আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

বাবুল সুপ্রিয় ও শত্রুঘ্ন সিনহা
(ছবি ইন্টারনেট থেকে)

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিক, বামফ্রন্ট সরকার মধ্যগগনে। আমার এক পিসতুতো দিদির ছেলে একবার কোনো ক্লাসে উঠলে সেখানেই ঘাঁটি গেড়ে ফেলছে। তা নিয়ে তার বাবা, মা, মামা সকলেই চিন্তিত। আমার সিপিএম কর্মী বাবা সেই দিদির মামা হন, তার উপর পেশায় শিক্ষক। ফলে সে ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে পরামর্শ চাইল। কোনো জবাব দেওয়ার আগেই দিদির ভাইটি আমার বাবাকে বলল “দোষ তো আমার ভাগনার নয়, দোষ তো তোদের (বয়সের তফাত কম হওয়ায় ‘তুই’ সম্বোধনই চালু ছিল)। তোরা মুড়ি মিছরি এক দর কইরা দিছস। এমন ব্যবস্থা করছস যে রিকশাআলার পোলায় আমার ভাগনার পাশে বইস্যা ক্লাস করে। তাতে তার তো কোনো উন্নতি হয় না, কারণ তার ল্যাখাপড়ার কালচার নাই। উল্টা আমাদের ভদ্দরলোকের পোলাগুলার সব্বোনাশ হয়্যা যাইতাছে।” আমার বাবা ভাগ্নে-ভাগ্নী বলতে অজ্ঞান ছিলেন, তাই কোনো কড়া উত্তর দেননি। হেসে বলেছিলেন “অ, নাচতে শেখো নাই বইলা উঠানের দোষ দিতাছ।” বাড়ি ফিরে আমাকে বলেছিলেন “এদের কীরকম মানসিকতা দেখেছিস? রিকশাওলার ছেলে ওর ভাগ্নের সাথে এক ক্লাসে পড়ছে বলে ওর গায়ে ফোসকা পড়ছে। তার জন্যে নাকি ওর ভাগ্নের পড়াশোনা হচ্ছে না।”

এর কৃতিত্ব বা দোষ কতটা বামফ্রন্ট সরকারের জানি না। দেশের অনেক জায়গাতেই সেইসময় পর্যন্ত রিকশাচালকের ছেলেমেয়ে আর চাকুরিজীবী মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়ে এক স্কুলেই পড়ত, একসাথে খেলাধুলোও করত। একই পাড়ায় বিত্তশালীর প্রাসাদপ্রমাণ বাগানওলা বাড়ি থাকত, মধ্যবিত্তের একতলা বাড়ি থাকত, নিম্নবিত্তের টালির চালের বাড়িও থাকত। সেসব বাড়ির মধ্যে বাটি চালাচালির সম্পর্কও থাকত কখনো কখনো। এ কোনো সোনালি অতীতের আষাঢ়ে গপ্প নয়। তখনো বিলক্ষণ শ্রেণি বিভাজন ছিল, তিনতলা বাড়ির মেয়ের সাথে টালির বাড়ির ছেলের প্রেম হত না সিনেমার মত, বিয়েও নয়। কিন্তু এ বাড়ির দাদুর শ্রাদ্ধে ও বাড়ি থেকে চিঁড়ে-দই খাওয়ার লোক থাকত, ও বাড়ির ছেলের বিয়েতে এ বাড়ি থেকে অন্তত একজনের নেমন্তন্ন থাকত। ১৯৯১ সালের পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে বদলাতে এখন সব অলীক। এখন হয় ফ্ল্যাট, নয় ঝুপড়ি। হয় গেটেড কমিউনিটি, নয় বস্তি। যেখানে পাড়া অবশিষ্ট আছে, সেখানেও বাবা-মা কেবল নিজেদের দরের পরিবারের বাচ্চাদের সাথেই মেলামেশা করতে দেন নিজের ছেলেমেয়েকে। চাকুরিজীবীর ছেলের স্কুল আর রিকশাওলার ছেলের স্কুল আলাদা হবে — আমার পিসতুতো দাদার এই ফ্যান্টাসি এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। রিকশাচালক, বাড়ির কাজের দিদি, জনমজুরের ছেলেমেয়েরা পড়ছে টিমটিমে সরকারপোষিত স্কুলে, কারণ তাদের বাবা-মায়েদের ওটুকুই সাধ্য। আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ছে ঝাঁ চকচকে প্রাইভেট স্কুলে। অর্থাৎ মনমোহনী অর্থনীতির তিরিশ বছরে অভূতপূর্ব বৈচিত্র্যহীন ঐক্য তৈরি হয়েছে এ দেশে। ইংরেজিতে যাকে ঘেটো বলে, গোটা দেশটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমন ঘেটোর সমাহার।

কেন এসব কথা লিখলাম? কারণ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের দেশ ভারতবর্ষ বিপন্ন বলে আমরা সকলেই খুব চিন্তিত। একটা করে নির্বাচনের ফল বেরোয়, বিজেপি জেতে, আর আমরা নানা রঙের বিজেপিবিরোধীরা, হতাশ হয়ে বা ক্রুদ্ধ হয়ে বলি “এ দেশটার কিস্যু হবে না। লোকে কেবল হিন্দু-মুসলমান বোঝে। আর কোনো ইস্যু নিয়ে মাথা ঘামায় না।” এত বড় দেশে প্রত্যেক নির্বাচনেরই যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে সেগুলোর কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, ধর্মীয় বিভাজনকে প্রধান ইস্যু করে তোলার চেষ্টা নিঃসন্দেহে অনেকটাই সফল হয়েছে। নির্বাচনগুলোর ফলাফলে তার প্রভাব উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। কিন্তু সে বিভাজন দূর করার পথ খোঁজার সময়ে আমরা ভেবে দেখছি না, ধর্মীয় বিভাজনের ইমারত দাঁড়িয়ে আছে অন্য গভীরতর বিভাজনের উপর। আমি আপনার থেকে আলাদা। আমি আপনার চেয়ে বেশি রোজগার করি, আপনার চেয়ে দামি পোশাক পরি, আমার গাড়ি আছে আপনার নেই, অতএব আপনার সাথে আমার মেশা উচিত নয়। আমাকে মিশতে হবে আমার মত লোকেদের সাথে। এই ব্যাপারটা যদি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে আপনি আমার জানাশোনার বাইরে চলে যাবেন। ক্রমশ আপনার ভালমন্দে আগ্রহ হারাব, তারপর একসময় স্থির বিশ্বাস হবে যে আপনি বাঁচলেন কি মরলেন তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আমি কেবল আমার মত লোকেদের সাথে মিশি, আপনি মেশেন আপনার মত লোকেদের সাথে — সমাজ যে এমনভাবে বিভক্ত হওয়াই উচিত, এই ধারণা একবার মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া গেলে অন্য যে কোনোরকম বিভাজন তৈরি করা জলভাত। যে অপর, সে অপ্রয়োজনীয়, এমনকি খারাপ — আগে একথা প্রতিষ্ঠা করুন। তারপর অপরের সংজ্ঞাটা দরকার মত বদলাতে থাকুন। সোজা হিসাব।

আমাদের দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় (নাকি সর্বত্রই?) এমনিতেই এক ধরনের অপরায়নের ভিত্তিতে পৃথকীকরণ কয়েক হাজার বছর ধরে চলে আসছে — বর্ণবাদ। তার সাথে বিশ্বায়নের যুগে যোগ হয়েছে শ্রেণিভিত্তিক পৃথকীকরণ, যা এতক্ষণ ব্যাখ্যা করলাম। এই দো-ফসলি জমিতে ধর্মীয় বিভাজনের ফসল ফলানো মোটেই কঠিন নয়। যে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য নিয়ে আমাদের গুমোর, সেই বৈচিত্র্য স্থানীয় স্তরে হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তৈরি জমিতেই বীজ বুনে ফসল তুলেছে। ভেবে দেখুন, ভারতের বাজার খুলে দেওয়া হল ১৯৯১ সালে, আমরা ‘আপওয়ার্ডলি মোবাইল’ হতে শিখে গেলাম। আর ১৯৮৯ সাল থেকে রক্তক্ষয়ী রথযাত্রার মাধ্যমে লালকৃষ্ণ আদবানি সঙ্ঘের যে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা সারা ভারতে ছড়িয়ে দিতে নেমেছিলেন, তার প্রথম বড়সড় সাফল্য এল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্যে দিয়ে। ভারতে বহুজাতিকের পায়ের তলার মাটি যত মজবুত হয়েছে, তত মজবুত হয়েছে আরএসএসের মাটি। ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া আরএসএস বরাবর সাম্প্রদায়িক মতাদর্শে অবিচল থেকে কাজ করে গেছে। কিন্তু দেশভাগ, গান্ধীহত্যার মত ঘটনার পরেও প্রান্তিক শক্তি হয়েই থাকতে হয়েছিল। অথচ কম্পিউটারের ভারতে, উদারীকরণের ভারতে কিনা এই প্রাচীনপন্থী, ধর্মান্ধ সংগঠন ক্রমশ নিজের শক্তি বাড়িয়ে আজকের অপরাজেয় স্থানে পৌঁছতে পারল। একথা বললে ভুল হবে না, যে ভোগ্যপণ্যের বৈচিত্র্য আর বেসরকারিকরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে ও সমাজে আরএসএসের প্রভাব বেড়েছে। অটলবিহারী বাজপেয়ী আর মোদীর সরকারের রাজনীতি যতটা রক্ষণশীল, তাঁদের অর্থনীতি ততই উদারপন্থী। তথাকথিত খোলা হাওয়ার খোঁজ দিয়েছিল কংগ্রেস, সে হাওয়ায় পাল তুলে দেশকে মাঝসমুদ্রে নিয়ে গেছে আরএসএস। কারণ নব্বইয়ের দশক থেকে যে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি সারা পৃথিবীতে চালু হয়েছে নানা চেহারায়, তাতে যে বৈষম্য বাড়ে তা এখন বিশ্বব্যাঙ্কও স্বীকার করে। আর আগেই বলেছি, মূল বৈষম্যটা বাড়লে আর সবরকম বৈষম্য তৈরি করা যায়। অতএব ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করতে হলে ওটাই পথ।

বারবার আরএসএস কেন বলছি? বিজেপি বলছি না কেন? কারণ হিন্দুরাষ্ট্র বিজেপির এজেন্ডা নয়। বিজেপির কোনো দায়িত্বশীল নেতা ওই শব্দটি পারতপক্ষে উচ্চারণ করেন না, কাগজে কলমে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি সহস্রবার দেওয়া হলেও, হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় না। ভীষণদর্শন সাধুসন্ন্যাসী বা হিন্দি বলয়ের কোনো কোনো নেতা ২০২৩ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে বলে কয়েকবার ঘোষণা করেছেন বটে, কিন্তু মোদী বা অমিত শাহের মত কেউ কখনো ওসব বলেন না। বুদ্ধিমান সাংবাদিক, বিশ্লেষকরা যারা ওসব বলে তাদের “ফ্রিঞ্জ এলিমেন্ট” (প্রান্তিক ব্যক্তি) বলে দাগিয়ে দেন। হিন্দি ভাষায় জনপ্রিয় প্রবাদ হল “হাথি কে দাঁত। খানে কে ঔর, দিখানে কে ঔর।” অর্থাৎ হাতি যে দাঁত দিয়ে খায়, সে দাঁত দেখায় না। আরএসএস অত্যন্ত বলশালী হাতি বৈ তো নয়। বিজেপিবিরোধী দল, বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক, আমরা চুনোপুঁটিরা — সকলেই বিস্তর আলাপ-আলোচনা করছি, ফন্দি আঁটছি, বিজেপিকে কী করে নির্বাচনে হারানো যায় তা নিয়ে। আর অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করছি, বিচার বিভাগ থেকে সংবাদমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন থেকে পুলিসবাহিনী — সবই “ওদের” লোকে ভর্তি। এই “ওরা” যে বিজেপি নয়, আরএসএস, তা বুঝতে পারলে এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকত না।

আরএসএস নিজেকে বলে সামাজিক সংগঠন, অর্থাৎ বর্তমান ভারতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা শুধু দলীয় রাজনীতির নয়, স্রেফ নির্বাচনী রাজনীতির তো নয়ই। লড়াইটা সামাজিক। আরএসএস নিজে সেভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বিরুদ্ধে একশো বছর ধরে লড়ে এসেছে, দলীয় রাজনীতিকে সেই লড়াইয়ের একটা ফ্রন্টে পরিণত করেছে। আর আমরা ভাবছি, যেনতেনপ্রকারেণ আরএসএসের রাজনৈতিক শাখাকে ভোটে হারিয়ে দিলেই ঝামেলা চুকে যাবে।

আরএসএসের সমান বয়সী একটি রাজনৈতিক দল ছিল ভারতে — ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সে দল ভাঙতে ভাঙতে শতধা বিভক্ত। প্রাচীন সংগঠনে এরকম ভাঙাগড়া হয়েই থাকে। কিন্তু মজার কথা, আরএসএসের মধ্যেও নানা দ্বিধা দ্বন্দ্ব আছে। তবু তারা এখনো ‘সঙ্ঘ পরিবার’। সর্বত্র বজরং দলের সাথে বিজেপির মতে মেলে না; বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রবীণ তোগাড়িয়াও প্রকাশ্যে মোদীর নিন্দা করেছেন। মাঝেমধ্যে খোদ আরএসএস বেসুরো গায়। অথচ মূল লক্ষ্য থেকে এরা কেউ কখনো সরে না। মুসলমান বিদ্বেষে সবাই এককাট্টা, রামমন্দির নিয়ে সবাই এককাট্টা। বিরোধীদের আঁচড়াতে, কামড়াতে, খুন করতে সবাই সমান উদ্যোগী। কমিউনিস্টরা কে বেশি কমিউনিস্ট তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে প্রচুর শক্তিক্ষয় করেন, করতে করতে শুধু ল্যাজের ডগা পড়ে আছে। সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যদের ওসব বদভ্যাস নেই।

আরও যা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে রাখতে, হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন সার্থক করতে আরএসএস শুধু বিজেপির উপর দায়িত্ব দিয়ে বসে নেই। তারা জানে, সমস্ত প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত হওয়া সত্ত্বেও, ইলেকটোরাল বন্ডের কল্যাণে টাকার অঢেল জোগান থাকা সত্ত্বেও এত বড় দেশে সব নির্বাচন জেতা অসম্ভব। বিজেপি হেরে গেলেই হিন্দুরাষ্ট্র ফসকে যাবে? তা হতে দেওয়া যায় না। তাই “সেটিং” থাক আর না-ই থাক, অন্তত আরএসএসের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নয়, শক্তিশালী বিরোধী হিসাবে তেমন কিছু দলের উপস্থিতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কীভাবে করা হল তা হয়ত অতিদূর ভবিষ্যতে কোনো পরিশ্রমী গবেষক উদ্ঘাটন করবেন, কিন্তু আপাতত দেখাই যাচ্ছে, যিনি রথযাত্রায় আদবানির পাশে ছিলেন, আনন্দ পট্টবর্ধনের বিখ্যাত তথ্যচিত্র রাম কে নাম-এ যাঁকে আদবানির মঞ্চে মাইক হাতে দেখা যায়, সেই শত্রুঘ্ন সিনহা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দল তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। যে বাবুল সুপ্রিয় দাঙ্গায় যুক্ত ছিলেন বলে বহু মানুষ অভিযোগ করেন, সোশাল মিডিয়ায় বাঙালি মুসলমানদের বিদেশি বলেছেন একাধিকবার, তিনি বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসে প্রথম এগারোয় জায়গা পাচ্ছেন। প্রার্থী হচ্ছেন এমন আসনে, যেখানে সংখ্যালঘু মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট। অবশ্য তৃণমূলের সর্বময় কর্ত্রী বহু আগেই রাখঢাক না করে বলেছিলেন তাঁর সমস্যা বিজেপিকে নিয়ে, আরএসএসকে নিয়ে নয়। গান্ধীজির বাঁদরদের মত মুখ, চোখ, কান বন্ধ করে থাকা পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিপ্লবী মানুষ সে কথা শুনতে বা দেখতে পাননি, তাঁর দল সম্পর্কে মানুষকে সাবধানও করেননি। নিশ্চয়ই সে কারণেই মমতা আত্মবিশ্বাসী, যে বালিগঞ্জ কেন্দ্রের সংখ্যালঘু মানুষ বাবুলকে ভোট দিন আর না-ই দিন, ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা নিশ্চয়ই দেবেন। আসানসোলের সংখ্যালঘু মানুষ শত্রুঘ্নকে ভোট না দিলেও ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা নিশ্চয়ই দেবেন। কারণ বিজেপিকে ভোট না দিলেই যে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত বেঁচে যাবে — এ বিশ্বাস বহু মানুষের। তাঁরা আরএসএসকে দেখতে পান না। যাঁদের দেখিয়ে দেওয়া দায়িত্ব তাঁরা দেখতে দেন না।

শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। বিলীয়মান কংগ্রেসের জায়গা নেবে বলে যে দলটার উপর গত কয়েকদিন বহু বিজেপিবিরোধী মানুষ ভরসা করতে শুরু করেছেন দেখছি, সেই আম আদমি পার্টি দুটোর জায়গায় দশটা রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও আরএসএসের ক্ষতি নেই। বহু কমিউনিস্টও দেখছি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিল্লি সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম দেখে আপ্লুত। মনমোহনী অর্থনীতির আমলে বামপন্থীদেরও যে নিজেদের রাজনীতি গুলিয়ে গেছে তার এর চেয়ে ভাল প্রমাণ সম্ভবত নেই। তাঁরা ভেবেও দেখছেন না, কেজরিওয়াল যা করছেন তা আসলে রাজীব গান্ধীর আমলের কংগ্রেসসুলভ কাজ। তফাতের মধ্যে কংগ্রেসের মত দুর্নীতি আপ দলে নেই। কেজরিওয়াল একাধিকবার বলেছেন, তিনি বামপন্থী নন, দক্ষিণপন্থীও নন। কার্যক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তিনি হয় কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেন না, নয় আরএসএসের পছন্দের অবস্থান নেন। দিল্লি দাঙ্গায় তাঁর দল কোনো সক্রিয়তা দেখায়নি। উপরন্তু নিজের দলের মুসলমান কাউন্সিলর তাহির হুসেনের পাশেও দাঁড়ায়নি। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার সমর্থন করেছিল। অর্থাৎ আপ আপনাকে ভাল রাস্তা দিতে পারে, ভাল স্কুল ও হাসপাতাল দিতে পারে, শস্তায় জল ও বিদ্যুৎ দিতে পারে। তবে তাদের শাসিত রাজ্যে গণহত্যা হয়ে গেলে তারা মাথা ঘামাবে না। অর্থাৎ আপ হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার পথে বাধা নয়।

যেমন বাধা নন ওড়িশার নবীন পট্টনায়ক। মমতা, কেজরিওয়াল, নবীন — এঁরা কেবল ‘গোদি মিডিয়া’ নয়, ভারতের সব মিডিয়ার মতেই দারুণ ভাল। কারণ এঁরা “গুড গভর্ন্যান্স” (সুশাসন) নামক একটি জিনিস সরবরাহ করেন। সেটি দুলালের তালমিছরির মত এক অরাজনৈতিক অমৃত। এঁদের দেখিয়ে মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে — সুশাসন মানে হল রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল ও ভর্তুকি। কর্মসংস্থান নয়, আইনশৃঙ্খলা নয়, জাতীয় রাজনীতির ইস্যুতে সঠিক অবস্থান নেওয়াও নয়। এই মানদণ্ড মেনে নিতে অসুবিধা না থাকলে কিন্তু মানুষ যোগী আদিত্যনাথকে আবার ভোট দিল বলে রাগ করা চলে না। কারণ রাস্তাঘাট নিয়ে ওই রাজ্যের মানুষের বিশেষ অভিযোগ নেই। স্কুল, হাসপাতাল না দিতে পারলেও উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার বিনামূল্যে রেশন দিয়েছে। কোভিডে মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণও দিয়েছে।

ভারতে একজন বিরোধী নেতা আছেন, যিনি মানেন লড়াইটা আসলে সামাজিক এবং বলেন যে লড়াই আসলে আরএসএসের বিরুদ্ধে। তিনি রাহুল গান্ধী। কিন্তু সমস্যা হল, তিনি সোশাল মিডিয়ার নেতা। ইদানীং দিব্য বাগ্মী হয়ে উঠেছেন, কিন্তু রাস্তায় নামেন কালেভদ্রে। ইউটিউব, ফেসবুক আর টুইটারে লাইকের মূল্য যে রাজনীতির ময়দানে শূন্য — তা তিনি বোঝেন বলে মনে হয় না। বহু বিজেপিবিরোধীর একটি পাহাড়প্রমাণ ভ্রান্তি আছে। তা হল, বিজেপি শাসনের ভিত্তি সোশাল মিডিয়া। একশো বছর ধরে আরএসএসের তৃণমূল স্তরে গিয়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজ করার ব্যাপারে কোনো ধারণা না থাকাই এই ভ্রান্তির মূলে। সম্ভবত রাহুলও এতেই ভোগেন। গত কয়েক বছরে রাহুলের কথাবার্তা থেকে বোধ হয়, তিনি বোঝেন মৌলিক বিভাজনগুলোর সাথে লড়াই না করে উপরিতলের ধর্মীয় বিভাজন দূর করা যাবে না। আরএসএসকে হারানোও যাবে না। কিন্তু সে ক্ষমতা তাঁর তো নেই বটেই, তাঁর দলেরও নেই। প্রাক-স্বাধীনতা যুগের কংগ্রেস বা লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সময়কার কংগ্রেসেও দেশের ধনীদের যথেষ্ট উপস্থিতি থাকলেও সাধারণ, গরীব মানুষের সাথে কিছু সংযোগ ছিল। ইন্দিরার সময় থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়েছে, যার শীর্ষবিন্দু ছিল জরুরি অবস্থা। কিন্তু সে আমলেও অর্থনৈতিকভাবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের রাস্তায় থাকার প্রচেষ্টা ছিল। রাজীবের সময় থেকে তা-ও কমতে শুরু করে, নরসিমা-মনমোহনে এসে কংগ্রেসের সর্বার্থে উচ্চকোটির দক্ষিণপন্থী পার্টি হওয়া শুরু হয়। আবার নরসিমার এক সময়কার মিডিয়া উপদেষ্টা পিভিআরকে প্রসাদ লিখেছেন, নরসিমার নাকি ইচ্ছে ছিল বিজেপির আগেই অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করা। সেই উদারপন্থী অর্থনীতি আর হিন্দুত্বের সহাবস্থানের গল্প। এমনি এমনি তো তাঁকে ভারতের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বলেন না কেউ কেউ। কংগ্রেস এখনো সেই পথেই চলেছে, রাহুল একা চাকা উল্টোদিকে ঘোরাবেন কী করে?

তাহলে আরএসএসের বিরুদ্ধে সামাজিক লড়াই লড়বে কারা? লালুপ্রসাদ, মুলায়ম সিং, মায়াবতীদের রাজনীতি নির্বাচনী লড়াইয়ে আর ফল দিচ্ছে না মানে তো এই নয়, যে দেশের নিম্নবর্গীয় মানুষ এখন খুব ভাল আছেন। জাতপাতের বৈষম্য বরং গভীরতর হয়েছে, শ্রেণিবৈষম্যের কথা আগেই বলেছি, আর ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য তো ভয়াবহ স্তরে পৌঁছেছে। এইসব বৈষম্যের বিরুদ্ধে একযোগে লড়ার নতুন রাজনীতি করবে কারা?

কেবল ভোটের পাটিগণিতে কিন্তু এ আঁধার থেকে মুক্তির পথ পাওয়া যাবে না।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: