একটি অসাধু গল্প

পল্টু যদ্দিনে বড় হইল তদ্দিনে ভক্ত পরিবার জনপ্রিয় হইতে শিখিয়া ফেলিয়াছে শুধু নয়, পল্টুর পরিবার অপেক্ষা এলাকায় বেশি জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে

এ অঞ্চলে যজমানি এবং পাঠশালায় শিক্ষকতার কারণে পল্টুদের পরিবারের বিস্তর প্রতিপত্তি ছিল বহুকাল হইতে। কবে হইতে? অন্তত বুড়োশিবতলার বুড়ো বটগাছ যদ্দিন আছে তদ্দিন তো বটেই। এই প্রতিপত্তি আরো বাড়িয়া গেল যখন কয়েক দশক পূর্বে পল্টুর বাপ-জ্যাঠারা লাঠিসোটা এবং বুদ্ধি একত্র করিয়া পার্শ্বস্থ গ্রামের ভক্ত পদবিধারী ডাকাত পরিবারকে কপর্দকশূন্য করিয়া দিলেন। গোড়ায় পল্টুর পিতামহ উহাদের ধোপা নাপিত অবধি বন্ধ করাইয়াছিলেন, অতঃপর শক্তিহীন ভক্তকুল পায়ে ধরিয়া “আর করিব না” বলিয়া নাকখত দেয়ায় আদেশ হইয়াছিল — কোন ঘরে কোন অস্ত্র রাখা চলিবে না, নিজেদের গ্রামের বাহিরে কাহারো সাথে অদরকারে কথা বলা চলিবে না এবং সর্বোপরি নিজগ্রামের বা অন্য কোন গ্রামের মোড়ল হইবার চেষ্টা করা চলিবে না। “জো হুজুর” বলিতে তাহাদের জুড়ি ছিল না। তাই তাহারা এসবই মানিয়া লইল।
অতঃপর আমাদের পল্টু বাড়িয়া উঠিল, সংস্কৃত শিক্ষায় এবং আঁক কষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তির কারণে আমাদের অঞ্চলে বিলক্ষণ দু চার পয়সা করিল এবং খ্যাতির অধিকারী হইল। প্রত্যুৎপন্নমতি হওয়ায় পল্টুর পূর্বপুরুষেরা যাহা চিন্তাও করেন নাই পল্টু তাহাই সম্ভব করিল। সে যজমানি ও শিক্ষকতা ছাড়িয়া দিয়া শুধু মোড়লি করিয়াই বিস্তর ধনী হইয়া উঠিল।
ওদিকে ভক্তরাও বসিয়া নাই। গিরীশ মহাপাত্র যেমন নিজে না খাইলেও অন্যের কাজে লাগিতে পারে বলিয়া গাঁজার কলিকা সংরক্ষণ করিত, ভক্তরাও তেমনি “নিজে শিখিতেছি না, অন্যকে শিখাইতেছি” বলিয়া অস্ত্রশিক্ষা ও মোড়লি শিক্ষা চালু করিয়া দিল আপনাদিগের উঠোনে। পল্টুর বাপ-কাকাদের কাছে কোন কোন ম্লেচ্ছ অভিযোগ করিয়াছিল বটে যে ইহাদের এখনই মাজা ভাঙিয়া দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাবুরা কহিলেন “ম্লেচ্ছগুলার সবেতে বাড়াবাড়ি।” সুতরাং ভক্তদের শক্তি সঞ্চয় নির্বিঘ্নে চলিতে লাগিল।
পল্টু যদ্দিনে বড় হইল তদ্দিনে ভক্ত পরিবার জনপ্রিয় হইতে শিখিয়া ফেলিয়াছে শুধু নয়, পল্টুর পরিবার অপেক্ষা এলাকায় বেশি জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এ অঞ্চলের লোককে সত্যের সাথে মিথ্যার উত্তম মিশ্রণ পান করাইয়া তাহারা বুঝাইতে সমর্থ হইয়াছে যে পল্টু ও তাহার পিতৃপুরুষ অদ্যাবধি কেবলই নিজেদের ঘর হইতে এ অঞ্চলের কোষাগার পর্যন্ত সিঁধ কাটিয়াছে, অন্য কিছু করে নাই। এই সমস্তের ফলে ভক্ত পরিবার কালে কালে নিজেদের শিষ্যদের মাধ্যমে অঞ্চলের মোড়লি দখল করিতে সমর্থ হইলেন।
আগেই বলিয়াছি আমাদের পল্টু আঁক কষিতে সেই ছোট থেকেই বিশেষ পারদর্শী। এখন প্রবীণ হইলেও সে ঘরের দেয়ালে প্রত্যহ শুভঙ্করী আঁক কষিত। ফলে দেয়ালের লিখন টের পাইয়া সে যথাসময়ে মাটিতে পোঁতা মোহরের কলসগুলিসমেত শহরে সরিয়া পড়িয়াছিল। অধুনা ভক্তকুলপতি নীরেন ভক্ত যখন সদলবলে আসিয়া পল্টুদের ভদ্রাসনের দখল লইল, তখন গহ্বরগুলি দেখিয়াই সে যা বোঝার বুঝিয়া গেল।
নীরেন স্বভাবে ডাকাত হইলেও, খুন, জখম, ফষ্টিনষ্টিতে রুচি থাকিলেও গুণীর কদর জানিত। সে ঠিক করিল তাহাদের গৃহের বিশ্বকর্মাপূজা উপলক্ষে সাক্ষাৎ বিশ্বকর্মা পল্টুকে সংবর্ধনা জানাইবে। শুনিয়া আমরা গ্রামবাসীরা, যাহারা নীরেনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ, ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম, তাহারা আশায় বুক বাঁধিলাম — বুঝি বা রত্নাকরের বাল্মীকি হইবার দিন ঘনাইয়া আসিল।
যথাকালে বিশ্বকর্মা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বহু বৎসর পরে গ্রামে পদার্পণ করিয়া আমাদের সেই ছোট্ট পল্টু নিতান্ত আবেগপ্রবণ হইয়া পড়িল। ভক্তদের দাওয়ায় পা রাখিয়াই সে নীরেনকে জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুপাত করিয়া কহিল “ওঃ! ছেলে বয়সে এই দাওয়ায় তোমার ঠাকুর্দা বিশ্বনাথ ভক্তের কোলে বসিয়া কত খেলা খেলিয়াছি। অমন স্নেহময় ব্যক্তি ইহজীবনে আর একটিও দেখিলাম না।” শুনিয়া আমরা, এ তল্লাটের বৃদ্ধরা, বাকরুদ্ধ হইয়া গেলাম। প্রথমে তো বুঝি নাই কার কথা হইতেছে। ভাবিতেছিলাম আমার নব্বই বছরের জীবনে এমন সজ্জন আমাদের গাঁয়ে কাহাকে দেখিয়াছি। হঠাৎ পার্শ্বে দন্ডায়মান সুবল খুড়ো, যাঁহার বয়স ১০৩, তিনি অতি অভব্য ভাষায় সরোষে বলিয়া উঠিলেন “শালা বিশে ডাকাতকে সজ্জন বলচে র‍্যা। বিশে লুকিয়ে কিসব ভূত পেরেতের পুজো কত্ত। আমাদের গেরামের বাচ্চা ধরে এনে বলি দিত। পল্টুর বাপ আজ থাকলে ব্যাটার ঠ্যাং ভেঙে দিত।” বুঝিলাম খুড়ো প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়াছেন। আমার এখনো শতবর্ষ হইতে ঢের দেরী, তাই তাঁহার পাশ হইতে ছিটকাইয়া সরিয়া আসিলাম। বলা তো যায় না, কেহ যদি শুনিতে পাইয়া নীরেনের কানে লাগাইয়া দেয়! চাণক্য নাকি বলিয়াছেন রাজার সমালোচকের পাঁচ বিঘতের মধ্যে থাকিতে নাই।
অতঃপর পুজোমন্ডপের অনুষ্ঠানে নীরেন পল্টুকে কিছু বলিতে অনুরোধ করিল। আমরা শিরদাঁড়া সোজা করিয়া বসিলাম। আহা! কি চমৎকার বলিল আমাদের পল্টু!
“আজ আমি আপনাদের কাছে এতদঞ্চলের আদর্শ ও ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু বলিব।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলকে প্রেম এবং সহমর্মিতার ভিত্তিতে গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। সভ্য, অসভ্য সকল মানুষের সহায়তায় এই অজ গাঁয়ে সভ্যতার গোড়াপত্তন করিয়াছিলেন। আমরা সর্বদাই ভ্রাতৃত্বের পথে চলিয়াছি, কাহাকেও শত্রু জ্ঞান করি নাই। তাই কবি বলিয়াছেন ‘যত মার খাই / পরোয়া তো নাই / মারো মোরে আরবার। / যে মারিছে মাথে / তাহারেও হাতে / দিতে হবে অধিকার।’ অতএব বন্ধুগণ, আমাদের হিংসা পরিহার করিতে হইবে, সকলকে ভালবাসিতে হইবে, বুঝিতে হইবে হিংসার দ্বারা কোন মহৎকার্য হয় না। চালাকির দ্বারা হইলেও হইতে পারে।”
শুনিয়া আমরা সকলেই প্রবল করতালি দিলাম। ভক্তরা এবং তাহাদের ছাত্ররাও দেখিলাম যৎপরোনাস্তি উল্লসিত। কিন্তু বক্তৃতা শেষ হওয়ামাত্রই যাহা ঘটিল তাহা আমাদের স্বপ্নাতীত। নীরেন উঠিয়া দাঁড়াইয়া মাথায় হাত ঠেকাইয়া অশ্রু গদগদ কন্ঠে চিৎকার করিয়া উঠিল “প্রভু, তোমায় আগে কেন চিনতে পারিনি, প্রভু? চিরকাল তোমায় পল্টু বলেই জেনেচি। এ পাপ আমি রাখব কোথায়, প্রভু? ক্ষমা কর, প্রভু, এই অধমের অপরাধ ক্ষমা কর।” বলিতে বলিতে সে দৌড়াইয়া মঞ্চে উঠিয়া পল্টুর পায়ে গিয়া পড়িল। দেখাদেখি সমস্ত ভক্ত পরিবার এবং তাহাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও সাষ্টাঙ্গ হইল। আমরা সকলেই পল্টুর স্বর্ণচশমায় শ্রীচৈতন্যের দিব্যচক্ষু প্রত্যক্ষ করিলাম। এও বুঝিলাম, ত্রেতায় যিনি রাম, দ্বাপরে যিনি কৃষ্ণ, ফাঁপরে তিনিই পল্টু। নীরেন উঠিয়া দাঁড়াইয়া মাইক হস্তে লইয়া ঘোষণা করিল সেই মুহূর্ত হইতে ভক্তরা এবং তাহাদের পারিষদবর্গ ডাকাতি, খুন, জখম, ধর্ষণ, চিটিংবাজি, ফেরেব্বাজি, কালোবাজারি ইত্যাদি সমস্ত অপরাধমূলক কার্য ছাড়িয়া দিল। এরপর হইতে আমাদের অঞ্চলে অখন্ড শান্তি, সচ্ছলতা, সমৃদ্ধি বিরাজ করিবে।
আমরা হর্ষিত হইয়া বুঝিতে পারিলাম দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে সুদিন আসিয়া পড়িয়াছে।

সভ্যতার ফাঁদ

যতই পাহাড় কমে আসুক, সেইসঙ্গে জঙ্গল, তৎসহ শ্বাস নেওয়ার মত বিশুদ্ধ বাতাস। হোটেল হোক, রিসর্ট হোক, হাইওয়ে হোক, পেট্রল পাম্প হোক। এগুলোই তো সভ্যতার লক্ষণ

কদিনের জন্যে পালিয়ে গেছিলাম। শিক্ষক গ্রেপ্তার, বিরোধী হত্যা, নির্লজ্জ মিথ্যাভাষণ, দ্রব্যমূল্যের অনর্গল বৃদ্ধি, উপনির্বাচন, পেইড নিউজ — এসব ভুলে। পাহাড়ে। মধ্যে মধ্যে পালাতে ইচ্ছে বোধহয় সবারই করে। তবে পালাতে চাইলেই তো আর পালানো যায় না। আমরা সাধারণ মানুষ, মুকেশ আম্বানি তো নই। তাঁর জীবনযাত্রা চলে তাঁর নিয়মে, আমাদের চলতে হয় সমাজ, সংসারের নিয়মে। তবে যা দেখে এলাম, পালানোর জায়গা সকলেরই কমে আসছে।
গেছিলাম গৌহাটি হয়ে শিলং, সেখান থেকে হপ্তাখানেক ধরে এদিকওদিক চেরাপুঞ্জি, ডাউকি, লাইথলুম ইত্যাদি। সাড়ে আট বছর আগেও একবার শিলং গেছি। এবারে একই রাস্তায় যাওয়ার সময়ে সবচেয়ে বড় যে তফাতটা চোখে পড়ল সেটা হল তখন পাহাড় কেটে যে জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ হচ্ছিল তা এবারে সম্পূর্ণ। তা ভাল, তবে মুশকিল হল রাস্তা বানানো হয়ে গিয়ে থাকলেও পাহাড় ফাটানো আর শেষ হচ্ছে না। গৌহাটি থেকে শিলঙের পথে এবং শিলং থেকে চেরাপুঞ্জির পথে বিপুল উদ্যমে পাহাড় ভাঙা চলছে, ভাঙা জায়গাগুলো দগদগে ঘায়ের মত হয়ে আছে বাঁকে বাঁকে। পাহাড়ের গা থেকে রক্ত পড়ে না বলেই বোধহয় কেউ প্রশ্ন তোলে না “এত রক্ত কেন?” এত পাহাড় ফাটানো কেন তার উত্তর খুব শক্ত নয় অবশ্য। অনেক জায়গাতে ইতিমধ্যেই সাইনবোর্ড লেগে গেছে — অমুক হোটেল আর তমুক রিসর্ট। অনেক জায়গাতেই অবশ্য নির্মাণ সম্পূর্ণ। কিসের বলুন তো? পেট্রল পাম্পের। পাহাড়ে নির্মল বাতাস আর নীল আকাশের আশে বেড়াতে গিয়ে যতগুলো পেট্রল পাম্প দেখলাম তত সারাজীবনে দেখেছি কিনা সন্দেহ। টুরিস্ট বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে, সরকারের করপ্রাপ্তি বাড়ছে, পেট্রল পাম্প বাড়লেই বা ক্ষতি কী? আপনি বলবেন, তা ওসব তো করতেই হবে। পাহাড় বেচে তো আর পয়সা হয় না।” আরে আরে! বলেন কী! কে বলেছে পাহাড় বেচে পয়সা হয় না? আলবাত হয়। বেধড়ক পাহাড় ভেঙে ফেলা দেখে আমার গিন্নীর সাথে একটু হা হুতাশ করছিলাম “এইভাবে পাহাড় কাটছে! কী পায় এমন করে?” শুনে আমাদের ভাড়া গাড়ির চালক শর্মাজি বললেন “পত্থর বিকতা হ্যায় না! কাফি আচ্ছা দাম মিলতা হ্যায়।” কপালে ছিল বলে স্বচক্ষে দেখাও হয়ে গেল এক জায়গায়। পাহাড় ভাঙা হচ্ছে আর লরিতে চেপে টুকরো টুকরো পাহাড় চলেছে কিছু দূরে নির্মীয়মাণ রিসর্টের শোভাবর্ধনে। যারা পাথর ভাঙছে তারা খুশি কারণ দিব্য দু পয়সা হচ্ছে। যারা পাথর কিনছে তারা খুশি কারণ তাদের রিসর্ট মজবুত এবং মনোরম হচ্ছে। আমাদের মত টুরিস্টরা খুশি কারণ দুর্গম পাহাড় সুগম হচ্ছে, আমাদের থাকার জায়গা বাড়ছে। সরকার খুশি কারণ যত টুরিস্ট, যত রিসর্ট, তত কর। হিসাব বহির্ভূত আয়ব্যয়গুলোর কথা বাদই দিলাম। তাছাড়া মেঘালয় পিছিয়ে থাকবে কেন? পশ্চিমবঙ্গে হাতিদের যাওয়া আসার পথে হোটেল, রিসর্ট বানানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, উত্তরাখণ্ডে জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে হাইওয়ে হচ্ছে। মেঘালয় ছোট রাজ্য বলে কি মানুষ না? সে যতই পাহাড় কমে আসুক, সেইসঙ্গে জঙ্গল, তৎসহ শ্বাস নেওয়ার মত বিশুদ্ধ বাতাস। হোটেল হোক, রিসর্ট হোক, হাইওয়ে হোক, পেট্রল পাম্প হোক। এগুলোই তো সভ্যতার লক্ষণ।
পাহাড়ের শোক ত্যাগ করে অন্য কথা বলি। প্রকৃতিপ্রেমী বাঙালিদের জলে ফেলা প্লাস্টিক সত্ত্বেও মানতেই হবে ডাউকি ভ্রমণ মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে আমার মত কাঠবাঙালের পক্ষে, যার কয়েক ফুট দূরেই বাংলাদেশের জল, মাটি দেখে বারবার ‘কোমল গান্ধার’ মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেসুরো গলায় গেয়েও ফেললাম সেই বিয়ের গান, যা ঋত্বিক দুই বাংলার বিয়ের গান হিসাবে ভেবেছিলেন “আমতলায় ঝামুরঝুমুর / কলাতলায় বিয়া / আইলেন গো সুন্দরী জামাই / মুটুক মাথায় দিয়া।”
সেই স্বপ্নসফর শেষ করে শর্মাজি নিয়ে গেলেন এক প্রত্যন্ত গ্রামে, নাম তার মউলিননং। কেন যাওয়া সেখানে? না সেটা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। গ্রামে অনেক সাইনবোর্ড। অনেক খুঁজলাম এই সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের তকমাটা কে দিয়েছে কোথাও লেখা আছে কিনা। পেলাম না। আপনারা কোথাও পেলে জানাবেন। অবশ্য গ্রামটা নিঃসন্দেহে খুব পরিচ্ছন্ন। হবে না-ই বা কেন? গ্রামে কোন কাঁচা রাস্তা নেই, কাদা হবে কোত্থেকে? সব বাড়িতে পাকা শৌচাগার, পুরো গ্রামে পাকা নর্দমা। গ্রামটা খাসিদের, যাঁদের জীবিকা মূলত পর্যটনই, ফলে প্রায় সবকটা বাড়িই দোকান হয়ে উঠেছে। ফলক দেখে জানতে পারলাম গ্রামের রাস্তা পাকা হয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমে (MGNREGS)। এত পাকা শৌচাগার বানানোও গ্রামের লোকের সাধ্যে কুলিয়েছে বলে মনে হয় না, হয়ত সরকারী সাহায্য ছিল। থাকাই উচিৎ। সব গ্রামেই এরকম সাহায্য দিয়ে গ্রামগুলোকে পরিচ্ছন্ন করে না তুলে একটা গ্রামকে পরিচ্ছন্নতম করে তোলা কেন রাষ্ট্রের (সরকারের) উদ্দেশ্য হবে — প্রশ্ন সেটাই। অর্থনৈতিক সঙ্গতির সাথে পরিচ্ছন্নতার যে আবশ্যিক সম্পর্ক সেটা অস্বীকার করতে গিয়ে আরো প্রকট হয়ে পড়েছে এখানে। কী গর্বের দেশ আমাদের! স্বাধীনতার একাত্তর বছর পরে যত্ন করে একটা গ্রামকে পরিষ্কার করেছি আমরা যাতে দেশবিদেশের টুরিস্ট এসে দেখে চোখ কপালে তুলে বলে “ওমা! কি পরিষ্কার! একদম বিদেশের মত।”
ঠিক আগেরদিন লাইথলুম নামে আরেকটা গ্রামের প্রান্তে একটা জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে উঁচুনিচু ঘাসজমি হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে উল্টোদিকের পাহাড়ের সৌন্দর্যে চমকে উঠে। আর আকাশ অমনি নেমে এসে ঠোঁটে আঙুল রেখে বলেছে “কোলাহল তো বারণ হল। এবার কথা কানে কানে।”
সেদিন আমাদের চালক ত্রিপুরার বাঙালি। অগাধ জ্ঞান ভদ্রলোকের (তাঁর কথায় পরে আসছি)। জানালেন এই রূপকথার মত জায়গাটায় রক অন ২ ছবিটার শুটিং হয়েছিল। তাতে জায়গাটায় লোকের আনাগোনা অনেক বেড়েছে কিন্তু গ্রামের রাস্তা সরকারী আশীর্বাদধন্য হয়নি। টুরিস্টদের জন্যে শৌচাগারটার অবস্থা দেখে বোঝা যায় গ্রামটাও পরিচ্ছন্নতম হয়ে ওঠার অদৃশ্য পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি। যাক সে কথা। কবি তো কবেই প্রশ্ন করেছেন “চেরাপুঞ্জির থেকে, একফোঁটা মেঘ ধার দিতে পারো গোবি সাহারার বুকে?” সেই চেরাপুঞ্জির অদূরে এমন অসাম্য তো থাকবেই।
সেদিনের চালক নাথবাবুর কথা দিয়ে আমার প্যানপ্যানানি শেষ করি।
ভদ্রলোক চোস্ত হিন্দিতে কথা বলছিলেন বলে ভেবেছিলাম উনি অবাঙালি নাথ। মাঝে একটা ফোন এল, তাতে বাঙাল ভাষায় কথা বলতে শুনে ভুল ভাঙল। জানা গেল উনি বঙ্গসন্তান ঠিক নন, ত্রিপুরাসন্তান। অযাচিতভাবে জীবন, দাম্পত্য, অপত্যস্নেহ প্রভৃতি ভারী ভারী বিষয়ে অনেক জ্ঞান বিতরণ করলেন, তবে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান যেটা দিলেন সেটা ময়ূরের জনন প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নইলে আমার এই ভ্রমণকাহিনীতে তাঁর জায়গা হত না। গভীর প্রত্যয় থেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন “বলুন তো, ময়ূর ডিম দেয় না বাচ্চা দেয়? আগে দাদা বলুন, তারপরে বৌদি বলবেন।”
আমি মূঢ়, অল্প বিজ্ঞানশিক্ষিত সাংবাদিক, বলে ফেলেছি “ডিম দেয়। সেটা ফুটে বাচ্চা হয়।” ভদ্রলোক সজোরে ব্রেক কষে পেছন ঘুরে এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যে নিজেকে নিরক্ষর মনে হল। আমার স্ত্রী, স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানোই যার পেশা, তার কাছে উনি অন্যরকম কিছু আশা করেছিলেন। অথচ সে বলল “হ্যাঁ, পাখিমাত্রেরই ডিম থেকে বাচ্চা হয়।” তড়িদাহত নাথবাবু আমার দিকে ফিরে বললেন “এই প্রশ্নটা বৌদিরে করা যায় না। আপনারে করি। এই যে কইতাছেন ময়ূরে ডিম দেয়, ডিম দিতে গ্যালে তো করতে অইব। আপনে কখনো ময়ূর-ময়ূরীরে করতে দ্যাখছেন?” আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে ময়ূর কুকুর বেড়ালের মত আমাদের চারপাশে প্রচুর পরিমাণে ঘুরে বেড়ায় না। ফলে তাদের “করতে” না দেখা না “করার” প্রমাণ হিসাবে দাঁড়ায় না। তিনি আমাকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন “আরে আপনি দ্যাখেন নাই শুদু না, কোন মানুষই দ্যাখে নাই। কারণ ওরা করে না। ময়ূর গিয়া ময়ূরীর কাছে কান্দে। সেই অশ্রু পান কইরাই ময়ূরীর বাচ্চা হয়।” আমার জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই, যুক্তিবিদ্যার মাস্টারমশাই — সকলের প্রতি মনে মনে “অপরাধ নেবেন না স্যার” বলে চুপ মেরে রইলাম। ঐ পাহাড়ি রাস্তায় বউ, বাচ্চাসমেত নাথবাবু আমাদের অনাথ করে দিলে তো স্যারেরা বাঁচাতে পারবেন না। একটা প্রশ্ন অবশ্য না করে থাকতে পারলাম না। “এখানেই সপরিবারে থাকেন না ত্রিপুরায় কেউ আছে এখনো?” উত্তর এল “না না, ফেমিলি আছে ওখানে। বাবা-মা আছেন না?”
বোঝা গেল বিপ্লব দেবরা এখন অনেকদিন ক্ষমতায় থাকবেন।
ভেবেছিলাম পালাতে পেরেছি কয়েকদিনের জন্যে। উপলব্ধি হল “বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ। কেমনে দিই ফাঁকি?”

রবীন্দ্রনাথ, শাভেজ, একজন জাপানি ও আমি: বিশ্বসাথে যোগে

এত ভাল লেগেছে কবিতাটা, বলে “যে করে হোক আমায় একটা জাপানী অনুবাদ যোগাড় করে দাও”

“বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো/সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।” গানটা ছোট থেকেই শুনছি। কতবার কত রবীন্দ্র জয়ন্তীতে সুরে, বেসুরে; কত লং প্লেয়িং রেকর্ডে, ক্যাসেটে, সিডিতে যে শুনেছি তার হিসাব নেই। বেশিরভাগ রবীন্দ্রসঙ্গীত যেরকম অন্যমনস্কভাবে শোনে সবাই, সেভাবেও শুনেছি আবার মন দিয়েও শুনে দেখেছি। কোন যোগ স্থাপন করতে পারিনি গানটার সাথে। এভাবেই স্কুল, কলেজ পেরিয়ে গেছি। বাবা-মায়ের ঠ্যালা খেয়ে রবীন্দ্র জয়ন্তীতে অংশগ্রহণ করেছি একটা বয়স পর্যন্ত, তারপর যে বয়সে বাবা-মা আর জোর করতে পারে না সেই বয়স থেকে যতটা পেরেছি পাশ কাটিয়ে গেছি অনুষ্ঠানটাকে।

তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম। একদিন আশুতোষ বিল্ডিং এর ঠিক সামনে অর্ধচন্দ্রাকার জায়গাটায় বসে পা দুলিয়ে অমূল্য আড্ডা দিচ্ছি, আমার সহপাঠী বন্ধু এবং তৎকালীন কমরেড (পরে সহকর্মী) সুদীপ্ত এসে জোর করে টেনে নিয়ে গেল। কোথায় যেতে হবে না হবে কিচ্ছু বলল না। যদ্দূর মনে পড়ে ইউনিভার্সিটির গেট দিয়ে বেরিয়েই রেলায় ট্যাক্সি ডেকে আমাকে নিয়ে উঠে পড়ল। কোথায় যাওয়ার তাড়া, কিসের তাড়া কিছুই বুঝলাম না। যেতে যেতে শোনা গেল সেটা।

আমরা দুজনে তখনো বিশ্বজুড়ে যৌথ খামারের স্বপ্নটপ্ন দেখি। তা জাপান থেকে এক কমরেড এসেছেন আমাদের এখানকার নির্বাচন কভার করতে। তাঁকে সাহায্য করতে হবে। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটি নাকি সাংবাদিকতা বিভাগের কোন ছাত্রকে চেয়েছে সেই কাজে। আর আমার যোগ্যতা সম্পর্কে অকারণ উচ্চ ধারণা পোষণ করা বন্ধুটি অমনি আমার নাম বলে দিয়েছে। বলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি অবশ্য। আমাকে পাকড়াও করে পাড়ি দিয়েছে রাজ্য কমিটির অফিসে। শুনেই আমি ট্যাক্সির দরজা খুলে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলাম আর কি। জাপানীর জ জানি না, সুদীপ্ত আমায় এরকম ফাঁসাচ্ছে! শেষমেশ যে বান্ধবীটির প্রতি অনুরক্ত ছিলাম তার কথা ভেবে টেবে ঝাঁপটা দিলাম না।

জাপানীটি দেখা গেল অতীব ভদ্রলোক এবং সে জাপানী জানা লোক খুঁজছে না, খুঁজছে ইংরিজি এবং বাংলা জানা লোক। তা তার সাথে নির্বাচন কভার করা তো হল। বোধহয় নেহাত খারাপ সাহায্য করিনি। তাই সে পরেও আরেকবার কলকাতায় এসে আমাকেই খুঁজে বার করে কাজকম্ম করেছিল।

এর পরের বছর। ছাত্রজীবন একেবারে শেষ প্রান্তে। ছাত্র ফেডারেশনের সাথে সম্পর্ক ঘুচিয়ে দিয়েছি, এম এ পাশ করে চাকরিবাকরি পাব কিনা তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছি। এমন সময় খবর হল উগো শাভেজ কলকাতায় আসবেন। শাভেজ মানে ভেনেজুয়েলার সেই নেতা যিনি প্রায় একটা গোটা মহাদেশকে বিশ্বায়নের চাকার তলা থেকে সরিয়ে এনে অন্যরকমভাবে বাঁচার সাহস দিয়েছেন। শাভেজ মানে যিনি ভোটে জিতে এসে সমাজতান্ত্রিক কর্মকান্ড চালানোর ক্ষমতা ধরেন। শাভেজ মানে যিনি প্রায় কাস্ত্রোর মতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে বহুজাতিকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। সেই শাভেজ আসছেন কলকাতায়। যখন নেলসন ম্যান্ডেলা এসেছিলেন, বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন হাত ধরে। এবারে শোনামাত্র ভাবছি কী করে যাওয়া যায় রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে সেই দিনটায়। ছাত্র ফেডারেশনের সাথে আড়ি করেছি, যৌথ খামারের স্বপ্নের সাথে তো আড়ি করিনি। এত কাছে আসছেন শাভেজ, অন্তত কয়েকশো ফুট দূর থেকে তাঁকে দেখব না!

কোন ব্যবস্থা মাথায় আসার আগেই জাপানী কমরেড জুনিচির ফোন। “আমি কমরেড শাভেজের কলকাতা সফর কভার করতে আসছি। তোমার অন্য কোন কাজ না থাকলে আমাকে একটু সাহায্য করবে?” অন্য কাজ! সব কাজ ফেলে ঐ কাজ করব আমি।

জুনিচির সঙ্গী হওয়ার সুবাদে মঞ্চের একেবারে কাছাকাছি বসার সুযোগ পেয়ে গেলাম। খুব কাছ দিয়ে হেঁটে এসে মঞ্চে উঠলেন শাভেজ। তারপর উদাত্ত গলায় নিজের মাতৃভাষায় বক্তৃতা। স্টেডিয়ামে উপস্থিত বেশিরভাগ লোকের মতই আমিও স্প্যানিশ জানি না। জুনিচিও জানে না। আমার কাজ ছিল ঐ সভার সকলের বক্তৃতার ইংরিজি অনুবাদ লিখে দেওয়া। শাভেজের বক্তৃতা শুনছি আর প্যাডে লিখছি। আসলে তো তাঁর কথা শুনে লিখছি না, লিখছি স্প্যানিশ দূতাবাস আমারই বয়সী যে ছেলেটিকে শাভেজের বক্তৃতা বাংলা করে বলে দেওয়ার জন্যে নিযুক্ত করেছিল তার কথা শুনে। দু এক মিনিটের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে ভাগ্যবানটি স্প্যানিশ যেমনই জানুক, বাংলা মোটেই জানে না। হোঁচট খেতে খেতেও প্রায় মেরে এনেছিল ব্যাপারটা কিন্তু একেবারে গুবলেট হয়ে গেল শাভেজ বক্তৃতার উপসংহারে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা বলতে শুরু করতেই। লাইনদুয়েক বাংলা করতেই গোটা স্টেডিয়াম বুঝে গেল এটা কোন কবিতা। কিন্তু সেই হতভাগা বোধহয় জম্মে কবিতাটা পড়েনি। তাই সে ভ্যাবাচ্যাকা। আরো লাইনতিনেক চলার পর এমনকি শাভেজও বুঝলেন ঠিক বাংলা হচ্ছে না। ভুরু কুঁচকে থেমে গেলেন। অগত্যা মঞ্চে উপবিষ্ট পশ্চিমবাংলার তখনকার মুখ্যমন্ত্রী (তিনিও নাকি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর মত কবিতা টবিতা লিখতেন) উঠে এসে সেই বঙ্গ মায়ের স্প্যানিশ সন্তানটিকে সরিয়ে দিয়ে গড়গড় করে বলে দিলেন “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য / উচ্চ যেথা শির…” ইত্যাদি। শাভেজ দেখলাম যারপরনাই খুশি হলেন। দুজনের আলিঙ্গন, স্টেডিয়ামসুদ্ধ লোকের স্লোগান দিয়ে মিটিং শেষ হল।

কথা ছিল বক্তৃতাগুলো আমি পরদিন দুপুরের মধ্যে ইমেল করব জুনিচিকে। তারপর বিকেলে ওর হোটেলে যাব আর কোন সাহায্য লাগলে সেটা করতে। পরদিন হোটেলে পৌঁছতেই ওর প্রথম প্রশ্ন “তুমি এত ভাল কবিতা লিখতে পার? রবীন্দ্রনাথের কবিতাটার কি সুন্দর ইংরিজি করেছ!” লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায় আর কি। ওকে বোঝালাম যে ইংরিজিটা মহাকবি নিজেই করে গেছেন। তাতে ও আরো মুগ্ধ। রবীন্দ্রনাথ নোবেলজয়ী কবি। জাপানেও গেছেন সেকথা ওর জানা। কিন্তু তিনি যে এত ভাল ইংরিজি জানতেন তা ও শোনেনি কখনো। কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল।

তারপরেই আমাকে ফেলল মহাবিপদে।

“আচ্ছা এই কবিতাটার জাপানী অনুবাদ পাওয়া যাবে?”

বোঝ! আমি ওকে বললাম যে রবীন্দ্রনাথ জাপানী ভাষা জানতেন বলে আমার জানা নেই। ওদের দেশের কোন কবি যদি করে থাকেন অনুবাদ তো থাকতে পারে কিন্তু সে তো ও-ই ভাল জানবে। জুনিচি নাছোড়বান্দা। এত ভাল লেগেছে কবিতাটা, বলে “যে করে হোক আমায় একটা জাপানী অনুবাদ যোগাড় করে দাও।” দিন দুয়েক সময় চেয়ে নিয়ে কেটে পড়লাম।

অকূলপাথারে পড়লে যা করা আমাদের জাতীয় অভ্যেস সেটাই করলাম। বাবার পরামর্শ চাইলাম। বাবাই বাতলে দিলেন। আমার এক মামা বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ছিলেন। সেই মামীকে ধরলাম। নিপ্পন ভবনের অধিকর্তার ইমেল আইডি যোগাড় হল। তাঁকেই জুনিচির ব্যাপারে জানিয়ে লিখলাম অন্তত বঞ্চিত করে যেন বাঁচিয়ে দেন। ভেবেছিলাম উত্তর টুত্তর পাব না। অবাক কান্ড! চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই উত্তর এল “আপনার অনুরোধ পেয়েছি। মিস্টার জুনিচি কোদামাকে আমরা কবিতাটা পাঠাচ্ছি।”

আরও পড়ুন সাহিত্য ও সাংবাদিকতা অপ্রিয় সত্য ছাড়া বৃথা

জুনিচির সেদিনই দিল্লীতে নিজের আস্তানায় ফিরে যাওয়ার কথা। আমি জানালাম কী বার্তা এসেছে রবীন্দ্রনাথের নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বেচারা একটু ব্যাজার মুখেই ফেরত গেল। বোধহয় ভেবেছিল মারাদোনার মত ডজ করে দিলাম। আমি আবার নিপ্পন ভবনের অধিকর্তা মারাদোনা কিনা তাই ভাবছিলাম। কে আমি অজ্ঞাতকুলশীল কলকাতার উপকণ্ঠের এক ছাত্র? আমার অনুরোধে কেনই বা এসব করতে যাবেন তিনি? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বুঝি ক্ষমতা অসীম। পরদিন বিকেলে দিল্লী থেকে ফোন করল জুনিচি। সে ইমেলে কবিতাটা পেয়েছে। এবং পড়ে আপ্লুত। “এমন আশ্চর্য কবিতা আমি আগে পড়িনি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।”

রবীন্দ্রনাথকে বললাম, একমাত্র তুমিই পারো। কোথায় সুদূর লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা! সেখানকার বিপ্লবী নেতার বুকে তুফান তোলে তোমার কবিতা আর সেই কবিতা নিজের ভাষায় পড়তে চায় এশিয়ার এক প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের সাংবাদিক! আব্দারটা করে তোমার দেশের, তোমার ভাষার এক অকিঞ্চিৎকর তরুণের কাছে আর সে আব্দারটা মেটাতে সমর্থ হয় কারণ একটা বিশ্বভারতী রেখে গেছ তুমি!

সেইদিন গানটা কানের ভিতর দিয়ে মরমে পৌঁছল। ফিরে রবীন্দ্রনাথকেই বললাম “নয়কো বনে, নয় বিজনে,/নয়কো আমার আপন মনে -/সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়, সেথায় আপন আমারও।।”

শ্রীদেবীত্ব

এই আঁতলামিটা আসলে ঠিক সেটাই করে যেটা এড়াতে চায় সচেতনভাবে — একজন অভিনেত্রীকে শুধু মহিলা হিসাবে বিচার করা। কারণ যে ছবিতে চরিত্র দাবী করেছে, সেখানে সুপ্রিয়া দেবীর কাজই ছিল যৌন আবেদনে দর্শককে ঘায়েল করে দেওয়া। যদি সেটা করতে পেরে থাকেন, তাঁর অভিনয় সার্থক

sridevi-FI

জনপ্রিয় মানেই ভাল নয় — একথা যেমন সত্যি, তেমনি জনপ্রিয় মানেই শিল্প হিসাবে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার দাবী রাখে না — এরকম মনে করাও অকারণ আঁতলামি ছাড়া কিছুই নয়। ফেসবুক যেমন মহা বিরক্তিকর কিছু ছ্যাবলামিকে প্রশ্রয় দেয় তেমন এই ধরণের আঁতলামিকেও ইদানীং বড্ড বাড়িয়ে তুলেছে।
যেমন সুপ্রিয়া দেবী মারা যাওয়ার পর দেখলাম রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই চিৎকার করছে “দাদা, আমি বাঁচতে চাই।” এদের অধিকাংশকে বিনা পয়সায় দেখাতে চাইলেও ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখতে চাইবে না, অনেক কষ্টে বসানো গেলেও মাঝপথে উঠে যাবে। কেউ কেউ হয়ত আদৌ দ্যাখেনি ছবিটা। কারণ সংলাপটা “দাদা, আমি বাঁচতে চাই” নয়। অথচ সকলে মিলে এমন করা শুরু করল যেন সুপ্রিয়া দেবী সারাজীবনে ঐ একটিই ছবি করেছেন। আর ঋত্বিক ঘটকের সাথে ঐ কাজটার জন্যেই সকলে চেনে ওঁকে। অধিকাংশ লোকের তো ‘কোমল গান্ধার’ এর অনসূয়াকেও মনে আছে মনে হল না, বাণিজ্যিক ছবিগুলোর কথা ছেড়েই দেওয়া যাক। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে আপামর দর্শক সুপ্রিয়াকে চিনেছে বাণিজ্যিক ছবিতে তাঁর অভিনয়ের জন্যেই। ঋত্বিকও তো সেসব অভিনয় দেখেই তাঁকে নীতা বা অনসূয়ার চরিত্রের জন্যে নির্বাচন করেন। সুপ্রিয়া তো আর গীতা ঘটক নন, যে ছোট থেকেই ঋত্বিক চিনবেন।
আসলে এদেশে অভিনেত্রীরা মারা গেলে আমাদের ঘোরতর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটা মজার ঘটনা ঘটে আমার মনে হয়। অভিনেত্রীকে পর্দায় দেখে কখন কখন তাঁর সৌন্দর্যে/যৌন আবেদনে আমরা মথিত হয়েছি, সেইটে চেপে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চলে। এই একবিংশ শতাব্দীতে নারীবাদ যেটুকু জায়গা করতে পেরেছে আমাদের সমাজে, সেটা যৌনতা সম্পর্কে আমাদের চিরাচরিত ঢাকঢাক গুড়গুড়ে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কোন সমালোচক কোন সংবাদমাধ্যমে প্রয়াতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বা আমার মত সাধারণ লোক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে গিয়ে ভাবছে “সাবধানে লিখি, বাবা। যদি সেক্সিজম হয়ে যায়।” মেরিলিন মনরো বা আনিটা একবার্গ মারা গেলে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষকে কিন্তু এরকম অদ্ভুত আচরণ করতে দেখি না। আসলে আমাদের এখানে অধিকাংশ লোকই সেক্সিজম মানে সেক্স বোঝে তো। ফলে সুপ্রিয়াকে ‘বনপলাশীর পদাবলী’ তে (বিশেষ করে ‘দেখুক পাড়াপড়শিতে’ গানে যখন তিনি উত্তমকুমারের বঁড়শিতে গেঁথে যান) যে প্রবল আবেদনময়ী লেগেছিল, সেটা লেখাটা বড্ড uncool হয়ে পড়ে। ‘মন নিয়ে’ ছবিতে উত্তমকুমারকে নিয়ে টানাটানি করা যমজ বোনেদের চরিত্রগুলোয় সুপ্রিয়ার অভিনয় অনালোচিতই থেকে যায়। এমনকি ‘সিস্টার’ ছবির সেই চরিত্র, যে শত্রুসেনার হাত থেকে স্কুলের মেয়েদের বাঁচাতে নিজের দেহ সমর্পণ করে — সেটার কথাও নাকি খুব একটা কারোর মনে নেই। চারদিকে এত সিনেমাবোদ্ধা গিজগিজ করছে দেখলে নীলকণ্ঠ বোধহয় সেই ঢাকনাহীন বাংলার বোতলটা ছুঁড়ে মারত।
এই আঁতলামিটা আসলে ঠিক সেটাই করে যেটা এড়াতে চায় সচেতনভাবে — একজন অভিনেত্রীকে শুধু মহিলা হিসাবে বিচার করা। কারণ যে ছবিতে চরিত্র দাবী করেছে, সেখানে সুপ্রিয়া দেবীর কাজই ছিল যৌন আবেদনে দর্শককে ঘায়েল করে দেওয়া। যদি সেটা করতে পেরে থাকেন, তাঁর অভিনয় সার্থক। সেই সার্থকতা স্বীকার না করাই তো শিল্পীর পক্ষে অমর্যাদাকর। উত্তমকুমারের বেলায় আমরা শুধু ‘জতুগৃহ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘বাঘবন্দি খেলা’ নিয়েই আলোচনা করি? ‘সপ্তপদী’ বা ‘শঙখবেলা’ র মত যেসব ছবিতে তাঁকে দেখলেই আজও বহু মেয়ের প্রেম করতে ইচ্ছে করে —- সেগুলোকে বাদ দিয়ে ভাবি? এমনকি সত্যজিৎ রায়ও তো তাঁর সুপুরুষ চেহারার যৌন আবেদনকে ব্যবহার করেছেন। তাতে দোষ কি?
এখন এত কথা বলছি কেন? বলছি এইজন্যে যে শ্রীদেবীকে নিয়ে দেখছি আবার সেই আঁতলামো শুরু হয়ে গেছে। আসলে শ্রীদেবী সম্পর্কে ভারতীয় পুরুষের যে যৌন আবেগ সেটাকে চাপা দেওয়া আরো শক্ত। সুপ্রিয়ার বেলায় আমাদের উদ্ধার করেছেন ঋত্বিক। শ্রীদেবী যে কখনো শ্যাম বেনেগাল বা গোবিন্দ নিহালনির মত পরিচালকের সাথে অভিনয় করেননি! এখন আঁতলামোটা করা যাবে কী করে! ধরা হল দীর্ঘ বিরতির পরে করা শেষদুটো ছবিকে — ইংলিশ ভিংলিশ আর মম। এদুটোই নাকি শ্রীদেবীর অভিনয়ক্ষমতার শীর্ষ বলে শুনতে পাচ্ছি এখন। দুটোর একটাও আমি দেখিনি, তবুও শ্রীদেবীর মৃত্যুতে আমার কারো চেয়ে কম দুঃখ তো হচ্ছে না! তিনি যে শুধু সুন্দরী ছিলেন না জিনাত আমনের মত, অভিনয়টা যথেষ্ট ভাল জানতেন — সেটা ইংলিশ ভিংলিশের আগে বোঝা যায়নি! ‘আখরি রাস্তা’র মত অমিতাভসর্বস্ব ছবিতেও তো যখন পর্দায় আসেন, শ্রীদেবীর দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। বিদ্যা বালন তো সেদিনের মহিলা, একজন নায়িকা একা একটা বাণিজ্যিক ছবিকে টেনে নিয়ে যেতে পারেন সে তো নেচে গেয়ে মারামারি করে শ্রীদেবী আশির দশকেই দেখিয়ে দিয়েছেন ‘চালবাজ’ এ। ‘চাঁদনী’ ছবিতে শ্রীদেবীর পাশে ঋষি কাপুর আর ওরকম সুপুরুষ বিনোদ খান্নাকেও নেহাত বেচারা লাগেনি কি? অতীতের এক সুন্দরী নায়িকাকে দুটো না বানালে ওয়াটার পিউরিফায়ার বেচা যায় না। শ্রীদেবী কিন্তু বরাবরই তাঁর সৌন্দর্য আর অভিনয়ের এমন কম্বো পেশ করেছেন যে আমাদের কৈশোরে তিনি ফলিডলের বিজ্ঞাপন করলে আমরা তাও কিনে ফেলতাম। তাহলে আজ আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে এসব হালের ছবির নাম কেন? ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ হয়ত শ্রীদেবীর ছবি, শ্রীদেবীকে ইংলিশ ভিংলিশের অভিনেত্রী বললে কিন্তু নেহাতই অন্যায় হবে।
বরং সত্যি কথাটা সহজ করে বলা যাক না। আমাদের প্রজন্ম বরাবর বনি কাপুরকে মনে মনে (কখনো প্রকাশ্যেও) গালাগাল দিয়ে এসেছে শ্রীদেবীর স্বামী হওয়ার সৌভাগ্যের জন্যে। বেশ মনে আছে আমার এক অতীব মেধাবী বন্ধু একবার ফুট কেটেছিল “কে বেশি বৌদিবাজ বল তো? রবি ঠাকুর না অনিল কাপুর?” চরম সত্যি কথাটা এই যে আমাদের প্রজন্মের যেসব ছেলে একদমই সুবোধ বালক ছিল, তাদের কৈশোরও স্বপ্নার্দ্র করে রেখেছিলেন শ্রীদেবী, কারণ তিনি ক্যামেরার সামনে অদৃশ্য পুরুষের সঙ্গেও প্রবল প্রেম করতে পারতেন। নীল শাড়িতে সেই শ্রীদেবীকে দেখার পর আমাদের দিন কাটত না, রাত কাটত না।
প্রকাশ্যে আজ যে যা-ই বলুক আর লিখুক, মনে মনে সবাই জানে, সৌরভ গাঙ্গুলি যেমন বলকে বলতে পারতেন “বাপি, বাড়ি যা”, শ্রীদেবীও সানি লিওনকে বলতে পারতেন “সানি, বাড়ি যা।”

সপ্তপদী: আমাদের অস্ত্র

একটা মুমূর্ষু গরীব ছেলেকে সারিয়ে তোলার পরে যখন তার বাবা আশীর্বাদ করেন “ভগবান আপনার ভাল কোরেন,” কৃষ্ণেন্দু উত্তরে বলে “ভগবান আর কোথায়, রামশরণ? তোমরাই তো আমার ভগবান।”

“এখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এসো?
(মেয়েটা মাথা নেড়ে না বলে)
“কেন?”
“আমি বিধর্মী। এ সময়ে আমার তোমার কাছে আসা ঠিক হবে না।”
“এসো…….. (ধরাচূড়া পরা ছেলেটা মেয়েটাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে) বোসো।”
“এ তুমি কী করলে?”
“কী করলাম!”
“এ অবস্থায় তুমি আমাকে স্পর্শ করলে!”
“অস্পৃশ্যতার কথা বলছ? আমার মাকে জানলে তুমি একথা বলতে পারতে না। আজ সারাদিন মনে হয়েছে মায়ের কথা। তখন আমি খুউব ছোট। মা গল্প করতেন ভবিষ্যতের। বলতেন ‘খোকা, তুই মস্তবড় ডাক্তার হবি। বিলেত যাবি।’ শুনে আমি অবাক হয়ে বলতাম ‘বিলেত যাব? বাবা যে বলেন বিলেত গেলে জাত যায়?’ মা হেসে ফেলতেন। বলতেন ‘তুই কি তোর বাবার মত জাত ধুয়ে জল খাবি? আর তোর বাবা যদি একান্তই রাগ করেন, আমি নাহয় তোর বাবাকে নিয়ে আলাদা হয়ে থাকব। তুই তো বড় হবি।”

আজকাল আর রোম্যান্টিকতা আসে না। অথচ কিছুদিন আগেও রোম্যান্টিক হিসাবে আমার দিব্যি নাম ছিল। রাস্তাঘাটে প্রেমিক- প্রেমিকা বা নবদম্পতি দেখলে বিক্ষুব্ধ মনও বেশ পেলব হয়ে আসত, বিভিন্ন সুখস্মৃতি ভিড় করত, জানা গান বা কবিতার লাইন মনে পড়ত। আজকাল আর তেমন হয় না। এখন জোড়া দেখলেই একটা আশঙ্কা কাজ করে এবং অনেক চেষ্টা করেও দেখেছি কিছু প্রশ্ন নিজেকে না করে থাকতে পারি না “দুজন একই ধর্মের তো? নইলে এদের কেউ আক্রমণ করবে না তো?”
এই আশঙ্কা একদিনে তৈরি হয়নি। বেশ মনে আছে বয়সে আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট এক মহিলা সহকর্মী — যাকে পোশাকআশাক, খাদ্যাভ্যাস, নামী স্কুলকলেজের ছাপ ইত্যাদি কারণে আধুনিকাই বলা উচিৎ — বছরদুয়েক আগে আমার সাথে দীর্ঘক্ষণ তর্ক করেছিল যে হিন্দু মেয়েদের ফুঁসলিয়ে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করাটা মুসলমান যুবকদের সুচিন্তিত সঙ্ঘবদ্ধ চক্রান্ত এবং হিন্দু মেয়ের সাথে মুসলমান ছেলের বিয়ে একমাত্র তখনই মেনে নেওয়া যেতে পারে যদি মেয়েটি নিজের ধর্ম পরিবর্তন না করে।
কাল ভ্যালেন্টাইনস ডে তে হৃদয়াকৃতি বেলুন আর চকোলেটের ফাঁক দিয়েও আমার আশঙ্কা আমাকে সারাদিন মুখ ভেংচে গেল, বারবার হাদিয়া আর অঙ্কিত সাক্সেনার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠতেই থাকল আর কানে বাজতে থাকল সেই প্রাক্তন সহকর্মীর কথাগুলো। এই দৃশ্যশ্রাব্য আতঙ্ক থেকে বাঁচতে আমি আশ্রয় নিলাম বহুবার দেখা একটা পুরনো রোম্যান্টিক ছবিতে। সেখানে দুই ভিন্নধর্মী সহপাঠীর লাঠালাঠি শেষ হয়ে প্রেম শুরু হওয়ার অনুঘটক হিসাবে কাজ করছেন ছেলেটার সদ্যমৃতা মা, যিনি ছেলেকে ছোট থেকেই শিখিয়েছিলেন জাত ধুয়ে জল না খেতে। ভাগ্যিস! শিখিয়েছিলেন বলেই তো কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি হাত ধরে নিজের হোস্টেলের ঘরে নিয়ে আসে রিনা ব্রাউনকে। নইলে যে তৈরিই হতে পারত না আমাদের অতিপ্রিয় প্রেমের ছবিটা, যা ১৯৬১ তে তৈরি, প্রাকস্বাধীনতা যুগের গল্প বলছে অথচ ২০১৮র আমরা যার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছি।
কৃষ্ণেন্দুর মায়ের উদারতা (সময়ের গেরো দেখুন — মনুষ্যত্বকে উদারতা বলছি) যে নেহাত গালগল্প নয় তার প্রমাণ আমার পারিবারিক ইতিহাসেই আছে। আমার মায়ের দিদিমা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে এক ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্বাধীনতা সংগ্রামীকে বাড়ির ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন, হিন্দু দারোগা বাকি বাড়িটা তল্লাস করে তাকে পায়নি কারণ সে কল্পনাও করেনি ওখানে ঐ লোককে লুকনো যেতে পারে।
তবে তার মায়ের তুলনায় কৃষ্ণেন্দুর কাছে ধর্ম বা বিগ্রহের গুরুত্ব যে আরো কম, ‘সপ্তপদী’ দেখলে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। শুধু মেডিকাল কলেজ পর্বে তার সোচ্চার ঘোষণা থেকেই নয়, যে রিনার জন্য সে ধর্মান্তরিত হল তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরেও কৃষ্ণেন্দুর আচরণ বারবারই প্রমাণ করে মুখুজ্যে বামুন থেকে রেভারেন্ড হওয়ার পরেও তার বিশ্বাস মানবধর্মেই সবচেয়ে জোরালো। সেইজন্যেই একটা মুমূর্ষু গরীব ছেলেকে সারিয়ে তোলার পরে যখন তার বাবা আশীর্বাদ করেন “ভগবান আপনার ভাল কোরেন,” কৃষ্ণেন্দু উত্তরে বলে “ভগবান আর কোথায়, রামশরণ? তোমরাই তো আমার ভগবান।”
কাল কলকাতার রাজপথে যারা নাকি একটা পরিবারকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার অনুষ্ঠান করেছে, তারা রেভারেন্ড কৃষ্ণেন্দুর এই কথা শুনলে নির্ঘাত বলত “চালাকি করে রামশরণকে খ্রীষ্টান বানানোর চেষ্টা করছে।” সুবিধামত পেলে কৃষ্ণেন্দুর অবস্থা গ্রাহাম স্টেইনসের মতও করতে পারত। এরাই আবার এক হিন্দু সন্ন্যাসীকে নিজেদের লোক বলে দাবী করে যিনি লিখেছিলেন “বহুরূপে সম্মুখে তোমার/ ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর/ জীবে প্রেম করে যেইজন/ সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” শোনা যায় বিবেকানন্দ প্রথমে “জীবে দয়া” লিখেছিলেন। তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ শুনে বলেন “দয়া! দয়া করবার তুই কে রে? জীবে প্রেম বল।” কাকতালীয় নয় যে রিনার চোখ দিয়ে পরিচালক অজয় কর যখন রেভারেন্ডের ঘরটা আমাদের দেখান, সেখানে রিনা, যীশু ছাড়া আর যাঁদের ছবি দেখা যায় তাঁরা হলেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ। এবং রামকৃষ্ণ। এই কৃষ্ণেন্দুর কাছে যে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভালবাসার মানুষের মূল্য বেশি হবে তা আশ্চর্যের নয়। আশ্চর্যের কথা এই যে কৃষ্ণেন্দুর বাবার গোঁড়ামি থেকে আমরা আজও বেরিয়ে আসতে পারলাম না অথচ তিনি নিজেও ছবির শেষপ্রান্তে সত্যদর্শন করতে পারলেন।
সেদিনের দর্শকের নিশ্চয়ই আপত্তিকর লাগেনি, এমনকি আলাদা করে লক্ষ্য করার মতই মনে হয়নি, যে কৃষ্ণেন্দুকে হারানো এবং নিজের জন্মবৃত্তান্ত জানতে পারা, তারপর মাকে হারানোর মধ্যে দিয়ে রিনার নরকদর্শন আর কৃষ্ণেন্দুর বাবার ভুল স্বীকারের পরে রিনা আর কৃষ্ণেন্দুর মিলন কিন্তু সপ্তপদীতে হয়নি। ধর্মীয় এবং পারিবারিক পরিচয় খোয়ানো, কোমরের নীচে আঘাত পাওয়ায় চলচ্ছক্তি এবং যৌনক্ষমতা পর্যন্ত খোয়ানো রিনাকে কৃষ্ণেন্দু নিয়ে গেছে যীশুর কাছেই। গত ৫৭ বছর ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু দর্শক এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে চলেছেন, কারো মনে হয়নি খ্রীষ্টধর্ম জিতে গেল। আজ এ ছবি তৈরি হলে সুচিত্রা সেনের নাক কাটার দাবী উঠত বোধহয়। পূর্বসুরীদের সাথে আমাদের তুলনা করে দেখুন তো লজ্জায় নিজের নাক কাটতে ইচ্ছে করে কিনা?
তবে পূর্বসুরীরা বোধহয় এই ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। সেইজন্যে নিজেদের সৃষ্টিতে বারংবার সাবধান করেছেন। কেন বারংবার বলছি?
১৯৬১ তে মুক্তি পায় সপ্তপদী। এখানে তবু, অন্তত প্রাণ থাকতে কৃষ্ণেন্দু আর রিনা এক হতে পেরেছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি কিভাবে দুটো জীবন নষ্ট করে দিতে পারে তার আরো নির্মম, আরো বিয়োগান্ত একটা ছবি কিন্তু মুক্তি পেয়েছে ঠিক তার আগের বছরই — সত্যজিৎ রায়ের দেবী। সেখানে উমাপ্রসাদ আর দয়াময়ী আর কখনো এক হতে পারেনি। দয়াময়ীকে শেষ দৃশ্যে আমরা হারিয়ে যেতে দেখি কুয়াশায়, উমাপ্রসাদ আর তাকে খুঁজে পায় না। তার মৃত্যু হল কিনা সত্যজিৎ দেখান না কিন্তু সে উন্মাদ হয়ে যায়। রিনা তবু কৃষ্ণেন্দুর কোল পায়, যীশুর শরণাগতি পায়। দয়াময়ী সেসব কিছুই পায় না। কৃষ্ণেন্দুর বাবার মত উমাপ্রসাদের বাবারও (কি আশ্চর্য! সেই ছবি বিশ্বাস!) গোঁড়ামি ভাঙে, তবে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয় তাঁকে।
সত্যজিতের মৃত্যুর পর এক বক্তৃতায় উৎপল দত্ত বলেছিলেন দেবী ছবিটা গ্রামেগঞ্জে সরকারী খরচে দেখানো উচিৎ। তবে সঠিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হবে। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কথা বাদ দিন। অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজও দেবী আমাদের হাতিয়ার। আর অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে প্রেমের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে যারা, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সপ্তপদীও আমাদের অস্ত্র হতে পারে। হাদিয়ার জন্য লড়াইয়ে অস্ত্র, আর কেউ যেন অঙ্কিত না হয়, আর কোন তথাকথিত অনার কিলিং না হয় তার জন্য লড়াইয়েও অস্ত্র।
শোকের ঊর্ধ্বে উঠে বা শোকের মধ্যে দিয়েও যে সত্যদর্শন হয় তা যদি উমাপ্রসাদের বাবা কালীকিঙ্করকে দেখে বিশ্বাস না হয় তাহলে অঙ্কিতের বাবা যশপাল সাক্সেনাকে দেখুন, যিনি বললেন “যা হয়েছে তাতে আমি অত্যন্ত শোকগ্রস্ত। কিন্তু মুসলমানদের সাথে শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করতে চাই না। আমার কোন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ নেই।”

ধর্মনিরপেক্ষতার ধাঁধা

শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম”

আগামী বছর লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার ৩০ বছর পূর্ণ হবে। এই তিরিশ বছরে দুটো শব্দবন্ধ আদবানি এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের কল্যাণে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে — মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা (pseduo secularism) আর প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা (true secularism)। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের হজযাত্রায় ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সূত্রে ঐদুটো শব্দবন্ধ আবার বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে। মোটের উপর বিজেপি এবং তার সমর্থকরা যা বলছেন তার সার এই যে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটা বিশেষ ধর্মের লোক তীর্থ করতে যাবে বলে সরকার পয়সা খরচা করবে কেন? এগুলো হচ্ছে মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা। এই যে নরেন্দ্রবাবু ভর্তুকি তুলে দিলেন — এইটেই হচ্ছে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা। কথাটা শুনতে ভারী ভাল এবং কথাটা সত্যিও — যতক্ষণ না আপনি এটা জানছেন যে মানস সরোবরে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভারত সরকার কত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। এছাড়াও কোন রাজ্যের সরকার পাকিস্তানের নানকানা সাহিবে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্যে ভর্তুকি দেয়, কোন রাজ্যের সরকার কুম্ভমেলার আয়োজন করে। এবং সেসব মিলিয়ে যা খরচা হয় তা হজযাত্রার ভর্তুকির চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই দেখুন

https://www.outlookindia.com/website/amp/rs-200-cr-haj-subsidy-gone-but-what-about-rs-2500-crore-set-aside-by-up-alone-fo/306961?__twitter_impression=true

পার্থক্যটা আরো কুশ্রী হয়ে দাঁড়ায় হজে যাতায়াতের খরচ হিসাব করলে। হিসাব করলে ফল যা বেরোয় তার মানে দাঁড়ায় এই যে ভর্তুকিটা তীর্থযাত্রীরা পায় না, পায় এয়ার ইন্ডিয়া — হজ করতে যেতে হলে যাদের বিমানে যাওয়া বাধ্যতামূলক। গোটা আষ্টেক অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুন

https://thewire.in/214513/haj-subsidy-cancelled-air-india/

তা সত্ত্বেও হজের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর এখন অব্দি কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা কোন মুসলিম সংগঠনকে হাঁই হাঁই করে উঠতে দেখা গেল না যে “এটা আমাদের অধিকার, এটা দিতেই হবে।” বস্তুত সেই প্রথম এন ডি এ সরকারের আমল থেকে হজযাত্রীদের ভর্তুকি দেওয়া নিয়ে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” পার্টি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনছি। এই বছরগুলোতে এ নিয়ে বন্ধুবান্ধব, পরিচিত, অপরিচিত যত ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সাথে কথা হয়েছে, সকলেই বলেছে যে এই ভর্তুকি অপ্রয়োজনীয়। ইসলামেও নাকি তাদেরই হজযাত্রা করতে বলা হয়েছে যাদের সামর্থ্য আছে। সুতরাং সরকারী আনুকূল্যে তীর্থ করতে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই।
অথচ দেখুন, হজের ভর্তুকির সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার কথা যেইমাত্র বলা হয়েছে অমনি চিৎকার শুরু হয়ে গেছে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”। কথাটা যে বলবে সে-ই যে হিন্দুদের শত্রু এটা যেন স্বতঃসিদ্ধ। এই চিৎকারে সবচেয়ে জোরালো গলাগুলো হিন্দুত্ববাদী মোদীর সাঙ্গোপাঙ্গদের। এটাকে, অতএব, প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু মূল প্রশ্নটা এর চেয়ে অনেক বড় এবং সেই প্রশ্নটার উত্তর নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার দরকার আছে। প্রশ্নটা এই যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কী? শুধু দক্ষিণপন্থীরা নয়, মধ্যপন্থী, এমনকি অনেক বামপন্থীও বলে থাকেন “ভারত আবার ধর্মনিরপেক্ষ কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষ মানে কোন ধর্মকেই সরকার পাত্তা দেবে না। এখানে কি সেটা হয়? এখানে তো সবেতেই ধর্ম।”
কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটা এসেছে ইউরোপের secular ধারণা থেকে। এবং secular রাজনৈতিক ব্যবস্থার মানে এমন একটা ব্যবস্থা যাতে চার্চের কোন ভূমিকা থাকবে না। চার্চ, মানে ধর্মযাজকদের, রাষ্ট্রের ব্যাপারে কোন কথাই বলতে দেওয়া হবে না। ইউরোপে ব্যাপারটা এভাবেই ঘটেছিল কারণ মধ্যযুগে ঐ মহাদেশে চার্চ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছিল, রাজার সমান বা কোন কোন ক্ষেত্রে রাজার চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে যারপরনাই অত্যাচার করত সাধারণ মানুষের উপর। নবজাগরণ চার্চের সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটা আন্দোলনও বটে। নবজাগরণ সমাজকে ধর্মকেন্দ্রীক (theocentric) থেকে করল মানবকেন্দ্রীক (anthropocentric)। সেখান থেকেই কালে কালে এল secular রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা। তা চার্চনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা যদি কায়েম করতে হয় তাহলে স্বভাবতই রাষ্ট্রকেও ধর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। সেটাই যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা।
কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার যে এই একটাই চেহারা হতে পারে, একথাটা কে বলে দিল? অন্তত ভারতবর্ষে শাসকের কাছ থেকে এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে (যেহেতু গণতন্ত্রে শাসক আকাশ থেকে পড়েন না, সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন) ওরকম ধর্মনিরপেক্ষতা আশা করা নির্বুদ্ধিতা। কেউ ওরকম হলে নিশ্চয়ই ভাল কথা, যেমন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আর বেশিরভাগ শাসক যে তেমন হবেন না সেটাই এদেশে স্বাভাবিক। কেন, সেটা ভারতের ইতিহাস যে একটুও বুঝেছে তাকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। বিবেকানন্দ তো বলেইছিলেন, সব জাতির একটা করে মূলমন্ত্র থাকে, ফরাসীদের যেমন liberte, egalite, fraternite; ভারতীয়দের মূলমন্ত্র তেমনি ধর্ম। কোন দেশের মূলমন্ত্র ধর্ম হওয়া মোটেই ভাল কথা নয়, হলে কী ধরণের পশ্চাদপসরণ হতে পারে তার বহু নিদর্শন আমরা পাচ্ছি এখন, অন্য অনেক দেশের উদাহরণ থেকেও বোঝা যায়। তবুও এটাই যে ভারতের বাস্তবতা সেটা অস্বীকার করা মূর্খামি। আমাদের রাষ্ট্রপিতারা (founding fathers অর্থে। আমি গান্ধীভক্ত নই, তাই একা মহাত্মা গান্ধীই রাষ্ট্রপিতা এমনটা মনে করি না। তবে তিনিও একজন) ওরকম মূর্খ ছিলেন না। ধর্মকে বাদ দিয়ে এই দেশ চালানো যাবে না সেটা তাঁরা ভালই বুঝতেন কিন্তু ধর্মের উপর ভর দিয়ে তো আর একটা বিংশ শতকের সভ্য দেশ গড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া কোন ধর্মের উপর ভর দেওয়া হবে? এ তো আর পঞ্চদশ, ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপ নয় যে খ্রীষ্টান ধর্মটাকে সামলে দিলেই হল। এখানে অজস্র ধর্ম, একই ধর্মের মধ্যেও অজস্র মত (ইংরিজিতে যাকে sect বলে আর কি)। সেখানে কোন একটাকে প্রাধান্য দেওয়া মানেই বাকি সকলকে জোর করে সেই ধর্মের অধীন করে দেওয়া।
অতিচালাক কয়েকজন সঙ্ঘ পরিবারের নেতা বলতেন এবং এখনো বলেন “হিন্দুরা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, অতএব তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ। অন্যদের তো কেউ তাড়িয়ে দিতে বলছে না, তারাও থাকবে এদেশে।” আপনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ হন তাহলে কথাটা আপনার দিব্য পছন্দ হবে। কিন্তু এভাবে যে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক দেশ তৈরি হয় না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাকিস্তান। সঙ্ঘ পরিবারের উপর্যুক্ত তত্ত্বটার মতই পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা মহম্মদ আলি জিন্নাও বলে গেছেন। তাতে আদপে কোন লাভ হয়নি ওদেশের হিন্দুদের। এদেশের “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” লোকেরাই তো উঠতে বসতে শোনান ১৯৪৭ এর পর থেকে ভারতে কিভাবে সংখ্যালঘুরা বেড়েছে আর পাকিস্তানে কমেছে। মুজিবহত্যা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। ভারতে যদি হিন্দুধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন রাষ্ট্রপিতারা তাহলে ভারতও যে হিন্দু পাকিস্তান হত সেটা বুঝতে বৈদিক বুদ্ধির প্রয়োজন হয় কি? তাহলে বিকল্প কী ছিল? একটাই। সব ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করা। বাম, দক্ষিণ সকলেরই বোঝা উচিৎ ইউরোপীয় ঢঙে রাষ্ট্র যদি সব ধর্ম থেকে সমদূরত্বের নীতি নিত তাহলে এখানে যা হত সেটা হল মাৎস্যন্যায়। যে সংখ্যালঘু তাকে নিজের ধর্মাচরণ করতে হত লুকিয়ে আর যে সংখ্যাগুরু সে আইনগতভাবে না হলেও, গায়ের জোরে নিজের ধর্ম চাপিয়ে দিত সংখ্যালঘুদের উপর। না মানলে মারধোর খেতে হত, মরতে হত। ঠিক যেভাবে সরকারী নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এখন পশ্চিমবঙ্গেও দিব্যি অস্ত্রশিক্ষা শিবির চালাচ্ছে আর এস এস।
কেউ কেউ বলবেন, আচ্ছা সে না হয় দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় হল। গান্ধী তো খুন হলেন ১৯৪৮ এ, প্যাটেল চলে গেলেন ১৯৫০ এ, আম্বেদকর ১৯৫৬ এ আর নেহরু ১৯৬৪ তে। কিন্তু পরবর্তী শাসকেরা কী করলেন? কী করলেন তারপরের প্রধানমন্ত্রীরা, মুখ্যমন্ত্রীরা? এবং অনিবার্যভাবেই দক্ষিণপন্থীরা সেই বোকা বোকা কথাটা আবার বলবেন “Secularism শব্দটা তো সংবিধানের প্রস্তাবনায় ছিল না। ইন্দিরা কেন ঢোকালেন?” প্রশ্নকর্তারা ভান করেন যেন ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার তার আগে থেকেই ২৫-২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ছিল না, ইন্দিরা চক্রান্ত করে সেটাও ঢুকিয়েছিলেন। তাহলে secularism শব্দটায় আপত্তিটা কিসের? আপনারা তো নাকি “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ”। তাহলে তো ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা সংবিধানে ঢোকানোর জন্যে ইন্দিরার আপনাদের ধন্যবাদার্হ হওয়া কথা!
এই কথোপকথন মুখোমুখি বসে চালালে এরপরেই টিভি বিতর্কের মত প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি লেগে যাবে, সীমান্তে কত সৈনিক মরছে সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যাবে। সুতরাং এবার ইতিহাস, সংবিধানের মত যা কেউ পড়ার দরকার মনে করে না এমন বিষয় বাদ দিয়ে একেবারে গোদা ব্যাপারে চলে আসা যাক। ভারত যে আসলে ধর্মনিরপেক্ষ নয় তা প্রমাণ করতে যে বহুল প্রচলিত উদাহরণগুলো দেওয়া হয় তার তেমন একটা নিয়ে কথা বলা যাক। তাহলে সরকারগুলোর পক্ষে কতটা কী করা সম্ভব সেটাও পরিষ্কার হবে।
ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হলে মুসলমানরা রাস্তায় বসে নমাজ পড়ে কেন? এসব বন্ধ হওয়া উচিৎ
ঠিক কথা। রাস্তা আটকে ধর্মাচরণ কোন কাজের কথা নয়। মুসলমানদের রাস্তায় নমাজ পড়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাস্তা আটকে পুজো প্যান্ডেল বন্ধ হওয়া উচিৎ, তাজিয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ, চারদিনের পুজোকে দশদিন অব্দি টেনে নিয়ে গিয়ে রাস্তাজুড়ে কানফাটানো ব্যান্ড পার্টি নিয়ে ভাসান বন্ধ হওয়া উচিৎ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কুম্ভমেলা থেকে শুরু করে দুর্গা ভাসানোর কার্নিভাল অব্দি সবকিছু বন্ধ হওয়া উচিৎ। স্কুলে সরস্বতীপুজো এবং নবীদিবস — দুটোই বন্ধ হওয়া উচিৎ। শুধু তাই নয়, রাস্তা জুড়ে, ট্রেনের কামরা জুড়ে গাঁজা খেতে খেতে জোয়ান লোকেদের তীর্থ করতে যাওয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ।
আমাদের বাংলায় তারকেশ্বরের মাথায় শ্রাবণ মাসে জল ঢালতে যায় যারা তারা অন্য সব যাত্রীরই মাথা কিনে নেয়। আপনি বয়স্ক হোন, অসুস্থ হোন, সাথে কোলের শিশু থাকুক বা অন্তঃসত্ত্বা মহিলা থাকুক, ওঁরা আপনাকে দয়া করে বসার জায়গা না-ও দিতে পারেন। ওখানে নিজের হিন্দু পরিচয় দিয়ে কোন খাতির পাবেন না। উপরন্তু দুর্গন্ধ এবং অনবরত ঢাকঢোলের আওয়াজে লিলুয়া থেকে হাওড়া যেতে মনে হবে সশরীরে নরকযাত্রা করছেন। এবং আর যাই করুন, ভুলেও শ্রাবণ মাসের শনিবারে শের শাহের করা গ্র‍্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে গাড়িতে চেপে কোথাও যেতে যাবেন না। বাবার ভক্তবৃন্দ গোটা রাস্তার দখল নিয়ে নেন। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বসে বিশ্রামও নিতে পারেন ইচ্ছা হলে। আর শব্দদূষণ যা হয় সেটাও বন্ধ হওয়া উচিৎ, আজানের মাইকের মতই। কিছু দিল্লীবাসীর কাছে শুনছিলাম কাঁওয়ারিয়ারা যেসব এলাকা দিয়ে হরিদ্বার যায় সেখানকার লোকেদের অভিজ্ঞতাও নাকি কতকটা এরকমই। তা যেসব রাজ্যে “মেকি ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার আছে তাদের কথা বাদই দিলাম। যেখানে “প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ” সরকার সেখানে এগুলো বন্ধ করে দেখান দেখি।
পারবেন না। কারণ সবচেয়ে উদার হিন্দুটিও গর্জে উঠে বলবে “আমার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।” তা যে সংখ্যায় কম তাকে আইন দেখাব, ধর্মনিরপেক্ষতা দেখাব আর যে সংখ্যাগুরু তার ধর্মাচরণ যেমন ইচ্ছা চলবে সেটা আর যা-ই হোক, গণতন্ত্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা তো নয়ই।
তাই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ইউরোপের মডেল অনুসরণ করে চলতে পারে না। ভারতে সরকারকে ধর্মগুলোর মধ্যে সমতা বজায় রাখার কাজে সক্রিয় হতেই হবে। একদেশদর্শিতাই সাম্প্রদায়িক, সমদর্শিতাই ধর্মনিরপেক্ষতা এদেশে।
সেই কারণেই সরকারের প্রধানের নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রদর্শনী সাম্প্রদায়িক। কারণ ব্যক্তি হিসাবে তিনি যা-ই হোন, তিনি শুধু নিজের ধর্মের মানুষের প্রধান নন, সব ধর্মের মানুষের প্রধান। সেইজন্যেই মমতার ইফতারে গিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়া এবং মোদীর দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতি অন্যায়। মমতা জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও ইচ্ছা হলে নিজের বাড়িতে দিনে পাঁচবার নমাজ পড়তেই পারেন, সেটা ব্যক্তি মমতার স্বাধীনতা। নরেন্দ্র মোদীও দুবেলা বাড়ির ঠাকুরকে পুজো করুন, কিচ্ছু এসে যায় না। কিন্তু প্রকাশ্যে একটা বিশেষ ধর্মাচরণ করে এই বার্তা দিতে পারেন না যে “আমি তোমাদেরই লোক”। সেটাই সাম্প্রদায়িকতা, ভর্তুকি দেওয়াটা নয়।

স্বপ্নসুন্দর

শেলী পড়েছি অনেক অনেক পরে। কিন্তু মহম্মদ রফির গান শুনতে শুনতেই বুঝেছি, যে গানগুলো সবচেয়ে বেশিদিন মনে থাকে, হৃদপিন্ডে জড়িয়ে থাকে শিরা, ধমনীর মত — সেগুলো বিষাদের গান, বিরহের গান

23sld12112934720.jpg

আমাদের বাড়িতে মামার দেওয়া একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। আমার স্কুলমাস্টার বাবার রোজগারে রেকর্ড কেনা বড় সহজ ছিল না। একমাত্র পুজোর মাসে নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে একটা দুটো লং প্লেয়িং রেকর্ড কেনা যেত। কিন্তু গান শোনা থেমে থাকত না তা বলে। পরিচিত বা প্রতিবেশীদের থেকে রেকর্ড চেয়ে এনেও গান শুনতাম সেইসময়।
একদিন একটা রেকর্ড চেয়ে আনল বাবা, খাপটার উপরে দেখি একটা হাসিমুখ, টাকমাথা লোকের ছবি। সেই রেকর্ডটা চালিয়ে একটা গানের আগে বাবা বলল “এই ছবিটা জানিস, আমি বাবার সাথে হলে গিয়ে দেখেছিলাম। একটা বিরাট পাথরের মূর্তি। তার সামনে বসে একটা লোক আকুল হয়ে গানটা গাইছে। গান শুনে পাথরের মূর্তিটার চোখ দিয়ে জল পড়ে। ওদিকে পাথরের মূর্তি কাঁদছে, এদিকে আমরা কাঁদছি।”
জানি না গল্পটার প্রভাবে নাকি গায়কের গুণে, গানটা শুনতে শুনতে আমারও চোখে জল এসে গেল। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি বাবারও চোখে জল। সেটা গান শুনে নাকি নিজের শৈশবস্মৃতি মনে করে, নাকি ঐ গানটা আর বাবার স্মৃতি অবিচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিল — সে বিচার করার মত বড় তখন আমি ছিলাম না। কিন্তু বেশ কয়েকবার শুনে আমার এত ভাল লেগে গেল গানটা যে প্রচন্ড বেসুরো গলায় গাইতে চেষ্টা করতে লাগলাম “ও দুনিয়া কে রখওয়ালে, সুন দর্দ ভরে মেরে নালে।”
তখন আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসতেন হিন্দমোটর কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিকরা। আমার বাংলা শিক্ষা তখনো হাসিখুশি দ্বিতীয় ভাগে না পৌঁছলেও তাঁদের সাথে বাবার কথোপকথন শুনে শুনে হিন্দি আমি বেশ বুঝতে পারি। ঐ রেকর্ডটাতেই আরেকটা গান ছিল যেটা আমার খুব পছন্দ হল। “কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা? ওয়ো কসম ওয়ো ইরাদা?” যতই হিন্দি বুঝি না কেন, প্রেম এবং তার প্রত্যাখ্যান বোঝার শক্তি তখন আমার মোটেও ছিল না। আসলে গায়কের গলার আওয়াজটাই বড্ড ভাল লেগে গেল। সেই ভাল লাগা নিয়ে মহম্মদ রফির সঙ্গে এতটা পথ।
শেলী পড়েছি অনেক অনেক পরে। কিন্তু মহম্মদ রফির গান শুনতে শুনতেই বুঝেছি, যে গানগুলো সবচেয়ে বেশিদিন মনে থাকে, হৃদপিন্ডে জড়িয়ে থাকে শিরা, ধমনীর মত — সেগুলো বিষাদের গান, বিরহের গান। চাপা কান্নায় বা উদগত অশ্রুতে রফির জুড়ি পাইনি।
স্মরণীয় গানে নিশ্চয়ই অনেকটা অবদান থাকে গীতিকার আর সুরকারের। কিন্তু আমার মত সঙ্গীতবোধহীন শ্রোতার মন জুড়ে থাকে শুধু মুখচোরা শিল্পীর মনোহরণ গলাটা। অল্প বয়সে প্রেমে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে তাই বারবার শুনতাম “এহসান তেরা হোগা মুঝ পর / দিল চাহতা হ্যায় ওয়ো কহনে দো”। সায়রা বানুর মুখে তখন দিব্য বসে যেত সেই মেয়েটির মুখ, কিন্তু স্বপ্নেও কন্ঠস্বরটা আমার হত না, মহম্মদ রফিরই থাকত।
ইদানীং বয়স দ্রুত বাড়ছে বুঝতে পারি। যদিও সন্ধের দিকে মেঘ করে এলে এখনো “দিওয়ানা হুয়া বাদল” মনে পড়ে অনিবার্যভাবে, আগেকার মত বাসে বোরখা পরা কোন সুন্দরীকে দেখলে চট করে “মেরে মেহবুব তুঝে মেরি মহব্বত কি কসম” মনে পড়ে না। তবে অবাক লাগে এই ভেবে যে দিনে পাঁচবার নমাজ পড়া এক মুসলমান কী করে পাথরের বিগ্রহ আর সেইসঙ্গে লক্ষ লক্ষ মূর্তিপুজোয় বিশ্বাসী শ্রোতাকে কাঁদাতে পারেন শুধু তাঁর কণ্ঠস্বর দিয়ে! এসব কি সত্যি ঘটেছিল, নাকি কোন চৈতালী রাতের স্বপ্নে আমাদের বাপ-ঠাকুর্দারা এসব দেখেছিলেন?

বড় দেশের দিন

আপনার যদি মনে হয় আমার ছেলে/মেয়ে ক্রিসমাস ক্যারল শিখে কেরেস্তান হয়ে যাবে, হলে সমূহ সর্বনাশ, তাহলে ঐসব স্কুলে পড়াবেন না। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে পড়াতে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুবছর আর প্রাথমিক শিক্ষার বছরচারেক বাদ দিলে আমার গোটা ছাত্রজীবন কেটেছে গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একজন সন্ন্যাসী। সেই স্কুলে আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন ছাত্রদের জন্য একটা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল যার বিষয় ছিল ‘ধর্ম কি কুসংস্কার?’ বিতর্ক প্রতিযোগিতার মত এতেও পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল এবং প্রথম হয়েছিল ক্লাস সিক্সের একটি ছেলে, যার মূল বক্তব্য ছিল “হ্যাঁ, আচারসর্বস্ব ধর্ম অবশ্যই কুসংস্কার।”

আমাদের স্কুলে দুর্গাপুজো হত, একেবারে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে।

এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পরে ভর্তি হলাম রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সদর দপ্তরের নাকের ডগায় থাকা কলেজে। সম্পূর্ণ আবাসিক কলেজ, যেখানে সকাল সন্ধ্যে হোস্টেলের ঠাকুরঘরে প্রার্থনায় বসতে হয়। যদিও ঠাকুরের আসনে তিনজন মানুষের ছবি আছে, তবু ব্যাপারটাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে কোনভাবেই চালানো যায় না। কারণ প্রার্থনায় রামকৃষ্ণ, সারদা, বিবেকানন্দ ছাড়াও হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা করা হয়। কিন্তু সেই প্রার্থনায় যাওয়া নিয়ে কোনদিন আমার সহপাঠী জাহির আর আমিনুলের মুখ ভার দেখিনি। স্পষ্টতই ওদের বাবা-মায়েদেরও এ নিয়ে কোন আপত্তি ছিল না। জাহির আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন হওয়ায় এ নিয়ে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। ও বলেছিল “আমার বাবা তো ঠাকুর দেবতা মানে না। তাছাড়া এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিসিপ্লিন, জেনেশুনেই তো এসেছি। আর আমি প্রার্থনায় বসে আমার ভগবানের কাছেও প্রার্থনা করতে পারি। কেউ তো আটকাচ্ছে না।” পরেও আমার সহপাঠী ইফতে খারুল, আসিফ, ইমরান, ইকবাল — এদের কাউকেই এ নিয়ে একটা শব্দও খরচ করতে দেখিনি, প্রার্থনায় যেতে ওদের কোনরকম আপত্তি আছে এমন মনে করবারও কোন কারণ ঘটেনি।

এত কথা বলবার কারণ বড়দিন পালন নিয়ে যে বদমাইশিটা শুরু হয়েছে সেইটা। বহু লেখাপড়া জানা হিন্দু, যাদের ধর্মপালন বছরে একবার বাড়িতে লক্ষ্মী, সরস্বতী বা কালীপুজো করায় সীমাবদ্ধ, পেটে বোম মারলেও এক লাইন শুদ্ধ সংস্কৃত বেরোবে না, তারাও গত কয়েকবছর ধরেই নিজেদের হিন্দু পরিচিতি সম্পর্কে দেখছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সচেতন হয়ে উঠেছে। “আমি গর্বিত যে আমি হিন্দু” বলাটা বেশ একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে বছরসাতেক হল। ভাবখানা এমন যেন ওকে কেউ বলেছে “এ মা, তুই হিন্দু? ছ্যা ছ্যা ছ্যা! দূর হ! এবার থেকে তুই আমার বাড়ি এলে আলাদা থালা বাসনে খেতে দেব।” অথবা হিন্দু বলে ওকে ট্রেন থেকে মেরে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা নতুন জায়গায় গিয়ে বাড়িভাড়া পাচ্ছে না। মজার কথা, এরকম গর্বিত হিন্দুরা আবার লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েকে খ্রীষ্টান মিশনারিদের স্কুলে ভর্তি করে। তাতে ক্ষতি নেই। বহুবছর ধরে ঐ স্কুল, কলেজগুলো এদেশে উচ্চমানের শিক্ষা দিয়ে আসছে, রামকৃষ্ণ মিশনের মতই। কিন্তু সমস্যা এই যে হিন্দু বাবা-মায়েদের এখন এক অদ্ভুত ধারণা হয়েছে “ওরা কায়দা করে নিজেদের ধর্ম প্রচার করছে।”

কি আশ্চর্য! এরা নাকি লেখাপড়া শিখেছে! আমার সন্তানকে আমি জেনেশুনে খ্রীষ্টান সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীদের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করলাম, তা তাঁরা তো সেভাবেই শিক্ষা দেবেন যেভাবে দেওয়া ভাল বলে তাঁরা মনে করেন। ওঁরা তো ওঁদের স্কুল কলেজের নিয়মকানুন গোপনও করেন না কখনো। ডন বসকো, অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ, লোরেটো বা সেন্ট জেভিয়ার্স তো আর হগওয়ার্টস নয় যে ভেতরে কী হচ্ছে বাইরের মাগল বাবা-মায়েরা জানতে পারে না। আপনার যদি মনে হয় আপনার ছেলে/মেয়ে ক্রিসমাস ক্যারল শিখে কেরেস্তান হয়ে যাবে, হলে সমূহ সর্বনাশ, তাহলে ঐসব স্কুলে পড়াবেন না। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে পড়াতে? আজ অব্দি তো শুনলাম না লিলুয়ার কোন বাবা-মা পুলিশে ডায়রি করেছেন যে তাঁদের বাড়ির ছেলেকে ফাদাররা জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ডন বসকোয় ভর্তি করেছে। বরং অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও সেখানে ভর্তি করতে পারলেন না বলে বিলাপ করতে শুনি বহু বাবা-মাকে।

তাহলে আর এস এস প্রোপাগান্ডায় এই নির্বোধের মত আত্মসমর্পণ করে কী প্রমাণ করছেন আপনি? নিজের হিন্দু পরিচিতি না উজবুক পরিচিতি?

স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে খ্রীষ্টান বানানোর প্রকল্প যদি মিশনারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর থাকত তাহলে কলকাতার সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে অ্যাদ্দিনে খ্রীষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেত বোধহয়। নিজের ধর্ম নিজের বুকের মধ্যে রাখুন, মাথায় উঠতে দেবেন না। সবাই জমিয়ে কেক খান, বড়দিনে আনন্দ করুন। না করলে ক্ষতি আপনার। আমি নাস্তিক কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর খিচুড়ি, ঈদের সেমাই, ছটের ঠেগুয়া বা ক্রিসমাসের কেক — কোনটাই ছাড়ি না। কেন ছাড়ব? এই যে নানা স্বাদ এটাই তো আমার দেশের মজা, এই মজা উপভোগ করার জন্যে মানুষ হওয়াই যথেষ্ট, বিশ্বাসী হওয়ার দরকার পড়ে না। আপনি যদি এর একটা খান, অন্যগুলো না খান সেটা আপনার ক্ষতি। সে তো লোকে প্যালারাম বাঁড়ুজ্জের মত আলু পটল আর সিঙিমাছের ঝোল খেয়েও বেঁচে থাকে। অমন বাঁচায় আনন্দ কই?

বড়দের ছেলেমানুষি

শিশুরা আর শিশু থাকছে না আজকাল। কারণ বড়রা থাকতে দিচ্ছে না

শিশুসুলভ আচরণ শিশুরা করলেই ভাল লাগে, তাই না? বড়রা তেমন করলে সবসময় যে হেসে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব তা নয়। অনেকসময় অসহ্য লাগতেই পারে। আর সত্যি কথা বলতে কি, বড়রা শিশুদের ভাল আচরণগুলো অনুসরণ করছে এমনটা কমই দেখা যায়, বেছে বেছে খারাপগুলোই করে। এব্যাপারে বড়দের ধারাবাহিকতা এমনই যে আমার তো সন্দেহ হয় আদৌ খারাপ আচরণগুলো শিশুদের নিজেদের মাথা থেকে বেরোয় কিনা। হয়ত সেগুলো তারা বড়দের থেকেই শিখেছে! অনেকক্ষেত্রে তো আমি নিশ্চিত যে ওগুলো তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটু উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে।
নার্সারিতে পড়ে তিনটে বাচ্চা মেয়ে। দুজন টকটকে ফরসা, একজন শ্যামবর্ণ। ফরসা দুজনের একজন আর শ্যামবর্ণ মেয়েটা রোগা প্যাটকা, অন্যজন গোলগাল। একজনের বাবা-মা চাকরিজীবী, দুজনের মা গৃহবধূ। একজনের বাবার ব্যবসা। মেয়ে তিনটে কিন্তু এসব কিছুই জানে না এবং জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। প্রত্যেকের কাছে অন্য দুজনের একটাই পরিচয় “বন্ধু”। এরকমটা বড়দের মধ্যে বড় একটা দেখা যায় কি? বড়রা তো বন্ধুত্বও পাতায় অনেককিছু বিচার করে। কেউ কেউ তো বামুন না কায়েত না শিডিউলড কাস্ট সেটাও বিচার করে।
এবার এই তিনজনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন একজনের বাবা-মা। কোন একদিন শ্যামবর্ণ মেয়েটার বাবার চোখে পড়ল গোলগাল মেয়েটা স্কুলে এসেছে বাবার গাড়ি চেপে। পত্রপাঠ মেয়েকে বোঝানো হয়ে গেল “ওর সাথে মিশবি না। ওরা অনেক বড়লোক, ওদের সাথে আমাদের মেলে না।” এরকম অযৌক্তিক যুক্তিকে ছেলেমানুষি ছাড়া কিছু বলা যায় কি? কিন্তু এটাকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই কারণ মেয়ে পরেরদিন স্কুলে গিয়ে তিন নম্বর বন্ধুকেও বুঝিয়ে দিল, গোলগাল মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করা উচিৎ নয়। অর্থাৎ বড়দের অন্যরকম মানুষকে এড়িয়ে চলা বা অকারণে শত্রু মনে করার যে অভ্যাস তা ঢুকিয়ে দেওয়া হল ছোটদের মধ্যে। গাড়ির মালিক হওয়ার কারণে অন্যদের ছোট করে দেখার কোন প্রবণতা যদি মেয়েটার বা তার বাবা-মায়ের মধ্যে দেখা যেত, তাহলে নাহয় ভাবা যেত মেয়ের বাবা তাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কোন প্রমাণ নেই।
আরেকটা উদাহরণ দিই।
ক্লাস ফাইভের দুটো মেয়ে। তারা একসাথে এক স্কুলে পড়ছে সেই নার্সারি থেকে। ভারী ভাব। একজন টুকটুকে, অন্যজন কুচকুচে। বড়রা কাউকে ফেয়ার এন্ড লাভলি মাখতে বলতেই পারে কিন্তু শিশুরা ওসব নোংরা ছেলেমানুষি করে না ফলে দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতেই পারে না এতগুলো বছর ধরে। অথচ সেই টুকটুকে মেয়েটা একদিন কুচকুচে মেয়েটাকে বলল “শোন, তুই না আমার পাশে বসবি না। তুই তো খুব কালো, আমার পাশে বসলে আমার রঙ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
এই ছেলেমানুষি এতবছর পরে মেয়েটার মাথায় এল কোথা থেকে বলুন দেখি, যদি বড়রা না শিখিয়ে থাকে?
শিশুরা আর শিশু থাকছে না আজকাল। কারণ বড়রা থাকতে দিচ্ছে না। আমাদের বড়রা এর চেয়ে অনেক ভাল ছিলেন। মানতেই হবে নিজেদের কুবুদ্ধিগুলো বড় হওয়ার আগেই আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন না। “অমুক মেয়ের সাথে মিশবি না কারণ তুই ফরসা আর ও কালো” বা “অমুকের বাবার গাড়ি আছে, তোর বাবার নেই। অতএব ও তোর বন্ধু হতে পারে না” এরকম বলতে আমার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের বাবা-মা — কাউকে শুনিনি। তাঁরা অবশ্য যারা ফেল টেল করে তাদের সাথে মেশা বড় একটা পছন্দ করতেন না, যারা ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হত তাদের মায়েরা কেউ কেউ কড়া নজর রাখতেন যাতে তারা আমাদের মত সাধারণ ছেলেপুলের সাথে না মেশে। কিন্তু তা বলে ছেলেমেয়েদেরই এসব বলতে শিখিয়ে দিতেন না। আর তাঁদের বাবা-মায়েরা সম্ভবত আরো উন্নত জীব ছিলেন কারণ আমার স্কুলমাস্টার বাবার কোন ক্লাসে একবারে না ওঠা অনেক বন্ধু আমৃত্যু ছিল।
আসলে বোধহয় তখনকার বাবা-মায়েরা পরীক্ষার নম্বর পাওয়ার সাথে মানুষ হওয়ার যে কোন যোগাযোগ নেই সেটা বুঝতেন, আমরা বুঝি না। আমাদের সময়ে এমন বেশকিছু ছেলেমেয়ের দেখা পাওয়া যেত যাদের সম্পর্কে ঠাট্টা করে বলা হত “যে ক্লাসে ওঠে সেখানেই শিকড় গেড়ে ফ্যালে।” আজকাল বোধহয় পাশ করা আরো সহজ হয়ে গেছে বলে খুব একটা কেউ ফেল করে না। কিন্তু তাতে কী? মনুষ্যত্বের পরীক্ষায় যে আমাদের ছেলেমেয়েরা অনবরত ফেল করে চলেছে। আমাদের সময়কার সবচেয়ে খারাপ ছাত্ররাও কিন্তু শিশু থেকে কিশোর হতে না হতেই পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে একটা দুধের শিশুকে খুন করে ফেলার কথা কল্পনাও করতে পারত না।
আবার বড়দের ছেলেমানুষি দেখুন — এই যেখানে অবস্থা সেখানে স্কুলে, বাড়িতে, টিভিতে ঘটা করে শিশু দিবস পালন করছে। নাকি এটার মানে হল “এই একটা দিন তোমাদের শিশু থাকার অনুমতি দিলাম। বাকি ৩৬৪ দিন বড়দের মত নোংরামো করতে হবে”?

শ্রদ্ধেয়

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ”

gulzar

নাইন কি টেনে পড়ার সময়ে একবার বাবার কাছে প্রচন্ড বকা খেয়েছিলাম একজন বাজে লোককে প্রণাম করার জন্যে। আসলে কোন এক গুরুজন আমাকে তার কিছুদিন আগেই বলেছিলেন “বয়সে বড় কারোর সাথে আলাপ হলে প্রণাম করবে।” বাবা একজনের সাথে আলাপ করানোয় আমি সেটাই করেছিলাম।

বাবা বাড়ি ফিরে বলেছিল “ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করা স্বভাবটা আবার তোর কবে হল? জানিস না শুনিস না, একটা অত্যন্ত নোংরা লোককে প্রণাম করলি আজকে। আলাপ না করিয়ে উপায় ছিল না তাই করিয়েছি। তা বলে প্রণাম করতে হবে? কক্ষনো প্রণামের যোগ্য কিনা না জেনে কাউকে প্রণাম করবি না।”

লৌকিকতার খাতিরে বাবার এই নির্দেশটা অনেকসময়ই মেনে উঠতে পারিনি, আজও পারি না। এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে সত্যিই প্রণাম করতে ইচ্ছা করে এমন অনেককে তো আবার প্রণাম করে উঠতে পারি না তাঁদের কাছে পৌঁছনোর যোগ্যতা নেই বলে, অতএব ব্যাপারটা হরে দরে একই হয়ে যায়।

তা সেরকমই একজন লোক গুলজার। যে বয়সে নিজে নিজে কবিতা পড়তে শিখেছি তার আগে থেকেই ফিল্মের গানের মধ্যে দিয়ে গুলজারের লেখা কানে ঢুকেছে। তখুনি মরমে পশেছে বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, তবে বরাবরই অন্য ফিল্মের গানের চেয়ে আলাদা কিছু যে শুনছি সেটা বোধ করতাম। সম্ভবত সেটা আমার বাবারই কৃতিত্ব। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দাদুর আমলের একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। তখন আমাদের যা সামর্থ তাতে পুজোর সময়ে জামাকাপড়ের সঙ্গে দু একখানা এল পি রেকর্ড কেনা হত, তার বেশি নয়। বাবা যার বাড়িতেই যেত, পছন্দের রেকর্ড দেখতে পেলে কদিনের জন্য চেয়ে আনত। “দো নয়না ঔর এক কহানি” আমার সেখান থেকেই পাওয়া। মনে আছে বাবা ঐ রেকর্ডটা শোনার সময়ে বলেছিল “মন দিয়ে শোন। কি আশ্চর্য কথা! তুঝ সে নারাজ নহি জিন্দগি, হৈরান হুঁ ম্যায়। একটা লোক জীবনের সঙ্গে কথা বলছে।” যত বড় হয়েছি, আরো গান শুনেছি, আরো কবিতা পড়েছি তত গুলজারের দাম আমার কাছে বেড়ে গেছে, ওঁকে আরো অন্তরঙ্গ মনে হয়েছে। ২০১২-তে যখন একটা চাকরি ছেড়ে অন্যটায় যোগ দিতে যাচ্ছি তখন অনুজ সহকর্মীরা ভালবেসে গুলজারের ‘Selected Poems’ আর ‘Neglected Poems’ আমার ঝুলিতে ফেলে দিল। সেই থেকে গুলজার আমার আরো আপন।

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ।” ফলে শঙ্খ ঘোষের কবিতা না পড়ে আর উপায় রইল না। কিন্তু তবুও বেশি পড়লাম ওঁর গদ্য। সমৃদ্ধ হলাম, কিন্তু তেমন টান তৈরি হল তা নয়। সেটা হল এই কয়েক বছর আগে, অগ্রজ সাংবাদিক অম্লানদার সাথে কথাবার্তায় আমার প্রিয় কবি জয় গোস্বামী বনাম ওর মতে “last of the great Bengali poets” শঙ্খ ঘোষ — এরকম একটা আবহাওয়া তৈরি হওয়ায়। এবারে তাঁর পান্ডিত্য ভেদ করে শঙ্খ ঘোষ একেবারে বুকে এসে বিঁধলেন। তবে হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই যে মানুষটা শুধুই কবি নন। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিরাশি বছর বয়সেও নিরপেক্ষ মনীষী হয়ে না থেকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে যে বক্তৃতাটা তিনি দিয়েছেন, সেটাই প্রমাণ করে তিনি প্রণম্য।

এই দুই প্রণম্যকে এক মঞ্চে কলকাতায় পাওয়া যাবে জানতে পেরেছিলাম ফেসবুকের দৌলতেই। ভাগ্যিস শনিবার — আমার কর্পোরেট দাসত্ব থেকে সাপ্তাহিক বিরতির দিন, নইলে এমন একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিতই থাকতে হত। উপলক্ষ বাংলায় গুলজারের প্রথম বই প্রকাশ। একটা বাঙালিদের সাথে ওঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ — পান্তাভাতে। অন্যটা তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ — প্লুটো।

নন্দনের বাইরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে প্রথমে গুলজার এলেন। এমনিতেই তিনি সেদিনের মধ্যমণি, তার উপর কবি হলেও বলিউডের তারকাচূর্ণ তাঁর সর্বাঙ্গে। সেই কারণে কলকাতার সাহিত্য আর সিনেমা জগতের তারকারা তাঁকে প্রায় এসকর্ট করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। সেই ভিড়েও দেখলাম ঠোঁটে সেই চিরপরিচিত “আধি অধূরি” হাসি। তার কিছু পরেই এলেন বাংলা ভাষার জীবিত কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ — শঙ্খ ঘোষ। তাঁকে ঘিরে কোন বলয় ছিল না। বিখ্যাত বাঙালিরা ততক্ষণে কে গুলজারের কত কাছে থাকতে পারেন সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন হলের ভেতরে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর মানুষটার অবশ্য আজও দেখলাম লাঠির প্রয়োজন হয় না। যাক সে কথা।

স্মরণীয় সন্ধের শুরুটা খুব সুখকর হয়নি। নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম বোধহয় ঠিক করতে পারছিল না কোশিশের সঞ্জীব কুমার হবে না আঙ্গুরের সঞ্জীব কুমার হবে। যারপরনাই টাকা এবং সময় খরচ করে ওখানে পৌঁছনো আমরা স্বভাবতই অধৈর্য। শঙ্খ ঘোষের ধৈর্যচ্যুতি হওয়া অবশ্য বেশ শক্ত ব্যাপার। মিনিট পাঁচেক মঞ্চে ছিলেন। বললেন “দেশে বিদেশে অনেককে পেয়েছি যারা গীতাঞ্জলি ইংরেজি অনুবাদে পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। কিন্তু ‘Gardener’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ পড়তে আগ্রহী হয়েছেন, তারপর নিজের উদ্যোগে বাংলায় পড়েছেন, এমন মানুষ গুলজার ছাড়া আর একজনও পাইনি… অন্য ভাষায় কাজ করেও তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁকে আমাদের খুব কাছের লোক বলে মনে হয়।”

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত অনেকের দৃষ্টিপথ জুড়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে একগাদা টিভি ক্যামেরা এবং তার চালকেরা। শঙ্খ ঘোষের শান্ত থাকার আবেদনে আমল দেওয়া তাই বেশ শক্ত হচ্ছিল। তাতেই অবশ্য টের পাওয়া গেল গুলজারের সম্মোহনী শক্তি। বইপ্রকাশ, পান্তাভাতের কিছুটা অনুলেখিকার পাঠ করা — এসব পেরিয়ে যখন তাঁর হাতে মাইক পৌঁছল, তখনো এক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে কিসব বলছেন একতলার দর্শকাসন থেকে। গুলজার প্রথমেই বেশ মোলায়েম অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন “ভাইসাব, অভি আপ চুপ হো যাইয়ে। অব মেরি বারি হ্যায়।”

গুলজার বললে কে-ই বা না শুনে থাকতে পারে!
এরপর তিনি অনেকের স্মৃতি রোমন্থন করলেন। সবচেয়ে মনে রাখার মত “মেরা কুছ সামান” গান তৈরি হওয়ার গল্পটা।

দীর্ঘ কবিতাটা লিখে নিয়ে গুলজার গেছিলেন রাহুল দেববর্মনের কাছে, সুর করে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। রাহুল দৈর্ঘ্যটা দেখেই উড়িয়ে দেন “এত বড় গান হয়! এরপরে কোনদিন টাইমস অফ ইন্ডিয়া নিয়ে এসে বলবে এটায় সুর দিয়ে দে।” তারপর কাগজটা টেনে নিয়ে পড়েন আশা এবং আপন মনে একটা সুর দিয়ে “লওটা দো” গেয়ে ওঠেন। সেটাই রাহুলকে উৎসাহিত করে হঠাৎ এবং কোলবালিশ আর হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে খানিকক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এদেশের শ্রেষ্ঠ মনখারাপ করা প্রেমের গানগুলোর একটা।

এইসব কথাবার্তার মাঝে নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম কখন গুলজারের বাধ্য হয়ে উঠেছে। তারপর সন্ধে যত এগোল, গুলজার ঝমঝমে দিনের ময়ূরের মত পেখম মেলতে শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করতে গিয়ে তাঁর অনুভবের কথা বললেন, কেন অকিঞ্চিৎকর প্লুটো তাঁর কবিতার বইয়ের নাম হয়ে উঠল সেকথা বললেন। এবং অবশ্যই কবিতা। এখন কীভাবে সব ছেড়ে কবিতা নিয়ে পড়ে আছেন সেকথা বললেন।

দেশের ৩২টা ভাষার ২৭৫ জন কবির কবিতা এ পর্যন্ত অনুবাদ করে সংকলিত করে ফেলেছেন, সংখ্যাটা আরো বাড়বে। এঁরা সবাই গুলজারের জীবনকালের মধ্যে লিখেছেন, এমন কবি। এখনো লিখছেন, এমন কবি। চুরাশি বছরের লব্ধপ্রতিষ্ঠ মানুষটা বললেন “এই সংকলনটা করতে গিয়ে আমি অনেক জানলাম, শিখলাম।” কী শিখলেন?

প্রথমত, মারাঠি, মালয়ালম আর বাংলা ছাড়া কোনো ভারতীয় ভাষায় এই মুহূর্তে ছোটদের জন্য কবিতা লেখা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, দেশের সেরা কবিতাগুলো লেখা হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভাষাগুলোয়। আর “কমপার্টমেন্ট মে জীনে কি আদত হো গয়ি হ্যায় ইস দেশ মে হামলোগোঁ কো। আসাম মে কুছ হোগা তো সির্ফ আসাম কে লোগ হি লিখেঙ্গে উস পর। সাউথ সে কোঈ নহি লিখেগা। দিল্লী সে কোঈ নহি লিখেগা।”

তবে সন্ধ্যের সেরা সময়টা এল আরো পরে, যখন গুলজার নিজের কবিতা পড়তে শুরু করলেন। প্লুটো নামের যে বইটা প্রকাশ হল, তাতে মূল কবিতার বাংলা অনুবাদগুলো বাঙালিদের লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত। গোটা দুয়েক পড়া হতেই ব্যাপারটা বুঝে গুলজার অনুবাদককে আর পড়ার সুযোগ দিলেন না। তারপর শুধু গুলজার আর তাঁর গুণমুগ্ধরা ছিলেন সেখানে। অনুপুঙ্খ বিবরণ অবশ্য বলবে বাংলার এক কবি, প্লুটোর অনুবাদক, পান্তাভাতের অনুলেখিকা, বলিউডের এক জনপ্রিয় সুরকার — এঁরাও উপস্থিত ছিলেন।
শুধু ‘সরহদ’ এর মত পরিচিত এবং গ্রন্থিত কবিতা নয়, সুদূর ব্যালকনি থেকে দেখলাম কাগজে লেখা টাটকা কিছু কবিতাও গুলজার আমাদের উপহার দিলেন। ভাবছেন বুঝি চারিদিকের নানা সংকট থেকে বিযুক্ত হয়ে গুলজার আর আমরা কয়েক ঘন্টার জন্যে পলাতক হয়ে গেছিলাম? তাহলে একেবারে শেষদিকে পড়া একটা কবিতা উদ্ধৃত করি:

উসনে জানে কিঁউ অপনে দাঁয়ে কন্ধে পর

নীল গায় কা ইক ট্যাটু গুদওয়া থা

মর জাতা কল দঙ্গোঁ মে,

অচ্ছে লোগ থে…

গায় দেখকে ছোড় দিয়া!!

এই অবিস্মরণীয় সন্ধ্যায় আমার আর গিন্নী তুলিরেখার এক পাশে ছিল স্নেহভাজন অর্ণব আর স্বাগতা, অন্য পাশে সস্ত্রীক প্রিয় মাস্টারমশাই শামিমবাবু। এমন দিনের বন্ধুদের ভোলা যায়!