মেঘে মেঘে

কয়েক বছর হল বর্ষাকাল এসে পড়লেই আতঙ্কে ভুগি — যদি এই বর্ষাই শেষ হয়! যদি আগামী বছর থেকে আমাদের জনপদে আর বৃষ্টি না হয়! যদি দেখতে দেখতে আমাদের সুজলাং সুফলাং জায়গাটা মরুভূমি হয়ে যায়!
ছোটবেলায় কত পাখির বাসা দেখেছি বাড়ির আশপাশের নানারকম গাছে। চড়াইয়ের বাসা, শালিকের বাসা, কোকিলের বাসা, কাকের বাসা। আর সবচেয়ে সুন্দর বাবুইয়ের বাসা। আজকাল তো আর দেখি না, আমার মেয়ের সাত বছর বয়স হয়ে গেল। ছবির বাইরে বাবুই পাখির বাসা তো সে দেখে উঠল না! কেমন দেখতে হাঁড়িচাচাকে? মেয়ে জানে কি? যখন আতঙ্ক মাথায় ওঠে, তখন ইতিউতি তাকিয়ে তত পাখি তো দেখি না যত আমার সাত বছর বয়সে দেখেছি! এভাবে পাখিরা যদি হারিয়ে যেতে পারে, বৃষ্টিও তো হারিয়ে যেতেই পারে! পারে না?
আমার আশঙ্কা এত তাড়াতাড়ি এত ভয়ানক সত্যি হয়ে উঠবে আমিও ভাবিনি। বৃষ্টিতে ভেজা আমার বড় প্রিয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেক সময় এমন মুহূর্তে বৃষ্টি নামে যখন কিছুতেই ভেজার উপায় নেই। তবু, প্রতি বর্ষায় অন্তত একবার ভিজে চুপচুপে না হয়ে আমি ছাড়ি না। গত কয়েক বছর প্রথম সুযোগেই ভেজার চেষ্টা করি। কেবলই আতঙ্ক — এই যদি আমার জীবনের শেষ বৃষ্টি হয়!
এবার বর্ষায়, কি সৌভাগ্য, সেদিন আমাদের নবগ্রামে ঠিক সন্ধ্যের মুখে আকাশ অন্ধ করে বৃষ্টি এল। ঠিক আমার ছুটির দিনটায়। ঐ দিন আমি বিকেল, সন্ধ্যের বিনিময়ে ভাত-কাপড়ের সংস্থান কিনতে নদীপারের শহরে যাই না। উল্লসিত হয়ে নেমে পড়লাম বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে। কড়কড়ে বাজের ধমক অগ্রাহ্য করে বৃষ্টির সাথে আমার নির্লজ্জ অভিসার। আশ মিটিয়ে ভিজে ঘরে ফিরেছি যখন তখনো ঝমঝমিয়ে রমরমিয়ে বৃষ্টি চলছে। ইউটিউবে চালিয়ে দিলাম “আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে।” আমার মতই একা একা উত্তমকুমার ভিজছেন আর লাজুক মাধবী গাছের তলায় বসে গাইছেন। সেদিন মাথা মুছতে মুছতে হৃষ্ট চিত্তে ভেবেছিলাম, যাক, আমরা এবারও বেঁচে গেলাম। আষাঢ়ের গোড়াতেই যখন এমন বৃষ্টি, তখন এ মরসুমে আর মরুভূমি দেখতে হচ্ছে না।
কিন্তু সেই শেষ। তারপর হপ্তাদুয়েক হয়ে গেল, বৃষ্টির আর দেখা নেই। অথচ আকাশে মেঘ আছে, মাঝে মাঝে সূর্যকে ম্লান করে দিয়ে আশা জাগিয়েও ব্যালে নাচের সুন্দরীদের মত হালকা সেসব মেঘ মঞ্চ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একদিন সকালের দিকে জানলার দিকে চোখ পড়তেই দেখি আকাশের বেশ মাজা রঙ হয়েছে আর ছিটেফোঁটা ঝরছেও বটে। ভাবলাম এই বুঝি প্রতীক্ষার অবসান হল। সবে গুনগুন শুরু করেছি, মেয়ে আমার ফিসফিসিয়ে বলল “বাবা, এখনই গেয়ো না। ভাল করে শুরু হোক আগে।” আমল দিচ্ছিলাম না, কিন্তু মিনিট খানেকের মধ্যেই দেখলাম সাঁইত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে সাত বছরের আশঙ্কাই বেশি সত্যি। বৃষ্টি থেমে গেল।
সেই থেকে আকাশে মেঘ দেখে অদ্ভুত পীড়া হচ্ছে। কখনো ভাবিনি ঘন নীল আকাশ আর কাশফুলের মত মেঘ দেখে একদিন বিরক্তি আসবে, কান্না পাবে, চেপে রাখা আশঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠবে।
মধ্যরাত পেরিয়ে যখন নির্জনে বাড়ি ফিরি সেই সময় বালি ব্রিজের উপর ভেসে চলা কিছু কৃশকায় মেঘের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানালাম। বললাম “কেরালায় এত বৃষ্টি, হিমাচলে, অরুণাচলে, আসামে, বিহারে, এমনকি উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা বানভাসি আর তোমরা কিনা উড়ে বেড়াচ্ছ, একফোঁটা বৃষ্টি নেই ভাগীরথীর এপারে ওপারে? কিসের অভাব তোমাদের? কী পেলে মোটাসোটা হয়ে ঝরে পড়ে একটু শান্তি দেবে?
কি বেইজ্জত যে হতে হল কী বলব। তারা বলল “যা চাই তা পারবে দিতে? তোমাদের তো আদ্ধেক পুকুর চুরি হয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোতে সক্কলে মিলে আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলে মজিয়ে ফেলেছ। গাছ যা ছিল সেসবও সাফ করে কংক্রিট দিয়ে সৌন্দর্যায়ন করেছ। বলি জলীয় বাষ্প কই যে খেয়ে দেয়ে মোটা হব? আমরা কি তোমার বাথরুমের শাওয়ার নাকি, যে ইচ্ছে মত খুললেই জল পড়বে?”
মাথা নীচু করে শোনা ছাড়া উপায় ছিল না। অপমান হজম করে নিয়ে বললাম “তাহলে কি কোনদিন আর আমাদের ছোটবেলার বর্ষা ফেরত পাব না?” তারা হাত উল্টে বলল “সে কথা কি বলা যায়? মৌসুমীর কখন কী মর্জি হবে সে তো আর আমরা বলতে পারি না। সে আমাদের মালকিন বলে কথা। তবে বাপু যা চাইবে ভেবে চেয়ো। কোন বছর আমরা প্রাণ ভরে ঢাললে তো আবার তোমরা এক গলা জলে হাবুডুবু খাবে। জল উপচে পড়ার জায়গাগুলো তো আর কিছু রাখোনি।”
কোন মতে বললাম “তাহলে উপায়? হয় অনাবৃষ্টি নয় অতিবৃষ্টি — এই কি আমাদের ভবিষ্যৎ? আমার মেয়ের তবে রাস্তার জলে কাগজের নৌকো ভাসানো হবে না? বড় হয়ে মাধবী হওয়া হবে না?”
“কালবেলা তো নিজেরাই ডেকে এনেছ। এখন শঙ্খবেলা চাইলে হবে বাছা?” বলতে বলতে তারা কোন দিকে যে উড়ে গেল রাতের অন্ধকারে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

Advertisements