নতুন করে পাব বলে

কেবল ঠেলে খনির গভীরে পাঠানো তো নয়, আরেক রকম ব্যবস্থাও আছে

20200508_164038-COLLAGE.jpg

প্রিয় কবি,

আপনার সাথে আমার সংলাপে বিপত্তির অন্ত নেই। এক দিকে খবরদারি, অন্য দিকে দেখনদারি। আপনাকে নিজের করে পাবার জো নেই।

এক দল টিকি নেড়ে বলবে “রবীন্দ্রনাথকে যেখানে সেখানে যেভাবে ইচ্ছে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিলেই হল? নিয়ম কানুন নেই? আজ প্রত্যুষে শুকতারাটি অমুক কোণে স্থির হয়ে ছিল কি? না হয়ে থাকলে কোন আক্কেলে গুনগুনিয়ে ‘ধীরে ধীরে ধীরে বও’ গাইছিলে? বলি ভোরের বেলার তারা তুমি পেলে কোথায়?”

আবার বিপক্ষ দল বলবে “কিসব ন্যাকা ন্যাকা ব্যাপার! রবীন্দ্রনাথ কারো বাপের সম্পত্তি নাকি? রবীন্দ্রনাথকে বুকে রেখেচি। বুকে। শালা হৃদয় আমার নাচে রে, পাগল কুত্তার মত নাচে রে।”
প্রথম দলের মত আসলে এরাও মনে করে আপনি এদের পৈতৃক সম্পত্তি। আপনার লেখা নিয়ে যা ইচ্ছে করলেই হল। অন্য কারো লেখা চটকালে তো সহজে বিখ্যাত হওয়া যায় না।

আমাকে তাই বারবার আপনাকে নিয়ে পালাতে হয়। কোলাহল বারণ হলে মন্দ হয় না, আপনার আমার কথা কানে কানে হওয়াই ভাল। গত পঁচিশে বৈশাখের পর থেকে আজ অব্দি যা যা হয়েছে, তাতে আপনার সাথে কিছু নতুন সংলাপের প্রয়োজন হয়েছে। সে কথাই বলি।

কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!

মহাসঙ্কট উপস্থিত। দেশের রাজার (হ্যাঁ, রাজাই। স্বাধীনতার এত বছর পরে দেশটা একেবারে যক্ষপুরী হয়ে উঠেছে। সে কথায় পরে আসছি) আদেশ, দেশকে মা বলে ভাবতে হবে। কেবল ভাবলে হবে না, আবার চিৎকার করে ডাকতেও হবে। যারা ছাগল ছানাদের মত দিবারাত্র গলা ছেড়ে ডাকবে না, তাদের দেশের শত্রু দেগে দেওয়া হয়েছে। গারদে ভরার ব্যবস্থাও হয়েছে। দেশকে মা বলে ডাকতে হুকুম হয়েছে, এদিকে দেশের লোককে সন্তান ভাবার হুকুম হল না। তারা কেবল প্রজা। রাজা হুকুম করবেন, তারা তামিল করবে। অন্যথা হলেই রাজার পাইক, বরকন্দাজ লাঠিপেটা করবে, গারদে ভরবে। আবার সকলে প্রজা নয়, কেউ কেউ প্রজা। রাজা যাকে প্রজা বলবেন, কেবল সে-ই প্রজা। বাকি সব অনুপ্রবেশকারী শয়তান।

তা দেশ মানে কী? দেশ মানে কে? আপনাকে সে প্রশ্ন করতে গিয়ে কোন মায়ের ছবি তো পেলাম না। পেলাম কেবল মানুষ। ক্লাসঘরে আর ঠাকুরঘরে আপনাকে দেখতে অভ্যস্ত চোখে দেখলাম আমার সাথে প্রতিবাদ মিছিলে। যে মহামানবের সাগরতীর বলে ভারতকে চিনিয়েছেন, দেখলাম সেই মানবসাগরই আপনাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। আপনার বিশ্বভারতী অভ্রভেদী দেবালয় হয়ে গেছে অনেকদিন, তা থেকে আপনার বিগ্রহটুকুও উধাও করে দেওয়া হবে অদূর ভবিষ্যতে। তাতে অবশ্য কিছু এসে যায় না। শিবরাম কবেই সাবধান করেছিলেন, “সঙ্ঘ মানেই সাংঘাতিক।” চুলোয় যাক সেই সঙ্ঘ, তার সাথে আর যত সঙ্ঘ আছে। আপনি তো আমাদেরই লোক। আমরা আমাদের মত করে পেলেই হল। কিন্তু গোলমালের এখানেই শেষ নয়।

দেশকে দিনরাত মা বলে প্রণাম ঠুকতে হবে, অথচ মায়েদের জন্য দেশটা বড় শক্ত ঠাঁই হয়ে উঠেছে। যারা প্রজা হয়ে থাকতে রাজি নয়, যারা আপনার গান শুনে বা না শুনে দাবী করেছে আমরা সবাই রাজা, তাদের মধ্যে মায়েরা বড় কম ছিলেন না। সেই মায়েদের উপর রাজার আঘাত নেমে এসেছে। সাতাশ বছরের সফুরা জারগরের সন্তানের জন্মের প্রথম ক্ষণ শুভ হবে না, হতে দেওয়া হবে না। কারাগারের অন্ধকূপে তাকে মা হতে হবে রাজার আদেশে। পুরাণকে ইতিহাস বলে গেলানো কংস রাজার অনুগত অসুরকুল অবশ্য তাতেও খুশি নয়। তারা প্রশ্ন তুলেছে সফুরা কি বিবাহিতা, নাকি সফুরা কুমারী? মুসলমানবিদ্বেষী, বিকৃত কামনায় হিলহিলে অসুরকুল মায়ের অগ্নিপরীক্ষা চায়। সেই ট্র‍্যাডিশন সমানে চলেছে।

সফুরা কুন্তীর মত কুমারী না হলেও তার সন্তান যেন কর্ণের মতই পাণ্ডব বর্জিত হয় তা নিশ্চিত করতে রাজা রাতে মাত্র চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নতুন ভারত গড়েছেন। এ ভারতে সংখ্যালঘুকে গর্ভে থাকতেই নিষ্ফলের, হতাশের দলে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। কবি, এ দেশে কি আর কেউ অনাথ বিধর্মী শিশুকে নিজের সন্তান বলে মানবে? আর কি কোন সন্তান বলবে “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকল জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন”?
আপনি কি পিছিয়ে পড়লেন, কবি?

৪৭ফ, ৬৯ঙ

“একদিনের পর দুদিন, দুদিনের পর তিনদিন; সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি, এক হাতের পর দু হাত, দু হাতের পর তিন হাত। তাল তাল সোনা তুলে আনছি, এক তালের পর দু তাল, দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অঙ্কের পর অঙ্ক সার বেঁধে চলেছে, কোন অর্থে পৌঁছয় না। তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা।”

আমাদের কালের কথাই লিখেছেন আপনি। এতখানি বয়সে এসে এই উপলব্ধি হল। যক্ষপুরীর কথা বলছিলাম। শুধু দেশটা কেন? গোটা পৃথিবীটাই যে রক্তকরবীর যক্ষপুরীতে পরিণত। নবীন কোরোনাভাইরাস এসে কদিন খনির দরজা এঁটে দিয়েছে৷ তাই এ কদিনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৪৭ফ আর ৬৯ঙ দের এবার মুখের রক্ত তুলে মরতে হবে। যক্ষপুরীর কবলের মধ্যে ঢুকলে তার হাঁ বন্ধ হয়ে যায়, এখন তার জঠরের মধ্যে যাবার একটি পথ ছাড়া আর পথ নেই। তাই বিল্ডারদের সাথে মিটিং করে সরকার রেলকে বলে “এদের বাড়ি যাবার ট্রেন বাতিল করো হে।” যদিও বিস্তর চেঁচামেচি হওয়ায় ঢোঁক গিলে বলতে হয়েছে “আচ্ছা বাতিল করতে হবে না। এরা যাবেখন।”
কেবল ঠেলে খনির গভীরে পাঠানো তো নয়, আরেক রকম ব্যবস্থাও আছে। বিশেষত আমাদের মত পুঁথি পড়ে চোখ খোয়াতে বসা, সর্দারদের চর বিশু পাগলদের জন্য। চাকরি থেকে ছুটি। ওরা বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছে, কেমনে দিই ফাঁকি?

উত্তর খুঁজছি, পাচ্ছি না। রচনাবলী, গীতবিতান, ছিন্নপত্রাবলী, ইংরেজি বক্তৃতামালা — সর্বত্র খুঁজছি। খুঁজতে খুঁজতে আপনার উপর বেজায় রেগে যাচ্ছি কখনো, কখনো আনন্দে কাঁদছি, আত্মগ্লানিতে হাসছি, বিষাদে চুপ করে থাকছি। সংলাপ চলছে, চলবে। আপনাকে এ জানা আমার ফুরাবে না।

যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

“কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, মেয়েটা হায়ার সেকেন্ডারি দিচ্ছে… কিছু একটা তো করতে হবে… ভাই একটা ডিও নেবে? লেডিস, জেন্টস দুরকমই আছে…”


আজ মে দিবস। সকালে ফ্ল্যাটের নীচে নেমে মাছ কিনছি, এক ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়ালেন কিছুটা কুচো চিংড়ি কিনবেন বলে। টাকা হাতেই রাখা এবং বেশভূষা দেখে বোঝা যায় কারোর বাড়িতে কাজ করেন। কথায় কথায় বললেন “কোরোনা হবার হলে হবেই। আমাদের পাড়ায় তিন বাড়িতে তিনজনের। কেউ কারো বাড়ি যাচ্ছে না। কিন্তু হল তো?”

লকডাউন শুরু হয়েছে এক মাসের বেশি হয়ে গেল। আমার ওয়ার্ক ফ্রম হোম, আমার মত ফ্ল্যাটবাসীদের অনেকেরই তাই। যাঁরা বাসন মাজেন, কাপড় কাচেন জীবিকা নির্বাহের জন্য, তাঁদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম বলে কিছু হয় না। আর যাদের হয় না তাদের মধ্যে আমার স্ত্রী, আমার অনেক প্রতিবেশীও পড়েন। লকডাউনে আমাদের কারো তেমন অসুবিধা নেই। ঘরে বসেও মাস গেলে মাইনে পাচ্ছি, কারণে অকারণে কর্তৃপক্ষ খানিকটা কেটে নিলেও। কিন্তু ঐ ভদ্রমহিলার মত যাঁরা, তাঁদের কাজে বেরোতেই হচ্ছে। লকডাউন মানলে তাঁরা মাইনে পাবেন না, ভাত খেতে পাবেন না, কেবল গালি খাবেন। বাড়ির কাজের দিদিদের ছুটি দেওয়ার কারণে প্রতিবেশীদের রক্তচক্ষু সহ্য করতে হয়েছে পাড়ার কোন কোন পরিবারকে। অনেকে আবার ছুটি দিয়েছেন নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে, কিন্তু “কাজ করছে না যখন মাইনে পাবে কেন?” এই যুক্তি প্রয়োগ করছেন। ফলত ভদ্রমহিলাকে আর বললাম না যে “হবার হলে হবেই” কথাটার কোন মানে হয় না, সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। স্পষ্টত আমার কাছে যে কথার যা মানে ওঁর জীবনে তা নয়। আমার কাছে মে দিবস একটা ঐতিহাসিক দিন, ওঁর কাছে একটা অর্থহীন শব্দবন্ধ।


মার্চ মাসের শেষ দিক থেকেই অফিসে, পাড়ায় তুমুল আলোচনা — কোথায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে না। কারো কারো অভিযোগ লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ অ্যামাজনে পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না, ডেটল কিনতেও ঘুরতে হচ্ছে তিন চারটে দোকান। ভদ্রলোকেদের মহাসঙ্কট। আমার বাড়িতে কিন্তু এখনো লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ পর্যাপ্ত। কী করে? সে কথাই বলি।

হুগলী শিল্পাঞ্চল বলতে একসময় যা বোঝাত, আমার বাড়ি সেই এলাকায়। তবে একে একে নিভিয়াছে দেউটি। রেললাইনের ওপারে জি টি রোডের ধারে র‍্যালিস ইন্ডিয়াকে আমি বরাবর অশ্বত্থবেষ্টিত দেখেছি। গদি তৈরির রিলাক্সন কারখানা অনেক দড়ি টানাটানির পর বন্ধ হয়ে গেছে আমি কলেজে ঢোকার আগেই। ন্যালকোর রমরমা রং তৈরির কারখানা, যার পাশ দিয়ে স্কুলে যেতাম, স্থানীয় লব্জে যা অ্যালকালি, তাও প্রেমেন্দ্র মিত্রের তেলেনাপোতা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘকাল। পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করতে পাঁচিলের ইঁট সরিয়ে কিছু লোককে তেলেনাপোতায় ঢুকতে দেখতাম স্কুলজীবনের শেষদিকেই। জে কে স্টিল প্রেতপুরী, পূর্ণিমা রাতে ভাঙা দোলনা দিব্যি মেরামত হয়ে যায় আর মধুবালা দোল খেতে খেতে গান করেন “আয়েগা আয়েগা আয়েগা। আয়েগা যো আনেওয়ালা”। শেষ পর্যন্ত একা দাঁড়িয়ে ছিল বিড়লাদের হিন্দমোটর কারখানা। তার ভিতর দিয়ে গেলে এখন মন খারাপ হয়ে যায়। আরো মন খারাপ হয় ট্রেন কোন্নগর স্টেশন ছাড়লে ডানদিকে তাকিয়ে যখন দেখি বন্ধ কারখানার চৌহদ্দিতে আদিগন্ত ঝিলের অনেকটা বুজিয়ে গগনচুম্বী আবাসন তৈরি হচ্ছে। এ শুধু আমার বাড়ির আশপাশের বন্ধ কারখানার ফিরিস্তি। গোটা হুগলী জেলায় ছোট বড় এমন অজস্র কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তা এত সব বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা কী করেন? তাঁরা বাড়ি বাড়ি আসেন।

কেউ আমার কাকাদের বয়সী, অপমানে মাটিতে মিশে যেতে যেতে বলেন “কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, মেয়েটা হায়ার সেকেন্ডারি দিচ্ছে… কিছু একটা তো করতে হবে… ভাই একটা ডিও নেবে? লেডিস, জেন্টস দুরকমই আছে…”

কেউ আমার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট, চমৎকার কথা বলে, বোঝা যায় লেখাপড়ায় নেহাত খারাপ ছিল না। কিন্তু বোধহয় কোম্পানির মালিকের পাতে মাছের পিস ছোট হয়ে যাচ্ছিল তাকে মাইনে দিতে গিয়ে। তাই সে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের দরজায়। রবিবার সকালে এসে আমার স্ত্রীকে বলছে “বৌদি, এই সেন্টটা দেখুন, দারুণ গন্ধ… আচ্ছা ফিনাইল লাগবে? বেশি দাম নয়…”

একটা ছেলে প্রতি মাসেই আসে। বয়স খুব বেশি নয় অথচ মাথায় টাক পড়ে গেছে, চোখ দুটো ঢুকে গেছে কোটরে, শীতের দুপুরেও দেখে মনে হয় বৈশাখের কড়া রোদে কয়েক মাইল হেঁটে এসে ধুঁকছে। নামটা যতবার জিজ্ঞেস করি, ততবার ভুলে যাই। “জীবনের ইতর শ্রেণীর মানুষ তো এরা সব”। এদের নাম মনে রাখার অবসর কোথায় আমার মনের? তা সেই ছেলেটার থেকে কী-ই বা কিনব প্রতি মাসে? হ্যান্ড ওয়াশই কিনি। কতটুকুই বা খরচ হয় প্রতি মাসে! রান্নাঘরে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঝকঝকে হ্যান্ড ওয়াশের বোতল, আমার স্ত্রী বলেন “তুমিই এবার হ্যান্ড ওয়াশের দোকান খুলবে।” তা সেই বোতলগুলোই কোরোনার আমলে আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এপ্রিল মাস কেটে গেছে, মে মাসের আজ প্রথম দিন। এই ফ্ল্যাটে এসেছি ২০১৬ র দোলের পরদিন। এই প্রথম ছেলেটা এতদিন হয়ে গেল আসেনি। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম “কোথায় বাড়ি তোমার?” আমাদের এখান থেকে অনেক দূরে। লোকাল ট্রেন চালু না হলে সে আসতে পারবে না। জানি না তার মে দিবস কেমন কাটছে। দুর্বল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন তাও জানি না, আশা করি কোভিড-১৯ ধরলেও বয়সের কারণে সে প্রাণে বেঁচে যাবে। আমারই বয়সী ছেলে। কে জানে কবে আমার দন্ডমুন্ডের কর্তার গেলাসে সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি কম পড়বে, আমাকেও হ্যান্ড ওয়াশ নিয়ে দাঁড়াতে হবে আপনাদের দরজায়?

কাশ্মীরের ভ্যালেন্টাইন

কাশ্মীরে কি আর্চি’স গ্যালারি আছে? সেখানে লাল টুকটুকে হৃদপিণ্ড কিনতে পাওয়া যায়?

প্রমাণ নেই, তবে সাক্ষী আছে। আমি কাশ্মীর গিয়েছি। তখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ নয়। বাবা-মা কার থেকে যেন চেয়ে চিন্তে ক্যামেরাও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু জম্মু থেকে বাসে চাপার পর খেয়াল হয় ফিল্ম কিনে নিয়ে যাওয়া হয়নি। দাম্পত্যের তারুণ্যে যেরকম ভুল হয়ে থাকে আর কি। তখন ভ্যালেন্টাইন্স ডে না থাকলেও প্রেম তো ছিলই।

গল্পটা শোনার পর থেকে কাশ্মীর বললে প্রথমেই প্রেম মনে হয়। তারপর সাদা কালো টিভিতে ‘কাশ্মীর কি কলি’ দেখলাম। বঙ্গললনা শর্মিলার লালিমা সে টিভিতে বিশেষ ধরা পড়েনি। তবু কাশ্মীর মানেই রোম্যান্স, কাশ্মীর মানেই প্রেম — এ একেবারে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল। ইংরেজি সাহিত্য পড়তে ঢুকেছি। যে মাস্টারমশাই জর্জ বার্নার্ড শ পড়াবেন তিনি অ্যান্টি রোম্যান্টিক নাটক পড়াবেন বলে ক্লাসে জিজ্ঞেস করলেন রোম্যান্টিক বললেই কী মনে আসে? সশব্দ চরণেই প্রেম এসে পড়ল। তখন জিজ্ঞেস করলেন রোম্যান্টিক ফিল্ম বলতে কার কোনটা মনে পড়ে? ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ এর মাঝখানে আমি বলে ফেললাম ‘কাশ্মীর কি কলি’। মাস্টারমশাই চোখ কপালে তুলে পরিষ্কার বাংলায় বললেন “এ তো ঠাকুরদাদার আমলের ছবি, বাবা। তুমি কি সেই যুগের লোক নাকি?” সেই গঞ্জনাও আমাকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। তার আগে এবং পরেও যার প্রতিই মনটা দ্রব হয়েছে তাকেই বলার চেষ্টা করেছি “বরসোঁ সে খিজা কা মৌসম থা, উইরান বড়ি দুনিয়া থি মেরি।” বেশিরভাগ যে শুনতে পায়নি বা পেলেও আশা ভোঁসলের মত জবাব দিতে রাজি হয়নি সে কথা আলাদা।

ইতিমধ্যে আবার ‘রোজা’ এসে পড়েছে। তার পোস্টারে পর্যন্ত গোলাপ ফুল। তামিল দম্পতির “ইয়ে হসিঁ ওয়াদিয়াঁ ইয়ে খুলা আসমাঁ” তে দুষ্টু মিষ্টি মধুচন্দ্রিমার আত্মার উপর ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের নরকের দুঃস্বপ্ন। উফ! কি রোম্যান্টিক! এক শর্মিলায় রক্ষে নেই, মধু দোসর।
ঐ যে বলে বয়স বাড়া ভাল নয়? ঠিকই বলে। কাশ্মীর নিয়ে মাখো মাখো রোম্যান্স ভেঙে গেল বয়স বাড়তেই। সে-ও অবশ্য নারীঘটিত ব্যাপার। অরুন্ধতী রায়। কে যে ওঁকে কুনান পোশপোরা ইত্যাদি যাচ্ছেতাই ব্যাপার নিয়ে লিখতে বলে! তবু চলে যেত বলিউডে মগ্ন থাকলে, সব মাটি করলেন বিশাল ভরদ্বাজ। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট পড়ে যদি কেউ কাশ্মীরের কথা ভাবে, তাকে ঠেকানো শক্ত। কি যে বিপদ করেছেন ভরদ্বাজ বামুন আর বাশারাত পীর মিলে! এখন কাশ্মীর বললেই, প্রেম বললেই শর্মিলা নয়, মধুও নয়, শ্রদ্ধা কাপুরের কবর মনে পড়ে।

তা ভাবছিলাম কাশ্মীরে কি আর্চি’স গ্যালারি আছে? সেখানে লাল টুকটুকে হৃদপিণ্ড কিনতে পাওয়া যায়? ছ মাস আগের স্টকে ঝুল পড়ে যায়নি? পোকায় কাটেনি? আচ্ছা ওখানকার ছেলেমেয়েরা হোয়াটস্যাপে প্রেম করছে আবার? কাদের যেন হোয়াটস্যাপ অ্যাকাউন্ট নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেছে শুনেছিলাম?

ও হ্যাঁ, ‘শিকারা’ নামে একটা ছবি বেরিয়েছে। সেটাও প্রেমের ছবি। না বললে লোকে বলবে “কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা তো বললেন না?” কী করে বোঝাই প্রেম আর উদ্বাস্তু একসাথে বললে আমার প্রথমেই সুপ্রিয়া দেবীর কথা মনে পড়ে!
আচ্ছা গত ছ মাসে কতজন কাশ্মীরি পণ্ডিত কাশ্মীরে ফেরত গেছে কেউ বলতে পারবেন? যারা গেছে তারা কি ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালন করছে? রবাবে বলিউডি গান দারুণ জমে কিন্তু। ধরুন আপনি একজন কাশ্মীরি পণ্ডিত মহিলা, ঝিলামের ধারে বসে চোখ বন্ধ করে শুনছেন একটি সুপুরুষ কাশ্মীরি ছেলে বাজাচ্ছে “এক থা গুল ঔর এক থি বুলবুল।”

আহা! চটছেন কেন? লাভ জিহাদে উস্কানি দিচ্ছি না। ও গানটায় শশী কাপুর আর নন্দা ছিলেন। দুজনের কেউই মুসলমান নন। শশীর দাদা শাম্মিও মুসলমান নন, শর্মিলা তো খোদ ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। অতএব ওসব ছবি দেখলে আজও দোষ নেই।

মেঘে মেঘে

কখনো ভাবিনি ঘন নীল আকাশ আর কাশফুলের মত মেঘ দেখে একদিন বিরক্তি আসবে, কান্না পাবে, চেপে রাখা আশঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠবে

কয়েক বছর হল বর্ষাকাল এসে পড়লেই আতঙ্কে ভুগি — যদি এই বর্ষাই শেষ হয়! যদি আগামী বছর থেকে আমাদের জনপদে আর বৃষ্টি না হয়! যদি দেখতে দেখতে আমাদের সুজলাং সুফলাং জায়গাটা মরুভূমি হয়ে যায়!
ছোটবেলায় কত পাখির বাসা দেখেছি বাড়ির আশপাশের নানারকম গাছে। চড়াইয়ের বাসা, শালিকের বাসা, কোকিলের বাসা, কাকের বাসা। আর সবচেয়ে সুন্দর বাবুইয়ের বাসা। আজকাল তো আর দেখি না, আমার মেয়ের সাত বছর বয়স হয়ে গেল। ছবির বাইরে বাবুই পাখির বাসা তো সে দেখে উঠল না! কেমন দেখতে হাঁড়িচাচাকে? মেয়ে জানে কি? যখন আতঙ্ক মাথায় ওঠে, তখন ইতিউতি তাকিয়ে তত পাখি তো দেখি না যত আমার সাত বছর বয়সে দেখেছি! এভাবে পাখিরা যদি হারিয়ে যেতে পারে, বৃষ্টিও তো হারিয়ে যেতেই পারে! পারে না?
আমার আশঙ্কা এত তাড়াতাড়ি এত ভয়ানক সত্যি হয়ে উঠবে আমিও ভাবিনি। বৃষ্টিতে ভেজা আমার বড় প্রিয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেক সময় এমন মুহূর্তে বৃষ্টি নামে যখন কিছুতেই ভেজার উপায় নেই। তবু, প্রতি বর্ষায় অন্তত একবার ভিজে চুপচুপে না হয়ে আমি ছাড়ি না। গত কয়েক বছর প্রথম সুযোগেই ভেজার চেষ্টা করি। কেবলই আতঙ্ক — এই যদি আমার জীবনের শেষ বৃষ্টি হয়!
এবার বর্ষায়, কি সৌভাগ্য, সেদিন আমাদের নবগ্রামে ঠিক সন্ধ্যের মুখে আকাশ অন্ধ করে বৃষ্টি এল। ঠিক আমার ছুটির দিনটায়। ঐ দিন আমি বিকেল, সন্ধ্যের বিনিময়ে ভাত-কাপড়ের সংস্থান কিনতে নদীপারের শহরে যাই না। উল্লসিত হয়ে নেমে পড়লাম বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে। কড়কড়ে বাজের ধমক অগ্রাহ্য করে বৃষ্টির সাথে আমার নির্লজ্জ অভিসার। আশ মিটিয়ে ভিজে ঘরে ফিরেছি যখন তখনো ঝমঝমিয়ে রমরমিয়ে বৃষ্টি চলছে। ইউটিউবে চালিয়ে দিলাম “আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে।” আমার মতই একা একা উত্তমকুমার ভিজছেন আর লাজুক মাধবী গাছের তলায় বসে গাইছেন। সেদিন মাথা মুছতে মুছতে হৃষ্ট চিত্তে ভেবেছিলাম, যাক, আমরা এবারও বেঁচে গেলাম। আষাঢ়ের গোড়াতেই যখন এমন বৃষ্টি, তখন এ মরসুমে আর মরুভূমি দেখতে হচ্ছে না।
কিন্তু সেই শেষ। তারপর হপ্তাদুয়েক হয়ে গেল, বৃষ্টির আর দেখা নেই। অথচ আকাশে মেঘ আছে, মাঝে মাঝে সূর্যকে ম্লান করে দিয়ে আশা জাগিয়েও ব্যালে নাচের সুন্দরীদের মত হালকা সেসব মেঘ মঞ্চ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একদিন সকালের দিকে জানলার দিকে চোখ পড়তেই দেখি আকাশের বেশ মাজা রঙ হয়েছে আর ছিটেফোঁটা ঝরছেও বটে। ভাবলাম এই বুঝি প্রতীক্ষার অবসান হল। সবে গুনগুন শুরু করেছি, মেয়ে আমার ফিসফিসিয়ে বলল “বাবা, এখনই গেয়ো না। ভাল করে শুরু হোক আগে।” আমল দিচ্ছিলাম না, কিন্তু মিনিট খানেকের মধ্যেই দেখলাম সাঁইত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে সাত বছরের আশঙ্কাই বেশি সত্যি। বৃষ্টি থেমে গেল।
সেই থেকে আকাশে মেঘ দেখে অদ্ভুত পীড়া হচ্ছে। কখনো ভাবিনি ঘন নীল আকাশ আর কাশফুলের মত মেঘ দেখে একদিন বিরক্তি আসবে, কান্না পাবে, চেপে রাখা আশঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠবে।
মধ্যরাত পেরিয়ে যখন নির্জনে বাড়ি ফিরি সেই সময় বালি ব্রিজের উপর ভেসে চলা কিছু কৃশকায় মেঘের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানালাম। বললাম “কেরালায় এত বৃষ্টি, হিমাচলে, অরুণাচলে, আসামে, বিহারে, এমনকি উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা বানভাসি আর তোমরা কিনা উড়ে বেড়াচ্ছ, একফোঁটা বৃষ্টি নেই ভাগীরথীর এপারে ওপারে? কিসের অভাব তোমাদের? কী পেলে মোটাসোটা হয়ে ঝরে পড়ে একটু শান্তি দেবে?
কি বেইজ্জত যে হতে হল কী বলব। তারা বলল “যা চাই তা পারবে দিতে? তোমাদের তো আদ্ধেক পুকুর চুরি হয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোতে সক্কলে মিলে আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলে মজিয়ে ফেলেছ। গাছ যা ছিল সেসবও সাফ করে কংক্রিট দিয়ে সৌন্দর্যায়ন করেছ। বলি জলীয় বাষ্প কই যে খেয়ে দেয়ে মোটা হব? আমরা কি তোমার বাথরুমের শাওয়ার নাকি, যে ইচ্ছে মত খুললেই জল পড়বে?”
মাথা নীচু করে শোনা ছাড়া উপায় ছিল না। অপমান হজম করে নিয়ে বললাম “তাহলে কি কোনদিন আর আমাদের ছোটবেলার বর্ষা ফেরত পাব না?” তারা হাত উল্টে বলল “সে কথা কি বলা যায়? মৌসুমীর কখন কী মর্জি হবে সে তো আর আমরা বলতে পারি না। সে আমাদের মালকিন বলে কথা। তবে বাপু যা চাইবে ভেবে চেয়ো। কোন বছর আমরা প্রাণ ভরে ঢাললে তো আবার তোমরা এক গলা জলে হাবুডুবু খাবে। জল উপচে পড়ার জায়গাগুলো তো আর কিছু রাখোনি।”
কোন মতে বললাম “তাহলে উপায়? হয় অনাবৃষ্টি নয় অতিবৃষ্টি — এই কি আমাদের ভবিষ্যৎ? আমার মেয়ের তবে রাস্তার জলে কাগজের নৌকো ভাসানো হবে না? বড় হয়ে মাধবী হওয়া হবে না?”
“কালবেলা তো নিজেরাই ডেকে এনেছ। এখন শঙ্খবেলা চাইলে হবে বাছা?” বলতে বলতে তারা কোন দিকে যে উড়ে গেল রাতের অন্ধকারে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

একজন সাব এডিটর

যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না

রোজ সকালে যে কাগজটা পড়েন সেটার মধ্যে ছাপাখানার শ্রমিকদের কায়িক শ্রমের পাশাপাশি অনেক মানুষের মানসিক শ্রম মিশে থাকে। তার মধ্যে যারা নিজেদের ভাল কাজের জন্যে প্রায় কখনোই পুরস্কৃত হয় না, কিন্তু ভুল হলে প্রচণ্ড তিরস্কৃত হয়, তাদের নাম সাব এডিটর। ভাল খবর বেরোলে সম্পাদকের পিঠ চাপড়ানি এবং পাঠকের কাছে নাম — দুইই হয় রিপোর্টারের। বস্তুত পাঠকের কাছে সাব এডিটর বলে কোনকিছুর অস্তিত্বই নেই প্রায়। সাব এডিটর যখনই কোথাও সাংবাদিক হিসাবে নিজের পরিচয় দেন তখনই শুনতে হয় “ও, আপনি রিপোর্টার?” সাংবাদিকতার ইতিহাস, সব দেশে সব যুগেই, রিপোর্ট তথা রিপোর্টারদের ইতিহাস। কাগজের চমকে দেওয়া হেডিং, ছবির স্মরণীয় ক্যাপশন পাঠক ভোলেন না। কিন্তু যিনি ওগুলো দিয়েছেন তাঁর নাম কাগজে ছাপা হয় না বলে পাঠক জানতেও পারেন না। প্রতিভাবান সাংবাদিকরা যখন আত্মজীবনী বা কাল্পনিক কাহিনী লেখেন তখনো সাব এডিটরদের কথা বড় একটা আসে না। বিখ্যাত রিপোর্টার বা কাগজের সম্পাদক মারা গেলে তাঁর কাগজে (তেমন বিখ্যাত হলে অন্য কাগজেও) খবরটা ছাপা হয়। সাব এডিটর, সে তিনি যত উচ্চপদস্থই হোন না কেন, মারা গেলে সাধারণত তা হয় না। অন্য চাকরিতে কর্মরত কেউ মারা গেলে অফিসে একটা স্মরণসভা হয়, খবরের কাগজের অফিসে দৈনন্দিন কাজের এমন চাপ যে সে ফুরসতও নেই।
অতএব যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না। বিশেষ করে যখন মৃত্যুর বেশ আগে থেকেই ভাস্করদার সাব এডিটরবৃত্তি ঘুচে গিয়েছিল।
এক অর্থে খবরের কাগজে সাব এডিটরদের জীবন মৃত্যুর এই যে অকিঞ্চিৎকর অবস্থান, এটাই সবচেয়ে বাস্তবানুগ। যে কোন পেশার মানুষের জীবন মৃত্যুই তো, খুব বড় কিছু না করে থাকলে, এই বিরাট পৃথিবীতে এরকমই অকিঞ্চিৎকর। তবু, সবচেয়ে নগণ্য লোকটা যখন মারা যায় তখনো তার চেনা জানা মানুষরা, কাছের মানুষরা, অন্তত কয়েকটা দিন শোক পালন করে। কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর। একবিংশ শতাব্দীতে নিশ্চয়ই আরো কম। তাই ভাবলাম এই বেলা স্মৃতিচারণটা সেরে ফেলা যাক। কদিন পরে আমারই লোকটাকে মনে থাকবে কিনা সে কি হলফ করে বলা যায়?
ভাস্করদার সাথে আমার শেষ দেখা ২০০৭ এ, যেদিন স্টেটসম্যান থেকে তার পাওনা টাকা পয়সার তাগাদা দিতে সে অফিসে এসেছিল। তারপর বার দুয়েক ফোনে কথা হয়েছে। শেষ কথা হয় ২০০৯ এ। আমার বিয়ের নেমন্তন্ন করবার জন্যে ফোন করেছিলাম। ভাস্করদা আসবে বলে কথা দিয়েও আসতে পারেনি। সাব এডিটরদের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। ভাস্করদা তদ্দিনে হিন্দুস্তান টাইমসের অধুনালুপ্ত সংস্করণের উচ্চপদস্থ সাব এডিটর। উচ্চপদস্থ, কিন্তু সাব এডিটর তো। তারপর থেকে ভাস্করদার সাথে যোগাযোগ আছে যে বন্ধুদের, তাদের কাছ থেকে তার খোঁজখবর নিয়েছি। কারণ ভাস্করদার জীবনে শোনার মত কিছুই ঘটছে না এরকম প্রায় হত না। এক আধবার ইচ্ছে হয়েছে দেখা করার উদযোগ আয়োজন করি, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ আলস্যে সে আর করা হয়ে ওঠেনি। তাহলে এখন লোকটার স্মৃতিচারণ করতে বসলাম কেন? এ কি আদিখ্যেতা নয়? নয়। তার কারণ আমি লিখছি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্যে। কিসের কৃতজ্ঞতা? সেই কথাই বলি।
আমি যখন শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসাবে ২০০৫ এর জুন মাসে দ্য স্টেটসম্যান কাগজে যোগ দিই তখন বহিরঙ্গ আর অন্তরঙ্গ — দুদিক থেকেই কাগজটার অবস্থা জলসাঘর ছবির জমিদারবাড়িটার মত। কাজ শেখার পক্ষে অবশ্য জায়গাটা তখনো চমৎকার ছিল। কিন্তু সেটা বুঝতে তো সময় লাগে। কী শিখতে হবে, কোনটা আগে শিখতে হবে কোনটা পরে — সেসব বুঝতেও সময় লাগে। আর সেসব বুঝে ওঠার জন্যে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের দরকার হয়। সেই স্বাচ্ছন্দ্য যুগিয়ে দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আমার তৎকালীন বস, ক্রীড়া সম্পাদিকা ইলোরা সেনের। ব্যাপারটা আরো একটু সহজ হয়েছিল ক্রীড়া বিভাগে আমার সহকর্মীদের মধ্যে আমার দুই সহপাঠী সুদীপ্ত আর অরিজিৎ থাকায়। কিন্তু সাংবাদিক মাত্রেই জানেন, আমাদের পেশায় এক কঠিন ঠাঁই আছে যেখানে নবীন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, এবং যেখানে কেউ কোন সাহায্য করতে পারে না। সে ঠাঁইয়ের নাম নাইট ডিউটি। যখন সেই ডিউটিতে থাকতাম, তখন গোড়ার দিকে বাড়ি যাওয়ার সময় ইলোরাদি বলে দিয়ে যেতেন “ভাস্কর, মনো (মনোজিৎ দাশগুপ্ত), ও রইল। প্রথম প্রথম নাইট করছে তো। একটু দেখো।” ঐ দুজনের ব্যবহারে আমরা (শিক্ষানবিশরা) কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেলাম, ভুল হলেও ভয় নেই। শুধরে দেওয়ার জন্যে ভাস্করদা, মনোদা আছে। আমার কাছে সেদিনের ঐ ভরসাটুকুর দাম, যত বয়স হচ্ছে তত বেড়ে যাচ্ছে।
আমি মফঃস্বলের ছেলে, চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সাংবাদিক ছিল না। তার উপর স্টেটসম্যান এমন একটা কাগজ যা পড়ে বাবা ইংরিজি শিখতে বলত ছোটবেলায়। ফলে বেশি রাতে অফিস ফাঁকা হয়ে গেলে অন্য ডেস্কের কার সাথে কতটা কথা বলব, কার সাথে হাসিঠাট্টা করা চলে, কার ঠাট্টায় হাসা চলে আর কার ঠাট্টায় হাসলে তিনি রেগে যাবেন — এসব নিয়ে প্রাথমিক দ্বিধা ছিলই। সেই দ্বিধা কাটাতে যে লোকটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল, সেও ভাস্করদাই। ফলে কিছুদিন পরেই দেখা গেল তার ভাষায় আমি হয়ে গেছি “কোন্নগরের সিপিএম।” ভাস্করদার কিন্তু সিপিএমকে ঘোর অপছন্দ। অথচ আমার বাবা সিপিএম করে বলে ঐ নামকরণটা করলেও আমাকে বেশ পছন্দ বলেই মনে হয়।
সেইসময় নাইট ডিউটি শেষ হওয়ামাত্রই বাড়ি আসার জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল না। আমাকে অফিসেই অপেক্ষা করতে হত ভোর চারটে অব্দি। তারপর অফিসের গাড়ি আমায় নামিয়ে দিত শেষ রাতের হাওড়া স্টেশনে। দিনের প্রথম ট্রেন ধরে আমি বাড়ি ফিরতাম। রাত দেড়টা দুটো নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার পর ঐ যে দুটো ঘন্টা, তা আমার দেখতে দেখতে কেটে যেত ভাস্করদার জন্যেই। হুল্লোড়ে লোকের নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা অত কাছ থেকে দেখার সুযোগ জীবনে আর হয়নি। সেই মধ্যরাতের আড্ডাগুলোতেই ভাস্করদাকে ভাল করে দেখার আমার সুযোগ হল। এবং যত দেখলাম, তত অবাক হলাম।
দেখলাম লোকটা যেমন ঝড়ের বেগে টাইপ করে সন্ধ্যেবেলা, তেমনি দুপুর রাতে গড়গড়িয়ে জয় গোস্বামীর কবিতা বলে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাঞ্জাবী বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলতে বলতে খালিস্তানপন্থী আন্দোলন কী এবং কেন, ভিন্দ্রানওয়ালে ইন্দিরা গান্ধীর ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন কিনা সেই আলোচনায় ঢুকে পড়ে অনায়াসে। আদবানির প্রশংসা করতে করতে দুম করে ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্প’ শট ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে আরম্ভ করে।
বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে, অফিস থেকে বেরনোর সময়ে দেখা গেছে ভাস্করদা, মনোদাকে পৌঁছতে যাবে আবার আমাকেও হাওড়ায় ছাড়তে যাবে, অত গাড়ি মজুত নেই। ওরা তখন আমায় নামিয়ে দিয়ে বাড়ি গেছে।
স্বভাবতই আমার মত নবীনদের অনেকেরই ভাস্করদাকে তখন দারুণ পছন্দ। দেখা গেল অফিসের সমস্যা নিয়ে ভাস্করদার পরামর্শ তো চাইছিই, উপরন্তু কোন সুন্দরীকে মনে ধরেছে কিন্তু বলে উঠতে পারছি না — সে সমস্যার সমাধানও ভাস্করদার কাছেই দাবী করছি। ভাস্করদা হয়ত বলছে “ওরে ****, এর চেয়ে আমিই বলে আসি নাহয়।”
ভাস্করদার সাথে আমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত এক নবমীর রাত। জীবনে প্রথম নবমীর দিন নাইট ডিউটি করছি। ব্যাজার মুখে। কাজ শেষ হওয়ার পর ভাস্করদা টানতে টানতে নিয়ে গেল প্রতিদিন অফিসের সামনে। নিজেরা চা খাচ্ছে, আমাকেও খেতেই হবে। যতই বলি আমি চা খাই না, ভাস্করদা বলে “আমি বলছি, তোকে খেতে হবে **।” খাওয়া হল, তারপর বলল “আচ্ছা, এটা আমার ইচ্ছায় খেলি, এবার তোর কী খাওয়ার ইচ্ছে বল। যা বলবি তাই খাওয়াব।” সেটা সুইগি, জোম্যাটোর যুগ নয়। ক্ষিদেও পেয়েছে তেড়ে। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না সঙ্কোচে। শেষ অব্দি ভাস্করদাই “আচ্ছা, তুই ডিম ভালবাসিস তো?” বলে রাস্তার ধারের দোকান থেকে ডবল ডিমের ভুর্জি কিনে দিল। নিউজরুমে ফিরে সামনে বসিয়ে সমস্তটা খাওয়াল। রাত আড়াইটেয় খাওয়া সেই ডিমের ভুর্জির স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।
ওরকম একজন সাব এডিটর হয়ে উঠতে আমরা কেউ পারলাম না। সব বিষয়ে অত আগ্রহ, অত পড়ার শক্তি আমাদের নেই। ওরকম একজন সিনিয়র হয়ে উঠতেও পারিনি। অত মমতাও আমাদের নেই।

ছবি: ভাস্করদার ফেসবুক পেজ থেকে

অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না

মৃণাল সেন প্রতিভাবান, মৃণাল সেন এ দেশে নতুন ধারার চলচ্চিত্রের দিকপালদের একজন, মৃণাল সেনের লেখার হাত চমৎকার — এসব গুণ সত্ত্বেও তাঁর একটা বড় দোষ তিনি রাজনৈতিক। ছবিতে বা ছবির বাইরে তিনি কখনো পাঁচিলের উপর বসে সিগারেট হাতে পা দোলাননি। নিরপেক্ষ হতে তাঁর বয়ে গেছে।
শুধু রাজনৈতিক নয়, তিনি প্রায়শই পার্টিজান। তাঁর ছবির রঞ্জিত মল্লিক যে চাকরি স্যুটেড বুটেড হওয়াটাকেই যোগ্য হওয়ার প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করে সেই চাকরি না পেয়ে স্যুট বুটের দোকানে আধলা ইঁট ছুঁড়ে মারে। তাঁর ছবিতে ফিল্ম ইউনিট নিজেদের শৌখিন মানবপ্রেমের অসারতা উপলব্ধি করে শুটিং বন্ধ করে ফিরে যায়। অতএব গত পরশু অব্দিও মৃণাল সেন আজকের ভদ্রলোকদের পাঞ্চিং ব্যাগও ছিলেন। প্রমাণ চাই? দিচ্ছি।
হয়ত আমার নিজের মুদ্রাদোষেই অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই রবিবাসরীয় কাগজে দেখলাম এক স্বনামধন্য প্রাক্তন আমলা নতুন বাঙালিদের নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন আজকের বাঙালি যে বাংলার সংস্কৃতি ভুলে গেছে, হিন্দি, ইংরিজি, বাংলা মিশিয়ে আজব ভাষায় কথা বলছে তার দায় যে নির্দিষ্ট কোন সরকারের ঘাড়ে চাপানো উচিৎ তা নয় তবে এর জন্যে আসলে দায়ী ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুঁজির পলায়ন, আর তারই দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নাকি বাঙালির ক্রমশ অবাঙালি হয়ে ওঠা। অবশ্য এমন নয় যে এই অভিযোগ ইনিই প্রথম করলেন। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর আউটলুক পত্রিকায় তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও একই কথা লিখেছিলেন। কিন্তু যে কারণে সেই আমলার লেখাটার কথা এখানে উল্লেখ করছি সেটা হল তিনি এক জায়গায় লিখেছেন
“এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের মতো কেবল পাড়ার মোড়ে বা রকে বসে আড্ডা না দিয়ে, কিংবা সরকারি চাকরি হল না — এই ক্ষোভে নিজেদের নষ্ট না করে রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। স্থানীয় কাউন্সিলরের আশীর্বাদে ধন্য হলে তারা ছোট ছোট হকার স্টল খোলে কিংবা জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজ়ন-এর মতো সংস্থার হয়ে মোটরবাইক চড়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। তারা কল সেন্টার বা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, আন্দোলনের চাহিদা ছাড়াই। তারা ঘাম ঝরায়, কিন্তু ১২ জুলাই কমিটির নাম শোনেনি কোনও দিন। এরা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়ায় ওতপ্রোত জড়িত, মোবাইল রিচার্জ বা ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত, কিন্তু এরা কেউ কোনও দিন সাহিত্যপত্রিকা বা জীবনানন্দের কবিতা পড়েনি।
এরা দিনরাত্রি কাজ করে, মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারাদের মতো মোটেই নয়।”
লেখাটা পড়া শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে রেখেছি সবে, এমন সময় হোয়াটস্যাপে এক সিনেমা অন্তপ্রাণ বন্ধু জানাল মৃণাল সেন প্রয়াত। লেখকের বক্তব্য সঙ্গত না অসঙ্গত তা বিচার করতে বসছি না এখন। শুধু বক্তব্য এই যে লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না, সম্ভবত আরেক ঘোষিত মার্কসবাদী ঋত্বিককুমার ঘটকের ক্ষেত্রেও নয়।
মৃণাল সেনের একাধিক ছবিতে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন এক অভিনেতা। প্রায় প্রতি সাক্ষাৎকারেই বলেন “মৃণালদার থেকে কত যে শিখেছি” ইত্যাদি। অধুনা নিজে ফিল্ম বানান। আমার মত অবসর যাপনের জন্যে ফিল্ম দেখা অশিক্ষিত লোকের সেসব ফিল্ম মুখে না রুচলেও ভদ্রসমাজে তাঁর ছবি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনিও কয়েকবছর আগে নবীন পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের ছবির সমালোচনায় এক জায়গায় লিখেছিলেন “আশির দশকের মৃণাল সেনের ছবির মত।“ কেন? না ছবিতে টানাটানির সংসার চালানো এক শ্রমিক দম্পতিকে দেখানো হয়েছিল যাদের জীবিকা অর্জনের লড়াই এত কঠোর যে ঠিক করে কথাও হয় না সারাদিন, দেখা হয় পলক পড়ার মত। আর ক্ষণিকের জন্যে ক্যামেরায় ধরা হয়েছিল একটি লাউডস্পিকারকে, যা দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আন্দোলনের সংবাদ বিসংবাদ। বারবার এসে পড়ছিল অর্থনৈতিক মন্দার নানা লক্ষণও।
অর্থাৎ মৃত্যুর পরে লোকের নিন্দা করতে নেই — এই সূত্র মেনে যত বিখ্যাত, অবিখ্যাত লোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি আমরা এখন দেখছি, পড়ছি তার অনেকগুলোর আড়ালেই আছে এই অনুভব, এই মতামত যে মৃণাল সেনের ছবি আসলে বাতিল সময়ের বাতিল দলিল। বাতিল মতাদর্শের বাতিল বুলি ছাড়া ও থেকে আর কিচ্ছু পাওয়ার নেই। কিছু কিছু লোকের কাজ নিজ গুণে এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায় যে সে কাজকে ভাল না বললে আবার রুচিশীল তকমা পাওয়া যায় না, উচ্চকোটির সদস্য হিসাবে পরিচয়টা নড়বড়ে হয়ে যায়। অগত্যা মৃণাল সেন সম্পর্কে গদগদ না হয়ে আজ অনেকেরই উপায় নেই। কিন্তু বাংলার ফিল্ম জগতের একজনেরও কাজ দেখলে কি মনে হয় যে কেউ “মৃণালদার” থেকে কিছু শিখেছেন?
সত্যি কথাটা স্বীকার করে ফেলা যাক। যাঁরা ছবি বানান আর আমরা যারা দেখি, কেউই বিশ্বাস করি না যে মৃণাল সেনের ছবিতে আর দেখার কিছু আছে। কেন করি না? কারণ স্রোতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা — এসবের অভ্যেস আমরা ‘মহাপৃথিবী’ ছবির ভিক্টর ব্যানার্জির মায়ের ডায়রির পাতার মতই পুড়িয়ে দিয়েছি। ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা বাধ্য হতে শিখেছি। বাধ্য হলেই যাবতীয় আরাম, যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য, যাবতীয় ভোগ্যপণ্য আমাদের হাতের মুঠোয় তা আমরা বুঝে গেছি। পোষ্যকে দুভাবে বাধ্য করা যায়। এক, কলার পরিয়ে। দুই, লোভ দেখিয়ে। বস্তুত লোভ দেখিয়ে বাধ্য করে নিয়ে কলার পরানোই সবচেয়ে উত্তম উপায়। আমরা বাঙালি ভদ্দরলোকেরা সেভাবেই বাধ্য হয়েছি। আমরাই তো বাংলা ছবির দর্শক, আমাদেরই কেউ কেউ বাংলা ছবির নির্মাতা।
আমরা এতটাই বাধ্য যে শুধু যে নিজেরা প্রতিবাদ করি না তা নয়, অন্যকে প্রতিবাদ করতে দেখলেও যারপরনাই রুষ্ট হই। তাই কলকাতায় মিটিং, মিছিল হলে বাসে আলোচনা করি গাঁয়ের লোকেদের কাজকম্ম নেই তাই এই সুযোগে কলকাতায় বেড়াতে চলে আসে, ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়। মাননীয় আমলা যাদের কথা লিখেছেন আর কি। “মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারা।”
এই যে সাদা কলারের আমরা, আমাদের কী করেই বা মৃণাল সেনের ছবি ভাল লাগবে? কলকাতায় মিছিল বেরোয়, ট্যাক্সিচালকরা ইউনিয়ন করে তা নিয়ে বাংলার বাইরের লোকেদের কাছে আমাদের যে লজ্জার শেষ নেই। অথচ কী আশ্চর্য দেখুন। বছরখানেক আগে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে কৃষকদের বিশাল মিছিল হল। সেখানকার ভদ্রলোকেরা অনেকেই সেই মিছিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কদিন আগে সারা দেশের কৃষকরা দিল্লীতে মিছিল করলেন। সেখানেও আমাদের মত ভদ্রলোকেরা খাবার নিয়ে, জল নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখানকার মত খবরও হল না কোন রাস্তায় কার গাড়ি আটকে পড়ে কার ফ্লাইট মিস হয়েছে। বাংলায় যখন কোন মিছিল, মিটিং হয় তখন আপনি তন্নতন্ন করে সংবাদের হাজারটা উৎস খুঁজেও একটা প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাবেন না। সেটা হল “কেন?” মানে মিছিলটা হল কেন? কোন দাবীতে? খবরটা আমাদের কেউ দেয় না কারণ আমরা জানতে চাই না। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে মিছিলটা এড়াতে পারব সেটুকু জানতে পারলেই আমরা খুশি। অতএব কী দরকার বাপু সিনেমার মধ্যে ওসব জিনিসের? রাজ্যটা অনেক দেরীতে উন্নয়নের রাস্তা ধরেছে, ওসব দেখলে বা দেখালে লোকে আবার যদি বিগড়ে যায়?
এভাবেই সত্যি সত্যি ভাল থাকা গেলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাদা কলারের লোকেরা লক্ষ্মী হয়ে থেকেও মৃণাল সেনের সর্বহারাদের মত দুর্গতিগুলো এড়াতে পারছে না। কারখানার অস্থায়ী কর্মীদের মতই বহুজাতিকের এক্সিকিউটিভের হুটপাট চাকরি চলে যাচ্ছে, কর্মী হিসাবে যেসব অধিকার জন্মগত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সে অধিকারগুলো কোম্পানি বলে কয়েই কেড়ে নিচ্ছে অথচ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলা যাচ্ছে না। ছ ঘন্টার বদলে আট ঘন্টা, আট ঘন্টার বদলে দশ ঘন্টা কাজ করেই চলেছেন। বাড়িতে এসেও ল্যাপটপ খুলে মালিকের লাভের কড়ি বাড়িয়েই চলেছেন। বেসরকারী ক্ষেত্রের বসেদের কথা বাদ দিন, সরকারপোষিত স্কুল কলেজের সামান্য টিচার ইন চার্জরাও সাক্ষাৎ হিটলার হয়ে উঠেছেন। সেই যে সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা, যারা ১২ই জুলাই কমিটির নাম শোনেনি, আন্দোলনের নাম না করেই সোনা মুখ করে কাজ করে, তারা এত ভাল আছে যে বারো-পনেরো হাজার টাকার জন্যে বাইক নিয়ে দিন নেই রাত নেই ঝড় নেই জল নেই সুইগি, জোমাটোর হয়ে ডেলিভারি করছে। পিঠে খাবারের বোঝা তবু এ খাবার যাবে না ছোঁয়া। ছুঁয়ে ফেললেই ভিডিও ভাইরাল হবে, সামান্য মাইনের, বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ও অধিকারবিহীন চাকরিটিও যাবে।
একজন লিখেছিলেন “খাওয়া না খাওয়ার খেলা যদি চলে সারা বেলা হঠাৎ কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না।” একেবারে যে কিছু ঘটছে না তাও নয়। কয়েক বছর আগেই উবের, ওলার আগমনে যারা সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল ঐ দালালদ্বয় এখন তাদের টাকা পয়সা কমিয়ে শুধু নিজেদের পকেট ভর্তি করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বাইপাসের উপর গাড়ি পেটাচ্ছে। আমি, আপনি তখনো জানতে চাইছি না দাবীগুলো কী কী?
আর কটা দিন সবুর করুন। এ আই আসিছে চড়ে জুড়ি গাড়ি। তখন আমার আপনার অবস্থাও অ্যামাজনের ডেলিভারি বয় বা উবেরের ড্রাইভারের মত হতে পারে। সেদিন মৃণাল সেনের কোরাস হয়ত খুব অলীক মনে হবে না। যে নায়ক আধলা ইঁট ছোঁড়ে তাকে যে স্রেফ নকশালই মনে হবে তাও ঠিক করে বলা যায় না। আজকের অর্থহীন তর্পণ বাদ দিন। মৃণাল সেনকে আসলে সেদিন আপনার দরকার হবে।
আজ যতই ফেসবুকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বান ডাকুক না কেন, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে না দেখেই মৃণাল সেনের ছবিকে আঁতেল আখ্যা দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল এবং আছে। কারণ ছবিগুলো পপকর্ন খেতে খেতে দেখা যায় না। অপমানে যেদিন সবার সমান হতে হবে, সেদিন বোঝা যাবে আসলে কোন ছবিগুলো আঁতেল, অর্থাৎ আমার আপনার কথা কোনদিন বলেনি, আমাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা, আমাদের টেনে নিয়ে চলা জীবনের কথা বলেনি, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর গোয়েন্দা গল্পের গাড্ডায় ফেলে রেখেছিল।
মৃণাল সেন মার্কসবাদী ছিলেন আমৃত্যু। পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে লেগে যখন এই বাংলায় অনেক আগমার্কা বামপন্থী কবি, অভিনেতা, গাইয়ে রাতারাতি আবিষ্কার করলেন তাঁরা এত বছর ভুল পথে ছিলেন, তখনো মৃণাল সেন অবস্থান বদলাননি। তা মার্কসবাদ ব্যাপারটাকেই যখন বাতিল করে দিয়েছিল সকলে তখন একজন মার্কসবাদীর চলচ্চিত্র ভাবনাকে বাতিল করে দেওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা জানেন হাওয়া বদলাচ্ছে। এতটাই বদলেছে যে ‘দি ইকনমিস্ট’ এর মত চরম দক্ষিণপন্থী পত্রিকা মার্কসের দ্বিশতবার্ষিকীতে লিখেছে পুঁজিবাদকে বর্তমান সঙ্কট থেকে বাঁচাতে হলেও মার্কস পড়তে হবে। অতএব কেউ যদি সচেতন হন, তাহলে এই নাম কা ওয়াস্তে তর্পণ শেষ হওয়ার পরেই মৃণাল সেনকে শিকেয় তুলে রাখার ভুল তিনি করবেন না। তবু এরকম বলার মানে হয় না যে বাংলা ছবির নির্মাতারা তাঁর মত সোচ্চার বামপন্থী ভাবধারার ছবি না বানালেই সেগুলো ফালতু। বলার কথাটা হল ছবিতে আটপৌরে জীবন, তার লড়াই, তার সঙ্কট না থাকাই ফাঁকিবাজি। সেই ফাঁকিবাজি করে, তাকে প্রশ্রয় দিয়ে মৃণাল সেনের প্রয়াণে গদগদ হওয়ার মানে হয় না।
সেই ফাঁকিবাজি না করার জন্যে মার্কসবাদী বা বামপন্থী ছবি বানাতে হয় না। অনেকেই তো বলেন পশ্চিমবাংলায় বাম শাসন ছিল অপশাসন। সেই অপশাসনের স্বরূপ নিয়ে কটা বাংলা ছবি হয়েছে? অথচ সারা পৃথিবীতেই তো অপশাসনের মধ্যে থেকেই দারুণ দারুণ ছবি হয়। ইরানের পরিচালকরা যেমন করেন। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের রক্তাক্ত, অস্থির সময়গুলো নিয়েই তো অসামান্য সব ছবি হয়। সেগুলো সবই যে বামপন্থী ছবি তা তো নয়। আবার একটা কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি।
মৃণাল সেন মারা যাওয়ার আগের রাতে নেটফ্লিক্সে আলফোনসো কুয়ারনের ‘রোমা’ দেখছিলাম। মেক্সিকোর ছাত্র আন্দোলন, গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় বানানো সাদাকালো, আবহসঙ্গীতবিহীন ছবিটা দেখতে দেখতে আমার মত ভেতো বাঙালি, ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে ক্ষীণ সম্পর্কযুক্ত দর্শকের বারবারই ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের ছবিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। এই ২০১৮তে তৈরি ছবিতে ১৯৭০-৭১ এর গল্প বলা হচ্ছে। এমনকি ১০ই জুন ১৯৭১ এ সংঘটিত কুখ্যাত কর্পাস ক্রিস্টি গণহত্যাও দেখানো হচ্ছে। মৃণাল সেন তো রাজনৈতিক হত্যাগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন কেবল কাগজের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে। এই বাংলার কেউ ‘রোমা’ বানালে বোদ্ধারা নির্ঘাত বলতেন “এ ছবি দিয়ে কী হবে? এ তো মৃণাল সেনের মত।“
‘রোমা’ ছবির যে সময়কাল তা এই বাংলাতেও অস্থিরতা, ছাত্র আন্দোলন, গণহত্যার সময়। ঠিক ১৯৭১ সালেই ঘটেছিল কাশীপুর গণহত্যা। এখন তো রাজ্যে কংগ্রেস সরকার নেই, সিদ্ধার্থশঙ্কর মৃত, সেই কান্ডের খলনায়করা সকলেই প্রায় ক্ষমতাহীন, নির্বিষ। কই হোক তো দেখি একটা ভাল ছবি সেই নিয়ে। বামফ্রন্ট আমলেও তো দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসার অনেক ঘটনা। নাহয় তাই নিয়েই হোক। এ আমলে ওসব নিয়ে ছবি করলে তো পুলিশে ধরবে না, উলটে একটা ভূষণ টুষণ জুটে যেতে পারে।
হবে না। কারণ “মৃণালদার” থেকে যদি স্রেফ একটা জিনিস শেখার থাকে, সেটা হল বুকের পাটা। ওটা আবার কারো শেখা হয়নি। আর মেধা? থাক সে কথা। বরং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসা চলুক। পার্টিজানদের ব্যাপারে অস্বস্তি কাটানোর সেরা উপায় তাদের কাল্ট ফিগার বানিয়ে দেওয়া। চিরকালই।

সৃষ্টির মনের কথা

“ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”

দুঃসময়। বড় দুঃসময়ে বেঁচে আছি। সকালের কাগজ ১৯৯২ এর স্মৃতি উশকে দিয়ে লিখছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ হুমকি দিয়েছে রাত পোহালেই দু লক্ষ লোক ঢুকে পড়বে অযোধ্যায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮৯ মনে করানো রথযাত্রার প্রস্তুতি। রাজ্য সরকার শীর্ষস্থানীয় আমলাকে পাঠিয়েছে বিজেপির সাথে যাত্রাপথ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
ওদিকে আসামে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভিড় বাড়ছে, বহু পরিবার ছিন্নভিন্ন, আত্মহত্যার পর আত্মহত্যা। সংসদে পাশ হওয়ার অপেক্ষায় নতুন নাগরিকত্ব আইন। যে আইন পাশ হলে অহিন্দু মানুষের ভারতের নাগরিক হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে” শুধু কবিতার পংক্তি হয়ে যাবে।
এসব ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। আর বিরোধীদের রাজনীতিটা কিরকম?
দিন দুয়েক আগে কংগ্রেস নেতা সি পি যোশী বললেন একমাত্র একজন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীই পারেন রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। মনে করিয়ে দিলেন যে রাজীব গান্ধীই বাবরি মসজিদের তালা খুলিয়ে পুজো আচ্চার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। যোশী আরো বলেছেন হিন্দু ধর্মটা একমাত্র ব্রাক্ষ্মণরাই বোঝে। নরেন্দ্র মোদী, উমা ভারতী এরা আর কী জানবে? নীচু জাতের লোকেদের হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলার কোন অধিকারই নেই। যোশীজিকে যিনি ধমকে দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ, সেই রাহুল গান্ধী কেবল মন্দির থেকে মন্দিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তাই হিন্দুত্বের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর বিজেপি প্রশ্ন তুলেছিল তিনি কি হিন্দু? উত্তরে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেছিলেন রাহুল যে শুধু হিন্দু তাই নয়, তিনি রীতিমত পৈতেওয়ালা হিন্দু।
বাংলার অগ্নিকন্যা তথা কর্ণধার বিজেপিকে আটকাতে দীর্ঘদিন অব্দি সাধারণ মুসলমানকে ভুলে ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সমর্থনে ভর দিয়ে চলছিলেন। বছরখানেক হল সেসব চাপা দিতে আবার ব্রাক্ষ্মণ সম্মেলন, বজরংবলী পুজো, জনসভায় গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ, দুর্গা বিসর্জনের বিষণ্ণতাকে আমুদে কার্নিভালে পরিণত করায় মেতেছেন। তাতেও যথেষ্ট হচ্ছে না মনে করে শেষমেশ আয়করদাতাদের টাকা পুজো কমিটিগুলোকে বিলিয়েছেন। এন আর সি নিয়ে দিনকতক লোকলস্কর নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচি করার পর এখন স্পিকটি নট। অবশ্য ওটা নিয়ে বেশি পরিশ্রম কেনই বা করতে যাবেন? তিনিই তো প্রথম সাংসদ যিনি সীমান্তবর্তী এলাকায় সিপিএম বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকাচ্ছে, এদের বার করে দেওয়া হোক — এই দাবী করে লোকসভার স্পিকারের দিকে কাগজ ছুঁড়েছিলেন।
আর বামপন্থীরা? সর্ববৃহৎ পার্টির নেতাদের একাংশ তো মনে করছেন বিজেপিকে হারাতে উপর্যুক্ত কংগ্রেসেরই হাত ধরা দরকার এক্ষুণি। নিজেদের লড়ার ক্ষমতার উপর এমন আস্থা আর কাদের আছে? এন আর সি, নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বামেদের যে কী মতামত কে জানে! শীর্ষ নেতৃত্ব একবার বলেছিলেন দেখতে হবে নিরপরাধ লোকের যেন হয়রানি না হয়। মানে মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণে তার বংশপরিচয়কে মানদণ্ড ধরায় বোধহয় তাঁদের আপত্তি নেই। যাহা লিগ্যাসি তাহাই লিগাল।
অর্থাৎ দেশের সর্বত্র তাঁদের ভারতীয়তা, তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে মানুষের কাছে। এই প্রমাণ দীর্ঘকাল ঠারেঠোরে চাওয়া হত এদেশের মুসলমানদের কাছে। এখন ঘাড় ধরে চাওয়া হচ্ছে। আসামের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও সেই আওতায়। সংখ্যালঘুদের প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা অপ্রিয়, অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের খুন করলে শাস্তি হয় না চাকরি হয়, ধর্মস্থান ভেঙে দিলে অপরাধ হয় না মন্ত্রিত্ব হয়, গালাগালি দিলে বাহাদুরি হয়।
এমতাবস্থায় প্রায়শই “সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় — দ্বেষ।” মনটা এমন কোন সৃষ্টি খুঁজতে থাকে যার মনের কথা ভালবাসা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম অনুভব সিনহার ছবি ‘মুল্ক’ (দেশ)। হিন্দু, মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গমস্থল বেনারসের পুরনো বাসিন্দা বৃদ্ধ আইনজীবী মুরাদ আলি মহম্মদকে কাঠগড়ায় উঠতে হল এবং প্রমাণ করতে বলা হল তিনি তাঁর মুল্ক অর্থাৎ দেশকে ভালবাসেন। তিনি নিয়মিত আয়কর দেন, পুলিশের খাতায় কখনো তাঁর নাম ওঠেনি, এমনকি গাড়ি চালানোর সময়ও কখনো ট্র‍্যাফিক আইন ভাঙেননি। কিন্তু ওসব যথেষ্ট নয় একথা প্রমাণের জন্যে যে তিনি দেশপ্রেমিক। সন্ত্রাসবাদী নন।
ধর্মীয় মৌলবাদ আমাদের উঠোন পেরিয়ে চলে আসছে আমাদের সবার শোবার ঘর অব্দি। তফাৎ শুধু এই যে সংখ্যালঘুর মৌলবাদকে ঢুকতে হচ্ছে লুকিয়ে চুরিয়ে, সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ আসছে সামনের দরজা দিয়ে। আলি মহম্মদের ভোলেভালা ক্লাস টেন পাশ ভাই বিলালের ছেলে শাহিদ, যাকে ছোটবেলায় ধরে বেঁধে কোরান পড়িয়ে ওঠা যায়নি, সে কাশ্মীরের বন্যাত্রাণে অর্থসাহায্য করছে ভাবতে ভাবতে হয়ে গেল জেহাদি নেটওয়ার্কের সদস্য। আর বাড়ির উল্টোদিকের পান বিক্রেতা চৌবে, যে আলি সাহেবের প্রাণের বন্ধু, তার অকর্মণ্য ছেলে বুক ফুলিয়ে “দেশের কাজে” নেমে পড়ল বাইকের সামনে পতাকা লাগিয়ে। কী সেই কাজ? লোকলস্কর ডেকে এনে আলি সাহেবের গ্যারেজ ভেঙে দেওয়া, হিন্দু উৎসবের আগে লাউডস্পিকারের মুখটা মুসলমানদের বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে তারা টের পায় “গোটা দেশ তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ”, রাতে আলি সাহেবের বাড়িতে পাথর ছোঁড়ার আয়োজন, দেয়ালে এবং দরজায় লিখে দেওয়া “TERRORIST”, “GO TO PAK”।
এই ছবিতে অনুভব সিনহার সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত আমাদের অনেকের মনে তৈরি হওয়া চড়া একরঙা ছবিগুলো মুছে দেওয়া। এ ছবির হিন্দুরা নানারকম, মুসলমানরাও তাই।
ধর্মপ্রাণ অথচ গোঁড়ামিহীন আলি মহম্মদ আছেন, কোরান ঠিকমত না পড়েও জেহাদী হওয়া ভাইপো শাহিদ আছে, অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের ভুয়ো এনকাউন্টারবাদী অফিসার দানিশ জাভেদও আছেন। তিনি মনে করেন সন্ত্রাসবাদীদের গ্রেপ্তার না করে শেষ করে দেওয়া উচিৎ কারণ তারা মুসলমানদের বদনামের কারণ।
হিন্দুদের মধ্যে চৌবে আছেন, যিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে বন্ধু আলির বাড়িতে কোরমা, কালিয়া খেতেন অথচ শাহিদের অপরাধ প্রকাশ হতেই বিরাট হিন্দু হয়ে উঠলেন এবং নিঃসংশয়ে বুঝে নিলেন “আমার ছেলে ঠিকই বলে। ওরা ঐরকমই।“ কিন্তু আলি সাহেবের আরেক বন্ধু সোনকর আছেন, যিনি ১৯৯২ এর ৬ই ডিসেম্বরের অভিশপ্ত রাতে চৌবেকে সঙ্গে নিয়ে আলি সাহেবের পরিবারকে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলেন। যিনি গোটা মহল্লার বিরুদ্ধে গিয়ে আলি সাহেবের পুরো পরিবারকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার চেষ্টা চলার সময়ে পাশে থাকলেন। আলির প্রবাসী ছেলে এসে যখন বলল এ বাড়ি ছেড়ে তার সাথে ইংল্যান্ড চলে যাওয়াই ভাল, তখন সোনকরকে দেখিয়েই আলি সাহেব বললেন “আমরা চলে যাব? আমি নিজেকে কী জবাব দেব? যে আমি দেশদ্রোহী? পাড়ার লোককে সোনকর কী জবাব দেবে? ও বলবে ও দেশদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?”
সর্বোপরি আছেন আরতি মহম্মদ — আলি সাহেবের হিন্দু পুত্রবধূ। একজন বেপথু হয়েছে বলে পুরো পরিবারটাকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার প্রচেষ্টাকে বিফল করার দায়িত্ব শেষ অবধি যার ঘাড়ে পড়ে। মুসলমানদের ঝামেলা মুসলমানরাই সামলাক, কোর্ট তো বলে দিয়েছে ওরা টেররিস্ট — বাবা-মায়ের এইসব আবোলতাবোল কথাবার্তা উড়িয়ে দিয়ে ঘাড় সোজা করে লড়ে যায় মেয়েটি। অথচ বেনারসে আসার আগে স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়েছিল সে, কারণ আলি সাহেবের ছেলে আফতাব চাইছিল সন্তানের জন্মের আগেই যেন তার ধর্মটা ঠিক করে রাখা হয়। শুনানিতে যাওয়ার সময় কিন্তু সে মন্দিরের প্রসাদী ফুল মাথায় ছুঁইয়ে যায়।
আরো এক দল মানুষ আছেন আলি সাহেবের মুল্কে, যাদের কথা না বললেই নয়। কিছু লোক যারা মসজিদে নমাজ পড়তে এসে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় শাহিদ আর বিলালের শাহাদাত উদযাপন করতে আসার জন্যে এবং প্রবল ধমক খায়। আলি সাহেব তাদের জানিয়ে দেন শাহিদ যা করেছে তা শাহাদাত নয়, সন্ত্রাস। যারা তাঁর বাড়িতে পাথর ছুঁড়েছে তারাও যে সন্ত্রাসীই সেকথা তিনি বলে এসেছেন এফ আই আর নিতে অনিচ্ছুক দারোগাকে।
মসজিদে ফিসফিসিয়ে কথা বলা লোকগুলোর দলেই পড়েন সরকারপক্ষের উকিল সন্তোষ আনন্দ। সাক্ষ্যপ্রমাণ না-ই থাক, মুসলমানবিদ্বেষের কোন অভাব নেই তাঁর মধ্যে। তিনি জানেন এখন কেস জিততে হলে বিচারবিভাগকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে হয়; হোয়াটস্যাপ, ফেসবুককে হাতিয়ার করতে হয়।
ছায়াছবি হিসাবে অনায়াসেই আরো ভাল হতে পারত ‘মুল্ক’। তাপসী পান্নু আরো জোরালো আরতি হতে পারতেন, আদালতে তাঁর অতি মূল্যবান closing argument চিত্রনাট্যের সাহায্য পেলে আরো কম বক্তৃতা হতে পারত। বিচারকের শেষ কথাগুলোও, যদিও অত্যন্ত জরুরী, অতটা বক্তৃতার মত না শোনালে নিঃসন্দেহে আরো ভাল হত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কথা এই সময়ে এই ছবিটার প্রয়োজন ছিল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আলি সাহেবরূপী ঋষি কাপুর যখন সন্তোষ আনন্দরূপী আশুতোষ রানাকে প্রশ্ন করেন “আমার দেশে আমাকে স্বাগত জানানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?” তখন প্রশ্নটা তাঁর একার থাকে না, কোটি কোটি ভারতবাসীর হয়ে দাঁড়ায়। সেইসব ভারতবাসীর যাঁদের পান থেকে চুন খসলে পাকিস্তানি বলে সম্বোধন করা হয়, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়ে যাদের দিকে আড়চোখে, বাঁকা হেসে তাকানো হয়।
তবে সবচেয়ে মনে রাখার মত মুহূর্ত তৈরি হয় আদালতে নয়, বাড়ির ছাদে। ভাই বিলালের উকিল থেকে কেসে অন্যতম অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার পর শব্দহীন বিনিদ্র রাতে পুত্রবধূকে আলি সাহেব বলেন “তবসসুম যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এল, তখন আমার সাথে খুব ঝগড়া করত, বলত ‘তুমি আমায় ভালবাস না।’ আমি বলতাম ‘বাসি তো। খুব ভালবাসি।’ ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”
দেশকে ভালবাসার প্রশ্ন উঠতে তাঁর মনে পড়ল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা, মায়ের কথা নয়। “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগানের পরাভবে পূর্ণিমার তাজমহলের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুরাদ আলি মহম্মদের দেশপ্রেম।

দিলীপবাবুর দান: জীবনানন্দ দাশ

তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না

jd

মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কাছ থেকে ঠিক কী পাই আমরা? শিক্ষা বললে বোধহয় উত্তরটা দায়সারা হয়। কারণ শিক্ষা শুধু তাঁরাই দেন না। বাবা-মা দেন, আত্মীয়রা দেন, বন্ধুবান্ধবও নিজের অজান্তেই ভাল মন্দ নানারকম শিক্ষা দেয়। কিন্তু সেই সব শিক্ষাই যে আমাদের মনে থাকে এমন নয়। অথচ কোন মাস্টারমশাইয়ের কাছে শেখা কোন কোন জিনিস আমরা সারা জীবন ভুলতে পারি না। সত্যি কথা বলতে, দীর্ঘ কর্মজীবনের সব ছাত্রছাত্রীকে কোন মাস্টারমশাই বা দিদিমণিরই মনে থাকে না। অথচ এমন মানুষ পাওয়া বিরল যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের ক্লাস করতে হয়েছে তাঁদের কাউকে একেবারে ভুলে গেছে। এই বৈপরীত্যের কারণ শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে লেখাপড়া শেষ করা অব্দি কম শিক্ষক, শিক্ষিকার ক্লাস করে না একজন মানুষ। অথচ অনেক বৃদ্ধকেও দেখেছি স্কুলের মাস্টারমশাইদের দিব্যি মনে রেখেছেন। আসলে সম্ভবত আমরা শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে এমন অনেক জিজ্ঞাসা পাই যা সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকে। তার কিছু ক্লাসঘরেই, কিছু হয়ত ক্লাসঘরের বাইরে। প্রমথ চৌধুরীর কথা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে “সুশিক্ষিত লোক মাত্রেই স্বশিক্ষিত।” অতএব শিখতে হয় নিজেকেই, কেউ শেখাতে পারে না। কিন্তু কী শিখব, কেন শিখব, কোনটা শিখলে আমার ভাল লাগবে — প্রিয় মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা বোধহয় সেটাই ধরিয়ে দেন। কেউ খুব ভাল পারেন কাজটা, কেউ আবার তত ভাল পারেন না। যাঁরা ভাল পারেন তাঁরাই বোধহয় বেশি করে মনে থেকে যান। আজ সকালের কাগজে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে পাতা জোড়া লেখা পড়তে পড়তে যেমন আমার মনে পড়ছিল সেই মাস্টারমশাইয়ের কথা, যিনি জীবনানন্দে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

ক্লাস টেনে পড়ার সময়ে আমাদের পাঠ্য ছিল এই কবিতাটা:

তোমার বুকের থেকে একদিন চ’লে যাবে তোমার সন্তান
বাংলার বুক ছেড়ে চ’লে যাবে, যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে,
আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে
ডুবে যায়, — কুয়াশায় ঝ’রে পড়ে দিকে দিকে রূপশালী ধান
একদিন; — হয়তো বা নিমপেঁচা অন্ধকারে গা’বে তার গান,
আমারে কুড়ায়ে নেবে অন্ধকারে মেঠো ইঁদুরের মতো মরণের ঘরে —
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে আছে আকাঙ্ক্ষার — তবুও তো
চোখের উপরে
নীল মৃত্যু উজাগর — বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণ —

কখন মরণ আসে কেবা জানে — কালীদহে কখন যে ঝড়
কমলের নাল ভাঙে — ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিখের প্রাণ
জানি নাকো;— তবু যেন মরি আমি এই মাঠ-ঘাটের ভিতর,
কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ
লেগে থাকে চোখেমুখে — রূপসী বাংলা যেন বুকের উপর
জেগে থাকে; তারি নীচে শুয়ে থাকি যেন আমি অর্ধনারীশ্বর।

আমাদের কবিতাটা পড়িয়েছিলেন দিলীপবাবু। তিনি গম্ভীর মানুষ। তাঁকে কখনো হা হা করে হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর হাসি স্মিত, তিনি রাগে ফেটে পড়তেন না, ফুটতেন। সর্বদা ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন। ফুল পাঞ্জাবীর হাতা কনুইয়ের উপর পর্যন্ত গোটানো থাকত। চোখে থাকত সেলুলয়েডের ফ্রেমের চশমা, চুল উলটে আঁচড়ানো। দূরদর্শনের সাদাকালো আমলে তোলা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যে ভিডিও এখনো মাঝেসাঝে দেখানো হয়, অনেকটা সেইরকম চেহারা। স্যার অবশ্য অতটা ছিপছিপে ছিলেন না। একটা হাত মুড়ে বুকের কাছে ধরা পাঠ্য বই আর ডাস্টার, অন্য হাতে চক নিয়ে দিলীপবাবু ক্লাসে আসতেন।

জীবনানন্দের কবিতাটা যত দিন ধরে আমাদের পড়িয়েছিলেন, তত দিন ধরে সম্ভবত অন্য কোন লেখা পড়াননি। প্রথম দিনই বললেন “এবার তোমরা যে কবিতাটা পড়তে যাচ্ছ, এর তুল্য কিছু আগে কখনো পড়নি।”

বেয়াড়া প্রশ্ন করার মত ছাত্র কোনকালে কম ছিল না। একজন জিজ্ঞেস করল “স্যার, ট্রামের তলায় কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে?”

আমরা তটস্থ। ভেবেছি রাশভারী দিলীপবাবু ভয়ানক রেগে যাবেন। কিন্তু তিনি স্মিত হেসে বললেন “কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে জানি না বাবা। তবে ইনি জীবনানন্দ দাশ, যে কোন মানুষ নন। এঁকে কোন ছকে ধরা যায় না। তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না। কবিতাটা বারবার পড়। এমনিতে আমাদের যা অভ্যেস আর কি। মানে বই পড়ব, বইটা পড়ব না। সেটা এঁর ক্ষেত্রে করেছ কি মরেছ।”

কবিতাটা পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝে আমাদের মুখগুলো দেখতেন। কোন মুখে একটু আগ্রহের উদ্ভাস, কোন মুখ একেবারে অনাগ্রহী, কোন মুখ দুর্বোধ্যতায় হাবুডুবু — এসবই খেয়াল করতেন বোধ করি। পড়াতে পড়াতে একদিন “কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ” পংক্তিতে পৌঁছেছেন। একজন প্রশ্ন করল “স্যার, ঢেউয়ের আবার গন্ধ হয় নাকি?”

“পুকুর বা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কোন গন্ধ পাওনি কখনো?”

ছেলেটি মাথা নেড়ে না বলায় দিলীপবাবু বড় অসহায়ের মত হাসলেন। তারপর বললেন “সত্যি। এ বড় অন্যায়। যাঁরা পাঠ্য ঠিক করেছেন তাঁদের বোধহয় এতখানি দাবী করা উচিৎ হয়নি তোমাদের কাছে। ক্লাসরুমে বসে কী করেই বা ঢেউয়ের গন্ধ বুঝবে তোমরা? তাছাড়া এত কিছু অনুভব করতে বলাও কি উচিৎ? অনুভব না করেই যখন পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায়। তবে বাবা কবিতা তো পাঠকের একটু বেশি মনোযোগ দাবী করে। কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও?”

আমাদের তখন দুর্বিনীত হওয়ার বয়স। আমি আর আমার এক বন্ধু তখন মনে করি আমাদের আশ্চর্য কাব্যপ্রতিভা আছে। আমরা দুজনেই তখন পাঠ্য কবিতার অক্ষম অনুকরণ দিয়ে কবিতার খাতা ভরিয়ে ফেলছি। অতএব যেদিন কবিতাটা পড়ানো শেষ হল এবং দিলীপবাবু বললেন কারো কোন প্রশ্ন থাকলে করতে, সেদিন আমার বন্ধুটি জিজ্ঞেস করল “স্যার, ভবিষ্যতে কোন কবি যদি জীবনানন্দের মত লিখতে পারে?”

দিলীপবাবু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন “সে হবার নয়। ইনি যে পথে হেঁটেছেন সে পথে বাংলা কবিতার ইতিহাসে আগেও কেউ হাঁটেননি, পরেও কেউ হাঁটেননি। যে হাঁটবে তার পরিণতি হবে জীবনানন্দের মতই। কত লোকে কত কথা বলেছে। কেউ বলেছে নৈরাশ্যবাদী কবি, কেউ বলেছে নির্জনতার কবি। এঁর মত হওয়া যায় না। আর হতে যাবেই বা কেন? নিজের মত হও।”

ক্লাসের শেষদিকে এসে বললেন “কবিতাটা তো পড়ালাম। কিন্তু বলে দিই, দেখা গেছে বোর্ডের পরীক্ষকরা জীবনানন্দের কবিতার প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেয়ার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। অতএব যারা বেশি নম্বর পেতে চায় তারা জীবনানন্দকে ছোঁয় না। তোমরাও নির্ঘাত তাই করবে। তবে কেবল নম্বর পাওয়ার জন্যে কবিতা পড়া খুবই দুর্ভাগ্যের। জীবনানন্দ তোমাদের নম্বর পাইয়ে দিতে পারবেন না। তবে যদি একটু ভাল লাগিয়ে নিতে পার, তাহলে এমন অনেক কিছু পেতে পার যা আমারও জানা নেই।”

আরও পড়ুন শ্রদ্ধেয়

যেন রহস্যোপন্যাস। শেষে সাংঘাতিক কিছু আছে সেই আভাসটুকু দিলেন কিন্তু কী আছে বললেন না। ঐ খোঁচাটুকুই আমায় বাধ্য করল রূপসী বাংলা বইটার খোঁজ করতে। পরে আরো অন্যান্য। আজও যখন জীবনানন্দ পড়তে গিয়ে কোন পংক্তিতে আটকে যাই, দুর্বোধ্য মনে হয়, স্যারের কথাগুলো মনে করি। “কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও।”

দিলীপবাবু আমায় জীবনানন্দ দিয়েছেন। তাঁর ক্লাসে আজও বসে আছি।

হে অভ্রান্ত চুল

ওয়েন্ডি ডোনিগার হিন্দুশাস্ত্র নিয়ে লিখতে পারবেন না কারণ তিনি বিধর্মী এবং বিদেশী। অড্রে ট্রাশকের গবেষণাও আমরা জানতে চাই না একই কারণে। সুতরাং শামিম আহমেদই বা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে লেখেন কোন সাহসে? কি ভাগ্যি ম্যাক্স মুলার সাহেব এ যুগে জন্মাননি!

প্রায় দেড় দশক হল খবরের কাগজে কাজ করছি। নয় নয় করে গোটা পাঁচেক কাগজে কাজ করা হয়ে গেল। এই কাগজগুলোর কোন কোনটার আবার এক বা একাধিক যমজ কাগজ আছে অন্য ভাষার। এছাড়াও অনেক কাগজ আছে যেগুলো পড়ি কিন্তু কখনো কাজ করিনি। এতগুলো কাগজ মিলিয়ে আজ অব্দি একটি কাগজও পাইনি যাতে কখনো কোন ভুল বেরোয় না। সমস্ত ভুলই অনভিপ্রেত এবং পরিহার্য। তবুও অনিবার্য। তার কারণ খবরের কাগজে লেখে এবং সম্পাদনা করে মানুষ। সাংবাদিকরা মানুষ, তাঁরা ভুল করেন। আবার সম্মানীয় অতিথি লেখক লেখিকারাও অনেক সময় ভুল করেন কারণ তাঁরাও মানুষ। সাংবাদিকতায় শিক্ষানবিশির দিনগুলোতে যাঁর কাছে হাতে কলমে কাজ শিখেছি, ভুল করলে তিনি প্রবল বকাঝকা করতেন সঙ্গত কারণেই। তবে পরে একটা কথা বলতেন, সেটা খুব দামী কথা। “কাজ করলেই ভুল হবে। একমাত্র যে কোন কাজ করে না, তারই ভুল হয় না।”

এই কথাটা কখনো ভুলতে পারি না বলেই অনুজ সাংবাদিকরা বা সংবাদজগতের বাইরের কেউ কোন সংবাদমাধ্যমের প্রমাদ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় বা তার বাইরে রগড় করতে চাইলে প্রশ্রয় দিই না। আমারও তো কাজ করতে গিয়ে ভুল হয়। ক্রিকেট মাঠে যেমন বলা হয় “যে ক্যাচ ফেলেছে তাকে ধমকিও না। পরের ক্যাচটা তোমার হাত থেকে পড়তে পারে।”

গত রবিবার বহুল প্রচারিত একটা কাগজে প্রকাশিত শামিম আহমেদের একটা লেখা নিয়ে যারা বাজার গরম করে চলেছে তাদের কান্ড দেখে এই কথাগুলো বলতেই হল। তবে এটুকু বলে ছেড়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তার কারণ লেখাটা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যা চলছে সেটা শুধু একটা লেখার একটা ভুলভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা নয়, লেখাটার উৎকর্ষ বা উৎকর্ষের অভাব নিয়ে মতপ্রকাশ নয়, লেখকের মেধা নিয়ে ব্যঙ্গ (লেখক সম্বন্ধে কিছু না জেনেই), তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে টানাটানি, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সরাসরি বা ঠারেঠোরে বলা “ও আর কী জানবে”। শুধু তাই নয়, এও বলার চেষ্টা হয়েছে যে জন্মাষ্টমীর দিন এই লেখা আসলে হিন্দুদের পূজ্য শ্রীকৃষ্ণকে কালিমালিপ্ত করার প্রচেষ্টা।

এগুলোকে এক কথায় বলে অসভ্যতা। এক দল লোক দেখলাম লিখছে সংশ্লিষ্ট কাগজের উচিৎ ছিল কোন সংস্কৃত পন্ডিতকে দিয়ে লেখাটা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। স্পষ্টতই এখানে scholar অর্থে পন্ডিত বলা হচ্ছে না। কারণ যে লিখেছে সে জানে না শামিমবাবু সংস্কৃত জানেন কি জানেন না। শুধু লেখকের নাম থেকেই সে ধরে নিয়েছে এমন হতেই পারে না যে লোকটি সংস্কৃত জানে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী একজন হিন্দুদের পুরাণ আর কী জানবে?

এই জাতীয় সর্বজ্ঞ সমালোচকদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক যে শামিমবাবু ইতিমধ্যেই মহাভারত নিয়ে পাঁচটি বইয়ের রচয়িতা। রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের দর্শন বিভাগের এই অধ্যাপকের অধীনে ছজন মহাভারত নিয়ে এম ফিল স্তরের গবেষণা করেছে, আরো চারজন পি এইচ ডি ডিগ্রির জন্য গবেষণারত। পুরনো খবরের কাগজ (বা ইন্টারনেট) ঘাঁটলে এও জানা যাবে যে রামকৃষ্ণ মিশনের ইতিহাসে শামিমবাবু প্রথম ইসলাম ধর্মাবলম্বী অধ্যাপক যিনি স্নাতক স্তরে বেদান্ত দর্শন পড়িয়েছেন। এই সবই তিনি করে ফেললেন এতগুলো বছরে, সংস্কৃত না জেনেই — এতটা ভাবার মূর্খামি আশা করি সমালোচকরা করবেন না।

আরেক ধরণের সমালোচক দেখলাম সোজাসুজি লিখেই দিয়েছেন যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জন্মাষ্টমির দিনে বা অন্যান্য হিন্দু উৎসবের দিনগুলোতে হিন্দু দেবদেবীদের নিয়ে কুৎসা রটানো হয় শস্তা পাবলিসিটি পাওয়ার জন্যে। শামিমবাবুর লেখাটা বারবার পড়েও অবশ্য কৃষ্ণের বিরুদ্ধে কুৎসা কোন জায়গাটায় করা হয়েছে বুঝে উঠতে পারলাম না। আসলে দোষ বোধহয় ব্যাসদেবেরই। তিনি মহাকাব্য লিখেছেন মনপ্রাণ দিয়ে। তাঁর কাব্যের চরিত্রেরা ভগবান হলেও দোষেগুণে মেশামিশি। সেইজন্যেই কয়েক হাজার বছর পরেও কাব্যটা সজীব। ব্যাসদেব তো আর জানতেন না এখনকার বিরাট হিন্দুদের নীতিবোধ চীনের পাঁচিলের মত উঁচু হবে, যা শ্রীকৃষ্ণের পক্ষেও অলঙ্ঘ্য হবে, সে যতই তিনি মূককে বাচাল এবং পঙ্গুকে গিরি লঙ্ঘন করার শক্তি দিন না কেন।

লেখার যে যে তথ্য নিয়ে সমালোচকদের আপত্তি সেগুলো নিয়ে আর আমি বাক্য ব্যয় করব না। লেখকের নিজের বক্তব্যই নীচে দেওয়া রইল। যা দুঃখের তা হল লেখার চেয়েও লেখকের পরিচয় আমাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আজকাল। ওয়েন্ডি ডোনিগার হিন্দুশাস্ত্র নিয়ে লিখতে পারবেন না কারণ তিনি বিধর্মী এবং বিদেশী। অড্রে ট্রাশকের গবেষণাও আমরা জানতে চাই না একই কারণে। সুতরাং শামিম আহমেদই বা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে লেখেন কোন সাহসে? কি ভাগ্যি ম্যাক্স মুলার সাহেব এ যুগে জন্মাননি! আর মাইকেল মধুসূদন! তিনি তো এ যুগে নির্ঘাত গণপিটুনিতে মারা যেতেন। তাঁর জীবন নিয়ে উৎপল দত্তের মঞ্চসফল নাটক ছিল ‘দাঁড়াও পথিকবর’। তখন আমার জন্ম হয়নি। পরে ঐ নাটকের উপর ভিত্তি করে তৈরি ছায়াছবিতে দেখেছিলাম একটি দৃশ্যে সুদূর গ্রামদেশ থেকে এক বৈষ্ণব কলকাতায় এসেছে শুধু ব্রজাঙ্গনা কাব্যের রচয়িতাকে দেখবে বলে। সুট বুট পরা মাইকেলকে দেখে তো সে তাজ্জব। সে বলে “তুমি নিশ্চয়ই শাপভ্রষ্ট, বাবা। এ কাব্য যে লিখেছে সে আসলে পরম বৈষ্ণব।” ঐ বৈষ্ণব ভদ্রলোকের সহিষ্ণুতা আমরা হারিয়েছি। তাই এখন অভ্রান্ত চুলেদের রাজত্ব। সেই যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “টিকি মুণ্ডে চড়ি উঠি কহে ডগা নাড়ি, হাত-পা প্রত্যেক কাজে ভুল করে ভারি। হাত-পা কহিল হাসি, হে অভ্রান্ত চুল, কাজ করি আমরা যে, তাই করি ভুল।“

অভ্রান্ত চুলেদের বলি, এককভাবে বা দলবদ্ধ ট্রোলিং করে শামিমবাবুকে চুপ করানো যাবে না। কারণ তিনি একা নন, আমরা তাঁর সঙ্গে আছি এবং যতদিন আছি ততদিন তাঁকে একা হতেও দেব না।

বিঃ দ্রঃ যা দিনকাল তাতে প্রশ্ন উঠবেই যে আমি শামিম আহমেদ সম্পর্কে এত জানছি কী করে বা তাঁর হয়ে ওকালতি করছি কেন? উত্তরটা সোজাসুজি দিয়ে রাখি। প্রথমত, কার কী নিয়ে লেখা উচিৎ তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার গণতন্ত্রে একমাত্র লেখকের নিজের। কোন ভুল সে অধিকার কেড়ে নেওয়ার সপক্ষে কোন যুক্তি নয়। সেই অধিকারের সপক্ষে দরকার হলে এক হাজার বার ওকালতি করব। দ্বিতীয়ত, শামিমবাবুর সাথে দু দশক আগে ক্লাসঘরে আমার আলাপ হয়। এতদিনে ক্লাসঘর ছাড়িয়ে আমাদের অসমবয়সী বন্ধুত্ব এতটাই অগ্রসর যে তিনি আমার পরিবারভুক্ত, আমি তাঁর পরিবারের লোক। আমার পরিবারের দিকে তেড়ে এলে আমি তো চুপ করে বসে থাকব না।

shamim1shamim2

সায়েবসুবোদের ছবি

বাংলা ছবির ফেস্টিভ্যাল অভিযান ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগেই শুরু হয়েছে। এমনকি সত্যজিৎ, মৃণালের ছবিও কখনো ফেস্টিভ্যাল দর্শন করেনি, পুরস্কৃতও হয়নি

কাল হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় একটা বাংলা ছবি দেখতে চলে গেলাম সপরিবারে। বেশ ভাল লাগল ছবিটা। যতটা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশিই ভাল লাগল। কিন্তু এক বালতি দুধে একফোঁটা চোনা। ছবির কলাকুশলীদের নামের তালিকা পুরোটাই রোমানে লেখা। বেশ কয়েকবছর হল বাংলার ছবিতে এটা বাংলার পাশাপাশি রোমানেও লেখার চল হয়েছে। অনেক ছবিতেই দেখেছি বাংলা লেখাটা পর্দার এককোণে অবহেলায়। এখানে দেখলাম বাংলা একদম বাদ।
বাংলা বর্ণমালার প্রতি ছবি করিয়েদের এই অনীহার কারণ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। চটজলদি উত্তর আসে “আসলে ফেস্টিভ্যালে পাঠাতে হয় তো।” যেন বাংলা ছবির ফেস্টিভ্যাল অভিযান ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগেই শুরু হয়েছে। এমনকি সত্যজিৎ, মৃণালের ছবিও কখনো ফেস্টিভ্যাল দর্শন করেনি, পুরস্কৃতও হয়নি। একথা বললে আবার উত্তর আসে “বাংলা করার অনেক খরচ তো।” এতেও প্রশ্ন ওঠে সত্যজিৎ, মৃণালের কি মাটির নীচে রূপোর কলসীতে গুপ্তধন পোঁতা ছিল? আচ্ছা ফেস্টিভ্যালের দর্শক, বিচারকদের জন্যে বিদেশী ভাষায় সাবটাইটেল করাতে কোন খরচ হয় না? তাছাড়া ফেস্টিভ্যাল মাথায় রেখে যাঁরা ছবি বানান আজকাল, তাঁরা কত কাঁড়ি কাঁড়ি পুরস্কার আনছেন, বাংলা ছবি সারা বিশ্বে কেমন অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। আরো একটা প্রশ্ন করি। বাংলাদেশের ছবিগুলো ফেস্টিভ্যালে যায় না? যাকগে।
পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পের যে ভাঁড়ে মা ভবানী সেটা অনেকদিন হল কোন গোপন তথ্য নয়। কলাকুশলীরা নিজেরাই তো সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়ান যে ছবি করার খরচ তুলতেই বেশ কষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে এই রোমানে টাইটেল কার্ড করে ইংরিজি না জানা দর্শককে অচ্ছুত করে রাখার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, যাকে ইংরিজিতে elitism বলাই সঙ্গত, সেটা বাংলা ছবির নিয়ামকরা পান কোথায়? নাকি ব্যাপারটা আসলে এই যে বাংলা ছবির উচ্চশিক্ষিত শহুরে নির্মাতারা নিজেদের নামের সঠিক বাংলা বানানটাও জানেন না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেন না? সে না হয় না-ই জানলেন। এ নিয়ে বেশি বললে আবার ব্যাপারটা শেষ অব্দি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু কথা হচ্ছে বাংলা ভাষাটা যখন এতই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বস্তু তখন এই সায়েবসুবোরা নিজেদের সায়েবসুবো দর্শকদের জন্যে ইংরিজি ছবিই বানান না কেন? তাহলে তো ফেস্টিভ্যালের বিচারকদের আরো সুবিধা হয় আর ইংরিজিতে যাকে wider audience বলে, আপনাদের প্রশ্নাতীত প্রতিভা সেটাও পেতে পারে আর আর্থিক ক্ষতির মাত্রাও কমে যেতে পারে।