পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।

এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।

২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।

তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।

তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?

ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র‍্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।

যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের

লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আরও পড়ুন সব ধর্ষণ সমান নয়

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক

সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।

‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।

যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’

লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।

পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?

একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন

স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।

দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –

১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে।
৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে।
৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।

ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।

হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।

এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।

আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।

মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?

এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।

যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।

আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।

আরও পড়ুন এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?

বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।

অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

জাতের নামে বজ্জাতিতেও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না।

চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।

এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!

চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।

জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।

মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।

এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।

আরও পড়ুন বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।

অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?

ভারত জুড়ে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচন আছে অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় সব বিশ্লেষক বলছেন, ওই রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হবে মহিলাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গেও যে মহিলাদের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানতে কারোর বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ৩.৭৩ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষদের চেয়ে মাত্র ১২ লক্ষ কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের বারবার ভোটে জেতার অন্যতম কারণ মমতা ব্যানার্জির মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও জোরদার করতেই নাকি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এমন একটা রাজ্যে ভোটের সময়ে মহিলাদের গুরুত্ব সব দলের কাছেই আকাশছোঁয়া হবে। নির্বাচনী প্রচার ভরে থাকবে মহিলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত এমন একটা দেশ যে দেশে সাধারণ বুদ্ধি বিশেষ কাজে লাগে না। এখানে সারাক্ষণই অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকে। এখন যেমন পশ্চিমবঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে মহিলারাই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্যে ‘এই করব, সেই দেব, তাই বানিয়ে দেব’ বলছে বলে নয়। বরং দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল মহিলাদের সম্মানকে দড়ি টানাটানির বিষয়বস্তু করে তুলেছে বলে।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন গরীবের সম্মান নামের এক বাংলা ছবির পোস্টার লেগেছিল আমাদের হোস্টেলের পাড়ার বেশকিছু দেওয়ালে। তা দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে দেশে গরিবের কোনো সম্মান নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বহু আলোচিত মহিলাদের সম্মান সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি – দুপক্ষ থেকেই যত ফিল্মি সংলাপ ছোড়া হচ্ছে, তত পরিষ্কার হচ্ছে আসলে মহিলাদের সম্মান নয়, তাঁদের ভোটই অভীষ্ট লক্ষ্য। সন্দেশখালিতে আসলে কোনো ধর্ষণ হয়নি, বিজেপি মহিলাদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়েছে – এই মর্মে বিজেপিরই অঞ্চল সভাপতি গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোমবার এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘মেয়েদের কাছে টাকার চেয়ে শাড়ির আঁচল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। বেশি চক্রান্ত করো না। সব কিছু পরিকল্পনা (করে) করেছে।’ পালটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ‘মমতা দিদি আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। আপনি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, আপনার নাকের ডগায় হাজার হাজার বোনের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হয়েছে। কিন্তু আমি আজ বলতে চাই, সন্দেশখালিতে যে অত্যাচার করেছে, সে যদি পাতালেও লুকিয়ে থাকে… মমতা দিদি তাঁদের পাতালে লুকিয়ে রাখলেও সেখান থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকাব।’

শাহের বক্তব্যের পুরোটাই ফেনা, অতএব তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রথম বাক্য বাদ দিয়ে বাকিটা বিচার করা যাক। তাঁর বক্তব্য সত্যি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। নাগরিক ডট নেট যেহেতু বিজেপি নেতার ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তদন্ত করেনি, করার উপযুক্তও নয়, সেহেতু ওতে প্রযুক্তিগত কারিকুরি আছে কিনা তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু যেভাবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক খবরের চ্যানেলে গঙ্গাধর স্বীকার করেছিলেন – ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি উনিই এবং ওই কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল, তাতে পরবর্তীকালে স্পষ্টতই দলের নির্দেশে তিনি যে ভিডিও বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি এখানে কোনোমতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এটুকুই বলতে পেরেছেন যে তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলানো হয়েছিল। কীভাবে? প্রলোভন দেখিয়ে, নাকি ভয় দেখিয়ে? সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি তখন। এমনকি পরে বিবৃতি বদলে ফেলেও তা বলেননি, বলেছেন এতে যান্ত্রিক কারচুপি আছে। অর্থাৎ দুটো বিবৃতি পরস্পরবিরোধী। গঙ্গাধরের কথা অনুযায়ী যে ব্যক্তি এসবের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীও এই ভিডিও অসত্য – এ কথার অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। যাঁরা ধর্ষণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র তবু টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছেন, গঙ্গাধরকে ভয় দেখিয়ে তৃণমূল এসব করে থাকতে পারে। কিন্তু সে তো তাঁর বিশ্বাস। এখন কথা হল, মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন এই ভিডিও বিজেপির ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, তাহলে নির্বাচনী প্রচারে তাদের বদমাইশি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে না কেন? ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়ে একটা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা – এগুলো তো মারাত্মক অপরাধ। কেউ এই অপরাধ করেছেন জানলে স্রেফ বাদানুবাদে থেমে থাকবে কেন একটা রাজ্যের সরকার? কেনই বা যে মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, পুলিস তাঁরা কী বলছেন তা জানার চেষ্টা করবে না? একথা তো সত্যি, যে আইনত গঙ্গাধর সত্যি বলে থাকলেও প্রমাণ হয় না সব সাজানো। একজন অভিযোগকারী মহিলা কী বলছেন সেটাই বিচার্য।

এখানেই সন্দেহ হয়, সন্দেশখালিতে সত্যিই মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন কি হননি তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ততটা মাথাব্যথা নেই। তিনি শুধু রাজ্যের মহিলা ভোটারদের কাছে একথা প্রমাণ করতে চান যে বিজেপি এতই হীন একটা দল, যে মহিলাদের মানসম্মানের তোয়াক্কা করে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্যে তাঁদের দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করাতেও পিছপা হয় না। রাজ্যের আরেকটা ঘটনাতেও এই একই সন্দেহ হয় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেটাও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা।

রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছেন রাজভবনের এক অস্থায়ী কর্মচারী। হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেছেন। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে রাজ্যপাল এমন একটা কাজও করেননি যাতে তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার আন্তরিকতা বোঝা যায়। তিনি কেবল রাজভবনে পুলিসের আর মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রবেশ নিষেধ করেছেন। বিবৃতি দিয়ে বলেছেন এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত। এমন নয় যে অতীতে কখনো কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া আনন্দ বোসের মত হয়নি।

২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল পদ ছাড়তে হয়েছিল নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। কারণ রাজভবনে তাঁর যৌন কীর্তিকলাপের টেপ প্রকাশ্যে এসেছিল এবং বিরোধীরা সমস্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, যদি তিওয়ারি পদত্যাগ করতে রাজি না হন তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত। অভিযোগ ওঠার পরে আনন্দ বোসের মত বুক ফুলিয়ে চলা তিওয়ারির পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনস্বীকার্য যে অভিযোগ উঠেছে মানেই বোস অপরাধী তা নয়। অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সে তো তদন্তসাপেক্ষ, আর রাজ্যপাল পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় বোসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করাও সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পদত্যাগ করার নামটি নেই; উল্টে রাজভবনের কর্মীদেরও এ বিষয়ে শমন অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়া, পুলিসকে সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ার আদেশ করার মত ঔদ্ধত্য রাজ্যপালের আসে কোথা থেকে?

উত্তরটা খুব শক্ত নয়। তিওয়ারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সময়ে কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাজ্যপাল নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিওয়ারি অবশ্যই বুঝেছিলেন যে কেন্দ্রের সরকার তাঁর পদ বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। তাই মানে মানে কেটে পড়েন। বোস নির্ঘাত জানেন, এই অভিযোগের কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সরে যেতে বলবেন না। শুধু বোস কেন, আপনি-আমিও জানি যে যৌন অপরাধের অভিযোগ বিজেপির কাছে কোনো অভিযোগের মধ্যেই পড়ে না। তাদের সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষক বলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়, জেল থেকে বেরোবার পর মালা পরিয়ে বরণ করে। ওই দলের নেতা আট বছরের মেয়ে আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করায় অভিযুক্তদের সমর্থনে মিছিল করে। পদক জয়ী অলিম্পিয়ানরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং গ্রেফতার হন না। ঝামেলা খুব বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কুস্তি ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে তাঁরই ডানহাতকে ওই পদে বসানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় আর নির্বাচনের টিকিটটা তাঁকে না দিয়ে তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের মেয়েটার কী হাল করা হয়েছিল তাও আমরা জানি। সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদনে রূপায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তার পরিবারকে আজও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে আর ধর্ষকরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কর্ণাটকে তো বিজেপির নেতাই অভিযোগ করেছেন, প্রোজ্জ্বল রেবন্ন নামক নরকের কীটটি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন এবং জেডিএসের সঙ্গে জোটে থাকা উচিত হচ্ছে না বলেছিলেন। কেউ কান দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রধানমন্ত্রী এক বছরে একবারও মণিপুরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, কুকি মহিলাদের উলঙ্গ করে হাঁটানোর নিন্দা করতে সময় নেন আড়াই মাস, তিনি সামান্য শ্লীলতাহানির অভিযোগেই একজন রাজ্যপালকে সরতে বলবেন? যাঃ!

প্রমাণ হয়ে গেছে, বোসের অনুমান নির্ভুল। প্রধানমন্ত্রী ওই অভিযোগ ওঠার পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোটের প্রচার করে গেছেন, রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেখানকার কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানে সন্দেশখালির প্রধান অভিযুক্তের নাম শাহজাহান না হলে বা সে বিজেপির সদস্য হলে সিবিআই তদন্তের কথা হয়ত উঠত না। গঙ্গাধর সত্যি বলছেন না মিথ্যে, তা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হত না। কিন্তু এখন নির্বাচনের মরসুম, সন্দেশখালিতে বিজেপির ‘দোনো হাথ মে লাড্ডু’ হয়ে গেছে। একে হিন্দু বনাম মুসলমান বয়ান তৈরি করা গেছে (গোদি মিডিয়ার সহায়তায় দিব্যি চেপে যাওয়া গেছে যে শাহজাহানের দুই প্রধান স্যাঙাতই হিন্দু), তার উপর ভোটের বাজারে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের সামনে তৃণমূলকে নারীবিরোধী প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সত্যিই নারীর সম্মান মূল্যবান মনে করলে আনন্দ বোসকে আপাতত পদ ছেড়ে দিতে বলা হত।

কিন্তু এ তো বিজেপির সন্দেহাতীত ব্যবহার। এই ঘটনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে বলছি কেন? তার কারণ মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এই কাণ্ড নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে তিনি আগেই জানতেন। প্রশ্ন হল, জানলে আগেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে এই রাজ্যপালকে সরানোর ব্যবস্থা করেননি কেন? তাহলে কি তিনি নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? রাজভবনের কর্মচারী মহিলার অভিযোগকে কি তিনি স্রেফ বিজেপিকে মহিলাবিরোধী এবং নিজের দলকে মহিলাবান্ধব প্রমাণ করার কাজে লাগাচ্ছেন? অর্থাৎ সন্দেহ হয়, এখানেও উদ্দেশ্য সেই মহিলাদের ভোট, মহিলাদের সম্মানরক্ষা নয়।

আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দিলে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারিকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে যাবে হয়ত। যারা রাজ্যের তৃতীয় শক্তি এবং এই নির্বাচনে আরও শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার।

বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম, আর কংগ্রেস, দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই মহিলাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিকল্পনার কথা আছে। সিপিএমের ইশতেহারে ‘women’ শব্দটা আছে ৪৯ বার, কংগ্রেসের ইশতেহারে ৪০ বার। দুই দলেরই ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্যে অনেক ভাল ভাল পরিকল্পনা আছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদেরও যে কাজে লাগবে তা বলাই বাহুল্য। সিপিএম এবারে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছে। কিন্তু এখানে আমরা যে দুটো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলো সম্পর্কে দুই দলেরই অবস্থান অস্পষ্ট বা আপত্তিকর।

সন্দেশখালির শাহজাহানবিরোধী আন্দোলনে সিপিএম তথা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী নিরাপদ সর্দার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুলিস তাঁকে গ্রেফতারও করেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জি সমেত অন্যান্য বাম নেতৃত্বকে সন্দেশখালি যেতে বাধাও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির মত কেবল হিন্দু মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এমন দাবি না করে থাকলেও মহিলাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সিপিএমও সরব ছিল। কংগ্রেস ওই এলাকায় প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু তারাও ওই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন গঙ্গাধরকে নিয়ে কী করা হবে সেটা দুই দলের নেতৃত্ব কি বুঝে উঠতে পারছেন না?

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং বহরমপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ঘুরে ফিরে মমতাকেই দায়ী করেছেন। কেন তা বোঝা শক্ত। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিম বলেছেন রাজ্যের যেখানে যা কুকর্ম হয় সবেতেই হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি অথবা দুই দলই যুক্ত থাকে। বিজেপি নিজের সুবিধা করতে গিয়ে তৃণমূলের দুঃশাসনের সুবিধা করে দিয়েছে গত দশ বছরে। এ কথারই বা মানে কী? গঙ্গাধরের কথায় সিপিএম বিশ্বাস করছে, নাকি ওটা তৃণমূলের চক্রান্ত বলেই ধরছে? সত্যিই ধর্ষণ হয়নি, নাকি হয়েছিল? স্থানীয় সিপিএম জানে না সত্যিটা কী? কিছুই পরিষ্কার হল না। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা এবং দমদম কেন্দ্রের কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী যা বলেছেন তা আরও অদ্ভুত।

সেলিমের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তিনি জিমন্যাস্টের মত ব্যালান্স বিমের উপরে রয়েছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই পড়ে যাবেন, প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন। আইন এবং সহবত বলে, তদন্ত ছাড়াই কোনো মহিলার লাঞ্ছনার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার উপর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার মহিলা। তাই সেলিম ধর্ষণের অভিযোগগুলোকে এখনই মিথ্যে বলতে পারছেন না। ওদিকে গঙ্গাধরের ভিডিওটাও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা না বোঝার লোক তিনি নন। এর উপর আছে তৃণমূল ও বিজেপি, দুপক্ষই খারাপ – এই অবস্থান বজায় রাখার দায়িত্ব। সুজন যা বলেছেন তাতে আবার মনে হয় তিনি সেলিমের সঙ্গে একমত নন। তিনি নিশ্চিত জানেন যে গঙ্গাধরের ভিডিও ভুয়ো। একই পার্টির দুজন নেতা যদি এরকম প্রায় পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেন, তাহলে পার্টির মত কোনটা তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। যদি স্রেফ ভোট বৈতরণী পার হওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও এমন গোলমেলে অবস্থান কোনো দলের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।

তবে এ নিয়ে তবু বাম-কংগ্রেস কোনো একটা অবস্থান নিয়েছে। রাজভবনের কাণ্ডে তাদের অবস্থান কী তা এখন পর্যন্ত অজানা। একমাত্র বিমান বসু ‘অন রেকর্ড’ মতামত দিয়েছেন, যদি একে কোনো মতামত বলা যায় – ‘রাজ্যপালের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। সবটা না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’ অধীর চৌধুরীর রাজ্যপালকে আক্রমণ না করা তবু মেনে নেওয়া যায়। হাজার হোক তিনি কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার সময়ে রাজ্যপালদের দিয়ে কী কী করানো হয়েছে তা হয়ত তাঁর মনে আছে। তাই তিনি রাজ্যপালের খুব একটা দোষ ধরেন না। কিন্তু সিপিএম নেতাদের রাজ্যপালের প্রতি এত সম্ভ্রম কৌতূহলোদ্দীপক।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই বঙ্গ সিপিএমের নেতারা রাজ্যপালদের সম্পর্কে খুব সাবধানী হয়ে উঠেছেন। বরাবর কিন্তু এমন ছিল না। সিপিএম দল একসময় রাজ্যপাল পদটারই অবলুপ্তি দাবি করত। এবারের ইশতেহারেও লেখা রয়েছে ‘It [CPI(M)] stands for a Governor to be chosen out of a panel of three eminent persons proposed by the chief minister…’। অর্থাৎ সিপিএম চায়, রাজ্যপাল বেছে নিক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা প্রস্তাবিত তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্যানেল। কেরালার রাজ্যপালের সঙ্গে গত কয়েকমাস ধরে ধুন্ধুমার চলছে সে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের। পার্টির ছাত্র সংগঠন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছে। অথচ এ রাজ্যের সিপিএম নেতারা সেই জগদীপ ধনখড়ের আমল থেকেই রাজ্য সরকার আর রাজ্যপালের সংঘাত হলে দুপক্ষই খারাপ – একথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জ্যোতি বসু আর তাঁর প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রাজ্যের পক্ষ নিতেন। বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলোকে একজোট করে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। সারকারিয়া কমিশন অনেকটা সেই পরিশ্রমের ফসল। মোদী সরকারের আমলে যে রাজ্যপাল আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নররা সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন বারবার, সেকথা কিন্তু সিপিএমের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যন্ত লেখা হয়েছে। অথচ মমতা সরকারের সঙ্গে যতবার ধনখড়ের সংঘাত হয়েছে, সিপিএম নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দোষ যে দুজনেরই তা প্রমাণ করতে। বোস আসার পরেও প্রথম দিকে ব্যাপারটা বদলায়নি, ইদানীং অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বোস যখন গতবছর রাজনৈতিক হিংসায় আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সেলিম বলেছিলেন, এটা রাজ্যপালের কাজ নয়। রাজ্যপাল শাহের নির্দেশে বিজেপি নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এবং হিংসা চলছে অভিযোগ করে বোস বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন গতমাসে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একযোগে বলে – রাজ্যপালের এ কাজ করার এক্তিয়ার নেই।

সেসব না হয় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপার। বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে মতামত দেওয়া তো তুলনায় সহজ। যে সহবতের কারণে সেলিম সন্দেশখালির মহিলাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারছেন না, সেই সহবত অনুযায়ীই বলতে পারার কথা যে রাজ্যপালের উচিত সরে গিয়ে তদন্তের পথ করে দেওয়া। তিনি দোষী না নির্দোষ তা পরে দেখা যাবে। রাজ্যের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটারের কথা ভেবেও বাম, কংগ্রেস নেতারা এইটুকু বলে উঠতে পারছেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ইন্দিরা হতে অর্ধশতক পরে মোদীর হাত ধরে ফিরেছে জরুরি অবস্থা

এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক।

আগামী ৪ জুন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে। তার ঠিক ২১ দিন পরেই জরুরি অবস্থা ৪৯ পেরিয়ে পঞ্চাশে পা দেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই দিনটা কাউকে ভুলতে দেয় না। প্রতিবছরই ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ওই ২১ মাস ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার সময়। এবার যদি মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারেন, হয়ত গোটা বছর ধরেই বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে ইন্দিরা গান্ধী কী মারাত্মক স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দেশের কত ক্ষতি করেছে ইত্যাদি। সুখের কথা, তার জন্যে আলাদা করে আয়োজন না করলেও চলবে। কারণ মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে। ইনস্টা রিল প্রজন্মের অনেকেই জানত না কীভাবে সারা ভারতে বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, সাংবাদিকদেরও কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। দশ বছরের মোদী রাজত্বে সেসব দেখানো হয়েছে। তবে ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বকণ্ঠে নতুন কালের সূচনা ঘোষণা করার পরে তাও ঘটেছে যা জরুরি অবস্থার সময়ে ঘটেনি – দুটো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করেছে।

তথ্যের খাতিরে অবশ্য বলতে হবে যে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী জেএমএম নেতা হেমন্ত সোরেন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে আগেভাগেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার চম্পাই সোরেনকে সঁপে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের মত ঝাড়খণ্ডের জোট সরকারকেও ভেঙে ফেলাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। হেমন্ত আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটো আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন। হেমন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে কারাবরণ করার পর, বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন জোট সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেজরিওয়াল ঠিক করেছেন পদত্যাগ করবেন না, কারারুদ্ধ থেকেই প্রশাসন চালিয়ে যাবেন। হয়ত এমনটা করবেন ঠিক করে রেখেছিলেন বলেই তিনি গতমাসে দিল্লি বিধানসভায় নিজেই আস্থা প্রস্তাব এনে আরও একবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি অভূতপূর্ব ঘটনা। ফলে সম্ভব-অসম্ভবের কথা আলাদা, আইনত এমনটা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায়। অমৃতকালে বোধহয় এমনই হয়ে থাকে।

কেবল দুই মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারিই অবশ্য একমাত্র অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে আয়কর বিভাগ। বিশ বছর আগের কর নাকি বকেয়া আছে, এই যুক্তিতে জরিমানা হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের তহবিলে পাহাড়প্রমাণ টাকা জড়ো করেছে বিজেপি, তা তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের প্রথম দফার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ২১ মার্চ বন্ডের নম্বরগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে আরও নানা তথ্য। তার অন্যতম হল দিল্লি সরকারের আবগারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক কাহিনি।

এই সেই নীতি, যা দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে, আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন কেজরিওয়ালকেও গ্রেফতার করা হল। একই মামলায় এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন তেলেঙ্গানার সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতা। এঁদের সকলের গ্রেফতারির পিছনেই রাজসাক্ষী পি শরৎ চন্দ্র রেড্ডির বয়ান। ইনি হায়দরাবাদের অরবিন্দ ফার্মা লিমিটেডের অন্যতম ডিরেক্টর। স্ক্রোল ওয়েবসাইটের তদন্ত বলছে, ২০২২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পাঁচদিন পরে শরৎ বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং কী আশ্চর্য! ইডি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি! তারপরেই তিনি দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান।

অতঃপর শরৎ বিজেপিকে আরও ২৫ কোটি টাকা দেন। এর সঙ্গে কেজরিওয়ালদের গ্রেফতারির সম্পর্ক বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, পাঠক বুদ্ধিমান।

হেমন্তের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। দেশজুড়ে যতজন বিরোধী নেতাকে ইডি গ্রেফতার করেছে, তাঁদের কারোর বিরুদ্ধেই মামলা কিন্তু কোথাও পৌঁছচ্ছে না। প্রায়শই এ আদালত সে আদালতের বিচারক ইডিকে ধমকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনারা কি সত্যিই মামলার নিষ্পত্তি চান? শিবসেনার সঞ্জয় রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুখ্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে সঞ্জয়ের জামিন আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ইডির আচরণ কোথাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কয়েকদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, ইডি কাউকে গ্রেফতার করলে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয়।

অর্থাৎ দেশের সরকার কোনোরকম কার্যকারণ না দেখিয়েই মানুষকে গ্রেফতার করার অধিকার দাবি করেছিল। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ আইনটার অবশ্য বদনামই আছে অযৌক্তিক দমনমূলক আইন হিসাবে। কিন্তু সে অন্য আলোচনার বিষয়। আমরা বরং দেখি, জরুরি অবস্থার ইন্দিরা-সঞ্জয়কেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত কী কী কাজ হয়ে চলেছে লোকসভা নির্বাচনের মুখে।

বিদায়ী সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে দুই কক্ষ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষের ১৪৬ জন সাংসদকে নানা ছুতোয় সাসপেন্ড করে একতরফা পাস করিয়ে নেওয়া হল নতুন টেলিকম আইন আর পুরনো ফৌজদারি আইন বাতিল করা তিনটে নতুন আইন, যেগুলো মারাত্মক দমনমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামান্য চণ্ডীগড়ের কর্পোরেশনও যাতে বিরোধী জোটের হাতে না যায় তার জন্যে অনিল মাসি নামক এক নির্লজ্জ আধিকারিককে দিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যালট বিকৃতি ঘটিয়ে আপের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হল বিজেপি প্রার্থীকে। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করা মাত্রই দেখা গেল কয়েকজন আপ কাউন্সিলর দলবদল করে ফেলেছেন। মোদীজির নেতৃত্বে হঠাৎ আস্থা জেগে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত কড়া অবস্থান নেওয়ায় চণ্ডীগড় কর্পোরেশনে ভোটারদের রায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনকেও ছাড়া হচ্ছে না। সেখানেও রাত দুটোর সময়ে এক প্রার্থীকে বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন।

হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভা নির্বাচনের ভোটাভুটির আগে কংগ্রেসের কয়েকজন বিধায়ক উধাও হয়ে গেলেন। সেই ছজন কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ‘টাই’ হয়ে যায়। টসে জিতে যান বিজেপি প্রার্থী। ওই বিধায়কদের স্পিকার পরে সাসপেন্ড করেন। একই দিনে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনেও ক্রস ভোটিংয়ের ফলে বিজেপির একজন অতিরিক্ত প্রার্থী জিতে যান। সবই অবশ্য বিবেকের সহসা জাগরণ, মোদীজির নেতৃত্বে ভারতের দুর্বার অগ্রগতিতে আস্থা তৈরি হওয়ার ফল।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে দ্বিখণ্ডিত করে একনাথ শিন্ডেকে সমর্থন দিয়ে সরকার গড়েছিল বিজেপি। অতঃপর নির্বাচন কমিশন দল ভেঙে বেরিয়ে আসা শিন্ডে গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে শিবসেনার প্রতীক তাদেরই দিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে রাজ্যের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির প্রতিও। শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ ছিল। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই হয়ে গেলেন ধপধপে সাদা। তারপর নির্বাচন কমিশন তাঁর গোষ্ঠীকেই আসল এনসিপি গণ্য করে দলীয় প্রতীক দিয়ে দিল। দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা শরদের দলকে এখন লড়তে হবে অন্য প্রতীকে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৪০০ পার করার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করারই অঙ্গ এসব। রাজ্যসভা, লোকসভা – দুই কক্ষেই দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই বিজেপির। নইলে সংবিধানের ল্যাজা মুড়ো বদলে দেওয়া যাবে না, ২০২৫ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করাও স্বপ্নই থেকে যাবে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত চেয়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল তা অসম্ভব। কীভাবে সম্ভব করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত সাফল্যের পর বিজেপি বা এনডিএর পক্ষে আসন আরও বাড়ানোও অনেকের অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির হাতে ছিল কেবল দলীয় কর্মীবাহিনী আর রাজ্য প্রশাসন। মোদীর হাতে আছে যাবতীয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি।

নির্বাচন কমিশনটাকেও করতলগত করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্যে গঠিত কমিটিতে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। মোদী সরকার নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে ঢুকিয়েছে মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে, অর্থাৎ বিরোধী দলনেতার ভূমিকা হয়ে গেল দর্শকের। নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করে যেমন সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল, তেমন এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেও মামলা হয়েছে। সে মামলার শুনানি হওয়ার আগেই সাত তাড়াতাড়ি সভা ডেকে দুজন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছে সরকার। বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে শ দুয়েক নামের তালিকা হাতে ধরিয়ে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। মামলা গ্রহণ করে বিচারপতিরা বলেছেন, নির্বাচন এসে যাওয়ায় ওই আইনে স্থগিতাদেশ দিতে চান না। কিন্তু আর যা যা বলেছেন, তাতে আইনটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সদয় বলে মনে হচ্ছে না। সরকারের এত তাড়া কিসের – সে প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু তাতে কী? যতদিনে এ মামলার রায় বেরোবে, ততদিনে হয়ত নির্বাচন মিটে যাবে। ঠিক যেমন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে মামলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, রায় বেরোল ২০২৪ সালে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আবার চেয়েছিল নির্বাচন পর্ব চুকলে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য প্রকাশ করতে। তারপর সুপ্রিম কোর্টের ধমকের জোর যত বাড়ল, তথ্য প্রকাশের গতিও তত বাড়ল। এখন দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ডের মামলায় নিজেদের রায় রিজার্ভ করার পরেও বিজেপি সরকার বন্ড ছাপা বন্ধ করেনি। ২০২৪ সালের তৃতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই ৮,৩৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড ছাপা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৮ সাল থেকে বন্ডে মোট ৮,২৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। আর যে যে দল বন্ডে টাকা নিয়েছে তারা সকলে মিলেও এত টাকা পায়নি। এর পাশে রাখুন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া, টাকা কেড়ে নেওয়া। কোনো সন্দেহ নেই, এরপর কংগ্রেস অনেক আসনে প্রার্থী দিতেই খাবি খাবে। ইতিমধ্যেই গুজরাটের এক আসনে নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়া প্রার্থী প্রথমে বাবা অসুস্থ – এই কারণ দেখিয়ে নিজের নাম তুলে নেন, তারপর পার্টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁকে আর তাঁর বাবাকে নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব চরম অসম্মান করে এসেছেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস নেতারা সনাতন ধর্মকে সম্মান করেন না।

এরপর কী হতে যাচ্ছে, কোন বিরোধী নেতা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন আমরা জানি না। শনিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের বাড়িতেও সিবিআই হানা দেয় এবং শূন্য হাতে ফিরে যায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সরকারবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চাতক পাখির মত আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই – যদি এমন কোনো রায় দেওয়া হয় যাতে সরকার কোণঠাসা হয়। এমনটা যে দেশে হয়, বুঝতে হবে সে দেশের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেই এমন হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত লোকেরা আবার অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝেন রক্তপাতহীন নির্বাচন। সেই সরলমতি মানুষগুলোর উদ্দেশে বলা যাক, এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক। এমনিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে নির্বাচন কমিশনের ভারি অনীহা। উত্তর দিয়ে দিলে কথা ছিল না, কিন্তু আলোচনাই করতে না চাওয়া যে প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে তাকে গোদা বাংলায় বলে ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’, ‘আমি তো কলা খাইনি।’ আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না, তাই কেবল একটা তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দ্য কুইন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, একটা-দুটো নয়, মোট ৩৭৩ আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে গোনা ভোটের বিস্তর তফাত ছিল। এই তফাতের কোনো ব্যাখ্যা কমিশন আজ পর্যন্ত দেয়নি।

তাহলে করণীয় কী? আমার-আপনার মত সাধারণ নাগরিকের কী করা উচিত জানি না, বিরোধী দলগুলোর অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে পথেঘাটে আন্দোলনে নামা উচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ নির্বাচনে তারা যাতে নিজেদের শক্তি অনুযায়ীও লড়তে না পারে সরকারের তরফে তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়ত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যে বিরোধীপক্ষের সেরা বক্তারা প্রায় সবাই কারান্তরালে থাকবেন প্রচার পর্বে। সুতরাং এখন আর আলাদা করে প্রচার, আসন সমঝোতা – এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী? পথে নামা ছাড়া বিরোধীদের সামনে প্রচারেরই বা আর কোন পথ খোলা আছে? প্রায় কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই তো বিরোধীদের জায়গা দেবে না। টাকাপয়সার বিপুল অসাম্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠাও তৃণমূল কংগ্রেসের মত দু-একটা দল ছাড়া বাকিদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রাস্তাই একমাত্র রাস্তা নয় কি?

অথচ আমরা কী দেখছি? কংগ্রেসের তিন প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখছি। ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন নিবেদন করতে দেখছি। দিল্লির রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কবে দেখব? কেরালায় কংগ্রেস, সিপিএম দুই দলই পথে নেমেছে। কিন্তু দেশজুড়ে বিরোধীদের পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলন কবে দেখব? এদেশের বিরোধীরা কি তেমন আন্দোলন করতে ভুলে গেছেন? ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে দিল্লির চেহারা এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আম আদমি পার্টির উত্থানই তো রামলীলা ময়দান আঁকড়ে পড়ে থাকা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। সে আন্দোলনে যিনি কেজরিওয়ালের গুরু ছিলেন, সেই আন্না হাজারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত ছিলেন। কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর জেগে উঠে সংবাদসংস্থা এএনআইকে বিবৃতি দিয়ে গ্রেফতার সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণটি জব্বর।

ওসব কথা থাক। প্রশ্ন হল, নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময়ে আন্দোলন, রাজনীতি সম্পর্কে যে বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিকদের মনে, বিজেপিবিরোধীরা কি এখন তারই ফাঁদে পড়েছেন? ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকেই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, এমনকি এই শতাব্দীর গোড়া থেকে এ রাজ্যের কমিউনিস্ট শাসকদেরও আমরা বলতে দেখেছি – মিছিল মানুষকে অসুবিধায় ফেলে, বনধ কর্মনাশা ইত্যাদি। তাই বোধহয় এখন আন্দোলনের বদলে আদালতে ভরসা রাখতে হচ্ছে। যেসব দলের নির্বাচনে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে মাইনাসে, তারাও গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে কে কোন আসনে লড়বে তা নিয়ে দরাদরি করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে ‘অমুক আসন আমাদের সেন্টিমেন্ট’, ‘কেউ বলছে তমুক আসনে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী’। যেন দাঁড়ালেই ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ হয়ে যাবে।

এদেশের বিপন্ন মানুষ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসায় না থেকে নিজের মত করে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশের কৃষকরা আবার পথে। মোদী সরকার তাঁদের পথে আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা পিছু হটছেন না। যদিও সরকারের বদান্যতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, সোশাল মিডিয়া থেকেও কৃষক আন্দোলনের খবর উধাও।

লাদাখের মানুষও গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে রোজ রাস্তায় নামছেন, পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে সুবিখ্যাত সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছেন।

ভারতের মত বিরাট দেশের অমিত ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের আন্দোলন যে একেবারেই সফল হতে পারে না তা নয়। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনই দেখিয়ে দিয়েছে গণআন্দোলনের ক্ষমতা কতখানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে না এমন আন্দোলনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আছে। ২০১৯-২০ সালের এনআরসি, সিএএবিরোধী আন্দোলনেরও সেই সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েনি, আন্দোলনকে এবং তার দাবিগুলোকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেয়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা হয়ে যায় – এটা মুসলমানদের সমস্যা, তাই ওরা আন্দোলন করছে। একইভাবে এখনো বহু মানুষ ভাবছেন কৃষি আইনগুলো কৃষকদের সমস্যা, লাদাখের ব্যাপারটা লাদাখের মানুষের সমস্যা আর মণিপুর তো বিস্মৃত, কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্পনাতেও নেই। এককথায় দেশের বিরোধী রাজনীতি সময়ের চেয়ে, পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। যতদিন পিছিয়ে থাকবে তত দ্রুত ভারত ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তায়িপ এরদোগানের তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। এখন জরুরি অবস্থা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সঙ্কোচের বিহ্বলতায় নিজেরে অপমান করছে সিপিএম

সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।

সালটা ১৯৯৬। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে উদগ্রীব দেশের অকংগ্রেস, অবিজেপি দলগুলো। এই প্রস্তাবে সায় দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলছে সিপিএমের মধ্যে। সেইসময় আমাদের এলাকার সিপিএমের একেবারে নিচুতলার এক তরুণ কর্মী বলেছিলেন, ছোট থেকে শুনে আসছি আমাদের দলের নামে একটা ‘আই’ আছে। সেটার গুরুত্ব কী তা তো কোনোদিন টের পেলাম না। জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে গোটা দেশ টের পাবে। সেদিনের আড্ডায় অন্য এক কর্মী কংগ্রেসের সমর্থনে সরকারে যাওয়ার বিরোধিতা করে বলেছিলেন, আজ কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়ব, তারপর বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে কোন মুখে ভোট চাইতে যাব লোকের কাছে? শেষপর্যন্ত যিনি ‘আই’-এর প্রভাব দেখার আশা করেছিলেন তাঁকে আশাহত হতে হয়েছিল। জ্যোতিবাবু স্বয়ং সেই নিচুতলার কমরেডের চেয়ে কিছু কম নিরাশ হননি। সরকারে না যাওয়ার পার্টিগত সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েও বলেছিলেন, ঐতিহাসিক ভুল হল। জ্যোতিবাবুর জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির শরিক সেই কমরেড অতি সম্প্রতি প্রয়াত হলেন আর যিনি বিরোধিতা করেছিলেন তিনিও এখন বয়সের কারণে খানিকটা নিষ্প্রভ। ইতিমধ্যে সাতাশটা বছর কেটে গেছে, কিন্তু সিপিএমের ‘আই’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে পার্টির নিজেরই দ্বিধা এখনো কাটল না। ইন্ডিয়া জোটের ‘আই’-তে ‘আই’ মেলানো নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন তারই প্রমাণ।

সেইসময় সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে ঘোষিত যুক্তি ছিল, এমন কোনো সরকারে যাব না যে সরকার মার্কসবাদী কর্মসূচি লাগু করে উঠতে পারবে না। কিন্তু সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের বহু নেতা সরকারে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন এবং তাঁরা মনে করেন ‘কেরালা লবি’ জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। কথাটা সত্যি হোক বা না হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব নেতাও যে সরকারে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না তা সর্বজনবিদিত। এবারেও দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পক্ষপাতী নয়। ইন্ডিয়া জোটে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেস – দুই দলই থাকলেও, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং অন্যতম নেতা সুজন চক্রবর্তী বারবারই বলছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আর তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও একই কথা বলছেন, কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে এক জোটে থাকা ঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্বের দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে গেছে কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে সদস্য না রাখার সিদ্ধান্তে। যদি গোড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হত তাহলে তবু বোঝা যেত। ইন্ডিয়া জোটের সব দল ওই কমিটিতে নেই। কিন্তু যখন কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা হয়, তখন সিপিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তাদের প্রতিনিধির নাম পরে জানানো হবে। পরবর্তীকালে হঠাৎ কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত হল কেন?

সিপিএম নেতৃত্বের এই দ্বিধার সমালোচনায় অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু অনস্বীকার্য যে বিজেপিবিরোধিতা আর তৃণমূলবিরোধিতার মধ্যে একটি বেছে নেওয়া আজকের সিপিএমের পক্ষে কঠিন। তাদের বিজেপিবিরোধিতার ইতিহাসে কোনো ছেদ নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের মত তারা কখনো বিজেপির সঙ্গে জোট সরকার গড়েনি, বিজেপির মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হননি কোনো সিপিএম নেতা। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সরকারকে বিজেপি, সিপিএম দুই দলই সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সেবার নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। উপরন্তু স্বল্প সময়ে ভিপি সিংয়ের সরকার মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ লাগু করা, একজন মুসলমানকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করার মত অভূতপূর্ব কাজ করেছিল। সেই সরকারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি বাবরি মসজিদ ভেঙে উঠতে পারেনি, বাধা পেয়েই সমর্থন প্রত্যাহার করে। অর্থাৎ বিজেপির কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে দেওয়া হয়নি, উল্টে হিন্দুত্ববাদের অতি অপছন্দের গোটা দুয়েক কাজ সেই সরকার করে ফেলেছিল। স্বভাবতই সিপিএম বিজেপিবিরোধী জোটের স্বাভাবিক সদস্য।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু মানুষ যে এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন তা বুঝতে বড় নেতা হতে হয় না। ট্রেনে বাসে বাজারে দোকানে খুচরো কথাবার্তায় গরিব, বড়লোক নির্বিশেষে মানুষের সরকারকে গাল দেওয়ার এরকম উৎসাহ শেষ দেখা গিয়েছিল বামফ্রন্ট আমলের শেষ পর্বে। এই অসন্তোষের কারণ যেমন ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়া অর্থাৎ যাবতীয় নিয়োগ দুর্নীতি, তেমনই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা নিয়ে দুর্নীতি, একশো দিনের কাজ না পাওয়ার মত বিষয়ও। পরের দুটি বিষয় সরাসরি গ্রামের গরিব মানুষের গায়ে লাগে। তা না হলে মনোনয়ন পর্ব থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত পুকুর চুরির পরেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীরা এতগুলো আসনে জিততে পারত না, বাম-কংগ্রেসের ভোটও বাড়ত না। সংসদীয় রাজনীতিতে জনমতের এই স্রোতকে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বিরোধী দল অগ্রাহ্য করতে পারে না।

এমতাবস্থায় সিপিএম কী করতে পারত? ইন্ডিয়া জোটে না গিয়ে বলতে পারত আমরা নিজেদের মত করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ব। সেক্ষেত্রে তৃণমূল তো বটেই, সব রঙের সমালোচক সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলে দেগে দিত। ইন্ডিয়া জোটে থাকায় যেমন বিজেপি তৃণমূলের দালাল বলছে এবং নিজেদের সদস্য, সমর্থকরাও সন্দেহের চোখে দেখছে। কথা হল, সমালোচকরা কী বলবে তা ভেবে রাজনীতি করা দিশাহীনতার লক্ষণ। এতদিনের দিশাহীনতাই আজকের গাড্ডায় ফেলেছে সিপিএমকে। ইন্ডিয়া জোটে না গেলেই সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলার সুযোগ পাওয়া যাবে কারণ ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে সিপিএমের সক্রিয়তার অভাবে বিরোধী পরিসর দখল করতে শুরু করে বিজেপি। তৃণমূল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে গায়ের জোরে প্রহসনে পরিণত করার পর নিচের তলার হতাশ সদস্য, সমর্থকরা বিজেপির দিকে ভিড় জমান এবং ২০১৯ সালের লোকসভা আর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তার ফায়দা তোলে। সিপিএম শূন্যে পৌঁছয়। ফলে ‘পার্টি লাইন’ যা-ই হোক, সিপিএমই বিজেপিকে পুষ্ট করছে – একথা পাটিগাণিতিক সত্য হয়ে যায়। সেই বদনামের ভারে সিপিএম এখন ন্যুব্জ।

আরও পড়ুন নয়া বার্তা ছাড়া পরিশ্রমের ফল পাবে না সিপিএম

এই পরিস্থিতি তৈরিই হত না, যদি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে নেতৃত্ব বাম রাজনীতির লড়াকু বিরোধিতার ঐতিহ্য বজায় রাখতেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর অনতিবিলম্বে সারদা কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস হয়। অথচ সিপিএম একদিনের জন্যও তা নিয়ে জনজীবন অচল করে দেওয়ার মত আন্দোলন করেনি। নারদের ক্যামেরায় শাসক দলের নেতাদের নগদ টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায়। সেইসময় বিরোধী নেত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি হলে কলকাতা অচল হয়ে যেত, সূর্যকান্ত মিশ্ররা কেবল বিবৃতি দিয়ে গেছেন। গতবছর মার্চে সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পরে এবং মীনাক্ষী মুখার্জির উদ্যোগে সিপিএমের আন্দোলনে ঝাঁজ আসে। তার আগে পর্যন্ত রাস্তার চেয়ে টিভির পর্দায় এবং ফেসবুক লাইভেই বেশি দেখা যেত সিপিএম নেতাদের। সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।

এই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার মূল্য হিসাবে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও শূন্য পাওয়া তেমন বড় কিছু নয়, যদি বিরোধী হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও ফেরত আনা যায়। সিপিএম নেতৃত্বের এবং বিজেপিবিরোধী সিপিএম সমালোচকদেরও ভেবে দেখা উচিত, সিপিএম ইন্ডিয়া জোট থেকে আলাদা হয়ে লড়লেই ভাল হয় কিনা। কারণ সিপিএম তৃণমূলবিরোধিতা না করলে আখেরে বিজেপিরই লাভ, তারা আরও বেশি করে তৃণমূলবিরোধী ভোট পাবে। মনে রাখা ভাল, ধূপগুড়ি বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপি হেরেছে মাত্র হাজার চারেক ভোটে। ওই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থীর (কংগ্রেস সমর্থিত) জামানত জব্দ হলেও তিনি পেয়েছেন তেরো হাজারের বেশি ভোট। এতগুলো তৃণমূলবিরোধী ভোট কিন্তু বিজেপির ঝুলিতে যেত তৃতীয় পক্ষ না থাকলে। এভাবে ভাবতে হলে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্বকে ঠিক করতে হবে লোকসভা নির্বাচনে মূল লক্ষ্য কোনটা। জ্যোতি বসু, হরকিষেণ সিং সুরজিৎদের অন্তত সেই দ্বিধা ছিল না। তাঁরা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকাতে ১৯৯৬ পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের সংখ্যালঘু সরকারকে চলতে দিয়েছিলেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ব্যাকফুটে গোদি মিডিয়া

পবন খেরা, সুপ্রিয়া শ্রীনাতেরা লাইভ টিভিতে গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ধমকাতে শুরু করলেন – বিজেপির দালালি করবেন না।

প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা আর বুথফেরত সমীক্ষার দৌলতে লোকনীতি-সিএসডিএস নামটা এখন ওয়াকিবহাল পাঠকদের কারোর অজানা নয়। কিন্তু এই সংস্থাটি আরও কিছু সমীক্ষা করে থাকে যেগুলো নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে শুধু যে হইচই হয় না তা নয়, আদৌ কোনো খবরই প্রকাশ করা হয় না। কারণ করলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে যাবে। তেমনই এক সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত সপ্তাহে। এই সমীক্ষার মজা হল, এখানে উত্তরদাতা সাংবাদিকরাই। যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের সমীক্ষাটির ফল দেখে আতঙ্কিত হওয়ার মত নানা বিষয় আছে, তবে এই লেখার পক্ষে যা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য তা হল, ৮২% সাংবাদিক বলেছেন তাঁরা মনে করেন তাঁদের নিয়োগকর্তা বিজেপিকে সমর্থন করেন।

এমনিতে স্বাধীন, সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে যে কোনো ব্যক্তিরই যে কোনো দলকে সমর্থন করার অধিকার আছে। উপরন্তু উদারনৈতিক গণতন্ত্রের গালভরা বাণীগুলোর গলদ বুঝে ফেলা যে কোনো মানুষই জানেন কোনো দেশেই কোনো সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারে না। বস্তুত, হওয়া উচিতও নয়। কারণ রাজনীতিহীন সাংবাদিকতা হল অর্থহীন তথ্যের সমাহার। ও জিনিস হোমেও লাগে না, যজ্ঞেও লাগে না। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া স্কুপ নামক ওয়েব সিরিজে একজন আদর্শবাদী সম্পাদকের একটি সংলাপ আছে। তিনি চাকরি ছাড়ার আগে মালিককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যখন কেউ বলে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আর অন্য একজন বলে হচ্ছে না, তখন সাংবাদিকের কাজ দুজনকেই উদ্ধৃত করা নয়। জানলা খুলে দেখা কোনটা ঠিক এবং সেটাই লেখা। সাংবাদিকের কাজ কোনটা তা ঠিক করা কিন্তু শতকরা একশো ভাগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং সাংবাদিকের এবং সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রবণতা থাকতে বাধ্য। সেই প্রবণতা কোনদিকে থাকবে তা অনেককিছুর ভিত্তিতে ঠিক হয়, যার একটা অবশ্যই মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ। ফলে কোনো তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমই যে কোনোদিন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিল না একথা বলাই বাহুল্য। যেমন কেউ বলে না দিলেও পশ্চিমবঙ্গে নেহাত বালক-বালিকারাও চিরকাল জানত আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ওই সংস্থারই ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ কংগ্রেসপন্থী; বর্তমান, দ্য স্টেটসম্যান বামফ্রন্ট সরকারের বিরোধী; আবার আজকাল বাম ঘেঁষা। তাহলে লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষার ফল আলাদা করে আলোচনা করার মত কেন? কারণ ভারতের মত এত বড় একটা দেশ, যেখানে এতগুলো রাজনৈতিক দল রয়েছে, সেখানে চালানো সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে এই বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক মনে করছেন তাঁদের সংস্থা একটা দলকেই সমর্থন করে। অর্থাৎ বিভিন্ন নাগরিক বিভিন্ন দলকে সমর্থন করার মত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন দলের দিকে ঢলে থাকলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ভারসাম্য বজায় থাকে তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই সমীক্ষা থেকে।

২০১৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন খবরের চ্যানেল দেখার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরা সমীক্ষার এই ফলাফলে অবিশ্বাস করবেন না। কেউ কেউ বলবেন বেশ হয়েছে, এমনটাই হওয়া উচিত কারণ বিজেপিই একমাত্র জাতীয়তাবাদী পার্টি। আর বিজেপিবিরোধী শঙ্কিত হবেন। এই যা তফাত। কিন্তু কে নিজের রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের এই একপেশে হয়ে যাওয়াকে কীভাবে দেখবেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল দেশের সংবাদমাধ্যমের এতখানি একচোখামির ফল কী হচ্ছে? অর্ণব গোস্বামী, রাহুল শিবশঙ্কর, রাহুল কাঁওয়াল, শিব অরুর, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকত, দীপক চৌরাসিয়া, অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, সুরেশ চওনঙ্কে বা অমন চোপড়ারা যে পরিমাণ ঘৃণা ছড়িয়েছেন গত এক দশকে – তার ফল আর শুধু উত্তেজনা সৃষ্টি করে দাঙ্গা ছড়ানোয় সীমাবদ্ধ নেই। ও কাজ তো হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকও করে। ধর্মান্ধ টিভি অ্যাঙ্করদের অবদানে উঠে এসেছে চেতন সিংয়ের মত ভয়ঙ্কর অপরাধী, যে সরকারি উর্দি পরে সরকারি বন্দুক দিয়ে ট্রেনের কামরায় প্রথমে নিজের ঊর্ধ্বতন অফিসারকে খুন করে। তারপর এক কামরা থেকে আরেক কামরায় গিয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী যাত্রী খুঁজে বার করে খুন করে। অবশেষে সেখানে দাঁড়িয়ে বাকি যাত্রীদের হুমকি দেয়, ভারতের দুজনই আছে – মোদীজি আর যোগীজি। এখানে থাকতে হলে এদেরই ভোট দিতে হবে।

এতদ্বারা ২০২৪ লোকসভার নির্বাচনের জন্য বিজেপির প্রচার শুরু হয়ে গেল কি? রবীশ কুমার যাদের গোদি মিডিয়া বলেন, তারা যখন অমিত শাহকে বিধায়ক কেনাবেচা করার গুণে ‘মডার্ন চাণক্য’ আখ্যা দিতে পারে তখন এই প্রণালীকেও ব্যাপারটা থিতিয়ে গেলে যে বিজেপির ‘অ্যাগ্রেসিভ ক্যাম্পেনিং’ নাম দেবে না তার নিশ্চয়তা কী? আপাতত খাঁটি আমেরিকান কায়দায় চেতন সিংকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা চলছে। যদিও রেলমন্ত্রীকে কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করবে না, একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে বন্দুক হাতে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছি কেন? কারণ বিজেপি সরকারকে প্রশ্ন করা বারণ, করলে চাকরি যায়। লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষা যে সঠিক, এই তার হাতে গরম প্রমাণ।

নিজের বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে আশপাশের লোকের সঙ্গে কথা বললেই টের পাওয়া যায় মূলধারার মিডিয়ার ছড়ানো ভুয়ো খবর এবং একচোখা খবর ইতিমধ্যেই কতখানি ক্ষতি করে ফেলেছে। দিন দুয়েক আগে একজন প্রাইভেট গাড়ির চালকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সেদিন কাগজে বেরিয়েছে বিজেপি মণিপুরের এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই এনআরসি করার কথা ঘোষণা করেছে। চালকের পাশে বসে কাগজ পড়তে গিয়ে সক্ষোভে আমার স্ত্রীকে বলতেই চালক বলে উঠলেন “ঠিক হয়েছে। এনআরসি তো করাই উচিত।” কেন করা উচিত জিজ্ঞাসা করায় তাঁর উত্তর “বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানগুলো এসেই তো মণিপুরে অশান্তিটা করছে।” তাঁকে বলা গেল যে মণিপুরে মুসলমান প্রায় নেই বললেই চলে এবং ওই রাজ্যের সীমান্ত মায়ানমারের সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে নয়। তাঁর নাছোড়বান্দা উত্তর “মুসলমান সব জায়গাতেই আছে।” অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞেস করতে হল, মণিপুর সম্পর্কে তাঁর তথ্যের উৎস কী? উত্তর “খবরেই তো দেখাচ্ছে।” কোন চ্যানেলের খবরে দেখাচ্ছে সে প্রশ্ন করে আর সময় নষ্ট করিনি, কারণ কোন খবর মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ায় না সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বরং সহজ। তাই তাঁকে মণিপুরের ভূগোল, ইতিহাস এবং বর্তমান অশান্তি যে মেইতেই আর কুকিদের মধ্যে তা জানাতে খানিকটা সময় ব্যয় করলাম। এনআরসি যে এর প্রতিকার নয় তাও বোঝানোর চেষ্টা করলাম। সফল হলাম কিনা জানি না, ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মানুষ বহুবছর ধরে সারাদিন যা দেখে চলেছে তার প্রভাব কয়েক মিনিটের কথায় দূর হওয়া অসম্ভব।

ভারতীয় সমাজকে এই খাদের কিনারে নিয়ে আসার দোষ সবটাই টিআরপিখোর টিভি চ্যানেলগুলোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। খবরের কাগজগুলোও কোনো অংশে কম যায়নি। ‘পেইড নিউজ’ নিয়ে সাংবাদিক পি সাইনাথের যে কাজ আছে তা প্রমাণ করে টাকার জন্যে ভারতের বড় বড় কাগজগুলো সবকিছু করতে রাজি। ২০১৮ সালে কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশনেও তেমনই দেখা গিয়েছিল। কোবরাপোস্টের প্রতিনিধিরা একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে ভারতের অনেকগুলো বড় বড় সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের কাছে গিয়েছিলেন। প্রস্তাব ছিল, আমরা টাকা দেব, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর করতে হবে এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা হয় এমন খবর করতে হবে, নানারকম ইভেন্টের আয়োজন করতে হবে। দুটো মাত্র সংবাদমাধ্যম রাজি হয়নি – পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর ত্রিপুরার দৈনিক সংবাদ।

সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থলোলুপতা এবং বিজেপি সরকারের ভয় দেখানো, সরকারবিরোধী খবর করলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি নানা কৃৎকৌশলের ফল হল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিজেপি-আরএসএসের বয়ানের একাধিপত্য। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কখনো যা হয়নি ২০১৪ সালের পর থেকে ঠিক তাই হয়ে চলেছে। সংবাদমাধ্যম কেবলই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। যাদের হাতে দেশ চালানোর দায়িত্ব তাদের প্রশ্ন করে না। অর্থাৎ কয়েকশো বছর ধরে সারা পৃথিবীতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রে সাংবাদিকতার মূল কর্তব্য বলে যা স্থির হয়েছে – ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা – সেই কাজটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন করা অপরাধ, যে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে না তারাই সঠিক কাজ করে – একথাই সারা দেশে সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে গদগদ সেলফি তুলে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। কে কত বড় সাংবাদিক তার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসক দলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রশাসনিক বৈঠকে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন “পজিটিভ (ইতিবাচক) খবর করুন। বিজ্ঞাপন পাবেন।” এত বড় খবর সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকের এক কোণে ১৭৮ শব্দে প্রকাশিত হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের একজনও এর প্রতিবাদে একটি শব্দও লেখেননি বা বলেননি।

এভাবে চলছিল ভালই, কিছুদিন হল এই ধামাধরা মিডিয়া কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েছে। এমনিতে পৃথিবীর যে কোনো ব্যবসায় নিয়ম হল কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু ভারতের সাংবাদিকতায় সেই নিয়ম বারবার ভেঙেছে গোদি মিডিয়া। অর্ণব গোস্বামী টাইমস নাওতে থাকার সময়েই বিজেপির পক্ষে বলে না এনডিটিভির মত যেসব চ্যানেল তার সাংবাদিকদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা আরম্ভ করেছিলেন। একেবারে আরএসএসের তত্ত্ব অনুসরণ করে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, মুসলমান তো বটেই, যে কোনো ইস্যুতে সরকারের সামান্যতম বিরোধিতা করা ব্যক্তিদেরও দেশদ্রোহী বলা শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০১৪ সাল থেকে। টিভি বিতর্কে বিরোধী দলের একজন মুখপাত্রকে ডেকে চিৎকার করে তাঁকে কথা বলতে না দেওয়া, অন্যদিকে নানা পরিচয়ে বিজেপি-আরএসএসপন্থী একাধিক লোককে প্যানেলে বসিয়ে একতরফা প্রচার চালিয়ে যাওয়া দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়টুকু বাদ দিলে ভারতের সংবাদমাধ্যম এমন কখনো করেনি বলেই সম্ভবত বিরোধী দলগুলোর নেতারা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন। ইংরেজিতে যাকে ‘ওয়াল টু ওয়াল কভারেজ’ বলে, সমস্ত নির্বাচনী প্রচারে এবং সারাবছরই বিজেপি তাই পেয়ে চলছিল আর বিরোধীদের কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবার রাস্তা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। এর পাল্টা কৌশল কারোর মাথায় আসেনি। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য, সমর্থকরা ভেবে বসেছিলেন সোশাল মিডিয়া দিয়ে মাত করে দেবেন। কিন্তু বিপুল অর্থবলের কারণে সেখানেও বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠা শক্ত। উপরন্তু আমাদের মত শহুরে মধ্যবিত্তদের নিজের চারপাশ দেখে যা-ই মনে হোক, ভারতের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এখনো স্মার্টফোন নেই, থাকলেও শস্তা ডেটা নেই, কানেক্টিভিটি নেই। ফলে ফেসবুক বা টুইটার দিয়ে তাঁদের কাছে পৌঁছনো যায় না।

নেপথ্যে কে আছেন জানি না, কিন্তু বিজেপির এই সর্বগ্রাসী প্রচারের বিকল্প পথ প্রথম দেখালেন রাহুল গান্ধী – ভারত জোড়ো যাত্রা। শুধু যে সাবেকি ভারতীয় কায়দায় মাইলের পর মাইল হেঁটে নিজের ভাবমূর্তি খানিকটা পুনরুদ্ধার করলেন এবং কংগ্রেসকে জাতীয় স্তরে ফের প্রাসঙ্গিক করে তুললেন তাই নয়, রাহুল ওই যাত্রায় এমন একটা জিনিস করলেন যা এমনকি বিজেপিও ভেবে উঠতে পারেনি। ভারত জোড়ো যাত্রাকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম কোনো কভারেজ দেবে না বুঝে রাহুল ছোট বড় বিচার না করে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, এমনকি ইউটিউবারদেরও সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, বড় বড় কাগজে রাহুল নেই। টিভিতে রাহুল নেই। অথচ কর্ণাটকে চলা ভারত জোড়ো যাত্রা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আলোচনা করছেন। আসলে রাহুল (বা কংগ্রেস) যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা বড় অংশের মানুষ খবরের জন্য আর কাগজ বা টিভির উপর ভরসা করেন না। বিশেষত যাঁদের মস্তিষ্কের সবটাই এখনো হিন্দুত্ব গ্রাস করতে পারেনি, তাঁরা অনেকেই এখন ধ্রুব রাঠি বা আকাশ ব্যানার্জির মত ইউটিউবারের দিকে তাকিয়ে থাকেন খবর সংগ্রহের জন্য। পশ্চিমবঙ্গের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো সঠিক অর্থে বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি বলেই হয়ত এই ধারা এখনো শীর্ণকায়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত বুলডোজারশাসিত রাজ্যেও হিন্দি ভাষার ইউটিউবাররা প্রবল জনপ্রিয়। যোগী সরকারকে বেগ দেওয়ার মত খবর, হাস্যকৌতুক, গান সবই তাঁরাই তৈরি করছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বহু রাজ্যেই ঘটনা তাই। এই প্রবণতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হল ভারত জোড়ো যাত্রায়।

এর সঙ্গে কংগ্রেস আরও একটি কৌশল নিল, যা প্রথম চোটে যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের আপত্তিকর মনে হবে। শাস্ত্রে বলা আছে, দূত অবধ্য। সাহেবরাও বলে থাকে “Don’t shoot the messenger”। কিন্তু রাহুল ভারত জোড়ো যাত্রা চলাকালীন একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এক সাংবাদিককে সরাসরি বলে দিলেন, বিজেপির হয়ে কাজ করতে হলে বুকে বিজেপির লোগো লাগিয়ে আসুন। তাহলে ওদের যেভাবে উত্তর দিই আপনাদেরও সেভাবেই উত্তর দেব। সাংবাদিক হওয়ার ভান করবেন না। সাংবাদিক দমে যেতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাওয়া বেরিয়ে গেল?

এরপর থেকে একই ঢঙে কথা বলা শুরু করলেন তাঁর দলের অন্য মুখপাত্ররাও। পবন খেরা, সুপ্রিয়া শ্রীনাতেরা লাইভ টিভিতে গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ধমকাতে শুরু করলেন – বিজেপির দালালি করবেন না। কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন ইন্ডিয়া টুডের শোতে সুপ্রিয়া সটান রাহুল কাঁওয়াল এবং রাজদীপ সরদেশাইকে বলে দিলেন, আপনাদের স্টুডিওতে তো সকাল থেকে শোকপালন চলছে বলে মনে হচ্ছে। এই আক্রমণাত্মক মেজাজ কংগ্রেসের মুখপাত্ররা বজায় রেখে চলেছেন। সম্প্রতি টাইমস নাওয়ের সাক্ষাৎকারে কপিল সিবাল নাভিকা কুমারকে ল্যাজেগোবরে করে ছেড়েছেন। ভারি মোলায়েম গলায় বলেছেন, আশা করি এখন পর্যন্ত নাভিকা প্রধানমন্ত্রীর মাউথপিস নয়?

ক্রমশ এই রণনীতি অন্য বিরোধী দলের নেতাদেরও নিতে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুই বাকি দেশের চেয়ে একটু দেরিতে হয় আজকাল। তাই হয়ত সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অতি সম্প্রতি একেবারে পার্টিজান হয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যমকে কড়া ভাষায় প্রত্যুত্তর দেওয়া শুরু করেছেন। লাইভ অনুষ্ঠানে জি ২৪ ঘন্টার অ্যাঙ্কর মৌপিয়া নন্দীকে সটান বলে দিয়েছেন, দালালি করা চলবে না। ওই চ্যানেলের মালিক সুভাষ চন্দ্র যে রাজ্যসভার বিজেপি সমর্থিত সাংসদ, টেনে এনেছেন সেকথাও।

আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌপিয়া প্রথমে ওই তথ্যটাই অস্বীকার করেছেন, তারপর সেটা সফল হবে না বুঝে জাঁক করে বলেছেন, সেলিম চাইলেও ২৪ ঘন্টা গণশক্তির মত রিপোর্টিং করবে না। তারপর, যেন হঠাৎ খেয়াল হওয়ায়, যোগ করেছেন, জাগো বাংলার মত রিপোর্টিংও করবে না।

স্বাভাবিক অবস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের এইভাবে সাংবাদিকদের তথা সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ভারত যে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই এবং এই অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি করতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। বস্তুত অধিকাংশ তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম এখন এতটাই একচোখো হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের খবর না দেখে বা না পড়ে কেউ যদি গণশক্তি আর জাগো বাংলা পড়ে নিজের মত করে ঠিক কী ঘটেছে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে হয়ত সত্যের বেশি কাছাকাছি পৌঁছবেন।

একথা পাঠক/দর্শক মাত্রেই আজকাল উপলব্ধি করেন। সেই কারণেই রবীশ কুমারের ইউটিউব চ্যানেলের গ্রাহক সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, এমনকি কুণাল কামরার মত ঋজু বিদূষক, যাঁর মূল কাজ লোক হাসানো, তাঁর পডকাস্টও মানুষ আগ্রহ নিয়ে দ্যাখেন। সেদিক থেকে যে বাঙালি হিন্দি বা ইংরিজিতে স্বচ্ছন্দ নন তাঁদের দুর্ভাগা বলতে হবে। বাংলা ভাষায় ওই মানের কাজ এখনো হচ্ছে না।

যা-ই হোক, ধামাধরা মিডিয়ার সংকটের কথা ফেরত আসি। সম্প্রতি রিপাবলিক চ্যানেলের কর্ণধার অর্ণব মণিপুর নিয়ে মোদী সরকারের সমালোচনা করেছেন, রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবিও তুলেছেন। তা নিয়ে বিজেপিবিরোধী মানুষ যুগপৎ হাসাহাসি করছেন এবং বিস্মিত হচ্ছেন। আসলে এতে বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই। বিজেপিকে তো বটেই, এমনকি বিজেপিবিরোধীদেরও বিস্মিত করে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও ২৬টি দলের ইন্ডিয়া জোট গড়ে উঠেছে। শেষপর্যন্ত সে জোট টিকবে কিনা সেটা পরের কথা, কিন্তু গোদি মিডিয়ার কাছে আশু সমস্যা হল এই দলগুলির অধীনে থাকা রাজ্য সরকারগুলো। গোটা দক্ষিণ ভারতে কোথাও বিজেপি সরকার নেই, অথচ ওই রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল, প্রচুর বিজ্ঞাপন পাওয়া যেতে পারে। বাড়াবাড়ি করলে বিজেপির দেখানো পথে ওই সরকারগুলো বিজ্ঞাপন দেবে না। গোবলয়ের রাজ্যগুলোর মধ্যেও বিহার, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থানের সরকার ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোর হাতে। দিল্লি, পাঞ্জাবের সরকারও তাই। বলা বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গের মত বড় রাজ্য, ছত্তিসগড়ের মত উন্নতি করতে থাকা রাজ্যও ইন্ডিয়ার হাতে। তাহলে গোদি মিডিয়ার হাতের পাঁচ বলতে রইল মডেলের হাড়গোড় বেরিয়ে পড়া গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ছোট্ট রাজ্য হরিয়ানা আর মধ্যপ্রদেশ। শেষেরটি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপির হাতে থাকবে কিনা তা নিয়েও ঘোর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো থেকে তেমন ব্যবসা হয় না নয়ডাকেন্দ্রিক তথাকথিত সর্বভারতীয় মিডিয়ার। কারণ তারা ওই অঞ্চল এবং তার মানুষজনকে চেনেই না। স্বভাবতই তাঁরাও এদের পাত্তা দেন না। এমতাবস্থায় স্রেফ দাঙ্গাবাজি করে চলে কী করে অর্ণব, রুবিকাদের?

লাইভ টিভিতে বিরোধী দলের নেতাদের প্রতিআক্রমণের ফলে হিন্দুত্বে একান্ত দীক্ষিত দর্শক ছাড়া আর সকলের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা যে তলানিতে ঠেকেছে একথা বুঝতে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর পাকা মাথাদের কারোর বুঝতে বাকি নেই। বিকল্প সংবাদমাধ্যম বিপুল সরকারি বাধা সত্ত্বেও যে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে তাতেও সন্দেহ নেই। অতএব মাঝেমধ্যে বিজেপিবিরোধী ভান করতে হবে বইকি। মুশকিল হল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন সম্ভবত বিজেপিও ভাবতে শুরু করেছে, এদের দিয়ে প্রোপাগান্ডা করালে তা আর আগের মত প্রভাবশালী হবে না। তাই তারাও এখন ‘সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ ধরার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বিজেপিপন্থী লেখক, সাংবাদিক, এমনকি মন্ত্রীরাও বেশকিছু ইউটিউবারকে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেছেন। এমনটা বিজেপি আগে কখনো করেনি। এই ইউটিউবারদের অন্যতম beerbiceps বলে একজন। ইউটিউবে তার প্রায় ছয় মিলিয়ন ফলোয়ার। অতীতে সে ক্রিকেটার যজুবেন্দ্র চহল, সানি লিওন, সারা আলি খান জাতীয় মানুষের সাক্ষাৎকার নিত। এমনকি ডিমনেটাইজেশনকে ব্যঙ্গ করেও ভিডিওও বানিয়েছে একসময়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে সে পরম সাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে। বারবার ভুয়ো খবর ছড়িয়ে ভ্রম সংশোধন করা এজেন্সি এএনআইয়ের সম্পাদক স্মিতা প্রকাশ থেকে শুরু করে অমুক প্রভু, তমুক দক্ষিণপন্থী স্ট্র্যাটেজিস্ট – সকলেই বিয়ারবাইসেপসের শোতে উপস্থিত হচ্ছেন। বিজেপি যদি ২০২৪ নির্বাচন জিতেও যায়, রাহুল, সেলিমরা মূলধারার সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তাঁদের তিরিক্ষে মেজাজ বজায় রাখলে হয়ত বিয়ারবাইসেপসদেরই পোয়া বারো হবে, কপাল পুড়বে অর্ণব, মৌপিয়াদের।

তবে আক্রমণের ধারাবাহিকতা থাকা চাই। সেলিম জি নেটওয়ার্কের অ্যাঙ্করকে হাঁকড়াবেন আর তাঁর দলের মুখপাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা রিপাবলিক টিভির মত আরও উগ্র দক্ষিণপন্থী চ্যানেলের বিতর্কে হাসিমুখে অংশগ্রহণ করবেন, অনুষ্ঠানের আগে পরে দিলদরিয়া হয়ে ছবিও তুলবেন – তা কী করে হয়?

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বায়রন যদি ব্রুটাস হন, তৃণমূল কে?

২০২১ সালে যে তৃণমূল নেতাদের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাঁরা বিজেপিতে গিয়ে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন, তাঁদের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর অনতিবিলম্বেই ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছিল।

অবাক হওয়ার ক্ষমতা কমে আসাই সম্ভবত বার্ধক্যের সবচেয়ে নিশ্চিত লক্ষণ। বায়রন বিশ্বাস কংগ্রেসের টিকিটে, সিপিএমের সমর্থনে মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় খুব একটা অবাক হতে পারিনি। ফলে বুঝলাম, বুড়ো হচ্ছি। আমি যখন ছাত্র, তখন আমাদের কলেজের সেমিনারে সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। পিঠে ভারি স্কুলব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাওয়া এক পরিচিত স্কুলছাত্রকে নাকি তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন “কেমন আছ?” সে উত্তর দিয়েছিল “ওই আছি আর কি। এবার গেলেই হয়।” তখনও এ-দেশে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়নি। তখনই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে আমার মতো চালসে পড়া লোকের তো বুড়ো হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। চারপাশ অতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এত দ্রুত, যে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে বদলানো প্রায় কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই বোধহয় সাহিত্য, সিনেমা, সোশাল মিডিয়া— সর্বত্র স্মৃতিমেদুরতার ছড়াছড়ি, একমাত্র নস্টালজিয়ার বাজারই সর্বদা সরগরম। বদল এমনিতে জীবনের লক্ষণ, তা মনোরঞ্জক এবং উত্তেজক। কিন্তু ঘনঘন বদল আবার একঘেয়ে হয়ে যায়। সর্বক্ষণ চার, ছয় হয় বলে যেমন আজকাল আর আইপিএল ম্যাচ দেখতে ভাল লাগে না। মনে হয়, এ তো জানা কথাই। খেলার মহান অনিশ্চয়তা বলে আর কিছু নেই। রাজনীতিও ক্রমশ মহান অনিশ্চয়তা হারাচ্ছে। এ রাজ্যের রাজনীতি তো বটেই।

অনেকেই চটে যাবেন। তবু না বলে পারছি না— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদল ব্যাপারটা এতই জলভাত হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে, যে বায়রনের দলবদল নিয়ে কংগ্রেস ও বাম নেতৃত্বের আহত হওয়া এবং বহু সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা হতাশায় ভোগা আমার কাছে প্রাথমিকভাবে কৌতুককর। পরে অন্য কিছু। আগেই বলেছি, অতি দ্রুত সবকিছু বদলালে নিরুপায় মানুষ স্মৃতির কাছেই আশ্রয় নেয়। অনতি-অতীতে ফিরে গেলেই দেখতে পাই, এ রাজ্যের সর্বত্র একেকটা পাড়া বা পরিবার সম্পর্কে অন্যরা বলত “ওরা পাঁড় কংগ্রেসি” বা “ওরা কট্টর সিপিএম”। কোনও কোনও মানুষ সম্পর্কে বলা হত “প্রথমদিন থেকে তৃণমূলে আছে”। আজকাল আর সেসব বলা যায় না। এক যুগ আগে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেখা গেছে রেজ্জাক মোল্লার মতো “ঘামের গন্ধওলা কমরেড” তৃণমূলে চলে যেতে পারেন। উদয়ন গুহর মতো পারিবারিকভাবে বামপন্থী নেতা দল বদলাতে পারেন। হাত-পা নেড়ে মার্কসবাদ কপচানো, পকেটে মঁ ব্লাঁ পেন আর হাতে আই ওয়াচ পরা সিপিএমের রাজ্যসভার সদস্য ঋতব্রত ব্যানার্জি তৃণমূলের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারেন নিঃসঙ্কোচে। এমনকি প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘদিনের মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের বিশ্বস্ত সৈনিক শঙ্কর ঘোষ বিজেপির নির্ভরযোগ্য ‘কারিয়াকার্তা’ হয়ে উঠতে পারেন। তালিকা দীর্ঘতর করা যেতেই পারে, কিন্তু বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। যেসব মানুষ কখনও বামপন্থীদের ভোট দেন না, দেবেন না— তাঁদেরও কিন্তু বরাবর প্রত্যাশা থাকে, আর যে যা-ই করুক, বামপন্থীরা এমন নীতিহীনতায় জড়াবেন না। সেই বামপন্থীদেরই এসব করতে দেখে ফেলার পর ধনী ব্যবসায়ী কংগ্রেসি বায়রনের কাছে অন্যরকম প্রত্যাশা থাকবেই বা কেন? তিনি তো দেখলাম ঘোরপ্যাঁচহীন সরল মানুষ। বলেছেন, তৃণমূল প্রার্থী করেনি বলে কংগ্রেসে গিয়েছিলেন। এখন যখন বিধায়ক হয়েই গেছেন, তখন আর দলের উপর রাগ করে থাকার দরকার কী?

সাগরদীঘির ভোটাররা রাগ করতে পারেন এই লোকটির বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, অধীর চৌধুরী রাগ করতে পারেন তাঁকে বোকা বানানো হয়েছে বলে। আমরা, বাকি রাজ্যের মানুষ, যদি রাগ করতে চাই তাহলে কয়েকটা কথা একটু স্মরণ করে নেওয়া দরকার।

এ রাজ্যের বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় দিনের পর দিন একাধিক বিধায়ককে বাইরে তৃণমূল, ভিতরে বিজেপি হয়ে থাকতে দিচ্ছেন। এঁদের মধ্যে মুকুল রায় বলে একজন আছেন, যিনি বিজেপির টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে পরে ঘটা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতিতে তৃণমূলে ফিরে এসেছেন বলে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তারপর যখন তাঁকে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিরোধীরা সমালোচনা করেন। কারণ সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী ওই পদটা প্রধান বিরোধী দলকে দেওয়া হয়ে থাকে। এই সমালোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী যুক্তি দেন, মুকুল তো বিজেপিরই বিধায়ক। কদিন আগেও মমতা একথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বিধানসভার বাইরে প্রায় প্রতিদিন গরম গরম মন্তব্য করে বিজেপিকে সংবাদের শিরোনামে রাখেন যে বিরোধী দলনেতা, জনসভার অনুমতি আদায় করতে বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে যাঁর ক্লান্তি নেই, সেই শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি-টুমকি দেননি কখনও। সুতরাং ধরে নিতে হয় মুকুল তৃণমূলেরও, বিজেপিরও। শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদামণি যেমন বলতেন “আমি সতেরও মা, অসতেরও মা।” তা এই ব্যবস্থায় যদি আমাদের রাগ না হয়, খামোকা বায়রনকে ব্রুটাসের সঙ্গে একাসনে বসানোর প্রয়োজন কী?

ওই লোকটি যে জনাদেশকে অসম্মান করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ রাজ্যের এক বড় অংশের মানুষ তো আবার তৃণমূল দল ভাঙালে তাতে জনাদেশের অসম্মান হয় বলে মনে করেন না। ঠিক যেভাবে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এবং সোশাল মিডিয়ায় বিজেপি কোনও রাজ্যের সরকার দল ভাঙিয়ে ভেঙে দিলে অমিত শাহকে চাণক্য বলা হয়, ব্যাপারটাকে মাস্টারস্ট্রোক বলা হয়, সেইভাবে এ রাজ্যেও তো অন্য দলের নেতা তৃণমূলে যোগ দিলে তা গণতন্ত্রের জয় বলেই ঘোষণা করেন বহু মানুষ। বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররাও গদগদ হয়ে বলেন, তৃণমূল দেখিয়ে দিল। বায়রনের দলবদলের পর যেমন বলা হচ্ছে, সাগরদীঘির পরাজয়ের জবাব দিল তৃণমূল। প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, জবাবটা কাকে দিল? ভোটারদের? যে ভোটাররা তৃণমূলকে দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন? তাহলে লড়াইটা কি শাসক দল বনাম ভোটারের? একেই তাহলে এখন গণতন্ত্র বলছি আমরা? পরপর হিমাচল প্রদেশ আর কর্নাটকে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে বিজেপি সম্পর্কে সর্বভারতীয় স্তরে একটা কথা চালু হয়ে গিয়েছিল— ভোটে যে-ই জিতুক, সরকার গড়বে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কি আলাদা কিছু করছে?

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন যে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল তা তো ইদানীং অভিষেকও ঠারেঠোরে স্বীকার করেন। এ বছরে সময় অতিক্রান্ত হলেও পঞ্চায়েত নির্বাচন করানো নিয়ে সরকারের কোনও উৎসাহ নেই। রাজ্যপাল রাজ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করছেন না, সরকারও তা নিয়ে সংঘাতে যাচ্ছে না। অথচ এমনিতে কত বিষয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে কত আকচা-আকচি চলে! ২০২১ সালে যে তৃণমূল নেতাদের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাঁরা বিজেপিতে গিয়ে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন, তাঁদের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর অনতিবিলম্বেই ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছিল। উপরন্তু বাবুল সুপ্রিয়র মতো দাঙ্গাবাজ বিজেপিফেরতকে উপনির্বাচনে প্রার্থী করে মন্ত্রীও বানানো হয়েছে। এগুলো জনাদেশকে সম্মান করার লক্ষণ? এই ধারাতেই তো কংগ্রেসের একমাত্র বিধায়ককে দলে টেনে নেওয়া হল। আবার মঞ্চে বসে অভিষেক জাঁক করে এও বললেন, যে বোতাম টিপলেই কংগ্রেসের চারজন সাংসদকে তৃণমূল নিয়ে নিতে পারে। একের পর এক দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় দল যখন টলমল করছে, দিদির দূত প্রকল্প ঘটা করে ঘোষণা করার পর জনরোষের চেহারা দেখে চুপিসাড়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে, নবজোয়ারে বেরিয়ে নিত্য ল্যাজেগোবরে হতে হচ্ছে— তখনও এভাবে বুক ফুলিয়ে দল ভাঙানোর হুমকি দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে অভিষেক মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নীতি একটা বাতিল পণ্য হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন চাকরি চুরির চাঁইদের শেষ অব্দি কী গতি হয়?

তাঁর ধারণা যথার্থ। বিজেপির বিরুদ্ধে চাট্টি গরম গরম কথা বললেই (এমনকি আরএসএসের বিরুদ্ধেও বলতে হয় না। মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেন আরএসএস খারাপ নয়) সরকারি দলের যাবতীয় অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি, গঙ্গারতি ও মন্দির নির্মাণ সত্ত্বেও বিজেপিকে আটকাতে তাদেরই ভোট দেওয়া আমাদের কর্তব্য— একথা যখন থেকে এ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখনই নীতির ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হয়ে গেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল বিজেপিকে আটকানো, রাজ্যের সরকারের কাজের মূল্যায়ন নয়। তাতে ক্ষতি নেই। গণতন্ত্রে ভোটাররা নিজেদের অ্যাজেন্ডা নিজেরাই তো ঠিক করবেন। কিন্তু আজ দুবছর পরে ভেবে দেখা দরকার, বিজেপিকে আটকানোর উদ্দেশ্যটুকুও সফল হয়েছে কি? বিজেপি তিনজন বিধায়ক নিয়ে এককোণে পড়ে থাকা দল থেকে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে তো বটেই, সরকারবিরোধী ভোটাররা যাতে বিজেপি ছাড়া আর কোনও দলের উপর ভরসা করতে না পারেন তার জন্যে শাসক দল আপ্রাণ চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় পক্ষের কাছে সামান্য একটা উপনির্বাচনে হারও তারা সহ্য করছে না। না হয় মেনে নেওয়া গেল, কংগ্রেস নিজেদের বিধায়ককে ধরে রাখতে পারে না বলে অপদার্থ। সিপিএম আরও অপদার্থ, কারণ তারা আদালতের মুখাপেক্ষী হয়ে আন্দোলন করে— এও না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপিই একমাত্র পদার্থ হিসাবে পড়ে থাক— এমন পরিস্থিতিই কি তৈরি করতে চেয়েছিলাম আমরা? বায়রনের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে চুটকি আর মিম বানানো বা ক্ষোভ প্রকাশ করার চেয়ে নিজেদের এই প্রশ্ন করা বেশি জরুরি। কারণ আবার নির্বাচন আসছে। গণতন্ত্রের ওইটুকু তলানিই তো পড়ে আছে আমাদের জন্যে— একটা ভোট দেওয়ার অধিকার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নয়া বার্তা ছাড়া পরিশ্রমের ফল পাবে না সিপিএম

তৃণমূলকে যত বড় ধাক্কা দেওয়া দরকার, বিজেপিকে রাজ্য রাজনীতিতে যতটা অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া দরকার – তার জন্যে কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কি যথেষ্ট?

গত এক দশকে বাংলার রাজনীতিতে সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দগুলোর যদি একটা তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে প্রথম স্থান দখল করার লড়াইয়ে থাকবে ‘দুর্নীতি’ আর ‘সেটিং’। গত বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে ‘এন আর সি’, ‘সি এ এ’, ‘এন পি আর’ শব্দগুলোর বহুল ব্যবহার সত্ত্বেও মনে হয় না ও দুটোকে টলানো যাবে। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর সেই ২০১৩ সালে সারদা কেলেঙ্কারি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় মাপের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা শুরু হয়েছিল। তারপর সামনে আসে নারদ স্টিং অপারেশন, অতঃপর প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা কেলেঙ্কারি, গরু পাচার, অবৈধ বালি খাদান, কয়লা পাচার এবং সর্বোপরি নিয়োগ কেলেঙ্কারি। একের পর এক অভিযোগ উঠেই চলেছে। এগুলো ছাড়াও বিরোধীরা বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন ত্রিফলা আলো নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে, কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাইকেল নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে, উমপুনের ত্রাণের চাল ও ত্রিপল বিতরণে দুর্নীতি হয়েছে। যদিও এই কটা অভিযোগ আইনি পথে খুব বেশি এগোয়নি, জনমনেও তেমন প্রভাব ফেলতে পেরেছে বলে সাধারণ মানুষের কথাবার্তা থেকে মনে হয় না। এর পাশাপাশি বামপন্থীরা এবং কংগ্রেস বারবার দাবি করে এসেছে তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে ‘সেটিং’, অর্থাৎ গোপন আঁতাত, আছে। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের দুর্নীতির তদন্তগুলো শেষমেশ কোথাও পৌঁছয় না। অন্যদিকে ২০১১ পরবর্তী সময়ে যখনই তৃণমূল নিজেকে কোণঠাসা মনে করেছে, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনো বলেছেন সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেপি একসাথে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। কখনো বা বলেছেন সিপিএম বিজেপির হাত শক্ত করছে। এই করতে করতে বাংলার রাজনৈতিক বয়ানে যুক্ত হয়েছে দুটো শব্দ – বিজেমূল আর বিজেপিয়েম।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমের নিচের তলা সচেতনভাবে বিজেপিতে ভোট নিয়ে গেছে বলে জোরদার অভিযোগ উঠেছিল। তাতে ইন্ধন জুগিয়েছিল জেলাস্তরের কিছু নেতার প্রকাশ্য উক্তি। আবার ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে যেভাবে “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” অজুহাত দিয়ে দলে দলে তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তার ফলে তৃণমূল আর বিজেপি একই দল – এই জাতীয় অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনের পর আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার মত করে বহু নেতা তৃণমূলে ফিরে আসেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম অবশ্যই মুকুল রায়, যিনি বিধানসভার খাতায় এখনো বিজেপি। অথচ রীতিমত সাংবাদিক সম্মেলন করে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর ভাইপোর উপস্থিতিতে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। এখন আবার তিনি তৃণমূল, না বিজেপি, নাকি অসুস্থ – তা নিয়ে তরজা চলছে। ফলে বিজেমূল তত্ত্বও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না আর।

কিন্তু সন্দেহ নেই, এই মুহূর্তে সেটিংকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে দুর্নীতি। লোকাল ট্রেনের ভেন্ডর কামরার আরোহী সবজি বা ছানার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মফস্বলে নতুন গজিয়ে ওঠা শীততাপনিয়ন্ত্রিত রিটেল চেনে বাজার করা গৃহবধূ – সকলেরই আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। রাজ্য সরকারের পক্ষে যা বিশেষ উদ্বেগের, তা হল এই ইস্যু নিয়ে শাসক দল সম্পর্কে নরম মন্তব্য করতে প্রায় কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। সারদা কেলেঙ্কারি এ রাজ্যের মধ্যবিত্তকে প্রায় ছুঁতেই পারেনি, কারণ আমানতকারীরা অধিকাংশই ছিলেন গরিব মানুষ। তার উপর তখন ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের উপর তিতিবিরক্ত হয়ে নতুন শক্তিকে ক্ষমতায় আনা মানুষের তৃণমূল সম্পর্কে খানিকটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। নারদ কেলেঙ্কারির ঢেউ তো আরও অল্পেই ভেঙে গিয়েছিল। ততদিনে মন্ত্রীসান্ত্রীরা একটু-আধটু ঘুষ নেবেন – এ কথা পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবনে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। তাছাড়া যে টাকা ঘুষ হিসাবে দেওয়া হয়েছে তা আমার-আপনার টাকা কিনা তাও সন্দেহাতীত নয়। ফলে ও নিয়ে বেশি মানুষ ভাবেননি। কিন্তু এবার তাহলে জনমানসে এত অসন্তোষ কেন?

কারণ নানাবিধ, কিন্তু একটা কারণ অবশ্যই বিরোধী দলগুলোর সক্রিয়তার তফাত। ২০১১ সাল থেকে বছর খানেক আগে পর্যন্তও বিরোধী হিসাবে সিপিএম অবিশ্বাস্য নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়েছে। নারদের ক্যামেরায় তৃণমূলের মন্ত্রীদের ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পরেও রাজ্যটা যেমন চলেছিল তেমনই চলেছে। বামফ্রন্টের মন্ত্রীরা এরকম কাণ্ডে জড়ালে আর বিরোধী নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলে সেদিন রাত থেকেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিট অবরুদ্ধ হয়ে যেত – একথা হলফ করে বলা যায়। তৎকালীন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র ও তাঁর দলবল কিন্তু আলিমুদ্দিনে বসে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করেননি। মাঝেমধ্যে কলকাতার রাজপথে এক-আধটা মিছিল টিভির পর্দায় লাল পতাকার উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, সরকারের উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিগত রাজ্য সম্মেলনে নতুন রাজ্য কমিটি নির্মিত হওয়ার পর এবং মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির অনেকখানি পরিবর্তন ঘটেছে। কেবল কলকাতা নয়, জেলা সদরগুলোতে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং আরও নানা দাবি নিয়ে বামেদের সরকারি অফিস অবরোধ করতে বা সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি করতে দেখা যাচ্ছে। যে লড়াকু মেজাজের জন্য বামপন্থী দলগুলোর কর্মীদের সুনাম বা দুর্নাম ছিল বরাবর, সেই মেজাজ আবার দেখা যাচ্ছে। কেবল নবান্ন নয়, উত্তরকন্যা অভিযান হচ্ছে নিয়মিত। কখনো ছাত্র-যুব সংগঠনের উদ্যোগে, কখনো বা শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে। সেখানে ব্যারিকেড ভেঙে ফেলা হচ্ছে, আতঙ্কিত প্রশাসন জলকামান চালিয়ে দিচ্ছে। কলকাতায় চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সরকারের সোজা পথ, বাঁকা পথের নানা কৌশল সত্ত্বেও কিছুতেই ভাঙছে না। উল্টে ডিএ নিয়ে আন্দোলন করতে নেমে পড়েছেন শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং অন্য রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। একসঙ্গে এতগুলো আন্দোলনের প্রভাব পৃথিবীর যে কোনো দেশে যে কোনো কালে সরকারকে চাপে ফেলে। এখানেও ফেলেছে। মমতা সরকারের গোদের উপর বিষফোঁড়া আদালত।

দল এবং সরকার যে ঘূর্ণির মধ্যে পড়েছে তা আর কেউ মানুক না মানুক, পোড়খাওয়া নেত্রী মমতা নিশ্চয়ই মানেন। তাই একের পর এক জনসংযোগ কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, রাজ্য নির্বাচন কমিশন পঞ্চায়েত নির্বাচনের তারিখ নিয়েও উচ্চবাচ্য করছে না। যেসব এলাকায় পাঁচ বছর মানুষ খানাখন্দ পেরিয়ে যাতায়াত করেছেন, সেখানে এক বেলার মধ্যে নতুন রাস্তা তৈরি করা চলছে। মানুষের অসন্তোষের তীব্রতা টের পাওয়া যাচ্ছে এই দিয়েই যে তৃণমূল সাংসদ, বিধায়করা পর্যন্ত দিদির দূত হয়ে গিয়ে কোথাও তাড়া খেয়েছেন, কোথাও ভোটাররা মুখের উপর বলে দিয়েছেন ভোট দেওয়া হবে না। তাই এখন অভিষেক নতুন নাম দিয়ে ফের জনসংযোগের চেষ্টায় নেমেছেন।

মানুষের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হল, সেই ক্ষোভকে নালা কেটে ব্যালট বাক্সে বইয়ে দেওয়ার মত পরিশ্রম কি বামেরা করছেন? কোনো সন্দেহ নেই, রামনবমীর অজুহাতে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরি করে বিজেপি গত এক মাসে আবার এক ধরনের বাইনারি তৈরি করতে সফল হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। সে কাজে তাদের সাহায্য করছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। ঈদ উদযাপনে গিয়ে এন আর সি, সি এ এ নিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন সংখ্যালঘু মানুষকে। সাগরদীঘির হার এবং নওশাদ সিদ্দিকীর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সামলাতে এবং একের পর এক তৃণমূল নেতার দুর্নীতির কেসে ফেঁসে যাওয়ার অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচতে হলে বিজেপি যে বামেদের চেয়ে প্রার্থিত প্রতিপক্ষ – তা মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কথা হল, এই কৌশল ভোঁতা করে দিতে বামেরা কী করতে পারেন? “বিজেপি-তৃণমূলের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে ভুলবেন না। দুর্নীতির মাধ্যমে রাজ্যটাকে কীভাবে ফোঁপরা করে দেওয়া হয়েছে খেয়াল রাখুন” – এই আবেদন আজকের বহুধাবিভক্ত ভারতে রাজনৈতিক বার্তা হিসাবে কি যথেষ্ট কার্যকরী? পশ্চিমবঙ্গ তো ভারতের বাইরে নয়। গোটা দেশে যা চলছে, তাতে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের দুর্নীতির ইস্যুতে লড়ে কি সুবিধা করতে পারবেন বামেরা? তৃণমূলকে যত বড় ধাক্কা দেওয়া দরকার, বিজেপিকে রাজ্য রাজনীতিতে যতটা অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া দরকার – তার জন্যে কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কি যথেষ্ট? নাকি মানুষের পালস বুঝতে আবার ভুল হচ্ছে সিপিএম তথা বাম নেতৃত্বের?

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

সাম্প্রদায়িক বাইনারি তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জমির সবটা দখলে রাখতে চাইছে তৃণমূল আর বিজেপি। তা ভাঙতে বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক বার্তা কি দিতে পারবেন সিপিএম ও তার শরিকরা? এখন পর্যন্ত দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় মিছিল করা ছাড়া তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। শিগগির নতুন কোনো বার্তা দিতে না পারলে গত এক-দেড় বছরের পরিশ্রম কিন্তু জলে যেতে পারে। বুথ স্তরে মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে তৃণমূলের সঙ্গে লড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক খামতি তো আছেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত