গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত।

বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত গোট

সম্প্রতি কিংবদন্তি সুনীল গাভস্করের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন মহাতারকা বিরাট কোহলি। সামনেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বিরাট তার আগে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে প্রচুর রান করছেন (এই লেখার সময়ে ১৩ ইনিংসে ৬৬৮; গড় ৬৬.১০)। ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের অনেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে একদা সফল প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিরাটের স্ট্রাইক রেটের সমালোচনা করছিলেন। তাই একটি ম্যাচ জিতিয়ে বিরাট তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দেন। বিরাটের দল এবারের আইপিএলের হারতে হারতে প্রায় প্লে অফের ওঠার দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটের মন্থর ব্যাটিং এবং স্পিনারদের মারার অক্ষমতার সমালোচনা করছেন। বিরাট সেই সমালোচনা থেকে কিছু শেখার বদলে সমালোচকদের দিকেই তোপ দেগেছেন। বলে দিয়েছেন, যারা তাঁর পরিস্থিতিতে পড়েনি তাদের পক্ষে বক্সে বসে সমালোচনা করা সহজ। বাইরের লোক যা খুশি ভেবে নিতে পারে। তিনি বাইরের কে কী বলল তাতে কান দেন না। একথায় গাভস্কর বেজায় চটে বলে দিয়েছেন, বাইরের লোকের কথায় যদি কান না-ই দেয় তো কথার উত্তর দিচ্ছে কেন? আমরা যা দেখব তাই তো বলব। আমাদের তো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্ডা নেই। টিভির পর্দায় দেখা গেছে, গাভস্কর যখন একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে এসব কথা বলছেন, তখন কাছেই অনুশীলনরত বিরাট কথাগুলো শুনে কটমটিয়ে তাকিয়েছেন।

এমন হতে পারে না যে বিরাট জানেন না গাভস্কর কত বড় ব্যাটার ছিলেন। আর পাঁচজনের কথার দাম না থাক, গাভস্করের কথার অবশ্যই দাম আছে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কথারও বিলক্ষণ দাম আছে। নইলে তাঁদের সমালোচনায় বিরাট ক্ষেপে যেতেন না। তাহলে তিনি ওরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যা পাব, তা হল ঔদ্ধত্য। টেস্ট ক্রিকেটে যখন হেলমেট প্রায় ছিলই না, প্রত্যেক আন্তর্জাতিক দলেই এক বা একাধিক ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করা বোলার ছিল, সেইসময় যিনি প্রথম ব্যাটার হিসাবে দশ হাজার রান করেছিলেন বেশ দুর্বল একটা দলে খেলে, তাঁকে আমল না দেওয়ার ঔদ্ধত্য কী করে তৈরি হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়া যুগের এক অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে। প্রবণতাটা হল বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করে, এক ধরনের কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে নিজের সময়ের সেরাকে সর্বকালের সেরা প্রতিপন্ন করা। হালে একটি শব্দের জন্ম হয়েছে খেলার জগতে – GOAT, অর্থাৎ ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’। গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত। শচীন তেন্ডুলকরের আমল থেকে এনডর্সমেন্টের দুনিয়ায় কে সর্বকালের সেরা তা নিয়ে মশলাদার আলোচনা শুরু হয়। শচীনের বিদায়ের পর কবে যেন মহেন্দ্র সিং ধোনি গোট হয়ে গেলেন, তাঁর বিদায়ের পর বিরাট।

গাভস্করের হয়ে কথা বলার জন্যে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনী নেই, বিরাটের জন্যে আছে। তারা বলে দিয়েছে বিরাটই গোট, কেউ অন্য কিছু বললে দল বেঁধে তেড়ে আসে তাকে গাল দিতে। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও অনেকদিন ধরে বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস বা শচীনের সমান বা তার চেয়েও মহান ক্রিকেটারের তকমা দিয়ে চলেছেন। ফলে নির্ঘাত বিরাট নিজেও মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা। তাই গাভস্কর, ম্যাথু হেডেনরা এলেবেলে।

এই গোটে যে আজকাল কত বেড়া খেয়ে ফেলছে খেলার জগতে, তার হিসাব নেই। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে হাতের ফোনটাতেই চাইলে দেখে ফেলা যায় যে কোনো খেলার কিংবদন্তিদের স্মরণীয় এবং সাধারণ খেলাগুলো। বর্তমান প্রজন্ম চাইলেই পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফেলতে পারে। শচীন বা ভিভ তো বটেই, এমনকি ব্র্যাডম্যানের খেলারও এক-আধটা ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। সেগুলো দেখলে মাঠের তারতম্য, প্রতিপক্ষের গুণমানের তারতম্য নিজের চোখে দেখা যায়। অন্ধ ভক্ত না হলে বোঝাই যায়, এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের খেলোয়াড় তুলনীয় নয়। খেলার মান নির্ভর করে যে যে জিনিসগুলোর উপরে তার প্রায় কোনোটাই এক নেই, থাকার কথাও নয়। দুনিয়ার সবকিছুই তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। সেখানে সর্বকালের সেরা দশ বা পাঁচ বা এক মুখরোচক আড্ডার বিষয়বস্তু হতে পারে বড়জোর। এছাড়া কোনোরকম র‍্যাঙ্কিংয়ের কোনো মানে হয় না।

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

মুশকিল হল, অধিকাংশ ক্রীড়ামোদী সুচিন্তিত মতামতের মানুষ হয়ে গেলে একনিষ্ঠ ভক্তকুল গড়ে উঠবে না। সেটা না হলে জনপ্রিয় খেলোয়াড়রা যে শত শত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেগুলো চোখ বন্ধ করে কেনার লোক কমে যাবে। তাহলে স্পনসর পাওয়া যাবে না, খেলাধুলো করে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। তাই খেলোয়াড় নিজে, তার সোশাল মিডিয়া টিম, সংবাদমাধ্যম, খেলার সম্প্রচারক, ধারাভাষ্যকাররা – সকলে মিলে কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং গড়ে তোলেন। তাতে সমসাময়িক কাউকে সর্বকালের সেরার মুকুট দিয়ে দেন। যদি কোনো সম ক্ষমতার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে পোয়া বারো। কে সত্যিকারের গোট তা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে ব্যাপারটাকে আরও মুখরোচক করে তোলা হয়। ফুটবলে যেমন লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আমিই সেরা – এই কথা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৬ ঘন্টা শুনতে শুনতে কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে তিনিই সর্বকালের সেরা। তখন তিনি লিওনেল মেসির মত, রামছাগলের সঙ্গে ছবি তোলাতে পারেন বা বিরাটের মত, প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ফালতু মনে করতে পারেন।

কোনো খেলোয়াড় নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করলে এমনিতে বিশেষ ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে সেই মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়লে এখন যা হয়, তা হল তাঁদের অন্ধ ভক্তরা প্রাক্তন খেলোয়াড়দের এবং যারা তেমন ভক্ত নয় তাদের গালিগালাজ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। যখন অতীতের খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন কিন্তু গাভস্করের ভক্তরা বলত না – বিজয় মার্চেন্ট বা সি কে নাইডু ক্রিকেটের কী বোঝে? এমনকি শচীনের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের প্রথমদিকের ভক্তরাও বলত না গাভস্কর কী বোঝে? বলত না, কারণ গাভস্কর কখনো তেমন ভাবার মত আচরণ করতেন না। বরং আজীবন নিজের আগের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। শচীনও গাভস্করের সঙ্গে কথা বলতেন মাথা নিচু করে, কখনো ফর্ম পড়ে গেলে গাভস্করের পরামর্শ নিতেন। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে গাভস্করের সব রেকর্ডই তো শচীন ভেঙে দিয়েছেন। এখন কিন্তু বিরাটের ভক্তরা বলেন, গাভস্কর কে? ও কী বোঝে? রোহিত শর্মার ভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই বলে যান, রোহিত একদিনের ক্রিকেটে ভারতের গোট ক্রিকেটার। বিরাট দূরের কথা, শচীনও তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। এর কারণ আজকের খেলোয়াড়দের আচরণে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। কারোর কম, কারোর বেশি। কথায় কথায় কাল্পনিক, অযৌক্তিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে সেই ঔদ্ধত্য উস্কে দেওয়া হয়। কারণ ঔদ্ধত্যের ভাল বাজার আছে। আজকাল খেলার মাঠে সভ্যতা, ভদ্রতার চেয়ে ঔদ্ধত্য, অসভ্যতার কাটতি বেশি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

One thought on “গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে”

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading