লজ্জার ভাগ

ভিখারি দূরে থাক, হকারদের প্রবেশও নিষেধ। কেউ ফাঁকতালে গ্রীষ্মের দুপুরে ঢুকে পড়লে রক্ষীর চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে।

উসকোখুসকো, পরিচর্যার অভাবে লাল হয়ে যাওয়া দড়ির মত চুল, পরনে রং বোঝা যায় না এমন সালোয়ার কামিজ, কাঁধে একটা কাপড়ের পোঁটলা, সঙ্গে হাড় জিরজিরে ছেঁড়া ফ্রক পরা বছর দশেকের একটি মেয়ে। এভাবে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন একজন বছর তিরিশের মহিলা। দিন পনেরো আগের কথা। কোনো ভণিতা নেই, দরজা খুলতেই বললেন “বাবু, দুটো কাপড় হবে? আমাদের পরার কাপড় নেই।” বাড়ির দরজায় এসে কেউ সরাসরি হাত পেতে দাঁড়ায়নি অনেককাল। তাই কিছুটা ধাক্কা লেগেছিল। নিজের ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে, বউ মেয়ের দিকে তাকিয়ে লজ্জাই হয়েছিল কিছুটা। গিন্নীর ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু পুরনো জামাকাপড় প্রার্থীর হাতে তুলে দেওয়া গেল। বাচ্চা মেয়েটির চোখ দিয়ে খিদে এমন দৃষ্টিকটুভাবে চেয়ে ছিল, যে তার হাতে দুটো বিস্কুটও দেওয়া গেল। তাতেই বোঝা গেল, এমন নয় যে ওদের বাড়িতে অন্নের তবু সংস্থান আছে, কেবল বস্ত্র ভিক্ষা করতে হচ্ছে। মহিলা বলে বসলেন “বাবু, চাল হবে?” আসলে ইনি ভিক্ষাজীবী নন একেবারেই। বললেন অধুনা প্রায় জঙ্গলে পরিণত হিন্দমোটর কারখানার পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলোর একটাতে থাকেন। কী কাজ করতেন বললেন না, কিন্তু বললেন কাজ ঘুচে গেছে অতিমারীর কোপে। কাপড় দিয়েছি গোটা কয়েক, মেয়ের হাতে বিস্কুট দিয়েছি না চাইতেই, কিঞ্চিৎ নগদও দিয়েছি। বোধহয় সে জন্যেই ভরসা করে চাল চেয়েছিলেন। কেন কে জানে, ফস করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল “হবে না।” একটিও কথা না বাড়িয়ে, পোঁটলার মুখ বেঁধে ফেলে দুজনে বিদায় নিলেন।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার পর মনে হল, ফিরে ডাকি। কিন্তু কোথায় যেন আটকে গেল। গিন্নী শুনে বললেন “হবে না বললে কেন? চাল তো ছিলই।” ভেবে দেখলাম, চাল আছে। অভাব তো নেই-ই, বরং উদ্বৃত্ত আছে। কিন্তু আমার দেবার মনটাই নেই। নিজের কাছে নানারকম যুক্তি খাড়া করে ফেললাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। যেমন, কাপড় দিলাম, টাকা দিলাম, আবার চালও দেব? বাড়াবাড়ি করা ভাল নয়। যদি চিনে রাখে, নিয়মিত আসা যাওয়া শুরু করে? প্রগতিশীল যুক্তিও খবরের কাগজের ক্রোড়পত্রের মত লাগিয়ে দিলাম পিছনে — ভিক্ষা দেওয়া ভাল নয়। এর সমর্থনে দু-একজন মহাপুরুষের উক্তিও মনে করার চেষ্টা করলাম, মনে পড়ল না। শেষ পর্যন্ত দুটো কথা স্বীকার না করে উপায় রইল না। প্রথমত, যিনি এসেছিলেন তিনি সারা বছর ধরাচূড়ো পরে ট্রেনে বাসে ভিক্ষা করে নেশার টাকা তুলে বেড়ানোর লোক নন। লজ্জার মাথা খেয়ে মেয়ের হাত ধরে ভিক্ষা করতে বেরিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, যদি বারবার ফিরেও আসেন, তাহলেও আমার যত আছে সবটা ভিক্ষা করে নিয়ে যাওয়ার শক্তি ওঁর নেই।

আসলে সংবেদনশীলতা বোধহয় একটা অভ্যাস। সে অভ্যাস আমার চলে গেছে, তাই কয়েক মিনিটের জন্যও আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়াতে পারি না। ভয় হয়, দুর্বলতম মানুষটিও আমার সব কেড়ে নেবে। অথচ নেওয়ার মত কী-ই বা পড়ে আছে আমাদের? এক সময় কিন্তু ছিল। যখন এ তল্লাটে বাড়ি বাড়ি আসতেন তাঁরা, যাঁদের আমরা সবাই ভিখিরি বলতাম।

ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ের যে জায়গাগুলো হুগলী শিল্পাঞ্চলের মধ্যে ধরা হত, তারই একটায় আজন্ম বসবাস করছি। আমার জন্মের আগে বা আমার জ্ঞান হওয়ার আগেই এ অঞ্চলের বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সমরেশ বসুর গল্প, উপন্যাসে এই অঞ্চলের যে ব্যস্ত শ্রমিক মহল্লার ছবি পাওয়া যায়, সেসব বিরল হয়ে আসতে শুরু করেছে ক্রমশ। র‍্যালিস ইন্ডিয়াকে প্রথম থেকেই পোড়োবাড়ি বলে জেনেছি, রিলাক্সন কারখানায় ধর্মঘট, শ্রমিক-মালিকের টানাপোড়েন চলছে — এসব শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। কিন্তু কৈশোরের শেষ পর্যন্ত হিন্দমোটর আর রিষড়ার অ্যালকালির সাইরেন ভুলতে দেয়নি যে আমরা শিল্পাঞ্চলে বাস করি। পাড়ার কাকু, জেঠু, দাদারা সাইরেন বাজার খানিক আগে-পরে সাইকেল নিয়ে কারখানার দিকে রওনা হতেন বা ফিরতেন। ওসব সকাল-বিকেলের ব্যাপার। দুপুরের নৈঃশব্দ্য, গৃহিণীদের দু দণ্ড বিশ্রামের শান্তি ভঙ্গ হত ভিখারিদের আগমনে।

যাঁরা আসতেন তাঁদের রোজ দেখতে দেখতে মুখ চেনা হয়ে যেত। এক লোলচর্ম বৃদ্ধা আসতেন। পিঠ বেঁকে মাটির সাথে প্রায় সমান্তরাল হয়ে গেছে, দু পা হেঁটেই হাঁপিয়ে পড়েন, টানা কথা বলতেও পারেন না। পয়সা দিলে ক্ষুণ্ণই হতেন। তাঁর দরকার ছিল চাল, ডাল অথবা আলু। তখন ফ্ল্যাটে থাকতাম না। নিজেদের বাড়ি ছিল, সে বাড়ির চাল ছিল টিনের, বৃষ্টি হলে জলও পড়ত। কিন্তু ওই বৃদ্ধাকে মা কখনো বলেননি, চাল হবে না। এ কেবল আমার বাড়ির গল্প নয়। এলাকায় দোতলা বাড়ি তখন গোনা যেত, আর টিভি থাকতে একটা-দুটো বাড়িতে। বৃদ্ধা সব বাড়ি থেকেই কিছু না কিছু পেতেন, ঠা ঠা দুপুরে জিরিয়ে নিতেন কোনো বারান্দায় বসে। হাফপ্যান্টের বয়সে কৌতূহলের সীমা থাকে না। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম “দিদা, তুমি ভিক্ষা করো কেন? তোমার বাড়িতে কেউ নেই?” ছিল, সবই ছিল। স্বামী না থাকলেও ছেলে ছিল, বৌমা ছিল, নাতি-নাতনি ছিল। কিন্তু তারা দেখে না, দু মুঠো খেতেও দেয় না — এমনটাই বলেছিলেন তিনি। দিদার মৃত্যুসংবাদও যথাসময়ে পাওয়া গিয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, আমাদের পাড়ার লোকেরাই চাঁদা তুলে তাঁর সৎকারের ব্যবস্থা করেছিল।

এক কাকু ছিল, যে শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ভিক্ষা করতে চাইত না। জন্মান্ধ, তার উপর টাকাপয়সার হিসাবও রাখতে পারত না ঠিক করে। তাই তার বাড়ি বাড়ি ধূপ বিক্রি করার ব্যবসা নামেই ব্যবসা। কোনো ক্রেতা তাকে সুযোগ পেয়ে ঠকিয়েছে কিনা জানি না, তবে যে ধূপ সে বিক্রি করতে আসত তার গন্ধ তেমন মনোমুগ্ধকর ছিল না। আদৌ কোনো গন্ধ ছিল কিনা সে-ও তর্কসাধ্য, অর্থাৎ পাইকারি বিক্রেতা তাকে বরাবরই ঠকিয়ে গেছে বলা যায়। সুতরাং কাকুর কোনোমতে গ্রাসাচ্ছাদন আসলে লোকের দয়ার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। বয়স একটু বাড়তে মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণও দেখা দিয়েছিল, ফলে দুর্দশার শেষ ছিল না। তবু, কটু কথা শোনালেও, তাকে যৎসামান্য সাহায্য করার লোকের অভাব ছিল না আমাদের এই অকিঞ্চিৎকর মফস্বলে।

মাঝে মাঝে দেখা মুখও ছিল কয়েকজন। সেই সময়কার আর সব মফস্বল স্টেশনের মত, আমাদের কোন্নগর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেও ভিখারিদের দেখা পাওয়া যেত। তাছাড়া কালীপুজোর দিন সন্ধেবেলা আমারই বয়সী কিছু শুকনো মুখ ঘুরে বেড়াত। তারা শিশু হলেও আত্মসম্মান যথেষ্ট, তাই কখনো কারোর কাছে বাজি চায়নি। কিন্তু তাদের মুখের অন্ধকার দেখেও নিজের ভাগের আলো থেকে একটুও দেবে না কোন পাষাণ?

আশির দশক পেরিয়ে নব্বইয়ের দশকে এসে কিন্তু অন্য মানুষের দয়ায় বাঁচতে বাধ্য মানুষের সংখ্যা কমে গেল বহুগুণ। এলাকায় বন্ধ কারখানার সংখ্যা বাড়লেও চোখের সামনে দেখতে পেলাম, কিছু না কিছু করছে সকলেই। নিতান্ত ভিক্ষা করে খাওয়ার লোক আমাদের এলাকায় আর নেই দেখে অদ্ভুত স্বস্তিবোধ হত। আজ যৌবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমার বৃত্তের সমবয়স্ক এবং বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেদের সাথে কথা বলে দেখি, নিজ নিজ এলাকায় তাঁদের অভিজ্ঞতাও এরকমই। অন্যের অনুগ্রহের ভরসায় জীবনধারণ করার চেয়ে গ্লানিকর কিছু নেই। সে গ্লানি দেখাও গ্লানিকর। তা কাউকে অবসন্ন করে, কাউকে ক্ষিপ্ত করে। ওই গ্লানি থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি বলেই মনে হয়েছিল মাঝের কয়েক বছর।

এখন ভারতের যে প্রান্তের মানুষের সাথেই কথা বলছি, মন খারাপ করা গল্প বলছেন সবাই। আলোকচিত্রীদের ক্যামেরাতেও ধরা পড়ছে মানুষের অসীম দুর্দশার ছবি। পথ দিয়ে চলে যাওয়া দুধের গাড়ি থেকে গড়িয়ে পড়া দুধ রাস্তা থেকে চেটে খাচ্ছেন একজন — এমন ছবিও আমরা দেখে ফেলেছি গত বছর। তার আগেই অবশ্য আমার কল্পনাশক্তিকে অবশ করে দিয়ে হুগলী জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের অধিবাসী এক বন্ধু জানিয়েছে, এক দুপুরে তারা সবে খেয়ে উঠে ঢেঁকুর তুলছে যখন, এক পথিক এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছে “ভাত হবে?” বছর তিরিশেকের ছেলেটি নিজের জন্মস্থানে মানুষকে এভাবে অভুক্ত থাকতে কখনো দেখেনি। ভারতের রাজধানীতে জন্মানো, বেড়ে ওঠা সাংবাদিক বন্ধুও এই দেড় বছরে একাধিকবার বলেছেন, যারা খেটে খেত, তারাও হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে।

জানি না, পাঠক, এসব অভিজ্ঞতা কতটা মিলছে আপনাদের অভিজ্ঞতার সাথে। আমাদের নবগ্রাম অনেক বদলে গেছে, আমরা সবাই বদলে গেছি। এখানে এখন অনবরত বাড়ি ভাঙছে, ফ্ল্যাট উঠছে। সেসব ফ্ল্যাটে আমরা সম্ভ্রান্ত লোকেরা থাকি। আমার ফ্ল্যাটের সদর দরজা খোলা পেয়েই নিশ্চয়ই দোতলায় উঠে আসতে পেরেছিল ওই তরুণী মা আর তার মেয়ে। হয়ত আর কোনোদিন পারবে না। বহু ফ্ল্যাটে সজাগ রক্ষী আছে এসব বাজে লোককে আটকানোর জন্য। ভিখারি দূরে থাক, হকারদের প্রবেশও নিষেধ। কেউ ফাঁকতালে গ্রীষ্মের দুপুরে ঢুকে পড়লে রক্ষীর চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে। আপনি যদি তেমন কোনো ফ্ল্যাটের বাসিন্দা হন, তাহলে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতা, বমন উদ্রেককারী দৃশ্যের পসরা সাজাবার জন্য। এসব গালগল্প মনে হলে আমিই দায়ী।

আসলে অনুগ্রহ প্রার্থী মানুষ আমাকে বড় লজ্জায় ফেলেন। অতিমারীর সময় হঠাৎ লজ্জায় পড়তে হয়েছে তা নয়। এ লজ্জার শুরু এই সহস্রাব্দের গোড়ার দিকে। তার আগে নেহাত বালক ছিলাম, লজ্জা ঘৃণা ভয় — সবই কম ছিল। প্রথম লজ্জা পেলাম যখন সাহাগঞ্জের ডানলপ কারখানার শ্রমিকরা আমাদের বাড়িতে পুরুষ-মহিলাদের প্রসাধন সামগ্রী বিক্রি করতে এলেন। বাবার বয়সী লোক সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালে যে পায়ের নীচের মাটি দুলতে শুরু করে, সে অনুভূতি সেই প্রথম। আমরা যত বড় হয়েছি, বন্ধ কারখানার সংখ্যা যত বেড়েছে, তত বেড়েছে মরিয়া শ্রমিকদের যাতায়াত। এক পাড়ায় কতজন এক মাসে কতগুলো ডিওডোর‍্যান্ট কিনতে পারে? উত্তর জেনেও তাঁদের দলে দলে, বারবার আসতে হয়েছে আমাদের দুয়ারে। বিপন্ন মানুষের জন্যে, রোজগারের রাস্তা খোঁজা মানুষের জন্যে এই পৃথিবী কী ভীষণ ছোট! যাঁরা আসেন, তাঁদের কখনো না কখনো ফেরাতেই হয়। মেজাজ ভাল থাকলে নরম সুরে “সেদিন যেটা দিয়ে গেলেন, এখনো ফুরোয়নি যে, কাকু।” তিরিক্ষে হলে “এই তো আপনাদের ফ্যাক্টরিরই একজনের থেকে একটা জিনিস কিনলাম। কজনের থেকে কিনতে হবে রে বাবা?” মাসে মাসে এলে কয়েক জনের মুখ চেনা হয়ে যায়। তখন অনুগ্রহ প্রার্থনা আরও লজ্জায় ফেলে। কেউ কেউ নিজের অবস্থায় এতই লজ্জিত, যে সামান্য নখপালিশ কেনার জন্য হাঁটুর বয়সী গৃহবধূকে বলে ফেলেন “আপনাদের অশেষ দয়া। আপনারা আছেন বলেই আমার মেয়েটা খেতে পরতে পাচ্ছে মা।” আসলে তিনি জানেন এই বেচা কেনা চাহিদা-যোগানের অর্থনৈতিক নীতি অনুযায়ী হচ্ছে না, হচ্ছে অনুগ্রহের ভিত্তিতে।

গত দেড়-দুই দশক ধরে তবু এই ভানটুকু আমাদের আব্রু বজায় রেখেছিল। অতিমারী এসে সেটুকুও বুঝি কেড়ে নিল। ভিখারি হওয়া ছাড়া আর পথ রইল না অনেক মানুষের। নিজেকে এখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুঃশাসনীয় গল্পের নারীদের মত অসহায়, উলঙ্গ মনে হয়। দুঃখ ভাগ করলে কমে জানি, লজ্জা ভাগ করলে কমে কিনা জানি না। তাই খানিক আশায়, প্রিয় পাঠক, এই ঝুঁকি নিলাম।

https://aajkaal.in এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

বর্ষার শব্দ

শিরীষ কাগজের চালাকি ভেদ করতে বর্ষার একটা গোটা মরসুমও লাগেনি। ভিতরে ঢুকতে পেয়ে তার সুরও গেল বদলে।

বর্ষার শব্দ আছে। বৃষ্টির শব্দ নয়, যে শব্দের কথা বলছি তা অন্য কোনো শব্দের সাথে মেলে না।

আমাদের বাড়িটা মজবুত এবং পাকা। কিন্তু বাবা-জ্যাঠাদের মধ্যে ঠাকুর্দার তৈরি বাড়ি ভাগাভাগি হওয়ার সময় বারান্দাটা আমাদের ভাগে পড়েনি। অথচ রোজ প্রচুর মানুষ আসেন বাবার কাছে নানা প্রয়োজনে, তাঁদের বসার জায়গা দেওয়া যায় না। তাই বারান্দার দরকার পড়ল। শিক্ষক বাবার মাইনে তখন হাজার দশেক। মাকে জিজ্ঞেস করলেন “লোন নিয়ে বারান্দাটা করে না ফেললে আগামী বর্ষায় খুব মুশকিলে পড়ব। কটা বছর ডাল, আলুসেদ্ধ খেয়ে থাকতে হবে কিন্তু। পারবে তো?” সে যুগের মধ্যবিত্ত গৃহিণীরা পারতেন না এমন কৃচ্ছ্রসাধন আজও আবিষ্কার হয়নি। সেই আমাদের বারান্দা হল, কিন্তু বাবা যা ঋণ পেলেন তাতে বারান্দার দেওয়াল প্লাস্টার হল না। মেঝে হল না, মাটি ফেলে সমান করে একটু কম দামের ইট পেতে দেওয়া হল তার উপর। নড়বড় করত, মায়ের শরীর বেশ ভারী বলে চলতে অসুবিধা হত প্রথম প্রথম। বাবা বলতেন “ও কিছু না, চলতে চলতে ওগুলো মাটিতে বসে যাবে। তখন আর অসুবিধা হবে না।” পাকা ছাদও হল না, কারণ ছাদ ঢালাইয়ের অনেক খরচ। কোথা থেকে বেশকিছু ফুটোওলা টিন জোগাড় হল, শিরীষ কাগজ দিয়ে ফুটো বোজানো হল, আমাদের পাকাবাড়ির বারান্দা পেল টিনের চাল। বর্ষা এসে পড়ল, সশব্দে। প্রথম দিন বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় অনেক রাত। আমরা তিনজনেই এমন বোকা, ভেবেছিলাম কেউ টিনের চালের উপর উঠে লাফাচ্ছে। ক্রমশ সে শব্দের সাথে ভাব হয়ে গেল।

শিরীষ কাগজের চালাকি ভেদ করতে বর্ষার একটা গোটা মরসুমও লাগেনি। ভিতরে ঢুকতে পেয়ে তার সুরও গেল বদলে। আস্ত চাল আর ফুটো চালে শব্দের তফাত অভ্যস্ত কান ছাড়া ধরা পড়ে না চট করে। ফুটো দিয়ে ইটের উপর পড়ার শব্দ আরেকরকম। জল পেয়ে ইটগুলোর চেহারা বদলে গেল, চটি ছাড়া বারান্দায় হাঁটা বারণ হল। সাপ, ব্যাঙ দুয়েরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান একমাত্র আমাদের বারান্দার ইটের মেঝেতেই দেখেছি। সাপগুলোর বাহারি চেহারা দেখে বহুবার ভেবেছি বিষাক্ত, কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে ওগুলো হেলে। ইটের উপর জল পড়ার শব্দ একরকম, সেই জলে কাদায় হাঁটার শব্দ আরেকরকম। সব মিলিয়ে বর্ষার শব্দ।

সশব্দ বর্ষায় বিদ্যুৎ চালু থাকবে এমন প্রত্যাশা আমাদের ছিল না। বৃষ্টি থামলেই আসবে কিনা তা নিয়েই বরং বড়রা আলোচনা করতেন। বর্ষার শব্দের মধ্যে সন্ধেবেলায় লণ্ঠন বা ল্যাম্পের আলোয় পড়তে বসলে চেঁচিয়ে পড়ার দরকার হত। মনে মনে পড়লে বা লিখতে গেলে ধীরে ধীরে বুজে আসত চোখের পাতা — এমন সুরেলা, এমন ছান্দিক ছিল বর্ষার শব্দ। সাধারণত বাবা বাড়ি ফিরতেন রাত করে। বরাবরই মনে হত বাবা বাড়ির বাইরে থাকলে বর্ষার শব্দ একরকম, ফিরে এলে অন্যরকম।

তখন পাড়ায় টিভি বিরল। আমাদের পাশের বাড়িতেই ছিল একখানা। দৈবাৎ বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও লোডশেডিং হত না। তখন টিভি থেকে ভেসে আসা সিনেমার গান আর সংলাপে বর্ষার শব্দের রূপ খুলে যেত। বৃষ্টি, লোডশেডিং, পড়াশোনা শেষ, বাবা ফিরছেন না, ফিরলে খেতে বসব। ততক্ষণ কী হবে? মা গান গাইবেন। বর্ষার শব্দে যোগ হল মায়ের খালি গলার গান, বাড়িতে হারমোনিয়ামের প্রয়োজন বোধ হয়নি তখনো। মোমবাতির আলোয় তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে মা কতদূর ধেয়ে যেতেন তা বোঝার বয়স হওয়ার আগে থেকেই এই রুটিন। বোধহয় তাই এখনো বর্ষার শব্দ পেলেই কানের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজতে থাকে। তার সবগুলোই প্রকৃতি পর্যায়ের গান নয়, বর্ষার গানও নয়। বোঝার বয়স কি আজও হয়েছে? কে জানে! বয়স আর বোঝার বয়স বোধহয় আলাদা। তাছাড়া সবটা কি কখনো বোঝা হবে? প্রথম যেদিন মাকে “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি” গাইতে শুনেছিলাম আর চোখে দেখেছিলাম জল, সেদিন সে জলের কারণ বুঝিনি, আজও তো বুঝি না।

খালি গলায় গাইতে বাবাও ভালবাসতেন, অপেশাদার যাত্রা/নাটকে নিয়মিত অভিনয় করতেন বলে কণ্ঠস্বরও ছিল চমৎকার। কখনো কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানি না, কিন্তু বহু কবিতা মুখস্থ ছিল। সেসব আবৃত্তি করার ইচ্ছে কেন জানি না বৃষ্টি এলেই সবচেয়ে প্রবল হত। বোধহয় বাবার মধ্যে রোম্যান্টিকতার ঘাটতি ছিল। কারণ এক্ষুণি চোখ বুজলে বর্ষার শব্দের সাথে বাবার গলায় শোনা যেসব কবিতা আজ মিশে যাচ্ছে, সেগুলো একটাও প্রেমের কবিতা নয় — কাজি নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ৎ’, ‘কামাল পাশা’, রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেটা’। আর আশ্চর্য সব গল্পের আবহসঙ্গীত হয়ে আছে বর্ষার শব্দ। ঠাকুর্দার একখানা রেকর্ড প্লেয়ার আমাদের ভাগে পড়েছিল। কিছু ধার করা আর কিছু কেনা লং প্লেয়িং রেকর্ড চালাতাম তাতে। একটা রেকর্ডে বাজত ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। একটা ছুটির দিনে শুনতে শুনতে লোডশেডিং। বাবার মুখে সেই প্রথম শুনলাম ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর গল্প। কোনো এক বর্ষার দিনে শুনেছিলাম রুশ বিপ্লবের গল্প। আমি জানি বাবা কোনোদিন সের্গেই আইজেনস্টাইনের কোনো ছবি দেখেননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নন্দনে প্রথমবার ব্যাটলশিপ পোটেমকিন দেখে মনে হয়েছিল এসব দৃশ্য বাবার চোখেই প্রথম দেখেছি। ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারার গল্পও প্রথম শুনিয়েছিলেন কোন বৃষ্টিদিনে।

আমাদের জীবনে অনেকগুলো স্মরণীয় পরিবর্তন আসে ১৯৯০ সালে। সেই বসন্তে প্রথম মাকে ছেড়ে বেশ কয়েকদিন থাকতে হয়েছিল। বৈশাখ মাসের পাঁচ তারিখ হাসপাতালে মা আমার বোনকে জন্ম দিলেন। সে বছরই কোনো সরকারি সিদ্ধান্তে বাবার মাইনে বাড়ল অনেকখানি। একদিন আমাকে আর মাস ছয়েকের বোনকে বড় জেঠিমার কাছে রেখে বাবা-মা খানিকক্ষণের জন্য বেরিয়ে গেলেন। ফিরলেন একটা আশ্চর্য জিনিস নিয়ে। আপট্রনের পোর্টেবল টিভি। ততদিনে পাড়ায় প্রায় সব বাড়িতে টিভি এসে গেছে, কলকাতাবাসী আত্মীয়দের বাড়িতে এবং পাড়ার এক ধনী বন্ধুর বাড়িতে মনোরম রঙিন টিভিও দেখে ফেলেছি। সাদাকালো টিভি দেখে সামান্য মনখারাপ হয়েছিল, প্রকাশ করিনি। দোকান থেকে যিনি এসে টিভি চালানো, বন্ধ করা, চ্যানেল বদলানো, ছবির ঔজ্জ্বল্য বাড়ানো কমানো শেখাতে এসেছিলেন তিনি বললেন “কোম্পানি এই মডেলটা রঙিন টিভি হিসাবেই বানিয়েছিল। খরচে পোষাবে না বলে লাস্ট মোমেন্টে সাদাকালো করেছে।” এ কি কম সান্ত্বনা! পরদিন খেলার মাঠে ধনী বন্ধুটিকে সগর্বে জানিয়েছিলাম এই তথ্য। তখন ভুয়ো খবর আমাদের কল্পনাতেই ছিল না। এতকিছু বদলাল, বর্ষার শব্দ কিন্তু বদলায়নি। যতটুকু মাইনে বেড়েছিল তাতে দেওয়াল প্লাস্টার করা যায় না, বারান্দার মেঝে হয় না, পাকা ছাদ হয় না।

তা বলে কেউ গোমড়া মুখে থাকে না। আমার সাথে আমার বোনও বর্ষার শব্দ উপভোগ করতে শিখে গেল দ্রুত। বছর তিনেক পরে আমাদের বাড়িতে এল আরেকটা আশ্চর্যন্ত্র। ফিলিপসের টু ইন ওয়ান। একই যন্ত্রে ক্যাসেট চলে আবার এফ এম রেডিও চলে! দাদুর রেকর্ড প্লেয়ার বোনের জন্মের আগেই গত হয়েছেন। মাঝের কয়েকটা বছর বাড়িতে গান বজায় রেখেছিলেন বাবা-মা নিজেরাই। সামর্থ সীমিত, তাই বাবা বললেন যে মাসে টেপ রেকর্ডার কেনা হল, সে মাসে ক্যাসেট কেনা হবে না। মাসে মাসে একটা-দুটো করে ক্যাসেটে বাড়িতে এলেন সুমন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা, সলিল চৌধুরী, এ আর রহমান এবং অবশ্যই থরে থরে রবীন্দ্রনাথ। তখন আর বৃষ্টি হলেই লোডশেডিং হয় না আমাদের পাড়ায়। এক বর্ষার সকালে বাবার ইচ্ছে হল আবৃত্তি রেকর্ড করে রাখবে। যে গলা যাত্রার মাঠে শেষ সারির দর্শকের কাছেও পৌঁছে যেত অনায়াসে, সেই গলা তখন আর নেই। সেরিবেলা ডিজেনারেশনের অসুখে বাবার হাত কাঁপত আজন্ম দেখেছি, ততদিনে গলাও কাঁপতে শুরু করেছে। সেদিনের বর্ষার শব্দে মিশল কাঁপা গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’। সেখানেই শেষ নয়, রান্নাবান্নার মধ্যে থেকে টেনে এনে মাকে দিয়েও আবৃত্তি করানো হল মায়ের প্রিয় কবিতা ‘অভিসার’।

এখন চাকরি চলে যাওয়ার যুগ, মাইনে কমে যাওয়ার যুগ। তাই হয়ত বললে গল্পের মত শোনায়, কিন্তু সে সময় সত্যিই বাবার চাকরি যেতে পারে বা মাইনে কমে যেতে পারে আমরা জানতাম না। জানতাম মাইনে কেবল বাড়ে। কারোর বাবার মাইনে ঝটপট বাড়ে, আমাদের বাবার ধীরে ধীরে বাড়ে। ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে আমার যখন গোঁফ দাড়ি বেরোতে শুরু করেছে, তখন বর্ষার শব্দ বদলে গেল। কারণ ব্যাঙ্কের চোখে বাবার ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। অতএব বারান্দার পুরনো বাসিন্দা সাপ, ব্যাঙেদের কপাল পুড়ল। শান বাঁধানো মেঝে হল, দেওয়ালে প্লাস্টার হল। ফুটো টিনের চালের দিন ফুরোল। বারান্দা যে কেবল পাকা ছাদ পেল তা নয়, ছাদের উপর নতুন ঘরও হল। তারপর এল বর্ষা। আমরা চারজন আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে প্রবল ব্যথায় আবিষ্কার করলাম, আমাদের বর্ষার শব্দ দূরে সরে গেছে। সেবার বর্ষাটা মনখারাপে কেটেছে। কী যেন অমূল্য ধন আমাদের ছিল, আর নেই।

বর্ষা কিন্তু নির্দয় নয়। টিনের চাল না পেলে চুপ করে যাব, এমন জেদ নেই তার। আমাদের বাড়ির সামনেই খোলা মাঠ, সেখানে বিকেলে ক্রিকেট, ফুটবল খেলেছি কিন্তু সকালে গরু চরিয়েছে নাটুকাকু। এরপর থেকে আমাদের বর্ষার শব্দ ভরে রেখেছে সেই গরুদের ডাক, কাদা মাঠে বলে শট নেওয়ার ভোঁতা শব্দ আর গোলের তীক্ষ্ণ উল্লাস। ছাদের রেনওয়াটার পাইপ থেকে জল পড়ার শব্দ থেকেও বঞ্চিত হইনি। কলকাতার অনতিদূরে আমাদের মফস্বলে গত সাড়ে তিন দশকে শব্দদূষণ যত বেড়েছে, বর্ষা তত বোবা হয়েছে। গাছপালা, পশুপাখিও নিঃশব্দে উল্লাস করা শিখে গেছে। পাছে শব্দ করলে মানুষের চোখে পড়ে ছাঁটাইয়ের খাতায় নাম উঠে যায়!

আমরা কিন্তু বহাল তবিয়তে আছি। শুধু বৃষ্টি এলে মনে হয় কোনও একটা তার ছিঁড়ে গেছে কবে। সুর হারায়ে গেল।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে

নবীন প্রজন্মের পাকিস্তানিদের বাংলার প্রতি কোনও দ্বেষ নেই, বলছেন ভাইরাল হওয়া পাক সিরিয়ালের পরিচালক

আমার গানটা ভীষণ ভাল লেগেছিল আর ঘটনাচক্রে আমার সিরিয়ালের দুটো তিনটে মুহূর্তের সঙ্গে গানটার বক্তব্য আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছিল।

মহরীন জব্বার। ছবি ইনস্টাগ্রাম থেকে

বাংলা ভাষার সাথে পাকিস্তানের যথেষ্ট সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়নি, আক্ষেপ মহরীন জব্বারের

কয়েকদিন ধরে সোশাল মিডিয়ার বাঙালিরা দুটো ক্লিপ নিয়ে আপ্লুত। সেখানে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের এক টিভি সিরিয়ালের দৃশ্যে নায়িকা (য়ুমনা জ্যায়দি) রবীন্দ্রনাথের ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ গানটা গাইছেন। ডিপ ফেকের যুগে কোনকিছুতেই চট করে বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু প্রথম ক্লিপ প্রকাশ্যে আসার কিছু পরেই সংশয় দূর হল। দেখা গেল দিল কেয়া করে নামের ওই সিরিয়ালের পরিচালক নিজেই ইনস্টাগ্রামে ওই গানের অন্য একটা অংশ পোস্ট করেছিলেন। পাকিস্তান এমন একটা দেশ, যে দেশের সরকার বাংলাভাষীদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তা থেকে এক বিরাট আন্দোলনের জন্ম হয়, যার পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, সেই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। স্বভাবতই তাঁর লেখা গান আজকের পাকিস্তানের টিভি সিরিয়ালে গাওয়া হয়েছে দেখে দুই বাংলার মানুষ আপ্লুত। পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজে, ওয়েবসাইটে রীতিমত খবর। যদিও এই সিরিয়াল জিও টিভিতে দেখানো হয়েছিল ২০১৯-এ, ভারতে এখন একটা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত সে কারণেই এতদিন পরে সোশাল মিডিয়ার সূত্রে বাঙালির চোখে পড়া। এই গান পাকিস্তানের সিরিয়ালে কে ব্যবহার করলেন? কেনই বা ব্যবহার করলেন? তবে কি কোন বাঙালি আছেন এই প্রযোজনার নেপথ্যে? উদ্বেলিত বাঙালি হৃদয়ে অনেক প্রশ্ন। নাগরিক ডট নেটকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর আস্তানা থেকে এইসব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিলেন ওই ধারাবাহিকের পরিচালক মহরীন জব্বার।

মহরীনের প্রথম ছায়াছবি রামচন্দ পাকিস্তানি-তে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন কলকাতার দেবজ্যোতি মিশ্র। নন্দিতা দাস সে ছবিতে অভিনয়ও করেন। ফলে বাংলা বা কলকাতা তাঁর সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়।

আপনি একেবারে প্রথম ছবি থেকে বাঙালিদের সাথে কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে আপনার আলাপ কি সেই সূত্রে? নাকি অন্য কোনভাবে আপনার বাংলার সাথে যোগ ছিল এবং সে পথেই রবীন্দ্রনাথে পৌঁছেছেন?

আমি এই গানটা পেয়েছি আসলে আমার বন্ধু শর্বরী দেশপাণ্ডের কাছ থেকে, মানে সিরিয়ালে গানটা যে প্লেব্যাক করেছিল। ও একবার নিউ ইয়র্কে এসেছিল। তখন একটা আড্ডায় ওই গানটা গায়। শোনা মাত্রই গানটা আমাকে আকর্ষণ করে, যদিও আমি তখন কথাগুলোর মানে জানতাম না। কিন্তু ভাল লেগেছিল বলে আমি পরে ওকে গানটা অনুবাদ করে পাঠাতে বলি। অনুবাদ পড়ার পর গানটার প্রেমে পড়ে যাই। এতটাই, যে আমি বুঝতে পারি এই গানটা আমাকে দিল কেয়া করে-তে ব্যবহার করতেই হবে। কারণ য়ুমনা জ্যায়দির চরিত্রটার সাথে এই গানটা দারুণ মিশ খায়। তখন আমি শর্বরীকে গানটা রেকর্ড করে আমাকে পাঠাতে বলি।

আপনি কি বাংলায় বা অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন? ওই গানটার সংস্পর্শে আসার পরে ওঁর লেখা পড়া বা ওঁর গান শোনা কি অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে বা মাঝে মাঝে শুনছেন?

না, আমি কখনো কোন ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ পড়িনি। ওই গানটার মধ্যে দিয়েই আমি তাঁকে আবিষ্কার করি এবং আশ্চর্য হয়ে যাই। স্রেফ প্রেমে পড়ে যাই। ওটা আমার কাছেও একটা শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে এই শিক্ষাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

আচ্ছা, একটা উর্দু সিরিয়ালে বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করার কথা হঠাৎ কেন মনে হল?

ওটা একেবারেই আবেগমথিত প্রতিক্রিয়া। আমার গানটা ভীষণ ভাল লেগেছিল আর ঘটনাচক্রে আমার সিরিয়ালের দুটো তিনটে মুহূর্তের সঙ্গে গানটার বক্তব্য আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছিল। আমার চিত্রনাট্যে তো গানটা প্রথমে ছিল না। পরে যখন সিরিয়ালের পুরো গল্পটা পড়ছি (আসমা নবীলের লেখা), তখন আমার মনে হল যে অমুক অমুক জায়গায় এই গানটাই সবচেয়ে উপযুক্ত।

পাকিস্তানের যুবক যুবতীদের মধ্যে কি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার চল আছে? আপনার সিরিয়ালে যেমন দেখিয়েছেন তেমনভাবে নিজেদের মধ্যে আড্ডায় তারা কি এসব গান গায়?

সত্যি কথা বলতে, যদি কারোর কোন বাঙালির সাথে পারিবারিক সম্পর্ক থাকে বা সে বাংলাদেশে কোন সময় থেকে থাকে, কি পশ্চিমবঙ্গের সাথে যোগাযোগ থাকে, তাহলে আলাদা কথা। নচেৎ নয়। আমি নিশ্চিত পাকিস্তানে সেরকম মানুষ অনেকেই আছেন, তবে সেরকম আড্ডায় আমার নিজের কখনো থাকার সুযোগ হয়নি। সুতরাং সিরিয়ালে যা দেখিয়েছি সেটা একেবারেই অভিনব দৃশ্য।

মজার কথা, আপনি যে বছরে জন্মেছেন সে বছরেই পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পশ্চিম পাকিস্তান আর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব  শুরু হয়েছিল উর্দু বনাম বাংলা নিয়ে, যে কারণে আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এখনো অনেকের উর্দু ভাষার প্রতি রাগ আছে। আবার এই ক্লিপগুলো জনপ্রিয় হয়েছেও কতকটা সেই কারণেই। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম এই নিয়ে খবর করেছে। মানুষ ভীষণ খুশি। অনেকের প্রশ্ন, পাকিস্তানে কি তাহলে বাংলার প্রতি আর কোন সাংস্কৃতিক বিরোধিতা নেই? মানে খুব নির্দিষ্টভাবে যদি জিজ্ঞেস করি, আপনার সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করায় কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? বাংলা গান ব্যবহার করেছেন বলে কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি তো?

আসলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম, আমি যখন তরুণ ছিলাম তখনকার কথা ধরেই বলছি, ১৯৭১-এর ঘটনাবলী নিয়ে খুব একটা আলাপ আলোচনা, পর্যবেক্ষণ — এসবের মধ্যে দিয়ে যায়নি। তার আবার একটা সুফল আছে। সেটা হল তাদের মধ্যে কোন বাংলা বিরোধিতা নেই। বাংলা ভাষাটা সম্পর্কে কোন গোঁড়ামিও নেই। তাদের মনের দরজা খোলা। তবে দুঃখের বিষয় বাংলা ভাষার সাথে পাকিস্তানের ততটা সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়নি, যতটা হিন্দির সাথে হয়েছে। যেমন বলিউডের সিনেমা আমাদের ওখানে দারুণ জনপ্রিয়। কারণটা অনেকটাই ভাষাগত। পাকিস্তানের মানুষ হিন্দিটা চট করে বুঝতে পারে। সেই কারণেই আমার মনে হয় বাংলা নিয়ে অনেককিছু করা যেতে পারে। এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা দরকার। আমি তো বাংলা ব্যবহার করে কোন অসুবিধায় পড়িনি। মনে হয় না ভবিষ্যতেও কোন সমস্যা হবে।

দিল কেয়া করে টিভিতে দেখানো হয়েছিল ২০১৯-এ। “আমার পরান যাহা চায়”-এর ক্লিপগুলো সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়ার পর আরো বেশকিছু পাকিস্তানি সিরিয়ালের ক্লিপ পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোতে বাংলা গান (রবীন্দ্রসঙ্গীত নয় অবশ্য) ব্যবহার করা হয়েছে। আপনার কি জানা আছে কবে থেকে এই ধারা শুরু হয়েছে? কেনই বা পাকিস্তানি সিরিয়ালে বাংলা গানের ব্যবহার শুরু হল? পাকিস্তানে কি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলা বলা মানুষজন আছেন? নাকি এটা ওটিটির যুগ, সেকথা মাথায় রেখে পরবর্তীকালে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের যে দর্শকরা দেখবেন, তাঁদের আকর্ষণ করার জন্যে করা হচ্ছে?

আমি অন্য পাকিস্তানি সিরিয়ালের ক্লিপগুলো দেখিনি, তবে যদি এরকম হয়ে থাকে, আমার মনে হয় ব্যাপারটা চমৎকার। আমি যখন এই গানটা ব্যবহার করেছিলাম তখন কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করিনি। শর্বরী গানটা অপূর্ব গেয়েছিল। আর দেখলাম আমার সিরিয়ালের গল্পটার সাথে গানটা খাপ খাচ্ছে। ব্যাস, ওটাই কারণ। আমি খুব খুশি যে টিভিতে সিরিয়ালটা শেষ হয়ে যাওয়ার এত বছর পরে হলেও ব্যাপারটা আপনাদের নজরে পড়েছে এবং ভাল লাগছে।

শেষ প্রশ্ন। এই মুহূর্তে এই উপমহাদেশের শিল্পীদের পক্ষে আমাদের যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ভাগ করে নেওয়া কতটা কঠিন? সামাজিক বা রাজনৈতিক বাধা কতখানি? অদূর ভবিষ্যতে সেই বাধা সরে যাওয়ার আশা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

দেখুন, মুশকিল হল এই তিনটে দেশের (ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) সরকারগুলোর মধ্যে কোনরকম মতপার্থক্য হলেই প্রথম আঘাতটা আসে শিল্পীদের উপর। অথচ তাঁদের একেবারে শেষে আক্রান্ত হওয়ার কথা। কিরকম মজার কথা ভাবুন, ব্যবসা বাণিজ্য চলতে থাকে অথচ তিনটে দেশেই শিল্পীদের এক কোণে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে এই পরিস্থিতিতেও এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছেন। আপনি তো জানেনই, আমি ২০০৮ সালে রামচন্দ পাকিস্তানি করেছি ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে। এক ঝুঠি লাভ স্টোরি করেছি জি ফাইভের জন্য। সম্ভবত ওদের জন্য আরো একটা কাজ আমি করব। আশা করি এই আদান প্রদান বন্ধ হবে না। কারণ আমার মনে হয় একমাত্র এই পথেই আমরা একে অপরকে জানতে পারি, চিনতে পারি। আমাদের একের অপরের সম্বন্ধে অনেক অজ্ঞতা আছে। আমাদের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝিও আছে। অথচ আমাদের কত মিল! কতকিছু রয়েছে যা আমরা সকলেই ভালবাসি। দেশের মাটির প্রতি আমাদের ভালবাসা একরকম, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, আমাদের পোশাক আশাক — সবেতেই তো অনেক মিল। তফাতগুলো সত্ত্বেও এতগুলো মিল আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা তিনটে দেশের মানুষেরই মনুষ্যত্ব আছে। আমার মনে হয় না সেকথা যথেষ্ট জোর দিয়ে বলা হয়েছে, দেখানো হয়েছে। তাছাড়া আমার মনে হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে উপমহাদেশের অন্য দুটো দেশে পাকিস্তানের সংস্কৃতি যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছয়নি। বিশেষ করে ভারতে। সেখানে তেমনভাবে পাকিস্তানের নাটক বা সিনেমা দেখা যায় না, পাকিস্তানের সঙ্গীত শোনা যায় না বা সেখানকার বই পড়া যায় না। বরং পাকিস্তানে ভারতের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম অনেক সুলভ। তবে আমি আশাবাদী এবং মনে করি সবসময়ই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব নেওয়া উচিৎ। তাই আমার ধারণা ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

‘অলৌকিক মেগা সিরিয়াল দেখা সমাজের সত্যজিতের ছবি দেখার কোন কারণ নেই, তিনি উপলক্ষ মাত্র’

আসলে আমাদের বিয়ের দিন যেমন ঠাকুর্দার ছবি বার করা হয়, কারণ আমাদের একটা বংশপরিচয় আছে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী বা অপরাজিত সেই ধরনের ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাঙালি আজকাল সেইসব ছবিই দেখে যেখানে সত্যজিৎ রায় ঈশপের মত নীতিবাক্য প্রচার করেন, নাগরিককে বললেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে শতবর্ষ পার হওয়া সত্যজিৎ রায়ের ছবি নিয়ে কথা বলার জন্য সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের চেয়ে যোগ্যতর লোক পাওয়া দুষ্কর। তা বলে তাঁর সাথে কথা বলতে বসে সিনেমার গণ্ডিতে আটকে থাকলে ভুল হয়। তিনি আসলে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও বিনাশের একজন একনিষ্ঠ পাঠক। তাই তাঁর সত্যজিৎ আলোচনা কেবল সেলুলয়েডে আটকে থাকে না। নাগরিক ডট নেটের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন পেশ করে আলোচনা উপভোগ করলেন প্রতীক।

সঞ্জয়দা, আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস আর বিজ্ঞান প্রায় সম্মুখসমরে। সেই প্রেক্ষিতে সত্যজিতের বিজ্ঞানমনস্কতাকে আপনি কীভাবে দেখেন? মানে দেবী, মহাপুরুষ বা গণশত্রু ছবিতে দেখি ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান। আবার তাঁর গল্পগুলোতে, এমনকি প্রফেসর শঙ্কুর মত কল্পবিজ্ঞানের গল্পেও, অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। সেগুলোকে কিন্তু সবসময় অসম্ভব বা বুজরুকি হিসাবে দেখানো হয়নি।

এই প্রশ্নটার উত্তরে প্রথমেই বলব, সত্যজিৎ রায় নিজে রসিকতা করে বলতেন যে তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু ভূতে বিশ্বাস করেন। যে ধরনের অলৌকিকতা বা ব্যাখ্যার অতীত কিছু ঘটনা তিনি দেখেছেন, সেগুলো সাধারণ সংস্কারের মত তাঁর মধ্যে কাজ করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সত্যজিৎ রায় একজন যুক্তিবাদী। ব্যাপারটা অপরাজিত ছবিতে প্রথম দেখা যায়। অপু স্কুলে গিয়ে প্রথম দেশ শব্দটার মানে জানল। তারপর ইন্সপেক্টর তার প্রশংসা করে গেলেন, হেডমাস্টার তাকে লিভিংস্টোনের ভ্রমণ বৃত্তান্ত দিলেন, বাইরের বই পড়ার উৎসাহ দিলেন। এরপর সে বাড়িতে সাইফনের পরীক্ষা করছে, গ্রহণ যে রাহু কেতুর ব্যাপার নয়, চন্দ্র সূর্যের বিশেষ অবস্থানের ফলে হয় — সেটা মাকে বোঝাচ্ছে। অপু প্রথম ভাষার রহস্য (মেটাফর, মেটোনিমি ইত্যাদি) জানছে, ল্যাবরেটরি দেখছে। অর্থাৎ সত্যজিতের স্বাধীনোত্তর দেশে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার যে অভিপ্রায়, তার মধ্যে সবসময়েই থাকছে ধর্মমুক্ত যুক্তিবাদের উন্মোচন, যার উৎস আমরা ইউরোপের রেনেসাঁয় পাই। আমাদের দেশে এই যুক্তিবাদের আগমন উনিশ শতকে। সত্যজিৎ এমন একটা পরিবারের সদস্য ছিলেন, যেখানে আমরা উনিশ শতক বলতে যা বোঝাই তার সমস্তটাই ছিল। কেবল উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার এবং সত্যজিৎ নয়, মনে রাখতে হবে কলকাতার বাইরে যে ক্রিকেট খেলা হত ময়মনসিংহে, তারও উদ্গাতা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরেরই এক ভাই সারদারঞ্জন রায়। ফলে ইউরোপিয় আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম যুগের সত্যজিতের মধ্যে খুবই সক্রিয়।

দেবী ছবিতে শুধু যে অন্ধ কুসংস্কার কোন অভিশাপের জন্ম দিতে পারে, কীভাবে এক ধরনের ফিমেল হিস্টিরিয়ার উৎপত্তি হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় সম্পর্কের বিন্যাস দেখানোর ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় বিপ্লবী। শ্বশুরমশাইয়ের পায়ে দয়াময়ী তেল মাখিয়ে দেওয়ার পরে, ফ্রয়েডিয় প্রতিস্থাপনের তত্ত্ব মেনেই সত্যজিৎ দেখান যে সেই রাত্তিরেই শ্বশুরের স্বপ্নে মা কালী দেখা দেন। আসলে পুত্রবধূর শরীর স্পর্শে যদি কোন সুখানুভূতি হয়, তা আমাদের সচেতন নীতিবোধকে আঘাত করে। তার প্রতিক্রিয়াতেই কালী দর্শন। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে পারি না, যে গণশত্রু, হীরক রাজার দেশে বা মহাপুরুষ ছবিতে, তিনি যে কেবল আচারগুলোর মধ্যেকার সংস্কারান্ধতাকে আক্রমণ করছেন, তা নয়। ধর্ম আরো বড় জিনিস। বিশেষত ভারতবর্ষে ধর্ম, অন্তত হিন্দুধর্ম, একটা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। এটা কোন বাঁধাধরা ধর্ম নয় এবং সেই কারণেই সেখান থেকে বিপদের সম্ভাবনাও বেশি। সত্যজিৎ সারাজীবনই এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর প্রগতি চিন্তায় কোন খাদ ছিল না।

আসলে আমার মনে হয় সমস্যার জায়গাটা হল আমাদের উনিশ শতকীয় প্রগতি চিন্তা। তাকে নবজাগরণ বা অন্য যে নামেই ডাকুন, তার মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা (ambiguity) ছিল। আমরা যেমনভাবে বাইরের জগতের প্রগতির কথা ভেবেছিলাম, তেমনভাবে অন্তর্জগতের প্রগতির কথা ভাবিনি। এটা ঠাকুর পরিবারের ক্ষেত্রেও সত্য, কেশবচন্দ্র সেনের পরিবারের ক্ষেত্রে সত্য, এমনকি বিদ্যাসাগরের পরিবারের ক্ষেত্রেও সত্য। আমাদের পরিবারের নারী সদস্যদের উন্নতি এবং পুরুষ সদস্যদের মানসিকতার মধ্যে বিরাট পার্থক্য থেকে গেছে। এই স্ববিরোধটা আমার মনে হয় উনিশ শতকের ঐতিহ্য যাঁরা বহন করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে। সত্যজিৎ রায়ও সেই সমস্যা থেকে মুক্ত নন।

আপনি বললেন সত্যজিতের মধ্যে উনিশ শতকের মনীষা ছিল। তা ইদানীং অনেকেই যে বলছেন সেই সময়ের সমস্ত অর্জন আমরা বাঙালিরা হারিয়ে ফেলছি, তাহলে ঐ মনীষার অংশ হিসাবে সত্যজিতের ছবিও কি অদূর ভবিষ্যতে বাঙালির কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

আপনি তো ভিমরুলের চাকে ঢিল মারলেন। দেখুন, বাঙালিরা অনেক বানানো সত্যের মধ্যে বাস করে। চলচ্চিত্র আমার ভাত কাপড়ের জোগান দেয় বলেই আমি জানি যে সত্যজিৎ রায়ের ছবি সত্যি সত্যি কতটা দেখা হয় আজকাল। সত্যজিৎ রায়ের ছবি বলতে আজকের বাঙালি মধ্যবিত্ত, মানে আমার আপনার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কোন ছবিগুলো বোঝে? শেষ তিনটে ছবি — গণশত্রু, শাখা প্রশাখা, আগন্তুক; ফেলুদার ছবিগুলো — সোনার কেল্লা, জয়বাবা ফেলুনাথ এবং একটা ছোটদের জন্য ছবি — গুপী গাইন বাঘা বাইন। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের যে ঐতিহাসিক পর্ব, যখন তাঁর শিল্প শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছে, অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৬৪ সালের চারুলতা পর্যন্ত, সেই ছবিগুলো কজন দ্যাখে? এমনকি তাঁর যে বিখ্যাত শহর ত্রয়ী — জনঅরণ্য, সীমাবদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বী — যেখানে অপূর্ব কুমার রায়ের মধ্যে দিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে নাগরিকের যে পুনর্নির্মাণ সত্যজিৎ রায় করেছিলেন, সেই ধারণাকে তিনি নিজেই প্রশ্ন করেছেন, সেই ছবিগুলোই বা কতটা দেখা হয়?

অপরাজিত ছবির অপু গ্লোব হাতে কলকাতা শহরে পা দিয়েছিল এবং হ্যারিসন রোডের দিকে তাকিয়েছিল। আর প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির সিদ্ধার্থ যখন গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে থেকে বা লিন্ডসে স্ট্রিটের সামনে থেকে একটি অবলিক অ্যাঙ্গেল ক্যামেরায় একজন তরুণীর বক্ষদেশের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। যদি ভাবা যায় বাঙালি যুবকের অপূর্ব থেকে সিদ্ধার্থে রূপান্তর হল। বা শ্যামলেন্দুতে রূপান্তর হল, যে চাকরিতে উন্নতির জন্য খুনের অভিপ্রায় বহন করতে পারে। সোমনাথের কথা ভাবুন। যুবক অপূর্ব গ্লোব হাতে বিশ্ববোধের শরিক হতে চেয়েছিল। সেই যুবকের স্বপ্ন এমনভাবে ভেঙে গেল, যে সে সোমনাথ হয়ে নৈশ অভিযানে মেয়েমানুষের সাপ্লায়ার হয়ে গেল। সত্যজিতের এই যে স্বপ্নের নির্মাণ এবং স্বপ্নভঙ্গ, এখানেই তিনি শিল্পী হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। অথচ এইসব ছবি আজকাল বড় একটা কেউ দেখে না। চারুলতা, দেবী, কাঞ্চনজঙ্ঘা কেউ দ্যাখে? অভিযান ছবিটা কবে কে শেষ দেখেছে? অপরাজিত ছবিটা তো প্রায় দেখাই হয় না। পথের পাঁচালীই বা কতটা দেখা হয়? দেখা হয় সেইসব ছবি, যেখানে সত্যজিৎ রায় ঈশপের গল্পের মত নীতিবাক্য প্রচার করেন। তখন সত্যজিৎ রায়ের শরীরও খারাপ হয়ে গেছে। তাই এই ছবিগুলো নেহাতই সামাজিক অনুশাসনের দায়িত্ব নেয়।

সঞ্জয়দা, আপনার কি মনে হয় সত্যজিতের কাজ নিয়ে চর্চা করার বদলে, তাঁর দর্শন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার বদলে, তাঁর আবহসঙ্গীতকে রিংটোন বানিয়ে, ছবির ব্যর্থ রিটেলিং করে বা যেখানে সেখানে সেগুলো থেকে এক-আধটা সংলাপ গুঁজে দিয়ে আমরা রবীন্দ্রপুজোর মত সত্যজিৎ পুজো শুরু করে দিয়েছি?

আসলে আমাদের বিয়ের দিন যেমন ঠাকুর্দার ছবি বার করা হয়, কারণ আমাদের একটা বংশপরিচয় আছে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী বা অপরাজিত সেই ধরনের ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ দ্যাখে না, কিন্তু সবাই জানে ওগুলো ক্লাসিক। এমনও বলা চালু হয়েছে যে সত্যজিৎ রায় আজ আর প্রাসঙ্গিক নন। আজকাল টিভিতে এমন সব অলৌকিক মেগা সিরিয়াল চলে, যা দেখে ভূতেদেরও গা ছমছম করবে। তার গল্পগুলো সপ্তদশ শতকেও অবাস্তব ছিল। কিন্তু সেগুলো যে চলছে, তার মানে এগুলোর সামাজিক অনুমোদন আছে। তা এমন সমাজের তো সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখার কোন কারণ নেই। তিনি একটা উপলক্ষ মাত্র। তাঁর যে ছবিগুলো দেখা হয়, সেগুলো একটা বার্তা পাওয়ার জন্য। যেমন আগন্তুক বা হীরক রাজার দেশে। এগুলো জনপ্রিয় কেন? কারণ এগুলোতে এমন বার্তা রয়েছে, আমাদের মনের দুর্বলতা, ভীতি থেকে যেগুলোর প্রতি আমরা সমর্থন আশা করি। “দড়ি ধরে মারো টান/রাজা হবে খানখান” বলে যে বিদ্রোহ, তা আমাদের সহজে ইচ্ছাপূরণের সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। মনমোহনবাবু বাইরে থেকে এসে আমাদের হঠাৎ ভাল করে দেন, আমরা ভাবি যে আমরা বাঙালিরা আবার হঠাৎ একদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লব। পরিশ্রম, মেধা এবং ধীশক্তির কোন প্রয়োজন নেই।

বাংলায় ইদানীং গোয়েন্দা গল্প নিয়ে বহু নির্দেশক ছবি, ওয়েব সিরিজ ইত্যাদি করছেন। অথচ সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র ফেলুদাকে নিয়ে তিনি নিজে দুটোর বেশি ছবি করেননি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশকে নিয়েও তিনি ‘চিড়িয়াখানা’ করেছিলেন অনেকটা দায়ে পড়ে। অথচ তিনি তো রহস্য গল্প লিখতে ভালবাসতেন। ছবি করার ক্ষেত্রে এই অনিচ্ছা কেন সেদিকটায় যদি একটু আলোকপাত করেন।

আসলে কী জানেন, সত্যজিৎ রায়ের সময়ে, এমনকি সত্তরের দশকেও, বাঙালি স্থিরতার প্রতীক ছিল। ফেলুদা রহস্য অনুসন্ধান করত এবং রহস্যভেদ করত। ছোটদের জন্যে লেখা সত্যজিৎদের পরিবারে বংশ পরম্পরায় চলেছে। উপেন্দ্রকিশোর লিখেছেন একেবারে শিশুদের জন্য, সুকুমার রায় লিখেছেন অনতি কিশোরদের জন্য, আর সত্যজিৎ লিখেছেন যারা প্রায় স্কুলের শেষ ধাপে — তাদের জন্য। ফেলুদার গল্পগুলো মূলত কিশোরপাঠ্য, ফলে প্রায় স্ত্রী চরিত্র বর্জিত। কিন্তু আজ যে গল্পগুলো নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো এক ঈশ্বর পরিত্যক্ত সমাজের লক্ষণ।

এই সমাজের মানুষ সামাজিক সংলাপের জন্য অন্য কোন এজেন্সির দ্বারস্থ। রাষ্ট্রাতিরিক্ত কাউকে তার দরকার। রাষ্ট্র স্বাধীনতার এই সত্তর-আশি বছর পরে আর খুব একটা নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ বলে মনে হচ্ছে না আমাদের। স্বাধীনতার প্রথম প্রতিশ্রুতি ফিকে হয়ে গেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে আমরা ঈশ্বরকে নির্বাসন দিয়েছি। কবচ, তাবিজ, শেকড় হিসাবে বা আমাদের ভাষার ব্যবহারে যতটা ঈশ্বরকে কাজে লাগাই, তত কিন্তু বিশ্বাস হিসাবে কাজে লাগাই না। আজকের নিরীশ্বর মানুষ, জীবনানন্দ দাশের ভাষায় “মানুষ কাউকে চায় — তার সেই নিহত উজ্জ্বল / ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল”। রাষ্ট্র এবং ঈশ্বর যদি অশক্ত হন, তাহলে নিরাপত্তা পেতে আমাদের একটা মধ্যস্থ এজেন্সি দরকার। সেই এজেন্সিটা কে? সেটা হল রাষ্ট্রাতিরিক্ত চরিত্র — গোয়েন্দা। মনে রাখবেন, গোয়েন্দা কিন্তু পুলিস নয়। সে অপরাধ আটকানোর দায়িত্ব নিতে পারে না, কিন্তু অপরাধের সমাধান করে দেয়। বাকি কাজ পুলিস করে।

অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে হঠাৎ যে বিত্তস্ফীতি মধ্যবিত্তদের মধ্যে, তারপর খবরের কাগজ পড়লেই বোঝা যায়, আমাদের অপরাধেরও মাত্রা বদল ঘটে গেছে। এখন কলকাতা শহরে যে ধরনের অপরাধ হয়, এমনকি যৌন অপরাধ হয়, সেগুলো আগে হত না। এই সমাজ কার কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়? সে সেলফ জাস্টিসের ভাবনায়, আত্মসমর্থনের জন্য, এমন একজনকে খুঁজে নেয়, যে তার হয়ে এই কাজটা করে দেবে। বাঙালি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছে, যেখানে অন্য কিছু ভাবার জায়গা নেই।

তবে দুঃখের বিষয়, স্রেফ ক্যামেরা দক্ষতা বা সম্পাদনা দক্ষতার দিক থেকেও সত্যজিৎ রায় অন্য পর্যায়ের শিল্পী ছিলেন। এখনকার এঁদের কোন দক্ষতাই নেই। আমি যখন রূপকলা কেন্দ্রের প্রধান ছিলাম, সেখানে সৌমেন্দু রায় পড়াতেন। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন “যা অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে সঞ্জয়, তাতে তুমি ক্যামেরা চালাচ্ছ, না সুব্রতদা (সুব্রত মিত্র) ক্যামেরা চালাচ্ছেন, বোঝা যাবে না। কারণ ডিজিটাল ক্যামেরা সেলফ কারেক্টিং মোডে চলে। যেমন এডিটিং সফটওয়্যার সবটাই নিজেই করে নেয়। ফলে এখনকার ছবিগুলোতে আপনি ঝলসানি পাচ্ছেন। ঝলসানি মানে কিন্তু সিনেমার উৎকর্ষ নয়। ভারতীয় সমাজ যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, আপনি বাংলা ছবিতে তার কোন প্রমাণ দেখতে পান? এমনকি নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের আন্দোলন নিয়ে যারা গর্ব করে, তারাও কি বাংলা ছবিতে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের কোন প্রভাব দেখাতে পেরেছে? পারেনি।

আচ্ছা, খুদে পাঠকদের পক্ষ থেকে একটা প্রশ্ন। সত্যজিৎ প্রফেসর শঙ্কুর গল্প নিয়ে ছবি করেননি কেন?

যে কোন ছবি বানানোর ব্যাপারেই সত্যজিৎ রায়ের একটা জোরালো বিশ্বাস ছিল। আমরা সবাই যদি সেই বিশ্বাসের শরিক হতে পারতাম, তাহলে বাংলার চলচ্চিত্র শিল্প আজকের গাড্ডায় গিয়ে পড়ত না। সত্যজিৎ মনে করতেন, কেউ যদি তাঁকে ছবি করতে টাকা দেন, তাঁর একটা ন্যূনতম রিটার্ন পাওয়া উচিৎ। ফলে তিনি প্রথম থেকেই খুব কম বাজেটে ছবি করার কথা ভাবতেন। তাঁর মার্কেট কারা? প্রধানত বাঙালি মধ্যবিত্ত। তাই এদের রুচি অনুযায়ীই তিনি ছবি বানাতেন এবং কম খরচে বানাতেন। ছোটরা সঙ্গতভাবেই জানতে চাইতে পারে তিনি শঙ্কুকে নিয়ে কেন ছবি করলেন না? আমি যোগ করব, সত্যজিৎ রায় নিজে তো ঘনাদার গল্পের খুব ভক্ত ছিলেন। তা নিয়েই বা কেন ছবি করলেন না? এই গোটা জগৎটাকেই উনি বাইরে রাখলেন কেন? উত্তরটা সোজা। আসলে ঘনাদা বা প্রফেসর শঙ্কুতে যে টেকনিকাল এফেক্ট দরকার, সেই এফেক্ট আনতে সত্যজিৎ রায়কে যে প্রবল পরিশ্রম এবং খরচ করতে হত, তা আজকের বাঙালি পরিচালক ভাবতে পারে না। সে তো বিভূতিভূষণের গল্প নিয়ে ছবি করতে আফ্রিকায় চলে যেতে পারে। সে হনুমান টুপি পরে নরওয়েতে বসে থাকে। সেই সময়ে এই পরিমাণ খরচ সত্যজিৎ রায়ের সাধ্যের বাইরে ছিল।

প্রযোজকদের ব্যাপারটাও মনে রাখতে হবে। আর ডি বনশল কিন্তু এমন ব্যবসা করতেন যার ব্যালান্স শীট হয়, অডিট রিপোর্ট হয়। আজকাল কিছু রহস্যজনক বিনিয়োগকারী হয়েছে বাংলা সিনেমায়। তাদের টাকা কোথা থেকে আসে, তারা কেন বিনিয়োগ করে, করতে না পারলে কোথায় চলে যায় — কেউ বলতে পারবে না। গত দশ-পনেরো বছরের বা পুরো একুশ শতকেরই এই ইতিহাসের হদিশ কোন সেন্ট্রাল বা স্টেট এজেন্সির কাছে নেই।

শেষ প্রশ্ন। লেখক হিসাবে সত্যজিৎ রায়কে আপনি কোনখানে রাখবেন? প্রশ্নটা করছি কারণ শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত হলেও অশোক মিত্রের মত মানুষ লিখেছেন “আমার গলা কেটে ফেললেও বলতে আদৌ সম্মত হব না যে সত্যজিৎ তেমন বাংলা গদ্য লিখতে জানতেন।”

নিরপেক্ষভাবে বলছি, অশোক মিত্র সমগ্র বাংলা সাহিত্যের কথা ভেবে লিখেছেন এবং এটা আংশিক সত্য। তিনি খুব ভুল বলেননি, তবে একটু নির্দয় হয়েছেন। কারণ তাঁর মাথায় হয়ত ছিল সাহিত্য রচনায় সত্যজিতের পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর বংশের শিশুসাহিত্যিকরা যে মানের, ধরুন সুকুমার রায় বা লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় সেই মানের সাহিত্যিক ছিলেন না। যদিও তিনি দাবি করতেন সাহিত্য তাঁর রক্তে, সিনেমাটাই বরং আমদানি। আসলে সিনেমাই পেশা হওয়ার কারণে সত্যজিতের যে কোন গল্পেই দৃশ্য খুব গুরুত্ব পেত। দার্জিলিং জমজমাট, গ্যাংটকে গন্ডগোল বা বাদশাহী আংটি পড়লে দেখবেন দার্জিলিং, গ্যাংটক এবং লখনৌ ঘোরার জন্য কোন টুরিস্ট বোর্ডের গাইডবুক লাগবে না। একেবারে চিত্রনাট্যকারের ভঙ্গিতে, ক্যামেরা মুভমেন্ট যেভাবে হবে, সেভাবে সত্যজিৎ লিখতেন। কিন্তু শুধু চোখ তো সাহিত্য তৈরি করে না, অন্য অনুভূতিগুলোও করে। সত্যজিৎ সেগুলোর দিকে নজর দেওয়ার সময় পাননি। এটা সত্য। আবার তাঁর জনপ্রিয়তাও এই কারণেই। সত্যজিতের লেখা পড়লে ভাবতে হয় না।

সুকুমারের আবোল তাবোল কিন্তু মহত্তর সৃষ্টি, কারণ তার মধ্যে অনেক ভাবনার জায়গা আছে। আপনি প্রথম পড়ার সময় খুব মজা পাবেন, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারবেন অনেক গভীরতর ভাবনা আছে লেখাগুলোর মধ্যে। সত্যজিৎ রায়ের লেখা শুধুই পড়ার আনন্দে পড়ার জন্য। যেন তরতর করে গাড়ি চলছে স্টেশনে না থেমে। এগুলো রেল যাত্রায় বা বড় প্লেন যাত্রায় নিখুঁত সঙ্গী হতে পারে। কিন্তু এমন নয় যে এগুলো মানুষের মনে স্থায়ী হতে পারে। সে চেষ্টা সত্যজিৎ করেনওনি। দৈবাৎ তাঁর ছবি তেমন না চললে তিনি বইগুলোর রয়্যালটি থেকে অনেক লাভ করতেন।

এই প্রসঙ্গে বলি, পরিচালক হিসাবে তাঁর পারিশ্রমিক কিন্তু খুব কম ছিল। আজকের পরিচালকরা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন যে সেদিনকার হিসাবে তাঁদের আজকের পারিশ্রমিকের চার ভাগের এক ভাগও সত্যজিৎ কোনদিন নেননি। যখন তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, তখনো।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

যে রাম স্টিরিওটাইপ মানেন না

মকবুলবাবুর পরিষ্কার কথা, “জয় সিয়ারাম” বলছেন না “জয় শ্রীরাম” বলছেন তাতে কিছু এসে যায় না, রাম রামই থাকেন। কোন উদ্দেশ্যে বলছেন সেটাই আসল।

রামানন্দ সাগরের রামকে মনে আছে? সেই যে দাড়ি গোঁফ কামানো সুদর্শন অরুণ গোভিল? ইদানীং রাস্তাঘাটে অনেক গাড়ির পিছনে স্টিকার হিসাবে যে গেরুয়া রঙের ‘অ্যাংরি রাম’ দেখা যায় সেই চেহারাটা মনে করুন। তিনিও শ্মশ্রুগুম্ফহীন যুবক। কখনো অবাঙালি দোকানদারের কাছ থেকে অক্ষয় তৃতীয়ায় মিষ্টির প্যাকেটের সাথে রামসীতার ছবিওলা ক্যালেন্ডার পেয়েছেন? সেই রামও বলিউড, টলিউডের নিরানব্বই শতাংশ নায়কের মত ক্লীন শেভন। চোখ বুজে বলা যায়, অনিল কাপুর বা চিরঞ্জিত কোনদিন রামের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য ডাক পেতেন না। বস্তুত ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ভি মধুসূদন রাওয়ের হিন্দি ‘লব কুশ’ ছবিতে রামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কামানো মুখের জিতেন্দ্র। ছোটবেলায় পড়া ‘ছবিতে রামায়ণ’-এর রামেরও গোঁফ দাড়ি কিচ্ছু নেই। এ ভারতে কত শত রামায়ণ আর সেসবে কত শত রাম। হিসাব রাখা দুঃসাধ্য। তবু অন্য চেহারার রাম খুঁজে পাওয়া শক্ত। কিম্বা শক্ত মনে হয়, কারণ ঐ যে কবি বলেছেন, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দুই আমাদের দেখা হয়ে ওঠে না সারাজীবন।

ভোটের মুখে গুরুর গুঁতোয় রামের খোঁজে বেরিয়েছি। ঝোলায়, থুড়ি মাথায়, রয়েছে রামের স্টিরিওটাইপ। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, আমার দৌড় রামরাজাতলা পর্যন্ত। যে যত কম জানে, তার দুনিয়া তত ছোট, আর সে ভাবে সে তত বেশি জানে। হুগলী জেলার ছেলে, হাওড়া জেলার রামরাজাতলা চিনব না তা-ও কি হয়? পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিস দিতে দিতে দিব্যি পৌঁছে গেলাম। কিন্তু স্টেশনে নেমে টোটোয় চেপে রামমন্দিরে গিয়ে মোবাইল ফোনে খচখচ করে গোটা কতক ছবি তুলে চলে এলে গুরুর কাছে চিঁড়ে ভিজবে না। তাই সবজান্তা ভাব ত্যাগ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করতেই হল এখানকার রামের ইতিহাস, ভূগোল কোথায় পাব? জানা গেল, জানতে হলে যেতে হবে অযোধ্যার কাছে। পিঠটান দেব ভাবছিলাম। মুখে মাস্ক থাকা সত্ত্বেও বাণী নিকেতন লাইব্রেরির সহৃদয় সমুদা কী করে যে মতলব বুঝে ফেললেন! সবই বোধহয় রামের ইচ্ছে। বললেন অযোধ্যা মানে অযোধ্যারাম চৌধুরী, যিনি এই পুজো চালু করেছিলেন। সমুদার কাছে কি টাইম মেশিন আছে? পলাশীর যুদ্ধের আশেপাশে যে মানুষ এই পুজো চালু করেছিলেন, তাঁর কাছে আমাকে পাঠাবেন কী করে? বললেন “চলে যান ভাইদার কাছে। উনি রামমন্দিরের একজন ট্রাস্টি। যা জানতে চান সব পেয়ে যাবেন ওঁর কাছে।” অযোধ্যারামের কাছে পৌঁছবার এ কী রকম রাস্তা তা তখন বুঝিনি, বুঝলাম রামরাজাতলার রামমন্দিরের অছি পরিষদের সদস্য তপন চৌধুরী ওরফে ভাইদার বাড়ির বৈঠকখানায় বসে। দেওয়ালে টাঙানো বংশলতিকা বলছে যাঁর কাছে এসেছি, তিনি অযোধ্যারাম চৌধুরীর বংশের অষ্টম পুরুষ। রামের খোঁজে এসেছি শুনে তপনবাবু বের করে দিলেন ‘অযোধ্যারামের রাম’ — তাঁরই লেখা রামরাজাতলার রামপুজোর ইতিবৃত্ত। পুস্তিকাটি হাতে নিয়েই ভেঙে গেল আমার মনে শিকড় বাকড় গজিয়ে যাওয়া রামের প্রথম স্টিরিওটাইপ। মলাটের ছবিতে দেখি রামের পুরুষ্টু গোঁফ!

সাহেবরা বলেছে “Man made god in his own image” । তপনবাবুদেরও বিশ্বাস সুদূর অতীতের কোন শিল্পী রাজকীয় ভঙ্গিমা আনার জন্য রামের মুখে গোঁফ এঁকে দিয়েছিলেন। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। আসলে অন্যত্র রামের যে মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় তা বনবাসী রামের, কিন্তু অযোধ্যারাম চৌধুরী চেয়েছিলেন রাজবেশী রামের পুজো করতে। কারণ স্বপ্নে তিনি রাম সীতাকে যুগলে রাজবেশেই দেখেছিলেন। প্রত্যেক বছর রামনবমীতে শুরু হয়ে শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার পর্যন্ত চলা এই পুজোতে অবশ্য কেবল রামসীতার পুজো হয় না। অযোধ্যারাম বংশপরম্পরায় শিবভক্ত ছিলেন, তাই রামসীতার পাশেই থাকেন শিব। শিবের সামনে পবনপুত্র হনুমান। এছাড়াও ব্রহ্মা, জাম্বুবান, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন আর বিভীষণ। রামচন্দ্রের রাজসভার নর্তকীদের মূর্তি মিলিয়ে মোট ছাব্বিশটা মূর্তি এই বেদীতে থাকে। আমার মত অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করীদের মনে আরেকটা স্টিরিওটাইপ আছে। আমাদের ঘোরতর ধারণা বাঙালি হিন্দুরা মাতৃপূজাই করে বরাবর, রামের পুজো নেহাত উত্তর ভারতীয় হাঙ্গামা। এই পুজোর আড়াইশো বছরের ইতিহাস অবশ্য সেরকম সাক্ষ্য দেয় না। তবে হ্যাঁ, মাতৃপূজা বাদ দিয়ে রামরাজাতলায় রামের পুজো করবার জো নেই। অযোধ্যারাম যখন এই পুজো চালু করেন, তখন এতদঞ্চলে ধুমধাম করে বারোয়ারি সরস্বতীপুজো হত। রামের পুজো নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে বিবাদ হয়, সে বিবাদ মেটাতে অযোধ্যারাম অভিনব উপায় অবলম্বন করেন। বেদীতে রামচন্দ্রের মূর্তির উপরে স্থাপন করলেন দেবী সরস্বতীকে। প্রতি বছর রামের মূর্তি তৈরির কাঠামোর বাঁশ পুজো চালু হল সরস্বতীপুজোর দিন। সে বাঁশ স্থানীয় লোকেদের বাড়িতেই কাটতে হবে।

তপনবাবু বলছিলেন “আড়াইশো বছরে আর কখনো যে এই পুজো নিয়ে কোন বিবাদ হয়নি এমন নয়, কিন্তু রামের আশীর্বাদে সব মিটে যায় শেষ অব্দি। কিছু কিছু ব্যাপার যেমন আড়াইশো বছর ধরে আমরা একইরকম রেখেছি (যেমন প্রথম পুরোহিত হলধর ন্যায়রত্নের বংশেরই কাউকে দিয়ে পুজো করানো), তেমনি সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় বদলও হয়েছে। পুজোর জায়গা তো বদলেছে অনেক আগেই। এখন যেখানে মন্দির, সেখানে তো অযোধ্যারাম শুরু করেননি। তারপর পূর্ণাঙ্গ মন্দিরও গড়তে হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। বছরে চার মাসে পুজো হয়, বাকি আট মাস ঠাকুরের আসনের জায়গাটুকু বাজারের মধ্যে বজায় রাখতে আমরা হিমশিম। তাই এই মন্দির।”

আমার এক মাস্টারমশাই বলতেন একশোটা শকুন মরলে একটা সাংবাদিক জন্মায়। তা মাস্টারমশাইয়ের কথার মান রাখতে জিজ্ঞেস করে ফেললাম “আচ্ছা, এই পুজোতে অন্য ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ কেমন?” তপনবাবু চওড়া হেসে বললেন “আসুন না এবার পুজোর সময়, নিজের চোখেই দেখতে পাবেন। এই পুজো, এই মেলা এখানকার এক নম্বর উৎসব তো। হিন্দু, মুসলমান সকলের উৎসব। সে কি আজ থেকে? ছোটবেলা থেকেই তো তাই দেখে আসছি।”

তপনবাবুদের বংশের ইতিহাসেও অবশ্য মুসলমান শাসকদের নাম জড়িয়ে আছে। অযোধ্যারাম চৌধুরী নবাব আলিবর্দি খাঁর উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ছিলেন। হাওড়ার সাঁকরাইলে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর সান্যাল। কিন্তু মোগল সম্রাটের দেওয়া ‘চতুর্ধারীন’ উপাধি থেকে এই বংশের পদবি হয়ে যায় চৌধুরী। সেই বংশের বাড়ির পুজো আজ বারোয়ারি পুজো। রামরাজাতলার রাম সর্বগ। তাঁর নামে মোবাইল ফোনের দোকান চলে, আবার উৎকৃষ্ট ছাগমাংসের দোকানও চলে।

স্টিরিওটাইপের দফা রফা হওয়ার আরো কিছু বাকি ছিল। সেটুকু সম্পূর্ণ হল এ তল্লাটের পুরনো বাসিন্দা অধ্যাপক মকবুল ইসলামের সাথে কথা বলে। তিনি জানালেন “বাংলার বৈষ্ণব সংস্কৃতিতে যখন রাধাকৃষ্ণের পুজো খুব বেশি প্রচার পায়নি, সেইসময় রামই আরাধ্য ছিলেন। সেই সময়কার রামের মন্দির এখানে আছে, মুর্শিদাবাদে আছে, আরো নানা জায়গায় আছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের পরিবারও রামের ভক্ত ছিল, তাঁর বাবা রঘুপতির পুজো করতেন। প্রাক-চৈতন্য যুগের বৈষ্ণব ধর্ম ছিল রামকেন্দ্রিক। এই ধারা আসাম এবং মণিপুরেও খুব শক্তিশালী ছিল, যে কারণে একাধিক রামের মন্দির আছে।” রামরাজাতলার পুজোকে মকবুলবাবু ভারতের এই বিস্তীর্ণ এলাকার রাম সংস্কৃতির অঙ্গ বলেই মনে করেন।

“আমাদের এখানকার রাম ঠাকুরের ভাসান নবদ্বীপের রাসের সাথে তুলনীয়। এটা গোটা বাংলার উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ঘটনাবলীর অন্যতম। এখানে রামের সাথেই ভাসান হয় পার্শ্ববর্তী পুজো ব্যাতাই চণ্ডী আর সৌম্য চণ্ডীর, যাঁরা শক্তির প্রতীক। সুতরাং রাম রয়েছেন বিষ্ণু তত্ত্ব আর শক্তি তত্ত্বের মধ্যমণি হয়ে। অতএব রাম ঠাকুর আপামর বাংলার মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।”

ডিজে বক্স থেকে বা রাজনৈতিক দলের লোকেদের মুখে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনির আক্রমণাত্মক উচ্চারণ মকবুলবাবুর প্রত্যয়ে কোন ছাপ ফেলতে পারেনি। তিনি ওসব এক ফুঁ-তে উড়িয়ে দিয়ে বললেন “রাজনৈতিক স্বার্থে কথাটার একটা রাজনৈতিক অর্থ তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে ঐ ধ্বনি শুনলে মানুষের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু আমরা রাম ঠাকুরকে চিনি ছোটবেলা থেকে। তখন এসব রাজনৈতিক দলের এখানে কোন প্রভাবই ছিল না। আমরা তো তখন থেকেই রাম ঠাকুরকে ভালবাসি। সুতরাং এসব স্লোগানে আমাদের কিছু এসে যায় না।”

মকবুলবাবুর পরিষ্কার কথা, “জয় সিয়ারাম” বলছেন না “জয় শ্রীরাম” বলছেন তাতে কিছু এসে যায় না, রাম রামই থাকেন। কোন উদ্দেশ্যে বলছেন সেটাই আসল। “রামের মত একজন মহান, আদর্শ পুরুষের নামের রাজনীতিকরণের ফলে যা হয়েছে তা হল অনেকে রামকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এটা কিন্তু ক্ষতিকর। কারণ রামকে প্রত্যাখ্যান করা মানে মূলত বিষ্ণুতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করা। অর্থাৎ রাজনৈতিক ‘জয় শ্রীরাম’ রামের থেকে মানুষকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করছে। এটা ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষতি। এটা করে কোন পার্টির জয়জয়কার হতে পারে হয়ত, কিন্তু রাধাকৃষ্ণ, রামসীতা যে আমাদের সকলের সংস্কৃতি — সেই বোধটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।”

অবশ্য অযোধ্যারামের প্রতিষ্ঠিত রামরাজার প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের আকর্ষণ তাতে কমবার নয় বলেই মকবুলবাবুর ধারণা। দিন বদলেছে অনেক, আচ্ছে বা বুরে যা-ই বলুন, কিন্তু যে কোন সম্প্রদায়ের লোক রামরাজাতলার রামচরণ শেঠ রোড দিয়ে যাওয়ার সময় একবার রাম ঠাকুরকে দেখতে চাইবেই।

আপনিও ইচ্ছা করল দেখে আসতে পারেন, তবে রামের গোঁফ নেই কেন? মন্দিরে মোটে চারটে ঠাকুর কেন? প্রতীকের লেখার সাথে মিলছে না কেন? এসব প্রশ্ন করে গুরুতে পোস্ট করবেন না যেন। ২০১৯-এ তৈরি মার্বেলে মোড়া মন্দিরে যে বিগ্রহ দেখতে পাবেন সে বিগ্রহ রাজস্থান থেকে করিয়ে আনা। ফি বছর রামনবমী থেকে যে রামরাজার পুজো হয়, তাঁকে দেখতে হলে তখন যেতে হবে।

ঐ যে বললাম, এ রাম কোন স্টিরিওটাইপ মানেন না।

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

যদি কিছু চাওয়া যায়

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানে যাকে মোষ তাড়ানো উল্টো স্বভাব বলে, তেমন স্বভাবের জনা ছয়েকের জন্যই এই স্কুল টিকে আছে।

দিল্লি রোডের ও পারে একটা দরকারে যেতে হবে। সাইকেলে চেপে রওনা দিয়েছি বসন্ত পঞ্চমীর ফুরফুরে হাওয়ায়। কোভিডের ছোবলে নিভৃতবাস, তারপর মায়ের মৃত্যু — সব মিলিয়ে পথে বেরনো হয়নি বেশ কিছুদিন। বেরিয়ে টের পেলাম দুর্গম গিরি কান্তার মরু পাড়ি দিয়েছি। নির্বাচন এসে পড়েছে, সঙ্গে এসেছে উন্নয়নের জোয়ার। অতএব আমাদের এঁদো মফসসল স্টেশনের সঙ্গে জাতীয় সড়ককে জুড়েছে যে মূল রাস্তাটা, সেই কিলোমিটার পাঁচেকের সমস্তটা খুঁড়ে এবং বুজিয়ে পাইপ বসানোর কাজ চলছে। তা দেখেই নিভৃতবাসে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে দেখছি শেষ হওয়ার বদলে কাজের গভীরতা ও বিস্তার বেড়ে গেছে বহু গুণ। অজানা গলিগুলোর সঙ্গে পথিকের মধুচন্দ্রিমা মিটে গেছে, পড়ে আছে বিরক্তি, কারণ সব জানা হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় বিধায়ক দলে থেকে কাজ করতে পারছিলেন না বলে অন্য দলে পাড়ি দিয়েছেন। কে জানে, হয়ত পিচ, বালি, রোলারদেরও দম বন্ধ হয়ে আসছে বলে সত্বর কাজ শেষ করতে পারছে না। এসব নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করে লাভ নেই। তাই আধ কিলোমিটার সাইকেলে যাত্রা করার পরই যখন নিজেকে মনোহর আইচের মত প্রবীণ মনে হল, তখন নেমে পড়লাম। চোখে পড়ল রাস্তার উল্টোদিকেই ‘প্রচেষ্টা’।

গুরুচণ্ডালির গুরু বলেছেন, নির্বাচনের জল-হাওয়া-মাটি নিয়ে লিখতে হবে। সেইসব শুঁকতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই দম শেষ। বাঁশাই অটো স্ট্যান্ডে ‘প্রচেষ্টা’-র দিকে চোখ পড়তেই মনে হল, নির্বাচন নিয়ে কেবল আমার মত চশমা আঁটা খোঁচা দাড়ির আঁতেলেরই আশা-আশঙ্কা আছে এমন তো নয়, ঐ স্কুলের ছাত্রছাত্রী, যারা একেবারেই আমার মত নয়, তাদেরও কিছু চাওয়ার থাকতে পারে। ২০১১-র জনগণনা বলেছে পশ্চিমবঙ্গে নানারকম প্রতিবন্ধকতা থাকা মানুষের সংখ্যা ২০,১৭,৪০৬। এরা জনসংখ্যার মোটে ২.২১%, নির্ঘাত সে কারণেই এদের কথা মনে পড়ে না সচরাচর। ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ — এই আধুনিক তকমা শেষমেশ ওদের ক্ষতিই করেছে কিনা কে জানে! স্কুলটা বাড়ির এত কাছে, একেবারে মেন রোডের উপর। তবু তো কোনদিন চেয়ে দেখিনি! আজও স্কুলের সামনের অটো স্ট্যান্ডে পাঞ্জাবি পাজামা আর শাড়ির রঙিন লাইনের দিকে চোখ না গেলে নীরব স্কুলটা বোধহয় আড়ালেই থেকে যেত। অতএব ঢুকে পড়লাম গ্রিলের দরজা পেরিয়ে।

দীর্ঘদিনের ‘প্রচেষ্টা’। ১৯৯৭ সালে, কে জানে কেন, জনা কয়েক জোয়ানের মাথায় ঢুকেছিল এলাকার নানারকমের প্রতিবন্ধকতা থাকা ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু একটা করা দরকার। যৌবন চলে গেলেও একটা কিছু করার দুরারোগ্য ব্যাধি সারেনি সুবীর ঘোষ, যূথিকা চক্রবর্তী, শিপ্রা সিংহদের। পাঁচজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে শুরু হওয়া স্কুলের ছাত্রসংখ্যা এখন ৫৯। মূলত মানসিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা হয় এই স্কুলে। এখানকার ছাত্রছাত্রীদের কেউ সেরিব্রাল পলসিতে ভুগছে, কারোর আছে ডাউনস সিনড্রোম। কারোর আবার একাধিক অসুবিধা। অসুবিধা মানে? এখানে প্রথমবার আসার সময়ে কেউ নিজে হাতে খেতে পারত না, কেউ নিজে জামাকাপড় পরতে পারত না। কেউ কেউ পেচ্ছাপ পায়খানা পেলে সামলাতে পর্যন্ত পারত না। সুবীরবাবুরা আসলে এদের স্বাবলম্বী হতে শেখান। কোন কোন অসুবিধা কোনদিনই কাটবে না, তা বলে স্কুলের সরস্বতীপুজোর আয়োজন করতে অন্যদের সাহায্যের দরকার হয় না এই ছাত্রছাত্রীদের।

“কী করে চলে এই স্কুল? সরকারি সাহায্য কতটা পান?” হাঁদার মত এই প্রশ্নটা করতেই হল।

“মিড ডে মিলের ব্যবস্থা সরকার করেছেন। স্কুলটা চলে আসলে কিছু সহানুভূতিশীল মানুষের টাকায়,” সুবীরবাবু বললেন।

জনগণনার ওয়েবসাইটে দেখেছি, রাজ্যের যে জেলাগুলোতে “people with disability” এক লক্ষের বেশি, আমাদের হুগলি জেলা তার অন্যতম। কানাইপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের আশেপাশেও ৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী এরকম ছেলেমেয়ের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সুবীরবাবুর মতে শতাধিক। বহু ছেলেমেয়ের বাবা-মা ওঁদের সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁদের ফিরিয়ে দিতে হয়। সুবীরবাবুর ভাষায় “টানাটানির সংসার। ছোট স্কুল। ২০০৩-এ অনেক কষ্টে এই বিল্ডিংটা হয়েছিল, এতদিনে দোতলায় কয়েকটা নতুন ঘর করতে পেরেছি। কোথায় বসাব এতজনকে?”

কেমন টানাটানি? প্রতি মাসে শুভানুধ্যায়ীরা টাকা দিলে বিদ্যুতের বিল মেটানো হয়, সুবীরবাবুদের মাইনে হয়। কত মাইনে? বিস্তর চাপাচাপির পর জানা গেল কষ্টেসৃষ্টে চার অঙ্কেও পৌঁছয় না। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানে যাকে মোষ তাড়ানো উল্টো স্বভাব বলে, তেমন স্বভাবের জনা ছয়েকের জন্যই এই স্কুল টিকে আছে। তাঁরাই সকাল এগারোটা থেকে বেলা তিনটে অব্দি জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, মানে ক্লাস নেওয়া থেকে বাথরুম পরিষ্কার — সবই করে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, গত বছর লকডাউন শুরু হওয়ার পর মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত টানা ৪৫ দিন চেয়ে চিন্তে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছেন গরীব ছাত্রছাত্রীদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষকে। মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের সাথে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ত্রাণ বিলি করেছে এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও।

এমন মানুষদেরও জিজ্ঞেস করতে হয় “কী হলে সুবিধা হয় ছেলেমেয়েদের? বা আপনাদের? কী আশা করেন সরকারের কাছ থেকে? সামনে তো নির্বাচন।”

ওঁদের দাবি স্কুলবাড়িটার মতই আকারে ছোট। কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের মাসে ৭৫০/- টাকা ভাতা দিয়ে থাকেন। রাজ্য সরকার দেন ১০০০/- টাকা। এদের ভাতা বাড়ানো হোক, এই মাত্র। এ ধরনের বাচ্চারা অধিকাংশই আসে অতি দরিদ্র পরিবার থেকে। কারণ এরা যে অসুবিধাগুলো নিয়ে জন্মেছে, সেগুলোর প্রধান কারণ পুষ্টির অভাব, টিকাকরণের অভাব। অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন এইসব পরিবারের মহিলারা অনেকেই ঠিকমত খাওয়া দাওয়া পান না, যথেষ্ট যত্ন পান না। কেউ কেউ সারাদিন না খেয়ে কায়িক পরিশ্রম করেন। অনেকের বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। ফল ভোগ করে ছেলেমেয়েরা।

‘প্রচেষ্টা’-র ৮০% ছাত্রছাত্রীই এসেছে দারিদ্র্যসীমার নীচে থাকা পরিবার থেকে, অধিকাংশই তফসিলি জাতিভুক্ত পরিবারের সন্তান। সুবীরবাবু বললেন, পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে এই ছেলেমেয়েগুলো পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যরা রোজগার করে, এরা পারে না। তাই সকলের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর, পুজোয় সকলের জামাকাপড় হয়ে যাওয়ার পর এদের হল কিনা সেকথা আর পরিবারের অন্য সদস্যরা ভাবে না। বাবা-মা মারা গেলে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় দিন কাটে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত আছে আধার কার্ড। যেটুকু ভাতা পাওয়া সম্ভব, অনেকেই আধারের গেরোয় সেটুকুও পাচ্ছে না বলে সুবীরবাবুর অনুযোগ। “অনেকেরই আধার কার্ড নেই। সেরিব্রাল পলসি যাদের, তারা ঠিকমত রেটিনা স্ক্যান করাতে পারে না, হাতের ছাপ ঠিক করে দিতে পারে না। ফলে তাদের আধার কার্ড তৈরি করা যাচ্ছে না, তাই ভাতাও পাচ্ছে না। যিনিই সরকারে আসুন, এই ব্যাপারটা দয়া করে একটু দেখুন। আইনটার সরলীকরণের আবেদন জানাচ্ছি।”

অন্য যে অভিযোগটা পাওয়া গেল, তা এ দেশে নতুন না হলেও গুরুতর। মানসিক প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে পুলিশ প্রথমত অভিযোগ নিতে গড়িমসি করে, দ্বিতীয়ত অনেক সময় আদৌ নেওয়াই হয় না। পুলিশ চায় আপোষ মীমাংসা করে নেওয়া হোক, ক্ষতিপূরণ দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হোক। সুতরাং পুলিশি চিন্তা ভাবনারও বদল চাইছেন ওঁরা। চাইছেন ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। কারণ অভিযোগকারী বাচ্চাকে নিয়ে তার পরিবারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আদালতে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ব্যাপারটা ক্রমশ যন্ত্রণাদায়ক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।

স্কুল চত্বরে বসে কথাবার্তা বলতে বলতেই আমার দিকে পুজোর প্রসাদ এগিয়ে দিল এক ছাত্রী। কুল খেতে খেতে ভাবছিলাম এসব দাবি শুনে গুরু কী বলবেন আর নির্বাচনে লড়বেন যাঁরা, তাঁদের রাম শ্যাম যদু মধু স্লোগান পেরিয়ে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের দাবি কানে পৌঁছবার সম্ভাবনা ২.২১% -এর চেয়েও কম কিনা। বেশ বৈরাগ্য আসছিল, ভাবছিলাম গুরুকে বলব ভীষণ ব্যস্ত আছি। তাই আপাতত কিছু লিখে উঠতে পারছি না। এমন সময় সুবীরবাবু একটি মেয়েকে আমার সামনে দাঁড় করালেন। উচ্চতা এবং মুখের গড়ন বলে তার বয়স বছর পঁচিশ, অথচ লাজুক হাসির বয়স কিছুতেই দশের বেশি নয়।

“তুমি তো জানো, আমাদের এখানকার স্টুডেন্টরা খেলাধুলোয় খুব ভাল। নিয়মিত দেশের হয়ে স্পেশাল অলিম্পিকে যায়।” আমি মোটেই জানতাম না, কিন্তু সবজান্তা ভাব বজায় না রাখলে ভদ্রলোক ভাবমূর্তি চিড় খেয়ে যাবে। তাই বিজ্ঞের মত মাথা নাড়লাম। উনি বলে চললেন “এ হচ্ছে মুনমুন। দত্ত। ২০০৯-এর ওয়ার্ল্ড উইন্টার গেমসে ভারতের যে দল ফ্লোর হকিতে রুপো জিতেছিল, ও সেই দলের সদস্য ছিল।”

অতঃপর অজ্ঞানতা প্রকাশ করাই ভাল বোধ হল। তখন জানা গেল, ‘প্রচেষ্টা’-র ছাত্রছাত্রীদের কীর্তি মুনমুনকে দিয়েই শুরু এবং শেষ নয়। আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিত ২০১৯ ওয়ার্ল্ড সামার গেমসে এই স্কুলের ছাত্রী হাসি দুলে সাইক্লিং-এ দুটো রুপো জিতেছিল। ভারতের রুপো জয়ী ভলিবল দলেও এই স্কুলের একজন ছাত্র ছিল। ২০০৭ সাল থেকেই এখানকার ছেলেমেয়েরা স্পেশাল অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করছে। ফুটবল, ভলিবল, বাস্কেটবল, সাইক্লিং, সাঁতার, ফ্লোর হকি, ফ্লোর বল — এতগুলো ইভেন্টে এরা জেলা থেকে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত মেডেল জিতেছে।

নাম হাসি হলেও মেয়েটি নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকত, কারোর সাথে মেলামেশা করত না, কথা বলতে ভয় পেত। এই স্কুলে আসা এবং ক্রমাগত প্রস্তুতি ক্যাম্পে যাতায়াত করতে করতে তার জড়তা কাটে এবং শেষ পর্যন্ত বাড়িঘর ছেড়ে বহু দূরের আবু ধাবিতে গিয়ে সে মেডেল জেতে। গল্প হলেও সত্যি। এমন সব গল্প আমার মত ভদ্রলোকের অজান্তে এখানে ওখানে তৈরি হচ্ছে। তুচ্ছ মানুষ, নির্বাচনের মরসুমে তুচ্ছতর যারা, তাদের এসব কীর্তি গুরুর মনে ধরবে কিনা কে জানে! মফসসলের দুর্গম রাস্তার ধারে কুড়িয়ে পাওয়া এই গল্প না বলে আমার যে উপায় ছিল না।

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

ইংরেজি কাগজের বাঙালি সম্পাদক: আমি বলব, তুমি শুনবে

এইসব কাগজের হিন্দিভাষী সম্পাদকরা ধরে নেন যে পাঠকের মাতৃভাষা হিন্দি নয়, সে-ও হিন্দি বোঝে।

এশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের শুরুতেই অঘটন। আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের তারকাখচিত দলকে ১-০ গোলে হারিয়ে দিল আফ্রিকা থেকে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা সেনেগাল। পরদিন কলকাতার ‘দ্য স্টেটসম্যান’ খবরের কাগজ প্রথম পাতায় সবচেয়ে বড় হরফে শিরোনাম দিল — David 1 Goliath 0. তখন কলেজে পড়ি। ইংরেজি অনার্সের আমরা কজন মুগ্ধ, বলাবলি করছি “কী দারুন হেডিং দিয়েছে!” হোস্টেলের খবরের কাগজের টেবিলে রাখা কাগজটা সকলেই পড়ে। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত — কোনও অনার্সের ছেলেই বাদ যায় না। স্পষ্ট দেখতে পেলাম সকলেই আমাদের মত মুগ্ধ হয়নি। কয়েকজন পরিষ্কার জিজ্ঞেস করল “এটার মানে কী?”

ঘটনাটা ২০০২ সালের। তখনো ইন্টারনেট আজকের মত সহজলভ্য নয়, সকলেই ফেসবুকে এবং অনেকেই টুইটারে বা ইন্সটাগ্রামে আছে এমন নয়। ফলে সাংস্কৃতিক বিনিময় এত সহজ ছিল না। ইদানিং বাংলা সংবাদমাধ্যমেও কখনো কখনো অসম লড়াই বোঝাতে ডেভিড-গোলিয়াথের কথা লেখা হয়। কারণ এখন সন্দেশখালির ধর্মপ্রাণ হিন্দুরও জানতে বাকি নেই অনুষঙ্গটা, জানার জন্য বাইবেল পড়তে হয়নি। স্প্যানিশ ভাষা না জেনেও যেমন অনেক ফুটবল পাগল বাঙালি রিয়াল মাদ্রিদের দশম চ্যাম্পিয়নস লিগ খেতাবকে ডেসিমা বলেছিল। কিন্তু যখনকার কথা বলছি তখন বাইবেলের কাহিনির সঙ্গে সামান্য পরিচয় না থাকলে স্টেটসম্যানের ঐ শিরোনাম দুর্বোধ্য হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। দেখা গিয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছাড়া, আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে যারা ক্রিশ্চান মিশনারি স্কুলের প্রাক্তনী, নিদেন পক্ষে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছে, অথবা পারিবারিকভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত, কেবল তারাই ঐ শিরোনামটা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিল। তাই ইংরেজি অনার্সের এক সহপাঠী প্রশ্ন তুলেছিল “খবরের কাগজ কি mass এর জন্য, না class এর জন্য?” তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছিল “স্থানীয় ভাষার কাগজ জনতার জন্য, ইংরেজি কাগজ বাছাই করা লোকের জন্য।”

এই যুক্তি সেদিন যতটা অকাট্য মনে হয়েছিল আজ আর ততটা মনে হয় না। কারণ গত ১৮ বছরে দেশের সব রাজ্যেই ইংরেজি জানা লোকের সংখ্যা বেড়েছে, ফলত ইংরেজি কাগজের পাঠকও বেড়েছে। Audit Bureau of Circulations (ABC), অর্থাৎ ভারতে প্রকাশিত পত্রপত্রিকাগুলোর কোনটা কত বিক্রি হয়, পড়া হয় তার হিসাব রাখে যে সংস্থা, তাদের পরিসংখ্যান থেকেই এ কথা প্রমাণিত হয়। তাছাড়া খবরের কাগজের পাঠক টিভি দেখেন না বা মোবাইলে ইন্টারনেট ঘাঁটেন না — এমন মনে করাও অযৌক্তিক। তাই কাগজের পাঠক বুঝবেন না, এমন শব্দ বা চিত্রকল্পের তালিকা ২০০২ এর তুলনায় ছোট হয়ে এসেছে। যেসব শব্দ/শব্দবন্ধ দু দশক আগে ইংরেজি কাগজের পাঠকদের একাংশেরও দুর্বোধ্য মনে হত, তার অনেকগুলোই এখন বাংলা কাগজেও দিব্যি ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বরং দেখা যায় বাংলা প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি শব্দটাই বাংলা কাগজে, পত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র’ কথাটার ব্যবহার যেমন দিন দিন কমে যাচ্ছে, বিপুল বিক্রমে ‘আই টি সেক্টর’ বলা এবং লেখা চলছে। ‘Demonetisation’ কথাটার বাংলা প্রতিশব্দ চালু করার জন্যও বাংলা সংবাদমাধ্যম বেশিদিন লড়ল না। কথাটা বাংলা হরফে লিখে দিয়েই কাজ সারা হল। এতে বাংলা ভাষার লাভ হচ্ছে না ক্ষতি হচ্ছে তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়, কিন্তু নিঃসন্দেহে ইংরেজি কাগজ সম্পাদনার কাজ অনেক সহজ হচ্ছে। কিন্তু mass আর class এর তফাতটা কি একেবারে ঘুচে গেছে? পনেরো বছর ইংরেজি কাগজে সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটার উত্তর প্রায় রোজ খুঁজতে হত।অন্য দেশের কথা জানি না, ভারতে এখনো ইংরেজি কাগজ (বা ওয়েবসাইট) পড়তে পারার সঙ্গে শ্রেণির গভীর যোগাযোগ আছে। ইদানিং ব্যাঙের ছাতার মত পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দৌলতে বেশ কম রোজগারের মানুষও সাধ্যের বাইরে গিয়ে ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, কিন্তু বাড়িতে ইংরেজি কাগজ রাখার সাধ তাঁদের চট করে হয় না। ইংরেজি কাগজের বিক্রি বেড়েছে আসলে উদারীকরণের ফলে গত তিরিশ বছরে তৈরি হওয়া উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে। এখন যে সব্জি বিক্রেতা তাঁর ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, তিনি তাঁর পরিবারে লেখাপড়ার প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্ম। ফলে ইংরেজি কাগজ পড়ার কথা ভাবতে পারেন না, ছেলেমেয়ের কেন পড়া প্রয়োজন তাও বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু এখন যিনি বহুজাতিকের কর্মচারী হওয়ায় গাড়ি কিনেছেন, তাঁর বাপ-ঠাকুর্দারা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত ছিলেন, তবু বাড়িতে লেখাপড়ার চল ছিল। ফলে তিনি জানেন আরো এগোতে হলে আরো বেশি করে ইংরেজি রপ্ত করতে হবে। তাই ইংরেজি কাগজ পড়া। ইংরেজি কাগজের সাব-এডিটররাও আসেন মূলত এই ধরণের পরিবার থেকে। ফলে কাগজের বিষয় নির্বাচন এবং ভাষা — দুটো ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন হয়। সম্পাদনা করার সময় যে পাঠককে লক্ষ্য বলে ধরা হয়, তিনি উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পাঠক।

এই কারণেই বাংলা কাগজের চেয়ে ইংরেজি কাগজের প্রথম পাতায় শেয়ার বাজারের ওঠানামার খবর বেশি প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তেমনি একেবারে অন্য বিষয়ের খবর লিখতে গিয়ে “bulls and bears” অনুষঙ্গ ব্যবহার করা ইংরেজি কাগজে জলভাত। পাঠক আর সম্পাদক, উভয়েই বাংলাভাষী হলেও। এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। হোস্টেলের মত জায়গায় নানা শ্রেণির পাঠক একত্র হওয়ার ফলে ঐ সরল হিসাব সবসময় খাটে না, তাই কোন কোন পাঠককে ছুঁতে পারা যায় না। ইংরেজি কাগজে লেখার ক্ষেত্রে অবশ্য একটা অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায় ভারতের সর্বত্রই, কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়। কোন শব্দ বা শব্দবন্ধ বুঝতে না পারলে পাঠক সেটা নিজের অক্ষমতা বলেই ধরে নেন এবং জেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ ঐ কাগজটা পড়ার অনেক কারণের একটা হল ইংরেজি ভাষাটা আরো ভাল করে শেখা। আজ থেকে কুড়ি পঁচিশ বছর আগে তো বড়রা সরাসরিই ছোটদের স্টেটসম্যান পড়ে ইংরেজি শিখতে বলতেন। এখন ইংরেজি পড়ার অভ্যাস সার্বিকভাবে বেড়েছে, ‘দ্য টাইমস’ বা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ও ঘরে বসেই পড়া যাচ্ছে, তাই হয়ত এখন আর কেউ কাগজ পড়ে ইংরেজি শিখতে বলেন না, তবে ইংরেজি কাগজের কৌলীন্য কমেনি। বাংলা কাগজের ভাষা কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য হতেই হবে।
শিরোনামের কথা বলে শুরু করেছিলাম, শিরোনামের কথা দিয়েই শেষ করি।

সর্বভারতীয় বলে পরিচিত যে ইংরেজি কাগজগুলো, সেগুলোর শিরোনামে প্রায়শই হিন্দি শব্দ/শব্দবন্ধ নিয়ে খেলা লক্ষ্য করা যায়, রোমান হরফে পুরোপুরি হিন্দি শিরোনামও দেখা যায়। নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে ২০১০ এর বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এন ডি এ জোট জয়ী হওয়ার পর ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ এর শিরোনাম ছিল ‘Rajnitish’। ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ র পাতায় অভিনেত্রী জেসি রনধাওয়া সম্বন্ধে প্রতিবেদনে ‘Jesse jaisi koi nahin’ শিরোনাম ব্যবহৃত হয়েছে। স্পষ্টতই এইসব কাগজের হিন্দিভাষী সম্পাদকরা ধরে নেন যে পাঠকের মাতৃভাষা হিন্দি নয়, সে-ও হিন্দি বোঝে। বাংলা, ওড়িশা বা দক্ষিণ ভারতের পাঠকদের অসুবিধার কথা ভাবা হয় না। অন্যদিকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত যে ইংরেজি কাগজগুলোর ইন্টারনেটের বাইরে সর্বভারতীয় উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য নয়, সেসব কাগজে কিন্তু বাংলা শব্দ/শব্দবন্ধ নিয়ে শিরোনামে এরকম খেলা সচরাচর দেখা যায় না। রোমান হরফে লেখা আদ্যন্ত বাংলা শিরোনাম তো নৈব নৈব চ। ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি যখন মধ্যগগনে তখনো কি কোথাও শিরোনাম হয়েছে “Sourav fills Brisbane”? কোনও নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পর কলকাতার কোন ইংরেজি কাগজে ব্যানার হেডিং হবে “Mamatar khamata” — এ কথা এখনো অকল্পনীয়। অথচ এই কাগজগুলোর বেশিরভাগ পাঠক বাঙালি, সম্পাদকমণ্ডলীর বড় অংশও তাই।

এমনটা কেন ঘটে? হিন্দিভাষী সম্পাদকদের চেয়ে বাঙালি সম্পাদকদের ইংরেজির উপর দখল কি বেশি, নাকি বাঙালি সম্পাদকরা নিজেদের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনম্মন্যতায় ভোগেন? সমাজবিজ্ঞানের লোকেরা গবেষণা করে দেখতে পারেন।

তথ্যসূত্র
১। http://archive.indianexpress.com/news/rajnitish/715691/
২। https://timesofindia.indiatimes.com/ahmedabad-times/Jesse-jaisi-koi-nahin/articleshow/757540.cms

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

সকল অহঙ্কার হে আমার

“আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

সেদিন যথাসময়ে অফিসে ঢুকে দেখি, অনেক দেরি করে ফেলেছি। নিউজরুম আলো করে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তখন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ তে কাজ করি। কলকাতা সংস্করণের অধুনা প্রয়াত রেসিডেন্ট এডিটর সুমিত সেন সৌমিত্রবাবুর স্নেহভাজন ছিলেন বলে শুনেছি। সেই সুবাদেই টাইমসের অফিসে আসা। আসবেন জানতাম না। যখন পৌঁছেছি, তখন তাঁর প্রায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমার মত আরো অনেকেরই আশ মেটেনি সেদিন। তাই কিছুদিন পরেই আরেকবার তিনি আসবেন বলে কথা হল।

সে দিন আসতে আসতে আরো বছর খানেক কি দেড়েক। আগেরবার এসে শুনেছি গটগট করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছিলেন। এবার একতলাতেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঐ মানুষটিকে আগে কয়েকবার রবীন্দ্র সদন, বিমানবন্দর ইত্যাদি জায়গায় বহুদূর থেকে দেখেছি। দু হাত দূরত্ব থেকে সেদিন দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আড্ডার মেজাজে কথা হল, অনেকে অনেক প্রশ্ন করলেন, আমারও অনেক কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোল না। বেরোবে কী করে? কেবল আমার কান তো তাঁর কথা শুনছিল না, আমার প্রতিটি রোমকূপ শুনছিল।

তিনি যা যা বললেন তার মধ্যে অনেক কথা বহুবার বহু জায়গায় বলেছেন বা লিখেছেন। আজকের কাগজগুলোতেও সেসব বিলক্ষণ পাওয়া যাবে। যা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করেছিল, সেটা বলি। কারণ সেগুলো আর কোথাও পড়েছি বা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।

বলছিলেন অগ্রজ শিল্পীদের কথা। শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী থেকে ছবি বিশ্বাসে এসে দীর্ঘক্ষণ বললেন। সত্যি কথা বলতে, নিজের অভিনয় নিয়ে যা বললেন সেগুলো সবই নানাজনের প্রশ্নের উত্তরে। তার চেয়ে অনেক বেশি কথা বললেন ছবি বিশ্বাসের সম্বন্ধে। কেবল ছবি বিশ্বাসের অভিনয় প্রতিভা নয়, বললেন তাঁর অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতা নিয়েও। ছবি বিশ্বাসের জীবনের শেষ দিকে কোন এক ছবিতে দুজনের একটা দীর্ঘ দৃশ্য ছিল।

“লম্বা সিন, আর সংলাপগুলোও খুব লম্বা লম্বা। আমি বারবার ভুল করছি আর শট এন জি হয়ে যাচ্ছে। ছবিদার তখন শরীরটা এমনিই বেশ খারাপ। ঐ সিনটাতে আবার সুট বুট পরা, অথচ তখন অসম্ভব গরম। শট ওকে হচ্ছে না বলে ফ্যান চালানোও যাচ্ছে না। ফলে ওঁর আরো শরীর খারাপ লাগছে, ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন। শেষে পরিচালক বললেন ‘আমরা একটু ব্রেক নিই, আপনারা একটু রেস্ট নিয়ে নিন। তারপর আবার চেষ্টা করা যাবে।’ আমি ছবিদার সাথে বসে সারেন্ডার করলাম। বললাম ‘দেখছেন তো পারছি না। দিন না বাবা একটু দেখিয়ে?’ উনি সেই বিখ্যাত গম্ভীর গলায় বললেন ‘বুঝতে পেরেছ তাহলে’? তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ‘তুমি আমার ডায়লগ বলো, আমি তোমার ডায়লগ বলছি।’ তারপর অতবড় সিন গোটাটা রিহার্সাল করালেন, মুভমেন্টগুলোও শুধরে দিলেন। তারপর নিজের নিজের ডায়লগ বলিয়ে আবার করালেন। শেষে ডিরেক্টরকে ডেকে এনে শট নেওয়ালেন, শট ওকে হল।

আমি অবাক হয়ে গেলাম শরীরের ঐ অবস্থাতেও ওরকম উদ্যম দেখে। তাছাড়া আমার একটা অহঙ্কার ছিল, আমার সংলাপ সবসময় মুখস্থ থাকে। সেই অহঙ্কারটাও চুরমার হয়ে গেল। কারণ দেখলাম ছবিদার শুধু নিজের নয়, আমার ডায়লগও হুবহু মুখস্থ। বরং আমি দু এক জায়গায় ভুল করে ফেলেছিলাম, উনি ধমকালেন ‘কী যে করো তোমরা! ডায়লগ মুখস্থ রাখতে পারো না?”

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার মুখে এই গল্পটা শুনে আশ্চর্য লেগেছিল, কিভাবে আমাদের সামনে নিজের ত্রুটিগুলো অকপটে বললেন! অগ্রজ অভিনেতার কাছ থেকে কত শিখেছেন সেটাও কেমন সবিস্তারে বললেন! অথচ কত সহজ ছিল “আমি এই, আমি তাই, আমি সেই” বলা। সেরকম বলার মত যথেষ্ট কীর্তি তো তাঁর ছিলই। অবশ্য হয়ত আমরা এই প্রজন্মের লোক বলেই আমাদের এত অবাক লাগে। সৌমিত্রবাবু তো বললেনই “আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

“নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান” কথাটা আমরা ভুলে গেছি। তাই কলকাতার ফিল্মোৎসবে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাট আউট ঝোলে না। ঝোলে আয়োজক প্রধান মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা অবশ্য আকাশ থেকে পড়েন না, আমাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন। আমরা সবাই তো এখন আত্মরতিপ্রবণ। নইলে কোন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলে সাংবাদিকরা কেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখবেন, “অমুক সালে যখন আমি তমুক এক্সক্লুসিভটা করে অমুক প্রোমোশনটা পেয়েছি…”? কেনই বা আসবে মৃত মানুষটি কবে কী কারণে লেখকের প্রশংসা করেছিলেন?

ভাগ করলে বাড়ে

একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন

“ও আয় রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে / ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং কুড়াকুড় বাদ্যি বেজেছে…” গানটা বেশ জনপ্রিয়। পুজোর মরসুমে বিশেষত ছোটদের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে প্রায় সর্বত্র শোনা যায়। ১৯৭৭ সালের পুজোয় সলিল চৌধুরীর এই সৃষ্টি তাঁর কন্যা অন্তরার গলায় প্রথম শোনা গিয়েছিল। গানটার সঞ্চারী এরকম “কাঁদছ কেন আজ ময়নাপাড়ার মেয়ে? / নতুন জামা ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে? / আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে / আজ হাসিখুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে।”

আনন্দ যে ভাগ করলে বাড়ে, সে কথা আজকাল আর ছোটদের বোঝানোর সময় পাই না আমরা। সলিল চৌধুরীর প্রজন্মের মানুষ প্রাণপণে শেখাতেন। এই স্তবকটা সেদিক থেকে চমকপ্রদ কিছু নয়। কিন্তু বহুবার শোনা এই গানটা কদিন আগে নিজের মেয়ের গলায় শুনে যে কারণে কানটা বেশি খাড়া করতে হল, তা হল দুটো শব্দ — “ময়নাপাড়ার মেয়ে”।

ঐ দুটো শব্দে ঘুমন্ত স্মৃতি সজাগ হয়ে উঠল। আমাদের বাড়িতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম টেপ রেকর্ডার (বা ক্যাসেট প্লেয়ার) আসার পর গোড়ার দিকে কেনা ক্যাসেটগুলোর একটার নাম ছিল ‘হিটস অফ সলিল চৌধুরী’। সেই ক্যাসেটের অধিকাংশ গান সকলের চেনা, সেই বারো-তেরো বছর বয়সে আমারও চেনা। কিন্তু সেই প্রথম শুনেছিলাম এক আশ্চর্য গান — সুচিত্রা মিত্রের গলায় ‘সেই মেয়ে’।

১৯৫০ এ প্রকাশিত সেই গানের শরীরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামের মানুষের দুর্দশা আর তেভাগা আন্দোলন। কলকাতায় এসে পড়া অগণিত অভুক্ত, অর্ধভুক্ত মানুষের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে গীতিকার লিখেছেন “হয়ত তাকে কৃষ্ণকলি বলে, কবিগুরু, তুমিই চিনেছিলে।” শীর্ণ বাহু তুলে ক্ষুধায় জ্বলতে দেখে শুরুতেই ভেবেছেন “কে জানে হায়, কোথায় বা ঘর কী নাম কালো মেয়ে?” তারপরই চিহ্নিত করেছেন “হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।” একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

চৌঠা আষাঢ় ১৩০৭ এ রচিত রবীন্দ্রনাথের “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” সুচিত্রা মিত্র বা শান্তিদেব ঘোষের গলায় কে না শুনেছে? সেই উৎকৃষ্ট প্রেমের (যদিও ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা গীতবিতানের প্রেম পর্যায় নয়, বিচিত্র পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) গানের নায়িকা সলিল চৌধুরীর কলমে ফিরে এল অভুক্ত পল্লীবালা হিসাবে। তেভাগা আন্দোলনে উদ্দীপ্ত গীতিকার নিজের গানের শেষে কবিগুরুকে বললেন “আবার কোনদিন যদি তারে দেখো পথে / বোলো তারে বোলো তারই তরে / ময়নাপাড়া থেকে খবর আসে তারি তরে রে / সে যেন ফিরে যায় রে।”

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে দুই স্রষ্টার এই সংলাপ কৈশোর থেকেই জানা ছিল। মধ্যবয়সের মুখে এসে খেয়াল করে শিহরিত হলাম যে সেই ময়নাপাড়ার মেয়ে সলিল চৌধুরীকে ১৯৭৭ এও ছেড়ে যায়নি। ১৯৫০ এ তিনি বছর আঠাশের যুবক, সাতাশ বছর পরে প্রায় বৃদ্ধ। তাঁর কল্পনায় রবীন্দ্রনাথের গানের যুবতী ততদিনে ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেছে। তেভাগার তাপ এ গানে নেই, সময় বদলেছে বলে, হয়ত শিশুদের জন্য গান বলেও। কিন্তু গানটা যে সচ্ছল পরিবারের শিশুর জবানিতে রচিত, সে নিজে যা উপহার পেয়েছে তার সবই ময়নাপাড়ার মেয়েকে দিয়ে দেবে বলছে, নইলে হাসিখুশি মিথ্যে হয়ে যাবে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর সলিল চৌধুরীর সংলাপ বোধহয় এই গানে কেবল ময়নাপাড়ার মেয়েতে শেষ নয়, কারণ সচ্ছল মেয়ের প্রত্যয়ে প্রতিধ্বনি পাচ্ছি ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূজার সাজ’ কবিতার। দরিদ্র কৃষক বাবার দুই ছেলে — বিধু আর মধু। বাবার কিনে আনা সামান্য ছিটের জামা বিধুর পছন্দ হয়েছে, মধু কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সে ধনী রায়বাবুর কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে। রায়বাবু নিজের ছেলেকে ডেকে বলেন “ওরে গুপি, তোর জামা দে তুই মধুকে।” কবিতার মূল প্রতিপাদ্য অবশ্য আত্মসম্মান, তাই বিধু-মধুর মা মধুর ধার করা জামা দেখে দুঃখ পান, বিধুকে বলেন “দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে / ছিটের জামাটি করে আলো।” কিন্তু লক্ষণীয় যে, রায়বাবুও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পক্ষপাতী।

স্রষ্টারা ভাগ করে নিতে জানেন।

সব পথ এসে মিলে গেল শেষে

কয়েক হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে সন্ত্রাসবাদী বলে মিথ্যা অভিযোগে হাজতে পোরা গেলেও, লোকচক্ষে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রমাণ করা বড় শক্ত

মেয়ো রোডের মাঝখানে পুব দিকে মুখ করে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গতকাল বিকেলে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের একটি মেয়ের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যা, খোদ সরকারের দ্বারা প্রমাণ লোপাট এবং ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা কর্তৃক সত্যকে ধর্ষণ করার প্রতিবাদে একটা মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। সেই মিছিল শেষ হল গান্ধীজির পাদদেশে। তারপর পথসভা। সেই সভায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, পিছন দিক থেকে আসা ডুবন্ত সূর্যের আলোয় গান্ধীজির মুখে যেন প্রসন্ন হাসি। কিসের প্রসন্নতা?

এই বাল্মিকী সম্প্রদায়ের মানুষ চলতি কথায় ভাঙ্গি। যুগ যুগ ধরে এঁদের পেশা মানুষের মল মূত্র পরিষ্কার করা। বাংলায় আমরা এই পেশার লোকেদের বলি মেথর। বলা বাহুল্য, ব্রাহ্মণ্যবাদ বা মনুবাদ অনুসারে এঁরা অস্পৃশ্য। দিল্লীতে এঁদের মহল্লায় গান্ধীজি দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। শোনা যায় ঐ এলাকার (যার বর্তমান নাম বাল্মিকী কলোনি) লোকেরা আজও মনে করেন, তাঁদের কাছ থেকে গান্ধীজিকে বিড়লা হাউসে সরিয়ে না নিয়ে গেলে নাথুরাম গডসের ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের সাধ্য ছিল না তাঁকে হত্যা করে। এ বিষয়ে বিবেক শুক্লার লেখা Gandhi in Delhi বই থেকে আরো বিস্তারিত জানা যেতে পারে। কিন্তু বর্ণবাদ নিয়ে গান্ধীজির সমালোচনা করার অনেক অবকাশ আছে। তিনি যে মনে করতেন নিম্নবর্ণের লোকেদের জোর করে মন্দিরে ঢোকার চেষ্টা করা অনুচিত, উচ্চবর্ণের লোকেদের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য সেবা করতে দেওয়া উচিৎ — তা সমর্থনযোগ্য মনে হয় না অনেকেরই। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশে গান্ধীজির সমালোচনা করতেন না। এমনকি এই যে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের লোকেদের সাথে থাকা, তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

অরুন্ধতী রায় তাঁর ‘The Doctor and the Saint’ নিবন্ধে লিখছেন “In his history of the Balmiki workers of Delhi, the scholar Vijay Prashad says when Gandhi staged his visits to the Balmiki Colony on Mandir Marg (formerly Reading Road) in 1946, he refused to eat with the community:

‘You can offer me goat’s milk,’ he said, ‘but I will pay for it. If you are keen that I should take food prepared by you, you can come here and cook my food for me’… Balmiki elders recount tales of Gandhi’s hypocrisy, but only with a sense of uneasiness. When a dalit gave Gandhi nuts, he fed them to his goat, saying that he would eat them later, in the goat’s milk. Most of Gandhi’s food, nuts and grains, came from Birla House; he did not take these from dalits. Radical Balmikis took refuge in Ambedkarism which openly confronted Gandhi on these issues.”

এতৎসত্ত্বেও নিম্নবর্ণের অনেক মানুষের মনেই গান্ধীজির জন্য জায়গা আছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ভারতের বর্তমান মনুবাদী, ফ্যাসিবাদী শাসকের গান্ধীজিকে আক্রমণ না করা। গান্ধীজির একনিষ্ঠ সহচর জওহরলাল নেহরুকে নোংরা ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে তারা ছাড়ে না। কিন্তু গান্ধীজিকে আক্রমণ করার বদলে বরং দেখানোর চেষ্টা করে যে তারা গান্ধীর পথেই চলেছে। তার কারণ “মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক” কে ঘৃণা করলেও “দলিত ভোটব্যাঙ্ক” তাদের বিশেষ প্রয়োজন। পাছে গান্ধীজিকে গালাগালি করলে সেই ভোটে ভাঙন ধরে! তাই গডসের মূর্তি আর গান্ধীর মূর্তি — দুয়েই মালা দেওয়া হয়।

গান্ধীর সমালোচনা করার আরো অনেক জায়গা আছে। তিনি নিজেই যখন বলেছেন “আমার জীবনই আমার বাণী”, তখন জীবন আর বাণী — দুটোতেই নানা অসঙ্গতি দেখানো সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন তিনি যে গড়পড়তা ভারতীয়দের মতই আফ্রিকানদের ভারতীয়দের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করতেন তার প্রমাণ তাঁর লেখাপত্র, বক্তৃতাতেই আছে।

রাজনীতিতে ধর্মের প্রবেশ কি বিষময় হতে পারে তা আমরা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। সে কাজটাও যে গান্ধীর হাত দিয়েই হয়েছে — এমন সমালোচনা বাম ও দক্ষিণ, উভয় দিক থেকেই হয়েছে। বক্তব্যগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। তাঁর হিন্দ স্বরাজ যে স্বপ্নের রাষ্ট্রের কথা বলে, তার সাথে ধর্মীয় ভাবনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যদিও হিন্দুত্ববাদের গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকরের সেরকম রাষ্ট্র মোটেই পছন্দ হয়নি, ফলে এখনকার হিন্দুত্ববাদীদের গান্ধীজির পথেই চলার দাবী যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গান্ধীজি যে অহিংসার কথা বলতেন, যাকে তিনি দর্শনে পরিণত করেছিলেন তার সাথেও পুরোপুরি একমত হওয়া শক্ত। পৃথিবীর সর্বত্র বাস্তবতা হল বলপ্রয়োগ না করলে কোন কোন কাজ একেবারেই করা সম্ভব হয় না, অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ না করলে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারকে প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল বিকেলে গান্ধীজির পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে অহিংস আন্দোলন সম্ভবত তাঁর সময়ের চেয়ে আজ বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

আজকের দুনিয়ায় ভারতের মত সুবৃহৎ রাষ্ট্র, যার বিপুল পুলিশ বাহিনী এবং সুবিশাল সেনাবাহিনী আছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালকের মিছিলের শ খানেক লোক আণুবীক্ষণিক তো বটেই, কয়েক লক্ষ লোকের মিছিলও তেমন বড় কিছু নয়। এত লোকের হাতে অস্ত্র থাকলেও তেমন কিছু এসে যায় না। যদি তা না হত, তাহলে বাইরে থেকে অস্ত্রের যোগান থাকা সত্ত্বেও এভাবে কাশ্মীরের জিভ কেটে নেওয়া সম্ভব হত না। আসলে প্রতিবাদীর হাতে অস্ত্র থাকলে তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে, নিজের পীড়নের সপক্ষে মত তৈরি করতে আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রের আরো সুবিধা হয়। সেই কারণেই প্রতিবাদীদের দলমত নির্বিশেষে জেহাদি বা আর্বান নকশাল বলে দেগে দেওয়া। অথচ কয়েক হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে সন্ত্রাসবাদী বলে মিথ্যা অভিযোগে হাজতে পোরা গেলেও, লোকচক্ষে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রমাণ করা বড় শক্ত। তার জন্য বশংবদ সংবাদমাধ্যম লাগে, মাইনে করা আই টি সেল লাগে। সে প্রোপাগান্ডাই বা কতদিন বিশ্বাসযোগ্য থাকে সেটা দেখার। এই দোনলা প্রোপাগান্ডার বয়স কিন্তু এখনো বছর দশেক হয়নি। একটা দেশের ইতিহাসে দশ বছর কতটুকুই বা সময়? তাই আজ বহু মানুষ কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ বা শার্জিল ইমামকে কতিপয় আত্মবিক্রীত নিউজ অ্যাঙ্করের কথায় টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং বলে বিশ্বাস করছেন বলেই যে চিরকাল করবেন — এমনটা নাও হতে পারে। প্রোপাগান্ডা সততই স্বল্পায়ু।

কিন্তু এসবের ফলে যা হয়েছে তা হল আদর্শের দিক থেকে গান্ধীজির শত যোজন দূরে থাকা উমর থেকে শুরু করে কংগ্রেসী রাহুল গান্ধী পর্যন্ত সকলেই তাঁদের বক্তৃতায় একই সুরে বলছেন, আমরা এই শাসককে জমি ছাড়ব না, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করব। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে, সংবিধান মেনে। অর্থাৎ সকলেই গান্ধীগিরি শিরোধার্য করেছেন। গান্ধীর প্রসন্নতা বোধহয় এই কারণে।

ভারতের সংবিধান হিন্দুত্ববাদের রমরমায় অধুনা অনেকের কাছেই একটি ঘৃণিত নথিপত্র। বিশেষত বর্ণহিন্দুরা, যাঁরা হাথরাসের ঘটনাকে স্রেফ ধর্ষণ হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন, মেয়েটির দলিত হওয়ার কোন আলাদা গুরুত্ব নেই ভাবতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাঁদের অনেকেরই সংবিধানটা অপছন্দ। কারণ “আম্বেদকর এস সি, এস টি র দিকে ঝোল টেনে দেশটার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।” গান্ধীজির হত্যাকারীরা যখন তেমন শক্তিশালী ছিল না, তখনই এঁরা শিখেছেন সংবিধানটা একা আম্বেদকরই লিখে ফেলেছিলেন এবং গায়ের জোরে বামুন, কায়েতদের বঞ্চিত করে গেছেন। সংবিধান সভা বলে কোন কিছুর সম্বন্ধে যে অধিকাংশ মানুষ জানেন না, সংবিধানের প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদের দায়িত্ব যতটা আম্বেদকরের ততটাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির — এ কথা যে বেশিরভাগ নাগরিক বোঝেন না, তার জন্য মধ্যপন্থী বা বামপন্থীরা কম দায়ী নন। কিন্তু মজার কথা, ঘোর দক্ষিণপন্থার আক্রমণে যখন সংবিধান নিয়ে এই প্রথম সচেতন কাটা ছেঁড়া হচ্ছে, তখন গান্ধীর কৌশল সব বিরোধীরই কৌশল হয়ে উঠছে। আর যে নথিকে তাঁরা হাতিয়ার করছেন সেটা গান্ধীর সবচেয়ে বড় সমালোচক আম্বেদকরের সাথে সমার্থক। এ বছরের জানুয়ারি মাসে সি এ এ – এন আর সি – এন পি আর বিরোধী মিছিল মিটিঙেও তো আমরা দেখেছি সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য — পাশাপাশি গান্ধী আর আম্বেদকরের ছবি। গান্ধী মূর্তির প্রসন্নতা হয়ত সে কারণেও।

ইতিহাস বোধহয় এভাবেই গড়ে পিটে নেয়। মেয়ো রোডের গান্ধী মূর্তির কাছে অনেকগুলো রাস্তা এসে মিশেছে। সংখ্যায় অল্প হলেও কাল সেখানে এসে মিশেছিলেন নানা পথের বামপন্থীরা — যোগেন্দ্র যাদবের মত ঘোষিত গান্ধীবাদী সমাজবাদের দল স্বরাজ ইন্ডিয়ার মানুষজন; সি পি আই (এম) থেকে নির্বাসিত প্রসেনজিৎ বসুর মত লোক; কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে বামপন্থী ছেলেমেয়েরা, যারা নানা দলের বা হয়ত শুধুই ক্যাম্পাস লেফট; আমার মত রাজনীতি না করা বামপন্থীরা। আরো অনেকে আসেননি, কিন্তু আসতে বাধা নেই। সচেতনে বা অবচেতনে গান্ধীজির পথে এমন অনেকেই এসে পড়ছেন, যাঁদের সাথে তাঁর আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল। সকলে মিলিত হলে যদি দেশের ভাল হয় তাতে গান্ধী, আম্বেদকর, নেহরু, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে বা জ্যোতি বসু — কেউই আপত্তি করতেন বলে মনে হয় না। গান্ধীজিকে যিনি মহাত্মা বলেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথ (অমিতাভ চৌধুরীর মতে উনিই প্রথম বলেননি) থাকলে আশা করতেন “ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজও / বন্ধ নাশিবে — তারাও আসিবে দাঁড়াবে ঘিরে।”