সাংবাদিক? ওদের আবার কী দরকার?

গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।

ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।

ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।

বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

যাদবপুর: রিপাবলিক বা অন্য চ্যানেলে যা চলছে তা সাংবাদিকতা নয়

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে।

১৯৯০-এর দশকে তখন সারা ভারতের মাঠ মাতাচ্ছেন কৃশানু দে। ধীমান দত্ত সম্পাদিত খেলা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভারতীয় ফুটবল আন্তর্জাতিক স্তরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কেন? কৃশানুর উত্তরটা মোটামুটি এরকম ছিল – সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ থেকে সমরেশ বসুতে নেমেছে, ফুটবল চুনী গোস্বামী থেকে কৃশানু দে-তে নামবে না? ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন, এটা কোনো উত্তরই হল না। কৃশানুর খেলার ভক্তরা বলতে পারেন, কৃশানু অযথা বিনয় করছিলেন। তিনি মোটেই খুব নিচু মানের খেলোয়াড় ছিলেন না। সাহিত্যপ্রেমীরা বলতে পারেন, এ অতি বাজে তুলনা। সমরেশ বসু মোটেই এত ওঁচা লেখক নন যে রবীন্দ্রনাথ থেকে নামতে নামতে বাংলা সাহিত্য তাঁর স্তরে এসেছে বলা যাবে। কিন্তু যদি নামগুলো বাদ দিয়ে কৃশানুর বক্তব্যের নির্যাসটুকু নিই, তাহলে দেখা যাবে তিনি বলেছিলেন সব ক্ষেত্রেই বাঙালির অবনমন হচ্ছে। কথাটায় কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল নেই। সেই অবনমনের গতি গত ৩০-৩৫ বছরে আরও বেড়ে গেছে। কৃশানুর মানের বাঙালি ফুটবলার আজ আছে কি? সমরেশ বসুর মানের সাহিত্যিকও বাংলায় আর নেই। তবে বাঙালির সাংবাদিকতা যে উচ্চতা থেকে ধপাস করে পড়েছে, তার তুলনা মেলা ভার। মতি নন্দী থেকে মৌপিয়া নন্দী, গৌরকিশোর ঘোষ থেকে ময়ূখ ঘোষ। যেন এভারেস্ট থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়া।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং ফলাফল প্রকাশের পরেও সারা দেশে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের, বিশেষত খবরের চ্যানেলগুলোর ভূমিকা। হোয়াটস্যাপ থেকে পাওয়া ভুয়ো খবর সম্প্রচার করা; মন্দির বনাম মসজিদ বয়ান প্রচার করে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো; সান্ধ্য প্যানেলে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের ডেকে এনে লড়িয়ে দেওয়া; বিরোধী দলের মুখপাত্র থেকে শুরু করে ছাত্রনেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা সাংবাদিকদের ধমকানো; যে কোনো আন্দোলনকারীকে দেশদ্রোহী বা মাওবাদী বা খালিস্তানি বলে দেগে দেওয়া, পাকিস্তানের চর বা বিদেশের টাকায় চলেন বলে ঘোষণা করে দেওয়া – এইসব কুকর্ম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে শুধু যে দেশের গোদি মিডিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রচারযন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে তা নয়, দেশের সামাজিক পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে দিয়েছে। তার ফল আমরা এখনো পেয়ে চলেছি (ভারত ক্রিকেটে ট্রফি জিতলে মধ্যপ্রদেশে সংখ্যালঘু এলাকায় হিংসা ছড়ানো হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে হোলির জন্যে মসজিদ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ত্রিপল দিয়ে), আরও বহুবছর পাব।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের সাপেক্ষে বিজেপির ফল অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হওয়ায় বাংলার সংবাদমাধ্যমের দিকে তখন ততখানি নজর পড়েনি অনেকের। বস্তুত রিপাবলিক টিভি তখন পর্যন্ত মালিক অর্ণব গোস্বামীর পরিবেশনার গাঁক গাঁক শৈলীটুকুই চালু করতে পেরেছিল, ঘৃণার পথে রোজ নতুন মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়া তখনো জমিয়ে শুরু করেনি। বলা যেতে পারে প্রদীপ, থুড়ি আগুন, জ্বালাবার আগে কেরোসিন তেল জোগাড় করার পর্ব চলছিল। অন্যদিকে একদা বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া সুভাষ চন্দ্রের জি নেটওয়ার্কের চ্যানেল ২৪ ঘন্টাও তখন আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিল। তাছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে বিজেপির মন কষাকষির সংবাদও ভেসে এসেছিল। এবিপি আনন্দও আনন্দবাজার পত্রিকার মতই ধর্মেও থাকত, জিরাফেও থাকত। বাংলা চ্যানেলগুলোর দাঁত নখ বেরোতে শুরু করল ২০২৩ সাল থেকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের র‍্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে। তখনই প্রথম দেখা গেল, ওই ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলার জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর মুখ হয়ে ওঠা অ্যাংকররা একেবারে অর্ণব, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকতদের মত মার্কামারা গোদি মিডিয়ার অ্যাংকরদের ভাষায় ঘৃণা ছড়াতে পারেন।

২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে – এই ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়েছিল কিছু তথাকথিত জাতীয় চ্যানেল (ফরেন্সিক পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়)। তার ভিত্তিতে দিল্লি পুলিস ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করে এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয়টাকেই জেহাদি সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া বলে দেশের সামনে তুলে ধরার প্রক্রিয়া চালু করে গোদি মিডিয়া। সেইসময় টাইমস নাও চ্যানেলে কর্মরত অর্ণব কীভাবে লাইভ শোতে ডেকে উমর খালিদকে অসভ্যের মত ধমকেছিলেন, সেকথা অনেকেরই মনে আছে। ২০২৩ সালে দেখা গেল, মৌপিয়া অর্ণবের ছাত্রী না হলেও একলব্য তো বটেই। তিনিও যাদবপুরের এক ছাত্রনেতাকে ২৪ ঘন্টা চ্যানেলের শোতে ডেকে ধমকালেন এবং পাড়ার মস্তানদের কায়দায় বললেন ‘কে তুমি?’ যেন তিনি নিজে কোনো সম্রাজ্ঞী। রিপাবলিক বাংলার ময়ূখ অবশ্য তখনো তৃণমূল সরকারের বিরোধিতার কারণে এ রাজ্যের বাম কর্মী, সমর্থকদের নয়নের মণি। ওই চ্যানেলের দক্ষিণপন্থী প্রচারকে তখনো অনেকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছিলেন।

তারপর ঘটল আর জি করের ঘটনা। ততদিনে মৌপিয়া ২৪ ঘন্টা থেকে চলে গেছেন কলকাতা টিভিতে, যে কলকাতা টিভি কেন্দ্রীয় এজেন্সির কুনজরে (অর্থাৎ বিজেপির কুনজরে) পড়েছিল ২০২৩ সালেই। ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের দফতরে তল্লাশি চালিয়েছিলেন অফিসাররা। আর জি করের ঘটনায় রাজ্য সরকারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মৌপিয়ার চ্যানেল এবং সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল। তখনই দেখা যায়, তিনি আন্দোলন ব্যাপারটারই তীব্র বিরোধী। গোদি মিডিয়া চ্যানেলগুলোর মতই, সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকুক আর না-ই থাকুক, আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে নিত্যনতুন অভিযোগ চলতে থাকে। রিপাবলিক বাংলার তখনো দু নৌকায় পা, কারণ একদিকে তৃণমূল সরকারের বিরোধিতা করা কর্তব্য। অন্যদিকে বিজেপি যেই বুঝেছে আর জি কর আন্দোলন থেকে তাদের কোনো লাভ হবে না, হিন্দু-মুসলমান বাইনারির কোনো অবকাশ নেই, অমনি শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল নেতাদের সুর মিলে গেছে। ডাক্তাররা কত অসৎ, কেমন মদ গাঁজা খায়, তাদের উপর জনরোষ এসে পড়বে – এসব কথা এসে পড়েছে। এবিপি আনন্দ আবার সেই মামলায় প্রথম থেকে আন্দোলনের পাশে। কারণটা সহজবোধ্য। সরকারবাবুদের কাগজগুলোর মতই তাঁদের খবরের চ্যানেলের গুণগ্রাহীরাও বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররাও বেশিরভাগই আসেন সেই শ্রেণি থেকে। অতএব ডাক্তাররা দিন কে রাত, রাত কে দিন বললেও সর্বতোভাবে তাঁদের পাশেই থাকতে হত ঘন্টাখানেকের সুমন দে-কে।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এইসব ছোটখাটো পার্থক্য ঘুচে গেল যাদবপুরে ব্রাত্য বসুর গমন নিয়ে সাম্প্রতিক গোলমালে। যাদবপুরকে মৌপিয়া, ময়ূখ বা সুমন – কারোর চ্যানেলেরই পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে দেড় দশক হতে চলল, কেন্দ্রে বিজেপি জাঁকিয়ে বসেছে এক দশকের বেশি। রাজ্যের বিধানসভায় এরা ছাড়া আর কোনো দল নেই প্রায়। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো উভয়ের কেউই দাঁত ফোটাতে পারেনি। শিক্ষকদের মধ্যে যদি বা সংগঠন আছে, ছাত্রদের মধ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উপস্থিতি এখনো সাড়া জাগানোর মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা কার, তা নিয়ে যতই দড়ি টানাটানি করুন মুখ্যমন্ত্রী আর রাজ্যপাল – তাতে যাদবপুরের ছেলেমেয়েদের কিছু এসে যায়নি। এসে যে যায়নি তার প্রমাণ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি এমনিতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের একত্রে ঘিরে ধরা, গাড়ির সামনে শুয়ে পড়া। সকলেরই দাবি প্রায় এক – ক্যাম্পাসে নির্বাচন করো, গণতন্ত্র ফেরাও। সে দাবির পাশে কেনই বা রিপাবলিক, কলকাতা টিভি, এবিপি আনন্দ দাঁড়াবে? নির্বাচন হলে বেশিরভাগ আসনে জিতবে তো সেই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তিন চ্যানেলের একটার মালিকও যে বামপন্থীদের পছন্দ করেন না – একথা কে না জানে?

কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ যাদবপুরকে বদনাম দেওয়ায় থেমে থাকলে কথা ছিল। সে তো র‍্যাগিংয়ে ছাত্র মৃত্যুর সময় থেকেই ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর ব্যবহৃত কন্ডোম গুনে চলেছে বাংলার সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এবারের অভিনবত্ব লাগামছাড়া সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারে। বিন্দুমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণের তোয়াক্কা না করে যা খুশি অভিযোগ তুলে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করে চলেছে রিপাবলিক বাংলা। যাদবপুর আজমল কাসবের মত উগ্রপন্থী তৈরির কারখানা – এমনও বলা হচ্ছে গলা তুলে। কেন বলছেন ভাই? উত্তরে কিন্তু চিৎকার ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। এখানে যাদবপুর আসলে উপলক্ষ, আসল লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো। কিসের আতঙ্ক? ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক। যে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের কোনো হানা এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেনি, ভারতেও ঘটেনি বহুকাল। এমনকি ২০১৯ সালের পুলওয়ামার ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রবল জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্র মোদীর সরকারেরও কোনো তাপ উত্তাপ নেই। সেই কাণ্ডের দোষীরা আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হল না। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিসের এক শিখ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই দাভিন্দর সিং পর্যন্ত ২০২০ সালে জামিন পেয়ে গেছেন, কারণ পুলিস ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এমন উগ্রপন্থার আতঙ্ক আজ ছড়ানো কী উদ্দেশ্যে? হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ভয় জাগাতে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ঘটাতে। মৌপিয়া মাওবাদীর ভয় দেখানো পর্যন্ত এগিয়েছেন, ময়ূখ আরও এককাঠি সরেস। আসলে দুজনের প্রতি নির্দেশাবলিও বোধহয় কিছুটা ভিন্ন। দুজনেরই অন্তরালের উপরওয়ালার উদ্দেশ্য যাদবপুরের বারোটা বাজানো (কলকাতা পুলিস বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিস ফাঁড়ি করতে চায় বলে খবরে প্রকাশ। এতে কোনো পাঠকের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর ট্যাংক রাখতে চাওয়ার কথা মনে পড়লে নিবন্ধকার দায়ী নন), তবে ময়ূখের উপরওয়ালার তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের আরও আরও প্রান্তিক করে দেওয়ার লক্ষ্যও আছে নির্ঘাত। নেহাত সমাপতন নয় যে প্রায় একই সময়ে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের মুসলমান বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে।

এখানে একটা কথা বলা জরুরি। রিপাবলিক বাংলা কিন্তু আজ হঠাৎ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ শুরু করেনি, প্রথম থেকেই এ কাজ করে আসছে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে লাগাতার বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি দরদ দেখানোর ভান করে তীব্র বিদ্বেষমূলক, গালগল্পপ্রবণ শো চালিয়ে গেছে ময়ূখ ও তার চ্যানেল। মূল রিপাবলিক চ্যানেলটির বেত্তান্ত যাঁরা জানেন তাঁদের অবশ্য আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এরা সাংবাদিকতা করতে আসেনি, আরএসএস-বিজেপির এজেন্ডা অনুযায়ী সমাজে বিভাজন তৈরি করাই এদের আসল কাজ। জেগে ঘুমোলে অবশ্য কিছুই জানা যায় না, বোঝা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত ফ্যাসিবাদবিরোধী, হিন্দুত্ববাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে – তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলো – তারা এতদিন জেগেই ঘুমোচ্ছিল বোধহয়। তাই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়া জোট যখন সিদ্ধান্ত নিল যে হিন্দি, ইংরিজি চ্যানেল মিলিয়ে ১৪ জন অ্যাংকরের অনুষ্ঠান তারা বয়কট করবে, তখন এই সবকটা দল ওই জোটে থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু করা হবে কিনা তা নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হল, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের ’পর’? প্রশ্নটা বিশেষত বামপন্থীদের জন্যে। তৃণমূলের মুখপাত্রদের রিপাবলিক বাংলার সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। ময়ূখ বা রিপাবলিক বাংলার অন্য কোনো সাংবাদিক মুসলমানদের সম্পর্কে চাট্টি উস্কানিমূলক কথা বললে তা নিয়ে চ্যানেলে বসে চেঁচামেচি করে তাঁদের বরং সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হওয়ার ভান করতে সুবিধা হবে। আর কংগ্রেসের তো কে নেতা, কে নয় তাই বোঝা শক্ত। অবস্থা এমনই যে রাহুল গান্ধীকে গুজরাটে গিয়ে বলতে হয় – কংগ্রেসে বিজেপির লোক আছে, তাদের তিনি বার করে দেবেন। ফলে কে কোথায় যাবেন না যাবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কে?

কিন্তু বামপন্থীরা, অন্তত তাঁদের ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা করতে নামেননি। আবার কংগ্রেসের মত নেতৃত্বহীনতার সমস্যাও থাকার কথা নয়, কারণ তাঁদের তো ‘রেজিমেন্টেড’ দল। তাহলে? ময়ূখ সরাসরি এ রাজ্যের বামপন্থীদের আক্রমণ করল বলে ঘুম ভাঙল, নাকি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নোংরামি করার পরে ঘুম ভাঙল? যে কারণেই ভেঙে থাক, কবি বলেছেন, প্রভাত কেবল রাত্রির অবসানে নয়। যখনই চিত্ত জাগে তখনই প্রভাত হয়। কিন্তু প্রভাত কি আদৌ হয়েছে? এতকিছুর পরেও তো রিপাবলিক বাংলা চ্যানেলের শোতে বাম প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। যাদবপুর কাণ্ডে রিপাবলিক বাংলার কার্যকলাপে আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তারা সাংবাদিকতা করে না। ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের প্রতিবেদকদের উদ্দাম অসভ্যতার (ভিডিও প্রমাণ বর্তমান) ফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে যাদবপুর থানায়। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘দালাল’ আখ্যা পাওয়া প্রতিবেদকরা ক্যামেরার সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে দাবি করেছেন তাঁরা দালালই। দেশের মানুষের দালাল। অপছন্দের সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা দালাল আখ্যা দিচ্ছেন – এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সত্যিকারের সংবাদমাধ্যম সে আখ্যাকে পাত্তা দেয় না, ‘আমরা অমুক আমরা তমুক’ বলে বড়াইও করে না। কারণ সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠের মধ্যে যেটা পড়ে, সেটা হল – সাংবাদিক নিজে সংবাদ নয়। দেখা যাচ্ছে সেই প্রাথমিক পাঠটাই রিপাবলিক বাংলা মানে না। এরপরেও এদের সংবাদমাধ্যম হিসাবে গণ্য করার কোনো মানে নেই।

পশ্চিমবঙ্গের ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিরা প্রায় সবাই ‘গোয়েবেলস’ আর ‘রেডিও রোয়ান্ডা’ কথা দুটো ব্যবহার করে থাকেন। প্রথমটা অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ, নাজি প্রোপাগান্ডার দায়িত্বে থাকা কুখ্যাত ব্যক্তিটির নাম। দ্বিতীয়টা গত শতকের নয়ের দশকে আফ্রিকার রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে হুটু হত্যার মিথ্যা খবর প্রচার করে, লোক খেপিয়ে টুটসিদের গণহত্যার পথ প্রস্তুত করা রেডিও স্টেশনের নাম। আমাদের ফ্যাসিবিরোধীরা সঠিকভাবেই বলে থাকেন যে এদেশের গোদি মিডিয়া গোয়েবেলসের কায়দায় মিথ্যা প্রচার করে এবং রেডিও রোয়ান্ডার কায়দায় পরজাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে গণহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশের মুসলমানদের। কিন্তু মুশকিল হল, সে কাজে তাঁরা যে মদত দিয়ে ফেলছেন – এটা মানতে রাজি নন। আগে না হলেও, সম্প্রতি বাম দলগুলোর অনেক কর্মী, সমর্থক বলতে শুরু করেছেন যে রিপাবলিক বাংলায় পার্টি প্রতিনিধিদের আর না যাওয়াই উচিত। তাতে প্রতিযুক্তি দেওয়া হয় ‘ওই প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করা দরকার। ছেড়ে দেওয়া উচিত না’। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করনেওয়ালারা বোধহয় সেইসময় রোয়ান্ডায় থাকলে রেডিও রোয়ান্ডাতেও যেতেন – প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করতে।

করে কী লাভ হচ্ছে? কোনো পরিমাপযোগ্য লাভ কোনো বাম দলের নেতা বা মুখপাত্র দেখাতে পারবেন না। কী ক্ষতি হচ্ছে তা বরং পরিষ্কার। বহু বাম সমর্থকের বাড়িতে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, দিনরাত রিপাবলিক বাংলা এবং রিপাবলিক টিভি চলে। কেন চলে? কারণ বাম নেতারা ওই চ্যানেলগুলোতে যান বলে সমর্থকরা মনে করেন ওরা নিশ্চয়ই ঠিক জিনিস দেখায়, ঠিক কথা বলে। অর্থাৎ তাঁদের মনোজগতে রিপাবলিক নেটওয়ার্ক বৈধতা পেয়ে গেছে। এতে রিপাবলিকের সুবিধা হল, সারাদিন চেতনে ও অবচেতনে তাদের ঘৃণাভাষণ ও ভুয়ো খবর বাম সমর্থক পরিবারগুলোকে গেলাতে পারছে। ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদী তৈরি হয় বললেও তারা বিশ্বাস করবে, শিগগির পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে আর হিন্দুদের ফের দেশভাগের সময়কার মত জান মাল নিয়ে উদ্বাস্তু হতে হবে বললেও তারা বিশ্বাস করবে। সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে লোক হয় অথচ ভোট কেন পড়ে না – এই প্রশ্নের এও এক উত্তর। বাম নেতারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মনে করেন, তাঁরা রিপাবলিকের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছেন। আসলে রিপাবলিক তাঁদের ব্যবহার করছে। তার প্রমাণ নির্বাচনের পর নির্বাচনে বামেদের ভোট রামে চলে যাওয়া।

এই সহজ কথাটা স্বীকার করতে বাম নেতাদের ভীষণ অসুবিধা। তাঁদের জঙ্গি অনলাইন সমর্থকরাও এসব বললে বলেন – এটা মিডিয়ার যুগ। মিডিয়াকে ব্যবহার করতেই হবে। এখানে বলার কথা দুটো। প্রথমত, উট আর উটপাখি যেমন এক নয়, বক আর বকফুল যেমন এক নয়, রিপাবলিকও তেমন মিডিয়া নয়। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া সম্পর্কে নিজেদের অগ্রজদের সাবধানবাণীই আজকের বাম নেতা কর্মীরা বিস্মৃত হয়েছেন। একাধিক লোকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায় যে জ্যোতি বসু আর প্রমোদ দাশগুপ্ত দুজনেই কমরেডদের বলতেন ‘আনন্দবাজার আমাদের কোনো কাজের প্রশংসা করলেই সাবধান হবেন। আরেকবার ভেবে দেখবেন কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা।’ তাও তো ওঁদের সময়ে কোনো সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের স্তরে নামেনি। তবু একথা তাঁরা কেন বলতেন? কারণটা খুব স্পষ্ট। মিডিয়া হাউস মানেই হল বৃহৎ পুঁজি। তার স্বার্থ সবসময় বামপন্থী দলগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী, তারা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতে চায় – তার পরিপন্থী। সুতরাং তাদের প্ল্যাটফর্মে তারা বামপন্থীদের ততটুকুই প্রচার দেবে যতটুকুতে তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়। অতএব তাদের নিন্দাই প্রত্যাশিত, প্রশংসা সন্দেহজনক।

একথা বললে সিপিএমের এখনকার লোকেরা বলেন ‘এখন যুগ বদলে গেছে। ওসব ওঁদের যুগে চলত, এখন চলে না।’ কথা হচ্ছে, যুগ তো সর্বদাই বদলায়। কিন্তু জ্যোতিবাবুদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মিডিয়ার কী ধরনের বদল হয়েছে? বৃহৎ পুঁজির বদলে এখনকার মিডিয়া কি ছোট পুঁজির হাতে চলে গেছে? ফলে তাদের স্বার্থের সঙ্গে বামপন্থীদের স্বার্থের সংঘাত আগের চেয়ে কমে গেছে? মোটেই তা নয়। বরং এখন মূলধারার মিডিয়া আরও বড় পুঁজির অধীন হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউস নামে, বেনামে হয় মুকেশ আম্বানি নয় গৌতম আদানির হাতে চলে গেছে। অর্ণব যখন রিপাবলিক টিভি চালু করেন, তখন তাঁকে পুঁজি জুগিয়েছিলেন আবার এক বিজেপি সাংসদ অস্ত্র ব্যবসায়ী – এ তথ্যও সবার জানা। সেই নেটওয়ার্কের চ্যানেলে না গেলে চলবে না বা গেলে বামপন্থীদের লাভ হবে – এহেন চিন্তার ব্যাখ্যা কী?

সন্তোষজনক ব্যাখ্যা যে নেই তা ১ মার্চের পর থেকে এ রাজ্যের বাম নেতা কর্মীরা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন। তাই ময়ূখের উপর অভিমান করতে শুরু করেছেন। কলেজজীবনে ময়ূখ ভারতের ছাত্র ফেডারেশন করতেন বলে শোনা যায়। সাংবাদিকতার পেশায় যাওয়ার পরেও সেই গন্ধ তাঁর গায়ে বেশ কিছুদিন লেগেছিল। সেই সময়কার সোশাল মিডিয়া পোস্ট দেখেই বিশেষত সিপিএম সমর্থকরা তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। এখন সেইসব পোস্ট শেয়ার করে বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে – তাহলে কি তখন ময়ূখ নিজেই দেশদ্রোহী ছিল, ইত্যাদি। সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের একখানা ভিডিও দেখলাম। সেটা ১৩ মার্চ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রিপাবলিকের বীরপুঙ্গবদের চরম অসভ্যতার আগে শুট করা। সেখানে সৃজন ময়ূখের বক্তব্যের সমস্ত গোলমাল সুন্দর তুলে ধরলেন, কিন্তু তারপর বললেন ‘ও ছোটবেলায় এরকম ছিল না’। মুশকিল হল, ছোটবেলায় তো হিটলারও নাজি ছিল না। তাতে কী এসে যায়? সমস্যাটা তো আসলে ব্যক্তি ময়ূখ বা ব্যক্তি মৌপিয়া নন। কোন সাংবাদিক কীভাবে কাজ করবেন, কোন বিষয়ে কোন পক্ষ নেবেন তা ঠিক হয় তাঁর কোম্পানির (পড়ুন মালিকের) স্বার্থ অনুযায়ী। এটুকু বোঝার মত রাজনৈতিক পরিপক্কতা কি বঙ্গ সিপিএমের নেতাদের নেই?

আরেকটা জিনিস হয়ত সৃজনের মত তরুণ নেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ তাঁরা সে আমলে ছোট ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তীদের না জানার কথা নয়। তা হল বামফ্রন্ট আমলে কলেজে রাম, শ্যাম, যদু, মধু সবাই এসএফআই ছিল। অফিসে যেমন সবাই কো-অর্ডিনেশন কমিটি, স্কুলে এবিটিএ আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকুটা। ওতে কিছু প্রমাণ হয় না। অমন সর্বাঙ্গীণ আনুগত্য তৈরি করার বিপদই হল – সরকার বদলালেই লোকগুলো বদলে যায়। যেভাবে পাড়ায় পাড়ায় অটো স্ট্যান্ডের লাল পতাকাগুলো ঘাসফুলে বদলে গিয়েছিল ২০১১ সালে। মানুষের আসল রং বোঝা যায় দিন বদলালে। ময়ূখের রং এখন দেখা যাচ্ছে।

একটা সংবাদমাধ্যমে যতজন সাংবাদিক কাজ করেন তাঁরা সকলে নীতি নির্ধারক নন। অন্য যে কোনো পেশার মত সেখানেও অধিকাংশই স্রেফ হুকুম তামিল করেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের কুকর্মের জন্য সাংবাদিককে সবসময় দায়ী করা যায় না। কিন্তু ময়ূখ, মৌপিয়া, সুমনরা যে স্তরে পৌঁছে গেছেন তাতে আর তাঁদের পদাতিক সৈনিক বলে ছাড় দেওয়া যায় না। ওই স্তরের সাংবাদিকরা সরাসরি নির্দেশ নেন মালিকের থেকে, অনেকসময় কোম্পানিতে তাঁদের শেয়ারও থাকে। মালিকরা জেনে বুঝেই এমন লোককে ওই জায়গায় তোলেন যে বিনা বাক্যব্যয়ে এমন কাজ করতে পারবে যা বিন্দুমাত্র বিবেক থাকলে পারা যায় না। ফলে ময়ূখ-মেদুরতা এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ভাবনা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় মেরুকরণে নেমে পড়া মিডিয়াকে বয়কট করার সময় এসে গেছে। বিভিন্ন দলের নেতারা ওসব চ্যানেলে গিয়ে বৈধতা না দিলেই সমর্থকদের চোখেও ওদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়বে কিনা জানি না, ক্রমশ বারুদের স্তূপ হয়ে ওঠা সমাজে অবশ্যই পড়বে। রবীশ কুমার এমনি এমনি বলেন না – টিভিতে খবর দেখা বন্ধ করুন।

পুনশ্চ: রিপাবলিক টিভি আর কলকাতার টিভির দুই তারকার চেয়ে ভদ্র আচরণ করেন। তাহলেও এবিপি আনন্দের সুমনের কথাবার্তা কোন দিকে গড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার আমাদের সকলের। মনে রাখা ভাল, তিনি পুঁচকে দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের আব্বাস সিদ্দিকীকে বলতে পারেন ‘আব্বাস, আপনি বিজেপির ভোট কাটুয়া।’ কিন্তু অমিত শাহের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন না – তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে অবাধ যাতায়াত চলে কী করে? উপরন্তু, বাংলাদেশের বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক হাওয়া তোলার চেষ্টা সুমনের শো থেকেও কম হয়নি। আর সাম্প্রতিক যাদবপুর কাণ্ডে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন প্রমাণ করতে যে ইন্দ্রানুজ রায়ের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে যাওয়ার ছবিটা ভুয়ো। প্রমাণ হিসাবে কী যুক্তি দিচ্ছিলেন? না ছবিটা গণশক্তি ছাড়া কোথাও বেরোয়নি। এই যুক্তিতে দুনিয়ার সব সংবাদমাধ্যমের সব এক্সক্লুসিভই ভুয়ো। কারণ সেই খবর অন্য কোথাও বেরোয় না।

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে। সেই গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্তরা জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের শিষ্যরা অনেকে আছেন। সেই শিষ্যদের আজও অনেক সাংবাদিক আদর্শ বলে মনে করেন, বহু পাঠক/দর্শক তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেন। সেই অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, জয়ন্ত ঘোষাল, অশোক দাশগুপ্তরা এখনো হয় কাগজে নয় সোশাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয়। এই ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’-রা কেউ কি সোচ্চারে বলেছেন, বাংলার টিভি চ্যানেলগুলো যা করছে তা সাংবাদিকতা নয়? কারোর জানা থাকলে খবর দেবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কর্ণাটক নির্বাচনের ফল: মিডিয়া, জিভ কাটো লজ্জায়

কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকতা আজ কদর্যতার নতুন শৃঙ্গে আরোহণ করল বিজেপি হেরে যাওয়ায়। এর বিপদ দীর্ঘমেয়াদি।

কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেভাবে এই নির্বাচনের ফলাফল সম্প্রচারিত হতে দেখলাম টিভির পর্দায়, সাংবাদিক হিসাবে সেটা নিয়ে আলোচনা করাও আমার অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। ব্যাপারটার শুরু নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই।

নতুন সহস্রাব্দের গোড়ায় এ দেশে চব্বিশ ঘন্টার খবরের চ্যানেলের ছড়াছড়ি হওয়ার পর থেকেই প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা ওপিনিয়ন পোল এবং বুথফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোলের বিপুল জনপ্রিয়তা। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা ভোটারদের প্রভাবিত করে কিনা বা এক দফা ভোটের পর টিভিতে বুথফেরত সমীক্ষা হলে পরের দফাগুলোয় যেখানে ভোটদান হবে সেখানকার ভোটদাতারা প্রভাবিত হন কিনা – এ নিয়ে একসময় বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। ফলে এখন নিয়ম হয়ে গেছে, যে কোনো স্তরের নির্বাচনের ৪৮ ঘন্টা আগে থেকে প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা যাবে না, আর শেষ দফার ভোটদান সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো গত কয়েক বছরে নিরপেক্ষতার ভান ত্যাগ করে ক্রমশ যত একচোখা হয়ে উঠেছে, তত এইসব সমীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বর মাসেই সংসদে মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়ে দিয়েছেন, এইসব সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

খুব ভাল কথা। গত দশ বছরে লোকসভা তো বটেই, বেশিরভাগ নির্বাচনের প্রাক্কালে মতামত সমীক্ষায় দেখা গেছে বিজেপি ভাল জায়গায় আছে, বুথফেরত সমীক্ষাতেও তাই। সবসময় যে সেইসব সমীক্ষার ফল মিলেছে তা নয়, সব নির্বাচনেও বিজেপি জেতেনি। কিন্তু ভুল কোন সমীক্ষায় না হয়? কোন দলই বা সব নির্বাচনে জেতে? ফলে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের এইসব সমীক্ষা নিষিদ্ধ করতে চাওয়ার কারণও ছিল না। কিন্তু এবারে কর্ণাটক নির্বাচনের আগে একটা অন্যরকম প্রবণতা লক্ষ করা গেল। যেই দেখা গেল প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষাগুলোতে ক্ষমতাসীন বিজেপির হাল ভাল নয় বলে দেখা যাচ্ছে, অমনি চ্যানেলগুলো ওইসব সমীক্ষা নিয়ে হইচই করা বন্ধ করে দিল। কোন চ্যানেলের সমীক্ষায় কী পাওয়া গেছে তা নিয়ে খবরের কাগজগুলোও বিশেষ জায়গা খরচ করল না। অথচ কাগজের রাশিফলের কলাম অনেকে যেভাবে গেলে, সেইভাবে ভোটে কী হতে চলেছে তা নিয়ে অনুষ্ঠান হলেও লোকে বিলক্ষণ গেলে। কারণ ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা কল্পনা করতে প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ ভালবাসে। অতএব টিআরপি আদায় করতে যে কোনো চ্যানেলের কাছে সমীক্ষাগুলো দারুণ লোভনীয়। তবু ঢাকঢোল পিটিয়ে সেগুলো নিয়ে প্রচার করতে দেখা গেল না। অথচ অতীতে খোদ বিজেপিকে দেখা গেছে বিজ্ঞাপন দিতে, যার বয়ান খানিকটা এইরকম – সমস্ত ওপিনিয়ন পোল বলছে আমরা জিতব। তাই আমাদেরই ভোট দিন। এবারে প্রায় কোনো প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষাকেই সেভাবে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। তাই কি গোদা বাংলায় যাকে চেপে যাওয়া বলে, গোদী মিডিয়া তাই করতে শুরু করল?

এ সন্দেহ দৃঢ় হয় রায় দম্পতির হাত থেকে গৌতম আদানির করতলগত হওয়া এনডিটিভির কাণ্ড খেয়াল করলে। তারা ১০ মে ভোটদানের আগে দুদিন ধরে বিস্তারিত প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল সম্প্রচার করল। তাতে ভোটাররা কোন ইস্যুকে প্রধান ইস্যু বলে ভাবছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ সম্পর্কে মতামত কী, রাজ্য সরকারের কাজ সম্পর্কে কী ভাবছেন – এইসব গভীর প্রশ্ন ছিল। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কত শতাংশ মানুষ কাকে দেখতে চান – এ প্রশ্নও ছিল। অথচ কে কত আসন পেতে পারে সেই হিসাবটাই দেখানো হল না।

আরও মজা হল গত বুধবার ভোটদানের পর সন্ধেবেলা। একমাত্র নিউজ নেশন-সিজিএস বুথফেরত সমীক্ষা নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বলল, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে ১১৪ আসন নিয়ে, কংগ্রেস পাবে ৮৬, জেডিএস ২১ আর অন্যরা তিন। আর কোনো সর্বভারতীয় সমীক্ষাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে রাজি হল না। “এত আসন থেকে অত আসনের মধ্যে পাবে” – এটাই দেখা গেল সকলের পছন্দের নীতি। তাতেও সমস্যা ছিল না। কিন্তু কংগ্রেস আর বিজেপি – দুই প্রধান পক্ষকে যে সংখ্যাগুলো দেওয়া হল, সেগুলোর কোনো সীমা পরিসীমা নেই। যেমন এবিপি নিউজ-সি ভোটার বলল বিজেপি পাবে ৬৬-৮৬ আসন আর কংগ্রেস ৮১-১০১। রিপাবলিক টিভি-পি মার্কের মতে বিজেপি ৮৫-১০০; কংগ্রেস ৯৪-১০৮। সুবর্ণ নিউজ-জন কি বাত বিজেপিকে দিল ৯৪-১১৭, কংগ্রেসকে ৯১-১০৬। টিভি ৯ ভারতবর্ষ-পোলস্ট্র্যাট বলল বিজেপি পাবে ৮৮-৯৮, কংগ্রেস ৯৯-১০৯।

সংখ্যাগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। একটা দল ৯৪ আসন পাওয়া মানে তার বিরোধী আসনে বসা প্রায় নিশ্চিত, অন্যদিকে ১১৭ আসন পাওয়া মানে নিশ্চিন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ছেলে পরীক্ষা দিয়ে এল, বাবা জিজ্ঞেস করলেন “কত পাবি?” ছেলে বলল “পাসও করতে পারি, ফেলও করতে পারি।” এ তো সেইরকম সমীক্ষা হয়ে গেল। একটা দল ৮৫ পেতে পারে, আবার একশোও পেতে পারে – একথা বলার জন্যে সমীক্ষা করার প্রয়োজন কী? এনডিটিভি নিজে কোনো সংস্থার সাহায্য নিয়ে এবারে বুথফেরত সমীক্ষা করেনি। এই সংখ্যাগুলো যখন বুধবার সন্ধ্যায় তাদের চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল, তখন বিজেপি মুখপাত্র দেশরতন নিগম সঙ্গত কারণেই বলেছিলেন “এবার দেখছি আমিও একটা পোল সার্ভে এজেন্সি খুলে ফেলতে পারি।”

চূড়ান্ত ফল এই সমস্ত সমীক্ষাকেই ভুল প্রমাণ করেছে। যখন এই লেখা লিখছি, তখন নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট বলছে কংগ্রেস ১১৭ আসনে জিতে গেছে, আরও ১৯ আসনে এগিয়ে। অর্থাৎ মোট ১৩৬। বিজেপি ৫৩ আসনে জয়ী, আরও ১১ আসনে এগিয়ে। অর্থাৎ মোট ৬৪। এছাড়া জেডিএস ১৮ আসনে জয়ী, আরও দুই আসনে এগিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে এই সমীক্ষাগুলোর ভুলের পরিমাণ কিন্তু লাগাতার কমছিল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মত হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনের ফলাফল কোনদিকে যাবে তা সঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছিলেন অনেক সংস্থার সমীক্ষকই, দু-একটা সংস্থা আসন সংখ্যাও প্রায় নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিল। তাহলে কর্ণাটকে গিয়ে কি তাঁরা সকলে রাতারাতি সব দক্ষতা হারিয়ে ফেললেন? নাকি সমীক্ষকদের দেওয়া সত্যিকারের সংখ্যাগুলো মিডিয়া আমাদের দেখতেই দিল না প্রলোভনে বা ভয়ে?

কোনো সন্দেহ নেই যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের নির্বাচন জিততে চেয়েছিল। কিন্তু হারলেও তাদের পক্ষে ফলটা তো নেহাত খারাপ হয়নি। সেই প্রথম তারা এই রাজ্যে একক বিরোধী দল হিসাবে উঠে আসে। ২০১৬ বিধানসভার তুলনায় বিধায়কের সংখ্যা বেড়ে যায় ২৫ গুণেরও বেশি। ফলে হারলেও সেই ফলকে যে একাদশাবতার মোদীজির সাফল্য হিসাবে দেখানো সম্ভব হবে তা তো বিজেপির জানাই ছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের এক বছরও যখন বাকি নেই, সেইসময় কর্ণাটকের মত বড় রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী দিনরাত প্রচার করার পরেও কেবল ক্ষমতা খোয়ানো নয়, গোটা ষাটেক আসনে নেমে আসাকে যে কোনোভাবেই সাফল্য বলে প্রমাণ করা যাবে না – তা বোধহয় অমিত শাহের মত পাকা মাথার লোকেদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাই কি এত-থেকে-অত শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে বলা হয়েছিল বৃহৎ পুঁজির মালিকানায় থাকা সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে?

ইন্দিরা গান্ধী আরোপিত জরুরি অবস্থা সম্পর্কে লালকৃষ্ণ আদবানির একটা উক্তি বিজেপি নেতারা কয়েক বছর আগে পর্যন্তও খুব আওড়াতেন। আদবানি বলেছিলেন “শ্রীমতি গান্ধী মিডিয়াকে নত হতে বলেছিলেন, মিডিয়া হামাগুড়ি দিয়েছিল।” ২০১৪ সাল থেকে মূলধারার মিডিয়া যেভাবে চলছে সে সম্পর্কে অধুনা মার্গদর্শকমণ্ডলীর সদস্য আদবানির মতামত আমরা জানি না। কিন্তু আজ ফল প্রকাশের দিন সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যা করল, তাকে বোধহয় একমাত্র দণ্ডি কাটার সঙ্গে তুলনা করে চলে।

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল সকালের দিকেই। ইন্ডিয়া টুডের অ্যাঙ্কর রাহুল কাঁওয়াল কংগ্রেসের অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে টুইট করা একটা ভিডিও নিয়ে বেজায় আপত্তি করতে লাগলেন। কেন সেই ভিডিওতে রাহুল গান্ধীকে নায়কোচিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে? কেন লেখা হয়েছে “আমি অপরাজেয়। আমি আত্মবিশ্বাসী। হ্যাঁ, আজ আমি অপ্রতিরোধ্য।” ভিডিওটায় আপত্তিকর কী আছে তা কাঁওয়াল কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছিলেন না, কিন্তু কী যেন খচখচ করে বিঁধছিল। সত্যি কথা বলতে, দেখে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল। ক্লাসের কোনো একটা ছেলের দিকে একাধিক মেয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালে আমরা বাকিরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করার চেষ্টা করতাম তার মধ্যে বিশেষ কিছুই নেই – না রূপের দিক থেকে, না গুণের দিক থেকে। এও যেন সেই ব্যাপার।

যদিও কাঁওয়াল মোটেই আমাদের মত যৌন ঈর্ষায় ভুগছিলেন না। পর্দার নিচের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছিল কংগ্রেস তখন ১২১, বিজেপি ৭৬। সংখ্যার উপর তো আর রাগ দেখানো চলে না, তাই গায়ের ঝালটা কংগ্রেস নেতাটির উপরেই ঝাড়ছিলেন তিনি। ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হল খানিক পরে যখন কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এলেন। কংগ্রেস কেন এগিয়ে বা আরও এগিয়ে নেই কেন, সেসব প্রশ্নে না গিয়ে কাঁওয়ালবাবুর বর্ষীয়ান সহকর্মী রাজদীপ সরদেশাই প্রবল বিক্রমে প্রশ্ন করলেন, কংগ্রেস কর্মীরা কেন পোস্টাল ব্যালট গণনার সময় থেকেই ঢাকঢোল পিটিয়ে নাচ করছিলেন। যেন তাতে বিরাট কিছু হেরফের হয়ে যাবে বা কোনো নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করা হয়েছে। কাঁওয়ালও সঙ্গত করলেন। সুপ্রিয়া পাল্টা আক্রমণে গিয়ে যা বললেন তার নির্যাস হল, নেচেছে বেশ করেছে। আপনাদের স্টুডিওতে তো সকাল থেকে শোকপালন চলছে বলে মনে হচ্ছে। এহেন আক্রমণের মুখে দুজনকেই ব্যাকফুটে যেতে হল। কিন্তু তাতে অনুষ্ঠানের গুণগত পরিবর্তন কিছু হয়নি। সারাদিন ধরেই নানাবিধ গ্রাফিক্স তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা চলল যে বিজেপির এই হার তেমন বড় হার নয়। মাঝে মাঝে উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত, পৌরসভার নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য তুলে ধরার চেষ্টাও করা হল। উপরন্তু দিন দুয়েক আগে লাইভ অনুষ্ঠানে যোগেন্দ্র যাদবের খোঁচা উপেক্ষা করে আগাগোড়া ইন্ডিয়া টুডে মল্লিকার্জুন খড়গে আর জেপি নাড্ডার ছবি ব্যবহার করে গেল। কংগ্রেস হারলে আর বিজেপি জিতলে যেভাবে রাহুল আর মোদীর ছবি ব্যবহার করা হয় তা এ দিন করা হল না।

রাজদীপ অবশ্য নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে অত্যুৎসাহী হওয়ার ফল হাতেনাতে পেলেন কিছুক্ষণ পরেই, যখন বিজেপির আই টি সেলের সর্বেসর্বা অমিত মালব্য তাঁকে কুৎসিত ভাষায় অকারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করলেন।

কতটা বেহায়া এবং অসাংবাদিক হলে শাসক দলের মুখপাত্রের হাতে সহকর্মীর অমন অপমানে চুপ করে থাকা যায় কাঁওয়াল তা দেখিয়ে দিলেন। সেই তিনিই আবার বিকেলের দিকে সুপ্রিয়া যখন ফেরত এলেন, তখন পুরুষসিংহের মত গর্জন করে গেলেন “আজ কেন বলছেন না গণতন্ত্র মৃত? আজ কেন বলছেন না ইভিএমে গণ্ডগোল আছে?” অবশ্য ফ্যাক্ট চেকার মহম্মদ জুবেরের টুইট দেখে জানতে পারছি, বিজেপির পরাজয় থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আজ ওটাই গোদী মিডিয়ার বিশিষ্ট সাংবাদিকদের অন্তিম হাতিয়ার হিসাবে স্থির হয়েছিল।

এ তো গেল ইন্ডিয়া টুডের কথা। সাধারণত কোলাহল সবচেয়ে কম হয় বলে এখনো এনডিটিভি দেখে থাকি। প্রণয় রায়দের প্রস্থানের পর সেখানেও অন্য চ্যানেলের মত অত্যন্ত হাস্যকর কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। আজ যেমন স্টুডিওর এক কোণে একজনকে কন্নড় খাবারদাবার তৈরি করতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরিচিত মুখ বিষ্ণু সোম এবং আদানি আমলে নতুন যোগ দেওয়া দুই অপেক্ষাকৃত তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ বলতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও কেবলই বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন কেন এই হার বিজেপির পক্ষে রীতিমত সম্মানজনক। ব্যাপারটা একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে দুই তরুণ মুখের একজন ‘সিনিয়র জার্নালিস্ট’ শ্রীনিবাস রাজুকে বলেই ফেললেন “কংগ্রেস যখন হারে তখন তো আমাদের এক্সপার্টরা বলেন ‘ডেসিমেটেড’। আজ বিজেপি হারছে অথচ ‘তেমনভাবে হারছে না’ বলছেন কেন বলুন তো?” রাজু বলার চেষ্টা করলেন, তিনি কিছু বলছেন না। যা বলার ডেটাই বলছে। সামনে ল্যাপটপ নিয়ে বসা অ্যাঙ্কর বললেন “কই, ডেটা তা বলছে না তো!” বেচারির কাল সকাল পর্যন্ত চাকরিটা থাকলে হয়।

আরও পড়ুন রাজদীপের দ্বীপান্তর: নিরপেক্ষতার পুরস্কার?

এবং অর্ণব গোস্বামী। প্রিন্স অফ ডেনমার্ককে বাদ দিয়ে যেমন হ্যামলেট হয় না, ভারতীয় মিডিয়া আলোচনাও তেমনি এ গোঁসাইকে বাদ দিয়ে হয় না। তবে যে যা-ই মনে করুক, আমার মত স্বাধীন সাংবাদিকের বাড়িতে মাস গেলে কোনো রাজনৈতিক দলের দপ্তর থেকে মোটাসোটা প্যাকেট এসে তো পৌঁছয় না, ফলে কোন চ্যানেল রাখব আর কোনটা রাখব না সে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সারাক্ষণ গোঁসা করে থাকা গোঁসাইয়ের চ্যানেল পয়সা খরচ করে দেখার শখ আমার নেই। তাই রিপাবলিক নেটওয়ার্ক দেখি না। কিন্তু আজ অন্য সূত্র থেকে একটু-আধটু দেখতেই হল। দেখলাম তাঁর মেজাজ বরাবরের মতই সপ্তমে চড়ে যাচ্ছে যখন তখন, তবে সে চাপ বেশিক্ষণ নিলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে ভেবেই হয়ত কভারেজ কখনো জলন্ধর লোকসভার উপনির্বাচন, কখনো পাকিস্তানের সঙ্কটে চলে গেছে তাঁর গোটা নেটওয়ার্কেই।

বাংলা চ্যানেলগুলোর কথা আর কী বলব? বছরে ৩৬৪ দিন তারা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্যকিছুর খবর রাখে না। সেই কূপমণ্ডূকতা একদিনে কাটিয়ে উঠে কি আর জাতীয় হয়ে ওঠা যায়? এবিপি আনন্দে দেখলাম নানা ছুতোয় তৃণমূল কংগ্রেস এরপর কী করবে আর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কর্ণাটক থেকে কিছু শিখবে কিনা এই নিয়েই চিল চিৎকার চলছে। টিভি৯ বাংলা আরও এককাঠি সরেস। তারা বেশ বেলা পর্যন্ত পর্দায় সংখ্যাগুলো উপস্থাপন করা ছাড়া কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে কিছুই দেখাচ্ছিল না, ব্যস্ত ছিল অয়ন শীলকে নিয়ে। পরে দায়সারা সম্প্রচার শুরু হল। বাকি চ্যানেলগুলো দেখার আর প্রবৃত্তি হয়নি।

এত লম্বা লেখা পড়ে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, আজ মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে লেখার কী দরকার ছিল?

উত্তরে বলি, সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা যে একটি সোনার পাথরবাটি তাতে সন্দেহ নেই। বড় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণগুলো বাদ দিলেও, সাংবাদিকরা মানুষ এবং কোনো মানুষ নিরপেক্ষ নয়। ফলে মানুষের সাংবাদিকতাও ১০০% নিরপেক্ষ হতে পারে না। সে কারণেই সমস্ত পেশার মত সাংবাদিকতাতেও কিছু নিয়মকানুন (যার পোশাকি নাম এথিক্স) মেনে চলা হয় চিরকাল। সেগুলোর সময়োচিত পরিবর্তনও ঘটে। কিন্তু অমৃতকালে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো ন্যূনতম এথিক্স বিসর্জন দিয়ে এতটাই পক্ষ নিয়ে ফেলেছে যে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। উল্টে সাংবাদিকতার অর্থটাই সাধারণ দর্শকের কাছে উল্টে গেছে। এখন তাঁরা মনে করেন একজন সাংবাদিক অমুক দলের কোনো কাজের সমালোচনা করেছেন মানেই তিনি ওই দলের বিরোধী। পরে আবার একই দলের কোনো কাজের প্রশংসা করলে মনে করেন পালটি খেল, বা এতদিনে আসল চেহারা বের করল। এই অভিজ্ঞতা রাজদীপের মত স্বনামধন্য সাংবাদিক থেকে শুরু করে আমার মত চুনোপুঁটি – সকলেরই। কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকতা আজ কদর্যতার নতুন শৃঙ্গে আরোহণ করল বিজেপি হেরে যাওয়ায়। এর বিপদ দীর্ঘমেয়াদি। বহুদিন পরে জয়ী হওয়া দলের সদস্য, সমর্থকরা আজ নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে মিডিয়া নামেই সাংবাদিকতা করে, এরা আসলে ক্ষমতাসীন দলের দালাল। অতএব কেন্দ্রীয় সরকারের জোয়াল ২০২৪ বা পরবর্তী যে সময়েই বিজেপি-আরএসএসের হাত থেকে বেরিয়ে যাক না কেন, নতুন যে দল ক্ষমতায় আসবে তারাও মিডিয়ার কাছ থেকে দালালিই দাবি করবে। একবার যে দালাল বলে প্রমাণিত হয়েছে তাকে তো আর সাংবাদিক বলে বিশ্বাস করা যায় না।

এই ক্ষতি সমস্ত সাংবাদিকের। তার চেয়েও বড় কথা, এই ক্ষতি গণতন্ত্রের।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত