ভারত বনাম ইন্ডিয়া: আমাদের সেই তাহার নামটি

মোহন ভাগবত বলেছিলেন ধর্ষণের মত অপরাধ ভারতে প্রায় ঘটেই না, ওসব হয় ইন্ডিয়ায়। কারণ ভারত প্রাচীন দিশি মূল্যবোধে চলে, ইন্ডিয়া চলে পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুযায়ী। সেটাই ধর্ষণের কারণ। দেশের নাম ইংরিজিতেও ইন্ডিয়া থেকে ভারত করে দেওয়ার প্রয়াসকে এই আলোয় দেখতে হবে।

যা রটে তার কিছু

যেদিন বিজেপিবিরোধী জোটের নামকরণ হল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স, সংক্ষেপে ইন্ডিয়া, সেদিন সঙ্ঘ পরিবারের প্রবল বিরোধী এক অগ্রজ বন্ধু বলেছিলেন “সবই ভাল, কিন্তু সেই অ্যাংলোফাইল নামটাই ধরে থাকতে হল? ইন্ডিয়া না করে কোনোভাবে ভারত করা গেল না নামটা?” তিনিও অবশ্য স্বীকার করেছিলেন, গত এক দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে যেভাবে বিজেপিই ঠিক করে দিয়েছে ইস্যু কোনটা আর বিরোধীরা কেবল তার বিরোধিতা করে গেছে, সেই ধারা উলটে দিয়েছে ওই নাম। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, সরকারি দলের মুখপাত্র এবং তাদের কুখ্যাত আই টি সেল হিমশিম খাচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক আলোচনার যে মানদণ্ড তারাই তৈরি করেছে, তাতে ইন্ডিয়া নামধারী কাউকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা চলে না। বললেই পালটা আক্রমণ হবে “তার মানে আপনি অ্যান্টি-ইন্ডিয়া?” নাম যে সবকিছু নয়, চরম দেশদ্রোহী কোনো দলও নিজের নামের সঙ্গে দেশের নাম জুড়তেই পারে – এই যুক্তির বাজার বিজেপি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে বহুকাল হল। বিজেপিশাসিত উত্তরপ্রদেশে এলাহাবাদের নাম বদলে প্রয়াগরাজ রাখা হয়েছে, মোগলসরাই হয়ে গেছে দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর। এগুলো তো প্রাচীন জায়গা, সাম্প্রতিককালে ঝাঁ চকচকে শহর হয়ে ওঠা গুরগাঁওয়ের নাম পর্যন্ত বদলে গুরুগ্রাম করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির ঔরঙ্গজেব রোডেরও নাম বদলে গেছে। কারণ বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার মনে করে নাম ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্যাঁচে পড়ে শেক্সপিয়র সাহেবের মত নামে কী আসে যায় বললে নিজেদের সমর্থকরাই শুনবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখনিঃসৃত বাণী সমর্থকদের কাছে অমৃতসমান। তাই তিনি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের নামেও ইন্ডিয়া থাকে বলে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। লাভ হল না দেখে শেষ চেষ্টা ছিল ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে ‘ঘমন্ডিয়া’ বলা। কিন্তু দেখা গেল, ওটা ‘মিত্রোঁ’ বা ‘ভাইয়োঁ ঔর বহনোঁ’-র অর্ধেক জনপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারল না। ফলে নামের লড়াইটা তখনকার মত ইন্ডিয়া জোট জিতেই গিয়েছিল।

কিন্তু হার স্বীকার করে নেওয়া বিজেপির স্বভাব নয়। হলে একাধিক রাজ্যে ভোটে না জিতেও তারা সরকার গঠন করতে পারত না। তাছাড়া সত্যোত্তর পৃথিবীর বাস্তবতা বিজেপির মত করে কেউ বোঝে না। তারা জানে, আজকের দুনিয়ায় বাস্তবে কী ঘটছে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে বড় কাজ হল মানুষ কী জানছে এবং জেনে কী ভাবছে তা নিয়ন্ত্রণ করা। অতএব যা ভাবলে আমার সুবিধা লোককে সেটাই ভাবাতে হবে, অন্য কথা ভাবার ফুরসত দেওয়া চলবে না। সুতরাং অবিলম্বে চলে এল জল্পনা কল্পনা চালানোর মত বিষয় – এক দেশ, এক নির্বাচন। আচমকা সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসবে ঘোষণা করা হল এবং কী নিয়ে আলোচনা হবে তা সংসদীয় প্রথায় প্রকাশ না করে গোদি মিডিয়াকে দিয়ে সম্ভাবনা হিসাবে ভাসিয়ে দেওয়া হল এক দেশ, এক নির্বাচনের কথা। এতে বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল এই পরিকল্পনার বিরোধিতায়, নিজেদের সরকারবিরোধী বক্তব্যগুলো আর মানুষের সামনে তুলে ধরার সময় রইল না। জনপরিসর থেকে হারিয়ে গেল মণিপুর, হরিয়ানার দাঙ্গা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আদানি গ্রুপের আর্থিক দুর্নীতির নতুন প্রমাণ সামনে আসায় তাদের বিরুদ্ধে ফের ওঠা যৌথ সংসদীয় তদন্তের দাবি। এক দেশ, এক নির্বাচন নিয়ে হইচই না কাটতেই সরকারপক্ষ নিয়ে এসেছে আরেক অনন্ত জল্পনার বিষয় – দেশের নাম ইংরেজিতেও ইন্ডিয়া থেকে বদলে ভারত করে দেওয়া হবে কি?

এমনিতে বিজেপির ভোটসর্বস্বতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। স্রেফ ভোটে জেতার জন্যে তারা করতে পারে না এমন কাজ নেই। ফলে এক দেশ, এক নির্বাচন চালু করা অথবা দেশের নাম বদলানোর দিকেও এগোতেই পারে। বিজেপির পুরনো বন্ধু এবং উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে ইদানীং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া মায়াবতী যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন রাজনৈতিক সংগঠন বা জোটের নামে ইন্ডিয়া ও ভারত শব্দ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করার আবেদন নিয়ে, হাস্যকরভাবে ইন্ডিয়া জোটকে দায়ী করেছেন বিজেপিকে দেশের নাম বদলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য, তাতে এই সন্দেহ জোরদার হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। আলোচনাটা আরেকটু গভীরে গিয়ে করা দরকার।

যেখানে বাঘের ভয়

লক্ষণীয় যে এক দেশ, এক নির্বাচন এখনো স্রেফ জল্পনার বিষয় হলেও (প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটা কমিটি তৈরি করা ছাড়া আর কিছু করা হয়নি) দেশের নাম সরকারিভাবে ইন্ডিয়ার বদলে ভারত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই জি-২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত সরকারের তরফ থেকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতে রাষ্ট্রপতিকে ‘প্রেসিডেন্ট অফ ভারত’ লিখে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ কারোর স্বপ্নার্দ্র বিছানার জিনিস হয়ে নেই, সরকারি কাগজপত্রে লিখিত আকারে এসে পড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষের এ নিয়ে আলোচনা না করে উপায় নেই। কারণ এতে আমার-আপনার – জনপ্রিয় লব্জে বললে করদাতার – টাকা জড়িয়ে আছে। মানে সমস্ত সরকারি কাগজপত্রে যদি কাল থেকে ‘গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’ হয়ে দাঁড়ায় ‘গভমেন্ট অফ ভারত’, তাহলে স্রেফ লেটারহেড ছাপাতে কত কোটি টাকা খরচ হবে ভাবুন।

ইদানীং সরকার এবং তার ন্যাওটা সংবাদমাধ্যম, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিখ্যাত ক্রিকেটার, চিত্রতারকা ইত্যাদি বিশেষ অজ্ঞরা সরকারের যে কোনো কার্যকলাপের উপকারিতা প্রমাণ করতে প্রথমেই বোঝায় কাজটা করলে করদাতাদের কত টাকা বাঁচবে। ১৯৯১ সালের পর থেকে যেমন সরকার এবং তার ন্যাওটারা অহোরাত্র বোঝাত ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, এ খানিকটা সেইরকম। যেমন ‘এক দেশ এক নির্বাচন ভাল, কারণ করদাতাদের অনেক টাকা বাঁচবে’, ‘ভর্তুকি তুলে দেওয়া ভাল, কারণ করদাতাদের অনেক টাকা বাঁচে’। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় ওটাই সরকারের কাজের ভালমন্দের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড, তাহলে কিন্তু সর্বত্র ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করার পরিকল্পনাকে কোনোভাবেই ভাল বলা যাবে না। কারণ এতে করদাতাদের টাকা তো বাঁচবেই না, উলটে একগাদা টাকা খরচ হবে। টাকার কথা যখন উঠলই, তখন খেয়াল করিয়ে দেওয়া যাক – শুধু গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া নেই, আছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও। সেটাও কি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ভারত হবে? হলে টাকা কি নতুন করে ছাপা হবে? সেক্ষেত্রে পুরনো নোটগুলোকে কি চলতে দেবে সরকার? নাকি আরও একচোট নোটবন্দির খাঁড়া ঝুলছে আমাদের মাথার উপরে?

কথাটাকে সোশাল মিডিয়া জোক মনে হচ্ছে? মনে রাখবেন, দেশের বর্তমান সরকার জোকারের মত সব এলোমেলো করে দিতেই ভালবাসে। তাতে মানুষের প্রাণ গেলেও কুছ পরোয়া নেই। রাজ কাপুর অভিনীত জোকার নয়, হিথ লেজার বা জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত জোকার। তার অন্তত দুটো প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে – নোটবন্দি আর চার ঘন্টার নোটিসে দেশব্যাপী লকডাউন।

ভারত এক খোঁজ

অবশ্যই শুধু করদাতাদের টাকা খরচ হবে বলে ভারত নাম ব্যবহারে বিরোধিতা করা চলে না। ও রাস্তায় হাঁটলে শেষমেশ অনেক ভাল কাজেরই বিরোধিতায় গিয়ে পৌঁছতে হবে। ঠিক যে রাস্তায় মোদী সরকার হাঁটছে। দেশে এত ঘন ঘন নির্বাচন হয়, তাতে করদাতাদের বিপুল টাকা খরচ হয়। অতএব গোটা দেশে একসঙ্গে লোকসভা আর বিধানসভা নির্বাচন হোক – টাকা বাঁচবে। গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিয়ে টাকা বাঁচানো যদি ঠিক হয়, তাহলে কিছুদিন পরে বলা যেতেই পারে, নির্বাচন ব্যাপারটারই দরকার নেই। একশো শতাংশ টাকা বেঁচে যাবে। পঞ্চায়েত, পৌরসভা, কর্পোরেশনগুলোর ব্যাপারে নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতেই তাই বলা হবে। সুতরাং অন্য যুক্তিতে আসি।

এতদিন যাঁরা জানতেন না, তাঁরাও গত কয়েকদিনের আলোচনায় নিশ্চয়ই জেনে গেছেন যে আমাদের দেশটার নাম সাংবিধানিকভাবেই ইন্ডিয়া এবং ভারত – দুটোই। সংবিধানের একেবারে প্রথম অনুচ্ছেদেই পরিষ্কার লেখা আছে “India, that is Bharat, shall be a Union of States.”

বস্তুত সংবিধান সভার বিতর্কে নাম নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল এবং সবাই যে ইন্ডিয়া শব্দটা ব্যবহার করা নিয়ে একমত ছিলেন তা নয়। শেষমেশ দুটো নামই থেকে যায়। এমন নয় যে ভারত নামটাকে ব্রাত্য করে দিয়ে স্রেফ বিদেশি লব্জের ইন্ডিয়াকেই দেশের সরকারি নাম করে দেওয়া হয়েছিল, যা এখন দক্ষিণপন্থীরা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আদৌ ইন্ডিয়া কেন? সব ভাষাতেই ভারত নয় কেন? আমার বন্ধু যা বলেছেন সেটা কি সত্যি? ইন্ডিয়া শব্দটা কেবল ভারতের অ্যাংলোফাইলরা, অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাসর্বস্ব উচ্চকোটির লোকেরা ব্যবহার করেন? ও নাম আপামর ভারতবাসীর পছন্দের নাম নয়?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে মনে রাখা ভাল, বহু ভাষাভাষী এবং ভাষার ভিত্তিতে তৈরি প্রদেশগুলো নিয়ে গঠিত দেশ ভারতে এক রাজ্যের মানুষের সঙ্গে অন্য রাজ্যের মানুষের সংযোগের ভাষা কী হওয়া উচিত, সরকারি কাজের ভাষা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকেই বিতর্ক চলছে। এমনকি সংবিধানের ৩৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারায় লেখা আছে দেশের সরকারি ভাষা হবে দেবনাগরী লিপিতে লেখা হিন্দি।

তারপর ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ১ নম্বরে যা-ই লেখা থাক, এই সংবিধান চালু হওয়ার পরে ১৫ বছর দেশের সরকারি ভাষা হিসাবে ইংরিজির ব্যবহার চলতে থাকবে। আবার ৩ নম্বর ধারাতেই বলা হয়েছে, বর্তমান অনুচ্ছেদে (অর্থাৎ ৩৪৩ নম্বরে) যা-ই বলা থাক, ওই ১৫ বছর কেটে গেলে ইংরিজি ভাষার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। ৩৪৩-৩৫১ অনুচ্ছেদগুলো পড়লে হিন্দি ভাষার প্রতি সংবিধানের পক্ষপাত দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়। ৩৫১ নম্বরে তো হিন্দি ভাষার প্রসারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই অনুচ্ছেদের শেষাংশে একেবারে হেডমাস্টারি কায়দায় বলা হচ্ছে শব্দভাণ্ডার প্রসারিত করার প্রয়োজনে প্রধানত সংস্কৃতের কাছে হাত পাততে হবে (“…for its vocabulary, primarily on Sanskrit and secondarily on other languages”)। ঘটনা হল, ভারত শব্দটা এসেছে সংস্কৃত থেকে এবং ব্যবহার হয় মূলত হিন্দি ও উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলোতে। ফলে বিন্ধ্য পর্বতের ওপারের মানুষের সঙ্গত কারণেই এই শব্দটাকে দেশের নাম বলে মেনে নিতে আপত্তি আছে। প্রাচীন শাস্ত্র ও পৌরাণিক সাহিত্যে যে ভারতের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে কিন্তু দাক্ষিণাত্য পড়ে না। মহাভারতে কটা কথা আছে দক্ষিণ ভারত নিয়ে? বাঙালিদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা, তামিল, মালয়ালমের সঙ্গে সংস্কৃতের অনেক মিল। অতএব ওগুলো সংস্কৃত থেকেই এসেছে। কিন্তু তামিলরা অনেকেই মনে করেন তাঁদের ভাষা সংস্কৃত থেকে আসেনি। বরং দাক্ষিণাত্যের সমস্ত ভাষার জন্ম তামিল থেকে। আর্য সভ্যতার থেকে দ্রাবিড় সভ্যতা একেবারেই পৃথক। সাম্প্রতিক অতীতে তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা জেলায় ২৬০০ বছরের পুরনো এক সভ্যতার খোঁজ মেলার পর তাকে ‘ভারতম’ সভ্যতা বলা হবে, নাকি ‘দ্রাবিড়ম’ – এই নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছিল ওই রাজ্যের রাজনীতি।

অর্থাৎ আমরা বিন্ধ্য পর্বতের এপারে আছি বলেই আমাদের ভাষা, সংস্কৃতিতে ভারত শব্দটার প্রাঞ্জল উপস্থিতি। কিন্তু কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সমস্ত ভারতবাসী ভারত বলেই দেশটাকে চেনেন বা চিনতে পছন্দ করেন – এরকম ভাবনায় গলদ আছে। এমনকি বাঙালিরা সকলে ভারত শব্দটাই ভাবে – এমন ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৯ তারিখে সাপ্তাহিক কালান্তর-এ প্রকাশিত দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রিপোর্টাজ ‘আমি ইন্ডিয়া’ পড়লে

এই বয়েসে আবার উদ্বাস্তু। বন্যার তিনমাস পরেও একটা তাঁবু জোটাতে পারেন নি। সমর্থ মেয়ে-জামাই আর বছর দশেকের ছেলেটাকে নিয়ে চারদিক খোলা একটা ছাউনির তলায় খড় বিছিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। অথচ এখনও ওঁর মাথা ছুঁয়ে পূর্ণিমার চাঁদ।

‘পাকিস্তান ছেড়ে কবে এসেছিলেন?’ আশ্চর্য উত্তর দিলেন বুধেশ্বরী। ছাউনি থেকে হাত নামিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন ‘আমি ইন্ডিয়া। আমি পাকিস্তান না থাকিস।’

অমোঘ সেই অভিজ্ঞতা। পাটকাঠির চাল ছাড়িয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে যে রমণী দাঁড়িয়ে, সে বলছে সে উদ্বাস্তু নয় – ভারতবাসী। সে বলছে সে ‘ইন্ডিয়া’।

আরও বড় কথা, ভারতের কেন্দ্রস্থলের যে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলো সবচেয়ে জনবহুল, সেখানকার গরিব-গুরবো মানুষের মধ্যেও দেশের নাম হিসাবে ভারতের চেয়ে বেশি প্রচলিত এমন একটা শব্দ যা ভারত বনাম ইন্ডিয়া বিতর্কে বিজেপিবিরোধীদেরও উল্লেখ করতে দেখছি না – হিন্দুস্তান। স্বাধীনোত্তর দেশে আসমুদ্রহিমাচল সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে (দক্ষিণ ভারতে কিছুটা কম, কিন্তু একেবারে পারেনি তা নয়) যে জিনিসটা তা যে মুম্বাইয়ে তৈরি হিন্দি ছবি – সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। বাংলায় সে ছবির জনপ্রিয়তাও কোনোদিন কম ছিল না। ভেবে দেখুন তো, হিন্দি সিনেমার সংলাপে বা গানে কতবার শুনেছেন ভারত বা ভারতীয় শব্দটা? বরং বারবার শোনা যায় হিন্দুস্তান এবং হিন্দুস্তানি শব্দ দুটো। হম হিন্দুস্তানী ছবির ‘ছোড়ো কল কি বাতেঁ, কল কি বাত পুরানি/নয়ে দওর মে লিখেঙ্গে/দিল পর নয়ী কহানী/হম হিন্দুস্তানী’ গানটা একসময় প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। সে গানে আবার আরএসএস-বিজেপির প্রবল অপছন্দের লোক জওহরলাল নেহরুকে দেখানো হয়েছিল।

বলিউডের সর্বকালের জনপ্রিয়তম শিল্পীদের একজন অমিতাভ বচ্চন। তাঁর প্রথম ছবির নাম সাত হিন্দুস্তানী (১৯৬৯)। তিনি বুড়ো বয়সে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে তৈরি বেশকিছু খাজা জাতীয়তাবাদী ছবির একটায় অভিনয় করেছিলেন। সেই ছবির নাম হিন্দুস্তান কি কসম (১৯৯৯)। ওই একই নামে ১৯৭৩ সালেও একটা ছবি হয়েছিল। চেতন আনন্দ সেই ছবি বানিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধ নিয়ে। বর্তমানে যাঁকে বলিউডের বাদশা বলা হয়, সেই শাহরুখ খানের একটা ফ্লপ কিন্তু অন্যরকম ছবির নাম ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী (২০০০)। আরও অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। হিন্দিভাষী সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে বলিউড হিন্দুস্তান শব্দটাকে এই প্রাধান্য দিত না। আরএসএস-বিজেপির প্রভাবে ইদানীং হয়ত বদল এসেছে, কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে বিহার, উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যের যেসব শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করতেন তাঁদের কদাচিৎ ভারত শব্দটা ব্যবহার করতে দেখা যেত। তাঁরা হিন্দুস্তানই বলতেন। যদিও হিন্দুস্তান শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হিন্দুদের ভূমি – হিন্দু, মুসলমান সকলেই কিন্তু দেশের নাম হিসাবে এই শব্দটাই নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে এসেছেন। আজকাল কথাগুলো লেখার প্রয়োজন পড়ছে, পড়ে সন্দেহও হচ্ছে হয়ত, কিন্তু আমাদের শৈশবে স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস বা নেতাজির জন্মজয়ন্তীতে যে গানটা পাড়ায় পাড়ায় মাইকে বাজতই, সেটা হল ‘সারে জহাঁ সে আচ্ছা/হিন্দুস্তান হমারা’। সেই গানের রচয়িতা মীর ইকবাল একসময় পাকিস্তানপন্থী হয়ে যান। সম্ভবত সেই অপরাধেই, আমাদের অখেয়ালে, ওই গানটাকে বিজেপি আমলে ব্রাত্য করে দেওয়া হয়েছে। ইকবালের লেখাপত্র পাঠ্য থেকে বাদ দেওয়াও শুরু হয়েছে, কিন্তু সে অন্য আলোচনা। এই আলোচনায় এটুকুই বলার যে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের বিরাট অংশের মানুষ দেশকে হিন্দুস্তান নামে চিনে এসেছেন অন্তত কয়েক হাজার বছর ধরে, ভারত নামে নয়, ইন্ডিয়া নামেও নয়। ফলে ইন্ডিয়া যদি অভিজাত ভারতের লব্জ হয়, ভারতও অভিজাত ভারতেরই অন্য এক অংশের লব্জ।

‘ভারত’ আর ‘ইন্ডিয়া’ বলে অনেক আরএসএসবিরোধীও আসলে যা বোঝাতে চান তা হল দুস্তর আর্থসামাজিক ব্যবধান। ওটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, প্রয়োজনও নেই। তাঁরা বলতে চান এ দেশের মধ্যে আসলে দুটো দেশ আছে। ইন্ডিয়া অংশটা লেখাপড়া শেখা, শহুরে, পেট ভরে খাওয়া দেশ। ভারত মূলত গ্রামে বাস করে, লেখাপড়া শিখবে কী, অনশনে অর্ধাশনেই তার দিন কাটে। কথাটা ঠিক, আবার ভুলও। কারণ দুটো কেন? একটু ঘোরাফেরা করলেই স্পষ্ট দেখা যায় এ দেশের মধ্যে আসলে অনেকগুলো দেশ আছে। পেশাগত কারণে এক সময় বারবার ঝাড়খণ্ড যেতাম। রাঁচি আর কলকাতা যে একই দেশের দুটো রাজ্যের রাজধানী একথা বিশ্বাস হত না কিছুতেই। কারণ প্রচণ্ড অব্যবস্থা, প্রবল অনুন্নয়ন দেখেছি। আবার সিকিম আর কেরালা বেড়াতে গিয়ে অবাক হয়ে ভেবেছি, পশ্চিমবঙ্গ এই রাজ্যগুলোর সঙ্গে একই দেশে আছে কেমন করে? এ তো গেল ভিনরাজ্যের কথা। সম্প্রতি জঙ্গলমহল ঘুরে এলাম। বুঝতে বাকি রইল না যে আমি আর কাঁকড়াঝোর বা আমলাশোলের বাসিন্দারা একই দেশে বাস করি না। কিন্তু তার সঙ্গে ইন্ডিয়া আর ভারত শব্দ দুটোর কী সম্পর্ক?

আরএসএস-বিজেপি কিন্তু ওই ফারাক বোঝাতে ইন্ডিয়া আর ভারত বলে না। তারা ওই দুটো শব্দ দিয়ে কী বোঝাতে চায় তা ২০১৩ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত আসামের শিলচরে যা বলেছিলেন তা খেয়াল করলেই পরিষ্কার হবে। তিনি বলেছিলেন ধর্ষণের মত অপরাধ ভারতে প্রায় ঘটেই না, ওসব হয় ইন্ডিয়ায়। কারণ ভারত প্রাচীন দিশি মূল্যবোধে চলে, ইন্ডিয়া চলে পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুযায়ী। সেটাই ধর্ষণের কারণ। দেশের নাম ইংরিজিতেও ইন্ডিয়া থেকে ভারত করে দেওয়ার প্রয়াসকে এই আলোয় দেখতে হবে। নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা জানেন ভাগবতের ওই মন্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। আসল কথা হল গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের বিরুদ্ধে ঘটানো অধিকাংশ অপরাধের অভিযোগই দায়ের হয় না। সুতরাং ইন্ডিয়াকে ভারত বানাতে চাওয়া মানে, হয় গোটা দেশটাকেই এমন করে ফেলা যেখানে পরম্পরাগত চিন্তায় ধর্ষিতারা আদৌ অভিযোগ দায়ের করবেন না, অথবা আরও সরল সমাধান – রাষ্ট্র বলবে ভারত প্রাচীন সংস্কার মেনে চলা দেশ। এখানে ধর্ষণ হয় না। এটা একটা উদাহরণ। আরও কী কী হওয়া সম্ভব ভারতে তার মাত্র একটা উদাহরণ।

আসল কথা

দেশকে মা বলে শুধু দক্ষিণপন্থীরাই কল্পনা করে তা তো নয়, ঋত্বিক ঘটকও করতেন। এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ করে থাকেন। কারণ দেশ আসলে একটা আবেগ, অর্থাৎ বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্র হল সেই বিমূর্ত ভিতের উপর গেঁথে তোলা মূর্ত ইমারত। নিজের মাকে যার যা ইচ্ছা সে তাই বলে ডাকে। ওটা বেঁধে দেওয়া অসম্ভব। বাঙালিরা মা বলে, তামিলরা আম্মা বলে, গুজরাটিরা আবার বা বলে। এমনকি বাঙালিদের মধ্যেও অনেকে মামণি বলে। এক পরিবারের কথা জানি, সেখানে দুই ছেলে তাদের মাকে বৌমা বলে ডাকত। কারণ কথা বলতে শেখার বয়সে ঠাকুমাকে শুনত তাদের মাকে বৌমা বলে ডাকছেন, সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। তামিল বা গুজরাটি পরিবারগুলোর মধ্যেও খুঁজে দেখলে নির্ঘাত এরকম বিকল্প ডাকের সন্ধান পাওয়া যাবে। ও নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, কারণ ওটা আবেগের বিষয়। সন্তানের যা বলে ডাকতে ভাল লাগে, সে তাই বলবে। কেউ ভারত বলবে, কেউ হিন্দুস্তান বলবে, কেউ ইন্ডিয়া বললেও তেড়ে যাওয়ার কিছু নেই। সংবিধানপ্রণেতারা ইন্ডিয়া আর ভারত লিখেছিলেন, কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নাম হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুস্তান শব্দটা রাখেননি। হয়ত ধর্মের ভিত্তিতে সদ্য ভাগ হওয়া এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করা দেশের সরকারি নাম হিন্দুস্তান হওয়া ভাল বার্তা দেবে না মনে করা হয়েছিল। কিন্তু সে নামের ব্যবহার একেবারে নিষিদ্ধ করার জন্যেও কোনো ব্যবস্থা নেননি। ভারত রাষ্ট্র পরবর্তীকালেও সরকার ছাড়া অন্য কে কোন নাম ব্যবহার করছে তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এখন ঘামাতে চায় বলেই এত কাণ্ড করছে।

আরও পড়ুন ২০২৪ আসলে গণভোট, বহুত্ববাদী ভারতের মুখ রাহুল গান্ধী

এমনিতে নাম বদলালে কী-ই বা এসে যায়? উপরে যে ব্যবহারিক অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছি সেটা ছাড়া? লক্ষ করে দেখছি, শেখানো বুলির মত কিছু কথা আওড়াচ্ছেন বিখ্যাতরা। সুনীল গাভস্কর প্রমুখ বলছেন, বর্মার নামও তো বদলে মায়ানমার হয়েছে। তাতে ক্ষতি কী? এর উত্তর খুঁজলেই আসল ক্ষতে চোখ পড়বে। বর্মার নাম বদলে মায়ানমার করা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে এবং তা কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাজ ছিল না। কাজটা করেছিল জুন্টা সরকার। আসল আপত্তির জায়গাটা এইখানে। ভারত সরকার যদি সত্যিই মনে করে থাকে দেশের সরকারি নাম ইংরিজিতেও ভারত করার কোনো বিশেষ প্রয়োজন আছে, তাহলে সংসদে আলোচনা করে নিয়মকানুন মেনে সংবিধান সংশোধন করে বদলাতে পারত। কিন্তু সরকারি কাগজে চুপিসাড়ে বদল করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। কাজটা অবশ্য বিলক্ষণ চতুরতার। কারণ এখন সংসদের বাইরে বিজেপি মুখপাত্ররা যা-ই বলুন, সংসদে আলোচনা হলে হয়ত অমিত শাহ বলবেন, বদলাইনি তো! ভারত নামটা তো সংবিধানেই আছে।

আসলে সংগঠনের শতবর্ষে দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে গেল অথচ দুনিয়াসুদ্ধ লোক ইন্ডিয়া বলে ডাকছে – এ জিনিস আরএসএসের হজম হবে না। কারণ ‘ইন্ডিয়া’ নামটা এসেছে পারস্যের লোকেদের মুখের ‘হিন্দুস্তান’ ইউরোপিয় জবানে বদলে গিয়ে। ইংরেজদের এ দেশে আসতে তখনো কয়েক হাজার বছর দেরি, যীশুখ্রিস্টেরই জন্ম হয়নি। এ নাম কি সঙ্ঘ মেনে নিতে পারে? বস্তুত ‘হিন্দু’ শব্দটাও বেদ, বেদান্ত, রামায়ণ, মহাভারত – কোথাও নেই। বরং জরাথ্রুষ্টের ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র গ্রন্থ আবেস্তা-য় আছে। সঙ্ঘ তাই পারলেই তাদের বয়ানে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটা গুঁজে দেয়। এমনি তো আর দয়ানিধি স্ট্যালিন সনাতন ধর্মের বিনাশের ডাক দেওয়ায় বিজেপি নেতারা রণচণ্ডী হয়ে ওঠেননি। বস্তুত যে ভাষাটার প্রতি আমাদের সংবিধানের বিশেষ পক্ষপাত, যা গত শতকের ছয়ের দশকে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার গোটা দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং এখন বিজেপি ফের চাপিয়ে দেওয়ার তালে আছে, সেই ‘হিন্দি’ ভাষাও আদতে ছিল হিন্দুস্তানি (আমির খুসরো বলতেন হিন্দভি) ভাষা। সুলতানি আমল থেকে দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্য এশিয়া এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ভাষা মিশে তা গড়ে উঠেছিল। এই ভাষা দেবনাগরী আর ফারসি – দুরকম লিপিতেই লেখা চলত। হিন্দি আর উর্দু – এই বিভাজন হয়েছে মাত্র শ দুয়েক বছর আগে এবং তার পিছনে ইংরেজদের ভূমিকা কম নয়।

অর্থাৎ সঙ্ঘ পরিবারের এক ভাষা, এক জাতি, এক রাষ্ট্রের স্লোগান – হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান – গোটাটাই বিদেশি লব্জ ধার করা। অবশ্য জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র ধারণাগুলোই ইউরোপিয়। কস্মিনকালে ভারতে ছিল না। আগাগোড়া ধার করা জিনিস নিয়ে চললে হীনমন্যতা আসাই স্বাভাবিক, ধারের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টাও প্রত্যাশিত।

শেষ নাহি যে

বুধেশ্বরী দীপেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘হামারলা মরিলে কি দ্যাশ বাঁচিবে?’ দেশের মানুষ না বাঁচলে দেশ বাঁচে না। এখন আশু লড়াইটা দেশ বাঁচানোর, নাম বাঁচানোর নয়। যেহেতু দেশের মানুষের জন্য বিজেপি সরকার কিছুই করেনি, তাই দেশের মানুষকে ঝুটো গর্ব দিয়ে এবং বিরোধীদের সে গর্ব সামলানোর কাজে ব্যস্ত রেখেই তারা উতরোবার চেষ্টা করছে। যুগপৎ নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত করছে। অর্থাৎ রথ দেখা এবং কলা বেচা। ২০২৪ নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদীরা পুনর্নির্বাচিত হলে দেশের নাম কেন, দেশের লোকেদের নামও বদলে দিতে পারে। কেউ আটকাতে পারবে না। ফলে এখন বিরোধীদের দায়িত্ব এক দেশ এক নির্বাচন বা নাম পরিবর্তনের মত কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থেকেও সরকারের অকর্মণ্যতা এবং বিপজ্জনক কাজগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো, বিকল্প হাজির করা। নইলে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতির ঘূর্ণিতে ডুবে মরতে হবে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী অবশ্য নির্বাচন এবং নাম নিয়ে ডামাডোলের ঊর্ধ্বে উঠে আসন্ন বিশেষ অধিবেশনে সংসদে আলোচনার জন্য নটা বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন। কিন্তু বিজেপি যে বিনা আলোচনায় সংসদ চালাতে এবং নিজেদের পছন্দের বিল পাস করাতে সিদ্ধহস্ত তা আমরা জেনে গেছি। ইন্ডিয়া জোট তাদের একতা বাইরের মত সংসদের ভিতরেও দেখাতে পারে কিনা, দেখিয়ে বিজেপির যা ইচ্ছা তাই করা আটকাতে পারে কিনা, তার উপরে নির্ভর করছে আমরা আগামী বছর কীরকম নির্বাচন দেখব। তার চেয়েও বড় কথা, দেশের ভিতটা থাকবে কিনা। ভিত না থাকলে ইমারত টেকে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত

“আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর।”

দুজন রাজনীতিবিদ। দুজনেই নিজের রাজ্যের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ – একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। একজন মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, অন্যজন অধুনালুপ্ত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শেষ মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমজন বিজেপির নংথমবাম বীরেন সিং, দ্বিতীয়জন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা পিডিপির মহবুবা মুফতি। এই দুজন অতি সম্প্রতি দুই মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে এমন দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যা পাশাপাশি রেখে দেখলে শুধু মণিপুরি বা কাশ্মীরী নয়, বাঙালিদেরও শিউরে উঠতে হবে। বস্তুত, বাঙালিদেরই শিউরে ওঠার কথা। কাশ্মীরী আর মণিপুরিদের তো সর্বনাশের মাথায় বাড়ি পড়েই গেছে। তাঁদের আর নতুন করে শিউরে ওঠার কী আছে?

২ জুলাই (রবিবার) মহবুবার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুর। সেই সাক্ষাৎকারের প্রায় প্রত্যেকটা কথাই উদ্ধৃতিযোগ্য, কিন্তু আমাদের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ের দেওয়ার মত কথাটা হল “আমি পাটনায় বিরোধী নেতাদের [সাম্প্রতিক বৈঠকে] বলেছি, মণিপুরে যা ঘটছে সেটাই ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারা এবং কেউ কিছু করে উঠতে পারবে না। মণিপুর আমাদের আয়না দেখাচ্ছে।”

গোটা সাক্ষাৎকারে একটাও আশাব্যঞ্জক বাক্য বলেননি মহবুবা। অবশ্য ২০১৯ সালের ৫ অগাস্টের পর কোনো কাশ্মীরীর মুখ থেকে আশার বাণী শোনার আশা করা মানে হয় আপনি কাশ্মীরের ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, নয় মুখে দরদ দেখাচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন “ভাল টাইট হয়েছে ব্যাটারা”। এই টাইট হওয়ার ব্যাপারটাই ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মানুষের, ভাল করে বোঝা প্রয়োজন এবং বুঝতে গেলে বীরেনের সাক্ষাৎকারের কাছে যেতে হবে। প্রণয় ও রাধিকা রায়ের বিতাড়নের পর এনডিটিভিও যে রবীশ কুমার নামাঙ্কিত গোদি মিডিয়ার অংশ হয়ে গেছে তা সর্বজনবিদিত। সেই চ্যানেল সমেত অন্য অনেক চ্যানেলকেই বীরেন কেন ৩০ জুন (শুক্রবার) পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত করলেন না, তা নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সর্বত্র প্রায় একই কথা বলেছেন, এখানে এনডিটিভির সাক্ষাৎকার নিয়েই আলোচনা করব।

পদত্যাগ করতে চাওয়ার কারণ হিসাবে যা জানিয়েছেন তাতে চমকে ওঠার মত কিছু নেই। লোকে যতক্ষণ তাঁর খড়ের পুতুল পোড়াচ্ছিল ততক্ষণ ঠিক ছিল। তা বলে মোদীজির কুশপুত্তলিকা দাহ করবে! অহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা! ওই স্পর্ধা দেখে বীরেন আর স্থির থাকতে পারেননি। তিনি ব্যথিত হন এবং ভাবেন, লোকে যখন তাঁকে বিশ্বাসই করছে না, শ্রদ্ধাই করছে না, তখন চেয়ারে বসে থেকে কী হবে? এসব কথায় প্রশাসক হিসাবে বীরেনের যোগ্যতা বা অযোগ্যতা নয়, প্রকট হয় ফুয়রারের সেনাপতি হিসাবে তাঁর বিশ্বস্ততা। প্রায় ২৮ মিনিটের সাক্ষাৎকারে দেশের বাকি অংশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ মিনিট আষ্টেক।

প্রায় দুমাস ধরে চলা মণিপুরের দাঙ্গা কেন, কোন ঘটনা থেকে শুরু হল তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে গেছে বহু আগেই। প্রায় সমস্ত সংবাদমাধ্যম, এমনকি এই ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে, যে ঘটনার সূত্রপাত ৩ মে মণিপুরের সমস্ত উপজাতিদের এক সম্মিলিত পদযাত্রা থেকে। কী জন্যে আয়োজিত হয়েছিল সেই পদযাত্রা? মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মেইতেইরা দাবি তুলেছে তাদের তফসিলি উপজাতি বলে ঘোষণা করতে হবে। ২০ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে বলে, এই দাবি দশ বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে যেন রাজ্য সরকার চার সপ্তাহের মধ্যে এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারকে তার সুপারিশ জানায়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই ওই পদযাত্রা বেরোয় এবং দাঙ্গা শুরু হয়। মূল সংঘর্ষ যে মূলত উপত্যকায় বসবাসকারী মেইতেইদের সঙ্গে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী কুকি এবং নাগাদের, সেকথাও কারোর অজানা নেই। কোনো রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং আর্থসামাজিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা সম্প্রদায় সংরক্ষণ দাবি করছে, এমনটা ২০১৪ সালের আগে বিশেষ দেখা যেত না। উপরন্তু মুখ্যমন্ত্রী বীরেন নিজে মেইতেই। এসব কারণেই যে মণিপুরের উপজাতিদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তাও এখন সবার জানা। কিন্তু বীরেন এনডিটিভির সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে এই দুমাসব্যাপী দাঙ্গার এক সম্পূর্ণ নতুন কারণ নির্দেশ করেছেন। বলেছেন মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করার আইনি নির্দেশ নাকি আদৌ এসবের কারণ নয়। তাঁর বক্তব্য “সরকার তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি ঘোষণা করার সুপারিশ এখনো পাঠায়নি। তাহলে সেদিন পদযাত্রা বার করা হয়েছিল কিসের দাবিতে? যারা করেছিল তাদের জিজ্ঞাসা করুন।” তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছেন এবং সেই উত্তরে আলোচনার অভিমুখই বদলে দিয়েছেন।

বলেছেন তাঁর সন্দেহ, এর পিছনে আসলে অনুপ্রবেশকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীরা। বলেছেন মণিপুরের পার্বত্য এলাকায় নাকি জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য (“demographic balance”) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেইতেই এবং নাগা এলাকায় সব ঠিক আছে, কিন্তু কুকি এলাকায় নাকি জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যের মায়ানমার সীমান্তবর্তী তিন জেলায় নাকি গত কয়েক বছরে প্রায় ১,০০০ নতুন গ্রাম গড়ে উঠেছে। একথা জানতে পারার পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে ওই এলাকার মানুষের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র পরীক্ষা করতে বলেন। সেই উদ্দেশ্যে ক্যাবিনেট সাব-কমিটি গড়া হয়। তাঁর সাফাই “সেই কমিটির চেয়ারম্যান করি লেপাও হাওকিপকে, যে নিজেই একজন কুকি। আমার যদি কুকিদের সম্পর্কে খারাপ মনোভাব থাকত, তাহলে এটা করতাম কি?” তিনি এও বলেন যে মণিপুরের কুকিরা তাঁর ভাই, তাদের নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বাইরে থেকে আসছে তাদের বরদাস্ত করা যায় না। তা সেই সাব-কমিটি নাকি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ২,১৭৪ জন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ফেলে। বীরেন ভারি নরম গলায় বলেন “আমি বললাম, এরা নিরীহ লোক। বিপদে পড়ে এখানে এসেছে, এদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র দিয়ে শেল্টার হোম বানিয়ে রাখা হোক যাতে ভারতীয় নাগরিক না হতে পারে। মায়ানমারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া যাবেখন। তা এসব করেছি বলে এই গণ্ডগোল করা হয়ে থাকতে পারে।” টানা দুমাস দাঙ্গা চলার পরে, বহু মানুষের মৃত্যুর পরে, বহু মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পরেও রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক সঠিক কারণ বলতে পারলেন না। হাওয়ায় কিছু অভিযোগ ভাসিয়ে দিলেন।

এরপরেই তিনি যোগ করলেন “তাছাড়া ২০১৯ সাল থেকে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছি। তাতে দু হাজারের বেশি লোক গ্রেফতার হয়েছে জঙ্গলের এলাকা থেকে। তার মধ্যে একজন গ্রামপ্রধানও আছেন। সুতরাং এই সঙ্কট যারা আফিম চাষ করে সেই মাফিয়ারা আর যারা মায়ানমার থেকে অনুপ্রবেশে প্রশ্রয় দেয়, তারা মিলিতভাবে তৈরি করে থাকতে পারে।”

এই কয়েক মিনিটের কথায় জ্বলন্ত মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী কী কী করলেন একবার দেখে নেওয়া যাক:

১) গোটা অশান্তির দায় কুকিদের উপর চাপিয়ে দিলেন। মেইতেইদের কোনো দোষ নেই। অর্থাৎ একটা রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সুচতুরভাবে একটা সম্প্রদায়ের (তাঁর নিজের সম্প্রদায়) পক্ষ নিয়ে নিলেন।
২) কুকিদের মধ্যে অনেকেই আসলে অনুপ্রবেশকারী – এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলেন। অর্থাৎ কুকিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন।
৩) কুকিরা পার্বত্য এলাকায়, অরণ্য এলাকায় গ্রামে গ্রামে আফিম চাষ করে। কুকি মানেই সন্দেহজনক, কুকি মানেই অপরাধী হতে পারে – এই ভাষ্য প্রচার করে দিলেন।

এই কায়দা কি নতুন? একেবারেই নয়। গোটা ভারতে মুসলমানদের সম্পর্কে ঠিক এই ভাষ্যই চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। কুকির বদলে মুসলমান বসিয়ে নিন আর তৃতীয় ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকা, অরণ্য এলাকার বদলে মাদ্রাসা বসিয়ে নিন। আফিম চাষের বদলে সন্ত্রাসবাদী চাষ বসিয়ে নিন।

সুতরাং বীরেন যা বলেছেন তা বস্তুত বর্তমান ভারতে প্রচলিত সংখ্যাগুরুবাদী ভাষ্যের মণিপুরি রূপ। এবার আসা যাক, বাঙালিদের কেন সচকিত হওয়া উচিত সেই প্রসঙ্গে।

এই ভাষ্যের অসমিয়া রূপটা নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে। সেখানে সংখ্যাগুরু অসমিয়ারা, আর জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ বাঙালিদের বিরুদ্ধে। অতএব ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনআরসি)। সেই ব্যবস্থার প্রকোপে কত মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে কাটাতে হচ্ছে, কত মানুষের সেখানে মৃত্যু হয়েছে ইতিমধ্যেই, কতজন যে কোনো সময়ে অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন – তার সঠিক সংখ্যা কারোর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা শুধু একটা সংখ্যাই নির্দিষ্টভাবে জানি – ১৯ লক্ষ। ৩১ অগাস্ট ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি থেকে বাদ পড়ে এতগুলো মানুষের নাম। বলা হয়, এঁরা ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। এঁদের সম্পর্কেও বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশ সে কথায় আমল দেয়নি, মায়ানমারও দেবে না, পৃথিবীর কোনো দেশই দিত বলে মনে হয় না। এদিকে অসমিয়া সংখ্যাগুরুবাদীরা কিন্তু এনআরসি থেকে ‘মাত্র’ ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ যাওয়ায় অখুশি। তারা আরও নিখুঁত (অর্থাৎ আরও বেশি মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মত) এনআরসি চায়। কোনো মানুষকে বেআইনি বলাই যে অমানবিক, সে আলোচনায় না গিয়েও এনআরসি যে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া তা বলাই যায়। নইলে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যরা এ দেশের নাগরিক নয় – একথা এনআরসিতে প্রমাণিত হল কী করে?

নাগরিকত্বের ধারণাতেই যে মৌলিক গোলমাল আছে সে তর্কে এই আলোচনায় ঢুকব না, অন্য কথা বলি। এ দেশের নাগরিকদের হাতে একাধিক পরিচয়পত্র বহুকাল ধরে আছে। সেসবে এমনিতেই পাহাড়প্রমাণ ভুল থাকে যার জন্য নাগরিকরা নন, সরকারি ব্যবস্থা দায়ী। যে কোনোদিন দেশের যে কোনো মহকুমা আদালতে খানিকক্ষণ বসে থাকলেই দেখা যায় বহু মানুষ আসেন শুধু নাম এফিডেভিট করাবেন বলে। একেক নথিতে একেকরকম নাম ছাপা হয়েছে একেকরকম বানানে। সেইসব মানুষের অধিকাংশই হয় মুসলমান, নয় নিম্নবর্গীয় হিন্দু। কারণ পরিচয়পত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা সরকারি আধিকারিকদের মধ্যে হিন্দু উচ্চবর্গীয়রা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁরা এঁদের নামগুলো জম্মে শোনেননি, শুনলেও বানান জানেন না। জেনে নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তাই ভুলের বেশিরভাগটা মুসলমান ও হিন্দু নিম্নবর্গীয়দের কাগজপত্রেই হয়ে থাকে। বন্যা ইত্যাদি দুর্যোগে কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বাদই দিলাম। তা এই এনআরসি সারা দেশেই করার অভিপ্রায় ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের। উদ্দেশ্য স্পষ্ট – যেসব সম্প্রদায় হিন্দুরাষ্ট্রে অবাঞ্ছিত, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া। যেহেতু হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না এত কোটি মানুষ, তাই গণহত্যায় যদি না মরে তো থাকবে। কিন্তু শাসক সংখ্যাগুরুর অধীনস্থ প্রজা হিসাবে থাকবে। এত বড় দেশে ব্যাপারটা করা অসম্ভব, যদি না যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে তাদের মধ্যেই সমর্থন তৈরি করা যায়। তাই ঝোলানো হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নামক গাজর। ফলে এনআরসি বরাক উপত্যকার বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সমর্থন পেয়ে গেল, পশ্চিমবঙ্গেও ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের পর এপারে আসা বাঙালদের উত্তরপুরুষের এনআরসি সম্পর্কে মতামত হয়ে গেল “সরকার একটা ভাল জিনিস করলে বিরোধিতা করব কেন?” সঙ্গে মিশে থাকল পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর গল্প শুনে বড় হওয়া মস্তিষ্কের প্রতিশোধস্পৃহা। বরাবরের পশ্চিমবঙ্গীয়দের তো কথাই নেই। তাঁরা নিশ্চিন্ত – “আমি যে ছিলাম এই গ্রামেতেই”। যাঁরা এরকম মানসিকতার নন, তাঁরাও ভাবলেন সিএএবিরোধী আন্দোলন করার প্রয়োজন মুসলমানদের। নাগরিকত্ব গেলে তো তাদের যাবে, হিন্দুরা তো এনআরসিতে জায়গা না পেলেও ফের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মতুয়ারা রীতিমত আশান্বিত হলেন বহু প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব এইবার পাওয়া যাবে ভেবে। নাগরিকত্ব পেতে গেলে যেসব অলীক শর্ত পূরণ করার কথা আইনে বলা আছে সেদিকে খুব বেশি লোকের চোখই পড়ল না।

দেশজুড়ে পথে পথে আন্দোলন এবং কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসের নিচে এনআরসি চাপা পড়ে গেল। সম্ভবত সেই কারণেই আন্দোলন বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও সিএএ অনুযায়ী কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়ার তাগিদ আর নরেন্দ্র মোদী সরকারের নেই। আসল উদ্দেশ্য তো অনেককে বাদ দেওয়া, কাউকে কাউকে যোগ করা নয়। যাঁরা ভেবেছিলেন আরএসএস-বিজেপি এনআরসির কথা ভুলে গেছে, তাঁদের বীরেনের কথা মন দিয়ে শোনা উচিত। তাঁর তৈরি ক্যাবিনেট সাব-কমিটি যা করছিল বলছেন, তা তো আসলে এনআরসির কাজই। কিছু মানুষকে অনাগরিক চিহ্নিত করে আলাদা জায়গায় রাখা। বীরেন খেলার মাঠের লোক ছিলেন বলে বোধহয় মনটা নরম, তাই ডিটেনশন সেন্টার না বলে শেল্টার হোম বলেছেন। লক্ষণীয় যে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা হয়েছে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র দিয়ে, অর্থাৎ আধার কার্ড। এই জিনিসটি যে একেবারে ফালতু, সেকথা এখন নেহাত নিরক্ষর মানুষও জেনে গেছেন। আধার জাল করা অত্যন্ত সহজ, নিত্যই আধার জাল করে লোকের টাকাপয়সা মেরে দেওয়ার কাহিনি কাগজে, টিভিতে, ওয়েবসাইটে দেখা যায়। আর বায়োমেট্রিক? প্রায়শই শোনা যায় অমুকের আঙুলের ছাপ আর মিলছে না, তমুকের চোখের মণি মিলছে না। ফলে অমুক সরকারি প্রকল্পের টাকা তোলা যাচ্ছে না, রেশন তোলা যাচ্ছে না। এই গোলযোগে ঝাড়খণ্ডে লুখি মুর্মু নামে এক মহিলা অনাহারে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ আছে। সেই আধার কার্ড দিয়ে নাগরিক চিনে নিচ্ছে বীরেনের সরকার।

তবে এনআরসির চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছে তাঁর ক্যাবিনেট কমিটি। কারণ গোটা রাজ্যের মানুষের নাগরিকত্বের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, হচ্ছে শুধু সংখ্যালঘু কুকিদের। আগামীদিনে কি তাহলে এভাবেই অন্য নামে এনআরসি হবে সারা দেশে? যে যেখানে সংখ্যালঘু কেবল তাদেরই নাগরিকত্বের পরীক্ষায় বসানো হবে, যাতে আসামের এনআরসির চেয়ে অনেক সহজ, সুশৃঙ্খল হয় কাজটা, আরও বেছে বেছে অপছন্দের জনগোষ্ঠীর মানুষকে বাদ দেওয়া যায়? আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। যাঁরা জানেন না তাঁরা বলবেন, এ তো মেইতেই-নাগা জাতিগত রেষারেষির ব্যাপার। এর মধ্যে আরএসএস, হিন্দুত্ব, হিন্দুরাষ্ট্র আসছে কোথা থেকে? তাঁদের জন্য উল্লেখ থাক, মেইতেইরা প্রধানত হিন্দু। কুকিরা প্রধানত খ্রিস্টান। গত দুমাসে কয়েকশো গির্জা এবং মন্দির পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে মণিপুরে।

ভারতে তো আজকাল আর এসব পড়ে মানুষ হিসাবে খারাপ লাগে না অনেকের। ফলে শুধু সংখ্যালঘুদের জন্য এনআরসি করার আশঙ্কাতেও শিউরে উঠবেন না অনেকেই, যদি তিনি যেখানে আছেন সেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হন। তাই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ভারতবর্ষ এমন এক সাড়ে বত্রিশ ভাজা যে এদেশে সকলেই কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু। মারোয়াড়ি বা গুজরাটি নিজের রাজ্যে ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে এসে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা দিল্লিতে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি মুসলমান হিন্দি বলয়ে গেলে আবার জাতিগত ও ধর্মীয় – দুভাবেই সংখ্যালঘু। দেড়শো কোটি ভারতীয়ের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া খুব শক্ত যে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যেখানেই যাবে সেখানেই সবদিক থেকে সংখ্যাগুরুই থাকবে। অথচ করমণ্ডল এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় যাত্রা করা দিনমজুর থেকে শুরু করে লোরেটো হাউসের প্রাক্তনী আই টি মজুর পর্যন্ত সকলকেই জীবিকার টানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেতে হবে, সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে হবে। যতই ফড়ফড়িয়ে ইংরিজি বলুন আর গড়গড়িয়ে হিন্দি, নাম দেখে বাঙালি বলে ঠিক চিনে ফেলা যাবে। ফলে নিশ্চিন্ত থাকার উপায় কারোরই নেই।

এই কারণেই মহবুবা যা বলেছেন তা অভ্রান্ত। আসামে এনআরসি নাম দিয়ে বা মণিপুরে ক্যাবিনেট সাব-কমিটির নাম দিয়ে যা করা হচ্ছিল তা আসলে ভারতের প্রতিটি রাজ্যের জন্য সযত্নে আলাদাভাবে তৈরি একেকটা হিন্দুত্ববাদী মডেল (যদিও উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে এনআরসির পথ করে দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধী)। হিন্দুত্ববাদের লক্ষ্য অখণ্ড ভারত, কিন্তু আসলে যা করছে এবং এই কর্মপদ্ধতি একমাত্র যা করে উঠতে পারে, তা হল ভারতের বালকানায়ন (Balkanisation)। অর্থাৎ খণ্ড খণ্ড ভারত। যত এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক পুলিস, এক নির্বাচন, এক দেওয়ানি বিধি ইত্যাদি ধারণা গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাড়ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিপুত্রদের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের মত রক্ষণশীল দাবিও বাড়ছে। দুই রাজ্যের পুলিসের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। এভাবে চললে সব রাজ্যেই ‘ভিনরাজ্যের লোক হটাও’ অভিযান শুরু হবে। এর ট্রেলারও ইতিমধ্যেই কিছু কিছু জায়গায় দেখানো হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার যুগে কোনো রাজ্যকে এসব ইস্যুতে মণিপুর করে দেওয়া কয়েক মিনিটের ব্যাপার। সংরক্ষণের মত কোনো বড় ইস্যুর প্রয়োজনই পড়বে না।

আরো পড়ুন স্রেফ বলপ্রয়োগে মণিপুর সমস্যা আরো বাড়বে

তবে হিন্দুত্ববাদী মডেল যারা তৈরি করে তাদের আর যা-ই হোক, অবধানের এবং পরিশ্রমের খামতি নেই। একই মডেল যে সব রাজ্যে চলবে না তা তারা বিলক্ষণ জানে। তারা বোঝে যে কিছু রাজ্য আছে যেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে এভাবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সরাসরি লড়িয়ে দেওয়া যাবে না। অন্য কৌশল দরকার হবে। আবার জম্মু ও কাশ্মীরের মত রাজ্যও ছিল, যেখানে হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড় ঘোষিত শত্রু মুসলমানরাই সংখ্যাগুরু। সেক্ষেত্রে রাজ্যটাকেই ভেঙে দেওয়া দরকার। সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। কিন্তু আধিপত্য স্থায়ী করতে হলে দরকার রাজ্যটার চরিত্রই বদলে দেওয়া। জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করার যে অভিযোগ কুকিদের বিরুদ্ধে বীরেন করেছেন, মহবুবা সঙ্কর্ষণকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন প্রায় সে জিনিসই ৫ অগাস্ট ২০১৯ তারিখের পর থেকে কাশ্মীরে করা হচ্ছে। “আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর। বালি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বিরাট আবিষ্কার লিথিয়াম – সবকিছু বাইরের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাও দুর্নীতি করে,” বলেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

তাহলে মোদ্দা কথা হল, যে রাজ্যের সংখ্যাগুরু (ধর্মীয় বা জাতিগত) হিন্দুত্বের পতাকা নিজেই তুলে নেবে না সে রাজ্যকে ভেঙে দেওয়া হবে। সেখানকার অর্থনীতির লাগাম তুলে দেওয়া হবে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাজ্যগুলোর ধনী ব্যবসায়ীদের হাতে। বদলানোর চেষ্টা হবে জনবিন্যাস। ফলে যারা ছিল সংখ্যাগুরু, তারা হয়ে যেতে পারে ভীত সন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু। এ হল হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার আরেকটা মডেল। পশ্চিমবঙ্গবাসীর শিউরে ওঠা উচিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গে একইসঙ্গে মণিপুর মডেল এবং কাশ্মীর মডেল প্রয়োগ করা সম্ভব।

ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একেকজন নেতা উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করা নিয়ে একেকরকম কথা বলে রেখেছেন। এমনকি কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জীবন সিং এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বছর জানুয়ারি মাসে দাবি করেছিলেন, আলাদা কামতাপুর রাজ্যের দাবি নিয়ে নাকি কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলছে। মধ্যস্থতা করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। একথা সত্যি যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো ভাবনাচিন্তা আছে বলে ঘোষণা করা হয়নি। তবে মনে রাখা ভাল, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে আগের দিন সন্ধেবেলাও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন তৎকালীন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক। অবশ্য যিনি বলেন রাজভবনের ফ্যাক্স মেশিন খারাপ ছিল বলে মহবুবার সরকার গঠন করার দাবি জানতে পারেননি, তাঁকে বিশ্বাস করা চলে না। কিন্তু সঙ্কর্ষণের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মহবুবাও বলেছেন “হপ্তাখানেক ধরে গুজব শুনছিলাম…সেইজন্যেই আমি, ওমর আবদুল্লা এবং অন্যরা মিলে রাজ্যপালের কাছে যাই জানতে যে সত্যিই ৩৭০ রদ করা হবে কিনা। উনি আমাদের বলেন ‘আমি আপনাদের বলছি, সেরকম কিচ্ছু হবে না’। পরদিন সকালে কী হল সে তো জানেনই। আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল বটে, কিন্তু যতক্ষণ না পরেরদিন আমাদের মাথায় বাজ পড়ার মত করে ব্যাপারটা ঘটল, আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি।”

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির লাগাম এমনিতেই অনেকটা হিন্দিভাষীদের হাতে। রাজ্য ভাগ করলে বাঙালি হিন্দুরা উত্তরবঙ্গে নানা জাতি, উপজাতির মধ্যে হয়ে পড়বেন সংখ্যালঘু। কাশ্মীরী মুসলমানদের দুর্গতি দেখে ২০১৯ সালে যাঁরা উল্লসিত হয়েছিলেন তাঁরা সেদিন বিপুল অপরাধবোধে ভুগতে পারেন।

দক্ষিণবঙ্গে হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সারা দেশের লোকসভা, বিধানসভার আসনগুলোর ভোটার পুনর্বিন্যাস করার কথা। গোটা বা ভাঙা দক্ষিণবঙ্গে এমন হতেই পারে যে বেশকিছু আসনে বাঙালিরা নয়, হিন্দিভাষীরাই হয়ে গেলেন নির্ণায়ক শক্তি। অথচ মণিপুরের মতই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, অনুপ্রবেশকারীতে ভরে যাচ্ছে – এ অভিযোগ বিজেপির বহুকালের (সংসদে এ অভিযোগ প্রথম তোলেন অবশ্য মমতা ব্যানার্জি)। বীরেন যেমন সংখ্যালঘু কুকিদের মায়ানমার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী বলে সন্দেহ ছড়াচ্ছেন, তেমনই বাঙালি মুসলমানরা আসলে বাংলাদেশি – এই সন্দেহ সারা ভারতে ইতিমধ্যেই ছড়ানো হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তার ফল ভোগ করেছেন শুধুমাত্র ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়, ধর্ম বা শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালি মাত্রেই যে বাংলাদেশি (হ্যাঁ, হিন্দু উচ্চবর্গীয়রাও। কারণ দেশভাগের ফলে বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দুর এ পারে চলে আসার কথা আই টি সেলের প্রত্যেকটি কর্মী জানে) – এই ধারণার প্রচার পুরোদমে চলছে। রাজ্য ভেঙে গেলে চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, ঘোষ, বোসদেরও অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হতে সময় লাগবে না।

আরও পড়ুন প্রজাতন্ত্রসাধনা

কাশ্মীরীরা আজ কেমন আছে জিজ্ঞেস করায় মহবুবা যা বলেছেন তা একেবারে জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিক উপন্যাস নাইন্টিন এইট্টি ফোর মনে পড়ায়। “কাশ্মীরীরা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে। তারা ঘরের মধ্যেও মন খুলে কথা বলত পারে না, কারণ তারা ভীত, তাদের বেঁচে থাকার বোধটাকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বন্দুক আর বুটের নিচে বাস করছি।” যেসব জনগোষ্ঠীকে হিন্দুত্ব নিজেদের শত্রু বলে মনে করে, তাদের কিন্তু এভাবেই রাখতে পছন্দ করে। কেবল বাঙালি মুসলমান নয়, বাঙালি হিন্দুরাও যে মোটেই আরএসএসের পছন্দের জনগোষ্ঠী নয় তার বহু প্রমাণ আছে, খামোকা এ লেখার কলেবর বাড়িয়ে লাভ নেই। কিছুই খুঁজে না পেলে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রচারসভায় “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগান খেয়াল করুন। নিদেন বাংলায় অনুবাদ করে নিয়ে “ভারতমাতার জয়” বলাও বিজেপি কর্মীদের না-পসন্দ।

কেউ অবশ্য বলতেই পারেন, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য, বাঙালিরাও অনেক বড় জাতি। সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গবাসী হিন্দু তো বটে। সুতরাং মণিপুর, কাশ্মীর নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার কী? অমন ব্যবহার আমাদের প্রতি আরএসএস-বিজেপি করতে যাবে কেন? বড় রাজ্য, বড় জাতিকে ছোট করে নেওয়ার কায়দা যে হিন্দুত্ববাদীদের জানা আছে তা তো আগেই ব্যাখ্যা করেছি। ফলে বিরাটাকার নিয়ে ভরসা করে বোধহয় লাভ নেই। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যবাসীর হিন্দুরাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠার ক্ষমতার উপর হয়ত ভরসা রাখা যায়। যেভাবে চতুর্দিক হিন্দিভাষীতে ভরে যাওয়া নিয়ে নিচু গলায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে করতে নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুলের দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি করে দিচ্ছেন কলকাতা ও শহরতলির ভদ্রলোকেরা, বাঙালি হিন্দুর বহুকালের উৎসব রথযাত্রার চেয়ে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন গণেশপুজোয়, যেভাবে বারাণসীর ঢঙে কলকাতার ঘাটে গঙ্গারতি চালু করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, দীঘাকে করে তুলছেন পুরীর মত তীর্থস্থান, শাসক দল রামনবমীর মিছিল করছে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, বজরংবলীর পুজো হচ্ছে ঘটা করে, বাংলা মেগাসিরিয়ালে বাজছে হিন্দি ছবির গান, বাংলা ছবির পোস্টার সারা ভারতে মুক্তির দোহাই দিয়ে লেখা হচ্ছে দেবনাগরী হরফে আর বাঘাযতীনের চেহারা হয়ে যাচ্ছে অক্ষয় কুমারের কেশরী ছবির পাঞ্জাবি যোদ্ধার মত – তাতে বিনাযুদ্ধে শুধু মেদিনীপুর নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুরাষ্ট্রের সবচেয়ে লক্ষ্মীসোনা রাজ্য হয়ে গেলেও আশ্চর্য হওয়া যাবে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

ওদের গুজরাটের মত, উত্তরপ্রদেশের মত শিক্ষা দেওয়া যাবে কী করে? সে আশাতেই তো বিরাট হিন্দু নেতাদের ভোট দেয়া। কিন্তু ওদের শিক্ষা দিতে দিতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অশিক্ষিত হয়ে যাবে না তো?

শুনুন ধর্মাবতার,

হিন্দুরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে হিন্দু নাগরিক হিসাবে যা যা অপরাধ করে ফেলেছি সেসব স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে এই চিঠি লিখছি।

অ্যাঁ, কী বলছেন? ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র? আজ্ঞে হ্যাঁ, তা তো বটেই। সংবিধান নামে ওই যে মোটা বইটা আছে, যেটার নামে নেতা, মন্ত্রীরা শপথ নেন এবং ভুলেও মনে রাখেন না – সে বইতে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে লেখা আছে তো বটেই। স্কুল কলেজে পড়েছিলুম সেসব। এমনকি দরকারে পড়ে দেখব বলে আর ছেলেপুলেকে শেখাব বলে বাড়িতে এক কপি কিনেও রেখেছি। কিন্তু কথা হচ্ছে, বইতে তো কত কথাই লেখা থাকে। সব মেনে চললে তো বাঁচা যাবে না। যেমন ধরুন ‘সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা বলিলে পাপ হয়’। এরকম কথা ছোটবেলায় কত বইতে পড়েছি। তা বলে কি সবসময় সব জায়গায় সত্যি কথা বলে বেড়াই? সকলে সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হয়ে গেলে আর আইন আদালত কোন কাজে লাগবে? কে সত্যি বলছে, কে মিথ্যে বলছে তার বিচার করতেই তো বিচারকরা আছেন। তা সংবিধানও একটা বই বৈ তো নয়। তার উপর আবার ইয়া মোটা। আজকাল তিন প্যারার বেশি ফেসবুক পোস্টই পড়ে ওঠা যায় না, অত মোটা বই কে পড়তে যাবে? ওসব জলাঞ্জলি দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, নয় কি? হোয়াটস্যাপেই এঁটে যাবে – দয়া করে এমন একটি সহজ ও ছোট সংবিধান বানিয়ে দিন না, মোটা ঝামেলাটি চিরতরে চুকে যাক। নতুন সংবিধানে ভারত যে হিন্দুরাষ্ট্র হবে তাতে তো সন্দেহ নেই, মানে চাদ্দিকে সবাই যখন বলছে দেশটা হিন্দুদের। তাই এখনই ক্ষমা-টমা চেয়ে পাপস্খালন করে রাখতে চাইছি আর কি, নইলে তখন যদি গদ্দার বলে শূলে চড়ানো হয়? মরণকালে হরিনাম করলে তো আর জীবন ফিরে পাওয়া যায় না, তাই প্রাণের মায়ায় কাজটা সেরে রাখছি।

প্রথম অপরাধটি করেছিলুম সেই ১৯৯২ সালে। আমার কোনো দোষ নেই, মাইরি বলছি। যত রাজ্যের হিন্দুবিরোধী খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেল দেখে বিশ্বাস করেছিলুম অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ভারি অন্যায় কাজ হয়েছে। ব্যাটা সেকুলার মিডিয়া আর পার্টিগুলো মিলে বুঝতেই দেয়নি যে বাল্মীকি, তুলসীদাস প্রমুখ রামায়ণ রচয়িতারা ভগবান শ্রীরামের জন্মস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ, মৌজা ও দাগ নম্বর লিখে না গিয়ে থাকলেও অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, উমা ভারতী, মুরলী মনোহর যোশীর মত দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা ঠিকই জানতেন যে একেবারে রামের ভূমিষ্ঠ হওয়ার জায়গাটিতেই পাপিষ্ঠ বাবর মসজিদ বানিয়ে ছেড়েছিল। আমার অজ্ঞানতা ক্ষমা করুন প্রভু।

সেই থেকে একের পর এক পাপ করেই চলেছি। এই ধরুন বাঙাল পরিবারের ছেলে হয়েও শিখে ফেলেছি দেশভাগের দায় হিন্দু, মুসলমান কোনো পক্ষের কম নয়। আরও শিখেছি ওপার থেকে যেমন ভিটেমাটি ছেড়ে অনেক হিন্দুকে এপারে চলে আসতে হয়েছিল, এপার থেকেও বিস্তর মুসলমান সব ফেলে ওপারে চলে গেছে। ওপারের লোক মোটেই সাধ করে চলে আসেনি, এপারের লোকও যে ড্যাং ড্যাং করে ওপারে পাড়ি দিয়েছে ঠিক তা নয়। এসব ঘোর বিজাতীয় কথাবার্তা যাঁরা শিখিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে দেহ রেখেছেন, ধর্মাবতার। ফলে আপনার কাজ কমেছে। যখন এক হোয়াটস্যাপ মেসেজ লম্বা সংবিধান অনুযায়ীও হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ শেষ হবে, তখন আর তেনাদের শাস্তি দেয়ার দরকার হবে না। আপনাদের হয়ে বরং আমিই তেনারা যা যা শিখিয়ে যেতে পারেননি তার জন্যে দু-চাট্টি গাল পেড়ে নিই।

যেখানে ইচ্ছে যত ইচ্ছে অন্যায় করে সবই বাবর ও তার চোদ্দ গুষ্টির পাপের শোধ তোলা হচ্ছে বলে ব্যাখ্যা করতে তাঁরা শিখিয়ে যাননি। মুসলমান মানেই মোগল আর মোগল মানেই রক্তপিশাচ বজ্জাত – এ কথাটি শিখিয়ে যাননি, মায় ওদের যে একটু শিক্ষা দিয়ে রাখা উচিত তা অবধি শিখিয়ে যাননি। কী ঝামেলা বলুন দেখি? অমৃতকালটি যে চেটেপুটে উপভোগ করব তার ব্যবস্থাই করে গেলেন না! তবে আর কী ছেলেপুলে মানুষ করলেন? ঘোর কলি। এখন দাড়িওলা, বন্দে ভারতে সওয়ার কল্কি অবতার যদি এর প্রতিকার করেন তবেই এ অধমের স্বর্গবাসের রাস্তা খোলে।

একটু ধৈর্য ধরুন, ধর্মাবতার। আমার পাপের এখানেই শেষ নয়। দ্বিগুণ পাপ করলুম ২০০২ সালে। ২৪ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরায় মহান করসেবকদের ট্রেনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর কয়েকদিন সামান্য একটু প্রতিক্রিয়া হল। অথচ ফের হিন্দুবিরোধী মিডিয়ার কথায়, ছবিতে বিশ্বাস করলুম ঘোর অন্যায় হচ্ছে। নারোদা পাটিয়া, নারোদা গাম, গুলবার্গ সোসাইটি – এসব জায়গার নাম মুখস্থ করে ফেললুম। আহসান জাফরিকে খুন করা হয়েছেবিলকিস বানোকে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে, পুলিস দেখেও কিছু দেখেনি, এমনকি মায়া কোদনানির মত মন্ত্রীসান্ত্রীরা দাঁড়িয়ে থেকে এসব করিয়েছেন – এমন গালগল্পে বিশ্বাস করে ফেললুম। একবারও ভেবে দেখলুম না, এক নিষ্ঠাবান হিন্দু মহিলা যাঁর নামেই রয়েছে মায়া, তিনি এমন মায়াদয়াহীন হতেই পারেন না। এসব হিন্দু সমাজকে বদনাম করার চক্রান্ত। গুজরাট মানে আসলে ভাইব্র্যান্ট গুজরাট, যেখানে মাঠে মাঠে ফসল আছে, গাছে গাছে পাখি আছে, ঘরে ঘরে চাকরি, থুড়ি ব্যবসা, আছে। যারা অন্য কথা বলে তাদের হিন্দু হৃদয়সম্রাটকে গাল পাড়া ছাড়া আর কাজ নেই – এই সহজ কথাটা বুঝে উঠতে পারিনি। চাকরি সূত্রে ও রাজ্যে থাকা আত্মীয়স্বজন শুভানুধ্যায়ীরা অনেকবার বলেছে, তেমন কিছুই হয়নি ওখানে। কেবল মায়ের পেট থেকে পড়েই আরডিএক্স চিনে যায় যারা, তাদের একটু শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এমন শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে এখন গুজরাটের মত শান্ত রাজ্য আর নেই। কিন্তু সেকথা শুনে বিশ্বাস করিনি। কাউকে কাউকে মুখের উপর বলে দিয়েছি, ওটা শ্মশানের শান্তি।

ছ্যা ছ্যা! কী পাপ বলুন দেখি! একেবারেই উচিত হয়নি এসব বলা। এই তো কেমন ধীরে ধীরে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, কেবল নারোদা পাটিয়া বা নারোদা গাম কেন, ২০০২ সালে গুজরাটের কোথাও কেউ কাউকে খুন করেনি। ধর্ষণ যারা করেছিল তারাও সব নিপাট ভালমানুষ, বামুন বাড়ির ভদ্র ছেলেপুলে। তাই তাদের খামোকা সারাজীবন জেলের অন্ধকূপে আটকে রাখার মানে হয় না। তাদের এত সুখ আছে, এত সাধ আছে। সবকিছু থেকে বঞ্চিত হবে? না হয় তাদের দেখে কিছু লোক সাহস পেয়েছে, না হয় কাশ্মীরের কাঠুয়ায় বছর আষ্টেকের শিশুকেও ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে, না হয় ধর্ষকদের বাঁচাতে হিন্দুরা গোটা কতক মিছিল মিটিংই করেছে, মৃত শিশুর উকিলকে খুনের হুমকি দিয়েছে। সে আর তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, বোকো হারামের অপরাধের তুলনায় কতটুকু? গেরুয়া পরে তো কেউ সন্ত্রাসবাদী হতে পারে না, ওসব কংগ্রেসি প্রোপাগান্ডা। গেরুয়া পরে কেবল এমপি, এমএলএ, মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়। কারণ তালিবানদের কেউ ভোট দেয় না, গেরুয়া পরে বোম ফিট করার অভিযোগ উঠলে দেয়। কারণ ওটি বীরত্ব।

আরও পড়ুন বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

দেশটা এখন বীরে বীরে বীরাক্কার। এদিকে আমার বীরেদের মর্যাদা দিতেও শেখা হয়নি। সেকুলাররা মাথাটা এমন খেয়েছে, কী বলব ধর্মাবতার, গোমাতাকে মাংস বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বা খাচ্ছে – এই অভিযোগে কাউকে উচিত শাস্তি দেয় যারা তাদের আমি ভেবেছি ‘লিঞ্চ মব’। এইসব সাহেবদের শেখানো কথাবার্তা, বুঝলেন কিনা? আমাদের দেশের কোনো ভাষায় ও কথাটা আছে? নেই, কারণ আমাদের দেশে ওরকম হয় না। আমাদের এখানে কেবল গোমাতার অসম্মান করলে উচিত শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা যারা দেয় তারা সব খোদ রাণাপ্রতাপের লোক, মানে সেই যিনি হলদিঘাটের যুদ্ধে আকবরের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। এই দেখুন, যত পাপই করে থাকি, আমার কিন্তু শুধরে নেওয়ার চেষ্টা আছে। যত রাজ্যের কমুনিস্টের লেখা ইতিহাস পড়ে শিখেছিলুম রাণাপ্রতাপ নাকি হেরে গেছিলেন। তা আবার হয় নাকি? ওই গরুখেকো মোগলদের কাছে আমাদের বিরাট হিন্দু রাজপুতরা কখনো হারতে পারে?

এত বছরের এত পাপ সব আপনার পায়ে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলুম। এবার থেকে একেবারে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে যাব, কথা দিচ্ছি। শুধু একটা ব্যাপারেই মনটা একটু খচখচ করছে, আপনি মাইবাপ, তাই আপনাকেই বলছি। হিন্দুরাষ্ট্র হওয়া যে দরকার তাতে সন্দেহ নেই। নইলে ওদের গুজরাটের মত, উত্তরপ্রদেশের মত শিক্ষা দেওয়া যাবে কী করে? সে আশাতেই তো বিরাট হিন্দু নেতাদের ভোট দেয়া। কিন্তু ওদের শিক্ষা দিতে দিতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অশিক্ষিত হয়ে যাবে না তো? ডারউইন বলেছিলেন মানুষ বাঁদর ছিল। আমাদের মুনি ঋষিরা বলেননি, তাই বোধহয় ওসব বই থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারভিউতে “অমৃতস্য পুত্রাঃ” বলে-টলে আমাদের ছেলেপুলেগুলো চাকরি বাকরি পাবে তো, ধর্মাবতার? না, মানে বলছি চাকরি বাকরি তো এদেশে বিশেষ নেই, বিদেশেই খোঁজ করতে হবে। সেখানে এসব বললে আবার হাঁকড়ে দেবে না তো অশিক্ষিত লালমুখো সাহেবগুলো?

আর আপনার সময় নষ্ট করব না ধর্মাবতার। কেবল একখানা শেষ প্রশ্ন আছে। বলি বিলকিস বানোর ওই যে ভালমানুষ ধর্ষকগুলি, তাদের আবার মুসলমানদের শিক্ষা দেয়া হয়ে গেলে আমাদের মেয়েদের শিক্ষা দেয়ার প্ল্যান আছে নাকি? না, মানে হিন্দুরাষ্ট্রে কি মুসলমান থাকতে দেয়া হবে? না হলে এই লক্ষ লক্ষ বীরেরা করবেটা কী? শিক্ষা দেয়া ছাড়া আর কোনো বিদ্যে কি এদের আছে?

অপরাধ নেবেন না হুজুর। এসব প্রশ্ন করব কাকে? কল্কি অবতার তো আর প্রেস কনফারেন্স করেন না, তেনার এজলাসও নেই। অগত্যা আপনাকেই করলুম আর কি। তাছাড়া আমাদের সাধুসন্তরা বলেছেন, সবই মায়া। তাই ছোট মুখে বড় কথা বলে অপরাধ হয়ে থাকলে মায়া বলে মামলা ডিসমিস করে দেবেন, এই আশা রাখি।

বিনয়াবনত

হিন্দুরাষ্ট্রের এক হিন্দু নাগরিক

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর।

চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
চোলি কে পিছে?
চুনরী কে নীচে কেয়া হ্যায়
চুনরী কে নীচে?

আমাদের তখন সবে গোঁফের রেখা উঠছে। সন্ধেবেলা দূরদর্শনের ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক ছবির এই গান পরপর কয়েক সপ্তাহ বেজেছিল এবং আমাদের উদ্বেল করেছিল। তখনো বাঙালি ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই হিন্দিতে পণ্ডিত হয়ে যেত না, ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও দলে দলে হিন্দিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা করে তুলতে উদগ্রীব হতেন না। ফলে চোলি আর চুনরী শব্দদুটির অর্থ জানতে আমাদের কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল। জানার পর আমাদের রোমাঞ্চ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল তা আজকের স্মার্টফোন প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিছুদিন পরে সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিতে কেউ বা কারা আদালতে মামলা ঠুকে দিল। গানটি শ্লীল না অশ্লীল তা নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি লেগে গেল, কিছুদিন পরে দেখা গেল জনপ্রিয়তায় একসময় এক নম্বরে উঠে যাওয়া ওই গান আর ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে বাজানো হচ্ছে না। ইলা অরুণের গাওয়া ওই চারটি লাইন মোটেই অশালীন নয় – এই যুক্তির পক্ষে যারা, তাদের হাতিয়ার ছিল অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া পরের কয়েক লাইন

চোলি মে দিল হ্যায় মেরা
চুনরী মে দিল হ্যায় মেরা
ইয়ে দিল ম্যায় দুঙ্গি মেরে ইয়ার কো, পেয়ার কো।

অকাট্য যুক্তি। ছবিতে দেখা যেত এক নাচাগানার আসরে নীনা গুপ্তা গানের প্রথম চার লাইনের প্রশ্নটি তুলছেন, আর লাস্যময়ী মাধুরী দীক্ষিত স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। অতএব অন্য কিছু ভাবার তো কোনো কারণ নেই। যতদূর মনে পড়ে আদালতে গানটির অশ্লীলতা প্রমাণ হয়নি, তাই প্রায় একই যুগের খুদ্দার ছবির অন্য একটি গান ‘সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’-র মত আদালতের নির্দেশে গানের কথা বদল করে নতুন করে প্রকাশ করতে হয়নি। কিন্তু ঘটনা হল, চোলির পিছনে আর চুনরীর নিচে যা আছে তা নিয়ে আমাদের রোমাঞ্চে জল ঢালা সম্ভব হয়নি। আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম কী আছে – দিল না অন্য কিছু।

২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর কী ঘটেছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদীর কতখানি দায় ছিল, আদৌ ছিল কি ছিল না – এ প্রশ্ন উঠলেই আমার ওই গানটির কথাই মনে পড়ে। হৃদয় তো অনেক গভীরে গেলে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেপুলেদের অতদূর যাওয়ার ধৈর্য থাকে না। আমরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কিন ডিপ’, ওই গানের সে অর্থটুকু ভেবেই আহ্লাদিত হতাম। দূরবর্তী কোনো মাইক থেকে গানটি ভেসে এলে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত, ঠোঁটে থাকত দুষ্টু হাসি। তা বলে কি আমাদের মধ্যে একটিও সুবোধ বালক ছিল না? তারা আমাদের অসভ্য উল্লাস দেখে যারপরনাই বিরক্ত হত। দু-একজন খাঁটি সাত্ত্বিক মানসিকতায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করত, আমরা গানটির একেবারে ভুল অর্থ ভেবে নিচ্ছি। একই গানের কথার যে একাধিক অর্থ হওয়া সম্ভব সে শিক্ষা আমরা তখনই পাই – রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরতা বা ভারতচন্দ্রের ব্যাজস্তুতিকে স্পর্শ করার আগেই।

বিলিতি কবিতার রোম্যান্টিক যুগের কবিরা মনে করতেন মানুষ অমৃতের সন্তান। জন্মের পরেও বেশ কিছুদিন সে নিষ্পাপ থাকে, তারপর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে পাপ প্রবেশ করে, পবিত্রতা বিদায় নেয়। কবি উইলিয়াম ব্লেক Songs of Innocence আর Songs of Experience নামে দুটি পরিপূরক কবিতার বই লিখে ফেলেছিলেন, আর উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন এ জগৎ হল কারাগার। একটি ছেলে যত বড় হয় তত তার চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসে সে কারাগারের গরাদ (“Shades of the prison-house begin to close/Upon the growing Boy”)। ২০০২ সালের মত ঘটনা যখন ঘটে তখন মানুষ অমৃতের সন্তান না মৃত্যুর সওদাগর তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দেয়। তবে এখন পিছন ফিরে মনে হয় মাধুরীর চোলি যেমন আমাদের নিষ্পাপ নাবালকত্ব থেকে অভিজ্ঞ সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনই গুজরাট ২০০২ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাম জন্মভূমি নিয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা আর মসজিদ ভাঙার রাজনীতির নাবালকত্ব থেকে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক মামলায় রায় দিয়েছে – কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির পিছনে কোনো বৃহত্তর অপরাধমূলক চক্রান্ত ছিল না। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদীরও কোনো প্রত্যক্ষ দায় ছিল না। এর উপরে আর কথা কী? কে না জানে, ভারতের বিচারব্যবস্থার মত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই? সেই কারণেই তো বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী সরকার। তাদের অভিযোগ – ব্যবস্থাটি অগণতান্ত্রিক। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় প্রায় বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। কী কাণ্ড! যে ব্যবস্থা মোদীর বিরুদ্ধে যাবতীয় রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে তাঁকে পদ্মফুলের মত নিষ্পাপ প্রমাণ করেছে, সেই ব্যবস্থাকে কিনা তাঁর সরকারই মনে করে অগণতান্ত্রিক!

এমন সময়, হাঁউ মাউ খাঁউ, গণহত্যার গন্ধ পাঁউ বলে এসে পড়ল বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন। নতুন করে উঠে পড়ল চোলির পিছনে কী আছে সেই প্রশ্ন। এইবেলা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক, উদাহরণ হিসাবে শুধুমাত্র বিপরীতকামী পুরুষদের মধ্যে চালু থাকা নারীদেহ সম্পর্কে একটি রগরগে আলোচনাকে কেন টেনে এনেছি। কারণটি খুব সোজা। ওই যে বললাম, আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম? লক্ষ করলে দেখা যাবে, গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল বিজেপির ভোটাররাও ঠিক একইভাবে যে যার মত করে বুঝে নিয়েছে। ওই যে বললাম, গানটি ভেসে এলেই আমাদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত? ঠিক একই ব্যাপার বিজেপি ও তার ভোটারদের মধ্যে চলে। বিবিসির তথ্যচিত্রে যা যা দেখানো হয়েছে তার কিছুই কিন্তু নতুন নয়। নতুন খবর বলতে এটুকুই, যে ব্রিটিশ সরকার এক নিজস্ব তদন্ত চালিয়েছিল, যার সিদ্ধান্ত হল মোদী স্বয়ং দায়ী। যে সমস্ত প্রমাণ, যেসব সাক্ষীকে এই তথ্যচিত্রের দর্শকরা দেখছেন তাঁদের কথা ভারতের বহু ছোটবড় সংবাদমাধ্যমে গত দুই দশকে প্রকাশিত হয়েছে। রাকেশ শর্মার তথ্যচিত্র ফাইনাল সলিউশন দেখলে বিবিসির তথ্যচিত্রের চেয়েও বেশি ঠান্ডা স্রোত নামবে শিরদাঁড়া বেয়ে। সেই তথ্যচিত্রটি যখন ইউটিউবে প্রথম আপলোড করা হয়, তখন সরকারের হাতে তা ব্লক করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু দলে দলে লোক বারবার রিপোর্ট করে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ব্লক করিয়ে দিয়েছিল।

ফলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উঠলেই প্রত্যেকবার বিজেপি নেতা ও সমর্থকদের থেকে দুরকম উত্তর পাওয়া যায়। এক দল বলে, সব বানানো গল্প। সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে। আরেক দল বলে, যা করেছে বেশ করেছে। মুসলমানদের বেশি বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। অমিত শাহ স্বয়ং যেমন সংবাদসংস্থা এএনআইকে বলেছিলেন, মোদীজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই অভিযোগকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আবার সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ২০০২ সালে মোদীজি যারা হিংসা ছড়ায় তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে গুজরাটে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার যা পছন্দ সে তাই বুঝে নেবে।

আমরাও ঠিক এমনই করতাম। এক দল মাধুরীর হৃদয় নিয়ে ভাবত, আরেক দল মাংসপিণ্ড নিয়ে। এমন চোলিকেন্দ্রিক পৌরুষই যে গুজরাট ২০০২-এর অভিজ্ঞান তা আর কেউ না জানলেও বিলকিস বানো বিলক্ষণ জানেন।

ভারত সরকার ইউটিউবে বিবিসির তথ্যচিত্রের যত লিঙ্ক আছে সব ব্লক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবিসির তথ্যচিত্রের লিঙ্ক শেয়ার করায় বেশকিছু টুইটও মুছে দিতে বলেছে। যদি বলি এই সাবালক জীবনের চেয়ে সেই নাবালক জীবন ভাল ছিল, তাহলে স্রেফ স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি বলা যাবে কি? তখন ভারত রাষ্ট্র স্রেফ যৌনতাকেই অশ্লীল বলে বিবেচনা করত, ঢেকেঢুকে রেখে, গানের কথা বদলে দিয়ে বা কোনো ফিল্মের গোটা দু-চার চুম্বন দৃশ্য বাদ দিয়েই নিজের ক্ষমতা জানান দিত। তাও কেউ আদালতে দৌড়লে তবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে অসত্য বলে দেগে দিয়ে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে এক্ষেত্রে। কদিন আগেই, গত মঙ্গলবার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া সংশোধনীর এক খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো যে খবরকে ভুয়ো খবর বলে ঘোষণা করবে সে খবর কোনো সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যাবে না। শেয়ার হলে তার দায়িত্ব বর্তাবে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির উপর।

অর্থাৎ আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো হয়ত এমনই বলবে। তা সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি বলতেই পারে। কিন্তু যত বলবে ততই চোলির পিছনে কী আছে সে প্রশ্ন জোরালো হবে। সরকারের এখনো চোলি কেন প্রয়োজন – সে প্রশ্নও উঠবে নির্ঘাত। কারণ গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত, এমনকি শাস্তিপ্রাপ্তরাও তো এখন মুক্ত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের সত্যতা প্রমাণ করে গারদ ঘনিয়ে এসেছে কেবল উমর খালিদ, শার্জিল ইমামদের মত নাবালকদের উপর – যারা গালভর্তি দাড়ি গজিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষকে মৃত্যুর সওদাগর ভাবার সাবালকত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আরও পড়ুন অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

সামান্য আশাবাদী অবশ্য হওয়া যায় একথা ভেবে, যে সরকারের এখনো খানিক লজ্জাশরম আছে বলেই চোলির প্রয়োজন পড়ছে। তবে ইন্টারনেটের যুগে চোলি যথাস্থানে রাখা লৌহকঠিন সরকারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য। শীত বড়জোর আর এক মাস। তারপর বসন্ত সমীরণে ভোরের দিকে হাওড়ার ফেরিঘাট থেকে যদি বাগবাজার অভিমুখে নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন ভাগীরথীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসেছেন অনেকে। তাঁরা বসেন নদীর দিকে পিছন ফিরে। তাতে সুবিধা হল, আপনি তাঁদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলেও তাঁরা আপনাকে দেখতে পান না। ফলে ভেবে নেওয়া সহজ হয় যে আপনিও তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। ইন্টারনেটে একটি দেশের মধ্যে তথ্য ও তথ্যচিত্র ব্লক করা এমনই ব্যাপার। অবশ্য আত্মপ্রতারণা ছাড়া একনায়কত্ব বাঁচে কেমন করে?

পুনশ্চ: বিবিসির তথ্যচিত্রের নামে পার্ট ওয়ান কথাটি রয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতের হিট ছবির সংলাপের ভাষায় “অভি তো হমে ঔর জলীল হোনা হ্যায়।”

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

মমতা ও পশ্চিমবঙ্গ: মাঝির হাতেই নৌকাডুবি?

মঙ্গলবার দুপুরে যখন সরকার নির্ধারিত স্থান উপচে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে গিয়ে পড়েছে সিপিএমের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মিটিং, সেইসময় একটি জনপ্রিয় বাংলা খবরের চ্যানেল সে মিটিং না দেখিয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যের গ্রেপ্তারের খবর দেখাচ্ছিল। অ্যাঙ্কর, নিউজরুমে দাঁড়ানো এক সাংবাদিক এবং আরও এক প্রতিবেদকের মধ্যে এসএসসি দুর্নীতির চর্বিতচর্বণ চলছিল। অনিবার্যভাবে এসে পড়ছিল অর্পিতা-পার্থ সম্পর্কের আলোচনা। তার খানিকক্ষণ আগেই ওই চ্যানেলে ফ্লোরা সাইনি বলে কোনো এক মডেলের চেহারা ফটোশুটের আগে কীভাবে বদলে যায় তা-ও দেখানো হচ্ছিল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। কোন চ্যানেলে ‘ইনসাফ’ আন্দোলন কীভাবে দেখানো হচ্ছে দেখতে গিয়ে ওই চ্যানেলটিতে গিয়েই বারবার হতাশ হতে হচ্ছিল। এমনকি মাঝে মাঝে প্রধান খবর বলে পরপর যে খবরগুলোর ঝলক দেখানো হয়, সেখানেও ইনসাফ সভার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হচ্ছিল, সাক্ষাৎকারে ধর্মাবতার অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় কেমন তিনমাস জেলের ভয় দেখিয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জিকে।

হঠাৎই সেই চ্যানেলেও লাইভ হয়ে গেল সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তৃতা। সমস্তটাই লাইভ হল। শুধু ওই একটি চ্যানেল নয়, কোনো চ্যানেলেই কমিউনিস্টরা আবার সেকালের মত কলকাতাকে অচল করে দিয়েছে, নৈরাজ্যের দিন ফিরিয়ে আনছে, পুলিসের কথা না শুনে ঘোর অন্যায় করছে – এরকম অভিযোগ উঠতে দেখলাম না। ওই জমায়েতের জন্য কোন রাস্তায় কত বড় যানজট তৈরি হয়েছে, কার প্লেন মিস হয়ে যাচ্ছে, কে ইন্টারভিউতে পৌঁছতে পারল না – এই নিয়ে অশ্রু বিসর্জনও চোখে পড়ল না। বরং বিজেপি মনোনীত প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদের চ্যানেলের স্টুডিও যেভাবে সাজানো হয়েছিল এবং অ্যাঙ্কররা যেরকম উদ্দীপ্ত ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল গণশক্তি নতুন চ্যানেল খুলেছে। কলকাতার যে খবরের কাগজটি মিটিং মিছিলে সাধারণ নাগরিকের অসুবিধা নিয়ে সাধারণত সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকে, তাদের বুধবার সকালের সংস্করণেও ইনসাফ সভার প্রতিবেদনে ওসব নিয়ে একটি শব্দ নেই।

কলকাতার সংবাদমাধ্যম দারুণ বিরোধী-বান্ধব – এমন অভিযোগ মমতা ব্যানার্জিও করবেন না। তাহলে এ হেন আচরণের কারণ কী? একটা কারণ নির্ঘাত প্রস্তুতির অভাব। জনতা যে আসলে চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিল, সে স্টোরির প্রস্তুতি থাকে ব্রিগেডে মিটিং হলে। যানজট ইত্যাদিও খেয়াল রাখা হয় সেইসব দিনে। কিন্তু ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে হওয়ার কথা যে জমায়েত, তা যে গোটা ধর্মতলা দখল করে নেবে তা বোধহয় কোনো প্রথিতযশা চ্যানেল সম্পাদক আন্দাজ করতে পারেননি। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে খুঁত ধরতে অসুবিধা হতে পারে, প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে কেন? মাসখানেক আগে ওই ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে থেকেই চাকরির দাবিতে ৫০০ দিন ধরে মেয়ো রোডে বসে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছ পর্যন্ত একটি নাগরিক মিছিলের ডাক দিয়েছিল বামেরা। লেখার প্রয়োজনে এবং কিছুটা নিজের প্রতিবাদ জানানোর তাগিদে সেদিন গিয়েছিলাম। সেই মিছিলে নেতারা এবং বিখ্যাতরা ছিলেন, কিন্তু প্রাণ ছিল না। লাভ বলতে এক প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ। সে গিয়েছিল নিজের কাগজ থেকে মিছিল কভার করতে। বলেছিল, কলকাতার সংবাদমাধ্যম নাকি এখন বামেদের প্রতি কিছুটা নরম হয়েছে। চাইছে বামেদের হাল ফিরুক। সেদিন কথাটা খুব একটা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মঙ্গলবারের পর বিশ্বাস না করে উপায় নেই।

কথা হল, সংবাদমাধ্যমের নরম হওয়ার প্রয়োজন কী? বিজ্ঞাপনের রাশ তো এখনো নবান্নের হাতেই। সিবিআই আর ইডি যতই জ্বালাতন করুক, সাংবাদিকদের প্রয়োজনে টাইট দেওয়ার জন্য কেস দিতে রাজ্য পুলিস তো আছেই। আসলে হাজার হোক, চ্যানেলের টিআরপি চাই। কাগজেরও পাঠকের মর্জি কিছুটা খেয়াল রাখতেই হয়। বহু দর্শক/পাঠকেরই মর্জি যে গত কয়েক মাসে সরকারবিরোধী হয়ে উঠেছে তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাজারে আলু পটল ঝিঙে মাছ মাংস কিনতে যাওয়া সম্পাদকরাও দিব্যি টের পাচ্ছেন।

বিধানসভার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যে বিশ্লেষণ এ রাজ্যে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল, তা হল কোনো সরকারবিরোধী হাওয়া আদপেই ছিল না। সবটাই বিরোধীদের কল্পনা। বিজেপির ভোট ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন থেকে এক লাফে ২৮.১৩% বাড়ল। মুখ্যমন্ত্রী নিজে হেরে গেছেন কিন্তু তাঁর পার্টি জিতেছে – এমন ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। ঠিক তাই ঘটল, অথচ প্রাজ্ঞ সম্পাদক এবং তৃণমূল সমর্থকরা ঘোষণা করলেন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো হাওয়া ছিল না। কেউ কেউ বললেন মমতা হেরেছেন শুভেন্দু অধিকারীর ধর্মীয় মেরুকরণমূলক প্রচারের কারণে, তার সঙ্গে সরকারের প্রতি অসন্তোষের কোনো সম্পর্ক নেই। আশ্চর্য! জ্যোতি বসুর পরে বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নাকি স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে হেরে গেছেন। এসব বলে আসলে যা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে, তা হল সরকারবিরোধী হাওয়া টেনে নিয়েছিল বিজেপি। সাধারণ ভোটার তৃণমূল নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি নিয়ে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিজেপির পরাজিত প্রার্থীদের তালিকায় তৃণমূলাগতদের বিরাট উপস্থিতিই তার প্রমাণ। কিন্তু মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল অটুট। দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষের সাথে কথা বললেই শোনা যেত, তাঁরা মনে করেন অমুক নেতাটা বদমাইশ কিন্তু দিদি ভাল। তমুক মন্ত্রী চোর কিন্তু দিদি ভাল। অনেকের মতেই ভাইপোও সুবিধের লোক নয়, কিন্তু মমতা ভাল। তাঁর দুর্ভাগ্য, এইসব আজেবাজে লোককে নিয়ে চলতে হয়। ফলে দুর্নীতিগ্রস্তরা “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে বিজেপিতে চলে যাওয়ায় মমতার জনপ্রিয়তা বরং বেড়েই গিয়েছিল। তিনি নন্দীগ্রামে হারলেন স্থানীয় বটগাছ শুভেন্দুর কাছে, অন্য কেউ প্রার্থী হলেই হয়ত জিতে জেতেন। কিন্তু এ কথা তো সত্যি, যে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা আসলে ২৯৪ আসনেই প্রার্থী। ভোটাররা যাদের অপছন্দ করছিলেন তারা দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় প্রসন্ন চিত্তে আবার মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এই গগনচুম্বী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কিন্তু আজ টলমল করছে।

ইনসাফ সভায় লোক টানতে মীনাক্ষী মুখার্জি, কলতান দাশগুপ্তরা স্থানীয় স্তরে অসংখ্য ছোট ছোট সভা করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংগঠনের একেবারে নিচের স্তর থেকে ইমারত গড়ে তোলার চেষ্টা। এ মাসে সিপিএম রাজ্যের প্রত্যেকটা পঞ্চায়েতে ডেপুটেশন দেওয়ার কর্মসূচিও নিয়েছে। সেই ডেপুটেশনের প্রস্তুতি হিসাবে আবার প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যেক পাড়ায় স্ট্রিট কর্নার হচ্ছে। এর আগে হয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ অভিযান। এই সক্রিয়তা শুধু যে গত ১১ বছরে দেখা যায়নি তা-ই নয়, শ্বেতশুভ্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে জনসংযোগে এমনই ভাঁটা পড়েছিল যে লেখাপড়া জানা শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ছাড়া অধিকাংশ মানুষেরই মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলকে দূর গ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হত। তার বিপরীতে মমতা কাছের লোক। যে ভাষা বিভ্রাটের জন্য মমতা নাক উঁচু সিপিএম কর্মী সমর্থকদের হাসির পাত্র, সে ভাষা একজন রিকশাচালক বা পরিচারিকাকে মনে করাত তিনি কাছের মানুষ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে মমতার দেবীপ্রতিম জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল এভাবেই। সেই জনপ্রিয়তা তাঁর দলকে নিঃসন্দেহে ২০২১ উতরে দিতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু ইদানীং সব ধরনের মানুষের বিশ্বাসেই চিড় ধরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কেন?

একসময় হিট বাংলা ছবির রিমেক হত বলিউডে এবং সে ছবিও হিট হত। সেভাবেই অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নিশি পদ্ম শক্তি সামন্তের হাতে হয়েছিল অমর প্রেম। সে ছবির গান তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। গীতিকার আনন্দ বক্সী একটি গানে তুলেছিলেন মোক্ষম প্রশ্ন – মাঝনদীতে নৌকো দুললে তো মাঝি সামলে-সুমলে পারে নৌকো ভেড়ায়, কিন্তু মাঝি নিজেই নৌকো ডুবিয়ে দেবে ঠিক করলে সে নৌকোকে বাঁচাবে কে (মজধার মে নইয়া ডোলে/তো মাঝি পার লগায়ে।/মাঝি জো নাও ডুবোয়ে/উসে কৌন বচায়ে)? অতি সাম্প্রতিককালে সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এই জাতীয় সংশয় তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। এসএসসি দুর্নীতি অবধি তবু ঠিক ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ সমর্থন করতে যাননি, বরং ঝটপট মন্ত্রিসভা থেকে পার্থকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। ফলে ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি দিদি সমর্থন করেন – এমন ভাবার অবকাশ তৈরি হয়নি। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডলের বেলায় দিদির একেবারে অন্য রূপ। কেষ্টবাবুর ঘরে নোটের পাহাড় দেখা যায়নি বটে, কিন্তু রোজই তাঁর বিপুল পরিমাণ ফিক্সড ডিপোজিট, জমিজমা, সাদা-কালো ব্যবসার কাহিনি প্রকাশিত হচ্ছে। দিদি কিন্তু বরাভয় নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন যেদিন ফিরে আসবে, সেদিন বীরের সম্মান দিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যে মানুষ নিশ্চিন্তে ছিলেন এই ভেবে, যে আশেপাশে চোর ডাকাত থাকলেও নৌকার হাল দিদির হাতে, তিনি এরপর কী ভাবছেন কে জানে? একথা ঠিক যে নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদেরও মমতা একইভাবে সমর্থন করেছিলেন, তাতে জনপ্রিয়তা কমেনি। কিন্তু মানুষের ধৈর্যেরও সীমা থাকে, আর সে সীমা কখন লঙ্ঘিত হয় কেউ জানে না। হয়ত বিরোধীদের সক্রিয়তার মাত্রাও সেই সীমা নিয়ন্ত্রণ করে। নারদ কেলেঙ্কারির পর পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা সাংবাদিক সম্মেলন ছাড়া আর কী করেছিলেন মনে করতে বেশ কষ্ট হবে।

কারণ যা-ই থাক, গত কয়েক মাসে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে। দোকানে বাজারে মানুষ মমতার সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। একজন রিকশাচালক এমনকি তাঁর হাওয়াই চটি, নীল পাড় সাদা শাড়িতেও দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন। সেসবের দাম সম্পর্কে এমন সব কথা উড়ে বেড়াচ্ছে যেগুলো নিঃসন্দেহে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির অবদান। নতুনত্ব এইখানে, যে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি এর আগে মমতাকে মমতাজ বলত, আরও নানা অশ্লীল ব্যক্তিগত আক্রমণ করত। কিন্তু মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত বললে ভাইরাল হওয়া যাবে না – ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকদের কাছে বোধহয় এরকমই তথ্য ছিল। সে তথ্য কি বদলে গেল?

একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। রাজ্যে চাকরি-বাকরি নেই; চাকরি সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির তদন্তেই সিবিআই, ইডির রমরমা। ওদিকে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জড়িয়ে পড়লেন ভুয়ো চাকরি বিলোবার কাণ্ডে। ঘটা করে সভা ডেকে চাকরির নিয়োগপত্র বলে যা বিলোলেন তা প্রথমত বেসরকারি চাকরির। তারপর জানা গেল ওগুলো সঠিক অর্থে চাকরিও নয়, শিক্ষানবিশির সুযোগ মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের যা অবস্থা তাতে অসহায় যুবকরা ওই মোটা অফারই মাথায় তুলে নিতেন নিশ্চয়ই, কিন্তু অতঃপর ঝুলি থেকে বেরোল প্রফেসর শঙ্কুর ‘মরুরহস্য’ গল্পের বিজ্ঞানী ডিমেট্রিয়াসের পোষ্যের আকারের একটি বেড়াল। যে সংস্থার অফার লেটার দেওয়া হয়েছে সেই সংস্থা আদৌ ওগুলি ইস্যু করেনি। চিঠিতে যাঁর সই রয়েছে সেই বেদপ্রকাশ সিং সটান বলে দিলেন চিঠিগুলি ভুয়ো। ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গান্ধীজির তিন বাঁদর হয়ে বসেছিল। তারপর থেকে মন্ত্রী, আমলা যাকেই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছে তিনিই বলেছেন তিনি কিছু জানেন না। জানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ফলে মাঝির নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় ঢুকে পড়ল এখানেও।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন মানুষও আছেন যাঁরা তৃণমূলে দুর্নীতি আছে, শঠতা আছে জেনে, তৃণমূল নেতারা সন্ত্রাস চালান মেনে, মমতাকে ভক্তি না করেও তাঁর মুখ চেয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন। কারণ তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। অধুনা তাঁরাও মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় পাচ্ছেন, পেতে বাধ্য। গত বছর এ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচার রাজ্য সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে হয়নি বলা যায়। যদি বলা হয় ভোটটাকে করে তোলা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে গণভোট, তাহলে ভুল হবে না। সেই ভোটে জিতলেন মমতা। তারপর থেকে গত এক বছরে তিনি কী কী করেছেন? বিজেপির দুই নেতাকে দলে নিয়ে একজনকে সাংসদ, আরেকজনকে বিধায়ক তথা মন্ত্রী করেছেন। আরেকজন প্রবীণ বিজেপি নেতাকে দলে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করে সারা ভারতের বিরোধীদের সমর্থন জোগাড় করেছেন। তারপর শেষ মুহূর্তে বলেছেন আগে জানলে বিজেপি মনোনীত প্রার্থীকেই সমর্থন করতেন। তারপর উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের সম্মিলিতভাবে মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন করেননি। সেখানেই শেষ নয়। কদিন আগে বলেছেন বিজেপি খারাপ, আরএসএস খারাপ নয়। শেষমেশ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভাল, অন্য বিজেপি নেতারা ইডি, সিবিআইকে কাজে লাগাচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তো মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় করবেনই।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

এমন হতেই পারে যে এরপরেও মমতা তথা তাঁর দল হইহই করে নির্বাচনে জিতবে। তবে মনে রাখা ভাল, রাজনীতিতে অমর প্রেম বলে কিছু হয় না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

%d bloggers like this: