গণতন্ত্রের কঙ্কাল দেখিয়ে দিলেন জিতু মুন্ডা

যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

নির্বাচনের ভরা মরশুমে একথা বললে নিশ্চয়ই মহাপাপ হবে যে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া, ভোট নেওয়া আর সরকার গঠন নয়। কিন্তু আমরা অনেকেই অনেক পাপ জানতে বা অজান্তে রোজ করে চলেছি। সুতরাং এ পাপও করেই ফেলা যাক। পশ্চিমবঙ্গে এবারে যেভাবে ভোট হচ্ছে, তার সঙ্গে নাজি জার্মানির নির্বাচনের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, অমিল বোধহয় একটাই— এখনো কোনো বুথে ভোটারের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোককে কাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে নজর রেখেছে বলে খবর নেই। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দফার শেষেও অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তেমনটা হয়নি। এই যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

ব্যাপারটা একেবারে সাদা চোখে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার কেওনঝার জেলার বাসিন্দা জিতু মুন্ডার। ‘আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমরা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ বলে গোরিলা গোষ্ঠীর দলনেতার মত বুক বাজানো আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু জিতুকে মাত্র হাজার বিশেক টাকা ব্যাংক থেকে তোলার জন্যে যা করতে হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় যে পৃথিবীর যে কোনো গোরিলা সমাজ আজকের ভারতের চেয়ে সভ্য। গোরিলা সমাজে প্রয়াত বোনের কষ্টার্জিত ফলমূল অধিকার করতে বোনের কঙ্কাল মাটি খুঁড়ে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতাশালী গোরিলার সামনে যে রাখতে হত না— একথা ডায়ান ফসির মত কোনো বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস না করেই হলফ করে বলা যায়। জিতুর বোন গবাদি পশু বিক্রি করে ওই কটা টাকা পেয়েছিলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয়। হতদরিদ্র জিতুকে বারবার ব্যাংকে গিয়ে শুনতে হয়েছে— মৃত্যুর প্রমাণ চাই, অর্থাৎ কাগজ চাই। জিতুর পক্ষে ‘কাগজ দেখাব না’ বলার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়, এদিকে তাঁর কাগজও অমিল। জিতুর মত আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের কাছে অনেক কাগজই থাকে না। আগামীদিনে ওড়িশায় এসআইআর হলে হয়ত জিতুকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ৬৬ লাখ মানুষকে ফেলা হয়েছে (অধিকাংশের কাগজ থাকা সত্ত্বেও)। এমনই রক্তমাংসহীন হিংস্র একটা ব্যবস্থা আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে।

অনেকেই বলবেন, ব্যাংকের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? কারণ শুরুতেই বললাম, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট— একথা বিশ্বাস করা আমাদের বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের টাকা বা প্রয়াত নিকটাত্মীয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তোলা যে একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার— তা আমাদের মনেই হয় না। যে কোনোদিন যে কোনো ব্যাংকে গেলেই কোনো না কোনো মানুষকে দেখা যায় মৃত আত্মীয়ের টাকাপয়সার ব্যাপারে এসেছেন। ব্যাংক থেকে কিছু কাগজপত্রের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয় ভাবলেশহীন মুখে। তার মধ্যে অবশ্যই থাকে KYC, যা জীবিত অবস্থায় ওই গ্রাহক নির্ঘাত ৯৯ বার জমা দিয়েছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়াতেও কেন ব্যাংকের একজন গ্রাহককে বারবার KYC জমা দিতে হবে— এ প্রশ্ন করা হলে নিম্নতম ব্যাংককর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সকলেই হাত উলটে উত্তর দেন— নিয়ম। এমন নির্বোধ নিয়ম আছে কেন, বাতিল হচ্ছে না কেন— এসব প্রশ্ন আমরা করি না। নিয়ম যে দৈবনির্দেশিত নয়, মানুষের তৈরি, তাতে গোলমাল থাকতে পারে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য— সেকথা আমরা ভুলে গেছি। যেমন আমরা মাঝেমধ্যে কাগজে পড়ি বা হাতের মোবাইলে দেখতে পাই, অমুক জায়গায় তমুক লোক আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক্স মেলেনি বলে সরকারি প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন না। তারপর আমরা স্ক্রোল করে অন্যকিছুতে চলে যাই। ২০১৮ সালে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার লুখি মুর্মু অনাহারে মারা গিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি, কারণ অক্টোবর মাস থেকে বায়োমেট্রিক্স মিলছিল না বলে রেশন তুলতে পারেননি। ওই রেশন ছিল তাঁর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। এসব দেখে আমরা আধার কার্ড সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলি না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালেই রায় দিয়েছে যে সরকারি প্রকল্পে আধার কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক আলোচনার বিষয় নয়। কারণ আমাদের বায়োমেট্রিক্স মেলা না মেলা নিয়ে ভাবতে হয় কেবল মোবাইলের নতুন সিম কার্ড দরকার হলে। দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের নিজেদের দায় সিম বিক্রি করা, তাই তারা বেজায় ভদ্রতা করে। আধার না মিললে ‘ভোটার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়ে হয়ে যাবে স্যার’। জিতুর বা লুখির কাছে হয়ত জরুরি কাগজ নেই, বিকল্প কাগজও নেই। কিন্তু তাঁদের জন্যে কেউ অন্য রাস্তার খোঁজ করবে না। কারণ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই কানাকড়ি দাম নেই। না দোকানে, না ব্যাংকে, না নির্বাচন কমিশনের কাছে। কারণ আমাদের ব্যবস্থায় মানুষের দাম (পড়ুন বৈধতা, শুনতে গণতান্ত্রিক হবে) মানুষ দিয়ে নয়, কাগজ দিয়ে। কোন কাগজ? সেটা আবার ব্যাংক বা রাষ্ট্র ইচ্ছামত বদলে ফেলতে পারে রোজ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ঠিক তাই হয়েছে, এখনো হয়ে চলেছে। ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়া নামও এখন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাদ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এসআইআরে বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯৯% বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। মানে তাঁদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনো কারণই ছিল না। অর্থাৎ গণতন্ত্রের লাগাম আর জনগণের হাতে নেই। এখনো কেউ কেউ ভোট দিতে পারছেন, এই যা। মানে ওই কঙ্কালটাই এখনো অবশিষ্ট আছে। তারও উপকারিতা আছে, দেখালে একটু-আধটু অধিকার পাওয়া যায়। জিতু যেমন ব্যাংকের দরজার সামনে বোনের কঙ্কালটাকে শুইয়ে দেওয়ায় হঠাৎ ব্যাংক সদয় হয়ে গেছে, তাদের KYC-র প্রয়োজনও রাতারাতি মিটে গেছে। জিতুর হাতে বোনের গচ্ছিত টাকা তো তুলে দেওয়া হয়েছেই, সঙ্গে সাহায্য বাবদ আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। আহা! দয়ার শরীর বাবুদের!

আরও পড়ুন ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

আমরা অনেকে অবশ্য এটুকু গণতন্ত্রেই খুশি। আমাদের আধ কোটি সহনাগরিক বিনা দোষে ভোট দিতে পারলেন না, তাতে কী হয়েছে? রিগিং হলেও তো কত লোক ভোট দিতে পারে না। আমি ভোট দিতে পারছি মানেই গণতন্ত্র সজীব। আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে পর্যন্ত পা রাখতে হচ্ছে না, হাউজিংয়েই বুথ হয়েছে। এমন গণতন্ত্র কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। রাজ্যটা কাশ্মীর এবং সব নিয়মকানুনের বাইরে চলে যাওয়া মণিপুরের চেয়েও বেশি সশস্ত্র বাহিনীতে ভরে গেল দেখে আমরা আরও নিশ্চিত হচ্ছি যে দেশে গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ফরসা টুকটুকে, সুবেশী, হিন্দিভাষী পুলিশ অফিসার আঙুল উঁচিয়ে গ্রামে ঢুকে লোককে শাসাচ্ছেন দেখে আমাদের দারুণ লাগছে। কারণ আমরা হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ওরকমভাবে খলনায়ক ও তার দলবলকে শাসাতে দেখেছি। মিডিয়া আবার বলছে, লোকটা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। সোনায় সোহাগা। যে অফিসাররা এনকাউন্টার করে তাদের মত বাহাদুর যে আর হয় না, সে তো আমরা সেই অব তক ছপ্পন থেকেই জানি। মিডিয়া লোকটার নাম দিয়েছে সিঙ্ঘম। ওই ছবিটা আরও সাম্প্রতিক, ফলে আমাদের আরও ভালো মনে আছে। অতএব আমরা আহ্লাদে আটখানা। যে লোক আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে সোজা ঠুকে দেয়, তার হাতেই যে আমাদের গণতন্ত্র সবচেয়ে নিরাপদ— এতে আর সন্দেহ কী? বিশেষত যার পরিবার পরিজনকে শাসাচ্ছে, সে নিজেই যখন অনেকের মতে অপরাধী। উত্তরপ্রদেশের মত, জাহাঙ্গীরের বাড়ির উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের গণতন্ত্রের এই রক্ষীটি জবরদস্ত। ডান, বাম নির্বিশেষে আমাদের এই যে ভাবনা— এটাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কঙ্কালকে জ্যান্ত জিনিস বলে ভুল করছি। জিতু একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

কঙ্কালপুজোর শুভেচ্ছা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত