আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

সাহেবরা বলে থাকে রোম একদিনে তৈরি হয়নি। মমতা ব্যানার্জিকে নিরলস সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার দিয়ে মানুষকে হাসির খোরাক জোগানোও একদিনে হয়নি। একে সাহিত্যের অপমান বা সাহিত্যিকদের অপমান – যা-ই বলুন, ঘটনাটি কিন্তু ধারাবাহিকতা মেনে ঘটানো হয়েছে। ২০১৮ সালকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ প্রায়শই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কারণ ওই বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। যেভাবে এই কাণ্ড ঘটানো হয় তাতে পশ্চিমবঙ্গে আর গণতন্ত্র অবশিষ্ট ছিল না বলে বিরোধীরা অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু রাজ্যের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যাঁদের আগ্রহ আছে তাঁদের একইসঙ্গে খেয়াল থাকা উচিত, মনোনয়ন পর্বের হিংসা নিয়ে শঙ্খ ঘোষের কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে তৃণমূলের বীরভূম জেলার নেতা অনুব্রত মণ্ডল কবিকে কোন ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।

“বড় বড় কথা বলছেন কবি? এ কোন কবি? আমরা তো কবি বলতে জানতাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। এ কোন নতুন কবি উঠে এসেছেন, যে আমার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন। কবির নাম শঙ্খ রাখা ঠিক হয়নি, শঙ্খ নামের অপমান করেছেন উনি। এখনও বলছি, রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে।”

আনন্দবাজার পত্রিকার ১০ মে ২০১৮ তারিখের সংস্করণে এই প্রতিবেদনের সঙ্গেই ছিল আরেকটি প্রতিবেদন, যেখানে অনুব্রতর আক্রমণ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনদের মতামত প্রকাশিত হয়েছিল। যাঁরা মত দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির দুই বর্তমান সদস্য – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও জয় গোস্বামী। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কথা যদি সত্যি হয় (মিথ্যে বলে মনে করার কোনো কারণ ঘটেনি, যেহেতু সে কথার কোনো প্রতিবাদ হয়নি এখনো), তাহলে মমতা ব্যানার্জিকে আকাদেমির সর্বপ্রথম রিট্রিভারশিপ (নাকি সাবভার্সিভ? বলতে গিয়ে ভুল হয়েছে?) পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তে এঁদেরও সম্মতি ছিল। কী বলেছিলেন সেদিন ওই দুজন? শীর্ষেন্দুর বক্তব্য ছিল “এটা রাজনৈতিক চাপানউতোর। আমি যেহেতু রাজনীতি করিনা, তাই এ নিয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।” আর জয় বলেছিলেন “পঞ্চাশের দশক থেকে অপ্রতিহত গতিতে কবিতা লিখছেন শঙ্খ ঘোষ। তিনি আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। এ রকম একজন সম্পর্কে যদি কেউ এ কথা বলেন, তবে কবিতা সম্পর্কে তাঁর কোনও বক্তব্যে মাথা না ঘামানোই ভাল। তাঁর কোনও কথাকে গুরুত্ব দেওয়াই উচিত নয়।”

অর্থাৎ বাংলার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবিকে শাসক দলের একজন পদাধিকারী গুন্ডা ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সেটা শীর্ষেন্দুর কাছে রাজনৈতিক চাপান উতোর। যেন শঙ্খ ঘোষ বিরোধী দলের একজন নেতা, সাহিত্য জগতের কেউ নন। অতএব প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দুর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার দায় নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রিয় শব্দ আছে – দলদাস। শব্দটি কোনো অজ্ঞাত কারণে শুধুমাত্র বাম দলের সাথে যুক্ত মানুষজনের জন্যই ব্যবহার করা হয়। নইলে দলদাসত্বের এমন চমৎকার উদাহরণ চোখ এড়াত না। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক অবস্থান নিলাম, অথচ বললাম আমি রাজনীতি করি না। ভাষার এমন চাতুর্য একমাত্র শীর্ষেন্দুর মত উচ্চাঙ্গের কথাশিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।

জয়ের মন্তব্যটিও অতুলনীয়। শঙ্খ ঘোষের মহানতা কোথায়? প্রথমত, অর্ধ শতকের বেশি কবিতা লেখায়। দ্বিতীয়ত, দুটি বড় বড় পুরস্কার পাওয়ায়। অর্থাৎ যদি পনেরো-বিশ বছর কবিতা লিখছেন, কোনো পুরস্কার পাননি – এমন কবি সম্পর্কে অনুব্রত কথাগুলি বলতেন তাহলে তেমন দোষ হত না। তাছাড়া দোষ হয়েছে বলেও জয় মনে করছিলেন কিনা বোঝার উপায় নেই, কারণ তিনি বলছেন যে লোক কবিতা বোঝে না তার কথায় গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না। অর্থাৎ কথাগুলি কে বলছে তার কোনো গুরুত্ব নেই। জয় এমন এক স্বপ্নলোকে বিচরণ করেন যেখানে ক্ষমতা নেই, ক্ষমতার বিন্যাস নেই। কেবল দু দল মানুষ আছে – এক দল কবিতা বোঝে, আরেক দল কবিতা বোঝে না। যারা বোঝে না তাদের মধ্যে কে কী বলল তা নিয়ে না ভাবলেই মিটে গেল। অর্থাৎ সেদিন পশ্চিমবঙ্গের গদ্য আর পদ্য সাহিত্যের দুই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শিল্পী অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলেন। সাহিত্য যে অতি খেলো ব্যাপার – এ কথা পশ্চিমবঙ্গে সেদিনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর একটি গল্পে ভজহরি নামে এক চাকরের কথা আছে। একদিন বাড়িতে চোর এল, ভজহরি ঠিক করল ব্যাটাকে ধরতে হবে। সে মাথায় শিং বেঁধে, লেজ পরে উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার ধারণা চোর তাকে ছাগল মনে করে চুরি করতে আসবে, অমনি সে চোরকে জড়িয়ে ধরবে। চোর এল, ঘরে ঢুকল, ভজহরি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু বলল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর সব জিনিসপত্র বার করে এনে নিশ্চিন্তে পুঁটুলি বাঁধল, ভজহরি কেবল আওয়াজ করল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর চুরির মাল নিয়ে আস্তাকুঁড় পেরিয়ে ছুটে পালাল, ভজহরি হেসে খুন। বলল “ব্যাটা কি বোকা, আস্তাকুঁড় মাড়িয়ে গেল, এখন বাড়ি গিয়ে স্নান করতে হবে!” নিজেদের বুদ্ধি সম্পর্কে ভজহরিসুলভ মুগ্ধতায় আকাদেমির সম্মানীয় সদস্যরা নিজেদের, বাংলা আকাদেমির এবং বাংলা সাহিত্যের বিশ্বাসযোগ্যতার বারোটা বাজালেন।

এমনিতে বাঙালি চিরকাল গুণ এবং গুণীর দারুণ কদর করে এসেছে বললে ডাহা মিথ্যা বলা হবে। বাঙালি বরাবরই স্বীকৃতির কাঙাল এবং হুজুগে মাততে পছন্দ করে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বিশ্বভারতী গড়ে তুলতে বাঙালিরা তাঁকে একটি পয়সা দিয়ে সাহায্য করেনি, শুধু মোহিত সেন নামে এক অধ্যাপক এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। অথচ মৃত্যুর পর স্যুভেনির হিসাবে সেই লোকের দাড়ি ছিঁড়ে নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। পথের পাঁচালী বিদেশে সম্মানিত না হলে সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও আমরা গদগদ হতাম কিনা সন্দেহ। এ বিষয়ে সেরা উদাহরণ অবশ্য মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অবিস্মরণীয় রিপোর্টাজে লিখেছেন, মাণিক যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন কেউ তাঁর খবর নেয়নি। অথচ মারা যাওয়ার পর ফুলে ফুলে ঢেকে যাওয়ার জোগাড়। সে দৃশ্য নিজে চোখে দেখেছিলেন বলেই বোধহয় সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ফুল জমে জমে পাথর হয়। এতকিছু সত্ত্বেও বাঙালি গুণীদের মধ্যে ক্ষমতার প্রসাদ পাওয়ার জন্য এ হেন কাতরতা, যা-ই ঘটুক তা মুখ বুজে মেনে নেওয়ার এমন ব্যগ্রতা নিঃসন্দেহে অভিনব। সুভাষ নিজে বামপন্থী হয়েও বামফ্রন্ট সরকারের পেয়ারের লোক ছিলেন না। মৃত্যুর পর বরং মমতা ব্যানার্জি তাঁকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেছিলেন। শঙ্খ ঘোষ কংগ্রেস আমলে তাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, বাম আমলে সিপিএম নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক সত্ত্বেও নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পর মিছিলে হেঁটেছিলেন। তফাতের মধ্যে তাঁকে দলে টানতে বিমান বসু তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন, ব্যর্থ হওয়ার পরেও “এ কোন কবি” বলেননি।

অল্পবয়সী, কম বিখ্যাতদের স্বীকৃতির লোভ তবু বোঝা যায়। সারাজীবন পাঠক, সমালোচকদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া এবং গত এক দশকে ফণিভূষণ, মণিভূষণ, বিধুভূষণে ভূষিত কৃতীরা কিসের অনুপ্রেরণায় নিজের সাধনার চরম অসম্মানেও রা কাড়েন না – সে এক রহস্য। কিন্তু সে রহস্য বাদ দিয়েও পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং কোন পথে চলেছে তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি করে দিল মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার প্রদান। নিজেদের অজান্তে এই কাজটি করার জন্য হয়ত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। কারণ বাংলার লেখক, প্রকাশক, পাঠক গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে বিলক্ষণ ভালবাসেন। নিজেদের দোষত্রুটি নিয়ে ভাবতে কেউ রাজি নন। বাংলা সাহিত্য একদিনে এতটা খেলো হয়নি। এই সুযোগে এ বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

রত্না রশিদ বলে এক সাহিত্যিক মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদে নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন বলেছেন। তাতে তৃণমূল কংগ্রেস মুখপাত্র দেবাংশু ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়ার কাটাছেঁড়া করলেই অনেকগুলি দিক বেরিয়ে আসবে। রত্নাকে ফালতু প্রমাণ করতে দেবাংশুর প্রথম যুক্তি, মমতা ব্যানার্জির বই বেস্টসেলার আর রত্নার বন্ধুবৃত্তেরও নব্বই শতাংশ লোকই তাঁর বইয়ের নাম বলতে পারবে না।

প্রথমত, বাংলার প্রকাশনা জগতের সার্বিক অডিট কে করে? একটি বই কত কপি বিক্রি হলে বেস্টসেলার হয়? আরও বড় প্রশ্ন – বেস্টসেলার মানেই ভাল সাহিত্য, এমনটা কে ঠিক করল? রত্নার বইয়ের নাম কজন জানেন তা দিয়ে কেন ঠিক হবে তিনি কেমন লেখেন? দেবাংশু মমতা ব্যানার্জির দলের লোক, তাই এই পুরস্কার প্রদানের পক্ষ নিয়ে যা পেরেছেন বলেছেন – এই যুক্তিতে তাঁর কথাগুলি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ বেস্টসেলার মানেই ভাল – এ ধারণায় আজকাল বেশিরভাগ পাঠক ভোগেন। প্রকাশকদের মধ্যেও বেস্টসেলার প্রকাশ করার হুড়োহুড়ি। বিপ্লব করে ফেলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাজারে নামা অনেক ছোট প্রকাশকও চটজলদি রোজগার এবং প্রকাশনা জগতে নাম করার তাগিদে জনপ্রিয় ফেসবুকারদের প্রচুর লাইক পাওয়া পোস্ট একত্র করে বই প্রকাশ করছেন। বেস্টসেলার বই করার তাগিদে কবিরা নিভৃতে সারস্বত সাধনা করার বদলে ফেসবুকেই পরের পর কবিতা প্রকাশ করছেন। এমনকি সাংবাদিকদের মত ঘটনাভিত্তিক কবিতা লিখছেন। বিখ্যাত মানুষদের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে কবিতা; কেউ মারা গিয়ে শ্মশানে পৌঁছবার আগেই কবিতা। সম্পাদনা রুগ্ন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা লেখা হয় সবই প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। ভুল, ঠিক বলে আর কিছু নেই। বিশিষ্ট লেখকদের পুরনো বইয়ের যেসব নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের প্রকাশনা সংস্থা থেকে, সেগুলিতে নতুন নতুন বানান ভুল, যতিচিহ্নের যথেচ্ছ অন্তর্ধান এবং আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে।

এর বিপরীতে ‘যাহা বেস্টসেলার, তাহাই বর্জনীয়’ ব্রিগেডও আছে। কোনো লেখকের বই ভাল বিক্রি হচ্ছে জানলেই তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যান ওটি আদৌ সাহিত্য নয়। বেস্টসেলার আর লিটারেচার দুটি পৃথক বস্তু – এমন অভূতপূর্ব তত্ত্বও উঠে আসছে। শতাধিক বছরের শেক্সপিয়র চর্চা এই ফল দিচ্ছে জানলে গিরীশ ঘোষ, উৎপল দত্তরা কী করতেন কে জানে! অর্থাৎ প্রকারান্তরে বেস্টসেলার বিরোধীরাও বেস্টসেলার হওয়া বা না হওয়াকেই উৎকর্ষের মাপকাঠি বলে ধরছেন। এভাবে যে ভাষার সাহিত্য চলে, সেখানে আকাদেমি, পুরস্কার – এসব নিয়ে তো ভূতে ফুটবল খেলবেই।

দেবাংশু তাঁর পোস্টে এরপর যা লিখেছেন তা আরও গুরুতর। তিনি লিখেছেন ২০২১ সালে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় না ফিরলে বাংলায় এন আর সি হত, রত্না রশিদকেও ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হত ইত্যাদি। অর্থাৎ মমতা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকেছেন, তাই তাঁর সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্য। মানে সাহিত্য এমন একটি বিষয়, যার পুরস্কার আদৌ সাহিত্যচর্চা না করেও পাওয়া যেতে পারে। কোনো পুলিসকর্মী হয়ত ভাল গুন্ডা দমন করেন, তার পুরস্কার হিসাবেও সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। এই যে সাহিত্যকে একটি বিশেষ কাজ, বিশেষ শৃঙ্খলা হিসাবে না ভাবা – এটিও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখন দারুণ ‘কুল’। ২০১৪ সালে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হোক কলরব আন্দোলন চলছিল, তখন বাংলার সাংবাদিক কুলচূড়ামণি সুমন চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকে লিখেছিলেন যাদবপুর এমন একটি জায়গা, যেখানে তুলনামূলক সাহিত্যের মত অর্থহীন বিষয় পড়ানো হয়। তিনি তবু সাহিত্যের বাইরের লোক, ইদানীং কবিরাও “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি” বললে রেগে যান। চিরকাল গরীব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ নিজেদের মত করে গান বাঁধেন, ছড়া কাটেন, শিল্প সৃষ্টি করেন – এই যুক্তিতে যে কেউ কবি হতে পারে এই যুক্তি দেওয়া হয়। যেন গরীব, খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে যাঁরা এসব করেন তাঁদের সৃজনে কোনো অধ্যবসায় নেই, কোনো শৃঙ্খলা নেই। যাঁরা ছৌ নাচেন তাঁদের যেন নাচ শিখতে হয় না, যেমন তেমন লম্ফঝম্প করলেই চলে। যাঁরা পটশিল্পী তাঁদের গল্পটি সযত্নে গড়ে তুলতে হয় না, ছবিগুলি ভেবেচিন্তে আঁকতে হয় না।

স্বতঃস্ফূর্ততা বলে এক আজব ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যা কেবল কবিরা নয়, যাঁরা গল্প, উপন্যাস লেখেন তাঁরাও একমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। মনে যা এল তা-ই ঝটপট লিখে ফেলা যদি কবিতা বা সাহিত্য হয়, তাহলে সত্যিই মমতার “এপাং ওপাং ঝপাং”-কে কবিতা বলে স্বীকার করতে আপত্তি করা চলে না। অন্নদাশংকর রায়ের সৃষ্টি ছড়া আর মমতা ব্যানার্জির লেখা ছড়া নয়, তার সবচেয়ে বড় কারণ (আর কোনো কারণ দর্শানোর আদৌ প্রয়োজন নেই) যে প্রথমটিতে ছন্দ আছে, দ্বিতীয়টিতে ছন্দের হদ্দমুদ্দ হয়েছে – এ কথাও বলা উচিত নয়। কারণ ছন্দ তো স্বতঃস্ফূর্ত নয়, রীতিমত মাত্রা হিসাব করে অঙ্ক কষে মেলাতে হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর যখন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাব্যপ্রতিভা প্রকাশ পেয়েছে, তখন থেকে তাঁর লেখা এবং তদনুরূপ লেখা কবিতা হচ্ছে না বললে বা ব্যঙ্গ করলেই বলা শুরু হয়েছে, কবিতা লেখা কি ভদ্রলোকদের মনোপলি নাকি? সবার অধিকার আছে কবিতা লেখার। অর্থাৎ কবিতাকে ভদ্রলোক বনাম সাবল্টার্নের রণভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। রাজধানী নিবাসী, বরাবর ক্ষমতার বৃত্তে থাকা ব্রাহ্মণকন্যা কী করে সাবল্টার্ন হন সে প্রশ্ন থাক। কিন্তু সাবল্টার্ন হলেই যে যা-ই লিখুক তাকেই কবিতা বলতে হবে, এমনটা কি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক লিখেছেন? স্বীকার্য যে কবিতার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। এমনকি অ্যান্টি-পোয়েট্রি বলেও একটি জিনিসের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ব্যাকরণ ভাঙতে গেলে আগে তো ব্যাকরণ শিখতে হয়, সে ব্যাকরণ ভদ্রলোকদের তৈরি হলেও।

এসব বললে রে রে করে তেড়ে আসার মত লোক এখন পশ্চিমবঙ্গে কম নেই। এই ক্ষতির তুলনায় মুখ্যমন্ত্রীর হাতে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেওয়া সামান্য ক্ষতি। বস্তুত, ওই ক্ষতিগুলো আটকানো গেলে হয়ত এই ক্ষতি দেখতে হত না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

আরও পড়ুন

পূজার ছলে তোমায় ভুলে

প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

হুগলি জেলায় বসে এই লেখা শুরু করার সময়ে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই বৃষ্টি হবে দক্ষিণবঙ্গে। সেইসঙ্গে কমবে তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহও স্তিমিত হবে। সত্যি কথা বলতে, এমনটা যে হবে তা আলিপুর কদিন ধরেই বলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার যাঁরা ভাগ্যনিয়ন্তা তাঁরা হয় আবহাওয়াবিদ্যার উপর জ্যোতিষশাস্ত্রের চেয়ে বেশি ভরসা করেন না, অথবা কোনো কারণে স্কুলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার ভীষণ তাড়া ছিল। নইলে ২৭ এপ্রিল (বুধবার) নবান্নে তাপপ্রবাহ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরেই ২ মে (সোমবার) থেকে গরমের ছুটি শুরু করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

গত কয়েক দিনে শিক্ষামন্ত্রকের দুটো সিদ্ধান্ত খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। প্রথমটা গরমের ছুটি এগিয়ে আনা, দ্বিতীয়টা কলেজে ভর্তি কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে করা। কয়েক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকের ফল বেরোবার পর কলেজে ভর্তি নিয়ে চমকপ্রদ সব কাণ্ড হয়েছিল। পরীক্ষায় যত নম্বরই পান না কেন, তৃণমূল ছাত্র পরিষদকে মোটা টাকা প্রণামী না দিলে কলেজে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না – এমন অভিযোগ উঠেছিল। পছন্দের বিষয়ে অনার্স নিতে গেলে কোথাও কোথাও ৪০-৫০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, এমনও শোনা যাচ্ছিল। তারপর চালু হয় কলেজের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভর্তি। কারণ এ দেশে গত দুই দশকে দুর্নীতির একমাত্র সমাধান হিসাবে জনপ্রিয় হয়েছে অনলাইন ব্যবস্থা, সে ব্যবস্থা সকলের নাগালের মধ্যে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করলে লোকে বোকা এবং সেকেলে বলে। কিন্তু বোধহয় সে ব্যবস্থাও দুর্নীতিমুক্ত করা যায়নি, তাই এবার সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভর্তি হবে শোনা যাচ্ছে। যতক্ষণ না ব্যাপারটা চালু হচ্ছে ততক্ষণ এর অসুবিধাগুলো জানা যাবে না। ফলে এই মুহূর্তে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাই সংবাদমাধ্যমেও তাঁদের প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটা করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মজার কথা, গরমের ছুটি এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁরা কী ভাবছেন তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের উৎসাহ তুলনায় কম। কারণটা সোশাল মিডিয়া দেখলেই দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তে পুরোপুরি খুশি হয়েছেন এমন কাউকে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। বলা বাহুল্য, অফলাইন প্রতিক্রিয়াও খুব আলাদা হবে না। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত সাবধানী। প্রতিবেদনের শেষ প্যারায় “অমুক শিক্ষক সংগঠন বলেছে এতে তমুক অসুবিধা হবে। কিন্তু তমুক শিক্ষক সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে” লিখেই ক্ষান্ত দিচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে এমনিতে শিক্ষাবিদের ছড়াছড়ি। অনেকে এত বিদ্বান যে শিক্ষা ছাড়াও নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত খবরের কাগজের উত্তর-সম্পাদকীয় স্তম্ভে লিখে থাকেন। কারো কারো মতে এ রাজ্যের সাধারণ মানুষ কাকে ভোট দেবেন তা-ও এঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। অথচ কোভিডের প্রতাপে প্রায় দু বছর বন্ধ থাকার পর খোলা স্কুল, কলেজ ফের টানা দেড় মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেল – এ নিয়ে শিক্ষাবিদদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন কয়েক মাস আগে পথে নেমেছিল স্কুল, কলেজ অবিলম্বে খোলার দাবিতে। যখন খুলে গেল, তখন একে আন্দোলনের সাফল্য বলেও সোচ্চারে দাবি করেছিল। এখন পর্যন্ত তারাও চুপ। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক সংগঠনগুলোর কী অবস্থা তা নিয়োগ থেকে বদলি – সব ক্ষেত্রে শোষিত মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের একলা লড়াই বা অস্থায়ী অরাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করে লড়াই করা দেখলেই টের পাওয়া যায়। যে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি বাম আমলে এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছিল যে অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত বাজেট বক্তৃতায় সরকারি বেতন পাওয়া মাস্টারদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করার নিদান দিয়েও পরে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সমিতির অস্তিত্ব এখন টের পাওয়া যায় কেবল সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে। তা সেই সমিতি বলেছে আপাতত সাতদিনের ছুটি দিয়ে পরীক্ষা ইত্যাদি আশু কাজগুলো শেষ করে নিয়ে তারপর ছুটি দিলে ভাল হত। আরও দু-একটি শিক্ষক সংগঠন ক্ষীণ স্বরে এরকম নানা পরামর্শ দিয়েছে। মমতা ব্যানার্জির সে পরামর্শ শুনতে বয়ে গেছে। তিনি অবিসংবাদী জননেত্রী, তিনি যখন মনে করেছেন এই গরমে স্কুল করা যায় না, তখন যায় না।

গত বছর অতিমারীর কারণে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়নি। এ বছরের মাধ্যমিক শেষ করা গেছে, উচ্চমাধ্যমিকেরও লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে নবান্নের সভার দিন। কিন্তু একাদশ শ্রেণির প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শুরু হওয়ার কথা ছিল আজ থেকে। সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে সেসব মাথায় রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। স্কুলের পরীক্ষা আর বোর্ডের পরীক্ষা গুরুত্বের দিক থেকে এক নয় – এমনটা ভাববার কী-ই বা দরকার? ঠিক দুটো অনুচ্ছেদের সরকারি নির্দেশে ছুটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাতিল পরীক্ষাগুলো কবে হবে না হবে তা নিয়ে একটা শব্দও খরচ করা হয়নি। ক্লাস ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের এই শিক্ষাবর্ষের প্রথম সামেটিভ পরীক্ষা ৭ মের মধ্যে শেষ করতে হবে – সরকারি নির্দেশ ছিল। সে নির্দেশও চোখের পলকে বাতিল হল। মানে যে ছেলেমেয়েরা কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি সেই ২০২০ সাল থেকে, তাদের প্রথম পরীক্ষাটাও বাতিল হল। নিজের নির্দেশ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিল সরকার নিজেই। এসব অবশ্য ইদানীং প্রায়ই হয়। এমনকি আগের নির্দেশের সাথে পরের নির্দেশের সাযুজ্য বজায় রাখার প্রয়োজনও বোধ করে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অনেকসময় সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী যা বলেন, কয়েক ঘন্টা পরের সরকারি সার্কুলারেই তা বেশ খানিকটা বদলে যায়।

যাক সে কথা। লক্ষ করার মত বিষয় হল, এই হঠাৎ ছুটিতে পড়াশোনার যে ক্ষতি হবে সরকার তা বোঝে না এমন নয়। বোঝে বলেই বলা হয়েছে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চলতে পারে। এমনিতেই বহু বেসরকারি স্কুল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশ মেনে গরমের ছুটি শুরু করছে না বলে জানিয়েছে। তারা কেউ কেউ অত্যধিক গরমের কারণে অনলাইন ক্লাস নেবে। আইসিএসই, সিবিএসই-র অধীন স্কুলগুলোর পরীক্ষাও চলবে। তার মানে দেড় মাস লেখাপড়া বন্ধ থাকবে শুধু পশ্চিমবঙ্গের সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীদের। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও যাদের পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব নয় তারা বঞ্চিত হবে। সুতরাং অতিমারীর সময়ে যে ডিজিটাল বিভাজন শুরু হয়েছিল, সরকার জেনেশুনে তা বাড়িয়ে তুললেন।

ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের অনলাইন এবং অফলাইন প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, তাঁরা যথারীতি স্কুলশিক্ষকদের সৌভাগ্যে বিরক্ত ও ঈর্ষান্বিত। “এরা আর কত ছুটি খাবে” জাতীয় মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া চলছে। তৃণমূল সরকারের আমলে নিয়োগের অভাবে যতগুলো ক্লাস নেওয়ার কথা, যতগুলো খাতা দেখার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। উপরন্তু সরকার নাগরিকদের শ্রীবৃদ্ধির যতরকম পরিকল্পনা নিয়েছেন সেসবের দায়িত্বও তাঁদেরই ঘাড়ে। গত কয়েক বছর প্রবল গরমে যতবার সরকার গ্রীষ্মাবকাশ বাড়িয়েছেন, ততবার নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছেন, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কিন্তু স্কুলে যেতে হবে। অর্থাৎ গরমে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন না। এতৎসত্ত্বেও রাজ্যসুদ্ধ বাবা-মা ভাবছেন “এরা আর কত ছুটি খাবে”। অথচ অধিকাংশ মাস্টারমশাই, দিদিমণি এই ছুটি চান না – লেখাপড়ার ক্ষতির কথা ভেবে তো বটেই, তাঁরা যে ক্রমশই গণশত্রু বলে প্রতিপন্ন হচ্ছেন সেই দুশ্চিন্তাতেও। চিন্তাটা অমূলক নয়। এই প্রখর তপন তাপে সরকারের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল, সে আলোচনা করতে গিয়ে যেসব বিকল্পের কথা বলছেন অনেকে, তা থেকে রাজ্যের স্কুলগুলো কী অবস্থায় আছে সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণার অভাব এবং সে কারণে মাস্টাররা মহা সুখে আছেন – এই ধারণার প্রাধান্য প্রকট হচ্ছে।

যেমন অনেকেই সকালে স্কুল করার কথা বলছেন। এঁরা সম্ভবত জানেন না, স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার পর থেকে রাজ্যের স্কুলগুলোতে স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। অনেকেই স্কুলে আসেন ৩০-৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি দূর থেকে ট্রেন, বাস, আরও নানারকম যানবাহনে। সম্প্রতি উৎসশ্রী নামে বদলির যে প্রকল্প চালু হয়েছে তাতে ইতিমধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, মামলাও চলছে। ফলে সে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ মোটেই খুব বেশি মানুষের হয়নি। হয়ত কোনো স্কুলে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, উৎসশ্রীর সুবিধা নিয়ে এসেছেন জনা চারেক। সঙ্গে আরও জনা পাঁচেক স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকা সম্ভব। পঞ্চাশ জনের ক্লাস যদি এই জনা দশেককে নিতে হয় সকালের স্কুলে, তাহলে কেমন পড়াশোনা হবে? নাকি দূর থেকে আসা মাস্টারদের স্কুলেই রাত কাটানোর দাবি করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর মর্জিই যেখানে আইন সেখানে অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এমন নিয়মও হতে পারে। তখন মাস্টাররা কেমন টাইট হল তা দেখে অন্য পেশার লোকেরা প্রভূত আনন্দ পাবেন।

আসলে একটা তৈরি করা সমস্যার সমাধান খুঁজে চলেছি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার গ্রীষ্মে একদিনও কালবৈশাখী হয়নি দক্ষিণবঙ্গে, তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছে কোথাও কোথাও। কিন্তু এমন তো নয় যে পশ্চিমবঙ্গ ছিল শীতের দেশ, বিশ্ব উষ্ণায়ন জায়গাটাকে রাতারাতি থর মুরুভূমি করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গে গরম চিরকালই পড়ত, কিন্তু গরমের ছুটি কবে থেকে কবে অব্দি থাকবে সেই সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী স্কুল কর্তৃপক্ষই নিতেন। সাধারণত দক্ষিণবঙ্গের স্কুলগুলোতে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টানা ২০-২৫ দিন ছুটি থাকত, স্কুল খুলতে খুলতে এসে যেত বর্ষা। উত্তরবঙ্গের স্কুলেও স্থানীয় আবহাওয়া বুঝে গরমের ছুটি দেওয়া হত। আর ছুটির দিনক্ষণ শিক্ষাবর্ষের গোড়াতেই ঠিক হয়ে যেত, ফলে পড়াশোনা এবং পরীক্ষার নির্ঘণ্ট রাতারাতি বদলাতে হত না। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষায় দুর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। কবে পরীক্ষা হবে, কবে ছুটি দেওয়া হবে, ছাত্রছাত্রীদের কী অ্যাক্টিভিটি টাস্ক দেওয়া হবে – সবই ঠিক হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে যথেষ্ট সহনীয় আবহাওয়ার জলপাইগুড়ি জেলার স্কুলের সঙ্গেই ২ মে থেকে ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে পুরুলিয়া জেলার স্কুলের। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় প্রতি বছরই দীর্ঘায়িত হচ্ছে গরমের ছুটি। এগারো বছর কেটে গেল, এখনো গরমের ছুটির দিন নির্দিষ্ট করতে পারল না রাজ্য সরকার।

এতদ্বারা সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোকে সবদিক থেকে পঙ্গু করে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি শিক্ষার রাস্তা চওড়া করা হচ্ছে কিনা সে প্রশ্নে না গেলেও একটা প্রশ্ন অনিবার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০২২ গ্রীষ্মের মত পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে তো আরও বাড়বে। তাহলে কি এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন স্কুলগুলো গরমকালে বন্ধই থাকবে? ভারত তথা পৃথিবীর যে যে অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম পড়ে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা কি স্কুল যায় না? নাকি রাজ্য সরকার এ ব্যাপারে পথপ্রদর্শক হতে চাইছে?

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

বাংলা মাধ্যম ও বাংলা বিপন্ন, কিন্তু রেডিও জকির হাতে নয়

অভিজ্ঞতাকে যুক্তি হিসাবে খাড়া করায় যাদের আপত্তি আছে, তাদের এ লেখা না পড়াই ভাল। কারণ দর্শন বলে একটা বিষয় সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয়। জ্ঞান কী করে আহরণ করা যায়, বা সহজ করে বললে, সত্য জানার উপায় কী, তা দর্শনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। নানা দার্শনিক ঘরানা এ নিয়ে নানা কথা বললেও কেউই সত্য জানার উপায় হিসাবে অভিজ্ঞতাকে একেবারে অগ্রাহ্য করে না। কিন্তু দর্শন-টর্শন, মাননীয়া রেডিও জকি অয়ন্তিকা ফেসবুক লাইভে যাদের আঁতেল বলেছেন, তাদের বিষয়। কারণ দর্শন নিয়ে গবেষণা করে কর্পোরেটে চাকরি পাওয়া যায় না। দর্শনের ছাত্রছাত্রীরা বিলক্ষণ কর্পোরেটের চাকরি পেতে পারে এবং পায়, কিন্তু তা অন্য কোনো পারদর্শিতার জন্য। উপরন্তু কেবল অয়ন্তিকার সমর্থকরাই যে দর্শনকে আঁতেল ব্যাপার মনে করেন তা নয়, যাঁরা তাঁর বিপক্ষে তাঁরাও দর্শন-ফর্শনের ধার ধারেন না। কিন্তু বর্তমান লেখকের তাতে বয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার দস্তুর মেনে অয়ন্তিকার পক্ষে বা বিপক্ষে মুচমুচে কথা লিখে চটজলদি লাইক কুড়োনো এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। অয়ন্তিকা যা বলেছেন তার মধ্যে সার কিছু আছে কি, না সবটাই ঘুঁটে? যতটা ঘুঁটে তা দিয়ে উনুন জ্বালানো চলবে কি, নাকি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে? সেসব তলিয়ে দেখাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

যাঁরা অয়ন্তিকার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত, তাঁদের অনেকের অনেক যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য দেখলাম। কিন্তু একটা কথা চোখে পড়ল না। মাননীয়াকে কেউই ধরিয়ে দিচ্ছেন না, যে কর্পোরেটের চাকরি না পেলেই শিক্ষা বৃথা – এর চেয়ে বড় ভুল ধারণা আর হয় না। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য জগতকে জানা, জীবিকা অর্জন করা নয় – রচনাবই মুখস্থ করা এরকম কোনো বক্তব্য রাখছি না। এই চূড়ান্ত বেসরকারিকরণের যুগেও কর্পোরেটের চাকরি নয়, এরকম কত চাকরি আছে নিজেই একবার ভেবে দেখুন। রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের আমলারা কি কর্পোরেটের চাকরি করেন? একেবারে উচ্চপদস্থদের বাদ দিলে, আমলাদের মাইনেপত্তর, অন্যান্য সুযোগসুবিধা কিন্তু এখনো ভারতে যারা বহুজাতিকের চাকরি করে তাদের সমান বা তার চেয়েও ভাল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরাও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কর্পোরেটের চাকুরে ছিলেন না। তাঁদের লেখাপড়া কি বৃথা গিয়েছে? ডাক্তার, নার্সরা অনেকেই কর্পোরেটের চাকুরে নন। বস্তুত কর্পোরেট হাসপাতালে যে ডাক্তারদের আমরা দেখাই, তাঁরা অনেকেই আসলে সরকারি হাসপাতালে চাকুরিরত। সেই পরিচয়ের কারণে, সেখানে অর্জিত সুনামের ফলেই কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা ওঁদের নিজের হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেক ডাক্তার আবার হাজার পীড়াপীড়ি করলেও যান না। যাঁরা পুলিসে চাকরি করেন তাঁরাও কর্পোরেটের চাকুরে নন, সেনাবাহিনীর লোকেরা তো ননই। স্বাধীনোত্তর ভারতে সম্ভবত সাংবাদিকতাই একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে দূরদর্শন আর অল ইন্ডিয়া রেডিও বাদ দিলে পুরোটাই কর্পোরেটের হাতে (কর্পোরেট শব্দটা যদিও তুলনায় নবীন, আগে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি ক্ষেত্র বলা হত) ছিল। সেই ক্ষেত্রের চেহারাও বদলাচ্ছে, যদিও গতি এখনো মন্থর। ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা’ বলে অশ্রুতপূর্ব একটা কথা উঠে এসেছে, বিশাল কর্পোরেট হাউসের বাইরে ছোট ছোট ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর গড়ে উঠছে। আগামীদিনে সাংবাদিকতার চাকরির জন্যও হয়ত সেগুলোর দিকে যেতে হবে ছেলেমেয়েদের।

সুতরাং বাংলা মাধ্যমে পড়লে কর্পোরেটের চাকরি পাওয়া যাবে না, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে – এই কথাটা আসলে পারিবারিক হোয়াটস্যাপ গ্রুপ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত বন্ধুদের সমসত্ত্ব জনগোষ্ঠীর মতামত, তার বেশি কিছু নয়। তাছাড়া সবাই চাকরি করবেই বা কেন? কেউ খেলোয়াড় হতে পারে। শুধু ক্রিকেট নয়, যত দিন যাচ্ছে এ দেশে অন্য খেলাধুলোতেও রোজগারের পরিমাণ বাড়ছে। কেউ অভিনেতা হবে, কেউ গায়ক বা বাজিয়ে হবে। সকলেরই চোস্ত ইংরেজি বলার দরকার পড়বে কি? কল্পনা করুন, একটি বাঙালি ছেলে শতরান করেছে আর অয়ন্তিকার মত কোনো ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ধারাভাষ্যকার নাক সিঁটকে বলছেন “ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না বলে দ্বিশতরান করতে পারল না।” বা ধরুন একটি মেয়ে চমৎকার গান গায়। বলিউডে অডিশন দিতে গেল, ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এক সঙ্গীত পরিচালক বললেন “ইংরেজিটা ঠিক বলতে পারে না তো, তাই সা থেকে পা-তে পৌঁছতে পারছে না।”

হাসছেন তো? হাসবেন না। কোনো ধারাভাষ্যকার এত বোকা নন, কোনো সঙ্গীত পরিচালকও এত মূর্খ নন। তাঁরা পেশাদার লোক, যোগ্যতার দাম দিতে জানেন। ফলে এমনটা কখনো ঘটবে না। কিন্তু ইংরেজি জানা (কেবল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া নয়) বাঙালি এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত, অর্থাৎ ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা একটা যোগ্যতা বলে ভাবতে অভ্যস্ত। অয়ন্তিকা যা বলেছেন সেই অভ্যাস থেকেই বলেছেন। বিতর্ক তৈরি হওয়ায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে তিনি যে দীর্ঘ ফেসবুক লাইভ করেছেন সেখানে এই ভাবনাটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলা মাধ্যমে পড়ে যারা ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না, তারা নির্ঘাত হীনমন্যতায় ভোগে।

কথাটা ঠিক। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া অনেকেও যে জঘন্য ইংরেজি বলে, কেবল টের পায় না যে ভুলভাল বলছে, সে কথা থাক। কিন্তু বিভিন্ন পেশায় দারুণ সফল অনেককেই চিনি যারা এই হীনমন্যতায় ভুগছে। কদিন আগেই আমার মত বাংলা মাধ্যমে পড়া এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর সঙ্গে কথা হল। সে-ও বলল, মনে হয় আরও উন্নতি করতে পারতাম গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারলে। এই হীনমন্যতার কারণ কী? কারণ অন্য বাঙালিরা। আমি কাজ করতাম ইংরেজি কাগজে, বেশকিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রতিবেদন লেখার সুযোগ পেয়েছি। লক্ষ করেছি, সাংবাদিক সম্মেলনে সব রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরাই ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে গিয়ে হোঁচট খান। উত্তর ভারতীয়রা সেই কারণে সাধারণত হিন্দিতে প্রশ্ন করেন বা হিন্দি মিশিয়ে বলেন। দক্ষিণ ভারতের অনেকে আবার হিন্দিতেও সড়গড় নন। তাঁরা কিন্তু বুক ফুলিয়ে যেমন ইংরেজি আসে, তেমন ইংরেজিতেই প্রশ্ন করেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব যিনি উত্তর দেবেন তাঁর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত মিডিয়া ম্যানেজারের। ইংরেজিটা নেহাত দুর্বোধ্য হলে ওই সাংবাদিকের রাজ্যের ভাল ইংরেজি জানা অন্য সাংবাদিকরা দেখেছি সাহায্য করেন। মাতৃভাষায় প্রশ্নটা জেনে নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলে দেন। অথচ কলকাতার বাংলা কাগজ, চ্যানেলের সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে দেখেছি ইংরেজি বলতে গিয়ে দরদর করে ঘামছেন। যাঁরা ফরসা তাঁদের মুখচোখ লাল হয়ে যেতে দেখেছি। কারণটা আর কিছুই নয়। উনি জানেন ওঁকে নিয়ে পরে হাসাহাসি করবে ওঁর নিজের শহরের সাংবাদিকরাই। হাতে গোনা দু-একজন ভাল ইংরেজি বলা সাংবাদিক সাহায্য করেন, বাকিরা জুলজুল করে তাকিয়ে থেকে সান্ধ্য মদ্যপানের আসরের হাসির খোরাক সংগ্রহ করেন। কারণ তাঁরাও অয়ন্তিকার দলে। মনে করেন কে কত ভাল ইংরেজি বলে তা দিয়ে প্রমাণ হয় কে কত ভাল সাংবাদিক। কলকাতার এক বহুল প্রচারিত বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদক তো এই সেদিনও বলে বেড়াতেন, তাঁর ভাল বাংলা জানা তরুণ সাংবাদিক দরকার নেই। দরকার ভাল ইংরেজি বলতে পারা সাংবাদিক। সে কাগজের প্রতিবেদনের মান এবং ভাষার মান পাল্লা দিয়ে নেমেছে।

পৃথিবীর কটা জাতি ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা যোগ্যতা মনে করে সন্দেহ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করতে যাওয়া এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, প্রথম দিকে টক দিতে উঠে সে ঘেমে নেয়ে যেত। তারপর তার রিসার্চ গাইড, যাঁর মাতৃভাষা ইংরেজি, একদিন জিজ্ঞেস করেন, তুমি তো যথেষ্ট ভাল ফিজিক্স জানো। বলতে গিয়ে অত ঘাবড়ে যাও কেন? সে উত্তরে জানায়, ইংরেজিটা ভুলভাল হয়ে যায় যদি? ভয় লাগে। তিনি তখন তাকে বলেন, ইংরেজি তোমার মাতৃভাষা নয়। তোমাকে আমরা নিয়েছি পদার্থবিদ্যার জন্যে, ইংরেজির জন্যে তো নয়। ও নিয়ে অত ভেবো না, কাজ চালিয়ে নিলেই হল। বাঙালি অধ্যাপক হলে ও কথা বলতেন না বোধহয়। আমার তো ইদানীং সন্দেহ হয়, সত্যজিৎ রায়ের ইংরেজি উচ্চারণ সাহেবদের মত না হলে বাঙালি বোধহয় তাঁকে বড় পরিচালক বলে মানত না।

এবার অন্য দিকটা দেখা যাক। অয়ন্তিকার বিরোধিতায় বাংলা মাধ্যমে পড়া জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল, এমনকি কর্পোরেট চাকরিতেই বহুদূর উঠেছেন এমন অনেক মানুষকে মুখ খুলতে দেখা গেছে। এটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। মাননীয়ার কথায় যে যুক্তির য আর মেধার ম নেই সে তো আগেই বললাম। নিজের পিঠ বাঁচাতে যিনি বাংলাপক্ষের বাংলায় বাঙালিদের জন্য কাজ সংরক্ষণের দাবিকে সমর্থন করেন, তাঁর যুক্তিবোধ নিয়ে আর শব্দ খরচ করব না। কিন্তু কথা হল এই যে এত বাংলাপ্রেমী ও বাংলা মাধ্যমপ্রেমীর দেখা পাওয়া গেছে, এঁদের অনেকের প্রেমই যে দুষ্মন্তের শকুন্তলার প্রতি প্রেমের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানে অভিজ্ঞানটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজে পড়েছেন বাংলা মাধ্যমে, তার জন্যে কোথাও হোঁচট খেতেও হয়নি। কিন্তু নিজের সন্তানকে পড়াচ্ছেন ইংরেজি মাধ্যমে। শুধু কি তাই? সন্তানের দ্বিতীয় ভাষা করেছেন হিন্দি। ছেলের ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় কোনো ছিদ্র দিয়ে যাতে বাংলা ঢুকতে না পারে, সে জন্য টিভিতে বাংলা অনুষ্ঠান দেখাও নিষিদ্ধ – এমন বাড়ি মফস্বলেও হয়েছে আজকাল। অয়ন্তিকা জনপ্রিয় এফ এম চ্যানেলে কাজ করেন। মুখের ভাষা শুনলেই বোঝা যায় বাংলা কোনোদিন ঠিক করে শেখেননি, তার জন্যে কিঞ্চিৎ গর্বও আছে। তা সত্ত্বেও ভাঙব তবু মচকাব না ফেসবুক লাইভটি করতে হল কেন? বাজারের চাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বাজার সমীক্ষা করে থাকেন, ফলে জানেন এফ এম চ্যানেলের শ্রোতাদের একটা বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের মফস্বল ও গ্রামের বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা মানুষজন, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা। তারা শোনে কিন্তু হিন্দি গান, নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময়ে ইংরেজি, হিন্দি মিশিয়েই কথা বলে। কারণ ওই খিচুড়ি ভাষা না বললে গ্রামের বন্ধুরাও গাঁইয়া ভাববে। এরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে না, কারণ পড়ার সুযোগ পায় না। হয় বাবা-মায়ের সে সামর্থ্য নেই, নয় এলাকায় তেমন স্কুল নেই। এদের চটিয়ে ফেললে এফ এম চ্যানেলের সমূহ ক্ষতি। আর জে ভদ্রমহিলা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েও এমনই অশিক্ষিত, অভব্য যে জানেন না, মানুষকে তার দুর্বলতা নিয়ে খোঁচা দিতে নেই। সেই অভব্যতার দায় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নেবেন কেন? জবাবদিহির আসল কারণ বোধহয় সেইটা।

এখান থেকেই তাহলে এসে গেল পরবর্তী প্রশ্নগুলো। ১) বাংলা মাধ্যমে পড়া পেশাগতভাবে সফল বাবা-মা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান কেন? ২) যারা বাংলা মাধ্যমে পড়ে তারাও অনেকে নিজেদের ইংরেজি মাধ্যমের মত করে তুলতে চায় কেন?

এসবের একটা কারণ অবশ্যই ইংরেজি বলার ক্ষমতাকে অকারণ গুরুত্ব দেওয়া, ইংরেজি শিখতে চাওয়া নয়। কারণ কোনো ভাষা শিখতে হলে সব বিষয় সেই ভাষাতেই পড়তে হয়, নইলে শেখা যায় না – এমনটা পৃথিবীর কোথাও প্রমাণ হয়নি। তাছাড়া যে কোনো বাঙালি বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করুন, ইংলিশ মিডিয়ামে কেন পড়ান? উত্তর আসে, আজকালকার দিনে তো ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না। অর্থাৎ ইংরেজি শেখা নয়, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল বেশি ভাল করে শেখা যায় বলেও নয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা শুধু ইংরেজি বলতে শেখার জন্য। মানে স্কুলটা মূলত স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। একই যুক্তিতে আজকাল হিন্দিকে বাঙালি শিশুর দ্বিতীয় ভাষা করা হচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্র ছাড়া সবই দক্ষিণে, অথচ বাঙালির নাকি হিন্দি বলতে না পারলে চাকরি হবে না। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ হলে ভাবনা ছিল না।

কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ রাজ্যে বরাবর বাংলা মাধ্যম স্কুল মানে সরকারি স্কুল (সরকারপোষিত স্কুলগুলো সমেত), আর ইংরেজি মাধ্যম স্কুল মানে বেসরকারি স্কুল। ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না – এই যুক্তিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দেওয়া বরাবর ছিল। কিন্তু গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকেও, বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়তে পাঠানো এক ধরনের বিলাসিতা, সরকারি স্কুলে দিব্যি পড়াশোনা হয় – এই ধারণা চালু ছিল। ফলে এখন যারা বাবা-মা, তাদের বাবা-মায়েরা অনেকেই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলেই পড়িয়েছেন। ছবিটা এই শতকের শুরু থেকে বদলাতে বদলাতে এখন এমন হয়েছে, যে অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রায় কেউই আর সরকারি স্কুলে পড়ে না। কলকাতা থেকে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে আমাদের নবগ্রাম। এখানকার সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড় ছেলেদের স্কুলের এক প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বছর পাঁচেক আগে আমাকে সখেদে বলেছিলেন, আগে আমাদের স্কুলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার, ব্যবসাদার, মুচি, মেথর – সবার ছেলেই পড়ত। এখন শুধু রিকশাওলা, দিনমজুর, মেছো, কশাইদের ছেলেরা পড়ে। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত আর নেই।

কেনই বা থাকবে? একে তো আর সবকিছুর মত স্কুলও ঝাঁ চকচকে না হলে সেখানে পড়াশোনা হয় না, এমন ধারণা বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর দিক থেকে অনেক সরকারি স্কুলই পিছিয়ে ছিল সেইসময়। উপরন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই স্কুলের পড়াশোনার মান কমাতে বিরাট ভূমিকা নিয়েছে প্রাইভেট টিউশন। সকালে স্কুল যাওয়ার আগে পর্যন্ত এবং বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই ঘরের বাইরে চটির পাহাড় জমিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, আর স্কুলে গিয়ে অকাতরে ঝিমোচ্ছেন – এ জিনিস আমরা অনেকেই দেখেছি। স্কুলশিক্ষকদের এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা এই শতাব্দীর শুরুতে এমন ফুলে ফেঁপে উঠেছিল এবং এতরকম দুর্নীতির জন্ম দিয়েছিল যে ২০০১-০২ আর্থিক বর্ষের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক, অধ্যাপকদের প্রাইভেট টিউশন করা চলবে না। তা নিয়ে শিক্ষকদের সংগঠনগুলো এবং অভিভাবক, ছাত্রছাত্রীদের প্রবল দুশ্চিন্তা ও আপত্তি নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। শেষপর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকার ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে উঠতে পারেনি। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল প্রাইভেট টিউশন। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা। অর্থাৎ ব্যাঙের ছাতার মত বিপুল সংখ্যক ঝলমলে বেসরকারি স্কুল।

বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার হাল কেমন তা শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললেই জানা যায়। ক্লাস পিছু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বরাবরই অসুবিধাজনক ছিল, এ আমলে আবার স্কুলে নিয়োগেও প্রায় দাঁড়ি পড়ে গেছে। রাজ্যে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব নেই, কিন্তু তাঁরা হয় আদালত চত্বরে পড়ে আছেন, নয় অনশন করছেন কোথাও। কপাল নিতান্ত মন্দ হলে পুলিসের লাঠি, জলকামান হজম করছেন, মরেও যাচ্ছেন কেউ কেউ। যাঁরা স্কুলে আছেন তাঁরা কেবল পড়াবেন আর পরীক্ষা নেবেন, খাতা দেখবেন তার জো নেই। অশিক্ষক কর্মী নিয়োগও অনিয়মিত, ফলে তাদের কাজ ঘাড়ে চাপছে, তার উপর সরকারি প্রকল্পের করণিকও হয়ে উঠতে হবে। শিক্ষাবর্ষে ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে এই শ্রী, ওই শ্রী, সেই শ্রীর হিসাব রাখতে। গরীব সরকার ওসব কাজের জন্য আলাদা লোক রাখতে পারেন না। মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁস না হলে খবর হচ্ছে। কোনো স্কুলে প্রধান শিক্ষক বা টিচার ইন চার্জ জমিদারি কায়েম করে নিয়োগ আটকে দিচ্ছেন। এমন গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম হয়েছে যে নিয়োগ সংক্রান্ত কেসের বিচারপতি তাঁর রায়ের উপর বারবার স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে বলে ডিভিশন বেঞ্চের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করছেন।

এত ডামাডোল দেখেও কোন বাবা-মা ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলে পড়তে পাঠাবেন? মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ভুক্তভোগী। তাই তাঁরাও নিজেদের ছেলেমেয়েদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমে দিচ্ছেন। সরকারের পোয়া বারো। বহু স্কুল ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা খাতে খরচ আরও কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের কত খরচ বেঁচে যাচ্ছে ভাবুন। তবে মাঝে মাঝে দেখানো দরকার যে সরকার স্কুলগুলোকে নিয়ে ভাবেন। তাই কিছু সরকারি স্কুলকে ইংরেজি মাধ্যম করে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়ত আরও হবে। এর পাশাপাশি আছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়। কেবল অয়ন্তিকাকে গাল পেড়ে বাংলা মাধ্যমের মান থাকবে?

ভারতের মত বহুভাষিক দেশে কেবল নিজের মাতৃভাষা শিখলে যে চলে না, তা ঠিকই। কিন্তু নিজের ভাষার বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। তার প্রমাণ তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষাভাষীরা। আজকের ভারতে কোনো বিষয়েই তারা অন্য রাজ্যের লোকেদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। শিল্প, সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞানে বাঙালিদের চেয়ে ঢের এগিয়ে। দুঃখের বিষয় খিচুড়ি ভাষায় কথা না বলেও তারা দিব্যি ইংরেজি আয়ত্ত করে ফেলছে। আর বাঙালি কর্পোরেটের চাকুরে হয়ে উঠতে এত ব্যস্ত যে একসময় বাঙালি পণ্ডিতদের যা বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলা ও ইংরেজিতে সমান মুনশিয়ানা, তা লুপ্তপ্রায়। এখন বাঙালির ভাষা চৌরঙ্গী ছবির স্যাটা বোসকে মনে পড়ায়। বাংলা শেক্সপিয়রের মত, ইংরেজি তুলসীদাসের মত আর হিন্দি রবীন্দ্রনাথের মত। মাননীয়া রেডিও জকির মত লেখাপড়া জানা কূপমণ্ডূক বাঙালি মনে করে হিন্দি, ইংরেজি ছাড়া বাংলা বলে আঁতেলরা। সে বাংলা বঙ্কিমচন্দ্রের। আর খিস্তি হল নবারুণ ভট্টাচার্যের বাংলা। কিন্তু কেবল এফ এমের আর জে নয়, আজকাল সাহিত্যিকরাও খিচুড়ি ভাষাই ব্যবহার করেন। কবিতা পত্রিকায় ওই ভাষায় বাংলা কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হয়। কদিন আগে বাংলা ভাষার এক ফেসবুক কাঁপানো কবি খিচুড়ি ভাষায় নামকরণ করা এক অনুষ্ঠানের বিচারক হয়েছেন। সোশাল মিডিয়ায় এক বাঙালি মুসলমান যুবক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কবির পাল্টা যুক্তি ছিল, আপনার নামটাই তো বাংলা নয়।

আর আপনি ভাবছেন বাংলা বিজেপি বা অয়ন্তিকার হাতে বিপন্ন?

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

আরও পড়ুন

হিন্দির হাতে বাংলা বিপন্ন: বাঙালি কি নির্দোষ?

বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

এক পুত্র আর এক পিতার গল্প বলি। প্রথম জনের বাবা খুন হয়েছিলেন গোরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের হাতে, দ্বিতীয় জনের ছেলে খুন হয়েছিল দাঙ্গাবাজদের হাতে। দ্বিতীয় জনকে আমরা সবাই চিনি — আসানসোলের নূরানী মসজিদের ইমাম ইমদাদুল রশিদি। প্রথম জনের নাম অভিষেক সিং। একবিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু এক বছরও নয়। অতএব মনে করিয়ে দেওয়া যাক, অভিষেকের বাবা সুবোধ কুমার সিং ছিলেন উত্তরপ্রদেশ পুলিসের ইন্সপেক্টর, একসময় দাদরির আখলাক আহমেদের খুনের ঘটনার তদন্ত করছিলেন। ইমামের ছেলে সিবগাতুল্লা খুন হয়েছিল ২০১৮ মার্চের দাঙ্গায়, ওই বছরেরই ৩ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরের এক অঞ্চলে একটি গরুর মৃতদেহ নিয়ে গোহত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে জনতা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সুবোধ গুলিবিদ্ধ হন। ইমাম রশিদিকে আমরা মনে রেখেছি দাঙ্গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুত্রশোক অগ্রাহ্য করে হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর বার্তা দেওয়ার জন্য। মুসলমানদের দিক থেকে বদলা নেওয়ার চেষ্টা হলে আসানসোল ত্যাগ করবেন বলার জন্য। সুবোধপুত্র অভিষেকও পিতৃশোকের মাঝেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন বাবা শিখিয়ে গেছেন হিন্দু মুসলমান আলাদা নয়। ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত। যেন এমন না হয় যে বহিঃশত্রুর দরকারই হল না, ভারতীয়রা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করে বসল।

কদিন হল ইমাম রশিদি আবার সংবাদের শিরোনামে এসেছেন পুত্র সিবগাতুল্লার খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করার জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে এত বড় ত্যাগ দেখে প্রশংসার বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মনিরপেক্ষ আমরা আপ্লুত। এই তো আমাদের দেশ, ইমামের মত লোকেরাই তো আমাদের আশার আলো, ইত্যাদি বয়ানে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে ফেসবুক ওয়াল পর্যন্ত সবই মুখরিত। একটি সংবাদপত্রে সরকারপক্ষের উকিলের বিবৃতিও বেরিয়েছে। তিনি বলেছেন চার দশকের বেশি ওকালতির অভিজ্ঞতায় কখনো কোনো মৃতের বাবাকে এমন অবস্থান নিতে দেখেননি। যদিও ইমাম সাহেবের এমন আচরণ মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। সিবগাতুল্লার হত্যার পরেই তিনি বলেছিলেন যে একজন হত্যাকারীকে ধরতে পেরেও ছেড়ে দিয়েছেন

সুবোধ কুমারের ছেলে অভিষেক এবং পরিবারের বাকি সদস্যরা কিন্তু এত মহান নন। আর পাঁচটা খুনের মামলার মত করেই সে মামলা এগোচ্ছে। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া কাগজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সুবোধের খুনে অভিযুক্ত ৪৪ জনের মধ্যে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে পুলিস দেশদ্রোহ আইনে মামলা করার অধিকার পেয়েছে এ বছরের ১৬ মার্চ। শোনামাত্রই কেউ কেউ সিদ্ধান্ত করতে পারেন, যোগীর রাজ্যে ন্যায়বিচার হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হল অভিযুক্তদের মধ্যে মাত্র ছজন জেলে আছে, বাকি সকলেই জামিনে বাইরে। প্রধান অভিযুক্ত বজরং দলের সদস্য যোগেশ রাজও শুরুতেই এলাহাবাদ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বাগড়া দেওয়ায় তার বেরিয়ে আসা হয়নি। বুলন্দশহরের পুলিস এফ আই আর করার সময়েই খুন, হিংসা এবং দেশদ্রোহিতার (সেকশন ১২৪এ) অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু পরে আদালত শেষেরটি বাদ দেয়, কারণ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়নি। সে অনুমোদন পাওয়া যায় ২০১৯ সালের জুন মাসে। তারও প্রায় তিন বছর পরে বুলন্দশহর জেলা আদালত এই অভিযোগ অনুমোদন করেছে। অথচ সারা দেশে কয়েকশো মানুষ, যাঁদের একটা বড় অংশ মুসলমান, এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাবাস করছেন। এদের মধ্যে সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান, ছাত্রনেতা উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম আছেন। অশীতিপর ফাদার স্ট্যান স্বামী তো শুনানি ছাড়াই জেলের মধ্যে মারা গেলেন। পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত মানুষটির জন্য তাঁর আইনজীবীরা সামান্য জল খাওয়ার স্ট্রয়ের আবেদন করেও সফল হননি।

অথচ ভারতের বিচারব্যবস্থা কিন্তু অমানবিক নয়। এই তো গতকাল দিল্লির এক আদালত ওঙ্কারেশ্বর ঠাকুরকে জামিন দিয়েছে মানবিকতার কারণে। ওঙ্কারেশ্বর সুল্লি ডিলস বলে একটি অ্যাপ তৈরি করায় অভিযুক্ত, যে অ্যাপে মুসলমান মহিলাদের কাল্পনিক নিলাম করা হয়েছিল। বিচারক ওঙ্কারেশ্বরকে জামিন দিয়ে বলেছেন, অভিযুক্তের এটা প্রথম অপরাধ। তাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখলে তার শরীর স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

এ তো পাতিয়ালা হাউস কোর্টের এক বিচারকের মন্তব্য। দেশের হাইকোর্টগুলো পর্যন্ত অত্যন্ত মানবিক। গত শনিবার দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর আর পরবেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তৃতার (হেট স্পিচ) অভিযোগে দায়ের হওয়া পিটিশনের উত্তরে বলেছে, কোনো কথা হেসে বললে অপরাধ হয় না। তাছাড়া ভোটের সময়ে বিদ্বেষমূলক কথা বললেও ক্ষতি নেই।

অর্থাৎ ক্ষেত্র বিশেষে বিচারকরা অত্যন্ত উদার, অত্যন্ত মানবিক। তবে সব ক্ষেত্রে অতটা হওয়া যায় না। ইমাম সাহেবের মত লোকেদের, ভারতের সংখ্যালঘুদের এই তারতম্য বুঝে না নিয়ে উপায় নেই। বিশেষত আজকের ভারতে মহান হওয়া সংখ্যাগুরুর কাছে একটি বিকল্প, সংখ্যালঘুর একমাত্র উপায়। আমাদের মধ্যে যাদের ইমাম সাহেবের প্রশংসা করতে গিয়ে আবেগে গলা বুজে আসে, তারা বুঝতে পারি না যে তিনি ছেলের খুনিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে, তাদের শাস্তি হলে মুহূর্তে সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে কেবল আসানসোল কেন, গোটা দেশে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া হবে। এ দেশ এখন নরকের দক্ষিণ দুয়ারে পৌঁছে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেওয়া যায়, মুখে হাসিটি থাকলেই হল। এসব আমরা বুঝি না বলেই আসানসোল দাঙ্গার অগ্রণী নেতা বাবুল সুপ্রিয়র তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে ভোটে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে ইমাম বিবৃতি দিলেন না বললে আমাদের গোঁসা হয়। আমরা কিছুতেই বোঝার চেষ্টা করি না, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের চোখের সামনে এখন এমন কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নেই, যারা দাঙ্গার সময়ে তাঁদের ঢাল হয়ে উঠবে বলে ওঁরা আশা করতে পারেন। রাজ্যের সর্বময় কর্ত্রীর উদ্দেশে “সকলি তোমারি ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি” গাওয়া ছাড়া ইমাম সাহেবদের সামনে কোনো পথ খোলা নেই। ধর্মনিরপেক্ষ সংখ্যাগুরুর সামাজিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তাই তাঁদের বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে বন্দি করেছে।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

অনুরূপ পোস্ট

রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

বাবুল সুপ্রিয় ও শত্রুঘ্ন সিনহা
(ছবি ইন্টারনেট থেকে)

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিক, বামফ্রন্ট সরকার মধ্যগগনে। আমার এক পিসতুতো দিদির ছেলে একবার কোনো ক্লাসে উঠলে সেখানেই ঘাঁটি গেড়ে ফেলছে। তা নিয়ে তার বাবা, মা, মামা সকলেই চিন্তিত। আমার সিপিএম কর্মী বাবা সেই দিদির মামা হন, তার উপর পেশায় শিক্ষক। ফলে সে ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে পরামর্শ চাইল। কোনো জবাব দেওয়ার আগেই দিদির ভাইটি আমার বাবাকে বলল “দোষ তো আমার ভাগনার নয়, দোষ তো তোদের (বয়সের তফাত কম হওয়ায় ‘তুই’ সম্বোধনই চালু ছিল)। তোরা মুড়ি মিছরি এক দর কইরা দিছস। এমন ব্যবস্থা করছস যে রিকশাআলার পোলায় আমার ভাগনার পাশে বইস্যা ক্লাস করে। তাতে তার তো কোনো উন্নতি হয় না, কারণ তার ল্যাখাপড়ার কালচার নাই। উল্টা আমাদের ভদ্দরলোকের পোলাগুলার সব্বোনাশ হয়্যা যাইতাছে।” আমার বাবা ভাগ্নে-ভাগ্নী বলতে অজ্ঞান ছিলেন, তাই কোনো কড়া উত্তর দেননি। হেসে বলেছিলেন “অ, নাচতে শেখো নাই বইলা উঠানের দোষ দিতাছ।” বাড়ি ফিরে আমাকে বলেছিলেন “এদের কীরকম মানসিকতা দেখেছিস? রিকশাওলার ছেলে ওর ভাগ্নের সাথে এক ক্লাসে পড়ছে বলে ওর গায়ে ফোসকা পড়ছে। তার জন্যে নাকি ওর ভাগ্নের পড়াশোনা হচ্ছে না।”

এর কৃতিত্ব বা দোষ কতটা বামফ্রন্ট সরকারের জানি না। দেশের অনেক জায়গাতেই সেইসময় পর্যন্ত রিকশাচালকের ছেলেমেয়ে আর চাকুরিজীবী মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়ে এক স্কুলেই পড়ত, একসাথে খেলাধুলোও করত। একই পাড়ায় বিত্তশালীর প্রাসাদপ্রমাণ বাগানওলা বাড়ি থাকত, মধ্যবিত্তের একতলা বাড়ি থাকত, নিম্নবিত্তের টালির চালের বাড়িও থাকত। সেসব বাড়ির মধ্যে বাটি চালাচালির সম্পর্কও থাকত কখনো কখনো। এ কোনো সোনালি অতীতের আষাঢ়ে গপ্প নয়। তখনো বিলক্ষণ শ্রেণি বিভাজন ছিল, তিনতলা বাড়ির মেয়ের সাথে টালির বাড়ির ছেলের প্রেম হত না সিনেমার মত, বিয়েও নয়। কিন্তু এ বাড়ির দাদুর শ্রাদ্ধে ও বাড়ি থেকে চিঁড়ে-দই খাওয়ার লোক থাকত, ও বাড়ির ছেলের বিয়েতে এ বাড়ি থেকে অন্তত একজনের নেমন্তন্ন থাকত। ১৯৯১ সালের পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে বদলাতে এখন সব অলীক। এখন হয় ফ্ল্যাট, নয় ঝুপড়ি। হয় গেটেড কমিউনিটি, নয় বস্তি। যেখানে পাড়া অবশিষ্ট আছে, সেখানেও বাবা-মা কেবল নিজেদের দরের পরিবারের বাচ্চাদের সাথেই মেলামেশা করতে দেন নিজের ছেলেমেয়েকে। চাকুরিজীবীর ছেলের স্কুল আর রিকশাওলার ছেলের স্কুল আলাদা হবে — আমার পিসতুতো দাদার এই ফ্যান্টাসি এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। রিকশাচালক, বাড়ির কাজের দিদি, জনমজুরের ছেলেমেয়েরা পড়ছে টিমটিমে সরকারপোষিত স্কুলে, কারণ তাদের বাবা-মায়েদের ওটুকুই সাধ্য। আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ছে ঝাঁ চকচকে প্রাইভেট স্কুলে। অর্থাৎ মনমোহনী অর্থনীতির তিরিশ বছরে অভূতপূর্ব বৈচিত্র্যহীন ঐক্য তৈরি হয়েছে এ দেশে। ইংরেজিতে যাকে ঘেটো বলে, গোটা দেশটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমন ঘেটোর সমাহার।

কেন এসব কথা লিখলাম? কারণ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের দেশ ভারতবর্ষ বিপন্ন বলে আমরা সকলেই খুব চিন্তিত। একটা করে নির্বাচনের ফল বেরোয়, বিজেপি জেতে, আর আমরা নানা রঙের বিজেপিবিরোধীরা, হতাশ হয়ে বা ক্রুদ্ধ হয়ে বলি “এ দেশটার কিস্যু হবে না। লোকে কেবল হিন্দু-মুসলমান বোঝে। আর কোনো ইস্যু নিয়ে মাথা ঘামায় না।” এত বড় দেশে প্রত্যেক নির্বাচনেরই যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে সেগুলোর কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, ধর্মীয় বিভাজনকে প্রধান ইস্যু করে তোলার চেষ্টা নিঃসন্দেহে অনেকটাই সফল হয়েছে। নির্বাচনগুলোর ফলাফলে তার প্রভাব উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। কিন্তু সে বিভাজন দূর করার পথ খোঁজার সময়ে আমরা ভেবে দেখছি না, ধর্মীয় বিভাজনের ইমারত দাঁড়িয়ে আছে অন্য গভীরতর বিভাজনের উপর। আমি আপনার থেকে আলাদা। আমি আপনার চেয়ে বেশি রোজগার করি, আপনার চেয়ে দামি পোশাক পরি, আমার গাড়ি আছে আপনার নেই, অতএব আপনার সাথে আমার মেশা উচিত নয়। আমাকে মিশতে হবে আমার মত লোকেদের সাথে। এই ব্যাপারটা যদি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে আপনি আমার জানাশোনার বাইরে চলে যাবেন। ক্রমশ আপনার ভালমন্দে আগ্রহ হারাব, তারপর একসময় স্থির বিশ্বাস হবে যে আপনি বাঁচলেন কি মরলেন তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আমি কেবল আমার মত লোকেদের সাথে মিশি, আপনি মেশেন আপনার মত লোকেদের সাথে — সমাজ যে এমনভাবে বিভক্ত হওয়াই উচিত, এই ধারণা একবার মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া গেলে অন্য যে কোনোরকম বিভাজন তৈরি করা জলভাত। যে অপর, সে অপ্রয়োজনীয়, এমনকি খারাপ — আগে একথা প্রতিষ্ঠা করুন। তারপর অপরের সংজ্ঞাটা দরকার মত বদলাতে থাকুন। সোজা হিসাব।

আমাদের দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় (নাকি সর্বত্রই?) এমনিতেই এক ধরনের অপরায়নের ভিত্তিতে পৃথকীকরণ কয়েক হাজার বছর ধরে চলে আসছে — বর্ণবাদ। তার সাথে বিশ্বায়নের যুগে যোগ হয়েছে শ্রেণিভিত্তিক পৃথকীকরণ, যা এতক্ষণ ব্যাখ্যা করলাম। এই দো-ফসলি জমিতে ধর্মীয় বিভাজনের ফসল ফলানো মোটেই কঠিন নয়। যে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য নিয়ে আমাদের গুমোর, সেই বৈচিত্র্য স্থানীয় স্তরে হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তৈরি জমিতেই বীজ বুনে ফসল তুলেছে। ভেবে দেখুন, ভারতের বাজার খুলে দেওয়া হল ১৯৯১ সালে, আমরা ‘আপওয়ার্ডলি মোবাইল’ হতে শিখে গেলাম। আর ১৯৮৯ সাল থেকে রক্তক্ষয়ী রথযাত্রার মাধ্যমে লালকৃষ্ণ আদবানি সঙ্ঘের যে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা সারা ভারতে ছড়িয়ে দিতে নেমেছিলেন, তার প্রথম বড়সড় সাফল্য এল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্যে দিয়ে। ভারতে বহুজাতিকের পায়ের তলার মাটি যত মজবুত হয়েছে, তত মজবুত হয়েছে আরএসএসের মাটি। ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া আরএসএস বরাবর সাম্প্রদায়িক মতাদর্শে অবিচল থেকে কাজ করে গেছে। কিন্তু দেশভাগ, গান্ধীহত্যার মত ঘটনার পরেও প্রান্তিক শক্তি হয়েই থাকতে হয়েছিল। অথচ কম্পিউটারের ভারতে, উদারীকরণের ভারতে কিনা এই প্রাচীনপন্থী, ধর্মান্ধ সংগঠন ক্রমশ নিজের শক্তি বাড়িয়ে আজকের অপরাজেয় স্থানে পৌঁছতে পারল। একথা বললে ভুল হবে না, যে ভোগ্যপণ্যের বৈচিত্র্য আর বেসরকারিকরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে ও সমাজে আরএসএসের প্রভাব বেড়েছে। অটলবিহারী বাজপেয়ী আর মোদীর সরকারের রাজনীতি যতটা রক্ষণশীল, তাঁদের অর্থনীতি ততই উদারপন্থী। তথাকথিত খোলা হাওয়ার খোঁজ দিয়েছিল কংগ্রেস, সে হাওয়ায় পাল তুলে দেশকে মাঝসমুদ্রে নিয়ে গেছে আরএসএস। কারণ নব্বইয়ের দশক থেকে যে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি সারা পৃথিবীতে চালু হয়েছে নানা চেহারায়, তাতে যে বৈষম্য বাড়ে তা এখন বিশ্বব্যাঙ্কও স্বীকার করে। আর আগেই বলেছি, মূল বৈষম্যটা বাড়লে আর সবরকম বৈষম্য তৈরি করা যায়। অতএব ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করতে হলে ওটাই পথ।

বারবার আরএসএস কেন বলছি? বিজেপি বলছি না কেন? কারণ হিন্দুরাষ্ট্র বিজেপির এজেন্ডা নয়। বিজেপির কোনো দায়িত্বশীল নেতা ওই শব্দটি পারতপক্ষে উচ্চারণ করেন না, কাগজে কলমে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি সহস্রবার দেওয়া হলেও, হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় না। ভীষণদর্শন সাধুসন্ন্যাসী বা হিন্দি বলয়ের কোনো কোনো নেতা ২০২৩ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে বলে কয়েকবার ঘোষণা করেছেন বটে, কিন্তু মোদী বা অমিত শাহের মত কেউ কখনো ওসব বলেন না। বুদ্ধিমান সাংবাদিক, বিশ্লেষকরা যারা ওসব বলে তাদের “ফ্রিঞ্জ এলিমেন্ট” (প্রান্তিক ব্যক্তি) বলে দাগিয়ে দেন। হিন্দি ভাষায় জনপ্রিয় প্রবাদ হল “হাথি কে দাঁত। খানে কে ঔর, দিখানে কে ঔর।” অর্থাৎ হাতি যে দাঁত দিয়ে খায়, সে দাঁত দেখায় না। আরএসএস অত্যন্ত বলশালী হাতি বৈ তো নয়। বিজেপিবিরোধী দল, বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক, আমরা চুনোপুঁটিরা — সকলেই বিস্তর আলাপ-আলোচনা করছি, ফন্দি আঁটছি, বিজেপিকে কী করে নির্বাচনে হারানো যায় তা নিয়ে। আর অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করছি, বিচার বিভাগ থেকে সংবাদমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন থেকে পুলিসবাহিনী — সবই “ওদের” লোকে ভর্তি। এই “ওরা” যে বিজেপি নয়, আরএসএস, তা বুঝতে পারলে এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকত না।

আরএসএস নিজেকে বলে সামাজিক সংগঠন, অর্থাৎ বর্তমান ভারতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা শুধু দলীয় রাজনীতির নয়, স্রেফ নির্বাচনী রাজনীতির তো নয়ই। লড়াইটা সামাজিক। আরএসএস নিজে সেভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বিরুদ্ধে একশো বছর ধরে লড়ে এসেছে, দলীয় রাজনীতিকে সেই লড়াইয়ের একটা ফ্রন্টে পরিণত করেছে। আর আমরা ভাবছি, যেনতেনপ্রকারেণ আরএসএসের রাজনৈতিক শাখাকে ভোটে হারিয়ে দিলেই ঝামেলা চুকে যাবে।

আরএসএসের সমান বয়সী একটি রাজনৈতিক দল ছিল ভারতে — ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সে দল ভাঙতে ভাঙতে শতধা বিভক্ত। প্রাচীন সংগঠনে এরকম ভাঙাগড়া হয়েই থাকে। কিন্তু মজার কথা, আরএসএসের মধ্যেও নানা দ্বিধা দ্বন্দ্ব আছে। তবু তারা এখনো ‘সঙ্ঘ পরিবার’। সর্বত্র বজরং দলের সাথে বিজেপির মতে মেলে না; বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রবীণ তোগাড়িয়াও প্রকাশ্যে মোদীর নিন্দা করেছেন। মাঝেমধ্যে খোদ আরএসএস বেসুরো গায়। অথচ মূল লক্ষ্য থেকে এরা কেউ কখনো সরে না। মুসলমান বিদ্বেষে সবাই এককাট্টা, রামমন্দির নিয়ে সবাই এককাট্টা। বিরোধীদের আঁচড়াতে, কামড়াতে, খুন করতে সবাই সমান উদ্যোগী। কমিউনিস্টরা কে বেশি কমিউনিস্ট তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে প্রচুর শক্তিক্ষয় করেন, করতে করতে শুধু ল্যাজের ডগা পড়ে আছে। সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যদের ওসব বদভ্যাস নেই।

আরও যা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে রাখতে, হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন সার্থক করতে আরএসএস শুধু বিজেপির উপর দায়িত্ব দিয়ে বসে নেই। তারা জানে, সমস্ত প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত হওয়া সত্ত্বেও, ইলেকটোরাল বন্ডের কল্যাণে টাকার অঢেল জোগান থাকা সত্ত্বেও এত বড় দেশে সব নির্বাচন জেতা অসম্ভব। বিজেপি হেরে গেলেই হিন্দুরাষ্ট্র ফসকে যাবে? তা হতে দেওয়া যায় না। তাই “সেটিং” থাক আর না-ই থাক, অন্তত আরএসএসের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নয়, শক্তিশালী বিরোধী হিসাবে তেমন কিছু দলের উপস্থিতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কীভাবে করা হল তা হয়ত অতিদূর ভবিষ্যতে কোনো পরিশ্রমী গবেষক উদ্ঘাটন করবেন, কিন্তু আপাতত দেখাই যাচ্ছে, যিনি রথযাত্রায় আদবানির পাশে ছিলেন, আনন্দ পট্টবর্ধনের বিখ্যাত তথ্যচিত্র রাম কে নাম-এ যাঁকে আদবানির মঞ্চে মাইক হাতে দেখা যায়, সেই শত্রুঘ্ন সিনহা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দল তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। যে বাবুল সুপ্রিয় দাঙ্গায় যুক্ত ছিলেন বলে বহু মানুষ অভিযোগ করেন, সোশাল মিডিয়ায় বাঙালি মুসলমানদের বিদেশি বলেছেন একাধিকবার, তিনি বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসে প্রথম এগারোয় জায়গা পাচ্ছেন। প্রার্থী হচ্ছেন এমন আসনে, যেখানে সংখ্যালঘু মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট। অবশ্য তৃণমূলের সর্বময় কর্ত্রী বহু আগেই রাখঢাক না করে বলেছিলেন তাঁর সমস্যা বিজেপিকে নিয়ে, আরএসএসকে নিয়ে নয়। গান্ধীজির বাঁদরদের মত মুখ, চোখ, কান বন্ধ করে থাকা পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিপ্লবী মানুষ সে কথা শুনতে বা দেখতে পাননি, তাঁর দল সম্পর্কে মানুষকে সাবধানও করেননি। নিশ্চয়ই সে কারণেই মমতা আত্মবিশ্বাসী, যে বালিগঞ্জ কেন্দ্রের সংখ্যালঘু মানুষ বাবুলকে ভোট দিন আর না-ই দিন, ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা নিশ্চয়ই দেবেন। আসানসোলের সংখ্যালঘু মানুষ শত্রুঘ্নকে ভোট না দিলেও ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা নিশ্চয়ই দেবেন। কারণ বিজেপিকে ভোট না দিলেই যে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত বেঁচে যাবে — এ বিশ্বাস বহু মানুষের। তাঁরা আরএসএসকে দেখতে পান না। যাঁদের দেখিয়ে দেওয়া দায়িত্ব তাঁরা দেখতে দেন না।

শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। বিলীয়মান কংগ্রেসের জায়গা নেবে বলে যে দলটার উপর গত কয়েকদিন বহু বিজেপিবিরোধী মানুষ ভরসা করতে শুরু করেছেন দেখছি, সেই আম আদমি পার্টি দুটোর জায়গায় দশটা রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও আরএসএসের ক্ষতি নেই। বহু কমিউনিস্টও দেখছি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিল্লি সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম দেখে আপ্লুত। মনমোহনী অর্থনীতির আমলে বামপন্থীদেরও যে নিজেদের রাজনীতি গুলিয়ে গেছে তার এর চেয়ে ভাল প্রমাণ সম্ভবত নেই। তাঁরা ভেবেও দেখছেন না, কেজরিওয়াল যা করছেন তা আসলে রাজীব গান্ধীর আমলের কংগ্রেসসুলভ কাজ। তফাতের মধ্যে কংগ্রেসের মত দুর্নীতি আপ দলে নেই। কেজরিওয়াল একাধিকবার বলেছেন, তিনি বামপন্থী নন, দক্ষিণপন্থীও নন। কার্যক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তিনি হয় কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেন না, নয় আরএসএসের পছন্দের অবস্থান নেন। দিল্লি দাঙ্গায় তাঁর দল কোনো সক্রিয়তা দেখায়নি। উপরন্তু নিজের দলের মুসলমান কাউন্সিলর তাহির হুসেনের পাশেও দাঁড়ায়নি। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার সমর্থন করেছিল। অর্থাৎ আপ আপনাকে ভাল রাস্তা দিতে পারে, ভাল স্কুল ও হাসপাতাল দিতে পারে, শস্তায় জল ও বিদ্যুৎ দিতে পারে। তবে তাদের শাসিত রাজ্যে গণহত্যা হয়ে গেলে তারা মাথা ঘামাবে না। অর্থাৎ আপ হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার পথে বাধা নয়।

যেমন বাধা নন ওড়িশার নবীন পট্টনায়ক। মমতা, কেজরিওয়াল, নবীন — এঁরা কেবল ‘গোদি মিডিয়া’ নয়, ভারতের সব মিডিয়ার মতেই দারুণ ভাল। কারণ এঁরা “গুড গভর্ন্যান্স” (সুশাসন) নামক একটি জিনিস সরবরাহ করেন। সেটি দুলালের তালমিছরির মত এক অরাজনৈতিক অমৃত। এঁদের দেখিয়ে মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে — সুশাসন মানে হল রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল ও ভর্তুকি। কর্মসংস্থান নয়, আইনশৃঙ্খলা নয়, জাতীয় রাজনীতির ইস্যুতে সঠিক অবস্থান নেওয়াও নয়। এই মানদণ্ড মেনে নিতে অসুবিধা না থাকলে কিন্তু মানুষ যোগী আদিত্যনাথকে আবার ভোট দিল বলে রাগ করা চলে না। কারণ রাস্তাঘাট নিয়ে ওই রাজ্যের মানুষের বিশেষ অভিযোগ নেই। স্কুল, হাসপাতাল না দিতে পারলেও উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার বিনামূল্যে রেশন দিয়েছে। কোভিডে মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণও দিয়েছে।

ভারতে একজন বিরোধী নেতা আছেন, যিনি মানেন লড়াইটা আসলে সামাজিক এবং বলেন যে লড়াই আসলে আরএসএসের বিরুদ্ধে। তিনি রাহুল গান্ধী। কিন্তু সমস্যা হল, তিনি সোশাল মিডিয়ার নেতা। ইদানীং দিব্য বাগ্মী হয়ে উঠেছেন, কিন্তু রাস্তায় নামেন কালেভদ্রে। ইউটিউব, ফেসবুক আর টুইটারে লাইকের মূল্য যে রাজনীতির ময়দানে শূন্য — তা তিনি বোঝেন বলে মনে হয় না। বহু বিজেপিবিরোধীর একটি পাহাড়প্রমাণ ভ্রান্তি আছে। তা হল, বিজেপি শাসনের ভিত্তি সোশাল মিডিয়া। একশো বছর ধরে আরএসএসের তৃণমূল স্তরে গিয়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজ করার ব্যাপারে কোনো ধারণা না থাকাই এই ভ্রান্তির মূলে। সম্ভবত রাহুলও এতেই ভোগেন। গত কয়েক বছরে রাহুলের কথাবার্তা থেকে বোধ হয়, তিনি বোঝেন মৌলিক বিভাজনগুলোর সাথে লড়াই না করে উপরিতলের ধর্মীয় বিভাজন দূর করা যাবে না। আরএসএসকে হারানোও যাবে না। কিন্তু সে ক্ষমতা তাঁর তো নেই বটেই, তাঁর দলেরও নেই। প্রাক-স্বাধীনতা যুগের কংগ্রেস বা লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সময়কার কংগ্রেসেও দেশের ধনীদের যথেষ্ট উপস্থিতি থাকলেও সাধারণ, গরীব মানুষের সাথে কিছু সংযোগ ছিল। ইন্দিরার সময় থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়েছে, যার শীর্ষবিন্দু ছিল জরুরি অবস্থা। কিন্তু সে আমলেও অর্থনৈতিকভাবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের রাস্তায় থাকার প্রচেষ্টা ছিল। রাজীবের সময় থেকে তা-ও কমতে শুরু করে, নরসিমা-মনমোহনে এসে কংগ্রেসের সর্বার্থে উচ্চকোটির দক্ষিণপন্থী পার্টি হওয়া শুরু হয়। আবার নরসিমার এক সময়কার মিডিয়া উপদেষ্টা পিভিআরকে প্রসাদ লিখেছেন, নরসিমার নাকি ইচ্ছে ছিল বিজেপির আগেই অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করা। সেই উদারপন্থী অর্থনীতি আর হিন্দুত্বের সহাবস্থানের গল্প। এমনি এমনি তো তাঁকে ভারতের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বলেন না কেউ কেউ। কংগ্রেস এখনো সেই পথেই চলেছে, রাহুল একা চাকা উল্টোদিকে ঘোরাবেন কী করে?

তাহলে আরএসএসের বিরুদ্ধে সামাজিক লড়াই লড়বে কারা? লালুপ্রসাদ, মুলায়ম সিং, মায়াবতীদের রাজনীতি নির্বাচনী লড়াইয়ে আর ফল দিচ্ছে না মানে তো এই নয়, যে দেশের নিম্নবর্গীয় মানুষ এখন খুব ভাল আছেন। জাতপাতের বৈষম্য বরং গভীরতর হয়েছে, শ্রেণিবৈষম্যের কথা আগেই বলেছি, আর ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য তো ভয়াবহ স্তরে পৌঁছেছে। এইসব বৈষম্যের বিরুদ্ধে একযোগে লড়ার নতুন রাজনীতি করবে কারা?

কেবল ভোটের পাটিগণিতে কিন্তু এ আঁধার থেকে মুক্তির পথ পাওয়া যাবে না।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

হিজাব না হলেও হিজাবির পক্ষ নিতেই হবে আমাদের

২০০৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ ক্লাসের ছাত্র ছিলাম। একদিন রাখালদার ক্যান্টিনে কয়েকজন সহপাঠিনীর সাথে শাঁখা-সিঁদুর নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার বক্তব্য ছিল, ওগুলো পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের চিহ্ন, অতএব বর্জনীয়। তাদের বক্তব্য ছিল, শাঁখা-সিঁদুর পরলে সুন্দর দেখায়, তাই ওগুলো ভাল। এর অর্ধ দশক পরে আমরা সকলেই বিয়ে করেছি। সেদিনের বন্ধুদের সাথে ২০০৫ সালের পর আর সাক্ষাৎ হয়নি, কিন্তু তারা কেউ বৈপ্লবিক হয়ে উঠে শাঁখা-সিঁদুর ত্যাগ করেছে এমন সংবাদ পাইনি। আমি নিজে মন্ত্র পড়ে বিয়ে করব না, এই দাবিতে কিঞ্চিৎ ধুলো ওড়ানোর পর মন্ত্র পড়েই বিয়ে করেছি। বেঁকে বসেছিলাম বলে আমৃত্যু প্রগতি চর্চা করা, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টি করা আত্মীয়রা, কোন মন্ত্রের কী মাহাত্ম্য, কেন মন্ত্র না পড়লে বিয়ে সম্পূর্ণতা পায় না — এসব বুঝিয়েছিলেন। বিয়ের পরে বউয়ের শাঁখা-সিঁদুর পরাও বন্ধ করতে পারিনি। আমার মত অসংখ্য পুরুষ এরপরেও নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ (কেউ কেউ নাস্তিক) বলে। তাতে খুব একটা দোষ দেখি না, কারণ ‘ফিমেল এজেন্সি’। ভারতীয় উপমহাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের উচ্চবর্গীয় পুরুষ আমরা। ‘ফিমেল এজেন্সি’ কথাটা ২০০৩ সালে আমার জানাই ছিল না, পরবর্তীকালেও আমার মাতৃভাষায় এই অর্থবোধক কোনো শব্দবন্ধের সন্ধান পাইনি। তাই আমাদের ধারণায় শাঁখা-সিঁদুর কেউ পরে না, সর্বদাই পরানো হয়। হিজাব বা বোরখাও পরানো হয়। কিন্তু বর্তমান বিতর্কে যা জরুরি, তা হল বাঙালি হিন্দু উচ্চবর্গীয় মহিলা ও পুরুষরা অনেকে শাঁখা-সিঁদুর পরায় ফিমেল এজেন্সি থাকে মানলেও হিজাব বা বোরখা পরায় ফিমেল এজেন্সি থাকতে পারে তা মানেন না। ফলে যে মুসলমান পুরুষের বাড়ির মেয়ে, বউরা হিজাবি, তারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বা নাস্তিক বললে আমরা হাসাহাসি করি। অতএব কর্ণাটকে যা হচ্ছে, তাকে কেবল লিঙ্গ রাজনীতি দিয়ে বিচার করে স্রেফ রাষ্ট্র মেয়েদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে বলে চেঁচামেচি করা মস্ত ফাঁকি। আসলে রাষ্ট্র মুসলমানদের কোণঠাসা করছে, মুসলমান মেয়েদের লেখাপড়া করার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।

কর্ণাটক সরকার ইতিমধ্যেই রাজ্যের স্কুল, কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে কয়েক দিনের জন্য, এবং গতকাল কর্ণাটক হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ঋতুরাজ আওয়াস্তির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ হিজাবি ছাত্রীদের পিটিশনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হিজাব বা বোরখা এবং গেরুয়া বস্ত্র — কোনোটাই পরা যাবে না, এমন বলেছেন। ছাত্রীদের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে এবং দেবদত্ত কামাথ প্রতিবাদ করেন। তাঁদের বক্তব্য, এমন রায় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের স্বাধীন ধর্মাচরণের অধিকার লঙ্ঘন করে। কিন্তু বিচারকরা রাজ্যে শান্তি ফেরাতে চান, এই যুক্তিতে দু পক্ষকেই ধর্মীয় পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ প্রথমত, সাংবিধানিক অধিকার স্থগিত রাখা চলে — এমন দৃষ্টান্ত তৈরি হল। দ্বিতীয়ত, একটা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার একটা ধরনকে তাদের উত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি বিশেষ আচরণের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে দেওয়া হল। এমনটা করা হল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মেয়ের স্কুল, কলেজে পড়ার অধিকারকে বিপন্ন করে। নিঃসংশয়ে বলা যায়, হিন্দু মেয়েদের পড়ার অধিকার একটা গোটা রাজ্যে একদিনের জন্যও বিপন্ন হলে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” চিৎকারে কান পাতা দায় হত। তখন বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাস রাখা ইত্যাদি ভাল ভাল কথা কারোর খেয়াল থাকত না। টিভি চ্যানেল, সোশাল মিডিয়া, রাস্তাঘাট — সর্বত্র চর্চা হত দেশটা জেহাদিদের হাতে চলে গেছে। কেউ স্বেচ্ছায় হিজাব/বোরখা পরুক আর অনিচ্ছায় পরুক, লেখাপড়া করতে হলে ওটা ত্যাগ করে স্কুল কলেজে আসতে হবে — এই বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য তার লেখাপড়া নিশ্চিত করা নয়, তার লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।

জনপ্রিয় স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরা তাঁর এক শোতে বিজেপি সরকারের তিন তালাক নিষিদ্ধ করা নিয়ে বলেছিলেন, আইনটা পাস হওয়ার পর বিজেপির লোকেদের ঢাকঢোল নিয়ে উল্লাস করতে দেখে ভাবলাম, এরা তো মুসলিম মহিলা নয়! এদের এত উল্লাসের কারণ কী? তারপর বুঝলাম, এরা মুসলিম মহিলাদের ক্ষমতায়নে উল্লসিত নয়। এরা আসলে মুসলিম পুরুষদের বিশেষ সুবিধা চলে যাওয়া উদযাপন করছে। হিজাব বিতর্কেও এ কথা মনে রাখা জরুরি। মুসলমান মেয়েদের হিজাব পরে পড়াশোনা করতে না দেওয়া মানে হিন্দুত্বের এক ঢিলে অনেক পাখি মারা।

শাঁখা-সিঁদুর, ঘোমটা চালু করেছিল পুরুষরা, হিজাবও তাই। অতএব মুসলমান মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদেরও বুঝিয়ে দেওয়া হল, “তোদের মেয়েদেরও আমাদের মর্জি মত চলতে হবে। দ্যাখ কেমন লাগে।” কর্ণাটক হাইকোর্টের মামলার রায় কী হবে জানা নেই, কবে হবে তা-ও অনিশ্চিত। ভারতীয় আদালত “তারিখ পে তারিখ”-এর জন্য প্রসিদ্ধ। তার উপর রায়ে যে পক্ষ অসন্তুষ্ট হবে, তারা হয়ত উচ্চতর আদালতে যাবে। মামলা যত দীর্ঘ হবে, মেয়েগুলোর স্কুল কলেজে যাওয়া তত বেশিদিন বন্ধ থাকবে। ইতিমধ্যে অন্যান্য রাজ্যেও একই হুজ্জত শুরু হবে। উপরন্তু, এরপর দাবি উঠবে হিজাব/বোরখা পরে চাকুরিস্থলেও যাওয়া চলবে না। সব মহিলাই মুসকানের মত অসমসাহসী এমন ভাবার কারণ নেই। তাছাড়া আমরা ভিডিওতে দেখেছি, কিছু ছাত্রছাত্রী হিজাবি মেয়েদের নিজেদের নিরাপত্তায় ঘিরে রেখে কলেজ থেকে বার করে নিয়ে যাচ্ছে। অফিস কাছারিতে তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। স্কুল কলেজের পড়ুয়াদের চেয়ে বড়রা বরাবরই বেশি সাম্প্রদায়িক। তার উপর আছেন কতিপয় প্রগতিবাদী। তাঁরা দাড়ি চুলকে বোঝাতে বসবেন, কেন হিজাব প্রতিক্রিয়াশীল, অতএব ওটা ত্যাগ করেই চাকরি করতে বেরোনো উচিত। ঠিক যেমন সবরিমালা মন্দিরে মহিলাদের ঢুকতে দেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ যখন কেরালা সরকার বলপূর্বক বলবৎ করছিল, তখন অনেক প্রগতিবাদী জোর তর্ক করছিলেন, মন্দিরে ঢোকা ব্যাপারটাই প্রতিক্রিয়াশীল। একটা কমিউনিস্ট সরকার কেন এতে মদত দেবে? অর্থাৎ মহিলারা মন্দিরে ঢুকতে চাইলেও সে ইচ্ছার মূল্য নেই। পুরুষরা প্রগতিশীলতার যে সংজ্ঞা ঠিক করবেন মহিলারা তার বাইরে কিছু ভাবলে তা প্রগতিশীলতা নয়।

বর্তমান বিতর্ক যে হিজাবে থামবে না, মহিলাদের দমন করাতেও নয়, সেটা কিন্তু বুঝে নেওয়া দরকার। সন্দেহ নেই ক্রমশ হিন্দু মহিলারা কী পরে বাইরে বেরোবেন তা নিয়েও গুন্ডামি প্রেরিত বিতর্ক তৈরি করা হবে, কারণ মৌলবাদ এবং সংখ্যাগুরুবাদ তার নিজের সম্প্রদায়ের মহিলাদেরও বন্ধু হয় না। কিন্তু উপস্থিত এ দেশের সংখ্যাগুরুবাদের পাখির চোখ মুসলমানের অধিকার হরণ। অতএব কিছুদিন পর মুসলমান পুরুষের ফেজ পরা নিয়েও আপত্তি করা হবে। বাড়িতে ফেজ পরো, অন্যত্র নয় — এমন বলা হতে পারে। তারপর বলা হবে অত ইঞ্চির বেশি দাড়ি রাখা যাবে না। যে প্রগতিশীলরা আজ ফিমেল এজেন্সিকে পাত্তা দেন না, সব ‘চয়েস’ মেনে নেওয়া যায় না বলেন — তাঁরা সেদিনও নির্ঘাত বলবেন ফেজ পরা আসলে পশ্চাদপরতা, সুতরাং বর্জনীয়। লম্বা দাড়ি রাখার অপকারিতা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের টিভি চ্যানেলে অনায়াসে বিতর্ক চলতে পারে, উত্তর সম্পাদকীয় কলমে লেখালিখি হতে পারে, ছন্দ মিলিয়ে মিষ্টি কবিতাও লেখা হবে নিশ্চয়ই। সে কবিতা ফেসবুকে ভাইরালও হবে। রাজ্য সরকার হয়ত বলবে “আমরা সব ধর্মকে সমান গুরুত্ব দিই। তাই দাড়ি কাটায় বিশেষ ভর্তুকি দেওয়া হবে।” কারণ বাংলা প্রগতিশীল মানুষের রাজ্য।

সন্ধে হলেই বাংলা মেগাসিরিয়ালে দেখা যায় সম্ভ্রান্ত হিন্দু উচ্চবর্ণ একটা লোকের দুটো বউ — একজন স্বীকৃত, আরেকজন এমনি এমনি। দুজনের মধ্যে তীব্র রেষারেষি চলছে, চিত্রনাট্য এমনি এমনি বউয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল। স্বীকৃত বউ মানেই দজ্জাল, কুটিল। আবার যে সিরিয়ালের চিত্রনাট্য স্বীকৃত বউয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল, সেখানে যত দোষ অন্য মহিলাটির। দুটি ক্ষেত্রেই বাবুটি ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানেন না, নেহাত ছলাকলায় পা হড়কে গেছে। এ সম্পর্কে পরিবারের অন্যরা, এমনকি রেজিস্টার্ড স্ত্রীও দেখা যায় নিঃসন্দেহ। শ্বশুরমশাই অকালকুষ্মাণ্ডটিকে ত্যাজ্যপুত্র করতে চাইলেও স্ত্রী বাধা দেন। তাতেই প্রমাণ হয় তিনি কত মহান। ভদ্রজন হাঁ করে এসব গেলেন, তারপর বোরখা পরা বা লম্বা দাড়ির মুসলমান দেখলে বলেন “ওরা ভীষণ গোঁড়া, ব্যাকডেটেড।”

কর্ণাটকের হিজাব কাণ্ডে বোধহয় একটাই লাভ হয়েছে। আক্রমণটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে যাওয়ায় আমাদের কারো কারো শিরদাঁড়া দিয়ে শেষপর্যন্ত ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেছে। আমাদের খেয়াল হয়েছে “এভাবেই শুরু হয়”। ব্যাপারটা ভাল। কারণ কবি বলেছেন, আসলে রাত্রির অবসানে প্রভাত হয় না। যখন চিত্ত জাগে, তখনই প্রভাত হয়। কিন্তু সত্যি কথাটা হল, শুরু অনেক আগেই হয়েছে। আমরা ঘুমোচ্ছিলাম।

সারা ভারতে গরুর মাংস খাওয়া বা নিয়ে যাওয়া বা বিক্রি করার অপরাধে কতজন মুসলমানকে পিটিয়ে মারা হয়েছে — এখন আর তার সঠিক হিসাব পাওয়া মুশকিল হবে। সোশাল মিডিয়ায় “মুসলমান বিক্রেতার থেকে জিনিস কিনবেন না, ওদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করুন” বলে ডাক দেওয়া হয়েছে। সে ডাক একেবারে বৃথা যায়নি। লকডাউনের সময়ে মুসলমানরাই করোনা ছড়াচ্ছে, এরকম প্রচারের জেরে পশ্চিমবঙ্গেও কোনো কোনো এলাকায় মুসলমান ফলওয়ালা, সব্জিওয়ালাকে খেদিয়ে দেওয়ার ঘটনা শোনা গেছে। মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করা হয়েছে। প্রথমে দেশব্যাপী আন্দোলন, তারপর অতিমারীর ধাক্কায় সরকার সে আইন প্রয়োগ করে উঠতে পারেনি। বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত, নিজস্ব স্বর আছে এবং হিজাব বা বোরখা পরেন না — এমন মুসলমান মহিলাদের ছবি নিয়ে তাঁদের কাল্পনিক অনলাইন নিলামও হয়েছে।

কিন্তু আমাদের অনেকেরই এতদিন বক্তব্য ছিল, ওসব মুসলমানদের সমস্যা, ওরা বুঝুক গে। এবার বোধহয় একটা মেয়েকে এক পাল ছেলের তাড়া করা দেখে খেয়াল হয়েছে, কলেজে ওই মেয়েটার মত বোরখা বা হিজাব পরা মেয়ের সংখ্যা কম, আমাদের ছেলেমেয়েরাই বেশি। কলেজ গুন্ডামির জায়গা হয়ে উঠলে, এসবের জেরে বন্ধ হয়ে থাকলে আমাদের ছেলেমেয়েদেরও বিপদ। অবশ্য খেয়াল যে হয়েছে, এ হয়ত আমার কল্পনাবিলাস। শুরু যেভাবেই হোক, শেষ যে এভাবে হয় না ইতিহাসে তার প্রমাণ আছে। এখনো যদি না সকলে না বুঝি, যে হিজাবের না হলেও হিজাবির পক্ষ নিতেই হবে, তাহলে আমাদের শেষটাও একইভাবে হবে।

তথ্যসূত্র:

১। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি টুইটার থেকে

রাজ্যের করোনা সামলানো দেখে হাসছে পাশবালিশ

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি ইন্টারনেট থেকে

২০২০ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন “করোনাকে পাশবালিশ করে নিন।” অর্থাৎ করোনা থাকবে, করোনাকে নিয়েই চলতে হবে। তখন করোনার প্রথম ঢেউ চলছে, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়নি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation) থেকে শুরু করে কোনো দেশের কোনো দায়িত্বশীল সংস্থাই করোনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর সেই মন্তব্য অনেককেই বিস্মিত করেছিল, মন্তব্যের সমালোচনা হয়েছিল, বিলক্ষণ হাসিঠাট্টাও হয়েছিল। কেউ কেউ অবশ্য চোখের সামনে গাদা গাদা মানুষকে মরতে দেখেও দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন, যে করোনা কোনো রোগই নয়, স্রেফ চক্রান্ত। এঁদের মধ্যে যাঁরা দক্ষিণপন্থী তাঁরা বলতেন চীনের চক্রান্ত, আর বামপন্থীরা বলতেন স্বৈরাচারী শাসকদের গণতন্ত্র ধ্বংস করার চক্রান্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অতি বিচক্ষণ বলেই পাশবালিশের পরামর্শ দিয়েছেন, এ কথা সেইসময় জোর গলায় একমাত্র ওঁরাই বলেছিলেন। পরে যখন বিজ্ঞানীরা বললেন অন্য অনেক ভাইরাসের মত করোনাও ক্রমশ শক্তি হারিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মত হয়ে যাবে কিন্তু মরবে না, তখন ওঁরা সোল্লাসে বলেছিলেন, হুঁ হুঁ বাওয়া, আমরা তখনই জানতুম। মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে হাসাহাসি করা? উনি কি না জেনে কথা বলেন?

এখন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস, সারা পৃথিবীতে ভ্যাক্সিন দেওয়া চলছে। এ দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখের মধ্যে সকলকে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেওয়া না হয়ে থাকলেও অনেক মানুষ ভ্যাক্সিন পেয়েছেন। কোনো কোনো দেশে বুস্টার ডোজও দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বহু প্রাণ নিয়ে চলে গেছে, ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের হাত ধরে তৃতীয় ঢেউ এসে পড়েছে। অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে ভাইরাসটা ছড়াচ্ছে আগের চেয়েও দ্রুত, কিন্তু ক্ষতি করার শক্তি আগের চেয়ে কম। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যা কম, মৃত্যুহারও কম। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ তাদের মতে আমাদের হাতে ওমিক্রন সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট তথ্য নেই।৩ কিন্তু যা নিশ্চিত, তা হল শিশুদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মত অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওমিক্রন বলে নয়, অতিমারির শুরু থেকেই দেখা গেছে খুব কম শিশুকেই কোভিড-১৯ কাবু করতে পারছে। তবু পশ্চিমবঙ্গের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছে না। অর্থাৎ করোনাকে পাশবালিশ করে নেওয়ার ক্ষমতা যাদের সবচেয়ে বেশি, তাদেরই বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর ভাইরোলজি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান সম্পর্কে যাঁরা দু বছর আগে নিঃসন্দেহ ছিলেন, এখন দেখা যাচ্ছে তাঁরাই স্কুল কেন খোলা হল না, যেটুকু খোলা হয়েছিল সেটুকুও কেন বন্ধ করে দেওয়া হল — তা নিয়ে বিস্তর রাগারাগি করছেন।

বাকি পৃথিবীর গবেষণা যা-ই বলুক, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে। লোকাল ট্রেন বন্ধ রেখে বা কমিয়ে দিয়ে রাস্তাঘাটের ভিড় কমানোর ভাবনা কতটা হাস্যকর তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। বরং স্কুল খোলা সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার।

১ নভেম্বর ২০২১ থেকে দিল্লিতে সমস্ত ক্লাসের জন্য ৫০% হাজিরার শর্তে স্কুল খুলে গিয়েছিল, গত কয়েকদিন করোনা আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে কোভিড বিধি মেনে খুলে গিয়েছিল কেরালার স্কুলগুলোও।৫ কর্ণাটকে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়েছিল ২৫ অক্টোবর। সম্প্রতি আক্রান্ত বাড়তে থাকায় অনেক স্কুলে বড়দিনের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। মহারাষ্ট্রে হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস শুরু হয়েছিল অক্টোবর মাসের গোড়াতেই, প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্লাস শুরু হয়েছে ডিসেম্বরে।৭ পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চালু হয়ে গিয়েছিল ২ আগস্টেই, দীপাবলির পর থেকে নীচু ক্লাস এবং প্রাথমিক স্কুলগুলোও খুলেছে। বলাই বাহুল্য, প্রয়োজন হলে সব রাজ্যের সরকারই ফের স্কুল বন্ধ করার নির্দেশ দেবেন। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হল, এতগুলো রাজ্যে সমস্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিচক্ষণ মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভোটকর্মী হতে হবে বলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছিল। যাঁরা সে যাত্রায় ভ্যাক্সিন পাননি, তাঁদেরও সরকার চাইলে সত্বর ভ্যাক্সিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতেন। তারপর স্কুল খোলা যেতে পারত। সেসব করা হয়নি। সুতরাং মনে করা অমূলক নয় যে দিল্লির আপ সরকার, মহারাষ্ট্রের শিবসেনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, ঝাড়খণ্ডের জেএমএম-কংগ্রেস সরকার, এমনকি কর্ণাটকের বিজেপি সরকারেরও স্কুলশিক্ষা নিয়ে মাথাব্যথা আছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের নেই।

মুখ্যমন্ত্রী যে করোনাকে পাশবালিশ করে ফেলতে বলেছিলেন, সেটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয়। অন্তত পশ্চিমবঙ্গে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই করোনাকে বুকে জড়িয়েই এগোনো হয়েছে, যেমন নির্বাচন। ২০২০ সালের মার্চের পর থেকে স্কুল, কলেজ একটানা বন্ধ থেকেছে; এই কয়েক মাসের জন্য খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল। রাজ্যের সবচেয়ে বড় দুটো পরীক্ষা — মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক— বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচন হয়েছে যথাসময়ে, ভরপুর প্রচার সমেত। কেবল বিধানসভা নয়, সামান্য দেরিতে হলেও কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। রাজ্যের বাকি কর্পোরেশন এবং ছোট পৌরসভাগুলোর নির্বাচনও পাশবালিশ নিয়ে খেলতে খেলতেই হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। বড়দিন, নতুন বছর উদযাপন করতে যারা পার্ক স্ট্রিটে ভিড় জমিয়েছিল, তাদের পাশবালিশের অধিকারকেও সরকার সম্মান দিয়েছেন। গঙ্গাসাগরের তীর্থযাত্রীদেরও পাশবালিশের অধিকার সুরক্ষিত।

স্কুল, কলেজ ফের বন্ধ করে দেওয়ায় যে ক্ষতি তার তবু কিছুটা পরিমাপ হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সমাজসেবী সংস্থার কল্যাণে এবং কিছুটা সোশাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা জানতে পেরেছি বিশেষত গ্রামাঞ্চলে স্কুলশিক্ষার কী অপরিসীম ক্ষতি এর মধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হয় যে মেয়ে, তার বিয়ে হয়ে গেছে — এমন খবরও আমাদের অজানা নেই। কিন্তু যে ক্ষতির কোনো পরিমাপ হয়নি, হয়ত হবেও না, তা হল মাসের পর মাস লোকাল ট্রেন বন্ধ করে রাখার ক্ষতি। কেবল শহর ঘেঁষা মফস্বল নয়, দূর গ্রামেরও বিপুল সংখ্যক মানুষকে রুটিরুজির জন্য নিত্য কলকাতায় আসতে হয়। সেই আসা যাওয়ার প্রধান মাধ্যম হল হাওড়া, শিয়ালদা থেকে ছাড়া লোকাল ট্রেন। শুধু যাত্রীদের কথা বললেও সবটা বলা হয় না। এই লোকাল ট্রেনে হকারি করে দিন গুজরান হয় বহু মানুষের। লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখা মানে তাঁদের জীবিকারও সর্বনাশ করা। মার্চ ২০২০ থেকে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত কতজন লোকাল ট্রেনের হকার আত্মহত্যা করেছেন তার কোনো পরিসংখ্যান কখনো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর অনাহারে মৃত্যু বলে তো এ দেশে, এ রাজ্যে কিছু হয় না আজকাল। রাত দশটা অব্দি লোকাল ট্রেন চললে আশা করি হকাররা সপরিবারে অন্তত অর্ধাহারের উপযোগী রোজগার করতে পারবেন।

তা এসবের প্রতিকার কী? প্রতিকার নেই। কারণ কোনো সরকার যখন পাশবালিশের বেশি ভেবে উঠতে পারে না, তখন খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্যের কথা বলার দায়িত্ব নিতে হয় বিরোধীদের। অধিকার কী তা যখন মানুষ ভুলে যায়, গণতন্ত্রে তা মনে করিয়ে দেওয়ার, অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার দায়িত্ব বিরোধীদের। কিন্তু এ রাজ্যের বিরোধীরাও নিজ নিজ পাশবালিশ নিয়ে ব্যস্ত। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির পাশবালিশ হল হিন্দুত্ব। স্কুল, কলেজ, লোকাল ট্রেন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। উপস্থিত লোকলস্করও নেই, কারণ অনেকেই এসেছিল তবু আসে নাই। নির্বাচনের পর তৃণমূলে ফিরে গেছে। আর যে বিরোধীরা বিধানসভায় আসনের নিরিখে শূন্য হলেও এখনো কিছুটা লোকবলের অধিকারী, তাদের পাশবালিশ হল সোশাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটার খুললেই সিপিএম নেতা, কর্মীদের পোস্ট দেখে জানা যাচ্ছে (১) স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখা হীরক রাজার পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার সমতুল্য এবং একই উদ্দেশ্যে করা; (২) পশ্চিমবঙ্গের গোটা গোটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর ফলে; (৩) লোকাল ট্রেন কমালে আরও বেশি ভিড় হবে, তাতে বরং সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আরও নানা কথা যা সকলেরই জানা আছে। বিকল্প বামেরাও ফেসবুক বিদীর্ণ করে এসব বলছেন, সঙ্গে থাকছে করোনা কীভাবে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছে তার উল্লেখ।

উভয় পক্ষই যা বলছেন সঠিক বলছেন, কিন্তু মুশকিল হল সোশাল মিডিয়ায় ওসব লেখার জন্যে তো আমাদের মত অক্ষম নিষ্কর্মারা রয়েছে। বিরোধী রাজনীতির লোকেদের তো এগুলো নিয়ে রাস্তায় নামার কথা। কোথায় আইন অমান্য? কোথায় স্কুল খোলার দাবিতে নবান্ন অভিযান? কোথায় লোকাল ট্রেন যেমন চলছিল তেমন রাখার দাবি নিয়ে রাস্তায় বসে পড়া? সুজনবাবু, সেলিমবাবু, সূর্যবাবুরা মমতা ব্যানার্জির ভূমিকার নিন্দা করে এন্তার লাইক কুড়োচ্ছেন। দীপঙ্করবাবু সর্বভারতীয় নেতা, ফলে ওঁর নীরবতা নিয়ে অভিযোগ করা চলে না। উনি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে টুইট করার মধ্যেও যাননি গত কয়েক দিনে। নেতারা যে পথে চলেন, স্বাভাবিকভাবে কর্মীরাও সে পথেই চলবেন। ফলে সোশাল মিডিয়ায় সরকারের অগণতান্ত্রিকতা নিয়ে লেখালিখির পাশাপাশি বড়দিনে যারা ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল তাদের নির্বুদ্ধিতা, ভোগবাদ ইত্যাদিকে আক্রমণ করা চলছে। যেন ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফুর্তি স্থগিত করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব ছিল না, যেন সাধারণ মানুষ এতই অবাধ্য যে এ বছর সরকার পার্ক স্ট্রিটে সমস্ত উদযাপন বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিলেও বৈপ্লবিক কায়দায় সান্টা ক্লসের টুপি পরে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আরও মজার কথা, বিপ্লবীরা সেইসব দিন আনি দিন খাই লোকেদের কথা ভুলেই গেছেন, যাঁরা বছরের এই সময়টায় মানুষ ফুর্তি করতে বেরোয় বলে দুটো পয়সা রোজগার করতে পারেন।

রাজ্যের এই দুর্দশা দেখে কারোর হয়ত চোখে জল আসতে পারে, তবে হাসছে পাশবালিশ।

তথ্যসূত্র

১। https://bangla.hindustantimes.com/

২। https://timesofindia.indiatimes.com/world/rest-of-world/why-an-omicron-wave-may-not-be-as-severe-as-delta/articleshow/88498802.cms

৩। https://fortune.com/2021/12/30/omicron-less-dangerous-covid-too-soon-to-know-who-warns/

৪। https://www.livemint.com/news/india/all-schools-in-delhi-to-reopen-from-today-covid-19-guidelines-and-other-details-11635725583788.html

৫। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/kerala-schools-reopen-after-long-covid-19-break/articleshow/87463018.cms

৬। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/after-18-months-schools-reopen-across-maharashtra-for-physical-classes/articleshow/86745389.cms

৭। https://indianexpress.com/article/cities/pune/maharashtra-offline-classes-for-primary-schools-students-to-resume-december-1-7641081/

৮। https://www.indiatoday.in/education-today/news/story/jharkhand-schools-reopen-from-today-for-classes-9-to-12-1835746-2021-08-02

৯। https://www.news18.com/news/education-career/jharkhand-schools-to-open-and-close-at-8-am-and-noon-respectively-4557812.html

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

‘ন্যাশনাল আর্কাইভের অবলুপ্তি দেশটাকে শপিং মল বানানোর চক্রান্ত’

ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়াতে এমন বহু ছবি আছে যা আর কোত্থাও পাওয়া যায় না। সেগুলো কিন্তু বিনোদনের জন্য নয়, ইতিহাস বলেই রেখে দেওয়া হয়েছে।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। ছবি ইন্টারনেট থেকে

ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে আগামী মাসেই ফিল্মস ডিভিশনের সমস্ত শাখা, ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া এবং চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়াকে ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাথে জুড়ে দেওয়া হবে। নাসিরুদ্দিন শাহ, নন্দিতা দাস সহ প্রায় ৯০০ শিল্পী ও কলাকুশলী এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন। কেন এই সিদ্ধান্ত, কেনই বা প্রত্যাহারের দাবি? নাগরিক ডট নেটকে বিশদে বললেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

কেন্দ্রীয় সরকার ফিল্মস ডিভিশন, ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া এবং চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়াকে ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রায় ৯০০ জন শিল্পী, কলাকুশলী এর প্রতিবাদ করেছেন। এই সংস্থাগুলোকে মিলিয়ে দেওয়ার তাৎপর্য যদি একটু বুঝিয়ে বলেন। মানে সিনেমা জগতের লোকেরা কেন এর প্রতিবাদ করছেন?

প্রতিবাদ করার কারণ হল এটা শুধু নির্বুদ্ধিতা নয়, এটা রীতিমত চক্রান্ত — গোটা দেশটাকেই শপিং মল বানাবার চক্রান্ত। দেশে অ্যাকাডেমিক চর্চা বা মননে সরকার আর গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। সরকার মানে এখন বড়বাজার। ফিল্মস ডিভিশন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে সমস্ত ছবি বানিয়েছিল — পল জিলস, হরিসাধন দাশগুপ্তরা বানিয়েছিলেন — সেগুলো আমাদের ইতিহাসের অনেকখানি জুড়ে আছে। এক অর্থে বলা যায় আমাদের ইতিহাস অনেকটাই ফিল্মস ডিভিশনের ইতিহাস। তথ্যচিত্র বাণিজ্যলক্ষ্মীর প্রসাদ পায় না, ফলে তার সরকারি সাহায্য লাগবেই। এই কথাটা ইংরেজরা বুঝত তাদের দেশের ওয়ার টাইম ডকুমেন্টারি ফিল্ম ইত্যাদির কারণে। স্বাধীনতার পরে ভারত সরকারও বুঝতে পেরেছিল। ফলে অনেক অমূল্য রত্ন তৈরি হয়েছিল, যা আমাদের ইতিহাসকে চেনাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু আজকের শাসক ইতিহাসে বিশ্বাস করে না, প্রমোদে বিশ্বাস করে। এমন প্রমোদ যা সহজলভ্য এবং সহজপাচ্য। তাই তার ফিল্মস ডিভিশনের দরকারও নেই। সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষে এই আলোচনা করতে গিয়ে ভেবে দুঃখ হয়, এই ফিল্মস ডিভিশনের হয়েই সত্যজিৎ দি ইনার আই তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।

ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ওটা তো প্রকৃতপক্ষে জাতির ইতিহাস সংরক্ষণের জায়গা। এরপর তো শুনব কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম তুলে দেওয়া হয়েছে। কারণ অনেকটা জমি আছে, সেখানে একটা বিরাট দোকান করা যেতে পারে। একইভাবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালও তুলে দেওয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে সেই হীরালাল সেনের সময় থেকে শত শত ছবি হয়েছে। অথচ আমাদের দুর্ভাগ্য, ১৯৩১ সাল পর্যন্ত হওয়া ছবিগুলো প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। অতি কষ্টে ফিল্ম আর্কাইভে পি কে নায়ার সাহেব থাকায় দাদাসাহেব ফালকের ছবি উদ্ধার করা গিয়েছিল। এখন বিল্বমঙ্গল, দেবদাস — এইসব ছবিও পাওয়া যাচ্ছে। এই ছবিগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব যে বোঝে না তাকে তো বোঝানো সম্ভব নয়। সারা বিশ্বে সিনেমাকে বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় দলিল বলে মনে করা হয়। তাকে সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক — সকলেই গুরুত্ব দেন। তাই পৃথিবীর সমস্ত দেশে ফিল্ম আর্কাইভ আছে।

আর এখানে বলা হচ্ছে ফিল্মস ডিভিশন, ফিল্ম আর্কাইভে কর্মী ছাঁটাই করে সব এক ছাতার তলায় আনা হবে। যেন হকার্স কর্নার। আসলে এরপর আস্তে আস্তে ওগুলোর বেসরকারিকরণ করা হবে। সেটা করলে যা হবে, তা হচ্ছে দেশে একমাত্র বলিউডি ছবিই থাকবে। আঞ্চলিক ফিল্ম বা অন্যরকম ফিল্মের অস্তিত্ব মুছে যাবে। এ এক প্রবল দুর্যোগ। কর্মী সংকোচন হওয়ার ফলে বহু মানুষ যে কর্মহীন হয়ে পড়বেন সেটা তো দুর্যোগ বটেই, সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে যে দেশের ইতিহাসের উপর এত বড় আঘাত প্রায় নিঃশব্দে নেমে এসেছে।

পুনের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়াতে এমন বহু ছবি আছে যা আর কোত্থাও পাওয়া যায় না। সেগুলো কিন্তু বিনোদনের জন্য নয়, ইতিহাস বলেই রেখে দেওয়া হয়েছে। এসব জিনিস তো বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। বেসরকারি সংস্থা তো যা কিছু বাণিজ্যের প্রয়োজনে লাগে না, সেসব বাঁচিয়ে রাখবে না। সে তো বারীন সাহা, ঋত্বিক ঘটকের ছবি নিয়ে চিন্তা করবে না। এমনকি সত্যজিতের ছবি নিয়েও ভাববে না। সে কেবল কিছু তারকাখচিত ছবির যত্ন নেবে। তা-ও পুরনো হয়ে গেলে ফেলে দেবে, বড়জোর ডিজিটাল ফরম্যাটে দেখাবে। সেলুলয়েডে তোলা মূল ছবিগুলো আর পাওয়াই যাবে না।

আমাদের দেশে তো এগুলো তৈরি করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সুস্থ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত — এই ধারণা থেকে। তার পাশে আজকের এই সিদ্ধান্তগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

এগুলো করা হয়েছিল অনেকটা সোভিয়েত মডেলে। যেমন ১৯১৯ সালে লেনিনের প্রত্যক্ষ উৎসাহে সোভিয়েত রাশিয়ায় পৃথিবীর প্রথম ফিল্ম শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। আমাদের দেশে শুধু ফিল্মস ডিভিশন বা ফিল্ম আর্কাইভ নয়, ললিতকলা অ্যাকাডেমি বা সাহিত্য অ্যাকাডেমি তৈরি করার পিছনেও ছিল একই ভাবনা, যে এগুলোর সরকারি সাহায্য দরকার। ব্যবসায়ীরা এতে উৎসাহ দেবে না। কারণ, শাড়ির ব্যবসাকে ছোট না করেই বলছি, শাড়ির ব্যবসা আর রামকিঙ্কর বেইজের স্থাপত্য এক নয়। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় রামকিঙ্করকে ডেকে যক্ষ আর যক্ষিণীর মূর্তি তৈরি করানোর ভাবনা সরকারের মাথাতেই আসতে পারে, কোনো বেসরকারি সংস্থার নয়। ভারতের প্রথম সরকারের এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক ধারণা এবং রুচিবোধ ছিল বলেই ওসব হতে পেরেছিল। আজ সবকিছুই ন্যক্কারজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং যদি দেখি দেশটা ভাস্কর্যবিহীন কিছু পুতুলের দেশে পরিণত হয়েছে, তাহলে অবাক হব না। যা কিছু প্রাচীন তা-ই তো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। সংসদ ভবনটাকে বাতিল করে নতুন সংসদ ভবন হচ্ছে। কারণ একটা আলো ঝলমলে, চকচকে কিছু না করলে চলবে না। নবরূপায়ণ বলে একটা শব্দ তৈরি করা হয়েছে। হয়ত রামায়ণ, মহাভারতেরও নবরূপায়ণ করা হবে। ভাগ্যিস হরপ্পা, মহেঞ্জোদরো ভারতে নেই! থাকলে জালিয়ানওয়ালাবাগের মত তারও নবরূপায়ণ হত বোধহয়।

কিন্তু সিনেমা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিঘ্নিতও হতে পারে?

নিশ্চয়ই পারে, কারণ সরকার শেষপর্যন্ত একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যে কথা বারবার বলা দরকার, তা হল সরকার যে ধরনের কাজকে মদত দিয়েছে সেগুলো অন্য কোনোভাবে পুষ্ট হতে পারত না। ভারত সরকার কিন্তু সিনেমার জাতীয়করণ করেনি। সিনেমা শিল্প নিজের মতই চলেছে। উত্তম-সুচিত্রা, দিলীপকুমার-মধুবালার ছবিও তৈরি হয়েছে আবার সত্যজিৎ রায়দের ছবিও হয়েছে। কিন্তু ধরো, সরকার না থাকলে তথ্যচিত্রের দায়িত্ব কে নিত? তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অনেক পরিচালক একটা বিশেষ ধরনের ছবি করার সুযোগও পেয়েছেন সরকারের জন্যেই। যেমন ধরো, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানাবেন সত্যজিৎ — এ তো ভারতীয় বণিকদের কল্পনাতেও আসত না। এ দেশে কোনোদিন শিল্পবিপ্লব হয়নি, ফলে এ দেশের শিল্পপতিদের সেই রুচিবোধও নেই। একমাত্র টাটারাই শিল্প, সাহিত্যের ব্যাপারে কিছুটা উৎসাহ দেখিয়েছেন। কিন্তু তাঁরাও এত বড় নিয়োগকর্তা নন যে এত গভীরে মাথা ঘামাবেন। তাঁদের অগ্রাধিকার নিশ্চয়ই বাণিজ্য; হওয়াও উচিত তাই। কিন্তু সরকার যেহেতু জনগণের করের টাকায় চলে, সেহেতু সরকার পারে এমন শিল্পীকে সুযোগ দিতে, যার শিল্পের তেমন বাজার নেই। ধরা যাক একটা স্টিল প্ল্যান্ট বানালে সরকারের যা আর্থিক লাভ হবে, রবীন্দ্রনাথের কবিতার বইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করলে তা হবে না। কিন্তু একটা দেশের তো রবীন্দ্রনাথের বই দরকার। তার পিছনে খরচ করা সরকারের কল্যাণমূলক কাজের মধ্যেই পড়ে।

ব্যাপারটা বোঝার জন্যে শিক্ষার দিকে তাকালেই হয়। শিক্ষার বেসরকারিকরণ করলে যা হয়, তা হচ্ছে যেসব বিষয় ব্যবসা বাণিজ্যে কাজে লাগে না সেগুলোকে পাঠ্যের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। হয়ত সিদ্ধান্ত হবে ব্যাঙ্কের হিসাবপত্রে যেটুকু অঙ্ক লাগে, তার বেশি পড়ানোর দরকার নেই। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা পড়ানোর দরকার নেই, কারণ ও দিয়ে ব্যবসার কোনো সুবিধা হবে না।

সুতরাং সরকার কোন ক্ষেত্রে বদান্যতা দেখাবে, কোথায় দেখাবে না — তা বিবেচনার বিষয়, কিন্তু বাতিল করে দেওয়ার বিষয় নয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণ যাতে মাত্রাতিরিক্ত না হয়ে যায়, সে কথা ভেবেই তো সাহিত্য অ্যাকাডেমিকে পুরোপুরি সরকারি সংস্থা না করে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আধা-সরকারি সংস্থা হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। সাহিত্য অ্যাকাডেমি ছিল বলে কিন্তু ভারতের আঞ্চলিক ভাষাগুলো পুষ্ট হয়েছে। যেমন অ্যাকাডেমির প্রথম সভাপতি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই রাজস্থানি ভাষা যে হিন্দি নয়, আলাদা ভাষা, তা নির্ণীত হয়েছিল এবং সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছিল। মানে ফিল্মস ডিভিশন বা সাহিত্য অ্যাকাডেমি জাতীয় সংহতির জন্যেও জরুরি। মুখে জাতীয় সংহতির কথা বলব আর কাজে দেশের একটা অঞ্চলের একটা ভাষা, একটা সংস্কৃতিকেই জায়গা দেব — এ হতে পারে না।

সম্প্রতি সিনেমার সেটে উগ্র মতাবলম্বী লোকেদের আক্রমণ, ওয়েব সিরিজের নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কেস ফাইল হওয়া — এগুলোকে কি সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত, নাকি এগুলোকে নিছকই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখব?

একেবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বলা যেতে পারে সরকার দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এক দিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে দিচ্ছে, অন্য দিকে সামাজিক চাপ তৈরি করার জন্যে অন্য একদল লোককে দিয়ে সিনেমার লোকেদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। আসলে সব সরকার এবং সরকারি দলই চায় নিরঙ্কুশ মতপ্রকাশের অধিকার কেবল তাদেরই থাকুক, আর কারোর যেন না থাকে। এইভাবেই গণতন্ত্রের গাছটিকে একেবারে উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। সে চেষ্টা সফল হবে কিনা ইতিহাস বলবে, তবে নরকের দিকে এরকম ধীর, নিশ্চিত পদক্ষেপ আগে কখনো দেখা যায়নি।

এক দিকে সরকার সিনেমাকে যেটুকু সাহায্য করত সেটুকুও আর করতে চাইছে না, অন্য দিকে ফিল্ম সার্টিফিকেশনের আইনে বদল আনতে চাইছে। এই অবস্থায় ভারতীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ কেমন বুঝছেন?

মনে রাখা ভাল, এ দেশে সরকার কিন্তু সিনেমার ভাগ্যনিয়ন্তা ছিল না কোনোদিন। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো রাজ্য সরকার কিছু ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গ সরকার পথের পাঁচালী প্রযোজনা করেছিল। ঋত্বিকও এই সুযোগ পেয়েছেন; পরবর্তীকালে গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পেয়েছেন। সেটা উচিত কি অনুচিত তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু সিনেমা শিল্প নিজের মত করেই চলেছে, সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে নয়। তা সত্ত্বেও যে বর্তমান সরকার এই সমস্ত কাজ করছে তা থেকে এটাই প্রমাণ হয়, যে সরকার ফিল্মস ডিভিশন, আর্কাইভ, চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি — এসব তুলেই দিতে চায়। ভারতে শুধুমাত্র নাচগান, আজগুবি গল্পওলা সিনেমাই চলবে। আর কখনো ইতিহাস ধরে রাখার চেষ্টা করে হবে না।

সার্টিফিকেশনের আইন বদল করতে চাওয়ার অর্থ হল ইংরেজরা যাকে “no humiliation to Christ” নীতি বলত, সেই নীতি অবলম্বন করা হবে। সরকার যে ছবিকে ধর্মীয় রীতিনীতির উপযুক্ত মনে করে, সে ছবিই শুধু থাকবে, বাকি সব নিষিদ্ধ হবে। এ এক শ্বাসরোধকারী অবস্থা। দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবাংলার শিল্পীরা যে এ নিয়ে চিন্তিত এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না। পশ্চিমবাংলার মিডিয়াতেও এ নিয়ে তেমন চর্চা নেই। বাঙালির এইসব ব্যাপারে এমন নিষ্ক্রিয়তা কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

সম্ভাবনার কথা বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বও জানেন। তাই বাংলা দখলে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে থাকলেও, বাংলার রাজধানী দখল করতে উৎসাহ দেখা যায়নি।

ছবি ইন্টারনেট থেকে

“যা গেছে তা গেছে”। এখন ভবিষ্যতে কী হতে পারে তা আলোচনা করা যাক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন “অশান্তিতে তৃণমূল জড়িত আছে প্রমাণ দিতে পারলে দল ব্যবস্থা নেবে।”১ অশান্তির ভিডিও ফুটেজ থাকলে দেখাতে বলেছেন। যেন বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরায় ধরা পড়া ফুটেজগুলো যথেষ্ট নয়, সোশাল মিডিয়ায় যেগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলোও পর্যাপ্ত নয়। এর বাইরেও কিছু থাকলে তা দলকে দেখাতে হবে এবং ব্যবস্থাও দলই নেবে। প্রশাসনের কোনো দায়দায়িত্ব নেই, নির্বাচনের অসদুপায় অবলম্বন করা যেন আইনত অপরাধ নয়। অথবা হয়ত বুঝিয়েই দিলেন, দলই প্রশাসন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনের আগে অতীতের রিগিংয়ের জন্য যে ক্ষমা চাওয়া হয়েছিল তা যেমন লোক দেখানো ছিল, এই প্রতিশ্রুতিও তেমনই।

অতএব অদূর ভবিষ্যতে আর যা-ই হোক, এসব যারা করেছে তাদের শাস্তি-টাস্তি হবে না। অবশ্য বাংলার সরলমতি খ্যাতিমানরা, যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “ভিশনে” বিশ্বাস করেন, তাঁরা বাদে আর কেউ নির্বাচনের দিন গুন্ডামি করলে কারো শাস্তি হবে এরকম আশাও করেন বলে মনে হয় না। বাংলায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আমলে শুরু হয়েছিল যেন তেন প্রকারেণ জেতার জন্যে বাহুবল প্রয়োগ, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। এখানে কমবেশির প্রশ্ন তুললে চলবে না, কারণ বাঙালির মাত্রাজ্ঞান নেই। এখানে কারো কাছে ইন্দিরা গান্ধী ফ্যাসিবাদী, কারো কাছে জ্যোতি বসু ফ্যাসিবাদী, কারো কাছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ফ্যাসিবাদী, আবার কারো কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্যাসিবাদী। আবার সরকার বাঁচাতে গেলেও ফ্যাসিবাদের দোহাই দিতে হয়। তাই আপাতত মাত্রা বাদ দিয়েই নির্বাচনী প্রহসন ও তার ফলাফল নিয়ে কথা বলা যাক।

রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার পরিণাম কী হয়, তা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন ১৯৭৭ সালে। তাঁর দল কংগ্রেস তারপর থেকে ক্রমশ দুর্বল হতে হতে এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় অবলুপ্ত। একমাত্র ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জয়ী পক্ষে ছিল, কিন্তু সে জয়ের কৃতিত্ব সম্পূর্ণত তৃণমূল কংগ্রেসের। সেই তুলনায় সিপিএমের ক্ষয় দ্রুততর। পঞ্চায়েত নির্বাচনে মারামারি কাটাকাটি দিয়ে শুরু করে নির্বাচনী জোরজুলুম বাম আমলে শেষমেশ যতদূর পৌঁছেছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় মাত্র দশ বছরের মধ্যে বিধানসভায় শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা হয়ত নয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সাতাত্তরের সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি ছিল। প্রত্যাশা যত বেশি হয়, পূরণ না হলে হতাশা তত তীব্র হয়। তাছাড়া ৩৪ বছরের সরকার তো আর একটা কারণে পদচ্যুত হয় না। কিন্তু তৃণমূল সরকারের আমলে প্রথম নির্বাচনের সময় থেকেই জোরজুলুম সম্পর্কে সাধারণ্যে যে উদাসীনতা, তার পিছনে অবশ্যই আগের আমলের শেষ দিকের অভিজ্ঞতা সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে যে প্রজন্ম বাহাত্তর বা সাতাত্তর — কোনোটাই দেখেনি, তাদের মধ্যে। স্রেফ ইতিহাস দেখলে মনে হতে বাধ্য, একই পরিণাম একদিন তৃণমূল কংগ্রেসেরও হবে। কিন্তু সেভাবে ভাবলে ভুল হবে। সালটা ২০২১।

মানুষের রাগের উদ্গীরণ কোথাও না কোথাও হবেই, কারণ সেটা প্রাকৃতিক নিয়ম। নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকারের বারংবার অপহরণ দেখে ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ জানাবেন, সেসব দিন বহুকাল চলে গেছে। তার একটা বড় কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই। পৃথিবীর কোনোকালের কোনো আন্দোলন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। আন্দোলন গড়ে তুলতে হয় এবং গড়ে তোলার দায়িত্ব বিরোধী শক্তির। এ রাজ্যের বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে কংগ্রেস বাম আমল থেকেই নিষ্ক্রিয়; সিপিএম ও তার সঙ্গীদের যদি আন্দোলন কীভাবে গড়ে তোলা যায় তা মনে থাকত, তাহলে সারদা, নারদ, এস সি পরীক্ষার মত ইস্যুগুলো থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনের জেরে রাজ্য একদিনের জন্যেও অচল হল না — এমনটা হত না। উপরন্তু নির্বাচন ছাড়া অন্য সময়ে শাসক দলের হিংসার অভিমুখ বাম দলগুলোর কর্মী, সমর্থক আর ক্ষেত্র বিশেষে কংগ্রেসের কর্মী, সমর্থকদের দিকে যতটা থাকে, বিজেপির দিকে ততটা থাকে না। যেখানে থাকে সেখানে প্রায়ই দেখা যায় বিজেপির লোকেরা কিছুদিন আগেই তৃণমূলে ছিলেন, অথবা উল্টোটা। উপরন্তু, অর্থবল এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকার ফলে বিজেপি বাহুবলের দিক থেকেও কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ফলে আগামীদিনে বাম, কংগ্রেসই আরও শক্তিহীন, আরও নির্জীব হয়ে পড়লে দোষ দেওয়া যাবে না। হাতে রইল বিজেপি।

বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভাল ফল করার পরেও প্রধান বিরোধী দল বলতে যা বোঝায়, গত সাত মাসে বিজেপি তা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং তৃণমূলী নেতা, কর্মীতে নির্বাচনের আগে ফুলে ফেঁপে ওঠা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি ওঁদের প্রস্থানে গ্যাস বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেছে। কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচার পর্বে তারা যে নিষ্প্রভ ছিল, তা-ও সমস্ত সংবাদমাধ্যম এক বাক্যে স্বীকার করছে। গতকালের তাণ্ডব প্রতিরোধের চেষ্টাতেও যে বামেরা এবং কংগ্রেস বেশি সক্রিয় ছিল, বেশিরভাগ মানুষই তা মানছেন। তৎসত্ত্বেও বুথফেরত সমীক্ষার ফল বলছে, গোটা পনেরো আসন নিয়ে কর্পোরেশনে প্রধান বিরোধী দল হবে (একমাত্র বিরোধীও হতে পারে) বিজেপিই। স্রেফ হিন্দিভাষীরা ভোট দিচ্ছে, এই স্তোকবাক্যে নিজেদের সন্তুষ্ট না করলে মেনে নিতে হবে, যে ভোটাররা এখনো ভোট দিতে পারছেন তাঁরা বাম বা কংগ্রেসের চেয়েও বেশি আন্দোলনবিমুখ বিজেপিকেই বিরোধী হিসাবে দেখতে চাইছেন। কেন চাইছেন?

বিধানসভায় বিজেপি হারল, কারণ বাংলার মানুষ সাম্প্রদায়িকতাকে হারিয়ে দিলেন, ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিলেন — এ কথা যদি বিশ্বাস করে থাকি, তাহলে এখন কেবল যারা সাম্প্রদায়িক তারাই ওদের ভোট দিচ্ছে — এই অতি সরলীকরণ কিন্তু চলবে না। মানতে হবে, যে যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে এবং দলত্যাগে বিজেপি শক্তিহীন হয়ে গিয়ে থাক, যতই রাজ্যের মানুষের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে তাদের অনাগ্রহ থাক, প্রচারে যতই ঢিলে দিক, আগামীদিনেও তারাই বিরোধী ভোটগুলো পাবে। কারণ তারা কেন্দ্রের শাসক দল। সাধারণ ভোটার জানেন বিজেপির আর কিছু না থাক অর্থবল আছে। তাছাড়া রাজ্য নির্বাচন কমিশন পরিচালিত পৌর নির্বাচন বা পঞ্চায়েত নির্বাচনে যা-ই ঘটুক না কেন, আগামী লোকসভা নির্বাচন কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে হওয়া নিশ্চিত করা বিজেপির হাতে। নরেন্দ্র মোদী এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন, যে ভারতের নির্বাচন কমিশনারকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তলব করতে পারে এবং তিনি গিয়ে সুবোধ বালকের মত দেখা করে আসতে পারেন।২ যে মানুষ ভোট দিতে পারলেন না বলে রুষ্ট হলেন, তিনি যে লোকসভা নির্বাচনে “আর যাকেই হোক, তৃণমূলকে ভোট দেব না” ঠিক করে বুথে যাবেন না — এ গ্যারান্টি কি কেউ দিতে পারেন? সেক্ষেত্রে দু-এক শতাংশ আদর্শের প্রতি এখনো অচল নিষ্ঠায় অথবা স্মৃতিমেদুরতায় ভোগা লোক ছাড়া বাকিরা যে বিজেপিকেই ভোট দেবেন, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই সম্ভাবনার কথা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও বিলক্ষণ জানেন। তাই বাংলা দখলে এ বছরের শুরুতে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে থাকলেও, বাংলার রাজধানী দখল করতে তাঁদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখা যায়নি। ভাবছেন একটা কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারে দিল্লির বিজেপি নেতৃত্বের গুরুত্ব না দেওয়াই স্বাভাবিক? তাহলে স্মরণ করিয়ে দিই, গত বছর এই সময়ে হায়দরাবাদ কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রচারে অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, যোগী আদিত্যনাথ — সকলেই গিয়েছিলেন।৩ অর্থাৎ যে নির্বাচন তৃণমূল অমনিই জিতত, তার পিছনে বিজেপি শক্তি খরচ করল না। অন্যদিকে শুধু জয়ে আশ মেটে না বলে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যে তাণ্ডব চালাল, তাতে বিধানসভায় তৃণমূলে যাওয়া বেশকিছু ভোট বিজেপিতে ফেরত যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হল। এমনিতেই ইদানীং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, ভারতীয় ভোটাররা বিচক্ষণ হয়ে উঠেছেন। বিধানসভায় কে রাজ্য চালানোর পক্ষে যোগ্যতম তা ভেবে ভোট দেন, লোকসভায় অন্য কেউ দেশ চালানোর পক্ষে যোগ্যতম মনে হলে তাকেই ভোট দেন। এই বিশ্লেষণ যদি সত্যি হয়, তাহলেও ২০২১ বিধানসভার চেহারা দেখে ২০২৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল কেমন হবে তা আন্দাজ করা চলে না। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ভোটারদের সামনে থাকবে ইতিমধ্যে হওয়া নির্বাচনগুলোর স্মৃতি। সামনেই রাজ্যের আরও অনেকগুলো পৌরসভার নির্বাচন। সেখানেও গণতন্ত্রের এরকম উৎসবই চলবে আশা করা যায়। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের সম্প্রসারণ আরও চমৎকার হবে। দরিদ্রতম ভোটারকে মূর্খ মনে করার মূর্খামি যদি না করি, তাহলে বুঝব, সে লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময়ে এ কথা মনে রেখেই ভোট দেবে, যে এই নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দিলেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যেমন ছিল তেমনই থাকবে।

অতএব ২০২৪-এর রাজ্যওয়াড়ি ফলাফলে যদি দেখা যায় বিজেপির উত্তর ভারতের ঘাটতি পশ্চিমবঙ্গ কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছে, ফলাফলটা দেখতে অনেকটা ২০১৯-এর মতই লাগছে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেই ফলাফলের পর এ রাজ্যের বিজেপি বিরোধীরা কী করবেন? রামের ভোট কেন বামে ফিরল না তা নিয়ে চেঁচাবেন? নাকি মানুষ কেন এতকিছুর পরেও বিজেপিকে ভোট দেয় তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করবেন?

তথ্যসূত্র
১। আনন্দবাজার পত্রিকা
২। দ্য হিন্দু
৩। দ্য প্রিন্ট

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ইতিবাচক না লিখলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে না — এই ঘোষণা প্রমাণ করে অগণতান্ত্রিকতা জয়যুক্ত হয়েছে। এই জয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমের অবদানও ফেলে দেওয়ার মত নয়।

ব্যোমকেশ জানালার দিক্ হইতে চক্ষু ফিরাইয়া বলিল— “কিছুদিন থেকে কাগজে একটা মজার বিজ্ঞাপন বেরুচ্ছে, লক্ষ্য করেছ?”

আমি বলিলাম— “না। বিজ্ঞাপন আমি পড়ি না।”

ভ্রূ তুলিয়া একটু বিস্মিতভাবে ব্যোমকেশ বলিল— “বিজ্ঞাপন পড় না? তবে পড় কি?”

“খবরের কাগজে সবাই যা পড়ে, তাই পড়ি— খবর।”

“অর্থাৎ মাঞ্চুরিয়ায় কার আঙুল কেটে গিয়ে রক্তপাত হয়েছে আর ব্রেজিলে কার একসঙ্গে তিনটে ছেলে হয়েছে, এই পড়! ওসব পড়ে লাভ কি? সত্যিকারের খাঁটি খবর যদি পেতে চাও, তাহলে বিজ্ঞাপন পড়।”

— পথের কাঁটা (ব্যোমকেশ সমগ্র, আনন্দ পাবলিশার্স; পঞ্চদশ মুদ্রণ, মে ২০১১)

বাংলার সংবাদমাধ্যমের যা অবস্থা হয়েছে, তাতে আজও সত্য জানার আগ্রহে যাঁরা খবরের কাগজ পড়েন তাঁরা সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের সাথে এই প্রশ্নে একমত না হয়ে পারবেন না। তা বলে কখনোই কোনো কাজের খবর ছাপা হয় না বললে নিদারুণ অবিচার হবে। যেমন কয়েকদিন আগেই সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা সংবাদপত্রের সংক্ষিপ্ত খবরের স্তম্ভে একটি দারুণ কাজের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বয়ানটি এইরকম

‘পজিটিভ খবর’ ও সরকারি বিজ্ঞাপন

জেলার পত্র-পত্রিকা তথা সংবাদমাধ্যম উন্নয়নের খবর অনেক বেশি করে। তারা যাতে সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত না হয়, প্রশাসনকে তা দেখার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাওড়া শরৎ সদনে বৃহস্পতিবার জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, “পজিটিভ (ইতিবাচক) খবর করুন। বিজ্ঞাপন পাবেন।” প্রশাসনিক বৈঠকে এ দিন জেলার সংবাদমাধ্যমের তরফে এক জন প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রীকে জানান, তাঁদের আর্থিক অবস্থা সঙ্গিন। বারবার বলেও তাঁরা সরকারি বিজ্ঞাপন পাচ্ছেন না। বিষয়টি শুনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “নিশ্চয়ই বিজ্ঞাপন পাবেন। এলাকার উন্নয়নের খবর আপনারা ভাল করে করুন।” মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ছাপার পরে সেগুলি জেলাশাসক, পুলিশ সুপার ও স্থানীয় থানার আইসি-র কাছে পাঠাবেন। তাঁরা দেখে নেবেন, খবর ‘পজিটিভ’ না ‘নেগেটিভ’। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বড় সংবাদমাধ্যম এক দিন অল্প করে খবর করে। অনেক সময় ‘নেগেটিভ’ ভাবে প্রচারও করে। কিন্তু জেলার ছোট কাগজ সরকারের কাজের কথা গ্রামে গ্রামে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। সেই জন্যই তাদের বিজ্ঞাপন পেতে যাতে অসুবিধা না হয়, তা নজর রাখার জন্য প্রশাসনিক কর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সিপিএম ও বিজেপি নেতাদের মতে, জরুরি অবস্থার সময়ে সংবাদ প্রকাশের আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হত। এখন আবার ‘অন্য রকম জরুরি অবস্থা’ এসেছে, যখন বিজ্ঞাপনের জন্য সরকারের শংসাপত্র নিতে হবে।

এখন কী হয় জানি না, বছর দশেক আগেও খবরের কাগজে শিক্ষানবিশির সময়ে প্রথমেই শেখানো হত কী করে এরকম সংক্ষিপ্ত খবর লিখতে হয়। কারণ অনেকটা জায়গা জুড়ে হাজার-দেড় হাজার শব্দে প্রতিবেদন লেখা সহজ, এত অল্প পরিসরে সমস্ত কাজের কথা লিখে ফেলাই কঠিন। যেমন প্রতিবেদকের পক্ষে কঠিন, তেমনি প্রতিবেদন যে সম্পাদনা করে তার পক্ষেও কঠিন। ফলে এই কাজটা শিখে ফেললে বড় প্রতিবেদন লেখা বা সম্পাদনা করা জলভাত হয়ে যায়। সেদিক থেকে এই খবরটি (নিউজরুমের ভাষায় ‘ব্রিফ’) সাংবাদিকতার ক্লাসে পাঠ্য হওয়ার যোগ্য। মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যেকটি জরুরি বাক্য, রীতিমত ব্যাখ্যা সমেত ১৭৮ শব্দের মধ্যে ধরে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবেদকদের ছোট থেকে পই পই করে বলে দেওয়া হয়, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য যে কোনো খবরে সব পক্ষের বক্তব্য দেওয়া আবশ্যক। এখানে তা-ও করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সম্বন্ধে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির বক্তব্য তো লেখা হয়েছে বটেই, এমনকি শূন্য পাওয়া সিপিএমকেও বঞ্চিত করা হয়নি। রাজ্যের গণতন্ত্রের সামগ্রিক ছবি তুলে ধরার জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রতিবেদন গত দশ বছরের কাগজ ঘাঁটলেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

খবরটি থেকে কী কী জানা যাচ্ছে?

প্রথমত, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবরই করতে হবে। সরকারি আইন যা-ই বলুক, সরকারের সমালোচনা করলে, দোষত্রুটি ধরলে বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সরকারি বিজ্ঞাপন প্রকৃতপক্ষে সরকারি আনুকূল্য। সে বাবদ যে টাকা পত্রপত্রিকাগুলি পেয়ে থাকে তা করদাতার টাকা নয়, সরকারের পৈতৃক সম্পত্তি। সরকারের নেকনজরে থাকলে পাওয়া যাবে, নচেৎ নয়। এককথায়, সংবাদমাধ্যমকে সরকারি প্রচারযন্ত্র হয়ে উঠতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জেলার পত্রপত্রিকা, চ্যানেল ইত্যাদি সরকারের কাজের প্রচার অনেক বেশি করে। তার উপযুক্ত প্রতিদান যেন তারা পায়, তা দেখা সরকারি আধিকারিকদের কাজের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ জেলাশাসক যেমন খবর রাখেন জেলার কোথাও বন্যাদুর্গত মানুষ না খেয়ে আছেন কিনা, তেমনি তাঁকে খেয়াল রাখতে হবে জেলার কোনো কাগজ বন্যাত্রাণে সরকারের কাজের ঢালাও প্রচার করেও সরকারি বিজ্ঞাপন না পেয়ে আছে কিনা।

তৃতীয়ত, সংবাদমাধ্যম মুখ্যমন্ত্রীকে একজন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসক মনে করছে না। প্রশাসনিক বৈঠকে গিয়ে কেবল তাঁর কার্যকলাপের যথাযথ প্রতিবেদন তৈরি ও মূল্যায়ন তার কাজ নয়। মুখ্যমন্ত্রী মাইবাপ, তাই নিজেদের আর্জি পেশ করাও কাজ। বাঁচালে মুখ্যমন্ত্রীই বাঁচাবেন।

চতুর্থত, বড় সংবাদমাধ্যম সরকারের যথেষ্ট স্তুতি করছে না। এমনকি মাঝেমধ্যে নিন্দে-বান্দাও করছে। বাংলা যে সোনার বাংলা হয়ে উঠেছে, সে খবর গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিচ্ছে ছোট সংবাদমাধ্যমই। তারা সরকারকে দেখছে, অতএব তাদের দেখাও সরকারের কর্তব্য।

পঞ্চমত, সরকারের যথেষ্ট প্রশংসা করা হয়েছে কিনা তা ঠিক করবেন জেলাশাসক, পুলিস সুপার এবং স্থানীয় থানার আইসি। অর্থাৎ যাঁদের ফৌজদারি ক্ষমতা আছে। কিন্তু সরকারি যে দপ্তরগুলি আইনত বিজ্ঞাপন দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেগুলি এলেবেলে।

মোদ্দা কথা, পশ্চিমবঙ্গে এখন সরকারি বিজ্ঞাপন একটি ঘোষিত লাঠি, যা উঁচিয়ে সংবাদমাধ্যমকে সরকার নিজের ইচ্ছামত ওঠবোস করায়। ঘোষিত কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে তৈরি হওয়া দুটি প্রেস কমিশন দেশের সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন, সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার জন্য যা যা সুপারিশ করেছিল তার অনেককিছুই অনেক দলের সরকারই মানেনি। অনেক কথা সংবাদমাধ্যমও মানেনি। প্রেস কাউন্সিল নামে একটি ঠুঁটো জগন্নাথ আছে, তাদের কথাও দু পক্ষের কেউ শোনে না। এর উপর আছে সংবাদমাধ্যম চালানোর, বিশেষত খবরের কাগজ চালানোর, বিপুল খরচ। সেই সুবাদে গত ৭৫ বছর ধরে অনেক দলের অনেক সরকারই সরকারি বিজ্ঞাপনকে লাঠি হিসাবে ব্যবহার করেছে। যে কোনো গবেষক যে কোনো রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস আর সংবাদমাধ্যমগুলির সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার তথ্য পাশাপাশি রেখে পড়লেই তার অজস্র প্রমাণ পাবেন। কিন্তু প্রবল প্রতাপান্বিত নরেন্দ্র মোদীর সরকারের আগে কোনো সরকার রীতিমত আইন প্রণয়ন করে সংবাদমাধ্যমকে তোতাপাখি করে ফেলার চেষ্টা করেনি। ঠিক তেমনি, অন ক্যামেরা সরকারি বৈঠকে বসে, ইতিবাচক খবর করলে তবে সরকারি বিজ্ঞাপন দেব — এ কথা ঘোষণা করার সাহসও পশ্চিমবঙ্গে অতীতে কোনো মুখ্যমন্ত্রীর হয়নি।

যে কোনো কাজ, যা বরাবর লুকিয়ে করা হত, তা প্রকাশ্যে করা বিরাট পরিবর্তনের প্রমাণ। অন্য সম্প্রদায়ের লোকেদের নিয়ে ভিত্তিহীন, কুৎসিত আলোচনা ভারতীয়রা চিরকাল করে থাকে। কিন্তু ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত ওই সম্প্রদায়ের মানুষের সামনে করা হত না, এখন হয়। এ থেকে প্রমাণিত হয়, চক্ষুলজ্জাও দূরীভূত, কারণ পরজাতিবিদ্বেষ এখন ক্ষমতার আশীর্বাদধন্য। তেমনি সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ইতিবাচক না লিখলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে না — এই ঘোষণা প্রমাণ করে অগণতান্ত্রিকতা জয়যুক্ত হয়েছে। এই জয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমের অবদানও ফেলে দেওয়ার মত নয়। এতবড় খবর যে একটি বড় সংবাদপত্রের ব্রিফে জায়গা পেয়েছে এবং অন্যত্র আদৌ জায়গা পায়নি, তার একটিমাত্র ব্যাখ্যাই সম্ভব বলে মনে হয়। “মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষপাত জেলার ছোট সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতি। অতএব বেল পাকলে কাকের কী?” আরও নৈরাশ্যবাদী হলে অবশ্য আরেকটি ব্যাখ্যাও করা সম্ভব। “এই নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে যদি যা পাচ্ছি তা-ও বন্ধ করা হয়?”

গত এক দশকে ভারতীয় গণতন্ত্র, পিছু পিছু ভারতীয় সাংবাদিকতা, যে পথে গেছে তাতে পরিষ্কার হয়ে গেছে, আয়ের যে পথ অবলম্বন করে এ দেশে সাংবাদিকতা এতকাল চলেছে তা বাতিল করতে হবে। নইলে সংবাদমাধ্যমের পক্ষে সত্য বলা, সত্য দেখানো অসম্ভব। সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং/অথবা কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ এড়ানো না গেলে সংবাদমাধ্যমকে ক্ষমতার বশংবদ হয়েই থাকতে হবে। ফলত ইংরেজিতে এবং ভারতের অন্যান্য ভাষাতেও এখন গ্রাহকভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চালু হয়েছে। নিউজলন্ড্রি, নিউজক্লিক, দ্য ওয়্যারের মত সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কেন তারা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সত্যের প্রতি অনেক বেশি বিশ্বস্ত থাকতে পারছে। আক্রান্ত হচ্ছে, তবু লড়ে যেতে পারছে। বাংলাতেও সেরকম প্রয়াস আশু প্রয়োজন। সেই প্রয়াস ফলপ্রসূ করতে হলে সত্যান্বেষী পাঠক, দর্শকদের এগিয়ে আসতে হবে। নইলে নাগরিক ডট নেট বা ইত্যাকার প্ল্যাটফর্মগুলিকেও অনতিবিলম্বে ক্ষমতার মালাই জপতে হবে।

তথ্যসূত্র

১। https://scroll.in/article/988105/explainer-how-indias-new-digital-media-rules-are-anti-democratic-and-unconstitutional

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: