম্ভব। সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং/অথবা কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ এড়ানো না গেলে সংবাদমাধ্যমকে ক্ষমতার বশংবদ হয়েই থাকতে হবে। ফলত ইংরেজিতে এবং ভারতের অন্যান্য ভাষাতেও এখন গ্রাহকভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চালু হয়েছে। নিউজলন্ড্রি, নিউজক্লিক, দ্য ওয়্যারের মত সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কেন তারা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সত্যের প্রতি অনেক বেশি বিশ্বস্ত থাকতে পারছে। আক্রান্ত হচ্ছে, তবু লড়ে যেতে পারছে। বাংলাতেও সেরকম প্রয়াস আশু প্রয়োজন। সেই প্রয়াস ফলপ্রসূ করতে হলে সত্যান্বেষী পাঠক, দর্শকদের এগিয়ে আসতে হবে। নইলে নাগরিক ডট নেট বা ইত্যাকার প্ল্যাটফর্মগুলিকেও অনতিবিলম্বে ক্ষমতার মালাই জপতে হবে।

তথ্যসূত্র

১। https://scroll.in/article/988105/explainer-how-indias-new-digital-media-rules-are-anti-democratic-and-unconstitutional

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

দুটো ভারতের কথাই বিদূষক বীর দাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি সেন্টারে দাঁড়িয়ে হলভর্তি দর্শকের সামনে বলেছেন। বস্তুত, তিনি কোনো রসিকতা করেননি। কোনো চুটকি বলেননি। কেবল ভারতে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা পরপর আউড়ে গেছেন। তাতেই এক ভারত এফআইআর করে ফেলেছে, অন্য ভারত উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।

কিসে আমাদের হাসি পায়? এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমরা কারা — সে প্রশ্নের উত্তর। হাসি যে এভাবে মানুষ চেনায় তা ২০১৪ পরবর্তী ‘স্বাধীন’ ভারতে বাস না করলে বোধহয় বোঝা হত না। এখন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, টুইটারে অনবরত হাসির উপাদান আসে। চাইলেই এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব যাতে সারাদিন মোবাইলে কেবল চুটকিই আসতে থাকবে। কদিন পরে গুগল যখন বুঝবে আপনি হাসবেন বলেই বাঁচেন, তখন আপনাকে খবর হিসাবেও নানারকম চুটকি, মিম আর হাস্যকর ভিডিও পাঠাতে থাকবে।
 

আমরা সবাই হাসছি, গোটা দেশ হাসছে। সবাই, সবকিছুই হাসির পাত্র। একজন নিরস্ত্র লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছে পুলিস, এক উল্লসিত মানুষ লাফিয়ে উঠে তার বুকে লাথি মারছে। তেমন হোয়াটস্যাপ গ্রুপে থাকলে এ নিয়েও একাধিক চুটকি পড়তে পারবেন। একটা মিছিলের লোকেদের পিছন থেকে এসে পিষে দিয়ে চলে গেছে একটা গাড়ি। পিষে যাওয়া লোকগুলোকে নিয়েও কৌতুক করা সম্ভব। তাছাড়া মহিলারা কত বোকা তা নিয়ে, একইসঙ্গে তারা পুরুষদের কেমন দাঁতের উপর রাখে তা নিয়েও অজস্র কৌতুক বিতরণ হয় আজকাল। মুসলমানদের রক্ষণশীলতা, পুরুষদের দাড়ি আর মহিলাদের বোরখা নিয়েও দারুণ বুদ্ধিমান এবং প্রবল শিক্ষিত লোকেরা মাথা খাটিয়ে হাজার হাজার জোক ও মিম তৈরি করছেন। আজকাল হাসির প্রয়োজনীয়তা এত প্রবল, যে নাচগানের অনুষ্ঠানেও লোক না হাসালে টিআরপি পাওয়া যায় না। আর হাসাতে হলে যে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ বিদ্রুপ করতেই হবে তা স্বতঃসিদ্ধ। কদিন আগেই নাচের অনুষ্ঠানের এক সঞ্চালক গৌহাটির এক শিশুশিল্পীকে দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন “চাইনিজ”, “মোমো”, “চিং চং” বলে। এসব দেখেও আমাদের হাসি পায়। রসিকতাটাকে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ বললে আরও বেশি হাসি পায়। কারণ জাতিবিদ্বেষও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত, যতক্ষণ না বিদ্বেষটা আমাদের জাতির প্রতি ধেয়ে আসে।

কিসে আমাদের হাসি পায় না? এর উত্তরও বলে দেবে আমরা কারা। পেট্রোল, ডিজেলের লাগামছাড়া দাম নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। দেবদেবীদের নিয়ে, পৌরাণিক চরিত্রদের নিয়ে রসিকতা করলেও আমাদের হাসি পায় না। দেশের দোষত্রুটি, দুর্নীতি নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। শুধু হাসি পায় না তা-ই নয়, ওসব নিয়ে রসিকতা করলে আমরা বেজায় চটে যাই। চটে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা আর মনে থাকে না। তখুনি আমরা তেড়ে গাল পাড়ি, রসিকতা করা বিদূষক বা কার্টুনিস্টকে পাকিস্তানে চলে যেতে বলি। আমাদের মধ্যে যারা উদ্যোগী, তারা এফআইআর পর্যন্ত করি। কিন্তু এই আমরাই সব নই। আমাদের আরেক দল আছে।

এই আমাদেরও হাসি পায়। আমরা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে হাসাহাসি করি। ভারত ১৯৪৭ সালে নয়, ২০১৪ সালে স্বাধীন হয়েছে শুনে হাসাহাসি করি। যারা এসব বলে তাদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীর সংখ্যা যে শূন্য, তা নিয়ে হাসাহাসি করি। প্রধানমন্ত্রীর দাড়ি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভুঁড়ি নিয়ে রসিকতায় হাসি। আমরা লক্ষ্মণের শক্তিশেল পড়ে হাসি, যানে ভি দো ইয়ারোঁ ছবির শেষ দৃশ্য দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ি। আর কিসে আমাদের হাসি পায়? প্রধানমন্ত্রী সমেত দেশের সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ লোকেদের কার্যকলাপ এবং অবলীলাক্রমে দিনকে রাত, রাতকে দিন করার ক্ষমতা দেখে হাসি পায়। পেঁয়াজের দাম এত বাড়ছে কেন জিজ্ঞেস করলে অর্থমন্ত্রী যখন বলেন “আমি পেঁয়াজ খাই না”, তখন আমাদের হাসি পায়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারকে না হওয়া যুদ্ধে হারিয়েছিলেন শুনে আমাদের হাসি পায়। গুজরাটে পথের ধারে আমিষ খাবার বিক্রি করতে দেওয়া হবে না শুনেও হাসি পায়, কারণ আমরা নিরুপায়। আমরা কেবল হাসতে পারি, আর কিছুই করতে পারি না। মানুষ তো কেবল মজা পেয়ে হাসে না, চরম দুর্দশাতেও হাসে। আমাদের এখন সেই অবস্থা। দেশের প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা যখন বলেন নাগরিক সমাজের সাথেও লড়তে হবে, তখনো আমাদের হাসি পায়। কিন্তু ভয়ে হেসে উঠতে পারি না। যখন দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান গণপিটুনিকে বৈধ ঘোষণা করেন, তখনো হাসতে পারলে আমরা খুশি হতাম। কিন্তু সাহস হয় না, কারণ আমাদের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ ছাপ দিনরাত পড়ে। ‘সন্ত্রাসবাদী’ ছাপ পড়তে কতক্ষণ?

এই দুই আমরা — ভারতের বাসিন্দা। দুটো ভারত। এই দুটো ভারতের কথাই বিদূষক বীর দাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি সেন্টারে দাঁড়িয়ে হলভর্তি দর্শকের সামনে বলেছেন। বস্তুত, তিনি কোনো রসিকতা করেননি। কোনো চুটকি বলেননি। কেবল ভারতে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা পরপর আউড়ে গেছেন। তাতেই এক ভারত এফআইআর করে ফেলেছে, অন্য ভারত উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। কারণ বীর দাস যে কথাগুলো সহজ ভাষায় বলেছেন, সেগুলো দেশের কোনো বিরোধী নেতা এখন পর্যন্ত বলেননি। প্রথিতযশা সাংবাদিকদের অধিকাংশ হয় মিথ্যে বলার শিল্পে দড় হয়ে উঠেছেন, নয় নিরপেক্ষতার অজুহাতকে ঢাল করে ফেলেছেন। এখনো সত্য খোঁজার, সত্য লেখার, সত্য দেখানোর সাহস যাঁদের আছে তাঁরা সিদ্দিক কাপ্পানের মত কারাগারে পচছেন। অবিনাশ ঝায়ের মত খুন হচ্ছেন। সমৃদ্ধি সকুনিয়া আর স্বর্ণা ঝায়ের মত আটক হচ্ছেন।

হয়ত বীরও কোনোদিন আটক হবেন অথবা তাঁর পেশার বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হবে, যেমনটা মুনাওয়ার ফারুকির ক্ষেত্রে করা হল। হয়ত বীর, কুণাল কামরা, বরুণ গ্রোভাররা মুসলমান নন বলেই কিছুটা বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বীর বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোন ভারতের সঙ্গে আছেন। তিনি সার্থকনামা।

আরো পড়ুন বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

আমাদের বাংলায় হবে সেই ছেলে কবে? এখানে আপাতত পদ্মলোচন নামের কানা ছেলেদের ছড়াছড়ি। কেবল অরাজনৈতিক, মোটা দাগের যৌন রসিকতার উদযাপন চলছে। যে দেশের সাংবাদিকরা বিকিয়ে যায় সে দেশ নিশ্চয়ই দুর্ভাগা, কিন্তু যে জাতির বিদূষকরা সুবিধাবাদী — তাদের দুর্দশা আরও বেশি। বাঙালি এখন সেই জাতি। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই হিন্দি বলয়ের অনেকের ভিডিও দেখা যায়, যাঁরা বীর বা কুণালদের মত বিখ্যাত না হলেও যোগী আদিত্যনাথের মত ভয়ঙ্কর লোককে নিয়েও রসিকতা করতে ভয় পান না। বাংলায় তেমন কেউ কই? ভাবলে অবাক লাগে, এই ভাষারই একজন কবি লিখেছিলেন সেই পংক্তিগুলো, যা বীরকে ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগা ভারতীয়দের মনের ভাব প্রকাশ করেছে নিখুঁতভাবে

অভয় দিচ্ছি, শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?
বসলে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা!
আমি আছি, গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে —
সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

‘১৯৯১ থেকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পথ ত্যাগ করার ফল গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১০১তম স্থান’

কেবল বলা হয়, সবকিছু খুলে দাও। সারা পৃথিবীতে আজ যতগুলো সফল অর্থনীতি আছে, কোনোটাই সবকিছু খুলে দিয়ে সফল হয়নি।

এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি হয়ে যাওয়া দারুণ অখুশি হওয়ার মত কোনো ঘটনা নয়, বলছেন অর্থনীতিবিদ

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, অধুনা দিল্লির বাসিন্দা নিত্য নন্দ অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ইস্যুগুলোতেই তাঁর আগ্রহ বেশি। ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও সরকারি সংস্থার পরামর্শদাতা হিসাবে বহু বছর ধরে তিনি অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের কাজ করেছেন। তাছাড়া UNCTAD (United Nations Conference on Trade and Development), UNESCAP (United Nations Economic and Social Commission for Asia and the Pacific), UNDP (United Nations Development Programme)-র মত সংস্থা এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের কনসালট্যান্টের ভূমিকাও পালন করেছেন। এই মুহূর্তে তিনি কাউন্সিল ফর সোশাল ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর। অতি সম্প্রতি লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই India’s Industrial Policy and Performance: Growth, competition and competitiveness। নাগরিক ডট নেটের সাথে আলাপচারিতায় নিত্যবাবু ভারতের অর্থনীতির অভিমুখ, জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ থেকে শুরু করে এয়ার ইন্ডিয়ার বেসরকারিকরণ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা সরিয়ে দিলেন।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ভারতের মত দেশে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাকে কতটা উপযোগী বলে মনে করেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে প্রায় জলের দরে বিদ্যুৎ জোগান, বা মমতা ব্যানার্জি যেভাবে নানা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জরুরি পরিষেবা বিনামূল্যে নাগরিকদের দিয়ে থাকেন — তাকে কীভাবে দেখেন?

দেখুন, সকলের জন্য ন্যূনতম খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেটাও আমরা করে উঠতে পারছি না। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১১৬টা দেশের মধ্যে ১০১ নম্বরে পৌঁছে গেছি। নেপাল, পাকিস্তানের চেয়েও পিছনে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক কাজকর্মের উপযোগিতা আলাদা করে বুঝিয়ে বলার আর দরকার পড়ে না। তবে একটা কথা বলতেই হবে, এই দুর্দশা কিন্তু স্রেফ গত এক-দেড় বছরের নয়। আমরা এই সময়টায় কী দেখলাম? কয়েক লক্ষ মানুষ লকডাউন আরম্ভ হতেই পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেন। তা এঁরা সব মহানগরগুলোতে কেন এসেছিলেন? কাজ করে একটা ভাল জীবন পাবেন আশা করে তো? কিন্তু ভেবে দেখুন, কতটা ভঙ্গুর তাঁদের অবস্থা, যে এক মাস কাজ না থাকলেই না খেয়ে থাকতে হবে, সেই আশঙ্কায় তাঁরা ফিরে যেতে শুরু করলেন। এই অবস্থা তো আর তক্ষুণি হয়নি। তার মানে আমরা যতই গলা ফাটাই যে ১৯৯১ সালের পরে আমাদের জিডিপি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, আসলে কিন্তু বিরাট অংশের মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে রয়ে গেছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে আমরা ৯৪ থেকে ১০১ হয়েছি। আগের সংখ্যাটাও কি গর্বের? আসলে গত তিরিশ বছর ধরেই আমরা ক্রমশ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সরে এসেছি। এগুলো তারই ফল।

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নটার কোনো সহজ উত্তর নেই। আমি নীতিগতভাবে এইসব পদক্ষেপের বিরোধী নই, কারণ গরীব নাগরিকদের সাহায্য করা দরকার। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু সমালোচনার জায়গা আছে। যেমন ধরুন কেজরিওয়াল যতখানি বিদ্যুৎ ভর্তুকি দিয়ে প্রায় বিনামূল্যে দিচ্ছেন, ততটা বোধহয় কোনো গরীব মানুষের দরকার হয় না। আমি মনে করি না কাউকে বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার চালানোর জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া উচিত। সেটা পরিবেশরক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতেও খারাপ, অর্থনীতির দিক থেকেও খারাপ। দিল্লিতে কেজরিওয়াল নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটা গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কোভিড অতিমারীতে আমরা দেখলাম এখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিন্তু তাতেও প্রয়োজন মেটানোর পক্ষে একেবারেই যথেষ্ট নয়। আমার মনে হয় বিদ্যুতে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিল্লি সরকার দিচ্ছে, তাতে কাটছাঁট করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সেই টাকা কাজে লাগালে তা অনেক বেশি জনকল্যাণমুখী হবে।

একটা কথা বলা দরকার। যে দেশটাকে আমরা গণতন্ত্রের স্বর্গ বা মক্কা বলে থাকি, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু আর কিছু থাকুক না থাকুক, গরীব বলেই আপনার ছেলেমেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে — এমনটা হয় না। ওখানকার সরকারি স্কুলগুলো যথেষ্ট ভাল। নিঃসন্দেহে কিছু বেসরকারি স্কুল আছে যেখানে লেখাপড়ার বাইরেও অনেককিছু শেখানো হয়। ঘোড়ায় চড়া, এটিকেট ইত্যাদি। সেখানে অনেক টাকাপয়সা থাকলে তবেই পড়াশোনা করা যায়। কিন্তু ওগুলো না শিখলেও তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু একজন গরীব ছাত্র বা ছাত্রী যে শিক্ষাটা না পেলেই নয়, তা থেকে কিন্তু বঞ্চিত হবে না। এ কথা কিন্তু আমাদের দেশ সম্বন্ধে নিঃসংশয়ে বলা যায় না। আমি নিজে পশ্চিমবঙ্গে পড়াশোনা করেছি বলে জানি, অনেককিছু ইতিমধ্যে বদলে গিয়ে থাকলেও আজও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলো নেহাত ফ্যালনা নয়। কিন্তু উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা মোটেই ভাল নয়। একেবারেই পড়াশোনা হয় না। মানে শেষমেশ ব্যাপারটা এই, যে গরীবের ছেলেমেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। ন্যূনতম খাদ্য নিশ্চিত করার মত সবচেয়ে গরীবের ছেলেমেয়েরও ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করাও কিন্তু যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আচ্ছা, বিশ্বায়নের যুগে ভারতের মত উদার অর্থনীতি নিয়ে চলেছে যেসব বড় বড় রাষ্ট্র, তারা এখন কোন পথে হাঁটছে? বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের যে সঙ্কটের কথা আমরা ইদানীং বামপন্থীদের মুখে শুনি, সেটা কতটা ঠিক বা ভুল?

আমাদের দেশে চীন কীভাবে চলেছে, দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে চলেছে, ব্রাজিল বা জার্মানি কীভাবে চলেছে সে সম্পর্কে যা বলা হয় আর আসলে দেশগুলোর অর্থনীতি যেভাবে চলেছে, তার মধ্যে কিন্তু অনেক তফাত আছে। বাম, দক্ষিণ — দু পক্ষই কোথাও না কোথাও পুরো সত্যিটা বলে না। এটাই বাস্তব।

আজ যদি আপনি বলেন চীন উদার অর্থনীতি অবলম্বন করে বিরাট এগিয়ে গেছে সেটা যেমন সম্পূর্ণ মিথ্যে, তেমনি যদি বলেন ওরা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে এগিয়েছে, তা-ও মিথ্যে। চীন আসলে দুরকম অর্থনীতির একরকম মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছে। চীনের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিন্তু বেশ জোরালো। পরিকাঠামো ক্ষেত্রে যেমন প্রবল নিয়ন্ত্রণ আছে। ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আছে। বিশ্বব্যাপী এখন যে চীনা কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করছে, সেগুলো বেশিরভাগই কিন্তু সরকারি কোম্পানি। এভাবেই চীনের অর্থনীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে ফরচুন ৫০০ তালিকায় আমাদের দেশের যতগুলো কোম্পানি থাকে, তার চেয়ে ওদের কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি।

আবার ছোট দেশ সিঙ্গাপুরের দিকে যদি তাকান। ওদের পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদরা উদারনৈতিক দেশ বলে থাকেন। আসলে ওদের দেশে আমদানি শুল্ক বেশ কম। এইদিক থেকে ওরা উদার। কিন্তু অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে প্রবল সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে। এমনকি কোনো আবাসনে কোন জনগোষ্ঠীর কতজন লোক থাকবে সেটাও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় গেলেও দেখতে পাবেন সরকার কিছু ক্ষেত্রে উদার হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। আসলে সব দেশই নিজের মত করে কোথাও না কোথাও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানির মত দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সত্যিটা আমাদের দেশের লোকের সামনে বলা হয় না সাধারণত। কেবল বলা হয়, সবকিছু খুলে দাও। সারা পৃথিবীতে আজ যতগুলো সফল অর্থনীতি আছে, কোনোটাই সবকিছু খুলে দিয়ে সফল হয়নি।

আপনার কথা থেকেই এসে পড়ে বেসরকারিকরণের প্রসঙ্গ। সদ্য এয়ার ইন্ডিয়া কিনে নিল টাটা। অনেকে বলছেন জওহরলাল নেহরু পুঁজিপতিদের বিরোধী ছিলেন। তাই এয়ার ইন্ডিয়া টাটাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদি ফিরিয়ে দিলেন। ভারতীয় অর্থনীতির একটা বড় ভুল এতদিনে সংশোধন করা হল। এই ব্যাখ্যা কতটা ঠিক? কারণ টাটাদের প্রকাশ করা হিসাব অনুযায়ী যখন ভারত সরকার এয়ার ইন্ডিয়া অধিগ্রহণ করেন, তখন তো কোম্পানি ঘাটতিতেই চলছিল, তাই না?

আসলে ১৯৫০-এর দশকে কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল — সেগুলো না জেনেই যদি আজ কেন হচ্ছে তা নিয়ে মন্তব্য করি, তাহলে খুব বড় ভুল হয়ে যাবে। সেইসময় আমাদের দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সঙ্গতির কথা মাথায় রাখা দরকার। এটা ঠিক যে টাটারাই এয়ার ইন্ডিয়ার ব্যবসাটা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া যেভাবে বাড়ছিল, তাঁরা কি সেই অনুযায়ী বাড়াতে পারতেন বা বাড়াতেন? সেটা আমরা কেউ জানি না। ১৯৬০-এর দশকে কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া এশিয়ার অন্যতম বড় এয়ারলাইন্স কোম্পানি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বলা ভাল, এয়ার ইন্ডিয়াকে আমরা, অর্থাৎ আমাদের সরকার, ঠিকমত চালাতে পারল না। বা চালাতে চাইল না। কারণ প্রথমত, মোটামুটি ১৯৮০-র দশক থেকে, আরও বেশি করে ১৯৯১ সাল থেকে, আমরা চাই না কোনোকিছুর মালিকানা সরকারের হাতে থাকুক। এটা এমন একটা আদর্শগত ব্যাপার, যার ভালমন্দ আমরা ভেবে দেখি না। সেই অবস্থান থেকেই এত বছর ধরে এয়ার ইন্ডিয়াকে কী করে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, ঠিক করে চালানো যায় — সে চিন্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি।

দ্বিতীয়ত, মাথায় যদি সাপে কামড়ায় আপনি কোথায় বাঁধন দেবেন? আজ মূল প্রশ্ন হল রাষ্ট্র কি জনকল্যাণের জন্য, নাকি পুঁজিপতিদের ব্যক্তিগত স্বার্থে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থান তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য? আমি কিন্তু বলছি না, যে নেহরুর সময়ে সবকিছু একেবারে উল্টো ছিল, তিনি পুঁজিপতিদের মোটেই রেয়াত করেননি। তখন সরকারিভাবে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার সবই যে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে তা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পুঁজিপতিদের সাহায্য করার জন্যই কাজগুলো করা হয়েছিল। কারণ তখন পুঁজিপতিদের হাতে তেমন টাকা ছিল না। আমাদের পরিকাঠামোগত শিল্প এবং ভারী শিল্প তৈরি করতে বড় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। তেমন বিনিয়োগ করতে পারার মত কটা কোম্পানি ছিল তখন এ দেশে, আর আজ কটা কোম্পানি আছে? দুটো বাস্তবতা একেবারে আলাদা। নেহরু একেবারে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন আর এখন শতকরা একশো ভাগ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলছে — এমন কথা আমি বলব না। কিন্তু সরকার কিছুই করবে না — আজকের এই যে মতাদর্শ। একে প্রশ্ন করা দরকার।

প্রায় দশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এয়ার ইন্ডিয়া যেভাবে লসে রান করছিল, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তার কোনো পুনরুজ্জীবনের আশা দেখছিলাম না। সেদিক থেকে এয়ার ইন্ডিয়া সরকারের হাত থেকে চলে যাওয়ায় যে আমরা খুব বেশি কিছু হারালাম তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এটাও ঠিক যে টাটার কাছে এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে দেওয়ার সময়ে কোম্পানির বিপুল পরিমাণ দেনার বোঝা কিন্তু সরকারই ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছে। সরকারের ঘাড় মানেই তো সাধারণ মানুষের ঘাড়। সুতরাং এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে মানুষের লাভ হল, তাও বলা যাবে না।

আবার ভেবে দেখুন, এয়ার ইন্ডিয়া চালিয়ে কি একেবারে সাধারণ, গরীব ভারতবাসীর কোনো লাভ হয়? তা কিন্তু নয়। এয়ার ইন্ডিয়ায় যারা কাজ করে তারা সবাই যথেষ্ট ভাল বেতন পায়, বিমানচালক বা বিমানসেবিকার কাজ খুবই গ্ল্যামারাস পেশা হিসাবে সমাজে স্বীকৃত। আমাদের মত দেশে ওই পেশায় অত বেতন না দিলেও কিন্তু চলে। তাছাড়া আমরা যারা এয়ার ইন্ডিয়ার পরিষেবা ব্যবহার করি, তারাও কিন্তু কেউ গরীব লোক নই। সুতরাং গরীব মানুষের এতে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। তবে সব মিলিয়ে একটা সরকারি এয়ারলাইন্স বেসরকারি হয়ে গেল বলে খুব অখুশি হওয়ার কিছু আছে বলে আমি মনে করছি না।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, যার মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার হল সিঙ্গাপুর সরকারের অধীন টেমাসেক হোল্ডিংস, তারা যথেষ্ট লাভজনক একটি সংস্থা। এমিরেটস, কাতার, এয়ার চায়না, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্সের মত আরও বেশকিছুসরকারি বিমান সংস্থা আছে, যাদের কোভিড-১৯ অতিমারির আগে অব্দি ধারাবাহিক বৃদ্ধি হচ্ছিল এবং লাভে চলছিল। এয়ার ইন্ডিয়া তেমনটা পারল না কেন?

ঠিক কথাই যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল এয়ারলাইন্স বলে যেগুলো গণ্য হয়, তার অনেকগুলোই পুরোপুরি সরকারি মালিকানায় চলে। আপনি যে নামগুলো করলেন তার মধ্যে আমি আরব দেশের এয়ারলাইন্সগুলোকে একটু আলাদাভাবে দেখি, কারণ ওরা যেহেতু তৈল উৎপাদক দেশ সেহেতু একটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। ওরা একেবারে বেস থেকে কম দামে তেল কিনে এয়ারলাইন্সগুলোকে একটু অন্যভাবে চালায়। ফলে ওদের সাথে অন্য এয়ারলাইন্সগুলোর তুলনা করা মুশকিল। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে তো আর সে যুক্তি খাটে না। থাই এয়ারওয়েজও আলাদা কোনো সুবিধা পায় না। নিউজিল্যান্ড ছোট দেশ ঠিকই, তবু তার সরকারি মালিকানার এয়ারলাইন্স দিব্যি চলছে। এরকম অনেক উদাহরণ তো আছেই। আর্জেন্টিনার কথাও আলাদা করে বলা দরকার। ওদের সরকারি এয়ারলাইন্সের একসময় বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু বেসরকারিকরণ সত্যি হল কিনা সেটা পরিষ্কার হল না। কারণ কোম্পানিটা কিনল কে? না ইউরোপের এক কোম্পানি। তারপর তারা চালাতে পারল না। যখন দেখা গেল এয়ারলাইন্সটা উঠে যাওয়ার জোগাড়, তখন জাতীয় সম্মানের প্রশ্ন এসে গেল। তাছাড়া কোম্পানি উঠে গেলে বহু কর্মচারী, যারা আর্জেন্টাইন নাগরিক, তাদের চাকরি চলে যাবে। সরকার মনে করল এটা হতে দেওয়া যায় না। তাই অনেক বেশি দামে তারাই আবার এয়ারলাইন্সটা কিনে নিল। আমাদের এখানেও যে সেরকম ঘটবে না সে গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

সরকারের ব্যবসা করা কাজ নয়, ওটা ব্যবসায়ীদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। এই যে কথাটা আমরা মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী থাকার সময় থেকে শুনে আসছি, সেটা কতটা ঠিক বলে মনে করেন? সরকার ব্যবসা না করলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব কি সর্বদা ভাল? ভারতীয় কর্পোরেটরা তো অনেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে অপচয় করেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের দায় এখন ব্যাঙ্কগুলোর ঘাড়ে চেপেছে।

মনমোহন সিং কথাটা প্রথম যখন বলেছিলেন, তখন বলেছিলেন সরকারের ব্যবসা না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত সামাজিক ক্ষেত্রগুলোকে শক্তিশালী করার দিকে মন দেবে। কিন্তু আমরা দেখতেই পাচ্ছি, হয়েছে কিন্তু তার উল্টো। শুধু যে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ হল তা নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্যকেও তুলে দেওয়া হল বেসরকারি হাতে। তার ফলাফল আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং সরকার ব্যবসা করবে কি করবে না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল ব্যবসা কেন করা হয় আর ব্যবসার সুফল কারা পায়? বেসরকারি হাতে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চান ভাল কথা। কিন্তু তার ফল সাধারণ মানুষের জন্য ভাল হবে কিনা সেটা হল আসল কথা। প্রচুর বেসরকারি হাসপাতাল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো বানানো হয়েছে গত তিরিশ বছরে। তার সুফল কি আমরা পেয়েছি? মনে হয় না, খুব বেশি লোক বলবে পেয়েছি। ঘটছে কী? গরীব পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুৎ বা রেলের মত পরিকাঠামোগত শিল্পকে শুধু ব্যবসা হিসাবে দেখা কিন্তু অত্যন্ত অন্যায়। ধরুন রেলওয়ের সাথে যে কীভাবে কত লোক জড়িয়ে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু যাত্রী আর রেল কোম্পানি নয়, রেলওয়ের নানারকম জিনিসের সাপ্লায়ার, ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের হকার — সকলেই রেলের সাথে যুক্ত। অতএব রেলওয়ে ব্যবসা হিসাবে কতটা লাভ করছে বা করছে না — এই হিসাব দিয়ে যদি রেলওয়ের মূল্যায়ন করা হয়, তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তার ফল হবে মারাত্মক।

একটা ছোট উদাহরণ দিই। ধরুন একজন ব্যবসায়ী দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় যাতায়াত করে একটা ছোট ব্যবসা করত। সে শস্তায় কিছু জিনিস বিক্রি করে করেকম্মে খাচ্ছিল। এখন রেলকে লাভজনক করতে গিয়ে আপনি যদি খুব বেশি ব্যয়সাধ্য করে তোলেন, তাহলে এই ধরনের ছোট ব্যবসায়ীর উৎপাদন খরচ কিন্তু বেড়ে যাবে। এরা আবার অনেকে বড় ব্যবসায়ীর সাপ্লাই লাইন হিসাবে কাজ করে। ফলে সেই ব্যবসার উৎপাদন খরচও বাড়বে। এইভাবে সবরকম ব্যবসায়ীর উপরেই চাপ বাড়বে। এক দিকে এসব করবেন আর অন্য দিকে আপনি অভিযোগ করবেন, চীনা জিনিসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না, তারা আপনার বাজার দখল করে নিচ্ছে। আপনি তেলের দাম লিটার পিছু ১০০ টাকার বেশি করবেন, বিদ্যুতের খরচ চীনের দ্বিগুণ করবেন, পরিবহণ খরচ চীনের দ্বিগুণ করবেন। তারপর বলবেন, আমার ব্যবসায়ীরা কোনো কাজের নয়। এ তো কোনো কাজের কথা নয়।

অর্থাৎ সরকার এমন অনেক ব্যবসার সাথে যুক্ত, যেগুলো এক দিকে যেমন মানুষকে, বিশেষ করে গরীব মানুষকে নানারকম পরিষেবা দেয়, তেমনি অন্য দিকে আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থাটাকে সচল রাখে। কম খরচে নানারকম উৎপাদনে এই ক্ষেত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। একথা অগ্রাহ্য করে আপনি যদি লাভ কত হল, তা বিচার করেন তা হলে সে বিচার সম্পূর্ণ ভুল।

এই যে বহু বছর ধরে করদাতাদের টাকায় গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলো সরকার এমন শর্তে বেসরকারি হাতে তুলে দিচ্ছেন, যা তাদের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক। এই সরকারিগুলো সংস্থাগুলোর অবস্থার কিছুটা উন্নতি করে নিয়ে তারপর বিক্রির চেষ্টা করলে কি ভাল হত?

দেখুন, আজ সরকার যদি কোনো সরকারি সংস্থাকে বেসরকারি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কাজটা করে ফেলার অনেকরকম উপায় আছে। আপনি করদাতাদের স্বার্থের কথা বললেন। সত্যিই তো। আপনি দুর্গাপুরে যান, রাঁচিতে যান, ভোপালে যান বা অন্য কোথাও গিয়ে দেখুন, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পগুলো করার সময়ে কৃষক এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষের থেকে জমি নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের জন্য যত জমি দরকার তার চেয়ে অনেক বেশি জমি নেওয়া হয়েছিল। গরীব মানুষ নামমাত্র দামে বা বিনামূল্যে সরকারকে জমি দিয়েছিল। আমাদের গ্রামের দিকে অনেক জায়গায় সরকারি হাসপাতাল করার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় প্রায় বিনা পয়সায় জমি দিয়ে দিয়েছে। কেন? না তাদের প্রত্যাশা ছিল যে এই জমিতে হাসপাতাল হলে সেটা দেশের কাজে লাগবে, দেশের মানুষ শস্তায় বা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবে। এটাও তো এক ধরনের বিনিয়োগ। আজ যদি সেই কারখানা, সেই হাসপাতাল বেসরকারিকরণ করে দেওয়া হয় তাহলে সেই মানুষগুলোর বিনিয়োগের মূল্য কীভাবে দেওয়া হবে? এগুলো নৈতিক প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, আমি যদি বিক্রিই করি, তাহলে একই ধারায় কেন ভাবব? মানে যেমন ধরুন, এয়ার ইন্ডিয়া একটা দেনায় ডুবে থাকা কোম্পানি। কেউ কিনতেই চাইছিল না। তা বলে টাটা যে খুব ক্ষতিস্বীকার করে কিনেছে তা কিন্তু নয়। এই কেনাবেচায় ওদের একটাই বড় দায়ভার নিতে হল, সেটা হল এয়ার ইন্ডিয়ার বিপুল কর্মীবাহিনী। এয়ার ইন্ডিয়াতে একসময় যত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে, হয়ত তত কর্মীর প্রয়োজন ছিল না। তাছাড়া এয়ার ইন্ডিয়া তার কর্মচারীদের যেসব সুযোগ সুবিধা দিয়ে এসেছে — বিনামূল্যে ভ্রমণ ইত্যাদি — সেগুলো কোথাও দেওয়া হয় না। আমার মতে সরকারের এই সুবিধাগুলো দেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত বেতন দেওয়া সত্ত্বেও এইসব সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এটা এয়ার ইন্ডিয়ার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার একমাত্র কারণ না হলেও অন্যতম কারণ। সরকার কেন এইসব ক্ষেত্রে কাটছাঁট করে কোম্পানিটার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেনি সেটাও ভাবা দরকার।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

বাঙালির চেতনার রঙে শিল্প হল গো অ্যাজ ইউ লাইক

নৃত্যশিল্পের অনুপযোগী দুজন মানুষের পাবলিক পারফরম্যান্সের সমালোচনা করলে ফ্যাট শেমিংয়ের ওজর তোলা প্রমাণ করে আমাদের শিল্প বোধ গোল্লায় গিয়েছে।

শারদ উৎসব এসে পড়লেই বাঙালির আনন্দ আর ধরে না। মন্ত্রী সান্ত্রী থেকে শুরু করে আমাদের মত চুনোপুঁটি — সকলেরই নাচতে ইচ্ছে করা স্বাভাবিক। তবে সকলে ক্যামেরার সামনে নাচেন না। সেটা চান না বলে নাকি সুযোগ পান না বলে, সে অন্য কথা। কিন্তু আমাদের মধ্যে যাঁরা বিখ্যাত বা কুখ্যাত, তাঁদের সুযোগের অভাব নেই। অতএব তাঁরা লাইক কুড়োবার এমন মওকা ছাড়বেন কেন? সমস্যা হল, ক্যামেরার সামনে কিছু করছেন মানেই সেটা পাবলিক পারফরম্যান্স। আর তাতে কেবল লাইক নয়, সমালোচনা জোটে; ব্যঙ্গবিদ্রুপও। শোভন চ্যাটার্জি আর বৈশাখী ব্যানার্জির নাচের বেলাতেও তাই হয়েছে। কিন্তু বাঙালি যেহেতু বুদ্ধিজীবীর জাত, সেহেতু নিতান্ত লঘু ঘটনাকেও গুরুত্ব আরোপ করে তর্কের বিষয়বস্তু করে তুলতে না পারলে চলে না। তাই শোভনবাবু, বৈশাখী দেবীকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা অন্যায় — এই সন্দর্ভ তৈরি হয়েছে। রীতিমত প্রবন্ধ লেখালিখি চলছে। যুক্তি মূলত দুটি। ১) দুজন মানুষ একে অপরকে ভালবাসে, একসাথে নাচতে ইচ্ছে হয়েছে বলে নেচেছে। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপার। সমালোচনা মানে অনধিকার চর্চা, ২) ওঁদের অন্য অনেক দিক থেকে সমালোচনা করা যেতে পারে। শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রুপ করা কুরুচিকর।

প্রথম যুক্তিটির মত কুযুক্তি কমই হয়। বেসুরো গলায় বাথরুমে গান গাওয়া নিশ্চয়ই আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা। কিন্তু স্টেজে উঠে গাইলে কোনো শ্রোতা যদি বলেন “গাধার মত গাইছে”, তখন তেড়ে যাওয়া চলে না। শ্রোতারও ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে। আসলে প্রথম যুক্তি আসছে দ্বিতীয় যুক্তি থেকে। সেটি নিয়ে কিঞ্চিৎ দীর্ঘতর আলোচনা প্রয়োজন।

নৃত্যশিল্পের অনুপযোগী দুজন মানুষের পাবলিক পারফরম্যান্সের সমালোচনা করলে ফ্যাট শেমিংয়ের ওজর তোলা প্রমাণ করে আমাদের শিল্প বোধ গোল্লায় গিয়েছে। ইংরেজি ভাষায় নৃত্য, গীত, সাহিত্য, চিত্রকলা — সবকিছুকেই discipline বলা হয়। কারণ এসবের চর্চা করতে নিয়মানুবর্তিতা দরকার, অনুশীলন প্রয়োজন। গায়ক/গায়িকা হতে গেলে কেবল রোজ রেওয়াজ করতে হয় না, টক খাওয়ার লোভও ছাড়তে হয়। নৃত্যশিল্পী হতে গেলেও খাওয়া-দাওয়ায় নিজেকেই বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়, জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনতে হয়। এককথায় কিছু ত্যাগস্বীকার করতে হয়। অত কথা আজকাল আমরা বুঝি না। আমরা বুঝি প্রতিভা। অর্থাৎ উদয়শঙ্কর, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার প্রমুখ বোকার হদ্দ ছিলেন। সারাজীবন ভরপেট খেয়ে ভুঁড়ি বাগিয়েও নাচ করতেই পারতেন। স্রেফ প্রতিভা দিয়েই কেল্লা ফতে হয়ে যেত।

আসলে দোষ শোভনবাবু, বৈশাখী দেবীর নয়। বাঙালি মাত্রেই কবি, গায়ক, অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী ইত্যাদি হয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। ইদানীং তা প্রমাণ করার জন্য রিয়ালিটি শো হয়েছে। ছানাপোনারা লসাগু, গসাগু শেখার আগেই গান গেয়ে স্বনামধন্য বিচারকদের থেকে প্রতিভার স্বীকৃতি পাচ্ছে। আগে বিখ্যাত গায়ক-গায়িকারা বলতেন সঙ্গীত নাকি সারাজীবন শিখতে হয়, আজকাল বছর পঁচিশ বয়সের শিল্পীরাও বিচারক। তার উপর আছে সোশাল মিডিয়া। পাঠ্য বইয়ের বাইরে কবিতা পড়িনি, কিন্তু ফেসবুকে রোজ কবিতা লিখছি, দু হাজার বন্ধুর মধ্যে পাঁচশো জন লাইক দিলেই প্রমাণ হল আমি কবি। বাড়ির শিশুটি সবে দু-একটি কবিতা আবৃত্তি করতে শিখেছে, বাবা-মা খুলে দিলেন ইউটিউব চ্যানেল। এক মাসেই মেয়ে বুঝে গেল সে একজন শিল্পী।

আরও পড়ুন সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

সোশাল মিডিয়ার বাইরেও একটি উপন্যাস লেখার পরেই তরুণ লেখক সম্পর্কে প্রবীণ বলছেন “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরেই…”। জনপ্রিয় কবি রাতারাতি সিনেমা পরিচালক হয়ে যাচ্ছেন, পারকাশনিস্ট সিনেমার নায়ক হচ্ছেন, নায়ক গায়ক হচ্ছেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথার মাথামুন্ডু খেয়াল না করে কোরাসে গাওয়া হচ্ছে। সাহেবরা বলে discipline, আমাদের জোরালো দাবি জানানো উচিত, শিল্প মানে আসলে go as you like। যে লিখেছে সে আর তার ভক্তরা যাকে কবিতা বলবে, তা-ই কবিতা। অনর্থক কিনা, ছন্দের হদ্দমুদ্দ হয়েছে কিনা তা বিবেচ্যই নয়।

এমতাবস্থায় কপোত-কপোতী মনের আনন্দে নাচবেন, শিল্প সৃষ্টি করবেন, তার আবার সমালোচনা হবে কেন? তাল মিলুক আর না মিলুক, দেখতে যেমনই লাগুক, যারা বলবে ওটা নাচ নয় তারা তালিবান।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

চিরতরে কমিউনিস্টদের পর হয়ে যাবেন না কানহাইয়া

রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন।

পরলোক থাকলে সেখানে হয়ত শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে মুচকি হাসছেন। কারণ দীর্ঘকাল তিনি যে পার্টির প্রবাদপ্রতিম নেতা ছিলেন এবং যে পার্টি থেকে তাঁর বহিষ্কারের অন্যতম কারণ কংগ্রেসকে ভারতীয় গণতন্ত্রের কালো দিনগুলোতে সমর্থন করা, সেই পার্টির উদীয়মান নেতা দল বদলে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।

এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, কানহাইয়া জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রথম প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি পরবর্তীকালে কংগ্রেসে যোগদান করলেন। কিন্তু কানহাইয়া আগের সকলের থেকে আলাদা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোবার আগেই সারা দেশ তাঁকে চিনে গেছে। ইচ্ছামত এডিট করা ভিডিও ক্লিপকে হাতিয়ার করে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। হাজতবাস করে এসেই তিনি যে বক্তৃতা দেন, তা তাঁকে রাতারাতি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। অতঃপর সুবক্তা কানহাইয়া ভাইরাল হয়ে যান। ভাইরাল ভিডিওর প্রভাব এখন ভাইরাল অসুখের চেয়ে কম নয়। ফলত কানহাইয়াকে নিয়ে কেবল বামপন্থী নয়, সমস্ত বিজেপিবিরোধী মানুষেরই প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হয়েছিল। তিনি সিপিআই ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় স্বভাবতই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তাছাড়াও বিষয়টিকে ভারতীয় বামপন্থার সাথে কংগ্রেসের সম্পর্কের নিরিখে দেখা প্রয়োজন।

স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসকে কীভাবে দেখবেন তা নিয়ে বরাবর ধন্দে ভুগেছেন। তার অন্যতম কারণ জওহরলাল নেহরু। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কেবল সামাজিক চিন্তাধারার দিক দিয়ে প্রগতিশীল ছিলেন না, তাঁর অর্থনীতিও আধা-সমাজতান্ত্রিক। তার উপর তাঁর সোভিয়েত প্রীতি সর্বজনবিদিত। সোভিয়েত সরকার স্বাধীন ভারতের প্রথম দিককার উন্নয়নেও যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। ফলত ডাঙ্গের মত নেতারা কংগ্রেসকে শত্রু বলে ভাবতে চাননি। ১৯৫৯ সালে কেরালার নাম্বুদিরিপাদ সরকারকে নেহরু অন্যায়ভাবে ভেঙে দেওয়ার পরও নয়। অনতিকাল পরেই ভারত-চীন যুদ্ধ, কংগ্রেসের পক্ষাবলম্বন নিয়ে মতভেদ অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এমন পর্যায়ে পৌঁছল, যে প্রথমবার পার্টি ভাঙল। সেই ভাঙনের মাশুল ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন আজও দিয়ে চলেছে। তারপর থেকে অন্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে কংগ্রেসের সম্পর্ক বেশিরভাগ সময়ে আদায় কাঁচকলায় হলেও, সিপিআইয়ের সাথে অম্লমধুর। সত্তরের দশকে কেরালায় একসঙ্গে সরকার চালিয়েছে কংগ্রেস, সিপিআই। জরুরি অবস্থার সময়ে বোধহয় অনেক কংগ্রেসির চেয়েও ইন্দিরার প্রতি সিপিআইয়ের সমর্থন বেশি সোচ্চার ছিল।

সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকারের আগ্রাসন সিপিএম ও নকশালদের সাথে কংগ্রেসের শত্রুতাকে চিরস্থায়ী করেছে বলে মনে হত অনেকদিন পর্যন্ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে সিপিএমের সাথেও কংগ্রেসের সম্পর্ক বদলেছে। দিল্লিতে কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর সরকার চলছে সিপিএমের সমর্থনে — এ একসময় অকল্পনীয় ছিল। এমনকি ২০০৪-০৯ সেই সরকার চলার পরেও ভাবা যায়নি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় সিপিএম, কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়তে পারে। তা-ও সম্ভব হয়েছে। সিদ্ধার্থশঙ্করের দমননীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন নকশালরা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংসদীয় নকশালপন্থী দলটি কিন্তু সিদ্ধার্থশঙ্করের স্নেহভাজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসাবে দেখে। মমতার দল কংগ্রেস থেকে বেরিয়েই তৈরি এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সর্বার্থে কংগ্রেসের জায়গাই অধিকার করেছে। অতএব ব্যক্তির নৈতিকতার প্রশ্নে কানহাইয়ার দলবদল নিন্দার্হ হতে পারে, রাজনৈতিক নীতির দিক থেকে তিনি কতটা বিচ্যুত, তা তর্কসাপেক্ষ।

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে একশো বছরেও সারা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না, তার কারণ হিসাবে অনেকেই আম্বেদকরপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা না করাকে দায়ী করেন। ডাঙ্গে যখন মহারাষ্ট্রের গিরনি কামগর ট্রেড ইউনিয়নের নেতা, তখন সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আম্বেদকরের প্রস্তাব অনুযায়ী দলিত শ্রমিকদের বস্ত্রশিল্পের বয়ন বিভাগে কাজ করতে দেওয়ার দাবিকে ডাঙ্গে আন্দোলনের দাবিতে যুক্ত করতে রাজি হননি, ফলে ঐক্য হয়নি। মজার কথা, রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন। কংগ্রেসে বাম ঘেঁষা আর্থসামাজিক চিন্তার রাহুলই শেষ কথা হয়ে উঠবেন, নাকি কপিল সিবালের মত বৃদ্ধ সিংহেরা নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে সমর্থ হবেন — কানহাইয়ার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে অনেকটা তার উপরেও নির্ভর করবে। তবে অদূর ভবিষ্যতেই এমন দিন আসতে পারে, যখন আজ বিশ্বাসঘাতক মনে হওয়া কানহাইয়ার হয়ে তাঁর প্রাক্তন কমরেডদের প্রচারে বেরোতে হবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

মার্কস গুলে খাওয়া সত্ত্বেও পুঁজিবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা তেজস্বী সূর্যদের চেয়ে কানহাইয়া কুমারদের মধ্যে কম নয়।

পশ্চিমবঙ্গে তখন বামফ্রন্ট সরকার। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস, মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সিপিএম নেতৃত্বে কেন তরুণ প্রজন্মকে দেখা যাচ্ছে না তা নিয়ে প্রবল আলোচনা চতুর্দিকে। কোনো এক সাংবাদিক সম্মেলনে তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে সিপিএমের প্রতিনিধি যা বলেছিলেন তা অনেকটা এইরকম — গরীব খেটে খাওয়া মানুষের জন্যে যেসব তরুণ কাজ করতে চান, তাঁরা আমাদের পার্টিতে স্বাগত। কমিউনিস্ট পার্টিতে নেতৃত্বে আসা এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কাজের মধ্যে দিয়েই সংগঠন তার নেতা খুঁজে নেয়। কিন্তু নেতা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি করা যায় না। নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে আমাদের পার্টিতে আসবেন না।

সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকে এই সাংবাদিক সম্মেলনের প্রতিবেদনে উদ্বেগ সহকারে লেখা হয়েছিল, সিপিএম নেতৃত্ব বুঝতে পারছেন না যুবসমাজের উপর এই বিবৃতির কীরকম বিরূপ প্রভাব পড়বে। সিপিএম কি বলতে চাইছে কারোর যদি জীবনের লক্ষ্য হয় পরবর্তী অনিল বিশ্বাস বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হওয়া, তার জন্যে পার্টিতে কোনো জায়গা নেই? বামপন্থীরা আবার প্রমাণ করল তারা যুবসমাজের অ্যাম্বিশনকে কোনো দাম দেয় না।

অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও অনুরূপ সমালোচনা হয়েছিল। এই বিশুদ্ধতা কার্যক্ষেত্রে সিপিএম কতটা বজায় রেখেছিল, সকলের জন্য একইভাবে রেখেছিল কিনা, কতজন নানাবিধ কায়েমী স্বার্থ নিয়েই সেই আমলে সিপিএম বা অন্য বাম দলগুলোতে ঢুকে পড়েছিল বিভিন্ন স্তরে — তা ভিন্ন আলোচনার বিষয় এবং সে আলোচনায় সিপিএমের অন্ধকার দিকগুলোই নিশ্চিতভাবে বেশি আলোকিত হবে। কিন্তু এই সহস্রাব্দের গোড়ায় একটা ক্ষমতাসীন দল বলছে নেতা হতে চাইলে আমাদের দলে আসবেন না, মানুষের জন্য কাজ করতে চাইলে আসুন। আর সে জন্যে সংবাদমাধ্যম তাদের নিন্দা করছে — এ কথা মনে পড়লে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন দেশ আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। সেদিন সোশাল মিডিয়া ছিল না। থাকলে সেখানেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত সংবাদমাধ্যমের সাথে মিলে যেত, তা বলাই বাহুল্য। আসলে রাজনীতি যে আর পাঁচটা পেশার মতই একটা পেশা, তেমনটা হওয়াই যে কাম্য — একথা অর্থনৈতিক উদারীকরণের ভারতে সযত্নে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আজ অমিত শাহকে ব্রিফকেস নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখে যাঁরা নীতি-নৈতিকতার কথা তোলেন, তাঁরাই অনেকে ওই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার পুরোভাগে ছিলেন।

অ্যাম্বিশন, কেরিয়ার — এই শব্দগুলো যদি রাজনীতির জগতে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তার অনিবার্য ফল প্রশান্ত কিশোর, অমিত শাহ। এবং কানহাইয়া কুমার। কাঁটাবিহীন গোলাপ হয় না। টাকার বিনিময়ে যে কোনো পার্টিকে ভোটে জেতানোর চেষ্টা করা যার পেশা, সেই প্রশান্ত কিশোরকে জিনিয়াস বলব; আর অমিত শাহ টাকা দিয়ে বিধায়ক কিনে নিলে গেল গেল রব তুলব — এটা যে দ্বিচারিতা, তা স্বীকার করার সময় এসে গেছে। না করলে অমিত শাহদের শক্তি বাড়তেই থাকবে। তেমনি কানহাইয়া কুমার সিপিআই ছেড়ে কংগ্রেসে গেলে খুশি হব, বলব সে এমন একটা পার্টিতে গেল যেখানে ওর প্রতিভা কাজে লাগবে; আর জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বা ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং বিজেপিতে গেলেই (ক্যাপ্টেন এখনো যাননি, এই লেখার সময় অমিত শাহের সাথে দেখা করবেন বলে খবর) জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল বলে চেঁচাব, তা হয় না। রাজনীতির নীতিহীনতা নিয়ে যত বড় বড় কথাই বলা বা লেখা হোক, আসলে ও নিয়ে আমাদের কারোর মাথাব্যথা নেই। মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে শুধুমাত্র নীতিহীনতার ফলটা আমাদের পছন্দের দলের পক্ষে না গেলে।

এই সত্য মেনে নিয়ে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে আলোচিত বামপন্থী কানহাইয়া কুমারের কংগ্রেসে যোগদান নিয়ে আলোচনা করা যাক।

কানহাইয়া কেন সবচেয়ে আলোচিত? তিনি কি বিপুল ব্যবধানে কোনো নির্বাচনে জিতেছেন? না। তিনি কোনো বিরাট গণআন্দোলন সংগঠিত করেছেন? না। আসলে কানহাইয়া পাদপ্রদীপের আলো সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন বলে সবচেয়ে আলোচিত। অকারণে পাননি। কমিউনিস্টদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাকে প্রায় কৌলীন্যের লক্ষণ বলে ধরা হত, ছাত্রাবস্থাতেই সেই কারাবাস তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। একেবারে প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতাদের মতই অকারণে, সম্পূর্ণ সাজানো কেসে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যেহেতু ঘটনাটা ঘটেছিল ভারতের রাজধানীতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়টার নাম জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, স্বভাবতই দেশের সব টিভি ক্যামেরার চোখ পড়েছিল তাঁর উপর। নিঃসংশয়ে বলা যায়, কানহাইয়া নামক সেলিব্রিটির জন্ম হল হাজতবাস কাটিয়ে ফিরে আসার রাত্রে, যখন তিনি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। প্রায় সব চব্বিশ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার হল। সেদিন থেকেই রাজ্যসভা বা লোকসভার যে কোনো বামপন্থী সাংসদের চেয়েও সাধারণ ভারতীয়ের কাছে বেশি পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন কানহাইয়া। নিঃসন্দেহে তিনি সুবক্তা, তাই মুহুর্মুহু বিভিন্ন চ্যানেলের বিতর্কসভায় ডাক আসতে থাকল, কিছুদিনের মধ্যেই বইয়ের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হল। এদিকে নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে থাকা বাম দলগুলোর কর্মী, সমর্থকরা খড়কুটোর মত কানহাইয়াকে আঁকড়ে ধরলেন। কমিউনিস্ট হলেই বা, তাঁদের জন্ম ভারতে। আর ভারত হল অবতারবাদের দেশ, অবচেতনে সে মতবাদ সকলের মধ্যেই ঢুকে বসে আছে। কানহাইয়া কোথাও পাঁচ মিনিট কথা বললেও সে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। কানহাইয়া আরও বেশি করে আলোচিত হয়েছেন।

এসবের মধ্যে দিয়ে কানহাইয়ার একটি গুণই জনসমক্ষে এসেছে — তিনি সুবক্তা। মুশকিল হল রাজনীতি মানে শুধু বক্তৃতা দেওয়া নয়। কিন্তু সেকথা আমরা ভুলে গেছি বা বলা যায় ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিকে যেমন পেশা বা কেরিয়ার করে তোলা হয়েছে আমাদের চোখে, তেমনি একে পারফর্মিং আর্টও করে তোলা হয়েছে। যে সেরা বক্তৃতা দেয়, সে-ই সেরা নেতা। কার বক্তৃতা কত হাজার শেয়ার হয়, কতগুলো লাইক পড়ে — সেগুলোই তার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার প্রমাণ। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতালের বেড, অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করা নেতাসুলভ নয়। মৃত মানুষের জন্য ক্যামেরার সামনে কাঁদা নেতাসুলভ। নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কার নেতার কর্তব্য নয়, এক গোড়ালি জলে দাঁড়িয়ে তদারক করা নেতাসুলভ। মিডিয়া আমাদের এমনটাই শিখিয়েছে। কে নেতা আর কে নেতা নয়, তা আর কাজ দিয়ে বিচার হয় না। মিডিয়া যাকে বেশি দেখায় তাকেই সবাই চেনে, সে-ই নেতা। কানহাইয়াকে সেই কারণেই অনেকের মনে হয়েছিল বামপন্থীদের আশা ভরসা। ইতিমধ্যে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তিনি নিজের জায়গা বেগুসরাইতে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। কুণাল কামরা, স্বরা ভাস্করের মত বিখ্যাতরা তাঁর হয়ে মাঠে নেমে প্রচার করেছিলেন; বহু বিখ্যাত, অখ্যাত মানুষ অনলাইন প্রচার করেছিলেন, ক্রাউড ফান্ডিং করে তাঁর জন্য টাকা তুলেছিলেন। কিন্তু বেগুসরাইয়ে সিপিআই দীর্ঘকাল ধরে যা ভোট পেয়ে আসছে, তার চেয়ে খুব বেশি ভোট কিন্তু কানহাইয়া পাননি। তাতেও বামপন্থী কর্মী সমর্থকদের মনে তাঁকে নিয়ে আশা বজায় থেকেছে। কানহাইয়া যেন ম্যায় আজাদ হুঁ ছবির অমিতাভ বচ্চন। মিডিয়াই তাঁকে নেতা বানিয়ে ফেলল, তাঁকে কেবল কয়েকটা ভাল বক্তৃতা দিতে হল। মনে রাখা ভাল, কানহাইয়ার প্রতি যা যা অবিচার হয়েছিল, তার সবগুলোই উমর খালিদের প্রতিও হয়েছিল। কিন্তু মিডিয়া তাঁকে তত দেখায়নি, তাঁর দেওয়া স্লোগান নিয়ে র‍্যাপ তৈরি হয়নি। হয়ত তাই তিনি আমাদের চোখে নেতা হয়ে ওঠেননি, এক বছরের বেশি সময় ধরে ইউএপিএ মামলায় জেলে পচছেন, অভিযোগের শুনানি পর্যন্ত হয়নি।

মুশকিল হল, কেবল কমিউনিস্ট পার্টি নয়, ভারতের কোনো পার্টির ইতিহাসেই স্রেফ পাদপ্রদীপের আলো পেয়ে কেউ নেতা হয়ে উঠতে পারেনি। ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের সদস্য হয়েও রাহুল গান্ধী আজ পর্যন্ত পারেননি। কানহাইয়ার অমন বংশপরিচয় নেই, ফলে তাঁর পক্ষে পেরে ওঠা আরও শক্ত। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চর্চা করার চেয়ে বেশি জরুরি, কানহাইয়ার দল বদল এ দেশের কমিউনিস্টদের সম্বন্ধে কী প্রমাণ করে তা নিয়ে আলোচনা করা। কমিউনিস্টরা দল পাল্টান না, আর কমিউনিস্ট পার্টিতে যে কেউ ঢুকতে পারে না — এই দুটো কথাই যে আর সূর্য পূর্ব দিকে ওঠার মত সত্য নেই তা পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছুদিন আগেই বোঝা গেছে। সম্প্রতি কেরালাতেও এক প্রবীণ কংগ্রেস নেতাকে সাদরে সিপিএমে জায়গা দেওয়া হয়েছে। কানহাইয়ার ঘটনা বরং দেখাল, বামপন্থী ছাত্রনেতাদের রঙিন চশমা পরে দেখা বন্ধ করা উচিত। সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলে এ অভিযোগ পুরনো। তা নিয়ে গোড়াতেই আলোচনা করা হয়েছে। সিপিআই নেতাদের মধ্যেও খুব যে তরুণ মুখ চোখে পড়ে এমন নয়। গত কয়েক বছরে এই সমালোচনা কাটিয়ে উঠতে দু দলের নেতাদের মধ্যেই সচেতন প্রয়াস দেখা গেছে। কানহাইয়া তার সুফল পেয়েছেন; যেমন পেয়েছেন সিপিএমের মীনাক্ষী, সৃজন, ঐশী, দীপ্সিতা, প্রতীকুর, পৃথারা। কিন্তু এঁদের সবাইকে তুলে আনা হয়েছে ছাত্র, যুব ফ্রন্ট থেকে। এঁদের নিয়ে সাধারণ সমর্থকরাও যারপরনাই আহ্লাদিত হয়েছেন, অথচ ভোট মিটে যাওয়ার পর এঁরা কে কোথায় তা বোঝা শক্ত হয়ে উঠেছে। তরুণ কৃষক নেতা বা শ্রমিক নেতা কি নেই, নাকি তারা ঝকঝকে চেহারার নয়, সুবক্তা নয় বলে ফুটেজ পাবে না — তাই তাদের সামনে আনা হয় না? কানহাইয়া কিন্তু দেখিয়ে দিলেন, আজকের ছাত্রনেতা মানেই সীতারাম ইয়েচুরি নয়, যে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রথম হয়েও আজীবন মন্ত্রী সান্ত্রী হওয়ার আশা না করে কমিউনিস্ট পার্টি করে যাবে। ছাত্রনেতা মানেই দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নয়, যে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হয়ে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের মত প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেও বিদেশে মোটা মাইনের চাকরি নিয়ে চলে না গিয়ে বিহারের চাষাভুষোদের মধ্যে রাজনীতি করবে। মার্কস গুলে খাওয়া সত্ত্বেও পুঁজিবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা তেজস্বী সূর্যদের চেয়ে কানহাইয়া কুমারদের মধ্যে কম নয়। মার্কসবাদ যে তা বলেও না, একথা কমিউনিস্ট দলগুলোকে আবার স্মরণ করতে হবে।

শোনা যাচ্ছে কানহাইয়া কুমার এবং গুজরাতের নেতা জিগ্নেশ মেওয়ানির কংগ্রেসে যোগদান খোদ রাহুল গান্ধীর ইচ্ছায়। যিনি ন্যূনতম আয় প্রকল্পের কথা বলেন, ২০২১ সালে নাম করে ভারতের ক্রোনি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, বিজেপিকে অতিক্রম করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ভারতীয়ত্বের ধারণার বিরুদ্ধে বারবার বলেন, তাঁকে বৃহত্তর অর্থে বামপন্থী বলতে আপত্তি করার কারণ নেই। কিন্তু সে বামপন্থা কি ভারতের দুর্বল হয়ে পড়া কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকল্প? দল হিসাবে কংগ্রেসের ইতিহাস দেখলে তা বলা শক্ত। অতএব সেই যুক্তিতে কানহাইয়ার কংগ্রেসে যোগদানে যে বামপন্থীরা খুশি, তাঁরা কদিন পরেই “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই” বলতে শুরু করবেন সম্ভবত।

একই কবিতা রাহুলকেও আওড়াতে হতে পারে। জিগ্নেশের গণআন্দোলন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা হয়ত নড়বড়ে গুজরাত বিজেপির বিপক্ষে কংগ্রেসের কাজে লাগবে, কিন্তু স্রেফ বাগ্মিতার জোরে কানহাইয়া বিহারে কংগ্রেসকে শক্ত জমিতে দাঁড় করাতে পারবেন — এমনটা এখুনি ভাবা যাচ্ছে না। লিবারেশন, সিপিএম এবং সিপিআইয়ে কানহাইয়ার প্রাক্তন কমরেডরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে অনেকটাই এগিয়ে। পার্টি সংগঠন তুলে নিয়ে যাওয়া এয়ার কন্ডিশনার খুলে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে

রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যাঁরা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে আর এস এসের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকেন, তাঁদের অন্যতম হলেন রাহুল গান্ধী।

বিরোধী জোটে কংগ্রেসকে নিয়ে আপত্তি না থাকলেও রাহুলকে নিয়ে তৃণমূলের ‘অ্যালার্জি’ আগেও রাজনৈতিক মহলের নজরে এসেছে। এ বার সুদীপের ওই মন্তব্যে দলের তরফে কার্যত সিলমোহর দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রাহুল গাঁধীকে মানুষ মোদীর বিকল্প হিসেবে দেখছে না। বারবার নির্বাচনী ব্যর্থতায় সুযোগ এবং সময় নষ্ট করা যাবে না। রাহুল সুযোগ পেয়েছেন। পারেননি।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোটের বিকল্প হিসেবে জবরদস্ত বিশ্বাসযোগ্য মুখ সামনে রেখে প্রচারে যেতে হবে। আর তা হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’
— আনন্দবাজার পত্রিকা, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১

সকালের কাগজে যাঁরা এই খবর পড়েছেন, তাঁরা অনেকেই যে প্রবীণ তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে একমত হবেন তা বলাই বাহুল্য। রাজীব-সোনিয়ার পুত্র রাহুল গান্ধী সত্যিই এমন একটা নির্বাচনও কংগ্রেসকে জেতাতে পারেননি, যা থেকে তাঁর সারা দেশের নেতা হওয়ার মত বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হতে পারে। উপরন্তু বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্কটের জন্য অনেকেই তাঁকে দায়ী করেছেন। রাজস্থানে অশোক গেহলত বনাম শচীন পাইলট লড়াইয়ে তিনি নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারেননি — এমন অভিযোগ আছে। মধ্যপ্রদেশে এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাধবরাও সিন্ধিয়ার পুত্র জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার দলত্যাগের পিছনেও রাহুল-প্রিয়াঙ্কার সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগ ওঠে। বিহারের নির্বাচনে কংগ্রেস একগাদা আসন নিয়েও জোটকে ডুবিয়েছে, তা না হলে নীতীশ কুমারের প্রস্থান অনিবার্য ছিল। উত্তরপ্রদেশে এখনো কংগ্রেসের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে না। গান্ধী পরিবারের লোক হওয়া ছাড়া রাহুলের নেতাসুলভ কোনো গুণ খুঁজে পাওয়া এখনো মুশকিল। অন্য দিকে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একা হাতে পশ্চিমবঙ্গকে কমিউনিস্টশূন্য করেছেন, প্রবল প্রতাপান্বিত মোদী-অমিত শাহ জুটিকে রুখে দিয়েছেন। বিজেপি-বিরোধী জোটের নেতৃত্বে তিনিই যে সবচেয়ে “জবরদস্ত বিশ্বাসযোগ্য মুখ”, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী-ই বা হতে পারে? কেবল একটাই খটকা। ২০২৪ সালের জানুয়ারির আগে যে নির্বাচন শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প মুখ ঘোষণা করার ব্যগ্রতা কেন?

এই খটকা না কাটতেই, বিকেল না গড়াতেই, এসে পড়েছে আরেকটি খবর। বাবুল সুপ্রিয় যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী (তাঁরই দলীয় মুখপত্র যা লিখেছে বলে খবরে প্রকাশ, তাতে এই তকমা দিলে নিশ্চয়ই দোষ হবে না) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য ভ্রাতুষ্পুত্র, মমতা প্রধানমন্ত্রী হলে যিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হতেই পারেন, সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং বাবুলকে পার্টিতে স্বাগত জানিয়েছেন।

এই দুটো খবর কয়েকদিন বা কয়েক মাসের ব্যবধানে এলে হয়ত এতটা খটকা লাগত না; দলবদল বাংলার রাজনীতিতে অভিনবত্ব হারিয়েছে বেশ কিছুদিন হল। কিন্তু কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে এসে পৌঁছনোয় কিঞ্চিৎ মুশকিল হয়েছে। কয়েকটি প্রশ্ন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে।

প্রথমত, গান্ধী পরিবারকে বাদ দিয়ে যে আজও কংগ্রেস হয় না, তা ভারতীয় রাজনীতির সাথে যে কোনো ভূমিকায় যুক্ত সকলেই জানেন। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তো জানেন বটেই। এ কথা ঠিক যে গত দশকেই টানা দশ বছর কংগ্রেসের নেতৃত্বে কেন্দ্রে এমন একটি সরকার চলেছে যার নেতৃত্বে ছিলেন ওই পরিবারের বাইরের একজন। কিন্তু সে নিতান্ত ঠেকায় পড়ে। উপরন্তু সেই সরকারের কার্যকলাপে রাশ টানতে একটি পরামর্শদাতা সমিতি ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বহু বিধানসভা এবং দুটি লোকসভা নির্বাচন হয়ে গেছে। কংগ্রেসের উপর্যুপরি ব্যর্থতা সত্ত্বেও দলের সর্বোচ্চ পদে সোনিয়া আর রাহুলের বদলে কেউ আসীন হননি। রাহুল নিজে থেকে পদ ছেড়ে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু গান্ধী পরিবারের বাইরের কেউ সে পদে আসীন হতে চাননি। শশী থারুর, কপিল সিবাল, আনন্দ শর্মারা মধ্যে মধ্যে ঝড় তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাউল বাতাস সাতমহলা গান্ধীপুরীর হাজার বাতি নিভিয়ে দেওয়ার আগেই দিল্লির ট্র্যাফিকে হারিয়ে যায়। অতএব ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের পরেও কংগ্রেস সাংসদদের গতিবিধি যে রাহুল গান্ধীই ঠিক করবেন, তা সুদীপ ও মমতা, দুজনেই বিলক্ষণ জানেন। তাহলে এত আগে থেকে প্রকাশ্যে রাহুলকে অনুপযুক্ত নেতা হিসাবে দেগে দিলেন কেন? রাহুলকে চটিয়ে কী লাভ?

দ্বিতীয়ত, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ যখন সাম্প্রদায়িকতা নিয়েই শানানো হয়, তখন মন্ত্রী পদের অপব্যবহার করে আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ আছে, মুসলমান বিদ্বেষ নিয়ে রাখঢাক করেন না — এমন একজনকে কেন নীল-সাদা কার্পেট পেতে দিল মুখ্যমন্ত্রীর দল?

প্রশ্নগুলো কারো কারো অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। সাহেবরা বলে থাকে, সাফল্যের মত সফল আর কিছু নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন চূড়ান্ত সফল। এ রাজ্যের রাজনীতিতে তিনি এখন উসেন বোল্ট, অর্থাৎ দৌড়তে দৌড়তে এক-আধবার পিছনে তাকালেও হাত দুয়েক ব্যবধানে জিতবেন। অতএব তাঁর পদক্ষেপগুলো নিয়ে ভাবার, সমালোচনা করার কোনো মানেই হয় না — এমনটা অনুরাগীরা বলতেই পারেন। কিন্তু ইতিহাসে যেমন বোল্ট আছেন, তেমন মিলখা সিংও আছেন। শোনা যায় রোম অলিম্পিকে তাঁর অবধারিত সোনা হাতছাড়া হয়েছিল অনেক এগিয়ে আছেন ভেবে গতি কমাতে গিয়ে। তাছাড়া স্লোগান হিসাবে যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, মমতাও জানেন, রাজনীতি খেলা নয়। অতএব ভেবে পা ফেলা এবং যে পা-টা ফেললাম, সেটারও পর্যালোচনা করা উচিত। সুতরাং প্রশ্নগুলো উড়িয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না।

বাংলা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট রাজ্যগুলো, তামিলনাড়ু, জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ বাদ দিলে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির মুখ্য প্রতিপক্ষ হিসাবে থাকবে কংগ্রেস অথবা কংগ্রেসের উপস্থিতি আছে এমন জোট। কংগ্রেস একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়, এমন লোকসভা আসনের সংখ্যা কিছুতেই শ দেড়েকের বেশি নয়। এর সাথে আছে কেরালার মত রাজ্য, যেখানে কংগ্রেস ভাল ফল করতে পারে, কিন্তু বিজেপিই অপ্রাসঙ্গিক। ফলে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বা কংগ্রেসের উপস্থিতি আছে এমন জোটকে ভাল ফল করতেই হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের অতি বড় সমর্থকও নিশ্চয়ই এতটা স্বপ্নের জগতে বাস করেন না, যে মনে করবেন ২০২৪ সালের মধ্যে তৃণমূল প্রথমে ত্রিপুরা, তারপর গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। তারপর বাড়তে বাড়তে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত হাত চিহ্নের সমান বা তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে জোড়াফুল? যদি উদার চিত্তে ধরে নেওয়া যায় লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ৪২-এ ৪২ পাবেন মমতা, ত্রিপুরার দুটো আসনেই জিতবেন, আসামের বাঙালিরাও তাঁকেই জয়যুক্ত করবেন, তাহলেও পঞ্চাশ পেরনো যাবে বড়জোর। বিজেপির ভারত জুড়ে বিপুল বিপর্যয় হলেও সরকার গড়তে কংগ্রেসের সমর্থন প্রয়োজন হবেই। নেতা হওয়ার অযোগ্য রাহুল গান্ধী তখন আজকের কথা মনে রেখে দিলে কী হবে? নাকি তাঁর কাছে সমর্থন চাওয়াই হবে না? ফ্যাসিবাদী সরকারের অপসারণ, নাকি মমতার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার? মূল লক্ষ্য কোনটি? হয় আমাদের সরকার হোক, নইলে যে যা পারে করুক, কিছু এসে যায় না — প্রকৃত এজেন্ডা এমন নয় তো?

বাবুলের তৃণমূলে যোগদানে এমন সন্দেহ প্রবল হয়। তার কারণ বাবুল আর যা-ই হোন, মুকুল নন। মুকুল রায়ের রাজনৈতিক দীক্ষা সঙ্ঘ পরিবারে নয়। তিনি বড়জোর রাজনৈতিক সুবিধাবাদী। বৃহত্তর ক্ষমতার স্বাদ পেতে কিম্বা ফৌজদারি অভিযোগের হাত থেকে বাঁচতে বিজেপিতে গিয়েছিলেন, সুযোগ বুঝে ফিরে এসেছেন। বাবুল কিন্তু কখনো তৃণমূলে ছিলেন না। অর্থাৎ এ প্রত্যাবর্তন নয়, পরিবর্তন। মুকুলের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ নেই। ভারতের রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রভাব ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বরের পর থেকে যত বেড়েছে, তত ভারতের উদারপন্থীদের কাছে কোনো দল বা নেতার গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে উঠেছে অসাম্প্রদায়িকতা। দ্বিতীয় ইউপিএ-র আমলে একের পর এক দুর্নীতি যখন প্রকাশ্যে আসছে, নির্ভয়া কান্ডে মানুষ ক্রমশ ধৈর্যহীন হয়ে পড়ছেন, তখন কংগ্রেসের পক্ষে শেষ যুক্তি হিসাবে খাড়া করা হত অসাম্প্রদায়িকতাকে। এই যুক্তি ২০১৪ সালের পর থেকে ক্রমশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে প্রায় সব রাজ্যে, কারণ বিজেপি-বিরোধী দলগুলির পাহাড়প্রমাণ ত্রুটি ঢাকা দেওয়ার উপায় নেই। অগত্যা বিজেপি-বিরোধী মানুষ ভেবে নিয়েছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত হোক, সাম্প্রদায়িক না হলেই হল। পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলও অনেকাংশে এই ভাবনার প্রতিফলন। বাবুল কিন্তু এই সামান্য পরীক্ষাতেও ফেল। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অগ্রণী সৈনিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যদি বাবুলও গ্রহণযোগ্য হন, তাহলে মনে করা অনুচিত হবে না, যে নেত্রীর লড়াই আসলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নয়, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও নয়, স্রেফ বিজেপি নামক রাজনৈতিক দলটির বিরুদ্ধে। যদি লোকসভা ত্রিশঙ্কু হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অবস্থায় না থাকেন, তখন আর কে সরকার গড়ল, না গড়ল — তা নিয়ে তাঁর আগ্রহ থাকবে না। তখন তাঁর কাছে রাহুল গান্ধীও যা, নরেন্দ্র মোদীও তাই।

ভারতে যাঁরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সত্যিই লড়ছেন, আর যাঁরা লড়ছেন বলে ভাবছেন, সকলেই নির্দ্বিধায় বলে থাকেন — আসল শত্রু হল আর এস এস। আসলে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যাঁরা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে আর এস এসের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকেন, তাঁদের অন্যতম হলেন রাহুল গান্ধী। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছিল। বৈষ্ণোদেবীর মন্দিরে গিয়ে তিনি যে নরম হিন্দুত্ব চালান, তা কংগ্রেসী ঘরানার পুরনো রাজনীতি। কিন্তু জওহরলাল নেহরুর পরে সম্ভবত আর কোনো কংগ্রেস নেতা এত সরাসরি আর এস এস-কে আক্রমণ করতেন না। এ হেন রাহুলকে সাত তাড়াতাড়ি নেতৃত্ব দিতে পারেন না বলে দেগে দেওয়া এবং স্পষ্টত সংখ্যালঘুবিদ্বেষী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিরোধী বাবুল সুপ্রিয়কে পার্টিতে জায়গা দেওয়া — এগুলো কি ধর্মনিরপেক্ষ জোটের নেত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করল? তাঁকে ভাবতে হবে। কারণ তিনি যাদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হবেন ভাবছেন, তারা ভাবতে পারে।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

কাকিমার এখন লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে মাসে এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ছেলের উপর যে আশা ছিল, সে আশা পূরণ হল না।

কালের গতি রোধ করা যমেরও অসাধ্য। তাই আজ পশ্চিমবঙ্গেও শিক্ষক দিবস। নইলে যেখানে শিক্ষিকারা বিষ খেতে বাধ্য হন, সেখানে শিক্ষক দিবস বলে কিছু থাকতে পারে না। অণিমা নাথ, ছবি দাস, শিখা দাস, পুতুল মন্ডল, জোশুয়া টুডু, মন্দিরা সর্দারদের বিষ খাওয়া আসলে একটা ষড়যন্ত্র, অশান্তি সৃষ্টি করাই আসল উদ্দেশ্য ছিল — এমন অভিযোগ অবশ্য উঠেছে। [১] ওঠাই স্বাভাবিক। কৃষকরা আত্মহত্যা করলে যেমন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তাদের অনুরাগীরা বলে থাকে “ক্ষতিপূরণের লোভে করেছে।” কবি এমনি এমনি লেখেননি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি। এ দেশে না জন্মালে আত্মহত্যা যে মরণোত্তর কিছু পাওয়ার লোভে করা সম্ভব এ তথ্য আপনি জানতে পারতেন? তেমনি প্রাথমিক স্কুলের কয়েকজন নগণ্য শিক্ষিকা যে একটা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকে অস্থির করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মানববোমার মত কাজ করতে পারেন — এ-ও অন্য কোথাও থাকলে জানা কঠিন হত। তাও আবার বিস্ফোরকবিহীন মানববোমা। মানে চারপাশে আর কেউ মরবে না, কারোর কোনো ক্ষতি হবে না। কেবল শিক্ষিকা নিজে মরবেন, আর তাতেই সরকার কেঁপে উঠবে। শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রতি আমাদের এত শ্রদ্ধা অবশিষ্ট আছে?

নেই। থাকলে ২০১৫ সালের মাদ্রাসা শিক্ষকদের অনশন আন্দোলনের কথা, ২০১৯ সালের প্যারাটিচারদের অনশনের কথা এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে চাকরির প্রত্যাশায় থাকা হবু শিক্ষকদের অনশনের কথা মনে থাকত। কয়েকশো শিক্ষক বা হবু শিক্ষক ওই আন্দোলনগুলোতে অনশন করেছেন, খবরের কাগজের তিনের পাতায়, বা পাঁচের পাতায়, কি সাতের পাতায় খবর বেরিয়েছে। আমরা পাতা উল্টাতে গিয়ে হয়ত খেয়ালও করিনি। ছন্দা সাহার মৃত্যু (২০১৫) [২], রেবতী রাউতের মৃত্যু এবং তাপস বরের ব্রেন স্ট্রোক নিয়ে বিতর্ক (২০১৯) [৩] তৈরি হলে কখনো সখনো একটু হৈ চৈ হয়েছে। তারপর যে কে সেই। গত দশ বছরে এ রাজ্যে যে কোন আন্দোলনের প্রতি সরকারি উদাসীনতা এবং সামাজিক উদাসীনতার কারণে (শুধু সরকার কেন? আন্দোলনের ‘আ’ শুনলেই কারণ জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে আমরাও কি অভিসম্পাত দিই না?) সব ধরনের আন্দোলনকারী ভেবে নিতে বাধ্য হয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি না নিলে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে না। তাই কেবল শিক্ষক, হবু শিক্ষকরা নয়, ডাক্তাররাও এই পর্বে অনশনের রাস্তা বেছে নিয়েছেন। বিষ খাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এক দিনে পৌঁছানো হয়নি।

এ রাজ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকারা কেমন আছেন খোঁজ নিতে গেলে প্রথমেই বিরাট অর্থনৈতিক বিভেদ চোখে পড়ে। স্কুলশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত স্থায়ী চাকরি করা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল, অভিযোগের অবকাশ বলতে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্য সরকারের নিয়ে টালবাহানা। কিন্তু সেই অভিযোগ সমস্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীরই রয়েছে, কেবল তাঁদের নয়। চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করা প্যারাটিচারদের অবস্থা এর বিপরীত। তাঁরা মাস গেলে তেরো হাজার টাকার আশেপাশে মাইনে পান। প্রভিডেন্ট ফান্ড, প্রফেশনাল ট্যাক্স ইত্যাদি কেটে এগারো হাজার টাকার মত হাতে আসে, যোগ্যতা যা-ই হোক, অভিজ্ঞতা যত বছরেরই হোক। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব ছিল ক্লাসের পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের যত্ন নেওয়া, স্কুলছুট ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্কুলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। অথচ স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ যেহেতু বন্ধ, তাই স্কুলগুলোতে শূন্য পদের অভাব নেই, ফলত কাজের চাপ যথেষ্ট। অতএব স্কুল কর্তৃপক্ষ অনন্যোপায়। প্যারাটিচাররা পুরো সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সমান ক্লাস নিচ্ছেন, সমানে সমানে পরীক্ষার খাতাও দেখছেন। এমনকি, গোড়ায় কথা ছিল সপ্তাহে তিনদিন তাঁরা কাজ করবেন। তা অবস্থা বিশেষে ছদিনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কাজ বেশি, মাইনে কম — প্যারাটিচারদের জন্য এটাই নিয়ম।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একইরকম বিভাজন তৈরি হয়েছে। পুরো সময়ের অধ্যাপনা শুরু করেই যেখানে হাজার পঞ্চাশেক টাকা মাইনে পাওয়া যাচ্ছে, বছরের পর বছর আংশিক সময়ের অধ্যাপক (যাঁদের এখন বলা হয় State Aided College Teacher — SACT) হয়ে থাকা নেট/স্লেট পাশ করা পিএইচডি অধ্যাপক, অধ্যাপিকারাও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় আটকে আছেন। কলেজের মর্জি মাফিক কোথাও কোথাও আরও কম। কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগও অনিয়মিত। ফলে কলেজ চালানোর ক্ষেত্রে কিন্তু বড় ভূমিকা পালন করেন SACT-রা। অথচ ওঁদের পদগুলো, পরিভাষায়, নোশনাল। মানে কোনো SACT কোনো কারণে বিদায় নিলে তাঁর জায়গায় নতুন লোক পাওয়া যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প নেই বহু বছর, কর্মসংস্থানের অভাব বর্তমান সরকারের আমলেই তৈরি হয়েছে এমন বললে নিতান্ত অন্যায় হবে। কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ নিয়ে বামফ্রন্ট আমলেও বিস্তর ডামাডোল ছিল। কিন্তু দীর্ঘ অভাবের তালিকার পাশে যা ছিল, তা হল লেখাপড়া শিখতে পারলে এবং এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করলে শিক্ষকতার চাকরির নিশ্চয়তা। বাম আমলেই একসময় স্কুলের চাকরির নিয়োগে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ উঠত। টাকা নিয়েই হোক অথবা নেতার সাথে পরিচিতি বা আত্মীয়তার সুবাদে যোগ্য প্রার্থীর বদলে অযোগ্য শিক্ষক, শিক্ষিকা নিয়োগ করা হচ্ছে — এমনটা কান পাতলেই শোনা যেত। স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার পর ছবিটা বদলে গিয়েছিল। কতটা বদলেছিল? আমার পাড়ায় চপ ভাজেন এক কাকিমা; কাকুর ছোট দোকান ছিল। তাঁদের বড় ছেলে এম এ পড়ছিল। বছর কয়েক আগে একবার চপ কিনতে গিয়েছি, কাকিমা বড় মুখ করে বললেন “এরপর এসএসসিটা পাস করলে মাস্টারি পাবে। আমাদের সংসারটা দাঁড়িয়ে যাবে।” সেই এসএসসি আর তার দেওয়া হয়নি, কারণ পরীক্ষাটাই হয়নি। কাকিমার এখন লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে মাসে এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ছেলের উপর যে আশা ছিল, সে আশা পূরণ হল না। ছেলে এখন কাকিমাকে ব্যবসায় সাহায্য করে। এইভাবেই কি ভবিষ্যতের শিক্ষক, শিক্ষিকা পাব আমরা?

এমন মনে করার কারণ নেই, যে পুরো সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা খুব ভাল আছেন। মাস গেলে মাইনেটা পেলেই মাস্টাররা খুশি, আর কিছু নিয়ে তারা ভাবে না। এমনিতেই একগাদা ছুটি পায়, অতিমারির ফলে তো আরও মজা হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সম্বন্ধে এমন ভাবনা সাম্প্রতিককালে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ফাঁকিবাজ পৃথিবীর সব পেশায়, সব কালে, সব দেশে থাকে। কিন্তু নিজের ধারণা নিয়ে বসে না থেকে শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় তাঁরা সুখে নেই।

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এক শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়া খুবই দুঃখের। কিন্তু লেখাপড়াটা ঠিক করে হয়েছিল কি? অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষক অপ্রতুল, এদিকে পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজারটা কাজ চেপেছে তাঁদের ঘাড়ে। সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পের কাজকর্ম অনেকটাই তাঁদের করতে হয়। করতে গিয়ে পড়ানোর সময় কাটছাঁট হয়। আরও বললেন, পশ্চিমবঙ্গে গত দশ বছরে যে হারে জনসংখ্যা বেড়েছে, সে হারে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বাড়েনি। কাগজে, টিভিতে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়া নিয়ে উল্লাস হয়, কিন্তু ছাত্রের সংখ্যা যে কমে যাচ্ছে সে কথা কেউ বলে না। এই ছাত্ররা যাচ্ছে কোথায়? তাঁর মতে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে চলে যাচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা অতিমারীর প্রকোপে আরও বেড়ে গেল। একেই দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া এবং বছর দুয়েক স্কুল বন্ধ থাকার কারণে অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে আসছে। ওই শিক্ষকের আশঙ্কা, এরপর যখন স্কুল খুলবে তখন দেখা যাবে স্কুলছুট ছাত্রের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে।

উনি যা বলেননি, তা হল সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গত দশ-পনেরো বছর ধরেই কমছে। গ্রামাঞ্চলের কথা জানি না, শহর ও শহরতলি এলাকায় তার একটা বড় কারণ বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বাবা-মায়েদের পক্ষপাত। এর প্রভাবে কোথাও কোথাও ছাত্রসংখ্যা এমনভাবে কমছে, যে স্বয়ং বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলও উঠে যেতে বসেছিল বছর দুয়েক আগে। ইংরেজি মাধ্যম করে দিয়ে বাঁচানো হয়েছে। [৪] বাংলা মাধ্যম অনেক স্কুলকেই ইংরেজি মাধ্যম করে বাঁচানোর চেষ্টা রাজ্য সরকার করছেন। বাঁচছে কিনা বুঝতে আরও কয়েক বছর লাগবে, কিন্তু ওই রুগ্ন স্কুলগুলোর মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের নিশ্চিন্ত থাকার দিন গিয়েছে। কারণ ১৯৯১-এর পর থেকে শিক্ষার বেসরকারিকরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে শিক্ষা (স্বাস্থ্যের মতই) আরও একটা ব্যবসা। আর রুগ্ন ব্যবসা যে রাখতে নেই তা কেন্দ্র বা রাজ্য, কোনো সরকারই অস্বীকার করে না। ফলে আজকের পাকা চাকরি মানেই আর কালকের পাকা চাকরি নয়।

মুশকিল হল, পঞ্চাশ হাজার, ষাট হাজার, এমনকি এক-দেড় লাখ টাকা খরচ করে যেসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের ভর্তি করছেন, সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেকেই ভদ্রজনোচিত মাইনে পান না। স্কুল মালিক কোটিপতি হচ্ছেন, অথচ মাস্টাররা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা বেসরকারি কলেজগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের আংশিক সময়ের শিক্ষকদের কথা উপরে বলেছি। একই যোগ্যতার অনেকে মাসে পনেরো-কুড়ি হাজার টাকা বেতনে বেসরকারি কলেজগুলোতে পড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার ক্লাস পিছু টাকা পান। কত পাবেন, কেমনভাবে পাবেন তা অনেক ক্ষেত্রেই কলেজ কর্তৃপক্ষের মেজাজ মর্জির উপর নির্ভর করে। বেসরকারি স্কুল এবং হাসপাতালের খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে হইচই হয়। মুখ্যমন্ত্রী বরাভয় নিয়ে আবির্ভূত হন, কাউকে ধমকে, কাউকে বাবা বাছা করে বুঝিয়ে অভিভাবকদের উপর চাপ কমাতে বলেন। কিন্তু মাস্টারদের মাইনে কোনো আলোচনার বিষয় হয় না। অবশ্য সরকারের বেতনভুক যে মাস্টাররা, তাঁদের আর্থিক দাবিদাওয়াই যখন কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বেসরকারি স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা কার কাছে কী আশা করবেন?

২০১৮ সালে জগদ্বিখ্যাত টাইম পত্রিকা আমেরিকার পাবলিক স্কুলগুলোর মাস্টারদের পারিশ্রমিক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওঁদের অবস্থা এত সঙ্গীন, যে একজন বলেছেন তিনি দিন গুজরান করার জন্য একসাথে তিনটে কাজ করেন, উপরন্তু ব্লাড প্লাজমা দান করেন।[৫] পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্তটা দেখিয়ে নিজেদের তার চেয়ে উন্নত প্রমাণ করায় আমরা ভারতীয়রা ওস্তাদ। অতএব সে প্রতিবেদন তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভাগ্যনিয়ন্তারা বলতেই পারেন, “আমরা অনেক ভাল রেখেছি।” সত্যিই তো। মাস্টারদের নিয়ে সরকারের তো বিশেষ মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কী পড়ানো হবে, কেন পড়ানো হবে — সেসব কর্পোরেট জগত ইতিমধ্যেই ঠিক করতে শুরু করেছে, আগামী দিনে আরও করবে। যে শিক্ষা কর্পোরেটের কাজে লাগে না, তা যে শিক্ষাই নয় — সে ব্যাপারে ঐকমত্য শিগগির তৈরি হয়ে যাবে। কদিন পর আপনি নিজেই বলবেন, আপনার সন্তানের ছবি আঁকা, খেলাধুলো করা, গান গাওয়া, সাহিত্য পড়া বা ভাল করে অঙ্ক শেখাও তত জরুরি নয়, যত জরুরি কোডিং শেখা। আর সেটা করতে কড়া বা স্নেহময় মাস্টারমশাই, দিদিমণি লাগে না। লাগে একটা অ্যাপ। যাদের অ্যাপ নেই তারা শিখবে না। মিটে গেল।

শিক্ষক দিবসে দাঁড়িয়ে ভয় হচ্ছে, শেরনি ছবিতে যেমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে মানুষের কুকর্মের ফলে একসময় বাঘ দেখতে মিউজিয়ামে যেতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও না সেই অবস্থা হয়।

তথ্যসূত্র:

১) হিন্দুস্তান টাইমস
২) ওল্ড ইন্ডিয়া টুমোরো
৩) সংবাদ প্রতিদিন
৪) আনন্দবাজার পত্রিকা
৫) টাইম ডট কম

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি।

খুব আতঙ্কে কাটছে আমাদের। পাশেই আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ভীষণদর্শন বন্দুকধারীদের ছবি, মানুষের প্রাণপণ পালানোর ছবি আমরা টিভি, খবরের কাগজ অথবা সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে দেখছি। আফগান মানেই বর্বর, অথবা মুসলমানরা ওরকমই হয় — এরকম ভাবনার লোকেরা একরকম শান্তি পাচ্ছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ মনে পড়লে অশান্তি দ্বিগুণ। আফগানিস্তানের মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের কথা ভেবে ঘুম উড়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেবল ‘কাবুলিওয়ালা’ লেখেননি। লিখেছিলেন “বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।/ দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।” এই লাইনগুলো স্মরণ থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য আফগানিস্তান দেখার প্রয়োজন নেই। তালিবান যা যা করে থাকে তার প্রায় কোনোটাই এ দেশে ঘটতে বাকি নেই।

তারা যখন নব্বইয়ের দশকে প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই এ কথা বলে অনেকে প্রবল নিন্দার মুখে পড়েছেন। বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ভেঙে ফেলা গর্হিত কাজ, কিন্তু বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার — এমন ব্যাখ্যাই চিৎকৃত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ তালিবান কাজটা করেছিল ক্ষমতায় এসে, বাবরি ভেঙেছিল ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনতা’। এখন সেই স্বতঃস্ফূর্ত জনতাই দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা। নেশন কী চায় তারাই জানে। সেই চাহিদা অনুযায়ী এডিট করা ভিডিও ক্লিপ জুগিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন দলের আই টি সেল, পুলিস তার ভিত্তিতেই সত্য মিথ্যা যাচাই না করে মানুষকে হাজতে পুরে দেয়, সে পচতে থাকে ইউএপিএ আইনে। শরিয়তি আইনের অবিচার এর চেয়ে আর কত বেশি?

তবু এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর গল্প বাতিল করেন, দলিত লেখক বামা এবং সুখরথারিনিও বাতিল হন। এঁরা গান নিষিদ্ধ করে লোকসঙ্গীত গায়ককে হত্যা করেন না, অপছন্দের লেখা সরিয়ে দেন। সে কালের জার্মানির মত বই পোড়ানোও শুরু হয়ে গেছে। আমেদাবাদের বইয়ের দোকানে ঢুকে বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ পুড়িয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে, আবার এসব বই পাওয়া গেলে দোকানই জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। আফগানিস্তানে তালিবরা যেটাকে ইসলাম বলে সেটাই ইসলাম। ভারতেও এখন সঙ্ঘ যাকে হিন্দুধর্ম বলে সেটাই হিন্দুধর্ম। তাই বাৎস্যায়নও হিন্দু সংস্কৃতি বিরুদ্ধ।

আরও পড়ুন সাহিত্য ও সাংবাদিকতা অপ্রিয় সত্য ছাড়া বৃথা

তালিবান নেতারা সগর্বে বলে, মেয়েদের কাজকর্ম, লেখাপড়া করতে হলে ইসলামের নির্দেশ মেনে বোরখা পরে বাইরে বেরোতে হবে। ইসলামে ঠিক কী বলা আছে তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু তালিবানি শাসনে তাদের মুখের কথাই আইন। এ দেশে এখনো ১৯৫০ সালের সংবিধান চালু আছে বটে, কিন্তু মহিলাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন, জামাকাপড়ের মাপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার, এমনকি চাউমিন খাওয়ার অভ্যাসেও যে সংস্কৃতির বারোটা বাজছে — তা বহুবার পরিষ্কার করে দিয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। স্বয়ং মোহন ভাগবত প্রকাশ্যেই বলে থাকেন, মেয়েদের কাজ ঘর সামলানো। উত্তরপ্রদেশের দাসনার মন্দিরের মহন্ত যতি নরসিংহানন্দের ছাপার অযোগ্য ভাইরাল বিষোদ্গারে মহিলাদের সম্পর্কে ভাবনায় তালিবান-সঙ্ঘ ঐকমত্য পরিষ্কার। এখন বিজেপি এই ঘোর মুসলমান বিদ্বেষী লোকটিকে জিহাদি আখ্যা দিচ্ছে, কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে কপিল মিশ্রর মত গুরুত্বপূর্ণ নেতার ঘনিষ্ঠ।

আর হত্যা? গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশদের কথা আমাদের মনে নেই। আরও অদরকারি আখলাক আহমেদ, পেহলু খানের মত অসংখ্য গণপিটুনির শিকারদের স্মৃতি। কারণ তাঁরা গরুর অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত। গত পরশু এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক বিচারপতি তো বলেই দিয়েছেন, গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইন দরকার। গরুর কল্যাণ হলেই দেশের কল্যাণ হবে।

আশা করা যায় তালিবান সরকার শুয়োরের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আগেই ভারত সরকার বিচারপতির স্বপ্ন সত্যি করবেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

শিখেছিলাম যে কমিউনিস্ট শহিদের বেদিতে মালা দিতে গেলেও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। পার্টি সদস্যের সে যোগ্যতা আছে, আমার নেই।

আমার খ্যাতি নেই, ইউটিউব চ্যানেল নেই, পোষ্য জীবজন্তুও নেই। পাড়ার কুকুরকে মাঝে মধ্যে উচ্ছিষ্ট খেতে দেওয়া ছাড়া পশুপ্রেমিক হিসাবে আমার কোনো কীর্তি নেই। আমি রেড ভলান্টিয়ার নই, সিপিএম দলের সদস্য নই, কোনোদিন ছিলাম না, ভবিষ্যতেও হব বলে মনে হয় না। অতএব যা লিখছি তা না লিখলেও কিছু এসে যেত না। তবু লিখছি একেবারে ব্যক্তিগত মন্দ লাগার কারণে। সব পক্ষকে সমান চোখে দেখার দায় এ লেখায় আমি নিচ্ছি না, নিতে চাইছি না। সেই কারণেই নাগরিক ডট নেটে এ লেখা লিখব না ভেবেছিলাম। ফেসবুক দেয়ালে লেখাই সমীচীন হবে মনে করছিলাম। কিন্তু সম্পাদকমণ্ডলীর অন্য সদস্যরা বললেন, আমরা ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আগেও জায়গা দিয়েছি এই মঞ্চে, এবারেও দেব।

২০০০ সালে ভোটাধিকার পেয়েছি, তারপর থেকে সিপিএমকেই ভোট দিয়ে আসছি। সেই দল জেলেপাড়ার সঙেদের দলে পরিণত হলে খারাপ লাগে। সেই খারাপ লাগার কারণেই কিছু অপ্রিয় কথা এখানে বলব।

পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক পরিসরে বরাবর দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবার বলে একটা কথা খুব চালু। অরাজনৈতিক পরিবার বলে কিছু হয় কিনা জানি না, তবে দেখেছি সাধারণভাবে ওই শব্দবন্ধ দিয়ে বোঝানো হয় এমন পরিবারকে, যাদের একাধিক সদস্য এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলের সদস্য। ধরেই নেওয়া হয়, ওই পরিবারের লোকেরা অন্যদের চেয়ে রাজনীতিটা বেশি বোঝে। অন্যদের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাপারে মতামত দেওয়ার অধিকার একটু বেশি, সে নিজে রাজনীতির ধারে কাছে না গেলেও। এই ধারণার পিছনে আদৌ কোনো যুক্তি নেই, আছে পরিবারতন্ত্রের প্রতি সুপ্ত ভালবাসা। ভারতে এই ভালবাসা সকলেরই অল্পবিস্তর আছে, বদনাম শুধু গান্ধীরা কুড়োয়। সেই কারণে স্বাধীনতার পর থেকে কমিউনিস্ট দলগুলো ছাড়া প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বই কোনো না কোনো পরিবার কুক্ষিগত করেছে। কমিউনিস্টদের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটেনি মানে বুঝতে হবে, ব্যক্তিগতভাবে যে যা-ই মনে করুক, অমুকের ছেলে বা তমুকের মেয়ে পরিচয়কে নেতা হওয়ার যোগ্যতা বলে স্বীকৃতি দেয়নি এই দলগুলো। এখনো দেয় না, কিন্তু আমার মতে সিপিএমের সাম্প্রতিক খিল্লিযোগ্য কার্যকলাপগুলোর কারণ হল পার্টির শুভানুধ্যায়ীদের পারিবারিক অতীতকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া।

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরের দশ বছরে সিপিএমের সমস্ত স্তরে এটা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সিপিএমের সেলিব্রিটি সমর্থকরা বলে থাকেন “আমার বাবা-মাকে ছোট থেকে দেখেছি লাল পতাকা নিয়ে…” ইত্যাদি। কেউ বলেন লাল পতাকার সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান, তাই তিনি সিপিএম সমর্থক। এসব খুবই পবিত্র আবেগ সন্দেহ নেই। কিন্তু মুশকিল হল, সাধারণত এই উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পার্টি দরদিরা মনে করেন, তাঁর বাবা জেল খেটেছিলেন বলে তিনি নিজেই একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার ক্ষমতা ধরেন। রাজনীতি ব্যাপারটা যে অত সহজ নয়, উপরন্তু কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি, সেটা এঁদের অনেকেরই বোধগম্য হয় না। অথচ গত দশ বছরে সিপিএম দল এঁদের বিপুল গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। বিখ্যাত মানুষদের বাম প্রীতি অন্যায় তো নয়ই, অভিনবও নয়। পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টির জন্মলগ্ন থেকে শিল্পী, সাহিত্যিকদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অনেকে একেবারে সদস্য হয়েছেন, অনেকে বাইরে থেকে সমর্থন করেছেন। অনিল চ্যাটার্জির মত জনপ্রিয় অভিনেতা তো সিপিএমের হয়ে নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখছি শ্রীলেখা, বাদশা, রাহুল, কমলেশ্বররা সিপিএমের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অনিল চ্যাটার্জির সময়েও কিন্তু জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরাই মুখ ছিলেন। এখন পার্টি কলেবরে কমেছে, আর নেতারা পার্টি দরদি আর পার্টি সদস্যের তফাত করতে ভুলে গেছেন। নিজেদের মুখগুলো মানুষের পছন্দ নয় বুঝেই কিনা কে জানে, বিখ্যাত দরদি পেলেই প্রবল আগ্রহে জড়িয়ে ধরছেন, তাঁর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। ফলে কেরিয়ারের মধ্যগগনেও সঠিক অর্থে তারকা হতে ব্যর্থ অভিনেত্রী সিপিএমের স্টার ক্যাম্পেনার হয়ে রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন। টিভি চ্যানেলের বিতর্কে সিপিএমের হয়ে বলতে যাচ্ছেন বাদশা মৈত্র বা কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। ব্রিগেডের মঞ্চেও তাঁরা যারপরনাই গুরুত্ব পাচ্ছেন। এত গুরুত্ব পেলে আমার আপনারও মনে হতে বাধ্য, আমি একজন দারুণ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং দলটা আমার পৈতৃক সম্পত্তি। দলের কর্মীদের চেয়ে আমি কোনো অংশে কম নই, তাদের সাথে আমি যেমন ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারি।

শুধু সেলিব্রিটি নয়। মূলত পারিবারিক ইতিহাসের কারণে সিপিএম সমর্থক বা একদা পার্টির কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাই ভালবেসে এখনো মোটা টাকা চাঁদা দেন — এরকম অনেক দরদিকেই সিপিএম নেতৃত্ব প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেন। সিপিএমের যেসব সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে পার্টির নথিতে পর্যন্ত স্বীকার করা হয়েছে, সেগুলোও ঠিক ছিল বলে এঁরা ফেসবুকে ঝগড়া করে বেড়ান, শোনা যায় সোশাল মিডিয়া স্ট্র‍্যাটেজি ইত্যাদিও এঁরা ঠিক করেন। টুম্পা প্যারডি নিয়ে যখন পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা হচ্ছে, এক সিপিএম বন্ধুকে আমার মন্দ লাগা জানাতে ফোন করেছিলাম। তার কাছে শুনলাম “ওটা তো পার্টি বানায়নি, বানিয়েছে পার্টিকে ভালবাসে এরকম কিছু ছেলেপুলে।” তারপর দেখলাম মহম্মদ সেলিম, শতরূপ ঘোষের মত নেতারা ওই প্যারডির সপক্ষে অনেককিছু বলেছেন। প্যারডিটা ভাল ছিল কি মন্দ ছিল সে প্রশ্ন আর নতুন করে তুলছি না। বলছি এটা যা প্রমাণ করে, তা হল হয় পার্টি নিজের কাজ দরদিদের আউটসোর্স করে দিয়েছে, অথবা দরদিরা ভালমন্দ যা-ই করুক, পার্টি তার পক্ষ নিচ্ছে। এত বিরাট হৃদয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের হওয়া উচিত কিনা সেটা বোধহয় ভেবে দেখা প্রয়োজন।

দরদিরা নিশ্চয়ই রেগে যাচ্ছেন। একটু বিস্তারিত বলি। দরদ খারাপ নয়, যদি তা দাবিহীন হয়। কমিউনিস্ট পার্টির নানারকমের দরদি থাকে। আমি যাদের কথা বলছি, তাদের কতকগুলো সামান্য লক্ষণ আছে। ১) পরিবারের কেউ অবিভক্ত সিপিআই বা সিপিএম করতেন, ২) অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল, পার্টিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন নিয়মিত বা মাঝে মাঝে, ৩) সিপিএমের সমালোচনাও করেন, কিন্তু যেগুলো পার্টির দোষ বলে উল্লেখ করেন, সেগুলো শোধরালে সিপিএম উন্নততর কংগ্রেস বা তৃণমূল হবে। উন্নততর কমিউনিস্ট পার্টি নয়। ৪) সোশাল মিডিয়ায় সিপিএমের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই তাকে বিজেপি বা তৃণমূল বলে দেগে দিতে দেরি করেন না। হয়ত যার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তার পার্টির জন্যে আত্মত্যাগ বেশি। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় পার্টির বিরুদ্ধ মত প্রচার আটকানোর পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার পর অত আগুপিছু দেখার সময় থাকে না।

এই ধরনের দরদিরা মনে করেন যেহেতু এঁরা সিপিএমকে ভালবাসেন এবং সাধ্যমত সাহায্য করেন, অতএব এঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরামর্শ অনুযায়ী চলা সিপিএমের কর্তব্য। অর্থাৎ সিপিএম একটি কোম্পানি আর এঁরা তার শেয়ার হোল্ডার। এই দরদিদের ভুল অচিরেই ভেঙে যেত, যদি পার্টির আচরণ তেমন হত। কিন্তু পার্টিও বোধহয় নিজেকে কোম্পানি হিসাবেই দ্যাখে। তাই দরদিদের সঙ্গে কর্মীদের বিবাদে চুপ করে থাকে, নয়ত বিপ্লবী নেতা তন্ময় ভট্টাচার্যের মত দরদিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “তুমিও একটা ভুল করেছ… আমাকে জানাতে পারতে….” ইত্যাদি।

তবে এই দোষে কেবল রাজ্য স্তরের নেতারা দুষ্ট এমন বললে মিথ্যে বলা হয়। সিপিএম পার্টিটা ভাল, জ্যোতিবাবু লোকটা ভাল নয়। বুদ্ধবাবু মানুষটা ভাল, কিন্তু পার্টি ওঁকে কাজ করতে দিল না। এই বাক্য দুটো শুধু বাজারি প্রোপাগান্ডা নয়, ব্যাখ্যা হিসাবে অমার্কসিয়ও বটে। সিপিএমের উপর, নীচ সর্বত্রই কর্মীর গুরুত্ব কমিয়ে দরদির গুরুত্ব বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। উদাহরণ দিই।

সাতই নভেম্বর সকালে বাজারে যাচ্ছি। পার্টির এক শহিদের বেদির সামনে নভেম্বর বিপ্লব দিবস উদযাপন হচ্ছে, জনা পাঁচেক পার্টি সদস্য রয়েছেন। আমাকে দেখে এক তরুণ পার্টিকর্মী যোগ দিতে বললেন। দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামান্য বক্তৃতা হল, তারপর শহিদবেদিতে মাল্যদান। পার্টি সদস্যরা দিচ্ছেন, হতবুদ্ধি করে দিয়ে আমার হাতেও তুলে দেওয়া হল মালা। পথচারীদের মধ্যে থেকে আমাকেই যে ডাকা হয়েছিল তার একমাত্র কারণ এই এলাকায় সিপিএম দলকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছিলেন যাঁরা, তার মধ্যে আমার প্রয়াত পিতা একজন। আমি তাঁর কাছে শিখেছিলাম যে কমিউনিস্ট শহিদের বেদিতে মালা দিতে গেলেও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। পার্টি সদস্যের সে যোগ্যতা আছে, আমার নেই। বুঝলাম এই তরুণ কর্মীটিকে তা শেখানো হয়নি। আশপাশে যে প্রবীণরা ছিলেন তাঁদের কাকু, জেঠু বলি। তাঁরাও চাইছেন আমি দিই।

মনে শহিদের প্রতি অশ্রদ্ধা নেই বলে দিয়েই ফেললাম। কিন্তু তাতে রাজনীতির ফাঁকিবাজিটা আড়াল হয় না। আসলে সারা বছর ধরে পাড়ার রিকশা চালকদের বোঝানো হয়নি নভেম্বর বিপ্লব কী এবং কেন? দরকারের সময় একজন পরিচিত দরদিকে ডেকে নেওয়া হল। অর্থাৎ পার্টিকে ব্রাহ্মসমাজে পরিণত করা হয়েছে। আদর্শ প্রগতিশীল, উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু তা নিয়ে সভা-সমিতি, উপাসনা করব আমরা ভদ্রলোকেরা। ওরা ওসবের কী বুঝবে?

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনো গরীব মানুষ সিপিএম করেন জানি। কিন্তু সব মিলিয়ে সিপিএম হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যবিত্তের, মধ্যবিত্তের জন্য, মধ্যবিত্তের দ্বারা চালিত পার্টি। ফলে এখন পার্টিকর্মীকে কুকুরের উপর হিংস্রতার অজুহাতে কেউ দল বেঁধে পিটিয়ে গেলেও কমিউনিস্টদের বিখ্যাত (এবং কুখ্যাত) পার্টিজানশিপ বোতাম আঁটা জামার নীচে শান্তিতে শয়ান। সংগঠন বাড়ানোর কী হবে তা কেউ ভাবছে না। ভাবছে কী করে সেলিব্রিটি দরদি বাড়ানো যায়। বিজেপি ফেরত হলেও চলবে।

দরদির উপরে কর্মীকে স্থান না দিলে সিপিএমের নিস্তার নেই।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত