যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়

আমি হিন্দু। কিন্তু আমি আজহারের ব্যাটিং দারুণ ভালবাসতাম। ও ফিক্সিং করেছে শুনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। মহম্মদ রফি আমার খুব ভাল লাগে, অনেকসময় কিশোরের চেয়েও বেশি। বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। আমার অনেক মুসলমান বন্ধু আছে। অতএব প্রমাণিত হল যে আমি সাম্প্রদায়িক নই। সুতরাং আমি একথা বলতেই পারি যে আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকে সব রাজনৈতিক দলই সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছে। সবেতেই ওদের বেশি সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, ওদের দোষগুলো সব ঢেকে রাখা হয়। এখনো ওরা যা ইচ্ছে মারদাঙ্গা করে, তাতে দোষ হয় না। মিডিয়া পর্যন্ত ওদের দোষ চেপে দেয়।

উপর্যুক্ত কথাগুলো যদি আপনার মনের কথা হয় তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি মোটেই অসাম্প্রদায়িক নন। বরং আপনি যুক্তি বা তথ্যের ধার না ধারা একজন মানুষ যিনি আবেগ দিয়ে সবকিছু বিচার করেন। আর্থসামাজিক মানদন্ডগুলোর প্রায় সবকটাতে মুসলমান সম্প্রদায় দেশের সবথেকে পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়। সরকারী চাকরিতেও। আমি বলছি না। ভারতের একমাত্র প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ পার্টির মন্ত্রী সংসদে বলেছেন। এই দেখুন https://www.google.co.in/…/muslim-working-proportion…/lite/…

এই যখন ঘটনা তখন সংখ্যালঘু তোষণটা হল কখন আর তার সুবিধাটা পেল কে?
এই যে বলছেন ওরা মারদাঙ্গা করলে কোন দোষ হয় না সেই নিয়েও বলা যাক তাহলে। ২০০১ এর জনগণনা অনুযায়ী আমাদের জনসংখ্যার ১৩% মুসলমান অথচ ঐসময়ে বিভিন্ন জেলে বন্দী ছিল যারা তাদের ২২% মুসলমান। নিজেই পড়ে দেখুন http://m.timesofindia.com/…/Muslim…/articleshow/45253329.cms

যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা আলাদা করে বলেন তাহলে বলি ভারতবর্ষে ঐ অপরাধে কঠোর শাস্তি কারোরই হয় না। উল্টে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোক হলে নায়ক হয়ে যাওয়া যায়, মন্ত্রীও হওয়া যায়। বলুন তো বাল ঠাকরে শিয়া না সুন্নি? বাবু বজরংগি কি মুসলমান? মায়া কোদনানি? জগদীশ টাইটলার? সজ্জন কুমার? লালকৃষ্ণ আদবানি? উমা ভারতী?

এবার আসুন মিডিয়ার কথায়। প্রথমত মিডিয়া কোন একটি সংস্থা নয়। প্রত্যেক মিডিয়া হাউসের নিজস্ব মতামত, কার্যপদ্ধতি, স্বার্থ আছে। সকলেই সেই অনুযায়ী খবর পরিবেশন করে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে সেটাকেই বোঝায়। ফলে খবরের সত্যতা যাচাই না করে যা ইচ্ছে লিখে, দেখিয়ে বাজার গরম করে এমন কাগজ এবং চ্যানেল যেমন আছে তেমনি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমও আছে। ভারতীয় সাংবাদিকতার যে অবনমন হয়েছে তা নিয়ে আজ কোন ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। তবু এখনো প্রায় সব কাগজ বা টিভি চ্যানেলই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কয়েকটা নিয়ম মেনে চলে। যেমন কোন সম্প্রদায়ের লোক কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ করেছে তা উল্লেখ না করা, কাদের বেশি ক্ষয়ক্ষতি, কাদের কম এসব আলোচনা না করা, সর্বোপরি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পরিস্থিতি যতক্ষণ না প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে ততক্ষণ তেমনভাবে রিপোর্টই না করা। কারণ দেখা গেছে তাতে উত্তেজনা নতুন নতুন এলাকায় ছড়ায় এবং দাঙ্গাবাজদের কাজ সহজ হয়। আজকাল অবশ্য অনেকেই মনে করছেন সোশাল মিডিয়ার এই যুগে এই পদ্ধতি অচল। এতে বরং যা নয় তাই গুজব ছড়ানোর ফাঁকা ময়দান তৈরি হয়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু মনে রাখবেন মিডিয়া দেখাচ্ছে না মানে কিন্তু শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরুদের কুকর্মগুলোও চাপা পড়ে থাকছে। আপনি হোয়াটস্যাপে যে ভিডিওটা দেখে লাফাচ্ছেন সেটাই একমাত্র সত্য নয়।
এত কথা বলছি মানে যে আমি আপনাকে দাঙ্গাবাজ বলছি তা নয়। এমন হতেই পারে যে আপনি যা বলছেন সরল বিশ্বাস থেকেই বলছেন। মানে আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে কথাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়। আমি আপনার সেই বিশ্বাসটাকেই প্রশ্ন করছি। ভেবে দেখুন তো আপনি সেই জার্মানদের মত হয়ে যাচ্ছেন না তো যারা নাজিদের এই প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করেছিল যে ইহুদীরাই জার্মানির সমস্ত দুর্দশার কারণ? তারপর কী হয়েছিল সেটা ইতিহাস। রক্তাক্ত, লজ্জাকর ইতিহাস। সে ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন না তো? জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়, তারা অভিশপ্ত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তারা করবেই।”

মৌলবাদী বনাম মৌলবাদী

বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে অত্যাচার হলে বোধহয় সবচেয়ে উল্লসিত হয় ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। কারণ তখন ওটা দেখিয়ে তারা বলতে পারে “কিছু বাঞ্চোদ তবুও বলবে ভারতে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে” (ভাষাটা দেখে কেউ নাক সিঁটকোবেন না দয়া করে। এই ভাষাতেই ওরা লেখে এগুলো)। কদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মন্দির, বিগ্রহ ভাঙা হয়েছে। হিন্দুবাড়িতে লুঠতরাজ, খুন, জখম ইত্যাদি করা হয়েছে। সেই ঘটনা নিয়েও উপরে যেমন বললাম তেমন পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। যে মানসিকতা নিয়ে এই জাতীয় পোস্ট করা হয় তারমধ্যে অনেকগুলো মনুষ্যেতর যুক্তি কাজ করে। যেমন:

১) হিন্দুরা করলেই দোষ হয়ে যায়। এখন যে ওরা (মুসলমানরা) করছে!

২) আমরা তো এখনো কিছুই করিনি (দাদরি ফাদরি ভুলে যান)। দেখাব মজা, দাঁড়াও না (অর্থাৎ গোটা দেশটাকে গুজরাট বানিয়ে দেবো। যদিও বলার সময় বলব গুজরাট নিয়ে মোদীকে মিথ্যে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত নির্দোষ ঘোষণা করেছে, ইত্যাদি)।

৩) আমাদের দেশের পাকিস্তানী এজেন্টগুলো (মানে কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং কিছু সাংবাদিক যারা এখনো সংঘচালিত নয়) বাংলাদেশ, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার নিয়ে তো কিছু বলে না। যত দরদ খালি মুসলমানদের জন্য, না? কই বাংলাদেশের কেউ তো হিন্দুদের জন্য চোখের জল ফেলছে না, এদের এত মড়াকান্না কিসের জন্য?

এক এক করে উত্তর দেওয়া যাক।

১) দোষ হিন্দুরা করলেও হয়, মুসলমানরা করলেও হয়। পৃথিবীর কোথাও এমন আইন আছে শুনেছেন যে খুনীকে মাপ করে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে আরো অনেকে খুন করেছে? এই যুক্তি একমাত্র সে-ই দেখায় যার উদ্দেশ্যই খুন করা।

২) এই যে তুলনামূলক আলোচনা করে বলছেন আমরা সহিষঞু, এতেই আপনারা নিজেরাই প্রমাণ করছেন সহিষঞু নন। তর্জনী উঁচিয়ে বলছেন “খবরদার অসহিষঞু বলবি না। কিছুই তো করিনি এখনো।” এ সেই সুকুমার রায়ের কবিতা হয়ে গেল “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে। সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে এমন ভয় পেলে।” কবিতাটা পড়ে যেমন সবাই হাসে, আপনাদের কথাবার্তাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত আপনাদের হাতে ক্ষমতা না থাকলে। বস্তুত নেহরু এবং প্যাটেল আপনাদের হেসেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং সেটাই ভুল হয়েছিল।

৩) এবার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে আসা যাক। প্রথমত, “পাকিস্তানী এজেন্ট” কথাটা ভীষণ বোকাবোকা। চীনা এজেন্ট বললে তাও ভেবে দেখা যেত। পাকিস্তান ভারতের রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক — এদের হাতখরচই দিয়ে উঠতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অগ্রগণ্য সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিলক্ষণ লেখালিখি, আলাপ আলোচনা হয়। আপনারা যথারীতি সেটা চেপে যান। রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে সময়ে ওদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলে। নিঃসন্দেহে এদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যতটা বলে ততটা বলে না। কেন বলবে? দলগুলো এদেশের। সংবিধান তাদের এদেশের মানুষের ভালমন্দের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এদেশের মানুষের দুর্দশা নিয়ে হইহল্লা না করে সারাক্ষণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে? মৌলবাদী মস্তিষ্ক ছাড়া এরকম চিন্তার উর্বর ক্ষেত্র পাওয়া মুশকিল।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খবর আপনি জানছেন
কি করে? জানাচ্ছে তো সেদেশের সংবাদমাধ্যম। সেগুলো চালায় কারা? সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংবাদিক কারা? সেদেশের মুসলমানরা। হিন্দুদের আক্রমণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বাকস্বাধীনতার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সামনের সারিতেই আছেন মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা। কতজনের প্রাণ গিয়েছে, কতজন দেশছাড়া হয়েছে জানেন না? নাকি না জানার ভান করছেন?
চতুর্থত, সাধারণ মানুষের কথা যদি বলেন, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ঘটনার পরেও দেখলাম ফেসবুকে সবচেয়ে সরব আমার বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধুরাই। আমি তো ঘটনাটার কথা প্রথম জানলাম তেমন এক বন্ধুর দেয়াল থেকেই। বন্ধুর কোন দেশ হয় না, ধর্ম হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে বন্ধুদের এই দুটো পরিচয় উল্লেখ না করে উপায় থাকল না, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। শাহবাগে দিনের পর দিন যারা মৌলবাদীদের শাস্তির দাবিতে হত্যে দিয়ে পড়েছিল তাদের অধিকাংশও মুসলমান। আমার অন্তত একজন বন্ধু তার মধ্যে ছিল, একথা বলতে আমি গর্ববোধ করি।
এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন। কারোর দিকে আঙুল তোলা আমাদের সাজে না।